“দুটি কথা”
‘মক্কার পথ’ প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, লেখক ও সাংবাদিক মুহাম্মদ আসাদ কর্তৃক লিখিত ‘The Road of Mecca’ গ্রন্থ এর অনুবাদ। মুহাম্মদ আসাদ জাতিতে ছিলেন ইহুদী। কিন্তু কিশোর বয়সেই তিনি ইহুদী ধর্মের প্রতি তাঁর আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেন। বয়োবৃদ্ধির সংগে সংগে তিনি পাশ্চাত্যের নব্য আধুনিক জীবন-পদ্ধতি ও তার জীবনাচরনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। একদিকে পাশ্চাত্যের জড়বাদী ভোগবাদ, অন্যদিকে যাজকদের অপার্থিব শরীর-বিমুক্ত আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা তাঁকে পাশ্চাত্য বলয় থেকে দূরে সরিয়ে নেয় এবং তাঁকে প্রাচ্যমুখী করে তোলে। তিনি আরবীয় এবং দেহ ও আত্মার সামঞ্জস্যবাদী মধ্যপন্থী ইসলামী জীবনবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ১৯২১ সালে তিনি ইসলাম কবুল করেন এবং মুহাম্মদ আসাদ নাম গ্রহণ করেন।
‘The Road of Mecca’ বা ‘মক্কার পথ’ মুহাম্মদ আসাদের রূহানী আত্মজীবনী। দেশ সফরের বিচিত্র অভিজ্ঞতা বর্ণনা প্রসংগে তিনি তাঁর আত্মিক উন্মোচনের কহিনী তুলে ধরেছেন। এ গ্রন্থে তাঁর ভ্রমণ-জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, আরবীয় দুনিয়ার জীবনধারা এবং তার সংগে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের জীবনধারার তুলনামুলক বৈশিষ্ট্য যেমন গল্পের আংগিকে বর্ণিত হয়েছে, তেমনি চিত্রিত হয়েছে এক অতৃপ্ত সত্যসন্ধানী চিত্তের সত্যোপলদ্ধির মর্মস্পর্শী কাহিনী।
বলাবাহুল্য, এ বইটি লিখেছেন এ যুগের এমন একজন চিন্তাশীল মনীষী, যিনি সাধারণ যুক্তিহীন আবেগাক্রান্ত ধর্মন্তরিত মুসলিম নন। তিনি এক অনন্যসাধারণ প্রতিভান্বিত ব্যক্তি যিনি ধর্ম গ্রহণের পূর্বে তাঁর সমস্ত বিদ্যা ও বুদ্ধির আলোকে ধর্মকে বুঝতে এবং তার মর্ম উপলদ্ধি করতে প্রয়াস পেয়েছেন।
এই অতি উঁচু মানের সাহিত্য-গুণসম্পন্ন চিত্তাকর্ষক গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ করেছেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী ও ইসলমী চিন্তাবিদ, ‘ইসলমি ফাউন্ডেশন পত্রিকা’ ও ‘সবুজ পাতা’র সাবেক সম্পাদক শাহেদ আলী। গল্প লেখার ভাষা তাঁর জাদুকরী হাত এই গ্রন্থটির বর্ণনাধর্মী সাহিত্যিক ভাষার অনুবাদে যে দারুণভাবে সফল হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই এবং যে-কোন পাঠক এর প্রাঞ্জল প্রসাদগুণ উপভোগ করে আনন্দ উপভোগ করবেন এবং এর বিশাল পৃষ্ঠযাত্রায় যে ক্লান্ত হবেন না, আনন্দের সংগে সে সংবাদ আমরা দিতে পারি। আর এ কারণেই পাঠকদের উপহার দিতে আমরা এ গ্রন্থখানির পুন:নবকলেবরে প্রকাশ করছি। ‘মক্কার পথ’ কে অনুবাদ না বলে বলা যায় নতুন সৃষ্টি, বাংলা সাহিত্যে এটি একটি অভিনব সংযোজন।
আমরা আশা করি, এ গ্রন্থ পাঠে পাঠক ইসলামের ধর্মাদর্শ উপলব্ধিতে নতুন চিন্তার খোরাক পাবেন এবং এবং ইসলামের প্রতি আরও গভীর বিশ্বাসে জেগে উঠবেন।
-শরীফ হাসান তরফদার
প্রকাশক
পূর্বকথা
লিও-পোলড উইস নামক একজন ইহুদী পন্ডিত ইসলাম কবুল করেছেন-এ খবর সম্ভবত স্কুল জীবনেই শুনেছিলাম; কিন্তু তিনি যে একজন লেখক, একজন অসাধারণ প্রতিভাশীল চিন্তাবিদ একথা জানলাম অনেক পরে। তাঁর মুসলিম নাম মুহাম্মদ আসাদ। আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রইলেও তাঁর কোন রচনা পড়ার সৌভাগ্য তখনো আমার হয়নি। বিট্রিশ আমলে তিনি ভারতে ছিলেন, পাকিস্থান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পশ্চিম পাঞ্জাব সরকারের ইসলামী পুনর্গঠন সংস্থার পরিচালক ছিলেন এবং তিনি ‘আরাফাত’ নামক একটি অতি উন্নতমানের ইংরেজী সাময়কী সম্পাদনা করেন। এর বেশী কিছু তাঁর সম্পর্কে জানতাম না।
একদিন, খুব সম্ভব ১৯৫৮-এর দিকে ব্যরিষ্টার এ.টিম.মুস্তাফা, যিনি পরে পাকিস্থানের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন, কথা প্রসংগে বলেন, ‘ভাইয়া, আপনি কি ‘The Road of Mecca’ পড়েছেনে? জীবনে আমি যত বই পড়েছি সেগুলোর মধ্যে এটি হচ্ছে বই।
মুস্তাফা ভাই কেবল একজন মশহুর আইনবেত্তাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আপোসহীন সক্রিয় ইসলামী সংস্কৃতিকর্মী এবং সুধী পাঠক; দুনিয়ার কোথায় কোন শ্রেষ্ঠ লেখক ইসলামের উপর বই-পুস্তক লিখেছেন তিনি তার আপ-টু-ডেট খবর রাখতেন। তার মুখে ‘The Road of Mecca’ –র উচ্ছ্বাসিত প্রসংশা শুনে বইটি সংগ্রহ করার জন্য আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং কিছুদিন পর এক কপি লাহোর থেকে পার্শেল করে আনাই। বইটি হাতে পেয়ে তার মধ্যে ডুবে যাই, শৈশব থেকে ইসলাম গ্রহণ পর্যন্ত আসাদের দীর্ঘ চাঞ্চল্যকর আধ্যাত্মিক সফরে তাঁর সহযাত্রী হয়ে আমিও ঘুরি ইউরোপ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, পথে-প্রান্তরে, হাটে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে, সমুদ্রে, আর নতুন করে দেখি জগতকে; ধীরে ধীরে ইসলামের পরিপূর্ণ রূপটি পাপড়ির পর মেলে বিকশিত হয়ে ওঠে আমার দৃষ্টির সম্মুখে। বার বার পড়লাম ‘The Road of Mecca’এবং পড়তে পড়তেই অন্তরে এ উপলব্ধি হলো-এ বই-এর বাংলা তরজমা বাংলাভাষী পাঠক-পাঠীকাদের জন্যে ইসলামী জীবন-দৃষ্টির এক নতুন দিগন্ত উন্নোচিত করবে।
সীমিত সামর্থ্য আর সময়ের অভাব সত্ত্বেও আমি বইটির তরজমায় হাত দিই এবং আমার সম্পাদিত ইসলামিক একাডেমী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপাতে থাকি। বিয়ষবস্তু এবং আসাদের অপূর্ব রচনশৈলীর গুনে আমার অক্ষম তরজমাও পাঠক মহলে প্রবল সাড়া জাগায়; কেবল এই তরজমার জন্যেই বহু পাঠক ইসলমিক একাডেমী পত্রিকা’র গ্রাহক হন এবং পত্রিকাটির প্রকাশনা কখনো অনিয়মিত হয়ে পড়লে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
‘The Road of Mecca’ বা মক্কার পথ মুহাম্মদ আসাদের রূহানী আত্মজীবনী। আসাদ গল্পচ্ছলে নিজের জীবনের কাহিনী লিখেছেন। উপন্যাসের চেয়েও সরস এ কাহিনী আসাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রামাণিকতায় হয়ে উঠেছে এ-কালের মানুষের জন্যে ইসলামের এক অনাস্বাদিতপূর্ব বিশ্লেষণ। বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে এক নতুন স্বাদ, এক অভিনব রস, যা পাঠককে কেবল আনন্দই দেয় না, এক সুগভীর তৃপ্তিকর অভিজ্ঞতায় করে ঐশ্বর্যবান; লেখকের সফর সংগী হয়ে পাঠকও অন্তিমে গিয়ে পৌঁছান মক্কা তথা ইসলামী জীবন-দৃষ্টির মর্মকেন্দ্র, আর ইসলামের পথে তাঁর দীর্ঘ অভিযাত্রা হয় পূর্ণ, আসাদের ভাষায় যা হচ্ছে home-coming- স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন।
মুহাম্মদ আসাদ সাংবাদিক, চিন্তাবিদ, ইসলামের এক অনন্য ব্যাখ্যাতা-কিন্তু মূলত তিনি দিব্যদৃষ্টির অধিকারী সৃজনধর্মী একজন প্রতিভা; ‘The Road of Mecca’ তাঁর এক অপূর্ব সৃষ্টি। বইটি তিনি উৎসর্গ করেন তাঁর স্ত্রী পোলা হামিদা আসাদকে। তাঁর এই সৃষ্টিকে বাংলা ভাষার আধারে পরিবেশন করতে গিয়ে যতদূর সম্ভব মূলের ছন্দ প্রবাহ, বাকভঙ্গি ও রচনাশৈলী অক্ষুণ্ণ রেখে আসাদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো সৃষ্টিকেই তো হুবহু ভাষান্তরতি করা যায় না। তাই আমি এ দাবী করি না যে, আসাদের এ অনুপম সৃষ্টিকে আমি পুরোপুরি আমার নিজের ভাষায় তুলে ধরতে পেরেছি। তবে আমার সান্তনা এই যে, এ বই-তরজমার পেছনে প্রথম থেকে শেস পর্যন্ত সক্রিয় ছিল সৃজনধর্মী রচনার প্রতি আমার সহজাত অনুরাগ এবং ইসলামী জীবনাদর্শের প্রতি আমার অশৈশব ভালোবাসা। বইটির তরজমা বংলাভাষী পাঠক-পাঠিকাদের হাতে তুলে দিতে পেরে আমি আমার নিজের উপর স্ব-আরোপিত একটি দায়িত্ব পালন করেছি, যার জন্য পুরষ্কার পরম করুনাময় আল্লাহ তাআলার কাছে মুহাম্মদ আসাদেরই প্রাপ্য। তরজমা সম্পূর্ণ করে পুস্তকাকারে প্রকাশ করার জন্য অগণিত উৎসুক এবং আগ্রহী পাঠক আমাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে তাগিদ দিয়েছেন; দেখা হলেই এ প্রসংগ তুলেছেন। তাঁদের সাগ্রহ প্রতীক্ষার এতদিনে অবসান হলো, তাঁদের দাবী এতদিনে পূর্ণ হলোঃ এজন্য আমি নিজেকে ভারমুক্ত মনে করছি এবং আল্লাহতা আলার প্রতি শুকরিয়া জানাচ্ছি। এই সব অগণিত পাঠকের মধ্যে ভাই শাহ্ আবদুল হান্নানের কথা কিছুতেই ভুলবার নয়; তাঁর ঐকান্তিক আগ্রহ ও দাবী, আমার মধ্যে যখনি অনুবাদে শৈথিল্য এসেছে, আমাকে নতুন করে উৎসাহিত করেছে।
বইটির তরজমার প্রথম পর্যায়ে সাবেক ইসলামকি একাডেমীর মোহাম্মদ আজিজুর ইসলাম ও শেখ তোফাজ্জল হোসেন দীর্ঘদিন আমার মৌখিত তরজমা লিপিবদ্ধ করেছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে এই দায়িত্বের এই দায়িত্বে পুরোটাই পালন করেছেন কবি মাসউদ-উশ-শহীদ। এতোটা আনন্দের সংগে মসউদ তাঁর প্রাত্যহিক জীবনের এক মূল্যবান অংশ এ কাজে আমার সংগে ব্যয়-এর প্রুফ দেখার দায়িত্ব সানন্দে বহন করেছেন আবদুল মুকীত চৌধুরী। বইটির নির্ঘন্ট তৈরী করে দিয়েছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেসের কালাম আজাদ। এঁরা প্রত্যেকেই আমার স্নেহভাজন; ধন্যবাদ দিয়ে এঁদের আন্তরিক সহযোগিতার মূল্যকে আমি লঘু করতে চাই না।
জ্ঞানকোষ প্রকাশনী বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে গোটা বাংলা-ভাষী পাঠক সমাজের কৃতজ্ঞভাজন হয়েছেন।
শাহেদ আলী
আল্লামা মুহাম্মদ আসাদের নাটকীয় জীবনের কিছু কথা
অধ্যাপক শাহেদ আলী
মুসলিম বিশ্বের আকাশ থেকে প্রজ্ঞা ও মনীষার উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি খসে পড়ে ১৯৯৪ সনে। পশ্চিমা জগতের দৃষ্টিতে এই নক্ষত্রটির আলো ছিলো প্রখর, চোখ ধাঁধানো; তাই তারা প্রায় শতাব্দীকাল এক চোখের সামনে দেখেও না দেখার ভান করেছে। এই মনীষী জন্মগ্রহণ করেছিলেন পশ্চিমে ইউরোপীয় পরিবেশে। অথচ তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন-এরা বাহ্য জাকজমকের অন্তরালে লুকায়িত অতল-গর্ভ শূন্যতাকে দুনিয়ার সামনে উদঘাটিত করে দিয়েছিলেন। এজন্য পাশ্চাত্য জগত তাঁকে বরাবর বিরক্তির সাথে উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছে। তাঁর ইন্তেকালের খবর কোন প্রচার পায়নি পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমে।
আর রাতকানা মানুষ চাঁদ-নক্ষত্র কিছুই দেখেনা, অন্ধ যেমন সূর্য দেখেনা, তেমনি মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টিতেও এই নক্ষত্রের কিরনের জ্যোতি কখনো পুরোপুরি প্রতিবিম্বিত হয়নি। তাই তার আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটির খসে পড়লেও তার কোন শূন্যতা মুসলিম বিশ্ব অনুভব করেনি-সূর্য বা নক্ষত্রের উদয়-অস্তে অন্ধের কিছুই আসে যায় না। তাদের নিজস্ব কোন প্রচার মিডিয়াও নেই। তাছাড়া যা কিছু আছে তাতেও এই মৃত্যু তেমন কোন গুরুত্বই পাইনি। তাঁর নাকি অসিয়ত ছিলো-তাঁর কবর যেন হয় মক্বায়-যেখানে তিনি দীর্ঘদিন বসবাস করে ইসলামকে আবিস্কার করেছিলেন, ইসলামের সেরা ব্যাখাতা এবং প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন, ইসলাম কবুল করে সারা বিশ্বের মোকাবেলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বকে তুলে ধরেছিলেন, লিখেছিলেন ‘Road To Mecca’ –র মত বিশ্বে আলোড়ন জাগানো বই। কিন্তু তাঁর সাধ পূরণ হয়নি। তিনি স্পেনে ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।
মুহাম্মদ আসদ, ইসলাম কবুল করার আগে যার নাম ছিলো লিওপোন্ড লুইস, তাঁর স্ত্রী পোলা হামিদা আসাদকে নিয়ে প্রায় ২৬/২৭ বছর বাস করেছিলেন মরক্কোর তানজির্য়াস শহরে। তিনি রাবাত আল-আলমই ইসলামের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন কোরানুল করিমের একখানি সংক্ষিপ্ত তফসীরসহ তরজুমা করার জন্য। প্রথম ১০ পারার তফসির প্রকাশিত হলে কোন কোন আলিম, তাঁর কোন কোন ব্যাখ্যা সম্বন্ধে ভিন্নমত পোষণ করেন। তখন আসাদ রাবিতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে মরক্কো চলে যান এবং আর্থিক অসুবিধা সত্ত্বেও, কেবল তাঁর স্ত্রী ও কতিপয় বন্ধু-বান্ধবের সহায়তায় তিনি একায় অনুবাদ ও তাফসীর সম্পূর্ণ করে তা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। সুদীর্ঘ ২০ বছরের সাধনার পর তাঁর তরজমা ও তাফসীর তিনি প্রকাশ করেন। আধুনিক বিশ্ব কোরআনুল করিমের আধুনিকতম তরজমা ও তফসীরকারের দায়িত্ব পালন করেন।
লিওপোন্ড লুইসের জন্ম ১৯০০ সনে, বর্তমান পোলান্ডের লেমবার্গ শহরে, এক ইহুদী পরিবারে। তাঁর পিতামহ ছিলেন কয়েক পুরুষ বিস্তৃত এক ইহুদী রাব্বী বা পুরোহীত পরিবারের শেষ রাব্বী হিসাবে। তাঁর পিতাকে ট্রেডিশনাল ইহুদী রাব্বী হিসাবে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা দেয়া হলেও তিনি সে পারিবাকি ঐতিহ্য ত্যাগ করে ব্যরিষ্টারী অধ্যয়ন করেন, নামকরা আইনজীবি হয়ে উঠেন এবং বিয়ে করেন এক ব্যাংকার পরিবারে। স্কুলের সাধারণ পড়াশুনার সঙ্গে লুইস হিব্রু ভাষা অনর্গল বলতে ও পড়তে শিখেন, এবং আর্মায়িক ভাষার সঙ্গেও সুপরিচিত হয়ে উঠেন। এই বয়সেই তিনি তালমুাদের মূল পাঠ ও ভাষ্যের সঙ্গে সম্যক পরিচয় লাভ করেন। বহু বছর পর এ বিষয়ে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক আত্মরচিত ‘Road To Mecca’–তে লিখেন “আমার মনে হলো ওল্ড টেষ্টামেন্ট এবং তালমুদের আল্লাহ যেন তাঁর পূজারীরা কিভাবে তাঁর পূজা করবে তার অনুষ্ঠানগুলো নিয়েই ব্যস্ত। আমার আরো মনে হতো আল্লাহ যেন বিশেষ একটি জাতির ভাগ্য নিয়ে বিস্ময়কররূপে ব্যস্ত রয়েছেন পূর্ব থেকেই। ইব্রাহিমের বংশধরগণের ইতিহাসরূপে ওল্ড টেষ্টামেন্টের কাঠামোটিই এমন যে মনে হয় আল্লাহ যেন গোটা মানবজাতির স্রষ্টা ও পালনকর্তা নন, বরং তিনি যেন এক উপজাতীয় দেবতা, যে দেবতা একটি মনোনীত জাতির প্রয়োজনের সঙ্গে গোটা সৃষ্টির সংগতি বিধান করে চলেছেন।”
ইহুদী মতবাদ নিয়ে নিরাশ হলেও লুইস কিন্তু অন্য কোন পন্থায় আধ্যাত্মিক সত্যানুসন্ধানে গেলেন না। প্রথম মহাযুদ্ধের পর তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং আনেকটা উন্নাসিকতার সঙ্গে শিল্প ও দর্শনের ইতিহাস অধ্যয়নে মনোযোগী হন। কিন্তু এই একাডেমিক জীবন তাঁর ধর্মীয় তাৎপর্য অনুসন্ধানের অন্তর্নিহিত তৃষ্ণা নিবারণে ব্যর্থ হলো। তাঁর অ্যাডভেনচারের বাসনাও তাতে তৃপ্ত হলোনা। প্রথম মাহযুদ্ধের পর ভিয়েনা কিন্তু মরিয়া হয়ে নিয়েজিত ছিলো তার স্বকীয়তা ও আত্মপরিচয় লাভের প্রয়াসে। যুদ্ধ এবং ৬০০ বছরের পুরানো হ্যারসবুর্গ রাজতন্ত্রের পতন পুরানো মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যগুলোর ভিত্তি ধ্বসিয়ে দেয়। অবশ্য এর পূর্বে এগুলো শিল্পবোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর আক্রমণের বিষয় হয়ে উঠেছিলো। এক সংশয়বাদী পরিবারে প্রভাবে লুইস তাঁর তরুণ বয়সের অন্য বহু বালকের মতোই সকল আনুষ্ঠানিক ধর্মকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বসেন। তাঁর তখন লক্ষ্য ছিলো কর্ম, দুঃসাহসিক অভিযান এবং উত্তেজনা। এই তাড়নাবশে তিনি অস্ট্রীয় সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন এক ছদ্মনামে কারণ তখনো তাঁর বয়স ১৮ বছর হয়নি। ফলে তার স্বপ্ন ব্যর্থ হলো্। চার বছর পর যখন তিনি আইনত ভর্তি হলেন সামরিক বাহিনীতে তার আগেই তাঁর সামরিক গৌরবের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। কারণ কয়েক সপ্তাহ পরেই ঘটলো বিপ্লব, অষ্ট্রীয় সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়ল এবং যুদ্ধও শেষ হয়ে গেলো।
কিন্তু আন্ত-একাডেমিক জীবনের কোন আকর্ষণই লুইসের ছিলোনা। তিনি অনুভব করছিলেন, জীবনের সাথে গভীরভাবে মোকাবেলা করার আকাংখা-জীবনে প্রবেশ করার বাসনা। নিরাপত্তা-প্রিয় মানুষ নিজের চারপাশে যে-সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে লুইস সেগুলোর আশ্রয় না নিয়ে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন জীবনে-চেয়েছিলেন সবকিছুর পিছনে যে আধ্যাত্মিক নিয়ম-শৃঙ্খলা রয়েছে তা উপলদ্ধি পথ নিজেই খুঁজে বের করতে।
বিশ শতকের গোড়ার দিকের দশকগুলোর একটি বিশেষ লক্ষণ ছিলো আধ্যাত্মিক শূন্যতা। বহুশত বছর ধরে ইউরোপ যে-সব মূল্যবোধে অভ্যস্ত ছিলো, সে সমুদয়ই ১৯১৪-১৯১৮ এর মধ্যে যা ঘটলো তাতে নিজস্ব রূপরেখা হারিয়ে নিরাকার, নিরবয়ব হয়ে পড়লো। সে শূন্যতা পূরণ করতে পারে এমন নতুন কোন মূল্যবোধ কোথাও দেখা যাচ্ছিলো না। ক্ষুণভঙ্কুরতা ও অনিশ্চয়তার ভাব, সামাজিক, মানসিক ওলটপালটের পূর্বাভাস মানুষের চিন্তা ও প্রয়াসে স্থায়ী বলে কিছু নেই এমন একটা সন্দেহের জন্ম দেয় তরুণ মনে। তরুণের আত্মিক চাঞ্চল্য কোথাও কোন নির্ভর খুঁজে পাচ্ছিলো না লুইস এবং তাঁর মত নবীনের যে –সব প্রশ্নে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলো নৈতিকতার কোন নির্ভরযোগ্য মানের অভাবে কেউ তাদের সেইসব প্রশ্নের সন্তোসজনক জবাব দিতে পারছিলেন না। লুইস দেখতে পেলেন, “বিজ্ঞান বলে জ্ঞানই সব অথচ একট নৈতিক লক্ষ্য ছাড়া জ্ঞান কেবল বিশৃঙ্খলাই সষ্টি করতে পারে।” এতে সন্দেহ নেই যে, সে সময়কার সমাজ সংস্কারক, বিপ্লবী এবং কমিউনিষ্টরা একটা মহত্তর এবং অধিকতর সুখী দুনিয়া নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লুইসের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ধরা পড়লো এরা সকলে চিন্তা করছে, কেবল বাহ্য সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থার আলোকে এবং এসব ক্ষেত্রে এই ক্রটি সংশোধনের জন্য ওরা ‘জিয়ান’ বাদী ধারণাকে এক নতুন অধিবিদ্যা বিরোধী অধিবিদ্যায় উন্নীত করেছে। তারা দেখতে পেল, তাদের চারপাশের পথিবীতে যা যা কিছু ঘটছে অনেক সময় কল্পিত ঐশী গুণাবলীর সঙ্গে তার অসঙ্গতি প্রচন্ড। আল্লাহর প্রতি যে-সব গুণ আরোপ করা হয়, মানব ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক শক্তিগুলো যেন সেগুলো স্পষ্টভাবে স্বতন্ত্র ও আলাদা। এ থেকে তারা সিদ্ধান্তে এলো আল্লাহ বলে কিছু নেই। ধর্মের আত্মাভিমানী অভিভাবকেরা আল্লাহকে তাদের নিজেদের পোষাক পরিয়ে মানুষের ভাগ্য থেকে আল্লাহকে বিচ্ছিন্ন, সম্পর্কহীন করে ফেলেছিলো। কিন্তু এতে তো সমস্যার সমাধান হলো না, ব্যক্তি-জীবনে কিংকর্তব্য সম্বন্ধে এই অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনশীলতা ঘোর বিশৃংখলার কারণ হয়ে উঠতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্য বোধের প্রতি অশ্রদ্ধা। এই সহজাত উপলদ্ধির কারণে লুইস এখানেই থামলেন না। তাঁর জন্য মহত জীবনকে গড়ে তোলা তাঁর দিকে আশার একটি সৃজনধর্মী পথ অনুসন্ধানের জন্য সহায়ক হয়ে উঠলো। এই তাগিদেই তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হয়ে তার মূল পাঠ্য বিষয় হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন শিল্পকলার ইতিহাস। কিন্তু পাঠ্য বিষয় লুইসকে তৃপ্ত করতে পারালো না। তিনি দেখতে পেলেন তাঁর শিক্ষকেরা- যাদের মধ্যে স্ট্রজিগোভস্কি এবং দূভোরাক ছিলেন বিখ্যাত এবং বিশিষ্ট সৌন্দর্যতত্ত্বের যে-সব নিয়ম-কানুন দ্বারা শিল্প সষ্টি নিয়ন্ত্রিত হয়, সেগুলো আবিষ্কার করতেই ছিলেন অতিমাত্রায় ব্যস্ত;এর মর্মমূলে যে আধ্যাত্মিক তরঙ্গভিঘাত রয়েছে তা উৎঘটনের চেষ্টা খুব সামান্যই করেছেন, অর্থাৎ লুইসের মতে শিল্পকলার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সেইসব রূপ ও আঙ্গিকের মধ্যে ছিলে সংকীর্ণভাবে সীমাবদ্ধ, যেগুলোর মাধ্যমে আর্ট লাভ করা অভিব্যক্তি।
লুইস তাঁর যৌবনোচ্ছল বিভ্রান্তির দিনগুলোতে ইউরোপে নবীন মনোবিকেলন শাস্ত্রের যে-সব সিদ্ধান্ত নিয়ে মেতে উঠেছিলো তার সঙ্গে পরিচিতি হয়েও তিনি তাতে তৃপ্তি পেলেন না-পেলেন না তার জিজ্ঞাসার জবাব, যদিও তখন মনোবিকোলন তত্ত্ব দেখা দিয়েছিলো একটা প্রথম শ্রেণী বিপ্লবরূপে। মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে নির্জ্ঞান মনের কামনা-বাসনার যে ভুমিকা রয়েছে তার আবিষ্কার গভীরতর আত্মেপলদ্ধির পথ সন্দেহতীতভাবে মুক্ত করে দিয়েছে-তরূণ লিওপোন্ড লুইসের এই বিশ্বাস বেশীদিন স্থায়ী হলো না। তাঁর কাছে ফ্রয়েডীয় চিন্তাধারার উদ্দীপনা ছিলো মদের মাদকতার মতোই তীব্র। ভিয়েনার ক্যাফেগুলোতে তিনি তন্ময় হয়ে শুনেছেন মনোবিকোলন তত্ত্বের শুরুর দিকের কয়েকজন পথিকৃত-আলেফ্রেড এডলার, হার্মান ষ্টিকেল এবং অটোগ্রোস প্রমুখ পন্ডিতদের নিজেদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ তর্ক-বিতর্ক, কিন্তু লুইস এই নতুন বিজ্ঞানের বুদ্ধিগত ঔদ্ধত্যে বিচলিত হয়েছেন। কারণ তাঁর মতে, “এ বিজ্ঞান মানুষের আত্মার সকল রহস্যকে কতগুলো স্নায়বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় পর্যবসিত করতে চায়।” তিনি উপলদ্ধি করলেন পরম সত্যগুলোর কাছাকাছি পৌঁছানোর ক্ষমতাও এই নতুন শাস্ত্রের সিদ্ধান্তগুলোতে নেই। তাছাড়া, মহৎ ও উন্নত জীবনের দিকে কোন নতুন পথের নির্দেশও তিনি এতে পেলেন না। মহাযুদ্ধের পর পর সাধারণভাবে প্রতিষ্ঠিত মূল্যগুলোর ব্যাপক ভাঙন শুরু হলো, সেই ভাঙনের ধারায় নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান অনেক বাধা-নিষেধও শিথিল হয়ে পড়লো। এ ছিলো একটি অবস্থা থেকে তার সম্পূর্ণ বিপরীত আর একটি অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হওয়া, যেখানে সবাকিছু হয়ে পড়েছিলো বিতর্কের বিষয়, অর্থাৎ অবস্থাটা এই দাঁড়ালোঃ কান পর্যন্ত মানুষের নিরবচ্ছিন্ন উর্ধ্বভিসারী অগ্রগতিতে মানুষের যে বিশ্বাস ও আস্থা ছিলো তা থেকে মানুষ নিক্ষিপ্ত হলো স্পেসলারের তিক্ত নৈরাশ্যের দিকে, নীটশের নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদ ও মনোবিকলন সৃষ্ট আধ্যাত্মিক শূন্যতার মধ্যে। শরীরের যুক্তি অভিলাসী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হলো নির্বিচার আপতিক, অবাধ। লিওপোন্ড লুইসের মনে হতো এ আর কিছুই নয়, ফাকা প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তাঁর মনে হলো একজন পুরুষ থেকে আর একজন পুরুষকে যে ভয়ংকর নিঃসঙ্গতা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে হয়তো তার দূর হতে পারে এটি নারী ও পুরুষের মিলনে। এই মানসিক চাঞ্চল্য ও অস্থিরতার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হলো না। তাঁর আব্বা তাঁকে পন্ডিত,পি,এইচ,ডি বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা ছেড়ে দিয়ে তিনি তাঁর পিতার অমতে বেছে নিলেন সাংবাদিক জীবন-তিনি লেখক হবেন এবং লেখাই হবে তার পেশা। ভিয়েনা থেকে তিনি পৌঁছলেন প্রাগে-যেখানে তিনি একটি পুরানো ক্যাফে, দ্য ওয়েষ্টেনসে শিল্পী-সাহিত্যিকদের এক ঐন্দ্রজালিক চক্রের সঙ্গে পরিচিত হলেন। কিছুদিন পর তাঁর পিতা খবর পেয়ে চিঠি লিখলেন, ‘‘আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তুমি এক ভবঘুরে বাউন্ডলে হিসাবে মরে পড়ে রয়েছ রাস্তার পাশে নর্দমায়।” প্রবল আত্মবিশ্বাসী জেদী তরুণ লুইস জবাব দিলেন-“না ”। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি লেখক হতে চান; তাঁর এই বিশ্বাস জন্মেছিলেন-তাঁর জন্য সাহিত্যিকদের জগত অপেক্ষা করছে সাগ্রহে, দরাজ দু’হাত বাড়িয়ে।
কিন্তু সেদিনে মশহুর কোন সংবাদপত্রে প্রবেশাধিকার ছিলো কঠিন ব্যাপার। বার্লিনের রাস্তায় রাস্তায় দিনের পর দিন পায়াচারী করেছেন, সাবওয়ে বা ট্যাক্সির ভাড়া নেই্। বহু সপ্তাহ তিনি কাটালেন, কেবল চা এবং বাড়ীওয়ালী সকালে যে দু’টি পাউরুটীর টুকরা দিতেন তা খেয়ে। তাঁর তখনকার এই দিনগুলোর নিয়তি ছিলো নির্জলা উপবাস। আর তাঁর রাতের স্বপ্ন ঠাসা থাকতো সতেজ আর মাখন মাখানে পুরু রুটির টুকরায়।
এই চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে এক চলচ্চিত্র প্রযোজকের সহকারী হিসাবে কাজ করে এবং পরে তাঁর ভিয়েনিজ বন্ধু এস্তোন কুহের জন্যে ফিল্মের সিনারিও লিখে দিয়ে এবং পরে আরে একটি সিনারিও লিখে কিছু অর্থ উপার্জন করে কিছুদিন কাটালেন। এরপর আরে একটি বছর মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন শহরে নানারকম অস্থায়ী কাজ করে শেষ পর্যন্ত তিন প্রবেশ করলেন খবরের কাগজের জগতে ১৯২১ সনে। জার্মান ক্যাথোলিক সেন্টার পার্টির বিত্তশালী সদস্য ডর ডেমার্ট, জার্মান রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ত্ব যিনি ইউনাইটেড প্রেস অব আমেররিকান সহযোগিতায় ইউনাইটেড টেলিগ্রাফ নামে একটি বার্তা সংস্থা শুরু করতে যাচ্ছিলেন। তাঁরই প্রতিষ্ঠানে সহকারী হিসাবে কাজ করারা আবেদন জানিয়ে পেলেন টেলিফোনিষ্টের কাজ। তাঁর উচ্চাকাংখার জন্য এ ছিলো একটি অতি অবসানজনক কাজ। কিন্তু কাজটি গ্রহণ না করে লুইসের উপায় ছিল না। এভাবে একমাস কাজ করার পর তিনি গোপনে বার্লিনে আগম মাদাম ম্যাক্সিম গোর্কী, যিনি ১৯২১-এর রাশিয়ার চরম দুর্ভিক্ষের সময় এখানে এসেছিলেন মধ্য ইউরোপীয় রাজধানীগুলোতে কার্যকরি ত্রাণ ও সাহায্যের জন্য জনমত গঠন করতে। তাঁরই সঙ্গে এক সাক্ষাতকার ঘটিয়ে টেলিফেনিষ্ট লিওপোন্ড লুইস হয়ে পড়লেন এক রিপোর্টার। তিনি হলেন সাংবাদিক।
লিওপোন্ড লুইস তখন ২২ বছরের উত্তার তরুণ। সমাজ বদলে দেবার, সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার বাসনায় লুইস এবং তাঁর বয়সী তুরুণেরা তখন অস্থির। সমাজকে কিভাবে গঠন করা উচিত যাতে করে মানুষ যাথার্থ এবং পরিপূর্ণ জীবন-যাপন করতে পারে। কিভাবে বিন্যাস্ত হওয়া উচিত তাদের সম্পর্ক যাতে করে যে একাকীত্ব ও নিঃঙ্গতা প্রত্যেকটি মানুষকে ঘিরে রেখেছে ভেঙ্গে–চুরে সকলে বেরিয়ে আসতে পারে এবং সত্যিকার পারস্পরিকক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার মধ্যে কাটাতে পারে পারে জীবন? ভাল কি, মন্দ কি, ভাগ্য কি, কিংবা ভিন্নভাবে বলতে গেলে মানুষের কি করা উচিত যাতে করে সে যথার্থ অর্থে কেবল মুখে নয় তার জীবনের সাথে এক ও অভিন্ন হতে পারে এবং বলতে পারে আমি এবং আমার অদৃষ্ট আলাদা নয়-একই!
সর্বত্র যখন নৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার আবহাওয়া প্রবল তাই জন্ম দিয়েছিলো বেপরোয়া আশাবাদের। আর তার প্রকাশ ঘটেছিলে একদিকে, -তাঁর সে সময়কার সঙ্গীতে, চিত্রকলা ও নাটকে দুঃসাহসিক পরীক্ষণ-নিরীক্ষণে, অন্যদিকে সংস্কৃতির কাঠামোও রূপরেখার সম্পর্কে অন্ধভাবে হাতড়ানোতে প্রায়শ বৈপ্লবিক অনুসন্ধানে রত ছিল। কিন্তু এই জোর করে বাঁচিয়ে রাখা আশাবাদের পাশাপাশিই তখন চলছে একটি আধ্যাত্মিক শূন্যতা। একটা অস্পষ্ট উন্নাসিক আপেক্ষিকতাবাদ ক্রমবর্ধমান এক নৈরাশ্যবাদের মধ্যে যার জন্ম। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উচ্চগ্রামে বাঁধা ভাবাবেগ পীড়িত অসন্তুষ্ট উত্তেজিত ইউরোপীয় জগতে কিছুই আর চলছিলোনা আগের মত স্বাভাবিক ও সুশৃঙ্খলভাবে। লুইসের চেখে ধরা পড়লো পশ্চিমা জগতের আসল মাবুদ আর আধ্যাত্মিক কিছু নয়। এর একমাত্র উপাস্য হচ্ছে কমফোর্ট, আরাম-আয়াস-গড়পড়তায় একজন ইউরোপীয়, সে গণতন্ত্রী কমিউনিষ্ট, মজুদুর বুদ্ধিজীবি যেই হউক তাঁর কাছে অর্থপূর্ণ বিশ্বাস ছিলো একটি বৈষয়িক উন্নতির পূজা, কারণ জীবনকে ক্রমাগত সহজতর করে তোলা ছাড়া জীবনের আর কোন লক্ষ্য থাকতে পারে না। সম্প্রতিক ভাষায় প্রকৃতির কবল থেকে মানুষকে আজাদ করাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। এই নতুন ধর্মের মন্দির হচ্ছে বিশাল কলকারখানা, সিনেমা, রাসায়নিক গবেষণাগার, নৃত্যশালা, প্রাণিবিদ্যা সংস্থাসমূহ। আর এ ধরণের মন্দিরের পুরোতঠাকুর হচ্ছে ব্যাংকার, ইঞ্জিনায়ার, রাজনীতিবিদ, চিত্রতারকা, পরিসংখ্যানবিদ, শিক্ষা পরিচালক, রেকর্ড স্রষ্টা, বৈমানিক এবং কমিসারেরা। ভালো এবং মন্দের ধারণার ক্ষেত্রে সার্বিক মতানৈক্য এবং সকল সমাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের সুবিধাবাদের আশ্রয় গ্রহণ-এর মধ্যে ঘটলো নৈতিক ব্যর্থতার প্রকাশ-সেই সুবিধাবাধিতার যা রাস্তার বীরঙ্গনার সাথে তুলনীয়, যে বীরঙ্গনা যখনই এবং যারাই বাঞ্ছিতা হয় তখনই তার কাছে দেহ দান করে। সেই বয়সেই লুইস দেখতে পেলেন ক্ষমতা এবং সুখের অতৃপ্ত লালসাই পাশ্চত্য জগতকে অনিবার্যভাবেই পরস্পরভিরোধী বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে রেখেছে। যে দলগুলোর প্রত্যেকেই মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং যখনই সেখানে তাদের পারস্পরিক স্বার্থে আঘাত লাঘছে, তারা একে অপরকে ধ্বংস করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তখন ন্যায়-অন্যায়ের সর্বোচ্চ মাপকাঠিই ছিলের বাস্তব উপযোগিতা, জাগতিক, সাফল্য। লুইসের সেই সময়কার অবস্থা , লুইসের ভাষায় “ আমি দেখতে পেলাম জীবন কতো অসুখী এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগ কত সামান্য। যদিও সমাজ ও জাতির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে কান ফাটানো উন্মত্ত চিৎকারের সঙ্গে। আমরা আমাদের সহজাত অনুভূতির দুনিয়া থেকে কত দূরে সরে পড়েছি। আর আমদের আত্মা কতো সংকীর্ণ এবং দীপ্ত হয়ে উঠেছে। তখন আমাদের সকল চিন্তার আদি এবং অন্ত ছিলো ইউরোপ।”
লুইস বলেন, ‘‘কিন্তু আমার চারপাশে যারা রয়েছে তাদের কিংবা তাদের মধ্যকার কোন দলের বিভিন্নমুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আশা-আকাংখায় শারিক হতে আমার অক্ষমতা কালক্রমে আমার মধ্যে এই অস্পষ্ট ধারণার রূপ নেয় যে, আমি ঠিক ওদের কেউ নই, ওদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই এবং তারই সঙ্গে আমর এ বাসনা জন্মাল যে আমাকে কারো অঙ্গীভূত হতেই হবে-তবে কার? কোন কিছুর অংশ হতে হবেই –তবে কিসের’’ বুকভরা এই আকুতি ও অস্থিরতা নিয়েই তিনি ১৯২২ সনে তাঁর মাথা কোরআনের আহবানে ২২ বছর বয়সে পাড়ি দিলেন আরক মূলক জেরুযালেমে। দীর্ঘদিন আরবদের সঙ্গে মেলামেশা করে তিনি পেলেন সেই জবাব। –তিনি কার অঙ্গীভূত হবেন, কিসের অংশ হবেন। ফ্রাংকফুর্টার শাইটুম নামক এক জগত বিখ্যাত কাগজের সংবাদদাতা হয়ে তিনি আসেন জেরুজালেম এবং কয়েক বছর পর করেন, ফিলিস্তীন, ট্রান্সজর্ডান, ইরাক, পারস্য, আফগানিস্থান। জেরুযালেমে অবস্থানকালে, তিনি প্রথম ইসলামের সংস্পর্শে আসেন এবং আরবদের জীবন পদ্ধতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। আরবদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মেলামেশার পর তিনি আবিষ্কার করলেন, ট্রাডিশনাল মুসলিম সমাজের মধ্যে রয়েছে মন ও ইন্দ্রিয়ের এক সহজাত সঙ্গতি, -যা ইউরোপ হারিয়ে বসেছে। তিনি তাদের মধ্যে আকিষ্কার করলেন হৃদয়ের নিশ্চয়তা এবং আত্ম-অবিশ্বাস থেকে মুক্তি, যে মুক্তি ইউরোপীয়দের স্বপ্নের অগোচর। তিনি কিসের অংশ হবেন, অবশেষে সেই জিজ্ঞাসার জবাব পেলেন লিওপোন্ড লুইস এবং ১৯২৬ সনে ইউরোপ ফিরে তিনি সস্ত্রীক কবুল করলেন ইসলাম। তাঁর মুসলিম নাম হলো মুহাম্মদ আসাদ। আসাদের আত্মকথা ‘মক্কার পথ’ গ্রন্থ তাঁর এই ইসলাম কবুল কে বলা হয়েছে ‘স্বগৃহ প্রর্ত্যাবর্তন’। ইসলামের দীক্ষিত হবার পর আসাদ প্রায় ৬ বছর আরব দেশে বাস করেন, আরব জীবন ও ভাষার সঙ্গে তাঁর গভীর পরিচয়। তিনি বাদশা ইবনে সউদের অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেন। এরপর তিনি আরব দেশ ছেড়ে ভারতে যান এবং মহান মুসলিম কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবালের সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁরই পরামর্শে আসাদ তাঁর পূর্ব তুর্কীস্তান, চীন এবং ইন্দোনেশিয়া সফরের পরিকল্পনা ত্যাগ করেন, ইসলামী রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক সূত্রগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের জন্যে তিনি ভারতে থেকে যান। ইসলামী রাষ্ট্র তখন এক স্বাপ্নিক কবির স্বপ্ন বিহবল মনের স্বপ্ন মাত্র ছিলো। মুহাম্মদ আসাদের ভাষায় “আমার কাছে ইকবালের মতই স্বপ্ন ছিলো-ইসলামের সমস্ত ঘুমন্ত আত্মাকে পুনর্জীবিত করে তোলার একটি পথের –বস্তুত একমাত্র পথের পথিকঃ একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সত্তা সৃষ্টি, যার সংহতির ভিত্তি একই রক্ত-মাংস নয়, বরং এটি আদর্শের প্রতি সাধারণ আনুগত্য। বহু বছর আমি নিজেকে নিবেদিত রাখি এই লক্ষ্যে অধ্যয়ন, রচনা ও বক্তৃতায় এবং কালে ইসলামী আইনের ব্যাখ্যাতা হিসাবে কিছুটা খ্যাতি অর্জন করি।” কিন্তু এই অর্জন কিছুটা নয়, আসলে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে এই রাষ্ট্রের সরকার ইসলামী পুনর্গঠন বিভাগ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার এবং পরিচালনার জন্য মুহাম্মদ আসাদকে আহবান করে,-এর লক্ষ্য রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে আদর্শগত ইসলামী ধ্যান-ধারণাগুলোকে বিশদভাবে তুলে ধরা, যার উপর নবজাত রাজনৈতিক সংগঠনটি তার আদর্শিক দিক-নির্দেশনার জন্য নির্ভর করতে পারে। মুহাম্মদ আসাদ দু’বছর এই অতিশয় উদ্দীপনাপূর্ণ কাজটি চালিয়ে যাবার পর পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগদান করেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরে তিনি হন মধ্যপ্রাচ্য ভিভিশনের প্রধান। ইহুদীবাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তীনিদের পক্ষে পাকিস্তান জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানে যে যুক্তি ও তথ্যের লড়াই সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করে তার সমর্থনে সকল ঐতিহাসিক তথ্য ও দলিল প্রমাণাদি সরবরাহ করেন মুহাম্মদ আসাদ। পররাষ্ট্র দপ্তরে তিনি আত্মনিয়োগ করেন, পাকিস্তান ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সম্পর্ক মজবুত করে তোলার জন্য। এই সময়ে মুহাম্মদ আসাদ নিযুক্ত হলেন জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তানী মিশনে মিনিষ্টার প্লেনিপোটেনশিয়ার হিসেবে। পরে ১৯৫২ সালের শেষেরদিকে তিনি এই পদে ইস্তাফা দিয়ে তাঁর অমর ‘‘The Road To Mecca’’গ্রন্থ রচনায় আত্মনিয়েগে করেন।
কাহিনীর কাহিনী
আমি এ বইয়ের যে কাহিনী বলতে যাচ্ছি তা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে ভূমিকার জন্য বিশিষ্ট কোনো মানুষের আত্মকাহিনী নয়;এটি দুঃসাহসিক অভিযানের বর্ণনামূলক কোনো কাহিনীও নয়-কারণ আমার জীবনে বহু বিস্ময়কর এ্যাডভেঞ্চার ঘটে থাকলেও সেগুলি আমার ভেতরে যা ঘটে চলছিল তারই অনুষাঙ্গিক মাত্র, তার বেশি কখনো ছিলো না, ধর্ম-বিশ্বাস অনুসন্ধানে সচেতন প্রয়াসের কাহিনীও এ নয়-কারণ সে বিশ্বাস বহু বছরে আমার জীবনে এসেছে, আমার পক্ষ থেকে তা অর্জনের কোনো চেষ্টা ছাড়াই। আামার কাহিনী হচ্ছে-একজন ইউরোপীয়’র ইসলাম আবিষ্কার এবং মুসলিম সমাজের মধ্যে তার মিশে যাওয়ার সাদামাঠা কথা।
আমি কখনো এ বই লেখার কথা ভাবিনি। কারণ আমার কখনো মনে হয়নি, আমার জীবন আমি নিজে ছাড়া অন্য কারো কাছে বিশেষ কোনো আকর্ষনের কারণ হতে পারে। কিন্তু যখন পাশ্চাত্য জগত থেকে পঁশিচ বছর বাইরে কাটানোর পর আমি প্যারিসে এলাম এবং সেখান থেকে এলাম নিউইয়র্ক ১৯৫২ সালের শুরুর দিকে, তখন আমি আমার এ মত পাল্টাতে বাধ্য হই। আমি তখন জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তানের পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবে কাজ করছিলাম বলে স্বভাবতই সকলের চোখ ছিলো আমার উপর; আমার ইউরোপীয় ও মার্কিন বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনের মধ্যে আমি বিপুল ঔৎসুক্যের কারণ হয়ে উঠি। প্রথমে ওদের মনে হয়েছিলো আমার কাজ হচ্ছে একজন ইউরোপীয় ‘বিশেষজ্ঞের’, যাকে প্রচ্যে দেশের একটি সরকার একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে নিয়োগ করেছে, আর আমি যে জাতির চাকরি করছি তাদের চালচলনের সঙ্গে আমার সুবিধার খাতিরেই মানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানে আমার কার্যকলাপ যখন স্পষ্ট হয়ে উঠলো,আমি কেবল ‘কাজের দিকে’ দিয়েই নয়, বরং আবেগ-অনুভূতি এবং বুদ্ধিবৃত্তির দিক দিয়েও সাধারণভাবে মুসলিম জাহানের রাজনৈতিক এবং তামুদ্দিনক লক্ষ্যের সাথে নিজেকে একাত্ম করে নিয়েছি তখন ওরা কিছুটা বিস্ময়-বিমূঢ় হয়ে পড়ে। যতই দিন যেতে লাগলো, ক্রমবর্ধমান হারে বেশি বেশি লোক জিজ্ঞাসা করতে লাগলো আমার অতীত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে। ওরা জানতে পেলো, আমি আমার জীবনের একেবারে প্রথমদিকে কাজ শুরু করেছিলাম কন্টিনেন্টাল পত্র-পত্রিকাগুলির এক বৈদেশিক সংবাদদাতা হিসাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র কয়েক বছর ব্যাপক সফরের পর আমি ১৯২৬ সালে মুসলমান হই; ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর প্রায় ছ’বছর আমি আরব দেশে বাস করি এবং বাদশাহ ইবনে সউদের বন্ধত্ব লাভে সমর্থ হই; এরপর আমি আরব দেশ ছেড়ে যাই ভারতে, আর সেখানে আমার সাক্ষাৎ ঘটে পাকিস্তান চিন্তার আধ্যিাত্মিক জনক –এবং মহান মুসলিম কবি-দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালের সংগে। তিনিই আমাকে অল্প সময়ের মধ্যে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজী করান। আমার পূর্ব তুর্কিস্তান, চীন এবং ইন্দোনেশিয়া সফরের পরিকল্পনা ত্যাগ করতে এবং ভাবী ইসলামী রাষ্ট্র, যা তখনো ইকবালের স্বাপ্নিক মনের স্বপ্নের বেশি কিছু ছিলো না, তার বুদ্ধিবৃত্তিক সূত্রগুলির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য ভারতে থেকে যেতে। আমার কাছে, ইকবালের মতোই এ স্বপ্ন ছিলো ইসলামের সমস্ত ঘুমন্ত আশাকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলার একটি পথের, বস্তুত, একমাত্র পথের প্রতীকঃ একটি জনগোষ্ঠীর একটি রাজনৈতিক সত্তার সৃষ্টি, যার সংহতির ভিত্তি একই রক্ত-বংশ নয়, বরং একটি আদর্শের প্রতি সাধারণ আনুগত্য। বহু বছর আমি নিজেকে নিবেদিত রাখি এই লক্ষ্যে অধ্যয়ন, রচনা ও বক্তৃতায় এবং কালক্রমে ইসলামী আইন ও তমুদ্দনের ব্যাখ্যাতা হিসাবে আমি বেশ কিছুটা খ্যাতি অর্জন করি। ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠিত হলো, আমাকে তখন ঐ রাষ্ট্রের সরকার ‘ইসলামী পুনর্গঠন বিভাগ’ নামক একটি ডিপার্টমেন্ট গড়ে তোলা এবং পরিচালনার জন্য আহবান করলেন; এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে আদর্শগত ইসলামী ধ্যান-ধারণাগুলিকে বিশদভাবে তুলে ধরা, যার উপর নবজাত রাজনৈতিক সংগঠনটি তার আদর্শিক দিক-নির্দেশের জন্য নির্ভর করতে পারে। দু’বছর ধরে এই অত্যন্ত উদ্দীপনাময় কাজটি চালিায়ে যাওয়ার পরি আমি পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগদান করি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরে আমাকে মধ্যপ্রাচ্য ডিভিশনের প্রধান নিযুক্ত করা হয়। এখানে আমি পাকিস্তান এবং অবশিষ্ট মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বন্ধন ও সম্পর্ক মজবুত করে তোলার জন্য আত্মনিয়োগ করি; আর এ সময়েই একদা আমি নিউইয়র্কে জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠনে পাকিস্তানী মিশনে নিযুক্ত হই।
এ সবই একজন ইউরেপীয় যে-মুসলিম সমাজের মধ্যে ঘটনা ক্রমে বাস করছে তার সংগে নিছক বাহ্যিক খাপ খাইয়ে নেয়ার চাইতে অনেক বেশী গভীরতরো কিছুর দিকে ইংগিত করেঃ বরং এতে করে একটি সাংস্কৃতিক পরিবারের প্রতি আনুগত্য সজ্ঞানে সর্বান্তকরনে প্রত্যাহার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা বোঝায়। আমার বহু পাশ্চাত্য বন্ধুর কাছে এটা খু্বই বিস্ময়কর ঠেকে। তারা তাদের মনে এই চিত্র আনতে সক্ষম হলো না-যে মানুষ জন্মেছে পাশ্চাত্য জগতে এবং সেখানে বড় হয়েছে ও শিক্ষা-দীক্ষা পেয়েছে সে কেমন করে এমন সম্পূর্ণভাবে এবং বাহ্যত, মনে কোন কিছু চেপে না রেখে মুসলিম জগতের সাথে নিজেকে একাত্ম করে নিয়েছে; তার পক্ষে কী করে পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বদলে সম্ভব হলো ইসলামী সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার গ্রহণ, এবং কী সেই জিনিস যা তাকে বাধ্য করেছে অমন একটি ধর্মীয়-সামাজিক আদর্শ গ্রহণ করতে, যা আমার মনে হয়, সকল ইউরোপীয় ধ্যান-ধারণা থেকেই অতি ব্যাপকভাবে নিকৃষ্টতরো বলে ওরা স্বতঃসিদ্ধ হিসাবে ধরে নিয়েছে।
কিন্তু কেন, আমি নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলাম, আমার পাশ্চাত্য বন্ধুরা এ বিষয়টিকে এমন একটা স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিচ্ছে? ওরা কি কখনো সত্যি সত্যি সরাসরি ইসলামের মর্মে পৌছানোর চেষ্টা করার প্রয়োজন বোধ করেছে? অথবা ওদের মতামতের ভিত্তি কি পূর্ববর্তী পুরুষ পরস্পরায় পাওয়া বিকৃত ধ্যান-ধারণ এবং কতিপয় ধরাবাধাঁ বুলি? হতে পারে কি যে সনাতন গ্রীক ও রোমান চিন্তা –পদ্ধতি পৃথিবীকে একদিকে গ্রীক ও রোমান এবং অন্যদিকে বারব্যরিয়ান্স তথা বর্বর জাতিপুঞ্জ, এই দুই ভাগে ভাগ করেছিলো তা পাশ্চাত্য মানসে আজো এতো পরিপূর্ণভাবে মিশে আছে যে তার নিজের সাংস্কৃতিক কক্ষপথের বাইরে যা কিছু পড়ে তার কোন স্পষ্ট নির্দিষ্ট মূল্য আছে বলে তত্ত্বগতভাবেও সে স্বীকার করতে অক্ষম?
গ্রীক এবং রোমানদের আমল থেকে, ইউরোপীয় চিন্তাবিদ এবং ঐতিহাসিকেরা ইউরোপীয় ইতিহাস ও কেবল পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এবং অর্থেই পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা করতে উন্নুখ ও ইচ্ছুক। এ চিত্রে অপাশ্চাত্য সভ্যতাগুলি কেবল তখনি প্রবেশ করে যখন ওদের অস্তিত্ব অথবা ওদের মধ্যে থেকে উত্থিত বিশেষ বিশেষ আন্দোলন পাশ্চাত্য মানুষের ভাগ্যের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছে বা করে থাকে; আর এ কারনে, পাশ্চত্যবাসীর দৃষ্টিতে পৃথিবীর ইতিহাস এবং তার বিভিন্ন সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত একটা সম্প্রসারিত পাশ্চত্য ইতিহাসের বেশি নয়!
স্বভাবতই এ ধরনের সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ একটি বিকৃত পরিপ্রেক্ষিতের জন্ম দিয়ে থকে। পাশ্চাত্যের মানুষ যেহেতু সেই সব লেখার সাথেই পরিচিতি যা তার নিজের সংস্কৃতিকে চিত্রিত করে অথবা নিজের সভ্যতার সমস্যাগুলি আলোচনা করে তার খুঁটিনাটি সমেত এবং উজ্জ্বল রঙে, আর বাকি বিশ্বের প্রতি এখানে-ওখানে ঘাড় বাঁকিয়ে মাঝে মাঝে তাকানোর বেশি কিছু করে না; এজন্য গড়পড়তা একজন ইউরোপীয় অথবা আমেরিকান সহজেই এই ভ্রান্ত ধারণার শিকার হ’য়ে পড়ে যে, পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা বাকি বিশ্বের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার চাইতে কেবল উৎকৃষ্টতরোই নয়, বরং আয়তনেও এতো বিপুল যে, দু’য়ের মধ্যে কোন তুলনাই হয় না; আর এ কারণে, পাশ্চত্য জীবন পদ্ধতি হচ্ছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য আদর্শ যার মনদন্ডেই কেবল অন্যান্য জীবন-পদ্ধতিকে বিচার করা যেতে পারে। এর দ্বারা অবশ্য এ কথাই বোঝানো হয় যে, যে কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ধ্যান-ধারণা, সামাজিক অনুষ্ঠান অথবা নৈতিক মূল্যায়ন, যা এই পাশ্চাত্য আদর্শ বা নমুনার সংগে মিলে না, তা বস্তুতই একিট নিম্মস্তরের জীবনের বস্তু। গ্রীক এবং রোমানদের পায়ের চিহ্ণ অনুসরণ করে পাশ্চাত্য জগত ভাবতে পছন্দ করে যে, ঐসব ভিন্ন সভ্যতা, এককালে যা বিদ্যমান ছিলো বা বর্তমানে আছে সে সবই প্রগতির যে-পথ পাশ্চাত্য অভ্রান্তভাবে অনুসরণ করে চলেছে সে পথে প্রতিবন্ধকস্বরূপ কতকগুলি পরীক্ষণ –নিরীক্ষণ মাত্র;অথবা, বড় জোর একথা বলা যায় (যেমন জনক সভ্যতাগুলির ক্ষেত্রে, যা সরাসরিভাবে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার পূর্বে বিকাশ লাভ করেছিলো একই রেখায়) এগুলি একই পুস্তকের পরপর কয়েকটি অধ্যায় মাত্র-অবশ্যই সভ্যতা হচ্ছে এর শেষ অধ্যায়।
আমি যখন আমার এই মতের কথা আমার কোন এক মার্কিন বন্ধুর নিকট ব্যক্ত করি-বন্ধুটি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে বেশ কৃতিত্বের অধিকারী এবং মানসিক প্রবণতার দিক দিয়ে তাঁকে পন্ডিত বলা যায়-তিনি প্রথমে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেন।
‘মেনে নিলাম’, তিনি বললেন, ‘প্রচীন গ্রীক এবং রোমকরা বিদেশী সভ্যতার বিচার করতে গিয়ে সীমিত দৃষ্টিভংগির পরিচয় দিয়েছিলো; কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা কি ওদের এবং বাকি দুনিয়ার মধ্যে যোগাযোগের অসুবিধারই অনিবার্য ফল নয়? আর এই অসুবিধা কি আধুনিককালে অনেকখানি কাটিয়ে ওঠা যায়নি? যা-ই হোক, আমরা, পাশ্চাত্যবাসীরা আজকাল আমাদের আপন সাংস্কৃতিক কক্ষপথের বাইরেও যা ঘটছে তার সংগে অবশ্যই নিজেদেরকে সম্পর্কিত রাখি । গত সিকি শতকে প্রাচ্য শিল্পকলা ও দর্শন সম্পর্কে এবং প্রাচ্যের বিভিন্ন জাতির মনকে যেসব রাজনৈতি চিন্তাধারা করে আছে সেসব বিষয়ে ইউরোপ এবং আমেরিকাতে যে বহু সংখ্যক পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে আপনি কি সেগুলির কথা ভুলে যাচ্ছেন না? অন্যান্য সংস্কৃতির কী দেবার থাকতে পারে তা বোঝার জন্য পাশ্চাত্যবাসীর এ আকাংখাকে উপেক্ষা করা নিশ্চয় সুবিচার হবে না!’
‘হয়তো আপনার কথা কিছুটা সত্য’, আমি জবাব দিই, ‘এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সেই আদি গ্রীক-রোমক দৃষ্টিভংগি আজকাল আর সম্পূর্ণ সক্রিয় নয়। এর কঠোরতা তার ধার উল্লেখযোগ্যভাবে হারিয়ে ফেলেছে, অন্য কোন কারণে নয়, কেবল এ কারণে যে, পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণের মধ্যে যাঁরা অধিকতরো পরিণতি চিন্তাশক্তির অধিকারী তাঁরা তাদের নিজেদের সভ্যতার বহু দিক সম্পর্কেই হতাশ এবং সন্ধিগ্ধ হয়ে উঠেছেন। ওঁদের কারো কারো মনে এই উপলদ্ধির সূচনা হতে শুরু করেছে যে, মানব প্রগতির কেবল একটিমাত্র কিতাব এবং একটিমাত্র কাহিনী না-ও থাকতে পারে, বরং বহু কিতাব এবং বহু কহিনী থাকা সম্ভবঃ আর এর কারণ কেবল এই যে, ঐতিহাসিক অর্থে মানবজাতি একটি সমজাতীয় সত্তা নয়, বরং বিভিন্ন গ্রুপের এক বিচিত্র সমবায়, যাদের মধ্যে মানব জীবনের অর্থ এবং লক্ষ্য সম্পর্কে অনেক দূর ব্যবধানের ভিন্ন ভিন্ন ভাবধারা রয়েছে। তবু আমি মনে করি না যে, পাশ্চাত্য জগত গ্রীক ও রোমকদের চাইতে বিদেশী সংস্কৃতির প্রতি কৃপাশীল পৃষ্ঠপোষকের মনোভাব সত্যি কম পোষণ করতে শুরু করেছেঃ বলা যায়, পাশ্চাত্য কেবল অধিকতর সহনশীল হয়ে উঠেছে। কিন্তু মনে রাখবেন-এ সহনশীলতা ইসলামের প্রতি নয়-কেবল কতকগুলি নির্দিষ্ট প্রাচ্য সংস্কৃতির প্রতি যা পাশ্চাত্যের অধ্যাত্ম ক্ষুধায় পীড়িত মানুষের জ্যে এক ধরনের আধ্যাত্মিক আকর্ষণ যোগায় এবং একই সাথে তা পাশ্চাত্য বিশ্বদৃষ্টি থেকে অতো বেশি দূরের যে, এর মূল্যগুলির বিরুদ্ধে কোন সত্যিকার চ্যালেঞ্জ বলে তা গন্য হয় না।’
‘আপনি এর দ্বারা কি বোঝাতে চান?’
‘দেখুন’, আমি জবাব দিই, ‘যখন একজন প্রতীচ্যবাসী, ধরা যাক, হিন্দু ধর্ম অথবা বৌদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা করে তখন সে ব্যতিক্রমহীনোভাবেই এ –সব মতবাদ ও তার নিজের মতবাদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য সম্পর্কে সতর্ক থকে। এ –সব মতবাদের এটা-ওটা তার প্রশংসা পেতে পর, কিন্তু স্বভাবতই সে কখনো তার নিজের ভাবধারার বদলে এগুলি গ্রহণ করার সম্ভাবনা বিবেচনা করে দেখতে রাজী হবে না। যেহেতু সে পূর্ব থেকেই এ অসম্ভব্যতা স্বীকার করে নেয় সে কারনে এসব বিজাতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে মানসিক স্থৈর্য এবং প্রায়ই সহানুভূতিপূর্ণ সমঝদারের মনোভাব নিয়ে সে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। কিন্তু ইসলামের প্রসংগ যখন আসে, যা হিন্দু অথবা বৌদ্ধ দর্শনের মতো পাশ্চাত্য মূ্ল্যগুলির মোটেই ততটা বিরোধী নয়, তখন এ পাশ্চাত্য মানসিক স্থৈর্য প্রায় সব-সময় এবং অনিবার্যভাবেই আবেগাত্মক পক্ষপাত দ্বারা বিচলিত হয়ে পড়ে। এর কারণ কি সম্ভবত এই যে, মাঝে মাঝে আমি সবিস্ময়ে ভাবি, ইসলামী মূল্যবোধগুলি পাশ্চাত্য মূল্যবোধের খুব কাছাকাছি বলেই তা আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনের বহু পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণার প্রতি প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ বিশেষ?
এবং আমি তাঁকে আমার একটা থিওরীর কথা বলতে আরম্ভ করি, যা আমার চিন্তায় এসেছিল কয়েক বছর আগে; এটি এমন এক থিওরী, যা আমার মতে, পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সমসাময়িক চিন্তাধারায় ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায়ই যে গভীর মূল বিদ্বেষ দেখতে পাওয়া যায় তা স্পষ্টতরোভাবে বোঝার সহায়কও হতে পারে।
‘এই বিদ্বেষের একটা সত্যিকার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পেতে হলে’, আমি বললাম, ‘আপনাকে তাকাতে হবে অনেক পেছনদিকে, ইতিহাসের অভ্যন্তরে-এবং পাশ্চাত্য ও মুসলিম জগতের মধ্যকার প্রথমদিকের সম্পর্কগুলির মনস্তাত্ত্বিক পটভূমিকা বুঝবার চেষ্টা করতে হবে। পাশ্চাত্যের লোকেরা আজকের দিনে ইসলাম সম্পর্কে যা চিন্তা এবং অনুভব করে তার শিকড় রয়েছে সেইসব গভীর প্রভাবের চাপ এবং স্মৃতির ছাপের মধ্যে যা জন্ম নিয়েছিলো ক্রসেডের সময়’।
‘ক্রসেড!’ আমার বন্ধু বিস্মিত কন্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘আপনি নিশ্চয় বলতে চান না যে প্রায় হাজার বছর আগে যা ঘটেছিলো তা এখনো, এই বিশ শতকের লোকের উপরও প্রভাব বিস্তার করতে পারে?’
‘কিন্তু তা অবশ্যই করে থাকে। আমি জানি, এ অবিশ্বাস্য শোনাবে। কিন্তু আপনার কি স্মরণ নেই মনোবিকলনকারীদের প্রথমদিকের আবিস্ক্রিয়াগুলিকে কী অবিশ্বসের সংগে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিলো, যখন ওঁরা প্রমাণ করবার চেষ্টা করছিলেন একটা বয়স্ক মানুষের আবেগময় দিকের বহুলাংশেরই –এবং ইডিওসিনক্রেসিস বা ‘বিশেষ মেজাজ-মর্জি’ শব্দটিতে যেসব আপাত অহেতুক প্রবণতা, রুচি ও সংস্ককার নিহিত রয়েছে তার ও প্রায় সবটারিই –উৎস খুঁজে পাওয়া যেতে পারে তা শৈশবের প্রথমদিকের, তার বয়সের সবচাইতে ফর্মেটিভ সময়টির বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যে? আচ্ছা, জাতি এবং সভ্যতা কি যৌথ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কিছু ? ওদের ক্রমবিকাশও ওদের শৈশবের প্রথমদিকের অভিজ্ঞাতর সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। শিশুদের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি ওদের শৈশবের এসব অভিজ্ঞতাও হয়তো আনন্দদায়ক ছিলো অথবা ছিলো পীড়াদায়ক;ঐসব অভিজ্ঞতা হতে পারে সম্পূর্ণ যুক্তিসম্পন্ন, অথবা বিপরীত পক্ষে, সেগুলি হতে পারে কোনো ঘটনার শিশুসুলভ সরল ভুল ব্যাখ্যার ফলঃ এ ধরনের প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতারই মন-মানস বদলে দেয়ার ক্ষমতা প্রধানত নির্ভর করে সেই অভিজ্ঞতার সূচনাকালীন তীব্রতার উপর। ক্রসেডের অব্যবহিত পূর্বের শতকটিকে, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় সনের প্রথম হাজার বছরের সমাপ্তটিকালটিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার শৈশবের প্রথম দিক বলে সহজেই বর্ণনা করা যেতে পারে .. .. .
আমি আমার বন্ধুকে স্মরণ করিয়ে দিই-তিনি নিজেও একজন ইতিহাসবিদ-এ হচ্ছে সেই যুগ রোম সাম্রাজ্যেরে ভাঙনের পরবর্তী অন্ধকার শতাব্দীগুলির পর এই প্রথম ইউরোপ তার নিজস্ব সাংস্বৃতির পথ দেখতে পশুর করেছে। প্রায় বিস্মৃত রোমন ঐতিহ্যের-সাথে কোন সম্পর্ক না রেখেই ঠিক সেই মুহুর্তে ইউরোপের জনসাধারণের বিভিন্ন মাতৃভাষায় নতুন নতুন সাহিত্য সৃষ্টি শুরু হয়েছেঃ যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে গথ, হূন এবং অভরদের স্থান হতে স্থানান্তরে বিচরনের ফলে যে মানসিক অবসাদ এসেছিলো, তা কাটিয়ে উঠে পাশ্চাত্য খ্রিষ্টধর্মের ধর্মীয় অভিজ্ঞতার প্রেরণায় চারুকলা ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মধ্যুগের প্রথমদিকের অপরিণত অবস্থার মধ্য থকে জন্ম নিচ্ছিলো এক নতুন সাংস্কৃতিক জগত। ঠিক সেই সন্ধিক্ষনে, ক্রসেড থেকে তার আত্মবিকাশের সেই চরম নাজুক সংবেদময় মুহর্তটিতে পেলো তার জীবনের সবচেয়ে প্রচন্ড আঘাত-আধুনিক ভাষায় যাকে বলা হয়, ‘ট্রওমা’ বা আবেগজনিত আঘাত, যা হয়ে উঠতে পারে মানসিক ব্যাধির হেতু.. .. .. .
ক্রসেডগুলি হচ্ছে এমন এক সভ্যতার উপর প্রচন্ড সমষ্টিগত চাপ, যা সবেমাত্র আত্মসচেতন হয়ে উঠতে শুরু করেছে। ঐতিহাসিক দিক দিয়ে বলতে গেলে, ক্রুসেডের যুদ্ধগুলি হচ্ছে এটা সাংস্কৃতিক সংহতির আলোকে নিজেকে দেখার জন্য ইউরোপের প্রথমতম এবং সম্পূর্ণ সফল এক প্রয়াস। প্রথম ক্রসেড যে উৎসাহ –উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছেো তার আগে কিংবা পরে ইউরোপ আর এতমন কোন অভিজ্ঞতাই অর্জন করেনি, যা এর সাথে তুলনীয় হতে পারে। ইউরোপ মাহদেশের উপর দিয়ে উন্মাদনার এক প্রবল ঢেউ বয়ে গেলো-এমন এক আনন্দ-উল্লাস যা এই প্রথম বিভিন্ন রাষ্ট্র, গোত্র ও শ্রেণীর মধ্যকার সকল প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে গেলো। এর আগে ছিলো ফ্রাঙ্ক, স্যাক্সন, জার্মান, বুর্গান্ডীয়, সিলিলীয়, নরম্যান এবং লুম্বার্ডেরা-বিভিন্ন গোত্র ও জাতের এক জগাখিচুড়ি, যাদের মধ্যে সাধারণ কিছু ছিলো না বললেই চলে, কেবল একটি বিষয় ছাড়াঃ ওদের প্রায় সবকটি সামন্ততন্ত্রী রাজ্য ও প্রদেশ ছিলো রোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ, আর ওরা সকলেই ছিলো খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসীঃ কিন্তু ক্রুসেডের যুদ্ধগুলিতে, এবং এসব যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই ধর্মীয় বন্ধন উন্নীত হয় এক নতুন সমতলে, যা সকল ইউরোপীয়রই সাধারণ লক্ষ্যঃ ‘খ্রিষ্টান রাজ্যের’ রাষ্ট্রীয়-ধর্মীয় ধারণা। পরিণামে তা-ই জন্ম দেয় ইউরোপ –ভিত্তিক সাংস্কৃতিক চেতনার। ১০৯৫ সালের নভেম্বরে পোপ দ্বিতীয় আরবান তাঁর ক্লারমন্টের বিখ্যাত বক্তৃতায় যখন পবিত্র ভূমি দখল করে রাখা ‘পাষন্ড জাতির’ বিরুদ্ধে খ্রিষ্টানদরকে যুদ্ধের জন্য উদ্ধুদ্ধ করেন তখনি তিনি সম্ভবত তাঁর নিজের অজান্তেই পাশ্চাত্য সভ্যতার চার্টার বা সনদ ঘোষণা করেন।
ক্রুসেডের যুদ্ধের ফলে আবেগজনিত প্রচন্ড আঘাতের যে অভিজ্ঞতা হয় তা-ই ইউরোপকে দেয় তার সাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং তার ঐক্য; কিন্তু পরিণামে এই একই অভিজ্ঞতাই তখন থেকে সেই মিথ্যা রঙের পোঁচ দিতে থাকরো, যে –রঙে পা্শ্চাত্যবাসীর চোখে ইসলাম প্রতিভাত হয়েছে পরবর্তীকালে-কেবল এ কারনে নয় যে, ক্রুসেডের অর্থই হচ্ছে যুদ্ধ এবং রক্তপাত। বিভিন্ন জাতির মধ্যে অমন কত যুদ্ধই তো সংঘটিত হয়েছে-যার কথা পরবর্তীকালে বেমালুম ভুলে গেছে সে-সব জাতি-এবং কতো শত্রুতা ও বৈরিতা, যা তাদের কারে মনে হয়েছিলে অনপনেয়, পরবতীকালে রূপান্তরিত হয়েছে বন্ধুত্বে! বিভিন্ন ক্রুসেডে যে ক্ষতি হলো তা অস্ত্রের ঝনঝনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনিঃ প্রথমত এবং সর্বাগ্রে এ হচ্ছে মনোজাগতিক ক্ষতি-ইসলামের শিক্ষা এবং আদ- র্শের একটি ইচ্ছাকৃত অপব্যাখ্যার মাধ্যমে পাশ্চাত্য মনকে মুসলিম জগতের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তোলাই সেই ক্ষতি; কারন ক্রুসেডের আহবানের যুক্তিযুক্ততা যদি বজায় রাখতে হয় তাহলে মুসলমানদের নবীকে অপরিহার্যভাবেই চিহ্ণিত করতে হবে খ্রিস্ট-বিরোধীরূপে এবং তাঁর ধর্মকে জঘন্যতম ভাষায় চিত্রিত করতে হবে, লাম্পট্য ও বিকৃত রুচির উৎসরূপে। ইসলাম যে এটি স্কুল ইন্দ্রিয়পরায়ণতা এবং পাশবিক হানাহানির ধর্ম, চিত্ত শুদ্ধির ধর্ম নয়, আনুষ্ঠানাদি পালনের ধর্ম, ক্রুসেডের আমলেই এ হাস্যকর ধারণা প্রবেশ করে পাশ্চাত্য মানসে এবং তখন থেকেই তা ওখানেই রয়ে গেছে; আর সেই সময়ে নবী মুহাম্মদের নাম-সেই একই মুহাম্মদ যিনি তাঁর উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন-অন্যান্য ধর্মের নবীগণকে শ্রদ্ধা করতে-ইউরোপীয়রা ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সংগে রূপান্তরিত করে ‘মাহৌন্দ’ –এ, ইউরোপে স্বাধীন অনুসন্ধিৎসা সূচিত হওয়ার যুগ তখনো অনেক সুদূর ভবিষ্যতের ব্যাপার। তখন যেসব শক্তি বিদ্যমান ছিলো তাদের পক্ষে পাশ্চাত্য ধর্ম এবং সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক ধর্ম ও সভ্যতার বিরুদ্ধে হিংসা –বিদ্ধেষের কালো বীজ বপন করা ছিরো খুবই সহজ। কাজেই, এ কোন আকস্মিক ব্যাপার নয় যে, এই সব যুদ্ধ যখন চলছিলো তখন জ্বালাময়ী শ্যাজো দ্য রোঁলা-যাতে দক্ষিণ ফ্রান্সে মুসলিম বে-দ্বীনের উপর খৃষ্টান রাজ্যের অলীক বিজয় কাহিনী বর্ণিত হয়েছে-রচিত হয়নি, রচিত হয়েছিলো তিন শতাব্দী পরে-অর্থাৎ প্রথমে ক্রুসেডের ঠিক কিছু আগে-এবং সংগে সংগেই তা হয়ে দাঁড়ালো ইউরোপের ‘জাতীয় সংগীত’-স্বরূপ; এবং এ-ও আকিস্মিক ব্যাপার নয় যে, এই যুদ্ধ নিয়ে রচিত মাহকাব্য হচ্ছে এক ‘ইউরোপীয়’ সাহিত্যের আরম্ভ যা আগেকার আঞ্চলিক সাহিত্য থেকে সুস্পষ্টভঅবে স্বতন্ত্রঃ কারণ ইউরোপীয় সভ্যতার শৈশবাবস্থার উপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের প্রতি নিদারুণ বিদ্বেষ।
এই ইতিহাসেরই একটা পরিহাস বলে মনে হয় যে, ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতীচ্যে যুগ যুগ লালিত শত্রুতা, যা আদিতে ছিলো ধর্মীয় আজো, এমন এক সময়েও টিকে আছে তার অবচেতন মনে যখন পাশ্চাত্য মানুষের কল্পনার উপর ধর্ম তার কর্তৃত্ব প্রায় সবটাই হারিয়ে ফেলেছে। অবশ্য, আসরে তা বিস্ময়কর নয়। আমরা জানি, মানুষকে তার শৈশবে যেসব ধমীয় বিশ্বাস জীবনব্যাপী-‘আর এই ই’, আমি আমার বক্তব্য শেষ করে বলি, ‘ঠিক এ-ই ঘটেছিলো সেই সমষ্ঠিগত ব্যক্তিত্ব পাশ্চাত্য সভ্যতার জীবনে। ক্রসেডের ছায়া আজো পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে আছে পাশ্চাত্য সভ্যতার উপর;আর ইসলাম এবং মুসলিম জগতের প্রতি তার সকল প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সুস্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে সেই মরেও-মরে না প্রেতের.. .’
আমার বন্ধু কিছুক্ষনের জন্য চুপ করে থাকেন। আমি এখনো দেখতে পাচ্ছি লম্বা হালকা-পাতলা সেই মানুষটি কামরার ভেতর পায়চারী করছেন। তাঁর হাত দুটি তাঁর কোটের পকেটে, মাথা ঝাঁকাচ্ছেন যেন কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে এবং অবশেষে তিনি বললেনঃ
‘আপনি যা বলছেন তাতে কিছু সারবস্তু থাকতে পারে-সত্যি হয়তো থাকতে পারে-যদিও, হঠাৎ করে আমি আপনার এই থিওরী বিচার করে দেখতে পারছি না, সে অবস্থা আমার নেই। তবে যা-ই হোক, আপনার জীবন, যা আপনার কাছে খুবই সরল এবং জটিলতা মুক্ত, পাশ্চাত্যের লোকদের কাছে অবশ্যই পরম বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক ঠেকবে? আপনি আপনার আত্মজীবনী লিখছেন না কেন? আমি নিশ্চিত যে, এটি খুবই চমকপ্রদ এবং আক র্ষণীয় পুস্তক হবে।’
উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে আমি জবাব দিইঃ হ্যাঁ, এ ধরণের একটি বই লিখতে গিয়ে আমি হয়তো ফরেন সার্ভিস ত্যাগের জন্য মানিয়ে নিতে পারি নিজেকে। মোদ্দা কথা, লেখাই তো আমার মূল পেশা.. .
আমি রসিকতা করে যে জবাব দিয়েছিলাম পরবর্তী কয়েক হপ্তা এবং মাসে আস্তে আস্তে আমার অজান্তেই তা উবে গেলো। আমি আমার জীবনের কাহিনী লিপিবদ্ধ করার জন্য এবং এতে ক’রে, যত তুচ্ছভাবেই হোক না কেন, যে পুরু যবনিকা ইসলাম এবং তার সংস্কৃতিতে প্রতীচ্য-মন থেকে আড়াল করে রেখেছে তা সরাতে সাহায্য করার জন্য চিন্তা করতে শুরু করি, গভীরভাবে। ইসলামে আমার প্রবেশ অনেক দিক দিয়ে একটি একক, অতুলনীয় ব্যাপারঃ মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘকাল বসবাস করেছি বলেই আমি মুসলমান হইনি, পক্ষান্তরে আমি তাদের মদ্যে বাস করার সিদ্ধান্ত নিই এ কারণে যে, আমি ইসলাম কবুল করেছি। আমি কি আমার একান্ত নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা পাশ্চাত্য পাঠকদেরকে অবগত ক’রে ইসলামী জগত ও পাশ্চাত্য জগতের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে বেশি অবদান রাখতে পারি না, সেই কুটনৈতিক পদে অবস্থান ক’রে যা করতে পারি, তার চেয়ে যে পদ আমরা দেশের অন্য লোকদের দ্বারা পূরণ করা যেতে পারে একই রকম প্রকৃষ্টরূপে! মোদ্দাকথা যে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি পাকিস্তানের মন্ত্রী হতে পারেন জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানে-কিন্তু আমার পক্ষে পাশ্চাত্যের লোকদের নিকট ইসলাম সম্পর্কে যেভাবে কথা বলা সম্ভব ক’জন লোক তা করতে সক্ষম? আমি মুসলমান, কিন্তু এ-ও সত্য যে, আমার জন্ম পাশ্চাত্য জগতেঃ কাজেই ইসলাম এবং পাশ্চাত্য জগত, দু’য়েরই সুধীজনের ভঅষায় কথা বলতে পারি আমি..
আর এ কারনে, ১৯৫২ সালের শেষের দিকে আমি পদত্যাগ করি পাকিস্তান ফরেন সার্ভিস থেকে এবং এ বইটি লিখতে শুরু করি। আমার আমেরিকান বন্ধুটি যে রকমটি আশা করেছিলেন এটি সে রকম ‘চিত্তাকর্ষক বই’ হয়েছে কিনা আমি বলতে পারি না। কেবল কিছু পুরানো নোট, বিচ্ছিন্ন রোজনামচা এবং সে সময়ে আমি সংবাদপত্রের জন্য যে সব প্রবন্ধ লিখেছিলাম তারই কয়েকটি সাহায্যে, স্মৃতি থেকে-এক ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনের জটিল রেখাগুলি ধরে ফের অতীতের দিকে যাত্রা করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিলো না- যে বিকাশ ও বিবর্তন ঘটেছে বহু বছর এবং ভৌগলিক স্থানের এক বিশাল বিস্তার জুড়ে।
আর এই যে কহিনীঃ আমার সমগ্র জীবনের কাহিনী নয়, কেবল সেই বছরগুলির কাহিনী, ভারতের পথে আরবদেশ ছেড়ে বের হওয়ার আগেকার বছরগুলির কাহিনী-সেই উত্তেজনাময় বছরগুলি, যা আমি সফরে কাটিয়েছি লিবিয়ার মরুভূমি থেকে পামীর মালভূমির বরফ-ঢাকা পর্বত শৃংগগুলি মধ্যবর্তী এবং বসফরাস ও আরব সাগরের মধ্যকার প্রায় সকল দেশের ভেতর দিয়ে। এ কাহিনী বলা হয়েছে একটি পটভূমিতে-এবং মনে রাখতে হবে, আরবের অভ্যন্তর থেকে মক্কায় ১৯৩২-এর গ্রীষ্মের শেষের দিকে, আমার সর্বশেষ মরু সফরের প্রেক্ষিতেঃ কারণ ঐ তেইশ দিনের মধ্যেই আমার জীবনের প্যাটার্ন সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো আমার কাছে।
পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলিতে যে আরবের বর্ণনা করা হয়েছে তা এখন আর নেই। এর নির্জনতা এবং সংহতি ধ্বসে পড়েছে অকস্মাৎ প্রবল বেগে উৎক্ষিপ্ত তেলের প্রচন্ড ধাক্কায় এবং তেল যে স্বর্ণ নিয়ে এসেছে তারই চাপে। এর মহৎ সরলতা হারিয়ে গেছে এবং তার সংগে হারিয়ে গেছে মানবিকতার দিক যা ছিলো একক অনন্য তা-ও। মানুষ যখন মহামূল্য কোন কিছুর জন্য বেদনা অনুভব করে, যা এখন হারিয়ে গেছে চিরদিনের জন্য, যা ফিরে পাওয়া যাবে না আর কখনো, সে বেদনার সাথে আমার মনে পড়েছে সেই শেষ দীর্ঘ মরুপথে চলার কথা-যখন আমরা দুজন, সওয়ারী হাঁকিায়ে চলেছি; আর চলেছি, দুজন দুটি উটের উপরে, সাঁতরে চলা আলোর ভেতর দিয়ে.. .
তৃষ্ণা
এক
আমরা দু’জন দু’টি উটের উপর, চলেছি তো চলেছি; মাথার উপর সূর্য জ্বলছে, সর্বত্র আালো ঝলমল করছে, ঝলসাচ্ছে, একাধারে নির্জনতা আর রোদ –ঝলসানো নীরবতা এবং তারই মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা দুটি মানুষ, দুটি উটের উপর-চলেছি দুলতে দুলতে, চলার সেই ছন্দে ও ভংগীতে যা মানুষকে নিদ্রালূ করে তোলো, আর তাকে ভুলিয়ে দেয় দিনের কথা, রোদের কথা, উষ্ণ হাওয়া আর সুদীর্ঘ পথের কথা। বালিয়াড়ির মাথায় কোথাও কোথাও হলদে ঘাসের গুচ্ছ আর এখানে ওখানে গ্রন্থিল হামদ-লতার ঝোপ, মস্ত বড় অজগরের মত বালির উপর কুন্ডলি পাকিয়ে পড়ে আছে। ইন্দ্রিয়গুলি যেন ঘুমিয়ে পড়েছে । জিনের উপর বসে দুলছি। কিছুই টের পাচ্ছি না উটের পায়ের নিচে বালি গুঁড়ানোর আওয়াজ এবং হাঁটুর ভেতরের দিক জিন-আঁটানো কাঠের পেরেকের ঘষা ছড়া। রোদ আর বাতাস থেকে মুখটাকে বাঁচানোর জন্য পাগড়ীর গুচ্ছ দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছি। মনে হলো, আমি যেন আমার আপন নিঃসংগতাকে একটি বস্তুরই মতো ধরা ছোঁয়া যায় একন একটা পদার্থের মতো এরই মধ্যে দিয়ে, হ্যাঁ ঠিক এরই মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছি তায়েমার কুয়াগুলির দিকে… তায়েমার সেই গহীন কুয়াগুলির দিকে, যা পানি যোগায় তৃষ্ণার্তকে.. ঠিক নুফুদের ভেতর দিয়ে তায়েমার দিকে-আমি একটা স্বর শুনতে পেলাম, জানি না স্বপ্নে শোনা স্বর, না আমার সংগীর কন্ঠস্বরঃ
-‘তুমি কিছু বলছিলে জায়েদ?’
-‘বলছিলাম’ আমার সংগী জবাব দেয়, ‘তায়েমার কুয়া দেখার জন্য ঠিক আড়াআড়িভাবে নুফুদ পাড়ি দেবার দুঃসাহস খুব বেশি লোক করবে না।’
আমি আর জায়েদ গিয়েছিলাম নজদ-ইরাক সীমান্তের কসর আসাইমনে, বাদশাহ ইবনে সাউদের অনুরোধে। সেখান থেকে আমরা দু’জন ফিরছিলাম। আমার কাজ শেষ করার পর হাতে ছিল প্রচুর অবসর। তাই ঠিক করলাম, প্রায় দু’শ, মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত তায়েমার সুদূর এবং প্রাচীন মরুদ্যানটি একবার দেখতে যাবো। ওল্ড টেস্টামেন্টের সেই ‘তোমা’-আর এর সম্পর্কেই ঈসায়া বলেছিলেন, ‘তোমা’র বাসিন্দারা তৃষ্ণার্তদের পানি যোগায়’। তায়েমার অঢেল পানি আর এর বড়ো ইঁদারা, সারা আরবে এমনটি কোথাও মিলে না। এই পানি আর ইঁদারার জন্য ইসলাম-পূর্ব যুগে তায়েমা হয়ে উঠেছিল ক্যারাভাঁ বাণিজ্যের একটা মস্ত বড়ো কেন্দ্র আর সেকেলে আরব তমদ্দুনের এক পীঠস্থান। স্থানটি দেখার ইচ্ছা আমার অনেকদিনের। তাই মরু-কাফেলা যে –সব ঘুরতি পথে চলে সে-সব পথে না গিয়ে কসর আসাইমিন থেকে আমরা সোজা ঢুকে পড়লাম বিশাল নুফুদের ভেতরে। মধ্য আরবের উঁচু এলাকাগুলি আর সিরীয় মরুভূমির মাঝখানে ছড়িয়ে আছে লালচে বালি মরু নুফুদ, বিশাল তার আয়তন । এই ভয়ংকর নির্জন এলাকার এই অংশে নেই কোনো পায়ের রেখা, নেই কোনো পথ। বাতাস যেন দায়িত্ব নিয়েছে –যাতে মানুষ বা কোনো পশুর পদক্ষেপ এই নরম দেবে-যাওয়া ঝুরঝুরে বালিতে স্থায়ী চিহ্ন রেখে যেতে না পারে এবং জমির কোনো নিশানা মুসাফিরকে পথ দেখানোর জন্য বেশিদিন টিকে না থাকে! বাতাসের ধাক্কায় বালিয়াড়িগুলির রূপরেখা হরদম বদলাচ্ছে, আস্তে আস্তে, টের পাওয়া যায় না এমনি মৃদু গতিতে প্রবাহিত হয়ে আকারের পর আকার নিচ্ছে। পাহাড় রূপান্তরিত হচ্ছে উপত্যকায়, উপত্যকায়, উপত্যকা রূপ নিচ্ছে নতুন মৃদু মর্মর ধ্বনি তোলে। উটের মুখেও তেতো ছাইয়ের মত সে ঘাস!
বহুবার দিক দিয়ে এ মরুভূমি আমি পার হয়েছি। তবুও কারো মদদ না নিয়ে নিজে নিজে এর মধ্য দিয়ে রাস্তা খুঁজে নেবার হিম্মত আমার নাই। কাজেই জয়েদকে আমার সংগে পেয়ে আমি ভীষণ খুশী। দেশের এই এলাকারই লোক জায়েদ। তার বংশের নাম শাম্মার, আল—নুফুদের দক্ষিণ এবং পূর্ব সীমানায় শাম্মার খান্দানের বসতি। শীতকারের ধারা বর্ষণে বালিয়ড়িগুলি যখন হঠাৎ ঘন সবুজ মাঠে রূপান্তরিত হয়, তখন বছরের কয়েক মাস ধরে ওরা নুফুদের মাঝখানে উট চরায়। মরুভূমির পরিবর্তনশীল মেজাজের সংগে জায়েদের সম্বন্ধ রক্তের, এর সাথে সাথে স্পন্দিত হয় জায়েদের হৃদয়।
আজ পর্যন্ত যত মানুষের সংগে আমার পরিচয় হয়েছে মনে হয় জায়েদই তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। চওড়া তার কপাল, পাতলা শরীর, মাঝারি আকার, সুন্দর গঠন, প্রচন্ড তার শক্তি, সুগঠিত মজবুত চোয়াল, আর একাধারে কঠোর এবং লালসাপূর্ণ মুখ নিয়ে তার গোধুম-রঙা সংকীর্ণ মুখমন্ডল-তাতে রয়েছে সেই প্রত্যাশিত গাম্ভীর্য যা মরু –আরবের বাসিন্দাদের একটি খাস বৈশিষ্ট্য-মর্যাদাবোধের সংগে একটা আন্তরিক মাধুর্যপূর্ণ আত্মসমাহিত ভাব। খাঁটি বেদুঈন রক্ত এবং নজদী শহরে জীবনের এক সুন্দর সংমিশ্রণ সে; বেদুঈনী ভাবাতিশয্যের গলদ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেও বেদুঈনের সহজ প্রবৃত্তির নিশ্চয়তা সে নিজের মধ্যে অক্ষুণ্ণ রেখেছে এবং শহরে লোকের বৈষয়িক কৃত্রিমতার শিকার না হয়েও তাদের সংসার জ্ঞান সে হাসিল করেছে। আমার মতো সেও এ্যডভেঞ্চার জীবন নানা ঘটনা এবং উত্তেজনায় ভরা। মহাযুদ্ধের সময় সিনাই উপদ্বীপে অভিযান চালানোর জন্য তুর্কী সরকার এক অনিয়মিত উট সওয়ার বাহিনী গঠন করেছিলো, বালক বয়সে জায়েদ ছিলো তারই একজন সিপাই। তা ছাড়া, ইবনে সউদের হামলা থেকে তার শাম্মার খান্দানের বসত–ভূমি রক্ষা করার জন্য সে লড়েছে। কিছুদিন আবার অস্ত্রের চোরাচালান দিয়েছে পারস্য উপসাগরে। আরব জাহানের বহু এলাকায় বহু আওরতের সংগে প্রেম করেছে প্রচন্ডভাবে। অবশ্য প্রত্যেকের সাথেই কোনো –না কোনো সময় আইনত তার শাদী হয়েছে এবং তারপর আইন মোতাবেক তাদেরকে সে তালাকও দিয়েছে। মিসরে সে কিছুকাল ঘোড়ার ব্যবসা করেছে। আর ইরাকে সে ছিরা ভাগ্যান্বেষী সৈনিক, সবশেষে প্রায় পাঁচ বছর ধরে সে রয়েছে আমার সহচর হিসাবে, আরব মুলুকে। এবং এখন উনিশ শ’ বত্রিশের গ্রীষ্মের এই শেষ দিকে আমরা দু’জন আরো অনেকবারের মতো চলেছি উটের উপরে বসে, বালিয়াড়ির মধ্যে নির্জন পথে ঘুরতে ঘুরতে; চওড়া চত্বরবিশিষ্ট কোন কোন কুয়ার পাশে আমরা থামছি এবং তারা –ঝিলমিল আকাশের নিচে আরাম করছি রাতের বেলা। তপ্ত বালুর উপর উটের পায়ের একটা সুইশ্ সুই্শ্ আওয়াজ, কখনো কখনো চলার মাঝে উটের পায়ের আওয়াজের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে জায়েদ নীরস কন্ঠে গান ধরে; রাত্রে আমরা তাঁবু খাটাই, কফি বানাই, ভাত রাঁধি এবং কখনো কখনো পাকাই শিকার-করা বুনো প্রাণীর গোশত। রাতের বেলা যখন আমরা বালির উপর শুয়ে থাকি বাতাস আমাদের উপর একটা ঠান্ডা পরশ বুলিয়ে যায়। বালিয়াড়ির উপর সূর্য ওঠে, লালচে সূর্য প্রচন্ড বিস্ফোরণে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় আতশবাজির মতো এবং আজকের মতো কখনো কখনো আমরা দেখতে পাই, হঠাৎ পানি পেয়ে জীবনের বিস্ময়কর প্রকাশ ঘটেছে তৃণলতার মধ্যে।
যোহরের সালাতের জন্য আমরা থেমেছি, একটা মশক থেকে পানি নিয়ে আমি হাত-মুখ এবং পা ধুচ্ছি। কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো আমার পায়ের কাছে ঘাসের একটা শুকনো গুচ্ছের উপর-একটা অসহায় ক্ষুদ্র তৃণের গুচ্ছ, সূর্যের নিষ্ঠুর তাপে রং হয়েছে হলদে, নেতিয়ে প্রাণহীন হয়ে পড়ে আছে বালির উপর। কিন্তু কয়েক ফোঁটা পানি ওর উপর পড়ার সংগে সংগেই ওর কোঁকড়ানো পাতাগুলির মধ্যে দিয়ে এক আশ্চর্য শিহরণ বয়ে গেলো, স্পষ্ট দেখতে পোম, কিভঅবে সেগুলি মেলে গোলো আমার চোখের সামনে। আরো কয়েকটি ফোঁটা.. . ছোট্ট পাতাগুলি নড়ে উঠলো, কুঁকড়ে গেলো এবং তারপর ধীরে ধীরে যেন সংকোচের সংগে শিউরে সেগুলি সোজা হয়ে গেলো। আমি নিরুদ্ধ শ্বাসে আরো কিছুটা পানি ঢালি তৃণ গুচ্ছটির উপর। আরো দ্রুত, আরো প্রচন্ডভাবে নড়ে উঠলো তৃণটি, যেন কোন অদৃশ্য শক্তি ওকে মৃত্যু-স্পন্ন থেকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলছে। আর ওর পাতাগুলি, কী আনন্দের সে দৃশ্য! তারা মাছের বাহুগুলির মতো সংকুচিত ও প্রসারিত হতে লাগলো, যেন লাজুক অথচ অদম্য উত্তেজনায় ইন্দ্রিয়জ আনন্দের একটি সত্যিকার ক্ষণিক বিস্ফোরণে সে অভিভূত। কিছুক্ষণ আগেও যা মৃতের শামিল, এমনি করে তারই মধ্যে আবার ফিরে এলো তার প্রাণ, প্রকাশ্যে, প্রবলভাবে, যে প্রানের কাছে হার মানে মৃত্যু এবং যার ঐশ্বর্য মানুষের বুদ্ধির অগম্য।
মরুভূমিতে আপনি প্রাণকে তার রাজকীয় রূপে অনুভব করবেন সবসময়ে। প্রাণকে টিকেয়ে রাখা এতো কষ্টকর, এতো কঠিন বলেন মরুভূমিতে প্রাণ যেন সবসময়েই একটা বহমত, একটা সম্পদ, একটা বিস্ময়। আর মরুভূমি সবসময়েই চমকপ্রদ মানুষের জন্য। মরুভূমির সাথে বহু বছরের জানাজানি থাকলেও বিস্ময়ের অবকাশ হামেশাই রয়েছে। কখনো কখনো যখন মনে হয় , মরুভূমি তার সমস্ত কঠোরতা আর শূন্যতা নিয়ে রয়েছে আমাদের চোখের সামনে তখন মরুভূমি যেন তার স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে বিশ্বাস ফেলতে শুরু করে এবং গতকাল যেখানে বালু আর টুকরো পাথর ছাড়া আর কিছু ছিলো না, আমরা দেখতে পাই, হঠাৎ সেখানে জেগে উঠেছে কচি ফিকে সবুজ ঘাস। আবার মরুভূমির শ্বাস বইতে শুরু করে, আর এক ঝাঁক ছোটো পাখি ডানার আওয়াজ তুলে বাতাসের মধ্য দিয়ে উড়তে আরম্ভ করে। কোত্থেখে এলো, কোথায় যাবে এই ক্ষীণ-দেহ লম্বা ডানাওয়ালা পান্না-সবুজ পাখিগুলি? কিংবা হয়তো এক ঝাঁক পংগপাল হঠাৎ তীব্র বেগে এবং ঝুমঝুম ছেড়ে উঠলো আসমানে, ধূসর এবং ক্ষুধার্ত, যোদ্ধা-বাহিনীর মতো হিংস্র আর অশেষ.. .
প্রাণের প্রকাশ তার রাজকীয় রূপেঃ মরুভূমিতে প্রাণ বিরল বলেই তার রাজকীয় রূপ হামেশাই বিস্ময়কর, সর্বদাই চমকপ্রদ, আর এখানেই নিহিত আছে আরবের এমনিতরো বালুমরু এবং আরো বহু পরিবর্তনশীল ল্যাণ্ডস্কেপের নামহীন সমগ্র সুবাসটুকু!
কখনো কখনো পথে পড়ে লাভা-মৃত্তিকা –কালো এবং অসমতল, কখনো বা বালিয়াড়ি, যার শেষ নেই । কাঁটা ঝোপ-ঢাকা ‘ওয়াদি’ বা উপত্যকা দুই পাথুরে পাহাড়ের মাঝখানে, আর সেই ঝোপ থেকে চকিত ভীত খরগোশ লাফ মেরে আমাদের পথের এক পাশ থেকে আরেক পাশ গিয়ে পড়ছে কখনো কখনো। কখনো-বা পাচ্ছি হরিণের পায়ের দাগ-পড়া শিথিল বালু আর আগুনে কালো হয়ে যাওয়া দু’চারটি পাথর, যার উপর অনেক অনেক আগে, বিস্মৃতির গর্ভে হারিয়ে যাওয়া মুসাফিরেরা, বহু পূর্বে, বিস্মৃত কোনো দিনে তাদের খাবার রেঁধেছিলো। কখনো কখনো চোখে পড়ছে খেজুর-বীথির ছায়া-পড়া কোনো পল্লী, আর কুয়ার উপরে কাঠের চাক্কাগুলি ঘুরছে এবং তাতে করে এক ধরণের সংগীত সৃষ্টি হচ্ছে.. . আর মুসাফিরেরা শুনছে সেই একটানা সংগীত। কখনো কখনো পাচ্ছি মরু –উপত্যকার মাঝখানে একটি কুয়া আর তার চারপাশে বেদুঈন পশু-পালকেরা জটলা পাকাচ্ছে তাদের তৃষ্ণার্ত মেষ এবং উটগুলিকে পানি খাওয়ানোর জন্য। তারা কোরাসে গান গাইতে চামড়ার বড় থলেতে করে পানি তুলছে আর ঝরাৎ করে সেই পানি চামড়ার পাত্রে ঢালার সঙ্গে সঙ্গে পশুগুলির উত্তেজনা চরমে পৌঁছুচ্ছে। তার উপর রয়েছে নিষ্করণ রোদে অভিভূত স্তেপভূমির নির্জনতা, এখানে- ওখানে হলদে ঘাস আর সাপের মতো শাখা ছড়িয়ে মাটির উপর হামাগুড়ি দিয়ে চলা পত্রঘন ঝোপগুলি কোনো কোনো স্থানকে করে তোলে উটের জন্য সাদর চারণ ক্ষেত্র। একটা নিঃসঙ্গ বাবলাজাতীয় বৃক্ষ হয়তো ইস্পাত-নীল আকাশে ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাটির স্তূপ আর পাথরের মাঝখান থেকে ডানে-বাঁয়ে নজর ছুঁড়ে মারতে মারতে বেরিয়ে আসছে সোনালী গিরগিটি, তারপর আবার মিলিয়ে যাচ্ছে একটা ছায়ার মতো, ভৌতিক ব্যাপারের মতো। লোকের বিশ্বাস, এই স্বর্ণ-গিরগিটি কখনো পানি খায় না। দেবে-যাওয়া নিচু জায়গায় দাঁড়িয়ে ছাপ-পশমের কালো কালো তাঁবুগুলি! বিকালের দিকে এক পাল উঢকে হয়তো তাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে ঘরের দিকে আর তরুণ উটের খালি পিঠে চড়েছে পশু-পালকেরা। তারা যখন তাদের পশুগুলিকে ডাকে তখন মরুভূমির নীরবতা যেনো তাদের কন্ঠস্বরকে চুমুক দিয়ে চুষে নেয়, কোন প্রতিধ্বনি না জাগিয়ে সে কন্ঠস্বর হারিয়ে যায় ঐ নীরবতায়।
কখনো কখনো দূর দিগন্তে দেখা যায় ঈষৎ উজ্জ্বল ছায়া-ওগুলি কি মেঘ? ওরা নিচু দিয়ে ভেসে যায়। ঘন ঘন বদলায় তাদের রং আর অবস্থান। এই মুহূর্তে হয়তো দেখাচ্ছে ধূসর তামাটে পাহাড়ের মতো-অবশ্যি শূন্য দিগন্তের কিছুটা উপরে-এবং পরমুহূর্তেই সারা দুনিয়ার কাছে ওরা পাথুরে দেওদারের ছায়াদার বীথিকার রূপ নিচ্ছে-কিন্তু শূন্যে,তারপর ওরা যখন আস্তে আস্তে নিচে নেমে আসে আর হ্রদে এবং বয়ে-চলা নদীতে রূপান্তরিত হয় এবং তাদের হাতছানি দেয়া পানিতে পাহাড় পাহাড় ও গাছপালার প্রতিবিম্ব কাঁপতে থাকে তখন হঠাৎ আপনি চিনতে পারেন ওরা কী! ওরা হচ্ছে জ্বিনের হাতছানি-সেই মরীচিকা যা বারবার মুসাফিরদের মনে মিছে আশা জাগিয়েছে এবং ‘তাতে করে’ ডেকে এনেছে তাদের সর্বনাশ আর অনিচ্ছাকৃতভঅবেই মুসাফিরের হাত তখন আগিয়ে যায় জিনের উপর মশকের দিকে.. .
কোনো কোনো রাত আবার ভিন্নতরো বিপদে পূর্ণ। বিভিন্ন কবিলার মধ্যে তখন যুদ্ধের উত্তেজনা, যুদ্ধের চাঞ্চল্য; মুসাফির তাঁবু খাটায়, কিন্তু আগুন জ্বালে না, যেন দূর থেকে তাদের কেউ দেখতে না পায়। দু’হাঁটুর মধ্যে রাইফেল রেখে ঘন্টার পর ঘন্টা ওরা জেগে থাকে। আর সেই শান্তির দিনগুলি, যখন নিঃসঙ্গ দীর্ঘপথ ঘুরতে ঘুরতে মুসাফির কোনো কাফেলার দেখা পায় আর সন্ধ্যাকলে তাঁবুর আগুনের চারপাশে বসা রোদে-পেড়া গম্ভীর লোকগুলির কথা কান পেতে শোনে-ওরা জিন্দেগী এবং মওতের, ক্ষুধা এবং তৃপ্তির, গর্ব, মহব্বত এবং ঘেন্নার, দেহের লালসা ও সে লালসা নিবৃত্তির, যুদ্ধ এবং সূদূর পল্লীগৃহের খেজুর-বীথিকার সহজ আর বৃহৎ বিষয় সম্বন্ধে আলাপ করে এবং কখনো আপনি শুনবেন না ওরা বাজে বকছে, কারণ মরুভূমিতে কেউ বাজে বকতে পারে না।.. .
আর প্রাণের দাবি আপনার মালুম হবে তৃষ্ণার সে দিনগুলিতে যখন শুকনা এক টুকরা কাঠের মতো জিব লেগে থাকে তালুর সংগে এবং দিগন্ত থেকে মুক্তির কোনো পয়গাম আসে না, বরং তার জায়গায় আসে জ্বলন্ত ‘মরু-সাইমুম’ এবং ঘূর্ণমান বালু-ঝড়ঃ আরো ভিন্নতরো দিনে আপনি হয়তো কোনো বেদুঈন তাঁবুতে মেহমান, পুরুষেরা আপনার জন্য নিয়ে আসবে পাত্র ভর্তি দুধ, বসন্তের শুরুতে মোটা-তাজা উষ্ট্রীর দুধ, যখন ধারা বর্ষনের পর স্তেপ আর বালিয়াড়িগুলি বাগানের মতো সবুজ হয়ে ওঠে, জানোয়ারের উর হয়ে ওঠে সুগোল আর ভারী। তাঁবুর এক পাশ থেকে আপনি শুনতে পাবেন আপনার সম্মানে মেয়েরে খোলা আগুনে ভেড়ার গোশত পাক করছে আর সশব্দে হাসছে।
রক্তিম ধাতুর মতো সূর্য হারিয়ে যায় পাহাড়ের আাড়লে। পৃথিবীর যে কোন স্থানের চাইতে রাতের বেলার তারা ঝিলমিল আকাশ এখানে উচ্ছতরো আর এই তারার নিচে আপনার ঘুম গভীর এবং নিঃস্বপ্ন; সকালগুলি ফিকে ধূসর এবং মৃদু ঠান্ডা, আর শীতল শীতকালের রাতগুলি, হাড় কাঁপানো বাতাস তাঁবুর আগুনের উপর ঝাপটা মারছে, যে আগুনের চারপাশে আপনি আর আপনার সংগীরা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছেন একটুখানি গরমের জন্য। আর গ্রীষ্মের দিনগুলি হচ্ছে অগ্নিঝরা, যখন আপনি চলেছেন আপনার হেলতে-দুলতে চলা উটের পিঠের উপর বসে, ঘন্টার পর ঘন্টা যেন অনন্তকাল ধরে আপনি চলেছেন; ঝলসানো বাতাস থেকে বাঁচানোর জন্য আপনার মুখ আপনার অনেক-অনেক উপরে একটি শিখারী পাখি চক্রাকারে ঘুরছে, চক্কর খাচ্ছে.. .
দুই
ধীরে ধীরে বিকাল গড়িয়ে যায় তার বালিয়াড়ি, তার নীরবতা আর তার নিঃসংগতা নিয়ে। কিছুক্ষণ পর নির্জনতা ভাঙে একদল বেদুঈন। ওরা চার কি পাঁচজন পুরুষ আর দু’জন মেয়ে। সবাই উটের উপর সওয়ার। আর একটি ভারবাহী জানোয়ারের পিঠে ওদের ভাঁজ করা কালো তাঁবু, বাসন-কোসন এবং বেদুঈন জীবনের অন্য সব তৈজসপত্র। আসবাবপত্রের স্তূপের উপর বসে আছে দু’টি শিশু। দলটি আমাদের পথ অতিক্রম করছিলো। আমাদের একদম কাছাকাছি এসে পড়ারপর ওরা ওদের জানোয়ারগুলির লাগাম টেনে ধরে বলেঃ
-‘আস-সালামু আলাইকুম-তোমাদের উপর শান্তি বার্ষিত হোক।’ আমরা জবাব দিই-‘এবং তোমাদের উপরও শান্তি বর্ষিত হোক আর বর্ষিত হোক তাঁর আশিস।’
-‘তোমরা কোথায় যাচ্ছ মুসাফির?’
-‘ইনশাআল্লাহ, তায়েমা।
-‘তোমরা আসছো কোত্থেকে?’
-‘কসর – আসাইমিন থেকে’, জবাব দিই আমি। তারপর সব চুপচাপ। এদের মধ্যে একজন লোক বয়স্ক, সে রোগাটে, তার মুখমন্ডল ধারালো আর তীক্ষ্ণ এবং দাড়ি কালো আর সূঁচালো। সে যে এদের নেতা তাতে সন্দেহ নেই। তার নজর আরো ধারালো ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো যখন তা জায়েদের উপর থেকে এসে সন্দেহজনকভাবে স্থির হরো আমার উপর-রং যার ফরসা এমন একজন বিদেশী আমি। এই পথহীন ঊষর প্রান্তরে হঠাৎ আমি আবির্ভূত হয়েছি শূণ্য থেকে, অপ্রত্যাশিত-আমি ব্রিটিশ দখলভূক্ত ইরাকের দিক থেকে আসছি। হতে পারে আমি একজন (সে তীক্ষ্ণ মুখওয়ালা লোকটির হাত যেনো হতবুদ্ধি হয়েই তার জিনের সম্মুখভাগটি নিয়ে খেলা করছে। আর একক্ষণে আমদের চারপাশ তার সংগীরা ফাঁক ফাঁক হয়ে অপেক্ষা করছে। কথা তো দলের সরদার হিসাবে ও-ই করবে। কয়েকটি মুহূর্ত পর, মনে হলো,সে যেন আর এ নীরবতা বরদাশত করতে পারছে না,আমাকে সে জিজ্ঞেস করেঃ
-‘কোন আরবদের লোক তুমি?’ – অর্থাৎ আমি কোন কওম বা এলাকার ও জানতে চায়। কিন্তু আমি জবাব দিয়ে ওঠার আগেই আমাকে চিনতে পেরে আচমকা হাসিতে তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে।
-‘ওহ, এখন তোমাকে চিনতে পারছি। আবদুল আজীজের সংগে তোমাকে দেখেছি। কিন্তু সে তো অনেকদিন-পুরা চার বছর আগের কথা, তাই না?’
সে তার বন্ধত্বভরা হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে। তারপর বলে সেই সময়ের কথা, যখন আমি বাস করছিলাম রিয়াদের শাহী কিল্লায়-আর সে এসেছিলো শাম্মার খান্দানের এক সরদারদলের সংগে, ইবনে সউদের কবিলাকে শ্রদ্ধা জানাতে। ইবনে সউদকে বেদুঈনেরা সবসময় তাঁর পয়লা নাম ‘আব্দুল আজীজ’ বলে ডাকে। আনুষ্ঠানিক সম্মানসূচক কোনো খেতাব তারা যোগ করে না তাঁর নামের সংগে, কারন বেদুঈনেরা মুক্ত মানুষ। বাদশাহকে তারা শুধু একজন মানুষ বলেই জানে-বেশক তিনি সম্মানের পাত্র, কিন্তু মানুষ যতোটুকুর যোগ্য তার বেশি নয়। এমনিভাবে আমরা কিছুক্ষণ সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলিকে স্মৃতির সাহয্যে জীবন্ত করে তুলি, হয় এর কথা না হয় ওর কথা বলি। আর রিয়াদ সম্পর্কে ও এক কাহিনী বলে তো আমি আর এক কাহিনী-সেই রিয়াদ, যার ভেতরে ও বাইরে রোজ হাজার মেহমান বাদশাহর খরচে বাস করে আর যাবার সময় ওরা পায় ইনাম-প্রত্যেক ব্যক্তির ইজ্জত অনুসারে-এক মুঠা রূপার মুদ্রা বা একটা ‘আবায়া’ থেকে শুরু করে সোনার মোহর ভর্তি থলে, ঘোড়া অথবা উট যা বাদশাহ প্রায়ই দিয়ে থাকেন সরদারদেরকে।
কিন্তু বাদশাহর এই মাহনুভতা অর্থের যতোটা না তার চাইতে ঢের বেশি তাঁর হৃদয়ের। হয়তো সবার উপরে তাঁর হৃদয়ানুভূতির এই উষ্ণতার জন্যই চারপাশে সবাই তাঁকে ভালবাসে এবং আমিও ভালবাসি।
আরবে যে বছরগুলি আমি কাটিয়েছি ইবনে সউদের বন্ধত্ব যেন একটা ঊষ্ণ আলোর দীপ্তির মতো সবসময়েই ছড়িয়েছিলো আমার জীবনের উপর। তিনি আমাকে বন্ধু বলে ডাকেন যদিও তিনি একজন বাদশাহ আর আমি একজন সাংবাদিক মাত্র। তাঁর রাজ্যে আমি যে –বছরগুলি কাটিয়েছে সেই বছরগুলিতে সবসময়ে আমি তাঁর বন্ধুত্ব দেদারছে পেয়েছি বলেই যে আমি তাঁকে ভালবাসি, তা নয়। কারণ বন্ধুত্ব তিনি বহু মানুষকেই বিতরণ করেন। আমি তাঁকে আমার বন্ধু বলে ডাকি, কারণ বহু মানুষের মধ্যে যেমন তাঁর টাকার থলে মেলে ধরেন, তেমনি তিনি কখনো কখনো তাঁর হৃদয়েকে মেলে ধরেন আমার কাছে। আমি তাঁকে আমার বন্ধু বলতে ভালোবাসি, কারণ তাঁর সকল দোষক্রটি সত্ত্বে ও আর দোষক্রটি কারই বা না আছে- তিনি একজন অতিশয় মহৎ ব্যক্তি; ঠিক ‘দয়ালু’ নন, কারণ দয়ালুতা কোন কোন সময় একা সস্তা চিজ হয়ে উঠতে পারে। একটা পুরানো দামেস্ক-তরবারী দেখে যেমন আপনি মুগ্ধ বিস্ময়ে বলেন, হ্যাঁ, এ একটা ‘উৎকৃষ্ট’ হাতিয়ার বটে, কারন, এ ধরনের একটি অস্ত্রে আপনি যা-কিছু চান সবই আছে, ঠিক তেমনিভাবে আমি ইবনে সউদকে একজন মহৎ ব্যক্তি বলে মনে করি। তিনি নিজের মধ্যে সমাহিত এবং সবসময় নিজের পথে চলেন এবং তিনি যদি তাঁর কাজে-কর্মে প্রায়ই ভুলও করেন, তারও কারণ তিনি নিজে যা তা’ছাড়া আর কিছুই কখনো তিনি হতে চান না।
বাদশাহ আব্দুল আজীজের সাথে আমার প্রথম মুলাকাত হয় মক্কায়, ১৯২৭ ইংরেজীর প্রথমদিকে, আমার ইসলাম গ্রহনের কয়েক মাস পরেই।
আমার-স্ত্রী-যিনি মক্কায় আমার এই প্রথম হ্জ্জ্ব-যাত্রায় আমার সংগিনী ছিলেন-সম্প্রতি তাঁর আকস্মিক ইন্তেকাল আমাকে করে তুলেছিলো বিষণ্ণ; আমি অসামাজিক হয়ে উঠেছিলাম। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছিলাম অন্ধকার থেকে, চরম নৈরাশ্য থেকে মুক্তি পাবার জন্য। বেশির ভাগ সময় আমি আমার ঘরেই কাটাচ্ছিলাম। এ সময়ে আমার সম্পর্ক ছিলো মাত্র গুটিকয়েক লোকের সাথে এবং বাদশাহর সাথে প্রথামতো সৌজন্যমূলক মূলাকাতও এড়িয়ে যাচ্ছিলাম কয়েক হপ্তা ধ’রে। তারপর, একদিন বাদশাহ ইবনে সউদের একজন বিদেশী মেহমান –ইন্দোনেশিয়ার হাজী আজোস সলিমের সাথে মুলাকাত করতে গিয়েই জানতে পারলাম, বাদশাহর হুকুমে আমার নামও তাঁর মেহমানদের তালিকায় তোলা হয়ে গেছে। মনে হয়, তিনি আমার নীরবতার কারণ জানতে পেরেছিলেন এবং নীরব সহৃদয়তার সংগে তা তিনি গ্রহণ করেছিলেন। এভাবে একজন মেহমান হিসাবে –যে-মেহমানের আজ পর্যন্ত একবারের জন্য ও তাঁর মেহমানদারের মুখ দেখার নসিব হয়নি, আমি মক্কার দক্ষিণ প্রান্তে, শিলাময় গিরি-সংকটের নিকটে একটি সুন্দর বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। এই গিরি-সংকটের মধ্য দিয়েই রাস্তা চলে গেছে ইয়েমেনের দিকে। চত্বর থেকে আমি নগরীর একটি বড় অংশ দেখতে পাচ্ছিলাম-মসজিদুল কুবরার মীনার, রঙিন ইঁটের ছাদবিশিষ্ট হাজার হাজার গৃহের সারি এবং নিষ্প্রাণ মরু-পাহাড়, যার উপর গম্বুজের মতো রয়েছে আকাশ, তরল ধাতুর মতো ঝলসানো আকাশ।
তবু, বাদশাহর সাথ আমার মুলাকাত হয়তো আমি মুলতবিই রেখে দিতাম যদি না মসজিদুল কুবরার বারান্দায়, একটা বই-ঘরে, ঘটনাক্রমে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র আমীর ফয়সারের সাথে আমার দেখা হতো। পুরানো আরবী, ফারসী এবং তুর্কী পুঁথি-পান্ডুলিপিতে পরিবেষ্টিত হয়ে সেই দীর্ঘ সংকীর্ণ কামরাটিতে বসা ছিলো একটা আনান্দের ব্যাপার; কামরাটির নিশ্চলতা ও অন্ধকার আমাকে ভরে দিতো এক অপূর্ব শান্তিতে। অবশ্যি, একদিন এই স্বাভাবিক নীরবতা একদল মানুষের সশব্দ উপস্থিতিতে ভেংগে গেলো। দলটির আগে আগে ছিলো সশস্ত্র দেহরক্ষীরা। আমীর ফয়সাল তাঁর সাংগ-পাংগ নিয়ে বই-ঘরের মধ্যে দিয়ে কাঁবায় যাচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন লম্বা আর হ্যাংলা এবং তাঁর বয়স ও দাড়িশূণ্য মুখখানার তুলনায় অনেক-অনেক বেশি মর্যাদাবান। তাঁর বয়স অল্প হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পিতা দু’বছর আগে তাঁর হিজায জয়ের পর পরই তাঁকে হিজাযে বাদশাহর প্রতিনিধির গুরুদায়িত্ব দিয়েছিলেন (নজদে বাদশাহর প্রতিনিধি ছিলেন ফয়সালের বড়ো ভাই শাহযাদা সউদ-যদিও বাদশাহ নিজে বছরের অর্ধেকটা কাটাতেন হিজাযের রাজধানী মক্কায় আর বাকী সময়টা কাটাতেন নজদের রাজধানী রিয়াদে)।
বই-ঘরের পরিচালকটি ছিলেন মক্কার একজন তরুণ পন্ডিত। তাঁর সংগে কিছুকাল ধরে আমার দোস্তী। শাহযাদার সংগে তিনি আমার পরিচয় করিয়ে দেন।
ফয়সল আমার সাথে হাত মেলালেন এবং আমি যখন তাঁর দিকে মাথা নিচু করলাম, তিনি আঙুলের ডগায় আলতো করে আমার মাথাটা একটু পেছনদিকে ঠেলে দিলেন; তাঁর মুখ হৃদ্যতাময় স্মিত হাস্যে দীপ্ত হলো।
তিনি বললেন- ‘আমরা, নজদের মানুষেরা, বিশ্বাস করি না যে, এক মানুষ আরেক মানুষের নিকট মাথা নোয়াবে! সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে শুধু আল্লাহরই নিকট সে নোয়াবে মাথা।
শাহযাদাকে দয়ালু, স্বাপ্নিক এবং কিছুটা গম্ভীর ও লাজুক বলে মনে হলো। তাঁর সম্পর্কে আমার এ ধরণা আমাদের পরিচয়ের শেষ বছরগুলোতে আরো দৃঢ়মূল হয়। তাঁর ভাবভংগির আভিজাত্য কৃত্রিম নয়, এ যেন তাঁর ভেতর থেকে ঠিকরে পড়ছে, বিকিরিত হচ্ছে। সেদিন আমরা দু’জনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ আমার একটা তীব্য ইচ্ছা হলো, এই পুত্রের পিতার সাথে মুলাকাতের।
-‘বাদশাহ আপনাকে দেখলে খুশিই হবেন’, আমীর ফয়সল বললেন, ‘আপনি তাঁকে এড়িয়ে চলছেন কেন?’
‘পরদিন আমীরের সেক্রেটারী আমাকে একটা মোটরে করে নিয়ে গেলেন বাদশাহর প্রাসাদে। আমরা যাচ্ছি আল-মা’আলার বাজারের রাস্তা দিয়ে, যাচ্ছি ধীরে ধীরে –উট, বেদুঈন ও নিলামদারদের হট্টগোলে ভিড়ের মধ্য দিয়ে। নিলামদাররা বিক্রি করছে বেদুঈনদের দরকারী সমস্ত জিনিস-উটের জিন, আবায়া, গালিচা রূপার কাজ করা তরবারি, তাঁবু পিতলের তৈরি কফি –পাত্র। এদেরকে ছাড়িয়ে আমরা বের হলাম এক প্রশস্ততরো, নীরবতা ও অধিক খোলা রাস্তায়, এবং আখেরে গিয়ে পৌঁছলাম বাদশাহ যেখানে থাকেন সেই বিশাল প্রাসাদে। প্রাসাদের সামনেকার খোলা জায়গাটি জিন-আঁটা উটে গিজগিজ করছে এবং কয়েকজন সশস্ত্র খিলানওয়ালা কামরায়, যার মেঝেতে ছিলো কম-দামী গালিচা বিছানো, দেয়াল ঘেঁষে ছিলো খাকী কাপড়ে ঢাকা সুদীর্ঘ দীওয়ান এবং জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিলো সবুজ পাতাঃ এ হচ্ছে একটি বাগিচার শুরু, যা মক্কার মাটিতে অতি কষ্টের সাথে ফলানো হচ্ছিলো।
এক কৃষ্ণাংগ বান্দা এসে হাযির হলো-‘বাদশাহ আপনাকে দাওয়াত করেছেন।’
যে কামরা থেকে আমি এই মাত্র বের হয়ে এলাম তেমনি একটি কামরায় ঢুকলাম। তফাৎ এই যে, কামরাটি ছোটো এবং হালকা, তবে এর একটা দিক বাগিচার দিকে সম্পূর্ণ খোলা। দামী ইরানী গালিচায় মেঝে; বাগিচার দিকে খোলা একটা ঘুলঘুলি-জানালায় দীওয়ানের উপর বাদশাহ বসেছিলেন পায়ের উপর পা রেখে। তাঁর পায়ের কাছেই মেঝের উপর বসে সেক্রেটারী তাঁর ডিকটেশন নিচ্ছিলেন। আমি যখন ঢুকলাম, বাদশাহ দাঁড়িয়ে গেলেন, তারপর দু’হাত বাড়িয়ে বললেনঃ ‘আহলান ওয়া সাহলান’- ‘এ আপনারই ঘর,সহজ হোন।’
এ অভ্যর্থনার অর্থ ‘আপনি এখন আপনার নিজ পরিবারে প্রবেশ করেছেন; আপনি যেন আপনার আসন এখন সহজ জায়গার উপর রাখতে পারেন’ঃ খোশ-আপদেদ জানানোর এই প্রকাশ-ভংগিটি হচ্ছে সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে সুন্দর আরবীয় প্রথা।
মুহূর্তের জন্য সবিস্ময়ে আমি তাকাই বাদশাহ ইবনে সউদের বিশাল উচ্চতার দিকে। যখন (ততোদিনে আমি নজদী রীতির সাথে পরিচিতি হয়ে উঠেছি) আমি আলতো করে তাঁর নাকের ডগা ও কপালে চুমু খেলাম, আমার উচ্চতা ছয় ফুট হওয়া সত্ত্বেও আমাকে পায়ের আঙ্গুলে ভর করে দাঁড়াতে হলো, আর বাদশাহকে মাথা নিচু করে ঝুঁকে পড়তে হলো আমার দিকে। তারপর তাঁর সেক্রেটারীর প্রতি একটি কৈফিয়তের দৃষ্টি হেনে তিনি বসে পড়লেন দীওয়ানে, আর আমাকে তাঁর পাশেই বসিয়ে দিলেনঃ
-‘একটি মিনিট, চিঠিখান শেষ হলো বলে।’
যখন তিনি শান্তভাবে ডিকটেশন দিয়ে যাচ্ছিলেন তখনি তিনি আমার সাথে আলপও শুরু করছিলেন-অথচ দু’বিষয়ের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে গেলো না একটিবারও। কয়েকটি আনুষ্ঠানিক বাক্যের পর আমি তাঁর হাতে একটি পরিচয়পত্র দিলাম। তিনি তা পড়লেন, অর্থাৎ একইসংগে তিনটি কাজ তিনি করে চললেন, এবং তারপর, ডিকটেশন বন্ধ না ক’রে অথবা আমার ভালোমন্দের খবর নেয়া না থামিয়ে তিনি হুকুম দিলেন কফির জন্য।
ইতিমধ্যে আমি তাঁকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে দেখবার সুযোগ পেলাম। তাঁর দেহ এতো সুগঠিত এবং অংঘ –প্রত্যংগের বিন্যাস এতো পরিমিত যে তাঁর বিশাল দেহ-তিনি কমপক্ষে সাড়ে ছয় ফুট নিশ্চয় হবেন-শুধু তখনি ধরা পড়ে যখন তিনি দাঁড়ান। চিরাচরিত নীল –শাদা চেক ‘কুফিয়া’য় ঘেরা এবং জরীর কাজ-করা ‘ইগাল’ মাথায় তাঁর মুখমন্ডল তীব্র পৌরুষব্যঞ্জক। নজদী ফ্যাশন অনুযায়ী তিনি তাঁর দাড়ি ও গোঁফ ছেঁটে ছোটো করে রাখেন। তাঁর কপাল প্রশস্ত, নাক মজবুত আর উন্নত, ঈগল পাখীর ঠোঁটের মতো; তাঁর পূর্ণ মুখ, মোলায়েম না হয়েও ইন্দ্রিয়জ লাজুকতায় কখনো কখনো একেবারেই নারীসুলভ মনে হতো। যখন তিনি কথা বলেন তাঁর চেহারা মুখের পেশীর অস্বাভাবিক গতিময়তার জীবন্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু যখন তিনি চুপ করেন তখন তাঁর মুখখানাকে কেমন যেন করুণ মনে হয়-যেন তিনি তাঁর অন্তরের একাকীত্বে আবার ফিরে গেছেন। বাদশাহর চোখ দুটির গভীর অবস্থান এর জন্য কিছুটা দায়ী হতে পারে। তাঁর বাঁ-চোখের ঝাপসা দৃষ্টি তাঁর মুখমন্ডলের পরম সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ করেছে খানিকটা! একটা পর্দা দেখা যাচ্ছিলো বাদশাহর চোখটিতে। পরে তাঁর এই কষ্টের কাহিনী আমি জানতে পেরেছিলাম, যদিও বেশির ভাগ লোকই না জেনে বলতো বাদশাহর বাঁ- চোখটি আপনিতেই এমনটি হয়েছে; আসলে কিন্তু ব্যাপারটি ঘটেছিলো একটি দুঃখজনক অবস্থায়।
ক’বছর আগে, তাঁর বেগমদেরই একজন, বাদশাহকে মেরে ফেলার প্রকাশ্যে মতলবে বাদশাহর প্রতিদ্বন্দ্বী ইবনের রশিদের খানদানের প্ররোচনায় আতরদানিতে বিষ ঢেলে দিয়েছিলো। এ ধরণের পিতলের তৈরি আতরদানি নজদে আনুষ্ঠানিক মজলিসে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রথামতো, আতরদানিটি বাদশাহর মেহমানদের সামনে রাখার পূর্বে প্রথমে তা দেয়া হয় বাদশাহকে। প্রথমবার গন্ধ নিয়েই ইবনে সউদ টের পান গন্ধটা যেন কেমন বিদঘুটে লাগছে- সংগে সংগেই তিনি আতরদানিটি নিক্ষেপ করেন মেঝের উপর। তাঁর সতর্কতায় তাঁর জান বেঁচে গেলো, কিন্তু তার আগেই তাঁর বাঁ –চোখ আহত ও কিছুটা অন্ধ হয়ে পড়লো। তাঁর অবস্থায় বহু রাজ –বাদশাহ নিশ্চিতভাবেই এর বদলা নিতেন; কিন্তু ইবনে সউদ বিশ্বাসঘাতিনী নারীর উপর বদলা না নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন-কারণ, তিনি স্থির নিশ্চিত ছিলেন যে, নারীটি তার আপন পরিবারের অনিবার্য প্রভাবেই এ কাজ করোছে, যেহেতু রশিদের পরিবারের সাথে সম্পর্কিত ছিলো এ নারীর পরিবার। তিনি শুধু তাকে তালাক দিলেন, তারপর প্রচুর সোনরূপা ও ইনামসহ তাকে পাঠিয়ে দেন ‘হইলে’, তার আপন বাড়িতে।
সেই পয়লা মুলাকাতের পর বাদশাহ প্রায় রোজই আমাকে ডেকে পাঠাতে লাগলেন। এক সকালে আমি তাঁর কাছে গেলাম একটি ইচ্ছা নিয়ে। বেশি আশা করিনি যে তা মঞ্জুর হবে, কারণ, আমি অনুমতি চেয়েছিলাম দেশের ভেতরে সফর করার, অথচ বাদশাহ সাধারণ বিদেশীদেরকে নজদ সফরের এজাজত দেন না। সে যা-ই হোক, আমি যখন প্রস্তাবটি তুলি-তুলি করছি বাদশাহ হঠাৎ আমার প্রতি একটা সংক্ষিপত্ত অথচ তীব্র দৃষ্টি হানলেন; এ এমন এক দৃষ্টি যে, মনে হলো তা আমার অনুক্ত ভাবনা-চিন্তার একেবারে মর্মে গিয়ে প্রবেশ করেছে; বাদশাহ স্মিত হাসলেন, তারপর বললেন-‘ও মুহাম্মদ তুমি কি আমার সংগে নজদ আসবে না, এবং মাস কতক রিয়াদে থাকবে না?’
আমি একেবারে অবাক হয়ে গেলাম এবং আর যাঁরা ওখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁদের অবস্থাও হুবহু আমারই মতো মনে হলো। কোনো বিদেশীর প্রতি এমন স্বতস্ফূর্ত দাওয়াত প্রায় অশ্রুতপূর্ব ব্যাপার।
তিনি বলে চললেন, ‘আমি চাই যে, আসছে মাসে তুমি আমার সাথে মোটরে সফর করবে।
আমি বুক ভরে দম নিলাম এবং তারপর বললাম, ‘হে ইমাম, আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন। তবে মোটরে সফর করে আমার কি ফায়দা হবে? পাঁছ-ছ’দিনে মক্কা থেকে রিয়াদ ছুটে গিয়ে কি লাভ হবে আমার যদি না আমি আপনার দেশের কিছুই দেখতে পেলাম… মরুভূমি, কিছু বালিয়াড়ি এবং দিগন্তের ধারে কোথাও কিছু মানষ, ছায়ার মতো কিছু মানুষ ছাড়া? আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন, আপনার সকল মোটরের চাইতে একটি উটই হবে আমার জন্য বেশি উপযোগী!
ইবনে সউদ হাসলেনঃ ‘তোমার কি তাহলে আমার বদুদের চোখে চোখে তাকাবার লোভ হয়েছে? আমি তোমাকে আগে থেকেই হুঁশিয়ার করে দিচ্ছিঃ ওরা বড় অনুন্নত। আর আমার নজদ হচ্ছে মরুভূমি, এর কোন আকর্ষণই নেই; এ সফরে উটের জিন শক্ত মালুম হবে আর খাবার হবে দুষ্প্রাপ্য; ভাত, খেজুর এবং কচিৎ কখনো গোশত ছাড়া আর কিছু মিলবে না। কিন্তু তা যা-ই হোক, তুমি যদি উটে চড়েই সফর করতে চাও, তা-ই হবে এবং শেষতক এ-ও হতে পারে যে, আমার কওমকে চেনার পর তুমি আফসোস করবে নাঃ তারা গরীব, তারা কিছুই জানে না, তারা কিছুই নয়, কিন্তু তাদের হৃদয় সরল বিশ্বাসে পূর্ণ।’
এবং এর কয়েক হপ্তা পরেই একটি ঘুরতি পথে আমি বার হয়ে পড়ি রিয়াদের দিকে; সফরের সম্বলস্বরূপ বাদশাহ দিলেন উট, খাদ্যসম্ভার, একটি তাঁবু ও একজন হাদী বা পদ-প্রদর্শক। রিয়াদে পৌঁছুতে আমার লাগলো দু’মাসেরও বেশি। এ-ই ছিলো আররের অভ্যন্তরে আমার পহেলা সফর, -আমার বহু সফরের মধ্যে প্রথম। কারণ বাদশাহ যে অল্প ক’মাসের কথা বলেছিলেন, সেই ক’মাসই গড়িয়ে গিয়ে ক’য়েক বছরে দাঁড়িয়ে গেলো, কত সহজেই না কয়েক বছর হয়ে উঠলো-যে বছরগুলি আমি শুধু রিয়াদে নয়, আরবের প্রায় প্রত্যেক এলাকাতেই ঘুরে বেড়িয়েছি এবং উটের জিন এখন আর কঠিন মালুম হয় না!
‘আল্লাহ আবুদল আজীজকে দীর্ঘজীবী করুন,’ বললো তীক্ষ্ণমুখো লোকটি,- ‘তিনি ‘বদু’কে ভালোবাসেন এবং ‘বদুরা’ তাঁকে ভালোবাসে!’ আর কেনই বা তারা ভালোবাসবে না?- আমি নিজেকে শুধাই। নজদের বেদুঈনদের প্রতি বাদশাহ মুক্তহস্ত এবং তাঁর এই সাহায্য তাঁর হুকুমতের একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। হয়তো খুব প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য নয়, কারণ বাদশাহ বিভিন্ন কাবিলার সর্দারদের ও তাদের অনুগতদের মদ্যে নিয়মিত যে –সব অর্থ- উপহার বিতরণ করেন তার ফলে তারা বাদশাহর ইনামের উপর এতোটা নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে যে, তারা নিজের চেষ্টায় নিজেদের জীবনের অবস্থা উন্নত করার উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেছে এবং ক্রমে ক্রমে তারা হয়ে উঠেছে খয়রাত –ভোজী –জাহিল এবং অলস থাকতেই খুশি।
তীক্ষ্ণমুখোর সংগে আমার আলাপের আগাগোড়া আমি লক্ষ্য করলাম-জায়েদ যেন কিছুটা অধৈর্য হয়ে উঠেছেঅ। সে যখন ওদের একজনের সংগে কথা বলছে তখনি ঘন ঘন তার চোখ রাখছে আমার উপর, যেনো সে দৃষ্টি আমাকে ইয়াদ করিয়ে দিতে চাইছে-এখনো দূর –দরাজ পথ রয়েছে আমাদের সামনে এবং পুরানো স্মৃতির রোমন্থন, ফেলে আসা অতীতের চিন্তা-ভাবনা উটের গতিকে ত্বরান্বিত করে না। আমরা বিদায় নিই। শাম্মার বেদুঈনেরা উট হাঁকিয়ে পূর্ব মুখে আগাতে থাকে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বালিয়াড়ির আাড়লে হারিয়ে যায়। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকেই আমরা শুনতে পাই-ওদের একজন একটা যাযাবরী সুর ধরেছে-এমন গান, যা উট তাঁর সওয়ারীর গতি বাড়ানোর জন্য এবং উটে চড়ে চলার একঘেঁয়েমি দূর করার জন্য গেয়ে থাকি এবং জায়েদ আর আমি আবার আমাদের পশ্চিম মুখো পথ ধরি সুদূর তায়েমার দিকে, তখন সে সুরটি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায় আমদের পেছনে এবং নীরবতা আবার ফিরে আসে।
তিন
-‘দেখুন, দেখুন,’ জায়েদের গলার স্বর নীরবতা ভাঙে,-‘একটি খরগোশ!
একটি ঝোপ থেকে এইমাত্র ধূসর পশমের যে বান্ডিলটি লাফ দিয়ে বের হলো আমি তার দিকে তাকাই আর জায়েদ পিছলে নেমে পড়ে তার জিন থেকে, জিনের আগা থেকে যে কাঠের ডাণ্ডাটি ঝুলে থাকে তাই খুলে নিয়ে। সে খরগোশটির পেছনে লাফিয়ে পড়ে এবং ছুঁড়তে যাবে অমনি তার পা আটকে যায় একটি ‘হামদে’র শিকড়ে, সে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় মুখের উপর-আর খরগোশটি চোখের আড়ালে গায়েব হয়ে যায়।
-‘একটা চমৎকার খাবার হারালাম বটে’, আমি জায়েদের দিকে তাকিয়ে হাসি। জায়েদ নিজে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, তার নিজের হাতের ডাণ্ডাটি দিকে অনুশোচনা –মেশানো দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে।
-‘কিন্তু এজন্য দুঃখ করো না, জায়েদ, খরগোশটি আলবৎ আমাদের কিসমতে ছিলো না।..
-‘না, আমাদের কিসমতে ওটি ছিলো না-কিছুটা আনমনা হয়ে সে জবা দেয়। তারপর দেখি কি-ও কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।
-‘তুমি কি আঘাত পেয়েছ, জায়েদ?’
-‘ওহ কিচ্ছুনা। শুধু আমার গোড়ালিটা মচকে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেরে যাবে।
কিন্তু সত্যি সে সেরে উঠলো না। জিনের পর বসে আরো ঘন্টাখানেক চলার পর আমি জায়েদের মুখে কিছু ঘাম দেখতে পাই এবং তার পায়ের দিকে যখন একবার তাকালাম-দেখতে পেলাম-তার গোড়ালিটি একদম মচকে গেছে এবং ভয়ানক ফুলেও উঠেছে।
-‘এভাবে চলার কোনো মানে নেই জায়েদ, চলো, আজ আমরা এখানেই তাঁবু খাটাই। এক রাতের বিশ্রামে তুমি সেরে যাবে।
জায়েদ সারারাত ছটফট করে যন্ত্রণায়। সুবহে সাদেকের অনেক আগেই সে উঠে পড়ে আর তার হঠাৎ চাঞ্চল্য আমাকেও জাগিয়ে দেয় আমার অস্বস্তিকর ঘুম থেকে।
-শুধ একটি উটই দেখতে পাচ্ছি, সে বলে, তারপর, আমরা চারদিকে তাকিয়ে আবিষ্কার করি, জানোয়ার দু’টির একটি- জায়েদের উটটিই গায়েব হয়ে গেছে। আমার উট চড়ে জয়েদ তার উটের খোঁজে বার হতে চায়-কিন্তু তার পয়ের জখমের জন্য দাঁড়ানোই তারপক্ষে কঠিন; হাঁটা আর উটে চড়া এবং উট থেকে নামার তো কথাই ওঠে না।
-তুমি বরং আরাম করো জায়েদ, -তোমার বদলে আমি যাচ্ছি, আমি যে পথে যাবো সেই পথ ধরে আবার ফিরে আসা আমার পক্ষে কঠিন হবে না।
এবং সূর্যোদয়ের সাথে সাথে আমি হারানো উটটির পায়ের নিশানা ধরে বের হয়ে পড়ি আমার উটে চটে; পায়ের দাগ আগিয়ে যায় বালু-উপত্যকার মধ্য দিয়ে একেবেঁকে, তারপর তা হারিয়ে গেলো বালিয়াড়ির আড়ালে।
আমি এক ঘন্টা চলি-তারপর আরেক ঘন্টা, তারপরও এক ঘন্টা; কিন্তু হারিয়ে যাওয়া জানোয়ারটির পদচিহ্ণ অনেক দূর গড়িয়ে যায় যখন আমি কিছুক্ষণের জন্য উট থেকে নামি-কয়েকটা খেজুর আর উটের সংগে বাঁধা মশক থেকে কিছু পানি খাই। সূর্য অনেক উপরে। কিন্তু কেন জানি, ওর চোখ ঝলসানো দীপ্তি এখন আর নেই। বছরের এই সময়ে সচরাচর যা ঘটে না, পিঙলবর্ণ মেঘ নিশ্চল ভাসছে আসমানের নিচে; এক বিস্ময়কর পুরু এবং ভারী বাতাস মরুভূমির বুকে চেপে আছে আর বালিয়াড়ির রূপরেখা, সাধারণত যেমন মোলায়েম হয়ে থাকে তার চাইতে সেগুলেকে অনেক অনেক বেশি স্নিগ্ধ করে তুলেছে।
আমার সম্মুখে উঁচু বালু পাহাড়ের চূড়ায় একটা অদ্ভূদ আন্দোলন আমর দৃষ্টি আকর্ষণ করে-ওটি একটি জানোয়ার? হয়তো হারানো উটটি! কিন্তু আরো মনোযোগ দিয়ে তাকালে পরে দেখতে পাই – আন্দোলনটি চূড়ার উপরে নয়-চূড়ারই মধ্যে । চূড়াটি চলতে শুরু করেছে খুব ধীরে, বিরাম না নিয়ে হালকাভাবে চলছে, অস্পষ্ট ঢেউ-খেলানো লহরী তুলে চলছে সামনের দিকে-তারপর মনে হলো ঢালু বেয়ে আমার দিকে গড়িয়ে পড়ছে-আস্তে আস্তে গড়িয়ে পড়া একট ঢেউ-এর মাথার চূড়ার মতো। বালিয়াড়ির ওপাশ থেকে একটা গাঢ় রক্তিমতা লতিয়ে ওটে আসমানের দিকে। এই রক্তিমতার নিচে, বালিয়াড়ির রেখাগুলির তাদের তীক্ষ্ণতা হারিয়ে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে-যেনো হঠাৎ একটা যবনিকা টেনে দেয়া হয়েছে মাঝখানে; লালাভ এক ফিকে উদয়-রশ্নি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মরুভূমির উপর। বালু-মেঘ আমার মুখের উপর ও চারপাশে ঘুরপাক খেতে শুরু করে এবং সহসা বাতাস প্রচন্ড আঘাতে উপত্যকাটিকে ছেদ করে, ভেদ ক’রে ছিন্নভিন্ন করে চারিদিক থেকে শুরু করেলো গর্জন। প্রথম পাহাড়-চূড়াটির মতোই আমার দৃষ্টির ভেতরকার সকল বালু-পাহাড়ের চূড়াই বিন্দু বিন্দু হয়ে ঝুরে ঝুরে গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আসমান একটি গভীর মরচে কাটা রং ধারণ করে এবং বাতাস ভরে ওঠে ঘূর্ণমান বালুকণায়, যা লালাভ ঘন কুয়াশার মতো সূর্য এবং দিবস, দুটিকেই ঢেকে দেয়। এ যে ধূলিঝড় এতে কোনোই সন্দেহ নেই!
হামাগুড়ি দিয়ে বসা উটটি আতংকে উঠে দাঁড়াতে চায়। বাতাস ততোক্ষণে ঝড়ের রূপ নিয়েছে। বাতাসের মধ্যে নিজেকে সোজা করে রাখার চেষ্টা করি এবং উটটির গলায় দড়ি বেঁধে বসিয়ে দিই; উটটির সামনের পা দু’টি আমি রশি দিয়ে বাঁধি এবং আরও নিশ্চয়তার জন্য ওর পেছনের একটি পা-ও। এরপর আমি নিজে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ি মাটির উপর এবং আমার মাথার উপর ‘আবায়া’টি টেনে দিই। উড়ন্ত বালুতে যাতে শ্বস রোধ না হয় সেজন্য আমি উটটির বগলে আমার মুখ চেপে ধরি। আমি টের পাই, জানোয়ারটিও তার মুখ চেপে ধরেছে আমার কাঁধের উপর, সন্দেহ নেই; এ কারনে আমি অনুভব করি- আমার যে দিকটায় উটের শরীরের আড়াল নেই । সে দিক থেকে বালু স্তূপীকৃত হচ্ছে আমার উপর;বালুর নিচে যাতে আমি একদম চাপা না পড়ে যাই সেজন্য আমি কিছুক্ষণ পর পর বাধ্য হয়ে স্থান বদলাতে থাকি।
আমার উদ্বেগ অহেতুক নয়, কারণ মরুভূমিতে হঠাৎ বালু-ঝড়ে পড়া আমার জন্য এ পয়লা নয়। আমার নিজের ‘আবায়ায় নিজেকে খুব এটেসেঁটে ঢেকে লম্বা হয়ে মাটির উপর পড়ে থাকি।
ঝড় কতোক্ষণে থামবে তার জন্য অপেক্ষা করি। বাতসের গর্জন আর আমার পোশাকের পতপত শব্দ ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই, রশি ছেড়ে দেওয়া পালের পতপত শব্দ-অথবা বাতাসে পতাকার শব্দ-মার্চ করে চলা বেদুঈন ফৌজের হাতে দীর্ঘ-দণ্ডের মাথয় কওমী পতাকার পতপত শব্দের মতো, যেমনটি পতাকা নেচেছিলো এবং পতপত করেছিলো প্রায় পাঁচ বছর আগে নজদী বেদুঈন সওয়ারদের উপর; ওরা ছিলো কয়েক হাজার এবং আমিও ছিলাম ওদের মধ্যে। হজ্ব করার পর আমরা আরাফাত থেকে ফিরছিলাম মক্কায়! এ ছিলো আমার দ্বিতীয় হ্জ্ব যাত্রা। আরব উপদ্বীপের অভ্যন্তরভাগে বছর খানেক কাটিয়ে পবিত্র নগরীর পূর্বে আরাফাত প্রান্তরে হাজীদের জমাতে ঠিক হজ্বের সময়ে শামিল হবার জন্য আমি দেখতে পেলাম-আমি ছিলাম সাদা পোশাক-পরা নজদী বেদুঈনদের এক বিপুল জনতার সংগে-ধূলি প্রান্তরে হাজীদের জমাতে ঠিক হজ্বের সময়ে শামিল হবার জন্য আমি কোনো রকমে ফিরে এসেছিলাম মক্কায়। এবং আরাফাত থেকে ফেরা পথে আমি দেখতে পোম-আমি ছিলাম সাদা পোশাক-পরা নজদী বেদুঈনদের এক বিপুল জনতার সংগে-ধূীল প্রান্তরের উপর দিয়ে ঘন পদক্ষেপ এবং দ্রুত গতিতে উট হাঁকিয়ে চলেছে, সাদা পোশাক –পরা মানুষের এক সমুদ্র যেনো –কেউ মধুরাঙা হলদে উটের; উচ্চকিত পৃথিবী-কাঁপানো গতিতে নর্তন-কুর্দন করতে করতে আগিয়ে চলেছে হাজার হাজার উট যেন একটা অপ্রতিরোধ্য তরংগ ধেয়ে চলেছে সামনের দিকে-কওমী ঝাণ্ডাসমূহ গর্জন করছে বাতাসে এবং কওমী হাঁক-ডাক যার মাধ্যমে ওরা ওদের বিভিন্নর কওমের এবং ওদের পূর্বপুরুষদের বীরত্বপূর্ণ কার্যকলাপের কথা ঘোষণা করে থাকে-ঢেউয়ের আকারে উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠেছে প্রত্যেক দলের মধ্য থেকে। আসলে নজদের বাসিন্দাদের জন্য তথা মধ্য আরবে উচ্চ ভূমিসমূহের অধিবাসীদের জন্য যুদ্ধ আর হজ্বের উৎস একই.. . এবং অন্যান্য দেশের অসংখ্য হজ্বযাত্রী-যারা এসেছে মিসর থেকে, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে, উত্তর আফ্রিকা এবং জাভা থেকে- যারা এ ধরণের মত্ততায় অভ্যস্ত নয়, আতংকে ওরা আমাদের সন্মুখ থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো, কারণ সে গর্জনশীল বাহনিীর পথের কাছে দাঁড়িয়ে জানে বেঁচে থাকা কারো পক্ষে সম্ভব নয়, ঠিক যেমন ছুটে চলা হাজার হাজার উটের মধ্যে কোন আরোহী তার উটের পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়লে মৃত্যুই তার জন্য অবধারিত।
উঠের পিঠে সেদিনকার সে চলা যতো উন্মদাপূর্ণই হোক, আমি সে উন্মদনায় শারিক হয়েছিলাম এবং আমার অন্তরে একটা বুনো আনন্দ, বোঁ-বোঁ শোঁ – শোঁ ধ্বনি, আমি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলাম সেই বিশেষ মুহূর্তটির নিকট, গতি ও গর্জনের নিকট-আর আমার মুখের উপর দিয়ে ছুটে-যাওয়া বাতাস যেন গেয়ে উঠলে, ‘তুমি আর কখনো পরদেশী থাকবে না-আমার জাতির মধ্যে আর কখনো তুমি পর বলে গণ্য হবে না।
আমরা পতপত করা ‘আবায়া’র নিচে বালুর উপর শুয়ে থেকে আমি শুনতে পাই ধূলি-ঝড়ের গর্জন থেকেও যেনো প্রতিধ্বনি উঠছে-‘কখনো তুমি আর পরদেশী থাকবে না।
আমি পরদেশী নই। আরব আমার স্বদেশ হয়ে উঠেছে। আমার পশ্চিমা অতীত যেনো বহু আগে দেখা একটা স্বপ্ন- এতোটা অবাস্তব নয় যে ভুলে যেতে পারি এবং এতোটা বাস্তব নয় যে আমার বর্তমানের অংশ হয় উঠবে । কথা এ নয় যে, আমি অলস স্বপ্ন-বিলাসী হয়ে উঠেছি- বরং যখনই আমি কোনো শহরে কয়েক মাস ধরে থাকি –যেমন মদীনায়, যেখানে আমার এক আরবী বিবি এবং এক শিশু ছেলে রয়ে, আর আছে ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের উপর লেখা বইয়ে ভর্তি একটি বইঘর – আমি চঞ্চল হয়ে উঠি এবং কর্ম ও গতির জন্য, মরুভূমির শুল্ক প্রাণবন্ত হওয়ার জন্য, উটের ঘ্রাণ এবং উটের জিনের পরশের জন্য প্রলুব্ধ হয়ে উঠ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জীবনের বেশির ভাগ সময়ে (আমার বয়স এখন বত্রিশ-এর কিছু উপরে) ঘুরে বেড়ানোর যে তাগিদ আমাকে এতোটা অস্থির করেছে এবং বার বার আমাকে সকল রকমের ঝুকি ও বিপদ-আপদ মুকাবেলার প্রতি প্রলুব্ধ করেছে তার উৎস এ্যাডভেঞ্চারের নেশায় ততোটা নয়, যতোটা পৃথিবীতে আমার নিজের জন্য একটা স্বস্তির স্থান খুঁজে বার করার বাসানার মধ্যে, এমন একটা বিন্দুতে পৌঁছানোর জন্য, যেখানে আমি যা কিছু ভাবি, অনুভব করি, কামনা করি,তার সংগে। এবং আমি যদি ঠিকমতো বুঝে থাকি, এই বছরগুলিতে অন্তরের এই আবিষ্কারের বাসনাই আমার ইউরোপীয় জন্ম এবং ইউরোপীয় পরিবেশে লালন-পালন যা কিছু আমার ভাগ্যে নির্ধারিত করেছে বলে মনে হয়েছিলো সেসব থেকে আমাকে ঠেলে দিয়েছে চিন্তা এবং বাইরের রূপ, উভয়দিক দিয়েই সম্পূর্ণ আলাদা এক নতুন জগত।
ঝড় যখন সম্পূর্ণ থামলো আমার চারদিকে জমে-ওঠা বালুর স্তূপ থেকে গা ঝেড়ে বের হয়ে এলাম। আমার উটটিও বালুতে অর্ধেকটা ডুবে আছে, কিন্তু তাই বলে অভিজ্ঞতা হিসাবে তা খুব খারাপ ছিলো না, কারণ এ রকমের অভিজ্ঞতা উটটির জীবনে অবশ্যি আরো বহুবার ঘটেছে। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হলো, বালুতে আমার মুখ-কান এবং নাক ভর্তি করে দেওয়া আর আমার জিনের উপর থেকে ভেড়ার চামড়ার উড়িয়ে নেওয়া ছাড়া ঝড় আমাদের তেমন কোন ক্ষতি করেনি। কিন্তু শিগগীরিই আমার ভুল বুঝতে পারলাম।
আমার চারপাশে সব কটি বালিয়াড়ির রূপরেখা একেবারে বদলে গেছে। হারানো উটের ও আমার পায়ের দাগ মুছে গেছে ঝড়ে। আমি দাঁড়িয়ে আছি সম্পূর্ণ নতুন ভূমির উপর। এখন আর তাঁবুতে ফিরে যাওয়া অথবা নিদেনপক্ষে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছু করবার নেই; সহায় কেবল সূর্য এবং দিক সম্পর্কে সাধারণ একটা ধারণা যা মরুভূমির সফরে অভ্যস্ত যে –কোন ব্যক্তিরই প্রায় একটা সহজাত অনুভূীতিবিশেষ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এ দুটি সহায়ও সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়; কারণ বালিয়াড়ির জন্য আপনি একটা সোজা সরল পথে আগাতে পারবেন না – পারবেন না আপনি যে দিক অনুসরণ করতে চান সেই দিকে আগাতে।
ঝড়ের ফলে আমার পিয়াস লেগেছে ভীষণ, কিন্তু অল্প কয়েক ঘন্টার বেশি আমাকে তাঁবু থেকে দূরে থাকতে হবে না, এই ভরসায় আমি আমার ছোট্ট মশক থেকে শেষ চুমুক পানিটুকু অনেক আগেই খেয়ে ফেলেছি। যাইহোক, আমি তাঁবু থেকে দূরে এাসে পড়িনি তা নিশ্চিত এবং আমার উটটি, যদিও দুদিন আগে কুয়ার পাশে শেষবার যখন আমরা থেমেছিলাম তারপর আর পানি খায়নি, তবু আমার এই উটটি হচ্ছে একটি অভিজ্ঞ অভিযাত্রী এবং সে আমাকে বহন করে তাঁবুতে নিয়ে যেতে পারবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যে দিকে তাঁবুটি রয়েছে বলে আমর মনে হলো সেই দিকেই আমি ফিরিয়ে দিলাম আমর উটটির মুখ, তারপর রওনা দিলাম ত্বরিত পদে।
এক ঘন্টা কেটে গেলো, তারপর আরেক ঘন্টা, তারপর আরেক ঘন্টা, কিন্তু জায়েদ কিংবা আমাদের তাঁবুর জায়গাটির কোন চিহ্ণ নেই। নারাঙ্গি –রঙ পাগাড়গুলির কোনো একটিরই আর পরিচিতি চেহারা নেই। ঝড় যদি না –ও হতো তবু এই পাহাড়গুলির মাঝে পরিচিতি কিছু খুঁজে বের করা সত্যি খুব মুশকিল হতো।
শেষ বিকালের দিকে আমি এসে পৌঁছি বালুর মধ্য থেকে বেরিয়ে থাকা কতকগুলি গ্রানাইট শিলার নিকট; এসব বালু-বিস্তারের মধ্যে এ রকম শিলার সাক্ষাৎ মিলে ক্বচিৎ। দেখা মাত্রই আমি এগুলিকে চিনতে পারলাম। আমি আর জায়েদ গতকালই বিকালে, রাতের জন্য তাঁবু গাড়ার খুব আগে নয়, এর পাশ দিয়ে গিয়েছিলাম। আমি অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, কারণ জায়েদকে আমি যে জায়গায় পাবো বলে আশা করেছিলাম সেখান থেকে যে আমি দূরে এসে পড়েছি তাতে কোন সন্দেহ নেই; কালকের মতো কেবলমাত্র দক্ষিণ-পশ্চিম মুখে সোজা এগিয়ে গেলেই চলবে, ওকে পেতে আর খুব বেগ পেতে হবে না।
আমার মনে আছে, এই শিলাগুলি আর আমাদের রাতের তাঁবুর মধ্যে ছিলো তিন ঘন্টার পথ; কিন্তু এখন যখন আমি আরো তিন ঘন্টার জন্য উট হাঁকিয়েছি, কিন্তু তাঁবু বা জায়েদের কোনো নিশানাই খুঁজে পেলাম না, আমি কি তবে তাকে আবার হারিয়েছি? আমি আগাতে থাকি, আগাতে থাকি বারবার দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে, আসমানে সূর্যের গতিবিধির দিকে সযত্ন লক্ষ্য রেখে। যখন রাত্রি নামলো, আমি স্থির করলাম আর আগানো একেবারেই অর্থহীন। তার চেয়ে বরং একু জিরিয়ে নিই এবং ভোরের আলোর জন্য অপেক্ষা করি! আমি উটটি থেকে নেমে তাকে বাঁধি এবং চেষ্টা করি কয়েকটি খেজুর চিবাতে কিন্তু বলতে কি, আমার ভীষণ পিয়াস পেয়েছে, তাই আমি খেজুরগুলি উটের সামনে রেকে ওর গায়ের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ি।
থেকে থেকে আমার তন্দ্রা আসছে-ঠিক ঘুমও নয়, ঠিক ঘুমও নয়, ঠিক জাগরণও নয়, পর পর কয়েকটি স্বপ্নাবস্থা, যার মূলে রয়েছে শ্রান্তি। সেই তন্দ্রা বারবার টুটে যাচ্ছে তৃষ্ণার দরুন যা ক্রমেই ভয়ানক পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া অন্তরের গহীনতম প্রদেশের কোথাও, যা মানুষ নিজের কাছেও খুলে ধরতে চায় না, রয়েছে ভযের সেই শুভ্র সততা গা- মোচড়ানো মলাস্ক ১[শামুকজাতীয় কোমলাংগ প্রাণীবিশষ]- আমার কী হবে যদি আমি জয়েদ ও আমাদের মশকগুলির নিকট ফিরে যাবার পথ আর না পাই? কারণ, এখানে থেকে যে –কোনো দিকেই রওনা করি না কেন, বহুদিন সফর করলেও কোনো বসতি বা পানি আর মিলবে না।
আবার রওনা করি ফজরে। রাতের বেলা ভেবে-চিন্তে এই সিদ্ধান্তে আসি যে, আমি নিশ্চয় দক্ষিণদিকে অনেক দূর চলে এসেছি। কাজেই আমি যেখানে রাত কাটিয়েছি জায়েদের তাঁবু সেখান থেকে উত্তর কিংবা উত্তর-পূর্বে কোথাও হওয়া উচিত। তাই,আমরা উত্তর, উত্তর-পূর্ব মুখে চলেছি বালু তরঙ্গ ভেদ করে এক উপত্যকা থেকে আরেক উপত্যকায়, কখনো ডানদিকের কখনো বামদিকের বালুর পাহাড়ের চারপাশে ঘুরে ঘুরে। দুপুরে আমরা আমরা জিরাই। আমার জিব লেগে আছে তালুর সাথে এবং মনে হচ্ছে এ যেন পুরানো চিড়-খাওয়া পুরু চামড়া। গলায় ঘা হয়ে গেছে আর চোখ জ্বালা করছে। আমার ‘আবায়াটা’ মাথার উপর টেনে দিয়ে আমি উটের পেটের সংগে গা ঘেঁষে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমানোর চেষ্টা করি, কিন্তু ঘুম হলো না। বিকালে আবার আমরা রওনা করি, তবে এবার আরো পূর্বমুখে, কারণ এতোক্ষণে আমি বুঝতে পেরেছি আমরা পশ্চিমমুখো হয়ে অনেক দূর চলে এসেছি;কিন্তু আশ্চর্য, এখনো জায়েদ বা তাঁবুর কোন হদিসই নেই।
এমনি করে আসে আরেকটি রাত। তৃষ্ণা হয়ে ওঠে যন্ত্রণা এবং পানির আকাংখা হয়ে ওঠে মনের একমাত্র অদম্য ভাবনা, যে-মন আর গুছিয়ে চিন্তা করতেও সক্ষম নয়। কিন্তু ভোরের সূর্য সমান আলো করার সাথে সাথে আমি আবার উঠে বসি আমার উটের পিঠে; সকাল গড়িয়ে, দুপুর গড়িয়ে আরো একটি দিনের বিকাল আসে; আমি উট হাঁকিয়ে চলেছি তো চলেছি। কেবল বালিয়াড়ি এবং তার শেষ নেই। কিংবা এই কি শেষ-আমার সকল পথের, চাওয়ার সকল পাওয়ার ইতি? -যাদের মধ্যে আমি আর কখনো পরদেশী বলে গণ্য হবো না তাদের মধ্যে আমার সমাপ্তি ..? ‘আল্লাহ গো’, আমি প্রার্থনায় ভেঙে পড়ি- ‘তুমি আমাকে এভাবে ধ্বংস হতে দিওনা .. .।
বিকালে আমি একটা উঁচু বালিয়াড়ির চড়ি, চারদিকের ভূ-প্রকৃতি একটু ভালোভাবে দেখতে পাবো এই আশায়। যখন দেখলাম পূবে, বহুদূরে একটা কালো বিন্দুর মতো কী দেখা যাচ্ছে, আমার ইচ্ছা হলো, উল্লাসে চিৎকারের সামর্থ্য্ও আমার নেই। আমার সন্দেহ নেই যে, এই কালো দাগটি আর কিছু নয়, জায়েদের তাঁবু এবং মশক দুটি –পানি ভর্তি দুটি মস্ত মশক! ফের উটে চড়তে গিয়ে আমার হাঁটু দুটি ঠকঠক করে কাঁপাতে লাগলো। ধীরে ধীরে হুঁশিয়ারির সাথে আমরা সেই কালো দাগটির দিকে আগাতে থাকি-ওটি যে জায়েদের তাঁবু তাতে একটুও সন্দেহ নেই। আবার যাতে দিক না হারাই এজন্য এবার সব রকমের সতর্কতা অবলম্বন করি। আমি সোজা এক সরলরেখায় আগাতে থাকি –চলতে চলতে কখনো উঠি বালুর পাহাড়ে, কখনো নামি বালু উপত্যকায়, এইভাবে আমাদের কষ্ট দু’গুণ তিনগুন বাড়িয়ে। শুধুমাত্র এ আশাই আমাকে উদ্দীপিত করেছে যে, কিছুক্ষণ, বড় জোর এক দু’ঘন্টার মধ্যেই, আমি পৌছুবো আমার মঞ্জিলে। শেষ নাগাদ, শেষ বালিয়াড়ির চূড়াটি অতিক্রম করার পর আমার সেই মঞ্জিল স্পষ্ট হয়ে উঠলো আমার চোখের সামনে; আমি উটের মুখের লাগাম টেনে ধরি এবং প্রায় আধ মাইল দূরের সেই কালো দাগটির দিকে তাকাই। মনো হলো, আমার হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেছে, কার আমার সামনে যা দেখতে পেলাম তা আর কিছু নয়, বালুর ভেতর থেকে বের হয়ে থাকা সেই কালো গ্রানাইট শিলাগুলি যা আমি জায়েদের সংগে তিন দিন আগে অতিক্রম করেছিলাম এবং দুদিন আগে একা আমি আবার অতিক্রম করেছি.. .
আমি বৃত্তাকারে ঘুরছি দুদিন ধরে।
চার
যখন জিন থেকে নামলাম তখন আমি একেবারেই ক্লান্ত, গায়ে জোর নেই একটু। এমনকি, উটের পা বাঁধার দিকেও আমর খেয়াল নেই। বলতে কি, জানোযারটিও এক ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে, পালিয়ে যাওয়ার ই্চ্ছাও তার নেই। আমার কান্না পেলো কিন্তু আমার শুকনো ফোলা ফোলা চোখ থেকে আসু এলো না এক ফোঁটাও।
আমি যখন কেঁদেছি তারপর কতো সময় অতিক্রান্ত হলো! .. . কিন্তু যা-ই হোক, সব কিছুই কি দূর অতীতের ব্যাপার নয়? সব কিছুই অতীতের বস্তু এবং বর্তমান বলে কিছুই নেই! আছে কেবল তৃষ্ণা .. . আর গরম .. আর যন্ত্রণা।
প্রায় তিন দিন হলো আমি পানি খাইনি। আর আমার উটটি শেষবার পানি খেয়েছে পাঁচদিন আগে। এভাবে হয়তো আরো একদিন, বড় জোর দু’দিন চলতে পারে। কিন্তু আমি জানি, আমি ততোক্ষণ আর চ লতে পারবো না। হয়তো আমার মৃত্যুর আগে আমি পাগলই হয়ে যাবো, কারণ আমার গায়ের ব্যাথার সাথে জড়িয়ে আছে আমার মনের ভয়; একটি থেকে জন্ম নেয় আরেকটি – জ্বালাময়, যন্ত্রণাপ্রদ-বিদারক! .. .
আমি চাই বিশ্রাম নিতে, আরম করতে, কিন্তু সংগে সংগে আমি এ কথাও জানি যে, আমি যদি এখন আরাম করি আর কখনো উঠে বসতে পারবো না। আমি নিজেকে কোন রকমে টেনে নিয়ে আবার জিনের উপর চড়ি, তারপর আঘাত করে লাথি মেরে উটটিকে দাঁড়াতে বাধ্য করি। আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম জিনের উপর থেকে যখন উটটি পেছনের পা দুটির উপর দাঁড়াতে গিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে-এবং আবার যখন সে সামনের পা দুটি সোজা করতে গিয়ে হেলে পড়ে পেছনদিকে। আমরা চলতে শুরু করি ধীরে ধীরে যন্ত্রণার মধ্যে, পশ্চিমদিকে। পশ্চিমদিকেঃ কী তামাশা! কিন্তু আমি বাঁচতে চাই, আর এ জন্যই আমরা চলি, আগাতে থাকি।
আমাদের যেটুকু কুওৎ বাকি আচে তারি সাহায্যে সারা রাত থপথপ করে পা ফেলে চলি। আমি যখন জিন থেকে পড়ে যাই তখন নিশ্চয়ই হয়ে ভোর হয়ে গেছে। আমি শক্ত কিছুর উপর পড়িনি; বালু খুবই মোলায়েম এবং আরামদায়ক; মনে হলো যেনো আদরে আলিংগন করছে আমাদের। কিছুক্ষণের জন্য উটটি নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, পয়লা হাঁটুর উপরে তারপর পেছনে পা দুটির উপরে সে নিজের শরীরটাকে ছেড়ে দেয় এবং বালুর উপর গলা ছড়িয়ে দিয়ে আমার পাশে গুটিগুটি মেরে শুয়ে পড়ে।
আমিও শুয়ে পড়ি আমার উটের সংকীর্ণ ছায়ায়, বালুর উপর। আমার ‘আবায়া’ দিয়ে আমি নিজেকে মুড়ে দিই, আমার বাইরে মরুভূমির যে জ্বালা রয়েছে- এবং ভেতরে যে ব্যাথা তৃষ্ণা এবং ভয় রয়েছে তা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। আমার আর চিন্তা করার কোনো তাকৎ নেই। আমি আমার চোখ দুটি বন্ধ করতে পারছি না। চোখের পাতা একটু নড়লেই মনে হয় চোখের পুতুলের উপর যেনো উত্তপ্ত ধাতু নড়ছে। তৃষ্ণা এবং উত্তাপ.. .তৃষ্ণা এবং সর্বনেশে নীরবতা-উষ্ণ-শুল্ক নীরবাত, যা আমাকে ঢেকে দেয় তার নির্জনতা ও নৈরাজ্যের কাফনে, আমার কানে রক্তের ধ্বনি উটের ক্ষণিক দীর্ঘশ্বাসকে করে তোলে ভয়ংকর-যেন, পৃথিবীতে এগুলিই হচ্ছে শেষ ধ্বনি, আর আমরা দু’জন একটি মানুষ, একটি জানোয়ার-আমরা হচ্ছি পৃথিবীর বুকে হতভাগ্য শেষ জীবন্ত প্রাণী- ধ্বংস যাদের অবধারিত!
আামদের অনেক উপরে, তরল গরমের মধ্যে চক্কর খাচ্ছে একটি শকুন, একবারো না থেমে, আসমানের বিবর্ণ পটভূমিকায় একটি সূঁচের মাথা যেনো, উড়ছে মুক্তভাবে, সকল দিগন্তের উপর..
আমার গলা ফুলে গেছে-শুকিয়ে প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে কন্ঠনালী, আর প্রত্যেকটি নিশ্বাস যেন হাজার সূঁচ ফুটিয়ে দিচ্ছে আমার জিবের গোড়ায় –সেই বড় সেই মহৎ আলজিব, যার নড়ার কথা নয়, অথচ নড়াচড়া না ক’রে একটুও থামতে পারছে না। আমার ভেতরের সবকিছুই জ্বলছে, সবকিছু রূপ নিয়েছে এক বিরামহীন যন্ত্রণায়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ইস্পাত-সদৃশ আসমান উজ্বল হয়ে উঠলো আমার বিস্ফারিত চোখের সামনে!
আমার হাত যেন নিাজে নিজেই প্রসারিত হয় এবং জিনের খিলের সংগে ঝুলানো ছোট বন্দুকটির কঠিন কোঁদার উপর গিয়ে লাগে। সংগে সংগে হাত থেকে যায় এবং আকস্মিক স্বচ্ছতায় আমার মন দেখতে পায়-কার্তুজের খোপে পাঁচটি তাজা কার্তুজ এবং ট্রিগারে একটু চাপ দিলেই ত্বরিত যা ঘটতে পারে তার স্বরূপ –কী যেন আমার ভেতরে , ফিসফিস করে বলে উঠলোঃ শিগগীর করো, আবার তুমি চলতে অক্ষম হয়ে পড়ার আগেই বন্দুকটি হাতে নাও।
এবং সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, আমার ঠোঁট নড়ছে এবং আমার মনের গহীন গুহা থেকে যেসব ধ্বনিহীন শব্দ আসছে সেগুলিকে আকার দিচ্ছেঃ ‘আমি তোমাদেকে পরীক্ষা করবো .. . নিশ্চয় পরীক্ষা করবো’, এবং ঝাপসা অস্পষ্ট শব্দগুলি ধীরে ধীরে আকার নেয়, হয়ে ওঠে কুরআনের একটি আয়াতের মতোঃ ‘আমি অবশ্য তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো ভয় দিয়ে, ক্ষুধা দিয়ে, সম্পদ জীবন ও ফল-ফসলের স্বল্পতা দিয়ে; তুমি খোশ খবর দাও তাদেরকে যারা ধৈর্যশীল এবং যখনি কোন মুসিবত আসে বলেঃ আমরা আল্লাহরই এবং আমাদের প্রত্যাবর্তন আল্লাহরই দিকে।
সবকিছুই তপ্ত এবং বিষণ্ণ। এই জ্বালাময় বিষণ্ণতার মধ্যে আমি বাতসে একটি প্রাণ জুড়ানো নিশ্বাস অনুভব করি এবং তার মৃদু ঝিরঝির ধ্বনি শুনি, যেনো গাছপালার মধ্যে মর্মর ধ্বনি তুলে বাতাস বইছে-পানির উপর দিয়ে – এবং সেই পানির হচ্ছে সবুজ ঘাসে ঢাকা দু’পারের মধ্যে ধীরে ধীরে বয়ে চলা একটি ক্ষীণ স্রোত, আমার শিশুকালের বাড়ি কাছে। আমি শুয়ে আছি নদীর পারে – নয় কি দশ বছরের ছোট্ট বালক, একটা ঘাসের ডগা চিবাচ্ছি এবং তাকিয়ে আছি সাদা গরুগুলির দিকে –গরুগুলি ঘাস খাচ্ছে, নিকটেই, বৃহৎ মলিন চোখ মেলে তৃপ্তির সরলতা নিয়ে। দূরে কিষাণ রমণীরা মাঠে কাজ করছে। একজন পড়েছে একটা লাল রুমাল এবং চওড়া লাল ডোরাকাটা নীল স্কার্ট। সাদা হাঁস, পায়ের ধাক্কায় পানিকে ঝলসিয়ে দিয়ে। এবং মোলায়েম বাতাস ধ্বনি তুলে চলেছে আমার মুখের উপর, জানোয়ারে নিশ্বাসের ধ্বনির মতো। হ্যাঁ, তাই বটে- জানোয়ারেরই নিশ্বাস ফেলার আওয়াজ। বৃহৎ সাদা গাভীটি, যার পায়ে সাদার মধ্যে ছিটানো রয়েছে তামাটে রংয়ের ফোঁটা, আমার একেবারেই কাছে এসে পড়েছে এবং এখন নাক দিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে আমাকে ধাক্কা মারছে, আমার পাশেই আমি টের পাই গাভীটির পায়ের নড়াচড়া।
আমি আমার চোখ দুটি মেলি; শুনতে পাই আমার উটের হ্রেষাধ্বনি আর আমার পাশেই ওর পায়ের নড়াচাড় টের পাই; উটটি তার পেছনের পা দুটির উপর অর্ধেক দাঁড়িয়েছে ঘাড় এবং মাথা উপর দিকে তুলে, ওর নাকের ছেদাগুলি স্ফুরিত –যেন সে দুপুরের বাতসে হঠাৎ এবং শুভ সুগন্ধের আভাস পেয়েছে। ফের ও জোরে জোরে শব্দ করে নাক দিয়ে এক আমি টের পাই –ওর উত্তেজনা যেন তরংগের আকারে গলা বেয়ে নেমে কাঁধ হয়ে ওর অর্ধেত্থিক বিশাল দেহের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন মরুসফরের পর পানি গন্ধ পেলে উট এভাবেই নাক দিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নেয় এবং শব্দ করে – এ আমি আগেও দেখেছি। কিন্তু এখানে .. . এখনে তো পানি নেই। .. . আছে কি? আমি আমার মাথা সোজা করে, যে দিকে উটটি মুখ ফিরিয়েছে সেদিকে তাকাই দু’চোখ সেলে। উটটি মুখ ফিরিয়েছে আমাদের সবচেয়ে নিকটের বালিয়াড়িটির দিকে – আকাশের ইস্পাতসদৃশ শূন্যতার পটভূমিকায় একটা নিচু শীর্ষ –সেখানে কিছুই নড়চে না বা কোন শব্দ ও হচ্ছে না –কেবল শোনা গেলো একটা অস্ফুট ধ্বনি, পুরোনো এক বীণার তারের স্পন্দনের মতো, খুবই কোমল এবং ভংগুর, তীক্ষ্ণঃ সে তীক্ষ্ণ, উচ্চ ও ভংগুর ধ্বনি এক বেদুঈনে কন্ঠের –যে উট হাঁকিয়ে গেছে চলেছে উটের পায়ের তালের সাথে ছন্দের মিল রেখে,বালু পাহাড়ের মাথার ঠিক ওপশেই দূরত্বের বিচারে একবারেই নিকটে, কিন্তু মুহূর্তের ভগ্নাংশেল মধ্যে আমি জানতে পারি, আমার নাগালের অনেক দূরে সেই স্থান, আমার কন্ঠস্বর ওখানে কিছুতেই পেছুবে না। নিশ্চয় ওখানে মানুষ আছে, কিন্তু ওদের নিকট পৌছুবার তাকৎ মোটেই নেই আমার। এমনকি, আমি এতো দূর্ব যে, দাঁড়াবার ক্সমতাও আমার নেই। আমি চেষ্টা করি চিৎকার করতে –কিন্তু আমর গলা থেকে কেবল একটি কর্কশ গোঙানি ছাড়া কিছু বার হলো না। তখন, নিজে নিজেই আমার হাত গিয়ে পড়ে জিনের সংগে ঝুলানো আমার ছোট্ট বন্দুকটির শক্ত কোঁদার উপর .. . এবং আমি আমার মনের চোখ দিয়ে দেখতে পাই কার্তুজের খোপে পাঁচটি তাজা কার্তুজ!
একটা চূড়া্ত চেষ্টার ফলে আমি জিনের খিল থেকে বন্দুকটি খুলতে পারলাম। বেন্ট থেকে বন্দুকে কার্তুজ পোরা –একটা পর্বতকে মাথার উপর তোলার মতো ভারি মনে হলো, তবু, শেষ পর্যন্ত তাতে সক্ষম হলাম। এরপর আমি বন্দুকটি কোঁদার উপর দাঁড় করিয়ে বন্দুকের নল সোজা আকাশের দিকে রেখে ট্রিগার টেনে দিই। বুলেটটি শন করে শূন্যতায় হারিয়ে গেলো অতি করুণভাবে, অতি ক্ষীণ একটি শব্দ করে। আবার বন্দুকের নল ভেঙে তাতে কার্তুজ পুরে ছুঁড়ি আর কান পেতে থাকি। বীণার সুরের মতো সেই গান থেমে গেছে। মুহূর্তের জন্য রইলো কেবল নীরবতা, আর কিছুই না। হঠাৎ বালিয়াড়ির মাথার উপরে দেকা দিলো। একটি মানুষের মাথা, তারপর কাঁধ এবং সেই লোকটির পাশে আরেকটি মানুষ। তারা কিছুক্ষনের জন্য তাকালো নিচের দিকে, তারপর ঘুরে তাদের অদৃশ্য সাথীদের কী যেনো বলো চিৎকার করে উঠলো; এরপর ওরা হামাগুলি দিয়ে বালিয়াড়ির মাথার চড়ে এবং অর্ধেক দৌড়ে, অর্ধেক ঢালু বেয়ে পিছলে নেমে ছুটে এলো আমার দিকে।
আমাকে গিরে প্রচন্ড উত্তেজন, দু’তিনজন মানুষ-এই নিঃসংগ নির্জনতর পর কী বিশাল জনতা! ওরা আমাকে তোলার চেষ্টা করছে; ওদের ক্রিয়া –কলাপ, হাত আর পায়ের এলোপাতাড়ি নড়াচড়ার এক অতি বিভ্রান্তিকর দৃশ্য! আমি যেন জ্বলন্ত ঠান্ডা বরফ এবং আগুন অনুভব করি আমার ঠোঁটের উপর এবং দেখতে পাই এক দাঁড়িওয়াল বেদুঈনের মুখ ঝুঁকে আছে আমার উপর, আর তার হাত এক ময়লা ভেজা তেনা ঠেলে দিচ্ছে আমার মুখের ভেতর। লোকটির আরেকটি হাত ধরে আছে একটি খোলা মশক। আমি আপনা আপনি হাত বাড়াই মকটির দিকে, কিন্তু বেদুঈনটি আমার হাত ঠেলে পেছন-দিকে; তেনাটি পানিতে ডুবিয়ে আবার সে কয়েক ফোঁটা পানি সেই তেনা চিপে আমার ঠোঁটের মধ্যে দেয়;আর এই পানি যাতে আমার মুখে ঢুকে আমার গলা গলা পুড়িয়ে না দেয় সেজন্য আমি দাঁতের সংগে দাঁত চেপে রাখি। কিন্তু বেদুঈন আমার দাঁত আলাদা না করে আমার মুখে আবার কয়েক ফোঁটা পানি দেয়। এ তো পানি নয়, যেন গলানো সীসা। ওরা আমার সাথে এরূপ ব্যবহার করছে কেন? আমি পালিয়ে বাঁচতে চাই এদের জূলুম থেকে। কিন্তু ওরা আমাকে ধরে রাখে। শয়তান সব! আমার চামড়া জ্বলছে; আমার সারা গায়ে আগুন লেগেছে। ওরা কি মেরে ফেলতে চাই আমাকে? হায় যদি কেবল বন্দুকটি ধরবার মতো শক্তি থাকতো আমার আত্মরক্ষার জন্য! কিন্তু ওরা আমাকে হা করিয়ে আমার মুখে কয়েক ফোঁটা পারি দেয়; এ পানি গোলা ছাড়া আমর আর উপায় রইলো না। আশ্চর্য! কিছুক্ষণ আগরে মতো অতো তীব্রভাবে আরদহন করছে না এ পানি; মাথার উপরে ভেজা নেকড়াটা ভালোই লাগছে এবং ওরা যখন পানি ঢাললো গায়ের উপর, ভেজা কাপড়ের স্পর্শ নিয়ে এলো উল্লাসের এক শিহরণ.. .
এরপর সব কিছু কালো হয়ে আসে; আমি নামছি এক গহীন কুয়ায় –এতো দ্রুত গতিতে নামছি যে, বাতাস আমার কানের পাম দিয়ে ছুটে যায় হুহু করে, শোঁ- শোঁ করে, আর সেই শোঁ-শোঁ ধ্বনি রূপ নেয় গর্জনে –গর্জনমুখর কৃষ্ণতায়.. . কালো- কালো.. .
পাঁচ
কালো .. . কালো. .. নরম মোলায়েম কালো, যার কোনো শব্দ নেই –একটা মহৎ সহৃদয় আঁধার, যা আমাকে আলিংগন করে গরম এক কম্বলের মতো এবং মনে জাগায় এই কামনা যে, আমি যেনো সবসময় এভাবেই থাকতে পারি, এমনি আশ্চর্য রকমে ক্লান্ত, নিদ্রালু আর আলসে। কোনো প্রয়োজন নেই আমার চোখ দুটি মেলার কিংবা আমার বাহু নাড়ানোরঃ তবু আমি আমার বাহু নাড়ি, আমার চোখ মেলি, কেবল আমার মাথার উপরে অন্ধকার দেখার জন্য –কালো ছাগ-পশম দিয়ে তৈরি বেদুঈনের তাঁবুর পশমী-আধাঁর, যার সমুখ দিকে রয়েছে সংকীর্ণ খোলা জায়গা, যার ফাঁক দিয়ে আমি দেখতে পাই তারা ঝিলমিল রাতের আসমানের একটি টুকরা এবং তারার আলোতে নিচে একটি ঝলমলো বালিয়াড়ির এক মোলায়মে বাঁক। .. . তাপরপর –তারপর তাঁবুর সেই ফাঁকটুকু আঁধার হয়ে ওঠে এবং একটি মানুষের মূর্তি এসে দাঁড়াই সেই ফাঁকটুকুর মধ্যে – তার ঝূলন্ত জোব্বার নকশা যেন আকাশের গায়ে খোদাই করা এবং আমি শুনতে পাই জায়েদের চিৎকার – ‘জেগে আছেন, ‘উনি জেগে আছেন’! এরপর তার কঠোর সংযত মুখখান ঝুঁকে পড়ে প্রায় আমার মুখের উপর; জায়েদ তার হাত দিয়ে ধরে আমার কাঁধে। আরেকজন মানুষ ঢোকে তাঁবুর ভেতর। আমি তাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু সে যখন আস্তে ভারিক্কি গলায় কথা বলতে শুরু করলো আমি সংগে সংগে বুঝতে পারি, সে শাম্মার কবিলার বেদুঈন।
আবার আমি অনুভব করি এক তপ্ত সর্বশেষে পিয়াস এবং জায়েদ আমার দিকে দুধের যে বাটি আগিয়ে ধরেছে তা চেপে ধরি সাজোরে। কিন্তু আমি যখন তা গিললাম তখন আর কোনো যন্ত্রণা রইলো না। আমি সেই দুধ খাচ্ছি যখন জায়েদ বর্ণনা করে চলে-কীভাবে এই ছোট্ট বেদুঈন দলটি বালু-ঝড় শুরু হলো তার কাছেই তাঁবু খাটাতে এলো,তারপর যখন হারানো উটটি রাতের বেলা নিজে নিজে ফিরে এলো তখন তার কেমন চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো এবং কী করে সকলে জোট বেঁধে বের হয়েছিলো আমাকে খুঁজতে, কীভাবে প্রায় তিন দিন পরে যখন তারা সব আশাই একরকম ছেড়ে দিয়েছিলো, তখন ওরা বালিয়াড়ির আড়াল থেকে শুনেছিলো আমার বন্দুকের আওয়াজ…
এরপর, ওরা আমার উপর খাটিয়ে দিলো একটি তাঁবু আর আমাকে হুকুম করা হলো, আমি যেনো আজ রাত এবং আগামীকাল এ তাঁবুর ভেতর পড়ে থাকি। আমাদের বেদুঈন বন্ধুদের কোনা তাড়াহুড়া নেই; তাদের মশকগুলি পানিতে ভর্তি, এমনকি তারা পুরা তিন বালতি পানি দিল আমার উটটিকে, কারণ, ওরা জানে, দক্ষিণদিকে একদিনের পথ গেলেই, ওরা আর আমরা গিয়ে পৌছুবো একটি ওয়েসিস – যেখানে রয়েছে প্রচুর খাদ্য – ‘হামদ –ঝোপ।
কিছুক্ষণ পর জায়েদ আমাকে তাঁবু থেকে বের করে, তারপর বালুর উপর একখানা কম্বল বিছিয়ে দেয়। আমি শুয়ে থাকি তারা –ভরা আসমানের নিচে।
কয়েক ঘন্টা পর আমি জায়েদের কাফি-পাত্রের টুঙটাঙ শব্দে জেগে উঠি-টাটকা কফির গন্ধ যেনো রমণীর উষ্ণ আলিংগন!
-‘জায়েদ’! আমি চিৎকার করে উঠি; বিস্ময়ের সাথে আমি লক্ষ্য করি, আমার গলার আওয়াজ যদিও এখনো ক্লান্ত তবু এখন আর তা কর্কশ নয়- ‘তুমি আমাকে কিছু কফি দেবে?’
-‘আল্লাহর কসম চাচা, অবশ্যি দেবো’, জায়েদ পুরানো আরবী রসুম মুতাবিক জবাব দেয়, আরববাসী এভাবেই তাকে সম্বোধন করে যাকে সে দেখাতে চায় সম্মান, তা সে বক্তার চেয়ে বয়সে বড়োই হোক অথবা ছোটই হোক, (যেমন আমাদের বেলায়- আমি জায়েদের চেয়ে কয়েক বছরের ছোট)-আপনার দীল যতো চায় ততো কফি আপনি পাবেন।’
আমি কফি খাই আর জায়েদের প্রসন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসি-‘আচ্ছ ভায়া, বুদ্ধিমান লোকের মতো ঘরে না থেকে আমরা এরূপ বিপদের মুখে নিজেদের ঠেলে দিচ্ছি কেন বলো তো?’
-‘কারণ, জায়েদ এবার আমার দিকে তাকিয়ে দঁত বের করে হাসে, আপনার আর আমার মতো লোকের পক্ষে যতো দিন না হাত পা কঠিন হয়ে উঠেছে আর আমরা যয়ীফ হয়ে পড়েছি ততোদিন ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয়! তাছাড়া মানুষ কি নিজেদের ঘরে থেকে মরে না? মানুষ কি তার অদৃষ্টকে ঘাড়ে করে নিয়ে চলে না-থাকুক না সে যেখানেই?
জায়েদ ‘অদৃষ্ট’ অর্থে ব্যবহার করে ‘কিসমা’ শব্দটি‘-কিসম’ মানে ‘যা ভাগ্যে নির্ধারিত হয়েছে।’ এই শব্দটি তুর্কী রূপ ‘কিসমত’, প্রতীচ্যে সুপরিচিত। আরেক পোয়ালা কিফ পান করতে আমার মনে হলো, এই আরবী শব্দটির একটি গভীরতরো অর্থও আছে –‘যাতে মানুষের অংশ আছে তাই –তো কিসমত।’
যাতে অংশ আছে মানুষের, তা-ই.. .
শব্দগুলি আমার স্মৃতিতে একটা ক্ষীণ বিলীয়মান ধ্বনি জাগায়, সংগে সংগে আমার সামনে ভেসে ওঠে একটি ক্লিষ্ট হাসির দৃশ্য.. . কার হাসি? এক ঝাঁক ধোঁয়া, উৎকট ধোঁয়া, যেন হাশিশের ধোঁয়া, আর তারি আড়ালে একটা ক্লিষ্ট হাসি, হ্যাঁ, এ ছিলো হাশিশেরই ধোঁয়া, আর হাসিটি ছিলো, আজতক আমি যতো মানুষের সাথে মিশেছি, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিচিত্র ব্যক্তিটির হাসি। আমার জীবনের বিচিত্র এক অভিজ্ঞিতার পর ওর সাথে আমার মুলাকাত হয়েছিলো! এক বিপদ. .. যা মনে হয়েছিলো.. . হ্যাঁ কেবলি মনে হয়েছিলো আসন্ন, সে বিপদ থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য আমি না জেনেই ধেয়ে চলেছিলাম, আরেক বিপদের দিকে, আর সে বিপদ –আমি যা এড়াবার চেষ্টা করেছিলাম, তার চেয়ে ছিলো অনেক বেশি বাস্তব, অনেক বেশি আসন্ন.. . এই অবাস্তব ও বাস্তব বিপদ-এ দু’য়ে মিলে আমাকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিলো এক নতুনতরো মুক্তির দিকে।
ব্যাপারটি ঘটেছিলো আট বছর আগে। আমি যাচ্ছিলাম ঘোড়ায় চড়ে আমার তাতার নওকর ইবরাহীমকে সাথে নিয়ে, শিবাজ থেকে দক্ষিণ ইরানে নাইরস হ্রদের কাছে, একটি পাড়ো, পাতলা বসতি, পথ-ঘাটহীন এলাকা কিরমানের দিকে। তখন শীতকাল-আর এই শীতকালে এলাকাটি হয়ে পড়েছিলো প্যাঁচ-প্যাঁচে কর্দমাক্ত একটি স্তেপ বিশেষ; আশেপাশে কোনো গাঁও-গেরাম নেই, দক্ষিণদিকে, কুহ-ই-গুশনেগান অর্থাৎ ‘ভুখাদের পাহাড়’ কর্তৃক ঘেরা সেই জলাভূমি গিয়ে স্পর্শ করেছে হ্রদটির কিনার। বিকালে আমরা যখন একটি আলগোছে পাহড়ের চারদিকে ঘুরছিলাম, হঠাৎ আমাদের নজরে পড়লো হ্রদটি-একটি নিস্তব্ধ সবুজ সমতল, যেখানে নেই কোনো আলোড়ন, শব্দ অথবা জীবন, কারণ এর পানি এতো নোনা যে, এতে কোনো মাছই বাঁচতে পারে না। গুটিকয়েক পংগু গাছপালা আর কিছু মরু-তৃণ ছাড়া হ্রদটির তীরের নোনা মৃত্তিকায় কোন উদ্ভিদই জন্মায় না। ভূমিটি কাদা মেশানো তুষারের পাতলা আস্তরণে ঢাকা এবং তার উজান দিকে তীর থেকে প্রায় দু’শো গজ দূরে চলে গেছে একটি সরু ক্ষীণ পথ।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে; আমাদের আজকের রাতের মঞ্জিল খানই-ই –খেত সরাইখানার কোন নিশানাই মিললো না এখনো। কিন্তু যে-কোনো মূল্যেই হোক আমাদের পৌছুতেই হবে ওখানে। দূরে-বহুদূর তক আর কোনো বসতি নেই এবং জলাভূমিটি কাছে হওয়ায়, অন্ধকারে আমাদের আগানো খুব বিপজ্জনক হয়ে উঠে। আসলে সকালেই আমাদেরকে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছিলো ওখানে একাকী না আগাতে, কারণ একটিমা্ত্র ভূল পদক্ষেপের ফলেই ঘটতে পারে সহজ এবং আকস্মিক মৃত্যু। তাছাড়া, ভেজা প্যাঁচ-প্যাঁচে জমির উপর দিয়ে দীর্ঘ একটা দিন চলার পর আমাদের ঘোড়াগুলি হয়ে পড়েছিল খুবই ক্লান্ত-ওদের জন্যও এখন দরকার বিশ্রাম এবং খাবার।
রাত আসার সাথে সাথে শুরু হরো মুষলধারে বৃষ্টি। আমরা চলছি ভিজতে ভিজতে বিষণ্ণচিত্তে এবং নীরবে- আমাদের নিজেদের বেফায়দা চোখের চাইতে ঘোড়ার সহজাত অনুভূতির উপরই আমরা নির্ভর করছি বেশি। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায় .. . কিন্তু কোথায় সেই সরাইখানা? কোন নিশনাই নেই! হয়তো আমরা অন্ধকারে ঠাহর করতে না পেরে সরাইখানাটিকে পেছনে ফেলে এসেছি; ফলে আজ হয়তো আমাদেকে রাত কাটাতে হবে খোলা জায়গায় –বর্ষনের নীচে, যে বর্ষণ ক্রমেই তীব্র ও জোরদার হয়ে উটেছে! আমাদের ঘোড়ার খুর পানিতে আঘাত হেনে ছিটাতে থাকে পানি, আমাদের ভেজা কাপড়গুলি ভারি বোঝার মত লেপ্টে থাকে আমাদের গায়ের সাথে। উচ্ছ্বসিত পানির পর্দার আবরনে কালো এবং নিশ্চিদ্র রাত ঝুলে আছে আমাদের চারপাশে। আমাদের হাড্ডি পর্যন্ত শীতে ঠক ঠক করছে-কিন্তু জলাভূমিটি যে আমাদের নিকটেই রয়েছে এ জ্ঞান আমাদেরকে আরে বেশি শংকিত করে তুলেলো। ঘোড়াগুলি একটিবারের মতো কঠিন মৃত্তিকার উপর পা ফেলতে ভুল করে তাহলে আল্লহ যেন আমাদের উপর রহম করেন! –সকালবেলা হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছিলো আমাদেরকে।
আমি চলছি আগে, আর ইবরাহীম আমার পেছনে, সম্ভবত দশ পা তফাতে। বারবার মনে হানা দিতে থাকে সেই ভয়ংকর জিজ্ঞাসা-আমরা কি অন্ধকারে খান-ই-খেত পেছনে ফেলে এসেছি? ঠান্ডা বৃষ্টির নিচে রাত কাটানো-কী যে অশুভ সম্ভাবনা! কিন্তু আমরা যদি অনেক দূর গিয়েই থাকি তাহলে জলাভূমিটি গেলো কোথায়?
হঠাৎ আমি শুনতে পাই একটি নরম মোলায়েম চপচপ শব্দ, আমার ঘোড়ার খুরের নিচে। আমি টের পেলাম জানোয়ারটি কাদার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে-কিছুটা ডুবে যাচ্ছে, কিছুটা ডুবে গেছে,তারপর মরিয়া হয়ে একটা পা তুলছে এবং আবার ডুবে যাচ্ছে। সহসা এই চিন্তা আমার মনকে বিদীর্ণ করে দেয়-আমরা কি তাহলে জলাভূমিতে পা দিয়েছি? আমি সাজোরে লাগাম টেনে ধরি এবং ঘোড়ার দু’পাশে দু’পা দিয়ে সাজোরে লাথি মারতে থাকি। ঘোড়াটি তার মাথা উপর দিকে তুলে ভীষণ ভাবে দাপাদাপি শুরু করে। আমার চামড়া ফেটে নির্গত হতে লাগলো ঠান্ডা ঘাম। রাতটা এতো কালো যে, আমি আমার নিজের হাত দুটি পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি না; কিন্তু নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে ঘোড়াটি শরীর যেভাবে স্ফীত হচ্ছে, তাতে টের পেলাম, কাঁদার আলিংগন থেকে বাঁচার জন্য কী মরিয়া হয়েই না ও চেষ্টা করছে। প্রায় কোনো রকম ভাবনা না করেই আমি হাতে নিই ঘোড়ার চাবুকটি যা ব্যবহার না করে সাধারণত ঝুলানো থাকে আমার হাতের কব্জিতে এবং আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই চাবুক দ্বারা আঘাত করি ঘোড়াটির পাছার উপর; উদ্দেশ্য –এভাবে যদি ঘোড়াটিকে কার শেষ শক্তিটুক খাটানোর জন্য উত্তেজিত করা যায়, কারন ঘোড়াটি যদি এই মুহূর্তে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে সে দেবে যাবে এবং তার সাথে আমিও ডুবে যাবো এ কাঁদার মধ্যে, গভীর হতে গভীরে। এ ধরণের মার কেতে অনভ্যস্ত হতভাগা জানোয়ারটি-অসাধারণ গতি ও শক্তির অধিকারী কাশগাই টাটু –পেছনের দুপায়ের উপর দাঁড়িয়ে গেলো-তারপর চারটি পায়ে আবার আঘাত করতে লাগলো জামিনের উপর; কাঁদা থেকে বাঁচার জন্য ঘন ঘন দম ফেলতে মরিয়া হয়ে সে চেষ্টা করে, লাফ দেয়, আবার নিজেকে নিক্ষেপ করে সম্মুকদিকে, আাবর পিছলে পড়ে যায়- এবং বিরতি না দিয়ে নরম কাদামটির উপর বারবার পড়তে থাকে ঘোড়াটির খুরের আঘাত।
আমার মাথার উপর দিয়ে একটি রহস্যময় বস্তু বয়ে যায় শোঁ শোঁ আওয়াজ ক’রে, আমি আমার মাথা তুলি সংগে সংগে, আর আমার উপর এসে পড়ে এটা কঠিন ধারণা-বহির্ভূত আঘাত, কিন্তু কোত্থেকে? সময় এবং চিন্তা একে অপরের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আর তালগোল পাকিয়ে যায়।
মুহূর্তের জন্য মনে হলো, ঘন্টার পর ঘন্টার মতোই দীর্ঘ, বৃষ্টির ছাট আর ঘোড়ার হাফানির ফাঁকে ফাঁকে আমি শুনতে পাচ্ছি সেই জলাটি চুষে চুষে পান করছে সেই ধ্বনি। আমাদের অন্তিম মুহূর্ত নিশ্চয় আসন্ন। রেকাব থেকে আমি আমার পা দুটি শিথিল করে দিলাম, তারপর তৈরি হলাম জিনের উপর থেকে লাফিয়ে পড়া একা আমার ভাগ্য পরীক্ষা করতে .. হয়তো কাদার উপর চিৎ হয়ে পড়ে থাকলে আমি নিজেকে বাঁচাতেও পারি – আমার মনের অবস্থা যখন এই , হঠাৎ অবিশ্বাস্য রকমে আমার ঘোড়াটি খুব শক্ত কঠিন মাটির উপর আঘাত হানলো সজোরে একবার .. . দুবার .. এবং আমি, মুক্তির উল্লাসে ফুপিয়ে উটে লাগাম টেনে ধরলাম আর কাঁপতে থাক জানোয়ারটিকে থামিয়ে দিলাম। আমরা বেঁচে গেলাম।
এই মুহূর্তে হঠাৎ আমার মনে পড়লো সংগীর কথা, আর আমি ভয়ে বিহ্বল হয়ে চিৎকার করে উঠরাম.. . ‘ইবরাহীম!’ কিন্তু কোনো জবাব নেই। আমার হৃদপিণ্ড জমে গেলো।
‘ইবরাহীম!’ কিন্তু আমাকে ঘিরে রয়েছে কেবল এক আধাঁর রাত আর বর্ষণ। ও কি তাহলে নিজেকে বাঁচাতে পারেনি? কর্কশ স্বরে আমি আবার চিৎকার করে ডাকি ‘ইবরাহিম।’
এবং তখন প্রায় অবিশাস্য রকমে, অনেক দূর থেকে অস্পষ্ট ভেসে এলো একটা চিৎকারের আওয়াজ ‘এই যে.. . আমি এখানে।;
এখন আমার বুদ্ধি স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পালা! আর এতে বিপুল ব্যবদানে একজন আরেকজন থেকে আলাদা হয়ে পড়লাম কী করে?
-‘ইবরাহীম!’
-‘এই যে .. .এই যে’.-
এবং আমি ঐ শব্দ অনুসরণ করে ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়াটাকে টানতে টানতে প্রতি ইঞ্চি মাটি পা দ্বারা পরখ করে খুব ধীরে ধীরে অত্যন্ত সতর্কতার সংগে দূরবর্তী সে কন্ঠস্বরের দিকে হাঁটতে থাকিঃ ইবরাহীম .. . ইবরাহীম শান্তভাবে বসে আছে ঘোড়ার জিনের উপর।
-‘তোমার কি হয়েছিলো ইবরাহীম? তুমিও কি ভুল করে জলাভূমিতে গিয়ে পড়েছিলে?’
– জলাভূমী? না তো। কেন জানি না আপনি হঠাৎ যখন ঘোড়া হাকিয়ে গায়েব হয়ে গেলেন আমি তখন –নড়ন-চড়ন নাস্তি, একটুও নড়লাম না, যেখানে ছিলাম সেখানেই থেমে গেলাম।’
-ঘোড়া হাঁকিয়ে গায়েব হয়ে গেলেন!’ এতোক্ষণে সমাধান হলো রহস্যের! জলাভূমিতে হাত থেকে বাঁচার এই চেষ্টা তাহলে আমার কল্পনারই পরিণতি। নিশ্চয়ই আমার ঘোড়াড়াটি এসে পড়েছিলো একটি কর্দমাক্ত রাস্তায় এবং আমার মনে হয়েছিলে, আমি আর আমার ঘোড়া তলিয়ে যাচ্ছি জলাভূমিতে আর তাই ঘোড়াটিকে চাবুক মেরে হাঁকিয়েছিলাম পাগলের মতো! আঁধারে দ্বারা প্রতারিত হয়ে আমি ঘোড়াটির অগ্রগতিকে, তার সম্মুকে ছুটে চলাকে জলাভূমির কবল থেকে বাঁচার প্রাণান্ত চেষ্টা বলে ভূল করেছিলাম এবং রাতভর ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছিলাম, জানতাম না যে, মাঠের এখানে –ওখানে ছড়িয়ে রয়েছে বহু গ্রন্থিল গাছপালা। জলাভূমি নয়, এই গাছগুলিই ছিলো আসন্ন এবং প্রকৃত বিপদঃ যে শাখাটি আঘাত করেছিলো আমার হাতে, তা ছোট না হয়ে হতে পারতে আরো বড় একটি শাখা, যা গুঁড়িয়ে দিতে পারতো আমার খুলি এবং এভাবেই দক্ষিণ –ইরানের একটি চিহ্নিত করবে চূড়ান্ত অবসান ঘটতো আমার সফরের।
আমি ক্ষেপে গেলাম নিজের বিরুদ্ধে –ক্ষেপে গেলাম এ কারনেও যে, আমরা সব দিশা হারিয়ে ফেলেছি এবং রাস্তার কোনো নিশানাই আর খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। আমরা আর সরাইখানা ফিরে পাবো না।
কিন্তু আমি আবার ভুল করে বসি।
ইবরাহীম ঘোড়ার উপর থেমে নেমে পড়লো হাত দিয়ে জমিনের অবস্থা অনুভব করবার জন্য এবং হয়তো এভাবেই নতুন করে পথ খুঁজে বের করার জন্য। এভাবে যখন সে হামাগুড়ি দিচ্ছে হঠাৎ তার মাথা গিয়ে ঠেকলো এক দেয়ালে-খান –ই-কেত সরাইখানার কালো প্রাচীরে!
জলাভূমিতে ঢুকে পড়ার কাল্পনিক ভুলটি যদি আমি না করতাম আমরা হয়তো আগাতেই থাকতাম, হয়তো সরাইখানাটিকে পেছনে ফেলে চলে যেতাম অনেক দূরে, তারপর হয়তো সত্যি সত্যি আমরা হারিয়ে যেতাম সেই জলাভূমিতে, কারণ পরে আমরা জানতে পেরেছিলাম, দুশ গজেরও কম সামনে থেকেই সেই জলাটি শুরু হয়েছে।
মহান শাহ আব্বাসের আমলের বহু ধ্বংসাবশেষের একটি হচ্ছে এই সরাইখানাটি। সারি সারি মজবুত ইমারতের খিলানের নিচে দিয়ে রয়েছে আসা-যাওয়ার পথ, হা-করা দরজা এবং ভেঙে পড়া উনান। এখানে-ওখানে লিণ্টেলের এবং ফাটল ধরা মেজলিকা টালির উপর আমি দেখতে পেলাম পুরানো খোদাই-এর কিছু চিহ্ন। বাসের অযোগ্য কোঠা কটিতে ছড়ানো রয়েছে পুরানো খড়কুটা আর ঘোড়ার লাদ। আমি আর ইবরাহীম প্রধান ‘হল’ কামরায় ঢুকে দেখতে পেলাম সরাইখানার ওভারশিয়র খালি মেঝেয় খোলা আগুনের পাশে বসে আছে আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি মানুষ, খালি পা, আকারে বামন এবং পরনে ছেঁড়া কাপড়। আমরা ঢোকার সাথে সাথে দুজনেই দাঁড়িয়ে গেলো। বামনাকৃতি লোকটি গম্ভীরভাবে, নিখুঁত প্রায় নাটকীয় ভংগিতে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানালো ডান হাতটি বুকের উপর রেখে। তার গারে জামাটিতে অসংখ্য তালি, নানা রঙের; লোকটি নোংরা, একেবারেই অগোছালো, এলোমেলো, কিন্তু তার চোখ দুটি জ্বল জ্বল করছে এবং মুখটি শান্ত স্নিগ্ধ।
আমাদের ঘোড়া কটির তদারক করার জন্য ওভারশিয়র কোঠা থেকে বের হয়ে গেলো একবার। আমি আমার ভেজা জামা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম আর ইবরাহিম দেরী না করে সেই খোলা আগুনের উপর চায়ের পানি বসিয়ে দিলো। যে মহৎ সামস্ত প্রভু তার চাইতে যারা হীন তাদের প্রতি ভদ্র হয়েও নিজের ইজ্জত হারায় না, তারি ভংগিতে সুন্দরভাবে সেই বামনটি ইবরাহীম কর্তৃক তার দিকে তুরে ধরা চায়ের পেয়ালটি গ্রহণ হরে।
বিন্দু মাত্র অস্বাভাবিক ঔৎসুক্য না দেখিয়ে, যেন একটি বৈঠকী আলাপ শুরু করার জন্যেই সে তাকালো আমার দিকে – ‘জনাব-ই আলী, আপনি কি ইংরেজ?
-‘না, আমি নামসাভী (অস্ট্রীয়)’
– ‘আমি যদি জিজ্ঞাস করি, আপনি কি তেজারতির উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন তা কি অশোভন হবে?’
-‘আমি খবরের কাগজের লেখক, আমি জবাব দিই, আমি তোমাদের দেশে সফর করছি – আমার কওমের নিকটে তোমার দেশের পরিচয় জানাবার জন্য। আমার কওম অন্যেরা কীভাবে জীবন-যাপন করে তা জানতে ভালোবাসে।’
সম্মতিসূচক স্মিত হাসির সাথে সে মাথা নাড়ে, তারপর চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ পর সে তার জামার ভাঁজ থেকে বের করলো একটি মাটির হুঁকা, আর একটি বাঁশের দন্ড; বাঁশের দন্ডটি সে মাটির পাত্রটির সাথে লাগিয়ে দেয়; তারপর স েতার দুই হাতের চেটোয়, দেখতে তামাকের মতোই কী একটা জিনিস ডরতে থাকে; পরে যত্নের সাথে, যেনো সোনার চাইতেও দামী সেই জিনিসটি ছিলিমের মধ্যে রেকে ঢেকে দেয় জ্বলন্ত আংগার দিয়ে বাঁশের দণ্ডটি সে মাটির পাত্রটির সাথে লাগিয়ে দেয়;তারপর চুপ করে যায়। কিছু্ক্ষণ পর সে তার জামার ভাঁজ থেকে বের করলো একটি মাটির হুঁকা, আর একটি বাঁশের দণ্ড; বাঁশের দণ্ডটি সে মাটির পাত্রটির সাথে লাগিয়ে দেয়; তারপর সে তার দুই হাতের চেটোয়, দেখতে তামাকের মতোই কী একটা জিনিস ডলতে থাক; পরে যত্নের সাথে, যেনো সোনার চাইতেও দামী সেই জিনিসটি ছিলিমের মধ্যে রেখে ঢেকে দেয় জ্বলন্ত অংগার দিয়ে। বাঁশের নলটি মুখে পুরে অনেকটা জোরে জোরেই সে ধোঁয়া টানতে লাগলো এবং ধোঁয়া টানতে টারতেই প্রচন্ডভাব কেশে উঠলো এবং এভাবে তার গলা পরিষ্কার করে নিলো। মাটির হুঁকার ভেতর পনি বগবগ করতে থাকে এবং একটা উৎকট গন্ধে ধীরে ধীরে কোঠাটি ছেয়ে যায়। এখন আমি বুঝতে পারলাম – এহচ্ছে ভারতীয় গাঁজা ‘হাশিশ’। এতোক্ষণে তার অদ্ভুত আদব –কায়দা ও ভাবভংগির অর্থ পরিষ্কার হলোঃ ও একজন ‘হাশশাশী’, গাঁজাখোর! আফিমখোরদের মতো তার চোখ দুটি ঢাকা নয়, এক ধরনের অনাসক্ত নৈর্ব্যক্তিক গভীরতায় তার চোখ দুটি জ্বল জ্বল করছে-বহুদূরে তার নজর , তার আশেপাশে বাস্তব দুনিয়া থেকে এতো দূরে যে, তা অপরিমেয়।
আমি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। ও ধূমপান শেষকরে আমাকে জিজ্ঞাস করে – ‘আপনি কি একটু চেষ্টা করে দেখবেন’?
আমি ধন্যবাদের সাথে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিই। জীবনে দুএকবার আফিম চেষ্টা করে দেখেছি, (অবশ্যি তাতে কোনো আনন্দ পাইনি; কিন্তু এই হাশিশ পানের চেষ্টাও আমার কাছে খুবই কষ্টসাধ্য, এমনকি অরুচিকর মনে হয়। হাশশাশী নিঃশব্দে হাসে –এক বন্ধুত্বপূর্ণ শ্লেষের সাথে তার তীর্যক চোখের নজর আমার উপর বুলিয়ে নেয়ঃ
-`আমি জানি, মাননীয় দোস্ত, আপনি কী ভাবছেন। আপনি ভাবছেন-হাশিশ খাওয়া হচ্ছে শয়তানের কাজ এবং আপনি একে ভয় করছেন। এক্কেবারে বাজে কথা। হাশিশ হচ্ছে আল্লাহর একটি দান-রহমত। অতি উত্তম.. . বিশেষ করে মনের জন্য। হযরত, লক্ষ্য করুন, আমি বুঝিয়ে বলছি আপনাকে। আফিম খারাপ –এতে কোনো সন্দেহ নেই, কারণ আফিম মানুষের মনে জাগায় এমন জিনিসের কামনা যা পাওয়া যাবে না। আফিম মানুষের স্বপন্গুলিকে করে তোলে লোভী, জন্তু-জানোয়ারের কামনার মতোই। কিন্তু হাশিশ সব লোককে শান্ত করে দয়ে এবং দুনিয়ার সব কিছুর প্রতি মানুষকে করে তোলো উদাসীন। হ্যাঁ তাই। হাশিশ মানুষকে দেয় তুষ্ঠি। একজন হাশশাশীর সামনে আপনি রেখে দিতে পারেন এক মণ সোনা সে যখন হাশিশ পান করছে কেবল সেই সময় নয়, যে কোনসময়ে – হাশশাশী তার একটি আঙুল ও সে সোনার দিকে বাড়াবে না। আফিম মানুষকে দুর্বল ও কাপুরুষ করে তোলে, কিন্তু হশিশ.. . হাশিশ সব ভয় দূর করে দেয় এবং মানুষকে করে তোলে সিংহের মতোই সাহসী। আপনি যদি শীতকালের মাঝামাঝি বরফের স্রোতে ডুব দিতে বলেন ‘হাশশাশী’কে, সে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়বে সেই স্রোতে আর হাসবে.. . কারণ সে জেনেছে,যার লোভ নেই তার ভয় নেই- এবং মানুষ যদি ভয়কে জয় করতে পারে, সে বিপদকেও জয় করে, কারণ- সে জানে, তার জীবনে যা কিছুই ঘটেছে তা তারই অংশ, সৃষ্টিতে যা কিছু ঘটে চলেছে সে সবের মধ্যে.. .’
আবার ও হাসে, সেই সংক্ষিপ্ত ঢেউ তোলা নিঃসব্দ হাসি, যাঁকে বিদ্রূপ বলা যায় না; সদাসয়তাও বলা যায় না –দুয়ের মাঝামাঝি একটা অবস্থা। এরপর তার হাসি থেমে যায়, কুণ্ডলী পাকানো ধূঁয়ার আড়ালে কেবল তার দাঁতগুলি বিকশিত হয় এবং তার উজ্জ্বল দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় এক স্থির অনড় দূরত্বের প্রতি।
‘যা কিছু ঘটে চলেছে তাতে আমার অংশ…’ বন্ধুত্বপূর্ণ, আরবীয় আকাশের তারকাপুঞ্জের নিচে শুয়ে শুয়ে আমি মনে মনে ভাবি-আমি .. হাড্ডি ও গোশতের, সংবেদন ও উপলব্দির এই বাণ্ডিল –আমাকে রাখা হয়েছে বিশ্বনিয়ন্তার কক্ষে এবং যা কিছু ঘটে চলেছে আমি আছি তারি মধ্যে। ‘বিপদ’, এ তো অলীক কল্পনা মাত্র – এ আমাকে কখনো ‘পরাভূত’ করতে পারে না – কারণ, আমার জীবনে যা কিছু ঘটছে তা তো সর্বত্রগামী সেই স্রোতেরই একটা অংশ – আমি নিজেই যে স্রোতের অংশ। এ-ও হতে পারে যে, এই বিপদ ও নিরাপত্তা, মৃত্যু ও আনন্দ, নিয়তি ও পূর্ণতা, সবকিছুই এই যে ক্ষুদ্র অথচ মর্যাদাবান একটি ‘বণ্ডিল’, আমি, তারই বিভিন্ন দিক মাত্র। কী অননত্ মুক্তি, হে আল্লাহ, তুমি দান করেছো মানুষকে!’
এই চিন্তার আনন্দের বেদনা এতো তীব্র এবং তীক্ষ্ণ যে, আমি আমার চোখ বুঁজতে বাধ্য হই এবং আমার মুখের উপর দিয়ে যে ঝিরঝির হাওয়া বয়ে যাচ্ছে তা-ই যেনো দূর থেকে মুক্তির পাখনারূপে নীরবে আমার উপর পরশ বুলিয়ে দেয়।
ছয়
এতোক্ষণে উঠে বসার মতো যথেষ্ঠ শক্তি আমি অনুভব করছি। আমি যাতে হেলান দিয়ে বসতে পারি সেজন্য জায়েদ আমাদের উঢের জিনের একটি নিয়ে আমার কাছে এলো।
-চাচা, আপনি আরাম করুন; আপনাকে মৃত মনে করে আপনার জন্য মাতম করেছি, আজ আপনাকে বহাল তবিয়তে পেয়ে আমি কতো যে আনন্দিত হয়েছি!
-‘তোমাকে সবসময় এক পরম বন্ধুরূপে পেয়েছি! তুমি যদি আমার ডাক শুনে আমার কাছে ছুটে না আসতে, তোমাকে ছাড়া বছরগুলি আমি কীভাবে চলতাম, বলো তো?
-“চাচা, আমি যে আপনার সাথে এই বছরগুলি কাটিয়েছি – তার জন্য কখনো অনুশোচনা হয়নি। আমার এখনো সেই দিনটির কথা মনে আছে যেদিন আমি আপনার চিঠি পেয়েছিলাম পাঁচ বছরেরো আগে। সেই চিঠিতে আপনি আমাকে মক্কায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আপনার সাথে আবার দেখা হবে এই চিন্তাটাই ছিলো আমার নিকট প্রিয়। তার বিশেষ কারণ ও ছিল – আপনি এরই মধ্যে ইসলামের আর্শীবাদ লাভে ধন্য হয়েছিলেন। ঠিক সেই সময়ই আমি শাদি করেছিলাম এক কুমারী মুন্তাফিক বালিকাকে; তার ভালোবাসায় আমার আনন্দের অবধি ছিলনা। ঐসব ইরাকী বালিকার কোমর খুবই চিকন, আর স্তন মজবুত, কঠিন, ঠিক এরি মত – অতীতের দৃশ্য স্মরণ করে মৃদু হেসে সে তার তর্জনী চেপে ধরে আমি যে জিনের উপর হেলান দিয়ে আছি তারি শক্ত অগ্রভাগের উপর – ‘এবং এদের আলিংগন থেমে মুক্ত হওয়া খুবই কঠিন।’ তাই আমি মনে মনে বললাম, ‘আমি যাবো তবে ঠিক এক্ষুণি নয়। কয়েক হপ্তা অপেক্ষা করতে হবে আাকে।’ কিন্তু হপ্তার পর হপ্তা গড়িয়ে যায়… গাড়িয়ে যায মাসের পর মাস এবং যদিও আমি কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই স্ত্রীলোকটিকে –সেই কুত্তীর বাচ্চাকে তালাক দিয়েছিলাম – ও কি না ওর চাচাত ভাইয়ের দিকে তাকচ্ছিলো আশনাই –এর দৃষ্টিতে, তবু আমি ইরাকী ‘আগায়েল’ আমার নোকরি ছাড়তে পারছিলাম না, ছাড়তে পারলাম না আমার দোস্ত-ইয়ারদেরকে, বাগদাদ ও বসরার আনন্দ –উল্লাসকে এবং সবসময়ই নিজেকে বলে চলছিলাম একথা ঠিক এখুনি নয়, আরো কিছু পরে।’ কিন্তু একদিন যখন আমি আমাদের তাঁবু থেকে আমার মাইনের টাকা নিয়ে চলেছিলাম উটে চড়ে এবং ভাবছিলাম, রাতটা আমার কোন দোস্তের বাড়িতে কাটাবো, হঠাৎ তখন মনে পড়লো আপনার কথা, মনে পড়লো, আপনার চিঠিতে আপনার প্রিয় সহধর্মিণী-আপনার রফিকার ইন্তিকার সম্বন্ধে আপনি লিখেছেন- আল্লাহ তাঁর উপর সদয় হোন এবং আমি ভাবলাম, তাঁকে হারিয়ে কতো নিঃসংগ বোধ করছেন আপনি এবং সংগে সংগে আমি বুঝতে পারলাম, আমার আর অপেক্ষা করা চলে না –আমাকে ছুটে যেতে হবে আপনার কাছে সেখানেই এবং তক্ষুণি, আমি আমার ইরাকী ‘ঈগাল’ থেকে তারকাটি ছিড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম; তারপর আমি আমার কাপড় –চোপড়গুলি নেবার জন্য ঘরে পর্যন্ত গেলাম না। আমার উটের রোখ আমি ফিরিয়ে দিলাম নুফুদের দিকে… নজদের দিকে, তারপর রওনা করে দিলাম –শুধু পরের গেরামটিতেই একবার থেমেছিলাম একটা মশক এবং কিছু খাবার কেনার জন্য … তারপর চললাম উট হাঁকিয়ে দিনের পর দিন –যতক্ষণ না আপনার সাথে মুলাকাত হলো মক্কায়, চার হপ্তা পরে…’
– ‘এবং তোমার মনে আছে জায়েদ, আররে অভ্যন্তরে আমাদের দুজনেরেই সেই পয়লা সফরের কথা, দক্ষিণ মুখে, খেজুর বাগিচার এবং ওয়াদি বিশার গম ক্ষেতের দিকে এবং সেখান থেকে রানিয়ার বালু বিস্তারের দিকে, যা আগে অতিক্রম করেনি কোন অন-আরব !
-‘কতো স্পষ্ট না তা আমার মনে পড়ছে, চাচা। আপনি কতো উৎসুকই না ছিলেন সেই শূন্য এলাকা ১[রাব আলখালি-নামক সুাবিশাল জনবসিতিশূন্য বালুময় মরুভূমি যা আরব –উপদ্বীপে এক –চতুর্থাংশ জুড়ে রয়েছে।] দেখতে যেখানে জীনের প্রভাবে বালুরাশি গান গায় সূর্যের নিচে। আর সেই এলাকার কিনারে যে-সব ‘বদু’ বাস করে তাদের কথা? যারা তাদের জীবনে তখনো চশমা দেখেনি এবং মনে করেছিলো আপনার চশমা জমাট পানি দিয়ে তৈরি? ওরা নিজেরাই জিনের মতো; অন্য মানুষ যেমন বই-কিতাব পড়ে তেমনি পড়ে ওরা বালুর উপর পথের রেখাসমূহ এবং পড়ে আকাশ আর হাওয়া থেকে ধূলি –ঝড়ের আগমনের কথা-ঝড় আসার বহু ঘন্টা আগেই। আর চাচা, আপনার কি মনে আছে রানিয়াতে আমরা যে গাইড ভাড়া করেছিলাম তার কথা –সেই শয়তান ‘বাদাভীর’ কথা-যাকে আপনি গুলি করে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, সে আমাদেরকে মরুভূমির মাঝখানে ফেলে চলে যেতে চেয়েছিলো বলে। আপনি যে যন্ত্রটি দিয়ে ছবি তোরেন তার বিরুদ্ধে সে কী ক্ষেপেই না গিয়েছিলো!’
আমরা দুজনেই আাদের বহু দূরে ফেলে আসা সেই এ্যাডভেঞ্চার হাসি। কিন্তু তখন আমাদের মোটেই হাসির মতো অবস্থা ছিলো না। আমরা ছিলাম রিয়াদের দক্ষিণে ছ-সাত দিনের পথ দূরে যখন সেই গাইড, আর রাইনের ‘ইখওয়ান’ বস্তির এক গৌড়া বেদুঈন, গোস্বায় ফেটে পড়েছিলো আমি তাকে ক্যামেরার উদ্দেশ্য বুঝিয়ে বলাতে। সে তখুনি এবং সেখানেই আমাদেরকে ফেলে চলে যাবার জন্য তৈরি হলো, কারণ এ ধরনের জাহেলী ছবি তোলায় তার রূহ বিপন্ন হয়ে পড়েছিলো। ওর হাত থেকে ছাড়া পেতে আমার মোটেই আপত্তি ছিলো না , যদি এ আশংকা না থাকতো যে আমরা তখন অমন একটি এলাকায় এসে পড়েছিলাম যার সাথে আমার বা জায়েদের কোনে পরিচয় ছিলো না –যেখানে আমাদের দুজনকে একলা ছেড়ে গেলে নিশ্চয় আমরা দিশাহারা হয়ে পড়তাম। পয়লা আমি আমাদের সেই ‘বেদুঈন শয়তান’কে বুঝাতে চাইলাম যুক্তি দিয়ে। কিন্তু কোনো ফায়দাই হলো না। ও কিছুতেই বুঝতে চাইবে না। বরং উটের রোক ও ফিরিয়ে দেয় রানিয়ার দিকে। আমি তখন ওকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলাম, আমাদের এভাবে তৃষ্ণায় প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাতে যদি ও রোখে যায় তাহলে সে জান নিয়ে কিছুতেই পালাতে পারবে না। এই হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও যখন ওর উট চালাতে শুরু কররো আমি তখন ওর দিকে আমার রাইফেল তাক করে তৈরি হলাম ওকে গুলি করতে –গুলি করার পুরা ইচ্ছাই ছিলো; এবং মনে হলো তাতেই শেষ পর্যন্ত আমাদের বন্ধুটি রূহ নিয়ে যতো ভাবনা –চিন্তা চাপা পড়ে গেলো। কিছুক্ষণ বিড়বিড় করার পর সে রাজি হলো, ওখান থেকে তিন দিনের রাস্তা পরবর্তী বস্তি পর্যন্ত আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে –যেখানে আমরা পারবো আমাদের বিতর্কিত বিষয়টিকে বিচারে জন্য কাজীর সামনে পেশ করতে। আমি আর জায়েদ মিলে ওর অস্ত্র কেড়ে নিলাম, তারপর পালাক্রমে পাহাড়া দিতে লাগলাম যাতে সে সরে পড়তে না পারে। কয়েক দিন পর আমরা যখন –কুবাইয়ার ‘কাজী’র নিকট বিচার প্রর্থনা করলাম তিনি প্রথমে রায় দিলেন আমাদের গাইডেরই পক্ষে। ‘কারণ’ (রসূলের একটি হাদীসের ভূল ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে তিনি বললেন, ‘জীবিত প্রাণীর ছবি তোলা নিন্দনীয় কাজ’ কিন্ত জীবিত প্রাণীর ছবি তোলা নিষিদ্ধ –বর্তমান কাল পর্যন্ত বহু মুসলমানের মধ্যে প্রবল এই বিশ্বাস সত্ত্বেও, এ ব্যাপারে ইসলামী আইনে কোনো বিধান নেই। তখন আমি ‘দেশের সকল আমীর এবং যে কেউ এটা পড়বে’ তার জন্য লিখিত বাদশাহর খোলা চিঠি ‘কাজী’র সামনে মেলে ধরলাম –এবং পড়তে গিয়ে ‘কাজী’র মুখ ক্রমেই লম্বাটে হয়ে উঠতে লাগলো – ‘মুহম্মদ আসাদ আমার মেহমান, দোস্ত এবং আমার প্রিয়জন, যে কেউ তার প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করবে সে আমার প্রতিই তা করবে এবং যে কেউ তার প্রতি শত্রুতা করবে সে আমারই শত্রু বলে গন্য হবে,… ইবনে সউদের কথা এবং মোহর যাদুর মতো কাজ করলো কঠোর কাজীর উপর। শেষ পর্যন্ত তিনি এ রায় দিলেন যে, ‘কোনো কোনো অবস্থায়’ ছবি তোলা অনুমোদন করা যেতে পারে। … এই রায়ের পর আমরা আমাদের গাইডকে ছেড়ে দিলাম এবং আমাদেকে রিয়াদের দিকে নিয়ে যাবার জন্য নিযুক্ত করলাম নতুন গাইড।
-‘চাচা, রিয়াদের সেই দিনগুলির কথা মনে আছে কি, যখন আমরা ছিলাম বাদশাহর মেহমান এবং পুরানো শাহী আস্তাবাল ঝকঝকে মোটর গাড়িতে ভর্তি দেখে আপনি কতো মর্মাহত হয়েছিলেন!.. এবং আপনার প্রতি বাদশাহর মেহেরবানির কথা?’
-‘আর তোমার কি মনে পড়ছে জায়েদ, বাদশাহ কীভাবে আমাদের পাঠয়েছিলেন বেদুঈন বিদ্রোহের রহস্য উদঘাটন করতে এবং কীভাবে আমরা রাতের পর রাত সফর করে লুকিয়ে ঢুকেছিলাম কুয়েত –এ; শেষ পর্যন্ত জানতে পেরেছিলাম ঝকঝকে নতুন ‘রিয়াল’ এবং সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে যেসব অস্ত্রশস্ত্র বিদ্রোহীদের নিকট আসছিলো তার আসল রহস্য… .?’
-‘আর চাচা, আমাদের সেই মিশনের কথা যখন সৈয়দ আহমদ –আল্লাহ তাঁর হায়াত দারাজ করুন –আমাদেরকে পাঠিয়েছিলেন সাইরেনিকায় এবং কেমন করে আমরা গোপনে একটি ‘ধাও’ –এ করে সমুদ্দুর পার হয়ে ঢুকেছিলাম মিসরে এবং কীবাবে আমরা সেই ইতালীয়দের দৃষ্টি এড়িয়ে আল্লাহর লানত হোক ওদের উপরে প্রবেশ করেছিলাম জবল আখদারে এবং উমর আল –মুখতারের নেতৃত্বে যোগদান করেছিলাম, মুজাহিদিনের সংগে? কী উত্তেজনাপূর্ণই না ছিলো !
তারার আলোকে আলোকিত মরুভূমির রাতের নীরবতায় যখন এক নাজুক ঈষদুষ্ণ হাওয়ায় ছোটো ছোটো ঢেউ জাগে বালুতে –অতীত আর বর্তমানের ছবি একে আরেকের সাথে বারবার জড়িয়ে যায়, আবার আলাদা হয় পড়ে এবং স্মৃতিকে জিইয়ে তোলা এক বিস্ময়কর ধ্বনির সংগে একে অপর পেছন দিকে ডাকে, বহু বছর পেরিয়ে, আমার আরবীয় বছরগুলির শুরতে মক্কায় আমার পয়লা হজ্ব এবং যে আঁধার সেই শুরু দিনগুলিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো, তার প্রতিঃ সেই নারীর মৃত্যুর প্রতি যাকে আমি এমন ভালোবেসেছিলাম, যেমন আর কোন নারীকেই ভালোবাসিনি পরে, যে এখন শুয়ে আছে মক্কার মাটির নীচে, একটা সাদাসিধা পাথর রয়েছে তার শিয়রে যাতে কোন লেখা নেই, যা চিহ্নিত করছে তার পথের শেষ এবং আমার এক নতুন পথের শুরু, একটি শেষ এবং একটি শুরু, একটি ডাক এবং একটি প্রতিধ্বনি মক্কার শিলাময় উপত্যকায়, আশ্চর্য্জনকভাবে একে অপরের স্বপ্নের সাথে জড়িত!
-‘জায়েদ, আরো কিছু কফি হবে?’
-‘আপনার হুকুমের অপেক্ষায় চাচা!’ জায়েদ জবাব দেয়। সে ব্যস্ত সমস্ত না হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, তার বাঁ হাতে লম্বা চিকন কফি পাত্র। তারপর মিনিট দু’এক, হাতলশূন্য পেয়ালা টুঙটু করে ওঠে তার ডান হাতে– একটি আমার জন্য আর একটি ওর নিজের জন্য-পয়লা পেয়ালাটিতে কিছু কফি ঢেলে সে আমার হাতে দিলো। লাল এবং সাদা চেক-‘কুফিয়া’র ছায়ার নিচে থেকে তার চোখ দুটি আমাকে নিরীক্ষণ করে গভীর মনোনিবেশের সাথে, যেন সামান্য কফির পেয়ালার চাইতে এভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শনই অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ! এই লম্বা লম্বা পশম শোভিত, গভীর, সংযত, শান্ত অবস্থায় করুণ অথচ অতি আনন্দে ঝলসে উঠতে সাদা উৎসুক দুটি চোখ বলছে স্তেপ অঞ্চলে মু্ক্তির মধ্যে শত পুরুষের জীবন কথাঃ এ চোখ এমন মানুষের চোখ যার পূর্ব পুরুষেরা শোষিত হয়নি কখনো এবং অন্যকেও শোষণ করেনি কোনোদিন। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে ওর চলনের ভংগিগুলি, প্রাশান্ত, প্রতিটি ভংগির নিজস্ব ছন্দ সম্বন্ধে সচেতন, কখনো তাড়াহুা নেই –দ্বিধাগ্রস্থ নয় কখনোঃ এমন নিখুঁত এবং বাহুল্য বর্জিত যে, আপনাকে তা একটা সুসমন্বিত অর্কেষ্টার ঐকতানের মধ্যে বিভিন্ন যন্ত্রের পারস্পরিকক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কথা মনে করিয়ে দেবে। বেদুঈনদের মধ্যে আপনি প্রায় দেখতে পাবেন এ ধরনের চলনভংগি মরুভূমির বাহুল্যহীনতা ওদের মধ্যে প্রতিফলিত। কারণ অল্প কটি শহর এবং গ্রাম বাদ দিলে, আরব দেশের মানুষের জীবন মানুষের হাতে এতো সামান্য্য আকৃতি পেয়েছে যে, প্রকৃতি তার কঠোর নিয়মকে মানুষকে বাধ্য করেছে আচার –আচরণে সকল প্রকার বিক্ষিপ্ততাকে বর্জন করতে এবং তার নিজের ইচ্ছা অথবা প্রয়োজনে করা সকল কাজকে রূপান্তরিত করতে স্বল্প কটি অতি নির্দিষ্ট, মৌলিক রূপে –যা অসংখ্য পুরুষ দরে একই রয়ে গেছে এবং কালক্রমে অর্জন করেছে স্পটিকের মসৃণ স্পষ্টতা। আর উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত এই সরলতাই এখন আমরা দেখতে পাই খাঁটি আরবের অংগভংগিতে যেমন, তেমনি জীবনে প্রতি তার মনোভঅবে।
-‘জায়েদ, তুমি আমাকে বলো, কাল আমরা কোথায় যাচ্ছি!’
জায়েদ স্মিত হাসির সাথে আমার দিকে তাকায় –‘কেন চাচা, আমরা তো তায়েমার দিকেই যাচ্ছি.. . ?’
-‘না ভায়া, আমি অবশ্যি চেয়েছিলাম তায়েমা যেতে! কিন্তু এখন আর আমি তা চাইছি না। আমরা যাচ্ছি মক্কা .. .’
পথের শুরু
এক
তৃষ্ণার কবলে পড়ার কয়েক দিন পর সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময়ে আমি আর জায়েদ পৌছুই একটি ছোট্ট পরিত্যক্ত ওয়েসিসে এবং রাতটা সেখানেই কাটাবার ইরাদা করি। ডুবন্ত সূর্যের কিরনের নীচে পুবদিকের বালু –পাহাড়গুলির রঙধনু-রঙ চাঁই –চাঁই আকীক পাথরের মতো ঝলমল করছে একটান পরিবর্তনশীল রঙীন খড়ি-রঙ ছায়া আর কোমলীকৃত আলোর প্রতিফলনের ধারায় –আর বর্ণের দিক দিয়ে এ পরিবর্তন এতোই নাজুক যে মনে হয়, ঘনায়মান গোধূলির ধূসরতার দিকে আগিয়ে চলা কোনো রকমে অনুভবযোগ্য ছায়া –স্রোতের অনুসরন করতে গিয়ে চোখও যেন তার প্রতি জুলুম করছে। আপনি এখনো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন খেজুর গাছের মাথাগুরি, যেন পালক-খচিত মুকুট, আর ওদের পেছনে, আধা লুকানো নিচু কাদা –ধসুর ঘর-বাড়ি আর বাগিচার দেয়ালগুলি! কুয়ার উপর কাঠের চাকাগুলি তখনও গান গেয়ে চলেছে।
গ্রামটি থেকে কিছু দূরে আমরা আমাদের উটগুলিকে শোয়াই খেজুর বাগানের নিচে। তারপর আদের ভারি বস্তাগুলি নামাই এবং উটের গরম পিঠের উপর থেকে জিন খুলে ফেলি। আমাদেরকে বেগানা দেখে আমাদের চারপাশে কয়েকটি দুরন্ত শিশু এসে জড়ো হয় এবং তাদের মধ্যে একটি ছেলে, যার চোখ বড়ো বড়ো এবং পরনে ছেঁড়া কাপড়, সে জায়েদকে বললো –কোথায় লাকড়ি পাওয়া যাবে সে তা দেখিয়ে দেবে। ওরা দুজন যখন লাকড়ির সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো তখন আমি উটগুলিকে নিয়ে তালাবের নিকট যাই। আমি আমার চাড়ার বালতি নামিয়ে পানি ভর্তি করে যখন তুলছি সেই সময় গাঁ থেকে কটি মেয়ে এলো পানি নেবার জন্য, তামার পাত্র এবং মাটির কলসে করে। ওরা পাত্রগুলি স্বচ্ছন্দে বহন করছে মাথায়, দুহাত দুপাশে ছেড়ে ঝুলিয়ে দিয়ে, বোঝার সংগে তাল রাখার জন্যই সামনের দিকে একটু ঝুঁকে, বোরকার ঝুল ঝাপটানো পাখার মতো দু’হাতে তুলে ধরে।
‘আসসালামু আলাইকুম, আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক হে মুসাফির।’
এবং আমি জবাব দিইঃ আর তোমাদের উপরও শান্তি আর আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হোক।’
ওদের পোশাক কালো রঙের এবং ওদর মুখমণ্ডল খোলা, যা আরবের এ অঞ্চলে গ্রাম্য এবং বদ্দু রমণীদের প্রায় প্রত্যেকের বেলায়ই সত্যি, ফলে আপনি সহজেই দেখতে পান ওদের কালো বিশাল চোখ। বহু পুরুষ ধরে যদিও ওরা বসতি স্থাপন করেছে এক মরূদ্যানে তবু ওরা ওদের পূর্বপুরুষদের যাযাবর জীবনের আন্তুরিক ভাবভংগি হারায়নি। ওদের চালচলন পরিষ্কার আর নির্দিষ্ট;ওদের বাকসংযম লজ্জা–শরম থেকে একেবারেই মুক্ত-যখন দেখলাম ওরা নিঃশব্দে বালিতির রশি আমার হাত থেকে তুলে নিচ্ছে এবং আমার উটের জন্য পানি তুলছে-ঠিক যেমনটি চার হাজার বাছর আগে এক তালাবের নিকটে সেই নারীটি করেছিলো ইবরাহীমের ভৃত্যের প্রতি-যখন সে কেনান থেকে এসেছিলো ‘পাদান আরাম’-এ তাদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর নিকট, তার মুনিবের পুত্র ইসহাকের জন্য একটি কনে যোগাড় করতে।
“সে সন্ধ্যাকালে শহরের বাইরে, একটি তালাবের কাছে হাঁটু গাড়িয়ে বসালো তার উটগুলিকে।
এবং সে বললো, ওগো আমার মুনিব, ইবরাহীমের প্রভু, আমি প্রার্থনা করছি তোমার নিকট, তুমি আজ আমাকে দ্রুতগতি দাও এবং আমার মুনিব ইবরাহিমের প্রতি দয়া করো। দেখো, এখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি একটি পানির তালাবের কাছে এবং নগরের লোকদের কন্যারা আসছে পানি তুলতে। এ রকম যেনো ঘটে যে, আমি যে তরুণীকে বলবো, আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি- তোমার কলসী নামাও, যাতে আমি পেতে পারি পানি এবং সে বলবে, খাও-এবং তোমার উটগুলিকে পানি খাওয়াবো আমি’- ‘সে যেনো ঐ মেয়ে হয় যাকে তুমি মনোনীত করেছো তোমার দাস ইসহাকের জন্য এবং তাহলেই আমি জানতে পারবো তুমি আমার মুনিবের প্রতি দয়া প্রদর্শন করেছো।
এবং দেখো, তার কথা বলার আগেই এরূপ ঘটলো যে, রেবেকা এসে হাজির হলো.. .তার কাঁদের উপর তার কলস। আর তরুণীটি ছিলো দেখতে অতি সুন্দর এবং কুমারী, যাকে স্পর্শ করেনি কোনো পুরুষ। সে ইদারার ভেতর নেমে ভর্তি করলো তার কলস, তারপর উঠে এলো।
নওকরটি তার নিকট ছুটে গিয়ে বললো, ‘আমি তোমার নিকট মাঙছি –তোমার কসল থেকে পানি খেতে দাও আমাকে’। সে বললো,‘পান করুন প্রভু।’ এবং তাড়াতাড়ি করে কলসটিকে তার হাতে নামিয়ে তাকে খেতে দিলো পানি। পানি খাওয়ার পর তরুণীটি বললো, আমি উটগুলির জন্যও পানি তুলবো যতোক্ষণ না ওদের পিয়াস মিটছে।’ সে দেরী না করে তার কলস খালি করে পানি ঢেলে দেয় গামলার মধ্যে যেখান থেকে উটগুলি খাবে এবং আবার ছুটে যায় ইঁদারার ভেতরে আর সব কটি উটের জন্যই তুলতে থাকে পানি.. .”
বিশাল নুফুদের বালুরাশি মধ্যে ছোট একটি ওয়েসিসে একটি ইঁদারার কাছে আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার দুটি উট নিয়ে, আর তাকাচ্ছি মেয়েটির দিকে যে বালতির রশি আমার হাত থেকে নিজের হাতে আর আমার জন্তুগুলির জন্য পানি তুলছে –আর আমার মনের উপর তখন ভেসে চলেছে বাইবেলের ঐ কাহিনী। ‘পাদান আরাম’ নামক সেই দেশ এবং ইবরাহীমের জমানা বহু বহু দূরের কিন্তু এই রমণীরা ওদের মর্যাদাপূর্ণ অংগভঙ্গি যে স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলেছে তারি জোরে, স্থানের সব ব্যবধান দিয়েছে মুছে এবং সময়ের বিচারে দীর্ঘ চার হাজার বছর যেন কিছুই নয়!
-প্রিয় বোনেরা, আল্লাহ তোমাদের হাতকে ধন্য করুন এবং সালামতে রাখুন।
-আর হে মুসাফির, আপনিও থাকুন আল্লাহর হিফাজতে, ওরা জবাব দেয়, তারপর ওরা মনোযোগী হয় ওদের গামলা আর কলসগুলির প্রতি- সেগুলি ভর্তি করে ঘরে পানি নিয়ে যাবার জন্য।
আমাদের তাঁবুর জায়গায় ফিরে এসে আমি আমার উটগুলিকে হাঁটু গাড়িয়ে বসাই এবং সামনের পাগুলিতে বেড়ি পরিয়ে দেই, যাতে ওরা রাতের বেলা কোথাও চলে যেতে না পারে। জায়েদ এরি মধ্যে আগুন ধরিয়েছে এবং কফি তৈরি করতে লেগে গেছে। একটা লম্বা বাঁকানো নল, পনি টগবগ করছে; একই আকারের ছোট্ট আরেকটি কফি পাত্র জায়েদের কনুইয়ের কাছে তৈরি রয়েছে। বাঁ হাতে সে ধরে আছে চ্যাপ্টা প্রকাণ্ড একটি লোহার চামচ, যার হাতলটি দু-ফুট লম্বা; এই চামচে সে মৃদু আগুনোর উপর এক মুঠপা কফিগুলি ভাজচে, কারণ আরব দেশে প্রতিটি পাত্রের জন্যই নতুন করে ভাজা হয় কফি। কফিগুলি কিছুটা তামাটে হয়ে ওঠার সংগে সংগেই জায়েদ সেগুলি একটি কাঁসার তৈরি হামানদিস্তায় রাখে এবং গুঁড়া করে। এরপর সে বড় পাত্রটি থেকে কিছু ফুটন্ত পানি ছোটো পাত্রিটিতে ঢালে –চুর্ণ কফি এর মধ্যে ঢেলে দেয় উপুড় করে এবং পাত্রটিকে রেখে দেয় আগুনের কাছে, যাতে করে ধীরে ধীরে ফুটতে পারে পানি। পানীয়টি প্রায় তৈরি হয়ে এলে জায়েদ তাতে কিছু এলাচ দানা ছেড়ে দেয় পানীয়টিকে তীব্রতরো করার জন্য, কারণ আরব দেশে কথা আছে, কফি যদি ভালো হতে হয়, অবশ্যি তা হতে হবে মৃত্যুর মতো তীব্র এবং প্রেমের মতো ঝাল ও উষ্ণ।’
কিন্তু আমি এখনো আরামের সাথে কফি পানের জন্য তৈরি নৈই। ক্লান্ত-দীর্ঘ, উত্তপ্ত ঘন্টার পর ঘন্টা জীনের উপর বসে থেকে ঘর্মাক্ত –পরনের পোশাক আমার শরীরের চামড়ার সাথে লেপ্টে আছে নোঙরভাবে, স্বভাবতই গোসলের জন্য সারা সত্ত্বা লালায়িত হয়ে আছে, তাই আমি ধীরে ধীরে আবার ফিরে যাই খেজুর বাগানের নিচে কুয়াটির কাছে।
আঁধার ঘনীয়ে এসেছে এরি মধ্যে। খেজুর বাগান থেকে সবাই ঘরে ফিরে গেছে। শুধু দূরে, যেখানে ঘর-বাড়িগুলি দাঁড়িয়ে আছে সেখানে একটি কুকুর ডাকছে। আমি আমার গায়ের কাপড়-চোপড় ফেলে দিয়ে নেমে পড়ি কুয়ার ভেতরে, কুয়ার দেয়ালের তাক ও খাঁজে হাত আর পা রেখে এবং কয়েকটি রশি অবলম্বন করে – যে রশিতে ঝুলছে পানি তোলার মশকগুলিঃ আমি নেমে পড় অন্ধকার পানি পর্যন্ত, তারপর সেই পানির ভেতরে। পানি বড় ঠান্ডা এবং আামর বুক পর্যন্ত পৌছুলো সেই পানি। অন্ধকারে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পানি তোলার রশিগুলি-এখন পানিতে ডোবা মস্ত বড়ো মশকগুলির ভারে সটান খাড়া হয়ে। দিনের বেলা এই মশকগুলিই ব্যবহৃত হয় ক্ষেতে পানি দেবার কাজে। পায়ের তলার নিচে আমি অনুভব করি, পাতলা ক্ষীণ পানির ধারা চুঁয়ে চুঁয়ে উপরদিকে উঠছে মাটির নীচের উৎস থেকে, যা এক মন্থর, চির-নতুনের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় কুয়াটিকে রাখছে তাজা।
আমার উপরে কুয়াটির মুখের উপর বাতাস হু হু করছে এবং কয়াটির ভেতর সৃষ্টি করছে ক্ষীণ প্রতিধ্বনি, যেন কানের কাছে চেপে ধরা সামুদ্রকি শঙ্খের ভেতরের আওয়াজ –একটি বৃহৎ শন শন ধ্বনি করা সামুদ্রিক শঙ্খ, যা আমি কানের কাছে চেপে ধরে শুনতে ভালোবাসতাম আমার আব্বার বাড়িতে, বহু বহু বছর আগে যখন আমি শিশু –কোনা রকমে টেবিলের উপর তাকাতে পারি লম্বায় অতটুকু উঁচু। আমি কানে চেপে ধরতাম শঙ্খটি আর বিস্মিত হয়ে ভাবতাম, এ আওয়াজ কি সবসময়ই শঙ্খের ভেতরে উঠছে, না, আমি যখন এটিকে কানের কাছে ধরি তখনি তা বেজে ওঠে। আমার সংগে কি এর কোনো সম্পর্ক নেই? এ সংগীত কি এমনি বাজছে? না কি আমি যখন শুনতে চাই তখনি বেজে ওঠে? বহুবার আমি চেষ্টা করেছি শঙ্খটিকে চালাকিতে হারিয়ে দিতে আমার নিকট থেকে ওটিকে দূরে রেখে, যাতে শন শন ধ্বনিটি থেমে যায়-তারপর, হঠাৎ আবার সেটিকে চেপে ধরেছি কানের কাছে। আবার সেই সংগীত, সেই ধ্বনি! আমি কখনো এ সমস্যার সমাধান করতে পারিনিঃ যখন আমি শুনতে চেষ্টা করতাম তখনো শঙ্খের ভেতরে এ সংগীত বেজে চলতো কিনা!
অবশ্য আমি তখনি বুঝতে পারিনি যে, আমার বুদ্ধি তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে এমন একটি প্রশ্নে যাতে হতবুদ্ধি হয়েছেন আমার চেয়ে অনেক বেশি দানিশমন্দ আদমীরা অসংখ্য জামানা ধরেঃ প্রশ্নটি হচ্ছে – আমাদের মন-নিরপেক্ষ ‘সত্য’ বা ‘বাস্তব’ বলে কিছু আছে কি না, কিংবা আমাদের প্রত্যক্ষ উপলব্ধিই তা সৃষ্টি করে কিনা। কিন্তু ফেলে আসা দিনগুলির দিকে তাকিয়ে আমর মনে হচ্ছে-এ সমস্যা কেবল ছোটবেলায়ই আমার পিছু পিছু ধাওয়া করেনি, পরবর্তীকালেও করেছে –যেমন ধাওয়া করে থঅকবে কোনো –না কোনো সময়, জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে, প্রত্যেকটি চিন্তাশীল মানুষকেই। কারণ, ব্যক্তি-নিরেপক্ষ সত্য যা-ই হোক, পৃথিবী আমাদের নিকট নিজেকে ব্যক্ত করে সেই আকৃতিতে এবং ততোটুকু যে আকৃতি এবং যতোটুকু প্রতিফলিত হয় আমাদের মন। কাজেই, আমরা প্রত্যেকেই ‘সত্য’ উপলদ্ধি করতে পারি কেবল নিজের অভিজ্ঞতারই যোগসূত্রে। এখানেই হয়তো পাওয়া যাবে মানুষের চেতনার প্রথম সূচনা থেমে মৃত্যুর পর মানুষের বেঁচে থাকায় মানুষের চিরন্তন বিশ্বাসের একটি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা এবং এ বিশ্বাস এতো গভীর, সকল কওম ও সকল কালে এতো ব্যাপকভঅবে সম্প্রসারিত যে একে কেবল একটি খেয়ালি ধারণ বলে সহজেই উড়িয়ে দেয়া সম্ভব নয়। এ কথা বলা হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, মানুষের মনের বিশেষ গড়নের ফলেই এ বিশ্বাস অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে, অনিবার্যভাবেই। বিমূর্ত তাত্ত্বিক অর্থে নিজের মৃত্যুকে চূড়ান্ত বিলুপ্তি বলে মানুষের পক্ষে চিন্তা করা হয়তো কঠিন নয়, কিন্তু সেই বিলুপ্তিকে দৃষ্টিগোচরে আনা অসম্ভব। কারণ এর অর্থই এই যে, মানুষ বাস্তব বস্তু মাত্রেরই বিলুপ্তি প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হবে। অন্য কথায় সে পারবে শূন্যতার ধারণা করতে যে ধারণা কেনো মানুষের মনই করতে সক্ষম নয়।
দার্শনিক এবং নবী-রসূলগণ নতুন করে আমাদের শেখাননি মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে –তাঁরা তো কেবল পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের মতোই প্রাচীন, সহজাত একটি ধারণাকে রূপ দিয়েছেন এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্যমণ্ডিত করেছেন।
সারাদিনের সফরের ধূলাবালু আর ঘাম ধুয়ে ফেরার মতো নেহাৎ জাগতিক ক্রিয়ার সাথে এ ধরনের গভীর সমস্যা নিয়ে ভাবনা-চিন্তার মধ্যে যে অসঙ্গতি রয়েছে তাতে আমি মনে মনে না হেসে পারি না। দৃষ্টি বা বুদ্ধিগ্রাহ্য কেনো সীমারেখা জীবনের জাগতিক এবং নিগূঢ় দিকের মধ্যে আছে কি? নজিরস্বরূপ, একটি হারানো উটের খোঁজের বের হওয়ার চাইতে অধিকতরো জাগতিক বিষয় কী হতে পারে? এবং পিয়াসে প্রায় মৃত্যুর চেয়ে নিগূঢ়তরো এবং দুর্বোধ্যতরো বিষয়ই বা কী হতে পারে?
হয়তো সেই অভিজ্ঞতার ধাক্কাই আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে করেছে তীক্ষ্ণ, ধারালো এবং আমার নিজের নিকট একটা কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজনীতাকে করে তুলেছে অনিবার্য। সেই প্রয়োজনটি হচ্ছে- আমি আমার নিজের জীবনের গতিকে আগে যেভাবে উপলব্ধি করেছ তার চাইতে পূর্ণতরোরূপে তাকে উপলব্ধি করার প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু তাই বলে, আমি আমার মনকে স্মরণ করিয়ে দিই, মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে ততদিন কি সে সত্যি তার নিজের জীবনের মানে উপলব্ধি করতে পারে?
হয়তো সেই অভিজ্ঞতার ধাক্কাই আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে করেছে তীক্ষ্ম ধারালো এবং আমার নিজের নিকট একটা কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তাকে করে তুলেছে অনিবার্য। সেই প্রয়োজনটি হচ্ছে-আমি আমার নিজের জীবনের গতিকে আগে যেভাবে উপলব্ধি করেছি তার চাইতে পূর্ণতরোরূপে তাকে উপলব্ধি করার প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু তাই বলে, আমি আমার মনকে স্মরণ করিয়ে দিই, মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে ততদিন কি সে সত্যি তার নিজের জীবনের মানে উপলব্ধি করতে পারে? আমাদের জীবনে, এই মুহূর্তে বা অমুক সময়ে কী ঘটেছে তা –ও আমরা মাঝে মাঝে জানি, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য, আমাদের অদৃষ্ট অতো সহজে বোঝা বা দেখা যায় না। কারণ, অদৃষ্ট হচ্ছে অতীত ও বর্তমান, যা কিছু আমাদের মধ্যে ঘটেছে আর আমাদেরকে চালিত করেছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু আমাদের মধ্যে ঘটবে ও আমাদেরকে আমাদেরকে চালিত করবে তারই মোটমাট যোগফল এবং সে কারণে, আমাদের যাত্রার একেবারে শেষেই কেবল তার পূর্ণ রূপটি ধরা দিতে পারে এবং যতোদিন আমরা পথ চলছি ততোদিন সবসময় আমরা তাকে ভুলই বুঝবো কিংবা কেবল অর্ধেকই বুঝবো।
আমি আমার এই বত্রিশ বছর বয়সে কী করে বলতে পারি, আমার অদৃষ্ট কী ছিলো কিংবা তা কী?
আমার ফেলে আসা জীবনের দিকে আমি যখন তাকাই, কখনো কখনো আমার মনে হয়, আমি যেন দুটি মানুষের জীবনই দেখছি। কিন্তু এ বিষয়ে যখনই ভবি, প্রশ্ন জাগে আমার জীবনের এ দুটি অংশ কি আসলেই একে অপর থেকে এতো আলাদা-না কি রূপ ও পন্থার বিষয়ে এতো সব বাহ্য-পার্থকের তলদেশেও জীবনের উভয় অংশে সবসময়েই ছিলো অনুভূতির মিল এবং লক্ষ্য ছিলো একই?
আমি আমার মাথা তুলি এবং কুয়ার বৃত্তাকার কাঁধির উর্ধ্বেদেশে দেখতে পাই আসমানের একটি বৃত্তাকার খণ্ড এবং তারসমূহ। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি নিশ্চল; আর আমার মনে হলো, আমি যেনো দেখতে পাচ্ছি কী করে ওরা ধীরে ধীরে স্থান বলে চলেছে যাতে করে ওরা পুরা করতে পারে লাখো-কোটি বছরের চক্র যা কখনো শেষ হবার নয়। এবং তারপর, আমি না চাইলেও আমাকে ভাবতে হয়, বছরের চক্র যা কখনো শেষ হবার নয়। এবং তারপর, আমি না চাইলে, আমাকে ভাবতে হয়, বছরের যে স্বল্প কটি পাড়ি আমি পার হয়ে এসেছি তার কথা, সেই অস্পষ্ট বছরগুলি যা আমি কাটিয়েছি আমার শৈশবের গৃহের উষ্ণ নিরাপত্তায়, অমন একটি শহরে, যার প্রতিটি অলিগলি ছিলো আমার চেনা পরিচিত.. . তারপর বড় বড় সব নগরীতে, উত্তেজনা ও আশা আকঙ্খায় ভরপুর নগরীতে কাটানো দিনসব, যা শুধু কিশোরই পারে অনুভব করতে… এরপর এক নতুন জগতে, যেখানে মানুষগুলির চেহার-সুরত প্রথমে মনে হয়েছিলো বিদেশী, কিন্তু কালক্রমে নিয়ে এসেছিলো এক নতুন অন্তরংগতা এবং স্বগৃহে ফেরার নতুনতরো অনুভূতি। তারপর.. অপরিচিত… আরো অপরিচিত পটভূমিকায়, মানব-মনের মতোই পুরোনো সব শহর-নগরে দিন যাপন, দিগন্তহীন স্তেপ অঞ্চলে, পাহাড়-পর্বতে, যার আদিমতা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেয় মানব হৃদয়ের বন্য আদিমতার কথা… এবং মরুভূমির নির্জন উত্তপ্ত একাকীত্বে গড়িয়ে চলা দিনগুলি ধীরে ধীরি জন্ম নেয় নতুন সত্য-সত্য, যা আমার কাচে নুতন .. এবং সেদিন দীর্ঘ আলাপের পরে, হিন্দুকুশ পর্বতের তুষারের মধ্যে এক আফগান বন্ধু বিস্মিত হয়ে বলে উঠেছিলো.. . ‘কিন্তু আপনি তো মুসলিম; আপনি নিজে তা জানেন না, এই যা।’ … এবং আরেক দিন,কয়েক মাস পরে যখন আমি নিজেই তা জানতে পেরেছিলাম। তারপর মক্কায় আমার প্রথম হজ্জ্ব, আমার স্ত্রীর মৃত্যু এবং তার পরবর্তী নৈরাশ্য; আর তখন থেকে আরবদের মধ্যে কাটানো এই সব মুহূর্ত-অন্তহীন মুহূর্তগলি এবং বছরের পর বছর মরুভূমি আর স্তেপের মধ্যে ঘরে বেড়ানো আরব বেদুঈনদের যুদ্ধের মদ্যে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে সফর করা, লিবিয়ার আজাদী সংগ্রামে শরীক হওয়া এবং মদীনায় দীর্ঘদিন অবস্থান.. যেখানে ইসলাম সম্বন্ধে আমার জ্ঞান পরিপূর্ণ কারার জন্য আমি চেষ্টা করি মসজিদে নববীতে; তারপর বারবার হ্জ্ব; বেদুঈন বালিকাদের সাথে শাদি আর পরে তালাক; মানুষের সাথে আগেগোষ্ণ সম্পর্ক এবং একাকীত্বের উষর দিনগুলি… পৃথিবীর সকল অঞ্চলের বিদগ্ধ মুসলমানদের সাথে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা, অজানা অনাবিষ্কৃত এলাকার মধ্যে দিয়ে সফরঃ প্রতীচ্য জীবনের চিন্তাধারা ও লক্ষ্য থেকে অনেক দরের জগতে নিমজ্জনের এই বছরগুলি।
বছরের পর বছরের কি সুদীর্ঘ মিছিল! এই মুহূর্তে,এই সব নিমজ্জিত বছর এখন ভেসে উঠেছে এবং আবার তাদের মুখের পর্দা তুলে বহু স্বরে আমাকে ডাকতে শুরু করেছে আর অকস্মাৎ আমার হৃদয়ের এক চকিত ঝাঁকুনিতে আমি দেখতে পেলাম কতো দীর্ঘ, কী অন্তহীন আমার এই পথ চলা! –তুমি তো হামেশাই কেবল চলেছো, আর চলেছো ‘ আমি নিজেকে বলি, ‘তোমার নিজের জীবনেকে তুমি এখনো এমন কোনো রূপ দিতে পারোনি যা মানুষ ধরতে পারে তার হাত দিয়ে এবং কখনো পারোনি ‘কোথায়’-এই প্রশ্নের জবাব দিতে। … ‘তুমি তো কেবল চলেছো আর চলেছো… মুসাফির রূপে, বহুদেশের ভেতর দিয়ে, বহুঘরের মেহমান য়ে, কিন্তু তোমার সফরের তামান্না তো এখনো শেষ হয়নি এবং তুমি যদিও অপরিচিত নও, তুমি এখনো শিকড় গাড়তে পারোনি।
আমি এক মানব গোষ্ঠীর মাঝে নিজের জায়গা করে নিয়েছি-ওরা যাতে বিশ্বাস করে আমি ও সে সব বিষয়ে বিশ্বাস এনেছি, – তবু আমি এখনো শিকড় গাড়তে পারিনি, এর কারণ কী?
দুবছর আগে আমি যখন মদীনায় এক আরবী জরু গ্রহণ করি তখন আমি এই কামনাই তো করেছিলাম যে, ও আমাকে একটি বেটা ছেলে সওগাত দেবে। তার পুত্র তালাল, যে মাত্র কয়েক মাস আগে আমাদের ঘরে জন্মেছে তাকে পেয়ে আমি অনুভব করতে শুরু করেছি যে আরবেরা একাধারে আমার স্বজন এবং আদর্শিক ভাই। আমি চাই যে তালাল দেশের গভীরে তার শিকড় গাড়ুক এবং রক্ত ও তমুদ্দুনের যে মহৎ উত্তরাধিকার তার রয়েছে তারি উপলব্ধির মধ্যে সে বেড়ে উঠুক। আমার মনে হয়ে, কোথাও স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের জন্য এবং পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী আবাস প্রতিষ্ঠার জন্য যে-কোন ব্যক্তিকে লালায়িত করে তোলার পক্ষে এই যথেষ্ট। তাহলে, কেন এখনো আমার ঘুরে বেড়ানো শেষ হলো না, কেন এখনো আমাকে চলতে হচ্ছে আমার পথে? কেন আমার জন্য আমি নিজে যে-জীবন বেছে নিয়েছি তা এখনো পুরাপুরি আমাকে খুশি করতে পারছে না? কী সেই জিনিস যা আমি পাচ্ছি না এই পরিবেশে?-ইউরোপের বুদ্ধিগত কৌতুহল তা নিশ্চয়ই নয়। আমি সে-সব ফেলে এসেছি পেছনে। এতে যে আমার খুব লোকসান হয়েছে তা নয়। বলতে কি, আমি এসব থেকে এতো দূরে সরে পড়েছি যে, ইউরোপের যে কাগজগুলি আমার রুটিরুজি যোগাচ্ছে সে-সবের জন্য লেখা তৈরি করাও দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে আমার জন্য। যখনি আমি কোনো লেখা পাঠাই আমার মনে হয়, আমি যেন এক অতল কুয়ার ভেতর ছুঁড়ে মারছি একখণ্ড পাথরঃ পাথরটি গায়েব হয়ে যায় অন্ধকার শূন্যতায় এবং সামান্য একটু প্রতিধ্বনিও আসে ন াআমাকে একথা জানাতে যে পাথরটি গিয়ে পৌছেছে তার লক্ষ্যস্থলে।
এভাবে যখন আমি চিন্তু করছি, অস্থিরতা এবং বিমূঢ়তার মধ্যে আরবের এক ওয়েসিসের কুয়ার অন্ধকার পানিতে, অর্ধ-নিমজ্জিত অবস্থায়, হঠাৎ আমি আমার স্মৃতির পটভূমিকা থেকে শুরতে পাই একটি কন্ঠস্বর… এক বুড়ো কুর্দিশ যাযাবরের গলার আওয়াজঃ ‘পানি যদি বদ্ধ জলার মধ্যে তার গতি হারিয়ে ফেলে, পানি হয়ে ওঠে বসি, জীর্ণ এবং ময়লা, কিন্তু যখন তা গতিশীল ও প্রবাহিত হয় তখন পানি হয়ে ওঠে স্বচ্ছ, পরিষ্কার। নিরন্তর ভ্রাম্যমান চলমান মানুষের অবস্থাও তাই।’ এরপর মনে হলো যেন যাদুমন্ত্র বলে আমার সকল চাঞ্চল্য থেকে গেছে। আমি সুদূর আঁখি মেলে তাকাতে শুরু কারি আমার জীবনের দিকে, যেমন আমি তাকাই একটি বই-এর পাতায়, তা থেকে একটি গল্প পড়ার জন্য এবং আমি বুঝতে শুরু করি যে, আমার জীবনের গতি ভিন্ন হতে পারতো না এর থেকে; কারণ, যখন আমি নিজেকে জিজ্ঞাস করি, ‘আমার জীবনের মোটফলটা কী,’ আমার ভেতর থেকেই কে যেন জবাব দেয়ঃ ‘তুমি বের হয়েছো এক জগতের বদলে আরেক জগৎ পাবার জন্য-এক নতুন জগৎ হাসিলের জন্য পুরানো এক জগতের বদলে, প্রকৃতপক্ষে যার অধিকারী তুমি কোনোদিই ছিলে না। ‘এবং চকিত স্বচ্ছতায় আমি বুঝতে পারি-এ ধরনের একটা প্রয়াসে আসলে গোটা জীবনটারই প্রয়োজন হতে পারে।
আমি কুয়ার ভেতর থেকে বের হয়ে আসি, সাথে যে পরিষ্কার লম্বা কুর্তা আমি এনেছিলাম তা গায়ে চড়াই এবং ফিরে যাই আগুনের নিকট জায়েদের কাছে, উটগুলির পাশে। জায়েদ আমাকে যে কড়া কফি দিলো আমি তা-ই খাই, তারপর আগুনের কাছে মাটির উপর সটান শুয়ে পড়ি, সতেজ প্রাণবন্ত হয়ে।
দুই
আমার ঘাড়ের নিচে আড়াআড়িভাবে রাখা আমার হাত দুটি; এবং আমি তাকিয়ে আছি এই আরবীয় রাতের দিকে, অন্ধকার তারাখচিত রাত, যা ধনুকের মতো বেঁকে আছে আমার উপরে। একটা বৈদ্যুতিক চাপের আকারে ছুটে চলেছে একটি উল্কা, এবং এই যে আরেকটি তারপর আরেকটিঃ আলোর চাপ বিদীর্ণ করছে অন্ধকারের বুক! এগুলি কি কেবল খণ্ড-বিখণ্ড গ্রহের টুকরো, কোনো এক মহাজাগতিক বিপর্যয়েরই ভগ্নাবশেষ, যা এখন উদ্দেশ্যহীনভাব ধেয়ে চলেছে মহাবিশ্বের অসীম বিস্তারের মধ্য দিয়ে? ওহো! তা নয়। আপনি যদি জায়েদকে জিজ্ঞাস করেন, সে আপনাকে বলে দেবে-এগুলি হচ্ছে আগুনের বর্শা, যার সাহায্যে ফেরেশতারা বিতাড়িত করে শয়তানকে, কোনো কোনো রাতে যে চুপি চুপি আসমানের উঠে যায় আল্লাহর রহস্য চুরি করে জানবার জন্য… একি তাহলে শয়তানের রাজা ইবলিস নিজে, যার উপর পূর্বাকাশে, এইমাত্র প্রচণ্ড বেগে নিক্ষেপ করা হয়েছে অগ্নিবাণ.. .?
এই আসমান এবং এর তারকারাজির সাথে সম্পর্কিত উপকথাগুলি-আমার কাছে বেশি পরিচিত, আমার শৈশবের ঘর থেকে.. .
এছাড়া অন্য রকম কী করেই বা হতে পারতো? আরব দেশে যখন আমি ঢুকেছি তখন থেকেই জিন্দেগী গুজরান করেছি একজন আরবেরই মতো, কেবল আরবী পোশাকই পরেছি, কথাও বলেছি কেবল আরবী জবানে আর আমার স্বপ্নগুলিও দেখেছি আরবীতে; আরবের রীতিনীতি আর চিত্রৈশ্বর্য প্রায় অলক্ষিতেই রূপ দিয়েছে আমার চিন্তাকে। একটি দেশের আচার-আচরণ আর ভাষায় একজন বিদেশী যতো দক্ষই হোক না কেন, মনের যে কার্পণ্যের ফলে সাধারণত তার পক্ষে ভিন দেশের মানুষের আবেগ-অনুভূতি উপলব্ধির প্রকৃত পথ খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না এবং তাদের জগতকে নিজের জগৎ করে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে , সে –সবের দ্বারা আমি কখনো বাধাগ্রস্থ হইনি।
হঠাৎ আমি সুখ ও মুক্তির হাসিতে উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠি-এতো জোরে হেসে উঠি যে জায়েদ বিস্মিত চোখ মেলে আমার দিকে তাকায় এবং আমার উটটি একটি ধীর অস্পষ্ট উন্নাসিক ভংগিতে তার মাথা আমার দিকে ফেরায়ঃ কারণ, এই মুহূর্তে আমি দেখতে পেলাম আমার পথটি, তার এতো দৈর্ঘ্য সত্ত্বেও কতো সহজ এবং সরল-যে জগত আমার ছিলো না সেকান থেকে একান্তভাবে আমার নিজের জগতের এই রাস্তাটি।
এদেশে আমার আসা-একি সত্যি নিজেরই ঘরে প্রত্যাবর্তন নয়? একটি হৃদয়ের নিজের ঘরে ফেরা, যে হাজার হাজার বছরের বাঁক ঘুরে তার নিজের ঘর খুঁজেছে এবং এখন চিনতে পেরেছে এই আকাশকে-আমার আকাশকে-বেদনাময় উল্লাসের সংগে? কারণ, এই আরবের আকাশ এতো গাঢ়, এতো উঁচু এবং যে –কোনো দেশের আকাশের চাইতে তারায় তারায় অনেক বেশি উৎসব মুখর, এই আকাশটাই চাঁদোয়ার মতো ছিলো আমার পুর্বপুরুষদের পথের উপর, সেই ভ্রাম্যমাণ পশুচারী যোদ্ধারা, যারা হাজার হাজার বছর আগে তাদের ক্ষমাতর একেবারে প্রভাতকালে জমি ও গণিমতের লোভে অন্ধ হয়ে রওনা করেছিলো কালদিয়ার উর্বর এলাকা এবং এক অজানা ভবিষ্যতের দিকেঃ ইহুদীদের সেই ছোট্ট বেদুঈন কবিলা-সেই লোকদের পিতৃপুরুষ যিনি পরে পয়দা হয়েছিলেন ‘কালদি’দের ‘উর’ নামক স্থানে।
সেই ব্যক্তি, যাঁর নাম ইবরাহিম, তিনি ‘উর’ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না। তাঁর কবিলা ছিলো আরবের বহু গোত্রের মধ্যে একটি। এসব আরব গোত্র কোনো না-কোনো সময়ে উপদ্বীপের ক্ষুধার্ত মরুভূমি হতে এঁকে-বেঁকে যাত্রা করেছে উত্তরের স্বপনপুরীর দিকে, যে এলাকাগুলি দুধ আর মধুতে সয়লাব ছিলো ওরা মনে করতো। উর্বর আল-হিলালের আবাদী এলাকা সিরিয়া এবং মেসোপটিমিয়াই হচ্ছে সেই সব অঞ্চল। কখনো কখনো এই সব কবিলা ওখানকার বাসিন্দাদের পরাজিত করে ওদের জায়গায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে ওখনাকার বাসিন্দাদের পরাজিত করে ওদের জায়গায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে শাসকরূপে, ক্রমে ওরা মিশে গেছে পরাজিতদের সাথে আর ওদের সহ নতুন এক জাতিরূপে হয়েছে অভ্যুত্থান, আসিরীয় এবং ব্যাবলনীয়দের মতো জাতির-যারা তাদের রাজ্য গড়ে তুলেছিলো আগেকার সুমেরীয় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের উপর-কিংবা কালদিদের মতো যারা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছিলো ব্যাবিলনের অথবা এমোরাইতদের মতো যারা পরে কেনানী বলে পরিচিত হয়েছিলো ফিলিস্তিনে এবং ফনীশীয়রূপে, সিরিয়ার উপকূলভাগে। আবার কখনো কখনো বহিরাগত পশুচারী যাযাবরেরা এতোই দুর্বল ছিলো যে যারা ওদের পূর্বে এসেছিলো তাদেরকে হারাবার শক্তি ওদের ছিলো না; পরিণামে এরা পূর্বগতদের মধ্যে হারিয়ে যায় অথবা আবাদীরা পিছু হটিয়ে দেয় যাযাবরদেরকে মরুভূমির দিকে, আর এমনিভাবে ওদেরকে বাধ্য করে নতুন পশু চারণের ক্ষেত্র তালাশ করতে এবং সম্ভবত ভিন্ন এলাকা জয় করতে। ইবরাহীমের আসল নাম তৌরত অনুসারে ‘আব-রাম’, প্রাচীন আরবী ভাষায় যার মানে হচ্ছে সেই ব্যক্তি-যিনি উচ্চাভিলাসী স্পস্টতই এই ইবরাহীমের কাবিলা ছিলো কমজোর গোত্রগুলি একটি। মরুভূমির প্রান্তদেশে উষর অঞ্চলে তাদরে বসতি সম্পর্কে বাইবেলে যে কাহিনী আছে তা সেই সময়ের কথাই বর্ণনা করে যখন তারা বুঝতে পেরেছিলো-দোজলা অঞ্চলে নিজেদের জন্য নতুন ঘর খুঁজে পেতে তারা ব্যর্থ হয়েছে-এবং তারা তৈরি হচ্ছিলো, ফোরাতের তীর বরাবর উত্তর-পশ্চিমে হারানেরা দিকে এবং সেখান হতে সিরিয়ার দিকে, রওনা করার জন্য।
‘সেই ব্যক্তি-যিনি উচ্চাভিলাসী’-আমার সেই আদি পূর্বপুরুষ, যাঁকে আল্লাহ ঠেলে দিয়েছিলেন অজানা অজ্ঞাত সব এলাকার দিকে, এমনি করে আবিষ্কার করতে নিজের সত্তাকে-তিনি নিশ্চয় বুঝতেন, ভালো করেই বুঝতেন, কেন আম এখানে এসেছি-কারণ, তাঁকেও বহু দেমের মধ্যে দিয়ে ছুটাছুটি করতে, কেন আমি এখানে এসেছি-কারণ, তাঁকেও ববহু দেশের মধ্যে দিয়ে ছুটাছুটি করতে, ঘোরাফেরা করতে হয়েছে, -নিজের জীবনকে অমন একটি রূপ দিতে পাবার আগে যাকে আপনি ধরতে, স্পর্শ করতে পারেন আপনার হাত দিয়ে; বিশেষ এক জায়গায় শিকড় গেড়ে বসার পূর্বে তাঁকেও হতে হয়েছে বহু ঘরের মেহমনা। তাঁর সেই যুগপৎ শ্রদ্ধা-ভীতি জাগানো অভিজ্ঞতার কাছে আমার এই তুচ্ছ বিমূঢ়তা কোনো সমস্যাই মনে হতো না। তিনি বুঝতেন যেমন আমি বুঝতে পারছি এখন-আমার ঘুরে বেড়ানোর মানে নিহিত রয়েছে এমন এক জগতের সাথে পরিচিত হয়ে আমার নিজের সাথে পরিচয়ের একটি সুপ্ত বাসনার মধ্যে, জীবনের গভীরতম প্রশ্ন-সকল এবং সত্য-স্বরূপের প্রতি যে-জগতের দিকে অভিগমন, আমি শৈশব ও যৌবনে যা-কিছুর সাথে পরিচিত ও অভ্যস্ত ছিলাম তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
তিন
মধ্য ইউরোপে আমার শৈশব ও যৌবনকাল থেকে আরবে আমার হালের জীবন পর্যন্ত কী সুদীর্ঘ পথ! কিন্তু জীবনের ফেলে আসা এই দিনগুলির স্মৃতিচারণ কতো আনন্দের।
সেই প্রথম শৈশবের দিনগুলি-পোলাণ্ডের লাও নগরী তখনও অস্ট্রিয়ার অধীনে-এমন একটা বাড়িতে কাটানো, যা ছিলো সেই রাস্তাটির মতোই নীরব এবং মর্যাদাপূর্ণ, যার পাশে দাঁড়িয়েছিলো বাড়িটি। লম্বা রাস্তা, কিছুটা ধুলিধূসর অথচ পরিচ্ছন্ন, দুপাশে সারি সারি চেস্টগান গাছ, পুরু কাঠের তক্তা বিছানো সেই রাস্তা ঘোড়ার ক্ষুরের ধ্বনিকে চাপা দিয়ে দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে রূপান্তরিত করতে অলস বিকালে। আমি ভালোবাসতাম সেই সুন্দর রাস্তাটিকে এক অদ্ভুদ সজ্ঞানতার সংগে, আমার শৈশবের শহরগুলির সাথে-কেবল এ করণেই নয় যে, রাস্তাটি ছিলো আমার বাড়ির রাস্তা; বরং আমি মনে করি, আমি একে আসলেই ভালোবাসতাম, কারণ একটি মহৎ প্রশান্তির ভাব নিয়ে রাস্তাটি হাসি-খুশিতে উচ্ছ্বাসিত শহরে প্রাণচঞ্চল কেন্দ্র থেকে প্রবাহিত হয়েছে শহর-প্রান্তের বনানীর নীরবতার দিকে এবং সেই বনানীতে লুকানো বিশাল গোরস্তানের দিকে। কখনো কখনো সুন্দর সুন্দর গাড়ি নিঃশব্দ চাকার উপরে, ধাবমান ঘোড়ার ক্ষুরের দ্রুত খট্ খট্ খট্ খট্ ছন্দের সথে তাল মিলিয়ে যেনো উড়ে চলে; আর যদি তা শীতকাল হয় এবং রাস্তাটি ঢাকা পড়ে যায় ফুট-গভীর তুষারে, আর তখন তার উপর দিয়ে গাড়িয়ে চলে শ্লেজ গাড়ি এবং ঘোড়ার নাসা থেকে বেরয়ে আসে বাস্প, আর কুয়াশার ভারাক্রান্ত হাওয়ার টুঙটুঙ করতে থাকে তাদের ঘন্টাগুলি আর তুমি যদি নিজেই বসে একটি শ্লেজ গাড়ির ভেতরে এবং অনুভব করো, কুয়াশা তোমার পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে আর তোমার গাচে লাগছে তার হিমশীতল পরশ, তোমার শিশুসুলব হৃদয় বুঝতে পারবে –ধাবমান ঘোড়াগুলি এমন এক সুখের দিকে তোমাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে যার আরম্ভ নেই, শেষও নেই।
তারপর, গ্রামাঞ্চলে গ্রীষ্মের সেই মাসগুলি যেখানে আমার এক ধনী ব্যাঙ্কার নানা রেখেছিলেন এক বড় জমিদারী, তাঁর বড় পরিবারের খুশির জন্য । অলস –গতি ছোট্ট একটি নদী বয়ে যেতো, যার দুই পারে ছিলো উইলো গাছের সারি; তারপর, শান্ত-শিষ্ট গবাদিতে ভর্তি সেখানকার গোলাবাড়িগুলি-আর এমন একটি আলো-আধাঁরী যা জন্তু-জানোয়ার ও খড়ের গন্ধে ছিলো রহস্যজনকভাবে পূর্ণ, আর রুথেনিয়ো কিষাণ কন্যাদের হাসি, যারা সন্ধ্যাকালে ব্যস্ত থাকতো গাই দোহানে; সোজা দোনার ভেতর থেকে উষ্ণ ফেনিল দুধ পান করতে পারো তুমি, কেবল তৃষ্ণার্ত বলেই নয়, বরং এখনও যা তার জান্তব উৎসবের এতো কাছাকাছি রয়েছে তেমন কিছু পান করাটাই ছিলো উত্তেজনাপূর্ণ। আগষ্ট মাসের সেই দিনগুলি, যা আমি কাটিয়েছি মাঠে কামালদের সংগে, যারা গম কাটছিলো, আর সেই মেয়েদের সংগে যারা সেগুলি একত্র কারে আঁটি বাঁধছিলোঃ তরুণী সেই সব নারী, দেখতে সুন্দর ভারিক্কি দেহ, বুকভরা স্তন আর কঠিন সজীব বাহু, যার শক্তি আমি অনুভব করতাম যখন ওরা দুপুর বেলা খেলাচ্ছলে আমাকে গমের স্তূপের উপরে গড়িয়ে দিতো; অবশ্য , সে সময় আমার বয়স ছিলো এতো অল্প যে ওদের হাস্যমুখর আলিংগনের এর বেশি কোনো অর্থ করা আমার পক্ষে সম্ভ ছিলো না।
আর আব্বা-আম্মার সাথে আমার ভিয়েনা এবং বার্লিন, আল্পস পর্বতমালা এবং বোহেমিয়ার অরণ্যাঞ্চল, উত্তর সমুদ্দুর আর বান্টিক সফর; স্থানগুলি এতো দুরে দূরে ছিলো যে, মনে হয়েছিলো প্রত্যেকটিই যেনো এক একটি নতুন দুনিয়া। যখনি আমি এ ধরনের সফরে বেরিয়েছি, ট্রেনের ইঞ্জিনের প্রথম হুইশল এবং তার চাকার প্রথম ঝাঁকুনির সংগে সংগে যে নয়া-নয়া বিস্ময় উদগটিত হতে যাচ্ছে আমাদের নিকট, তারই কল্পনায় যেনো থেমে যেতো আমার হৃদ-স্পন্দন!
.. . তা ছাড়া অনেক খেলার সাথী-ছেলে এবং মেয়েরা , একটি ভাই ও একটি বোন এবং বহু চাচাতো-খালাতো-মামাতো-ফুফাতো ভাই –বোন এবং হপ্তার ইস্কুলের দিনগুলি নিরান্দতার পর.. . যা খুব পীড়াদায়ক ছিলো না, সেই উজ্জ্বল স্বাধীন রোববারগুলি; গ্রামাঞ্চলে ছুটাছুটি করে বেড়ানো, আমার নিজের বয়সী সুন্দর বালিকাদের সাথে আমার প্রথম গোপন সাক্ষাতকার এবং অদ্ভুত এক উত্তেজনায় লাল হয়ে ওঠা, যা কাটিয়ে উঠতে আমার লাগতো ঘন্টার পর ঘন্টা.. .
এই শৈশব ছিলো সুখের- অতীতের হলেও তৃপ্তিকর। আব্বা-আম্মার জীবন ছিলো আরাম-আয়েশের জীবন, বলা যায় তাঁরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের জন্যেই জীবন ধারণ করেছেন। পরবর্তী বছরগুলিতে অপরিচিত এবং কখনো প্রতিকূল অবস্থার সাথে আমি যে সহজভাব নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছি, তার মূলে থাকতে পারে আমার আম্মারই প্রশান্তির এবং অবিচলিত নীরবতার কিছু –না-কিছু প্রভাব-অন্যদিকে আমার আব্বার মানসিক চঞ্চলতা হয়তো প্রতিফলিত হয়েছে আমর অস্থির প্রকৃতিতে.. .
আমাকে যদি আমার আব্বার বর্ণনা করতে হয়, আমি বলবো, এই সুন্দর, ছিপছিপে, মাঝারি আকৃতির গাঢ় রঙের মানুষটির –যাঁর চোখ দুটি ছিলো কালো এবং ব্যগ্র, -পরিবেশের সাথে খুব মিল ছিলো না। যৌবনের প্রথমদিকে তিনি স্বপ্ন দেখতেন বিজ্ঞান চর্চা করবেন-বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞানের আত্মনিয়োগ করবেন। কিন্তু তাঁর এই স্বপ্ন তাঁর জীবন সফল হয়নি। তিনি ব্যরিষ্টার হয়েই খুশি থাকতে বাধ্য হন। অবশ্য তাঁর এই পেশায় তিনি বেশ সফলিই হয়েছিলেন, কারণ তাঁর তীক্ষ্ম ব্যগ্র মনের জন্যে এ পেশা হয়তো একটা চ্যালেঞ্জের মতন ছিলো। তবু আব্বা কখনো এই পোশাকে মনে-প্রানে গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁকে ঘিরে জেঁকেছিলো যে একাকীত্বের একটি ভাব, তার মূলে হয়তো ছিলো হামেশা-বিধ্যমান এই সচেতনতা যে, তাঁর সত্যিকার পেশা তাঁকে ছলনা করেছে।
আমার আব্বার আব্বা ছিলেন তখনকার দিনের অস্ট্রীয় প্রদেশ বুকোভিনার রাজধানী জার্নোবিৎসের এক গোঁড়া রাব্বী তথা ইহুদী মোল্লা। আমার এখনো মনে পড়ে –বুড়ো ছিলেন খুবই সুন্দর, তাঁর হাত দুটি ছিলো নরম মোলায়েম এবং লম্বা, সাদা দাঁড়ির ফ্রেমের মধ্যে আঁটা ছিলো তাঁর উৎসুক অনুভূতিময় মুখখানা। তিনি তাঁর অবসর সময়ে সারাজীবন ধরেই গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করেছেন; এই দুই শাস্ত্রে তাঁর গভীর অনুরাগ ছিলো। তাছাড়া তিনি ছিলেন সেই এলাকার সেরা দাবাড়ে-আর এটাই হয়তো ছিলো.. . গোঁড়া গ্রীক আর্কবিশপের সাথে তাঁর সুদীর্ঘ বন্ধুত্বের বুনিয়াদ, কারণ, আর্কবিশপ নিজেও ছিলেন একজন নামকরা দাবাড়ে। দুই বুড়ো সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা কাটাতেন দাবার ছক নিয়ে, তাদের আসর শেষ হতো নিজ নিজ ধর্মের তূরীয় প্রতিজ্ঞাগুলির আলোচনায়। অনেকে মনে করতে পারে, এ ধরনের মানসিক প্রবণতা নিয়ে আমার দাদার পক্ষে আমার আব্বার বিজ্ঞানমুখিতাকে অভিনন্দিত করাই ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু মনে মনে তিনি শুরু থেকেই সিদ্ধান্ত করেন, তাঁর পয়লা পুত্র অনুসরণ করবে ইহুদী রাব্বীর ঐতিহ্য, যা ছিলো তাঁদের পরিবারের কয়েক পুরষের পুরোনো ঐতিহ্য। আমার আব্বার জন্য অন্য কোনো পেশার কথা বিবেচনা করে দেখতেও তিনি রাজী ছিলেন না। তাঁর এই প্রতিজ্ঞা হয়তো আরো মজবুত হয়েছিলো পারিবারিক আলমারিতে রক্ষিত একটি কলংকজনক কংকালের দ্বারা; তাঁর এক চাচার অর্থাৎ আমার পর-দাদার এক ভাই-এর স্মৃতি, যিনি অত্যন্ত অস্বাভাবিকভাবে ভংগ করেছিলেন পারিবারিক ঐতিহ্য-এমনকি, তাঁর পিতৃপুরুষের ধর্মকেও পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন।
মনে হয়, পর-দাদার সেই প্রায়-উপকথার ভাই-যাঁর নাম কখনো সশব্দে উচ্চারিত হতো না এ পরিবারে-মানুষ হয়েছিলেন একই পারিবারিকি ঐতিহ্যের মধ্যে। অতি তরুণ বয়সে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন পুরো রাব্বী আর এমন এক রমণীর সাথে সেই বয়সেই তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো যাকে তিনি ভালোবাসতেন বলে মনে হয় না। সেকালে রাব্বীর পেশার মাইনে খুব বেশি ছিলো না। তাই তিনি আয় বৃদ্ধির জন্য পশমের ব্যবসা করতেন, আর এজন্য প্রতি বছর তাঁকে যেতে হতো ইউরোপের কেন্দ্রীয় পশমের বাজার লীপজিগে। যখন তাঁর বয়স প্রায় পঁশিচ বছর, তখন তিনি ঘোড়ার গাড়িতে করে এ ধরনের দীর্ঘ সফরে বেরিয়ে পড়েন। সে উনিশ শতকের প্রথমার্ধের কথা; সেবারো তিনি লীপজিগে গিয়ে তাঁর পশম বিক্রি করেন; কিন্তু তিনি ঘরে না ফিরে তাঁর গাড়ি এবং ঘোড়া দুই-ই বিক্রি করে দিলেন। তারপর, দাড়ি আর জুলফি চেছে ফেলে দিায়ে, যে স্ত্রীকে তিনি ভালবাসনতেন না তাকে ভুলে গিয়ে চলে যান ইংল্যাণ্ডে। কিছুদিন তিনি তাঁর দিন-গুজরান করেন গতর খাটিয়ে, সন্ধ্যাকালে তিনি অধ্যয়ন করতেন জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিতশাস্ত্র। তাঁর কোনো এক পৃষ্ঠপোষক তাঁর জোহনের পরিচয় পেয়েছিলেন বলে মনে হয়-তিনি অক্সফোর্ডে তাঁর পড়াশেোনা চালাবার ব্যবস্থা করে দেন! অক্সফোর্ড থেকেই কয়েক বছর পরে আমার পর –দাদার ভাই বেরিয়ে আসেন এক প্রতিশ্রুতিশীল পণ্ডিত এবং নও-খৃষ্টানরূপে। তাঁর ইহুদী স্ত্রীর নিকট তালাকনামা পাঠাবার কিছু পরেই তিনি বিয়ে করেন অ-ইহুদীদের এক বালিকাকে। তাঁর পরবর্তী জীবন সম্বন্ধে আমাদের পরিবারে বিশেষ কিছু জানা যায়নি-তিনি জ্যোতিবিজ্ঞানী হিসাবে বেশ খ্যাতি অর্জন করেন এবং নাইট হিসাবে ইন্তেকাল করেন, কেবল এটুকুই জানা গিয়েছিলো।
মনে হয়, এই ভয়ংকর দৃষ্টান্তই, জাহিলদের বিজ্ঞান অধ্যায়নের জন্য আমার আব্বার যে আগ্রহ ছিলো তার প্রতি আমার দাদার মনোভাবকে এতো অনমনীয় করে তোলে। তাঁকে একজন রাব্বী হতে হবে-এবং এই শেষ কথা! অবশ্যি আমার আব্বা এতোটা সহজেই হাল ছেড়ে দেবার জন্য তৈরি ছিলেন না। দিনের বেলা তিনি পড়তেন ‘তালমুদ’-কিন্তু রাতের বেলা লুকিয়ে তিনি পড়তেন কেনো শিক্ষকের সাহায্য না নিয়েই, -‘মানবতামুলক মাধ্যমিক কারিকুলাম’। পরে তিনি তাঁর মার কাছে তা খুলে বলেন। তাঁর পুত্রের গোপন পড়াশোনায় তিনি হয়তো মনে কষ্ট পেয়ে থাকবেন, তবু তিনি তাঁর মহৎ প্রকৃতির দরুন বুঝতে পারেন, পুত্রকে তাঁর অন্তরের ইচ্ছা মতো কাজা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা খুবই নির্দয় কাজ হবে। বাইশ বছর বয়সে, আট বছর বয়সে, আট বছরের ‘মাধ্যমিক’ কোর্স চার বছরে শেষ করে আমার আব্বা বি. এ. পরীক্ষার জন্য তৈরি হন এবং কৃতিত্বের সাথে পাস করেন। এই ডিগ্রী নিয়ে তিনি এবং তাঁর আম্মা আমার দাদার কাছে ভয়ংকর খবরটি প্রকাশ করার জন্য সাহস করে তৈরি হলেন। এর ফলে যে নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হয় তা আমি অনুমান করতে পারি। কিন্তু এর পরিণতি এই হলো যে আমার দাদা শেষতক নরম হয়ে পড়েন এবং রাজী হয়ে গেলেন, আমার আব্বা আর রাব্বীর পড়াশোনা করবেন না, তার বদলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়বেন। অবশ্যি, পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা এমন ছিলো না যে তিনি তাঁর প্রিয় বিষয় ‘পদার্থ বিজ্ঞান’ অধ্যয়ন করতে পারেন। এ জন্য তিনি এর চাইতে অধিকতরো অর্থকরী একটি পেশা- আইনজীবীর পেশার আশ্রয় নেন এবং যথাসময়ে একজন ব্যারিষ্ট্যার হয়ে বের হয়ে আসেন। কয়েক বছর পর তিনি পূর্ব গ্যালিসিয়ার লাও শহরে বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানেই স্থানীয় একজন ধনী ব্যাংকারের চার কন্যার অন্যতমা-আমার আম্মাকে শাদি করেন। সেখানে ১৯০০ সালের গ্রীষ্মকালে তাঁদের তিনটি সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তানরূপে আমি জন্মগ্রহণ করি।
আমার আব্বার ব্যর্থ বাসনার প্রকাশ ঘটে বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলি নিয়ে তাঁর ব্যাপক পড়াশোনায় এবং হয়তো তাঁর এই দ্বিতীয় পুত্রের-অর্থাৎ আমার প্রতি তাঁর অদ্ভুত অথচ খুবই চাপা পক্ষপাতিত্বে। মনে হয়, আমিও সেই সব বিষয়ের প্রতিই বেশি অনুরাগী ছিলাম যার সংগে কোনো সম্পর্ক ছিলো না আশু অর্থ-উপার্জনের এবং সফল কর্ম-জীবনে’র। তা সত্ত্বেও তিনি যে আমাকে একজন বৈজ্ঞানিক বানাবার স্বপ্ন দেখতেন তা পূরণ হাবার কেনো সম্ভাবনাই ছিলো না। আমি বোকা না হলেও, ছাত্র হিসাবে ছিলাম খুবই উদাসীন প্রকৃতির। গণিতশাস্ত্র এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানগুলি ছিলো আমার কাছে বিরক্তিকর। আমি অপরিসীম আনন্দ পেতাম সিয়েনকীবিজের উত্তেজনাকর ঐতিহাসিক রোমান্সগুলি পড়তে, জুল ভার্নের উদ্ভট কাহিনী, জেমস ফেনিমোর কূপার এবং কার্ল মে- এর রেড ইণ্ডিয়ানদের নিয়ে লেখা গল্প এবং পরে রিলেকর কবিতা ও গভীর উদাত্ত ছন্দে রচিত ‘অলসো স্প্রাখ জরথুস্ত্র’ পাঠ করতে। লাতিন এবং গ্রীক ব্যাকরণের মতোই মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও বিদ্যুতের রহস্য আমাকে উৎসাহিত করতো না মোটেই। এর ফলে, প্রতিবারই আমি পরীক্ষায় ফেল করতে করতে প্রমোশন পেয়েছি। নিশ্চয়ই আমার আব্বার জন্য এ ছিলো তীব্র নৈরাশ্যের ব্যাপার। কিন্তু খুব সম্ভব, এ বিষয়ে তিনি সান্তনা বোধ করে থাকবেন যে, আমার ওস্তাদেরা পোলিশ ও জার্মান সাহিত্য এবং ইতিহাসের প্রতি আমার ঝোঁক দেখে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন।
আমার পারিবারিক ঐতিত্যের অনুসরণে আমি ঘরেই ওস্তাদের কাছে হিব্রু ধর্মে পুরাদস্তুর ইলম হাসিল করি। এর কারণ, আমার আব্বা-আম্মার প্রকাশ্য ধার্মিকতা নয়। ওঁরা ছিলেন এমন এক জামানার মানুষ যখন মানুষ পূর্বপুরুষদের জীবন যে ধর্ম-বিশ্বাসগুলি দ্বারা গঠিত হয়েছিলো সেগুলির কোনো-না-কোনোটির প্রতি কেবল মৌখিক আনুগত্যই প্রকাশ করতো; সে ধর্মের শিক্ষা অনুযায়ী তার ব্যবহারিক, এমনকি নৈতি চিন্তাকেও গড়ে তোলার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও কেউ করতো না। এহেন সব লোকের নীরস প্রাণহীন আনু্ষ্ঠানিকতায়-যারা কেবল অভ্যাসবশে, কেবল অভ্যাসেরই বশে… তাদের ধর্মীয় উত্তাধিকারকে আঁকড়ে ধরেছিলো-কিংবা অধিকতরো ‘সংস্কারমুক্তদের উন্নাসিক উদাসীনতায়, যারা মনে করতো ধর্ম একটি জরাজীর্ণ কুসংস্কার বিশেষ, মানুষ যার সাথে মাঝে মাঝে বহ্যিক খাপ খাইয়ে চলতে পারে, কিন্তু যার সম্পর্কে সে মনে মনে শরমিন্দা, বুদ্ধি দিয়ে তাকে সমর্থন করা যায় না বলে। সকল দিক দিয়েই, আমর আব্বা-আম্মা ছিলেন প্রতমোক্ত দলের মানুষ। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার মনে এই ক্ষীণ সন্দেহ জাগে-অন্তুতপক্ষে আমার আব্বার ঝোঁক ছিলো দ্বিতীয় দলটিরই দিকে। তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর আব্বা ও শ্বশুরকে খুশি করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকেন-আমাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে ধর্মীয় কিতাবগুলি পড়েতে হবে। এভাবে বারো তোরো বছর বয়সে আমি যে কেবল খুব দ্রুত হিব্রু ভাষা পড়তেই শিখে ফেললাম তা নয়, বরং হিব্রু ভাষায় অনায়াসে কথা বলার ক্ষমাতও আয়ত্ব করলাম। তাছাড়া আর্মায়িক ভাষার সাথেও মোটামুটি একটি পরিচয় হয়ে গেলো। বোধহয়, এই পরিচয়ের জন্য পরবর্তীকালে আমি অতো সহজে আরবী ভাষা আয়ত্ত করতে পেরেছিলাম। আমি ‘ওল্ড টেস্টামেণ্ট’ পড়ে ফেললাম তার আদি ভাষায়। এভাবে ‘মিশনা’ এবং‘ জেমারা’ – অর্থাৎ তালমুদের মূল পাঠ এবং তার তফসীরের সাথেও আমর পরিচয় হলো। বেশ কিছুটা আত্ম-প্রত্যয়ের সংগেই আমি আলোচনা করতে পারতাম জেরুজারেম এবং ব্যবিলনের তালমুদের তফাৎ নিয়ে। ‘তারগুম,’- অর্থাৎ বাইবেলের ভাষ্যগুলির জটিলতার মধ্যে আমি এভাবে হারিয়ে গেলাম যে, ‘রাব্বীর’ জীবনই যেনো আমার জন্য নির্ধারিত!
এই সব নতুন ধর্মীয় জ্ঞান সত্ত্বেও, কিংবা হয়তো এ কারনেই শিগগীরই আমি ইহুদী ধর্মের অনেক সূত্র সম্বন্ধেই একটা উন্নাসিক মনোভাব অবলম্বন করতে শুরু করি। একথা সত্য যে, ইহুদী ধর্মগ্রন্থের সর্বত্র যে নৈতকি সৎ-আলের উপর এতো জোর দেওয়া হয়েছে তার সংগে মতবিরোধ ছিলো না, ইহুদী নবীদের মহান ঐশী চেতনার সংগেও নয়। কিন্তু আমার মনে হলো ওল্ড টেষ্টামেণ্ট এবং তালমুদের ‘আল্লাহ’ যেনো তাঁর পূজারীরা কিভাবে তাঁর পূজা করবে তার অনুষ্ঠানগুলি নেয়েই অনাবশ্যকভাবে ব্যস্ত ছিলেন। আমার আরো মনে হতো, আল্লাহ যেনো বিশেষ একটি জাতি তথা ইহুদীদের ভাগ্য নিয়েই বিস্ময়করভাবে ব্যস্ত রয়েছেন পূর্ব থেকেই। ইবরাহীমের বংশধরগণের ইতিহাসরূপে ওল্ড টেষ্টামেন্টের কাঠামোটিই এমন যে, মনে হয়, আল্লাহ যেনো গোটা মানবজাতির স্রষ্টা ও পালনকর্তা নন, বরং একটি উপজাতীয় দেবতা, যে-দেবতা একটি মনোনীত জাতির প্রয়োজনের সংগ-সংগগতির বিধান করে চলেছে গোটা সৃষ্টিরঃ যখন তারা সৎকার্য করে তাদেরকে পুরস্কৃত করছে দেশ জয় দ্বারা এবং যখনি তারা তাদের জন্য স্থিরীকৃত পথ তেকে সরে পড়েছে তাদেরকে দুখ-লাঞ্ছনা ভোগ করতে কবাধ্য করছে অবিশ্বাসীদের হাতে। যখন এই মৌলিক ক্রটিগুলির আলোকে দেখি, মনে হয়, ইসায়া এবং জেরিমিয়ার মতো পরবর্তী নবীদের নৈতিক উদ্দীপনায়ও যেনো বিশ্বজনীন পয়গাম বলতে কিছু নেই।
কিন্তু, আমার সেই প্রথমদিকের পড়াশেরানর ফল, যা আশা করা হয়েছিলো তার বিপরীত হলেও-কারণ তা আমাকে আমার পিতৃপুরষদের ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট না করে, বরং তা থেকে দূরেই ঠেলে দিয়েছিলো, আমাকে পরবর্তীকালে বুঝতে সাহায্য করেছে-আমি মাঝে মাঝে ভাবি-ধর্ম মাত্রেরই মৌলিক উদ্দেশ্যকে; তার রূপ যা-ই হোক। অবশ্যি ইহুদী ধর্ম আমাকে হতাশ করলেও সে সময়ে অন্য কোথাও আধ্যাত্মিক সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা আমি করিনি। এক সংশয়বাদী-পরিবেশের প্রভাবে আমি আমার বয়সের অন্যান্য বহু বালকের মতোই সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বসি সকল আনুষ্ঠানিক ধর্মকে। যেহেতু, আমার কাছে ধর্ম কখনো এক মস্ত বাধা-নিষেধমূলক আইনের বেশি কিছু মনে হয়নি, তাই এই ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়ে আমার আসলেই কেনো সম্পর্ক ছিলো না। আমি যা চাইছিলাম, অন্যান্য প্রায় সকল বালকই যা চাই তা থেকে খুব ভিন্ন কিছু তা নয়- আমি চাইছিলাম কর্ম, আমি চাইছিলাম দুঃসাহসিক অভিযান এবং উত্তেজনা!
উনিশ শ’ চৌদ্দ সালের দিকে, যখন মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, মনো হলো, আমার বাল-সুলভ স্বপ্ন সফল করার পয়লা বড়ো সুযোগ যেনো হাতের মুঠায় এসে গেছে। চৌদ্দ বছর বয়সে আমি স্কুল থেকে পালিয়ে গিয়ে যোগ দিলাম অস্ট্রীয় সামরিক বহিনীনতে-এক মিথ্যা নামে। আমার বয়সের তুলনায় আমি ছিলাম অনেক লম্বা, সহজেই আঠারো বছর বলে পার হয়ে গেলাম, আর আঠারোই ছিলো ফৌজে ভর্তি হবার নূন্যতম বয়স। কিন্তু স্পষ্টতেই আমার মধ্যে ছিলো না সৈনিকোচিত কেনো বৈশিষ্ট্য। প্রায় এক হপ্তা পর আার আব্বা আমাকে খুঁজে বের করেন পুলিশের সাহায্যে। পরে আমাকে কলংকজনকভাবে নিয়ে যাওয়া হলো ভিয়েনায়, যেখানে কিছুকাল আগে থেকেই বাস করতে শুরু করেছিলো আমার পরিবার। প্রায় চার বছর পর, আমাকে কার্যত এবং আইনানুসারে ভর্তি করা হলো অস্ট্রীয় বাহিনীতে, কিন্তু এর আগেই আমার সামরিক গৌরবের স্বপ্ন ফুরিয়ে গেছে, আমি আমার সার্থকতার জন্য খুঁজে ফিরছিলাম অন্য পথ। যা হোক, আমার সামরিক বাহিনীতে ভর্তি হবার কয়েক হপ্তা পরেই বিপ্লব ঘটলো, অস্ট্রী সাম্রাজ্য ভেংগে পড়লো এবং যুদ্ধও শেষ হয়ে গেলো।
পয়লা মহাযুদ্ধের পর প্রায় দু’বছর আমি অনেকটা অগোছালোভাবেই ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পকলায় ইতিহাস ও দর্শনশাস্ত্র পড়ি। আমার মন ছিলো না এসব অনুশীলনে। শান্ত একাডেমিক জীবনের কোনো আকর্ষণই আমার কাছে ছিলো না। আমি অনুভব করছিলাম জীবেনের সাথে আরো গভীরভাবে মুকাবিলা করার আকাঙ্খা, জীবনে প্রবেশ করার বাসনা। নিরাপত্তাপ্রিয় মানুষ নিজের চারপাশে যে-সব কৃত্রিম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে সেগুলির আশ্রয় না নিয়েই আমি প্রবেশ করতে চেয়েছিলাম জীবনে-আমি চেয়েছিলাম, সবকিছুর পেছনে যে আধ্যাত্মিক নিয়ম-শৃঙ্খলা রয়েছে তা উপলব্ধির পথ নিজেই খুঁজে বের করতে-যে শৃঙ্খলা অবশ্যই রয়েছে বলে আমি জানতাম, অথচ, যা আমি তখনো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না।
সে দিন যে আধ্যাত্মিক শৃংখলা বলতে আমি কী বুঝতাম তা ভাষায় প্রকাশ করা মোটেই খুব সহজ নয়। নিশ্চয় আমি মামুলি ধর্মীয় অর্থে এ প্রশ্নটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করিনি; বরং বলা যায়, নির্দিষ্ট কোনো অর্থেই নয়। আমার নিজের প্রতি সুবিচার করতে হলে বলতে হয় আমার এই অস্পষ্টতা এই অনির্দিষ্টতা আমার নিজের তৈরি নয়-এ আসলে একটা গোটা যুগ বা জামানারই অস্পষ্টতা এই অনির্দিষ্টতা।
বিশ শতকের শুরুর দশকগুলির একটি লক্ষণ ছিলো আধ্যাত্মিকতা শূন্যতা। ইউরোপ বহু শত বছর ধরে যে –সব নৈতিক মূল্যবোধে অভ্যস্ত ছিলো সে সমুদয়ই ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সারের মধ্যে যা ঘটলো তারই ভয়ংকর চাপে নির্দিষ্ট রূপরেখা হারিয়ে আকার-শূন্য হয়ে পড়লো। এবং তার জায়গায় নতুন এক স্তবক মূল্যবোধ তখনো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিলো না কোথাও। সবাই অনুভব করছিলো একটা ক্ষণভংগুরতা ও অনিশ্চয়তার ভাব, সামাজিক ও মানসিক ওলট-পালটের পূর্বাভাস-যার ফলে মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করলো-মানুষের চিন্তা ও প্রয়াসে আর কখনো স্থায়িত্ব বলে কিছু থাকতে পারে কি না। সমস্ত কিছুই যেনো ভেসে চলছিলো এক নিরাকার, নিরাবয়ব বন্যায়। এবং তরুণের আত্মিক চাঞ্চল্য কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলো না কোনো নির্ভর। নৈতিকতার কেনো নির্ভরযোগ্য মান না থাকায় কেউই আমাদের তরুণদেরকে দিতো পারতো না সেই সব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব যে প্রশ্নগুলিতে আমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলাম। বিজ্ঞান বলতে ‘জ্ঞানই সব’- এবং গিয়েছিলো যে একটা নৈতিক লক্ষ্য ছাড়া জ্ঞান কেবল বিশৃংখলাই সৃষ্টি করতে পারে। সমাজ সংস্কারক, বিপ্লবী এবং কমিউনিষ্টরা-এতো সন্দেহ নেই যে, এরা সকলেই চেয়েছিলো একটা উৎকৃষ্টতরো এবং অধিকতরো সুখী দুনিয়া নির্মাণ করতে –কিন্তু এদের প্রত্যেকেই চিন্তা করছিলো কেবল বাহ্য সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার আলোকে এবং ক্রটি সংশোধনের জন্য ওরা ওদের ইতিহাসের জড়বাদী ধারণাকে উন্নীত করেছিলো এক নতুন অধিবিদ্যা-বিরোধী অধিবিদ্যায়। এদিকে নিজেদের চিন্তার রীতি থেকে অর্জিত যে গুনসমূহ অনেক আগেই অনমনীয় এবং অর্থহীন হয়ে পড়েছিলো, মামুলি ধার্মিকেরা সেগুলিকে আল্লাহর প্রতি আরোপ করার চাইতে বেহতর কিছু জানতো না। এবং আমরা তরুনেরা যখন দেখতে পেলাম- আমাদের চারপাশের পৃথিবীতে যা ঘটছে, অনেক সময়ই কল্পিত ঐশী গুণাবলীর সঙ্গে তার প্রচণ্ড অসংগতি দেখা যায় তখন আমরা নিজেদের বললামঃ ‘আল্লাহর প্রতি যে-সব গুণ আরেপ করা হয় সেগুলি মানবভাগ্যের নিয়ামক শক্তিগুলি থেকে স্পষ্টতই আলাদা, স্বতন্ত্র। কাজেই আল্লাহ বলে কিছু নেই।’ আমাদের অতি অল্প কজনের মনে হয়েছিলো, এ সমস্ত বিভ্রান্তির কারণ হয়তো ধর্মের আত্মাভিমানী অভিভাবকদের খেয়ালী মেজায-মার্জির মধ্যেই নিহিত, যারা দাবি করে, ‘আল্লাহর, পরিচয় দেয়া’র অধিকার তাদের রয়েছে এবং এভাবে, আল্লাহকে তাদের নিজের পোশাক পরিয়ে মানুষ ও তার ভাগ্য থেকে যারা আল্লাহকে করেছে বিচ্ছিন্ন।
ব্যক্তি-জীবনে কিংকর্তব্য সম্বন্ধে এই অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনশীলতা নিয়ে আসতে পারে ঘোর নৈতিক বিশৃংখলা এবং মানুষের শিল্প, সৌন্দর্য, সংস্কৃতির প্রতি অশ্রদ্ধা; পক্ষান্তরে মহৎ জীবনকে যা গড়ে তোলো তারি দিকে আসবার একটি সৃজনধর্মী ব্যক্তিগত পথ –অনুসন্ধানেরও তা সহায়ক হতে পারে।
পরোক্ষভাবে, এই সহজাত উপলব্ধিই হয়তো আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মূল পাঠ্য বিষয় হিসাবে শিল্পকলার ইতিহাস বেছে নিয়েছিলাম তার কারণ। মনে হয়েছিলো, শিল্পকলার সত্যিকার কাজই হচ্ছে আমাদের মনে সমাঞ্জস্যপূর্ণ বহুকে এক কর তোলার একটা নমুনা ফুটিয়ে তোলা, যা নিশ্চয়ই রয়েছে ঘটনায় খণ্ডবিচ্ছিন্ন যে-সব ছবি আমাদের চেতনা আমাদের নিকট উদঘটিত করছে সে সবের তলদেশে, -যে-নমুনাকে কল্পনামূলক চিন্তার সহায্যে কেবল সম্পূর্ণভাবেই প্রকাশ করা যেতে পারে। বলাবাহুল্য, আমার পাঠ্য বিষয় আমাকে খুশি করতে পারলো না। মনে হলো, আমার অধ্যাপকেরা-যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ যেমন, স্ট্রজিগভস্কি এবং দ্বোরাক ছিলেন নিজ নিজ অনুশীলনের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট-সৌন্দর্যতত্ত্বে যে-সব নিয়ম-কানুন দ্বারা শিল্প সৃষ্টি নিয়ন্ত্রিত হয় সেগুলি আবিষ্কার করতেই ছিলেন বেশি মাত্রায় ব্যস্ত; এর মর্মমূলে যে আধ্যাত্মিক তরংগাভিঘাত রয়েছে তা উদঘাটন করার চেষ্টা তাঁরা খুব সামান্যই করেছেন। অন্য কথায়, আমার মতে, শিল্পকলার প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভংগি অতি সংকীর্ণভাবে সীমাবদ্ধ ছিলো সেইসব রূপ ও আংগিকের মধ্যে যাদের মাধ্যমে অভিব্যক্তি লাভ করে আর্ট।
সেই যৌবনোজ্জ্বল বিভ্রান্তির দিনগুলিতে মনোবিলন শাস্ত্রের যে-সব সিদ্ধান্তের সাথে আমি পরিচিত হই সেগুলিতেও আমি, হয়তো বা কিছুটা ভিন্ন কারণেই, একই রকম অতৃপ্ত থেকে যাই। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সে সময়ে মনোবিকলন তত্ত্ব একটা পয়লা নম্বর মনোবিপ্লব রূপে দেখা দিয়েছিলো। আমি তখন অনুভব করছিলাম মর্মে মর্মেঃ জ্ঞান ও উপলব্ধির এতোদিনকার বদ্ধ অথচ নতুন দরোজাগুলি এভাবে খুলে দেয়ার ফলে মানুষের নিজের সম্পর্কে ও সমাজ সম্পর্কে চিন্তাধারা প্রভাবিত হবে গভীরভাবে, হয়তো বা একেবারেই বদলে যাবে; মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে নির্জ্ঞান-মনের কামনা-বাসনার যে ভূমিকা রয়েছে তার আবিষ্কার সন্দেহতীতভাবেই গভীরতরো আত্মোপলব্ধির পথ মুক্ত করে দিয়েছে, যা আমাদেরকে দিতে পারেনি আগেকার মনস্তাত্ত্বিক থিওরীগুলি। এ সবই মেনে নিতে তৈরি ছিলাম আমি –বলতে কি, ফ্রয়েডীয় চিন্তাধারার উদ্ধীপনা ছিলো আমার নিকট শরাবের মাদকতার মতোই তীব্র। বহু সন্ধ্যা আমি ভিয়েনার ক্যাফেগুলিতে শুনেছি মনোবিকলন তত্ত্বের শুরুর দিকে কয়েকজন পথিকৃতের নিজেদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা-যেমন আলফ্রেড এডলার, হারমান স্টিকেল এবং ওটো গ্রস। তবে, এর বিশ্লেষণের সূত্রগুলি সম্বন্ধে যদিও আমি বিচলিত হয়েছিলাম; কারণ এ বিজ্ঞান চেয়েছিলো মানুষের আত্মার সকল রহস্যকে কতকগুলি স্নায়বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় পর্যবসিত করতে। এই মতবাদরে প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁর ভক্তরা যে-সব দার্শনিক সিদ্ধান্তে এসেছিলেন সেগুলি আমার কাছে কেন যেনো মনে হয়েছিলো, অতিমাত্রায় সূক্ষ্ম, অতিমাত্রায় সুনিশ্চিত এবং অতিমাত্রায় সরলীকৃত; যার ফলে, আমার মনে হলো পরম সত্যগুলির কাছাকাছি পৌছুনোর ক্ষমতাও এ সব সিদ্ধান্তের নেই; তাছাড়া, উন্নত জীবনের দিকে কোনো নতুন পথের নির্দেশও নিশ্চয়ই তাতে ছিলো না।
তবে এসব সমস্যা আমার মনকে প্রায়ই দখল করে থাকলেও আমি কিন্তু তাতে তেমন অসুবিধা বোধ করিনি। ইন্দ্রিয়াতীত কেনো বিষয়ের চিন্তনে অথবা যে-সব সত্য কেবলি ধারণ-মাত্র সেগুলির সজ্ঞান অনুসন্ধানে আমি কখনো বেশি আগ্রহী ছিলাম না। আমার আকর্ষণ ছিলো যা-কিছু দেখা যায়, অনুভব করা যায় সে সবের প্রতি, জনগোষ্ঠেী, তার ক্রিয়া কর্ম ও বিভিন্ন সম্পর্কের প্রতি। আর ঠিক এ সময়েই আমি শুরু করেছিলাম নারীর সম্পর্ক আবিষ্কার করতে।
মহাযুদ্ধের পরপর, সাধারণভাবে প্রতিষ্ঠিত মূল্যগুলির ব্যাপক ভাঙন শুরু হলো, সেই ভাঙনের ধারায় নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান অনেক বাধা-নিষেধও শিথিল পয়ে পড়লো। আমার মতে তা উনিশ শতকের সংকীর্ণ গোড়ামীর বিরুদ্ধে যতোটা না বিদ্রোহ ছিলো তার চেয়ে বেশি ছিলো একটি অবস্থা থেকে তার সম্পূর্ণ বিপরীত আরেকটি অবস্থায় আপনা –আপনি নিক্ষিপ্ত হওয়া-যে অবস্থায় বিশেষ কতকগুলি নৈতিক মনকে চিরন্তন ও তর্কাতীত মনে করা হতো সে অবস্থা থেকে অমন আরেকটি অবস্থায় নিক্ষেপণ যেখানে সব কিছু হয়ে পড়েছিলো তর্কের বিষয়। এ ছিলো, কাল পর্যন্ত মানুষের নিরবিচ্ছন্ন উর্ধ্বাভিসারী অগ্রগতিতে মানুষের যে-বিশ্বাস ছিলো সেই বিশ্বাস থেকে স্প্রেঙলারের তিক্ত নৈরাশ্যের দিকে, নীটশের নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদ ও মনোবিকলন-সৃষ্ট আধ্যাত্মিক শূন্যতার দিকে দোলকের প্রত্যাবর্তন। যুদ্ধ-পরবর্তী সেই প্রথমদিকের বছরগুলির দিকে তাকালে মনে হয়, তরুণ এবং তরুণীরা, এত উৎসাহের সাথে যারা কথা বলতো ও লিখতো ‘শরীরের মুক্তি’ সম্বন্ধে, তারা যখন-তখন যে ‘প্যান দেবাতার’ শরণ নিতো তারা সেই দেবতার অতি উত্তেজনাময় প্রেরণা থেকে ছিলো অনেক দূরে। তাদের ভাবাবেশ অতো বেশি আয়েশী ছিলো তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না বিপ্লবী হওয়া। সাধারণত তাদের মধ্যে যৌন সংযোগ হতো আকস্মিক, ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই উপস্থিত হতো, অমন এক গদৎবৎ ভাব লেশহীনতা, প্রায়ই যার পরিণতি ঘট তো অবাধ যৌন-মিলনে।
চিরচারিত নৈতিকাতর যা কিছু অবশিষ্ট ছিলো তার শাসনে আমি যদি নিজেকে বাঁধাও মনে করতাম, তবু যে হাওয়া এতো ব্যাপক এবং এতো প্রবল হয়ে উঠেছিলো তা থেকে নিজেকে বাঁচানো কঠিন হতো খুবই। আমি বরং, যা ফাঁকা পথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহত বলে বিবেচিত হতো তাতেই আমার সময়োর আরো অনেকের মতো গর্বই বোধ করতাম। প্রেম-প্রেম খেলা সহজেই পরিণত হতো প্রণয়ে এবং কোনো কোনো প্রণয় রূপ নিতো কামোচ্ছ্বাসে। আমি অবশ্যই মনে করি না আমি লম্পট ছিলাম, কারণ আমার সেই যৌবনসুলভ ভালোবাসাগুলিতেও যতো তুচ্ছ ও ক্ষণস্থায়ী তা হোক, হামেশাই অস্পষ্ট অথচ জোরারো এই আশার গুঞ্জরণ ছিলো যে, একজন পুরুষ থেকে আরেক একজন পুরুষকে যে ভয়ংকর নিঃসংগতা সুস্পষ্টভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, হয়তো তা ভংগ হতে পারে একটি পুরুষ ও একটি নরীর মিলনের মাধমে।
… … . .. .. …………. … . … … … . ..
আমার অস্থিরতা বেড়েই চললো। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে ক্রমেই আরো কঠিন হয়ে উঠতে লাগলো। শেষ নাগাদ ঠিক করলাম, পড়ালেখা একদম ছেড়ে দেবো এবং সাংবাদিকতায় আমার হাত পরখ করে দেখবো। কিন্তু আমার আব্বা তাতে ভীষণ বাধ সাধলেন। এ বিরোধিতার জন্য যতোটুকু যুক্তি তখন আমি মেনে নিতে রাজী ছিলাম হয়তো তার চেয়ে প্রবলতরো যুক্তি দিয়েই তিনি তাঁর আপত্তি তুলেছিলেন। তিনি বললেন, লেখাকে পেশা হিসাবে বেছে নেবার আগে অন্তত আমার নিজের কাছে হলেও এ প্রমাণ আবশ্যক যে আমি লিখতে পারি। একবার তুমুল আলোচনা পর তিনি তাঁর কথা শেষ করলেন এই বলে, ‘তা যাই হোক, পি-এইচ-ডি-ডিগ্রী কারো সার্থক লেখক হবার পথে বাধা হয়েছে বলে আজে জানা যায়নি। তাঁর যুক্তি ছিলো নিখুঁত, নির্ভুল। কিন্তু আমি ছিলাম একেবারেই নবীন, প্রচণ্ড আশাবাদী এবং অতিশয় চঞ্চল। যখন বুঝতে পারলাম, তিনি কিছুতেই তাঁর মত বদলাবেন না, তখন নিজের মতে জীবন শুরু করে দেয়া ছঅড়া আমার আর কোনো উপায়ই রইলো না। কাউকে আমার মনের কথা না বলেই ১৯২০ সালের গ্রীষ্মের এক দিনে আমি ভিয়েনার কাছে বিদায় নিলাম এবং প্রাগের পথে চেপে বসলাম যাত্রীবাহী এক ট্রেনে।
আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাদ দিলে আমার একটি হীরার আংটি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। আংটিটি আমি পেয়েছিলাম আমার মার কাছ থেকে। মা এক বছর আগেই জান্নাতবাসী হন। প্রাগে সাহত্যিকদের প্রধান আড্ডা ছিলো একটি ক্যাফে; সেই ক্যাফের এক খিদমতগারের সাহায্যে আংটিটি আমি বিক্রি করে দিই। খুব সম্ভব, এতে আমি একেবারেই ঠকে যাই; তবু আমি যে টাকা পেলাম তা-ই আমার কাছে মনে হলো সাত রাজার ধন। এই সম্পদ পকেটে করে আমি পৌছুলাম বার্লিন। ওখানে কয়েকজন ভিয়েনী বন্ধু আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলে পুরোনো ক্যাফে দ্য ওয়সটেনস-‘এ শিল্পী সাহিত্যিকদের’ এক যাদুকরী চক্রের সংগে।
আমি বুঝতে পারলাম এখন থেকে কারো সাহায্য না নিয়ে একাই আমাকে আমার পথ করে চলতে হবে। আমার পরিবার থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য আর কখনো আমি আশা করবো না বা নেবো না। কয়েক হপ্তা পর, আমার আব্বার গোস্বা যখন একটু কমলো তিনি আমাকে লিখে পাঠালেন, ‘আমি এখন সাফ দেখতে পাচ্ছি, একদিন তুমি ভবঘুরে বাউন্ডেলে হিসাবে মরে পড়ে রয়েছো রাস্তার পাশে, নর্দমায়।’ আমি ত্বরিৎ জবাব পাঠাই ‘না, আমার জন্য রাস্তার পাশের নর্দমা নেই- দেখবেন আমি উঠবো একোবরে শীর্ষ-চূড়ায়। কী করে আমি চূড়ায় উঠবো তা তখনো আমার কাছে মোটেই পরিষ্কার ছিলো না; তবে, আমি জানতামা যে, আমি লিখতে চাই, লেখক হতে চাই-এবং আমার এ বিশ্বাসও জন্মেছিলো যে সাহিত্যিকদের জগত আমার জন্য অপেক্ষা করছে সাগ্রহে, দরাজ দুহাত বাড়িয়ে।
কয়েক মাস পর আমার নগদ টাকাকড়ি ফুরিয়ে গেলোঃ আমি তখন একটি কাজের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সাংবাদিক হওয়ার উচ্চবিলাস রয়েছে যে তরুনের তার জন্য সুস্পষ্ট পছন্দের বিষয় হচ্ছে মশহুর দৈনিক কাগজগুলির কেনো একটিতে কর্ম প্রাপ্তি; কিন্তু আমি দেখতে পেলাম ওরা আমাকে পছন্দ করছে না; অবশ্য আমি যে হঠাৎ তা বুজতে পারলাম তা নয়। একথা বুঝতে আমাকে বার্লিনের ফুটপাতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ পায়চারি করতে হয়েছে, আর কী কষ্টকরই না ছিলো এভাবে পায়চারি করা-কারণ সাবওয়ে বা ট্যাক্সির ভাড়া যোগাড় করাও তখন একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তাছাড়া প্রধান সম্পাদক বার্তা সম্পাদক ও সহ-সম্পাদকদের সাথে অসংখ্যবার অপমানজনক ইণ্টারভিউ থেকেও একই সিদ্ধান্তে আসিঃ একটা মোজেজা ছাড়া কোনো তরুণ, যার একটি মাত্র লাইনও নাই এক ফোটাও।
আমার জন্য কোনো মোজেজাই ঘটলো না। তার বগলে আমি পরিচিত হলাম ক্ষুধার সাথে এবং অনেক কটি সপ্তাহ আমি কাটালাম চার আর রোজ সকালে যে-দুটা পাউরুটির টুকরা আমার বাড়ীওয়ালী আমাকে দিতেন তা-ই খেয়ে। ক্যাফে দ্যা ওয়েসটেন্স-এ যে সাহিত্যক বন্ধদের সংগ লাভ করছিলাম তারাও আমার মতো একজন কাঁচা অনভিজ্ঞ ভাবী লেখকের জন্য তেমন কিছু করতে পারছিলো না। তাও দিনের পর দিন এভাবে কাটাচ্ছিলো, শূন্যতার একোবরে কিনারে বসে; বহু কষ্টে পানির উপর কেবল থুৎনিটুকু জাগিয়ে রাখতে চেয়েছিলো ওরা। কখনো কখনো কারো কপালের জোরে কেনো ভালো রচনা বা কোনো ছবি বিক্রি হলে একটা হঠাৎ ঐশ্বর্যের সাক্ষাৎ মিলতো; তখন ওদের কেউ-না কেউ বিয়ার এবং ফ্রাংফুর্টারের পার্টি দিতো আর আমাকে বলতো এই আকস্মিক সৌভাগ্যে শরীক হতে। কখনো বা কেনো এক হীনমন্যতাগ্রস্ত ভূইফোঁড় ধনী আমাদের এই অদ্ভুত বুদ্ধিজীবী যাযাবরদের দাওয়াত করতো তার ফ্লাটে, আমাদের দেখে হা করে তাকিয়ে থাকতো ভয় মেশানো তাজিমের সংগে-যখন আমরা আমাদের খালি উদর ভরে চলতাম ক্যাভিয়ার, ক্যানাপে ও শ্যাম্পেন দ্বারা এবং আমাদের মেজবানের সহৃদয়তার ঋণ শোধ করতাম ‘বোহেমিয়ান জীবনে আমাদের অর্ন্তদৃষ্টি’ দিয়ে। কিন্তু এ ধরনের ব্যাপার ছিলো ব্যতিক্রম। আমার ঐ দিনগুলির সাধারণ নিয়ম ছিলো নির্জলা উপবাস এবং আমার রাতের স্বপ্ন ঠাসা থাকতো সতেজ আর মাখন-মাখানো পুরু রুটির টুকরায়। কয়েকবারই আমার ইচ্ছা হয়েছে আব্বাকে লিখি এবং সাহায্য চাই। আব্বা নিশ্চয়ই তা প্রত্যাখান করতেন না। কিন্তু প্রত্যেকবারই আমার মর্যাদা আমাকে বাধা দিয়েছে; তাই সাহায্য না চেয়ে আমি তাঁকে বরং লিখতাম যে আমি একটি চমৎকার চাকরি বাগিয়েছি এবং মোটা মাইনে পাচ্ছি।
শেষ তক খোশ নসিব বশে এলো এক পরিবর্তন। এফ. ডবলু মার্নোর সাথে আমি পরিচিত হলাম। তিনি সবেমাত্র খ্যাতির অংগনে পা দিয়েছেন একজন উদীয়মান চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসাবে। (তাঁর সাথে আমার এই পরিচয় হয়েছিলো তাঁর হলিউডে যাবার অল্প কবছর আগে। সেখানে তিনি আরো খ্যাতি অর্জন করেন এবং শেষকালে অসময়ে মর্মান্তিকভাবে মারা যান।) মার্নোর মধ্যে ছিলো একটা খামখেয়ালী বেপরোয়া ভাব আর এ কারণে তিনি ছিলেন তাঁর সকল বন্ধুরই অতি প্রিয়। দেখামাত্রই, এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে প্রবল আশাবাদী ও উৎসুক এই তরুণের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তিনি আমাকে জিজ্ঞাস করলেন, তিনি যে নতুন ফিল্ম শুরু করতে যাচ্ছেন তাতে আমি তাঁর সহকারী হিসাবে কাজ করতে রাজী আছি কিনা-আর যদিও কাজটি ছিলো খুবই অস্থায়ী তবু আমি দেখতে পেলাম আমার সামনে তখন বেহেস্তের দরোজা যেনো খুলো যাচ্ছে, যখন আমি আমতা আমতা করে বললাম-জী –হ্যাঁ, আমি রাজী।
দুটি উজ্জ্বল মাস-টাকাকড়ির দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত! জীবনে কখনো যে-সব অভিজ্ঞতা আমার ঘটেনি এমনি ধরনের বিচিত্র চমৎকার অভিজ্ঞতার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গিয়ে আমি মার্নোর সহকারী হিসাবে কাজ করে গেলাম। আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেলো প্রচণ্ড রকমে; আর আমার এ আত্মবিশ্বাস নিশ্চয় এ কারণে হ্রাস পেলো না যে ফিল্মের নায়িকা-এক মশহুর এবং সুন্দরী চিত্রাভিনেত্রী-বিপন্ন বোধ করেননি পরিচালকের তরুণ সহকারীর প্রেম-প্রেম খেলায়। ফিল্মটির কাজ শেষ হওয়ার পর মার্নো যখন একটি নতুন কাজ নিয়ে বিদেশ যেতে তৈরি হলেন আমি তাঁর কাজ থেকে বিদায় নিলাম এই বিশ্বাস নিয়ে যে আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিনগুলির অবসান হলো।
এর অল্প দিন পর –আমার এক ভিয়েনিজ সাংবাদিক বন্ধু তখন বার্লিনে নাটক-সমালোচক হিসাবে বেশ নাম কিনেছে, নাম তার আন্তন কুহ, আমাকে অনুরোধ করলো, তাকে একটি ফিল্মের সিনারিও রচনায় সাহায্য করতে। সিনারিওটি লেখার দায়িত্ব আমাকেই দেয়া হয়েছিলো। আমি প্রচণ্ড উৎসাহের সাথে রাজী হয়ে যাই। আমার বিশ্বাস, আমি এই রচনার জন্য ভয়ানক খেটেছিলাম। যা-ই হোক, পরিচালক খুশি হয়ে আমাদেরকে তাঁর ওয়াদা মতো অর্থ দিয়েছিলেন-সেই টাকা আমি ও আস্তন, আমরা দুজনের মধ্যে, আধা –আধি ভাগ করে নিই। চলচ্চিত্র জগতে আমাদের এই প্রবেশের ব্যাপারটিকে স্মরণীয় করে তোলার জন্য আমরা বার্লিনের সবচেয়ে ফ্যাশন-দোরস্ত রেস্তোরায় একটি পার্টি দিই। আমরা যখন রেস্তোরা পাওনা চুকিয়ে দেবার জন্য বিলটি নিলাম দেখতে পেলাম আমাদের সব টাকাই গলদা চিংড়ি, নোনতা মাছের ডিম আর ফরাসী মদের জন্য বার করে দিতে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কপাল আমাদেরকে রক্ষা করলো। আমরা তখুনি আরেকটি সিনারিও লিখতে বসে গেলাম ব্যালাজাককে কেন্দ্র করে, সম্পূর্ণ কাল্পনিক একটি চিত্র, তাঁর এক অদ্ভুত কাল্পনিক অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে! শুধু তাই নয়, যেদিন রচনা শেষ হলো সেদিনই আমরা এর এক খদ্দেরও পেয়ে গেলাম। এবার আর আমরা আমাদের এ সাফল্য নিয়ে কোনো ‘ভোজের আয়োজন’ করলাম না। তার বদলে আমরা বের হয়ে পড়লাম ব্যাভেরিয়ার দেশগুলিতে কয়েক সপ্তাহ অবসর বিনোদনের উদ্দেশ্যে।
এরপর আরো একটি বছর—দুঃসাহসিক সাফল্য ও ব্যর্থতার ভরা একটি বছর। মধ্য-ইউরোপের বিভিন্ন শহরে নানা রকমের অস্থায়ী কাজ করার পর আমি সফল হলাম সংবাদপত্র জগতে প্রবেশ করতে।
এই দুর্গ ভেদের ব্যাপারটি ঘটে ১৯২১ সালের শরৎকালে, টাকা-পয়সার অসুবিধার আরো একটি খন্ডকালের পর। একাদিন আমি বসে আছি ক্যাফে দা ওয়েসটেন্স-এ, ক্লান্ত এবং সান্তনাহীন। এমন সময় আমার এক বন্ধু এসে বসলো আমার টেবিলে। আমি যখন তাকে আমার অসুবিধাগুলির কথা বললাম সে আমাকে পরামর্শ দিলোঃ
-‘তোমার জন্য একটি সুযোগ হতেও পারে। ডার্মাট নিজেই একটি বার্তা প্রতিষ্ঠান শুরু করতে যাচ্ছে ইউনাইটেড প্রেস অব আমেরিকার সহযোগিতায়। এ প্রতিষ্ঠানের নাম হবে ইউনাইটড টেলিগ্রাফ। আমার বিশ্বাস, তাঁর বহু সহ-সম্পাদকের দরকার হবে। তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি।’
বিশ দশকের দিকে, জার্মানীতে রাজনৈতিক মহলে ডঃ ডামার্ট ছিলেন একজন নামজাদা ব্যক্তি। ক্যাথলিক সেন্টার পার্টির সদস্যদের মধ্যে তিনি ছিলেন সত্যি অতুলনীয়। তাঁর সহকারী হিসাবে কাজ করতে পারবো-আমার নিকট লোভনীয় মনে হলো এক ধারণা।
পরদিন আমার বন্ধু আমাকে নিয়ে গেলো ডঃ ডামার্টের দপ্তরে। চমৎকার মাঝারি বয়েসি লোকটি আমাদেরকে বসতে অনুরোধ করলেন ভদ্র ও বন্ধুসুলভ ভংগিতে।
-‘মিঃ ফিংগাল। (আমার বন্ধুর নাম) তোমার বিষয়ে আমাকে বলেছেন; তুমি কি এর আগে কখনো সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেছে?’
-‘জ্বী না’ আমি জবাব দিই, ‘তবে আমর অন্য অভিজ্ঞতা রয়েছে বিস্তর। বলতে পারেন, আমি পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলির সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ এবং আমি অনেক ভাষা জানি। (আসলে কিন্তু আমি পূর্ব ইউরোপীয় একটিমাত্র ভাষাতেই কথা বলতে পারতাম, আর সেই ভাষাটি হচ্ছে পোলিশ ভাষা, আর ঐ অংশটিতে তখন কী ঘটছিলো সে বিষয়ে খুব অষ্পষ্ট এক ধারণাই ছিলো আমার। তবু আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অনাবশ্যক বিনয়ের দ্বারা আমি আমার সুযোগ নষ্ট হতে দেবো না।)
-তাই নামি, চমৎকার তো, আরো সাসির সংগে ডঃ ডামার্ট মন্তব্য করেন, বিশেষজ্ঞদের আমি ভারি পছন্দ করি। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে, এই মুহূর্তে পূর্ব ইউরোপীয় বিষয়ের কোনো কাজে তোমাকে লাগাতে পারছিনে।’
নিশ্চয়িই তিনি আমার চেহারায় নৈরাশ্যের ছায়া পেয়েছিলেন, তাই ঝটিটি তিনি বললেন-তবু তোমার জন্য আমার হাতে একটি কাজ রয়েছে-অবশ্য, কাজটি তোমার মর্যাদার ঠিক উপযোগী হয়তো বা নয়..’
-কী রকম কাজ স্যার? আমি আমার বাড়ি ভাড়া আজো দিতে পারিনি, একথা মনে করে জিজ্ঞাসু হই।
-‘দ্যাখো, আমি আরো কটি টেলিফোনিস্ট চাই—না, না, তুমি চিন্তা করো না, অপারেটর নয়। আমার দরকার সেই রকম টেলিফোনিস্ট যারা প্রাদেশিক কাগজগুলির জন্য টেলিফোনে বার্তা পাঠাবে…।’
আমার উচ্চাকাঙ্খার পক্ষে এ প্রস্তাব ছিলো অপমানকর। আমি ডঃ ডামার্টের দিকে তাকাই, তিনিও তাকালেন আমার দিকে, যখন আমি দেখতে পেলাম তাঁর চোখের চারদিকের চটুল রসিকতাময় ভাঁজগুলি ঘনসম্বদ্ধ হয়ে আসছে, আমি বুঝতে পারলাম আমার গর্বোদ্ধত খেলা ভেস্তে গেছে।
-‘আমি তাই করবো স্যার, দীর্ঘশ্বাস ও হাসির সাথে আমি জবাব দিই।
পরের হপ্তায় আমি আমার নতুন কাজ শুরু করি। কাজটা ছিলো খুবই একঘেয়ে ক্লান্তিকর। আমি যে সাংবাদিক জীবনের খাব দেখে আসছিলাম তার সাথে এর সম্পর্ক ছিলো সামান্যই। দিনে কবার করে টেলিফোনের সাহায্যে সংক্ষিপ্ত বার্তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের বার্তা প্রতিষ্ঠানের পত্রিকাগুলিকে পাঠানোই ছিলো আমার কাজ। তবে আমি ছিলাম একজন চমৎকার টেলিফোনিস্ট এবং আমার মাইনেও ছিলো চমৎকার!
এক মাস এভাবে কাজ শুরু করি। কাজটা ছিলো খুবই একঘেয়ে, ক্লান্তিকর। আমি যে সাংবাদিক জীবনের খা’ব দেখে আসছিলাম তার সাথে এর সম্পর্ক ছিলো সামান্যই। দিনে কবার করে টেলিফোনের সাহায্যে সংক্ষিপ্ত বার্তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের বার্তা প্রতিষ্ঠানের পত্রিকাগুলিকে পাঠানোই ছিলো আমার কাজ। তবে আমি ছিলাম একজন চমৎকার টেলিফোনিস্ট এবং আমার মাইনেও ছিলো চমৎকার!
একমাস এভাবে কাজ করি। মাসের শেষে অদৃষ্টপূর্ব এক সুযোগ এসে গেলো আমার জন্য।।
১৯২১ সালে রাশিয়ায় এমন এক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা ছিলো ভয়াবহতায় অভাবিতপূর্ব। কোটি কেটি লোক উপবাস করছিলো এবং মারা যাচ্ছিলো লাখে লাখে। গোটা ইউরোপের সংবাদপত্রগুলি এই পরিস্থিতির লোমহর্ষক বর্ণনায় মেতে উঠেছিলো। বৈদেশিক রিলিফ প্রেরণের কয়েকটি পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছিলো, -তার মধ্যে একটি পরিচালনা করেন হার্বাট হুভার যিনি মহাযুদ্ধের পর মধ্য ইউরোপের জন্য বিপুল সাহায্য করেছিলেন। রাশিয়ার ভেতরে ম্যাক্সিম গোর্কি একটি বড়ো আকারের সাহায্য প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন। সাহায্যের জন্য তাঁর নাটকীয় আবেদনগুলি সারা পৃথিবীকে বিচলিত করে এবং জোর কানাঘুষা চলছিলো, তাঁর স্ত্রী নাকি শিগগিরই মধ্য ইউরোপীয় রাজধানীগুলি সফর করেছেন আরো কার্যকরী সাহায্যের জন্য জনমত গঠন করতে।
আমি ছিলাম কেবল একজন টেলিফোনিস্ট। কাজেই, এই উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার বিবরণ পাঠানেরা ব্যাপারে আমি সরাসরি কিছুই করিনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার এক হঠাৎ পরিচিতির বন্ধুর হঠা একটি মন্তব্য আমি এতে জাড়িত হয়ে পড়ি আকস্মিকভাবে। (আমার এ ধরনের হঠাৎ বন্ধুর সংখ্যা ছিলো অনেক, সবচেয়ে অচেনা স্থানগুলিতে)। এ ক্ষেত্রে আমার এ পরিচিতি বন্ধুটি ছিলো হোটেল এসপ্লানেডের নৈশ দারোয়ান, বার্লিনের সবচেয়ে চালাক লোকদের একজন, আর সেই বললো, এই যে, মাদাম গোর্কি-ইনি একজন চমৎকার মহিলা, কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারবে না যে ইনি একজন বোলশেভি!’
-‘মাদাম গোর্কি? তুমি কোথায় দেখেছো তাঁকে?’
সংবাদদাতা তার গলা নিচু করে ফিস ফিস করে বলে-তিনি আমাদের হোটেলেই আছেন। মাত্র গতকাল এসেছেন, তবে হোটেলের খাতার তিনি ভিন্ন নাম লিখিয়েছেন। শুধু মাত্র ম্যানেজারই জানেন, তিনি কে। তিনি চান না যে রিপোর্টাররা তাঁকে ঘিরে থাকুক।
-কিন্তু ‘তুমি’ তা কী করে জানলে?’
-হোটেলে কী হয় না হয়, আমরা দারোয়ানরা সব জানি, সে দাঁত বার করে হাসে, আপনি কি মনে করেন যে, এটুকু না জানলে আমাদের চাকরি বেশি দিন টিকতো?’
মাদাম গোর্কির সাথে একটি যোগ, একটি নিজস্ব সাক্ষাৎকার কী চমৎকার ব্যাপারই না হবে! বিশেষ করে এজন্যও যে, তিনি যে বার্লিনে আছেন এ ব্যাপারে খবরের কাগজে আজে একটি হরফও ছাপা হয়নি। মুহূর্তে আমার কল্পনায় আগুন ধরে গেলো।
-তুমি কি কোনো রকমে তাঁর সাথে আমার দেখা করিয়ে দিতে পারো? আমি আমার বন্ধুকে বলি।
-‘আমি জানি না পারবো কি না-মাদাম গোর্কি নিজের কথা কাউকে জানতে দিতে একদম নারায। তবে হ্যাঁ, একটা কাজ হয়তো আমি করতে পারি। তুমি যদি সন্ধ্যায় লবিতে বসো, আমি হয়তো ইশারায় তাঁকে দেখিয়ে দিতে পারি ‘
ওর সংগে এই হলো কথা। আমি ইউনাইটেড টেলিগ্রাফে আমার অফিসে ছুটে গেলাম। প্রায় সকলেই তখন চলে গেছে, কিন্তু সৌভঅগ্যক্রমে বার্তা সম্পাদক তখনো টেবিলে কাজ করছিলেন। আমি তাঁকে চেপে ধরলাম-আমি যদি আপনাকে একটি চাঞ্চল্যকর কাহিনী যোগাড় করে দেবার ওয়াদা দিই আপনি আমাকে একটি প্রেস কার্ড দেবেন কিন?
-‘কী ধরনের কাহিনী?’-তিনি সন্দেহের সাথে জিজ্ঞাস করেন।
-‘আপনি আমাকে প্রেস কার্ডটি দিন-আমি আপনাকে কাহিনীটি দেবো। যদি আমি তা না দিই, আপনি যে কোনো সময় কার্ডটি ফেরত পেতে পারেন।’
শেষতক বুড়ো বার্তা-পাগল আমার কথায় রাজী হয়ে গেলেন। আমি অফিস থেকে বের হয়ে গেলাম একটি কার্ড নিয়ে-এমন একটি কার্ডের গর্বিত অধিকারীরূপে বের হয়ে এলাম যার বদৌলতে এখন আমর পরিচয় হলো আমি ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি।
পরের কটি ঘন্টা আমার কাটলো এসপ্লানেডের লবিতে (প্রবেশ কক্ষে)। ন’টায় সময় আমর দোস্ত এসে কাজে যোগ দিলো। দরজায় দাঁড়িয়ে সে আমাকে চোখ ইশারা করলো-তারপর সে হারিয়ে গেলো অভ্যর্থনা ডেস্কের আড়ালে এবং কয়েক মিনিট পর আবার ফিরে এসে বললো যে মাদাম গোর্কি তাঁর কামরায় নেই, বাইরে গেছেন।
-‘তুমি যদি সবুর করে অনেকক্ষণ বসো, তিনি এলে আলবৎ তাঁকে দেখতে পাবে।’
প্রায় এগারোটার সময় আমি আমর দোস্তের সংকেত পেলাম। সে গোপনে আমাকে ইশারা করছিলো একজন মহিলার প্রতি, যিনি এই মাত্র ঘূর্ণায়মান দরজা দিয়ে ঢুকছেনঃ ছোট্ট অবয়বের চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের এক সুন্দরী মহিলা, পরনে তার অতি চমৎকার কাটিং-এর একটি কালো গাউন আর হাত-কাটা ঢিলা জামা, যা যমীনের উপর গড়াচ্ছিলো তাঁর পেছনে পেছনে, তাঁর চলার সংগে সংগে। তিনি তাঁর চাল-চলনে এমনি খাঁটি অভিজাত যে তাঁকে ‘কুলি-মজুরের কবির’ স্ত্রী বলে কল্পনা করা সত্যি বড়ো কঠিন এবং আরো কঠিন তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন নাগরিক বলে কল্পনা করা। তাঁর পথ আটকে আমি মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাই, তারপর গলার স্বরটাকে যতদূর সম্ভব আকর্ষনীয় করে তাঁকে সম্বোধন করতে তৈরি হই—‘মাদাম গোর্কি..।’
মুহূর্তের জন তিনি চকিত বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে একটি স্মিত হাসিতে তাঁর সুন্দর কালো চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তারপর তিনি অমন জার্মান ভাষায় জবাব দিলেন যাতে স্লাভ উচ্চারণের প্রতি সামান্যেই ধরা পড়লোঃ‘ আমি মাদাম গোর্কি নই—তুমি ভুল করেছো- আমার নাম অমুক (রুশীয় নামের মতো শোনায় এমন একটি নাম বললেন, যা আমি ভুলে গেছি।)’
-‘না, মাদাম গোর্কি’, আমি জোর দিয়ে বলি, ‘আমি জানি, আমি ভূল করিনি। আমি এ-ও জানি যে, আমরা রিপোর্টারদের দ্বারা আপনি বিরক্ত হতে চান না—কিন্তু আমি যদি আপনার সাথে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পাই আমার জন্য তা-ই যথেস্ট হবে-হ্যাঁ, যথেষ্ট হবে আমার জন্য। এ সুযোগ আমার জীবেনের পয়লা সুযোগ, আমার আত্মপ্রতিষ্ঠার। আমি নিশ্চিত যে আপনি আমার এ সুযোগ নষ্ট হতে দেবেন না।’ এরপর আমি তাঁকে আমার প্রেস-কার্ড দেখাই,– ‘আজই আমি এটি পেয়েছি-এবং আমি যদি মাদাম গোর্কির সাথে আমার সাক্ষাৎকারের রিপোর্ট দিতে না পারি এই কার্ডটি আমাকে ফেরত দিতে হবে।’
অভিজাত মহিলাটির মুখে আগের মতোই স্মিত হাসি জেগে রয়েছে-‘কিন্তু আমি যদি হলফ করে বলি, আমি মাদাম গোর্কি নই, তাহলে কি তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে?’
-‘আপনি হলফ করে যা-ই বলবেন আমি বিশ্বাস করবো।’
মহিলা হাসিতে ফেটে পড়লেন-তুমি তো ভারি চমৎকার ছোকরা হে।’ (তাঁর সুন্দর মাথাটি আমর কাঁধ পর্যন্ত পৌছালো কি না, সন্দেহজনক।) ‘আমি তোমাকে কোনো মিথ্যা বলবো না। তোমারই জয় হলো। তবে সন্ধ্যার বাকী সময়টা আমিরা লবিতে কাটাতে পারি না। তুমি আমার কামরায় আমার সাথে চা খেয়ে আমাকে কিছুটা আনন্দ দিতে কি রাজী আছো?’
এইভাবে আমি মাদাম গোর্কির কামরায় বসে চা খেয়ে ধন্য হই। প্রায় এক ঘন্টাকাল তিনি দূর্ভিক্ষের ভয়াবহতা হুবহু বর্ণনা করলেন। তারপর, আমি যখন মাঝরাতে তাঁর কাছে থেকে বিদায় নিলাম, আমি সংগে করে নিয়ে এলাম অনেকগুলি নোট করা অনেকগুলি পাতা।
ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের অফিসে যে-সব সহ –সম্পাদক রাতের ডিউটিতে ছিলো এই অস্বাভাবিক মুহূর্তে আমাকে অফিসে দেখে তাদের চোখ বিস্ফারিত হলো। কিন্তু আমি কোনো ব্যাখ্যা দেবার প্রয়োজন বোধ করলাম না। কারণ আমার হাতে রয়েছে জরুরী কাজ। আমার সাক্ষাৎকারের রিপোর্ট যতো তাড়াতাড়ি লিখে নিয়ে সম্পাদকের অপেক্ষা না করেই আমাদের গ্রাহক প্রত্যেকটি কাগজের জন্য জরুরী প্রেস কল বুক করি।
পরের সকালেই বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটলো। বার্লিনের বিখ্যাত দৈনিকগুলির একটিতেও মাদাম গোর্কির উপস্থিতি সম্পর্কে একটি হরফও ছাপা হয়নি, অথচ আমাদের বার্তা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক মফস্বলের প্রত্যেকটি কাগজ পয়লা পৃষ্ঠায় ছাপিয়ে দিয়েছে মাদাম গোর্কির সাথে ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের বিশেষ প্রতিনিধির সাক্ষাৎকারের নিজস্ব বিবরণ। টেলিফোনিস্ট একটা পয়লা শ্রেণীর রিপোর্ট তৈরি করে বসেছে!
বিকালে ডঃ ডামার্টের অফিসে সম্পাদকদের একটা বৈঠকে বসলো। আমাকে সেখানে ডেকে পাঠানো হলো-তারপর আমাকে বক্তৃতা দিয়ে বোঝানো হলো, গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবরই বার্তা-সম্পাদকের অনুমতি ছাড়া কখনো বিলি করতে নেই। প্রাথামি এই বক্তৃতার পর আমাকে জানানো হলো, আমাকে রিপোর্টার পদে উন্নীত করা হয়েছে।
অবশেষে আমি হলাম একজন সাংবাদিক।
চার
বালিতে নরম মৃদু পায়ের আওয়াজঃ জায়েদ-কুয়া থেকে সে ফিরছে মশক-ভর্তি পানি নিয়ে। ধপ করে সে মশকটি ছেড়ে দেয় যমীনের উপর, তারপর সে আমাদের দুপুরের রান্নায় আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে; ভাত এবং ছোট একটি ভেড়ার গোশত যা সে আগে সন্ধ্যায় কিনেছিলো গাঁ থেকে । হাতা দিয়ে শেষবারের মতো বারেক নেড়ে দেয়, তারপর কড়াই থেকে বক বক করে দূয়া ওঠার পর সে আমার দিকে ফেরেঃ
-‘আপনি কি এখন খাবেন, চাচা?’ এবং আমার জবারের জন্য অপেক্ষা না করে- কারণ ও জানে, আমার জবাব হ্যাঁ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না,- সে পাত্র থেকে খাবারগুলি একটি বড়ো বর্তনের উপর স্তূপীকৃত করে আমার সামনে রেখে দেয় এবং আমাদের একটি পিতলের জগে পানি ভরে তুলে ধরে আমার হাত ধোয়ার জন্যঃ
-‘বিসমিল্লাহ, আল্লাহ আমাদের হায়াত দরাজ করুন।’ তারপর আমরা একে অপরের মুখোমুখি পদ্মাসন হয়ে বসে ডান হাতের আাঙুল দিয়ে কেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
আমরা চুপচাপ খাচ্চি। আমাদের দুজনের কেউই খুব বেশি কথা বলতে জানি না, তাছাড়া যেভাবেই হোক, আমার মন তখন পুরানো স্মৃতির রাজ্যে গিয়ে পড়েছে। আমি ভাবছিলাম, আরব দেশে আমার আগেকার দিনগুলির কথা, যখন জায়েদের সাথেও আমার সাক্ষাৎ হয়নি। কাজেই, আমি পরিষ্কার কথা বলতে পারবো না; কেবল আমার নিজের মনে মনে নিজের সাথে কথা বলে চলি, আমার বর্তমান মেজাজের সাথে অতীতের মুহূর্তে মেজাজ-মর্জির স্বাদ-গন্ধ মিশিয়ে।
খানা শেষ হবার পর আমি যখন আমার উটের জিনে হেলান দিয়ে বসলাম, আঙুলগুলি তখন খেলা করছিলো বালু নিয়ে এবং আমি তাকিয়ে থাকি নীরব নিশ্চুপ আরব-আসমানের নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে। আমার মনে হলো, সেই সুদূরের বছরগুলিতে আমার জীবনে যা কিছু ঘটেছে সব বলতে পারি দীল খুলে এমন একজনকে যদি আমার পাশে পেতাম, কী চমৎকারই না হতো! কিন্তু আমার পাশে তো জায়েদ ছাড়া আর কেউই নেই। জায়েদ এক চমৎকার এবং বিশ্বস্ত মানুষ-আমার জীবনের বহু নিঃসংগ মুহূর্তে তাকে আমি পেয়েছি আমার সাথী হিসাবে। জায়েদ অতি বিচক্ষণ, সে অতি সূক্ষ্ম বিষয়ও ধরতে পারে এবং মানুষের চরিত্রে তার জ্ঞান গভীর। কিন্তু আমি যখন ওর মুখের দিকে আড়ভাবে তাকাই ঘাড় বাঁকিয়ে, দীর্ঘ জুলফির ফ্রেমের মধ্যে ওর সুগঠিত, পরিচ্ছন্ন মুখমণ্ডল এই মুহূর্তে ঝুঁকে পড়েছে কফি-পেয়ালার উপর, সবকিছু ভুলে গিয়ে আবার পরমুহূর্তেই জায়েদ ঘাড় ফিরেয়ে চাইছে কাছে যমীনের উপর বসে-পড়া উটগুলির দিকে, প্রশান্তরি সংগে জাবর কাটছে উটগুলি-তখন আমি বুঝতে পারি, আমি চাই ঠিক ভিন্ন এক শ্রোতা; এমন একজন শ্রোতা, আমার সেই দূর অতীতের সাথেই যে কেবল তার সম্পর্ক নেই, তা নয়, বরং আমার বর্তমান দিনরাতের দৃশ্য শব্দ গন্ধ থেকেও সে থাকবে অনেক দূরে, যার সামনে আমি আমার স্মৃতির গেরো খুলে দিতে পারবো একটি একটি করে-যাতে করে তার চোখ সেগুলি দেখতে পায়, আর পরে আমার চোখও পুনরায় দেখতে পায় সেগুলি এবং এভাবে যে আমাকে সাহায্য করবে, আমার শব্দের জালের মধ্যে আমার নিজের অতীত জীবনকে ধরতে।
কিন্তু এখানে জায়েদ ছাড়া নেই। এবং জায়েদই তো মূর্তিমান বর্তমান।
হাওয়া
এক
আমরা চলেছি তো চলেছি-দু’টি মানুষ দু’টি উটের উপর এবং সকাল গড়িয়ে ছাড়িয়ে গেল আমাদেরকে।
-‘এ ভারি তাজ্জব ব্যাপার-ভারি বিস্ময়কর ব্যাপার’, নীরবতার মধ্যে জায়েদের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়।
-‘ তাজ্জব ব্যাপার কী, জায়েদ?’
-‘একি তাজ্জব ব্যাপার নয় চাচাজান, মাত্র ক’দিন আমরা যাচ্ছিলাম তায়েমার দিকে, কিন্তু এখন আমাদের উটগুলির মুখ রয়েছে মক্কার দিকে। আমার বিশ্বাস যে, সেই রাতের আগে আপনি নিজেও তা জানতে না। আপনি বদ্দুর মতোই ভবঘুরে.. এই ঠিক যেমন আমি! চাচাজান, একি কোনো জিন, যে আজ থেকে চার বছর আগে হঠাৎ আমার মনে জাগিয়ে দিয়েছিলো আপনার সাথে মক্কায় দেখা করার বাসনা এবং এখন আপনার মনে জন্ম দিয়েছে মক্কা যাওয়ার সিদ্ধান্ত? এমনি করে কি আমরা হাওয়ার মুখে উড়ে চলেছি, আমরা কী চাই তা জানি না বলে?’
-‘না যায়েদ, তুমি আমি- আমরা স্বেচ্ছায় হাওয়ার মুখে ভেসে চলেছি, কারণ আমরা জানি, আমরা কী চাই; আমাদের হৃদয় তা জানে, যদিও আমাদের চিন্তা কখনো কখনো তা অনুধাবন করতে দেরী করে বসে; কিন্তু পরিণামে আমাদের চিন্তা আমাদের হৃদয়ের সাথে তাল রেখেই চলে এবং তখন আমরা ভাবি, আমরা একটি সিদ্ধান্তে এসেছি..!
.. . .. . … .. . .. . …
হয়তে দশ বছর আগে, সেদিনও আমার হৃদয় তা জানতো না, যখন আমি দাঁড়িয়েছিলাম জাহাজের পাটাতনে। জাহাজটি আমাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলো নিকট প্রাচ্যের দিকে আমার পয়লা সফরে, দক্ষিণমুখে, কৃষ্ণসাগরের ভেতর দিয়ে ধূসর কিনারহীন কুয়াশাচ্ছন্ন রাত্রির অস্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে, কুয়াশার মোড়া এক ভোর অতিক্রম করে বসফোরাসের অভিমুখে। সমুদ্দুর মনে হচ্ছিলো সীসার মতো, কখনো ফেনা ছিটকে পড়ছিলো পাটাতনের উপর আর ইঞ্জিনের আঘাত যেন হৃদস্পন্দনের শামিল!
আমি রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিলাম-দৃষ্টি আমার পাণ্ডুর ছায়াচ্ছন্নতার দিকে। কেউ যদি তখন আমাকে জিজ্ঞাস করতো, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি কী ভাবছিলাম কিংবা প্রাচ্যে আমার এই পয়লা অভিযানে আমি ঠিক কী প্রত্যাশা নিয়ে বের হয়েছি আমার পক্ষে পরিষ্কার জবাব দেয়া খুবই কঠিন হতো। ঔৎসুক্য সম্ভবত, কিন্তু এ এমন এক ঔৎসুক্য যা তীব্র ছিলো না এবং মনে হয়, এর লক্ষ্য ছিলো অমন বিষয় যার বিশেষ কোনো গুরুত্বই ছিলো না। আমার অস্বত্বির এই কুয়াশা, যা সমুদ্রের উপর ঘনায়মান কুয়াশার সাথেই যেনো কিছুটা সম্পর্কিত-তার লক্ষ্য ছিলো না বিদেশ-ভূমি কিংবা আসছে দিনগুলির মানুষেরা, নিকট ভবিষ্যতের ছবিসমুহ, অদ্ভূত শহর-বন্দর আর চেহারা-সুরত, বিদেশী কাপড়- চোপড় আর চাল-চলন, যা শীঘ্রই আমার চোখে ছায়া ফেলতে লাগলো, আমার চিন্তায় সেগুলির স্থান ছিলো খুব অল্পই। সফরে কিছুটা আকস্মিক এক ব্যাপার মনে হয়েছিলো আমার কাছে। আমি একে গ্রহণ করেছিলাম আমার দীর্ঘ সফরে এক আনন্দদায়ক অথচ তেমন-বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় এমনি এক অবকাশ হিসাবে। সে সময়টায় আমার মন বিচলিত ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলো অতীতের ভাবনায়!
অতীত? সত্যি কি আমার কোনো অতীত আছে? আমার বয়স তখন বাইশ বছর। কিন্তু আমর বয়সের মানুষ-সেসব মানুষ যারা জন্মেছে এই তকের শুরুতে-সম্ভবত আগের যে –কোনো কালের মানুষের চাইতে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠেছে; অল্পদিনের মধ্যেই তাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেক বেশি দীর্ঘ জীবনের-আর আমার মনে হলো, আমি যেনো পেছনে ফিরে তাকাচ্ছি সময়ের সুদীর্ঘ বিস্তানের দিকে চোখ মেলে। এই বছরগুলির সব কটি বাঁধা-বিপত্তি এবং দুঃসাহসিক অভিযান-সেইসব আশা-আকাঙ্খা, চেষ্টা ও ব্যর্থতা আর সেই সব রমণী এবং জীবনের উপর আমর প্রথম অতর্কিত সব হামল-সবই আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে। তারা ঝলমল আসমানের নীচে সেইসব অন্তহীন রাত, যখন আমি ঠিক জানতাম না আমি কী চাই এবং কোনো দোস্তের সাথে হেঁটে চলেছি জনশূন্য রাস্তায়, পারমার্থিক বিষেয়ে কথা বলতে বলতে-বেমালুম ভূলে যেতাম যে, পকেট কতো শূন্য এবং আসছে কাল আমার জন্য কতো অনিশ্চিত-একটি সুখদায় অসন্তোষ, যা কেবল একজন তরুণই অনুভব করতে পারে, তার সংগে দুনিয়াকে বদলে দেবার আর তাকে নুতন করে নির্মাণ করার বাসনা- সমাজকে কীভাবে বিন্যস্ত হওয়া উচিত তাদের সম্পর্ক, যাতে করে প্রত্যেটি মানুষ যে একাকীত্ব দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে তা ভেঙে-চুরে সকলেই বেরিয়ে আসতে পারে এবং সত্যিকার পারস্পরিক সহয়োগিতা ও বন্ধুত্বের মধ্যে কাটাতে পারে জীবন? ভালো কী এবং মন্দ কী, ভাগ্য কী- কিংবা ভিন্নভাবে বলতে গেলেঃ মানুষের কী করা উচিত, যাতে করে সে যথার্থভাবেই এবং কেবল মুখে নয়, তার জীবনের সাথে এক ও অভিন্ন হতে পারে এবং বলতে পারে, ‘আমি আর আমার অদৃষ্ট আলাদা নয়, একই’-এই ধরনের সব আলোচনা যা কখনো ফুরাতে চাইতো না। ভিয়েনা ও বার্লিনের সাহিত্যের ক্যাফে গুলি যেখানে অবিরাম তর্ক-বিতর্ক চলতো ‘রূপ’ ও ‘স্টাইল’ ও ‘প্রকাশভংগি’ নিয়ে, রাজনৈতিক স্বাধীনাতর অর্থ নিয়ে, নারী ও পুরাষের মেলামেশা নিয়ে.. . জানার ক্ষুধা এবং কখনো কখনো পেটের ক্ষুধাও .. . এবং অসংযত ইন্দ্রিয়াবেগের মধ্যে কাটানো রাতগুলিঃ ভোরে বিছানা পড়ে থাকতো নোংরা, এলোমেলোভাবে, যখন রাতের উত্তেজনায় পড়তো ভাটা আর তা ধীরে ধীরে হয়ে উঠতো ধূসর, কঠিন আর নিরানন্দ। কিন্তু যখন সকাল হতো তখন আমি ভুলে যেতাম ভোরের রিক্তাবশেষের কথা এবং দুলতে দুলতে আবার চলতে শুরু করতাম এবং টের পেতাম পায়ের নীচে জমিন যেনো আনন্দে কাঁপছে,.. . একটি নতুনমুখ দেখা বা নতুন বই হাতে নেবার উত্তেজনা.. প্রশ্নের জবাব খুঁজে বেড়ানো এবং অর্ধেক উত্তর পাওয়া,-এবং সেইসব অতিশয় বিরল মুহূর্তে যখন মনে হতো; পৃথিবী যেনো সহসা কয়েক সেকেণ্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে, উপলব্ধির চকিত আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে-উপলব্ধি যার আভাস এনে দিতো এমন কিছু উদঘাটনের পূর্বে কখনো যার নাগাল পায়নি কেউঃ সকল প্রশ্নের এক জবাব.. .
বিশ শতকের গোড়ার দিকের সেই বছরগুলি ছিলো অদ্ভুত বিস্ময়কর। সর্বথ্র তখন সামাজিক ও নৈতিক অনিশ্চয়তার যে আবহাওয়া বিরাজ করছে, তা-ই জন্ম দেয় বেপরোয়া আশাবাদের, আর তার প্রকাশ ঘটে একদিকে সংগীত, চিত্রকলা ও নাটকে দুঃসাহসিক-পরীক্ষণ-নিরীক্ষণে, অন্যদিকে সংস্কৃতির রূপরেখা ও কাঠামো সম্পর্কে আঁধারে হাতড়ানোতে, প্রায়শ বৈপ্লবিক অনুসন্ধানের; কিন্তু এই জোর করে বাঁচিয়ে রাখা আশাবাদের পাশাপাশিই তখন চলছে একটি আধ্যাত্মিক শূন্যতা, একটি, একট অস্পষ্ট উন্নাসিক আপেক্ষিকতাবাদ, যার জন্ম হয়েছিলো মানুষের ভাগ্য সম্পর্কে এক ক্রমবর্ধমান নৈরাশ্যের মধ্যে।
আমার অল্প বয়স সত্ত্বেও আমার নিকট এ বিষয় গোপন ছিলো না যে, মাহযুদ্ধের ধ্বংসলীলার পর ভয়-বিধ্বস্ত, অসন্তুষ্ট, ভাবাবেগ-পীড়িত, উত্তেজিত, উচ্চগ্রামে বাঁধা ইউরোপীয় জগতে কোনো কিছুই আর ঠিক –ঠাক চলছিলো না আগের মতো। আমি দেখতে পেলাম, এর আসল উপাস্য আর আধ্যাত্মিক কিছু নয়, এর একমাত্র উপাস্য হচ্ছে ‘কমফর্ট’, আরাম-আয়েশ। সন্দেহ নেই যে, তখনো এমন বহু ব্যক্তি ছিলেন যাঁদের অনুভূতি ও চিন্তা নিয়ন্ত্রিত হতো ধর্মীয় তাৎপর্য দ্বারা, যাঁরা নিজেদের সভ্যতার সার-নির্যাসের সাথে তাঁদের নৈতিক বিশ্বাসগুলিকে খাপ-খাওয়ানোর জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁরা ছিলেন বিরল ব্যতিক্রম।
গড়পড়তা একজন ইউরোপীয়, সে গণতন্ত্রী হোক আর কমিউনিস্টই হোক, মজদুর হোক আর বুদ্ধিজীবীই হোক, তার কাছে অর্তপূর্ণ বিশ্বাস একটিই ছিলো বলে মনে হয়ঃ বৈষয়িক উন্নতির পূজা-এই বিশ্বাসে যে, জীবনকে ক্রমাগত সহজতরো করে তোলা ছাড়া জীবনের আর কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে না, কিংবা সাম্প্রতিক পরিভাষায় যেমন বলা হয়ে থাকে, জীবনকে ‘প্রকৃতির কবল থেকে আযাদ করাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য’। এই ধর্মের মন্দির হচ্ছে বিশাল কল-কারখানা, সিনেমা, রাসায়নিক, গবেষণার, নৃত্যশালা, পানি বিদ্যুৎ সংস্থাসমূহ আর এ ধরনের মন্দিরের পুরোত ঠাকুর হচ্ছে ব্যাংকার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ, চিত্রতারকা, সংখ্যাতত্ত্ববিদ, শিক্ষা-পরিচালক, রেকর্ড স্রষ্টা বৈমানিক এবং কমিসারেরা! ভালো এবং মন্দের ধারণার ব্যাপারে সার্বিক মতানৈক্য এবং সকল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে সুবিধাবাদের আশ্রয় গ্রহণ- এরি মধ্যে অভিব্যক্তি ঘটলো নৈতিক ব্যর্থতার-সেই সুবিধাবাদিতার যা চুনকাম করা রাস্তার বারাংগনার সংগে তুলনীয়, যে বারাংগনা যখনি বাঞ্ছিত হয় যে-কোন জনের কাছে যে-কোনো সময়ে নিজেকে দান করে থাকে। ক্ষমতা ও সুখের অতৃপ্ত লালসাই পাশ্চাত্য সমাজকে অনিবার্যভাবে বিভক্ত করে রেখেছে পরস্পর-বিরোধী বিভিন্ন দলে, যে দলগুলি প্রত্যেকটিই সর্বপ্রকার অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত এবং যখনি আর যেখানেই তাদের পারস্পরিক স্বার্থে সংঘাত বাঁধছে তারা একে অপরকে ধ্বংস করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তমদ্দুনের ক্ষেত্রে এর ফল হলো এমন এক ধরনের মানুষের সৃষ্টি, বাস্তব উপযোগিতাই যার কাছে নৈতিকতার একমাত্র মানদণ্ড ছিলো বলে মনে হয়, যার কাছে ন্যায়-অন্যায়ের সর্বোচ্চ মাপকাঠিই ছিলো জাগতিক সাফল্য।
আমি দেখতে পেলাম আমাদের জীবন কতো অসুখী এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে মানুষের সংগে মানুষের সত্যিকার যোগ কতো সামান্য, যদিও সমাজ ও জাতির উপর জোর দেয়া হচ্ছে কান-ফাটানো, প্রায় উন্নত্ত চিৎকারের সাথে। আমরা আমাদের সহজাত অনুভূতির দুনিয়া থেকে কত দূরে সরে পড়েছি আর আমাদের আত্মা কতো সংকীর্ণ কতো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। আমি এ সবই দেখতে পেলাম। কিন্তু যে কারণেই হোক, এ চিন্তা কখনো আমার মনে গভীরভাবে জাগেনি, যেমন কখনো তা জাগেনি আমার চারপাশে আংশিক সমাধান, হয়তো ইউরোপের নিজের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বাইরে কোথাও থাকতে পারে। আমাদের সকল চিন্তার আদি আর অন্ত ছিলো ইউরোপ। এবং সতেরো বছর কিংবা তার কাছাকাছি বয়সে, আমর লাওসে’র সন্ধান লাভও এ ব্যাপারে আমার মনোভংগির কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
. .. … …
এছিলো একটি খাঁটি আবিষ্কার। এর আগে কখনো আমি লাওসের নামই শুনিনি, আর তাঁর দর্শন সম্বন্ধে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ও ছিলো না, তখন একদিন আমি হঠাৎ ভিয়েনার এক বইয়ের দোকানের কাউন্টারে পেয়ে গেলাম তাও-কে-কিং-এর একটি জার্মান তর্জমা। বইটির অদ্ভুত নাম আমাকে কিছুটা উৎসুক করে তোলে। এলোমেলোভাবে বইটির পাতা উল্টাতে গিয়ে হঠাৎ আমার নজরে পড়ে বইটির ছোট্ট তাৎপর্যবহ অধ্যায়গুলির একটির উপর, আর আমি অনুভব করি, সুখের ছুরিকাঘাতের মতো একটি হঠাৎ রোমান্স, একটা আকস্মিক শিহরণ, ফলে আমি নিজ পরিপার্শ্বের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে, যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম মন্ত্রমুগ্ধবৎ স্থির নিশ্চল হয়ে, বইটি হাতে নিয়ে; কারণ, এ বইতে আমি জীবনকে দেখতে পেলাম তার পরিপূর্ণ স্নিগ্ধ নির্মলরূপে, সমস্ত ফাটল ও দ্বন্ধ থেকে মুক্ত সেই শান্ত, নম্র আনন্দের মধ্যে যা উর্ধ্বাভিগামী, যার অবকাশ হামেশাই রয়েছে মানব হৃদয়ে, যখনি মানুষ যত্নবান হয় তার আপন স্বাধীনতার সদ্ব্যবহারে।… এ যে সত্য, তা আমি জানতামঃ এমন এক সত্য এ, যা সত্য ছিলো সবসময়ই, যদিও আমরা তা ভুলে গেছি, আর এই মুহূর্তে এই সত্যকে প্রত্যক্ষ করলাম সেই আনন্দের সংগে, যে আনন্দের সংগে মানুষ ফিরে আসে তার বহু দিনের হারানো ঘরে.. ..
তখন থেকে কয়েকটি বছর ধরে লাওসে ছিলেন আমার জন্য এক জানালা বিশেষ, যার ফাঁক দিয়ে আমি তাকাতাম জীবনের কাঁচ-স্বচ্ছ এলাকাগুলির দিকে, যে-জীবন ছিলো সমস্ত সংকীর্ণতা ও মানুষের নিজের সৃষ্ট ভয়-ভীতি থেকে অনেক দূরে, শিশুসুলভ বাতিক থেকে মুক্ত, যে বাতিক আমাদের বাধ্য করেছিলো, মুহূর্ত থেকে মুহুর্তে হামেশা এবং যে-কোনো মূল্যে, জাগতিক উন্নতির মাধ্যমে নতুন করে আমাদের অস্তিত্বের নিরাপত্তা বিধান করতে। কথা এ নয় যে, ‘বৈষয়িক উন্নতি’ আমার দৃষ্টিতে অন্যায়, কিংবা অনাবশ্যক মনে হতো-বরং তখনো আমি তা কল্যাণকর এবং প্রয়োজনীয় বলেই ভাবতাম। কিন্তু একই সংগে আমার এ বিশ্বাসও জন্মেছিলো, ‘বৈষয়িক উন্নতি’ কখনো তার আসল লক্ষ্য হাসিল করতে পারে না, যে লক্ষ্য মানুষের সামগ্রিক সুখ বৃদ্ধি,- যদি না এ উন্নতির সাথে থাকে আমাদের আধ্যাত্মিক মনোভংগির নব রূপায়ণ আর পরম মূল্যগুলিতে, অন্য-নিরেপেক্ষ, এক নতুন বিশ্বাস। কিন্তু এই নব রূপায়ণ কী করে সম্ভব আর এই নব মূল্যায়ন কী ধরনের হবে তা আমার কাছে পরিষ্কার ছিলো না মোটেই।
জীবন আঁকড়ে ধরে তার উপর জুলুম না করে মানুষের উচিত জীবনের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়া-লাওসের এ বিশেষ প্রচারের মতো কেউ প্রচার করতে শুরু করলেই যে মানুষ জীবনের লক্ষ্য-বদলে ফেলবে এবং এভাবে সে তার চেষ্টা –সাধনার দিক পরিবর্তন করবে এমন প্রত্যাশা অলস কল্পনা ছাড়া আর কিছুই হতো না। কেবলমাত্র প্রচার, কেবলমাত্র বুদ্ধিগত উপলব্ধি ইউরোপীয় সমাজের আাধ্যাত্মিক মনোভংগিতে কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম ছিলো না মোটেই। প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো হৃদয়ের এক নতুন বিশ্বাস, এক নতুন ধর্মের-ঈমানের আগুনে উদ্দীপিত হয়ে সেসব মূল্যের নিকট আত্মসমর্পণের-যেগুলিতে ‘যদি’ এবং ‘কিন্তু’র কোনো অবকাশ নাই। কিন্তু সে ধর্ম কোথায় পাওয়অ যাবে….?
যে কারণেই হোক, এ আমর মনে জাগেনি যে, লাওসে, ক্ষণস্থায়ী এবং সে কারণে পরিবর্তনশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক মনোভাবের বিরুদ্ধেই তাঁর প্রবল আপত্তি তুলেছিলেন। বরং তাঁর চ্যালেঞ্জ ছিলো সেই মৌলিক ধারণার বিরুদ্ধে যা থেকে পয়দা হয় এই মনোভংগি। আমি তা জানলে এ সিদ্ধান্তে আসতেই বাধ্য হাতাম যে, লাওসে আত্মার যে নির্ভার প্রশান্তির কথা বলেছেন সেখানে পৌছুনোর ক্ষমতা নাই ইউরোপের, যদি না সে সাহস সঞ্চয় করে নিজের আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক ভিত্তি সম্পর্কেই প্রশ্ন তোলো। অবশ্য, সজ্ঞানে এরূপ একটা সিদ্ধান্তে আসার জন্য তখন আমার বয়স ছিলো খুবই কম.. . চৈনিক দরবেশের সেই প্রতিবাদের পূর্ণ তাৎপর্য এবং তার সামগ্রিক ঐশ্বর্য বোঝার বয়স আমার তখনো হয়নি। একথা সত্য যে, তাঁর বাণী আমার অন্তরতম সত্ত্বাকে ধরে নাড়া দিয়েছিলো-আমার কাছে তা জীবনের অমন একটা রূপ উদঘাতিত করেছিলো যাতে মানুষ তার ভাগ্যের সংগে এবং এভাবে তার নিজেরই সংগে একাত্মবোধ করতে পারে। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না-এ ধরনের একটা দর্শন কী করে বিশুদ্ধ মানসিক অনুধ্যানের গণ্ডী ডিঙিয়ে যেতে পারে এবং বাস্তবে রূপায়িত হতে পারে ইউরোপীয় জীবনের পটভূমিকায়। ফলে, ধীরে ধীরে আমার সন্দেহ হতে লাগলো- এর রূপায়ন আদতেই সম্ভব কিনা। আমি অবশ্য তখনো সেই বিন্দুতে এসে পৌছুইনি যেখানে এসে আমি নিজেকেই প্রশ্ন করতে পারিঃ যদি তার মূলনীতিগুলির আলোকে ইউরোপীয় জীবন-পদ্ধতির বিচার করা হয়, তাহলে সে জীবন পদ্ধতিই একমাত্র সম্বাব্য জীবন পদ্ধতি কি না। অন্য কথায়, আমি আমার চারপাশের আর সকলের মতোই সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন ছিলাম ইউরোপের অহং-সর্বস্ব সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভংগির দ্বারা।
তাই, লাওসে’র কণ্ঠস্বর কখনো একদম নীরব হয়ে না পড়লেও, ক্রমে ক্রমে তা সরে গেলো চিন্তামূলক কল্পনার পশ্চাদভূমিতে এবং কালে তা হয়ে উঠটো কেবল সুন্দর কবিতার বাহন, আর কিছু নয়। আমি তখনো তা মাঝে মাঝে পড়তাম এবং সুখদায়ক এক প্রত্যাশার ছুরিতে জখম হতাম। প্রত্যেকবারই কিন্তু বইটি আমি এই ঐকান্তিক অনুশোচনার সাথে রেখে দিতাম যে এ কোনো হাতীর দাঁতের তৈরি মিনারের দিকে স্বপ্নের ডাক ছাড়া কিছু নয় এবং আমি যে জগতের অংশ সেই বেসুরো, তিক্ত এবং লোভান্ধ জগতের সাথে যদিও আমি তাল রেখে চলতে পারছিলাম না তবু হাতীর দাঁতে তৈরি মিনারে বাস করার ইচ্ছা আমার ছিলো না।
তবু, সে সময়ে ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে যে-সব লক্ষ্য ও প্রয়াস নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছিলো এবং ইউরোপের সাহিত্য, কলা ও রাজনীতিকে ভরে তুলেছিলো প্রাণবন্ত তর্ক-বিতর্কের গুঞ্জন ধ্বনিতে, আমি তাতে মোটেই কোনো উদ্দীপনা বোধ করছিলাম না- কারণ, এসব লক্ষ্য ও প্রয়াসের বেশির ভাগ একে অপরের যতো বিরোধীই হোক না কেন, সব কটির মধ্যেই একটি জিনিস ছিলো কমন বা সাধারণঃ তা এই সরল ধারণা যে, জীবনকে বর্তমান বিভ্রান্তি থেকে টেনে তোলা এবং ‘উন্নত করা’ সত্যি সম্ভব যদি কেবল বাহ্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা উন্নত করা যায়। এ আমি তখনো খুব গভীরভাবেই অনুভব করেছিলাম, কেবলমাত্র বৈষয়িক উন্নতি কেনো সমাধা নয় এবং যদিও আমি নিশ্চিত করে জানতাম না সমাধান কোথায় পাওয়া যেতে পারে, তবু আমি নিজের মধ্যে সে উৎসাহ উত্তেজনার সন্দেহাতীত প্রমাণ কখনো পাইনি যা আমার সমকালীন লোকের ‘প্রগতির নামে অনুভব করতো।
একথা ঠিক নয় যে, আমি অসুখী ছিলাম। আমি কোনো দিনই অর্ন্তমুখী ছিলাম না। আর ঠিক সেই সময়ে আমি আমার ব্যবহারিক জীবনে প্রায় অসাধারণ সাফল্য উপভোগ করছিলাম। যদিও আমি পোশাকে পেশা হিসাবে খুব গুরুত্ব দিতে সামন্যই ইচ্ছুক ছিলাম, তবু ইউনাইটেড টেলিগ্রাফে আমার কাজ আমার জন্য বৃহত্তর পৃথিবীর বহু পথ খুলে দিয়েছে বলে মনে হলো-কারণ বহু ভাষা জানতাম বলে আমি তখন সহ-সম্পাদক পদে উন্নীত হয়েছি এবং স্ক্যণ্ডিনেভিয়ান দেমগুলির পত্র-পত্রিকার জন্য সংবাদ সরবরাহের দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হয়েছে। ক্যাফে দা ওয়েসটেন্স এবং তার আত্মিক উত্তরাধিকারী রোমানিশেষ ক্যাফে-দুটি ছিলো অনেকটা আমার মন মানসের স্ব-গৃহঃ এ দুজায়গায় তখনকার দিনের প্রায় সকল বিখ্যাত লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, অভিনেতা এবং চিত্রপরিচালকেরা জমায়েত হতেন। নামকরা এইসব লোকের সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো বন্ধুত্বের এবং কখনো কখনো অন্তরংগতার, আর নিজেকে আমি মনে করতাম তাঁদেরই একজন, অন্ত দৃষ্টিভংগির দিকে দিয়ে, খ্যাতিতে না হলেও। আমি গভীর বন্ধুত্ব এবং ক্ষণিক প্রেম দুই-ই উপভোগ করেছি। জীবন আমার কাছে ছিলো উত্তেজনাময়, প্রতিশুতি-প্রত্যাশায় ভরপুর এবং বিচিছন্ন অনুভূতিতে বার্ণঢ্য; কারণ, আমি জানতামা না আমি সত্যি কী চাই, যদিও তরুণের হাস্যকর ঔদ্ধত্যের সংগে, যুগপৎ এ প্রত্যয়ও জন্মেছিলো যে, একদিন আমি তা অবশ্য জানতে পারবো। তাই আমি আমার হৃদয়ের তৃপ্তি ও অতৃপ্তির দোলকে ঠিক একইভাবে দোল খাচ্ছিলাম, যেমন দোল কাচ্ছিলো বহু তরুণ সেই বিস্ময়কর বছরগুলিতে-কারণ, আমাদের কেউই প্রকৃত অসুখী ছিলো না যেমনি সত্যি তেমনি এ-ও সত্যি যে খুব অল্প কজনকেই সেদিন জ্ঞাতসারে সুখী বলে মনে হতো।
আমি অসুখী ছিলাম না কিন্তু আমার চারপাশে যারা রয়েছে তাদের কিংবা তাদের মধ্যকার কোনো দলের বিভিন্নমুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আশা-আকঙ্খায় অংশগ্রহণে আমার অক্ষমতা কালক্রমে এই অস্পষ্ট ধারণার রূপ নেই যে, আমি ঠিক ওদের কেউ নই, ওদের সংগে আমার সম্পর্ক নেই এবং আমি তারি সংগে আবার অস্পষ্টভাবে এ বাসনাও জন্মালো যে আমাকে কারো অংগীভূত হতে হবেই, তবে কারঃ- কোনো কিছুর অংশ হতে হবেই—তবে কিসেরঃ
… … … …
তারপর একদিন ১৯২২ সনের বসন্তকালে আমি আমার মাম ডোরিয়ানের একটি চিঠি পেলাম।
ডোরিয়ান ছিলেন আমার আম্মার সবচেয়ে ছোট ভাই। মামা ভাগ্নের নয়, বরং বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো আমাদের দুজনের মধ্যে। তিনি ছিলেন একজন মনোবিকলনবিদ, ফ্রয়েডের প্রথমদিকের একজন শাগরিদ; সে সময় তিনি জেরুযালেম একটি মানসিক হাসপাতালের প্রধান ছিলেন। তিনি নিজে যেহেতু জিওনিস্ট ছিলেন না এবং জিওনিজমের প্রতি তাঁর তেমন সহানুভুতিও ছিলো না, পক্ষান্তরে আরবদের প্রতিই তিনি ছিলেন আকৃষ্ট যার আর কিছুই দেবার ছিলো না। মামা ছিলেন অবিবাহিত, তাই তাঁর এই এককীত্বে এই তরুন ভাগ্নেটি তাঁর সাথী হতে পারে। তিনি তাঁর চিঠিতে ভিয়েনার সেই উত্তেজনাময় দিনগুলির কথা উল্লেক করেন যখন তিনি আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মনোবিকলনবদ্যার নতুন দুনিয়ায় এবং এই বলে শেষ করেনঃ তুমি একনে চলে আসো এবং আমার সাথে কয়েখ মাস থাকে। আমি তোমার আসা-যাওয়ার খরচ বহন করবো। তোমার যখন ইচ্ছ তখনই বালিনে ফিরে যেতে পারবে। এখানে এলে তুমি থাকবে এক পরম আনন্দদায়ক পুরোনো আরব পাথুরে ঘরে, যা গরমের দিনি ঈষৎ শীতল (এবং শীতকালে ভয়ানক ঠাণ্ডা)। আমরা দু’জনে এক সংগে সময় কাটাবো। আমার বইপত্র রয়েছে প্রচুর, তোমার চার পাশের অদ্ভুত মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে যখন তুমি হাঁফিয়ে উঠবে তখন তুমি পড়তে পারবে যতো ইচ্ছ্. ..।
আমি আমার মন স্থির করে ফেললাম তৎপরতার সাথে। অবশ্য এ তৎপরতা সব-সময়ই আমার জীবনের বড়ো বড়ো সিদ্ধান্তের বৈশিষ্ট্য হয়ে রয়েছে। পরদিন সকালেই আমি ইউনাইটেড টেলিগ্রাফ অফিসে ডঃ ডামার্টকে জানিয়ে দিলাম-আমাকে এক জরুরী কাজের তাগিদে নিকট-প্রাচ্য যেতে হচ্ছে, কাজেই এক হপ্তার মধ্যে আমি এজেন্সী ছেড়ে দিচ্ছি,-
কেউ যদি তখন আমাকে বলতো, ইসলামী দুনিয়ার সাথে আমার এই পয়লা পরিচয় একটি অবসরকালীন অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমিত থাকবে না, বরং তার ফল হবে অনেক-অনেক সূদুর প্রসারী এবং তা আমার জীবনেরই মোড় ফিরিয়ে দেবে তার সে ধারণা আমি একেবারেই অবাস্তব ও অযৌক্তিক বলে হেসে উড়িয়ে দিতাম। একথাও ঠিক নয় যে, বেশির ভাগ ইউরোপীয়র মতোই আরব্য উপন্যাসের রোমান্টিক আবহাওয়ায় যেসব দেশের সাথে আমার মন জড়িয়েছিলো আমি সেসবের মোহ থেকে মুক্ত ছিলাম। আমি অবশ্য বর্ণের সমারোহ, উদ্দাম রীতিনীতি এভং বিচিত্র সাক্ষাৎকার আশা করেছি। কিন্তু একথা কখনো আমার মনে হয়নি যে, আমি আত্মার জগতেও নতুন নতুন অভিযান প্রত্যাশা করতে পারি। এই নতুন সফরে আমার জন্য কোনো বিশেষ ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি রয়েছে বলে মনে হলো না। ইতিপূর্বে আমার জীবনে আমি যেসব ধারণ লাভ করেছি সেগুলিকে আমি সহজভাবেই পশ্চিমা বিশ্ব-দৃষ্টির সাথে মিলিয়ে নিয়েছি এবং আশা করেছি, এতে করে আমি আমার পরিচিত একমাত্র সাংস্কৃতিক পরিবেশের আওতায় অনুভূতি ও ধারণার এ প্রশস্ততর, ক্ষেত্রে পৌছুতে পারবো। এভং আপনি যদি এ সম্পর্কে চিন্তা করেন, এর চেয়ে ভিন্ন উপলদ্ধি আমার পক্ষে কী করেই বা সম্ভব ছিলো? আমি ছিলাম এক অতি-অতি তরুণ ইউরোপীয় এবং এই বিশ্বাসের মধ্যে আমি বড়ো হয়েছি যে, ইসলাম এবং ইসলামের উদ্দিষ্ট সবকিছুই মানুষের ইতিহাসের একটি রোমান্টিক গলিপথ ছাড়া কিছু নয়, কাজেই, ই্উরোপীয় পশ্চিমারা কেবলমাত্র যে-দুটি ধর্মকে গুরুত্বের সাথেবিবেচনার লায়েক মনে করে সেই খ্রিস্টান ও ইহুদী ধর্মের সাথে তার উল্লেখও অনুচিত, তুলনার তো কথাই ওঠে না।
ইসলামী বিষয়বস্তুর বিরদ্ধে (যদিও মুসলিম জীবনের রোমান্টিসাইজড বহিরংগের বিরুদ্ধে নয়) এই অস্পষ্ট ইউরোপীয় বিদ্বেষ নিয়ে আমি ১৯২২ সনের গ্রীষ্মকালে আমর সফর শুরু করি। নিজের প্রতি সুবিচার করতে গিয়ে আমি যদি একথা বলতে না পারি যে আমি একটা ব্যক্তিগত তাৎপর্যের মধ্যে ডুবেছিলাম, তা সত্ত্বেও আমি অজান্তেই গভীরভাবে বিজড়িত ছিলাম সেই আত্মনিমগ্না, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতায়, যা পাশ্চাত্যের সকল সময়েরেই একিট বৈশিষ্ট্য।
… … …
এবং এখন আমি প্রাচ্যের পথে, একটি জাহাজের পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে আছি। একটি মন্থর সফর আমাকে এনে পৌছিয়ে দিলো কনস্টঞ্জায় এবং সেখান থেকে এই কুয়াশাচ্ছন্ন প্রভাবে।
কুযাশার পর্দার আড়াল থেকে চোখের সামনে ভেসে উঠলো একটি লাল বাদাম, তারপর তা ঢলে গেলো জাহাজের একেবারে কাছ দিয়ে পাশ কেটে। বাদামটি দেখা গেলো বলে বুঝতে পারলাম কুয়াশা কাটিয়ে সুরুজ উঠি উঠি করছে। কয়েকটি পাণ্ডুর যেনো অনেকটা ধাতুর কাঠিন্য আর কি। তাদেরই চাপে দুধের মতো সাদা জমাট কুয়াশা যেনো ধীরে ধীরে অথচ গা ছড়িয়ে বসলো পানির উপর, তারপর সেগুলি বেঁকে বৃত্তাকারে আলাদা হয়ে গেলো, অবশেষে সুরুজের রশ্নির ডান বাম পাশ থেকে সেগুলি বিস্তৃত ভাসমান রক্তচাপের আকারে উঠতে লাগলো উপরদিকে, পাখার মতো।
‘সুপ্রভাত’। একটি গাঢ়, পূর্ণ কণ্ঠস্বর শোনা গেলো। আমি ঘুরে দাঁড়াই এবং আমর পূর্ব সন্ধ্যার সংগীটির কালো আলখিল্লাটি চিনতে পারি। আরো চিনতে পারি একটি মুখের বন্ধুত্বপূর্ণ সেই স্লিদ্ধ হাসি যা আমাদের কয়েক ঘন্টার পরিচয়ের মধ্যেই আমি ভালোবেসে ফেলেছি। জেস্যূট পাদরীটি ছিলেন আধা পোল আধা ফরাসী, তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার একটি কলেজে পড়াতেন। ছুটি ভোগ করার পর তিনি আবার তাঁর কর্মস্থানে ফিরে যাচ্ছেন। জাহাজে ওঠার পর আমরা সন্ধ্যাটা কাটিয়েছিলাম অন্তরং আলাপে। যদিও শীগগীরই বুঝতে পারলামে বহু বিষয়েই আমাদের মতের অমিল ব্যাপক, তবে অনেক বিষয়েই আমাদের মধ্যে মিলও রয়েছে; এবং এটুকু বুঝবার মতো যথেষ্ট বয়সও তখন আমার হয়েছে যে, এমন একজন মানুষ আমার সামনে রয়েছেন যিনি একটা চমৎকার, সিরিয়াস অথচ সুরসিক মনের অধিকারী.. .।
–‘সুপ্রভাত ফাদার ফেলিক্স, সমুদ্দুরের দিকে একটু চেয়ে দেখুন’—
সূর্যোদয়ের সাথে দিবালোক এবং রঙের আবির্ভাব ঘটেছে। আমরা ভোরের হাওয়ার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলাম জাহাজের গলুই-এর উপর। অসম্ভবের নেশায় মেতে আমি নিজেই চেষ্টা করলাম ঢেউ-এর ওঠা-পড়ার মধ্যে রঙের গতি নির্ধারণ করতে। নীল? সবুজ? ধূসর? রঙটা নীল হতে পারতো, কিন্তু এরি মধ্যে একটা রক্ত-লাল উজ্জ্বল দীপ্তি, যা কাঁপছিলো এবং যা ছিলো সূর্যেরেই প্রতিফরন, গড়িয়ে গেলো ঢেউ-এর ঢালু উপত্যকার উপর দিয়ে, অথচ ঢেউ-এর চূড়াটি ভেঙে পড়লো বরফের মতো সাদা ফেনপুঞ্জে এবং তার উপর দিয়ে ছুটে গেলো ইস্পাতের মতো-ধূসর, ছিন্ন, কুঞ্চিত বস্ত্রের আকারে। মুহুর্তকাল আগে যা ছিলো একটা ঢেউ এর পাহাড় তা-ই এখন হয়ে উঠেছে একটা স্পন্দনশীল গতি-রূপান্তরিত হলো হাজারো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আলাদা আলাদা ঘূর্ণিপাকে এবং সেইসব ঘূর্ণিপাকের ছায়া-ঢাকা গর্তের মধ্যে, রক্তের মতো লাল রঙটি বদলে গিয়ে হয়ে উঠলৈা গাঢ়, স্লিগ্ধ সবুজ; তারপর সেই সবুজ রঙটি উঠতে লাগলো উপরদিকে এবং রূপান্তরিত হলো কাঁপতে থাকা স্পন্দনময় বেগুনীতে, যা নিম্মগামী হয়ে পয়লা শরাবের মতো লাল হয়ে উঠলো, কিন্তু মুহূর্তকাল পরেই আবার তীব্যবেগে উর্ধ্বগামী হলো আসামনী নীল রঙে, পরিণত হলো ঢেউ-এর চূড়া্য় এবং ভেঙে পড়লো এবং আবার সাদা ফেনপুঞ্জ তার জাল ছড়িয়ে দিলো গড়াগড়ি-যাওয়া পানির পাহাড়গুলির উপর, উদ্ধতভাবে.. . এবং এভাবে এ অনন্ত খেলা চলতেই থাকলো।
রঙের এই খেলা এবং মুহূর্তে মুহূর্তে এর পরিবর্তনশীল ছন্দ আমি কখনো অনুধাবন করতে সক্ষম হবো না, এ বোধ আমার এমন একটি অস্থিরতা এনে দিলো যা প্রায় এক দৈহিক অনুভূতিই শামিল। বলা যায়, আমি যখন আমার চোকের কোণ দিয়ে অনেকটা লঘুভাবে এর দিকে তাকালাম মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, গোটা ব্যাপারটিকে একটিমাত্র ছবির মধ্যে ধরা হয়তো সম্ভবঃ কিন্তু সতর্কভাবে সজ্ঞান মনোনিবেশ করতে গিয়ে, যা একটি বিচ্ছিন্ন ধারণাকে আরেকটি বিচ্ছিন্ন ধারণার সাথে যুক্ত করার এক অভ্যাস বিশেষ, কেবল কতকগুলি ভাঙাচোরা, আলাদা আলাদা ছবিই পাওয়া গেলো, আর কিছু নয়। কিন্তু এই সংকট থেকে, এই অদ্ভুদ বিরক্তিকর বিভ্রান্তির মধ্যেও একদা অত্যন্ত স্পষ্ট ধারণা হলো আমার-কিংবা বলা যায়, সেই মুহর্তে আমার ঠিক এরূপই মনে হলো- এভং আমি প্রায় অনিচ্ছাকৃতভাবেই স্বগত বলে উঠলামঃ
-‘ যে কেউ এ সমস্তকে তার ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে উপলব্ধি করতে পারবে সেই পারবে তার ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে।’
-’তুমি কী বলতে চাইছো, আমি জানি’, ফাদার ফেলিক্স জবাব দেন, ‘কিন্তু নিয়তির উপর প্রভুত্ব করার ইচ্ছা মানুষের কেন হবে? দুঃখ –কষ্ট থেকে রেহাই পাবার জন্য? তার চেয়ে কি নিয়তি থেকে মুক্ত হওয়াই উত্তম নয়?’
-‘আপনি তো প্রায় একজন বৌদ্ধের মতোই কথা বলছেন, ফাদার ফেলিক্স! তাহলে কি আপনিও মনে করেন নির্বাণিই সকল জীবরে লক্ষ্য?’
-‘না, না, নিশ্চয় নয়- আমরা খৃশ্চানরা জীবন এবং অনুভূতির বিনাশ চাই না- আমরা কেবল চাই জীবনকে বস্তু আর ইন্দ্রিয়ের এলাকা থেকে আত্মার জগতে উন্নীত করতে।’
-‘কিন্তু তা কি সন্ন্যাস নয়?’
-‘এ সন্ন্যাস নয়, তরুণ বন্ধু সন্ন্যাস নয়! এ-ই একমাত্র পথ প্রকৃত জীবনের.. . শান্তির…’
বসফোরাস প্রাণালী উন্মুক্ত হলো আমাদের সামনে-একটি প্রশস্ত পানি-পথ, যার দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে শিলাগঠিত পাহাড়। এখানে ওখানে আমি দেখতে পাচ্ছি থামের উপর তৈরি হাওয়া খেলানো দালান-কোঠা, চত্বর-বিশিষ্ট বাগ বাগিচা, রহস্যময় উচ্চতায় জেগে ওঠা সাইপ্রেস বৃক্ষরাজি এবং প্রাচীন জেনিসারী কিল্লাসমূহ, জমাট স্তূপীকৃত শিলা, যা শিকারী পাখীর বাসার মতো ঝুলে আছে পানির উপর। মনে হলো যেনো বহুদূর থেকে এলো ফাদার ফেলিক্সের গলার স্বরঃ
-তুমি ভেবে দেখো-বাসনার … সকল মানুষের বাসনার গভীরতম প্রতীক হচ্ছে- জান্নাতরূপ প্রতীক। তুমি সকল সময়ই দেখতে পাবে, যদিও সবসময়ই ভিন্ন ভিন্ন চিত্রে, তবু তার অর্থ সবসময়ই এক, মানুষ নিয়তির হাত থেকে মুক্ত হতে চায়। জান্নাতে মানুাষের নিয়তি বলে কিছু নেই; মানুষ যখন দেহ আর প্রকৃতির প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ করলো এবং এভাবে, আমরা যাকে আদি পাপ বরি সেই পাপ করে বসলো, তখনি এলো নিয়তি। সেই আদি পাপটি কী?- মানুষের পথে বাধাস্বরূপ দেহের যে প্ররোচনা তাতে আত্মার পদস্থলন, আর প্ররোচনাগুলিই হচ্ছে আসলে মানুসের প্রকুতির মধ্যে অবশিষ্ট পশু –স্বভাব। মানুষের সার, মানবিক ও মানবিক-ঐশি অংশ হচেছ কেবল তার আত্মা। আত্মার অভিযাত্রা হচ্ছে আলোর দিকে। কিন্তু আদি পাপের জন্য তার পথ সবসময়ই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এমন সব বাধার দ্বারা, যা দেহের হাড় এবং অদৈব গঠন ও তার প্ররোচনাগুলি থেকে উদ্ভুত। তাই খৃশ্চান ধর্মের লক্ষ্য হচ্ছে জীবনের আসার, ক্ষণিক পাশবিক দিক হতে মানুষের নিজের মুক্তি এবং তার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকরে প্রত্যাবর্তন!’
দুমিনার বিশিষ্ট প্রাচীন কিল্লা রুমিলি হিসাব দেখতে পেলাম। এর একটি দেয়াল- কিল্লার ভেতর থেকে দুশমনকে আক্রম্যন করার জন্য যাতে ছিরো অসংখ্য ছিদ্র-নেমে এসেছে প্রায় পনির কিনার পর্যন্ত। তীরে, কিল্লার দেয়ালগুলির দ্বারা তৈরি অর্ধবৃত্তটির মধ্যে একটি ছোট্ট তুর্কি গোরস্তান, যার কবরের পাথরগুলি ভেঙে পড়ে আছে, যেন শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখছে।
-‘তা হতে পারে ফাদার ফেরিক্স, কিন্তু আমার মনে হয় এভং আবার বয়সের অনেকেই এরূপ মনে করে, দেহের গঠনের মধ্যে সার আর অসারেরঃ পার্থক্য নিরূপণে এবং দেহ আর আত্মাকে পৃথক করার মধ্যে কোথায় যেনো একটা ভুল রযে গেছে।… সংক্ষেপে, আমি আপনার মতো সাথে একমত হতে পারছিনা যে, দেহের দাবি, রক্ত-মাংস আর পার্থিব নিয়তির মধ্যে মহৎ পবিত্র কিছুই নেই-আমার কামনার লক্ষ্য অন্যত্র! আমি জীবনের এমন একটি রূপের স্বপ্ন দেখি যদিও আমি স্বীকার করছি, এখানে তা খুব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না-যাতে-গোটা মানুষ, দেহ-আত্মায় মিলে মানুষ, তার সত্ত্বার গভীর হতে গভীরতরো পূর্ণতার জন্য চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যাবে, যাতে আত্মা আর ইন্দ্রিয় একে অপরের শত্রু হবে না-যাতে মানুষ যেমন তার নিজের ভেতরের ঐক্য উপলব্ধি করবে তেমনি ঐক্য উপলব্ধি করবে তার নিয়তির তাৎপর্যের সংগে, যাতে করে সে তার জীবনের চূড়ায় পৌছুনোর পর বলতে পারে-‘আমি আমার নিয়তি।’
-‘এ তো হেলনীয় স্বপ্ন’। ফাদার ফেলিক্স জবাব দেন-‘কিন্তু এ স্বপ্নের পরিণতি কী হয়েছিলো? প্রথম ওর্ফিক আর ডায়োনোসিয়ান রহস্যে, তারপর আফলাতুন আর প্লোতিনিয়াসের ভাবধারায়, আর এমনি করে,আবার এই উপলব্ধিতেও যে, দেহ আর আত্মা পরস্পর বিরোধী… দেহের প্রভুত্ব থেকে আত্মার মুক্তি সাধন, এই হচ্ছে খৃশ্চান মুক্তির অর্থ, ক্রুশে আমাদের প্রভুর আত্মোৎসর্গে আমাদের বিশ্বাসের তাৎপর্য.. . ‘এখানে তিনি থামলেনঃ তারপর আমার দিকে এক ঝলক চেয়ে বললেন, ‘দেখো আমি সব সময়ই কিন্তু মিশনারী নই.. আমি যদি তোমাকে আমার বিশ্বাসের কথা বলি, তুমি আমাকে ক্ষমা করো, কারণ এ তোমার বিশ্বাস নয়.. .
-কিন্তু আমর কোনো বিশ্বাসই নেই’, আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি।
-হ্যাঁ, ফাদার ফেলিক্স বলেন, আমি তা জানি, বিশ্বাসের অভাব, বরঞ্চ বলা উচিত বিশ্বাস করার অক্ষমতা- এ হচ্ছে আমাদের জামানার আসল রোগ। তুমি আরো অনেকের মতোই বাস করছো একটি বিভ্রান্তির মধ্যে, যা হাজার বছরের পুরোনো। বিভ্রান্তিটি এই যে, মানুষের চেষ্টা –সাধনার দিক বুদ্ধিই দেখতে পারে। কিন্তু বুদ্ধি নিজে আধ্যাত্মিক জ্ঞান পর্যন্ত পৌছুতে পারে না, কারণ জাগতিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য জ্ঞান একেবারেই মশহুল। বিশ্বাস –কেবল বিশ্বাসই পারে আমাদেরকে এই আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করতে।
-‘বিশ্বাস? আমি জিজ্ঞাস করি, আপনি আবার এ শব্দটি উল্লেক করলেন। একটি বিষয় আমি বুজতে পারি না, আপনি বলেছেন যে, কেবল বুদ্ধির মাধ্যমে জ্ঞান হাসিল ও সৎ জীবন-যাপন সম্ভব নয়; বিশ্বাসের দরকার-আপনি বলেছেন। আমি আপনার সাথে ষোলো আনা একমত। কিন্তু যার বিশ্বাসই নেই সে কী করে বিশ্বাস অর্জন করবে? এর কোনো পথ আছে কি, অর্থাৎ এমন কোনো পথ যা আমাদের ইচ্ছার জন্য, উন্মুক্ত।’
-কেবলমাত্র ইচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রিয় বন্ধু। এ পথ কুলে যায় একমাত্র আল্লাহরই রহমতে। তবে, এ পথ সবসময়ই তারই জন্য উন্মুক্ত হয় যে তার অন্তরের অন্তস্থল থেকেই প্রার্থনা করে আলোকের জন্য-দিশার জন্য।’
-‘প্রার্থনা করে? কিন্তু ফাদার ফেলিক্স, মানুষ যখন প্রর্থনা করতে পারে তখন তার বিশ্বাস তো রয়েছেই। আপনি আমাকে একটা বৃত্তের চারদিকে চালাতে চাইছেন-কারণ, কোনো মানুষ যদি প্রার্থনা করে, যার কাছে সে প্রার্থনা করছে তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে তার প্রত্যয় তো আগে থেকেই রয়েছে। এই প্রত্যয় তার কী করে এলো? তার বুদ্ধির মাধ্যমে? এর অর্থ কি একথা স্বীকার করার শামিল নয় যে, বুদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন অসম্ভব? তা বাদ দিলেও এমন কারো কাছে রহমতের কী অর্থই বা হতে পারে যার এ জাতীয় কোনো অভিজ্ঞতা নেই?
পাদ্রিটি তাঁর কাঁধ ঝাঁকুনি দিলেন অনুশোচনার সংগে, আমার তাই মনে হলো। কেউ যদি নিজে আল্লাহকে উপলব্ধি করতে না পেরে থাকে তার উচিত অন্যদের অভিজ্ঞতার দ্বারা পথ চলার জন্য তৈরি থাকা, এমন সব লোকের অভিজ্ঞতার দ্বারা যাঁরা তাঁকে উপলব্ধি করেছেন.. .
…… .. . .. .
কয়েকদিন পর আমরা নামলাম আলেকজেন্দ্রিয়ার সেদিন বিকালেই আমি ফিলিস্তিন রওনা হই।
ট্রেন সোজা তীর বেগে ছুটে চললো সেই বিকালভর, মোলায়েম আর্দ্র, ব-দ্বীপের দৃশ্যগুলি পাড়ি দিয়ে। পথে পড়লো নীলনদ থেকে নেয়া নহরসমূহ-বহু আঁধা-বোটের বাদামের ছায়ায় ছায়ায় ঢাকা শহর। দেখতে দেখতে পেছনে হারিয়ে গেলো ছোটো ছোটে বহু শহর; সারি সারি ধূলায় ধূসর ঘরবাড়ি এবং হালকা মিনারসব। বাক্সের মতো দেখতে মাটির কুটির নিয়ে গড়ে ওঠা গাঁয়ের পর গাঁ ছুটে গেলো পেছনদিকে। ফসল তুলে নেয়া কার্পাসের জমি, অংকুর গজানো আখের ক্ষেত; মোটা-সোটা মোষ এখন ঘরে চলেছে রাখাল ছাড়াই, সারাদিন কাদায় ভর্তি ডোবাতে গা ডুবিয়ে তাকার পর –এমনি কতো দৃশ্য চোখে পড়তেই পড়তেই আবার হারিয়ে যেতে লাগলো পেছনে। দূরে দেখতে পেলাম লম্বা জোব্বা পরা মানুষ – মনে হলো ওরা যেন ভেসে চলেছে-এমনি পরিষ্কার স্বচ্ছ ছিলো হাওয়া, সুউচ্চ নীল, যেনো কাঁচ –নির্মিত আসমানের নীচে। খালগুলির তীরে তীরে নল-খাগড়া নুয়ে পড়েছে বাতাসের ধাক্কায়; কালো রঙের সূক্ষ্ণ রেশমের পোশাকপরা রমণীরা ওদের মাটির কলসীতে পানি ভরছেঃ অদ্ভুদ সুন্দর সব রমণী, তন্বী, কআর দীঘাংগী, তওদের হাঁটা দেখে মনে হলো লম্বা লম্বা শাখাবিশিষ্ট গাছপালার কথা, যারা মৃদুভাবে আন্দোলিত হয় বাতাসে অথচ শক্ত মজবুত! তরুণী এবং মায়েরা-সকলেই হাঁটছে এমনি ভেসে ভেসে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, তারপর তা বয়ে চলে, বিশাল, বিশ্রাম-নেয়া কোনো প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। হালকা-পাতলা গড়নের পুরুষেরা হেঁটে চলেছে বাড়ির দিকে তাদের জমি থেকে, আর মনে হচ্ছে ওরা যেন একেকটি বিশাল পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে- আর একই সংগে এ-ও মনে হলো-ধীরে ধীরে মিলিয়ে দিনের থেকে ওদের যেনো তুলে নেয়া হয়েছে। মনে হলো, ওদের প্রত্যেকটি পদক্ষেপেরই যেনো একেকটা নিজস্ব অস্তিত্ব আছে-নিজেতেই নিজে সম্পূর্ণ একেকটি পদক্ষেপ-চিরন্তর, আর চিরন্তনের মধ্যে সবসময় কেবল ঐ একটি পদক্ষেপেই তো আছে। এই যে হালাক স্নিগ্ধতার ভাব-হয়তো এর মূলে রয়েছে নীল-বদ্বীপের মাদকতাময় সান্ধ্য আলো অথবা হয়তো অতো-সব নতুন জিনিস দেখার পর আমরাই নিজের চঞ্চলতা; কিন্তু কারণ যাই হোক, হঠাৎ আমি আমার নিজের ভেতরে অনুভব করলাম, ইউরোপের ভারঃ আমাদের সকল কাজে ইচ্ছাকৃত উদ্দেশ্যের ভার। আমি নিজে নিজে ভাবলাম, আমাদরে জন্য সত্যের সাথে সাক্ষাৎ কী কঠিন! সবসময়ই আমরা চেষ্টা করে চলেছি একে হাতের মুঠায় ধরার জন্য.. . কিন্তু সত্য হাতে ধরা দিতে রাজী নয়। কেবল যেখানে সত্য মানুষকে অভিভূত করে সেখানেই তা আত্মসমর্পণ করে মানুষের কাছে।
মিসরীয় ক্ষেত-মজুরের পদক্ষেপ, যা এরি মধ্যে হারিয়ে গেছে দূরে, অন্ধকারে, আমার মনের ভেতরে দোল খেতে থাকে মহৎ সমস্ত কিছুর জন্য প্রশংসা করা একটা সংগীতের মতো।
আমরা সুয়েজ খালে এষে পৌছুই এবং একটি সমকোনের মতো হঠাৎ মোড় ফিরি আর কিছুক্ষনের জন্য ধূসর কালো তীর বেয়ে উত্তরকে চলতে টেনে বের করা একটি সুর।জোছনা মেখে খালটি রূপান্তরিত হয়েছে একটি সত্যিকার অথচ স্বপ্নের প্রশস্ত রাস্তায়-যেনো ঝকঝকে ধাতুর একটি গাঢ় বন্ধনী! তুপ্ত, ক্লান্ত, নীল উপত্যকার মাটি এক বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে বালিয়াড়ির পর বালিয়াড়ি গঠনের সুযোগ করে দিয়েছে! এই বালিয়াড়িগুলি খালের দুতীরকে অমন একটি অস্পষ্টতা আর তীক্ষ্ণতার দ্বারা ঘিরে রেখেছে যা রাতের অন্য ল্যাণ্ডস্কেপে ক্বচিৎ দেখা যায়। নিবিষ্ট নীরবতার মধ্যে এখানে দাঁড়িয়ে আছে একেকটা ড্রেজারের কংকাল। ওদিকে, অপর পারে ছুটে চলেছে এক উট চালক, ছুটে চলেছে প্রায় অদৃশ্যভাবে, আর এরি মধ্যে তাকে গ্রাস করে ফেলেছে রাত্রি … কী বিশাল সহজ স্রোতঃ লোহিত সাগর থেকে তোতো হ্রদ হয়ে ভূমধ্যসগার পর্যন্ত.. . সোজা এক মরুভূমির মধ্য দিয়ে, যাতে করে, ভারত মহাসাগর আছাড় খেয়ে পড়তে পারে ইউরোপের অবতরণ স্থলগুলিতে।.. .
কাস্তারায় কিছুক্ষণের জন্য ট্রেন সফরের পড়ে এবং একটি অলস মন্থর ফেরি মুসাফিরদের নিয়ে যায় ওপারে, নীরব নিস্পন্দ খাল পাড়ি দিয়ে। ফিলিস্তিনের ট্রেন ছাড়ার তখনো প্রায় এক ঘন্টা বাকী। আমি ষ্টেশন ঘরের সামনেই বসে পড়ি। বাতাস গরম ছাড়ার তখনো প্রায় এক ঘন্টা বাকী। আমি ষ্টেশন ঘরের সামনেই বসে পড়ি। বাতাস গরম আর শুকনা। আমার ডানে মরুভূমি, বামে মরুভূমি-একটানা কাঁপা-কাঁপা ধূসরতা, এখানে ওখানে দাগ বুলানো, আর কোনো জন্তুর বিচ্ছিন্ন ডাকে বিঘ্নিত-হয় শিয়াল না হয় কুকুরের ডাক। উজ্জ্বল কার্পেটের কাপড়ে তৈরি ভারি বস্তা নিায়ে একটি বেদুঈন উঠে এলো ফেরি থেকে এবং আগিয়ে গেলো দূরে একটি দলের দিকে- আর এই মাত্র আমি দেখতে পেলাম, ওরা কতকগুলি নিশ্চল মানুষ আর হাঁটু-গেড়ে বসে পড়া কতকগুলি উট, পিঠে বোঝা চাপিয়ে রওনা হওয়ার জন্য তৈরি। মনে হলো, ওরা যেন বেদুঈনটির আসার ইন্তেজারিতে ছিলো। বেদুঈনটি তার বস্তাগুলি একটি উটের পিঠে রেখে দেয় ধপ করে; গোটা কয়েক কথার আদন-প্রদান হয়, তারপর সামনের পা –এর উপর, সওয়ারীরা দাঁড়িয়ে যায়, পয়লা পেছনের পা-এর উপর, তারপর সামনের পা-এ উপর, সওয়ারীরা সামনে-পেছনে দুরতে থাকে- তারপর তারা মোলায়েম শপশপ আওয়াজ তুলে উট হাঁকিয়ে রওনা করে দেয় এবং অল্পক্ষনের জন্য আমার চোখ অনুষরণ করেঃ বিলীয়মান পণ্ডগুলির দোল খাওয়া হালকা রঙের শরীর এবং চওড়া, বাদামী ও সাদা ডোরাওয়ালা বেদুঈন পোশাক।
একটি রেল মজুর আমার দিকে আগিয়ে এলো। ওরা গায়ে একটি নীল রঙের ওভারকোট, আর মনে হলো, লোকটি খোঁড়া। সে আমার সিগারেট থেকে ওর নিজের সিগারেট ধরিয়ে নিলো এবং ভাঙা ভাঙা ফরাসীতে আমাকে জিজ্ঞাস করলো,“আপনি জেরুজালেম যাচ্ছেন’? যখন আমি বললাম ‘হ্যাঁ’, সে আবার জিজ্ঞাস করে, ‘প্রই প্রথমবার’?
আমি কথা নেড়ে সায় দিই। সে চলে যাবার উদ্যোগ করছিলো, পরে আবার আমার দিকে ফিরে বসলো- ‘আপনি কি ওখানে সিনাই মরুভূমি থেকে আসা বড়ো কাফেলাটি দেখেছেন? দেখেন নি? তাহলে আসুন আমার সাথে, ওদের সাথে দেখা করি গিয়ে। আপনার হাতে সময় আছে এখনো।
একটা নীরব শূন্যতার মধ্য দিয়ে, একটা সংকীর্ণ বহু-ব্যবহৃত রাস্তা ধরে আমরা আগাতে থাকি। আমাদের জুতার তলা বালুতে ডুবে যায়। রাস্তাটি গিয়ে পৌছুছে বালিয়াড়িগুলি পর্যন্ত। আঁধারে একটি কুকুর ডেকে ওঠে। ছোটো ছোটো কাঁটা-বনের মধ্যে হোঁচট খেতে খেতে আমরা যাখন আগাচ্ছিলাম, আমার কানে ভেসে এলো বহু কণ্ঠস্বর-অস্পস্ট, এলোমেলো, চাপা, যেনো বহু মানুষের গলার আওয়াজ; আর, মরুভূমির শুকনা বাতাসের সাথে মিশে এলো বহু বিশ্রামরত জন্তুর উগ্র অথচ মোলায়েম গন্ধ। হঠাৎ যেমন আমরা কুয়াশা-ঢাকা রাতে শহর-বন্দরে কখনো কখনো দেখতে পাই, রাস্তার প্রান্তে এখনো অদৃশ্য কোনো প্রদীপের আলোর কাঁপুনি, যা কেবল কুয়াশাকেই উজ্জ্বল করে তোলে-একটা চিকন আলোর শিখা নীচ থেকে উঠরো উপরদিকে, -যেনো মাটির নীচে থেকে উঠেছে েএবং সোজা আঁধার হাওয়া ভেদ করে উঠছে উর্ধ্বে। এ হচ্ছে একটি আগুনের দীপ্তি যা উঠে এসেছে বালিয়াড়ি দুটির মধ্যকার গভীর খাদ থেকে, পথটি ঘন কাঁটাবনে এমনি আচ্ছন্ন যে আমি তার তলা দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি এখন মানুষের আওয়াজই কেবল শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু যারা কথা বলছে তাদের এখনো দেখতে পাচ্ছি না। আমি শুনতে পেলাম উটের নিশ্বাষের আওয়াজ এবং সেই সংকীর্ণ পথে কেমন করে ওরা একে অপরের সাথে গা ঘষছে, তারি শব্দ। মানুষের একটি বিশাল কালো ছায়া পড়ে আলোটির উপর, ছুটে যায় বিপরীতদিকের ঢালুর দিকে, তারপর আবার নীচের দিকে নেমে আসে। আরো কয়েক পা আগানোর পর সমস্ত কিছু দেখতে পেলাম- হাঁটু ভেঙে একটি বড়ো বৃত্তের আকারে জামিনের উপর বসে আছে অনেকগুলি উট, এখানে ওখানে স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে আছে জিনের পাশে বাঁধা থলে ও বস্তা-এবং সে-সবের মধ্যে কতকগুলি মানুষের মূর্তি! জন্তুগুলির গন্ধ শরাবের মতোই মিষ্টি আর গাঢ় যেনো। কখনো কখনো একেকটি উপ তার গা নাড়ে, যার আকৃতি চারপাশের আঁধারের দরুন বোঝা যাচ্ছে না, তারপর সে ঘাড় তোলে এবং নাকে একটা শব্দ করে রাতের বায়ূতে শ্বাস নেয়; মনে হলো যেনো দীর্ঘশ্বাস ফেলছেঃ এভাবে আমি জীবনে প্রথম শুনলাম উটের দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ। একটি ভেড়া আস্তে আস্তে ডাকছে-একটা কুকুর গরগর করে উঠছে এবং সেই সংকীর্ণ পথটির বাইরে রাত সর্বত্রই অন্ধকার আর তারকাহীন।
এরি মধ্যে দেরি হয়ে গেছে। আমাকে ষ্টেশনে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু আমি খুবই ধীরে ধীরে আগাতে থাকি সেই পথ দিয়ে, যে পথ দিয়ে আমরা এসেছিলাম- হতবুদ্ধি এবং বিস্ময়করভাবে বিচলিত-যেনো অমন একটি রহস্যজনক অভিজ্ঞতায় আমি হতবুদ্ধি এবং বিচলিত যা আমার হৃদয়ের একটি কোণকে আচ্ছন্ন করেছে এবং আমাকে আর যেতে দেবে না! ট্রেন আমাকে নিয়ে যায় সিনাই মরুভূমির মধ্য দিয়ে। মরুভূমির রাতের ঠাণ্ডা, আর ঢিলা বালুর উপর বসানো রেল লাইনের উপর দিয়ে চলা গাড়ীর ধাক্কা আর ঝাঁকুনিতে আমি ক্লান্ত, নির্ঘুম। আমার উল্টা দিকে বসেছে এক বেদুঈন, তামাটে রঙের বিশাল আবায় গায়ে দিয়ে। সেও ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিলো-পাগড়ির কাপড় দিয়ে সে ঢেকে নিায়েছে মুখ। পায়ের উপর পা রেখে সে পদ্মাসন করে বেঞ্চির উপর বসেছে, আর তার কোলের উপর পড়ে আছে রূপার কাজ করা খাপে ঢাকা একটা বাঁকা তলোয়ার। প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। বাইরে বালিয়াড়ির আর ক্যকটাস বনের রূপরেখা দেখতে পাচ্ছি আমি।
এখনো আমার মনে পড়ছে কেমন করে সেদিন ভোর হয়েছিলো-ধূসর কালো ছবি এঁকে, ধীরে ধীরে রূপরেখা অংকন করে- এবং কেমন করে তা বালিয়াড়িগুলিকে অন্ধকার থেকে তুলে তৈরি করছিলো কতকগুলি জমাট স্তূপ-বিশার এবং সাঞ্জস্যপূর্ণ। ক্রমে ফুটে-ওঠা আধো আলোতে দেখতে পেলাম কতকগুলি তাঁবু, দেখতে দেখেতে সেগুলিও হারিয়ে গেলো পেছনে এবং তার নীচে দেখলাম, বাতাসে ছড়ানো কুয়াশার জালের মতো জেলেদের জাল, দূরে দূরে গাড়া খুঁটির সংগে বেঁধে মাটির উপর ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে শুকানোর জন্যঃ মরুভূমিতে মাছ ধরার জাল, ভোরের বাতাসে দুলছে, যেনো স্বপ্নের পর্দা দিন আর রাত্রির মধ্যে, স্বচ্ছ, অবাস্তব।
ডানদিকে মরুভূমি- বাঁদিকে সমুদ্দুর। সমুদ্দুরের উপকূলে দেখলাম একাকী এক উট চালককে। সম্ভবত সে সারারাত উটের উপর সওয়ার ছিলো। মনো হলো, এখন সে ঘুমিয়ে পড়েছে গাদির উপর গা এলিয়ে দিয়ে-এবং ওরা দুজনে, উট চালক এবং উট, উভয়ই দোল খাচ্ছে একই ছন্দে। আবার নজরে পড়ে বেদুঈনদের কালো তাঁবু; মেয়েরা এরি মধ্যে তাঁবু থেকে বের হয়ে পড়েছে মাটির কলস মাথায় নিয়ে কুয়াতে যাবার জন্য তৈরি হয়ে। আধো-আধো আলো স্পষ্টতরো হয়ে উঠছে আর সেই আলোর মধ্যে জেগে উঠছে একটি সুস্পষ্ট জগৎ যেনো অদৃশ্য তাগিদে চালিত হয়ে-যা কিছু সহজ সরল এ বিস্ময় যেনো তারি থেকে উদ্ভুত এবং এর যেনো শেষ নেই!
স্থূল থেকে স্থূলতরো রশ্মিতে সূর্য ছড়িয়ে পড়ছে বালুরাশির উপর আর ভোরের ধূসরাত বিস্ফুরিত হলো নারাংগি-সোনালি বর্ণের আতশবাজি হয়ে। আমরা ছুটে চলেছি আল আরশি নামক ওয়েসিসে মধ্যে দিয়ে। দুপাশের সারি সারি পাম তরু, পাম শাখা হাজার হাজার সূক্ষ্ণগ্র বর্শার মতো দাঁড়িয়ে আছে দু’ধারে আলোছায়ায় সৃষ্টি হয়েছে বাদামী –সবুজ জালির যেনোঃ এরি মদ্যে ছুটে চলেছি আমরা। আমি দেখতে পেলাম, একটি মেয়ে, মাথায় একটি ভরা কলসী চাপিয়ে ফিরে আসছে কুয়া থেকে, তারপর পাম গাছের নীচে দিয়ে চলা একটি পথ ধরে আগাচ্ছে। মেয়েটির পরনে লাল আর নীল মেশানো একটি পোশাক, লম্বা তার ঝুল-মনো হলো, ও যেনো উপকথার এক সম্ভ্রন্ত রমণী!
আল-আরিশের পাম বাগিচা যেমন আকস্মিক নজরে পড়লো তেমনি দ্রুত তা আড়াল হয়ে গেরো চোখের। এখন আমরা সফর করছি শাঁখ-রঙ আলোর ভিতর দিয়ে। বাএর কাঁপতে থাকা জানালার সার্শিগুলি, ওপাশে অমন একটা নীরবতা জেঁকে আছে যা আমি কখনো সম্ভব বলে ভাবতেও পারিনি। যতো রূপ আর গতিবিধি নজড়ে পড়লো, মনো হলো কোনোটিরই যেনো গতকাল বা আসছে কাল বলে কিছু নেই, ওগুলি যেনো ওখানেই জমানো রয়েছে ইচ্ছাকৃত অনন্যতায়। দেখতে পেলাম নরম মোলায়েম বালু, বাতাস সেই বালুকে রূপান্তরিত করেছে নরম নরম বালু-টিলায়, যা সূর্যের নীচে খুব পুরোনো পার্চমেন্টের মতোই দীপ্তি পাচ্ছে স্নান কমলালেবুর রঙে-তবে, পার্চমেন্টের চাইতে কিছুটা নরম কেবল, আর ভাঙতি ও বাঁকুগুরিতে তা কম ভঙুর-টিলার চূড়ায় চূড়ায় বারু আঘাত করছে, বীণাযন্ত্রে তীক্ষ্ণ সুনির্দিষ্ট আঘাতের মতো, টিলাগুলির পার্শ্বদেশ অপরিসীম কোমল, যার অগভীর গর্ত ও ভাঁজগুলিতে পড়েছে স্বচ্ছ জল রঙ ছায়া-রক্তবর্ণ, হালকা নীল, রক্তিমাত, আর মর্চের মতো ফ্যাকাশে লাল রঙ। দুধের মতো উজ্জ্ব সাদা মেঘ, এখানে ওখানে ক্যাকটাস ঝোঁপ এবং কখনো লম্বা শাখাবিশিষ্ট শক্ত ঘাস নজরে পড়লো। দু-একবার আমি দেখলাম হালকা-পাতলা খালি পা বেদুঈনদেরকে এবং পাম শাখা বোঝাই এক উটের কাফেলাকে, যা তারা এক জায়গা থেকে নিয়ে চলেছে আরেক জায়গায়। মহৎ প্রাকৃতিক দৃশ্যে আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি!
কয়েকবারই আমরা থামি ছোটো স্টেশনগুলিতে, যা সাধারণত কাঠ আর টিনের তৈরি কতিপয় ব্যারাক ছাড়া আর কিছুই নয়। তামাটে রঙের, ছেঁড়া কাপড় পরা ছেলেরা ঝুড়ি নিয়ে ছুটাছুটি করছে, জলপাই, পুরা সিদ্ধ আণ্ডা আর মাছ এবং চেপটা আটার পাউরুটি বিক্রির জন্য হাঁকছে। আমার বিপরীতদিকে যে বেদুঈন বসেছিলো সে তার মাথার পাগড়ি খুলে পরে জানালাটা খুলে দিলো। তার মুখখানা পাতলা, বাদামী, তীক্ষ্ণ-সেই বাজপাখীর মুখ,যা সব সময়ই নিবিষ্টভাবে চেয়ে থাকে সামনের দিকে। সে একটি কেক কেনে এবং মোড় ফিরে বসার উপক্রম করে; এমন সময় তার নজর পড়ে আমার উপর এবং কোনো কথা না বলেই সে কেকটি ভেংগে দুটুকরা করে অর্ধেকটা আমার দিকে আগিয়ে দেয়। কিন্তু ও যখন দেখরো আমি ইতস্তত ও বিস্ময় বোধ করছি, ও হেসে ফেললো এবং আমি দেখতে পেরাম সেই কোমল হাসিটি তার মুখে এবং তার মুহূর্তকাল আগেকার অভিনিবেশেরর সাথে মানিয়েছে চমৎকার; সেই কোমল হাসি হেসে সে অমন একটি শব্দ উচ্চারণ কররো যা তখন আমি বুঝিনি কিন্তু এখন বুঝতে পারি; সে বললো ‘তফদ্দল’- ‘আমাকে অনুগৃহীত করুন’। আমি কেকের টুকরাটি নিলাম এবং মাথা নেড়ে তাকে ধন্যবাদ জানালাম।আরেকজন মুসাফির, তার মাথায় একটি লাল ফেজ টুপি, এ ছাড়া তার বাকী সক কাপড়-চোপড়ই ইউরোপীয়, মনে হলো লোকটি একজন ছোটো- খাটো ব্যবসায়ী, অযাচিতভাবে সে দোভাষীর দায়িত্ব গ্রহণ করলো। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে বললো-
-‘সে বলে,তুমি মুসাফির, সে-ও মুসাফির। তার পথ এবং তোমার পথ একই।’
এখন যখন আমি সেই ছোটো ঘটনাটির কথা ভাবি, আমার মনেহয়, আরব চরিত্রের প্রতি আমার পরবর্তী সকল প্রেমের মূলে হয়তো পড়েছে এরি প্রভাব। কারণ, এই যে, বেদুঈনটি অপরিচয়ের অতো সব বাধা সত্ত্বেও সফরে এক আকস্মিক সহাযাত্রীর মধ্যে বন্ধুত্ব উপলব্ধি করেছে-এবং তার সংগে রুটি ভাগ করে খেতে চাইছে, তার আচরণে আমি এরি মধ্যে এক ভারমুক্ত মনুষ্যত্বের বিশ্বাস ও পদক্ষেপ অবশ্যি অনুভব করে থাকবো!
এর কিছুক্ষণ পরেই পথে পড়লো পুরোনো গাজা শহর, যেনো একটা মাটির কিল্লা, তার বিস্তৃতত জীবন কাটাচ্ছে একটি বালু-পাহাড়ের উপর, ফণিমনসার প্রাচীরের মধ্যে। আমার বেদুঈন সংগীটি তার বোঝার থলেগুলি জমা করে গম্ভীর হাসির সাথে আমাকে সালাম জানালো, তারপর ঘাটির উপর লুটিয়ে পড়া কাপড়ের প্রান্ত দিয়ে বালুতে ঝাড়ু দিতে দিতে গাড়ী থেকে নেমে পড়লো। বাইরে প্লাটফর্মে আরো দুজন বেদুঈন দাঁড়িয়েছিলো, ওরা তার সাথে হাত মোসাফা করে এবং তার দু’গালে চুমু খেয়ে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়।
ইংরেজি বোলনেওয়ালা ব্যবসায়ীটি তার হাত রাখলো আমার বাজুর উপর, বললো ‘আমার সাথে আসুন। এখানে পনেরো মিনিট সময় আছে।’
স্টেশন ঘরের ওপাশে একটি কাফেলা তাঁবু খাটিয়েছে। আমার সাথী আমাকে জানালো-ওরা উত্তর হিজাযের বেদুঈন, ওদের মুখমণ্ডল বাদামী রঙের, ধূলি-ধূসর, আর বুনো আবেগে উত্তপ্ত। আমাদের বন্ধুটি গিয়ে দাঁড়ালো ওদের মাঝে। মনে হলো, ও বেশ কিছুটা মান্যগণ্য ব্যক্তি, কারণ ওরা সবাই ওকে ঘিরে অর্ধ-বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে গেলো এবং ওর প্রশ্নাদির জবাব দিতে লাগলো। ব্যবসায়ীটি ওদের সাথে কথা বলে। তখন ওরা আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। আমাদের শহরে জীবনের কথা ভেবে ওরা বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিতে.. . আমার মনে হলো, কতকটা গর্বিত উন্মসিকতার সংগেই যেনো আমাদের দিকে তাকালো। ওদেরকে ঘিরে রয়েছে একটি আযাদীর পরিবেশ, একটি মুক্ত আবহাওয়া। ওদের জীবনকে বুঝবার জন্য আমার মনে একটা তীব্র খায়েশ জাগলো। বাতাস শুকনা ও শিহরণ-জাগানো; মনে হলো, শরীর ভেদ করে যেনো সে বাতাস আমার ভেতর ঢুকছে। এই আবহাওয়ায় যেনো সমস্ত কাঠিন্যের গেরো খুলে যায়, সমস্ত চিন্তা হয়ে পড়ে এলোমেলো, অলস আর নিশ্চল! এর মধ্যে অমন একটা সময়হীনতা রয়েছে, যাতে প্রত্যেকটি দৃশ্য, প্রত্যেকটি ধ্বনি, প্রত্যেকটি দৃশ্য, প্রত্যেকটি ধ্বনি, প্রত্যেকটি ঘ্রাণ একেকটি সুনির্দিষ্ট নিজস্ব মূল্যের রূপ ধারণ করে। ক্রমে আমার এ উপলব্ধি হলোঃ মরুভূমির পরিবেশে যেসব বেদুঈন বাস করে তারা জীবনকে নিশ্চয়ই অন্য সকল অঞ্চলের মানুষের চেয়ে একেবারে আলাদভাবে দেখে, অনুভব করে; যে-সব অরসেসন ও স্বপ্ন অধিকতরো ঠাণ্ডা ও সম্পদশালী অঞ্চলের বাসিন্দাদেরই বৈশিষ্ট্য, ওরা নিশ্চয়ই সেগুলি থেকে মুক্ত এবং সম্ভবত বহু স্বপ্ন থেকেও, এবং নিশ্চয়ই তাদের বহু রুটি থেকেও! ওরা যেহেতু ওদের নিজের অনুভূতিরই উপর অন্তরংগতরোভাবে নির্ভর করে, তাই ঐ সব মরুবাসী অবশ্যি জাগতিক সকল বস্তুর জন্যই স্থির করে সম্পূর্ণ আলাদা মূল্যমান।
হয়তো এ ছিলো আমার নিজের জীবনেরই ভাবী বিপ্লবের পূর্বাভাস-যা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো এক আরব দেশে, সেই পয়লা দিনটিতে বেদঈনদের দৃশ্যে, -এমন এক জগতের পূর্বাভাস, যার সংজ্ঞা দেওয়া যায় অমন কোনো সীমা নেই, অথচ যা রূপহীন নয়ঃ যে জগত নিজেতেই নিজ পূর্ণ-এবং তা সত্ত্বেও, সবদিক দিায়েই উন্মুক্তঃ এমন এক জগৎ যা কিছুদিন পরেই হয়ে উঠলো আমার নিজের জগৎ! একথা ঠিক নয় যে, ভবিষ্যতে আমার ভাগ্যে কী রেখেছে সে সম্বন্ধে আমি তখন সচেতন ছিলাম; নিশ্চয়ই নয়। বরং এহচ্ছে সেই অনুভূতি যখন আ্পনি, জীবনে পয়লা এক অপরিচিত বাড়িতে ঢোকেন এবং অর্ধ পথে একটি অনির্দেশ্য গন্ধে আপনাকে অস্পষ্ট আভাস দেয়, যা- কিচু সে ঘরে ঘটবে সে সবের- যা ঘটবে আপনাকেই কেন্দ্র করে এবং সেগুলি যাদি আনন্দের হয়, আপনি অনুভব করবেন আপনার হৃদয় যেনো আকস্মিক হর্ষের ছুরিতে বিদ্ধ হয়েছে-এবং এসব ঘটনা ঘটে যাওয়ার অনেক-অনেক পরেও আপনার তা মনে পড়বে এবং আপনি মনে মনে বলবেন, আমি তো বহু আগে, ঠিক এভাবেই-অন্য কোনো রূপে নয়, এ সমস্তের আভাস পেয়েছিলাম সেই হল ঘরে, সেই পয়লা মুহূর্তেই-সেই পয়লা মুহূর্তেই!
দুই
মরুভূমির উপর দিয়ে বয়ে যায় তীব্র হাওয়া, আর মুহুর্তের জন্য জায়েদ ভাবে, আমরা আরেকটা বালু- ঝড়ের সম্মুখীন হতে চলেছি। বালু-ঝড় এলো না বটে, কিন্তু হাওয়া আমাদেরকে রেহাই দিলো না-আমাদেরকে অনুসরণ করতে লাগলো নিয়মিত দমকা বায়ুর রূপে এবং আমরা যখন এক বালু উপত্যকায় নামি তখন সেই বাতাসের ঝাপটাগুলি এক হয়ে বয়ে যেতে লাগলো এক নিরবচ্ছিন্ন শন শন ধ্বনিরূপে। উপত্যকার মাঝখানটাতে পাম গাছে ভরা একটি গাঁ, কটি আলাদা বস্তি নিয়ে আর প্রত্যেকটি বস্তি মাটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা-গাঁটি ঘূর্ণি বায়ূতে উড়ানো ধুলা-বালুতে প্রায় ঢাকাই পড়ে গেছে।
এলাকাটি যেনো বাতাসের একটি গুহাঃ হররোজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বায়ু এখানে তার সবল ডানা দিয়ে ক্রমাগত ঝাপটা মারে, রাতের বেলা চুপ করে থাকে এবং পরদিন আবার নতুন শক্তি নিয়ে জেগে ওঠে। বাতাসের এই বিরামহীন আঘাতে নুয়ে –পড়া পাম গাছগুলি যতোটুকা উচু হওয়া উচিত ততো উচু হতে পারে না,-বাধাগ্রস্তই থেকে যায়, জমিনের কাছাকাছি চারদিকে শাখা প্রসারিত করে। এসব পাম গাছের জন্য সবসময়ই রয়েছে চারিদিকে আগিয়ে আসা বালিয়াড়ির ভয়। প্রতেকটি মেওয়া বাগিচার চারপাশে গাঁর লোকেরা সারি সারি তামারিস্ক না লাগালে গা’টি অনেক আগেই বালুতে ডুবে যেতো। এই লম্বা গাছগুলির প্রতিরোধ- ক্ষমতা পাম গাছের চাইতে বেশি। এ সব গাছ, বস্তিগুলির চারপাশে তাদের মজবুত কাণ্ড এবং মর্মর-ধ্বনি জাগানো চিরহরিৎ শাখা দিয়ে তৈরি করে একটা জীবন্ত দেয়াল আর ওদেরকে দেয় একটা অনিশ্চিত নিরাপত্তা।
আমরা গাঁ’ ‘আমিরে’র মাটির ঘরের কাছে অবতরণ করি- ইচ্ছাঃ বিকালের এই গরমে এখানে আমরা একটু বিশ্রাম নেবো। মেহমানদের অভ্যর্থনার জন্যে যে ‘কাহওয়া’ নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে তা উন্মুক্ত এবং তাতে রয়েছে দারিদ্রের চিহ্ন। কফি জ্বাল দেয়ার পাথুরে চুলার সামনে রয়েছে কেবল একটি খড়ের মাদুর। কিন্তু স্বভাবতই আরবের মেহমানদারির কাছে সব রকমের দারিদ্রই হার মানে- কারণ, মাদুরের উপর আমরা বসতে না বসতেই চুলায় ডালপালা গুঁজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো; সদ্য-ভাজা কফির দানাগুলি তামার যে হামানদিস্তার গুঁড়া করা হচ্ছে তার ঝনঝন শব্দ কামরাটাকে দেয় একটা বাসের উপযোগী বৈশিষ্ট্য; আর সমস্ত বড়ো একটা থালায় স্তূপীকৃত হালকা বাদামী রঙের খেজুর ক্ষুধা দূরে করে মূসাফিরদের।
আমাদের মেজবান ছোট্ট হালকা-পাতলা এক বৃদ্ধ, বেতো, মিটমিটে চোখ, গায়ে কেবল একটি সূতী কাপড় আর মাথায় পাগড়ি- আমাদেরকে এতে শরীক হওয়ার জন্য আহবান করেনঃ
-‘আল্লাহ আপনাদের হায়াত দরাজ করুন। এ বাড়ি আপনাদের বাড়ি। আল্লাহর নামে খান। আমাদের কেবল এ-ই আছে’- আর তিনি তাঁর হাত দিয়ে একটি ওজরখাহীর ভংগি করেন, একটি মাত্র ভংগি- আর তার ভাগ্যের সমস্ত ভার ব্যক্ত হয় মানুষকে সম্বোধন করার সেই অকৃত্রিম শক্তিতে, যা সেইসব জাতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যারা সহজ অনুভূতির সাথে নিবিড় সম্পর্ক রেখে জিন্দেগী ওজরান করে- তবে খেজুরগুলি মন্দ নয়, খান হে মুসাফিরেরা, আমাদের সাধ্যমতো যা দিতে পারছি,,,,,,।‘
সত্যি, আমি জীবনে যতো উৎকৃষ্ট খেজুর খেয়েছি এ খেজুর তারি মধ্যে গণ্য হবার যোগ্য আর আমাদের মেজবানও স্পষ্টই খুশি আমাদের খিদায়, যা তিনি মেটাতে সক্ষম! তিনি আবার শুরু করেনঃ
-‘বাতাস…. বাতাস…. আমাদের জীবনকে এ করে তোলে কঠোর, কষ্টময়; কিন্তু আল্লাহরই মর্জি! আমাদের গাছ-গাছড়াগুলিকে ধ্বংস করে দেয় বাতাস। এগুলি যাতে বালূতে ঢাকা না পড়ে এজন্য হামেশাই আমাদেরকে লড়াই করতে হয়। অবশ্য সব সময়ই যে এমনটি ছিলো তা নয়। আগেকার দিনে এতো বাতাস এখানে ছিল না, আর তখন গাঁ’টা ছিলো বড়ো আর সমৃদ্ধিশালী। কিন্তু এখন গাঁ’টা ছোটো হয়ে গেছে। আমাদের তরুণদের অনেকেই এখান থেকে চলে যাচ্ছে- কারণ, সবাই এ ধরনের জীবন বরদাশত করতে সক্ষত নয়। দিনে দিনে বালূ ক্রমেই চারদিকে ঘেরাও করে ফেলছে আমাদেরকে। বেশি দিন নেই যখন আর এ পাম গাছগুলির জন্য কোনো জায়গাই থাকবে না। এই বাতাস…. কিন্তু আমরা নালিশ করি না। আপনারা জানেন নবী- তাঁর উপর আল্লাহর রহমত হোক- আমাদেরকে বলেছেন- ‘আল্লাহ বলেন, নিয়তিকে তিরস্কার করো না, কারণ জেনে রাখো আমিই নিয়তি….।
খুব সম্ভব আমি চমকে উঠেছিলাম- কারণ বৃদ্ধ তাঁর কথা বন্ধ করে দিয়ে মনোযোগের সাথে তাকালেন আমার দিকে, যেনো আমি কেন চমকে উঠেীছ তা বুঝতে পেরে তিনি স্মিত হাসলেন। অনেকটা যেনো রমণীর মুখের হাসি- সেই ক্লান্ত জরাজীর্ণ মুখে সে হাসি দেখতে অদ্ভুত ঠেকলো। বৃদ্ধ মৃদু স্বরে, যেনো অনেকটা স্বাগত, আবার বলেনঃ
‘জেনে রাখো আমিই নিয়তি’- তাঁর কথার সংগে তাঁর মাথা যেভাবে আন্দোলিত হলো তাতেই ব্যক্ত হলো জীবনে তাঁর নিজের স্থানের গর্বিত স্বীকৃতি। অতটুকু প্রশান্তি আর নিশ্চয়তার সংগে বাস্তবের এরূপ স্বীকৃতি জীবনে আমি কখনো দেখিনি, এমনকি সুখী মানুষের মধ্যেও নয়। তিনি শূন্য একটি বৃত্ত রচনা করেন বাহু অনেক প্রসারিত করে অস্পস্টভাবে; যেনো অনেকটা ইন্দ্রিয়াসক্তিরাই দ্যোতক তাঁরা বাহুর আন্দোলন।
এমন একটি বৃত্ত তিনি আঁকলেন বাহু প্রসারিত করে যার মধ্যে মানুষের এই জীবনের সাথে সম্পর্কিত সবকিছুই পড়েঃ দরিদ্র, অন্ধকার ঘর, বায়ূ আর তার চিরন্তন গর্জন, বালুর অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি, সুখের বাসনা আর যা অপরিবর্তনীয় তার কাছে আত্মসমর্প; খেজুর-ভর্তি থালা, চির-হরিৎ ঝাউ গাছের প্রাচীরের আড়ালে বেঁচে থাকার জন্য ফল- বাগিচাগুলির সংগ্রাম; চুলায় ধরানো আগুন ওপাশে উঠানের কোথাও কোনো এক তরুনীর হাস্যঃ এবং আমি এই সমস্তর মধ্যে, এর যে অংগভংগী ও সংকেত এসবকে জবিন্ত ও একত্র করেছে তাতে এমন এক বলিষ্ঠ আত্মার সংগতি শুনতে পেলাম যা কোনো অবস্থাকেই বাধা বলে জানে না, যা নিজের মধ্যেই শান্ত।
আমি আবার ফিরে যাই, অনেক আগে, দশ বছর পূর্বে জেরুজালেম, শরৎকালে সেই দিনটিতে, যখন আরো একজন বৃদ্ধ আমাকে বলেছিলেন, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পনের কথা, মানুষ যে আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই কেবল পারে আল্লাহর সংগে শান্তিময় সম্পর্ক স্থাপন করতে, আর এভাবে, নিজের নিয়তির সাথেও।
সেই শরৎকালে, আমি ছিলাম আমার মামা ডোরিয়ানের বাড়িতে- পুরানা জেরুজালেম নগরীর ঠিক মাঝখানে। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছিলো- ফলে আমি বাইরে বেশি যেতে পারছিলাম না। প্রায়ই আমি জানালায় বসে থাকতাম; বাড়ির পেছনের মস্ত বড়ো একটা উঠানের দিকে সেই জানালাটা থাকতো খোলা। উঠানটি ছিলো বৃদ্ধ এক আরবের; লোকে তাকে ‘হাজী’ বলতো- কারণ, তিনি মক্কায় হজ্জ্ব করেছিলেন। তিনি সওয়ারি আর মাল বহনের জন্য গাধা ভাড়া খাটাতেন। কাজেই তাঁর উঠানখানা হয়ে উঠেছিলো একটা সরাইখানার মতো।
রোজ সকালে সুরুজ ওঠার আগেই উট- বোঝাই করে শাক-সব্জি, তরি-তরকারি ও ফলমূল আনা হতো আশ-পাশের গ্রামাঞ্চল হতে; তারপর সেগুলি গাধার পিঠে চাপিয়ে শহরের বাজারে চিপা গলিপথে পাঠিয়ে দেয়া হতো। দিনের বেলা দেখতাম উটের বিশাল ভারি দেহগুলি মাটির উপর বিশ্রাম করছে; লোকজন হামেশা হৈ হল্ল করে উট আর গাধাগুলির দেখ-শোন করছে, তত্ত্ব-তালাবি নিচ্ছে, অবশ্য মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে ওরা বাধ্য হয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতো আস্তাবলে। উট আার গাধা চালক এই লোকগুলি ছিলো দরিদ্র আর ওদের গায়ে দেখতাম ছেড়া জামা-কাপড়; কিন্তু চাল-চলনে আর আচরণে ওদের তুলনা করা চলে মুক্ত-স্বাধীন নৃপতিদের সাথে। যখন ওরা একত্রে কেতে বসতো জমিনের উপরে আর আটার তৈরী চেপ্টা রুটি খেতো সামান্য পনীর বা দু’চারটি জলপাই-এর সাথেম আমি তাদের আচরণের আভিজাত্য ও স্বতঃস্ফুর্ততার এবং তাদের হৃদয়ের প্রশান্তির প্রশংসা না করে পারতাম না। আমি স্পষ্ট দেখতে পেতাম- ওরা নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সকল বস্তুকেও ওরা শ্রদ্ধা করে। হাজী সাব একটি ছড়ি ভর করে পায়চারী করতেন, কারণ, তিনি ছিলেন বাতের রোগী, আর তাঁর হাঁটু গিয়েছিলো ফুলে, ওদের মধ্যে এক রকম সর্দার ছিলেন তিনি-। দেখতাম, ওরা কোনো আপত্তি না করেই ওর কথা শুনছে। দিনে কয়েকবার তিনি ওদেরকে জমায়েত করতেন সালাতের জন্য, আর বৃষ্টি না হলে ওরা খোলা জায়গায়ই সালাত আদায় করতো। ওরা সব ক’জন একটিমাত্র লম্বা কাতারে দাঁড়ায় এবং তিনি ওদের ‘ইমাম’ হিসাবে দাঁড়ানের ওদের সম্মুখে। সালাতে নিখুঁৎ অংগ সঞ্চালনের দিকে দিয়ে ওরা যেনো সৈনিক, ওরা একই সংগে মক্কার দিকে মুখ করে মাথা নীচু করে, আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়, তারপর হাঁটু গেড়ে বসে এবং জমিনের উপর কপাল ঠেকায়। মনে হতো ওরা যেনো ইমামের মুখের অশ্রুত শব্দগুলি অনুসরণক করছে,- ইমাম, যিনি সিজদা থেকে উঠে আবার সিজদায় যাওয়ার আগে নগ্ন পায়ে দাঁড়ান জায়নামাজের উপর, তাঁর চোখ বোঁজা, হাত দু’টি ভাঁজ করে বুকের উপর রাখা, নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়ছেন, স্পষ্টই তনি গভীর ধ্যানে সমাহিতঃ আমি দেখতাম, তিনি তাঁর সমগ্র আত্মা দিয়ে প্রার্থনা করছেন!
এ ধরনের একটি প্রকৃত প্রার্থনার সাথে, প্রায় যান্ত্রিক অংগ সঞ্চালনের যোগ দেখে আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করি এবং একদিন ‘হাজী’ সাবকে, যিন কিছু ইংরেজি বোঝেন, জিগগাস করিঃ
-‘আপনারা কি সত্যি বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ চান আপনারা বারবার নুয়ে হাঁটু গেড়ে সিজদা করে তাঁর প্রতি আপনাদের ভক্তি দেখাবেন? এর চেয়ে কি নিজের দিকে তাকানো এবং নিজের অন্তরের নিভৃতে তাঁর প্রতি প্রার্থনাই উত্তম নয়? আপনাদের এ ধরনের অংগ সঞ্চালনের কারণ কি?
কথাগুলি মুখ থেকে বের হবার সাথে সাথেই আমার অনুশোচনা হলো, কারণ, এই বৃদ্ধ লোকটির ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবার ইচ্ছা আমার ছিলো না। কিন্তু ‘হাজী’ সাবকে মোটেই আহত মনে হলো না। তাঁর দন্তহীন মুখে একটা হাসি ফুটে উঠলো, তিনি বললেনঃ
-‘তাহলে, এ ছাড়া আমরা আর কীভাবে আল্লাহর ইবাদত করবো? তিনি কি দেহ আর আত্মা, দু’ই এক সংগে সৃষ্টি করেননি? শুনুন, আপনাকে বলছি, আমরা মুসলমানরা যেভাবে প্রার্থনা করি কেবল, সেইভাবেই প্রার্থনা করে থাকি, অন্যভাবে করি না। আমরা কাবা’র দিকে মুখ করে দাড়াই, মক্কায় অবস্থিত আল্লাহর পবিত্র ঘরের দিকে, এ সত্য উপলব্ধি করে যে দুনিয়ার সকল মুসলমানেরই মুখ- সে যেখানেই থাকুক না কেন- প্রার্থনায় এই ঘরের দিকেই ফেরানো হয়, আর আমরা সকলে মিলে একটি মাত্র দেহের শামিল এবং আল্লাহ হচ্ছেন আমাদের ধ্যান-ধারণার কেন্দ্র। প্রথম আমরা সরল সোজা হয়ে দাঁড়াই এবং পাক কুরআন থেকে তিলাওয়াত করি, একথা মনে রেখে যে, এ হচ্ছে তাঁরই কালাম, মানুষকে দেয়া হয়েছৈ যাতে সে জীবনে সরল, ন্যায়পরায়ণ ও অটল হতে পারে, তারপরে আমরা বলি, আল্লাহ মহান, সর্বশ্রেষ্ঠ। এর দ্বারা আমরা নিজেদের একথা স্মরণ করিয়ে দিই যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই যে আমাদের উপাস্য হতে পারে। একথা বলার পরে আমরা গভীরভাবে নুয়ে পড়ি, কারণ আমরা তাঁকে সম্মান করি সকলের উপরে এবং তাঁর শক্তি ও মহিমার প্রশংসা জ্ঞাপন করি। এরপর আমরা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে জমিনে কপাল ঠেকাই, কারণ, আমরা উপলব্ধি করি যে, তাঁর সম্মুখে আমরা ধূলিকণা মাত্র এবং আমরা কিছুই না- আর তিনি আমাদের স্রষ্টা, লালন-পালনকর্তা। এরপর আমরা জমিন থেকে আমাদের মাথা তুলি আর স্থির হয়ে বসি, আর প্রার্থনা করি, যেনো তিনি আমাদের পাপ ক্ষমা করে দেন, আমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, আমাদের সোজা-সরণ পথে পরিচালনা করেন; এবং আমাদেরকে স্বাস্থ্য ও রিযিক দেন- তারপর আবার আমরা সিজদায় যাই, এক আল্লাহর মহিমার সম্মুখে ধূলিতে আমাদের কপাল ঠেকাই। এরপর আবার স্থির হয়ে ব সি, আর প্রার্থনা করি যেনো তিনি, নবী মুহাম্মদ, যিনি আল্লাহর বানী আমাদের কাছে এনে দেন তাঁর প্রতি রহমত করেন, যেমন তিনি রহমত করেছিলেন পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদেরকেঃ আমরা প্রার্থনা করি, যেনো তিনি আমাদেরকে এবং যারা সত্য পথে চলে তাদের সকলকে রহমত করেন; আমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করি যেনো তিনি আমাদেরকে ইহজগতের কল্যাণ এবং পরকারের কল্যাণ- দু’ই দান করেন। সবার শেষে আমরা আমাদের মাথা ডানদিকে এবং বামদিকে ঘুরাই- এবং বলি, তোমাদের সকলের উপর আল্লাহর শান্তি আর রহমত বর্ষিত হোক, এবং এভাবে যাঁরা সৎকর্মপরায়ণ, যেখানেই তাঁরা থাকুক না কেন তাঁদের সকলের প্রতি আমরা জানাই অভিবাদন।
এভাবেই আমাদের রাসূল (স) সালাত আদায় করতেন এবং এভাবেই সর্বকালে সালাত সম্পাদনের জন্য তিনি তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছেন, যাতে তারা স্বেচ্ছায় আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে, আর ইসলামের অর্থ এ-ই এবং এভাবেই তাঁর সংগে শান্তিময় সম্পর্ক স্থপন করতে পারে আর তাদের নিজেদের নিয়তির সংগেও।
অবশ্য বৃদ্ধ লোকটি হুবহু এই শব্দগুলি ব্যবহার করেননি- কিন্তু তিনি যা বলেছিলেন তার অর্থ হলো এ-ই এবং এভাবেই আমি এগুলি স্মরণ করে থাকি। কয়েক বছর পর আমি বুঝতে পেরেছিলাম ‘হাজী’ সাব তাঁর এই ব্যাখ্যা দ্বারাই ইসলামের দরোজা পয়লা খুলে দিয়েছিলেন আমার জন্য। তা সত্ত্বেও আমি, ইসলাম আমার নিজের ধর্ম হয়ে উঠতে পারে এ চিন্তা আমার মনে প্রবেশ করারও বহু আগে এক দীনতা অনুভব করতে শুরু করেছিলাম- যখনি দেখতাম, যেমন দেখতাম প্রায়ই- একজন লোক নাঙ্গা পায়ে দাঁড়িয়ে আছে তার জায়নামাযের উপর, কিংবা খড়ের মাদুরের উপর- বুকের উপর হাত দু’টি ভাঁজ করে রেখে, মাথা নীচু করে সম্পুর্ণভাবে নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে, তার চাপাশে যা ঘটছে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে- সে মসজিদের ভেতরেই হোক, অথবা কর্মব্যস্ত কোনো রাস্তার ফুটপাতেই হোকঃ একজন মানুষ যার নিজেকে নিয়ে কোনো নালিশ নেই- শান্ত এবং তৃপ্ত!
* * * * * *
মামা ডোরিয়ান আমাকে যে ‘আরব পাথুরে ঘরের’ কথা লিখেছিলেন তা ছিলো সত্যি আনন্দদায়ক। বাড়িটি ছিলো’ প্রাচীন নগরীর’ কিনারে, ‘জাফা-দরোজার’ কাছে। এর প্রশস্ত, উঁচু সিলিং-বিশিষ্ট কোঠাগুলি, অতীতের বিভিন্ন জামানায় যেসব অভিজাত এখানে বসবাস করতেন, তাঁদেরই স্মৃতিতে যেনো ভারাক্রান্ত- আর এর দেয়ালগুলির নিকটবর্তী বাজার থেকে ভেঙে- পড়া জীবন্ত বর্তমানের স্পন্দনে স্পন্দিত। আর সে সব দৃশ্য, ধ্বনি আর গন্ধ এমনি যার সংগে আমার অতীতের অভিজ্ঞতার কোনো মিলই নেই।
ছাতের চত্বর থেমে আমি দেখতে পেলাম- সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত প্রাচীন নগরীর এলাকা- জালের মতো ছড়ানো তার অনিয়মিত পথ-ঘাট আর পাথরে খোদাই অলি-গলিসহ। অপর প্রান্তে রয়েছেন, বিশাল বিস্তৃতির বিচারে অনেক কাছে, সুলায়মানের মসজিদ-এলাকা, আর রয়েছে একেবারে শেষ সীমানায় মসজিদুল আকসা’ যা মক্কা মদীনার পরেই সবচেয়ে পবিত্র গণ্য, আর ঠিক মাঝখানটায় রয়েছে, ‘পাথুরে গম্বুজ’। তার ওপাশে প্রাচীন পবিত্র নগরীর দেয়ালগুলি প্রসারিত রয়েছে কিদরণ উপত্যকার দিকে আর উপত্যকার ওপাশে জেগে উঠেছে মোলায়েম মসৃণ লতা-পাতাশূণ্য পাহাড়- কেবল পাহাড়ের ঢালুগুলিই এখানে-ওখানে জলপাই গাছের দ্বারা চিহ্নিত। পূর্বদিকে এর চেয়ে কিছুটা উর্বরতার চিহ্ন মেলে; ওদিকেই দেখতে পেলাম একটা বাগিচা, ঢালু হয়ে নেমে এসেছে রাস্তার দিকে, গাঢ় সবুজ সে বাগিচা আর দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এটি হচ্ছে ‘জেথসিমেনের উদ্যান’। এরি মধ্য থেকে একদিকে জলপাই ও অপরদিকে সাইপ্রেস গাছের মধ্যে সোনালী, পেঁয়াজের আকারের রুশ গির্জার গম্বুজগুলি ঝলমল করছে।
এ যেনো, কিমিয়াগরের বক- যন্ত্রে আন্দোলিত কম্পিত ঢালাই তরল পদার্থ, পরিস্কার অথচ অবর্ণনীয়, হাজারো রঙে বিচিত্র, যা শব্দের অতীত, এমনকি, চিন্তারও আয়ত্তাতীত। এ রকমই আমার মনে হতো জলপাই পর্বত থেকে জর্ডান উপত্যকা আর মৃত-সাগরকে। ঢেউ- খেলানো পাহাড় আর দুগ্ধ-শুভ্র উজ্জ্বল পটভূমিকায় যেনো রুদ্ধশ্বাসের মতো অংকিত; তার সংগে জর্ডান নদীর গাঢ়-নীল রেখা এবং দূরে মৃত-সাগরের গোল আবর্ত এবং আরো দূরে, যেনো নিজের মধ্যেই সম্পূর্ণ আরেকটি জগৎ, প্রদোষ-মগ্ন মোআব গিরিশ্রেণী- এমন একটি অবিশ্বাস্য, বিচিত্র রূপময় সৌন্দর্য-চিত্র যে, আমার অন্তর তাতে উক্তেজনায় কাঁপতে শুরু করত।
আমার কাছে জেরুজালেম ছিলো একটি সম্পূর্ণ নতুন দুনিয়া। ‘পুরোনো নগরী’র প্রত্যেকটি স্থান থেকে জেগে উঠতো কতো ঐতিহাসিক স্মৃতিঃ সেই সব রাস্তা, যারা শুনেছে ইশায়াকে প্রচার করতে, সেই সব খোয়া যার উপর দিয়ে হযরত ঈসা (আ) হাঁটতেন, সেই সব প্রাচীর যা পুরোনো হয়ে গিয়েছিলো যখন রোমান সৈনিকদের ভারি পদক্ষেপ প্রতিধ্বনিত হতো সেগুলি থেকে, আর দরোজার উপরের খিলান, যাতে খোদাই রয়েছে সালাহুদদীনের আমরের লিপি। আসমান ছিলো গাঢ় নীল, যা ভূমধ্যসাগরীয় অন্যান্য দেশকে যারা জানে তাদের কাছে হয়তো নতুন মনে হতো না। কিন্তু আমার কাছে- যেহেতু আমি বেড়ে উঠেছি অনেক কম-বন্ধুত্বপূর্ণ আবহাওয়ায়- এই নীল ছিলো যগপৎ একটি আহবান ও একটি প্রতিশ্রুতি। বাড়ি-ঘর আর রাস্তাঘাটগুলি যেনো কাঁপতে থাকা একটা কোমল উজ্জ্বলতায় মোড়ানো, আর লোকজনের চলন-বলন স্বতস্ফুর্ত, জড়তামুক্ত, অংগভংগী সম্ভ্রম ও আভিজাত্যপূর্ণ- আর লোজন মানেই এখানকার আরবেরা,- কারণ ওরাই শুরু থেকে আমার চেতনায় ছাপ এঁকে দিয়েছিলো এদেশের মানুষ হিসাবে- এদেশেরই মাটি আর ইতিহাস থেকে তা জন্ম লাভ করেছে এবং এখানকার আলো-বাতাসের সাথে ওরা আছে এক হয়ে। ওদের পোশাক-পরিচ্ছদ বিচিত্র, বর্ণাঢ্য, বাইবেলী বর্ণনার দৈর্ঘ্য ও বিস্তার তাদের পরনের কাপড়ের; ‘ফেলাহ’ হোক, আর বদ্যু হোক- কারণ, আমি প্রায়ই দেখতাম বদ্যা শহরে আসছে জিনিস-পত্র কেনা-বেচা করার জন্য প্রত্যেকেই তাদের কাপড়-চোপড় পরে নিজের মতো করে, সবসময়ই অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা, যেনো মুহূর্তের প্রেরণায় সে একটা নেহাৎ-নিজস্ব ফ্যাশন উদ্ভাবন করেছে।
ডোরিয়ানের বাড়ির সামনেই, সম্ভবত চল্লিশ গগজের মতো দূরেই দাউদের কেল্লার কাড়া-কাল-জীর্ণ প্রাচীরগুলি উঠেছে- এই কেল্লাটি প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষের অংশবিশেষ; এটি একটি খাঁটি মধ্যযুগীয় আরব নগর-দুর্গ, আর সম্ভবত এটি তৈরি হয়েছিলো হিরোদীয় আমলের বুনিয়াদের উপরে; এর প্রহরা-কক্ষটি মিনারের মতো উঁচু আর সংকীর্ণ। (বাদশাহ দাউদের সাথে এর প্রত্যক্ষ কোনো যোগ না থাকলেও ইহুদীরা সবসময়েই একে এ নামেই অভিহিত করেছে; কারণ, বলা হয়, এখানে ‘জিওন’ পাহাড়ের উপরেই পুরানো শাহী প্রাসাদ ছিলো অবস্থিত)। ‘প্রাচীন নগরী’টির দিকে রয়েছে একটি নীচু প্রশস্ত দালান, যার ভেতর দিয়ে চলে গেছে প্রবেশ দরোজাটি আর দরোজার সম্মুখে পুরোনো পরিখাটির উপরই রয়েছে পাথরে তৈরি ধনুকের মতো বাঁদকা তোরণ- একটি পুল। বদ্যুরা যখন শহরে আসে তখন এই পথটিকে ওরা নিয়মিত ব্যবহার করে ওদের মিলনের জায়গারূপে। একদিন আমি দেখতে পেলাম- এক দীর্ঘ- দেহ বদ্যু সেখানে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে, রূপালী ধূসর আসমানের পটভূমিকায় একটি দেহাকৃতি, যেনো প্রাচীন কোনো উপকথার এক মূর্তি। ছোট্ট-লাল বাদামী দাড়ির ফ্রেমে, ধারালো চোয়াল- মুখমণ্ডলে একটি গভীর গাম্ভীর্যের অভিব্যক্তিঃ বিষণ্ন মলিন মুখমণ্ডল যেনো সে কোনো কিছুর প্রত্যাশা করছে, অথচ ভাবতে পারছে না যে, সত্যি তা ঘটবে। তার গায়ের চওড়া বাদামী-সাদা ডোরাওয়ালা আলখিল্লাটি জির্ণ এবং ছেঁড়া! আর হঠাৎ আমার মনে হলো, কেন মনে হলো জানি না, এ আলখিল্লাটি লোকটির গায়ে রয়েছৈ বহু মাস ধরে বিপদ আর পালিয়ে বেড়ানোর বহু মাস- ও কি তা হলে সেই ক’জন যোদ্ধারই একজন, যারা হযরত দাউদের অনুগমন করেছিলেন, হয়তো এই মুহূর্তে কোথাও জুদী পাহাড়ের কোলে এ গুহায় লুকিয়ে ঘুমিয়ে আছেন দাউদ, আর এই বিশ্বস্ত ও সাহসী বন্ধুটি একজন সংগী নিয়ে চুপি চুটি এই রাজধানী শহরে এসেছে- দেখেতে- ‘সল’ তাদের নেতা সম্পর্কে কী ভাবেন আর তাঁর জন্য ফিরে আসা নিরাপদ কি না এবং এখন, এই মুহূর্তে, দাউদের এই বন্ধুটি এখানে অপেক্সা করছে তার সংগীটির জন্য, সমূহ অমংগলের আশংকা নিয়েঃ ওরা হয়তো খোশ-খবর নিয়ে যেতে পারবে না দাউদের কাছে……
হঠাৎ বদ্যুটি নড়ে ওঠে এবং ঢালু বেয়ে নীচুতে নামতে শুরু করে আর আমার স্বপ্ন-কল্পনা টুটে যায়। তখন, সহসা আমার মনে পড়লোঃ এই লোকটি হচ্ছে একজন আরব, আর ওরা, বাইবেলের সেই মূর্তিগুলি ছিলো ইহুদী। কিন্তু আমার এই বিস্ময় কেবর মুহূর্তকাল স্থায়ী হলো, কারণ, অকস্মাৎ আমি বুঝতে পারলাম সেই স্বচ্ছতার সংগে যা হঠাৎ বিদ্যুৎ- ঝলকের মতো কখনো কখনো আমাদের অন্তরে ঝলসে ওঠে এবং পৃথিবীকে উদ্ভাসিত করে দেয় হৃদয়ের একটি মাত্র স্পন্দন-কালের জন্য সেই স্বচ্ছতার সংগে আমি বুঝতে পারলাম- দাউদ এবং দাউদের সময় ইবরাহীম ও ইবরাহীমের সময়ের মতোই তাদের আরব উৎসমূলের অনেক কাছে, আর সে কারণে, আজকের বেদুঈনদেরও তা নিকটতরো আজকের ইহুদীদের চাইতে- যাঁরা নিজেদেরকে মনে করে দাউদ ও ইবরাহীমের খান্দান বলে…..
আমি প্রায়ই বসতাম জাফা-দরোঝার নীচে, পাথর নির্মিত সূঁচালো স্বম্ভটির উপর এবং দেখতাম দলে দলে মানুষ প্রাচীন নগরীতে ঢুকছে আর সেখান থেকে বের হচ্ছে, সবাই একে অপরের সাথে গা ঘষতে ঘষতে, একে অপরকে কুনইয়ের ধাক্কা দিতে দিতে চলছে- আরব এবং ইহুদী যতো রকমের হতে পারে, সকলেই। এদের মধ্যে রয়েছে শক্ত হাডডিওয়ালা ‘ফেলাহীন’ মাথায় বাদামী রঙের কাপড় অথবা কমলা-রঙের পাগড়ি; আরো রয়েছে বেদুঈনেরা, মুখমণ্ডল, তাদের তীক্ষ্ম, পরিচ্ছন্ন এবং প্রায় সব সময়ই কৃশ; ওরা আলখিল্লা পরে এক আশ্চর্য আত্মস্থ ভংগীতে, প্রায়ই দু’হাত নিতম্বের উপর রেখে কনুই প্রসারিত করে দিয়ে, যেনো তারা নিশ্চিত যে, প্রত্যেকেই ওদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেবে। ওদের মধ্যে কিষাণ রমণীদেরও দেখতামঃ কালো বা নীল রঙের সূতী বস্ত্র গায়ে, বুকের উপর সাদা সূতায় ফুল তোলা; প্রায়ই ওদের মাথায় থাকতো জুড়ি এবং ওরা চলতো একটা নম্র, সহজ সুন্দর গতিচ্ছন্দে। পেছন দিক থেকে তাকিয়ে অনেক ষাট বছরের রমণীকেও মনে হতো রমনী। ওদের চোখের দৃষ্টি মনে হতো পরিস্কার এবং বয়সের প্রভাব-মুক্ত- যদি না ওরা আক্রান্ত হতো ‘ট্রাকোমা’ দ্বারা- এটি একটি দুরারোগ্য মিসরীয় চক্ষুরোগ, যা ভূমধ্যসাগরের পূর্বের সকল দেশের জন্যই এক অভিশাপ বিশেষ।
এবং ইহুদীদেরও দেখতামঃ স্থানীয় ইহুদী, যারা পরতো ‘তারবুশ’, আর চওড়া, বিশাল আলখিল্লা, মুখাকৃতির দিক দিয়ে যাদের গভীর মিল রয়েছে আরবদের সাথে; পোলাণ্ড আর রশিয়া থেকে এসেছে যে ইহুদীরা, তারা তাদের অতীত ইউরোপীয় জীবনের এতো ক্ষুদ্রতা আর সংকীর্ণতা নিয়ে এসেছে সাথে করে যে ভাবতে আশ্চর্য লাগে, তারা দাবি করে তারা আর মরক্কো ও তিউনিসিয়ার সাদা বার্নাস পরিহিত গর্বিত ইহুদীরা একই বংশের লোক। তবু, ইউরোপীয় ইহুদীরা তাদের চারপাশের চিত্রের সংগে স্পষ্টই বেমানান হলেও ইহুদী জীবন ও রাজনীতির সুর এবং মেজাজ তারাই সৃষ্টি করে, আর এ কারণে, আরব ও ইহুদীদের মধ্যে প্রায় দৃশ্যমান মন- কষাকষির জন্য ওরাই দায়ী।
ঐ সময়ে একজন সাধারণ ইউরোপীয় কতোটুকু জানতো আরবদের সম্বন্ধে? আসলে কিচ্ছুই না। সে নিকট প্রাচ্যে আসার সময় সংগে বয়ে নিয়ে আসতো কতকগুলি রোমান্টিক এবং ভ্রান্ত ধারণা এবং যদি সদিচ্ছা থাকতো এবং বুদ্ধিবৃত্তির দিক দিয়ে যদি সে সৎ হতো, তা’হলে তাকে স্বীকার করতেই হতো যে, আরবদের সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞানই নেই। ফিলিস্তিনে আসার আগে আমি তো কখনো এ দেশকে আরবদেশ বলে ভাবিনি। অবশ্য, আমার এ অস্পষ্ট ধারণা হয়েছিলো যে, এখানে ‘কিছু সংখ্যক’ আরবও বাস করে- তবে ওদের আমি কল্পনা করেছিলাম কেবল মরুভূমির তাঁবুর বাসিন্দা যাযাবর এবং স্নিগ্ধ মরূদ্যানের বাসিন্দারূপে। ফিলিস্তিন সম্পর্কে এর আগে আমি যা কিছু পড়েছি সবই জিওনিস্টদের লেখা; স্বভাবতই এবং কেবল নিজেদের দৃষ্টিভংগীতেই ওরা লিখে থাকে। তাই আমি বুঝতে পারিনি যে, শহরগুলিও আরবদের দ্বারা পূর্ণ, বুঝতে পারিনি যে, আসলে ১৯২২ সনেও ফিলিস্তিনে যেখানে ইহুদী ছিলো একজন, সেখানে পাঁচজন ছিলো আরব, সে কারণে ফিলিস্তিন যতোটা না ইহুদীদের দেশ তার চাইতে বহু-বহু গুণে বেশি আরবদেরই দেশ!
আমি যখন জিওনিস্ট সংগ্রাম কমিটির চেয়ারম্যান মিঃ উসীশকিনের নিকট এ বিষয়ে মন্তব্য করলাম, আমার মনে হলো, জিওনিস্টরা আবরদের এই সংখ্যাগুরুত্বের সত্যটিকে বিবেচনা করে দেখতেও রাজী নয়। জিওজিজমের বিরুদ্ধে আরবদের বিরোধিতাকে তারা কোনো গুরুত্ব দিতেই তৈরি নয়। মিঃ উসীশকিনের প্রতিক্রিয়া আরবদের প্রতি ঘেন্না ও তাচ্ছিল্য ছাড়া আর কিছুই মনে হলো নাঃ
-‘এদেশে আমাদের বিরুদ্ধে আরবদের সত্যিকার কোনে আন্দোলনই নেই- অথ্যাৎ, এমন কোনো আন্দোলনই নেই যার মূল রয়েছে জনতার মধ্যে। যাকে আপনি বিরোধিতা মনে করছেন এ সবই আসলে কতিপয় অসন্তুষ্ট এজিটেটরের চিৎকার মাত্র। নিজে নিজেই তা ভেঙে পড়বে কয়েক মাসেই- বড়জোর কয়েক বছরেই’।
তাঁর এ যুক্তি আমার কাছে মোটেই সন্তোষজনক মনে হলো না। শুরু থেকেই আমার মনে হচ্ছিলো ফিলিস্তিনে ইহুদী বসতি স্থাপনের গোটা ধারণাটি কৃত্রিম, অবাস্তব আর তার চাইতে বিপদের কথা- এতে করে, ইউরোপীয় জ ীবনের সকল জটিলতা ও অসমাধ্য সমস্যা এমন একটি দেশে আমদানি হওয়ার আশংকা রয়েছে যা হয়তো এ সবকে বাদ দিয়েই অধিকতরো সুখ থাকতে পারে। ফিলিস্তিনে ইহুদীরা সত্যি এমনভাবে আসছিলো না যাকে বলা যেতে পারে প্রত্যাবর্তন, বরং তারা, ফিলিস্তিনকে ইউরোপীয় লক্ষ্য নিয়ে ইউরোপীয় ছকে স্বদেশে পরিণত করার জন্যই মরিয়া হয়ে উঠেছিলো। অল্প কথায় ওরা হচ্ছে দরোজায় প্রবিষ্ট বিদেশী। তাই নিজেদের মাঝখানে ইহুদীদের একটি স্বদেশের ধারণার বিরুদ্ধে আরবদের দৃঢ় বিরোধিতায় আমি আপত্তির কিছুই খুঁজে পাইনি। বরং আমি শীগগীরই বুঝতে পারলাম, জোর করে একটি ইহুদী রাষ্ট্র চাপিয়ে দেবার চেষ্টা চলছে আর এর বিরুদ্দে আরবরা সংগতভাবেই সংগ্রাম করে চলেছে।
১৯১৭ সনের ব্যালফোর ঘোষণায়, ফিলিস্তিনে একটি ইহুদী ‘জাতীয় আবাসে’র ওয়াদা করা হয়। আমি এই ঘোষণায় দেখতে পেলাম একটি নিবিড় রাজনৈতিক চাল, সকল ঔপনিবেশিক শক্তিই যার আশ্রয় নিয়ে থাকে। চালটি হচ্ছে ভেদনীতির মাধ্যমে কোনো দেশ শাসনের বহু পুরোনো নীতি। ফিলিস্তিনের বেলায় এই নীতিটি ছিলো আরো নির্লজ্জ। কারণ, ১৯১৬ সনে তুরস্কের বিরুদ্দে ইংরেজকে সাহায্যের প্রতিদান হিসাবে ইংরেজরা তখনকার মক্কার শাসক শরীফ হোসেনকে একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের প্রতিশ্রতি দিয়েছিলো। কথা ছিলো, ভূমধ্যসাগর ও পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তী সব ক’টি দেশ নিয়ে গঠিত হবে এ রাষ্ট্র। ইংরেজেরা যে কেবল এক বছর পরই ফ্রান্সের সাথে সাইফ-পিকট চুক্তি করে (যাতে ক’রে লেবানন ও সিরিয়ার উপর ফরাসী প্রভুত্ব কায়েম হয়) সে ওয়াদা খেলাফ করে তা নয়, বরং আরবদের ব্যাপারে ওরা যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলো কার্যত ফিলিস্তিনকে তার আওতা থেকেও বাদ দেয়া হয়।
নিজে ইহুদী খান্দানের লোক হলেও শুরু থেকেই আমি জিওনি- নিজমের বিরুদ্ধের এক প্রচণ্ড আপত্তি অনুভব করি। আরবদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত সহানুভূতির কথা বাদ দিলেও বিদেশী বৃহৎ শক্তির সাহায্যে বহিরাগতরা বাইরে থেকে এ দেশে আসবে সংখ্যা গুরুত্ব অর্জনের প্রকাশ্য উদ্দেশ্য নিয়ে আর এভাবে একটা জাতিকে উচ্ছেদ করবে তার দেশ থেকে, যে- দেশ স্মরণাতীতকাল থেকে বরাবরই তারই দেশ- ব্যাপারটি আমার কাছে ঘোর নৈতিকতা- বিরুদ্দ বলে মনে হলো। তাই আরব- ইহুদী সমস্যা নিয়ে যখনি কোনো কথা ওঠে আমি স্বভাবতই আরবদের পক্ষ নিই। আর এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হতো প্রায়ই। এ মাসগুলিতে যে- সব ইহুদীর সংস্পর্শে আমি আসি তাদের প্রায় সকলেই আমার মনোভাব বুঝতে ছিলো অপারগ। আমি আরবদের মধ্যে যা দেখেছি তা ওরা বুঝতে পারতো না। ওদের মতে, আরবরা এক পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী ছাড়া আর কিছুই নয়। অমন এক মনোভাব নিয়ে ওরা আরবদের প্রতি তাকাতো যা মধ্যে আফ্রিকার ইউরোপীয় আবাদীদের মনোভাবের থেকে খুব আলাদা নয়। আরবরা কী ভাবছে এ নিয়ে ওদের মোটেই কোনো মাথাব্যাথা ছিল না। ওদের প্রায় কেউই আরবী শেখার কোনো চেষ্টা করতো না, আর স কলেই বিনাদ্বিধায় এই আপ্তবাক্য গ্রহণ করেছিলো যে, ফিলিস্তিন হচ্ছে ইহুদীদেরই ন্যায্য উত্তরাধিকার।
এ বিষয়ে, জিওনিস্ট আন্দোলনের তর্কাতীত নেতা শাইম ওয়াইজম্যানের সংগে আমার যে মুখতসর আলোচনা হয়েছিলো এখনো তা আমার মনে আছে। তিনি ফিলিস্তিনে তাঁর নিয়মিত সফরের একটিতে এখানে এসেছিলেন। (আমার বিশ্বাস, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা ছিলো লগুনে) তাঁর সাথে আমার দেখা হয় এক ইহুদী বন্ধুর বাড়িতে। এ লোকটির অপরিসীম প্রাণশক্তিতে আমি প্রভাবিত না হয়ে পারিনি- এমন এক প্রাণশক্তি যার অভিব্যক্তি ঘটেছিলো তাঁর দৈহিক গতিবিধিতেও, তাঁর দীর্ঘ স্প্রিং- এর মতো পদক্ষেপেও, কারণ এভাবেই তিনি পায়চারি করছিলেন ঘরের ভেতর। আমি প্রভাবিত না হয়ে পারিনি তাঁর প্রশস্ত কপালে ফুটে ওটা বুদ্ধির দীপ্তিতে আর তাঁর চোখের মর্মভেদী চাহনিতে।
তিনি কথা বলছিলেন টাকা- কড়ির অসুবিধা সম্বন্ধে যে- সব অসুবিধা ইহুদী জাতীয়- আবাসের স্বপ্নকে রূপ দেবার পথে ছিলো বাধাস্বরূপ- আর বলছিলেন, বিদেশে ইহুদীরা এই স্বপ্নে যে সাড়া দেয় তার ক্ষীণতা সম্বন্ধে। এতে আমার এই বিরক্তিকর ধারণাই হলোঃ
ওয়াইজম্যানও প্রায় অন্য সকল ইহুদীর মতোই উৎসুক ছিলেন ফিলিস্তিনে যা কিছু ঘটছিলো তার নৈতিক দায়িত্ব ‘বহির্জগতে’ চালান দিতে। এর ফলে আমি বাধ্য হলাম সেই সশ্রদ্ধ নীরবতা ভাঙতে যে নীরবতার সাথে উপস্থিত সকলেই তাঁর কথা শুনছিলো। আমি জিগগাস করিঃ
-‘কিন্তু আরবদের সম্বন্ধে কী?’
আলোচনার মধ্যে এ ধরনের একটি তাল- কাটা সুর এনে নিশ্চয়ই আমি ‘ভূল’ করেছিলাম, কারণ, ওয়াইজম্যান তাঁর মুখ ধীরে ধীরে ফেরালেন আমার দিকে, তাঁর হাতের পেয়ালাটি রেখে দিলেন আর আমরা কথাটির পুনরাবৃক্তি করলেনঃ
-‘এবং আরবদের সম্বন্ধে কী?’
-‘আরবদের তুমুল বিরোধিতার মুখে আপনি কী করে আশা করছেন যে, ফিলিস্তিনকে আপনার নিজেদের স্বদেশ বানিয়ে ফেলবেন? অথচ, মোদ্দাকথা তো এই, আরবরাই এদেশে সংখ্যাগুরু।
জিওনিস্ট নেতা কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন- ‘আমরা আমা করছি, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ওরা আর মেজরিটি থাকছে না’।
-‘হয়তো তা-ই! আপনি এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন বহু বছর ধরে, আপনি পরিস্থিতি আমার চেয়ে অবশ্যই ভালো বোঝেন। কিন্তু আরবরা যে- সব রাজনৈতিক বাধাবিঘ্ন আপনাদের জন্য সৃষ্টি করতে পারে- হয়তো না-ও করতে পারে- সে সবের কথা বাদ দিয়েও, এ সম্যার নৈতিক দিকটা কি আপনাকে মোটেই বিব্রত করে না? আপনি কি মনে করেন না যে, যারা এদেশে চিরকাল বসবাস করে এসেছে তাদের উচ্ছেদ করা আপনাদের পক্ষে অন্যায়?’
-‘কিন্তু এদেশ তো আমাদের’, ডঃ ওয়াইজম্যান ভুরু জোড়া কপালে তুলে জবাব দেন, ‘যা থেকে আমাদেরকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিলো আমরা তো তাই ফেরত নেয়ার বেশি কিছু করছি না’।
-‘কিন্তু আপনারা প্রায় দু’হাজার বছরের কাছাকাছি ফিলিস্তিন থেকে দূরে রয়েছেন। এর আগে, আপনারা এদেশ শাসন করেছিলেন, কিন্তু পুরা দেমটি কখনো নয়- পাঁচমো বছরেরও কম। আপনি কি মনে করেন না যে, একই যুক্তিতে আরবরা দাবি করতে পারে স্পেন, কারণ, তারাও তো স্পেনে কর্তৃত্ব করেছিলো প্রায় সাতশো বছর, আর প্রায় পাঁচশো বছর আগে তা সম্পূর্ণ খুইয়ে বসে’।
দেখতে পেলাম ডঃ ওয়াইজম্যান অধৈয্য হয়ে উঠেছেনঃ
-‘বাজে কথা! আরবরা তো স্পেন ‘জয় করেছিলো’ মাত্র; সে দেশ কখনো তাদের নিজেদের আদি বাসভূমি ছিলো না। তাই, স্পেনীয়রা শেষ নাগাদ ওদেরকে সেখান থেকে বের করে দিয়েছিলো- তা ঠিকই হয়েছিলো’।
-‘মাফ করবেন’ আমি পাল্টা জবাব দিই, ‘আমার মনে হচ্ছে এতে ঐতিহাসিক তথ্যগত কিছু ভুল রয়ে গেছে। আসলে, হিব্রুরাও তো ফিলিস্তিনে এসেছিলো বিজয়ী হিসাবে। তাদের বহু বহু আসে এখানে বাস করতো অনেক সেমিটিক এবং অ-সেমেটিক গোত্র- যেমন আমেরাইত, এদুমাইত, ফিলিস্টাইন, মোআইবাত এবং হিট্টাইট প্রভৃতি। ইসরাঈল এবং যুদা’র রাজত্বকালেও তো এসব কবিলা এখানেই বাস করতো। রোমানরা যখন আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেয় তখনো ঐসব গোত্র এখানেই বাস করতো। ওরা এখনো এখানেই বাস করছে। সপ্তম শতকে যে- সব আরব এ অঞ্চল জয় করে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করে, তারা সবসময়ই জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র মাইনরিটি মাত্র ছিলো। বাকী যাদেরকে আমরা আজ ফিলিস্তিনী বা সিরীয় ‘আরব’ বলে বর্ণনা করে থাকি আসলে তারা হচ্ছে এখানকার আরবায়িত মূল বাসিন্দা মাত্র। বহু শতাব্দীতে এদের অনেকেই মুসলমান হয়ে গেছে। অন্যরা খ্রিস্টানই রয়ে গেছে। মুসলমানেরা স্বভাবতই আরব থেকে আগত তাদের ধর্মাবলম্বীদের সাথে তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেয়। কিন্তু আপনি কি অস্বীকার করতে পারেন, ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ লোক, যারা আরবীতে কথা বলে, তারা মুসলমানই হোক বা খ্রিস্টানই হোক, তারা সরাসরি সূত্রে, এখানকার আদি বাসিন্দাদেরই বংশধর- আদি এই অর্থে যে, হিব্রুরা এখানে আসার বহু শতাব্দী আগেও তারা এখানেই বাস করতো’!
আমার এই বিস্ফোরণে ডঃ ওয়াইজম্যান ভদ্র হাসিতে মোলায়েম হয়ে ওঠেন এবং আলোচনার মোড় অন্য বিষয়ের দিকে ঘুরিয়ে দেন।
আমার এই হস্তক্ষেপের যে পরিণতি হলো তাতে আমি সুখী হইনি। আমি অবশ্যি আশা করিনি, উপস্থিত কেউ- ডঃ ওয়াইজম্যান তো ননই- আমার সাথে একমত হবেন যে, নৈতিকতার বিচারে জিওনিস্ট আদর্শটি খুবই দুর্বল এবং খোলো। কিন্তু এই প্রত্যাশা আমার ছিলোঃ আরবদের লক্ষ্যের প্রতি আমার সমর্থন আর কিছু না হোক জীওনিস্ট নেতৃত্বের মধ্যে অন্তত কিছুটা অস্বস্তির জন্ম দেবে- এমন এক অস্বস্তি যা ওদের মধ্যে এনে দিতে পারে আরও বেশি অর্ন্তমূখিতা, আর তাতে করে হয়তো একথা মেনে নেয়ার জন্য সৃষ্টি করতে পারে অধিকতরো মানসিক প্রস্তুতি। কথাটি এই যে, আরবদের জিওনিজম বিরোধিতার মধ্যে একটি নৈতিক অধিকারের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তার কিছুটা ঘটলো না। তার বদলে আমি দেখতে পেলাম একটা শূন্য দেয়াল যেন চোখ বের করে তাকিয়ে আছে আমার দিকেঃ আমার হঠকারিতার বিরুদ্ধে তিরস্কারই ভরা প্রতিবাদ- এখন সেই হঠকারিতা, যা ওদের পূর্বপুরুষদের দেশে, ইহুদীদের প্রশ্নাতীত অীধকার সম্ভন্ধে প্রশ্ন তোলার দুঃসাহস করেছে!
ভেবে ভেবে বিস্মিত হতাম আমি- অমন সৃজনধর্মী বুদ্ধির অধিকারী ইহুদীদের পক্ষে জিওনিস্ট- আরব বিরোধটিকে কী করে কেবল ইহুদীদেরই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা সম্ভব হচ্ছে! ওরা কি বুঝতে পারেনি যে, শেষতক ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সমস্যাটির সমাধান কেবলমাত্র আরবদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ভেতর দিয়েই সম্ভব হতে পারে? ওদের এই পলিসি যে যন্ত্রণাদায়ক ভবিষ্যৎ ডেকে আনবে অনিবার্যভাবেই সে বিষয়ে ওরা কি ছিলো সত্যি সত্যি অতোটা অন্ধ? যদি সামরিকভাবে সকলও হয় তবু এক শক্রভাবাপন্ন আরব সমুদ্দুরের মধ্যে ইহুদী- রাষ্ট্ররূপ ছোট্ট দ্বপটি চিরকারের জন্য যে সংঘাত, ঘেন্না ও তিক্ততার মুখোমুখি হবে তা দেখার মতো দৃষ্টিশক্তি কি ওদের একেবারেই ছিলো না?
এবং কী আশ্চর্য, আমি ভাবতাম, যে জাতি তার দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাদায়ক ইতিহাসে, বারবার অন্যায় জুলুম-নিপীড়নের শিকার হয়েছে, আজ সে-ই তার নিজের লক্ষ্য হাসিলের ঐকান্তিক চেষ্টায় অপর একটি জাতির প্রতি মারাত্মক জুলুম করতে উদ্যত- আর সে জাতিও এমন এক জাতি যারা ইহুদীদের অতীত দুঃখ- কষ্টের ব্যাপারে একেবারেই নিরপরাধ! আমি জানতাম, ইতিহাসে এরূপ ঘটনা কখনো ঘটেনি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার চোখের সামনেই তা ঘটতে যাচ্ছে দেখে আমার দুঃখের সীমা রইলো না।
সে সময়ে ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক দৃশ্যপট নিয়ে আমার এই অষ্টপ্রহর চিন্তা- ভাবনার মূলে যে কেবল আরবদের প্রতি আমার সহানুভূতি আর জিওনিস্টদের এক্সপেরিমেন্ট আমার উদ্বেগই কাজ করেছে তা নয়- এর মূলে আমার সাংবাদিক কৌতূহলও ছিলো সক্রিয়- কারণ আমি তখন ‘ফ্রংকফুর্টার শাইটুঙ- এর বিশেষ সংবাদদাতা আর ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ সংবাদপত্রগুলির অন্যতম ছিলো এ কাগজ। অনেকটা আকস্মিকভাবেই আমি এ সুযোগ পেয়ে যাই।
এক সন্ধ্যায় আমি আমার এক স্যুটকেসে ঠাঁসা পুরোনো কাগজগুলি বাছাই করছি- কাগজ ঘাটতে ঘাটতে এক বছর আগে বার্লিনে ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি হিসাবে যে কার্ডটি আমাকে দেওয়া হয়েছিলো, তা পেয়ে গেলাম। আমি প্রায় ওটি ছিঁড়েই ফেলতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় ডোরিয়ান মামা আমার হাত ধরে রসিকতার সাথে বলে উঠলেনঃ ‘ছিঁড়ো না। তুমি যদি হাইকমিশন অফিসে এই কার্ডটি পেশ করো কয়েকদিনের মধ্যেই সরকারী ভবনে খানার দাওয়াত পেয়ে যাবে। এদেশে সাংবাদিকরা খুবই বাঞ্ছিত জীব’।
আমি যদিও অনাবশ্যক কার্ডটি ছিঁড়ে ফেললাম, তবু মামার ঠাট্টা আমার মধ্যে এক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলো। অবশ্য আমি সরকারী ভবনে খানার দাওয়াতের জন্য মোটেই উদগ্রীব ছিলাম না- কিন্তু তাই বলে এমন একটি সময়ে নিকটপ্রাচ্যে থাকার এই দুর্লভ সুযোগ কেন আমি কাজে লাগাবো না- যখন দেখতে পাচ্ছি- মধ্য ইউরোপের খুব কম সাংবাদিকই এখানে সফরের সুযোগ পাচ্ছে, আমি কেন আবার আমার সাংবাদিক কাজকর্ম শুরু করবো না? তবে ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি হিসাবে নয়, কোনো একটি মশহুর দৈনিকের সংবাদদাতা হিসাবে। এবং যেরূপ আকস্মাৎ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি তেমনি সহসা আমি স্থির করে ফেললাম- আমি ‘সত্যিকার’ সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করবো!
‘ইউনাইটেড টেলিগ্রাফে’র সাথে এক বছর কাজ করলেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রের সাথেই আমার সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিলো না। তাছাড়া, যেহেতু আমার নিজের নামে আজো কিছুই ছাপা হয়নি, তাই সংবাদপত্র জগতে আমার নাম এখনো সম্পূর্ণ অজানা, অপরিচিত। অবশ্য, এতে আমি নিরাশ হয়ে পড়িনি। আমি ফিলিস্তিন সম্পর্কে আমার ধারণার উপর একটি প্রবন্ধ লিখলাম এবং দশটি জার্মান সংবাদপত্রে পাঠালাম তার কপি। সংগে আমি এ প্রস্তাবও দিলাম যে, নিকট-প্রাচ্যের উপর আমি ধারাবাহিকভাবে প্রবন্ধ লিখতে তৈরি আছে।
এ হচ্ছে ১৯২২ শেষের দিকের মাসগুলির কথা- তখন জার্মানীতে চরম সর্বনাশা মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করছে। জার্মান সংবাদপত্রগুলির পক্ষে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছিলো। অতি অল্পসংখ্যক খবরের কাগজই পারবতো মুদ্রায় তাদের বৈদেশিক সংবাদদাতাদের খরচ বহন করতে। কাজেই এ মোটেই আশ্চর্যজনক ছিলো না যে, আমি যে-দশটি সংবাদপত্রে আমার নমুনা প্রবন্ধটি পাঠিয়েছিলাম তারা একের পর এক, কমবেশি ভদ্র বাষায় তাদের প্রত্যাখ্যানের কথা লিখে জানালো। দশটি পত্রিকার মধ্যে কেবল একটিই আমার পরামর্শ গ্রহণ করে এবং মনে হয়, আমি যা লিখেছিলাম তাতে খুশি হয়েই আমাকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিশেষ ভ্রাম্যমাণ সংবাদদাতা নিয়োগ করে, আর তার সংগে একটি চুক্তিপত্রও পাঠায়- ফিরে গিয়ে আমাকে একটি বই লিখে দিতে হবে। এই পত্রিকাটিই ‘ফ্রাংকফুটার শাইটুঙ’। আমি প্রায় কাৎ হয়ে গেলাম যখন দেখতে পেলাম, আমি যেড কেবল একটি সংবাদপত্রের সাথে (আর কী সে সংবাদপত্র!) সম্পর্কই স্থাপন করতে পেরেছি তা নয়, পয়লা চেষ্টায়ই অমন একটা মর্যাদা হাসিল করেছি যা বহু ঝানু সাংবাদিকেরও ঈর্ষার বস্তু হতে পারে!
অবশ্য এর মধ্যে একটা কাঁটাও ছিলো। মুদ্রাস্ফীতির জন্য ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’ আমাকে নগদ টাকায় আমার মাইনে দিতে সক্ষম ছিলো না। বিনয়ের সাথে তারা বললো, আমার পারিশ্রমিক দেয়া হবে জার্মান মার্কের হিসাবে; ওদের মতোই আমিও জানতাম যে, এতে আমার প্রবন্ধগুলি পাঠাবার জন্য খামের উপর যে টিকেট লাগাতে হবে তার খরচ বহন করাও কঠিন হবে। কিন্তু ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর বিশেষ সংবাদদাতা হওয়ার গৌরব অনেক- অনেক বেশি মূল্যবান মনে হলো- সংবাদদাতা হিসাবে টাকা- কড়ি না পাওয়অর সাময়িক অসুবিধা সত্ত্বেও। আমি ফিলিস্তিনের উপর প্রবন্ধ লিখতে শুরু করে দিলাম এই আশায় যে, শীগগীরই হোক বা বিলম্বেই হোক, ভাগ্যে কোনো শুভ পরিবর্তনের ফলে, একদিন হয়তো আমি গোটা নিকট-প্রাচ্যেই, সফর করতে সক্ষম হবো।
* * * * * * * * *
ফিলিস্তিনে এখন আমার বন্ধু অনেক- ইহুদী এবং আরব, উভয়ই।
একথা সত্য যে, আরবদের প্রতি আমার সহানুভতির জন্য যা ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এ প্রকামিত আমার প্রবন্ধ গুলিতে ছিলো সুস্পষ্ট, জিওনিস্টরা আমাকে দেখতো অনেকটা বিস্ময়-মেশানো সন্দেহের সংগে। স্পষ্টই তারা স্থির করতে পারছিলো না আমি কি আরবদের দ্বারা ‘খরিদ’ হয়ে গেছি (কারণ, জিওনিস্টরা প্রায় সমস্ত কিছুকেই টাকা- কড়ির অর্থে ব্যাখ্যা করতে ছিলো অভ্যস্ত)! না কি, আমি কেবল একটা উদ্ভট বুদ্ধিজীবী, বিদেশী সবকিছুকেই যে ভালোবাসে। কিন্তু তখন যেসব ইহুদী ফিলিস্তিনে বাস করতো তাদের সবাই যে জিওনিস্ট ছিলো তা নয়। ওদের কেউ কেউ ফিলিস্তিনে এসেছে, রাজনৈতিক কোনো মতলব নিয়ে নয়, বরং পাকভূমি আর তার সাথে জড়িত বাইবেলী স্মৃতি- অনুষংগের প্রতি একটী ধর্মীয় অনুরাগবশে।
এই দলের মধ্যে ছিলেন আমার ডাচ বন্ধু ইয়াকব দ্য হান- দেখতে ছোটো- খাটো, গোলগাল, মুখে সোনালী রঙের দাড়ি, বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। এখানে আমার আসার আগে তিনি ছিলেন হল্যান্ডের একটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের অধ্যাপক। এখন তিনি আমস্টার্ডামের ‘হ্যাণ্ডলসব্লাড’ ও লণ্ডনের ‘ডেলি একপ্রেসে’র বিশেষ সংবাদদাতা। তাঁর ধর্মবিশ্বাস ছিলো গভীর, পূর্ব ইউরোপের যে- কোনো ইহুদীর মতোই গোঁড়া- কিন্তু তিনি জিওনিস্ট চিন্তাধারা সমর্থন করতেন না, কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘প্রতিশ্রুত ভূমিতে তাঁর জাতির প্রত্যাবর্তনের জন্য তাদেরকে মিসাইঅ্যার আগমনের অপেক্ষা করতে হবে’।
-‘আমরা ইহুদীরা’, তিনি আমাকে একাধিকবার বলেছেন, ‘আমরা পাক ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলাম এবং পৃথিবীর সর্বত্র আমাদেরকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো, কারণ আল্লাহ আমাদের যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমরা তা পালন করতে পারিনি। তিনি আমাদেরকে মনোনীত করেছিলেন তাঁর কালাম প্রচারের জন্য, কিন্তু আমরা আমাদের উদ্ধত অহংকার- বশে ভাবতে শুরু করলাম, তিনি কেবল খাতিরেই ‘মনোনীত জাতি’ করেছেন- এবং এভাবে আমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। এখন আর তওবা করা আর অন্তর সাফ করা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। এবং আমরা যখন আবার তাঁর কালাম শোনার লায়েক হবো, তিনি একজন মিসাইঅ্যা পাঠাবেন তাঁর বান্দাদেরকে প্রতিশ্রুত দেশে আবার নিয়ে যাবার জন্যে’।
-‘কিন্তু’, আমি জিগগাস করি, ‘জিওনিস্ট’ আন্দোলনের মূলেও এই মিসাইঅ্যার ধারণা নেই কি? আপনি জানেন, আমি তা সমর্থন করি না; কিন্তু প্রত্যেক জাতিরই কি এ বাসনা স্বাভাবিক নয় যে, তাদের একটি নিজস্ব আবাস-ভূমি থাকবে?
ডঃ দ্য হান আমার দিকে একটু লঘু পরিহাস মেশানো নজরে তাকান,- ‘আপনি কি মনে করেন, ইতিহাস কেবল কতগুলি ঘটনাপস্পরা? আমি তা মনে করি না। আল্লাহ যে, আমাদেরকে বাধ্য করেছিলেন আমাদের দেশ হারাতে, আর আমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নানা দেশে, তা উদ্দেশ্যহীন ছিলো না। কিন্তু জিওনিস্টরা নিজেরা একথা স্বীকার করতে রাজী নয়; যে- আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব আমাদের পতনের জন্য দায়ী ওরা সেই অন্ধতায়ই ভূগছে। ইহুদীদের দু’হাজার বছরের নির্বাসন এবং দুঃখ-কষ্ট ওদেরকে কিছুই শেখায়নি। আমাদের দুঃখ-কষ্টের মূল কারণটি বুঝবার চেষ্টা না করে তাকে এখন এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছে; বলা যায়, পশ্চিমা শক্তির রাজনীতি থেকে পাওয়া বুনিয়াদের উপর একটা ‘জাতীয় আবাস’ তৈরি করে- এবং জাতীয় আবাসভূমি তৈরিরর এই প্রচেষ্টায় অপর একটি জাতিকে তার নিজের আবাস থেকে বঞ্চিত করার অপরাধই করে চলেছে ওরা!
স্বভাবতই, ইয়াকব দ্য হানের রাজনৈতিক মতামত তাকে জিওনিস্টদের মধ্যে খুবই অপ্রিয় করে তোলে (আসলে আমার ফিলিস্তিন ত্যাগের কিছুদিন পরেই, আমি শুনে মর্মাহত হই যে, তাঁকে সন্ত্রাসবাদীরা এক রাত্রে গুলী করে হত্যা করেছে।) তাঁর সংগে যখন আমার পরিচয় হয় তখন তাঁর নিজের মতের অল্প ক’জন ইহুদীদের মধ্যেই তাঁর সামাজিক মেলামেশা ছিলো সীমাবদ্ধ- এদের কেউ কেউ ছিলো ইউরোপীয়, কেউ কেউ ছিলো আরব। আরবদের প্রতি তাঁর খুবই দরদ ছিলো বলে মনে হয়, আর তাঁর সম্বন্ধে আরবদেরও ছিলো খুব উচ্চ ধারণা। ওরা প্রায়ই ওঁকে দাওয়াত করতো ওদের বাড়িতে। আসলে তখনো আবরা ইহুদী হিসাবেই ইহুদীদের প্রতি সর্বতোভাবে বির্দ্বিষ্ট হয়ে ওঠেনি। কেবল ব্যালফোর ঘোষণার পরই- অর্থাৎ শত শত বছর পাশাপাশি সম্প্রীতির সাথে বসবাস এবং একটা জাতিগত ঐক্য-চেতনা সত্ত্বেও আরবরা ইহুদীদেরকে রাজনৈতিক দুশমন ভাবতে শুরু করে। কিন্তু দ্বিতীয় দশকের প্রথমদিকের বদলে- যাওয়া পরিস্থিতিতেও আরবরা জিওনিস্ট এবং ডঃ দ্যা হা’নের মতো বন্ধুভাবাপন্ন ইহুদীদেরকে স্পষ্টভাবেই আলাদা করে দেখতো।
…. …. …. …. ….
আরবদের মধ্যে আমার সফরের এই প্রথমদিকের নিয়তি-নির্দিষ্ট মাসগুলি যেনো আবেগ-অনুভুতি ও চেতনা প্রতিবিম্বের এক প্রবাহ বইয়ে দিলো। বলতে কি, ব্যক্তিগত ধরনের কতকগুলি অনুচ্চারিত আশা- আকাঙ্ক্ষা আমার চেতনায় স্থান পাবার দাবি জানাতে থাকলো্
আমি অমন একটা জীবনবোধের সম্মুখীন হলাম যা ছিলো আমার কাছে একেবারেই নতুন। মনে হলো, এই মানুষগুলির রক্ত থেকে একটি উষ্ণ, তপ্ত, মানবিক নিশ্বাস প্রবাহিক হচ্ছে ওদের চিন্তায়, ওদের অংগ-ভংগীতে- আত্মার সেইসব যন্ত্রণাদায়ক ফাটল, ভয়, ক্ষোভ এবং মানসিক বাধার সেইসব প্রেত যা ইউরোপের জীবনকে কুৎসিততরে এবং প্রতিশ্রতির দিক দিয়ে অতো কাঙাল করেছে…. এই আরবদের মধ্যে এর কোনোটিরই অস্তিত্ব নেই। আমি আমার নিজেরও অজান্তে হামেমা যা কামনা করে এসেছি তারই কিছুটা পেতে শুরু করি আরবদের মধ্যেঃ হালকাভাবে জীবনের সকল প্রশ্নের মুকাবিলা করার জন্য এটি একটি আবেগধর্মী মনোভাব। বলা যায়, অনুভূমির ক্ষেত্রে এক মহৎ কাণ্ডজ্ঞান।
কালক্রমে, এই মুসলিম জাতির মর্মকথা বোঝা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে উঠলো। এর কারণ এ নয় যে, ওদের ধর্ম আমাকে আকর্ষণ করেছিলো (কারণ তখনো এ সম্বন্ধে আমি জানতাম সামান্যই)। বরং তা এ কারণেই আমার কাছে অতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, ওদের মধ্যে আমি দেখতে পেয়েছিলাম মন ও ইন্দ্রিয়ের এক সহজাত সংগতি, যা ইউরোপ খুইয়ে বসেছিলো। আরো নিবিড়ভাবে আরবদের জীবন বোঝার মাধ্যকে কি আমাদের পম্চিমা জগতের দুঃখ-যন্ত্রণা, মানবিক সংহতিকর ক্ষয়কর অভাব আর সেই দুঃখ-যন্ত্রণার কারণের মধ্যে যে গোপন সম্পর্ক রয়েছে তা আবিস্কার করার সম্ভব নয়? কী সেই জিনিস, যা আমাদেরকে, পশ্চিমাদেরকে, জীবনের সেই পরম স্বাধীনতা থেকে পলায়ন করতে শিখিয়েছে, যে স্বাধীনতার অধিকারী এই আরবেরা, ওদের এই মানসিক রাজনৈতিক অবক্ষয়ের যুগেও- যার অধিকারী আমরাও হয়তো ছিলাম অতীতের কোনো এক সময়ে? তা যদি না হতো, আমরা কী করে সৃষ্টি করতে পারতাম আমাদের অতীতের মহৎ সব শিল্পকলা, মধ্যযুগের সার্থক গির্জাসমূহ, রেনেসাঁসের উন্মাদ উল্লাস, রেমব্রাতের চিত্রের আলো-আধাঁরের খেলা, বাখের সুর-মূর্ছনা, মোজার্টের স্নিগ্ধ মোলায়েম অস্বপ্ন, আমাদের চাষীদের চিত্রকলায় ময়ূরের পেখমের গৌরব এবং অস্পষ্ট, প্রায় অমূল্য শিখর- চূড়ার দিকে বীথোফোনের গর্জনময় আশায়-দীপ্ত উড্ডয়ন, যেখান থেকে মানুষ বলতে পারে- ‘আমি আর আমার নিয়তি অভিন্ন।
আত্মশক্তির প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য কী তা আমরা জানি না বলে আমাদের পক্ষে আর ঐসব শক্তির সত্যিকার ব্যবহার সম্ভব নয়। আমাদের মধ্যে আর কখনো জ ন্ম হবে না কোনো বীথোফেনের বা কোনো রেমব্রাতের! তার বদলে এখন আমরা জানি শিল্পকলায়, সমাজ বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রনীতি-বিজ্ঞানে প্রকাশের নব নব রূপ নিয়ে কেবল মারাত্মক দলাদলি, কেবলি পরস্পরবিরোধী শ্লোগান, ও সূক্ষ্মভাবে, পরিকল্পিত নীতির মদ্যে তুমুল সংগ্রাম। আমাদের সব যন্ত্রপাতি, আর আসমান- ছোঁয়া দালাকোঠা আমাদের আত্মার সমগ্রতা পুনরুদ্ধারের জন্য কিছুই করতে পারেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও… ইউরোপের অতীতের সেই হারানো আত্মিক গৌরব কি প্রকৃতপক্ষে চিরদিনের জন্যই হারিয়ে গেছে? আমরা কোথায় ভূল করেছি তা উপলব্ধি করে আমরা কি সেই আত্মিক গৌরবের কিছুটা ফিরে পেতে পারি না?
এবং প্রথমে যা, আরবদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের প্রতি, আরবীয় জীবনের বাইরের রূপ, আর আমি এ জাতির লোকদের মধ্যে আবেগের দিক দিয়ে যে স্থির- নিশ্চয়তা লক্ষ্য করেছি তার প্রতি আমার পক্ষে সহানুভুতি মাত্র ছিলো, তাই ধীরে ধীরে আমার অজ্ঞাতসারে, এমন কিছুতে রূপান্তরিত হলো যা এক ব্যক্তিগত অন্বেষার সাথেই তুলনীয়। আমি ধীরে ধীরে আরো সচেতন হয়ে উঠলাম একটি আচ্ছন্ন-করা তন্ময় বাসনা সম্পর্কে- জানার এ বাসনা যে, আবেগের দিক দিয়ে ওদের নিশ্চিন্ত নির্ভরতার মূলে কী রয়েছে, আর কী সেই জিনিস যা আরবদের জীবনকে অতো আলাদা করে দিয়েছে পাশ্চাত্য জীবন থেকে? আর মনে হলো, এই বাসনা যেনো আমার নিজের গহনতম সমস্যাগুলির সাথেই রহস্যজনকভাবে জড়িত। আমি পথ খুঁজতে লাগলাম যা আমাকে দেবে আরদের চরিত্রে, তাদের ধ্যান-ধারণায় গভীরতরো অন্তদৃষ্টি, যে চরিত্র- ও ধ্যান-ধারণা ওদেরকে দিয়েছে একটা বিশেষ রূপ আর আত্মিক দিক দিয়ে ওদেরকে করেছে ইউরোপীয়দের থেকে অতো স্বতন্ত্র! ওদের ইতিহাস, তমদ্দুন আর ধর্ম সম্বন্ধে আমি গভীরভাবে পড়াশোনা শুরু করে দিলাম। আর এই তাগিদ, যা আমি সেই জিনিসটি আবিস্কার করার জন্য অনুভব করি যা ওদের হৃদয়কে করেছে উদ্বুদ্ধ আর পরিপূর্ণ আর দিয়েছে ওদের পথের দিশা- তারি মধ্যে যেনো আমি আভাস পেলাম একটি প্রেরণার, এক গোপন শক্তি আবিষ্কারের, যা আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে, পূর্ণ করেছ, আর দিয়েছে দিক-নির্দেশনার প্রতিশ্রুতি।
কণ্ঠস্বর
এক
আমরা চলছি উটের উপর সওয়ার হয়ে, আর জায়েদ গান গাইছে। বালিয়াড়িগুলি এখন আগের চেয়ে আরো প্রশস্ত। এখানে ওখানে বালু জায়গা ছেড়ে দেয় নূড়ি পাথরের শয্যার জন্য এবং খণ্ড খণ্ড বেসল্টের জন্য, আর আমাদের সম্মুখেই, অনেক দক্ষিণে, জেগে ওঠে গিরিশ্রেণীর ছায়া ছায়া রেখাঃ জাবাল শাম্মার পর্বতশ্রেণী।
জায়েদের গানের পদগুলি একাকার হয়ে ভেদ করে আমার নিদ্রালূতাকে – কিন্তু ঠিক অমন মাত্রায় যে, আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে যে- শব্দগুলি সেগুলিই এমন এক বিস্তৃততরো, গভীরতরো তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে উঠছে যার সাথে তাদের বাহ্য অর্থের কোনো যোগই নেই!
এ হচ্ছে উট সওয়ারের সেই গানগুলির একটি, যা আপনি প্রায়ই শুনতে পাবেন আরব দেশে- এমন গান যা মানুষ গায় তাদের জন্তগুরির পদক্ষেপকে নিয়মিত ও ক্ষিপ্র রাখতে এবং ঘুমিয়ে-পড়া থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে- মরু- মানবের সুর, যারা অমন স্থানের সাথে দিন গুজরান করে যার কোন সীমা- সরহদ নেই, প্রতিধ্বনিও নেইঃ যে সুর সবসময়ই তোলা হয় বাদ্যবন্ত্রের প্রধান চাবিতে, সুরের একই সমতলে, ঢিলা-ঢালা আর কিছুটা কর্কশ- বেরিয়ে আসছে গলার একেবারে উপর থেকে, আর আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে শুস্ক হাওয়ায়ঃ যেনো মরুভূমির নিশ্বাস ধরা পড়েছে মানুষের একটি কণ্টস্বরে। মরুভূমির ভেতর দিয়ে যে মানুষ কখনো সফর করেছে সে কিছুতেই ভূলতে পারবে না এই কণ্টস্বর। এ কণ্টস্বর যেখানে জমি নিষ্ফলা, বাতাস উষ্ণ আর চতুর্দিকে উন্মুক্ত অবারিত আর জীবন কঠিন- সব জায়গায় একই।
আমরা চলেছি উটের উপর সওয়ার হয়ে আর জায়েদ গেয়ে চলেছে, যেমন তার আগে নিশ্চয়ই গেয়েছে তার আব্বা এবং তার কবিলার আর সকল মানুষ এবং আরো বহু কবিলার মানুষ, হাজার হাজার বছর ধ’রে; কারণ, এই গভীর, একঘেয়ে সূরগুলি গড়ে তুলতে এবং তাদেরকে চূড়ান্ত রূপ দিতে দরকার হয়েছে হাজার হাজার রছরের। বহু সুরে সুরেলা পাশ্চাত্য সংগীত প্রায় সবসময়ই প্রকাশ করে কোনো না- কোন ব্যক্তিগত অনুভূতি, কিন্তু এই আরকীয় সুরগুলি- অগণিতবার যাতে তোলা হয়েছে একই সুরের আমেজ- এগুলি যেনো, অনুভূমি থেকে পাওয়া উপলব্ধির সুরময় প্রতীক মাত্র, যার অভিজ্ঞতা রয়েছে বহু মানুষের, যার উদ্দেশ্যে কোন একটা বাব জাগানো নয়, বরং আপনাকে আপনার আত্মিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া। এইসব সুরের জন্ম হয়েছিলো বহু বহু আগে, মরুভূমির আবহাওয়া থেকে, বাতাসের আর যাযাবর জিন্দেগীর ছন্দ থেকে, বিশাল মাঠ- প্রান্তরের বিশালতার অনুভুতি থেকে, এক চিরন্তন বর্তমানের ধ্যান থেকেঃ এবং ঠিক যেমন জীবনের মৌলিক বিষয়গুলি সব সময়ই একই থাকে তেমনি এই সুরগুলিও সময়ের অতীত, পরিবর্তনের অতীত।
এই ধরনের সুরের কথা প্রতীচ্যে ক্বচিৎ কেউ ধারণা করতে পারে। প্রতীচ্যে, আলাদা আলাদা সুর কেবল সংগীতেরই একটা দিক নয়, এ তার অনুভুতি ও কামনা- বাসনারও একটি দিক। শীতল আবহাওয়া, ছুটে চলা নদী-নালা, পর পর চারটি ঋতু- এসব উপাদান জীবনকে এতো বহুমুখী তাৎপর্য ও দিক নির্দেশ করে যে, পাশ্চাত্যের মানুষ অতি স্বাভাবিকভাবেই পীড়িত হয় বহু কামনা- বাসনা দ্বারা’ এবং পরিণামে একটি তীব্র আকাঙ্ক্ষার দ্বারা, সে আকাঙ্ক্ষা কেবলমাত্র করার তাগিদেই কাজ করার আকাঙ্ক্ষা। তাকে সবসময়ই সৃষ্টি করতে হবে, নির্মাণ করতে হবে, জয়ী হতে হবে, তার নিজর জীবনের বিভিন্ন রূপের মধ্যে, নিজের অস্তিত্বকে বারবার উপলব্ধি করার জন্য; আর এই নিত্য পরিবর্তনশীল জটিলতা তার সংগীতেও প্রতিফলিত। তরংগিত উদাত্ত পশ্চিমা সংগীতেও ধ্বনি আসে বুকের ভেতর থেকে এবং উদাত্ত সব সময়ই বিভিন্ন তালে ওঠা নামা করতে করতে; এ সংগীতে কথা বলে সেই ‘ফাউস্টীয় প্রকৃতি- যার প্রবাবে পশ্চিমী মানুষেরা অনেক বেশি স্বপ্ন দেখে, অনেক বেশি কামনা করে এবং জয়লাভের ইচ্ছায় অনেক বেশি সংগ্রাম করে- কিন্তু তার সংগে হয়তো ওরা হারায়ও অনেক বেশি এবং তা হারায় বেদনাদায়ভাবে! কারণ, পশ্চিমী মানুষের জগৎ হচ্ছে ইতিহাসের জগৎঃ কেবলি হওয়া, ঘটা আর অতীত হয়ে যাওয়া; এতে শান্ত থাকার প্রশান্তিটুকু নেইঃ সময় হচ্ছে একটি দুশমন- যাকে সবসময়ই দেখতে হবে সন্দেহের নজরে; এবং ‘এখন’ এই কথাটি কখনো বহন করে না চিরন্তনের কোনো ইংগিত…..
পক্ষান্তরে মরুভূমি আর স্তেপ অঞ্চলের আরবকে তার চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য স্বপ্নের মায়াময় জগতে নিয়ে যায় না, এ দৃশ্য তার কাছে দিনের মতোই কঠোর বাস্তব; এতে অনুভুতির আলো-ছায়া খেলার কোনো অবকাশ নেই। বাহির আর ভেতর, আমি আর পৃথিবী তার কাছে বিপরীত এবং পরস্পরবিরোধী কোনা সত্ত্বা নয়, বরং এক অপরিবর্তনীয় বর্তমানেরই বিভিন্ন দিক; গোপন ভয় তার জীবনের উপর প্রভুত্ব করে না এবং যখনই সে কোনো কাজ করে সে তা করে বাহ্য প্রয়োজনে, মানসিক নিরাপত্তার বাসনার তাগিদে নয়। ফলের দিক দিয়ে সে পশ্চিমাদের মতো দ্রুত বৈষয়িক ‘সাফল্য’ হাসিল করতে পারেনি সত্য, কিন্তু সে তার আত্মাকে বাঁচাতে পেরেছে।
…. …. ….. …..
….. ‘কতো কাল’- আমি প্রায় একটা শরীরী চমকের সাথে নিজেকে নিজে সুধাই- জায়েদ আর জায়েদের জাতের লোকেরা, অমন সূক্ষ্মভাবে, অমন নির্দয় কঠোরতার সাথে যে-বিপদ তাদেরকে ঘিরে ফেলছে চারদিক থেকে তার মুকাবিলায় বাঁচাতে পারবে তাদের আত্মাকে? আমরা বাস করছি অমন একটা সময়ে যখন অগ্রসরমান পশ্চিমের মুকাবিলায় আর নিষ্ক্রিয় থাকতে পারবে না প্রাচ্য। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক- হাজারো শক্তি এসে আঘাত করছে মুসলিম জাহানের দরোজায়। মুসলিম জাহান কি অভিভূত হয়ে পড়বে পশ্চিমী বিশ শতকের চাপে এবং এই প্রক্রিয়ায় হারাবে কেবল তার নিজের ঐতিহ্যিক রূপগুলিকে নয়, তার আত্মিক বুনিয়াদকেও?
দুই
মধ্যপ্রাচ্যে আমি যে বছরগুলি কাটিয়েছি ১৯২২ থেকে ১৯২৬ তক, একজন সহানুভূতিশীল বাইরের লোক হিসাবে এবং এরপর থেকে, মুসলিম হিসাবে ইসলামী কওমের আশা- আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্যের অংশীদার রূপে সেই সময়টাতে আমি লক্ষ্য করেছি, কীভাবে ইউরোপীয়রা ধীরে ধীরে অপ্রতিহতভাবে মুসলমানদের তাদ্দুনিক জীবন ও রাজনৈতিক আযাদীকে গ্রাস করে চলেছে; এবং যেখানেই মুসলিম জাতিগুলি এই অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে নিজেদের বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছে, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় সাধারণ জনমমত তাদের প্রতিরোধকে আখ্যায়িত করছে ‘জেনোফোবিয়া বলে, তাদের সরল বিশ্বাস আহত হয়েছে, এই মনোভাব নিয়ে।
মধ্যপ্রাচ্যে যা কিছু ঘটছে তাকে এমনি স্থুলভাবে সরল করে দেখতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ইতিহাসকে কেবলমাত্র ইউরোপের স্বার্থের এলাকা বিচার করতে ইউরোপ বহুকাল ধরে অভ্যস্ত। যদিও পশ্চিমাদের সর্বত্র (বৃটেন ছাড়া) জনমত সব সময়ই প্রচুর সহানুভূতি দেখিয়েছে আইরিশ আযাদী আন্দোলনের প্রতি অথবা (রাশিয়া ও জার্মানীর বাইরে) পোল্যান্ডের জাতীয় জাগরণের প্রতি, তবু মুসলমানদের এরূপ আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের প্রতি সে সহানুভুতি কখনো সম্প্রসারিত হয়নি। পশ্চিমের প্রধান যক্তিই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভাঙন এবং অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা; এবং প্রত্যেকটি সক্রিয় পশ্চিমী হস্তক্ষেপেরই উদ্দেশ্য, এই হস্তক্ষেপের উদ্যোক্তাদের মতে (এবং খালিস নিয়তের ভান করেই তারা এরূপ বলে থাকে), কেবল পশ্চিমের আইনসংগত’ স্বার্থ সংরক্ষণ নয়, স্থানীয় লোকদের নিজেদের প্রগতি সাধনও বটে!
বাইরের প্রত্যেকটি সরাসরি, এমনকি, সদাশয় হস্তক্ষেপও যে একটি দেশের বিকাশকে কেবল বিঘ্নিতই করে, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ের পশ্চিমী জ্ঞানার্থীরা তা বেমালূম ভূলে গিয়ে এ ধরনের দাবিগুলি গিলতে হামেশাই উৎসুক! তারা কেবল দেখে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি দ্বারা তৈরি নতুন রেলপথসমূহ; একটি দেশের সামাজিক কাঠামোর ধ্বংস তাদের নজরে পড়ে না। তারা নতুন বিজলীর কিলোয়াট গোণে, একটি জাতির আত্মগৌরবের উপর যে আঘাত হানা হয় তা গোণে না।
বলকানে অস্ট্রিয়ার হস্তক্ষেপের যুক্তিসংগত অজুহাত হিসাবে অস্ট্রিয়া কর্তৃক বলকানকে ‘সভ্য করার মিশন’ যে- সব লোক কখনো গ্রহণ করবে না, তারাই কিন্তু একই রকমের অজুহাত সাগ্রহে গ্রহণ করে থাকে ব্রিটেনের বেলায় মিসরে, রাশিয়ার বেলায় মধ্য এশিয়ায়, ফ্রান্সের বেলায় মরক্কোতে এবং ইতালীর বেলায় লিবিয়াতে; এবং একথা কখনো তাদের মনে জাগে না যে, মধ্যপ্রাচ্য যে – সব সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যাধিতে ভুগছে তার অনেকগুলিই এই পশ্চিমী স্বার্থের প্রত্যক্ষ পরিনাম; একথাও তাদের মনে জাগে না যে, পশ্চিমী হস্তক্ষেপের অনিবার্য লক্ষ্য হচ্ছে আভ্য্ন্তরীণ যে ভাঙন এরি মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তাকে স্থায়ী এবং প্রশস্ততরো করে তোলা আর এভাবে সংশ্লিষ্ট জাতিগুলির আত্মস্থ হওয়াকে অসম্ভব করে তোলা।
আমি এটা পয়লা অনুভব করতে শুরু করি ১৯২২ সনে, যখনআমি আরব আর জিওনিস্টদের বিরোধের ব্যাপারে ব্রিটিশ শাসকদের দ্বৈত ভূমিকা লক্ষ্য করি। আমার কাছে তা আরো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে উঠলো ১৯২৩ সনের শুরুর দিকে, যখন অনেকগুলি মাস ফিলিস্তিনে ঘুরে ঘুরে কাটানোর পর আমি আসি মিসরে। মিসর তখন প্রায় একটানা বৈপ্লবিক আন্দোলন করে চলেছে ব্রিটিশ প্রটেকটরেটের বিরুদ্ধে। যে- সব প্রকাশ্য জায়গায় ব্রিটিশ সেপাইরা প্রায়ই যেতো সেখানেই নিক্ষেপ করা হতো বোমা- এং তার জবাব দেওয়া হতো নানারকম দমনমূলক পন্হায়- সামরিক শাসন, রাজনৈতিক গ্রেফতারী, নেতাদের নির্বাসন, পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া ইত্যাদির মাধ্যমে। কিন্তু এ ব্যবস্থাগুলি যতো কঠোরই হোক এর কোনটিই জনসাধারণের আযাদী স্পৃহাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। গোটা মিসরীয় জাতির মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছিলো ব্যাকুল নিরুদ্ধ কান্নার ঢেউ-এর মতো একটা কিছু- নৈরাশ্যে নয়, বরং এ ছিলো ব্যগ্র উৎসাহজনিত কান্না, নিজের অন্তর্নিহিত শক্তির মূল আবিস্কারের উত্তেজনায় ক্রন্দন!
সেই দিনগুলিতে কেবলমাত্র ধনী পাশারা, বিশাল বিশাল জমিদারীর যারা ছিলো মালিক, ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তারাই ছিলো আপোসধর্মী। বাকী অগণিত মানুষ, যাদের মধ্যে ছিলো হতভাগা ‘ফেলাহিনে’রা, এক একর জমি যাদের মনে হতো একটা গোটা পরিবারের জন্য আর্শীবাদস্বরূপ এক সম্পদ, তারা সবাই সমর্থন করতো আযাদী আন্দোলনকে। একদিন হয়তো শোনা গেলো, খবরের কাগজের হকারেরা রাস্তায় রাস্তায় চিৎকার করছে- ‘ওয়াফদ পার্টির সকল নেতা মিলিটারী গভর্নর কর্তৃত গ্রেফতার’ কিন্তু পরদিনই, নতুন নেতার দ্বারা পূর্ণ হয়ে যেতো তাদের স্থান- এভাবে আযাদীর ক্ষুধা এবং বিদ্বেষ দুই বাড়তে থাকে। ইউরোপীয়দের এর জন্য একটি মাত্র শব্দই ছিলো- ‘জেনোফেবিয়া’।
সে সময়ে আমার মিসরে আসার মূলে ছিলো একটি ইচ্ছা- আমি ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর জন্য আমার কাঝের পরিসর সম্প্রসারিত করতে চেয়েছিলাম ফিলিস্তিনের বাইরে, অন্যান্য দেশেও। ডোরিয়ান মামার আর্থিক অবস্থা অমন ছিলো না যে তিনি আমার জন্য অত্যুৎসুক তখন তিনি নিজেই অগ্রণী হয়ে আমাকে কিছু আগাম টাকা দিলেন, যাতে আমার জেরুজালেম থেকে কায়রো যাওয়া- আসার রেলের ভাড়া এবং সেখানে পনেরো দিন থাকার খরচ কোনো রকমে চলে।
কায়রোতে আমি থাকবার জায়গা পেলাম একটি চিপা গলিতে, যেখানে প্রধানত আরব হস্তশিল্পী ও গ্রীক দোকানদাররাই বাস করতো। আমার বাড়ির মালিক ছিলেন ত্রিয়েস্তিনের এক বৃদ্ধা, দীর্ঘংগী, ভারিক্কি, এলোমেলো, শুভ্রকেশী। তিনি সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত কড়া গ্রীক শরাব গলায় ঢালতেন এবং এক মেজাজ থেকে আরেক মেজাজে হোঁচট খেয়ে পড়তেন। তাঁর মেজাজ ছিলো খুবই উগ্র আর তীব্র, যা কখনো তার নিজ স্বরূপ বুঝতো বলে মনে হয় না। কিন্তু তিনি আমার প্রতি ছিলেন বন্ধুভাবাপন্না, আর তাঁর উপস্থিতিতে আমার ভালোই লাগতো।
প্রায় এক হপ্তা পরে আমার হাতের নগদ টাকা প্রায় ফুরিয়ে এলো। আমার ইচ্ছা ছিলো না যে আমি অতো তাড়াতাড়ি ফিলিস্তনে আমার মামার বাড়ির নিরাপত্তায় ফিরে যাই। তাই আমি আমার রুজির অন্য উপায় খুঁজতে শুরু করি।
আমার জেরুজালেমের বন্ধু ডঃ দ্যা হা’ন কায়রোর এক ব্যবসায়ীর নিকট একটি চিঠি দিয়েছিলেন আমার পরিচয় দিয়ে। আমি তাঁর কাছেই গেলাম পরামর্শের জন্য। তিনি হল্যাণ্ডের লোক; দেখলাম, তিনি খুবই উদার আর সহৃদয়, আর তাঁর নিজের কর্মক্ষেত্র অতিক্রম করে বহু দূর বিস্তৃত তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ঔৎসুক্য ও আকর্ষণ। ইয়াকব দ্যা হা’নের চিঠি থেকে তিনি জানতে পারলেন যে, আমি ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর একজন সংবাদদাতা। তাঁর অনুরোধে আমি যখন তাঁকে হালে ছাপা আমার কয়েকটি প্রবন্ধ দেখালাম, বিস্ময়ে তাঁর চোখের ভুরু একেবারে কপালে উঠে গেলোঃ
-‘বলুন, আপনার বয়স কতো?’
-‘বাইশ বছর’।
-‘তাহলে মেহেরবানী করে আমাকে অন্য কথা বলুন। এই প্রবন্ধগুলি দিয়ে আপনাকে কে সাহায্য করেছে?- দ্যা হা’ন?’
আমি হাসলাম- ‘অবশ্যি নয়, আমি নিজেই লিখেছি! আমি আমার কাজে হামেশা নিজেই করি। কিন্তু আপনি সন্দেহ করছেন কেন?’
তিনি তাঁর মাথা নাড়েন যেনো বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে- ‘কিন্তু খুবই তাজ্জব মনে হচ্ছে… এ ধরনের প্রবন্ধ লেখার পরিপক্কতা আপনি কোত্থেকে পেলেন? আপনি কেমন করে অর্ধেক একটি বাক্যে, যে- সব ব্যাপার অতো সাধারণ বলে মনে হয়, তাতেও প্রায় মরমী এক তাৎপর্য দান করেন?’
এর মধ্যে যে শ্রদ্ধা লুকানো ছিলো তাতে আমি অতোটা গৌরববোধ করি যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ফলে, আমার আত্মমর্যাদাবোধ বেড়ে গেলো অনেক। আমার এই নতুন পরিচিত দোস্তের সাথে আলোচনায় বোঝা গেলো, তাঁর নিজের ব্যবসায়ে কর্ম- সংস্থানের কোনো সুযোগ নেই; কিন্তু তিনি মনে করেন, তিনি হয়তো একটি মিসরীয় ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে আমাকে একটি কাজ যোগাড় করে দিতে পারেন- যে প্রতিষ্ঠানটির সংগে রয়েছে তাঁর নিজের লেনদেন।
তিনি আমাকে যে অফিসটি দেখিয়ে দিলেন সেটি ছিলো কায়রোর এক প্রাচীনতরো মহল্লায়। আমার বাসা থেকে তা খুব দূরে ছিলো নাঃ একটি চিপা গলি- যার দু’পাশে রয়েছে এককালের অভিজাত বাড়িঘর; এখন যা অফিস আর সস্তা এপার্টমেন্টে রূপান্তরিত। আমার ভাবী মুনিব একজন বয়স্ক, টেকো, মিসরীয় ব্যবসায়ী, যার মুখখানা সময়ে-পাকা এক শকুনেরই মুখের মতো। তাঁর একজন পার্ট- টাইম কেরানী দরকার, তাঁর হয়ে ফরাসী ভাষায় চিঠি- পত্রের আদান- প্রদানের জন্য। আমি তাঁকে এ বিষয়ে সন্তুষ্ট করতে পারলাম যে, এ দায়িত্ব পালন আমি করতে পারবো, যদিও ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা আমার একদম নেই। আমাকে মাত্র তিন ঘণ্টা কাজ করতে হবে। সে অনুপাতে মাইনেও কম, কিন্তু এ মাইনেও আমার বাড়িভাড়া চুকানো আর অনির্দিষ্টকাল আমাকে রুটি, দুধি ও জলপাই-এ তৃপ্ত রাখার জন্য ছিলো যথেষ্ট।
আমার বাসা আর অফিসের মধ্যেই পড়ে কায়রোর বারাংগনা পল্লী। এলাকাটি হচ্ছে একটি জটিল গোলক- ধাঁধাঁ বিশেষ, যেখানে অভিজাত আর নীচ বারাংগনারা কাটায় তাদের দিন আর রাত। বিকালে আমি যখন কাজে যাই অলিগলিগুলি দেখি শূণ্য, নীরব। ঘুলঘুলি দেয়া জানালায় ছায়ায় কোনো নারী হয়তো তার দেহ ছড়িয়ে দিতো আলসভরে; এ-বাড়ি না হয় ও-বাড়ির সম্মুখে, ছোটো ছোটো টেবিলের পাশে বসে গম্ভীর মুখে, দাড়িওয়ালা লোকদের সাথে, শান্তভাবে কফি পান করে বালিকারা, আর তারা আর দৈহিক মত্ততা থেকে অনেক দূরের বলে মনে হতো।
কিন্তু সন্ধ্যায় যখন আমি ঘরে ফিরে আসি তখন দেখতে পাই মহল্লাটি অন্য যে- কোনো মহল্লা অপেক্ষা অধিকতরো প্রাণবন্ত। আরবীয় বাঁশির নরম মোলায়েম সুর এবং ঢোল ও নারীর হাসিতে গুঞ্জন উঠেছে মহল্লাটিতে। বহু বিজলী বাতি আর রঙিন লণ্ঠনের আলোর নিচ দিয়ে যখন আপনি হাঁটছেন, প্রতি পদক্ষেপেই একটি মোলায়েম বাহু জড়িয়ে ধরবে আপনার গলায়, বাহুটি হতে পারে বাদামী অথবা সাদা- কিন্তু সব সময়ই তা সোনা ও রূপার চেন আর চুড়িতে ঝনঝন করবে এবং সবসময়ই তাতে পাওয়া যাবে মেশক, গুগগুল ও উষ্ণ জন্তু-ত্বকের গন্ধ। আপনাকে খুবই দৃঢ় থাকতে হবে- নিজেকে এই সব সহাস্য আলিংগন এবং ‘ইয়া হাবিবী’ ‘হে আমার প্রিয় সাআদাতাক’, ‘সুখী হও তুমি’- এই সব আহবান থেকে মুক্ত রাখতে। আপনাকে পথ করে যেতে হবে স্পন্দিত অংগ-প্রত্যংগের মধ্য দিয়ে, যার অধিকাংশই সরল, সুন্দর এবং ইংগিতপূর্ণ দেহ-ভাজ দ্বারা আপনাকে মাতিয়ে দেয়। গোটা মিসর যেন ভেঙে পড়ছে আপনার উপর, ভেঙে পড়ছে মরক্কো, আলজিরিয়া, ভেঙে পড়ছে সুদান, নুবিয়া, ভেঙে পড়ছে আরব, আর্মেনিয়া, সিরিয়া, ইরান- গৃহের দেয়ালের সাথে লম্বালম্বি করে রাখা বেঞ্চির উপর পাশাপাশি বসেছে লম্বা, রেশমী জামা-কাপড় পরা লোকেরা- হর্ষে উৎফুল্লা… হাসছে, মেয়েদের ডাকছে, অথবা নীরবে নারকেলের হুকা টানছে। ওরা সকলেই কিন্তু এখানকার ‘খদ্দের’ নয়… অনেকেই এসেছে, এই মহল্লার গতানুগতিকতামুক্ত হর্ষোৎফুল্ল আবহাওয়ায় দু-একটা ঘণ্টা কাটাতে… কখনো বা আপনাকে পিছিয়ে যেতে হ্চেছ সুদানের ছেঁড়া-জীর্ণ কাপড় পরা দরবেশের সমুখ হতে, যিনি ভিক্ষা চেয়ে গান গাইছেন আবিষ্ট মুখে, অনড় দু’হাত বাড়িয়ে। সুগন্ধি বিক্রেতা হকারের দোলায়মান ধুনচি থেকে ওঠা ধুপের ধোঁয়া, কুণ্ডলী-পাকানো মেঘের আকারে আপনার মুখকে বুরুশ করে দিচ্ছে! প্রায়ই আপনি শুনতে পাচ্ছেন মিলিত কণ্টে গান এবং আপনি বুঝতে শুরু করবেন শোঁ শোঁ করা, মোলায়েম আরবী ধ্বনিগুলির কোন কোনটির অর্থ। …. এবং ঘুরে ফিরে আপনি শুনতে পাচ্ছেন কোমল, কল- কল্লোলের মতো, সুখের উক্তি… ঔসব বালিকার জান্তব সুখ (কারণ ওরা সন্দেহাতীতভাবেই উপভোগ করছিলো নিজেদেরকে), যাদের পরনে রয়েছে হালকা-নীল, হলদে, লাল, সবুজ, সাদা, ঝিলিক-মারা সোনালি পোশাক, মিহি রেশমী, সূক্ষ্ম জালি জালি করে বোনা পাতলা টিউল, ভয়েল অথবা বুটিদার কাপড় তৈরি- আর ওদের হাসি যেন নূড়ি বিছানো ফুটপাতের উপর দিয়ে বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পদক্ষেপে ছুটে চলেছে- এই উচ্ছাসিত, এই নিম্নগামী এবং পরমহূর্তেই আবার স্ফূরিত হচ্ছে অন্যদের ওষ্ঠ থেকে…।
এই মিসরীয়রা- কী করে ওদের পক্ষে সম্ভব হতো এই হাসি? কী আনন্দ আর ফুর্তির সংগেই না ওরা, দিন নেই রাত নেই, চলতো কায়রোর পথে পথে, দুলনী চালে, লম্বা লম্বা ধাপে পা ফেলতে ফেলতে, ওদের দীর্ঘ শার্টের মতো ‘গাল্লাবিয়া’ গায় দিয়ে, যাতে থাকতো ডোরা, রংধনুর প্রত্যেকটি রঙের- চলতো ওরা লঘু চিত্তে, মুক্ত মনে, যাতে করে মনে হতো, মানুষের জীবনকে চূর্ণ করা দারিদ্র্য, অসন্তোষ আর রাজনৈতিক বিক্ষোভ, এ সমস্তকে মানুষ গুরুত্ব দেয় কেবলি আপেক্ষিক অর্থে। এই মানুষগুলির প্রচণ্ড বিস্ফোরণমুখী উত্তেজনায় সবসময়ই, দৃষ্টিগ্রাহ্য কোন ভাবান্তর ছাড়াই অবকাশ থাকতো। পরিপূর্ণ শান্তি, এমনকি আলস্যৈর যেন কিছুই কখনো ঘটেনি এবং কিছুই খোয়া যায়নি। এজন্য অধিকাংশ ইউরোপীয়রা মনে করতো (এবং হয়তো এখনো মনে করে) আরবরা মানুষ হিসাবে লঘু, ভাসাভাসা! কিন্তু প্রথমদিকে, সেই দিনগুলিতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম- আরবদের প্রতি পশ্চিমের এই তাচ্ছিল্যের মূলে রয়েছে যে- সব আবেগ ‘গভীর’ প্রতীয়মান হয় সেগুলিকে অতি-গুরত্বি দেয়ার প্রবণতা এবং যা-কিছু ‘লঘু’ ভাসাভাসা, যা কিছু হাল্কা, বায়বীয় এবং নির্ভার তাকেই নিন্দা করার প্রবণাত। আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে সব মানসিক দ্বন্দ্ব সংঘাত ও চাপ পশ্চিমের বৈশিষ্ট্য আরবরা মুক্ত রয়েছে সেগুলি থেকে। কাজেই আমাদের মাপকাঠি আমরা ওদের বেলায় কী করে ব্যবহার করতে পারি?ওদের যদি ‘লঘু’ ভাসাভাসাই মনে হয়, তারো কারণ হয়তো এই যে, ওদের আবেগগুলি দ্বন্দ্ব- সংঘাতের মুকাবিলা না করেই স্বচ্ছন্দে প্রবাহিত হয় ওদের আচরণের মধ্যে। হয়তো ‘পশ্চিমীকরণের’ চাপে ওরাও ধীরে ধীরে বাস্তবের সাথে সাক্ষাৎ যোগাযোগের এই স্বাভাবগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বসবে। কারণ, ঐ পশ্চিমী প্রভাব নানাভাবে সমকালীন আরব চিন্তার ক্ষেত্রে একটা উদ্দীপক ও ফলপ্রসূ নিমিত্ত হওয়া সত্ত্বেও অনিবার্যভাবেই তা আরবদের মধ্যে সেই সব মারাত্মক সমস্যাই সৃষ্টি করে যার দ্বারা পশ্চিমের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবন পীড়িত, বিড়ম্বিত।
….. ….. ….. …..
আমার ঘরের ঠিক বিপরীতদিকেই- এবং অতো নিকটে যে আমি হাত বাড়িয়ে প্রায় নাগাল পেতে পারি- দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা মসজিদ, যার রয়েছে সরু একটি মিনার, যে মিনার থেকে রোজ পাঁচবার সালাতের জন্য দেয়া হয় আযান। সাদা পাগড়ি পরা একজন লোক মিনারে চড়ে দু’হাত তুলে সুর করে গায়- আল্লাহু- আকবার’ – আল্লাহ মহান, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর রাসূল… এ যখন ধীরে ধীরে চারদিকে মুখ ফেরায় তার কণ্ঠের ধ্বনি উঠতে থাকে উর্ধ্ব দিকে, পরিষ্কার হাওয়ায় তা বুলন্দ হয়ে ওঠে, আরবী ভাষায়- গলা থেকে- আসা গভীর শব্দগুলির উপর দোল খেতে খেতে, আন্দোলিত হয়ে, কখনো আগিয়ে কখনো পিছিয়ে। ওর গলার স্বর গাঢ় উদাত্ত, মোলায়েমএবং দৃঢ়- যার মধ্যে অবকাশ রয়েছে অনেক ওঠা- নামার। কিন্তু আমি বুঝতে পারি, তপ্ত আবেগই কণ্ঠস্বরকে করেছে সুন্দর, বলার চাতর্য নয়!
-‘মুয়াজ্জিন’- এর এই সুর ছিলো কায়রোতে আমার দিবস ও সন্ধ্যার মূল সংগীত- ঠিক যেমন তা আমার জন্য মূল সংগীত ছিলো প্রাচীন জেরুজালেম নগরীতে এবং পরবর্তিকালেও মুসলিম দেশগুলিতে তা-ই আমার প্রত্যেকটি সফরকালে বিদ্যমান ছিলো আমার একমাত্র সংগীতরূপে। উপভাষার পার্থক্য এবং লোক- সমাজের রোজকার কথাবার্তার উচ্চারণের যে বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা সত্ত্বেও আযান ঘোষিত হয় সর্বত্রঃ শব্দের এই ঐক্য থেকে, আমি আমার কায়রোর সেই দিনগুলিতেই উপলব্ধি করি, সকল মুসলমানের মধ্যে অন্তরের ঐক্য কতো গভীর এবং তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের যে রেখা রয়েছে তা কতো কৃত্রিম আর অর্থহীন। ওদের চিন্তার পদ্ধতি একই, ভাল-মন্দ সৎ-অসতের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের বেলায় সকল মুসলমানই এক এবং মহৎ জীবনের উপাদানগুলি সম্পর্কে ওদের ধারণাও অভিন্ন।
এই প্রথমবারের মতো আমার মনে হলো আমি অমন একটি জনগোষ্ঠির দেখা পেয়েছি যেখানে মানুষে মানুষে আত্মীয়তা, দৈবক্রমে একই রক্ত- বংশজাত হওয়ার উপর বা অর্থনৈতিক স্বার্থভিত্তিক নয়- বরং তার ভিত্তি অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি স্থায়ী কিছু। এ আত্মীয়তার উৎস একই দৃষ্টিভংগি, যে দৃষ্টিভংগি মানুষে মানুষে নিঃসংগতাস্বরূত যতো রকম প্রতিবন্ধক রয়েছে সমস্ত কিছুকেই করে উন্মুলিত।
১৯২৩ সনের গ্রীষ্মে মধ্যপ্রাচ্যের জীবন ও রাজনীতি সম্পর্কে একটি স্বচ্ছতরো দৃষ্টিভংগিতে সমৃদ্ধ হয়ে আমি ফিরে আসি জেরুজালেমে।
আমার বন্ধু ইয়াকব দ্য হানের সহায়তায় পাশ্ববর্তী এলাকা ট্রানসজর্ডানের আমীর আবদুল্লাহর সাথে আমি পরিচিত হই। তিনি আমাকে দাওয়াত করেন তাঁর মুলুকে। এখানেই আমি পয়লা দেখলাম একটা খাঁটি বেদুঈন দেশ। রাজধানী আম্মান, টলেমিআস ফিলাডেলফাস কর্তৃক নির্মিত গ্রীক উপনিবেশ ফিলাডেলফিয়ার ধ্বংসাবশেষের উপর তৈরি একটি ছোট শহর ছিলো তখন। লোক সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি ছিলো না। রাস্তাঘাটগুলি ভর্তি বেদুঈনদের দ্বারা, খোলা স্তেপ অঞ্চলের খাঁটি বেদুঈন!, যাদের ক্বচি* দেখা যায় ফিলিস্তিনে- স্বাধীন যোদ্ধা আর উটপালক বেদুঈন! সার্কসিয়ান গরুর গাড়িগুলি (কারণ, শহরটি প্রথম আবাদ করেছিলো সার্কাসিয়ানরা; ওরা উনিশ শতকে ওদের স্বদেশ রাশিয়ানরা দখল করে নিলে এদেশে চলে এসে এখানে বসতি স্থাপন করে) আস্তে আস্তে কষ্টে- সৃষ্টে চলতো বাজারের মধ্য দিয়ে। বাজারটি আকারে বড় হলেও এতে যে হট্টগোল ও উত্তেজনা দেখা যেতো তা অনেক বেশি বড়ো এক নগরীকেই মানায়।
শহরে দালান-কোঠা খুব বেশি ছিলো না; তাই আমীর আবদুল্লাহ তখন বাস করছিলেন পাহাড়ের উপর এক তাঁবু খাটানো ক্যাম্পে; পাহাড়টি যেনো উপর দিক হতে তাকিয়ে আছে নিচে, আম্মানের দিকে। তাঁর তাঁবুটি ছিলো অন্যান্য তাঁবুর চেয়ে কিছুটা বড়ো; তার মধ্যে ছিলো ক্যানভাসের পার্টিশন দেয়া কয়েকটি কোঠা; চূড়ান্ত সরলতায় তাঁবুটি আলাদা ছিল অন্য সকল তাঁবু থেকে। এরি একটি কোঠায়, এক কোণে জমিনের উপর কালো ভালুকের চামড়া বিছিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিছানা। অভ্যর্থনা কোঠায়, কেউ যখন গালিচার উপর বসতো তখন তার বাহুদ্বয় রাখার জন্য সেখানে ছিলো রূপার কাজ-করা অগ্রভাগ বিশিষ্ট এক জোড়া সুন্দর উটের জীন।
আমীরে’র প্রধান পরামর্শদাতা ডঃ রিজা তওফিক বে’র করে যখন আমি তাঁবুতে ঢুকলাম, তখন কেবল একজন নিগ্রোই ছিলো সেখানে, যার পরনে ছিলো জমকালো ব্রোকেডের জামা-কাপড় আর কোমরে একটি সোনার ছুরি। রিজা তওফির বে’ ছিলেন একজন তুর্কী, আগে ছিলেন এক বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক,আর কামাল আতাতুর্কের আগে, তিন বছরের জন্য ছিলেন তুর্কী মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। তিনি আমাকে বললেন, আমীর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরবেন। এই মুহূর্তে তিনি কয়েকজন বেদুঈন সর্দারের সাথে আলাপ করছেন দক্ষিণ ট্রান্সজর্ডানে সর্বশেষ নযদী হানা নিয়ে। ঐ সব নযদী ওয়াহাবীরা, ডঃ রিজা আমাকে বোঝালেন, ইসলামের অভ্যন্তরে অমন একটি ভূমিকা গ্রহণ করেছে যা খৃশ্চান জগতের গোঁড়া সংস্কারপন্হীদের থেকে আলাদা নয়, কারণ ওরা পীর-দরবেশের পূজার ঘোর বিরোধী, বহুশতকের পরিক্রমায় যে-সব মরমী কুসংস্কার ইসলামের ভেতরে ঢুকে পড়েছে সেগুলিরও ঘোর বিরোধী। তা’ছাড়া, ওরা শরীফী খান্দানেরও আপোসহীন দুশমন, যে-খান্দানের প্রধান হচ্ছে ‘আমীরে’র পিতা, হিজাজের বাদশাহ হোসাইন। রিজা তওফিক বে’র মতে, ওয়াহাবীদের ধর্মীয় মতামত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা যায় না; আসলে, ওদের মতামত, অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের জনসাধারণের মধ্যে যে-সব ধারণা রয়েছে তার চেয়ে আল কুরআনের মর্মের অনেক কাছাকাছি। আর তা ইসলামের সাংস্কৃতিক বিকাশের উপর বিস্তার করতে পারে এক কল্যাণকর প্রভাব। অবশ্য ওদের অতিশয় গোড়ামি অন্যান্য মুসলমানের পক্ষে ওয়াহাবী আন্দোলনকে পুরাপুরি বোঝা কিছুটা কঠিন করে তুলেছে; আর এই ক্রটি, তিনি বলেন, কোন কোন বিশেষ মহলে হয়তো অনভিপ্রেত নয়, যারা আরব জাতিগুলির সম্ভাব্য পূনর্মিলনকে এক ভয়ংকর বিপদের সম্ভাবনা বলে গন্য করে।
কিছুক্ষণ পর ‘আমীর এসে ঢুকলেন। চল্লিশের মতো বয়স- মাঝারী আকৃতি, ছোট সোনালী রঙের দাড়ি, কালো প্যাটেন্ট চামড়ার চটি পায়ে, মৃদু পদক্ষেপে, সাদা ঝকঝকে রেশমের ঢিলা আরবী পোশাকে- যার উপরে রয়েছে প্রায় স্বচ্ছ সাদা সূতী ‘আবায়া। তিনি বলেনঃ
-‘আহলান ওয়া সাহলান’- ‘এ আপনারই ঘর, সহজ হোন’, এই প্রথম আমি শুনলাম- এই সুন্দর আরবী অভিবাদন!
আমীর আব্দুল্লাহর ব্যক্তিত্বের মধ্যে অমন কিছু রয়েছে যা আকর্ষণীয়, যা প্রায় বলপুর্বক জয় করে নেয় মানুষকে- আর সে জিনিস হচ্ছে তাঁর প্রগাঢ় রসবোধ, তাঁর আবেগ- তৃপ্ত কথাবার্তা আর তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। সে সময় যে তিনি কী জন্য তাঁর লোকজনের কাছে অতো জনপ্রিয় ছিলেন তা বুঝতে কষ্ট হয় না। অবশ্য তিনি তুর্কীদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশের প্ররোচিত শরীফীয় বিদ্রোহে যে ভূমিকা গ্রহণ করেন তার জন্য বহু আরব খুশি ছিলো না। ওরা তাঁর এই ভূমিকাকে মুসলিমের প্রতি মুসলিমের বিশ্বাসঘাতকতা বলেই মনে করতো। তা সত্ত্বেও জিওনিজমের বিরুদ্ধে আরবদের স্বার্থ রক্ষার নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য তিনি বেশ কিছুটা মর্যাদা হাসিল করেন। সেদিন তখনো আসেনি যখন তার রাজনীতির পাকচক্র তাঁর নামকে গোটা আরব জাহানে করে তুলবে ঘৃণ্য।
হাবশী পরিচালক, ছোট ছোট যে পেয়ালায় আমাকের কফি পরিবেশন করলো,এ থেকে চুমুক দিয়ে কফি খেতে খেতে আমরা কথা বলছিলাম। মাঝে মাঝে আমাদের সাহায্য করছিলেন ডঃ রিজা, তিনি চমৎকার ফরাসী বলতেন। আমরা কথা বলছিলাম এই নতুন দেশ ট্রান্সজর্ডানের শাসন বিষয়ক অসুবিধাগুলি নিয়ে। ওখানে প্রত্যেক ব্যক্তিই অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করে এবং কেবল নিজের কবিলার আইন-কানুন মানতেই সে অভ্যস্ত।– ‘কিন্তু, ‘আমীর বললেন, ‘আরবদের কাণ্ডজ্ঞান চমৎকার। বেদুঈনরা পর্যন্ত বুঝতে শুরু করেছে- বিদেশী প্রভুত্ব থেকে মুক্ত হতে হলে, ওদের পুরানো যেমন- খুশি চলার অভ্যাস অবশ্যি বর্জন করতে হবে। বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে যেসব ঝগড়া-ফাসাদের কথা আপনি নিশ্চয় শুনে থাকবেন সেগুলি এখন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।
এরপর তিনি অসংযত চঞ্চল বেদুঈনদের বর্ণনা করে চলেনঃ ওরা সামান্যতম উসিলায়ই নিজেদের মধ্যে লড়াই করে থাকে। ওদের খান্দানগত শক্রতা প্রায়ই বহু পুরুষ ধরে চলতে থাকে এবং কখনো কখনো তা পিতা থেকে পায় পুত্র, এমনকি শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে- যার ফলে চলতে থাকে নিত্যনতুন খুনজারি, রক্তপাত এবং নবতরো তিক্ততা, আদি কারণটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেও। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ মাত্র একটিই আছে; পূর্বতর নিহত ব্যক্তিটির গোত্র ও কবিলার কোন জোয়অন যদি অপরাধীর গোত্র ও কবিলার কোন কুমারীকে অপহরণ করে এবং তাকে বিয়ে করে, তাহলে বিয়ের রাতের রক্ত- যা খুনীর কবিলার রুক্ত- প্রতীক- রূপে এবং চূড়ান্তভাবে, হত্যার সময় যে রক্তপাত করা হয়েছিলো তারই প্রতিশোধরূপে গণ্য হয়। মাঝে মাঝে দেখা যায়, বহু পুরুষ ধরে বিদ্যমান শক্রতায় উভয় গোত্রের লোকেরাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কারণ তাতে উভয় দলেরই শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। এমন সব ক্ষেত্রে প্রায়ই তৃতীয় গোত্রের কোন ঘটক কর্তৃক অপহরণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।
-‘আমি এর চাইতেও ভালো করেছি’, আমীর আমাকে বললেন, ‘আমি যথার্থ খান্দানী শক্রতা কমিশন’ গঠন করেছি; এই কমিশন বিশ্বস্ত লোকদের নিয়ে গঠিত। ওরা সারা দেশে ঘুরে বেড়ায় এবং বিবাদমান গোত্রগুলির মধ্যে এই ধরনের প্রতীকী অপহরণ ও বিয়ের ব্যবস্থা করে থাকে। ‘কিন্তু’, বলতে তাঁর চোখ ঝিলিক দিয়ে ওঠে- ‘আমি সবসময় কমিশনের সদস্যদের বোঝাবার চেষ্টা করি’- যেন তারা কুমারীদের নির্বাচন করতে গিয়ে হুশিয়ারির সাথে কাজ করে- কারণ, আমি চাই না যে, বরের সম্ভাব্য হতাশার কারণে আবার পরিবারের ‘ভেতরেই শক্রতা সৃষ্টি হোক’।,,,,
দরমের আড়াল থেকে বার হয়ে একটি বালক, বারো বছরের মতো ওর বয়স। সন্ধ্যার আঁধার নামা তাঁবুর কামরার ভেতর দিয়ে ও ছুটে যায় ক্ষিপ্রগতিতে, নিঃশব্দ পদক্ষেপে, আর তাঁবুর বাইরে রাখা একটা ঘোড়ার পিঠে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে, রেকাবে পা না রেখেই; একটি নওকর, ঘোড়াটিকে ধরে দাঁড়িয়েছিলো- ওরি জন্য প্রস্তুত ছিলো ঘোড়াটি; ছেলেটি আর কেউ নয়, ‘আমীরের বড়ো ছেলে তালা; তার হালকা দেহে, ঘোড়ার পিঠি একলাফে তার আরোহণে, তার উজ্জ্বল চাহনিতে আবার আমি লক্ষ্য করলাম সেই জিনিসঃ নিজের জীবনের সাথে স্বপ্নমুক্ত বাস্তব যোগ, যা আমি ইউরোপে যা- কিছু জানবার সুযোগ পেয়েছিলাম তার সব কিছু থেকেই আরবকে স্থাপন করেছে অত দূর ব্যবধানে!
তাঁর ছেলের প্রতি আমার এই সুস্পষ্ট সপ্রশংসা দৃষ্টি লক্ষ্য করে ‘আমীর’ বললেন- ‘অন্য প্রত্যেকটি আরব শিশুর মতোই সে বেড়ে উঠেছে কেবল একটিমাত্র চিন্তা মনে নিয়েঃ মুক্তি, আযাদী।‘ আমরা আরবরা মনে করি না যে, আমাদের কোন ক্রটি নেই অথবা আমরা ভূল থেকে মুক্ত। তবে আমরা আমাদের ভূলগুলি নিজেরাই করতে চাই এবং এভাবে শিখতে চাই- কেমন করে এই ভূলগুলি থেকে বাঁচা যায়। ঠিক যেমন একটি গাছ বাড়তে বাড়তেই জানে কেমন করে বাড়তে হয়; কিংবা একটি স্রোত চলতে চলতে খুঁজে পায় ওর নিজের সঠিক চলার পথ। সে সব লোকের নিজেদের কোন প্রজ্ঞা নেই- যাদের আছে কেবল ক্ষমতা আর বন্দুক আর অর্থবিত্ত, যারা জানে কেবল সেইসব বন্ধুদের হারাতে যাদেরকে ওরা সহজেই রাখতে পারতো নিজেদের বন্ধুরূপে- আমরা চাই না যে, তারা আমাদেরকে প্রজ্ঞার পথ দেখাক! [সে সময়ে (১৯২৩) কেউই আঁচ করেনি যে, পরবর্তীকালে আমীর আবদুল্লাহ এবং তাঁর পুত্র তালালের সম্পর্ককে নষ্ট করে দেবে তীব্র বিরোধীতা- পুত্র ঘেন্ন করছেন আরব জগতে ব্রিটিশ নীতির প্রতি তাঁর পিতার আপস মনোভাবকে এংব পিতা তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ করছেন তাঁর তীব্র স্পষ্ট ভাষণের বিরুদ্ধে। তখন কিংবা পরে তালালের মধ্যে কখনো আমি দেখিনি- কোন মানসিক ব্যাধির লক্ষণ, যে ওজুহাত তাঁকে ১৯৫২ সনে বাধ্য করা হয় জর্ডানের তখত ত্যাগ করতে।]
অনির্দিষ্টকালের জন্য ফিলিস্তিনে থাকার ইচ্ছা আমার ছিলো না। ইয়াকব দ্য হা’ন আবার ছুটে এলেন আমার সাহায্যে। সাংবাদিক হিসাবে তাঁর খ্যাতি ছিলো সুপ্রতিষ্ঠিত এবং ইউরোপের সর্বত্র নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে ছিলো তাঁর সম্পর্ক। তাঁর সুপারিশের ফলে আমি দুটি ছোট খবরের কাগজের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে সক্ষম হই ধারাবাহিকভাবে কতকগুলি প্রবন্ধ লেখার জন্য; কাগজ দু’টির একটি ইংল্যান্ডের, অপরটি সুইজারল্যান্ডের। চুক্তি হলোঃ কাগজ দুটি আমার পারিশ্রমিক পরিশোধ করবে ডাচ গিল্ডারে এবং সুইস ফ্রাঁ-তে। কাগজগুলি ছিলো প্রাদেশিক ধরনের আর এদের খুব বেশি মর্যাদাও ছিলো না। মোটা মাইনা দেবার ক্ষমতা ওদের ছিলো না। কিন্তু আমার চালচলন সরল হওয়ায় ওদের কাছ থেকে আমি যে অর্থ পেলাম তাই আমার পরিকল্পিত মধ্যপ্রাচ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত সফরের খরচের জন্য যথেষ্ট মনে হলো।
আমার ইচ্ছা ছিলো- প্রথমে আমি যাই সিরিয়ায়। কিন্তু ফরাসী কর্তৃপক্ষ, যারা সবেমাত্র এক শক্রভাবাপন্ন জনতার মাঝখানে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে, অষ্ট্রিয়ার একজন প্রাক্তন বিদেশী শক্র-সৈন্যকে প্রবেশ পত্র দিতে রাজী ছিলো না। এ আঘাত ছিলো নিষ্ঠুর; কিন্তু এ ব্যাপারে আমার করবার কিছুই ছিলো না। তাই আমি স্থির করলাম- আমি হাইফা যাবো এবং সেকানে গিয়ে জাহাজে উঠবো ইস্তাম্বুলের পথে। বলাবাহুল্য এ-ও ছিলো আমার পরিকল্পনার অন্তর্গত।
জেরুযালেম থেকে হাইফা যাওয়ার ট্রেনে সফরে আমি এক মুসিবতে পড়ি।আমার একটা কোট পথে হারিয়ে যায়, যার মধ্যে ছিলো আমার ছাড়পত্র আর একটি ছোট্ট থলে। আমার কাছে রইলো কেবল কটি রূপার মুদ্রা আমার প্যান্টের পকেটে। কাজেই এখনকার মতো আমার ইস্তাম্বুল যাওয়ার কোন প্রশ্নইওঠে নাঃ পাসপোর্ট নেই, টাকাও নেই। বাসে করে জেরুযালেম ফেরা ছাড়া আমার আর কোন গতি রইলো না। ভাড়া পরিশোধ করতে হবে সেখানে পৌঁছুনোর পর, বরাবরকার মতোই, ডোরিয়ান মামার কাছ থেকে ধার করে। জেরুযালেম আমাকে অপেক্ষা করতে হবে কয়েক সপ্তাহ, কায়রোর অস্ট্রীয় কনসুলেট থেকে একটি ছাড়পত্রের জন্য (কারণ, তখন ফিলিস্তিনে কোন কনসুলেট ছিলো না) এবং হল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড থেকে আরো কিছু অর্থের জন্য।
এমনি করে পরদিন সকালবেলা আমি গিয়ে হাজির হই হাইফার প্রান্তে, একটি বাস- অফিসে। ভাড়া সম্পর্কে কথাবার্তা শেষ করে নিলাম। বাস ছাড়ার তখনো এক ঘন্টা বাকি। সময় কাটানোর জন্য আমি রাস্তায় পায়চারি শুরু করি, কখনো সামনে, কখনো পেছনে ফিরে আসি; নিজের প্রতি আমার অপরিসীম বিরক্তি- বিরক্তি আমার ভাগ্যকে নিয়ে যা আমাকে বাধ্য করছে জীবন সংগ্রামে অমন হীনভাব পিছু হটতে। ইস্তেজারি সবসময়ই অপ্রীতিকর- এবং জেরুজালেম প্রত্যার্তনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, আমার এই চিন্তা, এই পরাজয়বোধ ছিলো সবচাইতে তিক্ত, বেশি করে আরো এ কারণে যে, এরূপ সামান্য টাকা-পয়সা নিয়ে আমি আমার পরিকল্পনা কার্যকরী করতে পারবো কি-না, এ সম্বন্ধে ডোরিয়ান ছিলেন হামেশাই সন্দিহান। তাছাড়া আমি সিরিয়া সফর করতে পারবো না এবং আল্লাহই জানেন, আবার কখনো আমি আসতে পারবো কি-না পৃথিবীর এই এলাকায়। এ সম্ভাবনা অবশ্যি ছিলো যে, পরবর্তী কোন সময় ‘ফ্লাঙ্কফুর্টার শাইটুঙ’ মধ্যপ্রাচ্যে আমার আরেকটি সফরের খরচ বহন করতে পারে এবং ফরাসী সরকারও পারে কোন একদিন প্রাক্তন-শক্র বিদেশীদের উপর থেকে তাদের বাধা-নিষেধ তুলে নিতে। কিন্তু তা নিশ্চিত ছিলো না এবং ইত্যবসরে দামেশক সফরের সৌভাগ্য আমার এবার আর হলো না… ‘কেন’ আমি নিজেকে জিগগাস করি, তিক্তভাবে, ‘দামেশক নিষিদ্ধ হলো আমার জন্য?’
কিন্তু আসলে কি তা-ই সত্য? অবশ্য আমার পাসপোর্ট নেই, টাকা-কড়িও নেই। কিন্তু পাসপোর্ট আর টাকা-কড়ি কি সত্যি একেবারে অপরিহার্য ছিলো…?
চিন্তায় এতোদূর আগানোর পর হঠাৎ আমি থেকে যাই। যদি মনোবল থেকে যথেষ্ট, আমি পায়দল সফর করতে পারি, আরব গেরামবাসীদের উপর ভরসা করে। এবং হয়তো- বা আমি কোন-না কোনভাবে গোপেন পার হয়ে যেতে পারি সরহদ-পাসপোর্ট আর প্রবেশপত্রের জন্য মাথা না ঘামিয়েই…।
এবং আমি এ ব্যাপারে পূরাপূরি অবহিত হওয়ার আগেই আমার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়ে গেলোঃ আমি দামেশ যাচ্ছি। আমি আবার মত বদলে ফেলেছি এবং শেষতক আমি জেরুযালেম যাচ্ছি না, বাস চালকদের একথা বোঝাতে মিনিট দূয়েক সময়ই ছিলো যথেষ্ট। আমার আরো কয়েক মিনিট লাগলো, একজোড়া নীল ওভার-অল ও একটি আরবী ‘কুফিয়া’ যোগাড় করতে… (এ হচ্ছে আরবের ঝলসানো রোদ্দুর থেকে বাঁচার সম্ভাব্য উত্তম উপায়) কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনস একটি থলেতে ভরতে আর আমার স্যুটকেসটি ডোরিয়ান, সি. ও ডি- এর নিকট পাঠাবার ব্যবস্থা করতে। এরপর আমি রওনা দিলাম দামেশকের দীর্ঘ পায়ে হাঁটা-পথে।
যে অদম্য মুক্তিবোধ আমাকে আচ্ছন্ন করেছিলো তাকে সুখ থেকে আলঅদা করা সম্ভব ছিলো না। আমার পকেটে ছিলো মাত্র কয়েকটি ভাঙতি মুদ্রা। আমি একটি বেআইনী কাজের ঝুঁকি নিতে যাচ্ছি, যার ফলে আমি নিক্ষিপ্ত হতে পারি জিন্দানখানায়। অস্পষ্ট, অনিশ্চিতরূপে আমার সামনে রয়েছে সরহদ পার হবার সমস্যাটি। আমি কেবল আমার চাতুর্যের উপর বাড়ি দিয়েছি এই উপলব্ধিই হলো আমার সুখের কারণ, আজ আমি সুখী।
আমি গ্যালিলির পথ ধরে হাঁটতে শুরু করি। বিকালের দিকে ‘ইস্ত্রেলন’ প্রান্তর পড়লো আমার ডানদিকে। আমি যে-পথ দিয়ে হাঁটছিলাম তার থেকে নিচু সেই প্রান্তর; এখানে ওখানে পড়েছে আলো আর ছায়ায় টুকরা টুকরা ফালি। আমি আগিয়ে গেলাম নাজারাতের মধ্য দিয়ে এবং রাতের আগেই পৌঁছুলাম একটি আরবীয় গায়েঁ- দারুচিনি আর সাইপ্রেস তরুর ছায়াঘেরা একটি পল্লীতে। পয়লা বাড়িটির দরোজায় বসে আছে তিন চারজন পুরুষ ও মেয়েলোক। আমি ওখান থেকে জিগগাস করি- এ গাঁ’টি ‘আর-রায়না’ কি না। যখন শুনলাম তা’ই, আমি আবার রওনা করতে উদ্যত হই। অমন সময় মেয়েদের একজন আমাকে ডাকলো- ‘ইয়া সিদি, আপনি কি নিজেকে একটু তাজা করে নেবেন না?’ তারপর, যেনো আমার পিয়াসের কথা বুঝতে পেরেই সে ঠাণ্ডা পানি ভর্তি একটি সুরাহী আগিয়ে দেয় আমার দিকে।
যখন আমি পানি খেয়ে জিঁউ ঠাণ্ডা করেছি তখন পুরুষদের একজন, বলাবাহুল্য, ঐ মেয়েটিরই স্বামী, আমাকে জিজ্ঞেস করেঃ
-‘আপনি কি মেহেরবানী করে আমাদের সাথে খানা খাবেন না? এবং রাতটা আমাদের ঘরেই কাটাবেন না?’
ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করলো না, আমি কে, কোথায় চলেছি এবং আমার উদ্দেশ্যই বা কী! আমি রাতটা ওখানেই কাটিয়ে দিলাম ওদের মেহমান হিসাবে।
কোন আরবের মেহমান হওয়া- ইউরোপের স্কুলের ছাত্র- ছাত্রীরা পর্যন্ত এ সর্ম্পে নানা কাহিনী শুনতে পায়। -কোন আরবের মেহমান হওয়ার অর্থই হচ্ছে, কয়েক ঘণ্টার জন্য, কিছুক্ষণের জন্য, সত্যিকারভাবে ও সম্পূর্ণভাবে এমন সব মানুষের জীবনে প্রবেশ করা যারা হতে চায় ‘আপনার ভাই বা বোন’। আরবদের অমন প্রবল, প্রাণঢালা মেহমানদারির মূলে যে কেবল একটা মহৎ ঐতিহ্যই কাজ করছে তা নয়, এর আসল কারণ হচ্ছে ওদের অন্তরের স্বাধীনতা। ওরা ওদের নিজেদের প্রতি অবিশ্বাস থেকে অতোটা মুক্ত যে ওরা সহজেই ওদের হৃদয়কে মেলে ধরতে পারে অপরের কাছে। পশ্চিমী দেশগুলিতে প্রতিটি মানুষ তার নিজেরও পড়শীর মধ্যে যে-সব আপাতসুন্দর প্রাচীর গড়ে তোলে তার একটিও দরকার হয় না এই সব আরবের।
আমরা এক সঙ্গে খেলাম নারী ও পুরুষে মিলে, একটা মস্তবড়ো থালার চারপাশে, মাদুরের উপর পায়ের উপর পা রেখে বসে। থালাটি, মোটা করে ভাঙা গম আর দুধ মিশিয়ে তৈরি ‘পরিজে ভর্তি’। আমার মেজবানেরা বড়ো বড়ো অথচ কাগজের মতো পাতলা রুটির ছোট ছোট টুকরা ছিঁড়ে নিয়ে তার দ্বারা অমন কৌশলের সাথে পরিজ তুলছিলো যে, ওদের আঙুল কখনো লাগছিলো না পরিজে। আমাকে ওরা একটি চামচ দিলো; কিন্তু আমি তা না নিয়ে চেষ্টা করলাম, সাফল্যের সংগেই চেষ্টা করলাম ওদের সহজ অথচ পরিচ্ছন্ন চমৎকার খাবার পদ্ধতি অনুকরণ করতে এবং তাতে আমার বন্ধরা স্পষ্টই খুশি হলো।
আমরা যখন শুয়ে পড়লাম, প্রায় এক ডজন মানুষ, একই কোঠায়, আমি তাকালাম উপরে কড়িকাঠের দিকে, যেখান থেকে সারি সারি শুকনা মরিচ ও বেগুন গাছ ঝুলছে, তাকালাম তামা ও পাথরের তৈজস-পত্রে ভর্তি দেয়ারের তাকগুলির দিকে, আর ঘুমন্ত নারী ও পুরুষের দেহগুলির দিকে আর নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম- আমার নিজের বাড়িই কি কখনো এর চাইতে বেশি আপনতরো মনে হতে পারতো আমার কাছে?
এরপরের দিনগুলিতে, যুদী পাহাড়ের মর্টে-বাদামী রঙ, তার নীলাভ-ধূসর আর বেগুনি ছায়া ধীরে ধীরে পেছনে পড়লে গ্যালিলির প্রসন্নতরো এবং উর্বরতরো পাহাড়গুলি নজরে এলো। বহু ফোয়ারা আর নহর আত্মপ্রকাশ করলো অপ্রত্যাশিতভাবে। লতাপাতা উদ্ভিত ক্রমেই ঘনতরো হয়ে ওঠে। দেখতে পেলাম- সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে ঘন পত্রপুঞ্জে ছাওয়া জলপাই এবং উঁচু গাঢ় সাইপ্রেস বৃক্ষ; বিগত গ্রীষ্মের ফুল তখনো দেখা যাচ্ছিলো পাহাড়ের ঢালুগুলিতে।
কখনো কখনো আমি উট চালকের সাথে পথের কিছুটা অংশে হাঁটি এবং কিছুক্ষণের জন্য ওদের সরল হৃদয়ের উষ্ণতা উপভোগ করি। আমরা সবাই আমার ক্যান্টিন থেকে পানি খই এবং সকলে মিলে একই সিগ্রেট পান করি; তারপর আমি একাকী হাঁটি, রাতগুলি কাটাই আরবদের বাড়িতে,আর তাদের সংগে বসে তাদের রুটি খাই। আমি দিনের পর দিন হাঁটতে থাকি, গ্যালিলি হৃদের কিনার ঘেঁষে প্রসারিত গরম নিছু এলাকার ভেতর এবং হিউল হৃদ এলাকার মোলায়েম স্নিগ্ধ শৈত্যের মধ্য দিয়ে। হ্রদটি একটি ধাতব আয়নার মতো যার উপর রয়েছে রূপালী কুয়াশা, পানির উপর ঝুলে পড়া সন্ধ্যা- সূর্যের শেষ কিরণে কিছুটা রক্তিমাভ। উপকূলের নিকটেই বাস করে আরব জেলেরা, ডাল-পালা দিয়ে তৈরি করা চারের উপর কোন রকমে চাপিয়ে দেয়া পড়ের চাটাই- এর ঘরে। ওরা খুবই গরীব, কিন্তু ওদের এই হাওয়াই কুটিরে, রঙ-চটা, বিবর্ণ কিছু পরিচ্ছদ গায়ে, রুটি তৈরির জন্য কয়েক মুঠা গম এবং ওদের নিজেদের হাতে ধরা মাছ- এর বেশি কিছুর প্রয়োজন ওদের আছে বলে মনে হয় না, এবং সবসময়ই মনে হয় মুসাফিরকে ওদের ঘরে আহবান করা ও সংগে বসে খাওয়ার জন্য ওদের দাওয়াত প্রচুর রয়েছে।
ফিলিস্তিনের সবচাইতে উত্তরের স্থান হচ্ছে ইয়াহুদী উপনিবেশ মেতুলা; পরে আমি জানতে পেরেছিলাম এই মেতুলা ব্রিটিশ-শাসিত ফিলিস্তিন আর ফরাসী অধিকৃত সিরিয়ার মধ্যে একটুখানি ফাঁকা বিশেষ। দু’ গভর্নমেন্টের মধ্যে একটি চুক্তির ভিত্তিতে কিছুদিন পরই মেতুলা এবং পাশ্ববর্তী আরো দুটি উপনিবেশ ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্তবর্তীকালীন এই অল্প কটি হপ্তায় দু’ গভর্নমেন্টের কোনটিরই কার্যকর কোন কর্তৃত্ব ছিলো না মেতুলার উপর। কাজেই এটি ছিলো এক উত্তম স্থান, যেখান থেকে অতি সহজেই সিরিয়ায় ঢুকে পড়া যায়। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এরপর থেকে বড়ো রাস্তায় মুসাফিরদের কাছে থেকে সনাক্তি কাগড়-পত্র দাবি করা হয়। সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণই নাকি কঠোর ছিলো বেশি। কার্যত বেশি দূর আগানো সম্ভবই ছিলো না। পুলিশ প্রত্যেক যাত্রীকেই বাধ্য করতো থামতে। তখনো মেতুলাকে মনে করা হতো সিরিয়ার একটি অংশ। কাজেই দেশের অন্য জায়গার বাসিন্দাদের মতোই, এখানকার প্রত্যেকটি বাসিন্দাদের ফরাসী কর্তৃপক্ষের দেয়া পরিচয়-পত্র বহন করতে হতো। এ ধরনের একটি পরিচয-পত্র যোগাড় করা আমার জন্য বিশেষ জরুরী হয়ে পড়লো।
আমি খুব সতর্কতার সাথে এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর করতে থাকি। শেষপর্যন্ত আমাকে এমন একজন লোকের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো যিনি, হয়তো- বা কিছুটা লাভের বিনিময়েই, তাঁর নিজের পরিচয়-পত্রটি আমাকে দিয়ে দিতে পারেন। তিনি ছিলেন এক বিশাল পুরুষ, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স; বুক-পকেট থেকে ভাঁজকরা তেল চিটচিটে যে দলিলখানা তিনি বের করলেন তাতেও তাঁর বর্ণনা এরূপই ছিলো। কিন্তু দলিলটিতে কোন ফটোগ্রাফ না থাকায় সমস্যাটি অসমাধ্য মনে হলো না।
-‘আপনি এর জন্য কতো চান?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।
-‘তিন পাউণ্ড’।
আমি আমার পকেটে যে ক’টি মুদ্রা ছিলো সব কটি বের করে গুণতে শুরু করি; গুণে দেখলাম পঞ্চান্ন ‘পিয়াস্তার’ আছে- অর্থাৎ কুল্লে আধ পাউণ্ডের সামান্য কিছু উপরে।
-‘এ-ই আমার সব’, আমি বললাম, ‘এ থেকে কিছুটা আমার সফরের বাকি অংশের জন্য অবশ্যি আমাকে রাখতে হবে। আমি আপনাকে কুড়ি পিয়াস্তারের বেশি দিতে পারবো না (অর্থাৎ তাঁর দাবির ঠিক এক-পঞ্চমাংশের বেশি দেবার ক্ষমতা আমার নেই)।
কয়েক মিনিট দর-কষাকষির পর ঠিক হলো পঁয়ত্রিশ ‘পিয়াস্তার’ দেয়া হবে। দলিলটা এখন আমার হাতে। এর একটা পাতা ছিলো ছাপানো, তাতে দু’টি কলাম- একটি ফরাসী ভাষায়, আরেকটি আরবীতে। প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ কালিতে লেখা হয়েছে বিন্দু বিন্দু রেখার উপরে। তাতে ব্যক্তিগত যে বর্ণনা রয়েছে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর খুব প্রয়োজন হয়নি আমার, কারণ এ ধরণের বর্ণনার বেলায় সাধারণত যা হয়ে থাকে এটিও তাই; অর্থাৎ বিস্ময়কভাবে অস্পষ্ট ঝাপসা এই বর্ণনা। কিন্তু তাতে যে বয়েস লেখা হয়েছে তা উনচল্লিশ অথচ আমার বয়স মাত্র তেইশ বছর এবং আমাকে দেখতে দেখায় কুড়ি বছরের। একজন অসতর্ক পুলিশ অফিসারের কাছেও এই গরমিল সহজেই ধরা পড়বে; কাজেই দলিলে বয়সের পরিমাণটা কমানো জরুরী হয়ে পড়লো, তবে বয়সের উল্লেখ কেবল এক জায়গায় থাকলে এ পরিবর্তন তেমন অসুবিধাজনক হতো না, কিন্তু আমারই বদনসিব, তা লেখা হয়েছে ফরাসী এবং আরবী উভয় ভাষাতেই। খুবই হুঁশিয়ারির সাথে আমি কলম ব্যবহার করি এই অংকটি বদলাবার জন্য; কিন্তু তাতে যা দাঁড়ালো সে জালিয়াতি বিশ্বাস পয়দা করার খুব উপযোগী মনে হলো না। আর চোখ আছে অমন হরেক আদমির কাছেই ধরা পড়বে যে, দুটি কলমেই অংকটি বদলানো হয়েছে। কিন্তু এছাড়া আর কোন করণীয় ছিলো না আমার। আমাকে নির্ভর করতে হবে আমার কপাল এবং পুলিশের অমনোযোগিতার উপর।
খুব সকালে আমার ব্যবসায়ী ইয়ারটি আমাকে নিয়ে গেলো গাঁয়ের পেছনে একটি গলিতে এবং প্রায় আধ মাইল দূরের কয়েকটি টিলার দিকে আঙুলি নির্দেশকরে বলল- ‘অই যে সিরিয়া’।
আমি গলির ভেতর দিয়ে চলছিলাম। তখন সকাল হলেও খুবই গরম পড়েছিলো এবং যে বৃদ্ধা আরব মহিলাটি টিলার কাছে এক গাছতলায় বসেছিলো, যে- টিলার ওপারেই রয়েছে সিরিয়া, তারো নিশ্চয়ই খুবই গরম লাগছিলো, কারণ সে শুকনো ভাঙা গলায় আমাকে ডেকে বললঃ
-‘তুমি কি এই বুড়িকে একটু পানি খাওয়াবে বেটা?’
আমি আামর এই মাত্র ভর্তি করা ক্যান্টিন কাঁধ থেকে নামিয়ে ওকে দিই। বুড়ি লোভীর মত ঢক ঢক করে খায় এবং ক্যান্টিনটি আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলেঃ
-‘আল্লাহ তোমার প্রতি রহমত করুন; তিনি তোমাকে সহিসালামতে রাখুন এবং তোমার কাম্য মনযিলে পৌঁছিয়ে দিন।‘
-‘শুকরিয়া মা, আমি এর বেশি কিছু চাই না। এবং যখন আমি ওর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম বৃদ্ধার ঠোঁট দুটি প্রার্থনায় কাঁপছে- আন্দোলিত হচ্ছে; আমি এক অদ্ভুত উল্লাস অনুভব করলাম।
আমি টিলাগুলি পর্যন্ত পৌঁছে সেসব পেছনে ফেলে যাই। আমি এখন সিরিয়ার। আমার সামনে পড়ে আছে এক বিস্তীর্ণ অনুর্বর সমতল এলাকা। বহু দূরে, দিগন্তের কাছে আমি দেখতে পেলাম গাছপালার চেহারা, আর অমন কিছু যা দেখতে অনেকটা ঘরের মতো। নিশ্চয়ই এ ‘বানিয়াস’ শহর। এই সমতল এলাকাটি আমার ভালো লাগলো না; কারণ এতে নেই গাছপালা, ঝোপঝাড় যার আড়ালে আবডালে গা ঢাকা দেয়া যেতে পারে, যা সরইদের অতো নিকটে বলেই প্রয়োজনীয় হযে উঠতে পারে। কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোন পথ ছিল না। কেউ যখন স্বপ্নে এক জনবহুল রাস্তার মধ্য দিয়ে উলংগ হয়ে হাঁটে তখন তার স্বপ্নে যেমন মনে হয় আমারও নিজেকে ঠিক সেইরূপ মনে হলো।
তখন অনেকটা দুপুর হয়ে গেছে যখন আমি একটা ছোট নহরের কাছে পৌঁছুই- যে নহরটি প্রস্তরটিকে করেছে দু’ভাগ। আমি বসে জুতা ও মোজা খোলার চেষ্টা করছি এমন সময় দূরে তাকিয়ে দেখি চারটি ঘোড়-সওয়ার আসছে আমার দিকে। ওদের রাইফেলগুলি জিনের উপর আড়াআড়িভাবে রাখা; ফলে ওদেরকে দেখাচ্ছিলো ভয়ানক চেহারার ফৌজী পুলিশের মতো। আসলে ওরা ফৌজী পুলিশই ‘বটে’। তাই আমার পালানেরা চেষ্টা করার কোন মানেই হতো না। আমি মনে মনে এভাবে সান্ত্বনা পাবার চেষ্টা করি যে, যা ঘটনার তাই ঘটবে। এখন যদি ধরা পড়ি, আমাকে হয়তো রাইফেলের কয়েক ঘার বেশি দেয়া হবে না, আর আমাকে ওরা আবার নিয়ে যাবে মেতুলায়।
আমি নহরটি পার হয়ে উপরে গিয়ে বসি এবং খুব আস্তে আস্তে পা শুকাতে থাকি আর ফৌজী পুলিশেরা কাছে আগিয়ে আসক, তারি ইন্তেজারি করি। ওরা এসে আমার দিকে সন্দেহের নজরে তাকায়; কারণ যদিও আমি আরবী পাগড়ী পরেছিলাম, আমি যে একজন ইউরোপীয় তাতে কোন সন্দেহই ছিলো না।
-‘কোত্থেকে?’ ওদের একজন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আরবী জবানে আমাকে জিগগাস করে।
-‘মেতুলা থেকে।‘
-‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’
-‘দামেশকে’।
-‘মতলব?’
-‘ও, তেমন কিছু নয়, প্রমোদ ভ্রমণ!’
-‘কাগজপত্র কিছু আছে?’
-‘অবশ্যি’।
সংগে সংগে ‘আমর’ পরিচয়-পত্র বের হয়ে এলো আমার পকেট থেকে আর তার সংগে আমার হৃদপিণ্ডটা উঠে এলো আমার মুখে। ফৌজী পুলিশ কাগজের ভাঁজ খুলে তার দিকে তাকিয়ে দেখলো। আমার হৃদপিণ্ডটি আবার পিছলে নেমে গেলো যথাস্থানে আর স্পন্দিত হতে শুরু করলো। কারণ আমি দেখতে পেলাম, কাগজটির উপর দিকটা ও নিচু করে ধরেছে; বুঝতে কষ্ট হলো না যে, ও পড়তে জানে না। দু’তিনটি বড়ো বড়ো সরকারী মোহরেই সে সন্তুষ্ট, কারণ সে কী ভাবতে ভাবতে কাগজটি আাবর ভাঁজ করে আমার হাতে ফিরিয়ে দেয়ঃ
-‘হ্যাঁ, সব ঠিক আছে, যেতে পারেন’।
মুহূর্তের জন্য ইচ্ছা হলো, আমি ওর সাথে মুসাফা করি, কিন্তু পরে আবার ভাবলাম আমাদের সম্পর্কটিকে পুরোপুরি সরকারী সম্পর্ক রাখাই ঠিক হবে; লোক চারজন ঘোড়া ঘুরিয়ে কদমতালে দূরে হারিয়ে যায় এবং আমি আবার সফর শুরু করি আমার নিজ পথে।
বানিয়াসের কাছে এসে আমি পথ হারিয়ে ফেলি। আমার ম্যাপে যা বর্ণিত ছিলো ‘চাক্কাওয়ালা গাড়ি-ঘোড়া চলার লায়েক রাস্তা’ হিসাবে, দেখা গেলো, তা প্রায় এক অদৃশ্য পথ, আর স্তেপভূমি, জলা, ও ছোট-খাট নদী-নহর পার হয়ে একেঁ বেঁকে চলে গেছে সেই পথ এবং শেষতক একদম ফূরিয়ে গেছে বড়ো বড়ো পাথর-ছড়ানো কতকগুলি টিলার কাছে এসে। এই টিলাগুলির উপর আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াই কয়েক ঘণ্টা, চড়াই-উৎরাই ভেঙে এবং এভাবে ঘুরতে ঘুরতে বিকালে দেখা হয়ে গেলো দুটি আরবের সাথে; ওরা গাধার পিঠে চাপিয়ে আঙুর আন পনির নিয়ে যাচ্ছিলো বানিয়াসে। রাস্তার শেষ নাগাদ আমরা এক সাথেই হাঁটি। ওরা আমাকে খেতে দিলো রসালেঅ আঙুর। শহরের আগে বাগানে পৌঁছে আমরা নিজ নিজ পথ ধরি। রাস্তার পাশে একটি স্বচ্ছ, সরু খরগতি স্রোত উচ্ছ্বলিত! আমি আমার বুকপেট যমীনে রেখে শুয়ে পড়ি, বরফ-ঠান্ডা পানিতে কান নাগাদ মাথা ডুবিয়ে দিই এবং পানি গিলতে থাকি- খেতে থাকি।
আমি খুবই লেংগা, খুবই ক্লান্ত বটে, তবু বানিয়াসে থাকার ইচ্ছা আমার নেই- কারণ আমার আশংকা, এটি সিরিয়ার দিকের পহেলা ফাঁড়ি হওয়ায় এখানে নিশ্চয়ই পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। ফৌজ পুলিশের সাথে আমার মোলাকাত সাধারণ সিরীয় সেপাই সম্পর্কে আমাকে অনেকটা নিশ্চিত করেছে- কারণ ধরে নেয়া যায়, ওদের বেশির ভাগই উম্মী, নিরক্ষর এবং সে কারণে ওরা আমার জালিয়াতি ধরতে অক্ষম, অপারগ। কিন্তু পুলিশ ফাঁড়ি, যেখানে রয়েছে একজন অফিসার, তার কথা আলাদা। আমি তাই ক্ষিপ্র পায়ে অলিগলির ভেতর দিয়ে বাজারের বড়ো রাস্তাটি এড়িয়ে চলতে শুরু করি, কারণ পুলিশ ফাঁড়ি ঐ রাস্তায়ই থাকার সম্ভাবনা বেশি। একটি গলিতে আমি শুনতে পেলাম বাঁশের বাঁশির সুর আর হাততালির সংগে একটি মানুষের গান। তাতে আকৃষ্ট হয়ে আমি ঘুরে আসি বাঁকটি আর এক্কেবারে নির্বাক, নিশ্চল দাঁড়িয়ে যাই। আমার ঠিক উল্টা দিকেই সম্ভবত দশ পা দূরে রয়েছে একটি দরোজা যার উপর খোদিত রয়েছে দুটি শব্দ ‘পুলিশ-ফাঁড়ি, তাতে রয়েছে কয়েকজন সিরীয় পুলিশ, তাদের মধ্যে একজন অফিসার। ওরা বিকালে রোধে টুলের ওপর একজন সাথীর গান উপভোগ করছে। এখন পিছু হটার কোন উপায় নেই; কারণ ওরা এরি মধ্যে আমাকে দেখে ফেলেছে এবং অফিসারটি, বাহ্যত সে-ও একজন সিরীয়, আমাকে ডেকে বলল- ‘ওহে এদিকে আসো!
হুকুম তামিল করা ছাড়া উপায় নেই। ধীরে ধীরে আসতে থাকি আমি, হঠাৎ আমার মগজে একটি বুদ্ধি খেলে যায়। ক্যামেরা হাতে নিয়ে আমি অফিসারটিকে ফরাসী ভাষায় অভিনন্দন জানাই এবং তার সওয়ালের অপেক্ষা না করেই বলতে থাকিঃ
-‘আমি মেতুলা থেকে আসছি এই শহরে, সংক্ষিপ্ত সফরের জন্য। কিন্তু আপনার যে-বন্ধুর গান আমাকে অমন মোহবিষ্ট করেছে, তার এবং আপনার ফটো না নিয়ে আমি এখান থেকে ফিরছি না’।
আরবরা তোষামোদ পছন্দ করে। তার উপর ওরা নিজেদের ছবি তুলে আনন্দ পায়। তা্ই অফিসারটি মৃদু হাসির সাথে আমার প্রস্তাবে সম্মতি জানায় এবং আমাকে অনুরোধ করে আমি যেনো ফটো ডেভেলপ আর প্রিন্টিং-এর পর তার ফটো তাকে পাঠাই (আমি তা পাঠিয়েছিলাম আমার ধন্যবাদসহ)। আমার পরিচয়-পত্র চাওয়ার কথা তার আর মনেই পড়লো না। তার বদলে সে আমাকে মিষ্টি চা খাইয়ে আপ্যায়িত করে। এবং অবশেষে আমি যখন মেতুলায় ফিরে যাবার জন্য উঠলাম, আমাকে সে ‘শুভ বিদায়’ জানালো। আমি যে পথে এসেছিলাম সে পথে আবার পেছনে ফিরে যাই, শহরের চারদিকে চক্কর দিয়ে আসি এবং এভাবে আবার দামেশকের পথ ধরি।
হাইফা ছাড়ার ঠিক দু’হপ্তা পর আমি বেশ বড়ো একটি গাঁয়ে এসে পৌঁছাই, বলা যায় একটি শহর, যার নাম মাজদাল আশশামস। এ গাঁয়ে বেশির ভাগই দ্রুজ এবং কিছু খ্রিস্টান বাস করে। আমি একটি বাড়ি পছন্দ করলাম; মনে হলো বেশ সম্পন্ন মানুষের বাড়ি। কড়া নাড়তেই দরোজা ফাঁক করে বার হয়ে এলো এক নৌযোয়ান। ওকে আমি বললাম, রাতের জন্য আশ্রয় পেলে আমি সরফরায হবো। চিরাচরিত ‘আহলান ওয়া সাহলান’ সম্ভাষণের সাথে দরোজা একেবারে খুলে গেলো এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেখতে পেলাম, আমি এই ছোট্ট পরিবারে সাদরে গৃহীত হয়ে গেছি।
আমি এখন সিরিয়ার অনেক ভেতরে। এখান থেকে অনেক পথই রয়েছে দামেশকের। তাই আমি আামার দ্রুজ মেজবানকে বিশ্বাস করে তাঁর কাছে পরামর্শ চাইবার ইরাদা করি। আমি জানতাম যে, কোন আরবই তার মেহমানের প্রতি বে-উফাই বা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না। তাই আমি তাকে সমস্ত কিছু খুলে বলি, এমন কি, আমি যে জাল পরিচয়-পত্র নিয়ে সফর করছি-তা’ও। আমার মেজবান তখন আমাকে বলল, বড়ো রাস্তা ধরে চলা আামার পক্ষে বিপজ্জনক হবে খুবই। কারণ, এখান থেকে শুরু করে গোটা রাস্তাই ফরাসী ফৌজী পুলিশেরা পাহারা দিচ্ছে; ওরা সিরীয় পুলিশের মতো অতো সহজে আমাকে ছেড়ে দেবে না।
-‘আমি ভাবছি, তোমার সাথে আমার ছেলেকে পাঠাবো, আমার মেজবান বলল- যে নৌযোয়ান আমার জন্য দরোজা খুলে দিয়েছিলো তার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে- ‘ও তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে, তোমাকে মদদ করবে, যাতে তুমি এড়িয়ে চলতে পারো বড়ো রাস্তাগুলি’।
সন্ধ্যার আহারের পর আমরা বাড়ির সামনে খোলা চত্বরে বসি এবং পরদিন সকালে কোন পথ ধরবো তাই নিয়ে আলোচনা করি। আমার হাঁটুর উপর মেলা রয়েছে ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার একখানি ছোট্ট ম্যাপ, জার্মানীতে তৈরি। আমি জেরুজালেম থেকে এটি নিয়ে এসেছি সাথে করে। এই ম্যাপের উপর অনুসরণের চেষ্টা করি আমার দ্রুজ বন্ধুর প্রদর্শিত রাস্তা। আমরা যখন এই আলাপে মশগুল রয়েছি, পুলিশ অফিসারের উর্দিপরা একটি লোক, বোঝাই যাচ্ছিলো একজন সিরীয়, সে গাঁয়ের পথে পায়চারি করতে করতে এসে হাজির হয়। আড়াল থেকে লোকটি অমন হঠাৎ আবির্ভূত হলো যে, ম্যাপটি ভাঁজ করারই সময় পেলাম না, ওর নজর থেকে ওটি গোপন করার তো কথাই ওঠে না। অফিসারটি বুঝতে পারলো যে, আমি একজন পরদেশী, কারণ মেজবানের প্রতি একটুখানি মাথা ঝুঁকিয়ে চত্বরটি পার হয়ে সে আস্তে আস্তে আমাদের কাছে পৌঁছে।
-‘কে আপনি?’ ফরাসী জবানে আমাকে ও জিজ্ঞাসা করে এমন এক স্বরে যা খুব নির্দয় বলে মনে হলো না।
আমি আামর চিরদিনের অভ্যাস মতো দীর্ঘ অংসলগ্ন বক্তৃতায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে থাকি, আমি মেতুলাবাসী একজন ঔপনিবেশিক, প্রমোদ সফরে বেরিয়েছি। তবু যখন সে আমার কাছে পরিচয়-পত্র দাবি করে বসলো আমি তা ওর হাতে না দিয়ে পারলাম না। মনোযোগের সাথে ও কাগজটি দেখলো, আর তার ঠৌঁট দু’টি বেঁকে গেলো একটা শুকনো হাসিতে। – ‘কিন্তু আপনার হাতে ওটি কী?’ জার্মান ম্যাপটির দিকে ইশারা ক’রে আমাকে ও প্রশ্ন করে।
-‘এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়’, আমি বলি; কিন্তু অফিসারটি ওটা দেখবার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে দেয় এবং ম্যাপ দেখতে অভ্যস্ত মানুষের কুশলী আঙুল দিয়ে ভাঁজ খুলে কয়েক সেণ্ডে ম্যাপটির দিকে চেয়ে থাকে, তারপর সযত্নে আবার ভাঁজ করে স্মিত হাসির সাথে আমার হাতে তা ফিরিয়ে দেয়। তারপর ভাঙা জার্মান জবানে বলেঃ
-‘যুদ্ধের সময় আমি জার্মানদের পাশাপাশি তুর্কী বাহিনীতে কাজ করেছি’। -কথা শেষ করে ফৌজ কায়দায় আমাকে স্যালুট করে দাঁত বের করে ও আবার হাসে, তারপর চলে যায়।
-‘ও বুঝতে পেরেছে তুমি একজন ‘আলেমানি’- অর্থাৎ জার্মান, জার্মানদের ও ভালবাসে এবং ফরাসীদের ঘেন্না করে। ও আর তোমাকে বিরক্ত করবে না’।
পরদিন সকালে, আমি আমার তরুণ দ্রুজ সাথীটিকে নিয়ে পথচলঅ শুরু করি। খুব সম্ভব এ সফর ছিলো আমার জীবনের দুরূহতম সফর। দুপুরে বিশ মিনিটের খানিক বিরতিসহ আমরা এগারো ঘণ্টারও বেশি চলি, শিলাময় পাহাড় ডিঙিয়ে, বড়ো বড়ো পাথরের মধ্য দিয়ে, ধারালো নূড়ি পাথরের উপর সন্তর্পণে পা ফেলে, উৎরাই-চড়াই চড়াই-উৎরাই ভেঙে- যতক্ষণ না আমি টের পেলাম যে, আমার আর হাঁটার শক্তি নেই। যখন আমরা বিকালে দামেশকের সমতল অঞ্চলে আল-কাতানা শহরে পৌছুলাম তখন আমি একেবারে ভেঙে পড়েছি- আমার পায়ের আঙ্গুলগুলি ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে, আর আমার পা দু’টি গেছে ফুলে। আমার ইচ্ছা হলো, রাতটা এখানেই কাটাই, কিন্তু আমার তরুণ বন্ধুটি বাধা দেয় প্রবলভাবে, চারপাশে বহু ফরাসী পুলিশ রয়েছে এবং এটি যখন গাঁ নয় শহর, এখানে মনোযোগ আকর্ষণ না করে আশ্রয় পাওয়অ সহজ হবে না মোটেই। একমাত্র উপায় হচ্ছে, এখান থেকে দামেশকের মধ্যে যে মোটর চলাচল করে তারি একটিতে চড়ে বসা। এখনো আমার হাতে রয়েছে কুড়ি ‘পিয়াস্তার’ (হাইফা থেকে, আমার গোটা সফরে একটি পেনিও খরচ করতে হয়নি)। এবং এখান থেকে দামেশকে যাওয়ার গাড়ি ভাড়াও কুড়ি ‘পিয়াস্তার’।
শহরের প্রধান চকে ট্রান্সপোর্ট ঠিকাদারের ভাঙাচোরা অফিসে আমি জানতে পারলাম পরবর্তী গাড়ি না ছাড়া পর্যন্ত আমাকে এখানে প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। আমি আমার বন্ধু রাহনুমার কাছ থেকে বিদায় নিই; ও আমাকে আলিংগন করে আপন ভাইয়ের মতো, তারপর দেরী না করে নিজ বাড়ি ফেরার পথ ধরে। বুকিং অফিসের দরোজার কাছে ন্যাপস্যাকটি পাশে রাখে শেষ বিকালের মিষ্টি রোদে আমি ঢুলছিলাম। হঠাৎ একজন লোক আমার কাঁধ ধরে খুব জোরে ঝাঁকুনি দেয়ায় আমার ঝিমুনি টুটে যায়; লোকটি একজন সিরীয় ফৌজী পুলিশ। আমি মামুলি প্রশ্নাদির মুকাবিলা করি এবং মামুলি জওয়াব দিই। কিন্তু মনে হলো, লোকটি আামার জবাবে খুশি হতে পারেনি।
-‘আমার সাথে থানায় চলুন’, -এ বলে, ভারপ্রাপ্ত অফিসারের সাথে কথা বলূন’।
আমি এমনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, আমি ধরা পড়ি বা না পড়ি তা আর আমার জন্য মোটেই ভাবনার বিষয় ছিলো না।
ইস্টিশন-কামরায় পেছনে বসা ‘অফিসার’টি একজন হৃষ্টপুষ্ট লম্বা চওড়া ফরাসী সার্জেন্ট; তার সামনেই ডেস্কের উপর রয়েছে আরকের একটি খালি বোতল আর একটি ময়লা গ্লাস। সে শরাবে একেবারেই চুর হয়ে রেগে মেগে আছে; খুন-রাঙা চোখ মেলে উৎকট দৃষ্টিতে সে তাকালো পুলিশটির দিকে যে আমাকে নিয়ে এসেছে এখানে।
-‘এখন আবার কী?’
পুলিশটি তাকে আরবী জবানে বোঝায়- সে আমাকে, একজন পরদেশীকে, প্রধান চকে বাস থাকতে দেখে। এদিকে আমি তাকে ফরাসী জবানে বুঝাই যে, আমি পরদেশী নই, আমি একজন অনুগত নাগরিক।
-‘অনুগত নাগরিক?’ সার্জেন্টটি চিৎকারে করে ওঠে- ‘তোমরা হচ্ছো নচ্চর, বাউণ্ডেলে। দেশের ভেতর ঘোরাফেরা করো- কেবল আমাদেরকে উত্ত্যক্ত করার জন্য। কোথায় তোমার কাগজপত্র?
নিতান্ত অসহায়ভাবে আমি সোজা শক্ত আঙুল দিয়ে পকেট হাতড়চ্ছি আমার পরিচয়- পত্রের জন্য, এমন সময় সে তার বদ্ধমুষ্ঠি দিয়ে একটি কিল মারে টেবিলের ওপর আর ঝড়ের মত গর্জন করে ওঠেঃ
-‘থাক, দরকার নেই, বেরোও এখান থেকে’ এবং বের হয়ে আসতে আসতে যখন আমি আমার পেছন দিকে দরোজা লাগাচ্ছি আমি দেখতে পেলাম, সে আবার হাতে গ্লাস ও বোতল তুলে নিচ্ছে।
দীর্ঘ, দরাজ পায়দল সফরের পর আল-কাতানা থেকে মোটরে করে কোশাদা রাজপথের উপর দিয়ে, ফল-ফুলের বাগিচায় ঢাকা দামেশক প্রান্তরে প্রবেশ- কী যে এক মুক্তি, কী যে আরাম সে গাড়ি চড়ে! না, যেনো হাওয়ায় ভয় করে ভেসে চলা! দিগন্তে রয়েছৈ আমার মনযিল, ঘন সন্নিবিষ্ট গাছের মাথায় মাথায় তৈরি এক অন্তহীন সমুদ্দুর, আসমানের পটভূমিকায় দেখা যাচ্ছে কয়েকটা গম্বুজ এবং মিনার, আবছা আবছা। অনেক দূরে কিছুটা ডানদিকে, দাঁড়িয়ে আছে উলঙ্গ অনাবৃত পাহাড়টির চূড়া, এখনো সূর্যের কিরণে স্নাত, যদিও নরম ছায়া এরি মধ্যে লতিয়ে উঠতে শুরু করেছে ওর তলদেশে। সেই পাহাড়ের উপর ঝুলে আছে কেবল একখন্ড মেঘ- সরু, দীর্ঘ, ঝলোমলো, কালচে; দূরে হালকা নীল আসমান, একেবারে সোজা, খাড়া-প্রান্তরের উপর আমাদের ডান ও বাঁয়ের পাহাড়গুলির পটভূমিকায় ছড়িয়ে আছে ঘুঘু-ধুসর এক স্বর্ণাভা। আর হাওয়া- সে কতো হালকা!
তারপর- পথে পড়ে ফুলের উঁচু উঁচু বাগিচা, মাটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা; নানা রকমের সওয়ারী, ঠেলাগাড়ি, জানোয়ারে টানা গাড়ি, সৈনিক (ফরাসী সৈনিক) কতো কি! গোধূলি সবুজ হয়ে এলো পানির মতো। একজন অফিসার মোটর সাইকেলে করে প্রচণ্ড ধ্বনি তুলে পাশ দিয়ে ছুটে যায়, চোখে তার মস্ত বড়ো গগলস- এক ধরনের গভীর সমুদ্দুরের মাছের মতো দেখতে। তারপর- প্রথমে বাড়িটি পাশে পড়ে। তারপর- তারপরই দামেশক, খোলা প্রান্তরের নীরবতার পর হট্টগোলে উচ্ছ্বাসিত, উদ্বোলিত ফেনপুঞ্জ যেনো। জানালায় আর রাস্তায় সন্ধ্যার প্রথম বাতি সব জ্বলে উঠেছে। আমার সত্ত্বা উল্লাসিত হলো অমন একটা আনন্দের অনুভূতিতে যা আমি মনে রাখতে পারিনি।
কিন্তু আমার খুশি, আমার আনন্দ হঠাৎ চুরমার হয়ে গেলো, যখন শহরের কিনারায় ‘থানা’র কাছে এসে গাড়িটি থেমে গেলো।
-‘ব্যাপার কী?’ আমি আমার পাশে বসা গাড়ি-চালককে জিজ্ঞাস করি।
-‘ওহ, কিছুই না। বাইরে থেকে যতো গাড়ি আসে তার প্রত্যেকটিকে এখানে পৌঁছুনোর পর পুলিশের কাছে রিপোর্ট করতে হয়’।
ইস্টিশন থেকে একজন সিরীয় পুলিশ বের হয়ে আসেঃ
-‘আপনি কোত্থেকে আসছেন?’
-‘কেবল আল-কাতানা থেকে,’ ড্রাইভারটি জবাব দেয়।
-‘বেশ, তাহলে যেতে পারেন, (কারণ এ হচ্ছে নেহায়েতই স্থানীয় সফর) ড্রাইভার দাঁত কিড়মিড় করে গাড়ি স্ট্রার্ট দেয়। আমরা চলতে শুরু করি এবং অবাধে শ্বাস-প্রশ্বাস নিই। কিন্তু সেই মুহূর্তেই আবার কে একজন রাস্তা থেকে চিৎকার করে ওঠে- ‘ছাদ ঢিলা হয়ে পড়েছে’, এবং ‘থানা’ ছাড়িয়ে কয়েক পা পরেই ড্রাইভারটি তার নড়বড়ে গাড়িখানা থামালো খোলা ছাদটি ঠিক করার জন্য, যা এতোক্ষণ ঝুলে পড়েছে একপাশে। ড্রাইভার যখন এ নিয়ে ব্যস্ত তখন পুলিশটি আবার আস্তে আস্তে আগিয়ে এলো আমাদের দিকে- মনে হলো ড্রাইভারের যান্ত্রিক গোলাযোগ ছাড়া আর কিছুর প্রতিই সে আকৃষ্ট নয়। পরে অবশ্য, তার নজর পড়লো আামার উপর, আমি দেখলাম আর সংগে সংগে আমার সারা শরীর কঠিন হয়ে উঠলো; ওর চোখ দু’টি সজাগ-সতর্ক হয়ে উঠেছে; আমার মাথা থেকে পা নাগাদ ও জরীপ করছে। আরো কাছে এসে ও তীর্যক দৃষ্টিতে তাকালো গাড়ির মেঝের দিকে, যেখানে আমার ন্যাপস্যাকটি পড়ে আছে।
-‘আপনি কে?’ সন্দিগ্ধ কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞাস করে।
-‘মেতুলা থেকে’ – আমি শুরু করি; কিন্তু দেখলাম, পুলিশটির মাথা সন্দেহে দুলছে। তারপর ও ফিসফিস করে কথা বলে ড্রাইভারটির সাথে। আমি শব্দগুলি বুঝতে পারছিলাম- ‘ইংরেজ সিপাই, দলত্যাগী’। এবং এই পহেলা আমার জ্ঞান হলো যে, আামার নীল ওভারকোট, আমার বাদামী জরীর কাজ করা ইগাল-চাপা ‘কুফিয়া’ আর আমার ফৌজী-ধরনের ন্যাপস্যাক (যা আমি কিনেছিলাম জেরুজালেমে, একটি পুরোনো জিনিসের দোকান থেকে( সবকিছুরই মিল রয়েছে আইরিশ কনস্টেবলের পোশাকের সাথে, যাদেরকে সে সময়ে নিয়োগ করেছিলেন ফিলিস্তিন সরকার। এ-ও আমার মনে পড়লো, ফরাসী ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে, উভয়ই নিজ নিজ দলত্যাগীদেরকে দেশ থেকে বের করে দেবে।
আমি আমার ভাঙা ভাঙা আরবী বুলিতে পুলিশটিকে বোঝাবার চেষ্টা করি, আমি দলত্যাগী নই, কিন্তু ও আমার ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে বলেঃ
-‘সবকিছু ইন্সপেকটর সাবকে বুঝান’।
এবং এভাবে আমাকে মজবুর হয়েই যেতে হলো থানায়। ড্রাইভার বিড়বিড় করে বলল- ও আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না; এরপর সত্যি ও গাড়ি স্টার্ট দিয়ে আমার চোখের আড়ালে হারিয়ে গেলো। ইন্সপেকটর তখন থানায় ছিলেন না; তবে আমাকে বলা হলো, যে- কোন মুহূর্তেই তিনি ফিরে আসতে পারেন। আমাকে একটি কামরায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কামরাটিতে একটিমাত্র বেঞ্চি রয়েছে বসবার জন্য, আর দরোজা রয়েছে দু’টি, প্রধান প্রবেশ পথটি ছাড়া। একটির উপর খোদাই রয়েছে ‘কারারক্ষি’ এই কথা দুটি; আর অন্যটির উপর লেখা ‘কয়েদখানা’ এই শব্দটি। এই অস্বাস্তকর পরিবেশে আমাকে অপেক্ষা করতে হলো আধ ঘন্টারও বেশি, এবং প্রতি মুহুর্তে আমার এ বিশ্বাস পাকাপোক্ত হতে লাগল যে, আমার সফরের এই খানেই শেষ; কেননা আমার কাছে ইন্সপেকটর শব্দটি শুধু অফিসার শব্দটির চেয়ে অনেক অনেক বেশি অশুভ মনে হলো। আমি যদিএখন ধরা পড়ি, আমাকে কয়েকদিন, হয়তো, কয়েক হপ্তা হবে জেলে, বিচারাধীন কয়েদী হিসেবে; তারপর আমাকে দেওয়া হবে প্রথা অনুযায়ী তিন মাসের শাস্তি। এভাবে জেলখানায় তিন মাসের শাস্তি ভোগের পর আমাকে আবার রওনা করতে হবে পায়দল—ঘোড় সওয়ার ফৌজী পুলিশের প্রহরাধীনে, আবার ফিলিস্তিন সহরদের দিকে এবং সর্বপরি, পাসপোর্ট আইনের খেরাপ করার অপরাধে আমাকে হয়তো বের করে দেয়া হবে ফিলিস্তিন থেকে। ওয়েটিংরুমে যে বিষন্নতা বিরাজ করছে আমার বিতরের বিষাদের তুলনায় কিছুই নয়।
হঠাৎ আমার কানে এলো একটি গাড়ির শব্দ। গাড়িটি থানায় ঢুকে পথের সামনেই এসে থামে; মুহূর্তকাল পরেই, গাড়ি থেকে নেমে এলো একজন লোক, বেসামরিক পোশাকে, মাথায় ‘তারবুশ’ পরা। তার পিছু পিছু নামে একটি পুলিশ যে উত্তেজিতভাবে কিছু বোঝাতে চেষ্টা করছে সাদা পোশাক পরা লোকটাকে। বোঝাই যাচ্ছে, ইন্সপেক্টর অতিমাত্রায় ব্যস্ত।
এরপর যা ঘটলো তা যে ঠিক কেমন করে ঘটলো তা আমি জানি না। সেই সংকট মুহূর্তে আমি যা করলাম তা হয়তো প্রতিভার সেই দুর্লভ এক হঠাৎ-ঝলকানির ফল, যা আলাদা আলাদা পরিস্থিতিতে আর ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মধ্যে এমন-একেকটি ঘটনার জন্ম দেয় যা ইতিহাসকে দেয় বদলে। আমি এক লাফ মেরে দাঁড়ালাম এসে ইন্সপেক্টরের একেবারে কাছে, তারপর তার প্রশ্নাদির অপেক্ষা না করেই তার উপর ছুঁড়ে মারলাম ফরাসী জবানে এক ঝাঁক অনর্গল নালিশ, পুলিশটির অপমানজনক বিশ্রী ব্যবহারের বিরুদ্ধে, যে আমাকে আমার মতো একজন মাসুম নাগরিককে দলত্যাগী সেপাই গণ্য করেছে, যার জন্য শহরে যাওয়ার গাড়ি আমাকে হারাতে হয়েছে! ইন্সপেক্টর কয়েকবার আমাকে থামাবার চেষ্টা করলো- কিন্তু আমি তাকে সুযোগ দিলাম না একবারও, আর এক অনর্গল শব্দ- প্রবাহ দ্বারা আমি আচ্ছন্ন করে দিই তাকে, যার দশ ভাগের এক ভাগও সে বুঝতে পেরেছে বলে মনে হলো না, ‘মেতুলা’ ‘দামেশক’- এ দু’টি নাম ছাড়া। যা অগুণতিবার আমি উল্লেখ করেছি আামার কথার মধ্যে। বোঝা গেলো, তার এক জরুরী কাজ থেকে আমি উল্লেখ করেছি আমার কথার মধ্যে। বোঝা গেলো, তার এক জরুরী কাজ থেকে তাকে আটকে রাখার জন্য সে বিব্রত বোধ করছে। কিন্তু আমি তাকে একটি কথাও বলতে দিলাম না, নিশ্বাস নেবার জন্যও না থেমে আমি অবিরাম চালিয়ে যাই আমার শব্দের গোলাবাজি। শেষপর্যন্ত সে তেক্ত-বিরক্ত হয়ে হাত ছুঁড়ে মারলো শূন্যে আর চিৎকার করে উঠলোঃ
-‘থামুন, থামুন, আল্লাহর ওয়াস্তে থামুন। আপনার কোন কাগজপত্র আছে?’
আমার হাত যান্ত্রিকভাবেই প্রবেশ করে আমার বুক-পকেটে এবং তখনো অনর্গল স্রোতে কথার পর কথা বলতে বলতেই আমি আমার জাল পরিচয়-পত্রকানা তার হাতে গুঁজে দেই। অসহায় লোকটির হয়তো তখন এই উপলব্ধিই হয়েছিলো যে, সে ডুবে যাচ্ছে, কারণ সে দ্রুত ভাঁজ করে কাগজটির একটি কোণের উপর লক্ষ্য করে এবং সরকারী স্ট্যাম্পটি দেখে আর তারপর সেটি ছুঁড়ে মারে আমার উপর।
-‘ঠিক আছে, হু, সব ঠিক আছে, এখন যান, মেহেরবানী করে কেবল যান।‘ আমি তার অনুরোধের পুনরাবৃত্তির জন্য অপেক্ষা করলাম না।
কয়েকমাস আগে জেরুজালেমে এক দামেশকী শিক্ষকের সাথে আমার দেখা হয়। তিনিই আমাকে দাওয়াত করেছিলেন, আমি যখন দামেশকে আসি, আমি যেন তাঁর মেহমান হই। তাঁর বাড়ির খোঁজে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। একটি ছোট্ট ছেলে রাজী হয়ে গেলো আমার পথ-প্রদর্শক হতে। সে-ই আমার হাত ধরে আমার উদ্দিষ্ট বাড়ির পথ ধরলো।
গাঢ় সন্ধ্যা, পুরানো নগরী। রাস্তাগুলি চিপা; সংকীর্ণ রাস্তার উপর ঝুলে থাকা কোঠাগুলির জানালা, রাত যতোটা আঁধার করে তুলতে পারে তার চাইতে বেশি আঁধার করে তুলেছে রাস্তাগুলিকে। এখানে ওখানে কেরোসিনের হলদে আলোতে আমি দেখতে পাচ্ছি- কোন-না কো ফলওয়ালার দোকান, যার সামনেই রয়েছে স্তূপীকৃত তরমুজ এবং ঝুড়িভর্তি আঙুর। মানুষগুলি যেনো ছায়ামূর্তি। কখনো কখনো খড়খড়ির জানালার ওপাশ থেকে ভেসে আসে কোন রমনীর বাজখাঁই গলার আওয়াজ। তারপর সেই ছোট্ট ছেলেটি একবার বলে উঠলো- ‘এই যে সেই বাড়িটি’।
আমি একটা দরোজায় ধাক্কা দিই। কে একজন ভেতর থেকে জবাব দেয়। আমি দরোজার সিটকিনি খুলে প্রবেশ করি একটি শান-বাঁধা প্রাংগণে। আঁধারেও আমি দেখতে পেলাম, ফলের ভারে নুয়ে পড়া আঙুরের গাছসমূহ এবং একটি পাথরের বেসিন যা থেকে উচ্ছিত হচ্ছে একটি ফোয়ারা। কে একজন উপর থেকে ডেকে বলল-
-‘তফদ্দল, ইয়া সিদি, মেহেরবানী করে প্রবেশ করুন’! আমি তখন ঘরের বাইরের দেয়ালের পাশ ঘেঁষে ওঠা একটি সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠি এবং একটি খোলা চত্বর পার হয়ে একেবারে আমার বন্ধুর দরাজ আলিংগনে গিয়ে পড়ি।
আমি তকন ক্লান্ত অবসন্ন- একেবারেই হৃতশক্তি। তাই আমাকে যে বিছানা দেয়া হলো তাতেই আমি ধপ করে ছেড়ে দিলাম নিজেকে। সুমুখের প্রাংগণের গাছগুলিতে এবং বাড়ির পেছনের বাগানের গাছপালার হাওয়ার মর্মর ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। দূর থেকে ভেসে এলো অনেক স্তিমিত ধ্বনিঃ এক বৃহৎ আরব্য নগরী ঘুমিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, তারই আওয়াজ!
একটা নতুন উপলিব্ধির উত্তেজনা নিয়ে, যে-সব বস্তু বা বিষয় সম্বন্ধে আগে আমার বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিলো না সেগুলির প্রতি চোখ খোলা রেখে, আমি সেই গ্রীষ্মের দিনগুলিতে দামেশকের পুরানো বাজারের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আর তার বাসিন্দাদের জীবনকে যে অপূর্ব প্রশান্তি ঘিরে রেখেছে তা অনুভব করছিলাম। ওদের অন্তরের এই নিরাপত্তাবোধ লক্ষ্য করতাম একের প্রতি অন্যের ব্যবহারে, যে আবেগ-উষ্ণ মর্যাদাবোধের সাথে ওরা একে অপরের সাথে দেকা করে বা একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেয় তাতে, অপরকে বন্ধু বলে ভাবে কেবল এ-কারণেই শিশুদের মতো পরস্পর হাত ধরে দু’টি মানুষ যেভাবে এক সাথে চলে তার মধ্যে- দোকানীদের একের প্রতি অন্যের আচরণে, ছোটো দোকানের সেইসব ব্যবসায়ী যারা অবশ্যই পথচারীদের চিৎকার ক’রে ডাকবে- মনে হতো না এ- সব নাছোড়বান্দা দোকানীর কোন বুক চাপা ভয় আছে কিংবাওদের মধ্যে কোন ঈর্ষা আছে, -বিশ্বাস অতোটা চূড়ান্ত পর্যায়ের যে দোকানের মালিক, যখনি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাবার দরকার হয় সে তার দোকনপাট তার প্রতিবেশী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দোকানদারের হেফাজতে রেখে চলে যায় বিনাদ্বিধায়। আমি প্রায়ই দেখতাম, এভাবে ফেলে যাওয়া দোকানের সামনে থেমেছে কোন সত্যিকারের খদ্দের, বোঝাই যাচ্ছে সে নিজের মনে মনে ভাবাগোনা করছে- দোকানদার ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, না সে যাবে পাশের দোকানে জিনিস কিনতে। আর সে অবস্থায় প্রত্যেকবারই পাশের দোকানীট, যে আসলে অনুপস্থিত দোকানীর প্রতিদ্বন্দ্বী, আগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করছে, খদ্দের কি চায় এবং তার নিকট বিক্রি করছে অনুপস্থিত দোকানীর দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসাপাতি- তার নিজের জিনিস নয়, তার অনুপস্থিত প্রতিবেশীর জিনিস, এবং দামটা সে রেখে দিচ্ছে প্রতিবেশীর বেঞ্চির উপর। ইউরোপে এ ধরনের বেচাকেনা কে কবে কোথায় দেখেছে!
বাজারের কোন কোন বাস্তায় জটলা পাকায় শক্ত সবল পরিশ্রমী বেদুঈনেরা, প্রশস্ত লম্বা ঝুলওয়ালা জোমব্বা প’রে। ওরা এমনিতরো মানুষ যে, দেখলেই মনে হয় ওরা যেনো নিজেদের জীবনকে নিজেরাই সংগে নিয়ে চলেছে এবং সবসময়ই চলছে নিজেদের পথে। দীর্ঘদেহী লোকগুলি, গভীর জ্বলজ্বলে ওদের চোখ, দল বেঁধে ওরা দাঁড়া, না হয় বসে পড়ে দোকানের সামনে। একে অন্যকে খুব বেশি কথা ওরা বলে না- একটি শব্দ, একটি ছোট্ট বাক্য মন দিয়ে বললে এবং মন দিয়ে তা শুনলে, দীর্ঘ আলাপের জন্য তা-ই হয় যথেষ্ট। বুঝতে পারলাম, এই বেদুঈনের দল অযথা বকবক করতে জানে না। বকবক করা মানে সেই ধরনের কথা বলা যার কোন বিষয় নেই, যাতে নেই কোন ঝুঁকি, যা ক্ষয়িত আত্মার একটা বিশেষ চিহ্ন। এবং আমার মনে পড়লো আল-কুরআনের সেই শব্দগুলি যাতে বর্ণনা করা হয়েছে জান্নাতের জীবনকে- ‘এবং তুমি সেখানে শুনতে পাবে না কোন অসার কথা’। মনে হলোঃ নীরবতা হচ্ছে একটি বেদুঈন গুণ। ওরা নিজেদেরকে আচ্ছাদিত করে চওড়া বাদামী, সাদা অথবা কালো জোব্বায় এবং চুপ করে থাকে। ওরা যখন আপনার পাশ দিয়ে যায় ওরা আপনার দিকে তাকাবে শিশুর নীরব দৃষ্টিতে- গর্বিত, নম্র ও সজাগ। আপনি যখন ওদের সম্বোধন করেন ওদের ভাষায় ওদের কালো চোখের তারায় সহসা স্ফূরিত হয় স্মিত হাস্য! কারণ ওরা নিজেদের মধ্যে ডুবে থাকে না এবং ওরা চায় যে, অপরিচিতরা ওদের বুঝুক। ওরা হচ্ছে ‘অভিজাত…. শরীফ’ …. একেবারেই চুপচাপ অথচ জীবনের সকল বিষয়ের প্রতিই মুক্ত হৃদয়।
শুক্রবারে, যা মুসলমানদের ছুটির দিন, আমি দামেশকের জীবনে লক্ষ্য করতাম এক ছন্দ পরিবর্তন, আনন্দময় উত্তেজনার একটুখানি চাঞ্চল্য, একটা ঝটকা এবং তারই সাথে ভাবের গাম্ভীর্য। আমার মনে পড়লো- ইউরোপে আমাদের রোববারগুলির কথা- নগরীর নির্জন রাস্তাঘাট এবং বন্ধ দোকানপাটের কথা, সেই সব অর্থহীন শূন্যগর্ভ দিন আর সেই শূণ্যতা যা দুর্বহ পীড়ন এনে দিতো, তার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এরূপ কেনই বা হবে। ক্রমে আমার এই উপলব্ধি হতে লাগলোঃ এর কারণ, প্রতীচ্যের প্রায় সকল লোকের কাছেই ওদের রোজকার জীবন হচ্ছে একটি বোঝা, যা থেকে কেবল রোববারগুলিই ওদের দিতে পারে নিস্তার। রোববার এখন আর অবকাশের দিন নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অবাস্তত জগতে, এক আত্মপ্রতারণামূলক বিস্মৃতিতে পালানোর একটি উপায়, যে বিস্মৃতির পেছনে উকি মারছে দ্বিগুণ ভারী আর ভয়ংকর বিগত হপ্তার দিনগুলি।
এদিকে, আরবদের কাছে কিন্তু শুক্রবার হপ্তার বাকি দিনগুলি বিস্মৃত হবার একটি সুযোগ নয়; এর মানে এ নয় যে, এ লোকগুলির কোলে জীবনের ফল-ফসল সহজে এবং অনায়াসে ঝরে পড়ে। বরং এর সোজা মানে হচ্ছে- ওদের পরিশ্রম, হোক না কঠোরতম, ওদের ব্যক্তিগত আরজু- আকাঙ্ক্ষার সাথে সংঘাত বাঁধায় না। রুটিনের জন্যে রুটিন এদের জীবনে নেই। তার পরিবর্তে একজন কর্মরত মানুষ ও তার কাজের মধ্যে রয়েছে একটা নিবিড় আন্তরিক যোগ। কাজেই এদের জীবনে বিশ্রামের শুধু তখনি প্রয়োজন হয় যখন ওরা ক্লান্তি বোধ করে। মানুষ আর তার কাজের মধ্যে সংগতি, এই মিলকে ইসলাম নিশ্চয়ই স্বাভাবিক অবস্থা বলে বিবেচনা করে, আর এজন্যই শুক্রবার বাধ্যতামূলক বিশ্রামের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। কুটির শিল্পী এবং দামেশক বাজারের দোকানীরা কয়েক ঘণ্টা কাজ করে, কয়েক ঘণ্টার জন্য দোকানপাট রেখে দিয়ে ওরা যায় মসজিদে জুম’আর সালাত আদায় করতে। তারপর কোন ক্যাফেতে গিয়ে বসে, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সাক্ষাৎ করে। এরপর ওরা আবার ফিরে আসে ওদের দোকানপাটে, নিজ নিজ কাজে। এবং আরো কয়েক ঘণ্টা আনন্দ ও স্ফুর্তির সাথে তারমুক্ত হৃদয়ে ওরা কাজ করে চলে, যার যেমন খুশি। মাত্র অল্প ক’টি দোকানই আমি বন্ধ করতে দেখেছি এবং সে-ও কেবল সালাতের সময়ে, যখন লোকজন গিয়ে জমা হতো মসজিদে। দিনের বাকি সময়ে রাস্তাগুলিতে মানুষ গমগম করে, কর্মমুখর থাকে হপ্তার অন্য দিনগুলির মতোই।
এক শুক্রবারে আমি ‘উমাইয়া মসজিদে’ গিয়েছিলাম আমার এক দোস্তকে নিয়ে, যাঁর মেহমান ছিলাম আমি। মসজিদের গম্বুজ অনেকগুলি স্তম্বের উপর দাঁড়িয়ে আছে; জানালার ভেতর দিয়ে আলো এসে পড়ায় তা ঝলমল করছে। বাতাসে ভাসছে মেশকের খোশবু। মসজিদের মেঝেটি লাল নীল কার্পেট দিয়ে ঢাকা। দীর্ঘ সমান সমান সারিতে কাতারবন্দী হয়ে লোকেরা দাঁড়িয়েছে ‘ইমামে’র পেছনে। ওরা মাথা নিচু করছে, হাঁটু গেড়ে বসছে ভূমিতে ঠেকাচ্ছে কপাল এবং আবার সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে; সকলের মধ্যে এক সুশৃংখল ঐক্য, সৈনিকদের মতো। এমনি নিরিবিলি চুপচাপ ব্যাপার। লোকেরা যখন জামা’আতে দাঁড়ালো, আমি অনেক দূরে। বিশাল মসজিদের ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম বৃদ্ধ ‘ইমামে’র কণ্ঠস্বর। তিনি কুরআনের আয়াত আবৃত্তি করছিলেন। তিনি যখন মাথা নিচু করছেন বা সিজদায় যাচ্ছেন, গোটা জামা’আতেই একটিমাত্র ব্যক্তির মতো অনুসরণ করছে তাঁকে। আল্লাহর সামনে তারা মাথা নিচু করছে এবং সিজদায় যাচ্ছে, যেন আল্লাহ তাদের চোখের সামনেই রয়েছেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করলামঃ এই লোকগুলির কাছে ওদের আল্লাহ এবং ধর্ম কতো কাছের, কতো আপন!
-‘কী বিস্ময়কর! কী চমৎকার!’ আমি আমার বন্ধুকে বলি মসজিদ থেকে বের হতে হতে- ‘তোমরা আল্লাহকে তোমাদের এতো কাছে বলে অনুভব করো! আমার ইচ্ছা হয়, আমি নিজেও যদি ঠিক এরূপ অনুভব করতে পারতাম’।
-‘কিন্তু ভাই, এর চেয়ে অন্যরূপ হওয়াই বা কি করে সম্ভব? আমাদের পবিত্র কিতাব যেমন বলে, “আল্লাহ কি তোমাদের গর্দানের রগের চেয়েও তোমার নিকটতরো নন?’
এই নতুন উপলব্ধিতে চঞ্চল হয়ে আমি দামেশকে আমার প্রচুর সময় ব্যয় করি, ইসলাম সম্পর্কে যখনি যে কিতাব পাই তা-ই পড়ে পড়ে। আরবী ভাষার উপর আমার দখল কথাবার্তার জন্য যথেষ্ট হলেও তখনো তা মূল কুরআন পাঠের জন্য ছিলো খুবই অপ্রচুর। কাজেই আমি দু’টি তর্জমার আশ্রয় নিই- একটি ফরাসী, অপরটি জার্মান। তর্জমাগুলি আমি সংগ্রহ করেছিলাম এক লাইব্রেরী থেকে এছাড়া বাকী সবকিচুর জন্য আমাকে নির্ভর করতে হলো ইউরোপীয় প্রাচ্যাতত্ত্ববিদদের বই-পুস্তক আর আমার বন্ধুর ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণের উপর।
যতো আংশিক এবং বিচ্ছিন্নই হোক না কেন, আমার জন্য এই সব পড়াশোনা এবং আলাপ-আলোচনা হলো যবনিকা তোলার মতো- এমন একটি চিন্তার জগৎ দেখতে শুরু করলাম যার বিষয়ে এতোদিন আমি ছিলাম সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
মনে হলোঃ ধর্মকে সাধারণ অর্থে লোকে যা বোঝে ইসলাম সে রকম কিছু নয়- বরং এ যেন এক জীবন-ব্যবস্থা, শাস্ত্রবিধি এ যতোটুকু নয় তার চইতে অনেক অনেক বেশি গুণে, এ হচ্ছে ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের একটি কর্মসূচী, যার ভিত্তি আল্লাহর উপলব্ধির উপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআনে কোথাও আমি কোন উল্লেখ পেলাম না ‘পরিত্রাণের’ প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। ব্যক্তি এবং তার নিয়তিম মধ্যে কোন আদি জন্মগত পাপ দাঁড়িয়ে নেই; কারণ মানুষ কিছুই পাবে না যার জন্য সে চেষ্টা-সাধনা করে তা ছাড়া’। পবিত্রতার কোন গোপন প্রবেশদ্বার খোলার জন্য কোন কৃচ্ছব্রত বা সন্ন্যাসের প্রয়োজন নেই- এবং আল্লাহ যে-সব সহজাত কল্যাণকর গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন প্রতিটি মানুষকে সেগুলি থেকে বিচ্যুতিই তো পাপ। পাপ তো এছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের প্রকৃতি বিচার করতে গিয়ে কোন দ্বৈতবাদের অবকাশ রাখা হয়নি। দেহ আর আত্মা মিলে এক অখণ্ড সত্তা মনে করে ইসলাম।
প্রথমে আমি কেবল আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং আপাতদৃষ্টিতে যা জীবনের তুচ্ছ এবং বৈষয়িক ব্যাপার তা নিয়েও আল-কুরআনের ঔৎসুক্যে চমকে উঠেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বুঝতে শুরু করলামঃ মানুষ যদি দেহ আর আত্মা নিয়ে একটি গোটা সত্তা হয়ে থাকে, যা ইসলাম দাবি করে, তাহলে জীবনের কোনদিকই এতো তুচ্ছ হতে পারে না যে, তা ধর্মীয় এখতিয়ারের বাইরে পড়বে। এ সব বিষয়কে নজরে রেখেই কুরআন কখনো তার অনুসারীদের একথা ভূলতে দেয় না যে মানুষের এই পার্থিব জীবন মানুষের উচ্চতর জীবনের পথে একটি স্তর মাত্র এবং তার চূড়ান্ত লক্ষ্যটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক প্রকৃতির। বৈষয়কি উন্নতি ও সমৃধ্ধি কাম্য, কিন্তু তা-ই লক্ষ্য নয়। এজন্য, মানুষের ক্ষুধা-তৃষ্ণার যদিও নিজস্ব যৌক্তিকতা আছে তবু তা নৈতিক চেতনার দ্বারা অবশ্য সংযত ও নিয়ন্ত্রিক করতে হবে। কেবল যে আল্লাহর সংগে মানুষের সম্পর্কের সাথে এই চেতনার যেগা থাকবে তা নয়, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের সাথেও এর যোগ থাকবে; কেবল সৃষ্টির সংগেও তার সম্পর্ক থাকবে যা সকলের আত্মিক বিকাশেরও অনুকুল, যা’তে করে সকল মানুষই পূর্ণ জীবন-যাপন করতে পারে।
এ সবই ছিলো, এর আগে আমি ইসলাম সম্বন্ধে যা কিছু শুনেছি এবং পড়েছি সে-সব থেকে, মানসিক নৈতিক দিক দিয়ে অনেক বেশি ‘শ্রদ্ধেয়’। আত্মিক জগতের সমস্যাবলী সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভংগী ওল্ড টেস্টামেন্টের চাইতে অনেক বেশি গভীর মনে হলো। অধিকন্তু বিশেষ একটি জাতির প্রতি ওল্ড টেস্টামেন্টের যে পক্ষপাত দেখা যায় এতে তা-ও নেই। তা ছাড়া, জৈবিক সমস্যাবলীর প্রতি এর দৃষ্টি নিউ টেস্টামেন্টের চাইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং খুবই ইতিবাচক। আত্মা ও দেহের সম্পর্ক, দুয়ের প্রত্যেকেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট নিয়ে, আল্লাহ-র সৃষ্ট মানব-জীবনর যগল দিক ছাড়া আর কিছু নয়।
-‘এই শিক্ষাই কি,’ আমি জিজ্ঞাসা করি নিজেকে,’ এতোদিন আরবদের মধ্যে যে আবেগ অনুভূতির নিশ্চয়তা আমি উপলব্ধি করেছি, তার জন্য দায়ী নয়?’
এক সন্ধ্যায় আমার মেহমানদার আমাকে দাওয়াত করেন তাঁর সংগে দামেশকের এক ধনী বন্ধুর বাড়িতে খানার মজলিসে। বন্ধুটি তাঁর এক পুত্রের জন্মোৎসব পালন করেছিলেন।
আমরা দু’জনে হাঁটছিলাম ভেতরের নগরীর আঁকা-বাঁকা গলিপথে। এতোই সংকীর্ণ সে গলি যে, রাস্তার দু’পাশের বাড়ি-ঘরের দেয়াল থেকে রাস্তার উপর বের হয়ে আসা জানালা ও জাফরি দেওয়া ব্যালকনি প্রায় গায়ে গায়ে ঠেকেছে। পাথরের তৈরি পুরানো বাড়িগুলির মধ্যে জেঁকে আছে গাঢ় ছায়া আর প্রশস্ত নীরবতা, কখনো কখনো দু’একটি কালো বোরখায় ঢাকা মেয়ে ত্বরিৎ ছোট্ট পদক্ষেপে আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। একবার দেখলামঃ একজন দাড়িওয়ালা লোক লম্বা ‘কাফতান’ গায়ে, পথের একটি মোড় থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো অন্য এক মোড়ে। রাস্তার মোড় এবং অনিয়মিত কোণগুলি সর্বত্র একই ধরনের; একই রকম সংকীর্ণ গলি, যার একটি অপরটিকে কেটে চলে গেছে নানাদিকে, হামেশাই এই প্রতিশ্রুতিসহ যে, সামনেই কোন-না- কোন বিস্ময়কর আবিষ্কার রয়েছে এবং প্রত্যেকবারই একই ধরনের অন্য এক গলিতে গিয়ে মিশিছে!
কিন্তু আবিস্ক্রিয়াটি ঘটলো একেবারে শেষে। আমার বন্ধু এবং রাহনুমা একটা সাদামাটা, মাটির আস্তর দেয়া দেয়ালের উপর স্থাপিত নাম নম্বরহীন এক কাঠের দরোজার সামনে এসে দাঁড়ালো এবং মুষ্টবদ্ধ হাত দিয়ে দরোজায় ধাক্কা দিতে দিতে বললঃ এই যে, আমরা এসে পড়েছি।
একটা ক্যাঁচকোচ শব্দ করে দরজাটা খুলে যায়। একজন একদম বুড়ো লোক তার দন্তহীন মুখে আমাদের খোশ আমদেদ জানালো ‘আহলান ওয়া সাহলান’ বলে। তারপর আমরা একটি ছোট্ট করিডোরের ভেতর দিয়ে, যার ছিলো দুটি সমকোণবিশিষ্ট বাঁক, ঢুকলাম বাড়ির প্রাংগণে- যা বাইরে থেকে একটি মেটে রঙের খোলার বেশি কিছু মনে হচ্ছিলো না।
প্রাংগণটি প্রশস্ত এবং হাওয়া খেলানো। সাদা এবং কালো রঙের মার্বেলের টুকরা দিয়ে প্রাঙগণটি মোড়ানো। দেখতে মনে হয় যেন মস্ত বড়ো একটা দাবার ছক। মাঝখানে একটি নিচু আট কোণা বেসিন থেকে একটি ফোয়ারা খেলছে, গুঁড়া গুঁড়া পানি ছিটাচ্ছে। মার্বেলে মোড়া মেঝের মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট ব্যবধানে ছোট ছোট ফাঁক। সেই ফাঁকগুলিতে লাগানো লেবু গাছ এবং ওলিয়েগুরের ঝোপ তাদের ফুল-ফলে নূয়ে পড়ে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়েছে সমস্ত প্রাংগণের উপর এবং ভেতরের গৃহপ্রাচীরের ধার ঘেঁষে ঘেঁষে, দেয়ালগুলি ভূমি থেকে ছাদ পর্যন্ত অতি সূক্ষ্ম কারুকার্য করা অ্যালাবাস্টার রিলিফে ঢাকা যাতে রয়েছে জটিল জ্যামিতিক নকশা আর লতাপাতা আঁকা আরাবেষ্ক, ব্যতিক্রম কেবল খিড়কিগুলি যাতে স্থাপন করা হয়েছে মার্বেলের উপর খোলা জলির কাজ করা প্রশস্ত ফ্রেম। প্রাংগণের একদিকে দেয়ালগুলি বেঁকে গিয়ে ভূমি থেকে প্রায় তিন ফুযট উঁচুতে তৈরি করেছে একটি গভীর কুলুংগি, যার আকার একটি বড় কোঠার মতো, যেখানে উঠতে হয় মার্বেরের প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে। এই যে কুলুংগিটি, যাকে বলা হয় ‘লিওয়ান’- এর তিনটি দেয়াল ঘেঁষে পাতা রয়েছে নিচু বুটিদার দিওয়ান এবং মেঝের উপর বিছানো রয়েছে একটি খুব দামী গালিচা। কুলুংগির দেয়ালগুলিতে লাগানো হয়েছে বড় বড় আয়না, যার একেকটির উচ্চতা হবে প্রায় পনেরো ফুট এবং গোটা প্রাংগণটি, তার গাছপালা, তার সাদা-কালো মেঝে, তার অ্যালাবাস্টার, রিলিফ, মার্বেলের জানালার জালি এবং বাড়ির ভেতরে ঢোকার খোদাই করা দরোজা, আর মেহমানদের বর্ণাঢ্য ভিড়, যাদের কেউ কেউ বসেছে দিওয়ানে আর কেউ কেউ পানির বেসিনটির চারপাশে ঘোরাফেরা করছে- এ সব কিছুই প্রতিবিম্বিত হচ্ছিলো লিওয়ানের’ আয়নাগুলিতে এবং আমি যখন সেগুলির দিকে তাকালাম, আমি আবিস্কার করলাম, উঠানের বিপরীত প্রাচীরটিও আগাগোড়া এমনি আয়না দিয়ে মোড়ানো, যার ফলে গোটা দৃশ্যটিই প্রতিবিম্বত হচ্ছিলো দু’বার চারচার শতবার এবং এভাবে রূপ নিচ্ছিলো এক ইন্দ্রজালে, মার্বেল আ্যলবাস্টার, ফোয়ারা, অগণিত লোকজন, লেবু গাছের ঝাড়, ওলিয়েণ্ডার, ঝোপের অন্তহীন পরিক্রমণ- এক অন্তহীন স্বপ্নপূরী ঝলমল করছে সান্ধ্য আকাশের নিচে, যার বর্ণ অন্তহীন সূর্যের রশ্মিতে এখনও গোলাপী।
এ ধরনেদর একটি বাড়ি, রাস্তার দিকে সাদামাটা, অলংকৃত, ভেতরে জমকালো ও মনোরম, আমার কাছে ছিলো একেবারেই অভিনব। কিন্তু কালক্রুমে আমি জানতে পারলাম, কেবল সিরিয়া এবং ইরাকে নয়, বরং ইরানেরও সংগতিপন্ন মানুষের চিরাচরিত বাসগৃহের এই হচ্ছে নমুনা। আগেকার দিন আরব কিংবা ইরানী কেউই বাড়ির সমুখভাগ নিয়ে মাথা ঘামাতো না। তাদের কাছে ঘর ছিলো বাস করার জন্য এবং এর উপযোগিতা ছিলো ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ জিনিসটি, আধুনিক পশ্চিমা স্থাপত্যে জোর করে যে ‘উপযোগিতা’ সৃষ্টির এতো চেষ্টা করা হয়ে থাকে কতোই না ভিন্ন। এক ধরনের বিকৃত রোমান্টিসিজমের জালে আটকা পড়া, নিজস্ব অনুভূতি সম্পর্কে অনিশ্চিত প্রতীচ্যের লোকেরা আজকাল বাড়ির নকশা করতে গিয়ে তৈরি করে সমস্যা, আর আরব এবং ইরানীরা তৈরি করে, অথবা গতকালও তৈরি করতো, ঘর।
আমার মেহমানদার আমাকে তাঁর ডান পাশে দেয়ালের উপর বসালেন। একটি নগ্নপদ নওকর ছোট্ট একটি পিতলের ট্টেতে করে কফি পরিবেশন করে; গুড় গুড় আওয়াজ ওঠা ‘নারকেলে’র হুকা থেকে ধোঁয়া উঠে ‘লিওয়ানে’ গোলাব পানির খোশবু মিশানো হাওয়ার সংগে মিলে যায় এবং কুণ্ডলী পাকিয়ে ভেসে যায় কাঁচের ঢাকনা দেয়া মোমবাতিরগুলির দিকে আর মোমবাতিগুলি জ্বলানো হচ্ছিলো একটির পর একটি, দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে এবং গাছপালায় ঘনায়মান সবুজের ফাঁকে ফাঁকে।
উপস্থিত লোকজন সকলেই পুরুষ এবং অতি বিচিত্র ধরনের। ওদের অনেকের গায়ে ডোরাকাটা খসখসে দামেশকী রেশেম অথবা হাতীর দাঁতের বর্ণবিশিষ্ট মোটা চীনা রেশেমের কাফতান অথবা নীলচে মিহি পশমের বিশাল ‘জোব্বা’। আর মাথায় লাল ‘তরবুশে’র উপর জরির কাজ করা সাদা পাগড়ি।কেউ কেউ পরেছে ইউরোপীয় পোশাক, কিন্তু তা নিয়েই, স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, ওরা দিওয়ানের উপর, গায়ের উপর পা রেখে বসে আছে পরম আরামে। কোন কোন বেদুঈন সর্দার ওদের দলবল নিয়ে এসেছে স্তেপ অঞ্চল থেকে, ওদের চোখগুলি উজ্জ্বল, আর কৃশ বাদামী রংয়ের মুখে খাট কালো দাড়ি। ওদের প্রত্যেকটি অংগ সঞ্চালনের সংগে সংগে ওদের নতুন কাপড়-চোপড়ের খসখস আওয়াজ হচ্ছে; ওরা প্রত্যেকেই বহন করছে রূপার খাপে ঢাকা তলোয়ার। আলস্যভরে পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিন্ত আরামের ভংগী ওদেরঃ খাঁটি অভিজাত ওরা- কেবল ওদের বেলা ইউরোপীয় অভিজাতদের থেকে তফাতটা এই যে, ওরা বহু পুরুষের আন্তরিক যত্ন এবং ভদ্র জীবন- যাপনের ফলে উদ্ভুত মৃদু উজ্জ্বল এক জাত নয়, বরং ওরা যেন নিজেদের অনুভূতির নিশ্চয়তা থেকে বার হয়ে আসা তপ্ত আগুন। সুন্দর বাতাস, একটি শুকনা পরিষ্কার আবহাওয়া ওদেরকে ঘিরে আছে। ঠিক একই ধরনের আবহাওয়া তার বিশুরদ্ধতার দ্বারা ঘিরে রেখেছে সবাইকে, তবে অযাচিতভাবে নয়। এই লোকগুলি যেন সূদুরের বন্ধু, এ জায়গার ক্ষণিক মুসাফিরঃ ওদের মুক্ত লক্ষ্যহীন জীবন ওদের জন্য অপেক্ষা করছে অন্য কোথাও।
নাচনেওয়ালী এক মেয়ে বের হয়ে এলো একটি দরোজা দিয়ে এবং হালকা পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো ‘লিওয়ানে’। মেয়েটি বয়সে খুবই কাঁচা, নিশ্চয়ই কুড়ি বছরের বেশি হবে না এবং দেখতে অতি খুবসুরত। চড়চড় আওয়াজ করা, অবস্থান বদলের সাথে সাথে রং বদলায় এমনি এক ধরনের রেশমের ঢেউ খেলানো ইজার পরে, সোনালী রয়ের এক জোড়া চটি পায়ে আর মুক্তার বর্ডার দেয়া বডিস পরে, যা যতোটুকু না ঢেকেছে তার চাইতে বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে তার উঁচু উন্নত স্তন যুগকে, মেয়েটি আগালো এমনি এক তরুণীর ইন্দ্রিয়জ সৌন্দর্য ছড়িয়ে যে সকলের প্রশংসা পেতে ও বাঞ্ছিত হতে অভ্যস্ত আর তরুণীটির নরম মোলায়েম অংড়-প্রত্যংগ এবং তার টান টান হাতির দাঁতের মতো শ্রভ্র ত্বকের দৃশ্যে এই মজলিসের ভেতর দিয়ে আনন্দের যে একটা কল্লোল উঠলো, আমি যেন তা শুনতে পেলাম।
মেয়েটি তার সাথেই ‘লিওয়ানে’ যে মাঝারি বয়সের লোকটি এস ঢুকেছে তার হাতের তবলার বোলের সংগে তাল রেখে ঐ ধরনের চিরাচরিত কামোদ্দীপক নাচ নাচতে শুরু করে যা প্রাচ্যের অতি প্রিয় জিনিস, ঘুমন্ত বাসনাকে জাগিয়ে তোলা আর রুদ্বশ্বাস বাসনা পূর্তির আশ্বাস দানই যে নাচের উদ্দেশ্য।
-‘ওহো, কি বিস্ময়কর তুমি! ওহো, কি চমৎকার তুমি!’ আমার মেহমানদার বিড় বিড় করে, তারপর আমার হাঁটুতে আলতো করে থাপপড় মেরে বলে, ‘ছুড়ি কি একটি জখমের ওপর স্নিগ্ধ শীতল মলমের মতো নয়?’
নাচনেওয়ালীটি যেমন দ্রুত এসেছিলো তেমনি ত্বরিৎ আবার সে চলে গেলো- তার কিছুই আর অবশিষ্ট রইলো না কেবল বেশিরভাগ লোকের চোখে একটি অস্পষ্ট ঝিকিমিকি ছাড়া। ‘লিওয়ানে’র গালিচার উপর এখন নাচনেওয়ালীর স্থান গ্রহণ করেছে চারজন গায়ক। মেহমানদের একজন আমাকে বললঃ ‘এদের মধ্যে কেউ কেউ হচ্ছে সিরিয়ার সেরা গায়ক’। ওদের একজনের হাতে একটি লম্বা গলাওয়ালা বাঁশের বাঁশী। অপরজনের হাতে একটা চ্যাপটা এক মাথাওয়ালা ঢোল, অনেকটা ঘুংঘুর ছাড়া তাম্বয়ার মতো, তৃতীয় জনের হাতে এমন একটি যন্ত্র রয়েছে যা দেখতে গীটারের মতো এবং চতুর্থ জন নিয়েছে একটি মিসরীয় ‘তাম্বুরা’ যেনো একটা খুব চওড়া পিতলের বোতল, যার তলা ঢোলের চামড়া দিয়ে মোড়া।
প্রথমে ওরা খেলাচ্ছলে সূক্ষ্মভাবে টুঙটাঙ আওয়াজ তোলে, ঢোলে আঘাত করে, কোন রকম অনুভবযোগ্য স্পষ্ট তান লয় ছাড়াই; যেন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, যেন তারা যন্ত্রগুলিতে সূর তুলছে একটা সাধারণ উর্ধ্বমূখী তাল সৃষ্টির প্রস্তুতি হিসাবে। যার হাতে গীটার রয়েছে সে তার যন্ত্রে তারগুলির উপর দিয়ে উঁচু থেকে নিচু দিকে কয়েকবার তার আঙৃলের ডগা টেনে নেয়, ফলে একটা নিয়ন্ত্রিত বীণাধ্বনির আমেজ সৃষ্টি হয়। তাম্বারা-বাদক মোলায়েমভাবে তার ‘তাম্বারা’ বাজায়, বিরতি নেয় এবং আবার বাজায়। বাঁশীওয়ালা যেন আনমরা পর পর দ্রুতপতিতে কয়েকটি নিচু, তীক্ষ্ণ তন্ত্রীতে আঘাত করে, এমন সব তন্ত্রী, যা মনে হয়, যেন আকস্মিকভাবেই শুষ্ক একঘেঁয়ে বার বার আঘাত করা খঞ্জনীর সংগে মিলে যাচ্ছে এবং এই মুহূর্তে বাঁশীর, পরমূহূর্তে গীটারের তারের প্রচণ্ড ঝংকারের প্রতি দ্বিধার সংগে সাড়া দিতে ‘তাম্বুরা’কে বাধ্য করছে- আমি এ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠার আগেই একটি ঐকিক তান লয়, চারটি যন্ত্রকে এক সংগে বেঁধে দিলো আর একটি ঐকতানে রূপ নিলো। একটি ঐকতান?- আমি বলতে পারবো না, আমার মনে হলো, একটি সংগীত অনুষ্ঠানের প্রতি আমি যতোটা না মন দিয়েছি তার চেয়ে বেশি আমি প্রত্যক্ষ করছি উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা। আর যন্ত্রগুলির অবোধ্য তীক্ষ্ম স্বর থেকে জন্ম নিলো একটি নতুন তান লয়, যা উঠছে উচ্চগ্রামে, যেন গাঢ়, শংখের মত পেঁচানো রেখায় এবং তারপর হঠাৎ নেমে যাচ্ছে একেবারে নিচুতে, একটা ধাতব বস্তুর ছন্দময় উত্থান ও পতনের মতোঃ কখনো দ্রুতগতিতে, কখনো আস্তে, কখনো মোলায়েম ভাবে, কখনো সজোরে, নিস্পৃহ ঐকান্তিকতা ও আন্তহীন পরিবর্তনের মাধ্যমে এই নির্বিঘ্ন ঘটনা, এই ধ্বনি ও শ্রুতিগত ব্যাপার, যা কাঁপছে একটি সংগত নেশার মধ্যে, বেড়ে উঠে প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ে প্রবেশ করে আমার চেতনায়ঃ এবং যখন ক্রমে, উচ্চগ্রামে ধাবমান এক সংগীতের মধ্যে হঠাৎ (তা কতো শীঘ্র আহা! কতো শীঘ্রই না থেমে গেলো!-) আমি বুঝতে পারলামঃ আমি বন্দী হয়েছি। এই সংগীতের উত্তেজনা আমাকে আমার অলক্ষ্যেই করে তুলেছিলো মোহবিষ্ট, আমাকে যেন পাকড়াও করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এই সব সূরে রাজ্যে, যে সূরগুলি তাদের বাহ্যিক একঘেয়েমিরই মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেয় অস্তিত্ববান সকল বস্তুর চিরন্তন পুনরাবৃত্তির কথা, এবং আমার অনুভূতির দরজায় ধাক্কা দিয়ে, আমার অজ্ঞাতে যা- কিছু আমার মধ্যে ক্রিয়াশীল রয়েছে সবকিছুকে ধাপে ধাপে আনে বা’র করে- এমন কিছুকে অনাবৃত ক’রে সামনে রাখে যা সবসময়ই ছিলো, যা এখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এমন এক তীব্র উজ্জ্বলতার সংগে যে, আমার হৃৎপিণ্ড ধড়াস ধড়াস করতে লাগলো।
পাশ্চাত্য সংগীতের সাথে আমি পরিচিত। এ সংগীতের সুরকারের আবেগের সমগ্র পটভূমি পতিটি স্বতন্ত্র সূরে টেনে আনা হয় এবং প্রতিটি মেজাজে প্রতিফলিত করে সম্ভাব্য আর সকল মেজাজকে। কিন্তু এই আরবী সংগতি যেন উৎসারিত হলো চেতনার একই সমতল থেকে, একটি মাত্র নাজুক হালত থেকে- নাজুক হালত ছাড়া আর কিছুই যা ছিলো না- আর সে কারণেই তার প্রত্যেক শ্রোতার অনুভূতির ব্যক্তিগত মেজাজগুলিকে ধারণ করতে ছিলো সক্ষম….
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর নিচু চাপা ভারিক্কি সূরে ‘তাম্বুরা’ বেজে ওঠে এবং বাকি যন্ত্রগুলি করে তার অনুসরণ। এবারকার সুর আগের চেয়ে অনেব বেশি নারীসুলভ; প্রসারণ অনেক বেশি মোলায়েম, প্রত্যেকের আলাদা- আলাদা কণ্টস্বর একে অপরের সাথে খাপ খেয়ে যায় নিবিড়ভাবে, পরস্পরকে আলিংগন করে আবেগ-উষ্ণতার সাথে এ যেন একটা যাদুমন্ত্রে একত্র বাঁধা পড়ে অনেক-অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওরা একে অন্যকে আঘাত করে একে অপরকে ঘিরে প্রবাহিত হয় মৃদু তরংগায়িত রেখায়, যা প্রথমে কয়েকবার সংঘর্ষ বাঁধায় ‘তাম্বুরা’র দ্রুত তালের সংগে যেন একটি কঠিন বাধার সংগে সংঘর্ষ। কিন্তু ধীরে ধীরে ওরা আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং ‘তাম্বুরা’র উপর বিজয়ী হয়ে এক বন্দী করে ফেলে, ওকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আপসে একটি সাধারণ, পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওঠা সুরের উচ্চগ্রামে এবং তাম্বুরা প্রথম অনিচ্ছুক হলেও শিগগিরই সাধারণ বিহ্বলতার শিকার হয়ে পড়ে আর নেশায় মাতাল হয়ে যোগ দেয় আর সবার সংগে। তরংগায়িত রেখা হারিয়ে ফেলে তার নারীসূলভ কমনীয়তা আার ছুটে চলে বেড়ে ওঠা প্রচণ্ডতার সংগে, দ্রুততরো উচ্চতরো তীক্ষ্ণতরো হয়ে- সচেতন প্রবৃক্তির এক শীতল ক্রোধের মধ্যে, যে- প্রবৃত্তি সংযমের সমস্ত বাঁধন ছিড়ে ফেলেছে! সে তরংগায়িত রেখাই এবার পরিণত হলো শক্তি ও সার্বভেৌমত্বের অদৃশ্য কয়েকটি চূড়ার দিকে এক মাতাল বিহ্বল উর্ধ্বাভিসারে; কিছুক্ষণ আগেকার একে-অপরকে ঘিরে ঘূর্ণামান প্রবাহ থেকে জন্ম নেয় সূরের সঙ্গতিতে এক প্রচণ্ড চক্রবৎ ঘূর্ণন, চিরন্তন থেকে চিরন্তনের দিকে ছুটে চলা চক্রসমূহ, যার মান নেই, সীমা নেই, লক্ষ্য নেই, যেন অতল গর্তের ছুরির মতো ধারালো কিনারের উপর দিয়ে টানা রাশির উপর ছুটে চলেছে এক রুদ্ধশ্বাস বেপরোয়া বাজিকর, এক চিরন্তন বর্তমানের মর্ধ দিয়ে, এমন একটি উপলব্ধির দিকে যাকে বলা যায় মুক্তি এবং শক্তি- এবং যা সমস্ত চিন্তার অগোচর। হঠাৎ এক উর্ধ্বভিমুখী প্রসারণের মাঝখানে বিরতি, একটি মৃত্যুর নীরবতা- নির্দয়! সৎ। স্বচ্ছ।
গাছের পাতার মর্মর ধ্বনির মতো শ্বাস ফিরে এলো শ্রোতা ও দর্শকরে মধ্যে এবং দীর্ঘায়িত গুঞ্জত ‘ইয়া আল্লাহ ইয়া আল্লাহ’ উঠলো তাদের মধ্য থেকে। ওরা যেন এমনিতরো বুদ্ধিমান শিশু যারা এমন সব খেলায় মগ্ন থাকে, যা তাদের বহু পরিচিত এবং হামেশা তাদেরকে প্রলুব্ধ করে। ওরা সুখে আনন্দে স্মিত হাসি হাসছিলো।
তিন
আমরা আমাদের উট হাঁকিয়ে চলি এবং জায়েদ গান গায়; সবসময় একই তালে, সবসময় একই একঘেয়ে সুরে। কারণ, আরবের মনই হচ্ছে একঘেয়ে; কিন্তু তার মানে এ নয় যে, কল্পনার দিক দিয়ে সে দরিদ্র। কল্পনা শক্তি তার যথেষ্ট। কিন্তু তার সহজাত অনুভূতি প্রতীচ্যের মানুষের মতো বিস্তার, ত্রিমাত্রিক মহাশূণ্য এবং এক সংগে আবেগের নানা সূক্ষ্ম পরিবর্তন নিয়ে মগ্ন নয়। আরবীয় সংগীতের মাধ্যমে কথা বলে একটি মাত্র বাসনা, প্রতিবার, একটি একক আবেগধর্মী অভিজ্ঞতাকে তার সীমার একেবারে শেষপ্রান্তে নিয়ে যাবার জন্য। এই খাঁটি মনোটনিতে, অনুভূতিকে একটি নিরবচ্ছিন্ন উর্ধ্বভিসারী রেখার ঘনীভূত করে দেখার এই প্রায়- ইন্দ্রিয়জ বাসনার মধ্যে আরব চরিত্রের শক্তি এবং ক্রটি- দু-ই নিহিত রয়েছে। এর ক্রটিঃ এই জগৎ জাগতিক পরিসরেও আগে অভিজ্ঞ হতে চায়। আর এর শক্তিঃ আবেগধর্মী জ্ঞান একটি অনন্ত রেখায় উর্ধ্বভিসারী হতে পারে, এ সম্ভাবনায় বিশ্বাসের পরিণাম মনোজগতে মানুষকে পৌছতে পারে আল্লাহর উপলব্দিতে, অন্য কোথাও নয়। কেবলমাত্র এই জন্মগত প্রবণতা, যা মরুবাসীদের একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য, এর বুনিয়াদের উপরেই সম্ভব হয়েচিলো আদি ইহুদীদের তৌহিদ বা একেশ্বরবাদের উদ্ভদ এবং তার সাফল্যজনক পরিপূর্ণ রূপ, মুহাম্মদের ধর্মের। দুয়েরই পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মরুভূমি, মায়ের মতো।
আত্মা এবং দেহ
এক
দিনগুলি গড়িয়ে চলে এব রাতগুলি সংক্ষিপ্ত। আর আমরা দু’জন ক্ষিপ্র পদে চলি দক্ষিণদিকে। আমাদের উটগুলি এখন খুবই সুস্থ, শক্তিমান। সম্প্রতি তাদের পারি খাওয়ানো হয়েছে এবং গত এক দু’দিন তাদেরকে প্রচুর ঘাস খেতে দেওয়া হয়েছে চারণ ক্ষেত্রে। মক্কা আর এ জায়গার মধ্যে এখনো রয়েছে চৌদ্দ দিনের পথ এবং তার বেশিও হতে পারে, যদি আমরা কিছুটা সময় কাটাই- যার খুবই সম্ভাবনা রয়েছে- হাইল ও মদীনা নগীরতে, যে শহর দু’টি পড়বে আমাদেরই রাস্তায়।
এক অস্বাভাবিক অধৈর্য আমাকে পেয়ে বসেছে- এমন একটা তাগিদ যার কোন ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। এতোদিন আমি মনের আনন্দে কোনরকম তাড়াহুড়া না করেই সফর করেছি; জলদি জলদি গন্তব্যে পৌঁছানোর বিশেষ তাকিদ ছিলো না কখনো। সফরে পূর্ণতা এবং লক্ষ্যস্থল সবসময়ই মনে হয়েছে আকস্মিক। কিন্তু এখন আমি উপলব্ধি করতে শুরু করলাম তা-ই যা আমি আরব দেশে আমার বহু বছরে কখনো উপলব্ধি করিনিঃ রাস্তার শেষপ্রান্তে পৌঁছানোর অধৈর্য। রাস্তার শেষ কী? মক্কা দেখা? আমি এই পবিত্র নগরীতে এতোবার গিয়েছি এবং এ জীবনধারাকে এতো বিশদভাবে আমি জানি যে, মক্কা আর আামার জন্য নতুন কোন আবিষ্কারের প্রতিশ্রুতি বহন করে না- অথবা একটি নতুন কোন আবিষ্কার, যা আমি প্রত্যাশা করছি? নিশ্চয়ই তাই হবে। কারণ আমি মক্কার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছি একটি অদ্ভুত ব্যক্তিগত প্রত্যাশায়। পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চল থেকে আগত বহু জাতির মানুষের জামায়েতসহ মুসলিম বিশ্বের এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রটি, আমি একন যে- জগতে বাস করছি তার চাইতে, প্রশস্ততরো এক জগতের প্রবেশ- পথ যেন। এ নয় যে, আমি আরব দেশ নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি; না আমি আরবের মরুভূমি, তার শহর, তার অধিবাসীদের জীবনধারা ভালোবাসি, যেমন আমি আরবের মরুভূমি, তার শহর, তার অধিবাসীদের জীবনধারা ভালোবাসি, যেমন আমি সবসময়ই তাদের ভালবেসেছি। প্রায় দশ বছর আগে সিনাই মরুভূমিতে আরব-জীবনের যে প্রথম আভাস পেয়েছিলাম, তারপর কখনো আমার কাছে নৈরাশ্যের কারণ ঘটেনি এবং পরবর্তী বছরগুলি আমার প্রথম প্রত্যাশাকেই কেবল মজবুত করেছে। কিন্তু দু’দিন আগে ইদারার কাছে আমি যে-রাতটা কাটিয়েছি তখন থেকে আমার মধ্যে এই প্রত্যয় জন্মেছে যে, আরব মুলুক আমাকে তার যা দেবার ছিলো সবই দিয়েছে নিঃশেষে।
আমি শক্ত-সমর্থ, তরুণ এবং স্বাস্থ্যবান। অহেতুক ক্লান্ত না হয়ে আমি একলাগা ঘণ্টার পর ঘণ্টা উট হাঁকিয়ে চলতে পারি। আমি সফর করতে পারি এবং বহু বছর ধরেই আমি সফর করে চলেছি বেদুঈনের মতো, তাঁবু এবং ছোট-খাট সেসব আরাম-আয়েশ ছাড়াই, যা নযদের শহুরে লোকদের মতে দীর্ঘ সফরে অপরিহার্য। বেদুঈন জীবনের ছোট-খাট সব রকম নিপুণতার সাথেই আমি অভ্যস্ত এবং আমার প্রায় অজান্তেই আমি গ্রহণ করেছি নয়দী আরবের চালচলন ও রীতিনীতি। কিন্তু এ-ই কি সম্ভাব্য সব কিছু? আমি কি এতোদিন আরব মূলুকে বাস করেছি কেবলমাত্র একজন আরব হওয়ার জন্য? কিংবা একি এমন কিছুর জন্য প্রস্তুতি যা এখনো ঘটেনি?
….. …… ….. ……
আমি যে চাঞ্চল্য এখন অনুভব করছি তা মধ্যপ্রাচ্যে আমার পয়লা সফরের পর ইউরোপে ফিরে এসে যে তীব্র অধৈর্ড আমি উপলীব্ধ করেছিলাম অনেকটা তারই মতোঃ একটি প্রচণ্ড আবিষ্কারের ঠিক পূর্বমূহূর্তে হঠাৎ থেকে যাওয়ার উপলব্ধি- যে আবিস্কার ঘটতে পারতো আমার জীবনে, যদি আমার হাতে থাকতো কেবল আরো বেশি কিছু সময়।
আর জাহান ছেড়ে আবার ইউরোপ প্রবেশ করার প্রাথমিক চাপ কিছুটা ফিকা হয়ে এসেছিলো- ১৯২৩ সালের শরৎকালে, সিরিয়া ত্যঅগের পর, আমার কয়েক মাস তুরস্কে কাটানোর ফলে। মোস্তফা কামালের তুরস্ক তখনো প্রবেশ করেডিন তার সংস্কারবাদী অনুকরণের পর্যায়ে। তখনো তুরস্ক ছিলো তার জীবনধারার ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে খাঁটি তুর্কী; এবং এজন্য ইসলাম ধর্মের ঐক্যবন্ধনে তখনো সে ছিলো আরব জীবেনর সাধারণ। গতিধারার সংগে সম্পর্কিত। কিনতু তুরস্কের হৃদয়ের দ্বন্দ্বে মনে হয়েছিলো বেশ কিচুটা ভারিক্কি, কম স্বচ্ছ, কম লঘু এবং অনেক বেশি প্রাচ্য দেশীয়। যখন আমি স্থলপথে সফর করি ইস্তাম্বুল থেকে সোফিয়া এবং বেলগ্রেড়ে, মাশরিক থেকে মাগরিবে প্রবেশ আকস্মিক একটা ছেদের মতো মনে হয়নি আমার; চিত্রগুলি বদলালো ধীরে ধীরে, ক্রমশ, একিট পরিবেশ- মিনারের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে, পুরুষদের লম্বা ‘কাফতানে’র জায়গায় দেখা গেলো কিষাণদের কোমরবন্ধ আঁটা জামা। আনাতোলিয়অর বিক্ষিপ্ত গাছপালা ও উপবন যখন হারিয়ে গেলো সার্বিয়ার ফার বনাঞ্চলে তখন সহসা ইতালীর সীমান্তে আমি দেখতে পেলাত- আমি আবার ইউরোপে ফিরে এসেছি।
ত্রিয়েস্ত থেকে ভিয়েনার দিকে যাচ্ছি আমি ট্রেনে। চলতে চলতে তুরস্ক আমার মনের উপর যে- সব ছাপ এঁকে দিয়েছিলো সেগুলির সজীবতা হারিয়ে যেতে লাগলো এবং আরব মুলূকগুলিতে আমি যে আঠারোটি মাস কাটিয়েছিলাম তা-ই কেবল টিকে রইলো একমাত্র বাস্তবরূপে। এ আমার কাছে মনে হলো যেন একটা কশাঘাত যখন আমি বুঝতে পারলাম, আমার এককালের অতো পরিচিত ইউরোপীয় দৃশ্যাবলীর দিকে আমি তাকাচ্ছি এক বিদেশীর চোখে। মানুষগুলি মনে হলো ভয়ানক কুৎসিক, গতিবিধি ওদের রূঢ় এবং বিশ্রী; ওরা যা সত্যি সত্যি অনুভব করে আর চায় তার সাথে ওদের প্রত্যক্ষ কোন সম্পর্কেই নেই; এবং হঠাৎ এক ঝলকে আমি বুঝতে পারলাম, ওরা যা- কিছু করছে তাতে একটা উদ্দেশ্যের বাহ্যিক আভাস থাকলেও ওরাওদের অজান্তেই বাস করছে এক ছলনার জগতে… আরবদের সহবতে আসার ফলে জীবনে আমি যাকে অপরিাহর্য এবং মৌলিক মনে করেছি, অতোদিনে তার প্রতি আমার মনোভাব একেবারে স্পষ্টই এবং অপরিবর্তনীয়ভাবেই বদলে গেছে; অনেকটা বিস্ময়ের সংগে আমি স্মরণ করলাম- আমার পূর্বে বহু ইউরোপীয়ই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে আরব জীবনধারা; তাহলে এ কী করে সম্ভবপর হলো যে, আমি যে আবিস্কারের ধাক্কায় বিচলিত হয়েীছ ওদের সে ধাক্কা লাগেনি? অথবা ওদেরও কি তা লেগেছে? ওদের কেউ কেউও কি ওদের মর্মের গভীরে বিচলিত হয়েছে যেমন আমি এখন হয়েছি?
এ প্রশ্নের জবাব কয়েক বছর পর আমি পেয়েছিলাম আরব মুলুকে। জবাবটি এসেছিলো জেদ্দায় তখনকার দিনের ডাচ মন্ত্রী ডঃ ভ্যান ডার মিউলেনের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন এক উদার বহুমুখী সংস্কৃতির মানুস। আপন ধর্ম খৃশ্চানিটিকে তিনি এমন একটি আবেগ ও নিষ্ঠার সাথে আঁকড়ে ছিলেন যা আজকের পশ্চিমী লোকদের মধ্যে একেবারই বিরল। কাজেই বলা যায়, বোধগম্যবাবেই তিনি ধর্ম হিসাবে ইসলামের বন্ধু ছিলেন না। তা সত্ত্বেও তিনি আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন- জীবনে যেসব দেশের সংগে তাঁর পরিচয় হয়েছে তার প্রত্যেকটি থেকে, এখন কি তাঁর নিজের দেশ থেকেও আরব দেশকে তিনি ভালোবাসেন বেশি। হিজাজে তাঁর কাজের মেয়াদ যখন প্রায় ফূরিয়ে এসেছে, তখন আমাকে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কোন তীক্ষ্ণ অনুভূতিশীল মানুষ কখনো আরবীয় জীবনের যাদু-প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবে না, পারবে না আরবদের মধ্যে কিছুদিন কাটানোর পর এ প্রভাবকে তার হৃদয় থেকে উপড়ে তুলে ফেলতে। কেউ যদি এদেশ থেকে চলে যায়, চিরদিনের জন্য তবু সে হৃদয়ে বহন করবে এই মরুভূমির হাওয়া এবং হামেশাই সে পেছনে ফিরে এক দিকে তাকাবে উৎসুক আকাংখায়, তার নিজের ঘরবাড়ি যদি অনেক বেশি ঐশ্বর্যশালী এবং অনৈক বেশি সুন্দর অঞ্চলে হয়… তবুও’।
আমি কয়েক হপ্তার জন্য ভিয়েনায় থাকি এবং আমার আব্বার সংগে একটা আপোসে আসি। আমার বিশ্বাবিদ্যালয় ত্যাগ এবং যে অসৌজন্যের স াথে আমি তাঁর বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে পড়েছিলাম তার জন্য তিনি তাঁর রাগ ইতিমধ্যেই জয় করেছিলেন। আর যা’ই হোক, আমি এখন ‘ফ্রাংকফৃর্টঅর শাইটুঙ’- এর সংবাদদাতা; এটি এমন একটি নাম, যা তখনকার দিনে মধ্য ইউরোপে উচ্চারিত হতো প্রায় সভয় শ্রদ্ধার সাথে। এই পত্রিকার সংবাদদাতা হয়ে আমি সকলের উপর থাকবো, আমার এই দম্ভপূর্ণ দাবি আমি সার্থক প্রমাণ করেছি।
ভিয়েনা থেকে আমি সোজা রওনা করি ফ্রাংকফুর্টে, সশরীরে সেই কাগজের অফিসে হাজিরা দিতে, যার জন্য আমি এক বছরের অধিককাল ধরে লিখে চলেছি। ওখানে আমি হাজির হই প্রচুর আত্মবিশ্বাস নিয়ে; কারণ ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আমি যে-সব চিঠি-পত্র পেয়েছিলাম তাতে আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, আমার কাজে ওরা খুবই খুমি। আমি সত্যি সত্যিই ওখানে ‘হাজির হয়েছি’। এই উপলব্ধি নিয়ে ঢুকলাম ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’-এর গম্ভীর পুরানো ফ্যাশানের প্রাসাদে। ঢুকে প্রধান সম্পাদক বিশ্ববিখ্যাত ডক্টর হাইনবিশ সাইমন- এর নিকট আমার কার্ড পাঠিয়ে দিলাম।
যখন আমি তাঁর কামরায় ঢুকি, মুহূর্তকালের জন্য তিনি তাকালের নির্বাক বিস্ময়ে; চেম্বার থেকে উঠতেও তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু শিগগিরই তিনি তাঁর সমাহিত বাব ফিরে পেলেন এবং দাঁড়িয়ে আমার সংগে হাত মেলালেন।
-‘বসুন, বসুন। আমি আপনারই অপেক্ষা করছিলাম’। তিনি আমার দিকে নিষ্পলক চোকে তাকিয়ে রইলেন আর কোন কথা না বলে। ফলে, আমি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম।
-‘কোন ক্রটি হয়েছে কি ডঃ সাইমন?’
-‘না, না, কোন ক্রটি হয়নি। কিংবা বলতে পারেন সবই ভূল…’। তারপর তিনি সশব্দে হাসিতে ফেটে পড়লেন এবং বললেন. –‘যেমন করেই হোক, আমি আশা করেছিলাম একটি মাঝারি বয়সের লোকের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি, যার চোখে রয়েছে সোনালী ফ্রেমে আঁটা চশমা; আর আমি কিনা দেখতে পাচ্ছি একটি বালাককে… ওহো, আমাকে মাফ করুন- যদি কিছু মনে না করেন- আপনার বয়স কতো?’
হঠাৎ আমার মনে পড়লো কায়বোর ফুর্তিবাজ ডাচ সওদাগরের কথা; সেও আমাকে এক বছর আগে একই প্রশ্ন করেছিলো। আামি উচ্চ হাস্যে ফেটে পড়লাম, ‘আমার বয়স তেইশের কিছু উপরে স্যার, চব্বিশের কাছাকাছি’ তারপর আমি যোগ করি, ‘আপনি কি মনে করেন ‘ ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর জন্য এ বয়স খুবই কম?’
-‘না’, ধীরে ধীরে জবাব দেন সাইমন, ‘ফ্রাঙ্কফুর্টঅর শাইটুঙ’-এর জন্য নয়, আপনার প্রবন্ধগুলির জন্য। আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম আত্মপ্রচারের স্বাভাবিক ইচ্ছাকে জয় করে নিজের ব্যক্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে লেখার আড়ালে রেখে দেয়া, যেমনটি আপনার লেখায় লক্ষ্য করেছি, তা আরো অনেক বেশি বয়সের মানুষের পক্ষেই সম্ভব। আপনি জানেন, এ হচ্ছে পরিণত সাংবাদিকতার গোপন রহস্যঃ আপনি যা দেখেছেন, শুনেছেন এবং ভাবছেন তার সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠভাবে লেখা, সেই সব অভিজ্ঞতাকে আপনার নিজের একান্ত ‘ব্যক্তিগত’ অভিজ্ঞতার সংগে না জড়িয়ে…। পক্ষান্তরে এ বিয়ষে চিন্তা করে এখন আমার মনে হচ্ছেঃ কেবল খুব এক তরুণই লিখতে পারতো অতো বেশি আগ্রহ উদ্দীপনার সাথে, অতো বিপুল- আমি কেমন করেই যে বলি- অতো বিপুল পুলক রোমাঞ্চের সাথে…
এরপর তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন- ‘আমি এ আশই করছি যে, এ যেন ক্ষয়ে না যায়। এবং আপনি যেন আর সব্বাইর মতো আত্মতুষ্ট, ভোঁতা স্থুল হয়ে না পড়েন-‘।
মনে হয়, আমার এই অীত তারুণ্যের আবিষ্কারই ডঃ সাইমনের এ বিশ্বাসকে আরো শক্ত ও জোরদার করে তোলে যে, তিনি আমার মধ্যে খুবই সম্ভাবনাময় এক সাংবাদিকের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তিনি পুরাপুরি একমত হলেন যে, যতো জলদি সম্ভব আমার আবার মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে যাওয়া উচিত। যতো শীগগিরই ফেরা যায় ততোই ভাল। টাকা-পয়সার দিক দিয়ে এ ধরনের একটি পরিকল্পনার পথে আর কোন বাধা নেই। কারণ শেষপর্যন্ত জার্মান মুদ্রাস্ফীতিকে আয়ত্তে আনা সম্ভব হয়েছে এবং মুদ্রামূল্যে স্থিতিশীলতা আসার ফলস্বরূপ প্রায় সংগে সংগেই এসেছে সমৃদ্ধির এক প্লাবন। ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’ আবার সামর্থ্য অর্জন করেছে তার বিশেষ সংবাদদাতাদের ভ্রমণের খরচ বহন করতে। অবশ্য আবার মধ্যপ্রাচ্যের পথে বের হয়ে পড়ার আগেই, এ সংবাদপত্রটির সাথে যে বইটি লেখার জন্য প্রথমে আমি চুক্তি করেছিলাম, সে বইটি আমাকেলিখৈ দিতে হবে এবং এ-ও ঠিক হলো যে, এই সময়ের মধ্যে আমাকে সম্পাদকীয় দফতরের সংগে যুক্ত থাকতে হবে, যাতে করে আমি একটি বড় খবরের কাগজের কাজের খুঁটিনাটি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে পারি।
ফের বিদেশে যাবার জন্য আমার অধৈর্য সত্ত্বেও ফ্রাঙ্কফুর্টের ঐ মাসগুলি ছিলো ভয়ানক রকমের উদ্দীপনাপূর্ণ। ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ কেবল একটি বড় সংবাদপত্রই ছিলো না, এ ছিলো রীতিমতো এক গবেষণা কেন্দ্র। পূঁতাল্লিশজন পুরা সম্পাদক ছিলো এ কাগজটির। বার্তাকক্ষে যে বহু সংখ্যাক সহ-সম্পাদক এবং সহকারী কাজ করতো তাদেরকে এখানে গোণা হয়নি। সম্পাদকীয় কাজটি ছিলো বিশেষভাবে বিশেষজ্ঞদের কাজ। পৃথিবীল প্রত্যেকটি অঞ্চল এবং প্রত্যেকটি রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক বিষয় অর্পিত ছিলো এমন একজন সম্পাদকের হাতে যিনি ছিলেন নিজ ক্ষেত্রে এক অসাধারণ বিশেষজ্ঞ। আর এ ছিলো সেই পুরানো ঐতিহ্যেরই অনুসরণ যে, ‘ফ্রাঙ্কফুর্টঅর শাইটুঙ’-এর রচনা ও খবর কেবল চলমান ঘটনার ক্ষণিক প্রতিফলনই হবে না, বরং তা হবে এক ধরনের প্রমাণ্য সাক্ষ্য, যার উপর রাজনৈতিক এবং ইতিহাসবিদেরা পারবেন নির্ভল করতে। একথা সবাই জানতো- বার্লিনের পররাষ্ট্র দফতরে ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার শাইটুঙ- এর সম্পাদকীয় এবং রাজনৈতিক ভাষ্যগুলি ফাইল করা হয়- বিভিন্ন বিদেশী সরকারের ‘চিঠিপত্র’ যেমন শ্রদ্ধার সাথে ফাইল করা হয় তেমনি। (বস্তুত এই পত্রিকার বার্লিন দফতরের তখনকার দিনর প্রধান সম্পর্কে বিসমার্ক বলেছিলেনঃ ডঃ স্টেইন হচ্ছেন বার্লিন দরবারে ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার শাইটুঙ’-এর রাষ্ট্রদূত) এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হওয়া আমার বয়সের একজন তরুণের জন্য ছিলো সত্যি সত্যি গৌরবের ও আনন্দের। এ আনন্দ আরো বেশি করে অনুভব করি এজন্য যে, মধ্যপ্রাচ্যে সম্পর্কে আমি দ্বিধার সাথে যে- সব মতামত পেশ করেছি সেগুলির প্রতি সম্পাদকেরা গভীর মনোযোগ দিয়েছেন এবং প্রায়ই সেগুলি দৈনিক সম্পাদকীয় বৈঠকের বিষয়বস্তু হয়েছে। অবশ্য আমার চূড়ান্ত সাফল্য সেই দিনই এলো যেদিন আমাকে বলা হলো সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার উপর একটি সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখতে।
‘ফ্রংকফুর্টার শাইটুঙ’- এ আমাকে যে কাজ দেওয়া হলো তা আমার সজ্ঞান চিন্তার পেচনে যোগায় বিপুল উদ্দীপনা্। আগে সবসময়েই আমার চিন্তার যে স্বচ্ছতা ছিলো তার চাইতে আরো অনেক বেশি স্বচ্ছতার সাথে আমি আমার প্রাচ্যদেশের অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম পাশ্চাত্যের সাথে, যার আমি অংশ হয়েছি আবার, ঠিক যেমন ক’মাস আগে আরবদের হৃদয়ের নিরাপত্তাবোধ এবং তাদের আচরিত ধর্মের মধ্যে একটা যোগ আবিষ্কার করেছিলাম তেমনি এখন আমার মনে হতে লাগলো- ইউরোপের যে আত্মিক সংহতি নেই আর তার নৈতিকতায় যে নৈরাজ্য বিদ্যমান তার কারণ হয়তো ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে তার সম্পর্কচ্ছেদ- যে বিশ্বাস পাশ্চাত্য সভ্যতাকে রূপ দিয়েছিলো একদিন।
এখানে আমি দেখতে পেলাম এমন এক সমাজ যা আল্লাহকে পরিত্যাগ করার পর একটা নতুন রূহানী পথের সন্ধানে রয়েছে; কিন্তু জাহিরা পশ্চিমের খুব কম লোকই উপলব্ধি করেছে সমাজের সেই লক্ষ্যটি কী-। জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে প্রতীচ্যের অধিকাংশ লোক কম-বেশি অনেকটা এ ধরনেরই চিন্তা করতো বলে মনে হয়- ‘যেহেতু আমাদের বুদ্ধি, আমাদের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ, আমাদের হিসাব-নিকাশ, মানব জীবনের সূচনা এবং দৈহিক মৃত্যুর পর তার পরিণাম সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু ব্যক্ত করে না, আমাদের তাই উচিত সমস্ত শক্তিকে আমাদের বৈষয়িক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনা বিকাশের জন্য নিয়োজিত করা- অতীন্দ্রিয় নীতিশাস্ত্র আর স্বতঃসিদ্ধ ধ্যান-ধারণা, যা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ধার ধারে না, তার দ্বারা আমাদের নিজেদেরকে বন্দী করা উচিত নয়’। তাই প্রতীচ্যের সমাজ যদিও প্রকাশ্যে আল্লাহকে অস্বীকার করেনি তবুও তার বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন-ব্যবস্থার তাঁর জন্য আর কোন স্থানই সে রাখেনি।
বেশ কয়েক বছর আগে আমার পূর্বপুরুষদের ধর্ম সম্বন্ধে আমি যখন নিরাশ হয়ে পড়ি তখন আমি খুশ্চান ধর্ম নিয়ে কিছু চিন্তা করেছিলাম। আমার দৃষ্টিতে আল্লাহ সম্পর্কে খৃশ্চান ধারণা ছিলো ওল্ড টেস্টামেন্টের ধারণা থেকে অনেক-অনেক বেশি মহৎ, কারণ এ ধর্ম আল্লাহর ভাবনাকে কোন এক মানবগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্দ করেনি, বরং তিনি যে গোটা মানবজাতির পিতা- এই ধারণার জন্ম দিয়েছে। অবশ্য, খৃশ্চান ধর্ম- বিশ্বাসের মধ্যে এমন একটি উপাদান রয়েছে যা এই ধর্মের সার্বিক দৃষ্টিভংগী থেকে এক বিচ্যুতি; সে উপাদানটি হচ্ছেঃ খৃশ্চান ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেহ ও আত্মার মধ্যকার প্রভেদ, বিশ্বাসের জগৎ ও বাস্তব বৈষয়িক জগতের মধ্যকার ব্যবধান ও পার্থক্য।
যে-সব প্রবণতা জীবনকে এবং জাগতিক উদ্যমকে সত্য বলে স্বীকার করতে চায় সে-সব থেকে শুরুতেই খৃশ্চান ধর্ম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায়, আমার মনে হলো, খৃশ্চান ধর্ম বহু আগেই পাশ্চাত্য সভ্যতার পেচনে একটি নৈতিক উদ্দীপনা যোগাবার শক্তি সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। খৃশ্চান ধর্মের অনুসারীরা এ ধারণায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে যে, মানুষের ব্যবহারিক জীবনে নাক গলানো ধর্মের কাজ নয়। ওরা ধর্মীয় বিশ্বাসকে একটা শান্তিপ্রদ প্রথা ভেবেই সন্তুষ্ট, যে প্রথার উদ্দেশ্য- ব্যক্তিগতভাবে পুরুষ ও নারীর মধ্যে একটা অস্পষ্ট ব্যক্তিগত নৈতিকতাবোধের, বিশেষ করে যৌন ব্যাপারে নৈতিকতার পোষণ ছাড়া আর কিছুই নয়। এভাবে চার্চের একটি বহু প্রাচীন দৃষ্টিভংগির সহায়তায় ওরা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের গোটা ক্ষেত্রটিকেই নিজেদের গণ্ডির বাইরে রেখে দিয়েছে। চার্চের সেই দৃষ্টিভংগীটি হচ্ছেঃ ‘আল্লাহর পাওনা আল্লাহকে দাও এবং সিজারের পাওনা দাও সিজারকে’- এই বিভাগ। এভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের ক্ষেত্রকে নিজেদের গণ্ডির বাইরে রেখে দেওয়ায় খৃশ্চান রাষ্ট্রনীতি ব্যবসা-বাণিজ্য যে-পথ ধরে বিকাশ লাভ করেছে তা হযরত ঈসা কল্পিত পথ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। জাগতিক ব্যাপারে তাঁর অনুসারীদের একটা বাস্তব পন্হা নির্দেশ করতে না পারায় পাশ্চাত্য জগত যে ধর্ম অনুসরণ করে, আমার মতে, তা হযতর ঈসার সত্যিকার উদ্দেশ্যের এবং বলা যায়, অনুসরণ করে, আমার মতে, তা হযরত ঈসার সত্যিকার উদ্দেশ্যের এবং বলা যায়, প্রত্যেক ধর্মেরই যা মূল লক্ষ্য তার বিচারে ব্যর্থ হয়েছে? সেই উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যটি কি? মানুষ কিভাবে অনুভব করবে শুধু তা’ই নয়, বরং কিভাবে সে সঠিক জীবন-যাপন করবে তা দেখানোই হচ্ছে সেই লক্ষ্য। নিজের ধর্ম একভাবে না একভাবে তাকে নিরাশ করেছে, ব্যর্থ করেছে, এই সহজাত অনুভূীতর ফলে প্রতীচ্যের মানুষ বিগত কয়েক শতাব্দীতে খৃশ্চান ধর্মে তার সর্বপ্রকার বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। এই বিশ্বাস হারানোর ফলে সে এই প্রত্যয়ও হারিয়েছে যে, বিশ্বজগত একটিমাত্র পরিকল্পক মনের অভিব্যক্তি এবং সে কারণে, তা এক সুসমন্বিত সমগ্র। আর এ প্রত্যয় হারিয়েছে বলেই এখন সে জীবন-যাপন করছে এক আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শূণ্যতার মধ্যে। পশ্চিম যে এভাবে ধীরে ধীরে খৃশ্চান ধর্ম থেকে দূরে সরে পড়েছে তার মধ্যে আমি দেখতে পেলাম, ইহজীবনের প্রতি সেন্ট পলের যে ঘৃণা একেবারে শুরুতেই এবং সম্পূর্ণভাবেই হযরত ঈসার শিক্ষাকে দুর্বোধ্য করে তুলেছিলো তারই বিরুদ্ধে এক সবল বিদ্রোহ। তাহলে, পাশ্চাত্য সমাজ কি করে এখনো দাবি করতে পারে খৃস্ট সমাজ বলে? এবং একটি বাস্তব বিশ্বাস ছাড়া কী করেই বা ওরা বর্তমান নৈতিক নৈরাজ্যকে কাটিয়ে ওঠার আশা করতে পারে?
নিজস্ব অবস্থান থেকে উলট-পালট, উৎক্ষিপ্ত বিপর্যস্ত এক বিশ্বঃ এ-ই ছিলো আমাদের পাশ্চাত্য জগত। অভূতপূর্ব ব্যাপকতার সাথে রক্তপাত, ধ্বংসলীলা, হিংসাত্মক হানাহানি, বহু সামাজিক প্রথাপদ্ধতির ভাঙন, আদর্শের সংঘাত, নতুন নতুন জীবন-পদ্ধতিরে পক্ষে তিক্ত, সর্বাত্মক সংগ্রাম- এগুলিই ছিলো আমাদের সময়কার লক্ষণ। একটি বিশ্বযুদ্ধের ধূম্রজাল আর ধ্বংসলীলা থেকে অসংখ্য ছোট ছোট যুদ্ধবিগ্রহ এবং বহু বিপ্লবে ও প্রতিবিপ্লবের মধ্যে থেকে- তখন পর্যন্ত লিপিবদ্ধ সমস্ত কিছুকে ছাড়িয়ে যাওয়া অর্থণৈতিক বিপর্যয় থেকে- এককথায়, ভয়ংকর এ সকল ঘটনা থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানো একটি সত্য যে, কেবল বৈষয়িক এবং কারিগরি প্রগতির উপর প্রতীচ্যের বর্তমান একান্ত- নির্ভরশীলতাই আজকের নৈরাজ্য ও বিশৃংখলাকে দূর করে একটা ঐক্য ও শৃঙ্খলা স্থাপন করতে কিছুতেই সক্ষম নয়। মানুষ কেবল রুটি খেয়েই বাঁচে না, আমার এই সহজাত যৌবন-ধর্মী প্রত্যয় দানা বাঁধলো এই বুদ্ধিগত প্রত্যয়ে যে, মানুষ বর্তমানে ‘প্রগতির’ যে পূজা করছে তা আগের দিনের অবিমিশ্র মূল্যে বিশ্বাসের্ই একটি দুর্বল অস্পষ্ট প্রতিকল্প ছাড়া কিছুই নয়- আরর এই মিথ্যা বিশ্বাস সে-সব মানুষই উদ্ভাবন করেছে যারা অবিমিশ্র শর্তাতীত মূল্যে বিশ্বাস করবার হৃদয়গত সমস্ত ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে এবং এখন এই বিশ্বাসের দ্বারা নিজেদের ছলনা করছে যে, কোন- না কোনভাবে কেবল বিবর্তনের তাড়নায়ই মানুষ তার বর্তমানের বাধা-বিধ্নগুলি কাটিয়ে উঠবে। আমি বুঝতে পারলাম না, এই খেয়ালী বিশ্বাস থেকে নির্গত নতুন সব অর্থনৈতিক ব্যবস্থঅর কোন একটি কী করে পাশ্চাত্য সমাজের দুঃখ-দূর্দশার একটি সাময়িক প্রতিষেধকের বেশি কিছু হতে পারে? এ ব্যবস্থাগুলি বড় জোর এর কোন- না- কোন লক্ষণেরই কেবল চিকিঝসা করতে পারে, কিন্তু ব্যাধির মূল কারণের কখনও নয়।
…… …… ……. ……..
আমি যখন ‘ফ্রঙ্কফুর্টার শাইটুঙ’-এর সম্পাদকীয় দফতরে কাজ করছিলাম তখন প্রায়ই বার্লিনে যেতাম যেখানে ছিলো আমার প্রায় সকল বন্ধু-বান্ধব এবং বার্লিনে এ ধরনের একটি সফরকালেই সেই নারীর সংগে আমার সাক্ষাৎ হয়, পরবর্তীকালে যে হয়েছিলো আমার সহধর্মিনী।
রোমানিশেজ ক্যাফের জমজমাট ভিড়ের মধ্যে যে মুহূর্তে আমাকে এলসার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়অ হয় তখন থেকেই আমি তার প্রতি ভীষণ আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। এ আকর্ষণ কেবল তার চেহারার নাজুক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং তার সংকীর্ণ, সুবিন্যস্ত অস্থিবিশিষ্ট মুখমণ্ডলের জন্য, যাতে রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ গভীর নীল দু’টি চোখ আর অনুভূতিশীল নাজুক মুখ, যা ব্যক্ত করে রসবোধ ও মেহেরবানী,- বরং তারও চাইতে বেশি, যে-হৃদয়গত ইন্দিয়জ সহজ গুণের মাধ্যমে সে মানুষ এবং বস্তুকে গ্রহণ করে, সে কারণে। এলসা ছিলো একজন চিত্রশিল্পী। পরে আমি জানতে পেরেছিলাম ওর শিল্পকর্ম উঁচু দরের না হলেও ওর সেই স্নিগ্ধ উজ্জ্বল গভীরতা- ওর সমস্ত কথায় ও অংগভংগীতে যা ব্যক্ত হতো- ওর সমস্ত শিল্পকর্মও বহন করতো তারই ছাপ, যদিিও তার বয়স ছিলো আমার চাইতে পনেরো বছর বেশি, অর্থাৎ তখন তার বয়স পঁয়ত্রিশের উপর- তবু তার মসৃণ মুখমণ্ডল আর ক্ষীণ, নমনীয় শরীরের জন্য তাকে দেখলে মনে হতো অনেক কম বয়সের। জীবনে খাঁটি নর্ডিক জাতের যতো মানুষ আমি দেখেছি, সম্ভবত এলসাই হচ্ছে তাদের সুন্দরতম প্রতিনিধি। বিশুদ্ধ নর্ডিক জাতের মানুষের চেহারায় যে পরিচ্ছন্নতা ও তীক্ষ্ণতা থাকে সবই ছিলো তার মধ্যে; কিন্তু এ জাতেরই মানুষের মধ্যে প্রায়ই যে অনমনীয়তা এবং অনুভূতিহীনতা দেখা যায় এলসা ছিলো তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এলসার জন্ম সেই সব পুরানো হলস্টিন পরিবারগুলির একটিতে, যাদেরকে বর্ণনা করা যেতে পারে ইংরেজ ‘জোতদার সম্প্রদায়েরে’ উত্তর-জার্মান সমগোত্রীয়রূপে। কিন্তু তার চলাফেরা ও আচরনের মধ্যে যে সংস্কারমুক্ত স্বাধীনতা ছিলো তা’ই জোতদারসুলভ বস্তুনিষ্ঠতার স্থলে তাকে দিয়েছিলো সম্পূর্ণ এক অ-নর্ডিকসুলভ উষ্ণতা আর স্বাভাবিক বিচক্ষণতা। এলসা ছিলো বিধবা, তার ছিলো ছ’বছরের একটি পুত্র, যাকে সে খুবই ভালোবাসতো।
নিশ্চয়ই শুরু থেকেই এ আকর্ষণ ছিলো দু’তরফা, কারণ প্রথম সাক্ষাতের পর প্রায়ই আমরা একে অপরের সাথে দেখা করতে থাকি। আরব জগতের সাম্প্রতিক ছাপ আমার মনেক এতোটা আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো যে, আমি স্বাভাবিকভাবেই এলসাকে সেসব বলতে থাকি আর এ-সব ছাপ আমার মধ্যে যে মজবুত অথচ এখনো বিচ্ছিন্ন অনুভূতি ও ধারণার জন্ম দিয়েছে সেগুলির প্রতি সে আমার বেশিরভাগ বন্ধু-বান্ধব থেকে ভিন্নরূপে এক অসাধারণ সমঝদারি ও সহানুভূতির পরিচয় দেয়। এলসাকে এতো গভীর করে এসব জানাতে চেয়েছি যে, নিকট-প্রাচ্যে আমার সফরের বর্ণনা করে আমি যে বইটি লিখছিলাম তারি একটি ভূমিকা লিখতে গিয়ে আমার মনে হলো, আমি যেন এলসাকেই সম্বোধন করে লিখছিঃ
যখন কোন ইউরোপীয় ইউরোপের এমন কোন দেশে সফর করে যা সে আগে কখনো দেখেনি তখন সে কিছুটা বিস্তৃততরো হলেও নিজের পরিবেশের মধ্যেই বিচরণ করে চলে এবং সহজেই, অভ্যাস যে-সব জিনিসের সংগে তাকে পরিচিত করেছে এবং চলার পথ যে- নতুনের সাথে তার সাক্ষাৎ হচ্ছে তার পার্থক্য সে বুঝতে পারে; কারণ আমরা জার্মানই হই আর ইংরেই হই এবং ফ্রান্স, ইতালি অথবা হাঙ্গেরী যে-কোন দেশের ভিতর দিয়েই সফর করি না কেন, ইউরোপের মন ও চেতনা আমাদের সবাইকে বেঁধে দেয় এক ঐক্যবন্ধণে। আমরা যেহেতু নানা অনুষঙ্গের একটি সুনির্দিষ্ট পরিধির মধ্যে বাস করি সে কারণে আমরা একটা সাধারণ ভাষার মতোই এই সব অনুসংগের মাধ্যমে একে অপরকে বুঝতে এবং নিজেদেরকে অন্যের বোধগম্য করে তুলতে সক্ষম হই। আমরা এই ব্যাপারটিকে বলি সাংস্কৃতিক মিলন। এ জিনিসটির অস্তিত্ব নিশ্চয়ই একটি সুবিধা, একটি ফায়দা। কিন্তু অভ্যাস থেকে যে-সব সুবিধা উদগত হয় সে সবের মতোই এটিও কখনোপ কখনো অসুবিধা হয়ে দাঁড়ায়; কারণ মাঝে মাঝে আমরা দেখতে পাই, আমরা সেই বিশ্বজনীন চেতনায় যেন সুতী পশম দ্বারা আচ্ছাসিত। আমরা লক্ষ্য করি সে অভ্যাস আমাদের ঘুম পাড়িয়ে হৃদয়ে এসে দিয়েছে আলস্য; এ আমাদের ভূলিয়ে দিয়েছে আমাদের আগেকার অধিকতরো সৃজনশীল সময়ের বিপজ্জনক পথে চলার উদ্যমকে, সেই স্পর্শাতীত সত্যের সন্ধান লাভের প্রয়াসকে। আগেকার সেই সব জামানায় হয়তো এগুলিকে বলা হতো স্পর্শাতীত সম্ভাবনা, এবং আবিষ্কারক, অভিযাত্রী অথবা শিল্পী, যারাই তার সন্ধানে বার হয়ে পড়েছিলো তারা সবসময়ই নিজেদের জীবনের গহনতম উৎসেরই অনুসন্ধান করেছে। আমরা যারা দেরীতে এসেছি তারাও নিজেদেরই জীবনকে খুঁজে ফিরছি; কিন্তু আমাদের নিজেদের জীবন আপনা-আপনি পাঁপড়ির পর পাঁপড়ি মেলে বিকাশিত হবার আগেই আমরা তাকে পাবার বাসনায় আচ্ছন্ন এবং এই ধরনের প্রয়াসের আড়ালে যে পাপ প্রচ্ছন্ন রয়েছে আমরা অস্পষ্টভাবে তা আশংকা করছি। বহু ইউরোপীয় আজ অনযুভব করতে শুরু করেছেঃ বিপদকে এড়িয়ে চলার ভয়ংকর বিপদ!
এ বইটিতে আমি এমন একটি এলাকায় আমার সফরের কথা বর্ননা করছি ইউরোপ থেকে যার পার্থক্য এতোই বৃহৎ যে, এ দু’য়ের মধ্যে সহজে সেতু তৈরি করা সম্ভব নয়, এবং বলা যায়, এ পার্থক্যটি এক দিকে থেকে বিপদেরই শামিল। আমরা পেছনে ফেলে চলেছি এতো বেশি এক-রূপ এক-পরিবেশের নিরাপত্তাকে, যেখানে অপরিচিত তেমন কিছুই নেই এবং নেই বিস্ময়কর কিছু- আর আমরা প্রবেশ করছি অন্য এক জগতের বিস্ময়কর অদৃষ্টপূর্ব বৈচিত্র্যের মধ্যে।
আমরা যেনো আত্মপ্রতারণা না করিঃ সেই ভিন্ন জগতে যে বহু বর্ণাঢ্য ছবি আমাদের পথে পড়বে, আমরা হয়তো তার এটির বা ওটির মর্ম বুঝতে পারি; তবে, একটি পাশ্চাত্য দেশে গোটা চিত্রটির মর্ম যেমন সচেতনভাবে বোঝা সম্ভব এই আলাদা জগতে তা আমাদের পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। এই ভিন্ন জগতের মানুষ থেকে আমাদেরকে যা আলাদা করেছে তা কেবল স্থান নয়, স্থানের অতিরিক্ত আর কিছু। কী করে ভাবের আদান-প্রদান চলতে পারে ওদের সংগে? শুধুমাত্র ওদের ভাষা বলতে পারাই যথেষ্ট নয়। ওরা ওদের জীবনকে কিভাবে উপলব্ধি করে কেউ যদি তা বুঝতে চায় তাকে পুরাপুরি সংস্কারমুক্ত হয়ে ঢুকতে হবে ওদের পরিবেশে এবং ওদের সংগ ও অনুষঙ্গগুলির ভেতর শুরু করতে হবে জীবন-যাপন। তা কি সম্ভব? এবং তা বাঞ্ছনীয় হবে? হয়তো আমাদের পুরানো পরিচিত চিন্তাভ্যাসের বদলে বিদেশী অপরিচিত চিন্তাভ্যাস গ্রহণ করা তেজারতি হিসাবে পরিণামে ক্ষতিকরই হবে।
কিন্তু সত্যই কি আমরা ওই জগতের বহির্ভূত? আমি তা মনে করি না। আমরা যে নিজেদেরকে বহির্ভূত বলে অনুভব করি তার প্রধান কারণ আমাদের পাশ্চাত্য চিন্তা-পদ্ধতি আমাদেরই একটি নিজস্ব ভুলের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা বিদেশী অপরিচিত সৃজনধর্মী মূল্যকে খাটো করে দেখতে অভ্যস্ত এবং সবসময়ই তাকে আঘাত করতে, আমাদের নিজ শর্তে তাকে আত্মসাৎ করতে, আমাদের নিজ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে তাকে গ্রহণ করতে প্রলুব্ধ। অবশ্য আমার মনে হয়, আমাদের এ উৎকণ্ঠার যুগে এ ধরনের উদ্ধত প্রয়াসের আর কোন অবকাশ নেই। আমরা অনেকেই উপলব্ধি করতে শুরু করেছি যে, সাংস্কৃতিক ব্যবধান বুদ্ধিগত বলাৎকারের মাধ্যমে নয় বরং অন্য উপায়ে জয় করা যেতে পারে এবং জয় করা উচিত। হয় তো আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিতে এর নিকট সমর্পণ করেই তা জয় করা যেতে পারে। যেহেতু এই অপরিচিত জগত, আপনি যা কিছু আপনার স্বদেশে জেনেছেন তা থেকে এতো সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন, যেহেতু সেই জগতে এতো বেশি কিছুর অবকাশ রয়েছে যা রূপে ও ধ্বনিতে আশ্চর্য রকমে অভিনব এবং বিচিত্র সে কারণে, আপনি যদি মনোযোগী হন, কখনো কখনো তা, সুদুর অতীতে যে-সব বস্তুর সংগে ছিলো আপনার পরিচয় এবং দূর-অতীতে যা বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছে, সে-সবের ক্ষণিক স্মৃতির পরশ বুলিয়ে যাবে আপনার উপর- আপনার নিজের জীবনের সেই স্পর্শনাতীত বাস্তবতাগুলি। এবং আপনার জগতকে সেই ভিন্ন, সেই অপরিচিত জগত থেকে আলাদা করেছে যে গহ্বর তার ওপর থেকে স্মৃতির এই নিশ্বাস যখন আপনার নিকট পৌঁছায় তকন আপনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেনঃ হয়তো এখানেই- এবং কেবল এখানেই সকল সফর, সকল ভবঘুরেমীর অর্থ নিহিত কি নাঃ কী সেই অর্থ? না, আপনার চারপাশের জগতের অজ্ঞাত-পরিচয় বৈচিত্য সম্পর্কে সজাগ হয়ে ওঠা আর তাতে করে আপনার নিজের ব্যক্তিগত বিস্মৃত বাস্তবতাকে নতুন করে জাগ্রত করা….।
এবং আমি অন্ধকারে পথ হাতড়ানো মানুষের মতো এই বাধো বাধো কথাগুলির দ্বারা এতো অসার্থকভাবে যা বলবার চেষ্টা করেছিলাম- এলসা যেহেতু তার সহজাত অনুভুতি দিয়ে তার মর্ম বুঝতে পেরেছিলো, তা’ই আমি তীব্রভাবে অনুভব করলাম যে, এলসা এবং কেবল এলসাই- বুঝতে পারে আমি কিসের পেছনে ছুটেছি এবং এলসাই পারে আমার এই অনুসন্ধানে আমাকে সাহায্য করতে।
দুই
দীর্ঘ উদ্দেশ্যহীন সফরের আরো একটি দিন ফুরিয়ে গেলো। নৈঃশব্দ আমার ভেতর এবং নৈঃশব্দ আমার চারপাশের রাত্রিতে। বালিয়াড়ির উপর দিয়ে বাতাস বয়ে চলে আস্তে আস্তে, আলতো পরশ বুলিয়ে এবং বালিয়াড়ির ঢালুর বালুতে কোঁকড়ানো চুরের মতো ঢেউ খেলে। যে আগুন জ্বালানো হযেছে তারই সকীর্ণ বৃত্তের মধ্যে আমি দেখতে পাই জায়েদের মূর্তি.. তার পাত্র ও কড়াইগুলি নিয়ে ব্যস্ত, আমাদের জীবনের থলেগুলি পড়ে আছে নিকটেই, রাতের জন্যে তাঁবু খাটানোর সময় আমরা যেখানে ছুঁড়ে ফেলেছিলাম সেখানেই- আর উঁচু কাঠের হাতলওয়ালা আমাদের জীনগুলিও। কিছুদূরে এরই মধ্যে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে হামাগুড়ি দিয়ে পড়া দুটি উটের দেহ; দীর্ঘ সফরে ওরা ক্লান্ত ওদের গলা বালির দৃশ্যমান অথচ আপনার হৃদস্পন্দনের মতোই আপনার নিকটে, শূণ্য মরুভূমি।
পৃথিবীতে এর চাইতে সুন্দর অনেক ল্যাণ্ডস্কেপ রয়েছে, কিন্তু কোনটিই, আমি মনে করি, এমনি চূড়ান্ত ক্ষমতা সহারে মানুষের আত্মাকে গড়ে তুলতে পারে না। মরুভূমি তার কাঠিন্যে ও প্রায়-বসতিহীন গাছপালা-শূণ্য বিস্তৃতিতে সমস্ত ছলাককলাকে মুছে দেয় আমাদের জীবনের মর্ম-উপলব্ধির বাসনা থেকে-মুছে দেয়, অধিকতর সদয় প্রকৃতি যে- বহুবিধ প্রবঞ্চনার ফাঁদে ফেলে মানুষকে তার চারদিকের জগতে তার নিজের কল্পনা আরোপ করতে বাধ্য করতে পারে, সেগুলিকে; মরুভূমি হ চ্ছ নগ্ন এবং পরিচ্ছন্ন- সে আপোস করতে জানে না। যে-ব মনোরম খেয়াল মর্জি মাফিক চিন্তার মুখোশ হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে, মরুভূমি সেগুলিকে ঝেঁটিয়ে তাড়িয়ে দেয় মানুষের হৃদয় থেকে এবং এভাবে তাকে মুক্ত করে এমন এক পরমের নিকট আত্মসমর্পণ করার জন্য- যার কোন আকার নেইঃ সকল দূরের চাইতে দূর, অথচ যা-কিছু নিকট তার চাইতেও কাছে।
মানুষ যখন চিন্তা করতে শিখেছে তখন থেকেই মরুভূমি হচ্ছে এক আল্লাহকে তার সমস্ত বিশ্বাসের লালনকেন্দ্র। একথা সত্য, কোমলতরো পরিবেশ এবং আরো বেশি অনুকূল আবহাওয়ায়ও মানুষ বারবার তাঁর অস্তিত্বের এবং একত্বের হদিস পেয়েছে- যেমন প্রাচীন ইউনানীদের ‘মৈরা’র ধারণায়ঃ এই মৈরা এমন একটি অনির্বাচনীয় শক্তি যা অলিস্পাসের সকল দেবদেবীর ক্ষমতার উৎস এবং তাদের আয়েত্তের বহির্ভুত। কিন্ত এ জাতীয় ধারণা কখনো একটা অস্পষ্ট অনুভূতি, একটা কিয়াসী উপলব্ধির ফল ছাড়া বেশি কিছু ছিলো না, ছিলো না তা নিশ্চিত প্রজ্ঞার ফল, যতক্ষণ না চোখ-ধাঁধানো নিশ্চয়তার সংগে এই জ্ঞান উদ্ভাসিত হলো মরুভূমির মানুষের নিকট, মরুভূমিরই মধ্য থেকে। মিদিয়ানের মরুভূমির একটি আগুন-ধরা কাঁটাবন থেকেই আল্লাহর বানী ধ্বনিত হয়েছিলো মূসার নিকট; যূদী মরুভূমির বিয়াবানেই হযরত ঈসা পেয়েছিলেন আল্লাহর রাজ্যের পয়গাম এবং মক্কার নিকটে মরু-পাহাড়ের হেরা গুহায়ই প্রথম ওহী নাযিল হয়েছিলো আরবের নবী মুহাম্মদের (স) নিকটে।
তাঁর নিকট এ এসেছিলো শিলাময় পাহাড়ের মধ্যবর্তী সেই সংকীর্ণ, শুষ্ক গিরি সংকটে, সেই মরুভূমির রোদে পোড়া নগ্ন উপত্যকায়। কী ছিলো সেই পয়গাম?- না, দেহ ও আত্মার মিলনে যে জীবন সেই জীবনের সামগ্রিক স্বীকৃতিঃ যে পয়গামের পরিণাম- বিভিন্ন কবিলার রূপহীন ধর্মহীন এক জাতিকে একটি নির্দিষ্ট অবয়ব ও লক্ষ্য দান করা এবং তার মাধ্যমে কয়েক দশকের মধ্যেই একটি শিকা, এবং একটি প্রতিশ্রুতির মতো ছড়িয়ে পড়া, পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর এবং পূর্বদিকে চীনের প্রাচীর পর্যন্ত। তার নিয়তি ছিলো তেরশ’ বছরের অধিককাল পরেও, সব রকমের রাজনৈতিক অবক্ষয় কাটিয়ে উঠে, এমনকি, এ পয়গাম যে-মহৎ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিলো সেই সভ্যতার পরও টিকে থেকে, আজ পর্যন্ত একটি মহান আধ্যাত্মিক শক্তি হিসাবে কায়েম থাকা- সেই পয়গাম যা এসেছিলো আরবের নবীর নিকট….।
…. ….. ….. …..
আামার সময় কাটে ঘুমিয়ে এবং জেগে।আমি চিন্তা করি সেই দিনগুলির কথা যা চলে গেছে, কিন্তু এখনো মৃত নয়। আমি ঘুমিয়ে পড়ি এবং স্বপ্ন দেখি, আবার আমার ঘুম টুটে যায়, আবার আমি উঠে বসি। আমার জাগরণের আধো-আলো আধো-ছায়অ স্বপ্ন এবং স্মৃতি বয়ে চলে একত্রে, কোমলতার সংগে।
রাত এখন ভোরের কাছাকাছি। আগুন একদম নিভে গেছে। নিজের কম্বলে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে জায়েদ। আমাদের উট দু’টি পড়ে আছে নিস্পন্দ, যেন মাটির দু’টি ঢিবি। নক্ষত্র এখনো দেখা যাচ্ছে আসমানে এবং আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, এখনো ঘূমানোর সময় আছে। কিন্তু পূব আসমানের নিচুতে দেখা দেয় অন্ধকার ফুঁড়ে ফ্যাকাশে হয়ে বের হয়ে আসা একটি অনুজ্জ্বল আলোর রশ্মি আরেকটি গাঢ়তর শিকার উপরে, যা ছড়িয়ে আছে দিগন্তের উপরেঃ যুগল নকীব, ভোরের, ফজরের সালাতের সময়ে।
আমার উপরে আমি তেরছা দেখতে পাই শুকতারাটিকে, যাকে আরবরা বলে, আয-যোহরা, জ্বলজ্বলে নক্ষত্র। আাপনি যদি ওদেরকে জিজ্ঞাস করেন এ সম্পর্কে, আপনাকে ওরা বলবে, এককালে এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলো এক রমনী….
এক সময়ে দুই ফেরেশতা ছিলো হারুত আর মারুত নামে। বিনয় আর নম্রতা যদিও ফেরেশতাদের জন্য শোভনীয়, তবু এই দুই ফেরেশতা ভূলে গিয়ে অহংকার করেছিলো যে, তাদের পবিত্রতা অক্ষয়, অজেয়। আমরা নূরের তৈরি- পুরুষের ঔরসজাত দুর্বল মানুষের এসবের উর্ধ্বে! কিন্তু তারা ভূলে গিয়েছিলো তারা পবিত্র কেবল এ কারণেই যে, তাদের কামনা বলে কিছু নেই এবং কামনাকে দমন করবরা জন্য কখনো তাদের বলাও হয়নি। তাদের ঔদ্ধত্যে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এবং তাদেরকে বলেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে যাও এবং সেখানে তোমাদের পরীক্ষার মুকাবেলা করো’। দাম্ভিক ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসে এবং মানুষের দেহে মানব সন্তানদের মাঝে ঘুরে বেড়াতে থাকে- আর পয়লা রাতেই ওরা দেখা পায় এক রমনীর, যার সৌন্দর্য্য এতো বিস্ময়কর ছিলো যে, লোকেরা তাকে বলতো আয-যোহরা…. উজ্জ্বল রমনী। যখন ফেরেশতা দু’জন তাদের এই মুহূর্তেল মানুষের চোখ এবং অনুভুতিদিয়ে যোহরার দিকে তাকালো, তাদের বুদ্ধি তালগোল পাকিয়ে গেলো এবং ওরো যেন ঠিক মানুষেরই সন্তান, তাই তাদের মনে জাগলো যোহরাকে পাওয়ার অদম্য ইচ্ছা। ওদের দু’জনেই যোহরাকে বলল, ‘তুমি রাযী হয়ে যাও আমার প্রতি’। কিন্তু যোহরা জবাব দিলো, ‘আমি তো অন্য এক পুরুষের। তুমি যদি আমাকে চাও, ওর হাত থেকে আমাকে অবশ্যি মুক্ত করতে হবে। ‘তখন হারুত মারুত ওই লোকটিতে কতল করে বসে এবং ওরা অন্যায়ভাবে যে রক্তপাত করেছিলো সেই রক্তে রাঙা হাত নিয়েই ওরা সেই রমনীর উপর মিটায় ওদের উদগ্র কামনা। কিন্তু যে মুহূর্তে ওদের কামনা আর রইলো না, তখনি, কিছুক্ষণ আগেকার এ দুই ফেরেশতার চৈতন্যোদয় হলো যে, পৃথিবীতে ওদের পয়লা রাতেই ওরা দ্বিবিধ পাপ করে বসেছেঃ হত্যা এবং ব্যভিচার, এবং ওদের অহংকারের কোন অর্থই হয় না! তখন আল্লাহ বললেন, ‘পার্থিব শাস্তি এবং পরলেঅকের শাস্তি’- এ দু’টির একটি বেছে নাও তোমরা’। তীব্র অনুশোচনায় পতিত ফেরেশতা দু’জন বেছে নেয় এই পৃথিবীর শাস্তি। তখন আল্লাহ হুকুম দিলেন- আকাশ এবং পৃথিবীর মধ্যে এদেরকে ঝুলিয়ে রাখা হোক শৃংখলিত করে এবং এভাবেই ওরা ঝুলানো থাকবে হাশরের দিন পর্যন্ত, ফেরেশতা এব্ং মানষের প্রতি এই নসিহতরূপে যে, সমস্ত সদগুণই আপনা- আপনি ধ্বংস হয়ে যায় যখন তাতে থাকে না বিনয় এবং নম্রতা। কিন্তু কোন মানব-চক্ষুই যেহেতু ফেরেশতাদের দেখতে সমর্থ নয়, তাই আল্লাহ আয-যোহরাকে একটি নক্ষত্রে রূপান্তরিত করে ঝুলিয়ে দিলেন আসমানে, যাতে মানুষ সবসময়ই তাকে দেখতে পায় এবং তার কাহিনী ইয়াদ করে মানুষ স্মরণ করে হারুত আর মারুতের দুর্ভাগ্যেল কথা। এই কাহিনীর রূপরেখা ইসলামের চেয়ে অনেক- অনেক বেশি প্রাচীন মনে হয়। প্রাচীন সিমাইটরা তাদের দেবী ইশতারকে কেন্দ্র করে- পরবর্তীকালে যিনি হয়েছিলেন গ্রীসীয়দের দেবী এফ্লোদিতে, – যে সব উপকথার জাল বুনেছিলো, তারই কোন একটি থেকে এই কাহিনীর উৎপত্তি। আমরা যে গ্রহকে ‘শুক্র’ বলে জানি সেই গ্রহ আর এই দুই দেবীই এক বলে সনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আমি যে রূপে এই গল্পটি শুনেছিলাম তাতে হারুত মারুতের কাহিনীটি হচ্ছে মুসলিম মানসের এক নিজস্ব সৃষ্টি। এ কাহিনী এ ধারণারই দৃষ্টান্ত যে, বস্তু-নিরপেক্ষ পবিত্রতার কোন নৈতিক তাৎপর্যই নেই যতক্ষণ তা নির্ভর করে কামনা-বাসনা না-থাকার উপরে। কারণ বারবার ঘুরে ফিরে ভাল আর মন্দের মধ্যে একটি বেছে নেয়ার প্রয়োজনই কি সমস্ত নৈতিকতার ভিত্তি নয়?
বেচারা হারুত মারুত এ কথা জানতো না। যেহেতু ফেরেশতা হিসাবে ওরা কখনো কোন প্রলোভনের সম্মুখীন হয়নি তাই ওরা নিজেদেরকে মনে করতো পবিত্র এবং নৈতিকতার দিক দিয়ে মানুষের উর্ধ্বে। ওরা বুঝতে পারেনি যে, দৈহিক চাহিদার বৈধতা অস্বীকার করার পরোক্ষ অর্থ হবে মানুষের ক্রিয়াকলাপের মধ্যে সকল প্রকার নৈতিক মূল্যবোধের অস্বীকৃতি। কারণ কেবলমাত্র এই সব তাকিদ, প্রলোভন এবং সংঘাতের উপস্থিতিই… ‘বেছে নেয়ার সম্ভাবনাই- মানুষকে এবং কেবল মানুষকেই, আর কাউকে নয়, করে তোলে এক নৈতিক সত্তাবান প্রাণী, যার রয়েছে একটি আত্মা’।
এই ধারণার ভিত্তিতেই সকল উন্নততরো ধর্মের মধ্যে ইসলাম একাই আত্মাকে মানুষের ব্যক্তিত্বের একটি দিক বলে গণ্য করে এবং নিজের অধিকারেই তা একটি অন্য নিরপেক্ষ ব্যাপার, এরূপ মনে করে না। এর ফলে, মুসলিম দৃষ্টিতে মানুষের আত্মার বিকাশ তার প্রকৃতির সবক’টি দিকের সংগে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দৈহিক কামনা- বাসনা তার এই প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংগ। এগুলি কোন ‘আদি পাপে’র ফল নয়, বরং বাস্তব আল্লা- প্রদত্ত শক্তি, যাকে স্বীকার করে নিতে হবে এবং সেভাবেই ব্যবহার করতে হবে বুদ্ধিমত্তার সংগে। বলাবাহুল্য, আদি পাপের ধারণাই ইসলামী নীতিশাস্ত্রের নিকে অপরিচিত; তাই দেহের চাহিদাকে কি করে দমন করা যাবে তা মানুষের সমস্যা নয়, বরং সমস্যা হচ্ছে কেমন করে তার আত্মার চাহিদার সংগে সেগুলির সমন্বয় সাধন করা যাবে এমনভাবে যাতে করে জীবন হয়ে উঠবে পূর্ণ এবং সুকৃতিময়।
এই প্রায় অদ্বৈতবাদী জীবন-স্বীকৃতির মূল খুঁজে পাওয়া যাবে ইসলামের এই দৃষ্টিভংগীর যে, মানুষের আদি ফিতরত হচ্ছে মূলত সৎ। মানুষ জন্মগতভাবেই পাপী- এই খৃশ্চান ধারণা, অথবা সে জন্মগতবাবে হীন এবং অপবিত্র আর তাকে বহু জন্মের ভেতর দিয়ে করুণ ও দুঃখজনকভাবে পথ হাতড়াতে হাতড়াতে মোক্ষলাভ করতে হবে- হিন্দু ধর্মের এই শিক্ষা থেকে ভিন্ন সুরে আল- কুরআন বলেছেঃ ‘আমি তো সৃষ্টি করেছি মানুষকে শ্রেষ্ঠতম আবয়বে- পবিত্র অবস্থায়- (যে পবিত্রতা কেবল পরবর্তী ভ্রান্ত আচরণের ফলেই নষ্ট হতে পারে) অতঃপর আমি তাকে পরিণত করি হীনতমে, কিন্তু তাদেরকে নয়, যারা বিশ্বাসী এবং সৎকর্মপরায়ন’।
তিন
আমদের সামনে রয়েছে হাইলের পাম-তরুর বাগিচা।
আমরা থামলাম একটি পুরোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত ওয়াচ-টাওয়ারের পাশে, শহর প্রবেশে আমাদের প্রস্তুতি হিসাবে। কারণ, পুরানো আরবীয় প্রথা, যার সংগে হামেশাই সম্পর্ক থাকে ব্যক্তিগত সুরুচি ও সৌন্দর্যবোধের, তার দাবি এই যে, সফরকারী যখন কোন শহরে প্রবেশ করে তখন সে যেন তার সবচেয়ে ভাল পোশাক পরে, নগরে প্রবেশ করে সজীব এবং পরিচ্ছন্নভাবে যেন এইমাত্র সে তার উটের উপর চড়েছে। কাজেই আমরা আমাদের বাকি পানি খরচ করে ফেলি আমাদের হাত মুখ ধোয়ার জন্য, আমাদের অবহেলিত দাড়ি ছেঁটে নিই এবং আমাদের জীনের উপর চাপানো তলে টেনে বের করি আমাদের শুভ্রতম জামা-কৃর্তা। আমরা আমাদের ‘আবায়া’র উপর থেকে এবং জীনের উজ্জ্বল রংয়ের ঝুলন্ত টাসেল থেকে কয়েক হপ্তার জমে-ওঠা মরুবালি ঝেড়ে ফেলি বরুশ দিয়ে এবং আমাদের উটগুলিকে সাজাই তাদের উত্তম অলংকারে।
এবং এতক্ষণে আমরা তৈরি হয়েছি হাইল শহরে আমাদেরকে পেশ করবার জন্য। এই শহরটি প্রকৃতির দিক দিয়ে অনেক বেশি আরবীয়, যেমন ধরুন, বাগদাদ অথবা মদীনা থেকে। আরব-বহির্ভূত কোন দেশ বা জাতির কোন উপাদানই এ শহরে নেই, -সদ্য দোয়অনো এক গামলা দুধের মতোই এ শহরটি পবিত্র এবং নির্ভেজাল। বাজারে এখানে দেখা যায় না কোন বিদেশী পোশাক, দেখবেন কেবল ঢিলা আরবী ‘আবায়া’, ‘কুফিয়া’ এবং ‘ইগাল’। মধ্যপ্রাচ্যের আর যে- কোন রাস্তার চেয়েও এর রাস্তাগুলি অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন- এমনকি, নযদের জন্য যে- কোন শহর থেকেও- যে নযদ তার অপ্রাচ্য পরিচ্ছন্নতার জন্য মশহুর (সম্ভবত কারণ এই যে, এ দেশের মানুষ চিরকালই ‘আযাদ’ রয়েছে বলে প্রাচ্যের যে-কোন স্থানের চাইতে ওরা অনেক বেশি আত্মমর্যাদাোধ বজায় রেখেছে। এখানকার ঘর বাড়িগুলি চাপ দিয়ে শক্ত- করা কাদা-মাটির ঢেলা, একটির উপর আরেকটি বিছিয়ে তৈরি করা; ঘরগুলি মেরামত করা হয়েছে সুন্দরভাবে.. ব্যতিক্রম কেবল বিধ্বস্ত নগরীর প্রাচীরগুলি যা এখনো সাক্ষ্য বহন করছে ইবনে সউদ এবং ইবনে রশিদের পরিবারের মধ্যকার বিগত যুদ্ধের এবং ১৯২১ সালে এবং স্বয়ং ইবনে সউদ কর্তক শহরটি বিজয়ের।
তাম্রকারদের হাতুড়িগুলি পিটিয়ে পিটিয়ে তৈরি করছে সকল রকমের পাত্র, মিস্ত্রিদের করাতগুলি চিৎকার করে দাঁত বসিয়ে দ্ছে কাঠের মধ্যে, মুচিরা তলী লাগাচ্ছে স্যান্ডেলের। ভীড় ঠেলে ঠেলে চলেছে উট, পিঠে লাকড়ির বোঝা এবং মাখন ভর্তি চামড়ার মশক নিয়ে বাকি সব উট, যাদের বেদুঈনেরা এনেছে বিক্রির জন্য, বাতাসকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে তাদের গর্জনে। আলহাসা থেকে আনীত উজ্জ্বল জীনের থলেসমূহ আঙুল দিয়ে টিপে টিপে পরীক্ষা করছে অভিজ্ঞ হস্ত। নিলামদারেরা বাজারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত চলেছে চিৎকার করতে করতে, তাদের জিনিস বিক্রির ঘোষণা করে করে ঘুরে-ফিরে নির্দিষ্ট তারিখে। এ ধরনের নিলাম যে কোন আরব শহরের একটি চিরচারিত বৈশিষ্ট্য। এখানে ওখানে আপনি দেখতে পাবেন শিকারী বাজ পাখী ওদের কাঠের দাঁড়ের উপর নিচে লাফাচ্ছে ওদের পা বাঁধা পাতলা চামড়ার ফালি দিয়ে। ‘মৌ-রঙা’ ‘সালুকী’ হাইণ্ড কুকুর ওদের সুন্দর অংশ- প্রত্যংগগুলি আলস্য ভরে রোদে ছড়িয়ে দিয়ে পড়ে আছে। জীর্ণ ‘আবায়া’ গায়ে কৃশ বেদুঈনেরা, চমৎকার পোশাক পরা নওকরেরা এবং আমীরের দেহরক্ষীরা- প্রায় সকলেই দক্ষিণের প্রদেশগুলির লোক- মেলামেশা করছে বাগদাদ, বসরা এবং কুয়েতের সওদাগর আর হাইলের বাসিন্দাদের সাথে। এই সব স্থানীয় বাসিন্দা অর্থাৎ পুরুষেরা- কারণ মেয়েদের তো আপনি বেশি কিছু দেখতে পাবেন না ওদের কালো ‘আবায়া’ ছাড়া, যা ঢেকে রাখে ওদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত- এরা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে খুবসুরৎ খান্দানগুলির অন্যতম একটি খান্দানের লোক। আরবজাতি চেহারা আর অংগভংগীর যা কিছু সৌন্দর্য- সুষমা আজ পর্যন্ত লাভ করেছে, মনে হয়, তার সবই মূর্ত হয়েছে এই শাম্মার কবিলার মধ্যে, যার সম্পর্ক প্রাক- ইসলামী যুগের কবি গেয়েছিলেনঃ উচ্চভূমিতে বাস করে ইস্পাতের মতো তেজী পুরুষেরা আর গর্বিত সাধ্বী রমনীরা।
আমরা যখন ‘আমীরে’র কিল্লা সম্মুখে পৌঁছুই, যেখানে আমরা পরবর্তী দু’দিন থাকবো বলে স্থির করি, আমরা দেখতে পেলাম, আমাদের মেহমানদারেরা কিল্লার দরোজার বাইরে খোলা জায়গায় দরবার বসিয়েছে। আমীর ইবনে মুসা’দ হচ্ছেন ইবনে সউদের খান্দানের জিলুভী শাখার লোক এবং বাদশাহর একজন শ্যালক। ইনি বাদশাহর শক্তিশালী গভর্নরদের অন্যতম। এঁকে বলা হয় ‘উত্তরের আমীর’ কারণ, ইনি কেবল জবল শাম্মার প্রদেশের উপর কর্তৃত্বই করেন না, সিরিয়া এবং ইরাকের সরহদ পর্যন্ত সমগ্র উত্তর নযদ, যে এলাকার আয়তন প্রায় ফ্রান্সের মতোই বিশাল, এই গোটা অঞ্চলটির উপরই তাঁর কর্তৃত্ব।
‘আমীর’ যিনি আমার পুরানো দোস্ত এবং স্তেপ অঞ্চল থেকে এসেছে এমন একজন বেদুঈন ‘শায়াখ’ বসে আছেন কিল্লার দেয়াল বরাবর তৈরি একটি দীর্ঘ সংকীর্ণ ইটের বেঞ্চির উপর। লম্বা এক সারিতে তাঁদের পায়েল কাছে বসে আছে ইবনে মুসা’দ- এর ‘রাজাজিল’- রাইফেল আর রূপার খাপে ঢাকা তলোয়ারে সজ্জিত অস্ত্রধারী, রক্ষীরা, যারা দিনের মধ্যে কখনো তাঁকে ছেড়ে যায় না, যতোতটা না তাঁর রক্ষার জন্য তার চেয়ে বেশি তাঁর মর্যাদার খাতিরে; ওদের পরে রয়েছে বাজ পাখী পোষণেওয়ারা, পাখীগুলিকে দস্তানাপরা মুষ্টির উপর বসিয়ে- রয়েছে নিম্নস্তরের ভৃত্যেরা, বেদুঈনেরা, একদল অনুচর, ছোটো এবং বড়ো আস্তাবলের সহিস পর্যন্ত- সকলেই এক অপরকে সমান মনে করছে মানুষ হিসাবে, তাদের পদের পার্থক্য সত্ত্বেও। এবং এদেশে, যেখানে আপনি কখনো কাউকে সম্বোধন করেন না ‘আমার প্রভু’ বলে সালাতে আল্লাহকে সম্বোধন করা ছাড়া, সেখানে এর অন্যথা কী করেই বা সম্ভবপর হতে পারে? ওঁদের দিকে মুখ করে একটি বৃহৎ অর্ধবৃত্তের আকারে বসেছে বেদুঈন এবং শহুরে লোকেরা, যারা নিজেদের নালিশ এবং ঝগড়া-ফাসাদের বিষয় পেশ করছে ‘আমীরে’র কাছে ফয়সালার জন্য।
আমরা আমাদের উটগুলিকে এই বৃত্তের বাইরে বসিয়ে দিই। যে দু’জন অনুচর আমাদের কিকে দৌড়ে এসেছে তাদের হেফাজতে উটগুলিতে রেখে দিয়ে আমরা আগিয়ে যাই ‘আমীরে’র দিকে। তিনি দাঁড়িয়ে যান এবং যাঁরা বসেছিলেন তাঁর পাশে বেঞ্চির উপর এবং সম্মুখে যমীনের উপর, তাঁরাও তাঁর সংগে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমার দিকেই তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেনঃ ‘আহলান ওয়া সাহলান’- ‘আসুন, বসুন, আল্লাহ আপনার হায়াত দারাজ করুন’।
আমি আমীরের নাকের ডগায় এবং কপালে চুমু খাই আর তিনি চুমু খান আমার উভয় গালে; তারপর আমাকে টেনে বসিয়ে দেন বেঞ্চিতে, তাঁর পাশে। জায়েদ তার নিজের স্থান করে নেয় ‘রাজাজিল’দের মধ্যে।
ইবনে মুসা’দ আমাকে তাঁর মেহমানদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এঁদের কেউ কেউ আমার কাছে একেবারে নতুন, আবার কেউ কেউ কয়েক বছর ধরে পরিচিত। এঁদের মধ্যে রয়েছে গাদবান ইবনে রিমাল, সিজারা শাম্মারদের সর্বোচ্চ ‘শায়খ’। এই হাসিখুশি প্রবীণ যোদ্ধাকে সবসময় আমি চাচা বলে ডাকি। তাঁর এই প্রায়-সম্পূর্ণ জরাজীর্ণ চেহারা দেখে কেউ আন্দাজও করতে পারবে না, তিনি উত্তর অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ সর্দার; তিনি তাঁর তরুণী ভার্যার গায়ে সোনা ও মণি-মুক্তার এতো অলংকার চাপিয়ে দিয়েছেন যে, সাধারণের বিশ্বাস, এই তরুণী যখন তাঁর ষোলোটি খুঁটির ওপর স্থাপিত বিশাল তাঁবু থেকে বের হতে ইচ্ছা করেন তখন তাঁকে তাঁর গায়ের ভার রাখতে হয় দু’টি ক্রীতদাসীর উপর।
তাঁর চোখ দু’টি ঝিলিক মারতে লাগলো যখন তিনি আমাকে আলিংগন করলেন এবং আমার কানে ফিস ফিস করে বললেনঃ
-‘এখনো নতুন বৌ পাওনি?’
আমি এর জ বাবে কেবল স্মিত হাসি এবং কাঁধ ঝাঁকুনি দিই।
আমীর ইবনে মুসা’দ নিশ্চয়ই এই রসিকতা শুনে ফেলেছেন, কারণ তিনি উচ্চেস্বরে হেসে বললেন,
-‘শ্রান্ত মুসাফিরের জন্য দরকার স্ত্রী নয়, কফি’। তারপর তিনি হাঁক দেন,
‘কাহওয়া’
-‘কাহওয়া’- পুনরাবৃত্তি করে আমীরের নিকটতম নওকরটি এবং সারির শেষপ্রান্তে যে নওকরটি রয়েছে সেই এই ধ্বনিটি মুখে নিয়ে বলে ‘কাহওয়া’। এভাবেই তা চলতে থাকে যতোক্ষণ না আনুষ্ঠানিক আদেশটি গিয়ে পৌছায় দুর্গদ্বারে এবং তা আবার প্রতিধ্বনিত হয় ভেতরে। মুহূর্তের মধ্যে একটি নওকর আবির্ভূত হয় বাঁ হাতে ঐতিহ্যময় পিতলের কফিপত্র এবং ডান হাতে ছোট ছোট কয়েকটি পেয়ালা নিয়ে, আর পহেলা সে কফি ঢালে ‘আমীরে’র জন্য, দ্বিতীয়বার ঢালে আামার জন্য আর তারপর, বাকি মেহমানদের কফি পরিবেশন করে ওদের মর্যাদানুসারে। একবার অথবা দু’বার ফের ভর্তি করা হচ্ছে পেয়ালা এবং কোন মেহমান ইংগিত করেন যে, তাঁর আর দরকার নেই, তখন পেয়ালাটি আবার পূর্ণ করা এবং পরিবেশন করা হয় পরবর্তী মেহমানকে।
বোঝা যাচ্ছে, ‘আমীর’ ইরাক সীমান্তে আমার সফরের ফল জানতে উৎসুক। কিন্তু পথে আমার কী কী ঘটেছে, কেবল এই সব ছোট-খাট প্রশ্নের মধ্যে ধরা পড়ছে তাঁর ঔৎসুক্য, পূর্ণতরো খোঁজ-খবর নেওয়ার কাজটি রেখে দিচ্ছেন সেই সময়ের জন্য যখন একলা হবো আমরা দু’জন। তারপর, আমাদের উপস্থিতিতে যে-বিচারের শুনানীতে ছেদ পড়েছিলো তিনি আবার শুরু করলেন সেই শুনানী।
প্রতীচ্যে এ ধরনের সাদামাটা জটিলতামুক্ত বিচারালয় অকল্পনিয়, অবশ্য শাসক ও বিচারক হিসাবে সকল সম্মানই ‘আমীরে’র প্রাপ্য। কিন্তু বেদুঈনেরা তাঁকে যে সম্মান দেখায় তাতে গোলামি মনোভাবের কোন চিহ্নই নেই। বাদী এবং বিবাদী প্রত্যেকেই, সে-যে মানুষ হিসাবে আযাদ, এই চৈতন্যে সগৌরবে অবস্থান করছে। তাদের অংগভংগীতে কোন দ্বিধা-জড়তা নেই, তাদের কণ্ঠ প্রায়ই সোচ্চার এবং দৃঢ়তাব্যঞ্জক, আর প্রত্যেকেই আমীরে’র নিকট এভাবেই কথা বলছে যেন সে কথা বলছে বড়ো ভাইয়ের সংগে- তাঁকে ডাকছে, বাদশাহর নিজের ক্ষেত্রেও প্রচলিক বেদুঈন রীতি মোতাবেক, তাঁর প্রথম নাম ধ’রে, তাঁর খেতাব ধরে নয়। উগ্রতার আভাস মাত্র নেই ইবনে মুসা’দের অভিজাত্যের মধ্যে। তাঁর খাটো কালো দাড়ি শোভিত সুন্দর মুখখানা, তাঁর মাঝারি আকারের কিছুটা গাট্টাগোট্টা শরীরে ব্যক্ত করছে সেই সহজাত আত্মসংযম এবং সহজ মর্যাদাবোধ, যা আরবদেশে প্রায়ই দোর্দণ্ড প্রতাপের পাশাপাশি বিদ্যমান। ইবনে মুসা’দ খুবই গম্ভীর এবং কথাবার্তায় অতি সংক্ষিপ্ত্ কৃতিত্বপূর্ণ বাক্যে তিনি সহজ মামলাগুলির ফয়সালা করে ফেলেন কালাবিলম্ব না করে এবং একটু জটিল মামলাগুলি, যার জন্য আইনশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য প্রয়োজন, পাঠিয়ে দেন সে এলাকার ‘কাযী’র নিকট।
কোন বৃহৎ বেদুঈন অঞ্চলে সবোর্চ্চ ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সহজ নয়। বেদুঈনের নালিশের উত্তেজনাপূর্ণ জটিলতার মধ্যে সঠিক ফয়সালাটি পেতে হলে প্রয়েঅজন হবে সমূহ বেদুঈন কবিলা, বিভিন্ন পরিবারের সম্পর্ক, প্রধান প্রধান ব্যক্তিগণ, গোত্রগুলির পশুচারণ ক্ষেত্র, অতীত ইতিহাস ও বর্তমান মানসিক মেজাজমর্জি সম্পর্কে নিবিড় জ্ঞানের। এক্ষেত্রে বুদ্ধির ক্ষুরধারের মতোই প্রয়োজন হৃদয়ের চাতুর্যের এবং ভূলের হাত থেকে বাঁচার জন্য উভয়কে অবশ্যই কাজ করতে হবে এক সংগে সূচাগ্র সূক্ষ্ম সঠিকতার সাথে। কারণ বেদুঈনেরা তাদের প্রতি কোন অনুগ্রহ করা হলে জীবেন কখনো যেমন ভূলে না, ঠিক তেমনি তারা, বিচারের যে রায়কে অন্যায় মনে করে তা’ও কখনো ভুলে না। অপরদিকে, ন্যায়সংগত রায়কে যাদের বিরুদ্দে দেওয়া হয়েছে সে রায়, তারাও প্রায় সবসময়ই হাসিমুখে গ্রহণ করে। সম্ভবত ইবনে সউদের আর ‘সকল আমীর’ থেকেই ইবনে মুসা’দ শ্রেষ্ঠতরো, এই সকল শর্ত পূরণের দিক দিয়ে। তিনি এতো আত্মসমাহিত, এতো চুপচাপ এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে এতোটা মুক্ত যে, যখনি তাঁর বিচারবুদ্দি একেবারে শেষপ্রান্তে পৌঁছায়, ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর সহজাত অনুভূতি প্রায় সবসময়ই তাঁকে দেখায় সঠিক পথ। তিনি জীবন নদের সাঁতারু। তিনি নিজেকে ভাসিয়ে দেন স্রোতের টানে এবং স্রোতের সংগে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেন নিয়ন্ত্রণ করেন স্রোত।
এই মুহূর্তে দু’জন জীর্ণ পোশাক পরা বেদুঈন উত্তেজনাময় বাক্য আর অংগভংগীর সাথে তাদের ঝগড়ার বিষয় পেশ করছে। সাধারণত বেদুঈনদের বিষয়ে কিছু স্থির করা কঠিন কাজ; তাদের মধ্যে সব সময় এমন কিছু থাকে যার ব্যাপারে আগাম কিছু বলা যায় না- হঠাৎ স্বতঃস্ফূর্ত উত্তেজনার সম্ভাবনা, যা আপোস করতে জানে না- সবসময় জান্নাত আর জাহান্নাম যেন একে অপরের কাছাকাছি। কিন্তু আমি এখন দেখতে পাচ্ছি, কেমন করে ইবনে মুসা’দ ওদের জ্বলন্ত গোস্বার মধ্যে ওদেরকে আলাদা করে দিচ্ছেন এবং তাঁর নিরুত্তাপ কথার দ্বারা শান্ত করছেন ওদের। কেউ কেউ মনে করতে পারে, ওদের একজন যখন নিজের হক প্রতিষ্ঠার জন্য উকালতি করছে, তখন অন্যকে তিনি হুকুম করবেন খামোশ হতে; কিন্তু না, তিনি তা করলেন না। বরং তিনি তাদের উভয়কে একই সাথে বলতে, গলাবাজিতে একে অপরকে ছাড়িয়ে যেতে দিলেন এবং কেবল মাঝে মাঝে তিনি ওদের মাঝাখানে এসে দাঁড়াচ্ছেন, এখানে একটি শব্দ, ওখানে একটি প্রশ্ন নিয়ে, আর পরমুহূর্তেই তিনি তলিয়ে যাচ্ছেন ওদের উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্কের মধ্যে; তিনি হার মানেন এবং মনে হয় যেন তিনি পিছু হটছেন, কেবল কিছুক্ষণ পরেই আর একটি উপযুক্ত মন্তব্য নিয়ে ওদের মধ্যে এসে দাঁড়ানোর জন্য। এভাবে বাস্তবের সংগে বিচারকের নিজের মনকে খাপ খাইয়ে নেয়া যে-বাস্তবের ব্যাখ্যা করে চলেছে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে দুই ক্রুদ্ধ মানুষ- এ দৃশ্য মনোমুগ্ধকরঃ এভাবে খাপ খাইয়ে নেবার প্রয়াস আইনের অর্থে সত্যানুসন্ধান যতোটুকু নয়, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে ধীরে ধীরে একটি গোপন বস্তুগত সত্যের উন্মোচন। ‘আমীর’ এই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হন থেমে থেমে এবং সত্যকে টেনে বের করেন, যেন একটি সূক্ষ্ম তারের সাহায্যে, আস্তে আস্তে পরম ধৈর্যের সংগে, বাদী-বিবাদী দুয়েরই প্রায় অলক্ষ্যে… যখন ওরা হঠাৎ থেকে যায়, একে অপরের দিকে তাকায় বিস্ময়-বিমূঢ় দৃষ্টিতে এবং বুঝতে পারেঃ রায় দেওয়অ হয়ে গেছে এবং এ রায় স্পষ্টত এমনি ন্যায়সংগত যে, এর আর কোন ব্যাখ্যাই দরকার করে না… এর ফলে ওদের দু’জনের একজন দাঁড়িয়ে পড়ে দ্বিধার সংগে, তার ‘আবায়া’ লম্বা হয়ে ঝুলে পড়ে এবং ওর কিছুক্ষণ আগেকার প্রতিদ্বন্দ্বীর হাত ধরে প্রায় বন্ধুসুলভ ভংগীতে সবলে আকর্ষণ করেঃ ‘চলো’ এবং দু’জনেই দরবার থেকে বের হয়ে পড়ে, এখনো কিছুটা হতবুদ্ধি এবং একই সংগে ভাবমুক্ত, ‘আমীরে’র প্রতি অনুচ্চ কণ্ঠে শান্তি কামনা করতে করতে।
দৃশ্যটি চমৎকার- একটি খাঁটি শিল্প যেনঃ মনে হয় এটি যেন একটি নমুনা, আইনশাস্ত্র ও ইনসাফের মধ্যে ফলপ্রসূ সেই সহযোগিতার, যা প্রতীচ্যের আদালত ও আইন সভাগুলিতে এখনো রয়েছে তার শৈশবে; কিন্তু এখানে, যা একজন আরব ‘আমীরে’র কিল্লঅর সম্মুখে ধূলাবালিপূর্ণ বাজারের চকে ফুটে উঠেছে তার সার্বিক পূর্ণতায়!
ইবনে মুসা’দ মাটি দেয়ালে আলস্যভরে হেলান দিয়ে পরবর্তী মামলাটি নেন শুনানীর জন্য। তাঁর লেখা-পড়া দৃঢ় মুখমণ্ডল আর তার মধ্যে গহীন দু’টি চোখ, যার চাহনি উদ্দীপনাময় এবং মর্মভেদী- তাঁর এ মুখ হচ্ছে মানুষের এক সত্যিকার নেতার মুখ, তার জাতির মহত্তম গুণের উৎকৃষ্টতম প্রতীক। এই মহত্তম গুণটি কী? হৃদয়েল সহজ জ্ঞান।
উপস্থিত লোকজনদের আরো কেউ কেউ এমনতরো সপ্রশংস বিস্ময় ব্যক্ত করে প্রকাশ্যে। হারব কবিলার এক বেদুঈন, যে নাকি ‘আমীরে’র দেহরক্ষী, বসেছিলো আমার সামনেই মাটির উপর; লোকটি আমার দিকে গলা বাড়িয়ে দিয়ে স্মিত হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে বলেঃ
‘ইনি কি সেই সুলতানের মতো নন যাঁর সম্বন্ধে মুতান্নবী বলেনঃ
“তাঁর সংগে আমার মোলাকাত হয়েছিলো যখন তাঁর (চোখ) ঝলসানো তরবারি ছিলো কোষবদ্ধ,
আমি তাঁকে দেখেছি সে তরবারি ছিল রক্তরঞ্জিত,
এবং সবসময় আমি তাঁকে পেয়েছি
মানব জাতির সর্বোত্তমরূপে,
কিন্তু তবু তার মধ্যেও সবচেয়ে উত্তম ছিলো তাঁর মহৎ হৃদয়…?”
একজন নিরক্ষর বেদুঈন, দশম শতকে বাস করতেন এমন একজন শ্রেষ্ঠ আরব কবির কবিতা উদ্ধৃত করছে শুনে আমার কাছে তাতো বেখাপ্পা নয়, যেমন ঠেকতো বেবেরিয়ার কোন চাষীকে গ্যেটের কবিতা আওড়াতে শুনলে, কিংবা কোন ইংরেজ খালাসীকে উইলিয়াম ব্ল্যাক বা শেলীর কবিতা আবৃত্তি করতে দেখলে। কারণ পাশ্চাত্য জনসাধারণের মধ্যে শিল্পের অধিকতরো বিস্তার সত্ত্বেও পশ্চিমা সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলিতে আসলে গড়পড়তা ইউরোপীয় বা আমেরিকানের কোন অংশ নেই- পক্ষান্তরে অশিক্ষিত, এমনকি কখনো নিরক্ষর মুসলমানদেরও একটি বিপুল অংশ প্রত্যহ তাদের অতীতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে শরীক হয়ে থাকে সচেতনভাবে। ঠিক যেমন এই বেদুঈনটি তার নিজের দেখা একটি অবস্থাকে দৃষ্টান্ত দিয়ে বোঝানোর জন্য মুতান্নাবী থেকে একটি উপযুক্ত চরন মনে করতে সক্ষম হয়েছে, তেমনি বহু জীর্ণ পোশাক পরা ইরানী, যারা স্কুলে পড়াশুনা করেনি- হতে পারে সে একজন ভিস্তি, বাজারের কুলি অথবা সীমান্ত চৌকির একজন সেপাই- হাফিজ, জামী অথবা ফেরদৌসীর অসংখ্য কবিতা বহন করে তাদের স্মৃতিতে এবং তাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার বুনোটের মধ্যে সেগুলিকে দেয় গেঁথে। যে সৃজনশীলতা ওদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে করেছিলো অতো মহান, যদিও ওরা সেই সৃজনশীলতাকে অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছে, তবু এই মুসলিম জাতিগুলি আজো একটি প্রত্যক্ষ, জীবন্ত সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছৈ ঐ উত্তরাধিকারের শীর্ষ চূড়াগুলির সাথে, এর মহত্তম সম্পদগুলির সাথে।
……. ……… ………… …………
দামেশকের বাজারে যেদিন আমি এ আবিষ্কারটি করি তার কথা আজো আমার মনে পড়ে। আমার হাতে ছিলো একটি পাত্র, পোড়ামাটি দিয়ে তৈরি একটি বৃহৎ গামলা। এর আকৃতিটি ছিলো অদ্ভুত গাম্ভীর্যময়ঃ বড় এবং গোলাকৃতি, একদিকে চাপা একটি গোলকের মতো, যার অনুপাত প্রায় হুবহু সাংগীতিক অনুপাতের সাথে তুলনীয়; পাত্রটির গোল উপরিভাগ থেকে, যার পেলবতা রমণীর গালের মতোই কোমল, দুটি হাতল নিখুঁতভাবে বেঁকে ঝুঁকে পড়েছে বাইরের দিকে, যা গ্রীক ‘এমফোরার’ জন্য হতে পারতো গর্বের বস্তু। ওর এই হাতের আঙুলের ছাপ দেখতে পাচ্ছিলাম কাদার মধ্যে, পাত্রটির ভেতর দিকে ঘুরিয়ে দেয়া কাঁদি ঘিরে সে তার ছেনির দ্রুত সুনিশ্চিত আঁচড়ে এমন সূক্ষ্ম লতাপাতার একটি চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে যেন প্রস্ফুটিত গোলাপ ফুলের এক বাগিচার ইংগিত বহন করছে ছবিটি। কুমারটি কাজ করছে দ্রুত, প্রায় ঔদাসিন্যেল সংগে যখন সে সৃষ্টি করে চলেছে এই আশ্চর্য সরলতা, যা ইউরোপের মিউজিয়ামগুলিতে এত প্রিয়-প্রশংসিত সেলজুক ও ইরানী মৃৎশিল্পের সমস্ত গৌরব জাগ্রত করে মনেঃ কোন শিল্প সৃষ্টির কোন মতলব এই কুমারটির ছিলো না। সে যা তৈরি করছিলো তা হচ্ছে একটি রান্নার হাঁড়ি, আর কিছু নয়, কেবল একটি রান্নার হাঁড়িই, যা কোন ‘ফেলাহ’ বা বেদুঈন কয়েকটি তামার পয়সার বিনিময়ে যে- কোন বাজারে যে কোনদিন কিনতে পারে।
আমি জানি ইউনানীরা অনুরূপ বা এর চেয়ে বেশি পূর্ণতা এনেছিলো, সম্ভবত রান্নার পাত্রেও; কারণ ওরাও- ভিস্তি এবং বাজারের কুলি, সেপাই এবং কুমার প্রত্যেকেই- এমন এক সংস্কৃতিতে সত্যিকার অংশীদার ছিলো যা কেবল গুটি কয়েক বাছা বাছা ব্যক্তির সৃজনধর্মী ব্যগ্রতার উপর, কেবল প্রতিভাবান ব্যক্তিরাই পৌঁছুতে পারে এমন গুটি কয়েক উত্তুংগ চূড়ার উপর স্থাপিত ছিলো না, যে-সংস্কৃতি ছিলো সকলের সাধারণ সম্পদ। সুন্দর বস্তু যে-সব বস্তু ছিলো সে সংস্কৃতির অংগ, সেগুলিকে তাদের গর্ববোধ ছিলো তাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপের অংগঃ সকলের মিলিত জীবন্ত অধিকারে নিরবচ্ছিন্ন অংশ গ্রহণ।
সেই পাত্রটি আমার দু’হাতে ধরে রাখতে রাখতে আমি উপলব্ধি করি- ধন্য সে সব মানুষ, যারা তাদের রোজকার রাঁধে এ ধরনের পাত্রে, ধন্য সে-সব মানুষ একটি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারের যাদের দাবি ফাঁকা অহংকার নয়- তার চাইতে অনেক বেশি কিছু।
চার
-‘মুহাম্মদ, তুমি কি এখন আমার সাথে খেতে বসে আমাকে সরফরায করবে?’ ইবনে মুসা’দের কণ্ঠস্বরে আমার কল্পনার সূত্র ছিঁড়ে যায়; আমি চোখ মেলে তাকাই এবং দামেশকে আবার হারিয়ে যায় অতীতে, যেখানে তার স্থান; আর আমি ফের নিজেকে আসীন দেখতে পাই বেঞ্চির উপরে; ‘উত্তর অঞ্চলের আমীরে’র পাশে। বিচারসভা তখনকার মতো শেষ হয়েছে। মামলাবাজেরা বিদায় নেয় একে একে। ইবনে মুসা’দ বেঞ্চি থেকে উঠে পড়েন এবং তাঁর সংগে দাঁড়িয়ে পড়ে তাঁর মেহমান ও সান্ত্রীরা।
দলটি দু’ভাগ হয়ে পথ করে দেয় আমাদের জন্য। আমরা দাখিল দরোজা অতিক্রম করার পর ওরা আবার জমা হয় এবং আমাদের পিছু পিছু আসে কিল্লা প্রাংগণে।
কিছুক্ষণ পর ‘আমীর’ গাদবান ইবনে রিমার এবং আমি একসাথে খেতেবসি মন্ত বড় একটি খাঞ্চায়। ভাতের উপর রয়েছে একটি আস্ত ভেড়ার কাবাব। আমরা ছাড়া কামরার মধ্যে রয়েছে ‘আমীরে’র দু’জন পার্শ্বচর আর এক জোড়া সোনালী রঙের ‘সালুকী’ হাউণ্ড।
প্রবীণ গাদবান আমার কাঁধের উপর হাত রেখে বলেন, ‘তুমি এখনো আমার প্রশ্নের জবাব দাওনি- এখনো নতুন বিবি জুটলো না?’
আমি তাঁর এই জিদে হাসি, ‘আপনি জানেন, মদীনায় আমার এক বিবি রয়েছে- আমি আরেকজন বিবি যোগাড় করতে যাবো কেন?’
-‘কেন?- আল্লাহ আমাকে রক্ষা করুন, ‘এক’ বিবি, আর তুমি এখনো এক নওজোয়ান! কেন, আমি যখন তোমার বয়সের ছিলাম…’।
-‘আমি শুনেছি, শায়খ গাদবান,’ মাঝখানে বাধা দেন আমীর ইবনে মুসা’দ, ‘এখনো আপনি আগের চেয়ে কম যান না’!
-‘হে আমীর, আমি তো এখন জীর্ণ ধ্বংসাবশেষ। আল্লাহ আপনার হায়াত দারাজ করুন, কিন্তু কখনো কখনো আমার জীর্ণ হাড়গুলিকে তাতিয়ে নেওয়ার জন্য আমি চাই উষ্ণ নারী দেহের সান্নিধ্য।… কিন্তু তুমি বলো,’ আমার দিকে ফেরেন গাদবান,’ সেই যে দু’বছর আগে মুতায়েরী মেয়টিকে শাদি করেছিলে, তার খবর কী? ওকে নিয়ে তুমি কী করেছো?’
-‘কেন- কিছুই না; আর এই হচ্ছে আমার জবাব,’ আমি বলি।
-‘কিচ্ছুই না…?’ বৃদ্ধ তাঁর চোখ দু’টি বিস্ফরিত করে পুনরাবৃত্তি করেন, ‘সে কি এতোই বদসুরৎ ছিলো?’
-‘না, বরঞ্চ সে ছিলো ভারি খুবসুরৎ’।
-‘ব্যাপার কি?’ জিজ্ঞাস করেন ইবনে মুসা’দ, ‘কোন মুতায়েরী নবীনা সম্পর্ক তোমরা কথা বলছো? একটু আলোকপাত করো মুহাম্মদ’।
আমি সেই ব্যর্থ বিয়ে সম্পর্কে আমীরকে অবহিত করার চেষ্টা করি।
আমি তখন বাস করছি মদীনায়, স্ত্রী-হীন, একাকী। মুতায়ের কবিলার এক বেদুঈন, নাম ছিলো যার ফাহাদ, রোজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতো আমার ‘কাহওয়ার মজলিসে’, আর আমাকে বলতো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আমলে লরেন্সের নেতৃত্বে তার যতো রকমের অবিশ্ব্যাস্য অভিযানের কথা। একদিন সে আমাকে বলল, ‘কোন মরদেরই উচিত নয় একা জিন্দেগী গুজরান করা; কারণ, তাতে লোহু জমে দানা বাঁধবে তোমার শিরা-উপশিরায়ঃ তোমার উচিত শাদি করা’। এবং যখন আমি তাকে রসিকতা করে বললাম, ভাবী একটা কনেকে এনে হাজির করতে সে জবাব দিলো, ‘তা তো খুবই সহজ। আমার বোনাই মুতারিকের কন্যা এখন শাদির লায়েক হয়েছে এবং তার মায়ের ভাই হিসাবে আমি তোমাকে বলতে পারি, সে অতিমাত্রায় খুবসুরৎ’।
ফের রসিকতার ভংগীতে আমি তাকে বললাম ওর পিতা রাজী হবে কি না খোঁজ করে দেখতে। কী আশ্চর্য! পরদিন মুতরিক নিজেই আমার নিকটে এসে হাজির! স্পষ্টতই বিব্রতভাবে কয়েক পেয়ালা কফি শেষ করে, কিছু কেশে, কিছু ইতস্তত করে শেষতক তিনি আমাকে বললেন, ফাহাদ তাকে বলেছে যে, আমি নাকি তার মেয়েকে শাদি করতে চাই। ‘তোমাকে দামাদরূপে পেলে আমি ধন্য হবোঃ কিন্তু রোকেয়া যে এখনো শিশু, তার বয়স মাত্র এগারো’।
মুতরিক এখানে এসেছেন এ খবর পেয়ে ফাহাদ গোস্বায় একেবারে আগুন হয়ে উঠলো, ‘বদমাশ! মিথ্যুক বদমাশ, মেয়ের বয়স এখন পনেরো! আসলে সে গাঁয়ের আরব কারো কাছে মেয়ে শাদি দিতে চায় না। অন্যদিকে সে জানে ইবনে সউদের সাথে তোমার সম্বন্ধ কতো ঘনিষ্ঠ। তাই সরাসরি প্রস্তাব না- মঞ্জুর করেও তোমাকে আঘাত দিতে চায় না। তাই সে ভান করছে যে, তার মেয়ে এখনো শিশু। কিন্তু আমি তোমাকে বলছি, তার বুক দু’টি এই রকম’- এবং সে তার হাত দিয়ে বর্ণনা করে, আকারে ও অনুপাতে প্রলোভন জাগায়, এমন এক বক্ষদেশের- ‘ঠিক যেন ছিঁড়ে খাওয়া যায় এমন পাকা ডালিক’।
এই বর্ণনায় বৃদ্ধ গাদবানের চোখ দু’টি ঝিলিক দিয়ে ওঠেঃ ‘পঞ্চাদশী, হাসিন এবং কুমারী’… তারপরও সে বলে, ‘কিছুই না! এর চেয়ে বেশি আর কি চাইতে পারতে তুমি?’
-‘বেশ, সবুর করো, যতক্ষণ না কাহিনীর বাকি অংশটি শেষ করছি…. আমাকে অবশ্যি স্বীকার করতে হবে যে, আমার আগ্রহ ক্রমেই বেড়ে চলেছিলো, হয়তো বা মুতরিকের আপত্তির জন্যই তা আরো উদ্দীপিত হয়েছিলো খানিকটা। আমি ফাহাদকে দশটি সোনার মহর দিই। ফাহাদ আমার কাছে বিয়ে দেবার জন্য ক’নের মা-বাপকে বোঝাতে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে। অনুরূপ একটা উপহার পাঠানো হলো ক’নের মা, ফাহাদের বোনের নিকট। ওদের বাড়িতে সত্যি সত্যি কী ঘটেছিলো তা আমি জানি না। আমি শুধু এটুকু জানি যে, শেষতক ওরা দু’জনই এ বিয়েতে মুতরিককে রাজী করাতে সফল হয়।
-‘মনে হয় এই ফাহাদ’, ইবনে মুসা’দ বললেন, ‘খুবই ধূর্ত লোক। বোঝাই যাচ্ছে, সে এবং তার বোন আরো বড়ো বখশিস আশা করেছিলো তোমার কাছ থেকে! কিন্তু এরপর কি হলো?’
আমি তাদেরকে বলে চলি, কী করে কয়েকদিন পরে যথারীতি শাদি সম্পন্ন হয়েছিলো কনের গর-হাযিরিতে। রসুম মুতাবিক কনের প্রতিনিধিত্ব করেন তার পিতা, কনের ওলী এবং উকিল হিসাবেঃ কনের উকিল নিয়ে, দু’জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয় এজিনের সত্যতা সম্বন্ধে। এরপর শাদি উপলক্ষে এক ব্যয়বহুল সুস্বাদু খানা পরিবেশন করা হয়, তার সাথে এলো চিরাচরিত উপহার কনের জন্য (যাকে আমি এখন পর্যন্ত একবারো দেখিনি), তার আব্বা-আম্মার জন্য এবং আরো কয়েকজন নিকট আত্মীয়ের জন্য, যাদের মধ্যে, স্বাভাবিকভাবেই ফাহাদের স্থান ছিলো সর্বোচ্চ। সেই সন্ধ্যায়ই আমার জেনানকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসেন কনের মা এবং কয়েকটি বোরখা-পরা মেয়ে, যখন পাশের বাড়িগুলির ছাদের উপর থেকে দফ বাজাতে বাজাতে বিয়ের গান গাইছিলো রমণীরা।
নির্ধারিত সময়ে আমি ঢুকি সেই ঘরে যেখানে আমার বউ এবং তার আম্মা ইন্তেজারি করছিলেন আমার জন্য। দু’য়ের মধ্যে আমি কোন ফারাক করতে পারছিলাম না। কারণ দু’য়ের মধ্যে আমি কোন ফারাক করতে পারছিলাম না। কারণ দু’জনেরই পা থেকে মাথা পর্যন্ত বোরখাতে ঢাকা। কিন্তু আমি যখন রসুম মতো ‘আপনি এখন যেতে পারেন,’ এই শব্দগুলি উচ্চারণ করলাম তখন বোরখাপরা মহিলাদের একজন উঠে পড়েন এবং আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে যান; এভাবেই আমি জানতে পারি, যে নারী রয়ে গেলো সে-ই আমার স্ত্রী’।
-‘এবং তারপর বাবা… তারপর কী ঘটলো?’ – ইবনে রিমাল প্রশ্ন করেন, যখন আামর বর্ণনায় এই পর্যায়ে আমি একটু থামি। ‘আমীর’ আমার দিকে তাকালেন কৌতুক মেশানো-দৃষ্টিতে।
-‘তারপর… বেচারী মেয়েটি বসে আছে; সাফ বুঝতে পারছি সে ভীষণ ঘাবড়ে গেছে- এভাবে একটা বিলকুল অপরিচিত মরদের নিকট ওকে সঁপে দেয়ায়। এবং যখন আমি ওকে আমার জানা পরম বিনয় ও নম্রতার সাথে বললাম, ওর মুখের নেকাব তুলতে, ও তার ‘আবায়া’ আরো মজবুত করে জড়ালো তার গায়’।
-‘ওরা সবসময় এরূপই করে’। উচ্চকিত কণ্ঠে বলেন ইবনে রিমাল, ‘বাসর রাতের শুরুতে সবসময়ই ওরা এ রকম আতংকিত থাকে। আর তাছাড়া, তরুণী বালিকার জন্য শরমিন্দা হওয়া শোভনীয়ও বটে। কিন্তু পরে ওরা সাধারণত খুশিই হয়ে থাকে…. তোমার উনি খুশি হননি?’
-‘না, তেমনি খুশি হয়নি। ওর মুখের নেকাব সরাতে হলো আমাকেই এবং তা সরানোর পর আমি দেখতে পেলাম অতি খুবসুরৎ এক লাড়কিকে, যার মুখের রঙ পাকা গমের, আকৃতি আণ্ডার মতো, চোখ দু’টি বিশাল, আর ওর সুদীর্ঘ খেশদাম ও যে কুশনের উপর বসেছিলো তারই উপর ঝুলে পড়েছে। কিন্তু আসলেই এ ছিলো একটি শিশুর মুখ- যার বয়স কিছুতেই এগারোর বেশি হতে পারে না- ঠিক যেমনটি বলেছিলেন ওর বাপ, ফাহাদ এবং তার বোনের লোভই ওকে বয়সের বিচারে শাদির লায়েক বলে আমার কাছে তুলে ধরেছিলো। বেচারা মুতরিক মিথ্যা বলেননি একটুও”।
-‘কিন্তু তাতে কি হলো?’ জিজ্ঞাসা করেন ইবনে রিমাল। যেন আমি কি বলতে চাইছি তা তিনি বুঝতে পারেননি, ‘এগারো বছর কী অপরাধ করেছে? বালিকা তো বাড়ে- কেমন, বাড়ে না কি? আর সে আরো তাড়াতাড়ি বাড়ে খসমের বিছানায়…’।
কিন্তু আমীর ইবনে মুসা’দ বলেন, ‘না, শায়খ গাদবান তা নয়; ও তোমার মতন একজন নযদী নয়। ওর মাথায় মগজের পরিমাণ বেশি!’ এবং আামর দিকে ফিরে ইচ্ছাকৃত হাসি হেসে বলেন, “মুহাম্মদ, তুমি গাদবানের কথা শোন না। ও হচ্ছে একজন নযদী এবং আমরা প্রায় সকল নযদীরই মগজ (হাতে মাথার দিকে ইশারা ক’রে) ওখানে নয়- কিন্তু এখানে”- বলে তিনি অঙ্গুলি নির্দেশ করেন তার শরীরের সস্পূর্ণ এক ভিন্ন অংগের দিকে!
আমরা সকলেই হেসে উঠি এবং গাদবান তাঁর দাঁড়ির মধ্যে বিড়বিড় করে বলেন ‘তাহলে হে আমীর, আপনার চাইতে নিশ্চয়ই আমার মগজ বেশি!’
ওঁদের চাপে আমি ফের সেই কাহিনী বলে চলি; এবং ওঁদেরকে জানাই, এ বিষয়ে বৃদ্ধ গাদবানের যা-ই হোক, আামার বাল-বধূর এক্কেবারে কাঁচা বয়স আমার কাছে বাড়তি কিছু পওনা মনে হয়নি। ওর মামার একটা ন্যাক্কারজনক কৌশলের শিকার হয়েছিলো মেয়েটি। ওর প্রতি করুণা ছাড়া আর কিছুই অনুভব করিনি। মানুষ একটা শিশুর সাথে যেমন ব্যবহার করে আমিও ওর প্রতি তা-ই করি। ওকে আমি আশ্বাস দিই যে, আমার থেকে ওর ডর-ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু ও একটা কথাও বললো না; বরঞ্চ ও যেভাবে কাঁপছিলো তাতে ওর আতংকই প্রকাশ পেলো। একটা তাকের উপর আঁতি-পাঁতি খুঁজে আমি পেলাম একখণ্ড চকোলেট; সেই চকোলেটটি আমি ‘ওফার’ করি ওকে। কিন্তু জীবনে কখনো ও চকলেট দেখেনি বলে প্রচণ্ডভাবে মাথা নেড়ে তা প্রত্যাখ্যান করে। আমি তখন ‘আলেফ-লায়লা’ থেকে মজাদার কাহিনী বলে ওকে সহজ করে তোলার কুশিশ করি। কিন্তু ও তা বুঝলো বলে মনে হলো না। কাহিনীকে ওর মজাদার মনে করার তো কথাই ওঠে না; শেষতম ওর এই পয়লা ক’টি কথা ও উচ্চারণ করে- ‘আমার মাথা ধরেছে’…. আমি কটি এসপিরিন ট্যাবলেট ওর হাতে গুঁজে দেই এক গেলাস পানিসহ; কিন্তু এতে ওর ভয়ের আকস্মিক অভিব্যক্তি ঘটলো আরো প্রচণ্ডভাবে (পরে আমি জানতে পেরেছিলাম, ওর কোন এক বান্ধবী ওকে বলেছে, বিদেশের এ সব অপরিচিত লোকেরা কখনো কখনো বাসর রাতে ওদের স্ত্রীদেরকে এ জাতীয় ওষুধ খাওয়ায় খুব সহজে ওদের উপর বলাৎকার করার জন্য!) পুরা দু’ঘন্টা বা তার কাছাকাছি সময়ে আমি ওকে বোঝাতে সক্ষম হই যে, সেরূপ কোন জবরদস্তির মতলব আমার নেই। শেষতক ওর বয়েসী শিশুদের মতোই ও ঘুমিয়ে পড়ে, যখন আমি ঘরের এক কোণে গালিচার উপর বিছানা বিছাই নিজের জন্য।
পরদিন সকালে আমি ওর মায়ের জন্য লোক পাঠাই এবং দাবি করি যে, তিনি যেন তাঁর মেয়েকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। মহিলাটি তো বিস্ময়ে একেবারে হতবাক! অমন একটি সুস্বাদু লোকমা, এগারো বছরের কুমারীকে, কোন মরদ প্রত্যাখ্যান করতে পারে, অমন কশা জীবনে কখনো যেনো শোনেননি আমার শাশুড়ী। নিশ্চয়ই মনে করে থাকবেন, আমার মৌলিক ক্রটি রয়েছে!
-‘এবং তারপর,’ গাদবান জিজ্ঞাস করেন।
-‘কিছুই না- আমি মেয়েটিকে তালাক দিলাম, যে-হালে সে আামার কাছে এসেছিলো ঠিক সেই হালেই। ওর পরিবারের জন্য তেজারতিটি মন্দ হয়নি, কারণ ওরা মেয়েটিকে ফিরে পেলো এবং আমি যে দেনমোহর দিয়েছিলাম তা-ও, সাদির সব উপহারসহ। আর আমার ব্যাপারে চারদিকে এই গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে,আমি না-মরদ, পুরুষত্বহীন এবং আমার কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী বোঝাবার চেষ্টা করলো- সম্ভবত কেউ কিংবা আমার আগের কোন স্ত্রী যাদুটোনা করে থাকবে আমার উপর, যে যাদু থেকে আমি নিজেকে কেবল আরেকটি পাল্টা যাদুর সাহায্যেই আযাদ করতে পারি…’।
-‘মুহাম্মদ, আমি যখন মদীনায় তোমার পরের শাদির কথা আর তোমার ছেলের কথা ভাবি’, আমীর হাসতে হাসতে বললেন, ‘কোন সন্দেহ নেই যে, তুমি সত্যি একটা বড় রকমের যাদু করেছিলে…’।
পাঁচ
পরের রাতে আমি যখন আমার জন্য ছেড়ে দেয়া কামরায় ঘুমাতে যাচ্ছি, আমি দেখতে পেলাম জায়েদ, স্বভাবতই যেমন চুপচাপ তার চাইতে আজ সে অনেক বেশি নীরব। সে দরোজার কাছে এসে দাঁড়ায়, স্পষ্টই কোন সূদূর চিন্তায় যেন ও হারিয়ে গেছে। ওর থুঁতনি ওর বুকের উপর স্থাপিত আর চোখ দু’টির নজর মেঝেতে বিছানো খোরাসানী গালিচার নীল এবং শ্যাওলা- সবুজ গোল গোল নকশার উপর।
-‘এতোকাল পর, তোমার জোওয়ানী কালের শহরটাতে ফিরে এসে কেমন লাগছে জায়েদ?’- আমি ওকে প্রশ্ন করি, কারণ অতীতে আমি যখনই হাইলে এসেছি প্রত্যেক বারই জায়েদ এই শহরে ঢুকতে অমত করেছে।
-‘আমি ঠিক বলতে পারবো না চাচা’- ধীরে ধীরে ও জবাব দেয়…’ এগারো বছর- এগারো বছর চলে গেছে, আমি যখন শেষবার এখানে আসি। আপনি জানেন, আমি এখানে আসি, আমার অন্তর কিছুতেই রাজী হতে পারতো না এর আগে। কারণ, এলেই আমি দেখতে পেতাম দক্ষিণের লোকেরা বাদশাহী করছে ইবনে রাশিদের প্রাসাদে; এ আমার পক্ষে বরদাশত করা সম্ভব হতো না। কিন্তু যিলহাল আমি কিতাবের ভাষায় নিজেই বলছি-‘ হে আল্লাহ, সার্বভৌমত্বের অধিকারী, তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দাও এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা, ক্ষমতা কেড়ে নাও। তুমি যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করো এবং যাকে ইচ্ছা অধঃপতিত করো- তোমার হাতেই সমস্ত কল্যাণ এবং তোমার ক্ষমতা সমস্ত কিছুর উপরে’। বে-শক আল্লাহ ইবনে রশিদের খান্দানকে সুলতানাত দিয়েচিলেন, কিন্তু ওরা জানতো না, সেই ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ কী করে করতে হয়। ওরা ওদের কওমের প্রতি ছিলো দরাজ-দীল, কিন্তু স্বজনদের প্রতি কঠোর নির্দয় আর দেমাগে লাগাম ছাড়া, ওরা খুনাখুনি করেছে, ভাই ভাইকে কতল করেছে, আর এ জন্যেই আল্লাহ ওদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন এবং তা ফিরিয়ে দিয়েছেন ইবনে সউদের কাছে। আমার মনে হয়, এ নিয়ে আমার আর দুঃখ করা উচিত নয়; কারণ কিতাবে কি লেখা নেই, ‘কখনো কখনো তোমরা কোন জিনিস ভালোবাসো এবং হতে পারে তা তোমাদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর এবং কখনো কখনো তোমরা কোন কিছুকে ঘৃণা করে থাকো- যদিও তা তোমাদের জন্য হতে পারে উত্তম?’
জায়েদের কণ্ঠস্বরে একটা মিষ্টি স্নিগ্ধ আত্মসমর্পণের ভাব- এই আত্মসমর্পণের অর্থ যা ইতিমধ্যে ঘটে গেছে এবং এ কারণে, যাকে আর পাল্টানো সম্ভব নয় তারই স্বীকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়। অতীত অপরিবর্তনীয় এই বাস্তব সত্যের প্রতি মুসলিম হৃদয়ের এই নীরব সম্মতি, যার অর্থ এই স্বীকৃতি যে, যা কিছু ঘটেছে তা যেভাবে ঘটেছে ঠিক সেভাবেই ঘটবার ছিলো এবং আর অন্য কোনভাবেই তার ঘটতে পারতো না- মুসলিম- হৃদয়ের এই রেজামন্দিকে অহরহ পাশ্চাত্যবাসীরা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্তর্নিহিত এক প্রকার ‘অদৃষ্টবাদ’ বলে ভূল ক’রে থাকে। কিন্তু ভাগ্যের প্রতি মুসলিমদের এই রেজামন্দির সম্পর্ক হচ্ছে অতীতের সাথে, ভবিষ্যতের সাথে নয়; এই স্বীকৃতির অর্থ কর্মের প্রত্যাখ্যঅন নয়, আশা ছেড়ে দেওয়া নয়, নিজেকে উন্নত করার উদ্যম পরিত্যগ করা নয়; বরং বাস্তব অতীতকে আল্লাহর কাজ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে অস্বীকার করা।
-‘এবং তা ছাড়া’, জায়েদ তার কথার জের টেনে চলে- ‘শাম্মারদের প্রতি ইবনে সউদ মন্দ কছিু করেননি। ওরাও তা জানে, কারণ বছর তিনেক আগে কুত্তা আদ-দাবিশ যখন তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো, তখন কি তারা তলোয়ার নিয়ে তাঁকে সমর্থন করেনি?’
সত্যই ওরা তা করেছিলো, আর খাঁটি আরবেরা ওদের জীবনের মহত্তম মুহূর্তগুলিতে যে বৈশিষ্ট্যরে পরিচয় দিয়ে থাকে বিজিতের সেই পৌরুষের সাথে। তা ওরা করেছিলো সেই সাংঘাতিক বছরটিতে, ১৯২৯ সালে, যখন ফয়সাল আদ-দাবিশের নেতৃত্বে পরিচালিত ভয়ংকর বেদুঈন বিদ্রোহ ইবেন সউদের রাজত্বের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলো, তখন নযদের বাসিন্দা সবকটি শাম্মার কবিলাই, বাদশাহর প্রতি তাদের এককালের দুশমনি ভুলে গিয়ে তাঁর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলো। পরে বিদ্রোহীদের উপর বাদশাহ যে-বিজয় লাভ করেন তাতে ওদের অবদান রয়েছে প্রচুর। এই আপোস-মীমাংসা সত্যই এক উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, কারণ মাত্র ক’ বছর আগে ইবনে সউদ হাইল জয় করেছিলেন অস্ত্র বলে, এবং এভাবে উত্তর অঞ্চলের উপর ফের কায়েম করেছিলেন দক্ষিণের হুকুমত; এবং আরো উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, শাম্মার খান্দান ও দক্ষিণ নযদের লোকদের মধ্যে যুদ যুদ স্থায়ী এই পারস্পরিক ঘৃণা-বিদ্বেষ যে নযদীদেরই একজন হচ্ছেন ইবনে সউদ নিজে। এই ঘৃণা কোন রাজবংশের ক্ষমতার দ্বন্দের চাইতেও অনেক বেশি গভীর। বহুলাংশে এ ঘৃণা (যা সাম্প্রতিক আপোস-রফাও পুরাপুরি মুছে দিতে পারেনি) হচ্ছে দক্ষিণ আর উত্তরের মধ্যে চিরাচরিত মুকাবিলারই প্রকাশ, যা আারবদের গোটা ইতিহাসের ধারা বেয়ে চলে এসছে- যার নমুনা পাওয়া যাবে আরো অনেক জাতির ইতিহাসে। কারণ, বিলকুল স্বতন্ত্র পড়শী জাতিগুলির মধ্যে জাতিগত অপরিচয় যে দুশমনি সৃষ্টি করতে পারে, প্রায়ই দেখা যায়, নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত গোত্রগুলির মধ্যেও জীবনের আভ্যন্তরীণ ছন্দে- তালে সামান্য একটু পার্থক তার চেয়ে বেশি দুশমনি পয়দা করতে পারে।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বিন্দ্বিতা ছাড়াও আরো একটি ব্যাপারের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে আরবের উত্তর এবং দক্ষিণ অঞ্চলের মধ্যকার আবেগাত্মক বৈপরীত্বের ক্ষেত্রে। নযদের দক্ষিণেই, রিয়াদের নযদিকে প্রায় দু’শো বছর আগে আবির্ভূত হয়েছিলেন পিউরিটান সংস্করক মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব; এবং বিভিন্ন গোত্রকে- যারা নামে মাত্র মুসলমান ছিলো সে সময়ে- উদ্দীপিত করেছিলেন ধর্মীয় এক নতুন আবেগে। তখনকার দিনের অখ্যাত ইবনে সাউদের খান্দানে- যার ছিলো ছোট্ট শহর দাবিয়া’র সরদার- এই সংস্কার পেয়েছিলেন সেই লৌহ বাহু, যার তাঁর প্রেরণাগর্ভ বাণীকে দেয় কর্মে শক্তি এবং কয়েক যুগের মধ্যেই আরব উপদ্বীপের এক বিশাল অংশকে সেই জ্বলন্ত আপোসহীন বিশ্বাসের আন্দোলনৈর আওতায় করে ঐক্যবদ্ধ- বিশ্বে যা পরিচিত ‘ওয়াহাবী মতবাদ’ নামে। গত দেড়শো বছরের সবকটি ওয়াহাবী যুদ্দ এবং বিজয়ের ক্ষেত্রেই দক্ষিণের এই লোকেরা হামেশা উচ্চে তুলে ধরেছে পিউরিটানিজমের ঝাণ্ডা, আর উত্তরের লোকেরা কেবল আধমনাভাবে থেকেছে ওদের সাথে, কারণ তন্ত্রের দিক দিয়ে শাম্মার কবিলা ওয়াহাবী মযহাবের সাথে একমত হলেও দক্ষিণের জ্বলন্ত অনমনীয় ধর্মীয় প্রর্বনা থেকে ওদের হৃদয় সবসময়ই অবস্থান করেছে বহুদূরে। সীমান্ত দেশ সিরিয়া এবং ইরোকের কাছাকাছি বাস করায় এবং সবসময়ই ওদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক থাকায় শাম্মার কবিলা বহু যুগের ধারায় তাদের দৃষ্টিভংগিতে লাভ করেছে একটি কোমল উদাসীনতা আর আপোসের জন্য মানসিক প্রস্তুতি, যা অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন দক্ষিণের মানুষদের কাছে অজ্ঞাত। দক্ষিণের লোকেরা কেবল চরমের সাথেই পারিচিত, এবং গত দেড়শো বছরে ওরা জিহাদের খোয়াব দেখা ছাড়া আর কিচুই ভাবেনি। গর্বিত উদ্ধত এসব লোকেরা মনে করে, কেবল ওরা নিজেরাই হচ্ছে ইসলামের খাঁটি প্রতিনিধি এবং আর সকল মুসলিম জাতিই হচ্ছে খারেজী।
এসব সত্ত্বেও ওয়াহাবীরা কোন আলাদা ফেরকা মোটেই নয়। ‘ফেরকা’র কথা উঠলেই বুঝতে হবে কতকগুলি আলাদা আলাদা মতের অস্তিত্ব রয়েছে- যা একটি ফেরকার অনুসারীদেরকে একই ধর্মের আর সকল অনুসারী থেকে আলাদা করে দিয়েছে। অবশ্য, ওয়াহাবী মতবাদে কোন পৃথক বিশ্বাস নেই; পক্ষান্তরে এ আন্দোলন, ইসলামের মৌলিক শিক্ষার চারপাশে বহু শতাব্দীর পরিক্রমায় যেসব আস্তর পড়েছে এবং যেসব নীতি ও বিশ্বাস ইসলামের উপর আরোপিত হয়েছে সেগুলি দূর করে রাসূলুল্লাহর মৌলিক শিক্ষায় ফিরে যেতে চেয়েছে। আপোসহীন স্পষ্টতার দিক দিয়ে এ আন্দোলনে নিশ্চয়ই এমন একটা উদ্যোগ ছিলো, যা ইসঅমের শিক্ষাকে যেসব কুসংস্কার আচ্ছান্ন করে রেখেছে সেগুলি থেকে ইসলামকে মুক্ত করতে পারতো কালক্রমে। বলাবাহুল্য, আধুনিককালের ইসলামের সবকটি রেনেসাঁ আন্দোলনেরই- ভারতের ‘আহলে হাদীস’ আন্দোলন, উত্তর আফ্রিকার সেনুসী আন্দোলন, জামালউদ্দীন আফগানী এবং মিসরের মুহাম্মদ আবদুহুর প্রচেষ্টা সব কিছুরই- উৎস সোজা খুঁজে পাওয়া যাবে আঠারো শতকে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব যে আধ্যাত্মিক গতিবেগের সূচনা করেছিলেন তারই মধ্যে। কিন্তু নযদে তাঁর শিক্ষার যে পরিণতি ঘটেছে তার দু’টি ক্রটি রয়েছে, যে কারণেও এ আন্দোলন আত্মিক বিকাশের একটি শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। এর একটি ক্রটি হচ্ছে সেই সংকীর্ণতা যার দ্বারা এ আন্দোলন প্রায় সকল ধর্মীয় প্রচেষ্টাকেই আক্ষরিক অর্থে ধর্মীয় আদেশ- নিষেধ পালনৈর মধ্যে সীমিত করার চেষ্টা করে, বাইরের আবরণ ভেদ করে তার আধ্যাত্মিক মর্মকেন্দ্র প্রবেশের প্রায়োজনকে অবহেলা করে। অপর ক্রটিটি খোদ আরব চরিত্রের মধ্যেই নিহিত- কেবল আমরাই সৎ পথ প্রাপ্ত- সেই অত্যুৎসাহী ধার্মকন্মন্য অনুভূতির মধ্যে- যা কাউযকে ভিন্ন মত পোষণ করার অধিকার দিতে রাজী নয়। এ মনোভংগী সত্যিকার সিমাইটের এক বৈশিষ্ট্য যেমন আরেকটি বৈশিষ্ট এর ঠিক বিপরীত- ধর্মীয় ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীনতা। ।আরবদের এ একটি দুঃজনক গুণ যে, ওদেরকে সব সময়ই দোল খেতে হবে দু’টি মেরুর মধ্যে এবং ওরা কখনো একটা মধ্য পন্হা খুঁজে বের করতে সক্ষম নয়। একদা, প্রায় দু’শো বছর আগে নযদের আরবেরা ছিলো হৃদয়ের দিক দিয়ে মুসলিম জাহানের আর যে- কোন জনগোষ্ঠী ইসলাম থেকে অনেক দূরে; অথচ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের পর থেকে ওরা যে নিজেদেরকে কেবল দীনের যোদ্ধাই মনে করছে তা নয়, ব রং দীনের প্রায় একমাত্র মালিক-মুখতার বলেও গণ্য করে আসছে।
মুসলিম সমাজের আন্তর্জাগতিক পুনরুজ্জীবনের প্রয়াস ওয়াহাবী মতবাদের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। কিন্তু এ তাৎপর্য ঠিক সেই মুহূর্তেই বিকৃত হয়ে পড়লো যখন এ মতবাদের বাহ্য লক্ষ্য- সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় ক্ষমতা অর্জন পূর্ণ হলো আঠারো শতকের শেষের দিকে, সউদী রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এবং উনিশ শতকের গোড়ার দিকে আরবের বৃহত্তর অংশে সেই রাজ্যের সম্প্রসারণে। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের অনুসারীরা ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই তাঁর চিন্তাধারা পরিণত হলো সযত্নে রক্ষিত মমিতে, কারণ আত্মা ক্ষমতার গোলাম হতে পারে না এবং ক্ষমতাও চায় না আত্মার গোলাম হতে।
নযদের ওয়াহাবের ইতিহাস হচ্ছে একটি ধর্মীয় ভাবধারার ইতিহাস, যে-ভাবধারা প্রথমে উদ্দীপনা ও প্রত্যাশার ডানায় ভর করে উঠেডিছলো আকাশে এবং পরে লুটিয়ে পড়েছে ‘কেবল আমিই ঠিক পথে আছি’ এই অহমিকা বোধের নিম্নভূমিতে; কারণ সমস্ত সদগুণিই আপনা-আপনি ধ্বংস হয়ে যায়, যখন তাতে থাকে না প্রত্যাশা আর বিনয়- নম্রতাঃ হারুত! মারুত!
স্বপ্ন
এক
একজন মহান আরব ‘আমীরে’র দোস্ত এবং মেহমান হওয়া মানেই হচ্ছে তাঁর সকল কর্মচারী, সকল ‘রাজাজিল’, রাজধানীর সকল দোকানদার, এমনকি তাঁর হুকুমতের অধীন সকল বেদুঈনের দ্বারা দোস্ত এবং মেহমান বলে বিবেচিত হওয়া। মেহমান এমন কোন ইচ্ছা ক্বচিৎ ব্যক্ত করতে পারেন যা সহসা পূরণ করা হচ্ছে না- যখনি তা পূরণ করা সম্ভব; ঘণ্টায় ঘণ্টায় তিনি আচ্ছন্ন অভিভূত হন আবেগ-উষ্ণ নির্বিকার সহৃদয়তায়, যা তাঁকে ঘিরে থাকে, যেমন কিল্লার প্রশস্ত হলঘর এবং করিডোরগুলিতে তেমনি শহরের বাজারগুলিতে- একটুও কম নয়।
আগে যেমন প্রায়ই ঘটেছে এবারো তাই ঘটলো আমার বেলায়, হাইলে আমার দু’দিনের অবস্থিতিকালে। যখন আমি কফি খেতে ইচ্ছা করি সংগে সংগে আমার ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা কক্ষে বেজে ওঠে কাসার হামানদিস্তার সুরেলা ধ্বনি। কিছুক্ষণ আগে বাজারে আমি যে-সুন্দর জীনটি দেখেছিলাম তার কথা জায়েদের নিকট উল্লেখ করি, আমীরে’র ওকরদের একজন তা শুনতে পায় এবং বিকালে সে জিনিসটি এনে রেখে দেওয়া হয় আমার পায়ের কাছে। দিনের মধ্যে কয়েকবারই আসে একেকটি সওগাত- একেকটি উপহার; আামের নকশা আঁকা কাশ্মীরী পশমের একটি লম্বা জোব্বা, একটি ফুলতোলা ‘কুফিয়া’ জীনের জন্য একটি সফেদ বাগদাদী ভেড়ার চামড়ার অথবা রূপার হাতলাওয়ালা একটি বাঁকা নযদী ছোরা… আর আমি, ভবঘুরে আমি তার বদলে ইবনে মুসা’কে কিছই দিতে পারছি না, আরব মুলুকের একটি বড় মাপের ইংরেজি মানচিত্র ছাড়া। তিনি ভারী খুশি হলেন যখন দেখলেন আমি সেই মানচিত্রটিকে কষ্ট করে চিহ্নিত করেছি বিভিন্ন আরবী নাম দিয়ে।
ইবনে মুসা’দের মহানুভবতার একটি প্রবল সাদৃশ্য রয়েছে বাদশাহ ইবনে সউদের ব্যবহারের সাথে। অবশ্য তাঁদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বিচার করলে কেই তাতে বিস্ময় বোধ করবে না। তাঁরা সম্পর্কে যে কেবল জ্ঞাতি ভাই তাই নয়, ইবনে সউদ যখন তরুণ ছিলেন এবং ইবনে মুসা’দের ছিলেন তখনো একটি বালক, সে সময় থেকেই তাঁরা, বাদশাহর রাজত্বের প্রথমদিকের প্রায সকল বিপদ-আপদে, বিপর্যয়ে ও স্বপ্নে ছিলেন একে অপরের সাথী। তাছাড়া, বহু বছর আগে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আরো মজবুত হয় ইবনে মুসা’দের বোন যওহারার সাথে ইবনে সউদের শাদির ফলে। বাদশাহ এরআগে বা পরে যতো শাদি করেছেন তাঁদের সকলের চেয়ে এ মহিলার ইজ্জৎ ছিলো তাঁর নিকট অনেক বেশি।
….. …… ….. …….
যদিও বহু মানুষ তাঁর বন্ধুত্ব পেয়েছেন তবু খুব বেশি লোক ইবনে সউদের প্রকৃতির সবচেয়ে নিবিড় এবং সম্ভবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি নিরীক্ষণ করার সুযোগ পাননি। সেই দিকটি কী? তাঁর ভালোবাসার বিপুল সামর্থ্য, যাকে বিকশিত হতে ও টিকে থাকতে দিলে, তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতায় পৌঁছুতে পারেতেন। তিনি যে-সব রমনীকে শাদি করেছেন ও তালাক দিয়েছেন তাঁদের বিপুল সংখ্যার উপর এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, বাইরের বহু লোক মনে করে তিনি একজন লম্পট, একজন কামুক বিশেষ, যিনি ডুবে আছেন দৈনিক উল্লাসের অনন্ত অন্বেষায়; এবং যদি এমন কেউ আসলে থেকেও থাকে, তাহলেও অতি অল্প লোকই এ বিষয়ে সজাগ যে রাজনৈতক কারণে যে-সব বৈাহিক রিশতা স্থাপিত হয়েছিলো সেগুলো বাদ দিলে, ইবনে সউদের আর প্রত্যেকটি বিয়েই হচ্ছে হারানো প্রেমের কিছুটা ফিরে পাওয়ার অস্পষ্ট-অতৃপ্ত বাসনার ফল।
তাঁর দুই পুত্র মুহাম্মদ আর খালিদের আম্মা ছিলেন ইবনে সউদের আলা মাহবুবা, মহিমান্বিতা প্রেয়সী। এখনো, তাঁর মৃত্যুর তেরো বছর পরেও বাদশাহ যখনই তাঁর কথা বলেন তাঁর কণ্ট ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
নিশ্চয়ই, তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ মহিলা-কেবল খুব সুরতই নন (কারণ বাদশাহ তাঁর অত্যুচ্ছল বৈবাহিক জীবনে বহু খুবসুরত রমণীকে জানবার এবং পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, বরঞ্চ তিনি ছিলেন সেই সহজাত নারীসুলভ বোধশক্তির অধিকারী যা আত্মার উল্লাস আর দেহের উল্লাসের মধ্যে রচনা করে সেতু। ইবনে সউদ রমনীদের সাথে তাঁর সম্পর্কের সংগে তাঁর আবেগ- অনুভূতিকে প্রায়ই গভীরভাবে জড়িত হতে দেন না। আর সম্ভবত এটাই হচ্ছে কারণ, যার জন্য এত সহজভাবে তিনি শাদি করেন এবং তালাকও দেন। কিন্তু যওহারার ব্যাপার স্বতন্ত্র কথা; মনে হয়, তাঁর মধ্যে তিনি তাঁর আকাংখার এমন একটা তৃপ্তি লাভ করেছিলেন যা আর কখনো পাননি। যদিও যওহারা যখন বেঁচেছিলেন তখনো তাঁর আরো স্ত্রী ছিলেন, তবু তাঁর জন্য তাঁকে উদ্দেশ্য করে ইশকের কবিতা লিখতেন; এবং একবার তিনি তাঁর এক অধিকতরো দীলখোলা মুহূর্তে আমাকে বলেীছলেন- ‘যখন পৃথিবী আঁধার হয়ে এসেছে আর যে-সব বিপদ-আপদ আমার পথ রুদ্ধ করেছে সেগুলো থেকে যখনি আমি বেরিয়ে আসার কোন পথ খুঁজে পেতাম না তখনি আমি বসে পড়তাম এবং একটি গান রচনা করতাম যওহারার উদ্দেশ্যে। গানটির রচনা যখন শেষ হতো সহসা পৃথিবী আবার আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠতো এবং আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতো আমার কর্তব্য কী’।
কিন্তু যাওহারা ১৯১৯ সনে ইনফ্লুয়েঞ্জা যখন মহামারী রূপে দেখা দেয়, তখন ইন্তেকাল করেন। একই অসুখে ইবনে সউদের প্রথম সন্তান এবং সবচেয়ে প্রিয় পুত্র তুর্কীও ইন্তেকাল করেন। দুটি ক্ষতি তাঁর জীবনে এমন একটি যখন রেখে গিয়েছে যা কখনো শুকায়নি।
কেবল যে তিনি স্ত্রী আর পুত্রের প্রতিই নিজের হৃদয়কে এমন পূর্ণরূপে ঢেলে দিতে পেরেছিলেন তা নয়; তিনি তাঁর পিতাকে যেমন ভালোবাসতেন খুব কম মানুষই তার পিতাকে তেমন ভালোবাসে। তাঁর পিতা আবদুর রহমান, যাঁর সংগে আমি পরিচিত হয়েছিলাম রিয়াদে আমার প্রথমদিকের বছরগুলিতে, যদিও তিনি মানুষ হিসাবে ছিলেন দয়ালু এবং নেক, তবু তাঁর পুত্রের মতো অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী তিনি নিশ্চয়ই ছিলেন না। এবং তাঁর দীর্ঘ জীবনে তেমন কোন লক্ষ্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকাও পালন করেননি। নিজের চেষ্টায় একটি রাজ্য লাভের পরেও এবং দেশের একচ্ছত্র শাসক হওয়া সত্ত্বেও ইবনে সউদ তাঁর পিতার প্রতি ব্যবহারে এতোই নম্র আর বিনীত ছিলেন যে, আবদুর রহমান কিল্লার কোন কামরায় থাকলে তার উপরের কামরায় পা রাখতেও তিনি রাজী ছিলেন না, ‘কারণ’ তিনি বলতেন, ‘আমি আমার আব্বার মাথার উপরে কী করে নিজেকে হাঁটতে দিতে পারি?’ তিনি কখনো তাঁর সামনে বসতেন না বসার জন্য প্রকাশ্যভাবে না ডাকলে। এই রাজকীয় নম্রতায় আমি একবার যেভাবে অপ্রতিভ হয়েছিলাম তার কথা আজো আমার মনে পড়ছে। (আমার মনে হয় তা ঘটেছিলো ডিসেম্বরে, ১৯২৭ সনে)। শাহী কিল্লায় বাদশাহর পিতার থাকার ঘরে আরো অনেকবারে মতো প্রথানুযায়ী একবার আমি তাঁর সথে মুলাকাত করতে গিয়েছিলাম; আর বৃদ্ধ আমাকে বুঝাচ্ছিলেন তাঁর প্রিয় একটি ধর্মীয় বিষয়। হঠাৎ একজন খিদমতগার এসে সেই কামরায় প্রবেশ করে বলে উঠলো, ‘শূয়ুখ আসছেন’। পর-মুহূর্তেই ইবনে সউদ এসে দরোজায় দাঁড়ালেন। স্বাভাবিকভাবেই আমি চাইলাম উঠে পড়তে; কিন্তু বৃদ্ধ আবদুর রহমান আমার কব্জিতে ধরে আমাকে টেনে বসিয়ে দিলেন, যেন তিনি বলতে চান, ‘তুমি হচ্ছো আমার মেহমান’।– বাদশাহ যখন দূর থেকে তার পিতাকে সালাম জানিয়ে দরোজায় দাঁড়িয়ে আছেন, বোঝাই যাচ্ছে, কামরায় ঢোকার জন্য তিনি তাঁর পিতার অনুমতির অপেক্ষায়, তখন আমাকে বসে থাকতে হচ্ছে নিশ্চল হয়ে। আমি যে এতে কতোটা বিব্রত-বোধ করেছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু বাদশাহ নিশ্চয়ই তাঁর পিতার এ ধরনের খেয়ালীপনার সাথে পরিচিত ছিলেন, কারণ তিনি স্মিত হাসির সাথে আমার প্রতি চোখের ইশারায় করলেন, আমার বিব্রত অবস্থা দূর করে আমাকে সহজ শান্ত করার জন্য। এদিকে বৃদ্ধ আবদুর রহমান তাঁর আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকেন, যেন মাঝখানে কোন ছেদই পড়েনি। কয়েক মিনিট পর তিনি মুখ তুলে তাঁর পুত্রের দিকে চেয়ে মাথার নাড়লেন, তারপর বললেন, ‘কাছে আসো বেটা, বসো’। বাদশাহর বয়স তখন সাতচল্লিশ কিংবা আটচল্লিশ বছর হবে!
কয়েক মাস পর- আমরা তখন মক্কায়- বাদশাহর কাছে খবর এলো, তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছেন রিয়াদে। আমি কখনো ভূলবো না তিনি যে অবোধ্য অপলক দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড পত্রবাহকের দিকে তাকিয়েছিলেন সেই দৃশ্য, যে নৈরাশ্য তাঁর স্বভাবত এতো স্নিগ্ধ এবং আত্মসমাহিত মুখ ধীরে ধীরে, দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবেই আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো, তার কথা; ভূলতে পারো না কেমন করে তিনি লাফ দিয়ে উঠেছিলেন প্রচণ্ড গর্জনের সাথে ‘আমার আব্বা নেই! আমার আব্বা নেই!!’ এবং লম্বা লম্বা ধাব ফেলে ছুটে বের হয়ে গিয়েছিলেন কামরা থেকে, আর তাঁর পেছনে গড়াচ্ছিলো মাটির ওপর; এবং কেমন করে তিনি সিঁড়ি বেয়ে উঠেছিলেন লাফ মেরে মেরে, তাঁর দেহরক্ষী ভীত-আতংকগ্রস্ত মুখের উপর দিয়ে, চিৎকার করতে করতে, ‘আমার আব্বা ইন্তেকাল করেছেন! আমার আব্বা নেই!” দুদিন তিনি কারো সংগে দেখা করলেন না, কিছু খেলেন না বা পান করলেন না এবং রাতদিন কাটালেন প্রার্থনায়।
মধ্যবয়সী ক’জন পুত্র, রাজা যাঁরা নিজের শক্তি দিয়ে রাজ্য লাভ করেছেন এভাবে মাতম করতে পারতেন এক পিতার মৃত্যুতে যিনি বৃদ্ধ বয়সে ই ন্তেকাল করেছেন, শান্তির সাথে!
দুই
কারণ আবদুল আজীজ ইবনে সউদ সম্পূর্ণভাবে নিজেরই চেষ্টায় তাঁর এতো বড় রাজ্য কায়েম করেছিলেন। যখন তিনি শিশু সে সময়েই মধ্য আরবে তাঁর বংশ তার শেষ ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলে এবং এককালে এই শাহী খান্দানের তাবেদার হাইলের ইবনে রশিদ পরিবার তার স্থলাভিষিক্ত হয়। সে দিগুলো ছিো আবদুল আজীজের জন্য বড় নিষ্ঠুর, বড় যন্ত্রণাকর। গর্বিত এবং সংযতবাক বালকটি দেখতে পাচ্ছিলো- আসলে একজন বিদেশীই ‘আমির’ ইবনে রশিদের নামে তার পৈতৃক নগরী রিয়াদ শাসন করছে। কারণ এখন, এককালের প্রায় গোটা আরবের শাসক ইসনে সউদের পরিবার ইবনে রশিদের ভাতাভোগী মাত্র, যাদেরকে সহ্য করা হয়, কিন্তু আর ভয় করেন না ইবনে রশিদ। শেষ নাগাদ তাঁর শান্তিপ্রিয় পিতা আবদুর রহমানের জন্য তা অশোভনীয় হয়ে ওঠে। তিনি তাঁর গোটা পরিবারসহ রিয়াদ ত্যাগ করেন এই আশায় যে, তিনি তাঁর পুরানো বন্ধু কোয়েতের সুলতানের বাড়িতে বাকি দিনগুলি কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু তাঁর জন্য কী ভবিষ্যৎ রয়েছে তার তিনি জানতেন না- কারণ তিনি অবগত ছিলেন না তাঁর পুত্রের হৃদয়ে কী রয়েছে, তাঁর পুত্র কী ভাবছে!
পরিবারের সকল লোকের ম্যধ্যে একজনই কেবল এই বিক্ষুদ্ধ হৃদয়ে যা ঘটছে তার সম্পর্কে বেশি কিছু জানি না; কেবল এটুকুই জানি যে, বাদশাহ যখন তাঁর যৌবনের দিনগুলি নিয়ে কথা বলেন, তিনি সমসময়ই তাঁর কথা উল্লেখ করেন প্রগাঢ় তাজিসের সাথে।
-‘আমি মনে করি, তিনি আমাকে পেয়ার করতেন তাঁর নিজের সন্তানদের চাইতেও বেশি। যখন আর কোন লোকজন থাকতো না তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে তাঁর কোলের উপর বসাতেন এবং তারপর আমি যখন বড়ো হবো তখন আমাকে বড়ো বড়ো কী কাজ করতে হবে আমাকে সেসব কথা বলতেন- ‘তোমাকে অবশ্যই পুনরুদ্ধার করতে হবে ইবনে সউদ খান্দানের গৌরব-গরিমা’। একথা তিনি বার বার আমাকে বলতেন এবং তাঁর কথাগুলি ছিলো গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করার মতোই স্নিগ্ধ, মোলায়েম।
-‘কিন্তু হে আজায়িজ, [শব্দটি আদুল আজীজের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ। আদর করে তাঁকে এ নামে ডাকা হতো।] আমি চাই যে তুমি একথা জানো’, তিনি বলতেন, ‘ইবেন সউদ খান্দানের গৌরব- গরিমাও কিছুতেই তোমার চেষ্টা ও উদ্যোগের শেষ কথা হওয়া উচিত নয়। তোমাকে সংগ্রাম করতে হবে ইসলামের গৌরবের জন্য। তোমার কওম তীব্রভাবে অনুভব পথের দিকে এবং তুমিই হবে সেই নেতা। এই কথাগুলি সব-সময় জীবন্ত রয়েছে আমার হৃদয়ে’।
সত্যই কি তা-ই রয়েছে?
ইবেন সউদ সারা জীবন ইসলাম সম্পর্কে এভাবে কথা বলতে পছন্দ করেছেন যে, ইসলাম হচ্ছে তাঁর উপর অর্পিত একটি পব্রিত কর্তব্য। এমনকি, পরবর্তী দিনগুলিতেও, অনেক আগেই যখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তাঁর কিছুকাল আগেকার একটি আদর্শের নেতৃত্বের চাইতেও রাজক্ষমতা তাঁর জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখনো তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতা প্রায় বহু মানুষের, এমন কি খোদ বাদশারও, এ প্রত্যয় জন্মিয়েছে যে, সে আদর্শটি এখনো তাঁর লক্ষ্য রূপে রয়েছে।
এ ধরনের শৈশব স্মৃতির রোমন্হন প্রায়ই চলতো রিয়াদে, অন্তরংগদের বৈঠকগুলিতে, যা সাধারণত বসতো ‘এশা’র সালাতের পর। কিল্লার মসজিক সালাত শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আমরা ক্ষুদ্রতরো কামরাগুলির একটিতে একটিতে বসতাম বাদশাহকে ঘিরে এবং এক ঘন্টা ধরে শুনতাম রাসূলের হাদীস থেকে কিংবা কুরআনের কোন তফসীর থেকে পাঠ। এরপর বাদশাহ আমাদের দু’জন কিংবা তিনজনকে বলতেন তাঁর সাথে খাস মোকামের একটির ভেতরে যাওয়ার জন্য। এক সন্ধ্যায়, আমার মনে পড়েছে, আমি যখন বাদশাহর সাথে সভাকক্ষ ত্যাগ করছি, আমি নতুন করে বিস্মিত হই তাঁর গরিমাময় উচ্চতায়। এই উচ্চতার ফলে তাঁর চারপাশের সকলের উপরে ছিলো তাঁর শির। নিশ্চয়ই তিনি আমার সশ্রদ্ধ দৃষ্টি লক্ষ্য করছিলেন, কারণ তিনি তাঁর সেই অনির্বচনীয় মাধুর্যের সাথে সংক্ষিপ্ত হাসি হেসে আমার হাত ধরে বলতেনঃ
-‘হে মুহাম্মদ! তুমি আমার দিকে এমন করে তাকাচ্ছো কেন?’
-‘আমি ভাবছিলাম, হে দীর্ঘজীবী পুরুষ, আপনি যে বাদশাহ, কোন মানুষই তা প্রত্যক্ষ না করে পারে না, যখন সে দেখতে পায় আপনার মাথা জনতার মাথার এতো উপরে’।
ইবনে সউদ হাসলেন; তখনো আমার হাতে তাঁর হাত; তিনি আমাকে নিয়ে করিড়োরের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীর চলতে বললেন- ‘হ্যাঁ, লম্বা হওয়াতে সুখ আছে; কিন্তু একবার আমার উচ্চতা আমাকে কেবল মর্মবেদনাই দিয়েছিলো। সে বহু আগের কথা। আমি তখন এক বালক এবং কোয়েতে বাস করছিলাম শায়খ মুবারকের কিল্লায়। আমি ছিলাম খুবই হ্যাংলা এবং আমার বয়সের তুলনায় বেশি লম্বা; কিল্লার জন্য ছেলেরা- শায়খে’র পরিবারের এবং আমার নিজের পরিবারেরও- আমাকে তাদের হাসি-ঠাট্টআর একটি লক্ষ্য করে বসে, যেন আমি প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়াল। আমি আমার উচ্চতা নিয়ে এতোই শরমিন্দা ছিলাম যে, আমি যখন শাহী বালাখানার কামরার ভেতর দিয়ে অথবা কোয়েতের রাস্তা দিয়ে চলতাম তখন আমাকে ছোট দেখানোর উদ্দেশ্যে আমি মাথা নিচু করে কাঁধ ঝুঁকিয়ে চলতাম’।
ততোক্ষণে আমরা বাদশাহর কামরায় পৌঁছে গেছি। জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহযাদা সউদ সেখানে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর পিতার জন্য; শাহজাদা আমারই বয়সী এবং তাঁর পিতার মতো লম্বা না হলেও চেহারায় তিনি বেশ জাঁকালো। তাঁর মুখারয়ব তাঁর পিতার চেয়ে অনেক বেশি অমসৃণ, রুক্ষ এবং বাদশাহর মুখের নমনীয়তা ও প্রাণময়তার কিছুই তাতে নেই; তবু, তিনি দয়ালু এবং লোকের ধারনায় মানুষ হিসাবে উত্তম।
বাদশাহ বসলেন দেয়াল বরাবর পাতা কুশনে এবং আমাদের সবাইকে ইশারা করলেন আসন গ্রহণ করতে। তারপর তিনি হুকুম জারি করলেন, ‘কাহওয়া!’ দরজায় দাঁড়ানো সশস্ত্র নওকারটি করিডোরের দিকে মুখ করে চিৎকার করে ওঠে: ‘কাহওয়া’ এরপর গোটা করিডোরের মধ্য দিয়ে পর পর নওকরদের দ্রুত একজনের মুখ থেকে আর একজনের মুখে উচ্চারিত হতে থাকে, ‘কাহওয়া’- ‘কাহওয়া’! এভাবে বাদশাহর আদেশ এক উৎফুল্ল পুনরাবৃত্তির অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েক কোঠা দূরে বাদশাহর কফি তৈরির ঘরে গিয়ে পৌছায়। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই কোমরের পেটি থেকে এক সোনালি বাটওয়ালা ছুর ঝুলিয়ে একটি নওকর এসে হাজির হয়, এক হাতে পিতলের কফি পাত্র, অন্য হাতে ছোট ছোট কফির পেয়ালা নিয়ে। প্রথম পেয়ালাটি গ্রহণ করলেন বাদশাহ নিজে এবং বাকি পেয়ালাগুলি পরিবেশন করা হলো মেহমানদেরকে, তাঁদের আসনের ক্রম অনুসারে। এ ধরনের ঘরোয়া পরিবেশে ইবনে সউদ তাঁর মনে যা-ই আসে সে বিষয়ে কথা ব লেন স্বাধীনভাবে- পৃথিবীর সুদূর অঞ্চলগুলিতে যা ঘটছে, কোন আশ্চর্য নতুন আবিষ্ত্রিয়ার কথা, যার সম্পর্কে আকর্ষণ করা হয়েছে তাঁর দৃষ্টি। বিভিন্ন জাতি এবং রীতিনীতি ও প্রথা- প্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে তাঁর মনে যে কথা উদয় হয় তাই তিনি ব্যক্ত করেন অবাধে। তবে সবার উপরে নিজের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে কথা বলতে তিনি আনন্দ পান বেশি এবং অন্যরাও যাতে আলোচনায় যোগ দেয় সে জন্য তাদেরও তিনি উৎসাহ দিয়ে থাকেন। সেই বিশেষ সন্ধ্যায় আমীর সউদ এক নতুন আবিষ্ক্রিয়ার সূচনা করেন, যখন তিনি সহাস্যে আমার দিকে ফিরে বললেনঃ
-‘মুহাম্মদ! আজ কোন এক ব্যক্তি তোমার ব্যাপারে তার একটি সনেদ্হ প্রকাশ করেছে। ও বলেছে, তুমি মুসলিম ছদ্মবেশে একজন ইংরেজ গুপ্তচর কি না, এ সম্পর্কে ও মোটেই নিশ্চিত হতে পারছে না.. যা-ই হোক, এ নিয়ে তুমি ভেবো না। আমি তাকে বোঝাতে পেরেছি তুমি সত্যি একজন মুসলমান’।
আমি শুকনা হাসি গোপন করতে না পেরে বললাম, ‘হে আমীর; এ আপনার মেহেরবানী! আল্লাহ আপনার হায়াত দারাজ করুন। কিন্তু এ ব্যাপারে আপনি এতো নিশ্চিত হতে পারলেন কী করে? এটো কি সত্য নয় যে, আল্লহই জানেন, মানুষের অন্তরে কী রয়েছে?’
-‘তা সত্য,’ জবাবে আমীর বললেন, ‘তবে এ বিষয়ে আমাকে বিশেষ অন্তদৃষ্টি দেওয়া হয়েছে। আমাকে এ অন্তদৃষ্টি দিয়েছে গত রাতের একটি স্বপ্ন.. আমি দেখলাম মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি এবং মিনারের দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ মিনারের সিঁড়িতে দেখা গেলো একটি লোককে সে তার হাত দু’টি একত্র করে বাড়ির মতো করে মুখে রেখে আযান দিতে শুরু করেছে। ‘আল্লাহু আকবার’- আল্লাহ সুমহান, আল্লাহই মহান’ এবং শেষ পর্যন্ত আযাদ দিয়ে চলেঃ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই- এবং যখন আমি নিবিড়ভাবে তাকালাম, দেখতে পেলাম, সে লোক হচ্ছো তুমি! যখন আমার ঘুম ভেঙে গেল আমি নিশ্চিতভাবে জানতে পারলাম- যদিও আমি কখনো আগে সন্দেহ করিনি- তুমি একজন খাঁটি মুসলমান; যে স্বপ্নে আল্লাহর নাম ঘোষণা করা হয়েছে তা মিথ্যা হতে পারে না’।
আমার সত্যতা ও আন্তরিকতা সম্বন্ধে শাহজাদার অযাচিত বলিষ্ঠ ঘোষণায় এবং যে- আন্তরিকতার সাথে বাদশাহ মাথা নেড়ে আমীর সউদের বিস্ময়কর বর্ণনা সমর্থন করলেন’ তাতে আমি খুবই অভিভূত হয়ে পড়ি। ইবনে সউদ কথার সূত্র ধরে বললেনঃ
‘এরূপ প্রায়ই ঘটে যে, আল্লাহ স্পপ্নের মাধ্যমে আমাদের হৃদয় আলোকিত করেন- এই স্পপ্ন ভবিষ্যতের কথা আগাম বলে দেয় এবং কখনো কখনো বর্তমানকে স্পষ্ট করে তোলে। হে মুহাম্মদ! তোমার নিজের কি কখনো এ ধরনের স্বপ্নে অভিজ্ঞতা হয়েছে হয়নি?’
-‘হে ইমাম, নিশ্চয়ই আমার সে অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেক আগে, আমি মুসলমান হওয়ার চিন্তাও যখন করিনি, তারো অনেক আগে- এমনকি কোন মুসলিম দেশে পদার্পণ করারও আগে। তখন আমার বয়স উনিশ বছরে কাছাকাছি এবং আমি তখন ছিলাম ভিয়েনায়, আমার আব্বার বাড়িতে। আমি তখন মানুষের অন্তর্জীবন সম্পর্কিত বিজ্ঞানের প্রতি (বাদশাহকে আমি এভাবেই ‘মনোবিকলনে’র একটি নিকটতম সংজ্ঞা দিয়েছিলাম) আকৃষ্ট এবং আমার অভ্যাস ছিলো, আমার বিছানার মাশে কাগজ এবং পেন্সিল রাখা, যাতে করে ঘুম ভাঙার সংগে সংগেই আমার স্বপ্নগুলিকে টুকে রাখতে পারি। এই অভ্যাসের ফলে, আমি দেখতে পেলাম যে, স্বপ্নগুলিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্মরণ রাখতে পারি, যদিও আমি স্বপ্নগুলিকে নিয়ে হামেশা চিন্তা করতাম না্ সেই বিশেষ স্বপ্নটিতে আমি দেখতে পেলাম- আমি বার্লিনে আছি এবং ওখানে মাটির নিচে যে রেলপথ আছে আমি সেই পথে সফর করছি- গাড়িটি কখনো চলছে মাটির নিচে সুড়ংড়ের ভেতর দিয়ে এবং কখনো চলছে রাস্তার উপরে পুলের উপর দিয়ে। কামরাটি ভর্তি ছিলো একগাদা মানুষে- এতো বেশি মানুষ যে বসার কোন জায়গাই ছিলো না। কামরায় একটি মাত্র বাড়ি থেকে মিটমিটি করে আলো জ্বলছিলো। কিছুক্ষণ পর গাড়িটি বের হয়ে এলো সুড়ংগ থেকে, কিন্তু গাড়িটি ঐ সব উঁটু পুলের কোন একটিতে উঠলো না, বরং তা এসে উঠলো এক প্রশস্ত নির্জন কাদামাটির প্রান্তরে এবং গাড়ির চাকাগুলি কাদায় আটকে গেলো আর গাড়িটি গেলো থেমে; সামনে কিংবা পেছনে কোনোদিকেই চলবার ক্ষমতা রইলো না গাড়িটির।
-‘সকল যাত্রীই এবং তাদের সংগে আমিও গাড়ি থেকে নেমে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকি। আমাদের চারদকিদের প্রান্তরটি দিগন্তহীন, শূণ্য এবং উষর। তাতে কোন ঝোপঝাড়; ঘরবাড়ি, এমনকি একটি পাথরও নেই। এক ভীষণ পেরেশানিতে, আমাদের হৃদয় ছেয়ে গেলো তখন, আমরা যখন এখানে আটকা পড়ে গেছি, অন্য মানুষেরা যেখানে বাস করে আমরা সেখানে ফিরে যাবার পথ কী করে খুঁজে পাবো! সুবহে সাদেকের সময় যে ধূসর আলোর আভাস দেখা যায় তেমনি একটা আলো ছড়িয়ে আছে বিশাল প্রান্তরের উপর।
-‘তবে যেমন করেই হোক, অন্যদের এই পেরেশানিতে আমি পুরা শরীক হতে পারিনি। আমি সে দলের মধ্য থেকে বের হয়ে পড়ি এবং দেখতে পারি, হাত দশেক দূরে একটি উট হাঁটু ভেঙে শুয়ে আছে জমিনের উপর। উটটির পিঠে পুরোপুরি চাপানো ছিলো একটি জীন- ‘হে ইমাম, পরবর্তীকালে আপনার দেশে উটের উপর যেভাবে জীন চাপাতে দেখেছি ঠিক সেইভাবে’- এবং সে জীনের উপর ছিলেন একজন মানুষ, খাটো হাতাওয়ালা সাদা-বাদামী, ডোরা-কাটা ‘আবায়া’ পরিহিত। তার ‘কুফিয়া’টি টেনে নেওয়া ছিলো মুখের উপর, যার জন্য আমি তাঁর মুখের আকৃতি বুঝতে পারছিলাম না। আমার অন্তরে হঠাৎ এই উপলব্ধি হলো যে, উটটি আমার জন্যই অপেক্ষা করছে এবং নিশ্চল আরোহীটি হবে আমার হাদী বা রাহমুনা। কাজেই, আমি একটি কথাও না বলে এক লাফে উঠে পড়লাম জীনের পেছনে, উটটির পিঠে, যেভাবে আরব দেশগুলিতে একজন রাদিফ’ বা পশ্চাদারোহী উটের উপর চড়ে থাকে। পর মুহূর্তে উটটি দাঁড়িয়ে গেলো এবং সামনের দিকে চলতে শুরু করলো একটি দীর্ঘায়িত সহজ ভংগীতে এবং আমি অনুভব করলাম আমার ভেতের এক নাম-না-জানা সুখের স্ফূরণ ঘটছে। সেই ত্বরিৎ মসৃণ চলার ভংগীতে আমরা সফর করি, প্রথমে মনে হলো, কয়েক ঘন্টা এবং তারপর কয়েক দিন এবং তারপর কয়েক মাস এবং শেষপর্যন্ত সময়েল সব হিসাব আমি ভূলি যাই; এবং উটটির প্রত্যেকটি পদক্ষেপের সাথে সাথে ছাপিয়ে উঠতে থাকে আমার সুখ, আর শেষপর্যন্ত আমার মনে হলো, আমি সাঁতার কাটছি, শূন্যে, হাওয়ার মধ্য দিয়ে। অবশেষে আমাদের ডানদিকে দিগন্ত রক্তিম হয়ে ওঠে উদয়োন্মুখ সূর্যের কিরণে। কিন্তু আমাদের সামনে, বহুদূর যে দিগন্ত রয়েছে, আমি সেখানে দেখতে পেলাম আরেকটি আলো; সে আলোটি আসছে দুটি ঝলসানো সাদা আলো, আমাদের ডানদিকে যে সূর্য উঠছে তার আলোর মত লাল নয়, একটি ঠাণ্ডা আলো, যা আমরা যতোই আগাচ্ছি ততোই উজ্জ্বলতরো হয়ে উঠছে আর আমার হৃদয়ের আনন্দকে আমার সমগ্র চেতনায় এমনভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে যা অনির্বচনীয়। এবং আমরা এভাবে আগাতে আগাতে প্রবেশদ্বার আর তার আলোকের নিকটে এসে পড়ি। তখন আমি শুনতে পেলাম এক কণ্টস্র, কে যেনো কোথা থেকে ঘোষণা, করছে, ‘এইটি সর্ব পশ্চিম নগরী’। এবং জেগে উঠলাম ঘুম থেকে”।
-‘সুবহানাল্লাহ’- আল্লাহ মহান ও পবিত্র! বিস্মিত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন ইবনে সউদ, যখন আমি আমার কথা শেষ করি। ‘আর এই স্বপ্নই কি তোমাকে বলে দেয়নি, ইসলামের জন্যই তুমি ছিলে মনোনীত?’
আমি আমার কথা নেড়ে বলি, ‘না, দীর্ঘজীবী পুরুষ; কী করে তা আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিলো? আমি কখনো ইসলামের কথা ভাবিনি এবং এমনকি, কখনো কোন মুসলমানের সংগে আমার পরিচয়ও হয়নি।… সাত বছর পর, স্বপ্ন ভুলে যাওয়ার অনেককাল পরে, আমি ইসলাম গ্রহণ করি। মাত্র ক’দিন আগে এটি আমি পেয়েছি আমার কাগজপত্রের মধ্যে- সে রাত্রে ঘুম থেকে উঠে যেভাবে টুকে রেখেছিলাম হুবহু সেইভাবে’।
-‘কিন্তু বেটা, সেই স্বপ্নে আল্লাহ, তোমাকে যা দেখিয়েছিলেন আসলে তা ছিলো তোমার ভাগ্যে। তুমি কি তা’ পরিষ্কার বুঝতে পারছো না? সেই জনতার ভীড় এবং তা দের সংগে তুমি এক পথ-চিহ্নহীন প্রান্তরে এসে হাজির হয়েছো, আর তাদের বিভ্রান্তি, একি তাদেরই অবস্থা নয় যাদের কুরআনের সুরা ফাতেহা বর্ণনা করেছে ‘পথভ্রষ্ট’ বলে? আর যে উটটি তার সওয়ারসহ অপেক্সা করছিলো তোমার জন্য, তা কি কুরআন বারবার যাকে হেদায়েত বলেছে, তা-ই নয়? আর যে আরোহীটি তোমার সংগে কথা বলেননি এবং যাঁর মুখ তুমি দেখতে পাচ্ছিলে না, তিনি রাসূলুল্লাহ (স) ছাড়া আর কে হতে পারেন? তিনি খাটো হাতাওয়ালা জোব্বা পরতে ভালোভাসতেন… এবং আমাদের বহু বই-পুস্তক থেকে কি আমরা জানি না যে, যখনি তিনি স্বপ্নে কোন অমুসলিমকে অথবা যারা এখনো মুসলমান হয়নি তাদেরকে দেখা দেন, তাঁর মুখ সব সময়েই ঢাকা থাকে? তারপর দিগন্তের উপরে সেই ঠাণ্ডা স্নিগ্ধ আলোঃ তা ঈমানের যে-আলো না জ্বলেও আলোকিত করে তার প্রতিশুতি ছাড়া আর কী হতে পারে? তুমি তোমার স্বপ্নে সেখানে পৌঁছুতে পারোনি, কারণ যেমন আমাদেরকে বললে, বহু বছর পরেই তুমি ইসলামকে জানতে পেরেছিলে খোদ সত্যরূপে…’।
-‘হে শায়খ, আপনার ধারণা ঠিক হতে পারে… কিন্তু সেই ‘সর্ব পশ্চিমের নগরীটি কী যেখানে দিগন্তের দাখিল-দরোজা আমাকে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলো? কারণ আর যা-ই হোক, আমার ইসলাম গ্রহণ আমাকে পাশ্চাত্যের দিকে নিয়ে যায়নি। বরং তার আমাকে পাশ্চাত্য থেকে দূরেই নিয়ে গেছে’।
ইবনে সউদ মুর্হর্তের জন্য চুপ করে গিয়ে চিন্তামগ্ন হন! তারপর তিনি তাঁর মাথা সোজা করেন এবং আমার কাছে খুবই প্রিয় তাঁর সেই মিষ্টি হাসির সাথে তিন বলেন, “হে মুহাম্মদ, এর অর্থ কি এ হতে পারে না যে, তোমার ইসলাম গ্রহণই হবে তোমার জীবনের ‘পশ্চিমতম’ বিন্দু এবং এরপর পাশ্চাত্য জীবন আর তোমার থাকবে না?”
কিছুক্ষণ পর বাদশাহ আবার কথা বললেন, “ভবিষ্যৎ কেউ জানে না আল্লাহ ছাড়া, কিন্তু কখনো কখনো তিনি ভবিষ্যতে আমাদের জীবনে কী ঘটবে, স্বপ্নের মাধ্যমে তার আভাস দিয়ে থাকেন। আমি নিজে দু’তিনবার এ রকম স্বপ্ন দেখেছি এব প্রত্যেক বারই তা সত্য হয়েছে। বলতে কি, আমি আজ যা হয়েছি তা-ও একটি স্বপ্নের ফলেই হয়েছে…. তখন আমার বয়স সতের বছর। আমরা কোয়েতে নির্বাসিতের জিন্দেগী কাটাচ্ছি, কিন্তু আমার স্বদেশের উপর ইবনে-রাশিদের পরিবার বাদশাহী করবে তেমন চিন্তাও ছিলো আমার পক্ষে অসহনীয়। প্রায়ই আমি আব্বার নিকট কাতর মিনতি জানাতাম- তাঁর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক- ‘যুদ্ধ করো আব্বা এবং ইবনে-রশিদের খান্দানকে তাড়িয়ে দাও, রিয়াদের তখতের উপর তোমার চাইতে কারো বেশি দাবি নেই, আব্বা’। কিন্তু আমার আব্বা আমার উত্তেজনাপূর্ণ দাবিগুলি উড়িয়ে দিতেন অলীক কল্পনা বলে এবং আমাকে মনে করিয়ে দিতেন, আরবদের দেশগুলিতে মুহাম্মদ ইবনে রাশিদই হচ্ছেন সবচেয়ে পরাক্রমশালী শাসক; তিনি যে মুলূকের উপর বাদশাহী করেন তা উত্তরে সিরীয়া মরুভূমি থেকে দক্ষিণে শূণ্য প্রান্তরে বালূরাশি পর্যন্ত বিস্তৃত- তাঁর ইস্পাত কঠিন মুষ্টির সামনে সকল বেদুঈন কবিলাই ডরে-ভয়ে থরথর করে কাঁপে। যা-হোক, এক রাত্রে আমি এক আজব স্বপ্ন দেখি। আমি দেখতে পেলাম, রাতের বেলা, এক নির্জন স্তেপ অঞ্চলে আমি ঘোড়ার পিঠে বসে আছি, আর সামনেই ঘোড়ার উপর রয়েছেন বৃদ্ধ মুহাম্মদ ইবনে রশিদ, আমার খান্দানের রাজ্য অপহরণকারী। আমরা- দু’জনেই নিরস্ত্র, কিন্তু ইবনে রশিদ একটা মস্ত বড়ো উজ্জ্বল লণ্ঠন তুলে ধরে আছেন। যখন তিনি আমাকে তাঁর দিকে আগাতে দেখে বুঝতে পারলেন যে, আমি তাঁর দুশমন, তিনি হঠাৎ ঘুরে ঘোড়ার পেটে পায়ের আঘাত করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। কিন্তু আমিও তাঁর পেছনে ঘোড়া ছুটিয়ে দিই, ঘোড়া ছুটাতে ছুটাতে তাঁর জোব্বার একটি প্রান্ত আমি ধরে ফেলি, তারপর ধরে ফেলি তাঁর বাহু এবং পরে তাঁর লণ্ঠনটি নিভিয়ে দিই। যখন আমি ঘুম থেকে উঠে বসলাম, আমার এই নিশ্চিত উপলব্ধি হলো যে, ইবনে রশিদ খান্দানের হাত থেকে শাসন ক্ষমতা অবশ্যি ছিনিয়ে আনবো আমি একদিন’।
১৮৯৭ সালে, স্বপ্নের সেই বছরটিতে, মুহাম্মদ ইবনে রশিদ ইন্তেকাল করেন। আবদুল আজীজ ইবনে সউদের মনে হলো, আঘাত হানার এই তো প্রকৃষ্ট মুহূর্ত! কিন্তু তাঁর পিতা আবদুর রহমান এ ধরনের একটি অনিশ্চিত কাজের ঝুঁকি নিয়ে কুয়েতের শান্তিপূর্ণ নির্বিঘ্নে জীবনকে বিপন্ন করতে রাজী ছিলেন না। তবে পিতার নিষ্ত্রিয়তা থেকে পুত্রের উৎসাহ ছিলো প্রবলতরো। তাই, শেষতক পিতা রাজী হয়ে যান। তার বন্ধ কুয়েতের শায়খ মুবারকের সাহায্যে তাঁর খান্দানের প্রতি যে অল্প ক’টি বেদুঈন কবিলা তখনো অনুগত ছিলো তাদের নিয়ে তিনি এক ফৌজ গড়ে তোলেন এবং পুরানো আরবীয় কায়দায়, উট আর ঘোড়া হাঁকিয়ে নিজ নিজ কবিলার ঝাণ্ডা উড়িয়ে ইবনে রশিদের পরিবারের বিরুদ্ধে ময়দানে যুদ্ধের জন্য হাজির হন, আর উন্নততরো শক্র ফৌজের দ্বরা পর্যদন্ত হন অতি অল্প সময়েই এবং সম্ভবত তাঁর হৃদয়ের গভীরে, হতাশ হওয়ার চাইতেও অনেক বেশি ভারমুক্ত হয়ে তিনি ফিরে আসেন কোয়েতে, প্রতিজ্ঞা করেন আর কখনো তিনি তাঁর জীবনের সান্ধ্যকালটিকে লড়াইয়ের মতো কোন দুঃসাহসিক অভিযানের দ্বারা বিঘ্নিত করবেন না।
কিন্তু পুত্র অতো সহজেই হার মানতে রাজী ছিলেন না। তিনি সবসময়েই স্মরণ করতেন মুহাম্মদ ইবনে রশিদের উপর তাঁর বিজয়ের আবাল্য স্বপ্নের কথা; এবং পিতা যখন নযদের উপর তাঁর রাজত্বের সকল দাবী-দাওয়া ছেড়ে দেন তখন তরুণ আবদুল আজীজের এই স্বপ্নই তাঁকে ক্ষমতা লাভের দুর্বঅর প্রয়াসে উদ্দীপিত করে। তিনি তাঁর অল্প ক’টি বন্ধুকে পান তাঁর সংগী হিসাবে, তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর চাচাত ভাই আবদুল্লাহ ইবনে জিলবী এবং ইবনে মুসা’দ। ঢোল পিটিয়ে আরো ক’টি বেদুঈনকে তিনি যোগাড় করেন। এভাবে ওদের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় চল্লিশে। ওরা সওয়ারী হাঁকিয়ে কুয়েত থেকে বেরিয়ে পড়ে দস্যুর মতো, চুপি, চুপি, ঝাণ্ডা না উড়িয়ে, দফ না বাজিয়ে, গান না গেয়েঃ যে-সব রাস্তায় কাফেলা বেশি চলাচল করে সে-সব রাস্তা পরিহার করে এবং দিনের বেলা লুকিয়ে থেকে ওরা গিয়ে পৌঁছোয় রিয়অদের সন্নিকটে এবং নির্জন উপত্যকায় তাঁবু গাড়ে। সেদিনই আবদুল আজিজ চল্লিশ জন সংগীর মধ্য থেকে বেছে নেন পাঁচজনকে এবং বাকি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ
-‘আমরা ছ’জন এখন আমাদের ভাগ্যকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়েছি আল্লাহর হাতে। আমরাই যা্চিছ রিয়াদে; হয় রিয়াদ জয় করবো না হয় চিরদিনের জন্য তা হারাবো। তোমরা যদি শহর থেকে জংগলে শোরগোল শুনতে পাও, আমাদের মদদ করতে এসো; কিন্তু কাল সন্ধ্যার মধ্যে যদি তোমরা কোন কিছু শুনতে না পাও, তাহলে তোমরা মনে করো আমরা মৃত এবং আল্লাহ যেন আমাদের দোয়া কবুল করেন। যদি তাই ঘটে, তোমরা সকলে পুশিদা যতো দ্রুত পারো ফিরে যেয়ো কুয়েতে’।
এবং ছ’টি মানুষ বের হয়ে পড়ে পায়দল। রাতের প্রথমদিকেক ওরা শহর পৌঁছায় এবং কয়েক বছর আগে, শহরের বাসিন্দাদের অবমাননার উদ্দেশ্যে ইবনে রশিদ বিজিত নগরের দেয়ালের যে ক’টি জায়গা ভেংগে দিয়েছিলেন তারি একটির ভেতর দিয়ে ওরা দাখিল হয় শহরে। ওরা ওদের অস্ত্রশস্ত্র জোব্বার নিচে লুকিয়ে সোজা ঢুকে পড়ে রশিদী ‘আমীরে’র গভর্নরের কামরায়। ঘরটি ছিলো তালাবদ্ধ, কারণ শক্রভাবাপন্ন জনতার ভয়ে, বিপরীতদিকে যে দুর্গ রয়েছে সাধারণত তাতেই তিনি রাতগুলি কাটাতেন। আবদুল আজীজ এবং তাঁর সংগীরা দরোজার কড়া নাড়েন। একটি গোলাম দরোজা খুলে দেয়, কিন্তু সাথে সাথেই তাকে তাবুতে এনে হাত-পা বেঁধে ওর চোখমুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়; একই দশা ঘটলো সে ঘরে আর যে ক’জন লোক ছিলো তাদের প্রত্যেকেরইঃ সে সময় কেবল কয়েকজন নওকর এবং স্ত্রীলোকই ছিলো ঘরটিতে। অভিযানকারী ছ’জন, ‘আমীরে’র খাবারের ভাণ্ডার থেকে কিছু খেজুর নিয়ে তা খায় এবং পর্যায়ক্রমে কুরআন তিলাওয়াত করে রাতটা কাটিয়ে দেয়।
সকালবেলা কিল্লার দরোজা খোলা হলো এবং ‘আমীর বের হয়ে এলেন সশস্ত্র দেহরক্ষী ও নওকরদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে। ‘হে আল্লাহ, ইবনে সউদ তোমারি নিকট সমর্পিত, চিৎকার করে উঠেন আবদুল আজীজ এবং তাঁর পাঁচ সংগীকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন বিস্মিত হতচকিত দুশমনের উপর। আবদুল্লাহ ইবনে জিলুভী তাঁর বর্শা ছুঁড়ে মারেন ‘আমীরে’র উপর; কিন্তু তিনি তার আগেই মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মাথা নুইয়ে দেন। ফলে বর্শাটির দণ্ড কেঁপে কেঁপে বর্শাটি গিয়ে বিঁধে যায় কিল্লার মাটির দেয়ালে, যেখানে সেটি দেখতে পাওয়া যাবে আজও। আমীর ভী সন্ত্রস্ত হয়ে পিছু হটে গিয়ে ঢুকলেন প্রবেশদ্বারে; আবদুল্লাহ যখন একাকী আমীরের পিছনে ধাওয়অ করছেন তখন কিল্লার ভেতরে আবদুল আজীজসহ বাকি চারজন সংগী আঘাত হানেন দেহরক্ষীদের উপর; ওরা সংখ্যায় বেশি হলেও এতোটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলো যে, কার্যকরভাবে নিজেদের আত্মরক্ষার কোন তাকতই তাদের ছিলো না। মুহূর্তকাল পর আবদুল্লা বিন জিলুভীর পিছু পিছু তাড়া খেয়ে আমীর এসে দেখা দেন সমতল ছাদের উপর, তিনি দয়া প্রার্থনা করছিলেন, কিন্তু তা কবুল হলো না; এবং যখন তিনি ছাদের উপর পড়ে গেলেন এবং তাঁর উপর হানা হলো তলোয়ারের মারাত্মক আঘাত, ঠিক সেই মুহূর্তেই আবদুল আজীজ নিচ থে চিৎকার করে উঠলেন ‘আসো, হে রিয়াদবাসীরা আসো! এই যে আমি আবদুল আজীজ ইবনে সউদের খান্দানের আবদুর রহমানের পুত্র- তোমাদের ন্যায়সংগত শাসক!’ এই রিয়াদের লোকেরা, যারা ঘৃণা করতো তাদের উত্তরাঞ্চলের জালিমদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছুটে এলো তাদের শাহজাদার সাহায্যে এবং তাদের উট হাঁকিয়ে লাফিয়ে ছুটলো তাঁর পঁয়ত্রিশজন সংগী, নগরীর ফটকগুলির ভেতর দিয়ে, ঝনঝবায়ুর মতো তাদের সমুখের সব বাধা উড়িয়ে দিয়ে। এক ঘন্টার মধ্যেই আবদুল আজীজ ইবনে সউদ হয়ে পড়লেন নগরীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী শাসক।
ব্যাপারটি ঘটেছিলো ১৯০১ সালে। তখন তাঁর বয়স একুশ বছর। তাঁর জীবনে তারুণ্যের পর্ব তখন শেষ হয়ে এসেছে এবং তিনি প্রবেশ করেছেন তাঁর দ্বিতীয় অবস্থায়- পরিণত মানুষ এবং শাসকের বয়েসে।
ক্রমে ক্রমে একটি একটি প্রদেশ দখল করে এভাবে ইবনে সউদ গোটা নযদ ভূমি কেড়ে নিলেন ইবনে রাশিদ পরিবারের হাত থেকে এবং ওদের পিছু হটিয়ে নিয়ে গেলেন ওদের স্বদেশভূমি জাবাল শাম্মার ও তার রাজধানী হাইলে। যদিও ইবনে সউদের কোন জেনারেল স্টাফ ছিলো না এবং হয়তো জীবনে কখনো তিনি চোখ বুলাননি কোন মানচত্রের উপর, তবু তাঁর এই রাজ্য বিস্তার ঘটলো এমন সুচিন্তিতভাবে, যেন মানচিত্র, ফৌজ চালনা সম্পর্কিত কলাকৌশল এবং ভৌগোলিক রাজনৈতিক ধারণার উপর ভিত্তি করে একজন জেনারেল স্টাফ দ্বারাই ছিলো তা পরিকল্পিত। রিয়াদকে স্থায়ী কেন্দ্র করে তাঁর বিজয় অভিযানগুলি আগিয়ে চলে শামুকের প্যাঁচের মতো ঘুরে ঘুরে বৃত্তের আকারে এবং এরি মধ্যে যে অঞ্চল জয় করা হয়েছে, তাকে সম্পূর্ণ বশে না এনে এবং সেখানে ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে কায়েম না করে কখনো তিনি পা বাড়ান না সমুখদিকে নতুন কোন এলাকায়। প্রথমে তিনি রিয়অদের পূর্ব এবং উত্তরের জেলাগুলি দখল করেন এবং তারপর তাঁর রাজ্য প্রসারিত করেন পশ্চিমের মরুভূমিগুলির উপর। উত্তরদিকে তাঁর অগ্রগতি ছিলো মন্হর। কারণ তখনো ইবনে রশিদ- পরিবারের রয়েছে যথেষ্ট শক্তি, আর তা ছাড়া, তাদের পশ্চাতে ছিলো তুর্কীদের সমর্থন, যাদের সংগে ইবনে রশিদ-পরিবার মজবুত ঐক্যজোট গড়ে তুলেছিলো বিগত কয়েক দশক ধরে। ইবনে সউদের আরো একটি বাধা ছিলো- সে তাঁর দারিদ্র্য। নযদের দক্ষিণ অঞ্চলগুলি থেকে যে রাজস্ব পাওয়া যেতো তা দিয়ে কিছুকালের জন্যও দলে দলে বিপুল সৈন্য প্রেরণ সম্ভব ছিলো না যুদ্ধে।
-‘এক সময়ে,’ তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি এতোই গরীব ছিলাম যে, শায়খ মুবারক আমাকে রত্নখচিত যে তলোয়ারখানা দিয়েছিলেন, তাই আমি বাঁধা রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম কোয়েতে, এক ইহুদী মহাজনের কাছে। এমনকি, আমার জীনের জন্য একটা গালিচা যোগাড় করার ক্ষমতাও আমার ছিলো না- তবু ভেড়ার চামড়ার নিচে খালি বস্তা চাপিয়েই কাজ চলতো আমার’।
এ ছাড়া আরো একটি সমস্যা ছিলো যার ফলে ইবনে সউদের প্রথম জীবন হয়ে পড়েছিলো খুবই কঠিন। সমস্যাটি ছিলো বেদুঈন কবিলাগুলির মতিগতি নিয়ে।
মধ্য আরব, তার সকল শহর ও গ্রাম সত্ত্বেও প্রধানত একটির বেদুঈন এলাকা। তাদের সমর্থন অথবা বিরোধিতাই ইবনে সউদ ও ইবনে রাশিদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্দের প্রায় প্রত্যেক পর্যায়ে ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করে। বেদুঈনেরা খুবই চঞ্চলমতি, তাদেরমত বদল হয় সহজেই এবং যে মুহূর্তেই কোন দল জয়ী হতে চলেছে মনে হতো কিংবা বেশি পরিমাণ গনীমতের আশ্বাস দিতো, সাধারণত তাদের দলেউ তারা যোগ দিতো। এ ধরনের দ্বিমুখী আচরণের শিরোমণি ছিলো ফয়সাল আদ-দাবিশ, শক্তিশারী মুতায়ের কবিলার সর্বপ্রধান সর্দার; তার আনুগত্যের উপর হামেশাই নির্ভর করতো- দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শাহী খান্দানের মধ্যে কখন কে জয়ী হবে আর কখন কে হারবে! সে হাইলে এলে ইবনে রশিদ ইনাম দিতেন বোঝাই ক’রে; সে ইবনে রশিদকে পরিত্যাগ করে আসতো রিয়অদে আনুগত্যের শপথ নিতে ইবনে সউদের প্রতি এবং এক মাস যেতে না যেতেই আবার বিশ্বাস ভংগ করতো, কারো বিশ্বাসই সে রক্ষা করতো নাঃ সাহসী এবং ধূর্ত, ক্ষমতার প্রচণ্ড লোভে সে ছিলো উন্মাদ। তার জন্য ইবনে সউদকে কাটাতে হয় বহু বিনিদ্র রজনী।
এ ধরনের অসুবিধার মুকাবিলায় ইবনে সউদ একটি পরিকল্পনার কথা চিন্তা করেন। শুরুর দিকে হয়তো পরিকল্পনাটি একটি রাজনৈতিক দলের বেশি কিছু ছিলো না, কিন্তু পরিশেষে তাই রূপ দিলো অমন একটি চমৎকার ধারণায় যা গোটা উপদ্বীপটিকেই বদলে দিতে সক্ষমঃ কী সেই পরিকল্পনা?- যাযাবন কবিলাগুলির জন্য স্থায়ী বসতি স্থাপত করতে হবে। সন্দেহ ছিলো না যে, একবার স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করলেই, বিভিন্ন যুদ্ধবাজ দলের মধ্যে বেদুইনেরা যে দ্বিমুখী খেলা খেলে আসছে তা তাদের ছেড়ে দিতে হবে। যাযাবর হিসাবে তাদের পক্ষে সহজ ছিলো মুহূর্তের নির্দেশে তাঁবু গুটিয়ে ফেলা এবং তাদের পশুগুলিকে নিয়ে এখানে-ওখানে বিচরণ করা; একদল ছেড়ে আরেক দলের নিকট চলে যাওয়া; কিন্তু স্থায়ী বসতি গেড়ে জিন্দেগী গুজরান করলে তা সম্ভব হবে না। কারণ আনুগত্য তুলে নিয়ে দুশমনের প্রতি আনুগত্য স্থাপন করলে ভয় রয়েছে তাদের বাড়ি-ঘর বাগ-বাগিচা হারানোরঃ আর বেদুঈনের কাছে তার নিজ অধিকারের মতো মূল্যবান কিছুই নেই!
ইবনে সউদ তাঁর কর্মসূচীতে সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দিলেন বেদুঈনদের স্থায়ী বসতি স্থাপনের উপর। এ ব্যাপারে তিনি ইসলামের শিক্ষা থেকে সাহায্য পান প্রচুর। যাযাবর জীবন থেকে স্থায়ী বসতির শ্রেষ্ঠত্বের উপর ইসলাম জোর দিয়েছে বারবারই। বাদশাহ ধর্ম প্রচারদের পাঠালেন বিভিন্ন কবিলার নিকট। ওরা এই সব গোত্রকে ধর্ম শিক্ষা দেন এবং তাদের নিকট নতুন চিন্তাধারা প্রচার করেন; তাতে যে ফল পাওয়া গেলো তা ছিলো অপ্রত্যাশিত। ধীরে ধীরে ‘ইখওয়ান’ (ভ্রাবৃসংঘ) নামক সংগঠনটি রূপ নিলো- যে নামে স্থায়িভাবে বসতি গেড়ে বসা বেদুঈনেরা পরিচয় দিতে শুরু করলো নিজেদের। সর্বপ্রথম ‘ইখওয়ান’ বসতি ছিলো- আদ-দাবিশ গোত্রের আলওয়া মুতাইয়ের বসতি। ওদের বসতি আরতাবিয়া অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তিরিশ হাজার লোকের এক শহর হয়ে দাঁড়ালো। আরো বহু গোত্র একই পথ অবলম্বন করলো।
‘ইখওয়ানে’র ধর্মীয় উদ্দীপনা আর যোদ্ধা হিসাবে তাদের সম্ভাবনা ইবনে সউদের হাতে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তখন থেকে তাঁর যুদ্ধগুলি নেয় এক নতুন রূপঃ ‘ইখওয়ানের ধর্মীয় উদ্দপনায় পরিচালিত এইসব যুদ্ধ তাদের আগেকার বিভিন্ন শাহী খান্দানের ক্ষমতা দ্বন্দ্বের প্রকৃতি অতিক্রম করে ধর্মীয় জিহাদের রূপ নেয়। অবশ্য ‘ইখওয়ান’দের কাছে ধর্মের এই পুনর্জন্মের অর্থ একটা ব্যক্তিগত তাৎপর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। আঠারো শতকের মহান মুজাদ্দিদ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের শিক্ষার প্রতি ওদের আপোসহীন আনুগত্যের বিচারে, ‘ইখওয়ান’ নিজেরা যে ব্যক্তিগতভাবে সদাচারী, এই বিশ্বাসের অতিশয্যে ওরা প্রায়ই ছিলো ভরপুর। কিন্তু ওদের বেশির ভাগই যা কামরা করতো তা কেবল ব্যক্তিগত সদাচার নয় এবং তাদের লক্ষ্য ছিলো এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা যাকে ন্যায়সংগতভাবেই বলা যেতে পারে ইসলামী সমাজ। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিলো- ইসলামকে তার শুরুর দিকের সকল বাহুল্য-বর্জিত বিশুদ্ধতায় ফের প্রতিষ্ঠিত করা; এ শিক্ষা পরবর্তী সকল বিদ’আত তথা নবতরো সকল সংযোজনকেই প্রত্যাখ্যান করে। এ কথা সত্য, ‘ইখওয়ানের’ বহু ধারণাই ছিলো একেবারে আদিম, আর উদ্দীপনা প্রায়ই গিয়ে পৌঁছতো অন্ধ গোড়ামীর কাছাকাছি। কিন্তু উপযুক্ত পরিচালনা ও শিক্ষা পেলে তাদের গভীর ধর্মনিষ্ঠাই হয়তো তাদের সক্ষম করে তুলতো তাদের দৃষ্টিভংগিকে প্রসারিত করতে এবং কালে তাই হয়ে উঠতে পারতো সমগ্র আরবের একটি খাঁটি সামাজিক ও আধ্যাত্মিক পুনরুত্থানের কেন্দ্রবিন্দু। দুর্ভাগ্যক্রমে এ ধরনের একটি পরিণতির প্রচণ্ড তাৎপর্য বুঝতে পারেননি ইবনে সউদ। তিনি ‘ইখওয়ানকে ধর্মীয় এবং লোকায়ত শিক্ষার কেবল একেবারে প্রাথমিক কথাগুলি দিয়েই ক্ষান্ত ছলেন। বস্তুত ওদের গোঁড়া আগ্রহকে জিইয়ে রাখার জন্য যতোটুকু শিক্ষাদান প্রয়োজন মনে হয়েছিলো, সেই পরিমাণ শিক্ষাই তিনি ওদের দিয়েছিলেন। অন্য কথায়, ইবনে সউদ ইখওয়ান আন্দোলনকে কেবলমাত্র ক্ষমতার এক হাতিয়ার রূপেই দেখেছিলেন। পরবর্তী বছরগুলিতে তাঁর এই ব্যর্থতার শিকার হয় তাঁর নিজেরই বিভিন্ন নীতি এবং এক পর্যায়ে এসে, তিনি যে-রাজ্য সৃষ্টি করেছিলেন তার অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তোলে, আর হয়তো এতেই এই প্রথম আভাস পাওয়া গেলো যে, তাঁর জাতি তাঁর মধ্যে যে হৃদয়ের মহত্ত্ব আশা করেছিলেন ইবনে সউদ তা থেকে বঞ্চিত। কিন্তু বাদশাহর ব্যাপারে ইখওয়ান- এর মোহভংগ এবং ইখওয়ান এর ব্যাপারে বাদশাহর হাতাশার সুচনা হয়েঠিছলো অনেক আগে থেকেই…।
১৯১৩ সালে প্রচণ্ড আক্রমনের জন্য প্রস্তুত ‘ইখওয়ানকে হাতে পেয়ে শেষপর্যন্ত ইবনে সউদের মনে হলো, পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী আলহাসা প্রদেশটি বিজয়ের জন্য তিনি এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। আলহাসা নযদের এলাকা হলেও পনের বছর আগে তা দখল করে নিয়েছিলো তুর্কীরা।
তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা ইবনে সউদের জন্য নতুন নয়। প্রায়ই তিনি তুর্কী লশকরের মুকাবিলা করেছেন, বিশেষ করে ইবনে রাশিদের সেনাবাহিনীল অন্তর্গত স্থল গোলন্দাজদের। কিন্তু তুর্কীদের প্রত্যক্ষ শাসনাধীন আলহাসার উপর আক্রমণ করা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপারঃ এর অর্থ হবে একটি বৃহৎ শক্তির সংগে সাক্ষাৎ মুকাবিলা। কিন্তু কোন গত্যন্তর ছিলো না ইবনে সউদের জন্য। তিনি যদি আলাহাসা এবং তার বন্দরগুলিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারেন তার ফল হবে এই, তিনি সবসময়ই বিচ্ছিন্ন থাকবেন বহির্জগত থেকে, আর অত্যাবশ্যক অস্ত্রশস্ক, গোলাবারুদ এবং জবনের প্রয়োজনীয় বহু জিনিসই পারবেন না সংগ্রহ করতে। প্রয়োজনের দ্বারাই সমর্থিত হলো বিপদের এই ঝুঁকি। কিন্তু এই ঝুঁকি এতো মারাত্মক ছিলো যে, আলহাসা এবং তার রাজধানী আল-হুফুফের উপর আঘাত হানার আগে দীর্ঘদিন তিনি ইতস্তত করেছেন। কী অবস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিলো আজো তা স্মরণ করতেতিনি আনন্দ পানঃ
-‘আমরা এরই মধ্যে আল-হুফুফের দৃষ্টিসীমায় এসে পড়েছি। আমি যে বালিয়াড়ির উপর বসেছিলাম সেখান থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম মজবুত দুর্গের দেয়ালগুলি; দুর্গটি যেন তাকিয়ে আছে শহরটির দিকে। আমার এই উদ্দেশ্যের ফায়দা এবং বিপদগুলি সম্বন্ধে বিচার করে আমি ভয়ানক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যাই। আমি ভীষণ ক্লান্ত বোধ করছি; আমার হৃদয় শান্তি ও গৃহের কামনায় লালায়িতঃ এবং ঘরের কথা মনে হওয়ার সংগে সংগে আমার স্ত্রী যওহারার মুখ ভেসে উঠলো আমার চোখের সামনে। সেই সব কবিতার কথা আবার ভাবতে লাগলাম যা আমি তাঁকে আবৃত্তি করে শোনাতাম, তিনি আমার পাশে থাকলে এবং আমি তা উপলব্ধির আগেই তাঁর জন্য রচনা করতে শুর করি একটি কবিতা- আমি কোথায় আছি এবং কী বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত আমাকে নিতে হচ্ছে, সে-সব সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে! কবিতাটি আমার মনে রূপ নেয়ার সংগে সংগে আমি তা লিখে ফেলি এবং তা সীলমোহর করে আমার কাসেদদের একজনকে ডেকে হুকুম দেইঃ সবচেয়ে দ্রুতগামী দু’টি উট নাও। সেই উট হাঁকিয়ে চলে যাও রিয়াদ, কোথাও না থেমে, আর এটি দাও মুহাম্মদের মায়ের হাতে। কাসেদটি ধূলি-মেঘের আাড়ালে যখন হারিয়ে যাচ্ছে হঠাৎ আমি দেখতে পেলাম, আমার মন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যুদ্ধের ব্যাপারেঃ আমি আল-হুফুফ আক্রমণ করবো এবং আল্লাহ অবশ্যি সাফল্য দেবেন আমাকে।
তাঁর আত্মবিশ্বাস সার্থক প্রমাণিত হলেঅ। এক দুঃসাহসিক হামলা চালিয়ে সিপাইরা দখল করে নিলো কিল্লা। তুর্কী লশকরেরা আত্মসমর্পণ করে; তাদেরকে তাদের অস্ত্রশস্ত্র সাজসরঞ্জাম নিয়ে কিল্লা ছেড়ে উপকূলে সরে যাওয়অর ইজাযত দেওয়া হলো। সেখান থেকে ওরা জাহাজে চড়ে রওয়ানা হয় বসরার পথে। অবশ্য উসমানী হুকুমত তাদের অধিকার এতো সহজে ছেড়ে যাবার জন্য তৈরি ছিলো না। ইস্তাম্বুলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো- ইবনে সউদের বিরুদ্ধে এক শাস্তিমূলক অভিযান পাঠানার। কিন্তু সে অভিযান পাঠানোর আগেই মহাযুদ্ধ বেঁধে যায়, যার ফলে তুর্কীরা বাধ্য হয় তাদের সমস্ত জংগী ফৌজ অন্যত্র সমাবেশ করতে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উসমানী সাম্রাজ্য আর টিকে রইলো না।
তুর্কীদের মদদ থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং উত্তরাঞ্চলে এখন ব্রিটেন ও ফ্রান্স শাসিত এলাকাগুলির দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে ইবনে রশিদ আর পারছিলেন না কার্যকরভাবে দুশমনকে প্রতিরোধ করার কোন ব্যবস্থা করতে। ফয়সল আদ- দাবিশ এখন বাদশাহ ইবনে সউদের সবচেয়ে সাহসী সামন্ত যোদ্ধাদের অন্যতম। তারই নেতৃত্বে বাদশাহর ফৌজ হাইল দখল করে ১৯২১ সনে এবং তার ফলে ইবনে রশিদ তাঁদের সর্বশেষ মজবুত ঘাঁটিটিও হারিয়ে বসেন।
ইবনে সউদের রাজ্য বিস্তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে ১৯২৪-২৫ সালে, যখন তিনি মক্কা, মদীনা এবং জিদ্দাসহ হিজাজ জয় করেন, এবং ১৯১৬ ইংরেজিতে, ব্রিটিশ সমর্থন ও সাহায্যে শরীফ হোসেন তুর্কীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পর যে শরীফ বংশ হিজাজে ক্ষমতায় এসেছিলো, তাদের হিজাজ থেকে বিতাড়িত করেন। ইসলামের এই পবিত্র ভূমি বিজয়ের পরেই ইবনে সউদ- তাঁর বয়স এখন পঁয়তাল্লিশ বছর- পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত হলেন বাহির্বিশ্বের চোখের সামনে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সকল দেশই যখন পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের পায়ের তলায় পিষ্ট ঠিক সেই সময়ে ইবনে উদের এই অভূতপূর্ব বিজয় গোটা আরব জাহনে এক প্রবল আশার সঞ্জার করে; প্রত্যাশাটি এই যে, শেষপর্যন্ত তাদের মধ্যে এমন একজন নেতার আবির্ভাব হয়েছে যিনি সমগ্র আরব কওমকে উদ্ধার করবেন গোলামি থেকে। তাছাড়া আরবদের বাদ দিলেও আরো বহু মুসলিম জনসমষ্টি উৎসুক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকালো এ আশায় যে, তিনি একটি রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী আদর্শকে তার সামগ্রিক অর্থেই পুনরুজ্জীবিত করবেন, যে রাষ্ট্রে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের পরম নিয়ামক হবে আল- কুরআনের মর্মবাণী। কিন্তু এসব আশা পূর্ণ হলো না, অপূর্ণই রয়ে গেলো। তাঁর ক্ষমতা বেড়ে যাবার পর যখন তা সংহত হলো তখন এ কথা পরিষ্কার হয়ে উঠলো যে, ইবনে সউদ একজন বাদশাহ বৈ কিছুই নন, এমন একজন বাদশাহ, প্রাচ্য দেশগুলিতে তাঁর আগের বহু স্বৈরাচারী শাসক থেকে যাঁর কোন মহত্তর লক্ষ্য নেই।
ব্যক্তিগত জীবনে মহৎ ও ন্যায়পরায়ণ, বন্ধু ও সমর্থকদের প্রতি বিশ্বস্ত, দুশমনদের প্রতি মহানুভব, বাদশাহ ইবনে সউদ তাঁর প্রায় সকল অনুসারীদের থেকে অনেক- অনেক বেশি ধী-শক্তির অধিকারী। তা সত্ত্বেও তিনি দৃষ্টির সেই ব্যাপ্তির এবং সেই উদ্বুদ্ধ নেতৃত্বের পরিচয় দিতে পারেননি যা তাঁর কাছ থেকে আশা করেছিলো মানুষ। এ কথা সত্য, তিনি তাঁর বিশাল রাজ্যে জনসাধারণের জীবনে এমন এক নিরাপত্তা এনেছেন হাজার বছর আগের প্রথমদিকের খলীফাদের পর আরব দেশগুলিতে যার কোন তুলনা নেই, কিন্তু সেকালের খলীফাদের অনুসারণ না করে তিনি নিরাপত্তা আনয়ন করেন কঠোর আইন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থঅর মাধ্যমে, তাঁর কওমের মধ্যে নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে নয়। তিনি কিছু সংখ্যক তরুণকে বিদেশে পাঠিয়েছেন চিকিৎসা শাস্ত্র ও বেতার টেলিগ্রাম অধ্যয়ন করতে; কিন্তু তাঁর গোটা জাতিকে শিক্ষার জন্য উদ্বদ্ধ করবার এবং এভাবে বহু শত বছর ধরে ওরা যে অজ্ঞানের মধ্যে ডুবে আছে তা থেকে তাদের টেনে তোলবার জন্য কিছুই করেনি। তিনি সবসময়ই কথা বলেন ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য সম্বন্ধে, কথা বলেন আত্মপ্রত্যয়ের জাহিরা প্রত্যেকটি লক্ষণের সাথে; কিন্তু তিনি কিছুই করেননি একটি সুষম প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তোলার জন্য, যার মধ্যে সাংস্কৃতিক রূপ পেতে পারতো সেই জীবন পদ্ধতি।
তিনি সরল বিনয়ী এবং কঠোর পরিশ্রমী; তা সত্ত্বেও তিনি নিজে চরম মাত্রায় বেফজুল খরচ ও অর্থহীন বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেন এবং তাঁর চারপাশে যারা রয়েছে তাদের এ ধরনের খরচ ও বিলাসিতায় গা ভাসাতে দেখলেও তিনি আপত্তি করেন না। তিনি গভীরভাবে ধর্মপ্রবণ এবং ইসলামী আইনের আনুষ্ঠানিক নির্দেশগুলির প্রত্যেকটি তিনি পালন করেন অক্ষরে অক্ষরে; কিন্তু এই সব নির্দেশের আধ্যাত্মিক মর্ম ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তিনি খুব ক্বচিৎ কখনো চিন্তা করেন বলে মনে হয়। তিনি দৈনিক পাঁচবেলা ফরজ সালাত আদায় করেন অত্যন্ত নিয়মিতভাবে এবং রাতে ঘণ্টা কাটান গভীর ধ্যানে। কিন্তু মনে হয়, এ কথা কখনো তাঁর মনে উদয় হয়নি যে, সালাত একটা উপায় মাত্র এবং খোদ কোন লক্ষ্য নয়। তিনি নিজ প্রজাদের প্রতি শাসকের দায়িত্ব সম্পর্কে কথা বলতৈ ভালোবাসেন এবং প্রায়ই রাসূল (স)-এর এই বাণীটি উদ্ধৃত করে থাকেনঃ ‘প্রত্যেকটি মানুষই হচ্ছে একটি রাখাল যার উপর অর্পিত হয়েছে তার মেষপালের দায়িত্ব’; কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর নিজের সন্তানদের শিক্ষাকে পর্যন্ত অবহেলা করেছেন এবং এভাবে, তাদের সামনে যে-দায়িত্ব রয়েছে সেই দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের প্রস্তুত করেছেন সামান্যই। একবার যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলেঅ, তিনি তাঁর রাষ্ট্রকে এতোটা ব্যক্তিগত ভিত্তিতে গড়ে না তুলে আরো উদারভাবে সংগঠিত করার চেষ্টা কেন করেননি, যাতে করে তাঁর পুত্ররা পেতে পারেন একটি সংগঠিত প্রশাসন-কাঠামো, তিনি জবাব দিয়েছিলেনঃ ‘আমি আমার রাজ্য জয় করেছি আমার নিজের তলোয়ার এবং নিজের চেষ্টার জোরে। আমার পরে আমার ছেলেরা ‘তাদের’ নিজেদের উদ্যোগ নিক’।
বাদশাহর সংগে আমার এক আলোচনার কথা মনে পড়ছে- যাতে সমূহ পরিচয় মেলে তাঁর অদূরদর্শিতা এবং প্রশাসনিক দৃষ্টিভংগির অভাবেরঃ এ আলেঅচনা হয়েছিলো মক্কায় ১৯২৮- এর শেষের দিকে, যখন সিরিয়ার আযাদী আন্দোলনের মশহুর নেতা আমীল শকীব আরসালান বাদশাহর সংগে সাক্ষাৎ করেন। ইবনে সউদ আমার পরিচয় করিয়ে দেন এই ভাষায়ঃ ‘এ হচ্ছে মুহাম্মদ আসাদ, আমার পুত্র, অদ্য ফিরে এসেছে দক্ষিণাঞ্চলগুলি থেকে। ও আমার বেদুঈনের মধ্যে সফর করতে ভালোবাসে’।
আমীল শাকীব কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, তাঁর আগ্রহ ছিলো বহুমুখী এবং তিনি ছিলেন একজন মস্ত বড়ো পণ্ডিত। তিনি যখন শুনলেন আমি একজন ইউরোপীয় এবং ইসলাম কবুল করেছি, সংগে সংগেই তিনি উৎসুক হয়ে উঠলেন আমার অভিজ্ঞতা জানার জন্য। আমি তাঁর নিকট বর্ণনা করি দক্ষিণাঞ্চলের সেই অভিজ্ঞতার কথা, যেখানে আমার আগে আর কোন ইউরোপীয় কখনো সফর করেনি। কৃষিক্ষেত্রে সেই অঞ্চলটির বিপুল সম্ভাবনা, তার পানি সম্পদ এবং তার উর্বর মৃত্তিকা আমার কাছে মনে হয়েছিলো অত্যন্ত আশাপ্রদ এব্ং এই বর্ণনা প্রসংগে আমি বাদশাহকে লক্ষ্য করে বলিঃ
-‘হে ইমাম, আমি এ ব্যাপারে খুবই নিশ্চিত যে, গোটা হেজাজে প্রচুর গম সরবরাহ করার জন্য ওয়াদি বিশা সহজেই হয়ে উঠতে পারে একটি শস্য-ভাণ্ডার, যদি এলাকাটিকে বৈজ্ঞানিক পন্হায় জরিপ ও উন্নত করা হয়’।
আমার এই কথায় বাদশাহ উৎকর্ণ হয়ে উঠলেন,কারণ হেজাজের জন্য গম আমদানি করতে গিয়ে দেশের রাজস্বের একটা মোটা অংশই খরচা হয়ে যাচ্চে আর রাজস্বের ঘাটতি সবসময়ই ইবনে সউদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে আছে।
-‘এভাবে ওয়াদি বিশাকে উন্নত করতে কতোদিন লাগবে?’ তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন।
আমি বিশেষজ্ঞ নই, কাজেই কোন পরিষ্কার জওয়াব দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হলো না। আমি পরামর্শ দিই বিদেশী কারিগরী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করা হোক, যার কাজ হবে অঞ্চলটিকে জরিপ করা এবং উন্নয়নের জন্য বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা পেশ করা। আমি সাহস করে বললাম, এলাকাটি থেকে পুরা ফসল পেতে লাগবে বড় জোর পাঁচ থেকে দশ বছর।
-‘দশ বছর’! –বিস্ময় প্রকাশ করেন ইবনে সউদ, ‘দশ বছর তো অনেক দীর্ঘ সময়! আমারা বেদুঈনেরা কেবল একটি জিনিস জানিঃ যা কিছু আমরা হাতে পাই, তাই আমরা মুখে পুরি এবং আহার করি। দশ বছর পরের জন্য পরিকল্পনা করা, এ যে আমাদের জন্য অত্যন্ত দীর্ঘ ব্যাপার!’
এই বিস্ময়কর মন্তব্যে আমীর শাকীব হা করে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে, যেন তিনি তাঁর কান দু’টিকে বিশ্বাস করতে পারছেন না; আর এর জবাবে আমিও তাঁর দিকে তাকাই স্থির বিস্ফরিত দৃষ্টিতে….
আর সে সময়ই আমি নিজেকে এই প্রশ্ন করতে শুরু করিঃ ইবনে সউদ কি একজন মহৎ মানুষ যাঁকে আরাম- আয়েশ ও বাদশাহী সরিয়ে নিয়েছে মহত্ত্ব থেকে, অথবা তিনি কি কেবলই একজন প্রচণ্ড সাহসী ও খুবই চালাক ব্যক্তি, যিনি নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতা ছাড়া কিছুই চান না?
আমার পক্ষে আজ পর্যন্ত এ প্রশ্নের একটা সন্তোষজনক জওয়াব দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না যদিও তাঁকে আমি জানি বহু বছর ধরে আর ভালোভাবেই জানি, তবু ইবনে সউদের চরিত্রের একটা দিক আজো আমার কাছে অবোধ্যই রয়ে গেছে। ব্যাপার এ নয় যে, তিনি মনের ভাব অন্যের নিকট থেকে কোন না কোনভোবে গোপন রাখতে অভ্যস্ত; তিনি নিজের সম্বন্ধে কথা বলেন খোলাখুলি এবং প্রায়ই বর্ণনা করেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা; কিন্তু তাঁর চরিত্রের এতোগুলি দিক রয়েছে যে, তা সহজে বোঝা কঠিন এবং তাঁর সরলতার যে চেহারা বাইরে থেকে দেখা যায় তার আড়ালে গোপন রয়েছে সমুদ্রের সতোই বিক্ষুব্ধ একটি হৃদয় এবং মেজাজ-মর্জি ও আভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতার দিক দিয়ে যা সমুদ্রের মতোই ঐশ্বর্যশালী। তাঁর ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব বিপুল; কিন্তু তা যতো না নির্ভর করে বাস্তব ক্ষমতার উপর তার চাইতে বেশি নির্ভর করে তাঁর চরিত্রের শক্তির উপর। কথাবার্তায় এবং ভাবভংগিতে তাঁর মধ্যে আহমিকার লেশমাত্র নেই। তাঁর খাঁটি গনতান্ত্রিক মন তাঁকে সাহায্য করে, ময়লা ছেঁড়া তালি দেওয়া কাপড়-চোপড় পরে যে বেদুঈনেরা আসে তাদের সংগে আলাপ- আলোচনা করতে, যেনো তিনি তাদেরই একজন। আর তাঁর এই মন থেকেই তিনি সামর্থ্য পেয়েছিলেন, তাঁকে তাঁর প্রথম নাম ‘আবদুল আজীজ’ বলে সম্বোধন করবে- ওদের এই অধিকার দেওয়ার। পক্ষান্তরে, তিনি উচ্ছপদস্থ আমলাদের প্রতিও হয়ে উঠতে পারেন রূঢ় এবং ঘৃণাপ্রবণ, যখন তিনি তাদের মধ্যে লক্ষ্য করেন দাস মনোভাব, তিনি ঘৃণা করেন সকল রকম শরাফতির ভান। মক্কার একটি ঘটনার কথা আমার মনে পড়ছে। শাহী মহলে আমরা খানা খাচ্ছি, নযদের সবচেয়ে অভিজাত পরিবারগুলির অন্যতম এক পরিবারের সর্দারের নাসিকা কুঞ্চিত হলো সমাগত কোন কোন নযদীর অমার্জিত বেদঈনী’ আচরণে। ওরা উল্লাসের সংগে বড়ো বড়ো মুঠা-ভরা ভাত গিলছিলো গোগ্রাসে; নিজের সুক্ষ্ম রুচিবোধ প্রমাণ করার জন্য মক্কার সেই অভিজাতটি তাঁর খানা আঙুলের ডগা দিয়ে তুলে তুলে যখন খাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ শোনা গেলো বাদশাহর আওয়াজঃ ‘তোমরা রুচিবান লোকেরা তোমাদের খাবার নিয়ে কেলা করো এতো সাবধানতার সংগেঃ এটা কি এ জন্য যে তোমরা তোমাদের আঙুল দিয়ে ময়লা ঘাটতে অভ্যস্ত? আমরা নযদের লোকেরা আমাদের হাতকে ভয় করি না- আমাদের হাত পাক-সাফ পরিষ্কার এবং সে কারণে আমরা খাই তৃপ্তির সংগে এবং মুঠামুঠা করে’।
কখনো কখনো, যখন তিনি একেবারেই আরামে গা ঢেলে দিয়ে আছেন, স্মিত হাসি খেলা করে ইবনে সউদের মুখের উপর এবং তাঁর মুখমণ্ডলের সৌন্দর্যের উপর তা ছড়িয়ে দেয় প্রায় আধ্যাত্মিক এক বৈশিষ্ট্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ইবনে সউদ যে গোঁড়া ওয়াহাবী বিধান মেনে চলেন সে বিধানে সংগীত গর্হিত বলে গণ্য না হলে সংগীতের মাধ্যমেই তিনি প্রকাশ করতেন নিজেকে। কিন্তু আসলে তিনি তাঁর সংগীতধর্মিতার পরিচয় দিয়ে থাকেন তাঁর ছোট্ট কবিতাগুলিতে, তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণাঢ্য বর্ণনাগুলিতে এবং তাঁর যুদ্ধ এবং প্রেমের গানগুলিতে, যা ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র নযদে, যা পুরুষেরা গায় মরু বিয়াবানের মধ্য দিয়ে উটের পিঠে চলতে চলতে এবং রমনীরা গায় তাদের নিজ নিজ ঘরের নির্জনতায়। তাঁর রোজকার জীবন বাদশাহী দায়িত্বের উপযোগী যে নিয়মিত এবং নমনীয় ছন্দ অনুসরণ করে চলে তাতেই ঘটে তাঁর সংগীতধর্মিতার অভিব্যক্তি। জুলিয়াস সিজারের মতোই এক সংগে এবং একই সময়ে অনেক কটি চিন্তার সূত্র অনুধাবন করার সামর্থ্য তাঁর রয়েছে উচ্চ পর্যায়ের এবং তিনি তা করতে পারেন- যে তীব্রতার সংগে তিনি প্রতিটি সমস্যা মুকাবিলা করেন তা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন না করে, আর এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সহজাত গুণের জন্যই তিনি পারেন বিভ্রান্তির মধ্যে না পড়ে অথবা অতিরিক্ত পরিশ্রমের দরুন ভেংগে না পড়ে তাঁর বিশাল রাজ্যের সকল বিষয় ব্যক্তিগতভাবে পরিচালনা করতে এবং তাঁর পরও সময় করে নিতে এবং আগ্রহ বাঁচিয়ে রাখতে- রমনীর সাহচর্য নিয়ে এতো ব্যয়বহুল বিলাসিতায় মগ্ন হতে। তাঁর অনুভূতির সূক্ষ্মতা অনেক সময় প্রায় ভৌতিক, লোমহর্ষক। যে-সব লোকের সংগে তাঁর কারবার, তাদের মনের গতিবিধির একেবারে মর্মস্থলে পৌঁছুবার একটি প্রায় অব্যর্থ সহজাত অন্তদৃষ্টি রয়েছৈ তাঁর- প্রায়ই যেমন আমি নিজে প্রত্যক্ষ্য করবার সুযোগ পেয়েছি- মানুষ কথায় ব্যক্ত করার আগেই মানুষের চিন্তা বা মনের ভাব তিনি বুঝতে পারেন এবং কোন মানুষ কামরায় প্রবেশ করার সংগে সংগেই তাঁল প্রতি সেই মানুষটির মনোভাব তিনি টের পেয়ে যান বলে মনে হয়। এই ক্ষমতার জন্যই ইবনে সউদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে তাঁর জীবন নাশের কয়েকটি অতি সুপরিকল্পিত চেষ্টাকে বানচাল করে দিতে এবং রাজনৈতিক বিষয়ের অকুস্থলে বসেই সৌভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে।
সংক্ষেপে, যে-সব গুণের বদৌলতে একটি মানুষ মহৎ হতে পারে তার অনেকগুলিই রয়েছে ইবনে সউদের; কিন্তু মহত্ত্ব অর্জনের জন্য কোন সত্যিকার চেষ্টা তিনি কোনদিনই করেননি। মেজাজের দিক দিয়ে অন্তর্মুখী না হওয়ায় তাঁর যুক্তিভিত্তিক বিচার-শক্তি প্রয়োগের বিপুল ক্ষমতা রয়েছে, একেবারে জ্বলজ্যান্ত সব ভূল-ক্রটির মুকাবিলায় তিনি নিজে যে সঠিক পথে আছেন এ বিষয়ে আত্মপ্রত্যয় সৃষ্টির। আর তাই তিনি সহজেই এড়িয়ে যান সকল প্রকার আত্মবিচার। তাঁকে যারা ঘিরে থাকে- তাঁর সভাসদেরা এবং তাঁর দাক্ষিণ্যের উপর নির্ভরশীল অসংখ্য কৃপাভিক্ষুক- নিশ্চয়ই তারা তাঁর এই দুর্ভাগ্যজনক প্রবণতাকে রুখবার জন্য কিছুই করেনি।
তাঁল তারুণতরো বছরগুলিতে যখন মনে হয়েছিলো তিনি উত্তেজনা জাগানো স্বপ্নের স্বাপ্নক, সেই সময়ের বিপুল প্রতিশ্রুতিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তিনি হয়তো নিজের অজ্ঞাতেই উচ্ছ স্বরগ্রামে বাঁধা একটি জাতির মনকে ভেঙে দিয়েছেন, যে জাতি আগ্রহী ছিলো তাঁকে আল্লাহ-প্রেরিত একজন নেতা বলে ভাবতে। তাঁর কাছে ওদের প্রত্যাশা অতো বেশি ছিলো যে, ওদের পক্ষে নির্বিকারচিত্তে হতাশাকে মেনে নেওয়া কঠিন; নযদের বাসিন্দাদের মধ্যে যারা সর্বোক্তম তাদের অনেকেই আজকাল অত্যন্ত তিক্ত ভাষায় কথা বলে, তাদের মতে, তাদের বিশ্বাসের প্রতি যে বেওফাই করা হয়েয়ে, তার বিরুদ্ধে।
আমি কখনো ভূলবো না আমি যে দুর্দশা ও নৈরাশ্যের রূপ দেখেছিলাম আামার এক নযদী দোস্তের মুখে, যিনি এককালে ছিলেন ইবনে সউদের নেতৃত্বে অতি তীব্র বিশ্বাসী এবং বাদশাহর শাহী জিন্দেগীর সবচেয়ে কঠিন বছরগুলিতে বাদশাহর সংগী ছিলেন সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে, যখন তিনি বাদশাহ সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে একদিন আমাকে বলেনঃ
-‘সেই প্রথমদিকের বছরগুলিতে, আমরা যখন ইবনে সউদের সংগে উট হাঁকিয়ে অভিযানে বেরিয়েছিলাম ইবনে রশিদের বিরুদ্ধে এবং আমরা যখন ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ- ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই’- এই বাণীখচিত ঝাণ্ডার নিচে উট হাঁকিয়ে বের হয়ে পড়েছিলাম ইসলামের প্রতি সেই বিশ্বাসঘাতক শরীফ হোসেনের বিরুদ্ধে, তখন আমাদের মনে হয়েছিলো ইবনে সউদ এক নতুন মূসা, যিনি তাঁর কওমকে জাহিলিয়াত এবং অবক্ষয়ের বন্ধুন থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাবেন প্রতিশ্রুত ইসলামের ভূমিতে। কিন্তু তিনি যখন তাঁর কওম এবং তাঁর ভবিষ্যতকে ভুলে গিয়ে কায়েম হয়ে বসলেন তাঁর নবার্জিত আরাম-আয়েশ এবং বিলাসিতা নিয়ে, আমরা ভয়ে শিউরে উঠে দেখতে পেলাম, ইিন এক ফেরাউন…’।
অবশ্য আমার দোস্ত ইবনে সউদের নিন্দাভাষণের বেলায় ছিলেন অতি.. অতিমাত্রায় রূঢ়, এমনকি অবিচারী; কারণ তিনি ফেরাউন নন, জালিক নন; তিনি একজন দয়ালূ মানুস এবং আমার কোন সন্দেহ নেই যে, তিনি তাঁর কওমকে ভালোবাসেন। কিন্তু তাই বলে তিনি মূসাও নন। তাঁর ব্যর্থতা বরং এখানেই যে, তাঁল কওম তাঁকে যতো মহৎ বলে কল্পনা করেছিলো সে মহত্ত্বে তিনি পৌঁছুতে পারেননি- এবং যৌবনের তুর্যধ্বনির অনুসরণ করলে তিনি সম্ভবত যা হতে পারতেন তা তিনি হতে পারেননি। তাঁর তুলনা এবং ঈগল যে কখনো ডানা মেলেনি আকাশে।
তিনি অনেক… অনেক বড়ো আকারে, কেবল একজন মহানুভব গোত্র- প্রধানই রয়ে গেছেন….। [এই বইটি সম্পূর্ণ হবার (১৯৩৫) কিছুকাল পরেই ইবনে সউদ ৭৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁর ইন্তেকারে সংগে সংগে আরবীয় ইতিহাসে একটি যুগের অবসান ঘটে। তাঁর সংগে যখন শেষবার ১৯৫১ ইংরেজির শরৎকালে দেখা করি (পাকিস্তান সরকারের পক্ষে সউদি আরবে একটি সরকারী সফর উপলক্ষে) তখন আমার মনে হয়েছিলো, শেষপর্যন্ত তিনি তার জীবনের মর্মানিত্ক অপচয় সম্বন্ধে সজাগ হয়ে উঠেছেন। এককালে তাঁর যে মুখমণ্ডল ছিলো এতোটা দৃঢ় এবং জীবন্ত, তাই হয়ে উঠেছিলেঅ তিক্ততাব্যঞ্জক এবৃং নিস্পৃহ। তিনি নিজের সম্পর্কে কথা বলেছিলেন- মনে হলো, তিনি যেনো এমন কিছু সম্পর্কে কথা বলছেন, ইতিমধ্যেই যার মৃত্যু হয়েছে এবং যাকে কবরও দেওয়া হয়ে গেছে, যাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়!]
তিন
যেদিন সকালে আমি হাইল ত্যাগ করি সেদিন আমার ঘুম ভাঙলো এক উচ্চগ্রামের সংগীতের মধ্যে যা বেয় আসছিলো আমার দুর্গ প্রকোষ্ঠের খোলা জানালার ভেতর দিয়েঃ এমন এক গান, একন এক কিচির-মিচির, এমন এলাপাতাড়ি অপটু বাজনা, যেনো একটি জমকালো অপেরা শুরু করার আগে শত শত বীণাযন্ত্র এবং বাঁশরীতে সুর তোলা হচ্ছেঃ সেই বহু রাগবিশিষ্ট পৃথক পৃথক সুরের সংক্ষিপ্ত বেসুরো তাল, যা সংখ্যায় এতো বেশি এব্ং এতো নিয়ন্ত্রিত বলেই মনে হয়- যেনো এক রহস্যময়, প্রায় ভৌতিক সুরের ঐকতান জাগিয়ে তুলেছে।…. কিন্তু নিশ্চয়ই এটি একটি বিশাল অর্কেস্ট্র, আর সে কারণেই এ থেকে যে ধ্বনিতরংগ জাগছে, সেগুলি এতো প্রবল…।
আমি যখন জানালায় গিয়ে দাঁড়াই এবং বাইরের দিকে তাকাই- জনশূণ্য বাজারের উপর এবং বাজার ছাড়িয়ে শহরের মৃত্তিকা ধূসর ঘর-বাড়িগুলোর উপর ক্রমে ফুটে-ওঠা ভোরের ধূসরতার দিকে, তাকাই পাহাড়গুলির তলদেশের দিকে, যেখানে জন্মায় ঝাউ ও সারি সারি খেজুর গাছ- আমি তখন বুঝতে পারলাম এ হচ্ছে বাগানের মধ্যকার পানি তোলার ইদরার সংগীত- যে ইদরাগুলি সংখ্যায় শত শত হবে, সবেমাত্র শুরু হচ্ছে তাদের দিনের কাজ। মস্ত বড়ো বড়ো মশকে করে টেনে টেনে পানি তুলছৈ উটগুলি, পানি টানার রশিগুলি এবড়ো-থেবড়োভাবে তৈরি কাঠের কপিকালের উপর দিয়ে টানা হচ্ছে এবং প্রত্যেকটি কপিকল ঘষা খাচ্ছে তার কাঠের অক্ষদণ্ডটির সাথে আর গান গাইছে, বাঁশী বাজাচ্ছে, ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করছে এবং শোঁ শোঁ করছে বহু সংখ্যক উঁচু এবং নিচু সুরে, যতক্ষণ না রশিটির পাক সম্পূর্ণ খুলে গেছে এবং কপিকলটি থেমেছে; সংগে সংগে ওঠে একটি প্রচণ্ড ধ্বনি, যেনো একটি চিৎকার আর সেই চিৎকার ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় রশিগুলির দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে, যার সংগে এখন প্রবলভাবে মিশেছে কাঠের গামলার দিকে ধাবমান পানির দ্রুত বেগ;দ তারপর উটটি আবার মুখ ফেরায় এবং মন্হর গতিতে ফিরে যায় কুয়াটিতে আর আবার কপিকলটি সৃষ্টি করে চলে সংগীত, তখন রশিগুলি তার উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে নামে এবং মশকটি নেমে ডুব দেয় ইদরার ভেতরে।
ইদারার সংখ্যঅ এতো বেশি বলেই মুহূর্তের জন্যও এ সংগীতের বিরতি নেই; বিভিন্ন তার কখনো এক সুরে মিলে যায়, আবার কখনো আলাদা হয়ে যায়; কোন কোন সুর যখন শুরু হয় নতুন প্রাণোন্মাদনা নিয়ে, অন্য সব সুর তখন ধীরে ধীর হারিয়ে যায়। অবোধ্য ছন্দের একেকটি গোটা ফোয়ারা যেনো প্রবাহিত হচ্ছে একই সংগে এবং একে অপর থেকে আলাদা হয়ে গর্জন করে ক্যাঁচকোঁচ ধ্বনি তুলে শিস দিয়ে, গান গেয়ে গেয়ে- কী চমৎকার! কী মহৎ এক অর্কেষ্ট্রা! এই ঐকতান মানুষের পরিকল্পনার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়নি এবং সে কারণে এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্ব প্রকৃতির শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্তেরই প্রায় কাছাকাছি- যে প্রকৃতির ইচ্ছা অজ্ঞেয় ও অভেদ্য।
মধ্যপথ
এক
আমরা হাইল ত্যাগ করেছি এবং উটের উপর সওয়ার হয়ে মদীনার দিকে চলেছিঃ আমরা এখন তিনজন,কারণ ইবনে মুসাদের একজন লোক, মনসুর আল-আসসাফ, এখন আমাদের যাত্রাপথের একটি অংশে আমাদের সংগে চলেছে ‘আমীরে’র এক আদেশ নিয়ে।
মনসুর এতোই সুন্দর যে, পাশ্চাত্য কোন নগরীর কোন রাস্তায় বের হলে তাকে দেখবার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠতো সকল রমণী। সে খুবই লম্বা, মুখমন্ডল মজবুত, বীরত্বব্যঞ্জক, আর তার মুখাবয়ব বিস্ময়কর রূপে মসৃণ। তার গায়ের চামড়া সাদাটে বাদামী রঙের যা আরবদের মধ্যে সদ্বংশে জন্মগ্রহণ করার একটি অভ্রান্ত লক্ষণ; তার কালো চোখ দু’টি সুগঠিত, ভুরু জোড়ার নিচে থেকে দুনিয়াকে নিরীক্ষণ করে আগ্রহের সাথে। তার মধ্যে জায়েদের কমনীয়তা অথবা প্রশাস্ত নিরাসক্তির কিছুই নেই; তার মুখের রেখাগুলি থেকে বোঝা যায়, মনসুর প্রচণ্ড- অথচ শাসনে-রাখা প্রবৃত্তির অধিকারী, রেখাগুলি তার চেহারায় এমনি একটি বিষণ্নতা এনে দিয়েছে যা আমার শাম্মার দোস্তের স্নিগ্ধ গাম্ভীর্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তবে জায়েদের মতোই মনসুরও দুনিয়ার অনেক কিছু দেখেছে এবং তার সহবত সত্যই আনন্দদায়ক।
আমরা নুফুদের বালুমাটির জায়গায় এখন যে ধূসর এবং হলদে কংকরময় স্থানে এসে পৌঁছেছি, সেখানে দেখতে পাচ্চি, নানা রকম ছোট ছোট জীব-জানোয়ার, যারা কি না ভরে রেখেছে স্থানটিকেঃ ক্ষুদ্র ধুসর গিরগিটিগুলি এক অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে আমাদের উটের পায়ের ফাঁক দিয়ে এঁকেবেকে ছুটি গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে একটি কাঁটা গুল্মের নিচে আর জ্বলন্ত চোখ মেলে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে যখন আমরা সেগুলিকে পাশে রেখে আগিয়ে চলেছি, দেখতে পাচ্ছি ছোট্ট ধুসর ফোলা ফোলা মোটা লেজওয়ালা মেটো ইঁদুর, দেখতে অনৈকটা কাঠবিড়ালীর মতো, আর এদেরই স্বগোত্রীয় মারমথ, যার গোশত নযদী বেদুঈনের নিকট খুবই প্রিয়, আজতক আমি অতিমাত্রায় মোলায়েম যেসব সুস্বাদু খাদ্যের স্বাদ গ্রহণ করেছি, এর গোশত তারি অন্যতম। এ ছাড়া রয়েছে এক ফুট লম্বা হালাল এক ধরনের সরীসৃপ, যাকে বলা হয় ‘দাব’- এই প্রাণীটি জীবন ধারণ করে লতাগুল্মের মূল খেয়ে এবং এর গোশতের স্বাদ মোরগ এবং মাছের মাঝামাঝি। আমরা দেখতে পাই- ছোট্ট মুরগীর ডিমের আকারের চতুষ্পদী গোবরে পোকা মর্মস্পশী ধৈর্যের সংগে একদলা শুকনা উটের লাদ গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে; সামনের পায়ের উপর শরীরের ভর রেখে পিছনের মজবুত উটের পাগুলি দিয়ে দলটিকে ঠেলছে পেছনদি। আর এভাবে খুঁজে পাওয়া মহামূল্য বস্তুটিকে গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওদের আবাস গৃহের দিকে অত্যন্ত কষ্টের সংগে এবং যখনই কোন নুড়ি পাথর ওদের পথ রুদ্ধ করছে, ওরা চিৎ হড়ে পড়ছে মাটির উপর, আর অনেক কষ্টের সাথে গড়াগড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, এভাবে তাদের আয়ত্তাধীন বস্তুটিকে গড়িয়ে নিয়ে যায় আরো কয়েক ইঞ্চি সামনে, আবার চিৎ হড়ে পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায় এবং কাজে লেগে যায়, ক্লান্তিহীন শ্রান্তিহীন… কখনো বা ধূসর খরগোশ ধুসর ঝোপ-ঝাড়ের নিচে থেকে লম্বা ধাপ ফেলে আগিয়ে যায়। একবার আমরা দেখতে পেলাম কয়েকটি হরিণ, কিন্তু অতো দূরে যে, গুলী করা সম্ভব হলো না; দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী নীল ধূসর ছায়ার ভেতরে হারিয়ে গেলো ওরা।
-‘হে মুহাম্মদ, আপনি আমাকে বলূন’ জিজ্ঞাস করে মনসূর, ‘আপনি কেমন করে আরবদের মধ্যে আপনার স্থাপন করে নিলেন? এবং কেমন করেই বা আপনি কবুল করলেন ইসলাম?’
-‘তা কেমন করে ঘটলো, বলছি,’ মাঝপথে বলে ওঠে জায়েদ- প্রথম তিনি আরবদের ভালোবেসে ফেলেছিলেন এবং ওদের ভালোবেসে ওদের ধর্মকেও ভালোবেসে ফেলেন। চাচা, আমি কি ঠিক বলিনি?’
-‘জায়েদ যা বলেছে, তা সত্য মনসুর। বহু বছর আগে আমি যখন আরব ভুমিতে আসি তখন আমি তোমাদের জীবন পদ্ধতিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। এবং যখন আমি নিজেকেই জিজ্ঞাস করতে লাগলাম, তোমরা কী ভাবো এবং তোমরা কী বিশ্বাস করো, তখন আমি জানতে পারলাম ইসলাম কী’!
-‘কিন্তু, হে মুহাম্মদ, আপনি কি হঠাৎ বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর সত্যিকার কালাম?”
-‘না, তা নয়, এতো তাড়াতাড়ি এ উপলব্ধি হয়নি। আমি তো তখন বিশ্বাসই করতাম না যে, আল্লাহ মানুষের সাথে প্রত্যক্ষ কথা বলেছেন, অথবা যে কিতাবগুলিকে মানুষ তাঁর কালাম বলে দাবি করে সেগুলি জ্ঞানী মানুষের পুস্তক ছাড়া আর কিছু….’।
মনসুর আমার দিকে তাকায় চরম অবিশ্বাসের সংগেঃ ‘তা কি করে হতে পারে মুহাম্মদ? আপনি কি কখনো মূসা যে-কিতাব এনেছিলেন তাতেও, কিংবা হযরত ঈসার শিক্ষাতেও বিশ্বাস স্থাপন করেননি? কিন্তু আমি তো সবসময় ভেবেছি পশ্চিমের লোকেরা আর যাই-হোক, এগুলি বিশ্বাস করে’।
-‘কেউ কেউ করে, মনসুর এবং অন্যরা করে না, আর আমি ছিলাম এই অন্যদেরই একজন…..’।
এবং আমি তাকে বোঝাই যে, অনেককাল ধরে পশ্চিমের দিকে অনেক লোক তাদের নিজেদের কিতাবকে এবং তার সংগে অপর কারো ধর্মগ্রন্হকে আর আল্লাহর সত্যিকার ওহী বা প্রত্যাদেশ মনে করে না। বরঞ্চ ওগুলির মধ্যে ওরা দেখতে পায় বহু বহু যুগের পরিক্রমায় বিকশিত মানুষের ধর্মীয় আশা-আকাংখার ইতিহাস।
-‘কিন্তু ইসলামের সংগে কিছুটা পরিচিত হওয়ার সংগে সংগে ভীষণ একটা হোঁচট খায় আমার এই দৃষ্টিভংগি’, আমার কথার জের টেনে আমি বলি, ‘আমার এই পরিচয় হয় তখন যখন আমি দেখতে পেলাম ইউরোপীয়দের মতো যা’ মানুষের জীবন-পদ্ধতি হওয়া উচিত মুসলমানদের জীবন-ধারনের রীতিনীতি তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; এবং যখনি ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে আমি আরো বেশি কিছু শিখতে লাগলাম প্রত্যেকবারই আমার মনে হলো যেনো এমন কিছু আবিষ্কার করেছি যা আমি না জেনেও সবসময় জানতাম….’।
এবং এভাবে আমি মনসুরকে বলে চলি মধ্যপ্রাচ্যে আমার পয়লা সফরের কথা—কেমন করে আমি সিনাই মরুভূমিতে হাসিল করেছিলাম আরবদের সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা, সে কথা; ফিলিস্থিনে, মিসরে, ট্রান্সজর্ডান ও সিরিয়াতে আমি কী দেখছি, কী অনুভব করেছি, সে কাহিনী; কেমন ক’রে দামেশকে আমি পয়লা এই পূর্বাভাস পাই যে, তখনো অকল্পিত এক সত্যের পথ, ধীরে ধীরে উদঘাটিত হচ্ছে আমার সামনে এবং কেমন করে তুরস্ক সফরের পর ফিরে গিয়েছিলাম ইউরোপে এবং বুঝতে পেরেছিলাম, পশ্চিমা জগতে আবার নতুন করে বাস করা আমার পক্ষে কঠিন; কারণ একদিকে…আরব জাতিসমূহ এবং তাদের সংস্কৃতি সংগে আমার প্রথম পরিচয় মধ্যে যে এক বিস্ময়কর অস্বস্তির জন্ম দিয়েছিলো তার গভীরতো তাৎপর্য উপলব্ধির জন্যে আমি ব্যগ্র ছিলাম এ আশায় যে, এতে করে আমি নিজে জীবন থেকে যা প্রত্যাশা করি তা আরো নিবিড় করে বোঝার জন্যে তা হবে সহায়ক, অন্যদিাকে, আমি তখন এমন একটা বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছেছি যেখানে আমার নিকট এ সত্য ক্রমেই স্পষ্টতরো হয়ে উঠেছিলো যে, পাশ্চাত্য সমাজের আশা–আকাংখার ও লক্ষ্যের সংগে নিজেকে আর কখনো আমি এক করে দেখতে পারবো না।
১৯২৪ সালের বসন্তকালে ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’ আমাকে দ্বিতীয়বারের মতো পাঠায় মধ্যপ্রাচ্যে। আমার আগেকার সফরগুলি বর্ণনা করে আমি যে বই লিখতে শুরু করেছিলাম শেষপর্যন্ত তা সম্পূর্ণ হয়েছিলে। (আমি মধ্যেপ্রচ্যের পথে রওনা করার কয়েক মাস পরেই Unromantisches Morgenland–এর নামে বইটি ছাপা হয়। এই নামকরণের দ্বারা বুঝতে চেয়েছিলাম, বইটি মুসলিম প্রাচ্যের বহিরাংগের রোমান্টিক বিজাতীয় চিত্র নয়, বরং এটি তার দৈনন্দিন জীবানের বাস্তব সত্যগুলির মর্মস্থলে পৌঁছুনোরই একটি প্রয়াস। যদিও বইটির জিওনিষ্ট–বিরোধী মনোভাব এবং আরবদের জন্যে অস্বাভাবিক প্রীতী জার্মান পত্র পত্রিকায় বেশ কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিলো, তবু আমার ধারণা, বইটি খুব বেশি কাটেনি।
আবার আমি ভুমধ্যসাগর পাড়ি দিই। সম্মুখে দেখতে পেলাম মিসরের উপকূল–ভাগ। পোর্ট সৈয়দ থেকে কায়রো পর্যন্ত ট্রেনে ভ্রমণ একটা পরিচিতি বইয়র পাতা উল্টানোর মতোই মনে হলো। সুয়েজ খাল এবং মানজালা হ্রদের মাঝখানে মিসরের অপরাহ্ণ উন্নোচিত করেছে তার স্বরূপ। বুনো হাঁস পানিতে সাঁতার কাটছে এবং ঝাউ গাছগুলি নাড়ছে তাদের সুন্দর অর্ধবৃত্তাকার শাখাপুঞ্জ। সমতল অঞ্চলে জেগে উঠছে গ্রামের পর গ্রাম–যা প্রথমে ছিলো বালুকাময় আর কোথাও বা তৃণলতায় ঢাকা। বসন্তকালের জমিতে অলসভাবে পা ফেলতে ফেলতে লাঙল টেনে চলেছে, লম্বা লম্বা ধাপে, কসস মাথায়, হাত, দু’বা্র দু’পাশে ছেড়ে দিয়ে, তখন আমি নিজেকে বললাম সারা বিশ্বে কোন কিছুই—সবচেয়ে নিখুঁত গাড়ি, অথবা সবচেয়ে গর্বের বস্তু পুল, কিংবা সবচেয়ে ভাবগর্ভ কোন বই–পারে না প্রতীচ্যে হারিয়ে যাওয়া প্রাচ্য ইতিমধ্যেই বিপন্ন হয়ে পড়া এই শ্রেণীর স্থান পূরণ করতে যে–শ্রী মানুষের আসল সত্তা এবং তার চারদিকে পৃথিবীর মধ্যে এক যাদুগরী সুরসংগতির অভিব্যক্তি ছাড়া কিছু নয়…।
এবার আমি ভ্রমণ করছিলাম প্রথম শ্রেণীতে। আমি ছাড়া আমার কম্পার্টমেন্টে ছিলো আর মাত্র দু’জন লোক, আলেকজেন্দ্রিয়ার এক গ্রীক ব্যবসায়ী–ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলের সকল বাসিন্দার মধ্যে সহজ আলাপ জমানোর যে বৈশিষ্ট্যটি দেখা যায় সেই বৈশিষ্ট্য নিয়ে সে আমাকে অতি অল্প সমেয়েই এক উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনায় জড়িয়ে ফেলে, আমরা যা কিছু দেখছিলাম তারি উপর সে করে চলছিলো চটুল রসিক মন্তব্যঃ এবং একজন মিসরীয় ‘উম্দা’ অর্থাৎ গ্রাম্য সর্দার –তার দামী রেশমের কাফতান এবং তার স্কার্ফের ভিতর থেকে বেরিযে থাকা ঘড়ির পুরু সোনার চেন দেখে স্পষ্টই যাকে একজন ধনী ব্যক্তি বলে মনে হয়, বোঝা গেল, সে যে একেবারে গন্ডমূর্খ তাতেই সে খুশি! বলতে কি, আমদের সংগে আলাপে যোগ দেয়ার সত্ত্বেও আলোচনার মধ্যে সেও তার তীক্ষ কান্ডজ্ঞানের পরিচয় দেয় এবং গ্রীক সওদাগরটির সংগে তর্ক– যুদ্ধে নৈপুণ্যের প্রমাণ দেয় বার বার।
আমার মনে আছে, আমরা আলাপ করছিলাম ইসলামের এমন ক’টি সামাজিক মূলনীতি নিায়ে যা সে –সময়ে আমার চিন্তাধারাকে অধিকার করে রেখেছিলো প্রবলভাবে। ইসলামী আইনের সামাজিক ইনসাফের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ প্রশংসার সাথে আমার গ্রীক সহযাত্রীটি পুরাপুরি একমত হতে পারছিলো না।
–‘আপনি একে যত ইনসাফসম্মত মনে করছেন, আসলে তা তেমন ইনসাফসম্মত নয় বন্ধু!’ –আমরা ইতিমধ্যেই ফরাসী ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছি। আমাদের মিসরীয় সহযাত্রীটির সুবিধার জন্য আবার আরবী ভাষায় ফিরে এসে গ্রীক বন্ধুটি আমাকে লক্ষ্য করে বলে, ‘তোমরা বলে থাকো, তোমাদের ধর্ম খুবই ইনসাফের ধর্ম। তুমি তা’হলে বলতে পারো কেন ইসলাম মুসলমান পুরষকে খৃষ্টান অথবা ইহুদী মেয়ে শাদি করার অনুমতি দেয় অথচ তাদের মেয়ে ও বোনদেরকে কোন খৃষ্টান অথবা ইহুদী পুরুষের নিকট শাদি দিতে রাযী হয় না? তুমি কি একে ইনসাফ বলতে চাও, আ্যঁ?
–‘নিশ্চয়’, মূহুর্তের জন্য ইতস্তত না করে জমকালো পোষাক–পরা উম্মাদটি বলে, ‘শোনো! তোমাকে বলছি, কেন আমদের ধর্মীয় বিধানে এ ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা, মুসলমানরা, বিশ্বাস করি না যে, ঈসা–তাঁর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক–আল্লাহ পুত্র ছিলেন। তবে আমরা মনে করি যে. তিনি আল্লাহর একজন সত্যিকার নবী ছিলেন। যেমন আমরা মনে করি মূসা, ইবরাহীম এবং বাইবেলে উল্লিখিত অন্য সকলেই নবী ছিলেন। শেস নবী হযরত মুহাম্মদ কে যেভাবে পাঠানো হয়েছিলো, সেভাবেই সকল নবীকেও পাঠানা হয়েছিলো, সেভাবেই সকল নবীকে ও পাঠানো হয়েছিলো মানবজাতির নিকট। কাজেই, যদি কোন ইহুদী বা খৃষ্টান বালিকা কোন মুসলমান পুরুষকে বিয়ে করে, সি নিশ্চিত থাকতে পারে তার নিকট যে–সব ব্যক্তি পবিত্র, তার নতুন পরিবারে তাঁদের কারো প্রতি কোনো অশ্রদ্ধেয় উক্তি করা হবেনা; অথচ এ কথা নিশ্চিত যে, যদি কোন মুসলিম বালিকা কোন অমুসলিমকে বিয়ে করে, তাহলে যাকে সে আল্লাহর রসূল বলে বিশ্বাস করে তাঁকে অবমাননা করে হবে…এমনিকি তার নিজের সন্তানরাও তাঁর অবমাননা করতে পারে, কারণ এটি সত্য নয় যে, সন্তানেরা সাধারণত পিতার ধর্মই অনুসরণ করে! তুমি কি মনে করো একটি মুসলিমা বালিকাকে এ ধরণের যন্ত্রণা এবং অবমাননার দিকে ঠেলে দেওয়া ইনসাফ হবে?’
গ্রীক বৃদ্ধটির অসহায়ভঅবে তার কাঁধ ঝাঁকুনি দিলে; কিন্তু কোনা জবাব খুঁজে পেলো না। আমার মনে হলো, এই সরল নিরক্ষর ‘উম্মাদটি’ , তার নিজের জাতি যে–বিশেষ কান্ডজ্ঞানের অধিকারী তারই সাহায্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের একেবারে মর্মমূল স্পর্শ করেছে এবং দ্বিতীয়বারের মতো আমি, যেমনটি ঘটেছিলে জেরুযালেমের সেই বৃদ্ধ ‘হাজী’র বেলায়, উপলব্ধি করলাম, ইসলামের দিকে একটি নতুন দরজা যেনো খুলে দেওয়া হচ্ছে আমর জন্য।
আমার পরিবর্তিত আর্থিক অবস্থায় এখন আমি কায়রোতে এমন একটি স্টাইলে জীবন–যাপন করতে সক্ষম, যা কয়েক মাস আগে আমার পক্ষে ছিলো অচিন্ত্যনীয়। এখন আর আমাকে সিকি–আনি গুণতে হয় না। এই শহরে প্রথম বসবাসকালে যখন আমাকে জীবন ধারণ করতে হতো পাউরুটি, জলপাই আর দুধের উপর, সে সময়ে কথা ভূলে গেলাম। কিন্তু এক ব্যাপারে আমি আমার অতীতের ‘ঐতিহ্য’ বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখিঃ কায়রোর কোনো জৌলুসপূর্ণ এলাকায় না থেকে আমি আমার পুরানো বান্ধবী, ত্রিয়েস্তের সেই স্থুলাংগী রমণিীটির বাড়িতেই কয়েকটি কামড়া ভাড়া করি। মহিলাটি আমাকে পেয়ে দু’হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করেন এবং আমার দুই গালে মায়ের স্নেহে চুমু খান।
আমর এখানে আসার তৃতীয় দিনে, সূর্য যখন অস্ত যাচ্ছিলো, আমি শুনতে পেলাম দুর্গ থেকে কামানের চাপা আওয়াজ। সেই মূহুর্তে কিল্লার মসজিদে দু’পাশ থেকে আকাশের দিকে উঠে–যাওয়া দু’টি মিনারের সর্বোচ্চ গ্যালরীতে লাফিয়ে উঠলো একটি আলোর বৃত্ত এবং নগরীর সব ক’টি মসজিদের মিনার একই ধরণের আলোকমালায় শোভিত হয়ে উঠলো, আর প্রত্যেকটি মিনারের উপর একই রূপ আলোর বৃত্ত ফুটে উঠলো। পুরনো কায়রোর ভেতর দিয়ে এক বিস্ময়কর গতি–চাঞ্চল্য প্রবাহিত হলো–নগরীর মানুষের পদক্ষেপ দ্রুততরো এবং যুগপৎ অধিকতরো আনন্দ–চঞ্চল হয়ে উঠলো এবং উচ্চতরো হয়ে উঠলো রাস্তার বহু বিচিত্র ধ্বনিঃ আপনি অনুভব করছেন এবং প্রয় শুনতে পাচ্ছেন সর্বত্র একটি নতুন উত্তেজনার তরংগধ্বনি!
এবং সবকিছুই ঘটলো এ কারণে যে, দ্বিতীয়বার চাঁদ ঘোষণা করেছে নতুন মাসের আগমনবার্তা (কারণ ইসলামী পঞ্জিকা চলে চন্দ্র মাস আর সনের হিসেবে) এবং মাসটি হচ্ছে রমযান মাস, ইসলামী সনের সবচেয়ে গাম্ভীর্য ও গুরুত্বপূর্ণ মাস। এই মাস স্মরণ করিায়ে দেয় তেরশো বছরেরও আগের সে সময়ের কথা যখন ইতিহাসের বর্ণনা মতে, রসুলুল্লাহ পেয়েছিলেন আল–কুরআনের প্রথম ওহী। প্রত্যেক মুসলিম এ মাসে কঠোরভাবে সিয়াম পালন করবে–এই হচ্ছে বিধান; যারা অসুস্থ তারা ছাড়া নারী–পুরুষ সকলের জন্যেই খানাপিনা (এমন কি ধুমপানও) নিষিদ্ধ, সুবেহ সাদেকের আগে পূর্ব দিগন্তে যে আলোর রেখা দেখা যায় সেই মূহুর্ত থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দীর্ঘ ত্রিশ দিনের জন্য। এ ত্রিশ দিন কায়রোর লোকেরা চলাফেরা করে চোখে এমন উজ্জ্বলতা নিয়ে যে, যেনো ওরা উন্নীত হয়েছে এক পবিত্র এলাকায়। ত্রিশ রাত ধরে আপনি শুনতে পাবেন কামানের আওয়াজ, সংগীতের সুর এবং আনন্দ কোলাহল, যখন মসজিদগুলি আলোকে ঝলমল করছে দিনের আগমন পর্যন্ত।
জানতে পারলাম রমযানের এই মাসের উদ্দেশ্য হচ্ছে দু’টিঃ আপনাকে খাদ্য ও পানি বর্জন করতে হবে এই উদ্দেশ্যে যে, আপনিও যেনো আপনার নিজের শরীরে অনুভব করতে পারেন দরিদ্র এবং বুভুক্ষরা যা অনুভব করে। এভাবে মানুষের চেতনায় সামাজিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে একটি ধর্মীয় মৌলিক নীতির উপর।
রমযান মাসে রোযা আর একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবনে নিজে নিজে শৃংখলা মেনে চলার অভ্যাস–যা কিনা যুক্তিগত নৈতিকতার একটি দিক, যে নৈতিকতাকে ইসলামের সকল শিক্ষার মাধ্যই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে (যেমন, সকল প্রকার মাদক দ্রব্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে, কারণ ইসলাম মনে করে মাদক দ্রব্য হচ্ছে চৈতন্য ও দায়িত্ববোধ থেকে নিস্কৃতি পাবার অতি সহজ এক উপায়)। এ দু’টি উপাদানের মধ্যে অর্থাৎ মানুসের ভ্রাতৃত্ব এবং ব্যাক্তির স্ব–আরোপিত নিয়মানুবর্তিতায় ইসলামের নৈতিক দৃষ্টিভংগির রূপরেখা আমার কাছে ধীরে ধীরে স্পস্ট হয়ে উঠতে শুরু করলো।
ইসলামের প্রকৃত অর্থ কী এবং ইসলাম কী চায়, তার একটা পূর্ণতরো চিত্র পাবার প্রয়াসে আমি, কায়রোর কোনো কোনো মুসলিম বন্ধু যেসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিতে পেরেছিলেন তার দ্বারা প্রচুর উপকৃত হই। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু স্থানের অধিকারী হচ্ছেন শায়খ মোস্তফা আলা মারাঘি সে সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ইসলামী পন্ডিতদের অন্যতম এবং সন্দেহতীতভাবেই আল–আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আলিমদের’ মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাধর (কয়েক বছর পার তিনি আল–আজহারের রেকটর হয়েছিলেন)। খুব সম্ভব তখন তাঁর বয়স ছিলো চল্লিশ এবং পঞ্চাশের মাঝামাঝি, কিন্তু তাঁর মজবু পেশীবহুল দেহে ছিলো কুড়ি বছরের তরুনের তৎপরতা ও প্রাণশক্তি। তাঁর পান্ডিত্য ও গাম্ভীর্য সত্ত্বে ও মূহুর্তের জন্যও কখনো তিনি তাঁর রসবোধ হারাননি। তিনি ছিলেন মিসরের মহান সংস্কারক মুহাম্দ আবদুহুর একজন ছাত্র এবং তাঁর যৌবন–কালের অনুপ্রেরণার উৎস, অগ্নিপুরুষ জামালউদ্দীন আল আফগানীর সহচর্য লাভে ধন্য শায়খ আল–মারাঘি নিজেও ছিলেন একজন তীক্ষ্মধী বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন চিন্তবিধ। তিনি একথা বোঝাতে কখনোই ভুলতেন না যে, সাম্প্রতিককালের মুসলমানরা তাদের ধর্মের আদর্শ থেকে সত্যি অনেক দূরে সরে পড়েছে এবং আজকের মুসলমানের জীবন ও চিন্তার মাপকাঠিতে মুহাম্মদের শিক্ষার সম্ভাবনাগুলির পরিমাপ করার চাইতে বাড় আর কিছু হতে পারে না।
‘ঠিক যেমন, ভূল হবে, ‘তিনি বলতেন, ‘খৃষ্টানদের একে অপরের প্রতি প্রেমহীন আচরণের মধ্যে হযরত ঈসার প্রেমের বাণীর অস্বীকৃতি দেখা…।
এ সতর্কবাণীর সংগে শায়খ আল–মারাঘি আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন আল আজহারের সংগে।
কায়রোর সবচেয়ে পুরানো বাজার মৌস্কি স্ক্রীটের ভীড়ের হট্টাগোল থেকে বের হয়ে আমরা পৌঁছুই একটি ছোট্ট নির্জন দূরবর্তী স্কোয়ারে–যার একটি দিক হচ্ছে, আল –আযহার, মসজিদের সরল প্রশস্ত সম্মুখভাগ। একটি দোপাল্লার গেট এবং ছায়া –ঢাকা প্রাংগনের ভেতর দিয়ে আমরা খাস মসজিদের চত্বরে প্রবেশ করি। একটি বৃহৎ চতুর্ভূজ, যা বহু পুরানো মেহরাব আর্কেড দ্বারা বেষ্টিত। মাথায় পাগড়ী পরা, লম্বা কালো রঙে ‘জোব্বা’ গায়ে, ছাত্ররা বসে আছে মাদুরের উপর আর নীচু স্বরে পড়ছে তাদের এই পুস্তকক এবং পান্ডুলিপি। সামনে, মসজিদের বৃহৎ ছাদ–ঢাকা মিলনায়তনে লেকচার দেওয়া হচ্ছে। কয়েকজন ওস্তাদও বসে আছেন খড়ের মাদুরের উপর, স্তম্ভের নিচে, লম্বা সারিগুলি ধরে হল ঘরটিকি ছেদ করেছে, আর প্রত্যেক ওস্তাদের সামনে অর্ধবৃত্তাকারে হাঁটু গেড়ে বসেছে এক দল শিক্ষার্থী। অধ্যাপক তাঁর স্বর একবার ও উচু করেন না, ফলে, তাঁর উচ্চারিত কোনো শব্দই যাতে মিস না হয় সেজন্য দরকার হয় প্রচুর মনেোযোগ এবং অভিনিবেশের। যে কোন ব্যক্তির পক্ষেই এ চিন্তা স্বাভাবিক যে, এ ধরণের অভিনিবেশ সত্যিকার পান্ডিত্যের সহায়ক না হয়ে পারে না। কিন্তু শায়খ আল—মারাঘি শিগগিরিই আমার সে ভূল ধারণা ভেঙ্গে চুরমার করে দিলেন।
–‘আপনি ঐ ‘পন্ডিতদেরকে’ দেখতে পাচ্ছেন? তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘ওরা হচ্ছে ভারতের সেই পবিত্র গাভীদের মতো, যে গাভী, আমি শুনেছি রাস্তার উপর যেতো ছাপা কাগজ পায়, সবই খেয়ে ফেলে।…হ্যাঁ, যে সব বই শত শত বছর আগে লেখা হয়েছে সে সবের মুদ্রিত পৃষ্ঠাগুলি ওরা গোগ্রাসে গিলতে থাকে, কিন্তু কখনো হজম করে না। ওরা আজ আর চিন্তা করে না নিজেরা। ওরা পড়ে আর পুনরাবৃত্তি করে, পড়ে আর পুনরাবৃত্তি করতেই শেশে, পুরুষের পর পুরুষ ধরে ।’
‘কিন্তু শায়খ মুস্তাফা’ আমি মাঝখানে প্রশ্ন করি, ‘আর যা–ই হোক, আল আজহার তো ইসলামী শিক্ষার মূল কেন্দ্র এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। মুসলমানদের তামদ্দুনিক ইতিহাসের প্রায় প্রতি পৃষ্ঠায় এর নামের সাক্ষাৎ পাই। গত দশ শতকে এই বিশ্ববিদ্যালয় যেসব চিন্তাবিদ, ধর্মতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবেত্তা, দার্শনিক ও গণিতবিদের জন্ম দিয়েছে তাঁদের সম্বর্কে আপনি কি বলেন?
–‘কিন্তু কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই আল–আজহার আর এ ধরণের মনীষীদের জন্ম দিচ্ছে না’। শায়খ দুঃখ করে বলেন, ‘তা–ও হয়তো পুরাপুরি সত্য নয়; হাল আমলেও কখনো কখনো কোনো কোনো স্বাধীন চিন্তাবিদের অভ্যূদয় হয়েছে আল–আজহার থেকে। কিন্তু মোটামুটি একথা সত্য যে, গোটা মুসলিম –জাহান যে বন্ধাত্বে ভুগছে আল—আজহারও সেই বন্ধ্যাত্বের শিকার হয়েছে, আর এর সেকালের উদ্যোগ অনুপ্রেরণা এখন নির্বাপিত ছাড়া আর কিছু নয়। আপনি যেসব প্রচীন মুসলিম চিন্তাবিদের কথাতদ উল্লেখ করলেন তাঁরা স্বপ্নেও কখনো একথা ভাবেননি যে, বহু শতাব্দী পর তাঁদের চিন্তার ধারাবাহিকতা বজায় না রেবেও তার বিকাশ সাধন না করে, শুধু বার বার ঘুরে ফিরে তার পুনরাবৃত্তি করা হবে, যেনো সেগুলি পরম ও অভ্রান্ত সত্য! যদি আমরা পরিবর্তরন চাই ভালোর দিকে, তা’হলে আমাদের বর্তমান চিন্তানুকরণের পরিবর্তে ‘চিন্তাশীতাকে করতে হবে উৎসাহিত….।
আল –আজহারের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে শায়খ আল—মারাঘির এই তীক্ষ্ম মন্তব্য, আপনি মুসলিম জাহানের সর্ব্রত্র যে সাংস্কৃতিক ক্ষয়িষ্ণুতার মুখামুখি হবেন তার গভীরতম কারণগুলির অন্যতম কারণটি বুঝতে আমকে সাহায্য করে। জ্ঞানের ক্ষেত্রে এই প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জড়ত্ব–প্রাপ্তটি কি বিভিন্ন মাত্রায় প্রতিবিম্বিত নয় মুসলমানদের বর্তমানের সামাজিক বন্ধ্যাত্বেো? এই মানসিক জড়ত্বেরই আরেকটি রূপ কি আমরা দেখতে পাই না, নিস্ক্রিয়তার সংগে প্রায় অলসভাবে সেই অনাবশ্যক দারিদ্রকে স্বীকারক করে নেওয়াতে যার মধ্যে বহু মুসলমান বাস করছে? যেসব সামাজিক অন্যায় তাদের উপর অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেগুলি মুখ বুঁজে বরদাশত করার মধ্যে।
এবং তাহলে কি এ খুবই বিস্ময়কর, আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, মুসলমানদের অবক্ষয়ের এমন সব বাস্তব প্রমাণদিতে মজবুত হয়েই প্রতীচ্যে এতো সব ভুল ধারণার উদ্ভব হয়েছে? ইসলাম সম্বন্ধে প্রতীচ্যের জন–সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সংক্ষেপে বর্ণনা করা যায় এভাবেঃ মুসলমানদের পতনের প্রধান কারণই হচ্ছে ইসলাম, যা খৃষ্ট বা ইহুদী ধর্মের সাথে তুলনীয় একটিক ধর্মীয় আদর্শ হওয়া তো দূরের কথা, বরং এ হচ্ছে এক গলি মিশ্রণ, মরুভূমিসুলব অন্ধত্ব, স্থূলি ইন্দ্রিয়পয়ণতা, কুসংস্কার আর বোবা অদৃ্ষ্টবাদ, যা উন্নততরো মহত্তরো সামাজিক অবস্থার দিকে মানব জাতির যে অভিযান চলছে তাতে ইসলামের অনুসারীদেকে শরীক হতে বাধা দেয়; ইসলাম মানব–মনকে সংস্কার অথবা জিজ্ঞাসা–বিরুদ্ধতা থেকে মুক্ত তো করেই না, বরং এই বিরুদ্ধতাকে আরো মজবুত করে থকে। তাই যতো জলদি জলদি মুস্যিলম জাতিগুলি ইসলামী বিশ্বাস এবং সামাজিক আচার–আচরণের গোলামি থেকে আযাদ হবে এবং পাশ্চাত্য জীবন–পদ্ধতি গ্রহণ করতে রাজীক হবে, ততোই তাদের জন্যে মঙ্গল–বাকি দুনিয়ার জন্যেও…।
অতোদিনে আমার নিজের পর্যবেক্ষণ থেকে আমার এ প্রত্যয় জন্মেছে যে, ইসলাম সম্পর্কে গড়পড়তা প্রতীচ্যবাসীর ধারণা একেবারেই বিকৃত। আল কুরআনের পাতায় পাতায় আমি যা দেখতে পেলাম তা বিশ্ব জগত সম্পর্কে মোটেই এক ‘স্থুল বস্তুবাদী’ ধারণা নয়, বরং আল্লাহ সম্পর্কে একটি গাঢ় গভীর চেতনা, যার অভিব্যক্তি ঘটেছে আল্লাহ –সৃষ্ট গোটা প্রাকৃতিকে যুক্তিক দিয়ে গ্রহণ করার মধ্যে–পাশাপাশি বুদ্ধিক এবং ইন্দ্রিয়জ স্পৃহা, আত্মিক প্রয়োজন ও সামাজিক চাহিদার মধ্যে একটি সুন্দর সামঞ্জস্য! আমার স্পষ্ট হয়ে উঠলো দিবালোকের মতোঃ মুসলমানদের পতনের জন্যে ইসলামের ক্রটি–বিচ্যুতি নয়, বরং ইসলামের আদর্শ মুতাবিক জীবন–যাপনে আমাদের ব্যর্থতাই দায়ী।
কারণ, এ কথা তো সত্য যে, ইসলামই প্রথমদিকের মুসলমানদের তামদ্দুনিক দিক দিক দিায়ে উচ্চতার স্বর্ণ চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিলো তাদের কর্মশক্তিকে সজ্ঞান চিন্তার দিকে পরিচালিত করে;এই সজ্ঞান চিন্তাই তো আল্লাহর সৃষ্টির প্রকৃতি তথ্য তাঁর অভিপ্রায়কে বোঝার একমাত্র উপায়। মুসলমানেরা দুর্বোধ্য, এমনকি বুদ্ধির অনধিগম্য কোনো ‘ডগ্মায়’ বিশ্বাস করুক এমন কোনো দাবী করা হয়নি তাদের কাছে; বস্তুত হযরতের শিক্ষায় কোনো রকম অন্ধ বিশ্বাসের স্থন নেই। আর এ কারনেই প্রথম দিকের যে জ্ঞানানুসন্ধিৎসা মুসলিম ইতিহাসকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে, পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতো, তাকে চিরচারিত ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধের বেদনাদায়ক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে ঘোষণা করা হয়নি। পক্ষান্তরে বলা যায়, এর উদ্ভব ঘটেছে খাস করে ঐ ধর্ম থেকেই। আরবের নবী ঘোষণা করেনঃ জ্ঞানের অনুসন্ধান প্রত্যেক মুসলিম নর–নারীর জন্য পবিত্রতম কর্তব্য’; আর তাঁর উম্মতের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়েছিলো এই বিশ্বাস যে, কেবলমাত্র জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই আল্লাহর পূর্ণ ইবাদত সম্ভব। আল্লাহ কোনো রোগ পয়দা করেন না তার ওষুধ সৃষ্টি না ক’রে’, –মহানবীর এই কথা নিয়ে যখন তাঁরা গভীরভাবে চিন্ত করলেন, তখন তাঁদের এই উপলদ্ধি হলো যে, অজ্ঞাত ওষুধের অনুসন্ধান ক’রে তাঁরা পৃথিবেীতে আল্লাহর অভিপ্রায়কে পূর্ণ করার ব্যাপারে সহায়তা করতে পারেন, আর এভাবেই তাদের নিকট চিকিৎসা গবেষণা একটি ধর্মীয় কর্তব্যের পবিত্রতায় মান্ডিত হয়ে ওঠে। তাঁরা পাঠ করলেন আল—কুরআনের এই আয়াতঃ ‘আমি প্রত্যেক প্রাণীকে সৃষ্টি করি পানি থেক –আর এই শব্দগুলির তাৎপর্য ভেদ করতে গিয়ে তাঁরা প্রাণীসত্তাসমূহ এবং সেগুলির বিকাশ সম্বন্ধে অধ্যয়ন শুরু করেন, আর এভাবেই তাঁরা জীব–বিজ্ঞানের বুনিয়াদ স্থাপন করেন। নক্ষত্রমালা ও তাদের গতিবিধির সামঞ্জস্যের প্রতি আল—কুরআন অঙ্গুঁলি নির্দেশ করে স্র্যষ্টার মহিমা হিসাবে এবং এভাবেই মুসলমানরা জ্যোতিবিজ্ঞান ও গণিতশাস্ত্রকে গ্রহণ করে এমন এক আগ্রহ–উদ্দীপনার সাথে যা অন্যান্য ধর্মে কেবল প্রার্থনার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। কোপার্নিকাসের যে –পদ্ধতি নিজ কক্ষপথে পৃথিবীর আব র্তন এবং সূর্যের চারদিকে গ্রহপুঞ্জের পরিক্রমণকে সাবিত করে, ইউরেোপে তার বিবর্তন ঘটে মাত্র ষোড়ষ শতকের শুরুর দিকে (শাস্ত্রবিদরা যার মুকাবিলা করেছিলেন প্রচন্ড আক্রোশের সাথে, কারণ তাঁরা মনে করতে এতে বাইবেলের আক্ষরিক শিক্ষার বিরোধিতা রয়েছে) কিন্তু এ পদ্ধতির বুনিয়াদ পত্তন হয় আরো ছয়শো বছর আগে, মুসলিম দেশগুলিতে –কারণ ইতিমধ্যই নবম ও দশম শতকেই মুসলিম জ্যেতিবিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌছেছিলেন যে পৃথিবীর আকার গোল এবং সে আব র্তন করে তার নিজস্ব কক্ষপথে। তারা অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমার সঠিক হিসাব করতে সক্ষম হন এবং তাঁদের অনেকেই দাবী করতেন, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে আর তাঁদের এ দাবীর জন্য তাঁরা ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়নি। এভাবেই তাঁরা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও শরীরতত্বের চর্চ্চা করেন এভং অন্যান্য বিজ্ঞানের চর্চায়ও আত্মনিয়োগ করেন। বলাবাহুল্য, এসব বিষয়েই মুসলিম প্রতিভা তার সবচেয়ে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভগুলি রেখে গেছে। এই সব স্তম্ভ তৈরী করতে গিয়ে তাঁরা তাঁদের মহানবীর নসিহত অনুসরণ করেছেন, তার বেশি কিছু করেননি। মহানবীর সে নসিহত এইঃ কেউ যদি জ্ঞানের অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়ে, আল্লাহ তার জন্য বেহেশতের পথ সহজ করে দেন’, ‘বিজ্ঞানী তো আল্লাহর পথেই চলে থকেন’ ‘কেবল কলমের কালির মর্যাদা শহীদের লোহুর চাইতেও পবিত্র তরো।
মুসলিম ইতিহাসের গোটা সৃজনশীল যুগটিতেই অর্থাৎ মহানবীর পর প্রথম পাঁচশো বছরের মধ্যে, মুসলিম সভ্যতার চাইতে, জ্ঞান –বিজ্ঞান ও শিক্ষার মহত্তরো কোনো পৃষ্ঠপোষক কেউ ছিলোন না; যে–সব দেশে ইসলাম ছিলো চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী সে–সব দেশ ছাড়া অধিকতরো নিরাপদ আশ্রয়ও ছিলো না আর কোথাও।
একইভাবে কুরআনের শিক্ষায় প্রভাবিত হলো সামাজিক জীবন যখন খৃষ্টান ইউরোপ মহামারী হলেই মনে করতো আল্লাহর গজব হচ্ছে যার নিকট মানুষের আত্মসমর্পণ করা ছাড় উপায় নেই। সেই সময়ে এবং তারো অনেক আগে, মুসলমানেরা তাদের নবীর এই নির্দেশ অনুসরণ করতো যে, মহামারী প্রতিরোধ করবার জন্য মহামারী উপদ্রুত শহর ও এলাকাগুলিকে আলাদা করে ফেলতে হবে সুস্থ এলাকাগিুলি থেকে –এবং যখন, খৃষ্টান জগতের রাজা–বাদশাহ ও অভিজাতরাও গোসল করাকে একটি প্রায় ইতর বিলাসিতা বলে মনে করতেন, সে সময়েও, এমনকি দরিদ্রতম মুসলিম ঘরেও ছিলো কমপক্ষে একটি করে গোসলখানা, আর প্রাত্যেক মুসলিম নগরীতেই ছিলো সর্বসাধারণের জন্যে সার্বিক ব্যবস্থাসহ গোসলখানা (দৃষ্টান্তস্বরূপ নবম শতকে এক কর্ডোভাতেই ছিলো এ ধরনের তিনশ’ গোসলখানা)। এবং এসবই করা হয়েছেোলো মহানবীর একটি শিক্ষা কার্যকরী করতে গিয়েঃ ‘পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অংগ’। মুসলমান যখন জাগতিক জীবনের সুন্দর বস্তুগুলি উপভোগ করতো তখন সে আধ্যাত্মিক জীবনের চাহিদার সাথে কোনো বিরোধে মুখামুখি হতো না, কারণ রসূল্লুল্লাহ (সা)-এর শিক্ষা অনুসারে ‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জীবনে তাঁর ঐশ্বর্যের নিদর্শন দেখতে ভালোবাসেন।’
অল্প কথায়, ইসলাম প্রবল প্রেরণা, যোগালো সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জনের জন্য –যা মানবেতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল পৃষ্ঠাগুলির একটি দখল করে আছে, আর ইসলাম এ প্রেরণা সৃষ্টি করে বৃদ্ধিকে স্বীকৃতি দিায়ে এবং আজ্ঞেয়তাবাদকে অস্বীকার করে। এর মানে নিস্ক্রিয়তা নয়, কর্মবাদ; সন্ন্যাসবাদ নয়, জীবনবাদ। কাজেই এতে বিস্ময়ের অবকাশ খুবই কম যে, আরবের সীমা সরহদ অতিক্রম করার সাথে সাথেই ইসলাম দ্রুত গতিতে নতুন নতুন অনুসারী লাভ করতে থকে। পল এবং অগাস্টিনের প্রচারিত খৃষ্টধর্ম পার্থিব জীবনের প্রতি যে ঘৃণা–তাচ্ছিল্য পোষণ করে তারই মধ্যে লালিত বর্ধিত সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকার মানুষেরা এবং কিছুকাল পরে, ভিশিগথিক স্পেনের লোকেরা হঠাৎ এমন একটি আদর্শের মুখামুখি হলো যা, ‘আদি পাপে’ বিশ্বাসের অন্ধতা অস্বীকার করে এবং মানুষের পার্থিব জীবনের সহজাত মর্যাদার উপর দেয় গুরুত্ব; আর এ কারণেই তার এসে জড়ো হতে লাগালো নিত্যবর্ধমান সংখ্যায়, এই জীবনাদর্শের পাশে –যা তাদের শেখালো–মানুষ হচ্ছে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। ইসলামের ইতিহাসের গৌরবজ্জ্বল ঊষাকালে ইসলামের বিস্ময়কর বিজয়ের এ–ই হচ্ছে ব্যাখ্যা, তরবারির জোরে মানুসকে দীক্ষিক করার উপকথা নয়।’
মুসলমানেরা ইসলামকে মহত্ত্ব দান করেনি, ইসলামই মুসলমানদেরকে দিয়েছিলো মহত্ত্ব। কিন্তু যে মূহুর্তে তাদের বিশ্বাস হয়ে দাঁড়ালো তাদের অভ্যাসের বস্তু, তা তাদের জীবনের কর্মসূচী আর রইলো না, যে কর্মসূচী আর রইলো না, যে কর্মসূচী সজ্ঞান অনুসরনের বিষয়, তখনি , তাদের সভ্যতার তলদেশে যে সৃজনশীল উদ্দীপনা বিদ্যামান ছিলো তাতে শুরু হলো ক্ষয় এবং ক্রমে তা ডেকে নিয়ে এলো নিস্ক্রিয়তা, বন্ধ্যাত্ব এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয়।
আমি যে নতুন অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করলাম এবং যে অগ্রগতি রাভ করে চলেছিলাম আরবী ভাষায় (আমি আল–আজহারের একজন ছাত্রকে নিয়োগ করেছিলাম আরার রোজাকর পাঠের জন্য) তাতে মনে হলো, আমি এখন অমন একটি জিনিসের অধিকারী হয়েছি যা বলা যেতে পারে মুসলিম মানের চাবিকাঠি। মাত্র ক’মাস আগেই আমি যে আমার বই এ লিখেছিলাম ‘কোনো ইউরোপীয়ই পারে না সচেতনভাবে গোটা ছবিটার ধারণা করতে’ , সেব্যাপারে আর আমার পক্ষে অতোটা নিশ্চিত বোধ করা সম্ভব হলো না; কারণ , এখন এই মুসলিম জাহান প্রতীচ্য ভাবানুষংগের কাছে আর সম্পূর্ণ চিন্তাভ্যাসগুলি থেকে কিছুটা আযাদ হতে পারে এবং এ সম্ভাবনা মেনে নেয় যে, এসব চিন্তাভ্যাসই হয়তো একমাত্র গ্রহণযোগ্য চিন্তাভ্যাস নয়, তাহলে এককালের এতো অপরিচিত মুসলিম জগতও হয়ে উঠতে পারে বুদ্ধিগ্রাহ্য…।
কিন্তু যদিও আমি দেখতে পেলাম, ইসলামের অনেক কিছুই আমার বুদ্ধি এবং সহজাত অনুভূতির কাছে আবেদন জানায়, তবু আমি বাঞ্ছনীয় মনে করিনি যে, সে পদ্ধতি তার নিজের কল্পিত বাদ উদ্ভাবিত নয়, তেমন কিছুর সংগে একজন বুদ্ধিমান মানুষের সকল চিন্তা গোটা জীবন –দৃষ্টির খাপ নেয়া উাচিত।
–‘আমাকে বলুন, শায়খ মুস্তাফা, একবার আমি আমার পন্ডিত বন্ধু আল—মারঘিকে বলি, একটি বিশেষ শিক্ষা এবং কতক গুলি বিশেষ শিক্ষা একং কতকগুলি বিশেষ নির্দেশের মধ্যে কারো নিজেকে গন্ডীবদ্ধ রাখার প্রয়োজন কী? সমস্ত নৈতিক প্রেরণাকে অন্তর্বাণীর আওতায় রেথে দেওয়াই কি শ্রেয় নয়?
–“তরুণ বন্ধু, আপনি যা আমাকে জিজ্ঞাস করছেন, তা তো আসলে এই যে, আনুষ্ঠানিক ধর্মের প্রয়োজন কী? জবাবটি খুবই সোজা। খুব অল্প লোকই–কেবল নবীরাই –অন্তর্বাণী তাঁদের হৃদয়ে যা বলে তা বুঝবার প্রকৃত ক্ষমতা রাখেন। আমরা বেশিরভাগই ব্যক্তিস্বার্থ এবং কামনা–বাসনার জালে বন্দী এবং আমাদের হৃদয় যা বলে, আমার প্রত্যেকেই যদি তাই মেনে চলি, তাহলে আমরা সার্বিক নৈতিক বিশৃংখলার সম্মুখীন হবো এবং আচার–আচরণের কোনো পন্থার বিষয়েইে একমত হতে পারবো না। আপনি অবশ্য জিজ্ঞাস করতে পারেন, এই সাধারণ নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম আছে কি নাঃ আলোকপ্রাপ্ত লোকেরা মনে করে, তারা কোন বিষয়কে ভালো বা মন্দ করবে এ বিষয়ে তারা অন্যের দ্বারা ‘পরিচালিত’ হওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। কিন্তু তাহলেও আমি আপনাকে জিজ্ঞাস করছি–অনেক মানুষই –বহু মানুষই কি তাদের নিজেদের জন্য এই বিমেষ অধিকার দাবি করবে না? এ বং তার ফলই কী হবে।”
…. ….. …… … . …. …
আমি প্রায় ছ’হপ্তা হলো কায়রোতে আছি। এ সময়ের মধ্যে আবার আমি ম্যালেরিয়ায় ভুগি। এর আগের বছর আমি ম্যালেরিয়ায় পয়রা আক্রান্ত হয়েছিলাম ফিলিস্তিনে। মাথা ধরা, মাথা ঘোরা এবং সারা যন্ত্রণার সাথে শুরু হয় জ্বর এবং দিনের শেষে আমাকে বিছানায় শুয়ে পড়তে হয় চিৎ হয়ে; আমার হাত তোলবার ক্ষমতা পর্যন্ত রইলো না। আমর বাড়ির মালিক সিনোরা ভিতেল্লি আমার চারপাশে অমন ব্যস্ত–সমস্ত হয়ে ছুটাছুটি করতে লাগলেন যে, মনে হলো তিনি যেন প্রায় উপভোগই করছেন আমার অসহায়ত্বকে! আসলে কিন্তু আমর জন্য তাঁর উদ্বেগ আন্তরিক, নির্ভেজাল। তিনি আমাকে খেতে দিলেন গরম দুধ, মাথায় ঠান্ড পানির পট্টি দিলেন; কিন্তু আমি যখন তাঁকে বললাম ডাক্তার ডাকাই সংগত হবে, তিনি রাগে ঘেন্নায় একেবারে জ্বলে উঠেনঃ
–“ডাক্তার? ডাক্তার না ছাই! এই কসাইগুলি ম্যালেরিয়ার ব্যাপারে কী জানে? আমি এদের যে কোন জনের চাইতে এ বিষয়ে বেশী জানি। আমর মরহুম দ্বিতীয় স্বামী এই রোগেই মারা যায় আলবানিয়ায়। আমরা কয়েক বছর দুরাজ্জোতে ছিলাম। ও বেচারা প্রায়ই কষ্ট পেতো তোমার চাইতে অনেক বেশী যন্ত্রনায়–তবে আমাতে তার আস্থা ছিলো সবসময়…
আমি অতো কাহিল হয়ে পড়েচিলাম যে, আমার তর্ক করার কোনো ক্ষমতাই ছিলো না। কাজেই আমি তাঁর ইচ্ছামতো গ্রীক সূরা ও কুইনিনের এক উগ্র মিকচার আমি খাই–চিনি মাখানো বড়ি নয়, একেবারে খাঁটি চূর্ণ ওষুধ, যার তিক্ততা জ্বরের চাইতেও বেশি কাঁপন ধরিয়ে দেয় আমার মধ্যে। কিন্তু যেভাবেই হোক, বলতে বিস্ময়কর ঠেকবে হয়তো মা ভিতোল্লির প্রতি ছিলো আমার পূর্ণ আস্থা, তাঁর মরহুম দ্বিতীয় স্বামী’ অশুভ উল্লেখ সত্ত্বেও।
সেই রাতে, যখন জ্বরে আমার সারা গা জ্বলছে,হঠাৎ রাস্তা থেকে আসা একটি মোলায়েম, গাঢ় সংগীত আমি শুনতে পেলাম–একটি ব্যারেল ‘ওর্গানের’ বাজনা।
এ ওর্গান সেই সব সাধারণ ব্যারেল ওর্গানের একটি নয় যাতে রয়েছে টানা হাপর এবং ছিদ্রযুক্ত নল, বরং তা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবে ভাঙ্গা ভাঙ্গা সূর তোলা সেকেলে ক্লেভিকার্ড –এর সূক্ষ্ম বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে খুবই নাজুক এবং খুবই সীমাবদ্ধ বলে বহুকাল আগেই ইউরোপ পরিত্যাক্ত হয়েছে। এর আগেও আমি এ ধরনের ব্যারেল ওর্গান দেখেছি কায়রোতেঃ একটি লোক বাক্সটি বহন করছে তার পিঠে, আর একটি বালক তার পিছু পিছূ চলছে আর হাতল ঘুরাচ্ছে। এবং তা থেকে সুরগুলি উঠছে, আলাদা আলাদা প্রত্যেকটি, সংক্ষিপ্ত এবং পরিচ্ছন্ন; যেনো তীরের মতো ভেদ করছে লক্ষ্যবিন্দু, মধ্যকার ব্যবধান ডিঙ্গিয়ে, কাঁচের টুঙটাঙ শব্দ তুলে; সুরগুলি একটি আরেকটি থেকে এতোই আলাদা, এতেই স্বতন্ত্র যে, তাতে করে শ্রোতার পক্ষে পুরা সংগীতটির মানে উপলদ্ধি করা মোটেই সম্ভব নয়। বরং তার বদলে এ সংগীত তাকে টেনে নিয়ে যায় নরম, গাঢ় কতকগুলি মূহুর্তের মধ্যে দিয়ে, ঝাঁকুনি দিতে দিতে। এগুলি যেন একটা গোপন রহস্য যা আপনি উদঘাটন করতে চাইছেন, কিন্তু পারছেন না; এবং সারারাত ধরে এই সুরগুলি আমার মস্তিকে বার বার ঘুরপাক খেয়ে আমাকে দিচ্ছিলো যন্ত্রণা, এমন একটি ঘূর্ণ্যমান বৃত্তের মতো, যা থেকে আমার অব্যাহতি ছিল না স্কুটারীতে আমি ঘূর্ণ্যমান দরবেশদে যে–নাচ দেখেছিলাম তারই মতো– সে কি কয়েক মাস আগের কথা, না কয়েক বছর, যখন আমি অতিক্রম করছিলাম পৃথিবীর গভীরতম সাইপ্রেস বনভূমি…।
এ এক অতি অসাধারণ বনানী, স্কুটারীর সেই গোরস্থান, ইস্তাম্বুল থেকে শুরু করে বসফোরাপসের ঠিক মাঝখান দিয়েঃ অগণিত দেওদার গাছের ফাঁকে ফাঁকে অলিগলি আর পথ এবং সেই সব গাছের নিচে, অগণিত খাড়া এবং মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা শিলা–সমাধি, যাতে খোদিত রয়েছে বাতাসে–পানিতে ক্ষয়ে যাওয়া আরবী শিলালিপি। বহুকাল আগে থেকেই পরিত্যাক্ত হয়েছিলো গোরস্তানটি; এখানে যে–সব মৃত শায়িত রয়েছে তাদের মৃত্য হয়েছে বহু–বহু অতীতে। তাদের দেহ থেকে উদগত হয়েছে বিশাল বিশাল বৃক্ষের কান্ড, কোনেটি ষাট ফুট, কোনেটি আশি ফুট উঁচু। পরিবর্তনশীল ঋতুচক্রের ভেতর তিদয়ে বেড়ে উঠেছে এই সব বনস্পতি, এক নিশ্চল নীরবতার মধ্যে–আর এ বনানীতে এ নীরবতা এমনি ব্যাপকও প্রগাঢ় যে, মানুষের পক্ষে সেখানে বিমর্ষ হওয়ারও অবকাশ নেই। মৃতরা যে ঘুমিয়ে থাকতে পারে তা আমি এমন গভীর করে, এমন তীব্রভাবে, আর কোথাও অনুভব করিনি। এই মৃতরা মানুষ ছিলো অমন এক জগতের বাসিন্দা যেখানে জীবন–ধারণ ছিলো নির্বিঘ্নে শান্তিময়; এরা এক ত্বরাবিহীন মানবজাতির মৃত সন্তান।
গোরস্তানের ভেতর কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা পর, স্কুটারীর চিপা অলিগলির ভেতর দিয়ে আমি এসে পৌঁছুলাম একটি মসজিদের কাছে। ওটি যে একটি মসজিদ তা কেবল এর দারোজার উপর চমৎকার করুকার্যময় আরবী লিপি দেখে বুঝতে পারলাম। দরোজাটি অর্ধেক খোলা। আমি সেই দরোজা দিয়ে ঢুকে আধো আলো আধো ছায়ায় ঘেরা একটি কোঠায় এসে দাঁড়াই। সেখানে একটি গালিচার উপর একজন বৃদ্ধ–অতি বৃদ্ধকে– ব্যক্তিকে চক্রাকারে ঘিরে বসে আছে মাত্র ক’জন লোক। এদের প্রত্যেকেরই পরনে লম্বা জোব্বা এবং মাথায় উঁচু, তামাটে রঙের কিনরাহীন শোলার টুপি। বৃদ্ধ ‘ইমাম’ আল –কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন একঘেঁয়ে সুরে। একটি দেয়াল ঘেষে বসেছে কয়েকজন সংগীত শিল্পীঃ ঢোল বাদক, বংশী বাদক এবং ‘কামাঞ্জা’ বাদক,তাদের লম্বা গলাওয়ালা ভায়োলিনের মতো সংগীত যন্ত্রাদি নিয়ে।
হঠাৎ আমার মনে হলে, এতোকাল যে ‘নাচনেওয়ালা দরবেশদের’ কথা আমি ভুরি ভুরি শনে এসেছি, এ অদ্ভুদ মাহফিলটি নিশ্চয় ওদেরঃ সেই মরমীয়া পন্থা, যা নির্দিষ্ট ছন্দে, বারবার পুনরাবৃত্ত ক্রমবর্ধমান দ্রুততালে কতকগুলি অংগ সঞ্চালনের মাধ্যমে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির মধ্যে আনতে চায় মোহবেশ, যা তাকে ক্ষমতা দেয় আল্লাহকে প্রত্যক্ষ এবং ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধি করতে।
‘ইমামে’র তিলাওয়াতের পর যে নীরবতা নেমে এরো তা হঠাৎ ভেঙে খান খান হয়ে গেলো একটি মিহি অথচ সুউচ্চ স্বরগ্রামে তোলা বংশী–ধ্বনীতেঃ এবং সংগীত শুরু হলো, একঘেঁয়ে একটানা সুরে, প্রায় আর্তনাদের ভংগীতে যেনো। মনে হলো, যেনো একটি মাত্র অংঘ সঞ্চালনের সাথে দরবেশরা দাঁড়িয়ে গেলো, জোব্বা ছুঁড়ে ফেলে দিলো এবং দাঁড়ালো তাদের শুভ ঝুলন্ত কৃর্তা গায় নিয়ে, যা পৌঁছেছে গিয়ে তাদের হাঁটু পর্যন্ত; গেরো দেওযা রুমাল দিয়ে কোমরে বাঁধা সেই কুর্তা; এরপর তারা প্রত্যেকেই অনেকটা ঘুরে দাঁড়ালো, যার ফলে, একটি বৃত্তের আকারে দাঁড়িয়ে তারা প্রতি দু’জনে হলো একে অন্যের মুখামুখি। এরপর তারা বুকের উপর হাত দুটি আড়াআড়ি রেখে, একে অন্যের প্রতি ঘাড় নোয়ায় গভীর আন্তরিকতার সাথে, (এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়লো, প্রাচীনকালের দ্বৈত সংগীতের কথা এবং নানারকম কাজ–করা কোট গায়ে নাইটদের কথা, যারা সম্ভ্রমের সাথে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাতো মহিলাদের।) পরমূহুর্তে সকল দরবেশ তাদের বহু বিস্তার করলো দু’পাশে, ডান হাতের তালু উপর দিকে ঘূরালো এবং বা হাতের তালু ঘরালো নিচের দিকে। ফিস–ফিস করা ধ্বনির মতো তাদের ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এলো একটি শব্দ ‘হুয়া’–তিনি (অর্থাৎ আল্লাহ)। এই মোলায়েমভাবে উচ্চারিত ধ্বনি ঠোঁটে নিয়ে তারা প্রত্যেক ধীরে ধীরে ঘুরতে লাগলো নিজ নিজ কক্ষপথে, সেই সংগতীতের তালে তালে দেহকে আন্দোলিত ক’রে, যেনো তা’ আসছিলো অনেক..অনেক দূর থেকে। তারা তাদের শির ঝুঁকিযে দিলো. ঘাড় বাঁকিয়ে পেছন দিকে, চোখ তাদের বুঁজে এলো এবং একটি মসৃণ কাঠিন্য ছড়িয়ে পড়লো, প্রশস্ত, প্রচুর কাপড় দিয়ে তৈরি কুর্তাগুলি বাতাস পেয়ে ফুলে ফেঁপে উঠে ঘূর্ন্যমান মানুষগুলির চারপাশে তৈরি করে একটি বিশাল চক্র, যেনো সমুদ্দুরে চক্রাকারে আবর্তিত শুভ্র ঘূর্ণিপাক। তাদের মুখমন্ডলে গভীর নিমগ্নতার ছাপ..বৃত্তাকারে আব র্তন রূপ পেলো চক্রবৎ ঘূর্ণনে এক ধরণের মোহাবেশ, আর হার্ষোচ্ছাাস পষ্ট অভিব্যক্তি লাভ করে তাদের সকলের মধ্যে। তাদের অর্ধ বিস্ফোরিক ঠোঁট থেকে অসংখ্য, অগুণতিবার উচ্চারিত হতে লাগলো কেবল একটি শব্দ ‘হূয়া..হূয়া..হূয়া’-; তাদের দেহ কেবলি পাক খেতে লাগলো ঘুরে ঘুরে এবং মনে হলো, সংগীত যেনো তাদের টেনে নিচ্ছে তার চাপা, পাক–খাওয়া একঘেয়ে ঐকতানের দিকে, একঘেঁয়েভাবেই যে সুর উঠছে উচ্চগ্রামে এবং আমার মনে হলো, আমি নিজেই যেনো অপ্রতিরোধ্যভাবে সেই ঘূর্ণিপাকের টানে চলেছি উর্ধ্বদিকে, খাড়া ঘূর্ণ্যমান, মাথা ঘুরিয়ে দেয়া এক সিঁড়ি ভেঙ্গে, নিরন্তর আরো উপরে নিয়ত ঘুরে ঘুরে ওঠা সিঁড়ি মাড়িয়ে, কোনো এক অবোধ্য অজ্ঞেয় পরিণামের দিকে।..যাতোক্ষণ না মাদাম ভিতেল্লির দরাজ বন্ধুত্বপূর্ণ হাত আমার কপাল স্পর্শ করায় সম্পূর্ণ থোকে গেলো ঘূর্ণিপাক, এবং আমার মোহাবেশ ভেঙ্গে চুরে আমাকে আবার নিয়ে এলো স্কুটারী থেকে কায়রোর শিলামন্ডিত একটি কক্ষের স্লিগ্ধ শীতলতায়…।
যা’ই হোক, সিনোরা ভিতেল্লি ভুল করেননি। তাঁর উপদেশে আমি ম্যালেরিয়ার ধকল কাটিয়ে উঠলাম, ততো শীঘ্র না হলেও, আমার নিয়মিত ডাক্তার আমার রোগ সারাতে যে সময় নিতেন নিদেনপক্ষে সেই সময়ের মধ্যেই। দু’দিনের মধ্যেই আমার জ্বর সম্পূর্ণ সেরে গেলো এবং তিসরা রোজ বিছানা ছেদেড় আমি বসলাম একটি আরামদায়ক চেয়ারে। তবু চলাফেরা করার মত শক্তি আমার মোটেই ছিলো না। সময় হয়ে উঠলো খুবই মন্থর, দুর্বহ। দু’এবার আমার শিক্ষক–ছাত্রটি আল–আজহার থেকে এলেন আমাকে দেখতে, সংগে করে আমার জন্য তিনি আনলেন কিছু বই।
আমার সাম্প্রতিক বুখারে বয়ে আনা স্কুটারীর ঘূর্ণ্যমান দরবেশদের স্মৃতি, যেমন করেই হোক, আমাকে ভাবিয়ে তোলে। অপ্রতাশিতভাবেই এ ব্যাপারটি আমার কাছে এমন এক রহস্যময় তাৎপর্য গ্রহণ করলো যা আমার মূল অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট ছিলো না মোটেই। এই তরীকার গূঢ় আচার –অনুষ্ঠানগুলি–বিভিন্ন মুসলিম দেশে আমি যেসব তরীকা দেখেছি , তারই একটি এই তরীকা–আমার মনে ইসলামের যে চিত্র ধীরে ধীরে অভিব্যক্তি লাভ করছেো তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হলো না। আমি আমার আজহারী বন্ধকে অনুরোদ করি এ বিষয়ে আমাকে প্রাচ্যদেশীয় কিছু বই সরবরাহ করতে। এবং এসব বই–পুস্তক পকেড়, এ ধরণের গুহ্য প্রথা যে অমুসলিম উৎস থেকেই ইসলামে প্রবেশ করেছে, আমার এই সহজাত সংশয়ই প্রমাণিত হলো। মুসলিম মরমীবাদী, যারা ‘সূফী’ বলে পরিচিত, তাদের ধ্যান–ধারণা যে গ্রীক যে গ্রীক দুজ্ঞেয়বাদীদের, ভারতীয়দের, এমনকি কখনো কখনো খৃষ্টানদের প্রভাব ব্যক্ত করে তাতে কোনো সন্দেহনেই; এবং এই প্রভাবের ফলেই আমদানি হয় সন্ন্যাসপন্থী ধ্যান–ধারণা ও আচার–আচরণ যার সাথে আরবের মহানবীর পয়গামের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর পযগামে ‘যুক্তি’কেই বিশ্বাস অর্জনের একমাত্র পথ বলে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর দৃষ্টিভংগীতে মরমীয়া অভিজ্ঞতার সম্ভাব্যতা একেবারেই অবাস্তব বলে বিবেচনার অযোগ্য না হলেও,ইসলাম ছিলো মূলতই একটি যুক্তিভিক্তিক প্রস্তাবনা, আবেগসর্বস্ব নয়। যদিও অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ইসলাম তার অনুসারীদের মধ্যে অতিশয় ভাবাতিশয্যপূর্ণ এক অনুরাগের জন্ম দেয়, তবু হযরত মুহাম্মদের শিক্ষায়, ধর্মীয় ‘অনুভূতি উপলদ্ধি’র ক্ষেত্রে ভাবাতিশয্যকে কেবল ভাবাতিশয্য হিসাবেই, তেমন কোনো স্বাধীন ভূমিকা দেওয়া হয়নি। কারণ , ভাবাতিশয্য যকো গভীরই হোক, আত্মগত কামনা ও ভীতির দ্বারা তার প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী, যুক্তি যতোটা প্রভাবিত হতে পারে তার চাইতে–যুক্তির মধ্যে ভ্রান্তি অবকাশ যাই থাকুক।
… … … … ..
–‘বুঝলে মনসুর, এমনি খন্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়েই ইসলাম নিজেকে উন্মেচিত করে আমার নিকট; কথাবার্তা, বই পড়া কিংবা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে, এখানে এক ঝরক ওখানে এক ঝলক—এমনিভাবে, ধীরে ধীরে প্রায় আমার অজ্ঞাতেই…।
দুই
আমরা যখন রাতের জন্য তাঁবু গাড়ি জায়েদ আমাদের জন্য রুটি সেঁকতে বসে যায়। মোটা গমের আটার সংগে মিশিয়ে পানি দিয়ে পয়লা সে একটি পিন্ড বানায়, তারপর চেপ্টা গোলাকার রুটি তৈরী করে, এক ইঞ্চি পুরু। এরপর সে বালুতে একটি গর্ত খুঁড়ে এবং সেখানে শুষ্ক ডাল–পালা গুঁজে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং আগুনটা হঠাৎ বিস্ফোরিত হবার পর যখন থেমে যায়, তখন জ্বলন্ত আংগারের উপর রুটিটা রেখে দেয় এবং তার উপর গরম ছাই বিছিয়ে দিয়ে তার উপর স্তূপীকৃত ডাল–পালায় আগুন ধরিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর সে রুটিটির উপার থেকে অঙ্গার ও ডাল–পালা সরিয়ে সেটিকে উল্টিয়ে দেয় এবং আগের মতোই ঢেকে দিয়ে তার উপর আবার আাগুন ধরায়। আরো আধ ঘন্টা পরে সেঁকা রুটিটি অংগারের নিচ থেকে খুঁড়ে বের করে এবং বাকি ধূলা এবং ছাই ছাড়ানোর জন্য একটি কাঠি দিয়ে তাতে বারবার আঘাত করে। আমরা সে রুটি খাই পরিষ্কার মাখন মাখিয়ে, খেজুর দিয়ে। বলাবাহুল্য এর চেয়ে সুস্বাদু রুটি আর কোথাও পাওয়া অসম্ভব!
আমার এবং জায়েদের মতো মনসুরের ক্ষিধাও তৃপ্ত হলো, কিন্তু তার ঔৎসুক্য নয়। আমরা যখন আগুনটিকে ঘিরে শুয়ে আছি, সে আমকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলো– শেষপর্যন্ত কেমন করে আমি মুসলমান হলাম এবং যখন ওর কাছে তা ব্যাখ্যা করতে যাই, আমি অনেকটা বিস্ময়ে চকিত হয়ে উঠি, ইসলামের পথে আমার দীর্ঘ সফর কথায় প্রকাশ করা কতোই না কঠিন!
–‘কারণ, হে মনসুর, ইসলাম আমার কাছে এসেছে দস্যুর মতো, যে মানুষের ঘরে প্রবেশ করে রাতের বেলা, চুপি পুচি, কোনো শব্দ বা শেরাগোল না করে; তফাতটা এই যে, দস্যুরা যা করে ইসলাম তা করে নি, ইসলাম আমার ঘরে প্রবেশ করলো চিরকালের জন্য, চলে যাবার জন্য নয়। কিন্তু আমাকে যে মুসলমান হতে হবে একথা আবিষ্কার করতে আমার কেটে গেলো বহু বছর..।’
মধ্যপ্রাচ্যে আমার দ্বিতীয় সফরের সেই দিনগুলির কথা যখন স্মরণ করি–যখন ইসলাম আমার মনের উপর দখন বিস্তার করতে শুরু করেছে প্রবল্যের সংগে–আমার মনে হয়, আমি যে আবিষ্কারের সন্ধানেই এক সফরে বেরিায়েছি এ বিষয়ে তখনো আমি ছিলাম সচেতন। প্রত্যেক দিন ভেতর থেকে জেগে ওঠে নতুন নতুন প্রশ্ন এবং বাইরে থেকে আসে নতুন সমাধান—এসবই অমন একটা কিছুর প্রতিধ্বনি জাগ্রত করে যা আমার মনের পশ্চাদভুমিতে কোথাও ছিলো লুক্কায়িত। এবং ইসলাম সম্বন্ধে আমার জ্ঞান যতোই পরিষ্কার হতে থাকে, বারবার উপলদ্ধি করি, একটি সত্যকে আমি চিরদিনই জেনেছি সে সম্পর্কে সচেতন না হয়েও, আর তাই ক্রমে ক্রমে উদঘাটিত হচ্ছে, বলা যায়, প্রমাণিত হচেছ
১৯২৪–এর গ্রীষ্মের প্রথমদিকে, আমি কায়রোর থেকে বের হই এক দীর্ঘ সফরে, যাতে আমার লাগে দু’টি বছরের বেশির ভাগ সময়। প্রায় দু’বছর আমি দেশ–দেশান্তর ঘুরে বেড়াই, এমন সব দেশের মধ্যে দিয়ে যা তদের ঐতিহ্যের প্রজ্ঞার দিক দিয়ে প্রাচীন হলেও আমার মনের উপর তার প্রভাবের দিকক দিয়ে চির নতুন। আমার সফরে কোনো তাড়াহুড়া ছিলো না; একেক জায়গায় আমি দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকি। দ্বিতীয়বার আমি ট্রান্সজর্ডান যাই এবং আমীর আবদুল্লাহর সাথে ক’দিন কাটাই–সেই বেদুঈন মুলুকের উষ্ণ বীর্যবত্তায় হৈ–হুল্লোড় ক’রে, যা তখনো পাশ্চাত্য প্রভাব –স্রোতের সাথে নিজের চরিত্রমে মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়নি। সেবার আমার জন্য একটি ফরাসী ভিসার ব্যবস্থা করেছিলো ‘ফ্রংকফুর্টার শাইটুঙ’; আমি আবার সিরিয়া ভ্রমণের সুযোগ পেলাম। দামেশক বেশিদিন থাকিনি; আমার চলার পথে এ প্রাচীন নগরী এসেই পেছনে পড়ে গেলো। বায়রুতের লেবাননী সজীবতা আমাকে আলিংগন করে কিছু সমযের জন্য, কিন্তু শীগগিরই আমি তা ভুলে যাই, সিরীয় ত্রিপোলির বিজন নিদ্রালুতায়, তার নীরব প্রশান্তিতে। খোলা বন্দরে ছোটো ছোটো বাদমওয়ালা জাহাজগুলি তাদের নোঙর টান খেয়ে খেয়ে নচছে, আর লাতিন মাস্তুলগুলি মৃদু্ ক্যাঁচ্কোঁচ আওয়াজ করছে। জেটিতে একটি কফি হাউসের সামনে টুলে বসে বিকালের রোদে ত্রিপোলির নাগরিকেরা মজা –সে কফি খাচ্ছে আর ‘হুক ’টানছে। সর্বত্রই শান্তি আর সন্তোষ, আর মনেহলো তাদের খাবার রয়েছে অঢেল! এমন কি, ভিক্ষুকেরও যোনো আরামপ্রদ কবোষ্ণ রোদ উপভোগ করছে. যেনো বলছে, আহা, ত্রিপোলিতে ভিক্ষুক হওয়াও কতো আনন্দের! আমি এলাম আলেপ্পোতে। এর রাস্তাঘাট আর দালান–কোঠা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় জেরুযালেমের কথা। পুরানো পাথুরে ঘরবাড়ি, যা যমীন থেকে উদগত হয়েছে বলে মনে হয়, আর অন্ধকার ধনুকেরমতো বাঁকা তোরণ–শোভিত পথঘাট, নির্জন নীরব চক আর চত্বর এবং খোদাই –করা জানালা। অবশ্য, আলেপ্পোর অন্তজীবন ছিলো জেরুযালেমের চাইতে একেবারে আলাদা। জেরুজালেমের প্রবল মেজাজটি ছিলো অদ্ভুদ, পরস্পর বিরোধী জাতীয় স্রোতের পাশাপাশি একট যন্ত্রনাদায়ক খিচুনির মতো। ধ্যান–ধারণা এবং গভীর ধর্মীয় ভাবাবেগের পরেই সেখানে একটা বিষাক্ত মেঘের মতোই স্থায়িভাবে জেঁকে বসেছিলো মা্নুষ আর বস্তু সম্পর্ক প্রায় দুর্জ্ঞেয় এক বিদ্বেষ। কিন্তু আলেপ্পো –আরব এবং লেবাননের একটা মিশ্রণ হওয়া সত্ত্বেও এবং নিকটবর্তী তুরস্কের হালকা ছাপ তার উপর পড়লেও, আলেপ্পো স্ব–বিরোধীমুক্ত এবং স্নিগ্ধ, প্রশান্ত। কাঠের ব্যালকনি আর পাথুরে সমুখভাগ নিয়ে, ঘরবাড়িগুলি তাদের নিশ্চলতার মধ্যেও প্রাণবন্ত। প্রাচীন বাজারে হস্ত শিল্পীদের নির্বাক কর্মব্যস্ততা, পুরানো সরাইখানাগুলির চত্বর যার উপরে ছাদ আর দু’পাশে সারিসারি দোকান, নানা পণ্যে বোঝাই। মিতব্যয়িতা এভং তার সংগে একট লঘু–প্রকৃতির লালসা–আর উভয়ই সকল প্রকার ঈর্ষা থেকেমুক্ত; কোনো প্রকার ব্যস্ততা নেই, আর অমনি এক অবকাশ এ–‘পরদেশী’ জনকেও আলিংগন করে এবং তার মধ্যেও জাগায় এ আকাংখা যে, তার নিজের জীবন ও যেনো নির্বিঘ্ন অবকাশে শিকড় গেড়ে স্থির হতে পারে। এ সমস্তই বয়ে চলেছে, একত্রে একটি তীব্র মনোমুগ্ধকর ছন্দে।
আলেপ্পো থেকে গাড়িতে করে আমি পৌঁছলাম সিরিয়ায় একেবারে উওরের একটি শহর–দায়র–আয –যোর এ। আমার ইচ্ছা ওখান থেকে আমি ধরবো বাগদাদের পথ, যাবো ফোরাতের সমান্তরাল প্রাচীন সরু কাফেলার পথের উপর অবস্থিত বাগদাদে। আর সেই সফরেই প্রথম সাক্ষাৎ পাই জায়েদের।
বাগদাদ–দামেশকের রাস্তায় ক’বছর ধরে মোটরগাড়ি চলছে। কিন্তু সেদিক দিয়ে ফোরাতের সমান্তরার রাস্তাটি ছিলো সামান্যই পরিচিতি। বলতে কি, আমার আগে একটি মাত্র মোটর গাড়িই গিয়েছিলো ক’মাস আগে। এমনকি , আমার আর্মেনীয় ড্রাইবারও এর আগে কোনোদিন দায়র–আয–যোর অতিক্রম করেনি যদিও তার আত্মবিশ্বাস প্রবল, যেমন করেই হোক পথ বার করে নেবে। তা সত্ত্বেও তার মনে হলো, আরো বাস্তব আরো নির্ভরযোগ্য তাথ্যের প্রয়োজন রয়েছে। তাই আমরা দু’জন এক সংগে বাজারে ঘুরলাম তথ্যের সন্ধানে।
বাজারে স্তানটি গোটা দায়র–আয –যোর এর মধ্য দিয়ে আগিয়ে গেছে লম্বালম্বি। এটিকে একটি সিরীয় প্রাদেশীক শহর এবং একটি বেদুঈন রাজধানীর মিশ্রণ বলা যেতে পারে–যদিও বেদুঈনী প্রভাবই এর উপর বেশি। এখানে দু’টি বিশ্বের মিলন হয়েছে এক অদ্ভুদ সাদৃশ্য। এক দোকানে বিক্রি হচ্ছে আধুনিক অথচ মুদ্রিত ছবিওয়ালা পোষ্টকার্ড, যখন ঠিক তারপরেই, অন্য এক জায়গায় কয়েকজন বেদুঈন মরুভমিতে বৃষ্টি সম্বন্ধে কথা বলছে, কথা বলছে সিরিয়ার বিশরআনাজা কবিলা ও ইরাকের শাম্মার গোত্রের মধ্যকার হালের বিবাদ সম্পর্কে। একজন উল্লেখ করে, কিছুকাল আগে নযদী বেদুঈন সর্দার ফয়সল আদ –দাবিশ দক্ষিণ ইরাকে যে দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়েছিলেন, তার কথা; বার বার আরবের বুজর্গ আদমি ইবনে সউদের নাম উচ্চারিত হয় তার মুখে। লম্বা লম্বা ও রূপার কাজ–করা হাতলওয়ালা পুরানা গাদা বন্দুক– যা আজকার আর কেউ কেনে না, কারণ হাল আমলের রাইফেলগুলি এর চাইতে অনেক বেশি কার্যকরী–একটা স্বপ্নচ্ছন্ন ধূলি–ধুসর অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে তিনটি মহাদেশ থেকে আনা পুরানো ই্উনিফর্মের কাপড়, নযদী উটের জীন, গুড ইয়ার টায়ার, লীপজিগের ঝাড়বাতি এবং আল জাওফ থেকে আনা হত বাদামী বেদুঈনী জো্বাতে। অবশ্য, সেকেলে জিনিসগুলির মধ্যে পশ্চিমা পণ্যগুলিকে অবাঞ্ছিত আগন্তুক মনে হলো না; ওদের উপযোগিতাই ওদের জন্য স্বাভাবিক নিজস্ব একিট স্থান ক’রে দেয়। বেদুঈনদের বাস্তবতাবোধ জাগ্রত ও ব্যাপক; এবং সেই কারণের মনে হলো, যে –সব জিনিস গতকালও ছিলো ওদের মরু কাফেলার সরাইখানা থেকে অনেক দূরের বস্ত সেসব নতুন জিনিসকেও ওরা সহজেই গ্রহণ করেছে আর ওদের পুরানো সত্তাকে বিসর্জন না দিয়ে সেগুলিকে নিয়েছে আপন ক’রে। ওদের অন্তর্জগতের এই যে স্থিতিশীলতা, আমি মনে মনে ভাবি, তাই হয়তো ওদের দিয়েছে সেই শক্তি যার বলে ওা নয়া জমানার বন্যা স্রোতের মুকাবিলা করতে পারছে এবং হয়তো, তার কাছে হার না মানার ও ক্ষমতা ওদের দিয়েছে, কারণ এ লোকগুলির কাছে এখন নয়া জামানা খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে শুরু করোছে. –আর লোকগুলি কেমন? মাত্র কিছুদিন আগেও ওরা ছিলো বহির্জগত থেকে দূরে, নিাজের মধ্যেই সমাহিত। কিন্তু তাই বলে, ওদের দরোজায় এই টোকা দুশমনের কড়া নাড়া ছিলো না; নিষ্কলুষ ঔৎসুক্যের সাথে ওরা গ্রহণ করেছে এই সব নতুনত্বকে, বলা যায়,যেনো আঙ্গুল দিয়ে সবদিক থেকে তাকে পরখ করে দেখছে এবং তার সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে চিন্তা–ভাবনা করছে। পাশ্চাত্য ‘নতুনত্ব এইসব সরল উম্মি বেদুঈনের কী ক্ষতি করতে পারে আমি তা কতো সামান্যই তখন উপলদ্ধি করেছিলাম…।
আমার আর্মেনীয় ড্রাইবার যখন একদল বেদুঈনের নিকট খোঁজ–খবর নিচ্ছে ঠিক সেই সময়ই হঠাৎ আমার হাতের আস্তিনে একটা প্রবল টান পড়ে। সংগে সংগে আমি দাঁড়ালাম–দেখলাম, আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিশোর্ধ একবাহুল্য –বর্জিত সুন্দর আরব।
–‘ আপনার ইজাযত নিয়ে, ও ‘আফেন্দ’ , একটু নিচু রুক্ষ স্বরে বলে, ‘আমি শুনতে পেলাম, আপনি মোটরে করে যাচ্ছেন, কিন্তু আপনি আপনার পথ সম্বন্ধে নিশ্চিত নন। আপনার সাথে আমাকে নিন, আপনার কিছু সাহয্যে আসতে পারি।’
আমি তৎক্ষণাৎ লোকটিকে পছন্দ করে ফেলি এবং ওকে জিজ্ঞাস করি, ও কে?
–‘আমি জায়েদ ইবনে গনিম,’ ও জবাব দেয়, ‘আমি ইরাকী ‘আগায়েলে নোকরি করি।
তখনি আমি লক্ষ্য করলাম–ওর ‘কাফতানে’র খাকী রঙ এবং ইরাকী মরু কনস্টেবলের প্রতীক সপ্ত রশ্নিবিশিষ্ট তারকা, তার কালো ‘ইগাস’– এর উপর। এ ধরেোণের ফৌজকে আরবরা বলো ‘আগায়েল’। তুর্কীদের আমল থেকেই এর অস্তিত্ব রয়েছে। স্বেচ্ছায় এ বৃত্তি যারা গ্রহণ করে তাদেরই নিয়ে গঠিত এই ফৌজ–যাদের রিক্রট করা হয় কেবলি আরব থেকে–মরুস্তেপ যাদের আস্তানা এবং উট যাদের বন্ধু। ওদের দুঃসাহসী রক্ত ওদের রুক্ষ, বিলাস বর্জিত স্বদেশ থেকে ওদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে এমন এক জগতে হাজির করেছে যেখানে টাকা পয়সা বেশী, গতি চাঞ্চল্য এবং আজও আগামীকালের মধ্যে পরিবর্তন অধিকতরো।
জায়েদ আমাকে বললো, ও সিরীয়–ইরাক সরহদের শাসন সম্পর্কিত কোনো এক ব্যাপারে ওর এক অফিসারের সাথে দায়র–আয যোর–এ এসেছে। অফিসারটি ইরাকে ফিরে গেলেও ওর এক ব্যক্তিগত কাজে পেছনে রয়ে গেছে এবং এখন দামেশক হয়ে, অধিকতরো ঢালু অথচ অনেক বেশি ঘুরতি পথে না গিয়ে ও আমার সাথে ফিরে যাওয়াই পছন্দ করে। ও খোলাখুলি আমার নিকট স্বীকার করে, ও আজ পর্যন্ত কখনো ফোরাত বরাবর সমস্ত রাস্তা সফর করেনি এবং আমার মতোই সেও জানে, নদীর বহু শাখা–প্রশাখা এভং বাঁকের জন্য সমসময় আমরা নদীর সাহায্যে পথ পাবো না, –কিন্তু, জায়েদ বলে, ‘মরুভূমি মরুভুমিই এবং সূর্য ও তারকারাজি একই চিন্তার কারণ নেই, ইনশাআল্লাহ আমরা পথ খুঁজে পাবোই’। ওর প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাসে আমি আনন্দিত হই এবং আনন্দের সাথে রাজী হয়ে যাই ওকে আমার সাথে নিতে।
পরদিন সকালে আমরা দায়র–আয–যোর থেকে বারহয়ে পড়ি। বিশাল হাম্মাদ মরুভূমির উপর দিয়ে গড়িয়ে চলরো আমাদের ‘মডেল টি ‘ফোর্ড’ গাড়ির চাক শিলা–নূড়ি বিছানো এক অনন্ত,সমতল, কখনো আস্ফন্টের মতোই মসৃণ এবং সমান, কখনো ঢেউ–এর আকারে বিস্তৃত, দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত। কখনো কখনো ফোরাত নদী পড়ে আমদের বাঁ–দিকে–কর্দমাক্ত,শান্ত এবং নদীর পাড় নিচু–আপনারমনে হবে, যেন একটি নীরব হ্রদ,যতোক্ষণ না ভসমান একটি কাঠের টুকরা অথবা কিশ্তী আপনার নজরে পড়ে এবং তাতে করে প্রচন্ড স্রোত ধরা পড়ে। ফোরাত একটি প্রশস্ত নদী, তার মেজাজ রাজকীয়; এ কোনো শব্দ জাগায় না, এ নদী ক্রীড়াশীল নয়, এ ছুটে চলে না,ফেনা –শীর্ষ ঢেউ–এ ভেঙ্গে পড়ে না, পানি ছুঁড়ে মারে না। ফোরাত বয়ে চলে ধীরে ধীরে, –প্রশান্ত গতিতে,ছড়িয়ে দেয় প্রশস্ত ফিতার মতো, বন্ধনহীনা নদী, নিজের রাজকীয় পথ নিজেই সে ঠিক করে নিচ্ছে, মরুর অনুভবযোগ্য ঢালুর দিকে, অসংখ্য বাঁক ঘুরে ঘুরে, মরুভুমির সাথে সমতা বজায় রেকে, মরুভুমির মতোই গর্বের সাথে। কারণ, নদীর মতোই মরুভুমির বিস্তুত, মরুভূমিও শক্তিধর এবং প্রশান্ত।
আমাদের নতুন সংগী জায়েদ বসেছে ড্রাইবারের পাশে, হাঁটু তুলে একটি পা গাড়ির দরোজায় ঝুলিয়ে। ওর গায়ে জ্বরজ্বল করছে লাল মরক্কো চামড়ার তৈরি বুট যা ও আগরে দিন কিনেছে দায়র–আয –যোর–এর বাজার থেকে।
কখনো কখনো আমরা সাক্ষাৎ পাই উট সওয়ারদের, যেনো শূন্য থেকে হঠাৎ ওরা আবির্ভূত হয়েছে মরুভুমির মাঝখানে, মুহুর্তের জন্য নিশ্চল হয়ে দাঁড়ায়, আমাদের গাড়ির দিকে লক্ষ্য করে , আবার ওদের সওয়ারী জানোয়ার গুলিকে হাঁকিয়ে শূন্যে মিলিয়ে যায়। স্পষ্টতই ওরা পশুচারী, রোদে পুড়ে ওদের মুখের রঙ গাঢ় তামাটে হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে আমরা স্বল্পক্ষণের জন্য থাকি জরাজীর্ণ সরাইখানায়, তারপর শুরু হয় মরুভূমির অনন্তবিস্তার। ফোরাত হারিয়ে যায় দিগন্তের ওপারে। বায়ুতে ঝেটিয়ে জমা করা বালু,শিলা–নুড়ি বিছানা একেক টুকরা জমি এবং এখনে ওখানে কিছু ঘাসের গুচ্ছ অথবা কাঁটা–বন নযরে পড়ে। আমদের ডান পাশে, গাছপালা শূণ্য এবং প্রখর রোদের নিচে ভেঙ্গে পড়া এক নিচু ফাটা ফাটা দাগবিশিষ্ট শৈলমালা হঠাৎ জেগে ওঠে এবং মরুভূমির অস্তহীনতাকে আড়াল করে দেয়। ঐ সংকীর্ণ শৈল শ্রেণীর ওপাশে কী রয়েছে? আমি বিস্ময়র সংগে নিজেকে শুধাই। আর আমি জানি, যদিও ওপাশে রয়েছে একই রকম সমান অথবা পাহাড়ী মরুভূমি, এবই রকম বালু এবং একই রকম কঠিন নূড়ি সূর্যের নিচে জ্বলছে তাদের কুমারী কাঠিন্যে, তবু একটা ব্যাখ্যাতীত রহস্যের নিশ্বাস যেনো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে । ‘ওখানে কী থাকতে পারে’? আমার পরিপার্শ্বে এর কোনো জবাব বা প্রতিধ্বনি নেই; বিকালের কাঁপতে থাকা নিস্তদ্ধতায় কোনো শব্দ জাগছে না, কেবল আমাদের ইঞ্জিনের গুঞ্জন এবং শিলা নূড়ির উপর দিয়ে চলমান টায়ারের শো শো ধ্বনি ছাড়া। পৃথিবীর প্রান্ত কি ওখানে এক আদিম অতল গহবরে তলিয়ে গেছে? আমি যেহেতু জানি না, তাই অজ্ঞাত কিছু রয়েছে ওখানে আর যেহেতু আমি কোনোদিনই হয়তো তা জানতে পারবো না, তাই ত আজ্ঞেয়, অজ্ঞাত!
বিকালে আমাদের ড্রাইবার আবিষ্কার করলো, পেছনে ফেলে আসা মরু সরাইখানা থেকে সে ইঞ্জিনের জন্য পানি আনতে ভুলে গেছে। নদী অনেক ধূরে; আশপাশের বহু মাইলের মধ্যে কোনো ইঁদারা নেই। আমাদের চারপাশে ধ্যানমগ্ন রয়েছে ঢেউ–খেলানো দিগন্ত পর্যন্ত এক শূন্য,শুভ্র তপ্ত খঅড়িমাটির মতো প্রান্তর, তার উপর খেলা করছে এক নরম মোলায়েম উষ্ণ হাওয়া,-যেনো আসছে শূন্য থেকে এবং যাচ্ছেও শূন্যেরই দিকে, যার শুরুও নেই, শেষও নেই–যেনো মাহকাল থেকেই উত্থিত একটা চাপা গুঞ্জন–ধ্বনি!
ড্রাইবারটি,সকল লেবানিজের মতো যে বাহ্য লৌকিতার ধার ধারে না (তাদের এই গুণটির আমিকদর করতাম–কিন্তু ঠিক সেই মূহুর্তে নয়), বলে, –‘ওহো, তাই হোক, তবু আমরা পরের মরু–সরাইতে পৌঁছুতে পারবো।
কিন্তু তাতে মনে হলো, আমরা হয়তো তবু সেখানে পৌঁছুতে না–ও পারি। সূর্য জ্বলছে, রেডিয়েটারে পানি টগটগ করচে চা–এর কেটলির পানির মতো। আবার আমাদের দেখা হয় পশুচারীদের সাথে। পানি! না, উট পনেরো ঘন্টায় যতোদূর যেতে পারে, সে দূরত্বের মধ্যে , পনেরোটি উষ্ট্র–ঘন্টার মধ্যে কোথাও পানি নেই।
–‘তাহলে, তোমরা পান করো কী? মরিয়া হয়ে জিজ্ঞাস করে আর্মেনীয়টি।
–ওরা হেসে ওঠে, ‘আমরা উটের দুধ খাই’।
এই দ্রুতগামী শয়তানের গাড়ির অদ্ভুত লোকগুরি পানি কোথঅয় জানতে চাইছে দেখে ওরা মনে মনে নিশ্চয় খুব বিস্মিত হয়েছে। কারণ, প্রত্যেকটি বেদুঈন শিশুও ওদের বলে দিতে পারে এ অঞ্চলে পানি নেই কোথাও।
ভয়ানক অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি। ইঞ্জিন ফেল করার কারণে, এখানে মরুভুমিতে আটকে পড়ে থাকা, পানি নেই, খাবার নেই, অমন অবস্থায় এবং অপেক্ষা করাত, যতোক্ষণ না আরেকিটি গাড়ি আসে আমাদের পথে–হয়তো আসছে,না হয় পরশু–বিংবা হয়তো আসছে মাসে….।
আস্তে আস্তে ড্রাইভারের স্মিত ঔদাসীন্যের ভাব টুটে যায়। সে গাড়ি থাকিয়ে রেডিয়েটারের ঢাকনা খোলে; একটি সাদা গাঢ় ধুম্র–কুন্ডলী ফোস করে নির্গত হয়। রেডিয়েটর থেকে আমার ফ্লাক্সে কিছু পানি ছিলো তাই আমি উৎসর্গ করি ইঞ্জিনের উদ্দেশ্যে। আর্মেনীয়টি তার সাথে যোগ করে কিছু তেল এবং সাহসী ফোর্ড গড়িটি আমাদের নিয়ে আগিয়ে যায় কিছুক্ষণ।
–‘আমার মনে হয়, সেই আশাবাদী বলে, ‘ওখানে আমাদের ডানদিকে আমরা পানি পেতেও পারি। দেখছেন, ওই পাহাড়গুলি কতো সবুজ দেখাচ্ছে–মনেহয়, ওখানে তাজা ঘাস আছে। এবং যেখানে বছরের এই সময়ে ঘাস জন্মায়, যখন কোনো বৃষ্টি হয় না, সেখানে নিশ্চয় পানি আছে। এবং পানি যদি থাকেই, আমরা কেন গাড়ি চালিয়ে ওখানে উঠে পানি সংগ্রহ করবো না?
যুক্তির মধ্যে হামেশাই থাকে অনিবার্য এক শক্তি এবং এখানেও সেই জোর রয়েছে যদিও মনে হলো, আর্মেনীয়ল যুক্তিটা আচাচ্ছে ক্রাচে ভর করে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। আমরা পথ ছেড়ে দিয়ে গড় গড় আওয়াজ তুলে কয়েক মাইল আগাই পাহাড়ের দিকে। কিন্তিু পানি নেই… পাহাড়ের ঢালুগুলি আচ্ছাদিত রয়েছে, ঘসে নয়, সবুজাত পাথরে।
মোটরে একটা হিসিং শব্দ হলো, পিস্টনগুলি রূঢ়ভাবে আঘাত করতে থাকে, গাড়ির ঢাকনার জোড়ার ফাঁক দিয়ে বার হছ্ছে ধূঁয়া, সাদা কুন্ডলীর আকারে। আর কয়েক মিনিট.. এবং তরপরই , কিছু ন কিছুতেই চিড়ু ধরবে, ক্রাংক শ্যাফট্টি ভেঙ্গে যাবে–কিংবা এই রকম সূ** অন্য একটা কিছু। কিন্তু এবার আমরা কাফেলার পথ থেকে অনেক দূরে সরে পড়েছি। এখন যদি কিছু ঘটে, আমদের হতাশ হয়ে বসে পড়তে হবে এই নির্জন স্থানে। আমাদের যা কিছু তেল ছিলো তার প্রায় সবটুকুই দেয়া হয়েছে রেডিয়েটারে। আর্মেনীয়টি প্রায় পাগলামি শুরু করে দেয়, সে ‘পানির খোঁজ করে ফিরছিলো’, বাঁদিকে গাড়ির মোড় ঘুরিয়ে তারপর ডনি দিকে, সার্কাসের ভেতর বাজিকর যেভঅবে ডানে–বাঁয়ে গতি পরিবর্তন করে, ঘুর পাক খায়, তেমনি, । কিন্তু তবু পানির কোনো সম্ভাবানা দেখা গেলো না। এবং দামী ফরাসী মদের যে–বোতলটি আমি আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমর্পণ করলাম, তা–ও উত্তপ্ত রেডিয়েটারের বেশি কাজে লাগলো না শরাবজাত বাষ্পপুঞ্জে আমদের আচ্ছাদিত করা ছাড়া; এবং তার ফলে জায়েদ (যে কেো শরাব খায়নি) প্রায় বমি করে ফেলে।
যে পাথুরে নিস্ক্রিয়তায় জায়েদ এতোক্ষণ হারিয়ে গিয়েছিলো এই শেষ এক্সপেরিমেন্টে তা টুটে খান খান হয়ে গেলো। একটি ক্রদ্ধ অংগভংগির সাথে সে তার ‘কুফিয়া’ টেনে নামিয়ে দেয় চোখের উপর, গাড়ির উত্তপ্ত কিনারের উপর নুয়ে পড়ে আর মরুভূমির দিকে তাকাতে থাকে বারবার–সেই নির্ভূল, সতর্ক একাগ্রতার সাথে, যা খোলা আসমানের নিচে যারা জীবনের বেশির ভাগ কাটায়, তাদের একটা বৈশিষ্ট্য, যারা নিজেদের ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করতে অভ্যস্ত। আমরা উদ্বেগের সাথে এন্তজারি করি–বেশি কিছু আশা ছাড়াই–কারণ, আগেই সে আমদের বলেছে দেশের এই অংশে জীবনে সে কখনো আসেনি। কিন্তু সে তার হাত তুলে উত্তরদিকে নির্দেশ করে এবং বলে ওঠে–
–‘ওই যে’!
শব্দ তো নয়, যেনো একটি হুকুম, একটি আদেশ! ড্রাইভারটি বেজায় খুশি যে তাকে মুক্তিদেবার জন্য একজনকে পাওয়া গেলো। কোনো প্রশ্ন না করে সংগে সংগে সে আদেশ পালন করে। যন্ত্রদায়কভঅবে হাঁপাতে হাঁপাতে ইঞ্জিনটি আমাদের নিয়ে চলে উত্তরমুখে। কিন্তু হঠাৎ জায়েদ একটু উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে তার হাত রাখে ড্রাইভারের কাঁধের উপর এবং তাকে থামতে বলে। কিছুক্ষণের জন্য সে সম্মুখ দিকে মাথা একটু ঝুঁকিয়ে বসে শুঁকে শুঁকে শিকার ধরা কুকুরের মতো। তার চাপা ঠোঁটের আশপাশে কাঁপছে সামান্য, প্রায় অনুভবযোগ্য একটা উত্তেজনা।
–‘না, ওদিকে হাঁকা’, সে চিৎকার করে ওঠে এবং উত্তর–পূর্বদিকে ইশারা করে।
–‘জলদি।’ ড্রাইবার আবার তার হুকুম তামিল করে একটি কথাও না বলে। কয়েক মিনিট পর আবার জায়েদের মুখে আদেশ–‘থামো!’ এবং সে লঘূভংগিতে লাফিয়ে পড়ে গাড়ি থেকে, তার লম্বা জো্ব্বা সে দলা করে নিজের দু’হাতে নেয় এবং সোজা সামনের দিকে ছুটে যায়, থেমে পড়ে এবং কয়েকবার ঘুরে ঘুরে দেখে, যেনো কিছু খুঁজছে কিংবা নিবিড়ভঅবে কিছু শুনছে এবং অনেকক্ষণের জন্য ইঞ্জিনের কথা, আমার মুসিবতের কথা আমি ভুলে যাই, আমি এতোই মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ি একটি মানুষের দৃশ্য, নিজের সকল ইন্দ্রিয় আর স্নায়ু দিয়ে যে চেষ্টা করছে প্রকৃতির সাথে নিবিড় যোগ স্থাপনের জন্য। …এবং হঠাৎ সে লম্বা লম্বা ধাপে ছুটতে শুর করে দিলো, আর দুটি স্তুপের মাঝখানে একটি ফাঁকা জায়গায় অদৃশ্য হয়ে গেলো। মুহূর্তকাল পরেই আবার মাথা দেখা গেলো এবং তার হাত দটি আন্দোলি হতে লাগলোঃ
–‘পানি!’
আমরা তার কাছে ছুটে যাই। হ্যাঁ, তা’ই বটে । উপরে ঝুলে–পড়া শিলা দ্বারা রোদ, থেকে বাঁচানো একটি গর্তে ঝলমল করছে পানির একটি ছোট্ট ডোভা, বিগত শীতের বৃষ্টির কিছু অবশেষ, হলদে–বাদামি, কাদা মেশানো, কিন্তু তবু পানি…পানি! কোনো এক ধারণাতীত মরুভূমিজ ইন্দ্রিয়নুভূতি এই পানির অস্তিত্ব প্রকাশ করে দিয়েছে নযদের লোকটির নিকট..
এবং আমি আর আর্মেনীয় ড্রাইভারটি যখন খালি গ্যাসোলিন টিনে সেই পানি তুলে বহু অত্যাচারিত ইঞ্জিনে নিয়ে ঢালছি জায়েদ তখন স্মিত হাসিতে স্নিগ্ধ হয়ে–এক নির্বাক বীর যেনো– গাড়িটির পাশ দিয়ে একবার সম্মুখ দিকে হাঁটছে, আরেকবার পেছিনদিকে।
.. .. .. … … … … … … ….
তৃতীয় দিন দুপুর বেলা আমরা ইরাকী গেরাম ফোরাতের তীরবর্তী ‘আনা’য় পৌঁছলাম, এবং তার পামকুঞ্জ আর মাটির দেয়ালের মধ্যে দিয়ে কয়েক ঘন্টা গাড়ি হাঁকালাম। ওখানে আমরা জায়েদের কথা মতো দেখতে পেলাম বহু ‘আগায়েল’কে; যাদের বেশী ভাগ তারই কবিলার লোক। পাম গাছের ছায়ায় দীর্ঘ পদক্ষেপে চলাফেরা করছে চিক্কণ চিকচিক করা অশ্বরাজির মধ্যে দিয়ে, যাদের উপরে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে রোদ আর সবুজের মধ্য দিয়ে পরিশ্রুত হয়ে আসা আলো, যেনো একেকজন নৃপতি–শ্রী ও আভিজাত্যপূর্ণ এবং অধস্তনের প্রতি সৌজন্যময়। পথ চলতে চলতে জায়েদ ওদের কারো কারো প্রতি সম্মানের সাথে একটু মাথা নোয়ায় এবং তার মুখের দু’পাশে তার লম্বা চুল ঝাঁকুনি খায়। মরুভূমি আর শহর দগ্ধ করা উত্তাপের মধ্যে কঠোর জীবন –যাপন করলেও জায়েদ এতোই অনুভূতিশীল যে, গাঁয়ের রাস্তা দিয়ে আমাদের দ্রুত অগ্রগমনের মধ্যেও সে তার মাথার পাগড়ী পেঁচিয়ে মুখের উপর বাঁধে যাতে ধূলা মুখে ঢুকে না পড়ে, যে–ধুলায় আমরা, বিকৃত স্বভাব শহুরে লোকেরাও খুব অস্বস্তি বোধ করতাম না। আবার যখন আমরা শিলানুড়ির উপর দিয়ে চালাচ্ছি এবং পথেও আর ধূলা–বালি নেই, জায়েদ প্রায় সম্পূর্ণ বালিকাসুলভ এক মধুর ভংগীতে আর ‘কুফিয়া’ ঠেলে দেয় পেছন দিকে এবং শুরু করে দেয় গান। হঠাৎ সে তার মুল খোলে এবং গাইতে শুরু করে–সমতল ভেদ করে হঠাৎ উপর দিকে উৎক্ষিপ্ত গিরি –প্রাচীরের আকস্মিকতায় একটি নয্দী ‘কাসিদা’, এক ধরনের গজল গান, একটানা একঘেয়ে ছন্দে, টেনে বার করা সুরের আন্দোলন, মরু–বায়ুর মতো প্রবাহমান, যার শুরুও নেই, শেষও নেই। পরের গাঁয়ে পৌঁছানোর পর জায়েদ ড্রাইভারকে অনুরোধ করে থামবার জন্য। তারপর সে গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে ৈএবং এই পথটুকু তাকে লিফট দেয়ার জন্য শুকরিয়া জানিযে পিঠের উপর তার রাইফেলটিকে ফেলে সে পামপুঞ্জের মধ্যে হারিয়ে যায়; গাড়িটির মধ্যে পড়ে থাকলো এমন একটি গন্ধ যার কোনো নাম নেই, নিজের মধ্যেই সম্পূর্ণ এক মনুষ্যত্বের সুরভি, আত্মার সরল নিষ্কলুষাতর সুদূল –বিস্তৃত , অথবা কখনো বিস্মৃতনয়, অমন এক অনুরণময় অতীত স্মৃতিচারণ।
‘আনা’য় সেদিন আমার মনে হয়নি যে, জায়েদের সাথে আবার কখনো আমার দেখা হবে।কিন্তু আমি যা জানিনি তাই ঘটলো।
… . .. … …. …. ….
পরদিন আমি পৌঁছুই ‘হিত’ শহরে; ফোরাতের তীরে এমন এক স্থানে এ ছোট্ট শহরে অবস্থিত; যেখানে মরুভূমি থেকে ধীরে ধীরে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে দামেশক থেকে বাগদাদ যাবার পুরান কাফেলা–সড়কটি। শহরটি অবস্থিত একটি পহাড়ের চূড়ায়, দেয়াল আর কিল্লা সমেত যেনো একটি প্রাচীন অর্ধ–বিস্মৃত দুর্গবিশেষ। এর ভেতরে বা বাইরের ঘরবাড়িগুলি যেনো গিয়ে ঢুকে পড়েছে নগর–প্রাচীরের মধ্যে। ঘরবাড়িগুলির কোনো জানালা নেই, আছে কেবল কয়েকটি চিড় বা ফাটাল, দূর্গের ভেতর থেকে অস্ত্র ব্যবহারের সুবিধার জন্য দুর্গ–প্রাচীরে যে সব ছেদা রাখা হয় সেই রকম ছেদার মতো। শহরের ভেতর থেকে আসমানের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি মিনার।
নদীর পারে একটি কাফেলা–সরাইতে রাত কাটানোর জন্য আমি আমার চলায় যতি টেনে দিই। ড্রাইভার এবং আমার জন্য যখন রাতের খানা তৈরি হচ্ছে আমি তখন উঠানের মধ্যে যে কুয়াটি রয়েছে সেই কুয়তে গিয়ে হাত মুখ ধুই। আমি মাটির উপর হামাগুড়ি দিয়ে বসেছি, এমন সময় কোনো একজন লোক, যে লম্বা–নল ওয়ালা পানির পাত্রটি আমিরেখেছিলাম সেইটি তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে আমার হাতের উপর পানি ঢালতে থাকে। আমি মুখ তুলে তাকাই এবং আমার সম্মুখে দেখতে পাই–মোটা হাড্ডির কালো চেহারার একটি মানুষকে, যার মাথায় রয়েছে পশমের টুপি। অনুরুদ্ধ না হয়েই অযাচিতভঅবে ও আমাকে সাহায্য করছে আমার হাত মুখধোয়ার কাজে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিলো সে আরব নয়।আমি যখন তাকে জিজ্ঞাসস করলাম সে কে, ভাঙা ভাঙা আরবীতে সে জবাব দিলো–‘আমি একজন তাতার, আজারবাইজান থেকে এসেছি’। তার চোখ দুটি কুকুরে চোখের মতো উষ্ণ আন্তরিকতাময় এবং তার গায়ের এক সময়কার ফৌজী উর্দি প্রায় ছিন্ন, জীর্ণ!
আমি তার সাথে কথা বলতে শুরু করি, কিছুটা আরবীতে এবং কিছুটা টুকরা টুকরা ফার্সী ভাষায়, যা আমি শিখেছিলাম কায়রোতে এক ইরানী ছাত্রের কাছে। জানতে পারলাম, তাতারটি নাম ইব্রাহিম। তার জীবনের প্রায় সবটুকু –এখন তার বয়স প্রায় চল্লিশ–সে কাটিয়েছে ইরানের পথে–ঘাটে; বছরের পর বছর সে মালবাহী ওয়াগন চালিয়েছে তাব্রিজ থেকে তেহরানে, মেশেদ থেকে বিরযান্দে, তেহরান থেকে ইসফাহান এবং শিরাজে এবং একবার সো ঘোড়াসেওয়ার একদলকে পরিচারনা করেছে নিজের দল হিসাবে; ইরানী অশ্বরোহী বাহিনীতে সে সেপাই হিসাবে কাজ করেছে একবার, কাজ করেছে ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসাবে এক তুর্কোমান সর্দারের; এক সময়ে সে ইসফাহানের কাফেলা সরাইগুলিতে সহিসও ছিলো। কিন্তু এবার কারবালা–যাত্রী ইরানী তীর্থযাত্রীদের এক কাফেলায় খচ্চরের চালক হিসাবে ইরাকে আসার পর, কাফেলার সর্দারের সাথে ফাসাদ করে সে তার কাজ খুইয়ে বসেছে এবং এভাবে এক বেগানা মুলুকে সহায় সম্বলহীন হয়ে সে আটকা পড়ে গেছে।
পরে সেই রাত্রে কাফেলা সরাই এর পাম গাছ শোভিত প্রাংগণে, একটি কাঠের বেঞ্চিতে আমি গা এলিয়ে দিয়েছিলাম ঘুমাবার জন্য। গরম পড়েছিলো অসহ্য–আর ঝাঁকে ঝাঁকে মশা–যেনো মেঘপুঞ্জ–মানুষের খুন পিয়ে ফুলে ঢোল হয়ে ওঠা ভঅরি মুশার ঝাঁক। অল্প ক’টি লন্ঠন অন্ধকারের মধ্যে ছড়াচ্ছে তাদের করুণ আবছা আলো। কয়েকটি ঘোড়া, সরাইখানার মালিকেরই হবে হয়তো, একটা দেয়ালের সাধে বাঁধা। তাতার ইব্রাহিম তারই একিটকে বুরুশ করছে। যেভাবে সে ঘোড়াটি বরুশ করছে তাতে বোঝঅ যায় সে যে কেবল ঘোড়া চেনে তানয়, সে ঘোড়াকে ভালোও বাসে। তার আঙ্গুলগুলি এমনভঅবে টোকা দিচ্ছে ঘোড়ার খাড়া কেশরে যেমন করে প্রেমিক তাত বুলায় তার প্রেমিকের কেশদামে।
হঠাৎ আমার মনে একটা ধারণ এলো। আমি আমার সফরে ইরানের পথে চলেছি এবং আমার সম্মুখে রয়েছে ঘোড়ার পিঠে দীর্ঘ বহু মাসের সফর। আমি কেন এই লোকটিকে নিচ্ছি না আমার সাথে? মনে হলো লোকটি উত্তম এবং বেশ চুপচাপ। আর এ ধরণেরে একটি লোকের আমার নিশ্চয় দরকার হবে, যে ইরানের প্রায় প্রত্যেকটি পথ–ঘাটের খবর রাখে, আর প্রত্যেকটি কাফেলা সরাই –ই যার জানাশোনা, নিজের ঘরের মতো।
পরদিন সকালে যখন তাকে আমি বললাম আমিতাকে আমার নওকর করে নিতে পারি, তখন কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে সে প্রায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো এবং ফারসী ভাষায় আমাকে বললোঃ ‘হযরত, এর জন্য কখনো আপনার অনুশোচনা করতে হবে না!’
… … …. … … …
সে হচ্ছে আলেপ্পো থেকে আমার মোটর সফরের পঞ্চম দিনের দুপুর, যখন প্রথম আমার নযরে পড়লো বাগদাদের প্রশস্ত ওয়েসিসের দৃশ্য। অসংখ্য পামগাছের মাথার ফাঁক দিয়ে আসমানের দিকেওঠা সোনালী কাজ করে মসজিদের গম্বুজ এবং সু–উচ্চ মিনার ঝলমর করছে। রাস্তার দু’পাশেই রয়েছে একটি বিাশাল প্রাচীন গোরস্তান–ভেঙে ভেঙে পড়ছে যার কবরগুলি শিলা–ধূসর, উষার এবং পরিত্যক্ত। মিহি ধূসর ধূলা স্তদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গোরস্তানটির উপর; এবং দুপুরের খর রোদে এই ধূলি–ধূসরতাকে মনে হচ্ছে রূপালী কাজ করা স্বচ্ছ পাতলা কাপড়ের নেকাবের মতো–অতীতের মৃত জগত আর জীবন্ত বর্তমানের মধ্যে কুয়াশঅর মিহি দেয়াল যেনো। হ্যাঁ, হওয়া উচিত, সব সময় আমি মনে মনে ভাবি, যখন কেউ অমন কোনো এক নগরীর নিকটবর্তী থেকে এমনি সম্পূর্ণ আলাদা যে, সে পার্থক্য মন ধারণাই করতে পারে না….
এবং তারপর আমরা ডুব দিলাম পাম–বীথির মাঝে–মাইলের পর মাইল প্রকান্ড প্রকান্ড গাছের গুঁড়ি এবং বাঁকা বাঁকা পাতা–যতোক্ষণ না পাম–বাগিচা এসে হঠাৎ থেমে গেলো তাইগ্রিস নদর খআড় পাড়ের কাছে। নদীটি ফোরাত থেকে ভিন্ন ধরানের। কাদা সবুজে মেশানো রঙ্গ, ভারিক্কি–এবং কুল কুল শ্বদ করে চলেছে–সেই অপর নদীটির নীরব রাজকীয় প্রবাহের কাটে ঠিক যেনো অচেনা এক বিদেশী, পর!’ এবং আমরা যখন তাইগ্রীস পার হলাম নৌকা দিয়ে, তৈরি একটি দোল–খাওয়া ব্রিজের উপর দিয়ে, পারস্য উপসাগরের আগুনে উত্তাপ ছাড়িয়ে পড়রো আমাদের উপর।
বাগদাদের সেকালের শান–শওকত এবং জেল্লার কিছুই অবশিষ্ট নেই। মধ্যযুগকে মোংগলদের উপর্যুপরি হামলায় এ নগরী এমনভাবে ধ্বংস হয় যে, হারুন–অর–রশীদেরক পুরান রাজধানীর কথা স্মরণ করিয়ে দেবার মতো কিছুই বাকি নেই। দাঁড়িয়ে আছে এলোমেলোভাবে ইট দিয়ে তৈরি ঘর–বাড়ির এক শহর–মনে হয় যে, সম্ভাব্য পরিবর্তনের চিন্তায় সাময়িক এক ব্যবস্থা যেনো। আসলেই কিন্তু এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার আকারে এ ধরণের একটি পরিবর্তন ইতিমধ্যে সূচিত হয়ে গিয়েছিলো। নগরীটিতে আবার প্রাণের স্পন্দন শুরু হয়েছে; নতুন নতুন দালান–কোঠা জেগে উঠছে; ঘুমন্ত এক তুর্কী প্রাদেশিক হেডকোয়ার্টার থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক আরবীয় রাজধানী।
প্রচন্ড গরমের ছাপক পড়েছে সব কিছুর উপরেক এবং সকল গতিচাঞ্চল্যকে করে তুলেছে মন্থর। লোকজন রাস্তায় চলছে ধীর পদক্ষেপ। মনে হয় ওদের রক্ত খুবই গাঢ় এবং ওদের মধ্যে কোনো ছন্দ এবং মাধুর্য নেই। সাদ–কালোক চেক কাপড়ের পাগড়ীর নিচে ওদের মুখ দেখাচ্ছে অতিমাত্রায় গম্ভীর এবং অবন্ধুসুলব। গর্বিত আত্মসমাহিত মর্যাদায় মন্ডিত কোনো সুন্দর আরব মুখমন্ডল যখনি আমি দেখেছি, তার মাথায়ক দেখছি লাল, অথবা এবং সাদা রঙের ‘কুফিয়া’–যার অর্থ হচ্ছে, লোকটি এখানকার নয়, সে এসেছে উত্তরাঞ্চল থেকে, কিংবা সিরীয় মরুভূমি থেকে অথবা মধ্য আরব থেকে।
কিন্তু এই লোকগুলির মধ্যে প্রচন্ড এক শক্তি দীপ্যমান–ঘৃণার শক্তি–যে বৈদেশিক শক্তি তাদের স্বাধীনতা হরণ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণার। দেও –দানোর মতোই মুক্তির কামনায় হামেশাই আচ্ছন্ন বাগদাদের লোকেরা। হয়তো এই দৈত্যেরই কালো গভীর ছায়া পড়েছে তাদের মুাখের উপর। হয়তো এ সব মুখই সম্পূর্ণ আলাদা এক চেহারার হয়ে উঠে যখন ওরা শহরের সংকীর্ণ অলিগলি ও পাঁচিল–ঘেরা প্রাংগণগুলিডতে ওদের নিজেদের রোকজনের সাথে মুলাকাত করে। কারণ একটু নিবিড়ভাবে ওদের দিকে তাকালে আপনি বুঝতে পারবেন, ওদের চেহারা সম্পূর্ণ মাধুর্য –বর্জিত নয়। মাঝে মাঝে অন্যান্য আরবেব মতোই ওরা হাসতে জানে। কখনো কখনো অন্যান্য আরবের মতোই ওরা ওদের জোব্বা আভিজাত্যপূর্ণ তাচ্ছিল্যের সাথে ওদের পেছনে পেছনে ছেঁচড়িয়ে টেনে টেনে নেয় ধুলার উপর দিয়ে; ভাবটা যেনো এইঃ ওরা মর্মরের তৈরী প্রাসাদের মোজাইক করা মেঝের উপর দিয়ে হাঁটছে! ওরা ওদের রমণীদের রা্সতায় আলস্যভবে বেড়াতে দেয় বর্ণাঢ্য বিচিত্র কিংখাবের চাদরে চাদরে নিজেদের ঢেকে; বোরকা–পরা মহামূল্য রমণীকূল, লাল–কালো নীল–রূপালী এবং বোর্দো লাল কিংখাব পরা মূর্তি সকল ধীরে ধীরে সোনারা ছাপ এঁকে দিচ্ছি নিঃশব্দ চরণে…।
.. .. … .. . .. .. .. .. ..
আমরা বাগদাদে পৌঁছুনোর কয়েক হপ্তা পরে আমি যখন বড়ো বাজারের মধ্যে পায়চারি করছি, পিপাকৃতি ছাদ–ঘেরা ঈষৎ আঁধার গলি–পথগুলির একটি থেকে হঠাৎ প্রতিধ্বনিত হলো একটি চিৎকার। এক কোণ থেকে একটি মানুষ ছুটে গেলো, তারপর আরেকজন, তারপর তৃতীয় আরেকজন। এবং বাজারের লোকও ছুটতে শুরু করলো–এমন একটি আতংকে তাড়িত হ’য়ে ক যার কারণ আমি জানিক না, ওরাই জানে। ঘোড়ার ক্ষুরের খটখট আওয়াজঃ ভীত–সন্ত্রস্ত মুখি একটি সওয়ার ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটলো জনতার ভীড়ের দিকে, যে ভীড় ভেঙ্গে ছিন্ন–ভিন্ন হয়ে গেলো তার সামনে। আরো লোক দৌড়াচ্ছে এবং সবাই আসছে একই দিক থেকে এবং তাদের সাথে ছুটছে বাজারের দোকানীরা। ধাক্কা খেতে খেতে, ঝাঁকুনি খেতে খেতে গোটা দলটাই প্রবলবেগে আগাচ্ছে সামনের দিকে। দোকানদাররা ত্রস্ত–সন্ত্রস্ত হয়ে নিজ নিজ দোকানের সামনে স্থাপন করছে কাঠের তক্তা। কেউই কথা বলছে না, কেউক অপরকে ডাকছে না। শুধু মাঝে মাঝে আমি শুনতে পাচ্ছি পড়ন্ত মানুষেল চিৎকার, একটি শিশু আর্তনাদ করে উঠলো হৃদয় বিদীর্ণ করা শব্দে..।
কী হলো? কোনো জবাব নেই। যেদিকেই তাকাই বিমর্ষ মুখ নযরে পড়ে। একটি ভারী ওয়াগ–যা একনো গাটুরি দিয়ে অর্ধেক বোঝাই –চালক ছাড়াই ছুটে চছে সংকীর্ণ গলির ভেতর দিয়ে, ধাবমান ঘোড়া টেনে নিয়ে চলছে ওয়াগনটি।দূরে মাটির পাত্রের একটি স্তূপ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে–এবং আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম, ভাঙা হাড়ি–পাতিলের টুকরাগুলি গড়াগড়ি যাচ্ছে মাটিডতে। এই সব কন্ড ধ্বনি এবং লোকজনের পায়ের আওয়াজ আর শ্বাস–প্রশ্বাসের শব্দ বাদ দিলে, এক গভীর এবং চাপা নীরবতাই জেঁকে আছে সর্বত্র–ঠিক যেমনটি মাঝে মাঝে দেখা দেয় যায় ভূমিকম্পের আগে–আগে। শোনা যাচ্ছে, কেবল ছুটান্ত মানুষের পৌনঃপুনিক পদধ্বনি; কখনো শোনা যাচ্ছে প্রবহমান জনতার মধ্যক থেকে ছিটকে বার হয়ে পড়া কোনো নারী বা শিশুর আর্ত চিৎকার। আবর দেখা গেলো কতিপয় ঘোড় –সওয়ার। ভীতি, পলায়ন এবং নীরবতা! ছাঁদ–ঢাকা রাস্তাগুলি যেখানে একে অপরকে ছেদ করেছে সেখানে এক উন্মত্ত সমাবেশ, এক মাতাল হট্টগোল!
এসব ক্রসিং –এর একটিতে দংগলের সৃস্টি হয়েছে তাতে আটকা পড়ে আমার অবস্থা অমন হলো যে আমি আগাতেও পারছি না, পিছাতেও পারছি না এবং বলতে কি, কোথায় যে আমি যাবো, তা–ও আমি কজানি না। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি টের পেলাম, আামর বাজুতে কে যেনো চেপে ধরেছে, আর কেউ নয় জায়েদ, সে আমকে টানছে তার দিকে, দুটি দোকানের মাঝখানে… পিপা দিয়ে তৈরি করা একটি ব্যরিকেডের পেছনে।
–‘নড়বেন না’, সে কানে কানে বলে।
কী যেন একটা শাঁ করে চলে কগোলো পাশ দিয়ে; রাইফেলের বুলেট? অসম্ভব–
অনেক দূরে, বাজারের মাঝখানে কোনো স্থান থেকে, বহু কন্ঠের চাপা গর্জন ভেসে এলো। আবার কিছু একটা শাঁ করে চলে যায়, এবার আর এ বিষয়ে কোনো ভুলের আশংকা নেই। বুলেটের শব্দ–দূরে, একট অস্পষ্ট ঘর্ষণের শব্দ, যেনো কেউ কেউ মটরশুট ছড়াচ্ছে শুকনা শক্ত মেঝের উপর। ধীরে ধীরে আওয়াজ আগিয়ে আসে এবং ক্রমেই তা বাড়তে থাকে–সেই ঘন ঘন আওয়াজ যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে নিয়মিত ব্যবধানে–এবং আমি বুঝতে পারলাম ব্যাপারটি কীঃ মিশিনগান, কামানের শব্দ…..
আগেও যেমন বহুবার হয়েছে, আবারো তেমনি বাগদাদ নতুন ক’রে বিদ্রোহ করেছে এর আগের দিন–১৯২৪–এর উনত্রিশে মে। ইরাকী পার্লামেন্টে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গ্রেট–ব্রিটেনের সাথে একটি মৈত্রী চুক্তি অনুমোদন করে। আর এই মুহূর্তে একটি হতা্যশ জাতি আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে–একটি বৃহৎ ইউরোপীয় শক্তির বন্ধুত্বের বিরুদ্ধি..
এবেং পরে আমি জানতে পারলাম, বিক্ষোভ দমন করার জন্য বাজারে ঢোকার সকল পথ ব্রিটিশ ফৌজ বন্ধ ক’রে দিয়েছে। সেদিন বাজারে, নির্বিচার গোলাগুলিতে বহু লোক মারা যায়। জায়েদ বাধা না দিলে আমিও হয়তো সোজা ছূটে যেতাম কামানের আগুনের মুখে।
আর এটিই ছিলো আমদের বন্ধুত্বের সত্যিকার সূচনা। জায়েদের বিষয়–বুদ্ধিসম্পন্ন স্বল্পভাষী পৌরুষ আমাকে আক র্ষণ করে প্রচন্ডভঅবে। আর ওর দিক থেকে বরা যায়, সে–ও স্পষ্টই তরুন ইউরোপীয়টিকে ভালোবেসে ফেলেছিলো, আরবদের বিরুদ্ধে এবং তাদের জীবন–যাত্রার বিরুদ্ধে যার তেমন কোনো সংস্কার ছিলো না। ও আমাকে বললো ওর জীবনের সাদামটা কাহিনী। কেমন করে এর আগে ওর পিতার মতোই ও বড়ো হয়েছিলো হাইলের শাসকদের চাকুরিতে, ইবরে রশিদের শাম্মার খান্দানের অধীনে; কেমন করে যখন ১৯২১ সনে ইবনে সউদ হাইল দখল করে নেন এবং ইবনে সাউদের হাতে ইবনে রশিদের খান্দানের সর্বশেষ ‘আমীর’ বন্দী হন, তখন শা্ম্মার কবিলার বহু মানুষ এবং তাদের সাথে জায়েদও, নতুন শাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ না করে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে বেছে নিয়ে বা’র হয়ে পড়েছিলো দেশ ছেড়ে। আর এখন রয়েছে এখানে, তার ‘আইগালে’ সাতটি কোণাওয়ালা ইরাকী তারকা প’রে, বুকে তার জোয়ানী কালের স্বদেশের জন্য আকুল আকুতি নিয়ে।
ইরাকে আমার সফরের হপ্তাগুলিতে আমরা একে অপরের অনেক কিছু জানবার সুযোগ পাই এবং এর পরের বছরগুলিতে আমরা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলি। আমি মাঝে মাঝে তাকে চিঠি–পত্র লিখি এবং বছরে দু’একবার তাকে ইরান বা আফগানিস্তানের কোনো বাজার থেকে কিনে ছোট্ট উপহার পাঠাই। প্রত্যেকবারই তার অগোছালো, প্রায়–অবাধ্য বিশ্রী হাতের লেখায় জবাব দেয় এবং দিনগুলির কথা উল্লেখ করে, যখন আমরা এক সাথে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ফোরতের পার দিয়ে চলেছি, কিংবা পাখাওয়ালা সিংহ দেখতে গিয়েছি ব্যবিলনের ধ্বংসাবেশেষের মধ্যে। তারপর শেষমেষ, আমিযখন আরবে এলাম ১৯২৭ সনে, তখন আমি তাকে অনুরোধ করি আমার সাথে যোগ দিতে; পরের বছরই জায়েদ আমার সাথে মিলিত হয়। এবং তারপর থেকেই সে আমার সংগী হিসাবে রয়েছে, যতোটা না একজন নফর হিসাবে তার চাএত অনেক বেশি আমার এক কমরেড হিসাবে।
… .. .. .. .. .. .. …. .. .
তৃতীয় দশকের গোড়ার দিকেও ইরানে মোটর গাড়ি ছিলো অপেক্ষাকৃত বিরল; বড়ো বড়ো কেন্দ্রগুলির মধ্যে কয়েকটি ভাড়াই চলাফেরা করতো। তিন চারটি ট্রাংক রোড বাদ দিয়ে চলাফেরা করতে চাইলে ঘোড়া –টানা গাড়ির উপরই নির্ভর করতো হতো। এবং সেগুলিও যে সব জায়গায় যেতো তা নয়; কারণ ইরানের বহু জায়গায় তখন রাস্তা–ঘাটের অস্তিত্বই ছিলো না । আমার মতো লোকের জন্য –যে–কোনো দেশের মানুষের সাথে তাদের শর্ত মেনেই মেলামেমা করতে আমি উৎসুক–ঘোড়ায় চড়ে সফর করাই ছিলো সুস্পষ্পি ইংগিত; আর এ কারণেই, বাগদাদে আমরা শেষ হপ্তায় ইবরাহীমকে সংগে নিয়ে রোজ সকালে যেতাম শহরের বাইরে ঘোড়ার বাজারে। কয়েকদিন দর–কষাকষির পর আমি নিজের জন্যে একটি ঘোড়া ও ইবরাহীমের জন্য একটি খচ্চর কিনি। আমার সওয়ারীটি ছিলো দক্ষিণ –ইরানের একটি অতি সুন্দর আসলি, লাল–বাদমী রঙেন টাট্টু ঘোড়া, আর খচ্চরটি ছিলো পষ্টই তুরষ্ক থেকে আনীত একটি প্রাণোচ্ছল মগড়া একগুঁয়ে জানোয়ার, যার পেশীগুলি ছিলো ধূসর মখমখের চামড়ার নিচে ইস্পাতের মোটা রজ্জুর মতো; স্বচ্ছন্দে এটি বহন করতো তার সওয়ার ছাড়াও আমার বড়ো বড়ো থলেগুলি, যার আমি রাখতাম আমর প্রয়োজনীয় সবকিছু।
আমার ঘোড়ায় চড়ে এবং খচ্চরটিকে একটি রশিা ধরে চালাতে চালাতে ইব্রাহিম এক সকালে বার হয়ে পড়লো ইরানী সরহদে, ইরাকের সর্বশেষ শহর খানিকিনের দিকে। শহরটি হচ্ছে বাগদাদ রেলওয়ের একটি শাখা লাইনের ইস্টিশন। দু’দিন পর আমি ট্রেনে রওনা করি, ওখানে ইব্রাহিমের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য
আমরা খানিকিন এবং আরব –জাহানকে পেছনে ফেলে এসেছি। আমাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে হরদে পাহাড় সব–উচ্চতরো গিরিমালার বিরুদ্ধে সান্ত্রী যেনো–ইরানী মালভূমির পর্বতমালা, এক নতুন এবং প্রতীক্ষমান পৃথিবী। সীমান্ত চৌকিটি হচ্ছে একাকী এক ছোট্ট ইমারত , যার উপর তোলা রয়েছে একটি বিবর্ণ পতাকা–সবুজ–সাদা এবং লাল রঙ্গের, যাতে রয়েছে তরবারি ও উদীয়মান সূর্য সহ সিংহের প্রতীক। অল্প ক’জন শুল্ক–অফিসার , যাদের মাথার চুল কালো, গায়ের রঙ ফরসা, পরনে ময়লা ইউনিফর্ম আর পায়ে চটি জুতা, অনেকটা যেনো বন্ধুত্বপূর্ণ রসিকতার সাথেই পরীক্ষা করে আমার সামান্য লাগেজপত্র। তারপর ওদের একজন আমাকে সম্বোধন করে বরেঃ
–‘সবকিছুই ঠিক আছে, ‘জনবা–ই–আলী’, হুযুরের মরতবা আমাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্যের অনেক উপরে। আপনি মেহেরবানী করে আমাদের সাথে চা পান করে আমাদেরকে অনুগৃহীত করবেন?”
এবং আমি যখন এইবাকভংগীর মাধ্যমে ব্যক্ত আজব এবং সেকেলে শিষ্টাচার নিায়ে বিস্ময় বোধ করছিলাম কথন হঠাৎ আমর মনে হলো, ফারসী জবান তার বহু আরবী শব্দ সত্ত্বেও আরবী ভাষা থেকে কতো ভিন্ন, কতো আলাদা! এর মধ্যে রয়েছে একটি দ্যোতনাময় অনুশীলিত মাধুর্য, আরবদের উষ্ণ ব্যঞ্জনধ্বনির ভাষার পর, ফারসী স্বরবর্ণের মোলায়েম মুক্ত ধ্বনি বিস্ময়করূপে ‘পাশ্চাত্য’ ধরণের শোনালো।
মুসফির বেশে কেবল আমরিই ছিলাম না। চার ঘোড়ার টানা অনেকগুলি ভারি ক্যানভাসে ঢাকা ওয়াগান শুল্ক অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং কাছেই এক কাফেলা তাঁবু গেড়েছে। খোলা তাঁবুর আগুনে লোকজন তাদের খাবার রান্না করছে। যদিও বেলা তখন বিকালের প্রথম দিক, তবু মনে হলো, ওরা যেনো আরো আগাবার চিন্তাই করছে না এবং আমরাও , আমি জানি না, কেন, একই সিদ্ধান্ত নিই। খোলা জায়গায় রাতটা আমরা কাটাই যমূীনের উপর কম্বল বিছিয়ে।
ভোরের প্রথমদিকে, কটি ও্য়াগান ও কাফেলা আবার চলতে শুরু করলো নাঙা পর্বতমালার দিকে আমরাও আমদের নিজ নিজ সওয়ারীতে চড়ে তাদের সাথে রওনা করি। রাস্তাটি ঘুরে ঘরে উপর দিকে উঠেছে, এ কারণে দু’জন শীগ্গীই ধীরগতি ওয়াগনগুলিকে পেছনে ফেলে যাই এবং এরপর আমর আমদের সওয়ারী হাঁকিয়ে কুর্দদের পার্বত্য দেশের গভীর হতে গভীরতরো অঞ্চলো ঢুকে পড়ি–দীর্ঘদেহী, ফর্সা পশুচারীদের বাসভূমিতে।
আমি ওদের পয়লা লোকটিকে দেখলাম, যখন রাস্তার মোড়ে ডারপালা ও ছনের তৈরি, খশ্ খশ্ শব্দ করা একটি কুটির থেকে সে বের হয়ে এলো এবং কোনো কথা না বলে কানায় কানায় দুধ ভর্তি একটি কাঠের বাটি আমাদের সামনে তুালে ধরালো। তার বয়স খুব সম্ভব সতেরো; খালি পা, উস্কো–খুস্কো, গোসল করে বলে মনে হলো না; হাত পা আ –ধোয়া, অপরিষ্কার;একটা শোলার টুপির অবশেষ তার অগোছালো মাথায়ক শোভা পাচ্ছে। আমি সেইক পাতলা সামান্য নুন–মেশানোক এবং বিস্ময়কররূপে ঠান্ডা দুধ পান করছি আর বাটির কাঁধির উপর দিয়ে দেখছি দুটি নীল চোখ, আমার প্রতি পলকহীন নিবদ্ধ দুটি চোখ। নবজাত পশুর উপর ছড়িয়ে থাকে যে ভঙুর আর্দ্র মিষ্টি কুয়াশাচ্ছন্নতা, এক আদি নিদ্রালুতা, যা এখনো পুরাপুরি টুটেনি, তারই কিছু যেনো ঘনিয়ে আছে ওর চোখ দুটিতে!
বিকালে আমরা পৌঁছুই তাঁবু দিয়ে তৈরী একটি কুর্দী গাঁয়ে , পাহাড়ের ঢালগুলির মধ্যে চুপচাপ পড়ে থাকা ঘেঁষাঘেঁষি তাঁবুর একটি গাঁ। দেখতে সিরিয়া কিংবা ইরাকের অর্ধ–যাযাবর বেদুঈনদের তাঁবুর মতোই এই তাঁবুগুলি। ছাগ–পশমের তৈরি মোটা কালো কাপড় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে খড়ের মাদুর দিয়ে। কাছেই বয়ে যাচ্ছে একটি নহর, যার দু’পারে ছড়িয়ে আছে সারি সারি পপলার গাছের ছায়া; সেই নহরের মধ্যে মাথা জাগিয়ে থাকা একটা শিলার উপর এক জোড়া সারস পাখী উত্তেজিতভাবে ঠোঁটে ঠোঁটে আঘাত করে শব্দ সৃষ্টি করছে এবং পাখা ঝাপটাচ্ছে; ইন্ডিগো–ব্লু জ্যাকেট পরা একটি লোক তার দীর্ঘ অথচ হালকা পদক্ষেপে আগাচ্ছে তাঁবুর দিকে; তার মাটির সাথে সম্পৃক্ত অথচ খুবই শিথিল চরন–ভংগি থেকেযেনো কথা বলছে প্রাচীন বেদুঈন রক্ত! লাল–নীল মেশানো রঙের ঝুলন্ত কাপড় পেছন থেকে মাটির উপর টেনে টেনে, কাঁধের উপর একটা লম্বা মাটির পাত্র রেখে একটি রমণী ধীরে ধীরে চলেছে নহরটির দিকে। তার উরুদ্বয় পষ্ট রেখায়িত হয়ে উঠেছে তার পোশাকের মিহি কাপড় ফুটেঃ ভয়োলিনের তারের মতো দীর্ঘ এবং টানা রেখা! পানির কিনারে গিয়ে ও হাঁটু গেড়ে বসে এবং কলসে পানি ভরার জন্য পনির উপর নুয়ে পড়ে। তার পাগড়ির মতো মাথার কাপড় খসে পড়ে এবং রক্তের একটি স্র্রোতের মতো তা স্পর্শ ক রে ঝকঝক পানির উপরিভাগ, কিন্তু কেবল মুহূর্তের জন্যই; কাপকড়টি তুলে আবার সে তার মাথার চারপাশে জড়ায়, একটি মাত্র বিলীয়মান ভংগিতে, যা এখনো যেনো তার হাঁটু গেড়ে বসারই অংশ এবং একই ভংগির অন্তর্গত।
কিছু পরে আমি চারটি তরুণী এবং এক বৃদ্ধের সথে নহরটির ধারে গিয়ে বসি। মুক্ত স্বাধীন জীবন থেকে পাওয়া এক নিটেল মাধুর্য ও স্বাভাবিকতা রয়েছে ওদের চারজনের মধ্যেইঃ সৌন্দর্য , যা নিজের সম্বন্ধে সচেতন অথচ সৎ পবিত্র, যা নিজেকে লুকাতে জানে না, অথচ সলজ্জতা ও নম্রতা থেকে যাকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে সুন্দরী তার নাম গানের পাখীর নাম–‘তু–তু’ (স্বরবর্ণটি উচ্চারিত হয় ফারসী ভাষার মতো)। নাজুক ভূরুজোড়া পর্যন্ত তার গোটা কপালটাই একটি গাঢ় লাল রঙ্গের যার মধ্যে নীলের আভা রয়েছে–স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা; চোখের পাতাগুলিতে সুরমা মাখানো; স্কার্ফের নিচে থেকে ঠেলে বা’র হয়েছে বাদামী লার অলকগুচ্ছ, যার মধ্যে চিকন–চিকন রূপার চেন সূতার মতো পাকিয়ে জড়ানো হয়েছে। প্রত্যেকবার মাথা নাড়ার সাথে সাথেই সেগুলি ঝন্ ঝন্ করে উঠেছে নাজুক টোল–পড় গন্ড–রেখার সাথে ধাক্কা খেয়ে।
আমরা সকলেই আমাদের কথাবার্তা, বাতচিত্ উপভোগ করি–যদিও তখনো আমার ফারসী কথাবার্তা গোছানো হতে পারেনি, (কুর্দী ভাষার সাথে ফারসীর সম্পর্ক আছে)। এই কচি মেয়েগুলি, যারা নিজেদের কবিলার গম্ভীর বাইরে কখনো যায়নি এবং লেখা–পড়াও জানে না, আসলে কিন্তু খুবই চালাক। ওরা সহজেই আমার ঠেকে –ঠেকে বলা কথাগুলি বুঝতে পারে এবং প্রায়ই আমি যে শব্দটির জন্য অন্ধকারে হাত বাড়াচ্ছি সেটি বেছে নিয়ে নেহায়েতই বাস্তব নিশ্চয়তার সাথে আমার মুখে তুালে দিচ্ছে। ওরা কী করে, আমি ওদের নিকট জানতে চাই, ওরা জবাব দেয়, েএক যাযাবর রমণীল দিনগুলি যে বহু সংখ্যক ছোট্ট অথচ মহৎ কাজে ঠাসা থাকে সেগুলির তালিকা তুরে ধরেঃ দুটি চেপ্টা পাথরের মধ্যে অর্থাৎ যাতায় গম পেশা, জ্বলন্ত অংগারে রুটি সেঁকা , ভেড়ার দুধ দোয়া, চামড়ার থলির মধ্যে দই ঝাঁকুনি দিয়ে মাখন তোলা, হাতে চালানো তাঁতে ভেড়ার পশম থেকে সুতা তৈরি, এমন সবা প্যাটার্ন গালিচা বোনা এবং ‘কিলিম’ বোনা যা তাদের জাতের মতোই প্রাচীন এবং পুরানো; এবং সন্তান গর্ভে ধারণ করা আর তাদের পুরুষদের বিশ্রাম ও প্রেম দেওয়া..
এমন জীবন, যাতে কোনো পরিবর্তন নেই। আজ, গতকাল এবং আগামীকাল। সময় বলে কিছু নেই এই পশুচারীদের জন্য্–শুধু দিন–রাত ঋতুর অনুবর্তন ছাড়া। রাতকে করা হয়েছে আঁধার, ঘুমানোর জন্য; দিনকে বলা হয় আলোকোজ্জ্বল জীবনের দরকারী চিজগুলি যোগাড় করার জন্য; শীত ঋতুর আবির্ভাব ঘটে ক্রমবর্ধমান শীতের মধ্যে এবং পাহাড় পর্বতে চারণক্ষেত্রের স্বপ্লতায়; তাই ওরা ওদের পশুপাল এবং তাঁবু নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পৌঁছায় উষ্ণ প্রান্তরগুলিতে, মেসোটটেমিয়ায় এবং তাইগ্রীসে; পরে যখন গ্রীষ্ম ঋতু প্রখরতরো হয়ে গরমে এবং তপ্ত হাওয়অয়, তখন ওরা আবার ফিরে যায় পার্বত্য অঞ্চরে, এখানে, না হয় ওখানে, কবিলার ঐতিহ্যগত স্থান গুলির মধ্যে কোথাও।
–‘আপনার কি কখনো পাথরের তৈরি ঘরে থাকতে ইচ্ছা হয় না? আমি বৃদ্ধ লোকটিকে জিজ্ঞাস করি, যিনি এখন পর্যন্ত প্রায় একটি কথাও বলেন নি এবং স্মিত হাসির সাথে শুনছিলেন আমাদের বাতচিত; কখনো কি ইচ্ছা হয়না যে, আপনি নিজে মাঠের মালিক হন?
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বরেনঃ ‘না,… পানি যদি ডোবার মধ্যে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে, পানি হয়ে উঠে বন্ধ, কর্দমাক্ত এবং ; যখন পানির স্রোত থাকে, পানি বয়ে চলে, কেবল তখনি তা থাকে স্বচ্ছ পরিষ্কার…।’
. . . .. . . .. . .. .. .
কালক্রমে কুর্দিস্তান হারিয়ে যায় পেছনে। প্রায় আঠারোটি মাস আমি সকল দেশের মধ্যে সবচেয়ে আজব যে দেশ সেই ইরানের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়াই। এতে করে আমি অমন এক জাতিকে জানতে পারলাম, যার মধ্যে মিলন ঘটেছে তিন হাজার বছরের সংস্কৃতির প্রজ্ঞা এবং শিশুসুলভ চঞ্চল অনিশ্চয়তার–এমন এক জাতি, –যে, নিজের প্রতি এবং তার চারদিকে যা ঘচে চরেছে তার দিকে তাকাতে জানে এক ধীর আলস উন্নাসিকতরা সাথে, এবং পরক্ষণেই পারে কম্পিত হতে উদ্দাম আগ্নেয়গিরির আবেগে উত্তেজনায়। শহর–নগরের মার্জিত আরাম –আয়েশ আমি উপভোগ করি, তার সাথে উপভোগ করি প্রাণকে আনন্দে উদ্বেল করে তোলা স্তেপ অঞ্চরে তীক্ষ্ণ বাতাস। আমি ঘুমিয়েছি প্রাদেশিক গভর্নরদের প্রাসাদে যখন ডজন চাকর–বাকর খাড়া রয়েছে আমার হুকুম তালিম করার জন্য, আবার আমিই ঘুমিয়েছি আর্ধেক ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাফেলা–সরাখানায়, যেখানে আমাকে রাতের বেলা হুমিয়ার থাকতে হতো আমাকে বিচ্ছু কামড়ে দেবার আগেই সেগুলিকে মেরে ফেলার জন্য । বখতিয়ারী এবং কাশগাই গোত্রের মেহমান হিসাবে আমি আস্ত ভেড়ার রোস্ট খেয়েছি এবং ধনী সওদাগরদের খাবার ঘরে বসে খেয়েছি টার্কির রোষ্ট, যার ভেতরে ঠাসা থাকতো এ্যাপ্রিকট্–খুবানী। আমি মুহর্রমের ত্যাগ এবং খুন– মাতাল করা উন্মাদন লক্ষ্য করেছি, শুনেছি হাফিজের নাজুক গীতা–কবিতা যা ইরানের অতীত গৌরবের উত্তরাধিকারীরা গায় একটা বাঁশীর সুরের সংগে। আমি ইস্ফাহানের পপ্ লার বীথির নিচ দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি এবং বিশাল মসজিদগুলির সোনায় মোড়া গম্বুজ , ঝুলন্ত প্রবেশদ্বার ও মাহমূল্য বাহির্ভাগের চমৎকারিত্বে মুগ্ধ হয়েছি। ফারসী জবানও আমর কাছে আরবীর মতোই আপন হয়ে উঠালো। শহর –বন্দরে শিক্ষিত লোকদের সাথে যেমন আমি কথাবার্তা বলেছি, তেমনি আলাপ করেছি সেপাই এবং যাযাবরদের সাথে, বাজারে ব্যবসায়ীদের সাথে, মন্ত্রী এবং ধর্মীয় নেতাদের সাথে, ভবঘুরে দরবেশদের সাথে এবং রাস্তার পাশে সরাইখানায় জ্ঞান আফিমখোরদের সাথে। আমি শহরেও থেকেছি, গাঁয়েও থেকেছি, নিজের মাল পত্র নিয়ে সফডর করেছি মরুভূমি এবং বিপজ্জনক লোনা দলদলা জলাভূমির মধ্য দিয়ে। নিজেকে আমি সর্ম্পর্ণ হারিয়ে ফেলেছিলাম সেই ভেঙে– পড়া বিস্ময়কর আজব দেশের কাল–শূন্য আবহাওয়অয়। আমি ইরানী লোকদের সাথে, তাদের জীবন ও চিন্তার সাথে এমন ঘনিষ্ট হয়ে উঠলাম যে, আমি যেনো ওদের মধ্যেই জান্মেছি। কিন্তু এই দেশ, আর এই জীবন–পুরানো রত্নের মতোই, যা অস্পষ্ট আলো ছড়িয়ে দেয় সকল দিক থেকে–আমার কাছে খখনো তাতোটা ঘনিষ্ট হতে পারেনি যাতোটা আপন হয়ে উঠেছে আরবদের কাঁচস্বচ্ছ জগত।
ছয় মাসেরও অধিক আমি ঘোড়া হাঁকিয়ে বেড়াই আফগানিস্তানের অরণ্য্য, পর্বতমাল আর স্তেপ অঞ্চলেঃ হ্যাঁ, ছ’টি মাস এমিন একটি জগতে ছুটে বেড়াই যেখানে অস্ত্র প্রত্যেক মানুষই রাখে–অলংকার হিসাবে নয়;যেখানে প্রত্যেকটি কথা, প্রত্যেকটি পদক্ষেপেই সতর্কভাবে লক্ষ্য করতে হয়, পাছে না বাতাসের মধ্য দিয়ে গান গাইতে গাইতে ছুটে আসে বুলেট! কয়েকবার আমাকে, ইব্রাহিম ও আমাদের রাস্তার সাময়িক সংগীদের নিজেদের জান–বাঁচানোর জন্য লড়তে হয় ডাকাতদের সাথে। আফগানিস্তান সে সময় দুস্য–ডাকাতে গিজ্ গিজ্ করতো। কিন্তু শুক্রবার হলে দস্যুদের তরফ থেকে ভয়ের কোনো কারণ থাকতো না, কারণ রাব্বুল ‘আলামীনের ইবাদতের জন্য নির্ধারিত দিনে কাউকে খুন করা বা কারো কিছু লুট করা তার লজ্জার বিষয় মনে করতো। এক সময় কান্দাহারের কাছে আমি গুলী খেতে খেতে বেঁচে যাই , কারণ মাঠে কাজ করছে অমন এক গ্রাম্য সুন্দরী রমণীর খোলা মুখের উপর আমি লক্ষ্য করেছিলাম নিজের অজান্তে, যদিও হিন্দুকুমের উঁচু উঁচু গিরিপথে চেঙ্গিস খানের সেপাই–লস্কারের বংশধর মোংগলদের মাঝে এক কোঠায়, পর্ণ কুটীরের মেঝেয় মেজবানের তরুণী স্ত্রী আর বোনদের এক সাথে ঘুমালেও বিসদৃশ মনে হয় না। কয়েক হপ্তা আমি বাদশাহ আমানুল্লাহ খানের মেহমান হিসাবে কাটালাম তাঁর রাজধানী কাবুলে; রাতের পর রাত কাটালাম াতঁর আলিম উলামা আর পর্ডিতদের সাথে কুরআনের শিক্ষা নিয়ে আলোচা করে। এবং আরো অনেক রাত কেটেছে পাঠান খানদের কালো তাঁবুতে বসে–যেসব এলাকা নানা উপজাতির অন্তর্দ্বন্ধ্ জর্জরিত সেই এলাকাগুরি কী করে সফর করতে পারিই তারই আলোচনায়।
এবং ইরান ও আফগানিস্তানের সেই দু’বছরের প্রক্যেকটি দিনের আবির্ভাবের সংগে আমার মধ্যে েএই নিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে থাকে যে, আমি যেনো একটা চূড়ান্ত ফয়সালায় পৌছাতে যাচ্ছি!
.. .. . .. . .. .. . ..
‘কারণ ব্যাপার এই দাঁড়ালো মনসুর, মুসলমানের কীভাবে জীবন যাপন করে তা বুঝতে পারার দরুন প্রত্যেক দিনই ইসলাম সম্বন্ধে আমার জ্ঞান উন্নততরো হতে লাগলো। আমার মনে সব সময়ই সর্বোচ্চ স্থান দখন করে নিয়ে ছিলো ইসলাম..’
–‘ঈশা’র সালাতের সময় হলো’, রাতের আসমারে দিকে এক ঝলক তাকিয়ে জায়েদ বলে।
আমরা সলে দিনের সর্বশেষ প্রার্থনার জন্য কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াই, আমর তিনজন, মক্কার দিকে মুখ করে । জায়েদ এবং মনসুর পাশাপাশি দাঁড়াই এবং আম দাঁড়াই তাদের সম্মখে, জামাতের ইমাম হিসাবে (কারণ রসূলুল্লাহ প্রত্যেক দুই বা ততোদিক রোকের সমাবেশকেই জামাত বলেছেন), আমি আমার হাত দুটি তুলি উপরের দিকে এবং শুরু করি ‘আল্লাহু আকবর ’– ‘কেবল আল্লাহেই মাহন’ এবং তারপর মুসলামনেরা যেমন সবসময় করেন আমিও তেমনিভঅবে কুরআনের সূরা ফাতিহা আবৃত্তি করিঃ
দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে
প্রশংসা তো কেবল আল্লাহর
যিনি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক,
দয়াময়, পরম দয়ালু,
কর্মফল দিবসের মালিক।
আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি।
এবং কেবল তোমারই সাহায্য চাই,
আমাদিকে দেখাও সহজ–সরল পথ,
তাহাদের পথ, যাহাদিগকে তুমি অনুগ্রহ দান কিরয়াছ,
তাহাদের নয়, যাহার তোমার ক্রেধের পাত্র হইয়াছে,
তাহাদের নয়, যাহারা পথভ্রষ্ট।
এরপরে আবৃত্তি করি একশ’’ বারে নম্বর সূরা ঃ
দয়াময়, আল্লাহ এক, অদ্বৈত,
তিনি অভাবমুক্ত, সর্ববিষয়ের নির্ভর,
তিনি জনক নহেন, তিনি জাতও নহেন,
এবং তাঁহার সমতুল্য কেহই নাই।
যদি ও থাকে, তবু খুব কমই আছে সে জিনিস যা এক সংগে ইবাদত করার মতো মানুষকে পরষ্পররের অতো কাছে, অতো নিকটে এনে দেয়, আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক ধর্মের ক্ষেত্রেই এ কথঅ সত্য এবং খাস করে ইসলামের বেলায় একথা আরো বিশি সত্য, কারণ ইসলাম এই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে যে, আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যে কোনো মধ্যস্থের দরকার নেই এবং আসলে তা সম্ভবও নয়। ইসলামে কেনো প্রকার পুরোহিত ব্যবস্থা, পাদরী প্রথা এমনি সংগঠিত ‘চার্চ’ না থাকায়, প্রত্যেক মুসলমানই অনুভব করে যে, যখন সে জামাতে সালাত আদায় করে তখন সে একটি ‘কমন’ বন্দেগীতে সত্যিকারভাবে অংশগ্রহণ করছে, কেবল হাযিরা দিচ্ছে না। ইসলামে যেহেতু দীক্ষার কোন ব্যাপার নেই, তাই প্রত্যে বালেগ এবং সুস্থ মস্তিষ্ক মুসলমান যে–কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারে, তা জামাতে ইমামতিই হোক, শাদীর মাহফিল সম্পন্ন করাই হোক, অথবা মৃতের দাফন কার্য পরিচালনা করািই হোক। আল্লাহর বন্দেগীর জন্য কারো ‘বিশেষ করে মনোনীত’ হওয়ার দরকার নেইঃমুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উস্তাদ এবং নেতারা সহজ সরল মানুষ (কখনো ন্যা য্যভাবেই এবং কখনো উপযুক্ত না হয়েও ) ধর্মতত্ত্ব এবং ফিকাহতে পন্ডিত্যের জন্য যাঁদের সুনা ম আছে।
তিন
আমার ঘুম ভাঙে সূর্যোদয়ের সংগেঃ কিন্তু আমার চোখের পাতা এখনো ঘুমে ভরি। আমার মুখের উপর দিয়ে একটা নাজুক গুঞ্জন ধ্বনি তুলে বাতাস বয়ে যায়, বিলীয়মান রাত থেকে উঠন্ত দিনের ভেতরে।
ধুয়ে মুছে মুখ থেকে ঘুম তাড়ানোর জন্য আমি উঠে পড়ি। ঠান্ডা পানি যেনো একটি পরশ সুদূরের ল্যান্ডস্কেপ–আধাঁর বৃক্ষপুঞ্জে ঢাকা পর্বত এবং নদী–নালা যা চেরে এবং ব য়ে যায় এবং সবসময় থকে স্বচ্ছ, পরিষ্কার সে সকালের!..আমি আমার উরুর উপর বসি এবং মাথা পেছন দিক ঠেলে দিই, যাতে আমার মুখমন্ডল আর্দ্র থাকতে পারে অনেকক্ষণ ধরে; বাতাস মুখের আর্দ্রতার উপর মৃদু ঝাঁপটা দেয়, ঝাপটা দেয় সকল ঠান্ডা দিনের নাজুক স্মৃতি দিয়ে–অনেক –অনেক আগের শীতের দিনগুলির কথা, পাহাড়–পর্বত আর ফুলে ফেঁপে ধেয়ে চলা নদী নালার কথঅা.. . তুষার এবং চোখ ঝলাসনো শুভ্রতার মধ্যে দিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে চলার কথা.. . বহু বছর আগের সেই দিনটির শ্রভ্রতা, যখন আমি ইরানের পথহীন তুষারে ঢাকা পর্বতের উপর দিয়ে ঘোড়ায় করে চলেছি, আস্তে আস্তে সামনের দিকে ঘোড়াটিকে ধাক্কা দিতে দিতে আর ঘোড়ার প্রত্যেকটি পদক্ষেপের মানেই হচ্ছে তুষারে তার পা দেবে যাওয়া, তারপর বহু কষ্ট করে তুষারের ভেতর থেকে টেনে পা বের করা.. .।
সেদিন বিকালে, আমার মনে পড়ে, আমরা একটি গাঁয়ে বিশ্রাম করি, যার বাসিন্দারা দেখতে যাযাবরদেরই মতো। ভূমিতে দশ কি বারেটি গর্ত, তার উপর ছন–লতা ও মাটি দিয়ে নিচু গম্বুজের মতো ছাদ সেই নিঃসঙ্গ বসতিটিকে দিয়েছে এক ছুঁচোর নগরীরর চেহারা! দিক্ষণ– পূর্ব ইরানের কিরমান প্রাদেশের একটি স্থানের কথা এটি। রূপকথার পাতালবাসীদর মাতেই লোকজন হামাগুঁড়ি দিয়ে বেরিয়ে আজও বিদেশীদের দিকে তাকায় তাজ্জবের সাথে। এ ধরণের একটি মটির গম্বুজের উপর বসে এক তরুণী তার দীর্ঘ, কালো, উস্কুখুস্কু চুল আঁচড়াচ্ছে। তার জলপাই–বাদমী মুখখানা , মুদিত চোখ নিয়ে ফেরানো রয়েছে বিবর্ণ দুপুরে সূর্যের দিকে আর স গান গেয়ে চলেছে নিচু স্বরে, এক রকমের অদ্ভুদ ভাষায় ধাতুর তৈরি বাজুবন্দ ঝমঝম করছে তার হাতের কব্জিতে–কব্জিগুলি চিকন এবং মজবুত , কোনো এক আদিম অরাণ্যের বুনো জানোয়ারের পা’র ক্ষুর আর পা’র সন্ধিস্থলের মতো।
ঝিমিয়ে পড়া অংগ–প্রত্যংগগুলিকে চাঙা করে তোলার জন্য চা আর আরক গিলতে থাকি, প্রচুর পরিমাণেই গিলি সশস্ত্র পুলিশটিকে নিয়ে, যে আমাদের সংগী হিসাবে এসেছে ইব্রাহিম আর আমার সাথে। আমি যখন আবার আমার ঘোড়ার চড়লাম, তৃপ্তি মতো চা আর আরক গিলে এবং টগটগ করে সওয়ারী হাঁকিয়ে যাত্রা শুরু করলাম, সহসা যেনো গোটা বিশ্বটাই প্রশস্ত আর স্বচ্ছ হয়ে বিস্তৃত হলো আমার সম্মুখে, যেমনটি আর কখনো হয়নি আর আগে। আমি এর অনন্তকালীন রূপ দেখতে পেলাম এবং তার হ*দ–স্পন্দন অনুভব করলাম ধূসর নির্জনতায়, শুভ্র একাকীত্বে, আর মুহূত্বকাল আগেও আমার নিকট যা কিছু গোপন,লুকানো, তাই এবার প্রত্যক্ষ করছি, কখন আমাদের নিকট আল্লাহর গোপন রহস্যগুলি আপনা আপনি উন্মোচিত হবেঃ যখন এই রহস্যগুলিই সর্বক্ষণ আমাদের প্রতীক্ষায় রয়েছে আমাদেরকে তাদের নিকট খুলে মেলে ধরবার জন্য.. .।
আমাদের সম্মুখে উদ্ভাসিত হলো একটি উঁচু সমতল অঞ্চল; আর আমি, আমার ঘোড়ার পেটে বুগি মেরে ক্ষুরের আঘাতে বিচ্ছুরিত বরফ আমার চারপাশে উৎক্ষিপ্ত হতে থাকে অজস্র স্ফুলিংগের অত্যুজ্জ্বল আবরণের মতো! জমাট স্রোতের বরফের উপর গর্জাতে লাগলো আমাকে ঘোড়ার ক্ষুর.. .
আমার মনে হয়, তখনি আমি উপলন্ধি করি সেই অযাচিত করুণা, যার কথা–যদিও তখনো আমি নিজে পুরাপুরি বুঝিনি–আমাকে ফাদার ফেলিক্স বলেছিলেন বহু–বহু আগে, যখন আমি শুরু করতে যাচ্ছিলাম সেই সফর যা পরে আমার গোটা জীবনটাকেই বদরে দেয়ঃ করুণায় উদ্ভাসন–যা মানুষকে বলে দেয়–তুমিই.. ‘তুমিই’ হচ্ছো প্রত্যাশিত ব্যক্তি.. বরফের উপর দিয়ে আমার সেই ঘোড়া হাঁকিয়ে উন্মত্ত চলার আর আমার ইসলাম কবুল করার মধ্যে লেগেছিলো বছরের কিছু বেশি। কিন্তু তখনো আমি ঘোড়া হাঁকিয়ে হাঁকিয়ে চলছিলাম একটি তীরের মতো, আমার অজান্তেই সোজা মক্কার দিকে..।
.. . .. . .. . … .. .
এবং এখন আমার মুখ শুকনা আর সাত বছরের ও অধিক কাল আগের আমার সেই ইরানী শীতের দিন আবার পেছনে পড়ে যায়; পেছনে পড়ে যায়, কিন্তু হারিয়ে যায় না। কারণ সেই অতীত এই বর্তমানেরই অংশ!
মৃদু ঠান্ডা হাওয়া, আসন্ন প্রভাতেরই যা নিশ্বাস, কাঁটা ঝোপগুলিকে আন্দোলিক করে যায়। নক্ষত্রগুলি বিবর্ণ হয়ে উঠেছে । জায়েদ,মনসুর! ওঠো.. . ওঠো. তোমরা। আবার আমরা আগুন ধরাই এবং আমাদের কফি গরম করে নিই। এরপর, আমরা আমাদের উটের পর জীন চড়িয়ে দেবো এবং চলবো আরেকটি দিনের মধ্য দিয়ে সেই মরুভূমির ভেতর দিয়ে যা আমাদের জন্য প্রতীক্ষা করছে দু’বাহু মেলে।
জীন
এক
সূর্য তখন ডুবু ডুবু। হঠাৎ একটি মোটা কালো সাপ এঁকে–বেঁকে গড়াগড়ি যায় আমাদের রাস্তার উপর; সাপটি প্রায় শিশুর বাহুর মতো পুরু এবং লম্বায় হবে হাতেক। থেমে গিয়ে সাপটি আমাদের দিকে তার মাথা তোলে। অনেকটা স্বয়ংক্রিয় গতিতে আমি পিছনে নেমে পড়ি জীন থেকে, আমার ঘাড় থেকে হালকা বন্দুকটি নামিয়ে হাঁটু গেড়ে বসি েএবং তাক করি, আর সেই মুহূর্তের আমি আমার পেছনে শুনতে পাই মানুষের কন্ঠস্বর–
–‘গুলি করবেন না.. . গুলীঅ।’ কিন্তু আমি এরি মধ্যে বন্দুকের ঘোড়া টিপে দিয়েছি; সাপটি ঝাকুনি খায়, গড়াগড়ি যায়.. . তারপর সব শেষ!
মনসুর তার নারাজ মুখ আমার উপর তুলে ধরেঃ সাপটিকে মারা আপনার উচিত হয়নি.. . আর যা–ই হোক সূর্যাস্তের সময়ে তা নয়ই; কারণ , এ সময়ে জিনেরা বেরিয়ে আসে মাটির নিচ থেকে এবং প্রায়ই ওরা সাপের সুরত ধরে!
আমি তার কথায় হেসে ফেলি এবং বলি, ‘মনসুর, তুমি কি সেকালের মেয়েরা সাপরূপী জিনের যে–সব গাল গল্প বলতো, সেগুলি সত্যি বিশ্বাস করো?
–‘নিশ্চয় আমি জিনে বিশ্বাস কির। আল্লাহর কিতাবে কি তার উল্লেখ নেই? তবে ওরা যেসব সুরতে মাঝে মাঝে আমাদের নিকট আসে আমি তা জানি না.. তবে আমি শুনেছি, ওরা অতি বিস্ময়কর এবং অপ্রত্যাশিত সুরত গ্রহণ করতে পারে.. .
তোমার কথা ঠিক হতে পারে মনসুর, আমি মনে মনে বলি, কারণ আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় যেসব বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করতে পারে সে –সবের বাইরেও যে অমন সব অস্তিত্ব রয়েছে যা আমাদের ইন্দ্রিয়ের অগোচর, এ–ধারণা কি সত্যি খুব দূরকল্পনা? এটা কি এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক তুকাব্বরি নয়, যা আধুনিক মানুষকে সে নিজে যা দেখতে ও মাপতে পারে তাছাড়া অন্য কোনো রকম প্রাণ–সত্তার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করতে শেখায়? জিনেরা যাই–হোক, তাদের অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রমাণ করা যায় না, কিন্তু তাই বলে বিজ্ঞান অমন জীব–সত্তার অস্তিত্বের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দিতে পারে না, যাদের জীবনের নিয়ম–কানুন এমন সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে যে, আমাদের নিজস্ব ইন্দ্রিয়গুলি অতি বিরল কোনো অবস্থায়ই কেবল তাদের সাথে যোগ স্থাপন করতে পারে। একি সম্ভব নয় যে, এসব অজ্ঞাত জগত ও আমাদের জগতের মধ্যে কখনো কখনো এ ধরনের রাস্তা ক্রসিং হয় তখন অদ্ভুত সব অভিব্যক্তি ঘটে, যাকে আদিম খেয়াল, ভূত–প্রেত, দেও–দানে এবং এ ধরণের অন্যান্য অতিপ্রাকৃত অভিব্যক্তি বলে ব্যাখ্যা করেছে?
আমি যখন আবার আমার উটে চড়ি, মনে মনে এই প্রশ্নগুলি আওড়াতে আওড়াতে এমন এক মানুষের অবিশ্বাসের অর্ধস্মিত হাসি হেসে হেসে যার পরিবেশ ও শিক্ষা–দীক্ষা, যারা সবসময়ই প্রাকৃতির একেবারে কাছে আছে, তাদের থেকে তাকে স্থূল চর্ম করেছে!জায়েদ গম্ভীর মুখে আমাকে বলে সাপটাকে মারা আপনার ঠিক হয়টি। একবার বহু আগে ইবনে সউদ হাইল কবজা করার পর যখন আমি সে শহর ত্যাগ করেছি, আমি আমার ইরাকের পথে এরি মতো একটি সাপকে গুলি করে মেরেছিলাম। সূর্য তখন ডূবছে। এর কিছুক্ষণ পরেই যখন আমরা মাগরিবের সালাতের জন্য আসি, হঠাৎ আমি আমার পা দু’টির উপর সীসার ভার অনুভব করি, আর মাথার ভেতরে জ্বালা; উচু থেকে পড়ন্ত পানি মতো গর্জন করতে লাগলো এবং অংগ–প্রত্যংগুলি হয়ে উঠলো আগুন; আমি দাঁড়াতে পারলাম না সোজা হয়ে, একটি খালি বস্তার মতো ধপ করে পড়ে গেলাম জমিনের উপর; আমার চারদিকে আঁধার হয়ে উঠলো সমস্ত কিছু। আমি জানি না, আমি কতোক্ষণ সেই অন্ধকারে ডুবেছিলাম, তবে আমার মনে পড়ছে, শেষপর্যন্ত আবার আমি পায়ের উপর ভর করে দাঁড়িয়েছিলাম। অচেনা একটি মানুষ আমার ডান পাশে দাঁড়ালো, আরেকজন দাঁড়ালো বাঁ পাশে এবং ওরা আমাকে নিয়ে গেলো মস্ত বড়ো একটি আলো–আঁধারিতে রহস্যময় হল ঘরে–সেখানে ভর্তি ছিলো লোকজন আর ওরা চঞ্চলভাবে পায়চারি করছিলো এবং কথা বলছিলো একে অপরের সাথে। কিছুক্ষণ পর আমি বুঝতে পারলাম–ওরা দু’টি সম্পূর্ণ পৃথক দল, যেমন হয়ে থাকে আদালতের সামনে। পশ্চাদভুমিতে মেঝে থেকে কিছুটা উঁচু একটা মঞ্চের উপর বসে আছেন খুবই ছোট আকৃতির এক বৃদ্ধ। মনে হরো, ইনি একজন বিচারক অথবা সর্দার কিংবা ঐ রকম একটা–কিছু এবং মূহুর্তের মধ্যেই আমি জানতে পারলাম, আমিই আসামী।
একজন বললো,-‘ও তাকে হত্যা করেছে সূর্য ডুবার আগে রাইফেলের গুলীতে, ও অপরাধী।’ বিবাদী পক্ষের একজন পাল্টা জবাব দেয়, ‘কিন্তু ও জানতো না ও কাকে হত্যা করছে এবং রাইফেলের ট্রিগার টিপার সময় ও আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেছিলো। ‘কিন্তু বাদী পক্ষ তখন চিৎকার করে উঠলো,-‘না,ও তা উচ্চারণ করেনি।’ –যার জবাবে বিবাদী পক্ষের সবাই একত্রে কোরাসে বলে উঠলো, ‘সে উচ্চারণ করেছিলো–সে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেছিলো’ এবং এভাবেই তা চলতে লাগলো কিছুক্ষণ, একদল আগাচ্ছে আরেকদল পিছাচ্ছে, অভিযোগ আর খন্ডন চললো পালাক্রমে এবং শেষপর্যন্ত মনে হলো, আসামী পক্ষের সমর্থকরাই যেনো জিততে চলেছে। পেছনদিকে বসা বিচারক তাঁর রায় ঘোষণা করলেন এবারঃ ‘ও জানতো না, ও কাকে হ্ত্যা করছে এবং তখন আল্লাহর গুণ–গান করছিলোঃ ওকে যেখানে থেকে এনেছো সেখানে রেখে এসো।’
এবং যে লোক দু’টি আমাকে বিচার কক্ষে নিয়ে এসেছিলো ওরাই আবার আমাকে ওদের বাহুর নিচে চেপে ধরে, একই পথ দিয়ে নিায়ে গেলো সেই বিশাল অন্ধকারের মদ্যে যা থেকে আমি বের হয়ে এসেছিলাম এবং আমাকে ওরা জমিনের উপর শুইায়ে দিরো। আমি আমার চোখ দু’টি মেলি এবং দেখতে পাই, আমার দু’পাশে স্তূপীকৃত করে রাখা কয়েক গমের বস্তার মাঝখানে আমি পড়ে আছি, আর বস্তার উপর মেলা রয়েছে এক টুকরা তাঁবুর কাপড়, সূর্যের রশ্নি থেকে আমাকে বাঁচানোর জন্য। মনে হরো তখন বেলা পূর্বাহ্ণের পয়লা দিক এবং আমার সাথীরা এখানে থেমেছে। দুরে দেখতে পেলাম আমাদের উটগুরি চরছে একটি পাহাড়ের ঢালূতে। আমি হাত তুলবার চেষ্টা করি, কিন্তু আমর অংগ–প্রত্যংগগুলি একেবারে ক্লান্ত। আমার সাথীদের একজন যখন তার মুখ নিচু করে আমার উপর ধরলো, আমি বললাম, ‘কফি.. .’, কারণ আমি কাছেই কফি গুঁড়া করার পাত্রের আওয়াজ শুনতে পেলাম।
আামর বন্ধু লাফিয়ে উঠলো, ‘কথা বলছে.. কথা বলছে.. . ফিরে এসেছে ও! –এবং ওরা আমার সন্মুখে নিয়ে এরো টাটকা গরম কফি।
আমি জিজ্ঞাস করি, আমি কি সারা রাতিই বেহুঁশ ছিলাম এবং ওরা উত্তারে বলালো, ‘সারা রাত! পুরা চারটা দিন তুমি একটু নড়োনি! কেবল একদিন আমরা তোমাকে একটি উটের উপর চাপিয়েছি বস্তার মতো, রাতে আবার নামিয়েছি উট থেকে। এবং আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, এখানেই তোমাকে কবর দিতে হবে। কিন্তু তারিফ তাঁরই যিনি জীবন দেন ও নেন–চিরঞ্জীব, যারঁ মৃত্যু নেই.. .
–‘কাজেই আপনি দেখতে পাচ্ছেন চাচা সন্ধ্যায় সময় কারো সাপ মারা উচিত নয়।
এবং যদিও জায়েদের বর্ণনায় আমার অর্ধেক মন তখনো হাসছে, কিন্তু বাকি অর্ধেকটা মনো হলো, ঘনায়মান সন্ধ্যায় অদৃশ্য শক্তিগুলির জাল –বোনা প্রত্যক্ষ করচে, সূক্ষ্ণ ধ্বনি এক লোহমর্ষক শোরগাল, যা শ্রুতি গ্রাহ্য নয় আর আমরা প্রত্যক্ষ করছি চারপাশে হাওয়ায় একটা শক্রতার নিশ্বস এবং সূর্য ডোবার কালে সাপটিকে মেরে ফেলার জন্য অনুশোচনার একটি অস্পষ্ট অনুভূকি হলো আমার..।
দুই
‘হাইল’ ছেড়ে আসার তৃতীয় দিনের বিকালে আমরা আর্জার কুয়ায় আমাদের উটগুলিকে পানি খাওয়ানোর জন্য আনি, নিচু নিচু পাহাড়ে বেষ্টিত প্রায় বৃত্তাকার একটি উপত্যকায়; মিঠা পানিতে ভর্তি বৃহৎ কুয়া দু’টি উপত্যকার একেবারে মাঝখানটায় অবস্থিত। এ দু’য়ের প্রত্যেকটি একটি কবিলার সামাজিক সম্পত্তি–পশ্চিমেরটি ‘হারব’ নামক গোত্রের এবং পুবেরটি মুতায়েরদের। এদের চারপাশের মাটি হাতের তালুর মতোই শূণ্য; কারণ রোজ বিকারে শত শত উট আর ভেড়াদের দূরদূরান্তের চারণক্ষেত্র থেকে এখানে হাঁকিয়ে নিয়ে আসা হয় পানি খাওয়ানো জন্য এবং এই জমিনে ঘাসের যে কচি পাতাটিই গজাই, তা একটু দম ফেলার ফুরসৎ পর্যন্ত পায় না, তার আগেই আলতো করে কামড়ে তুলে সাবাড় করে দেয় ওরা।
আমরা পৌঁছানোর পর দেকতে পাই গোটা উপত্যকাটি গিজ–গিজ করছে জীব– জানোয়ারে এবং রৌদ্র–স্লাত পাহাড়গুলির মাঝখান দিয়ে দেখা দিরো পালের পর পাল ভেড়া এবং উট গাঁধা। কুয়াগুলির চারপাশে ভীষণ ভীড়, চাঞ্চল্য ও শোরগোল; কারণ, অতোগুলি জানোয়ারের পিয়াস মিটানো সহজ। পশুচারীরা লম্বা রশিতে ঝুরানো চামড়ার থলিতে করে পানি তোলে এবং তার সাথে এক ধরনের গান গায় রশি ধরে, ওরা যে একেকটা টান দিচ্ছে সেই টানগুলির মধ্যে সংগতি ও সমতা রাখার জন্যঃ কারণ বালতিগুলি মস্ত বড়ো এবং পানিতে ভর্তি হবার পর এগুলি অতো ভারি হয়ে ওঠে যে, কুয়ার তলা থেকে টেনে তুলতে বহু হাতের দরকার হয়।
যে কুয়াটি আমাদের সবচেয়ে নিকটে–যা মুতায়ের কবিলার সম্পত্তি–আমি শুনতে পাই সেখানে থেকে ওরা গান গাইছে উটগুলিকে লক্ষ্য করে–
‘গান করে এবং বাকি রেখো না পানি,
রহমতে ভরপুর এই কুয়া, এর নেই কোনো তল!
লোকজনের অর্ধেকে গায় প্রথম পদটি এবং বাকি অর্ধেকে গায় দ্বিতীয় পদটি–দুটিই তারা আবৃতিত্ত করে চলে দ্রুততালে, যাতোক্ষণ না বালিতিটি উঠে আসে কুয়ার কাঁধির উপর; এরপরের কাজ রমণীদের; ওরা পানিটা ঢালে চামড়ার ডোঙায়। আর বহু উট এক সাথে ঠেলাঠেলি করে ঝুঁকে পড়ে সামনের দিকে, ডাক ছেড়ে সশব্দে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে, উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে, ভীড় করে ডোঙাগুলির চার–পাশে এবং মনে হয়, মানুষের সান্তনার ডাক–‘হু উইহ্–হু উইহ্’ পারছে না ওদের শান্ত করতে। উটগুরির একেকটি তার লম্বা নমনীয় গ্রীবা তার সংগীদের ফাঁক দিয়ে বা উপর দিয়ে ঠেরে দেয় সামনের দিকে, যতো শ্রীঘ্র সম্ভব পানির পিয়াস মিটানোর জন্য; হালকা বাদামী, গাঢ–বাদামী, হলদে–সদা, কালো–বাদামী এবং মধ–বর্ণ কতকগুরি শরীর এদিক ওদিক দুলছে, ঠেলাঠেলি করছে, আন্দোরিত হচ্ছে,, ভিড় করছে আর জানোয়ারের ঘাম ও মূত্রের কড়া উৎকট গন্ধে ভরে তুলছে বাতাসকে। এরি মধ্যে বালতি আবার ভর্তি করা হয়ছে এবং আরো আরেকটি দুই ছত্রের কবিতা আবৃত্তির সংগে সংগেই রাখলেরা টেনে তুললো বালিতিটিঃ
‘কিছুই দূর করতে পারে না উাটের পিয়াস
পারে কেবল আল্লাহর রহমত আর রাখারের শ্রম।
এবং সারাটা জায়গা জুড়ে আবার শুরু হয় চাঞ্চল্য এবং পানি খাওয়ার দৃশ্য আর হাঁক–ডাক এবং গানের হুঞ্জরণ।
একজন বুড়ো মানুষ ইদারার কিনারের উপর দাঁড়িয়ে তার বাহু প্রসাতি করে আমাদের দিকে আর ডেকে বলেঃ ‘ওগো মুসাফিরেরা, আল্লাহ, তোমাদের হায়াত দারজ করুন। আমাদের মেহমানদারী গ্রহণ করো।’–এরপর ইদারার চারপাশের ভিড় থেকে কয়েকজন লোক ছুটে আসে আমদের দিকে। ওদের একজন আমার উটের লাগাম ধরে উটটিকে হাঁটু গাড়িয়ে বসায়, যাতে আমি সোয়ারী থেকে নামতে পারি আরামে। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে একটি পথ করা হলো যেনো আমাদের উটগুলি পৌঁছুতে পারে পানির ডোঙার কাছে এবং রমণীরা পানি ঢারতে শুরু করে উটগুরির জন্যঃ কারণ আমরা হচ্ছি মুসাফির আর সে কারণে আমাদের দাবি অগ্রগণ্য!
জায়েদ অনেকটা আপন মনে যেনো নিজেকে শোনানোর জন্যই , ‘হারব এবং মুতায়ের খান্দান পরস্পর যুদ্ধ করার পর এখন কী চমৎকার শান্তিতে বসবাস করছে! (কারণ , এ তো মুতায়ের কবিলার বিদ্রোহের পর তিন বছরের কথা যখন হারব কবিলা ছিলো বাদশাহর সবচাইতে বিশ্বস্ত সমর্থকদের অন্যতম) । আপনার কি মনে আছে চাচা, আগের বার যখন আমরা এখানে ছিলাম–কেমন করে আমরা রাতের বেলা আরজা অতিক্রম করেছিলাম অনেক ঘুরে, একটি বৃত্তের আকারে, এই কুয়াগুলি কাছে আসতে সাহস না করে–এখানে দোস্ত না দুশমন আছে, তা জানতাম না বলে..?
জায়েদ স্মরণ করছে ১৯২৮ –২৯ এর প্রচন্ড বেদুঈন বিদ্রোহের কথা–একটি রাজনৈতিক নাটকের চূড়ান্ত পর্যায়ে–যার ফলে, ইবনে সউদের রাজ্যের বুনিয়াদ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিলো এবং কিছুকালের জন্য আমিও তাতে নিজেকে জড়িত করে ফেলেছিলাম।
.. .. .. .. . .. . . .
১৯২৭ সনের যবনিকা উঠলো, তখন সৌদী আরবের বিশাল এলাকায় শান্তি বিরাজ করছে, ক্ষমতারত জন্য বাদশাহ ইবনে সউদের সংগ্রাম তখন শেষ হয়েছে। কোনো প্রতিদ্বন্ধী শাহী খান্দান নযদে তাঁর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে আর দাবি তুলছে না। হাইল এবং শাম্মারদের এলাকা এখন তাঁরই এবং ১৯২৫ সনে হেজাজ থেথে শরীফীয় খান্দানের বহিষ্কারের পর হেজাজ ও এখন তাঁর। সে সময়ে বাদশাহর আগেকার বছরগুলিতে বাদশাহর জন্য প্রচুর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বাদশাহর কর্মচারী হিসাবে আদ্–দাবীশ নিজের বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বার বার তিনি প্রমাণ করেন তাঁর আনুগত্যঃ ১৯২১ সনে তিনি বাদশাহর পক্ষে হাইর জয় করেন; ১৯২৪ সনে তিনি এক দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেন ইরাকের অভ্যন্তরে, যেখান থেকে ব্রিটিশের ছত্রছায়ায় শরীফ পরিবার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিলো ইবনে সউদের বিরুদ্ধে। ১৯২৫ সনে তিনি মদীনা জয় করেন এবং জেদ্দা জয়ে পালন করেন একটি চূড়ান্ত ভুমিকা। আর এখন, ১৯২৭ সানের গ্রীষ্মে তিনি তাঁর এই সব বিজয় –মাল্য নিয়ে আরতাবীয়ার ইখওয়ান উপনিবেশে বিশ্রাম করেছেন, যা ইরাক সরহদ থেকে খুব দূরে নয়।
বহু বছর ধরে ঐ সীমান্তটি ছিল প্রায় নিরবিছিন্ন বেদুঈন হামালার ক্ষেত্র। এই হামলা চালিয়ে এসেছে চারণভূমি ও পানির সন্ধানে বেরিয়ে পাড় বিভিন্ন গোত্র ও কবিলার লোকেরা । ইবনে সাউদ এবং মানডেটারী শক্তি হিসাবে ইরাকের জন্য দায়ী ব্রিটিমের মধ্যে উপর্যুপরি অনেকগুলি চুক্তির মাধ্যমে স্থির হলোঃ এ ধরণের অনিবার্য হিজরতের সম্মুাখে কোনা বাধা সৃষ্টি করা চলবে না। এবং নযদ–ইরাক সীমান্তের কোনো পাশেই কোন প্রাচীর বা কিল্লা তৈরি করা চলবে না। অবশ্য ১৯২৭ সনের গ্রীষ্মের বিসায়ার সীমান্তবর্তী কুয়াগুরির নিকট ইরাক সরকার একটি কিল্লা তৈরি করে তাতে সৈন্য মোতয়েন করে এবং সীমান্ত বরাবর আরো কিল্লা তৈরির সিদ্ধান্তের কথা সরকারীভঅবে ঘোষণ করে। এর ফলে উত্তর নযদের বিভিন্ন কবিলার মধ্যে একটি অস্বস্থির তরংগ ছড়িয়ে পড়ে।দেখতেপেরা তাদের অস্তিত্বেই বিপন্ন ;কারণ যেসব কুয়ার উপর তার সম্পূর্ণ নির্ভর করতো সেগুলি থেকো তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইবনে সউদ খোলাখুলি এই চুক্তি ভংগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, যার জন্য কয়েকমাস পরে ইরাকে অবস্থান রত ব্রিটিশ হাই কমিশনারের কাছ থেকে পেলেন কেবল একটি ছলনা পূর্ণ জবাব।
সদা উদ্যেগ কর্মচঞ্চল ফয়সল আদ দাবীশ মনে মনে বললেঃ ব্রিটিশের সাথে ঝগড়া শুরু করা বাদশাহর জন্য সুবিধা জনক না হতে পারে। তবে সেটা ‘আমিই করবো’। এবং ১৯২৭–এর অক্টোবরের শেষ দিনগুলিতে তিনি তাঁর ‘ইখওয়ানে’র দলপতি হিসাবে বেরিায়ে পড়লেন, বিসায়ার কিল্লা আক্রমণ করে তা ধ্বংস করে দিলেন, কিল্লার ইরাকী গ্যরিসনকে কোনো পাত্তাই দিলেন না। অকুস্থলের উপর ব্রিটিশ হাওয়াই জাহাজ দেখা গেলো এবং পরিস্থিতি জরিপ করে ফিরে গেলো, তাদের স্বভাবের বিরুাদ্ধে, একটি বোমাও না ফেরে। তাদের জন্য সহজ হতো হামলা প্রতিরোধ করা। (এ অধিকার তাদের ছিলো ইবনে সউাদের সংগে তাদের চুক্তির বদৌলতে) এবং পরে কূটনৈতিক আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে কিল্লাগুলির সমস্যা সমাধান করা। ব্রিটিশ–ইরাকী সরকার কী সত্যি বিবাদের আশু এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের উৎসুক ছিলেন!
উত্তর নযদের কবিলাগুরি থেকে ডেপুটেশন এলো ইবনে সউদের কাছে ইরাকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর দাবি নিয়ে। ইবনে সউদ এ ধরনের সব দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন, আদ্–দাবীশকে সীমালঙ্গনকারী বলে ঘোষণা করেন এবং সীমান্ত এলাকাগুরির উপর কড়া নযর রাখার জন্য হাইলের ‘আমীর’কে আদেশ দেন। বাদশাহ্ ‘ইখওয়ানে’র অধিকাংশ সদস্যকে আ র্থিক ভাতা দিয়ে আসছিলেন; তাদের মধ্যে আদ্–দাবীমের নিয়ন্ত্রণাধীন কবিরাগুলির সদস্যদের ভাতা এখন তিনি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিলেন। খোদ আদ্ –দাবীশকে নির্দেশ দেওয়া হলো। আরতাবিয়া থেকে বাদশাহর সিদ্বান্তের জন্য অপেক্ষা করতে। ইরাক সরকারকে এই সব ব্যবস্থা সম্পর্কে সরকারীভাবে অবহিত করা হলো এবং জানিয়ে দেওয়া হলো যে, আদ–দাবীশকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। এর সাথে ইবনে সউদ এ দাবিও করেন যে, ভবিষ্যতে ইরাকের সীমান্ত চু্ক্তিগুলি আরও কঠোরভাবে পালন করতে হবে।
এভাবে সহজেই এই নতুন সংঘর্ষের অবসান ঘটানো সম্ভব ছিলো, কিন্তু ঘটনা যখন এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিলো তখন ব্রিটিশ হাই কমিশনার ইবনে সউদকে জানালেন, তিনি আদ্–দাবিশের ‘ইখওয়ান’কে (যারা অনেক আগেই ফিরে গিয়েছিলো তাদের নিজ অঞ্চলে) শাস্তি দেবার এবং তাদের বাদশাহর প্রতি তাদেরকে আনুগত্যশীল হতে বাধ্য করার জন্য এক স্কোয়াড্রান বিমান পাঠাচ্ছেন। সে সময়ে রিয়াদে কোন টেলিগ্রাম অফিস ছিলো না। তাই বাদশাহ ইবনে সউদ তাড়াহুড়া করে এক পত্রবাহককে পাঠান বা্হরাইনে আর সেখান থেকেই বাগদাদে পাঠানো হলো একটি টেলিগ্রাম, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এবং চুক্তির কথা উল্লেখ করে, যাতে উভয় পক্ষকে সীমান্ত অতিক্রম করে আইন ভংগকারীকে পশ্চাদ্ধবন বারণ করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বললেন, আদ–দাবীশের উপর জোর করে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটিশ সাহায্যের কোন প্রয়োজন তাঁর নেই এবং সবশেষে তিনি এই হুশিয়ারি উচ্চারণ করলেন–নযদ অঞ্চলের উপর বিমান হামলা হলে ইখওয়ানদের মধ্যে তার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হবে; কারণ. ইখওয়ানের সদস্যরা যথেষ্ট পরিমানে উত্তেজিত ও বিক্ষুদ্ধ হয়ে আছে!
এই হুশিয়ারি কে উপেক্ষা করা হলো। ১৯২৮ এর জানুয়ারির শেষের দিকে, বিসায়ার ঘটনার তিন মাস পরে এক সোকয়াড্রান ব্রিটিম বিমান সীমান্ত অতিক্রম করে নযদী এলাকায় বোমা ফেলে মুতায়েবীর বেদুঈন তাঁর বসতিগুলি ধ্বংস করে এবং নারী–পুরুষ ও গৃহপালিত জীব –জানোয়ারকে নির্বিচারে হত্যা করে। এর ফলে উত্তর অঞ্চলের সকল ইখওয়ান ইরাকের বিরুদ্ধে বদরা নেওয়ার জন্য তৈরি হতে শুরু করে। বিভিন্ন কবিলার মধ্যে কেবল ইবনে সউদের বিপুল মর্যাদা ও ইজ্জতের জন্যই যথাসময়ে এই অভিযান থেকে যায় এবং ছোট –খাটো কয়েকটি সীমান্ত সংঘর্ষেরর মধ্যে সীমিত থাকে।
ইত্যবসের বিসিয়ার বিধ্বস্ত কিল্লাটি ব্রিটিশ সরকার আবার চুপি চুপি নির্মাণ করে এবং সীমান্তের ইরাকী এলাকায় আরো নতুন কিল্লা তৈরি হয়।
.. . .. . .. . .. . ..
ফয়সাল আদ্–দাবীশকে রিয়াদে আহবান করা হলে তিনি তাঁর কাজের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য রিয়াদে আসতে অস্বীকার করলেন–কারণ, তাঁর মতে, তিনি যা করেছেন বাদশাহর স্বার্থেই করেছেন। তাঁর তিক্ততা আরো বেড়ে গেলো। ব্যক্তিগত বিক্ষোভের দরুণ। ফয়সাল আদ্–দাবীশ, যিনি এতো বিশ্বস্ততার সংগে চমৎকারভাবে বাদশাহর খিদমত করেছেনে, তিনি তো আরতাবিয়ার ‘আমীর’ মাত্র বিপুর পরিমাণ জনবসতি সত্ত্বেও আসলে যা একিট বর্ধিষ্ণু গ্রামের বেশি কিছু নয়। হাইল বিজয়ে চূড়ান্ত ফয়সারা হয় তাঁরই নেতৃত্বে। কিন্তু তাঁকে নয়, বাদশাহর চাচাত ভঅই ইবনে মুসাদকে নিযুক্ত করা হলো হাইলের ‘আমীর’। হেজাজ অভিযানকালে আদ—দাবীশই মাসের পর মাস মদীনা অবরোধ করে রাখেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন; কিন্তু তাঁকে তার ‘আমীর’ করা হলো না। ক্ষমতার জন্য তাঁর তীব্র কামনা তাঁকে অস্থির করে তোলে। তিনি মনে মনে বললেন, ‘ইবনে সউদ আনাজা কাবিরার লোক, আর আমার কবিরা হচ্ছে মুতায়ের– খান্দানের, আভিজাত্যের দিক দিয়ে আমরা একে অপরের সমান; আমি কেন ইবনের সউদের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেবো?
এই ধরনের চিন্তা –ভাবনা ও যুক্তি চিরদিনই আরবের ইতিহাসের অভিশাপ হয়ে রয়েছেঃ কেউ স্বীকার করবে না যে, অন্য কেউ তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
একের পর এক অন্যান্য নাখেশ ইখওয়ান সর্দারের ভুরে যেতে লাগলো ইবনে সউদর কাছে তারা কত ঋণী! এঁদের মধ্যে ছিলেন শক্তিশালী আতায়বা কবিরার শায়খ এবং নযদ অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম ইখওয়ান বসতি ঘাটঘাটের আমির সুরতান ইবনে বুজাদ। এই সুলতান ১৯১৮ সনে শরীফ হোসাইনের ফৌজের বিরুদ্ধে তারবার যুদ্ধে জয়লাভ করেন। ১৯২৪ সনে তিনি জয় করেন তায়েফ ও মক্কা। কেন তিনি কেবল ঘাটঘাটের ‘আমীর’ হয়েই সন্তুষ্ঠ থাকবেন? কেন তাঁকে নিদেনপক্ষে তায়েফের ‘আমীর’ করা হলো না? ফয়সাল আদ্–দাবীশের মতো তাঁরও মনো হলো, তাঁর বিবেচনায় যা তাঁর প্রাপ্য তা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আর সুলতান ইবনে বুজাদ যেহেতু আদ্–দাবীশেল ভগ্নিপতি, তাই তাদের দুজনের জন্য ইবনে সউদের বিরুদ্ধে একমত হয়ে দাঁড়ানো একান্তই যুক্তিসংগত মনে হলো।
১৯২৮ –এর শরতকালে এসব বিবাদ–বিসংবাদ সমাধানের উদ্দেশ্যে রিয়াদে এক সম্মেলনে ডাকা হলো সরদার ও ‘আলিমদের’ –প্রায় সকল কবিলার সরদারেরাই এলো, ইবনে বুজাদ ও আদ্–দাবীশ ছাড়া। বিরোধিতায় উগ্র–অনমনীয় ইবনে বুজাদ ও আদ—দাবীশ ঘোষণা করলেন, ইবনে সউদ একজন পাষন্ড, প্রচলিত ধর্মমতে বিরুদ্ধচারী; কারণ তিনি কি কাফিরদের সংগে চুক্তি করেননি? এবং আরবদের দেশে কি মোটর–কার, টেলিফোন, বেতার–যন্ত্র ও উড়োজাহাজের মতো শয়তানের যন্ত্রপাতি প্রবর্তন করেননি? রিয়াদে ‘যেসব আলিম’ একত্র হলেন, তাঁরা এক বাখ্যে ঘোষণা করলেনঃ এসব নতুন কারিগরী যন্ত্রপাতি যে কেবল অনুমোদনের যোগ্য তাই নয়, বরং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও পরম বাঞ্ছনীয়, কারণ, এসবের সাহায্যে মুসলমানদের জ্ঞানের পরিসীমা বর্ধিত হচ্ছে িএবং তাদের ক্ষমতা বাড়ছে। তারা ইসলামের নবীর বরাত দিয়ে আররা ঘোষণা করলেন, অমুসলমান শক্তির সংগে চুক্তি ও একই রূপ বাঞ্ছনয়–যদি তা মুসলমানদের জন্য নিয়ে আসে শান্তি ও মুক্তি।
কিন্তু দুই বিদ্রোহী সরদার তাদের নিন্দাবাদ চালিয়ে যেতে থাকেন এবং যেসব সরলমতি ইখওয়ান ইবনে সউদের বিভিন্ন কাজে শয়তানের আছড় ছাড়া অন্য কিছু দেখার মতো যথেষ্ট জ্ঞান রাখতো না, তাদের কাছ থেকে ওঁরা পেতে লাগলেন স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া। ইবনে সউদ যে আগে ইখওয়ান’কে শিক্ষিত করে তুরতে এবং তাদের ধর্মীয় জোশকে নিশ্চিত লক্ষ্যের দিকে ঘুরিয়ে দিাতে পারেনি তারই মর্মান্তিক ফল এবার ফলতে শুরু করলো–
নযদের স্তেপ অঞ্চলগুলি গুঞ্জরিত হতে লাগলো মৌচাকের মতো। দ্রুতগতিতে উষ্ট্রীর পিঠে সওয়ার হয়ে রহস্যময় জাসুসেরা ছুটাছুটি করতে শুরু করলো এক কবিলা থেকে আরেক কবিলার মধ্যে; দূরবর্তী ইঁদারাগুলিতে সরদারেরা গোপন বৈঠক করতে লাগলো। শেষমেষ বাদশাহর বিরুদ্ধে আন্দোলনে ফেটে পড়লো প্রকাশ্য বিদ্রোহে–এবং তাতে মুতায়ের ও আতায়েব কবিলা ছাড়া আরো বহু কবিলা জড়িত হয়ে পড়রো। বাদশাহ কিন্তু অবিচলিত, তিনি সহানুভূতির সাথে সব কিছু বুঝবার চেষ্টা কররেন। তিনি বিদ্রোহী কবিলা–সরদারদের নিকট কাসেদ পাঠিয়ে তাদের যুক্তি দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলেন; কিন্তু তাতে কোনো ফল হলো না। মধ্য ও উত্তর আরব ব্যাপক গেরিলা যুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ারো। এককালে দেশে যে নিরাপত্তা ছিরো প্রায় প্রবাদ বাক্যের বিষয় তা লোপ পেলো এবং নযদে পুরা বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লো; দলে দলে বিদ্রোহী ইখওয়ান যেসব গ্রাম কাফিলা এবং কবিলা বাদশাহর প্রতি অনুগত ছিলো, তাদের উপর আঘাত হানতে হানতে এই এলাকার ভেতর দিয়ে সকল দিকে ধাবিত হলো ঝড়ের মতো।
বিদ্রোহী এবং অনুগত কবিলাগুলির মধ্যে স্থানীয় অসংখ্য ছোটো ছোটো সংঘর্ষের পর,১৯২৯–এর বসন্তকালে মধ্য নযদের সিবিলা ময়দানে একটি যুদ্ধে চূড়ান্ত ফয়সালা হয়। এক পক্ষ বাদশাহ তাঁর বিশাল ফৌজ নিয়ে, অন্যদিকে কবিলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দরের সমর্থনপুষ্ট মুতায়ের ও আতায়বা কবিলা। এই যুদ্ধে বাদশাহ জয়ী হন। ইবনে বুজাদ বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁকে জিঞ্জীরে বেঁধে আনা হলো রিয়াদে–আদ–দাবীশ যখম হন মারাত্মকভাবে। বলা হলো, আদ–দাবীশ আর বাঁচবেন না। আরবের বাদশাহদের মধ্যে সবচাইতে নরম ও কোমল ইবনে সউদ তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসককে পাঠালেন তাঁর চিকিৎসার জন্য এবং সিরিয়ার সেই তরুণ ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখতে পেলেন কলিজায় গুরুতর যখম। তিনি বললেন, আদ্–দাবীশ বড় জোর এক সপ্তাহ বাঁচতে পারেন। ডাক্তাতের মুখে এ কথা শোনার পর বাদশাহ স্থির করলেনঃ আমরা চাই যে, তার মৃত্যু শান্তিতে হোক, সে তার প্রাপ্য শাস্তি পেয়েছে আল্রাহর কাছ থেকে। তিনি আহত দুশমনকে আরতাবিয়ায় তার পরিবারের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্য আদেশ দিরেন।
কিন্তু আদ –দাবীশের মৃত্যুর কোনো লক্ষণই দেখা গেলো না। তরুণ ডাক্তার তাঁর যখম যতোটা গুরুতর মনে করেছিলেন আসলে তা তার কাছাকাছিও ছিলো না। কয়েক সপ্তহের মধ্যেই যথেষ্ট সেরে উঠে তিনি পালিয়ে গেলেন আরতাবিয়া থেকে, প্রতিশোধ গ্রহনের দৃঢ়তরো প্রতিজ্ঞা নিয়ে, আগরে চাইতেও।
.. . .. . .. .
আরতাবিয়া থেকে আদ্–দাবীশের বিদ্রোহ নতুন প্রেরণা যোগায়। শোনা গেলো তিনি নিজে রয়েছেনে কোয়েত সরহদের কাছাকাছি কোথা, যেখানে থেকে তিনি উপজাতিগুলির মধ্যে থেকে নতুন মিত্র সংগ্রহ করছেন তাঁর নিজস্ব মুতায়ের বাহিনীর জন্য, যে বাহিনী এখনো বেশ গুরুত্ব রাখে। তাঁর সাথে প্রথম যোগ দেয় একটি ছোট্ট অথচ দুর্ধর্ষ কওম ‘আজামন’–ওদের বসতি ছিল পারস্য উপসাগরের নিকটববর্তী আলহাসা প্রদদেশে। ওদের ‘শায়খ’ ইবনে হাজলায়েন ছিলেন ফয়সাল আদ্–দাবীশের মামা । এটুকু বাদ দিলে, ইবনে সউদ এবং আজমান কওমের মধ্যে সম্প্রীতি ছিলো অক্ষুণ্ণ। কয়েক বছর আগে ওরা বাদশাহর কনিষ্ঠ ক্রাতা সাদকে হত্যা করেছিলো এবং তিনি বদলা নিতে পারেন, এই ভেয়ে তারা বাড়ি–ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিরো কোয়েত। পরে ইবনে সউদ তাদেরকে মাফ করে দেন এবং পৈত্রিক আবাসভূমিতে ফিরে আসার অনুমতি দেন। তবু পুরানো বিক্ষোভ বাড়তেই থকে। এর অভিব্যক্তি ঘটলো প্রকাশ্য দুশমনীতে, যখন আপোসের কথাবার্তা চলাকারে ইবনে সউদের আত্মীয়, আল –হাসার আমীরে’র জ্যেষ্ঠ পুত্রের তাঁবুতে, আজমানদের সরদার এবং তার কয়েকজন অনুসারীকে বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করা হয়।
আজমান এবং মুতায়ের কবিলার মধ্যে মৈত্রী –নযদের আতায়বা গোত্রগুলির মধ্যে সৃষ্টি করে একটা নতুন স্ফুলিংগ। তাদের ‘আমীর’ ইবনে বুজাদ কয়েদ হওয়ার পর তার আবার জমায়েত হলো এক নতুন সরদারের নেতৃত্বে। আবার ওরা দাঁড়ালো বাদশাহর বিরুদ্ধে। এজন্য তিনি তাঁর প্রায় সকল শক্তি উত্তর নযদ থেকে তুলে নিয়ে সমাবেশ করলেন মধ্য নয্ দে। তীব্র লড়াই হলো, তরে ধীরে ধীরে ইবনে সউদই বিজয়ী। তিনি আতায়বার বিভিন্ন দলকে একটির পর একটি করে পরাভূত করালেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত তারা প্রস্তাব পাঠালো–আত্মসমর্পণ করবে। রিয়াদ এবং মক্কার মাঝামাঝি এক গ্রামে ‘শায়খরা’ আনুত্যের শপথ নিলো বাদশাহর নিকট এবং বাদশাহ আবর তাদের মাফ করে দিলেন এই আশায় যে, এরপর তিনি আদ –দাবীশ এবং উত্তরাঞ্চলের আর সকল বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে যে–কোনো ব্যবস্থা গ্রহনে সক্ষম। কিন্তু তিনি রিয়াদে ফিরতে না ফিরতেই আতায়বা কবিলা দ্বিতীয়বারের মতো তাদের ওয়াদা ভংগ করে নতুন করে লড়াই শুরু করে দেয়। এ যুদ্ধ ছিলো শেষ যুদ্ধ, শত্রুকে নির্মূল করার লড়াই। তৃতীয়–বারেরমতো আতায়বা হেরে গেলো এবং তাদের প্রায় এক–দশমাংশ লোক তাতে নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেলো। এভাবে রিয়াদের চাইতে বড়ো ঘাটঘাটের ‘ইখওয়ান’ বসতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ায় বাদশাহর কর্তৃত্ব মধ্য নযদে আবার প্রতিষ্ঠিত হলো।
উত্তর অঞ্চলে সংগ্রাম কিন্তু তখনো চলেছে। ফয়সল–আদ –দাবীশ এবং তাঁর মিত্ররা সরহদের কাছাকাছি ট্রেঞ্চ খুঁড়ে মজবুত হয়ে বসেছেন। বাদশাহর পক্ষ হয়ে হাইলের ‘’আমীর’ ইবনে মুসাদ আক্রমণের পর আক্রমণ চালান ওদের ওপর। দুবার খবর রটরো, আদ্ –দাবীশ নিহত হয়েছেন এবং প্রত্যেকবারই এ খবর মিথ্যা প্রমাণিত হরো । তিনি বেঁচে রইলেন; মাথা নিচু করবো না, আপোস করবো না, এই জিদ নিয়ে। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং সাতশত যোদ্ধ নিহত হরো যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু তবু তিনি যুদ্ধ করে চললেন। তখন প্রশ্ন জাগলো, আদ্ –দাবীশ টাকা –কড়ি পান কোথেকে,যা আরবের মতো দেশেও যুদ্ধ চালিয়ে যাাবর জন্য অপরিহার্য। কোথেকে আসে তাঁর অস্ত্রশস্ত্র আর গোলা বারুদ?
নিশ্চয়তাবিহীন এই রিপোর্ট চালু হয়ে গেলো যে, যে–বিদ্রোহী এককালে কাফিরদের সংগে ইবনে সউদের বিভিন্ন চুক্তির ঘোর সমালোচক ছিলেন তিনিই এখন ব্রিটিশের সংগে গোপন সন্ধি–সূত্রে আবদ্ধ হয়েছেন। গুজব রটে গেলো, তিনি ঘনঘন কোয়েত সফর করছেনঃ এ কাজ কি তাঁর পক্ষে সম্ভব, লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, ব্রিটিশ কর্তপক্ষের অজ্ঞাতসারে? বরং এটাই কি সম্ভব নয় যে, ইবনে সউদের দেশে বিদ্রোহ–বিশৃংখলা তাদের মতরব হাসিলের জন্য খুব উপযোগী।
.. . .. . . ..
রিয়াদে ১৯২৯ –এর গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যায় আমি সকাল শয্যা গ্রহণ করি;ঘুমিয়ে পড়ার আগে ওমানের বিভিন্ন বাজবংশের উপর রচিত একটি পুরানো বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে নিজেকে যখন বিষয়ান্তরে নেবার চেষ্টায় ছিলাম তখন হঠাৎ অনেকটা আকস্মিকভাবেই জায়েদ এসে ঢুকলো আমার কামরায়ঃশুয়ুখ থেকে এখানে একজন লোক এসেছেন, আপনার সংগে দেখা করতে চান।
আমি তাড়াতাড়ি পোশাক পরে কিল্লায় গিয়ে পৌছুই। ইবনে সউদ তাঁর ব্যক্তিগত কামরায় অপেক্ষা করছেন আমার জন্য; তিনি একটি দিওয়ানের উপর পায়ের উপর পরা রেখে বসে আছেন। তাঁর চারপাশে স্তূপীকৃত আরবী খবরের কাগজ এবং তাঁর হাতে কায়রোর একটি পত্রিকা। তিনি সংক্ষেপে আমার সালামের জবাব দিলেন এবং নিজের পড়ায় ছেদ না ঘটিয়ে ইশারায় আমাকে তাঁর পাশে দিওয়ানের উপর বসতে বললেন। কিছুক্ষণ পর তিনি কাগজ থেকে চোখ তুললেন এবং দরজায় যে গোলমাটি দাঁড়িয়েছিলো তার দিকে তাকালেন এবং হাত নেড়ে ইংগিতে বোঝালেন–তিনি আমার সংগে কিছুক্ষণ একা থাকতে চান। গোলামটি বেরিয়ে যেতে যেই দরজা বন্ধ করলো, বাদশাহ তাঁর হাতের কাগজ রেখে দিলেন এবং কিছুক্ষণেল জন্য আমার দিকে তাকালেন তাঁর ঝকঝকে চশমার পেছন থেকে, যেনো তিনি বহুদিন হলো আমাকে দেখেননি (যদিও সেদিনই সকালে আমি তাঁ সংগে কয়েকটি ঘন্টা কাটিয়েছি)।
–‘লেখা নিয়ে ব্যস্ত!’
–‘না, দীর্ঘজীবী সুলতান! বহু হপ্তা হলো আমি কিছুই লিখিনি।’
–‘ইরাকের সংগে আমাদের সীমান্ত সমস্যা নিয়ে যে প্রবন্ধগুলি লিখেছিলে চমৎকার হয়েছিলো সেগুলি।’
স্পষ্টই প্রায় দু’মাস আগে আমি আমার কন্টিনেন্টাল খবরের কাজগগুলির জন্য ধারাবাহিক যে সব রিপোর্ট লিখছিলাম তিনি তারই উল্লেখ করছিলেন। এর কোনো কোনোটি কায়রোর একটি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিলো যেখানে–আমি বলতে গৌরব বোধ করছি–ঐ রিপোর্টগুলি একটা খুব জটিল অবস্থার মীমাংসার সহায়ক হয়েছিলো। বাদশাহকে জানতাম বলে নিশ্চিত ছিলাম যে, বাদশাহ এলোমেলোভাবে কথা বলছেন না, তাঁর মনে স্থির বক্তব্য বলতে থাকবেন। তিনি সত্যই তাঁর বক্তব্য অব্যাহত রেখেছিরেন।
–‘হয়তো নযদে যা ঘটেছে সে সম্পর্কে, এই বিদ্রোহ ও তার শুভ ছায়া সম্পর্কে, তুমি আরো বেশি কিছু লিখতে চাইছো।’ তাঁর গলার স্বরে আভাস দেখা গেলো যখন তিনি বললেন, ‘শরীফ খান্দান আমাকে ঘৃণা করে; হুসাইনের পুত্ররা যারা এখন ইরাকে এবং ট্রান্স–জর্ডানের রাজত্ব করছে, আমাকে সবসময়ই ঘৃণা করবে, কারণ তারা ভূলতে পারে না আমি ওদের নিকট থেকে হেজাজ ছিনিয়ে নিয়েছি। ওরা চায় আমার রাজ্য ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে পড়ুক, কারণ তা হলেই ওরা ফিরে আসতে পারবে হেজাজে.. . এবং ওদের বন্ধুরা, যারা আমার বন্ধু বলে ভান করে, হয়তো তা অপছন্দ করবে না.. . ওরা ঐ কিল্লাগুলি খামাখাই তৈরি করেনিঃ ওরা ‘চেয়েছিলো’ আমাকে পেরেশান করতে এবং ওদের সরহদ থেকে দূরে ঠেলে দিতে.. .।
ইবনে সউদের কন্ঠ–উচ্চারিত শব্দরাজির পেছনে আমি শুনতে পাচ্ছিলাম তালগোল পাকানো ভৌতিক ধ্বনিসমূহ.. . রেলগাড়ির ঘড় ঘড় গর্জন, যা এখনো কাল্পনিক হলেও সহজে আগামী কালই হয়ে উঠতে পারে বাস্তবঃ হাইফা থেকে বসরা পর্যন্ত একটি ব্রিটিশ রেল সড়কর প্রেতচ্ছায়া।
এ ধরণের একটি পরিকল্পনার কথা কয়েক বছর ধরে চালু রয়েছে। একথা সুবিদিত যে, ব্রিটেন উদগ্রীব ছিলো ‘ভারত পর্যন্ত একটি স্থলপথ’ স্থাপনের জন্য–আর ফিলিস্তিন ট্রান্স–জর্ডান ও ইরাকের উপর ওদের মানডেটের অর্থও আসলে ছিলো তাই। ভূমধ্যসাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত একটি রেল সড়ক যে ব্রিটেনের সামাজিক যোগোযোগ ব্যবস্থায় কেবল একটি নতুন এবং মূল্যবান সূত্রই হবে তা নয়, বরং ইরাক থেকে সিরীয় মরুভূমির আড়াআড়ি হাইফা পর্যন্ত তেরের যে পাইপ লাইন বসানো হবে তার জন্যও এতে বৃহত্তর রক্ষা–কবচ নিশ্চিত হবে। তা ছাড়া, হাইফা এবং বসরার মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ অগ্রসর হবে ইবনে সউদের উক্ত পূর্বাঞ্চলের প্রদেশগুলির বুক চিরে রেল যোগাযোগ অগ্রসর হবে ইবনে সউদের উক্ত পূর্বাঞ্চরের প্রদেশগুলর বুক চিরে–এবং বাদশাহ কিছুতেই এ ধরণের ইংগিত ও কখনো গ্রহণ করতে পারেন না। এটাই কি সম্ভব নয় যে, এই সংকটপূর্ণ এলাকার ভেতরে যথেষ্ট গোলযোগ সৃষ্টি করার জন্য বলবৎ সকল চুক্তির খোলাখুলি বিরোধিতা করে ইরাক –নযদ সরহদ বরাবর কিল্লার পর কিল্লা নির্মাণ করা ছিলো একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের প্রথম পর্যায়, যাতে করে ব্রিটেনের প্রতি নমনীয়তা একটি ‘ছোট্ট আধা স্বাধীন বাফার’–রাষ্ট স্থাপনের যৌক্তিকতা প্রমান করা যায়? ফয়সর আদ্–দাবীশ এই উদ্দেশ্যের সহায়ক হতে পারেন, এমন কি শরীফ খান্দানের কোন সদস্যের চাইতেও বেশি সাহায্য করতে পারেন এ ব্যাপারে;কারণ তিনি নিজেও নযদী এবং ‘ইখওয়ানে’র মধ্যে রয়েছে তাঁর প্রবল একদল সমর্থক। কিন্তু তাঁর অতীতের সাথে পরিচিতি যে কারো কাছে দিবালোকের মতোই এ সত্য ছিলো যে, তাঁর অতীতের সাথে পরিচিত যে –কারো কাছে দিবালোকের মতোই এ সত্য ছিলো যে, তাঁর সম্পর্কে যে–ধর্মীয় আবেগ আতিশয্যের কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে, তা একটা মুখোশ মাত্র। আসলে কেবল ক্ষমতাই ছিলো তাঁর লক্ষ্য। এতে কোনো সন্দেহই নেই যে, তাঁর কোনো সাহায্যকারী না থাকলে একাকী তাঁর পক্ষে ইবনে সউদের বিরুদ্ধে এতো দীর্ঘদিন টিকে থাকা মোটেই সম্ভব হতো না । সতি্যি কি তিনি একলা?
অনেক্ষণ চুপ করে থাকার পর বাদশাহ আবার বলতে থাকেনঃপ্রত্যেকের মতোই আমিও, আদ্–দাবীশের হাতে যেসব অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে মনে হয়, সেগুলি কোত্থেকে আসছে, সে সম্পর্কে চিন্তা করি। আমি জানতে পেরেছি এসবই তাঁর রয়েছে প্রচুর–এবং বিপুল পরিমাণ টাকা–কাড়িও। আমি বলতে চাই, আদ্–দাবীশ অস্ত্রশস্ত্র গোলা –বারুদের যেসব সরবরাহ পায় সেগুলির রহস্যময় উৎস সম্বন্ধে তুমি কি কিছূ–কিন্তু আমি চাই যে, তুমি যদ্দুর পারো, নিজেই তা খুঁজে বার করো, কারণ আমার ভূল ও হতে পারে।
তাহলে ব্যাপার হচ্ছে এই, যদিও বাদশাহ কথা বলছিলেন খুবই অনড়ম্বরভাবে ঔদাস্যভাবে আলাপী ভংগীতে,তবু সুস্পষ্টভাবে প্রত্যেকটি শব্দই ওজন করে উচ্চারণ করছিলেন। আমিতাঁর দিকে তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানীর দৃষ্টিতে তাকাই। তাঁর যে চেহারা মুহূর্ত কাল আগে ছিলো এতো গম্ভীর তা–ই একউদার হাস্যে উদ্ভাসিত হলো। তিনি তাঁর হাত আমার হাতের উপর রেখে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন,‘বেটা, আমি চাই তুমি নিজেই খুঁজে বের করো–আবর বলছি, তুমি নিজেই বার করো খুঁজে কোত্থেকে দাবীশ পাচ্ছে তার রাইফেল, তার গোলা–বারুদ আর টাকা কড়ি, যা এমন ঢালাওভঅবে সে বিতরণ করণে, ব্যয় করছে! আমার মনে , বলতে গেলে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। কিন্তু আমি চাই যে, তোমরই মতো কেউ, যে জড়িত নয় প্রত্যক্ষভাবে, দুনিয়াকে জানিয়ে দাও আদ্–দাবীশের বিদ্রোহের পেছনে যে কুটির সত্য রয়েছে তার কথা.. . আমি মনে করি তুমি পারবে আসল ব্যাপারটি উদঘাটন করতে।’
ইবনে সউদ জানতেন তিনি যা করতে যাচ্ছেন, তার তাৎপর্য কি। তিনি সব –সময়ই জেনে এসেছেন আমি তাঁকে ভালোবাসি যদিও আমি তাঁর পলিসি সম্পর্কে তাঁর থেকে প্রায়ই ভিন্নমত পোষণ করি এবং আমার অমত আমি কখনও লুকাই না। তবু ও কখনো তিনি আমার প্রতি তাঁর আস্থা হারান নি; তিনি প্রায়িই আমার পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমার বিশ্বাস, তিনি আমাকে আরো বেশি করে বিশ্বাস করেন এজন্য যে আমি তাঁর কাছ থেকে ব্যক্তিগত ফায়দা আশা করি না, এ কথা তিনি খুব ভালো করেই জানেন; তিনি খুবই সচেতন যে, তাঁর সরকারের কোনো চাকরি পর্যন্ত আমি গ্রহণ করবো না– কারণ আমি থাকতে চাই মুক্ত এবং স্বাধীন। এজন্য ১৯২৯ –এর গ্রীষ্মে সেই স্মরণীয় সন্ধ্যায় তিনি শান্তভাবে আমার নিকট তাঁর এই ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন, আমি যেনো ‘ইখওয়ান’ বিদ্রোহের পেছনে যে রাজনৈতিক চক্রান্ত –জাল রয়েছে তার স্বরূপ উদঘাটনের জন্য বেরিয়ে পড়ি। এ ছিলো এমন একটি দায়িত্ব যার মধ্যে নিহিত ছিলো বড়ো রকমের ব্যক্তিগত বিপদের আশংকা আর কেবলমাত্র প্রাণান্ত প্রয়াসের বিনিময়েই তা করা সম্ভব ছিলো।
কিন্তু ‘শুয়ুখ’ আমার প্রতিক্রিয়ায় হাতশ হননি। আমি যে তাঁকে এবং তাঁর দেশকে ভালোবাসি,তা বাদ দিলে আমাকে যে কাজের দায়িত্ব তিনি অর্পণ করলেন, তা আমার মনে হলো একটা দারুণ উত্তেজনাময় এ্যাডভেঞ্ঝারের সম্ভাবনায় পূর্ণ–চমক–লাগানো এক সাংবাদিক বার্তার সম্ভাবনার কথা না হয় অনুল্লিখিতই রইরো।
–‘হে দীর্ঘায়ু পুরুষ’, আমি দেরী না করেই জবাব দিই, ‘আমার চোখ, আমার শির আপনার হুকুমের তাবেদার। নিশ্চয় আমি যা পারি তা আমি করবোই!
–‘এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহই নেই মুহাম্মদ; এবং আমি চাই যে, তুমি তোমার এই মিশন গোপন রাখবে। এতে বিপদ থাকতে পারে। আচ্ছা তোমার বেগমের খবর কি?’
আমার সে স্ত্রী হচ্ছে রিয়াদের একটি বালিকা, যাকে আমি শাদি করেছিলাম আগের বছর। আমি বাদশাকে নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হয়েছিলাম এ বিষয়েঃ
‘ও কাঁদবে না, হে ইমাম; আজকেই আমি ওকে তালাক দেবার কথা চিন্তা করছিলাম। আমরা একে অপরের উপযুক্ত বলে মনে হয়না।’
ইবনে সউদ সজ্ঞানে স্মিত হাসেন, কারন স্ত্রী তালাক দেবার বিষয়টা অপরিচিত নয়।
–‘কিন্তু অন্যদের খবর কি, তোমার জ্ঞাতি–গোষ্ঠীর?
–‘আমার বিশ্বাস কেউই নেই যে শোক করবে আমার যদি কিছু ঘটে; অবশ্য কেবল জায়েদের কথাই আলাদা–যে কোনো অবস্থায়ই সে থাকবে আমার সাথে এবং আমর যা ঘটবে জায়েদেরও ঘটবে তাই।’
–‘ভালোই তো’, বাদশাহ বললেন, ‘আরে,আমি না শেষে ভুলে যাইঃ এ কাজের জন্য তোমার কিছু টাকা–কড়ির দরকার হবে,’ এবং তাঁর পেছনে কুশনের নিচ হতে গলিয়ে তিনি বের করে আনলেন একটি থলে এবং গুঁজে দিলেন আমার হাতে, ওজন থেকে আমি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলাম থরেটি সোনার মোহরে ভর্তি। আমার মনে পড়ে, আমি মনে মনে ভাবছিলামঃ আমি যে তাঁর এই নির্দেশ গ্রহণ করবো, এ বিষয়ে আমাকে তিনি জিজ্ঞাস করার আগেও কতোটা নিশ্চিতই না তিনি ছিলেন।.. .
.. . .. . .. . .. .
আমার কোয়ার্টারে ফিরে এসে আমি জায়েদকে ডাকি। আমার ফেরার ইন্তেজারিতে ছিলো জায়েদ।
–‘আচ্ছা জায়েদ, আমি যদি তোমাকে এমন একটি কাজে আমার সংগী হতে বলি যা পরিণামে হতে পারে বিপজ্জনক, তুমি কি আমার সাথে যাবে?’
‘জায়েদ জবাব দেয়, আপনি কি মনে করেন চাচা, আমি আপনাকে একা যেতে দেবো, বিপদ যা–ই হোক? কিন্তু আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
–‘আমরা যাচ্ছি আদ্–দাবিশ কোত্থেকে তার অস্ত্রশস্ত্র টাকাকড়ি পাচ্ছেন, তা উদঘাটন করতে। তাবে বাদশাহর নির্দেশ আমরা কী করছি, যতক্ষণ না সম্পন্ন হয়েছে, কেউ যেনো তা জানতে না পায়। কাজেই তোমাকে সতর্ক থাকতে হবে।’
জায়েদ আমাকে সাহস দেবার চেষ্টা ও পর্যন্ত করলো না। বরং সে আরো বাস্তব প্রশ্নটি উত্থাপন করলোঃ ‘এ বিষয়ে আমরা আদ্–দাবিশ কিংবা তাঁর লোকজনকে নিশ্চয় জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারি না। তাহলে এ কাজে আমরা কিভাবে আগাচ্ছি?
কিল্লা থেকে ফেরার পথেআমিও সমস্যাটি নিয়ে বারবার চিন্তা করছিলাম। আমার মনে হয়েছিলো, মধ্য নযদের শহরগুলির কোনো একটি থেকে শুরু করাই হবে সবচেয়ে প্রশস্ত যেখানে রয়েছে বহু ব্যবসায়ী সওদাগর, যাদের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে ইরাক ও কুয়েতের সংগে। শেষতক আমি বেছেনিলাম শাকরা শহরটি, ওয়াশম প্রদেশের রাজধানী, রিয়াদ থেকে প্রায় তিন দিনের পথ, যেখানে হয়তো আমার দোস্তা আবদুর রহমান আসসিবাই আমাকে সাহায্য করতে পারেন।
পরের দিনটি আমরা ব্যস্ত রইলাম আমাদের অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে। আমি চাইনি যে আমাদের গতিবিধির প্রতি লোকজনের নজর খুব আকৃষ্ট হোক। এ কারনে আমি জায়েদকে হুঁশিয়ার করে দিই আমাদের বরাবরকার রীতি মাফিক, বাদশাহর ভান্ডার থেকে রসদ না নিতে এবং বাজার থেকে আমাদের দরকারী সব কিছু খরিদ করতে। সন্ধ্যার আগেই সে যোগাড় করে ফেলে প্রায় দশ সের চাল, রুটি বানানোর জন্য একই পরিমামন ময়দা, একটা ছোট্ট চামড়ার থলে ভর্তি পরিশোধিত মাখন, খেজুর, কফিদানা এবং নিমক। তাছাড়া সে খরিদ করলো দুটি নতুন মশক, একটি চামড়ার বালতি এবং খুব গভীর ইঁদাররা তলা পর্যন্ত পৌঁছায় তেমন লম্বা ছাগ–পশমের ঝোলানো থলের মধ্যে আমাদের দু’জনের প্রত্যেকের জন্য দু’প্রস্থ কাপড় ঠেসে ভরলাম এবং উভয়ই গায়ে দিলাম ভারী ‘আবায়া’, যা শীতের রাতে জীনের উপর, রাখা কম্বলগুলিসহ আচ্ছাদনের কাজ করবে। আমাদের উষ্ট্রীগুরি কয়েক হপ্তা চারণক্ষেত্রে কাটিয়ে সওয়ারীর জন্য খুবই উপযোগী হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি আমি জায়েদকে যে উষ্ট্র্রীটি দিয়েছি তা হচ্ছে ওমানের একটি দৌড়ের উষ্ট্রী, যা চলে খুবই ক্ষিপ্রগতিতে, আর আমি সওয়ার হলাম উত্তরাঞ্চলের আসরি একটি বয়স্কা সুন্দর উষ্ট্রীর উপর, একদা যার মালিক ছিলেন হইলের রশিদী ‘আমীর’। এটি আমাকে দান করেন ইবনে সউদ।
রাত নেমে আসার পর আমরা সওয়ার হাঁকিয়ে বার হয়ে পড়ি রিয়াদ থেকে। সকালের দিকে আমরা পৌঁছুই ওয়াদি হানিফা, দুটি খাড়া পাহাড়ের মাঝে একটি গভীর বিরান নদীতল, যেখানে চৌদ্ধ’শ বছরের ও আগে একটি চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো–মহানবীর উত্তরাধিকারী ইসলামের প্রথম খলীফা আবু বকরের মুসলিম ফৌজ এবং ‘ভন্ড নবী’, বহু বছর ধরে মুসলমানদের ঘোর বিরোধী মুসায়লামার সেনাদলের মধ্যে। এই যুদ্ধ মধ্য আরবে ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়র সূচনা করে। রসুলুল্লাহর প্রকৃত সাহাবীদের অনেকেই এ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন; ‘ওয়াদির’ শিলাময় ঢালুতে আজও তাঁদের কবরগুলি চোখে পড়ে।
দুপুরের আগে আমরা ধ্বংস প্রাপ্ত আইয়ায়ানা নগরী অতিক্রম করলাম;এককালে এই নগরী ছিলো এক বিশাল জনবহুল বসতি, ওয়াদি হানিফার দুই তীর বরাবর বিস্তৃত। সারি সারি দেয়াল, একটি মসজিদের নড়বড়ে খিলান, অথবা এখানে বিদ্যমান বিশাল প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ। এসব কিছুই আজকের দিনের নযদের সাদাসিধা মাটির দালান–কোঠার চেয়ে একটি াশোভনতারো স্থাপত্যরীতির পরিচায়ক। বলা হয়, দেড়’শ দু’শ বছর আগে পর্যন্ত দারীয়া থেকে (ইবনে সউদ খান্দানের প্রথম রাজধানী) ইইয়ায়না পর্যন্ত প্রায় পনের মাইল জায়গা জুড়ে ওয়াদি হানিফার সমস্ত গতিপথ জুড়ে ছিলো একটিমাত্র নগরী এবং দারীয়ার ‘আমীরের কোনো ছেলে জন্মালে কয়েক মিনিটের মধ্যে আইয়ায়নার শেষপ্রান্ত পর্যন্ত সে খবর পৌছে যেতো ছাদের মাথা থেকে মাথায়, রমণীদের মুখে মুাখে। আইয়ায়নার অবক্ষয়ের কাহিনী উপকথায় এমনি আচ্ছন্ন যে, ঐতিহাসিক তথ্য উদ্ধার করা সত্যি কঠিন। খুব সম্ভব, এ শহরের লোকের মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহাবের শিক্ষা ও ব্যাখ্যা কবুল করতে নারায হওয়ায় প্রথম সউদী শাসক এটি ধ্বংস করিয়েছিলেন। কিন্তু ওহাবী উপকথা ভিন্ন। তাদের মতে আল্লাহর গজবের প্রমাণ হিসাবে আরাবার সকল ইদারা এক রাত্রির মধ্যে শুকিয়ে যায়, যার ফলে এর বাসিন্দারা নগর ত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হয়।
তৃতীয় দিনের দুপুর বেলা আমাদের চোখে শাকরার মাটির দেয়াল আর কিল্লা আর উচু উচু পাম–গাছ, যা ঘর–বাড়ির উপর তুলে দাঁড়িয়ে আছে আমরা খালি বাগান আর খালি রাস্তার মধ্য দিয়ে উট হাঁকিয়ে যেতে থাকি এবং কেবল তখনি হঠাৎ মনে হলো, আজকে তো শক্রবার, নিশ্চয় সবাই মসজিদে চলে গেছ। কিছুক্ষণ পর পর পথে পড়তে লাগলো এক একজন স্ত্রীলোক, পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো ‘আবায়া’য় মোড়ানো’ অপরিচিতদের দেখে সে চমকে উঠছে এভং এ ত্বরিৎ সলজ্জ ভংগিতে সে তার মুকের ওপর নিকাব টেনে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করছে ঘরের ছায়ায়, খেজুর গাছের মাথার ওপর ঝিমুচ্ছে এক গাঢ উষ্ণতা।
আমরা সোজাসুজি গিয়ে পৌছুলাম আমাদের পেয়ারা দোস্ত আবদুর রহামন আসসিবায়ীর ঘরে। সে সময়ে তিনি ছিলেন প্রদেশের ‘বায়তুলমাল’ বা খাজাঞ্চিখানার দায়িত্বে। খোলা গেটের সামনে আমাদের সওয়ারী থেকে আমরা নেমে পড়ি এবং ঘর থেকে ছুটে এলো একটি নওকর ছেলে, আর সাথে সাথে জায়েদ ঘোষণা করে দিলো, ‘মেহমান হাজির’।
জায়েদ আর ছেলেচি বাড়ির প্রংগণে সওয়ারীর পিঠ থেকে জীন এবং জিনিসপত্র নামাচ্ছে, আর আমি আবদুর রহমানের ‘কফিখানা’য় নিজের বাড়ির মতো বসেছি আরাম করে। অন্য একটি নওকর দেরী না করে কফি তৈরির চুলার ওপর বসানো পিতলের পাত্রের নিচে আগুন ধরিয়ে দিলো। আমি প্রথম চামচ কফি গিলতে না গিলতেই উঠানের গলার আওয়াজ শুনতে পাওয়া গেলো, প্রশ্ন প্রশ্নের জওয়াব। বাড়ির কর্তা ফিরে এসেছেন। সিঁড়ি থেকে–এখনও তাঁকে দেখা যাচ্ছে না–তিনি চিৎকার করে আমাকে জানান তাঁর খোশ–আমদের, তারপর তিনি দরজার চৌকঠে এসে দাঁড়ালেন দু’হাত প্রসারিত করেঃ একটি ছোটো–খাটো নাজুক স্বাস্থ্যের হালকা–পাতলা লোক, তাঁর দাড়ি হালকা বাদামী রঙের আর এক জোড়া গাঢ় গভীর কৌতুক উচ্ছ্বল চোখ, স্মিত হাসি–বিচ্ছুরিত মুখমন্ডল; গরম সত্তেও তিনি তাঁর ‘আবায়া’র নিচে পরছেন একটি লোমওয়ালা চামড়ার কোট, এই কোটটিকে তিনি সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মনে করেন। যারা এর ইতিহাস জানতো না, তাদের একথা বলতে তিনি ক্লান্তি বোধ করতেন না যে এ কোটটি ছিলো হেজাজের সাবেক বাদশাহ শরীফ হোসাইনের এবং ১৯২৪ সনে মক্কা বিজয়ের পর এটি তাঁর, অর্থাৎ আবদুর রহমানের হস্তগত হয়। আমি এ কোট ছাড়া তাঁকে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
তিনি আমকে আলিঙ্গ করলেন উষ্ণ আবেগের সংগে এবং তাঁর পায়ের আঙুলের উপর দাঁড়িয়ে আমার দু’গালে চুমু খেতে বললেনঃ ‘আহলান ওয়া সাহলান ওয়া মারহাবা, ভাইজান।এ গরীবখানায় আপনার খোশেআমদেদ। সৌভাগ্যময় এই মুহুর্তটি, যা আপনাকে এখানে এনেছে।
তারপর শুরু হলো চিরচারিত প্রশ্নাদিঃ কোত্থেকে এসেছেন, কোথায় যাবেন, বাদশাহ কেমন আছেন, পথে কি বৃষ্টি হয়েছে অথবা নিদেনপক্ষে, আপনি কি বৃষ্টির কথা শুনেছেন?-আরবদের সংবাদ আদান – প্রদানের পুরা প্রথাটির পুনরাবৃত্তি! আমি তাঁকে বললাম, আমার গন্তব্য হচ্ছে মধ্য নযদের আনাইজা, যদিও আমার এই উক্তি পুরাপুরি সত্য ছিলো না, অথচ সত্যও হ’তে পারতো।
আগেকার বছরগুলিতে নযদ আর ইরাকের মধ্যে নানা রকমের তিজারতিতে ব্যাপৃত ছিলেন আবুদর রহমান; বসরা এবং কোয়েতের নাড়ি–নক্ষত্রের খবর তিনি জানতেন। স্থানগুলি সম্পর্কে তাঁকে কথা বলতে উৎসাহিত করা এবং হালফিল যেসব লোক ওখানে এসে থাকতে পারে কথা প্রসংগে তাদের সম্পর্কে তাঁকে কিছু জিজ্ঞাস করা মোটেই কঠিন কাজ ছিলো না-(কারণ আমার মনে হয়েছিলো, বলা হচ্ছে ফয়সাল আদ্–দাবিশ যখন কোয়েত সরহদের এতো কাছেই রয়েছেন। তাই তিনি তাঁর রসদ কোত্থেকে পাচ্ছেন–েএই স্থান কিংবা বসরা থেকে–তার কিছু ইংগিত পাওয়া যেতে পারে)। আমি জানতে পেলাম, আনাইজার মশহুর আল–বাসসাম পরিবারের একজন লোক–আমার অনেক দিনের পরিচিত–সম্প্রতি বসরা থেকে ফেরার পথে কোয়েত গিয়েছিলেন এবং বিদ্রোহী–অধ্যূষিত এলাকার মধ্য দিয়ে সফরের বিপদে নিজেকে নিক্ষেপ না করে নযদে ফিরেছেন বাহরাইন হয়ে। এই মুহূর্তে তিনি শাকরাতেই আছেন এবং আমি চাইলে আবদুর রহমান লোক পাঠিয়ে দেবেন তাকে আনার জন্য। কারণ পুরান আরবী রসুম মতে, নবাগত মেহমানের সাথেই এসে মুলাকাত করতে হয়, মেহমান সাক্ষাৎ করনেত যান না। কিছুক্ষণ পরই আবদুর রহমানের ‘কফিখানায় আমাদের সাথে এসে যোগ দিলেন–আবদুল্লাহ আল – বাসসাম।
যদিও আবদুল্লাহ ছিলেন নযদের সম্ভবত সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যবসায়ী পরিবারের লোক, তবু তিনি নিজে ধনী ছিলেন না। তাঁর সারাটা ‘জীবনই উত্থান আর পতনের কাহিনী এবং বেশির ভাগই পতনের–কেবল নযদে নয়, কায়রো , বসরা, কোয়েত, বাহরাইন এবং বোম্বেতে তিনি লাভ করেছেন এ অভিজ্ঞতা। সেব স্থানের কেউকেটা প্রত্যেককেই তিনি জানতেন এবং আরব দেশগুলিতে যা কিছু ঘটছিলো তার প্রত্যেকটি সম্পর্কে তথ্যের এক ভান্ডার তিনি বহন করতেন , তাঁর চতুর মস্তিকে। আমি তাঁকে বললাম, একটি জার্মান ব্যবসা –প্রতিষ্ঠান আমাকে যাচাই করে দেখতে বরোছে, কোয়েত এবং বসরার কৃষি যন্ত্রাদি আমদানি করা যায় কিনা, এবং যেহেতু এই ফার্মটি আমাকে মোট রকমের কমিশন দিতে চেয়েছে এজন্য এ দুটি শহরে স্থানীয় কোন কোন ব্যবসায়ী এ ধরণের প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে তা খুঁজে বের করবার জন্য আমি উৎসুক। আল –বাসসাম কয়েকটি নাম উল্লেখ করে বলেন-,
–‘আমার বিশ্বাস, কোয়েতের কোনো লোক আপনার এ প্রজেকটের ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে। তারা হর–হামেশাই বিদেশ থেকে জিনিসপাতি আমদানি করে চলেছে এবং আজকাল ব্যবসা খুবই তেজী মনে হয়–এতো তেজী যে, প্রায় প্রত্যেক দিন বিপুল পরিমাণ চাঁদির ‘রিয়াল’ আসছে সোজাসুজি ত্রিয়েস্তের টাকশাল থেকে।’
চাঁদির ‘রিয়ালে’র উল্লেখে আমি রীতিমত ধাক্কা খাই। এই বিশেষ ধরনের ‘রিয়াল’, যার নাম ‘মারিয়া থেরেসা থেলার–আরবের সরকারী মুদ্রা গুলির পাশাপশি, গোটা উপদ্বীপের প্রধান বাণিজ্যিক মুদ্রা বলে গণ্য ছিলো। এটি তৈরী হতো ত্রিয়েস্তে এবং এর চাঁদির মূল্যের সাথে সামান্য কিছু মুদ্রা বানানোর মজুরি যোগ করে বিক্রি করো হতো বিভিন্ন সরকারের কাছে এবং কিছু সংখ্যক বিখ্যাত ব্যবসায়ীর কাছেও–যাদের ছিলো বেদুঈনদের মধ্যে বড় রকমের ব্যবসা–বাণিজ্য, কারণ বেদুঈনরা কাগজী মুদ্রা গ্রহণ করতো না, তারা গ্রহণ করতো কেবল সোনা এবং রুপার মুদ্রা, তার মধ্যে পছন্দ করতো মারিয়া থেরেসা থেলার নামক মুদ্রা। কোয়েতী ব্যবসায়ীদের দ্বারা এই সব মুদ্রার বিপুর আমদানি থেকে মনে হলো তার বেদুঈনদের সাথে তেজী তেজারতি চালাচ্ছে।
–‘কেন,’ আমি আল –বাসসামকে জিজ্ঞাস করি, ঠিক এই মুহূর্তেই কোয়েতী সওদাগরেরা ‘রিয়াল’ আমদানী করছে?’
–‘আমি জানি না’ বাসসাম জবাব দেন।তাঁর গলার আওয়াজে হতবুদ্ধির আভাস, –‘ওরা বলে ইরাকে নিয়ে বিক্রি করার জন্য কোয়েতের আশপাশের বেদুঈনদের কাছ থেকে ওরা কিনে গোশতের জন্য উট। আজকাল ইরাকে দাম নাকি খুবই চড়া–যদিও আমার কাছে ঠিক বোধগম্য নয়, এই দুর্ভোগের দিনে কোয়েতের আশপাশের স্তেপ অঞ্চলে উট তারা কি করে আশা করতে পারে? .. .‘ আমার বরং মনে হয়’, তিনি সহাস্যে যোগ করেন, ‘ইরাকে সওয়ারী উট কিনে আদ্ –দাবিশ এভং তার লোকজনের নিকট বিক্রি করাই হবে অধিকতর লাভজনক। তবে, সমস্য এই, এসবের দাম দেবার মতো টাক–কড়ি যোগাড় করতে পারবেন না আদ –দাবিশ.. .’
–‘পারবেন না, সত্যি?
সেই রাত্রে আমাদের মেজবান আমাদের জন্য যে কামরার ব্যবস্থা করলেন সেখানে ঘুমুতে যাওয়ার আগে আমি জায়েদকে এক কোণে ডেকে নিয়ে বলিঃ
‘–আমরা কোয়েত যাচ্ছি।
–‘এ কাজ মোটেই সহজ হবে না, চাচা– জায়েদ জবাব দেয়; কিন্তু তার কথার চাইতেও তার চোখের ঝিলিক পষ্টতরোভাবে ব্যক্ত হলো এমন একটি কাজের জন্য সে প্রস্তুত রয়েছে, যা কেবল কঠিনই নয়, চূড়ান্ত রকমের বিপজ্জনকও বটে! অবশ্য বাদশাহর প্রতি অনুগত ফৌজ ও বিভিন্ন গোত্রের এখতিয়ারে যে এলাকা রয়েছে তার মধ্য দিয়ে সফর করা তো ছেলেখেলারই শামিল। কিন্তু কোয়েতের সরহদ পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে কমপক্ষে প্রায় এক’শ মাইল চলতে হবে সম্পূর্ণভাবেই আমাদের নিজেদের উপর নির্ভর ক’রে,শত্রু এলাকার ভেতরে, যার মধ্য দিয়ে বিদ্রোহী মুতায়েরিএবং আজকান কবিলার লোকের অবিরাম আনাগোন করছে। অবশ্য আমরা সমুদ্রপথে বাহরাইন হয়ে যেতে পারতাম কোয়েত, কিন্তু তার জন্য দরকার হবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে একটি অনুমতিপত্র। তার ফলে আমদের গতিবিধি ফাঁস হয়ে যাবে অতৎসুক সন্ধানী দৃষ্টির কাছে। আলযাওফ এবং সিরীয় মরুভূমি হয়ে ইরোকে সফর এবং সেখান থেকে কোয়েত যাত্রার ক্ষেত্রেও এই আপত্তি উঠবে, কারণ ইরাকে যে বহু সংখ্যক নিয়ন্ত্রণ ফাঁড়ি রয়েছে সেগুলির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়ার কল্পনাও হবে দুরাশা। কাজেই কোয়েত পর্যন্ত সরাসরি স্থলপথটি ছাড়া আর কোনো পথা আমাদের জন্য রইলো না। কী করে ভেতরে ধনা পড়ে খোদ শহরটিতে প্রবেশ করা যাবে, সে এমনে এমন একটি প্রশ্ন যার সহজ জবাব এই মূহুর্তে সম্ভব নয়; কাজেই আমরা তা ছেড়ে ভবিষ্যতের হাতে, আমাদের কপালের উপর ভরসা করে এবং অদৃষ্টপূর্ব সুযোগ সম্ভাবনার প্রত্যাশায়।
আবদুর রহমান আস–সিবায়ী অনুরোধ করলো আমি যোনো তাঁর সংগে কয়েকটি দিন কাটাই। কিন্তু যখন আমি জরুরী কাজের ওজর দেখালাম, তিনি আমাদের পরদিন সকালে ছেড়ে দিলেন; আমাদের সংগে যে রেশন ছিলো তিনি তারসংগে দিলেন প্রচুর পরিমাণ শুকনো উটের গোশত। আগামী দিনগুলিতে আমাদের জন্য যে একঘেয়ে খাবার রয়েছে তার সংগে একটি সুস্বাদু সংযোজন। তিনি জোর দিয়ে বললেন, আমি যেনো তাঁর সংগে দেখা করি ফিরতি পথে যার জবাবে আমি কেবল বলতে পারলামঃ ইনশা আল্লাহ , আল্লাহ মর্জি হলে।
শাকরা থেকে আমরা উত্তর–পূর্ব দিকে চারদিন সফর করি অস্বাভাবিক–কিছুর মোকাবিলা না করেই। এক সময় আমরা অনুগত আওয়াযীম বেদুঈনদের নির্দেশে থামতে বাধ্য হলাম; যারা ছিলো ইবনে মুসাদের সেনাবাহিনীর অংশ। কিন্তু বাদশাহর কাছ থেকে পাওয়া আমার খোলা চিঠি মুহূর্তের মধ্যে ওদের শান্ত করে দেয় এবং রীতি অনুযায়ী মরুভূমির খবরবার্তা আদান–প্রদানের পর আবার আমরা আমাদের পথ ধরি।
পঞ্চম দিনের সূর্যোদয়ের আগেই আমরা এমন একটি এলাকায় এসে পৌছুই যার উপর আর ইবনে সউদের হাত প্রসারিত নয়। এখন থেকে দিনের বেলা সফরের আর প্রশ্নই ওঠে না; আমাদের একমাত্র নিরাপত্তা হচ্ছে অন্ধকারে এবং গোপনে আগানোতে।
বিশাল ওয়াদী আর–রুম্মার মূল গতিপথ থেকে খুব দূরে নয় এমন একটি সুবিধা জনক গলিতে আমরা তাঁবু খাটাই। ওয়াদী আর রুম্মা হচ্ছে বহু পুরানো শুষ্ক নদীতল, যা উত্তর আরবে মধ্য দিয়ে চলে গেছে পারস্য উপসাগরের মাথার দিকে। গলিটির উ পরে ঝুলে আছে ঘন ‘আরফাজ’ ঝোপ যা আমাদের জন্য একটি আড়ালের কাজ করবে, যতক্ষণ আমরা থাকবো প্রায় খাড়া তীর ঘেষে। আমরা আমাদের উটগুলিকে মজবুত করে বাঁধি এবং ওদের খেতে দিই মোটা বার্লির আটা খেজুরের আঁটির সংগে মিশিয়ে; আর এভাবেই ওদেরই চরণক্ষেত্রে ছেড়ে দেবার আবশ্যকাত মিটিয়ে দেই। এরপর আমরা স্থির হয়ে অপেক্ষা করি রাত্রির। আগুন ধরাবার সাহস হলো না আমাদের–কারণ দিনের বেলাও তার ধোঁয়া পারে আমাদের গোপন অবস্থানের কথা ফাঁস করে দিতে। তাই খেজুর আর পানি খেয়েই আমাদের তুষ্ট থাকতে হলো।
আমাদেরে এই সতর্কতা যে কত সুষ্ঠ এবং নির্ভুল তা পষ্ট হয়ে উঠলো শেষ বিকালের দিতে, যখন বেদুঈনী উট–চালকের একটি গানের সুর হঠাৎ আমাদের কানে ভেসে এলো। আমরা তাড়াহুড়া করে উটের লাগাম তুলে নিই যাতে ওরা জোরে জোরে নাকে নিঃশ্বাস ফেলতে না পারে। তারপর আমরা রাইফেল হাতে গলির ঢালস্বরূপ প্রচীর পিঠ চেপে দাঁড়াই।
অপরিচিত উট সওয়ারেরা যতোই কাছে আসছে তাতোই তাদের গানের সুর হয়ে উঠছে প্রবলতার; আমরা এরই মধ্যে পষ্ট বুঝতে পেলাম এই শব্দগুলিঃ ‘লাইলাহা ইল্লাহলাহ – লাইলাহা ইল্লাহলাহ’ – আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। এটি হচ্ছে ‘অসংস্কৃত’ বেদুঈনদের অধিকতর জাগতিক চারণ–সংগীতের বদলে ইখওয়ান–কর্তৃক গৃহীত স্বাভাবিক গান। এতো কোনো সন্দেহ নেই যে, ওরা ‘ইখওয়ান’, আর এ এলাকায় ইখওয়ান মানেই শত্রুভাবাপন্ন ইখওয়ান। কিছুক্ষণ পরেই গলির তীরের সোজা উপরেই একটি টিলার চূড়ায় দেখা দিলো আট –দশ জন ও সওয়ারের একটি দল, ওরা একটি মাত্র সারিতে আগাচ্ছে ধীরে ধীরে –বিকালের আকাশের পটভূমিকায় সুস্পষ্টভাবে চিত্রিত। প্রত্যেকেই মাথায় পরেছে লালসাদা চেকের ‘কুফিয়া’র উপর ‘ইখওয়ানে’র সাদা পাগড়ি , বুকে আড়াআড়িভাবে দুটি কাতুর্জের বেল্ট এবং তার পেছনে জীনের খিলের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে িএকটি রাইফেলঃ গম্ভীর ভয়ংকর উট সওয়ারের এক মিছিল চলেছে, একবার সামনে ঝুঁকে তারপর উট পেছনে হেলে। এভাবে সামনে পেছনে হেলে–দুলে উষ্ট্রীগুলির গতির তালের সংগে তাল মিলিয়ে এবং মহান, কিন্তু বর্তমানে–অপব্যবহৃত ক’টি শব্দ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহর’ ধ্বনির সাথে সংগতি রেখে। দৃশ্যটি খুবই গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং তৎসংগে করুণ ও বটে। ওরা এমন কতকগুলি মানুষ, যাদের নিকট পষ্টতই জীবনের আর সব কিছু অপেক্ষা ধর্ম অনেক বেশি মূল্যবান। ওদের ধারণা ওরা জেহাদ করছে ধর্মের পবিত্রতা এবং আল্লাহর বৃহত্তর মাহাত্মের জন্য, অথচ ওরা জানে না যে, ওদের উৎসাহ আর আগ্রহ আকাংখাকে নিয়োজিত করা হয়েছে এক বিবেক বিচারহীন নেতার উট্চবিলাশ পূরণে, ব্যক্তিগত ক্ষমতাই যার লক্ষ্য.. .
আমাদের দিক থেকে দেখলে ওরা ছিলো খাতের দক্ষিণ কিনারে। কারণ ওরা যদি বিপরীত দিকের পথ ধরতো ওরা খুব পরিষ্কার আমাদের দেখতে পেতো, যেমন এখন আমরা ওদের দেখতে পাচ্ছি আমাদের উপর ঝুলে–পড়া আবরণস্বরূপ ঝোঁপের নীচ থেকে । যখন ওরাা ওদের ধর্ম –সংগীত ভাঁজতে ভাঁতে আমাদের দৃষ্টি থেকে পাহাড়ের ঢালুতে হারিয়ে গেলো, আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।
–‘ওরো জিনের মতো,’ ফিস ফিস করে জায়েদ, ‘হ্যাঁ জিনদের মতো–যারা জীবনের আনন্দ বলে কিছুই জানে না, মৃত্যুভয় বলে কিছু জানে না.. . ওরা সাহসী, ওদের ঈমান মজবুত, কেউ তা অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু ওরা স্বপ্ন দেখে কেবল খুন, মৃত্যু এবং বেহেশতের.. .
এবং কতকটা যেনো ‘ইখওয়ানে’র বিষণ্ণ শুদ্ধাচারিতার খেলাফেই অনেকটা ‘নীচু স্বরে’ সে আনমনা গাইতে শুরু করে একটা খুবই জাগতিক সিরীয় প্রেমের গান– ‘ওগো স্বর্ণাব বাদামী বরণের তন্বী কুমারী.. .
বেশ অন্ধকার হয়ে ওঠার সংগে সংগেই আমরা আবার শুরু করি আমাদের গোপন অভিযান, সুদূর কোয়েত অভিমুখে।
–‘দেখুন, দেখুন চাচা,’ হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে জায়েদ, ‘আগুন!
একটি বেদুঈন তাঁবুর জন্য অতি ক্ষুদ্র এ আগুন! হয়তো কোনো একাকী রাখাল রয়েছে ওখানে, কিন্তু বিদ্রোহীদের কেউ না হলে কোন রাখালের এ হিম্মত আছে যে এখানে আগুন জ্বালাবে? তুব ব্যাপারটি কী, খুঁজে দেখাই হবে ভাবে। যদি ওখানে কেবল একজন মানুষই থাকে, আমরা সহজেই তাকে বাগে আনতে পারি এবং হয়তো এ এলাকায় দুশমনের গতিবিধি সম্পর্কে কিছু মূল্যবান তথ্যও যোগাড় করতে পারি।
এখানকার মাটি বালুময় এবং আমরা যখন সতর্কতার সাথে আগুনটির দিকে আগাতে থাকি আমাদের উটগুলির পা থেকে কোনো শব্দই ওঠে না। সেই আগুনের আলোতে এখন আমাদের কাছে পষ্ট হয়ে উঠলো একাকী–বেদুঈনের হাঁটু গেড়ে বসা মূর্তি। মনে হলো, সে অন্ধকারের ভেতর উঁকি দিচ্ছে আমাদের দিকে এবং তারপর, সে যা দেখেছে তাতে সন্তুষ্ট হয়ে যেনো উঠে দাঁড়ালো ধীরে সুস্থে, বাহু দুটি আড়াআড়িভাবে রাখলো বুকের উ পর, হয়তো একথা বোঝাবার জন্য যে সে নিরস্ত্র এবং শান্তভাবে , বিন্দুমাত্র ভয় প্রকাশ না করেই অপেক্ষা করতে লাগলো আমাদের আগমনের জন্য।
–‘কে তুমি?’ জায়েধ তীক্ষ্ণ কন্ঠে প্রশ্ন করে,ছেঁড়া তালি–দেয়া কাপড়–পরা অপরিচিত লোকটির দিকে রাইফেল উঁচিয়ে ধ’রে।
বেদুঈনটি প্রশান্তভাবে মৃদু হাসে এবং গভীর ব্যঞ্জনময় স্বরে বলে, ‘আমি সুলুব্বি.. .।
তার প্রশান্তির কারণ এতোক্ষণে স্পষ্ট হয়ে এলো। সে যে অদ্ভুদ যাযাবর –সদৃশ গোত্রটির (অথবা বলা যায়, গোত্রগুলির একটি দলের) লোক যে গোত্র বেদুঈনদের প্রায় অন্তহীন যুদ্ধ–বিগ্রহে কখনো অংশ গ্রহণ করেনি; ওরা কারোরই শত্রু নয়, কেউই আ্ক্রমণ করে না ওদের।
সুলুব্বা গোত্রটি (একবচনে সুলুব্বি) এখনো একট দুর্বোধ্য রহ্যেই রয়ে গেছে অনুসন্ধানকারীদের কাছে। ওদের উদ্ভব সম্বন্ধে কেউ কিছু জানে না। ওরা যে আরবীয় নয় তা নিশ্চিত; ওদের রোদে গাত্রবর্ণ দেখে ওদের উদ্ভব সম্বন্ধে যা মনে হয়, ওদের নীল চোখ এবং হালকা বাদমী রঙের চুল তা থেকে ভিন্ন ইংগিত দেয় এবং বহন করে আরো উত্তরের অঞ্চলগুলির স্মৃতি। প্রাচীন আরব ঐতিহাসিকেরা বলেন, ওরা হচ্ছে সেই সব ক্রসেডারের বংশধর যাদের সালাহউদ্দিন গ্রেফতার করে আরবে নিয়ে এসেছিলেন। সেখানে পরে তারা মুসলমান হয়ে যায়। এবং আসলেই , সুলুব্বা নাম এবং ‘সলীব’ শব্দটির মূল একই অর্থাৎ ‘ক্রশ’, এবং ‘সুলুব্বী’ অর্থ ‘ক্রসেডার’।এ ব্যখ্যাটি সঠিক কি না বলা শক্ত। যা–ই হো, বেদূঈনরা সুলুব্বাদের আন–আরব বলে মনে করে– এবং ওদের প্রতি ব্যবহারে বেদুঈনদের রয়েছে কিছুটা উদার তাচ্ছিল্য। এই যে তাচ্ছিল্য, যা অতি স্পষ্টভঅবেই মানবিক সাম্যবোধের প্রত্যক্ষ বিরোধী এর ব্যখ্যা করতে গিয়ে ওরা, বেদুঈনেরা েএ কথারই উপর জোর দেয় যে, এ লোকগুলি একীনের দিক দিয়ে আসলে মুসলমান নয়, ওরা মুসলমানের মতো জীবন যাপন করে না। ওরা বলে, সুলুব্বারা বিয়ে করে না। ওরা ‘কুকুরের মতো অবাদ যৌন মিলনে অভ্যস্থ’;এমনকি, এ বিষয়ে ওরা নিকট–রক্ত সম্পর্ককেও গুরুত্ব দেয় না। তাছাড়া ওরা মরা খায় যা মুসলমানদের বিবেচনায় নাপাক, অপবিত্র। একটা কিছু ঘটে যাওয়ার পর তার যুক্তিসিদ্ধতা প্রতিষ্ঠতার প্রয়াসও এ হতে পারে। আামর বরং মনে হয়ে, সুলুব্বার জাতিগত বৈদেশিকতা সম্পর্খে বেদুঈনদের চেতনাই চরম বংশ–সচেতন, বেদুঈনদের ওদের চারিদিকে তাচ্ছিল্যের একটি ঐন্দ্রজিালিক বৃত্ত আঁতে বাধ্য করে, আর এ হচ্ছে ওদের রক্তের সংগে অন্য জাতের রক্ত–মিশ্রণের বিরুদ্ধে বেদুঈনদের একটি সহজাত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা সুলুব্বুদের ক্ষেত্রে ছিলো নিশ্চয়ই খুব আক র্ষণীয়ঃ কারণ, প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবেই ওরা হচ্ছে একটি সুন্দর জাতি, অন্য সকল আরবের চেয়ে দীর্ঘদেহী এবং ওদের অংগ প্রত্যংগে বিন্যাসের মধ্যে রয়েছে চমৎকার পারিপাট্য; বিশেষ করে, ওদের মেয়েরা অতি লাবণ্যময়ী, মোহময় দৈহিক সৌন্দর্য এবং অংগ সঞ্চালনের মাধুর্যে ডগমগ।
কিন্তু কারণ যাই হোক, সুলুব্বার প্রতি বেদুঈনদের তাচ্ছিল্যই ওদের জীবরেন দিয়েছে নিরাপত্তা; কারণ , ওদের যে –ই আক্রমণ করে, অথবা যে ব্যক্তিই ওদের ক্ষতি করে, সে–ই তার কবিলার লোকজনের দৃষ্টিতে মান –ইজ্জত খুইয়েছে বলে মনে করা হয়। তা ছাড়াও, সকল মরুবাসীর কাছেই সুলুব্বুদের খুব কদর–পশু চিকিৎসক, জীন নির্মাতা, টিনের কারিগর ও কামার হিসাবে। বেদুঈনেরা নিজেরা যদিও কুটির –শিল্প তথা হাতের কাজকে খুবই ঘেন্না করে তবু েএ সব জিনিসের প্রয়োজন হয় তাদেরও; এবং তাদের এই প্রয়োজনে সাহায্য করবার জন্য রয়েছে সুলুব্বা। তা ছাড়া ওরা পশুপালক হিসাবেও পটু, আর সবার উপরে, শিকারে ওরা সন্দেহতীতভাবেই উস্তাদ। ওদের পথের চিহ্ণ বোঝঅর ক্ষমতা প্রায় উপকথার পর্যায়ের;আর এক্ষেত্রে ওদের সাথে তুলনীয় হচ্ছে একমাত্র আল–মুররা বেদুঈনরো যারা বাস করে জনশূন্য এলাকার ১[Empty Quarter] উত্তরাঞ্চলের প্রান্তদেশে।
আমাদের নতুন পরিচিতি লোকটি যে একজন সুলুব্বী একথা জানতে পেরে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আমি ওকে খোলখুলি বললাম, আমরা ইবনে সউদের লোক। ওকে ওর আগুন নিবিয়ে ফেলার জন্য অনুরোধ করলাম। এভাবে আমাদের পরিচয় দান ছিলো বেশ নিরাপদ। কারণ এ লোকগুলি ওদের উপরওয়ালাদের খুবই সম্মানের চোখে দেখে। এরপর আমরা মাটির উপর বসে পড়ি এবং দীর্ঘ আলাপ জুড়ে দিই।
আদ –দাবিশের ফৌজের বিন্যাস সম্পর্কে এ বেশি কিছু বলতে পারলো না। ‘কারণ’, ও বললো, ‘ওরা সবসময়ে চলছে আর চলছেই জিনদের মতো এবং একনো এক জায়গাই বেশিক্ষণের জন্য ওরা থামে না।’ অবশ্য এটুকু জনা গেলো, ঠিক এ মূহুর্তে আমাদের খুব আশেপাশে শত্রুভাবাপন্ন ইখওয়ান –এর বড় কোন আড্ডা নেই, যদিও ছোটো ছোটো দল অনবরত মরুভূমি অতিক্রম করছে বিভিন্নমুখে হঠাৎ আমার মনে একটা ধারণ এলোঃ আমরা কি আমাদের কোয়েতের পথ দেখিয়ে যাওয়ার জন্য সুলুব্বির শিকারের এভং পথ চেনার সহজাত ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারি না?
–‘তুমি কি কখনো কোয়েত গিয়েছো?’ আমি তাকে জিজ্ঞাস করি। সুলুব্বি হেসে ফেলে– ‘বহুবার। আমি ওখানে হরিণের চামড়া বিক্রি করেছি এবং মাখন আর উটের পশম পরিষ্কার করেছি। কেন, আমি তো মাত্র দশদিন হলো ওখান থেকেই ফিরেছি।’
–‘তাহলে তো তুমি আমাদের কোয়েতের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারো? –অর্থাৎ আমাদের এভাবে নিয়ে যেতে পারো যাতে পথে ‘ইখওয়ান’কে এড়িয়ে আমরা কোয়েত পৌঁছুতে পারি।
আমার এ প্রশ্ন সম্পর্কে কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে সুলুব্বি। তারপর দ্বিধঅর সাথে বলে, ‘আমি হয়তো পারি, কিন্ত আপনাদের সাথে ‘ইখওয়ানের হাতে ধরা পড়লে হবে খুবই বিপদ। হ্যাঁ আমি অবশ্যি পারি,.. . কিন্তু আপনাদের জন্য তা হবে খুবই ব্যয়বহুল।’
–‘কতো?’
–‘বেশ’, এবং আমি ওর কন্ঠস্বর ধরতে পারলাম লোভের স্পনদন, ‘বেশ হুযুর, আপনি যদি আমাকে একশ’ রিয়াল দেন, আমি আপনাকে এবং আপনার বন্ধুকে এভাবে কোয়েত নিয়ে যেতে পারি যে, আকাশের পাখি ছাড়া আর কারো নজর পড়বে না আমাদের উপর।
একশ\’ রিয়াল দশটি আশরফির সমান, আমাদের জন্য এর তাৎপর্যের কথা বিচার করলে অংকটি হাস্যকরভাবেই তুচ্ছ। কিন্তু সুলু্ব্বি হয়তো ওর নিজের হাতে এত নগদ অর্থ জীবনে কখনো দেখেনি।
–আমি তোমাকে একশ’ রিয়ালই দেবো, বিশ রিয়াল এই মুহুর্তে এবং বাকীটা দেবো কোয়েত পৌঁছুনোর পর।’
ওর দাবী যে এত সহজেই মঞ্জুর হয়ে তা হয়তো আশা করেনি আমাদের পথ প্রদর্শক। হয়তে, সে কেন আরো মোটা অংক দাবী করেনি এজন্য তার অনুশোচনাই হলো। কারণ একটু চিন্তা করে সে বললো–‘কিন্তু আমর উটটির কি হবে? আমি যদি আমার উট হাঁকিয়ে আপনাদের সাথে কোয়েত নাগাত যাই এবং আবার ফিরে আসি, বেচারা জানোয়ারটির একেবারেই দফারফা হয়ে যাবে, আর আমার উট তো মাত্র একটিই।’
আমি কথাবার্তা আর দীর্ঘ হতে না দিয়ে ত্বরিৎ জবাব দিইঃ ‘আমি তোমার উটটি কিনে নেবো। তুমি এই উটে চড়ে কোয়েত যাবে এবং সেখানে আমি তোমাকে উপহার দেবো এটি। তবে আমদের ফিরতি পথও দেখিয়ে নিয়ে আসতে হবে তোমাকে।
এ ছিলো তার আশার অতীত। খুশীতে ডগমগ হয়ে দেরী না করে সে উঠে দাঁড়ালো এবং অন্ধকারে হারিয়ে গেলো। কয়েক মিনিট পরে সে আবার ফিরে এলো এবং রশি ধরে টেনে টেনে নিয়ে এলো একটি বয়স্ক অথচ সুন্দর, স্পষ্টতই শক্ত–সমর্থ জানোয়ার। কিছুক্ষণ দর–কষাকষির পর আমরা ওর দাম স্থির করি এশ পঞ্চাশ রিয়াল। শর্ত হলো, আমি এখন ওকে পঞ্চাশ রিয়অল শোধ করবো এবং বাকীটা ওর পুরষ্কার সহ ওকে দেওয়া হবে কোয়েতে। আমাদের জীনের পাশে ঝোলানো ব্যগ থেকে জায়েদ বের করে রিয়ল–ভর্তি িএকটি থলো এবং আমি মুদ্রাগুলি গুণে গুণে সুলুব্বির কোলে ফেলতে থাকি। সে ওর বিছানার চাদরের তৈরি পোশাকের নীচ থেকে এক চুকরা কাপড়া বের করে, যাতে বাঁধঅ ছিলো ওর টাকাকড়ি এবং যখন সে আমার রিয়ালগুলি ওর পুঁজির সাথে যোগ করতে শুরু করলো একটা নতুন মুদ্রার দ্যুতি আমার চোখে ভেসে উঠলো।
–‘থামো,’ – ওর হাতের উপর আমার হাত রেখে আমি প্রায় চিৎকার করে উঠি, ‘তোমার ঐ ঝকঝকে রিয়ালটি আমাকে দেখতে দাও।’
একটু দ্বিধঅর ভংগি করে, যেনো সে লুণ্ঠিত হাবর ভয়ে আতংকিত, সুলুব্বি ওর মুদ্রাটি আলতো করে অতি মোলায়েমভাবে আমার হাতে তালুর উপর রাখলো। নতুন মুদ্রার মতোই মুদ্রাটির কিনার বেশ ধারালো মনো হলো। তবু ও নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি একটি দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মুদ্রাটির দিকে তাকাই। হ্যাঁ, এটি অবশ্যই একিট নতুন ‘মারিয়া থেরেসা’ মুদ্রা, যেনো এইমাত্র টাকশাল থেকে এসেছে। এবং সুলুব্বির বাকী মুদ্রাগুলির উপর দেশলাইয়ের কাঠি ধরে আমি দেখতে পেলাম আরো পাঁচ–ছয়টি মুদ্রা, একই রকম বিস্ময়কররূপে নতুন।
–‘তুমি এ রিয়ালগুলি কোথায় পেলে?’
–‘আমি .. . আমি কসম করে বলছি হুজুর , আমি এগুলি সদুপায়েই পেয়েছি।.. . আমি এগুলি চুরি করিনি। কয়েক হপ্তা আগে কোয়েতে এক মুতায়েরী আমাকে এগুলি দিয়েছে। সে আমার নিকট থেকে একটি নতুন উটের গদি কিনেছিলো। কারণ তার গদিটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।’
–‘মুতায়েরী? তুমি ঠিক বলছো?’
–‘আমি ঠিকই বলছি হুজুর! আমি যদি মিথ্যা বলি, আল্লাহ যেনো আমাকে তুলে নেয়। ওছিলো আদ–দাবিশের লোকদের একজন সেই দলের লোক, যারা সম্প্রতি লড়াই করছিলো হাইলের ‘আমীরে’র বিরুদ্ধে। তার নিকট থেকে গদীর জন্য টাকা নেওয়া নিশ্চয় অন্যায় হয়নি। আমি না বলতে পারিনি এবং আমার বিশ্বাস ‘শুয়ুখ’ – আল্লাহ তাঁর হায়াত দারাজ করুন – তা বুঝবেন।
আমি তাকে আবার আশ্বস্ত করি এই বলে যে, বাদশঅহ তাকে দুশমন মনে করবেন না। এতে ওর আতংক দূর হলো। আরো প্রশ্ন করে জানতে পারি অনেক সূলুম্বা আদ –দাবিশের পক্ষের বিভিন্ন লোকের নিকট থেকে এ ধরণের মুদ্রা পেয়েছে, জিনিস –পত্র অথবা ছোটোখাটো কাজের বিনিময়ে.. .
আমাদের সুলুম্বি সত্যি প্রমাণ করলো যে, পদপ্রদর্শক হিসাবে সে অসাধঅরণ। তিন রাত ধ’রে সে আমাদের বিদ্রোহী এলাকার মাঝ দিয়ে, সর্গিল গতিতে , পথ–চিহ্ণহীন এলাকা অতিক্রম করে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে–িএমন সব এলাকা যা জায়েদ নিজেও আগে দেখেনি কোনোদিন, যদিও দেশটাকে জায়েদ ভাল করেই চেনে। দিনগুলি কাটলো কিন্তু লুকিয়ে, আত্মগোপন করে। গা ঢাাক দেওয়অর জন্য সন্দেহমুক্ত জায়গা খুঁজে বার করতে সুলুম্বি ছিলো সেরা এক উস্তাদ। এক সময় ও আমাদের নিয়ে গেলো একটি পানির গর্তের কাছে, যা সে অঞ্চলের বেদুঈনদের কাছেও ছিলো অজানা, সুলুম্বি আমাদের বললো। এর কিছুটা লোনা বাদামী পানিতে আমাদের উটগুলি ওদের পিয়াস মিটায় আর আমরাও আমাদের মশকগুলি আবার পানিতে ভর্তি করে নিতে সমর্থ হই। কেবল দু’বার আমরা দেখতে পেলাম ‘ইখওয়ান’দের কয়েকটি দল, কিন্তু কোনবারই ওরা আমাদের দেখে ফেলতে পারে, তেমন সুযোগ ওদের দেওয়া হলো না।
সুলুম্বির সাথে আমাদের সাক্ষতের পর চতুর্থ দিনের পূর্বাহ্ণে আমরা এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছুই যেখনা থেকে কোয়েতের শহর দেখা যায়। নযদ থেকে আগত মুসাফিরদের পক্ষে যা করা স্বাভাবিক আমরা তা করলাম না; দক্ষিণ –পশ্চিম দিক থেকে শহরে প্রবেশের চেষ্টা না করে আমরা আগাই পশ্চিম দিক থেকে, বসরা থেকে আসা সড়ক বরাবর, যেনো আমাদের সংগে কারো দেখা হলে সে মনে করে আমরা ইরাকী ব্যবসায়ী।
কোয়েতে ঢুকেই আমরা এক সওদাগরের প্রংগণে খাতিরজমা হয়ে বসে পড়ি। জায়েদ যখন ইরাকের কনস্টেবল বাহিনীতে ছিলো তখন থেকেই সে এই সওদাগরকে চেনে।
ধূলায় আচ্ছন্ন সড়ক এবং রোদে–পেড়া কাদার ইটে তৈরি ঘরবাড়ির উপর ছড়িয়ে রয়েছে একটা স্যাঁতস্যঁতে পীড়াদায়ক গরম; নযদের মুক্ত স্তেপ অঞ্চলের সাথে অভ্যস্ত আমি দেখতে নাদেখতেই ঘামে একেবারে ভিজে যাই। কিন্তু আরাম করার সময় ছিলো না। সুলুম্বির দায়িত্বে উটগুলি রেখে দিয়ে আমি আর জায়েদ আগিয়ে গেলাম বাজারের দিকে আমদের উদ্দিষ্ট প্রাথমি খোঁজ–খাবর নেবারজন্য। সুলুম্বিকে কড়া আদেশ দিলাম– আমরা কোত্থেকে এবং কেন এসেছি সে যেনো কাউকে না বলে।
যেহেতু কোয়েতের সাথে আমি পরিচিত নই এবং এও আমার ইচ্ছা নয় যে, আমার উপস্থিতির কারনে জায়েদ মানুষের দৃষ্টি আক র্ষণ করে বসে, এজন্য আমি প্রায় ঘন্টাখানেক অবস্থান করি একটি কফিল দোকানে, সেখানে বসে বসে কফি খঅই এবং নারকেলের ‘হুকা’ টানি। অবশেষে জায়েদ যখন আবার দেখা দিলো তার মুখে সাফল্যের অভিব্যক্তি দেখে আমি বুঝতে পারলাম নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু সে আবিষ্কার করেছে।
–‘চাচা, চলুন আমরা বাইরে যাই। কেউ না শুনে এমন কথা বলা বাজারেই সহজতরো। আর এই যে, আপনার জন্য একটি জিনিস এনেছি–আমার জন্যও একটি।’ বলতে বলতে সে তার ‘আবায়া’র নীচ থেকে বের করে টশ–বোনা বাদমী উলের তৈরী দুটি ইরাকী ইগাল। ‘এগুলির দ্বারা আমরা গণ্য হবো ইরাকী ব’লে।’
সতর্ক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জায়েদ নিশ্চিত হয়েছে, তার একসাবেক অংশীদার –যে তার সংগী ছিলো পারস্য উপসাগরে তার সেদিনের চোরাই কারবারের দিনগুলিতে–এখন কোয়েতে বাস করছে, আর বাহ্যত এখনো সে তার পুরান অভ্যস্ত ব্যবসাই চালিয়ে যাচ্ছে।
–‘কেউ যদি এ শহরে চোরই বন্দুক আমদানি সম্পর্খে আমাদের কিছু বলতে পারে সে হচ্ছে এই বান্দারঃ বান্দার আমারই মতো ম্যাম্মার কবিলার লোক, সেই একগুঁয়ে যুবকদের একজন, যারা ইবনে সউদের শাসন পুরাপুরি মেনে নিতে পারেনি। কিছুতেই ওকে জানানো উচিত হবে না যে আমরা ‘শুয়ুখে’র জন্য কাজ করছি। এমন কি, আমি মনে করি, আমরা কোত্থেকে এসেছি, তা’ও পর্যন্ত ওকে বলা যাবে না। কারণ, বান্দার আসলে নির্বোধ নয়। সে ভারি ধূর্ত –বলতে কি –অতীতে সে আমাকে এক ঘন ঘন প্রতারণা করেচে যে, আমি ওকে এখন বিশ্বাস করতেই ভয় পাই।’
শেষ পর্যন্ত আমরা বান্দারকে খুঁজে পেলাম বড় বাজারের নিকটে, এক চিপা গলির বাড়িতে। লোকটি দীর্ঘদেহী একহারা গড়নের, হাল্কা পাতলা, চল্লিশের মতো বয়স, চোখ দুটি তার গাঢ় গভীর আর মুখে তার তিক্ততা ও বদহজমির ছাপ। কিন্তু জায়েদকে দেখার সংগে সংগে তার মুখের রেখাগুলি সত্যিকার খুশিতে আলোকিত হয়ে ওঠে। আমার হালকা রঙের জন্য আমার পরিচয় দেওয়া হলো আমি একজন তুর্কী এবং আমি বাস করছি বাগদাদে আর বসরা থেকে বোম্বেতে আরবী তেজী ঘোড়া রফতানীর ব্যবসা করে আসছি।
–‘কিন্তু আজকাল বোম্বেতে ঘোড়া রফতানী করে আর লাভ হয় না’, জায়েদ যোগ করে, ‘আনাইজা আর বুরাইদার সওদাগরেরা ওখনকার বাজার একোবরেই কব্জা করে নিয়েছে।’
–‘আমি জানি’, বান্দার জবাব দেয়, ‘ইবনে সউদের ঐ পাজি দক্ষিণারা আমাদের দেশ দখল করেই তুষ্ঠ নয়; ওরা আমাদের রুজি–রোজগার কেড়ে নেবার জন্য ওঠে ড়ে লেগেছে!
–‘কিন্তু বান্দার, বন্দুকের ব্যবসা সম্বন্ধে তুমি কি বলো?’ – জায়েদ জিজ্ঞেস করে, ‘মুতায়ের এবং আজমান কবিলার লোকেরা যেভাবে ইবনে সউদের ঘাড় মটকাতে চাইছে তাতে তো এ ব্যবসা এন খুবই তেজী হওয়ার কথা, কি বলো?’
–‘হ্যাঁ। ব্যবসা এখানে খুব তেজীই ছিলো’, বান্দার তার কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, ‘কয়েক মাস আগেই আমি বেশ দু’পয়সা কামাই করেছি ট্রান্স– জর্ডানে রাইফেল কিনে, পরে সেগুলি আদ –দাবিশের লোকের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু সবই এখন একদম নষ্ট, একদম শেষ! এটি রাইফেলও তুমি আর বিক্রি করতে পারবে না।’
–‘তা কেমন ক’রে হয়? আমার তো মনে হয়, এগুলি আগের চেয়ে অনেক বেশি দরকারী আদ –দাবিশের জন্য।’
–‘হ্যাঁ,’ ‘বান্দার পাল্টা জবাব দেয়, ‘দরকার তার নিশ্চয় আছে। কিন্তু অমন দামে সে এগুলি পাচ্ছে যে দামে তুমি আমি কেউই বিক্রি করতে সমর্থ নই। .. . সে বাক্স বোঝাই ওগুলির পায় সমুদ্রের ওপার থেকে, প্রায় নতুন ইংলিশ রাইফেল এবং দু’শ কার্তুজ –সহ একটি রাইফেলের জন্য সে দাম দেয় দশ রিয়াল।’
–‘আলহামদু লিল্লাহ!’ আন্তরিক বিস্ময়ের সংগে উচ্চারণ করে জায়েদ, দু’শ কার্তুজ সহ প্রায় নতুন একটি রাইফেল দশ রিয়ালে! কিন্তু তা অসম্ভব.. .।
বাস্তবে তা অসম্ভবই মনে হলো– কারণ সে সময়ে কার্তুজ ছাড়াই একটি পুরানা লী–এনফিল্ড রাইফেলের দাম নযদে ছিলো ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ রিয়াল এবং নযদের চাইতে কোয়েতে দাম কম হতে পারে এ কথা বিবেচনা করলেও বিপুল পার্থক্যের কারণ তখনো বোঝা যাচ্ছিলো না।
বান্দার মুখ বাঁকিয়ে হাসে, ‘হ্যাঁ, মনে হয় ক্ষমতাশালী বন্ধু –বান্ধব রয়েছে আদ –দবিমের –খুব ক্ষমতাশালী বন্ধুজন। কেউ কেউ তা বলেঃ একদিন সে স্বাধীন এক ‘আমী’র হয়ে বসবে নযদের উত্তর অঞ্চলে।’
–‘বান্দার, তুমি যা বলছো’, মাঝখানে আমি বলি, ‘তা খুবই ভালো, খুবই ঠিক। আদ –দবিশের হয়তো সত্যি সত্যি ইবনে সউদের আওতার বাইরে নিজের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত করবেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, তার টাকা পয়সা নেই, আর টাকা পয়সা ছাড়া বিশ্বজয়ী আলেকজাণ্ডারের পক্ষেও রাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব ছিলো না।
বান্দার উচ্চকণ্ঠে হো হো করে ওঠেঃ টাকা–পয়সা? আদ –দাবিশের প্রচুর আছে–প্রচুর নতুন রিয়াল, যা রাইফেলের মতোই বাক্স – বোঝাই হয়ে তার নিকট আসে সমুদ্রের ওপার থেকে।’
–‘বাক্স বোঝায় রিয়ালা? বড় তাজ্জবের কথা! বেদুঈন কোত্থেকে পাবে বাক্স বোঝঅয় নতুন রিয়াল?’
–‘তা আমি জানি না ’– বান্দার জবাব দেয়, ‘তবে এ আমি জানি, তার কিছু লোক প্রায় রোজই নতুন রিয়ালের ডেলীভঅরী নিচ্ছে যা তাদের নিকট পৌঁছুচ্ছে শহরে বিভিন্ন সওদাগরে মাধ্যমে। কেন, কালই তো আমি দেখলাম, বন্দরে এ ধরনের বাক্স নামানোর কাজ তদারক করছে ফারহান ইবনে মাশহুর।’
এ ছিলো একটি খবরের মতো খবর। আমি ফারহানকে ভালো করেই জানি। সে সিরিয়ার বিখ্যাত বেদুঈন সর্দার নূরী আশ –শালানের ভাইপোর পুত্র। এই নূরীই একদা লরেন্সের সংগে মিলে লড়াই করেছিলো তর্কীদের বিরুদ্ধে। তরুণ ফারহানের সংগে আমার প্রথম দেখা হয় দামেশকে ১৯২৪–এ; ওখানে আমোদ–প্রমোদের সন্দেহপূর্ণ সকল জায়গায় মাতলামির জন্য সে ছিলো কুখ্যাত। কিছুদিন পর তার বড় চাচার পিতার সংগে তার ঝগড়া বাঁধে। তখন সে তার কবিলা ও রুবালার কিছু লোকজন নিয়ে চলে যায় নযদে, আর ওখানেই সে হঠাৎ ‘ধার্মিক’ হয়ে ওঠে এবং ‘ইখওয়ানে’র সাথে যোগ দেয়। তার সংগে আমার আবার দেখা হয় ১৯২৭ সনে, হাইলে ইবনে মুসাআদের কিল্লায়। তখন সে তার নবার্জিত ধর্মের প্রতীক হিসাবে পরতে শুরু করেছে ‘ইখওয়ানে’র সাদা বিশাল পাগড়ী আর উপভেঅগ করছে বাদশাহর আর্থিক অনুগ্রহ। আমি তাকে বাগদাদে আমাদের পূর্বেকার দেখা–সাক্ষাতের কথা মনে করিয়ে দিলে সে সহসা প্রসংগ বদল করে ফেলে। লোকাটি নির্বোধ এবং উচ্চাভিলাষী, আর এ করণেই সে আদ –দাবিশের বিদ্রোহের মধ্যে দেখতে পেলো বিশার ধূ– ধূ নুফুদের উত্তরে একটি ওসেসি আর – জাউফের স্বাধীন আমীররূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি সুযোগ; কারণ , অন্য দেশের মতো আরবেও বিদ্রোহীরা সিংহ শিকার করার আগেই নিজেদের মধ্যে সিংহের চামড়া ভাগ করার সনাতন রীতি অনুসরণ করে থাকে।
–‘তা‘হেলে ফারহান এখনে, কোয়তেই রয়েছে? আমি বান্দারকে জিজ্ঞাস রি।
–‘আলবৎ । আদ –দবিশের মতোই এখানে সে ঘন ঘন আসে এবং ‘শায়খে’র প্রসাদে অবাদে আসা যাওয়া করে। লোকে বলে শায়খ তাকে খুবই ভালোবাসেন।’
–‘কিন্তু কোয়েতে আদ –দাবিশ এবং ফারহানের আগমনে ব্রিটিশ গর্ভমেন্ট কি কোনো আপত্তি করে না? আমার যেনো মনে পড়ে, ক’মাস আগে ওরা একবার ঘোষণা করেছিলো আদ –দাবিশ বা ওর লোকজনদের এ অঞ্চলে ঢুকতে দেবে না .. .?
বান্দার আবার হো হো করে ওঠে – হ্যাঁ তা–ই করেছিলো ওরা, তা–ই করেছিলে! কিন্তু আমি তো আমাকে বলেছি, আদ –দাবিশের রয়েছে খুব ক্ষমতাশালী বন্ধু–বান্ধব .. . এই মুহূর্তে সে এ শহরে আছে কি না এ ব্যাপারে আমি নই;কিন্তু ফারহান আছে। সে রোজ সন্ধ্যায় ‘মাগরিবে’র সালাতের জন্য বড় মসজিদে যায়। যদি আমাকে বিশ্বাস না করো, এখানে তুমি ওকে তোমার নিজের চোখেই দেখতে পারো .. .।
এবং সত্যিই আমরা দেখতে পেলাম ওকে। বান্দারের কাছ থেকে এই ইংগিত পাওয়ার পর বড় মসজিদের সন্নিকটে সন্ধ্যার প্রথমদিকে আমি আর জায়েদ যখন পায়চার করছিলাম, একদল বেদুঈনের সাথে আমরা প্রায় ধ্ক্কা খাই আর কি! চেহারায় সন্দেহাতীতভাবেই নযদী এই বেদুঈনগুলি রাস্তার একটি কোণ থেকে বের হয়ে এসেছিলো। ওদের অগ্রভাগে রয়েছে চৌত্রিশ–পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের একজন লোক,যে–সব দীর্ঘদেহী বেদুঈন ওকে ঘিরে আছে এবং অনুসরণ করছে তাদের চাইতে কিছুটা খাটো, আর সুন্দর মুখখানায় তার শোভা পাচ্ছে খাটো কালো দাড়ি। আমি মুহূর্তেই তাকে চিনতে পারলাম। অবশ্য আজো আমি জানি না, সে আমাকে চিনতে পেরেছিলো কি না। তার চোখ এক ঝলকের জন্য স্থির হলো আমার চোখেল উপর; তারপর পলকের জন্য আমার উপর সে তার চোখ বুলিয়ে নেয় একটা বিমুঢ় দৃষ্টিতে, যেনো একটা ঝাপসা অস্পষ্ট স্মৃতিকে সে স্মরণে আনবার চেষ্টা করছে। তারপর সে তার মুখ ফিরিয়ে নিলো। মুহুর্তকাল পর মসজিদের দিকে ধাবমান মানুষেরে ভিড়ের মধ্যে সে আর তার দলের লোকেরা হারিয়ে গেলো।
আমরা স্থির করি কোয়েতে আমদের এই গোপন সফর আদ – দাবিশকে দেখার একটি সুযোগের প্রতীক্ষায় দীর্ঘায়িত করা যায় না। বান্দার আমাদের কাছে যা ব্যক্ত করেছে তা আরো মজবুত হলো শহরে পরিচিত অন্যান্য লোকজনের নিকট জায়েদের সুচতুর অনুসন্ধানের মাধ্যমে। আদ –দাবিশ লী –এনফিল রাইফেলের যে রহস্যপূর্ণ সাপ্লাই পাচ্ছে, লোককে ধোঁকা দেবার জন্য প্রকাশ্যে যা চালানো হচ্ছে ‘ক্রয়’ হিসাবে,স্পষ্টই তা ইশারা করছিলো এক কোকেতী সওদাগরের দিকে। অস্ত্র আমদানীর জন্য এ সওদাগর সবসময়ই এ এলাকায় ছিলো বিশিষ্ট এবং কোয়েতের বাজারগুলিতে টাকশাল থেকে সদ্য বের হয়ে আসা যে বিপুল পরিমাণে মারিয়া থেরেসা রিয়াল চালু ছিলো, প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সেগুলি এসেছে আদ – দাবিশ এবং তার চারপাশেল লোকজনের কাছ থেকে । তাঁর আসল ডিপোগুলি দেখা এবং চালানের কাগজপত্র পরীক্ষঅ – যা সম্ভব নয় বললেই চলে – তা বাদ দিলে আমাদের সাথে আলাপের সময় বাদশাহ যে –সব সন্দেহের কথা বলেছিলেন সেগুলির সত্যতার প্রচুর সাক্ষ্য –প্রমাণ আমরা পেয়ে গেলাম।
আমার মিশন পূর্ণ হলো। এবং পরের রাত, যে রকম লুকিয়ে আমরা কোয়েতে পৌঁছেছিলাম ঠিক তেমনি গোপনোই আমরা বের হয়ে পড়লাম কোয়েত থেকে। বাজারগুলতে জায়েদ আর আমি যখন খোঁজ –খবর নিচ্ছিলাম তখন আমদের সুলুম্বি খুঁজে পেতে দেখতে পেলো – এই মূহূর্তে কোয়েতের দক্ষিণে বিদ্রোহীদের কোনো দলের অস্তিত্ব নেই। এজন্য আমরা রওয়ানা করি দক্ষিণ দিকে আলহাসা প্রদেশের দিকে, যা ছিলো সম্পূর্ণভাবেই বাদশাহর নিরংকুশ নিয়ন্ত্রণে। এভাবে দুরাতের উদ্যম ও উৎসাহপূর্ণ সফরের পর আমরা উপকূলের অদূরে বনু হাজার বেদুঈনদের একটি দলের মুখোমুখি হই, যাদের আল – হাসান আমীর পাছিয়েছিলেন বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিকতম অবস্থানগুলি সম্পর্কে গোপন খবর নিতে; এবং তাদের সাথে আমরা আবার প্রবেশ করি বাদশাহর অনুগত এলাকায়।
ইবেনে সউদের রাজ্য নিরাপদে পৌঁছানোর পরই আমরা আমাদরে পথচালক সুলুম্বিকে ছেড়ে দিই। সে সান্দদে তার স্বোপার্জিত পুরস্কার পকেটে পুরে, আমি তাকে উটটি উপহার দিলাম সে উটটি হাঁকিয়ে, মিলিয়ে গেলো পশ্চিমদিকে, যখন আমরা চলেছি দক্ষিণে, রিয়াদের দিকে।
পরে আমি প্রবন্ধের যে–সিরিজ লিখি তাতে প্রথমবারের মতো একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বিদ্রোহীদের মদদ যোগাচ্ছে একটি বৃহৎ ইউরোপীয় শক্তি। প্রবন্ধগুলিতে দেখানো হলো,এসব ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইবনে সউদের রাজ্যের সীমানাকে দক্ষিণদিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে, তার উত্তরতম প্রদেশদিকে সউদী আরব এবং ইরাকে মধ্যে দিয়ে একটি ‘স্বাধীন’ সর্দার শাসিত অঞ্চলে পরিণত করা যা বৃটেনকে সে এলাকার মধ্যে দিয়ে একটি রেল লাইন তৈরির সুযোগ করে দেবে। এছাড়াও, আদ –দাবিশের বিদ্রোহ ইবনে সউদের রাজ্যের মধ্যে এমন বিপুল বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ এনে দিয়েছে যে, বাদশাশ ইবনে সউদের পক্ষে ব্রিটেনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কনসেশনের দাবীর বিরোধিতা আর সম্ভব হবে না, যে দাবীর বিরোধিতা তিনি করে বরাবর এসেছেন তখন পর্যন্তঃ এ কনসেশনগুলির একটি হলো ব্রিটেনের নিকট জেদ্দার উত্তরে অবস্থিত লোহিত – সাগরের বন্দর রাবিগের ইজারা, যেখানে ব্রিটেন অনেকদিন ধরে চেয়ে এসেছে নৌবাহিনী একটি ঘাঁটি স্থাপন করতে; অন্যটি হলোঃ দামেশক – মদীনা রেল সড়কের যে –অংশটি সউদী এলাকার মধ্যে পড়েছে তার নিয়ন্ত্রণ। আদ –দাবিশের হাতে ইবনে সউদের পরাজয় ঘটলে এই স্কীমগুলি একেবারে বাস্তব সম্ভাবনার আওতায় এসে যেতো।
আমার প্রবন্ধগুলি ইউরোপীয় এবং আরবী (প্রধানত মিসরীয়) পত্রিকাসমূহে ছাপা হওয়ার সাথে সাথে অকস্মাৎ দারুন এক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এও খুবই সম্ভব যে, গোপন ষড়যন্ত্র আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়াই হয়তো পরে এ ষড়যন্ত্রের বিফলতা অন্যতম কারণ। যতোই হোক, হাইফা থেকে বসরা পর্যন্ত ব্রিটেনের রেল সড়ক তৈরির পরিকল্পনাটি ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যায়। প্রাথমিক জরিপের জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছিলো তা সত্ত্বেও এ পরিকল্পনার কথা পরে আর কখনো শোনা যায়নি।
এরপরে যা ঘটনো তা সবই ইতিহাসের বিষয়ঃ ১৯২৯ সনের সে গ্রীষ্মে কোয়োতে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনার জন্য আদ –দাবিশকে যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে ইবনে সউদ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেন ব্রিটেনের নিকট। যেহেতু একটি বিদেশী শক্তি কর্তক এসব অস্ত্র সরবরাহের কোনো বাস্তব প্রমাণ তার কাছে ছিলো না, সেজন্য বাদশাহর পক্ষে এ ধরণের বিক্রয়ের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো সম্ভব ছিলো না। জবাবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জানায়, কোয়েতের ব্যবসায়ীরাই অস্ত্র সরবরাহ করছে বিদ্রোহীদের নিকট এবং তা বন্ধ করার জন্য ব্রিটেন কিছুই করতে পারে না, –কারণ, ১৯২৭ সনের জেদ্দার সন্ধি মোতাবেক ব্রিটেন আরবে অস্ত্র আমদানির উপর তাদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। ইবনে সউদ যদি চান, তার ব ললো, তিনিও অস্ত্র আমদানি করতে পারেন কোয়েতের ভেতর দিয়ে .. . ইবনে সউদ যখন আপত্তি করে বললেন, ঐ একই সন্ধিমতে ব্রিটেন এবং সউদী আরব উভয়ে নিজ নিজ এলাকার অপরের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সকল প্রকার ক্রিয়াকলাপ বন্ধ করতে বাধ্য, তখন তিনিও এ জবাব পেলেন – কোয়েতকে ব্রিটিশ এলাক বলা যায় না, কারণ এটি একটি স্বাধীন শেখ রাজ্য, যার সাথে ব্রিটেনের সন্ধি – সম্পর্কের বেশি কোনো সম্পর্ক নেই . . .।
এবং এজন্য গৃহযুদ্ধ চললো অব্যাহত গতিতে ১৯২৯ সনের শরতের শেষের দিকে। ইবনে সউদ নিজেই অবতীর্ণ হলেন ময়দানে; এবার তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞঃ তিনি আদ – দাবিশকে ধাওয়া করবেন কোয়েতের অভ্যন্তরেও যদি – অতীতে সবসময়ে যেমন হয়েছে – কোয়েত থেকে যায় বিদ্রোহীদের আশ্রয়ের জন্য একটি মুক্ত এলাকা এবং নবতরো অপারেশনের জন্য ঘাঁটি। এ দৃঢ় মনোভঅবের মুকাবিলায়, যা ইবনে সউদ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিতে ভুল করবে না, ওরা মনে হয় বুঝতে পারলো যে, ওদের এই খেলায় আর বেশিদূর অগ্রসর হওয়া খুবই বিপজ্জনক হবে। আদ – দাবিশ যাতে পিচু হটে আবার কোয়েত এলাকায় ঢুকতে না পারেন সেজন্য পাঠানো হলো ব্রিটিশ যুদ্ধ–বিমান আর সাঁজোয়া গাড়ি। বিদ্রোহী বুঝতে পারালেন তাঁর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে গেছে। খোলাখুলি যুদ্ধে তিনি আর কখনো পারবেন না বাদশাহকে ঠেকাতে। বাদশাহর শর্তগুলি ছিল সংক্ষিপ্ত এবং পরিষ্কারঃ বিদ্রোহী কবিলাগুলিকে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতে হবে; ওদের অস্ত্রশস্ত্র, ঘোড়া ও উটগুলি ওদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হবে আদ –দাবিশের জীবন রক্ষা করা হবে। কিন্তু তাঁকে তাঁর জীবনে বাকী দিনগুলি কাটাতে হবে রিয়াদে।
আদ –দাবিশ, যিনি প্রতি মুহূর্তেই সক্রিয় এবং গতিময়, এ ধরনের নিস্ক্রিয়তা এবং গতিহীনতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলেন না। তিনি বাদশাহর প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন। বাদশাহর বিপুল বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত করলেন। বাদশাহর বিপুল বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে বিদ্রোহীরা সম্পূর্ণভাবে পরাভূত হলো; আদ –দাবিশ এবং আরো কয়েকজন নেতা– তাঁদের মধ্যে ছিলেন ফারহান ইবনে মশহুর এবং আজমান কবিলার সর্দার নায়েক আবু কিলাব পালিয়ে গেলেন ইরাকে।
ইবনে সউদ আদ –দাবিশের বহিষ্কার দাবী করলেন। কিছুদেনের জন্য মনে হয়েছিলো আতিথেয়তা ও আশ্রয় দানের পুরানো আরবীয় নিয়মের কথা উল্লেখ করে ইরাকের বাদশাহ ফযসলা হয়তো তাঁর দাবী প্রত্যাখান করবেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি রাজী হয়ে যান। ১৯৩০–এর প্রথমদিকে ভয়ানক রকমে অসুস্থ আদ –দাবিশকে বাদশাহর নিকট অর্পণ করা হলো এবং তাঁকে নিয়ে আসা হলো রিয়াদে। কয়েক সপ্তাহ পর যখন স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, প্রবার সত্যি আদ –দাবিশের মুত্যু আসন্ন, বাদশাহ ইবনে সউদ তাঁর চিরচারিত মহানুভতার সাথে তাঁকে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন আরতাবিয়ায়, তাঁর পরিবার–পরিজনের নিকট। এভাবে এক উত্তাল ঝড়ো জীবনের সমাপ্তি। এবং ইবনে সউদের রাজ্যে আবার নেমে এলো শান্তি.. .
.. . … .. . .. .
এবং আবার নতুন করে শান্তি নামে আরযার কুয়াগুলির চারপাশে।
‘‘ওগো মুসাফিরেরা, আল্লাহ তোমাদের জীবন দান করুন। তোমরা অংশ নাও আমাদের দাক্ষিণ্যের। –উচ্চকন্ঠে বলে বৃদ্ধ মুতায়বী বেদুঈন এবং তার লোকজনেরা আমাদেরকে আমাদের উটগুলিকে পানি খাওয়াতে সাহা্যে করে। মাত্র কিছুকাল আগের সকল বিদ্বেষ এবং শত্রুতা বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই ছিলো না।
কারণ, এই বেদুঈনেরা এক বিস্ময়কর জাত। এমনকি, কাল্পনিক উস্কানিতেও মুহূর্তের মধ্যেই ওরা জ্বলে উঠতে পারে অদম্য রাগে ও রোষে, আবার এমনি মুহূর্তে মধ্যেই ওরা ফিরে যেতে পারে জীবনের সেই নিয়তির ছন্দ–প্রবাহে যেখানে বিরাজ করে নম্রতা এবং মায়াঃ জান্তা এবং জাহান্নাম, সবসময় পাশাপাশি, নিকট সান্নিধ্যে।
এবং মুতায়বী উট–রাখালেরা তাদের বড় বড় চামড়ার বালতিতে করে আমাদের উটগুলি জন্য পানি তোলে আর কোরাস গায়ঃ
পিও, এবং বাকী রেখো না পানি,
রহমতে পরিপূর্ণ এ ইদারা এবং এর নেই কোনো তল।
তিন
আমাদের হাইল ত্যাগরে পঞ্চম রাতে আমরা মদীনার প্রান্তরে পৌছুই এবং ওহুদ পর্বতের গাঢ় রূপরেখা দেখতে পাই। ক্লান্ত পদক্ষেপে আগিায়ে চলে আমাদের উটগুলি। খুব ভোর থেকে শুরু করে এই রাত নাগাদ আমরা পেছনে ফেলে এসেছি দীর্ঘ পথ। জায়েদ এবং মনসুর নিশ্চুপ, আমিও নীরব। জ্যোৎস্নার আলোতে মদীনা তার সংকীর্ণ পথবিশিষ্ট প্রাচীর এবং নবীর মসজিদের চিকন সরল মীনারসমূহ আমাদের সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়।
আমরা সেই দাখিল দরোজার সামনে উপস্থিত হই যা উত্তর দিকে অবস্থিত বলেই সিরীয় প্রবেশদ্বার বলে পরিচিত। উটগুলি সেই প্রবেশদ্বারের ভারী স্বম্ভগুলির ছায়াতে কিছুটা আড়ষ্ট ও সংকুচিত; ফলে, ওদের দরোজায় ঢুকতে বাধ্য করার জন্য আমরা আমাদের হাতের চাবুক ব্যবহার করি।
এখন, এই মুহূর্তে আম িআবার রয়েছি নবীর শহরে, দীর্ঘদীন নান জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর পর আবার ঘরের চেলে ঘরে ফিরে এসেছি; কারণ এই নগরী কয়েক বছর ধরেই আমার বাড়ি–ঘর। এক গাঢ় পরিচিত প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে মদীনার ঘুমন্ত নির্জন রাস্তাগুলির উপর। উটের পায়ের শব্দে এখানে–ওকানে আলস্য ভরে উঠে বসেছে কুকুর। একটি তরুণ হেঁটে চলেছে গান গাইতে গাইতেঃ তার স্বর একটি মোলায়েম ছন্দে আন্দেলিত হয়ে পাশের একটি গলিতে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। খোদাই করে বেলকনিগুলি আর রাস্তার উপর বের করা ঘরের জানালাসমূহ আমাদের উপর ঝুলে আছে আঁধারের মতো, নীরবে। সদ্য দোহন করে টাটকা দুধের মতোই জ্যোৎস্না–দোয়া বাতাস মৃদুষ্ণ। আর এখানেই আমার ঘর।
মনসুর তার বন্ধুদের সাথে দেখা করার জন্য আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়। আর আমরা দু’জনে আমদের উটগুলিকে হাঁটু গেঁড়ে বসিয়ে দিই। জায়েদ কোনো কখা না বলে উটের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়ে গদীগুলি নামাতে শুরু করে দেয়। আমি দরোজায় টোকা দিই। কিছুক্ষণ পর আমি ভেতরে মানুষের গলার আওয়াজ ও পায়ের শব্দ শুনতে পাই। খেঅলা পাখার মতো জানালার মধ্য দিয়ে লণ্ঠনের আলো, দরোজা বন্ধ করার হুড়কা নামিায়ে ফেলা হলো আর আমার বৃদ্ধা ঝি আমিনা উল্লাসে কলরব করে উঠলোঃ
–‘ওহো, আমার মুনিব ফিরেছেন ঘরে!’
পারস্যের চিঠি
এক
এখন বিকাল। মদীনার দক্ষিণ দাখিল দরোজার ঠিক বাএর আমি বসে আছি আমার এক বন্ধুর সাথে তার পা’ম বাগিচায়। বাগিচার অগণিত পা’ম গাছের কাণ্ড বাগিচার পশ্চাদভূমিতে সৃষ্টি করেছে এক ধূসর সবুজ আলে – আঁধারী, যার ফলে মনে হয়, এর যেনো কোনো শেষ নেই। গাছগুলি এখনো তরুণ এবং নীচু; সূর্যের আলো নৃত্য করছে ওদের কাণ্ডের উপরে ওপরে এবং ওদের শাখঅর পরস্পর জড়াজড়ি করে সৃষ্টি করা সূক্ষ্ণাগ গম্বুজের উপরে। বছরে এই সময়টাতে প্রায় রোজই যে ধুলিঝড় হয় তার ফলে বাগিচার পাম গাছগুলির সবুজ রং কিছুটা ধুলট। কেবল পাম গাছের নীচে লুসার্নের পুরা গালিচাই বজায় রেখেছে তার উজ্জ্বল নিখুত সবুজ রং।
আমার সামনেই –খুবু বেশি দূরে নয় –ভেসে উঠছে নগরীর দেয়ালগুলি, পুরান, ধূসর শিলা এবং মাটির ইট দিয়ে তৈরি–এখানে –ওখানে দুর্গ –প্রাচীর ঠেলে বা’র হয়ে পড়েছে নগর প্রাচীর থেকে। দেয়ালের পেছন থেকে মাথা উঁচু করে উঠেঠে নগরীর ভেতরে, আরেকটি বাগিচার দ্রুত বেড়ে ওঠা পাম গাছ–এবং ঘর–বাড়ি, যার দরোজা জানালার খড়গুলি রোদে পুড়ে বাদামী হয়ে গেছে, এবং ঘেরা দেওয়া ব্যালকনিগুলি; এর কোনো কোনোটি নগর প্রাচীরের মধ্যেই নির্মিত হয়ে সেগুলি হয়ে উঠেছে প্রাচীরের অংশ। কিছু দূরে আমি দেখতে পাই, সে মসজিদে নববীর পাঁচটি মীনার, উঁচু এবং বাঁশির সুরের মতোই নাজুক, দেকতে পাই, সেই মহৎ সবুজ গম্বজুটি যা রসূলুল্লাহর ছোট্ট ঘরটির উপর একটি ছাদের মতো অবস্থান করে ঘরটিকে লুকিয়ে রেকেছে, যে–ঘর ছিলো তাঁর জীবৎকালে তাঁর আবাসগৃহ এবং তাঁর ওফাতের পর যা হয়েচে তাঁর কবর; আরো দূরে নগরী ছাড়িয়ে চোকের সামনে ভেসে ওঠে অনাবৃত শিলাময় পর্বতমালা ওহুদঃ যেনো মসজিদে নববীর সাদা মীনার, পাম বৃক্ষের মাথঅ এবং শহরের বহু ঘর–বাড়ির পটভূমিতে ঝুলানো তামাটে–লাল রংয়ের চিত্রিত পর্দা।
বিকালের রোদ ঝলসানো আলোকে আলোকিত আসমান দুধের মতো সাদা উজ্জ্বল ঝরমল মেঘপুঞ্জের উপর ঝুলে আছে, কাঁচের মতো স্বচ্ছ সে আকাশ, আর নগরিটি যেনে গোসল করে উঠেছে এক নীল সোনালী–সবুজ আভা মেশানো আলোতে। মোলায়েম মেঘের চারপাশে খেলা করছে বাতাস অনেক উঁচুতে, যে বাতাস আরব দেশে কী ছলনাময় বলেই না প্রমাণিত হয়ে থাকে! এখানে কখনো আপনি বলতে পারবেন না, ‘এখন আকাশ মেঘলা , বৃষ্টি হবে শিগগিরিই’। কারণ মেঘ যখন পুঞ্জীভূত হয়ে ওঠে, ঝ্ঞ্ঝা–গর্ভ এই মেঘ, ঠিক সে সময় প্রাই এরূপ ঘটে যে, হঠাৎ মরুভূমি থেকে ছুটে আসে বায়ূর এক গর্জন এবং ঘন মেঘকে তা তাড়িয়ে নিয়ে একেবারে সাফ করে; আর যেসব লোক ছিল বৃষ্টির ইন্তেজারিতে তারা তাদের মুখ নীরব আত্মসমর্পণে ঘুরিায় নেয় আকাশ থেকে এবং গুনগুন করতে থকে ‘আল্লাহ ছাড়া কারো হাতে নেই কোনো ক্ষমতা, কোনো শক্তি’ – যখন আকাশ আবার নতুন কর নির্দয়ভাবে ঝলসাতে থাকে হারকা নীল স্বচ্ছতায়।
আমি আমার দেস্তকে বিদায় সম্ভাষণ জানাই এবং নগরীর বাইরে প্রবেশদ্বারের দিকে আবার হাঁটতে শুরু করি। আমার পাশ দিয়ে চলে যায় একটি লোক, লুর্সান ঘাসের বোঝা চাপানো দুটি গাধা হাঁকিয়ে এবং নিজে তৃতীয় আরেকটি গাধায় চড়ে। সে সালাম জানাবার জন্য তার হাতের ছড়িটি উচ্চে তুলে ধরে এবং বলে, আসসালামু আলাইকুম। আমিও তাকে এই কথাগুলি দিয়ে জবাব দিই। এরপর আসে এক বেদুঈন তরুণী, তার পরণের কালো জোব্বার প্রান্তদেশ তার পেছনে পেছনে গড়াচ্ছে, তার মুখের নিম্মভাগ নেকাব দিয়ে ঢাকা। তার জ্বলজ্বল চোখ দুটি এতোই কালো যে, তার চোখের সাদা অংশ এবং কালো পুতুল মিশে গেছে এক সাাষে; আর তার চলার ভংগীটি স্তেপ অঞ্চরে তরুণ প্রাণীর দোদুল্যমান গতির মতোই দ্বিধাগ্রস্ত!
আমি নগরীতে প্রবেশ করি এবং আল–মানখার উন্মুক্ত বিশাল চক অতিক্রম করে পৌছুই ভেতরে নগর প্রাচীরে, মিসরীয় প্রবেম দ্বারের ভারী তোরণের নীচে, যেখানে মুদ্রা ব্যবসায়ীরা বসে তাদের সোনা এবং রূপার মুদ্রাগুলি ঝনঝন করে বাজাচ্ছে। আমি ঢুকে পড়ি প্রধান বাজারটিতে, যা বড় জোর চব্বিশ ফিট চওড়া একটি রাস্তা, দোকানপাটে ঠাসা–ঠাসি, যাকে ঘিরে স্পন্দিত হচ্ছে একটি ক্ষুদ্র অথচ আবেগাষ্ণ জীবন।
বিক্রেতার উৎফুল্ল; গানের মাধ্যমে তাদের জিনিসপত্রের তারিক করছে। চমৎকার মাথার পাগড়ী, সিল্কের শাল এবং চিত্রিত কাশ্মীরী চাদর পথচারীর দৃষ্টি আক র্ষণ করে। রৌপ্যকারেরা হামাগুড়ি দিয়ে বসেছে বেদুঈন–গহনাপতিতে ভর্তি কাঁচের বাক্সের পেছনে –বাজুবন্দ এবং পায়ে খাড়ু, গলার হার এবং কানের দুল–সেইসব গহনা। খোশবু বিক্রেতারা দেখাচ্ছে ওদের মেহেদী ভর্তি পাত্র, চোখের লোম রাঙানোর জন্য সুরমা ভর্তি ছোট ছোট লাল প্যাকেট, তেল এবং সুগন্ধির বহু –বর্ণ শিশি এবং মসলা –স্তূপ। নযদের সওদাগরেরা বিক্রি করছে বেদুঈন কাপড় চোপড়, পূব– আরবের উটের জীন এবং জীন থেকে ঝোলানো রেশমের লম্বা ঝালরওয়ালা ব্যাগ। এক নীলামদার রাস্তায়, স্বর যতেদূর সম্ভব উচ্চে তুলে চীৎকার করতে করতে ছুটছে – তার কাঁধের উপর একটি পারস্য গালিচা এবং উটের পশমের ‘আবায়া’ আর বগলের নীচে একটি পিতলের স্যামোভার নিয়ে। উভয়দিকে চরেছে মানুষেল ঢল, মদীনার লোক এবং আরবে অন্যান্য অঞ্চলের রোক, সেনিগালের স্তেপ –অঞ্চল আর কিরগিজের স্তেপ–অঞ্চলে মধ্যকার সকল দেশের লোক, ইস্ট–ইন্ডিজ ও আটলান্টিক মহাসাগরের এবং অস্ত্রখান ও জাঞ্জিবারের মধ্যবর্তী সব দেশের মানুষঃ কারণ হজ্জ মাত্র কিছুদিন আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু মানুষের এতো ভিড় সত্তেও এবং রাস্ত এতো সংকীর্ণ হলেও এখানে কোনো আতি ব্যস্ততার মাতলামি নেই, কেউ কাউকে একানে ধাক্কা দেয় না, কারে গায়ের উপর এসে পড়ে না, কারণ মদীনায় কোন কিছুকে ধরা বা পাওয়ার জন্য সময় পাখা মেলে না!
কিন্তু এর চাইতেও যা বিস্ময়কর মনে হয় তা এই যে, এখানে ভিড় করা মানুষের চেহারা আর আকৃতিতে এবং তাদের পোশাক–পরিচ্ছদে এতো বৈচিত্র ও ভিন্নতা সত্তেও মদীনার রাস্তায় বিদেশী কিছুর ‘জগা–খিচুড়ি’ ঘটেছে বরে মনে হয় না। যার বিশ্লেষণ করতে চায় কেবর তাদের চোখেই ধরা পড়বে চেহারার এই বৈচিত্র। আমার মনে হয়, এই নগরীতে যারা বাস করে তারা সকলেই, এমনকি আস্থায়ী ভাবে কিছু দিনের জন্য যারা এখানে আসে, বলা যায়, তারাওঅচিরেই হারিয়ে যায় একটা সাধারণ মন–মেজাজের মধ্যে, আর এভাবেইতাদের চাল–চল, এমনকি তাদের মুখের অভিব্যক্তি পর্যন্ত এক হয়ে ওঠেঃ কারণ তাদের সকলেই পড়ে গেছে মহানবী অনিবার্য প্রভাবে–একদা এই নগরী ছিলো যাঁর এবং এখন ওরা মেহমান যাঁর.. .
১৩০০ বছর পরেও আত্মিক উপস্থিতি এখানে তেমনি জীবন্ত যেমন ছিলো তখন। কেবলমাত্র তাঁরই উসিলায় কতকগুলি বিচ্ছিন্ন ইতস্তত বিক্ষপ্ত পল্লী, যাকে বলা হতো ইয়াসরেব হয়ে ওঠে একটি নগরী এবং আজ পর্যন্ত তা সকল মুসলমানের এতো গভীর ভালোবাসা পেয়ে এসেছে যেমনটি পৃতিবীর আর কোনো দেশের কোন নগরীকে ভালোবাসেনি মানুষ। এই নগরীর নিজের একটা নাম পর্যন্ত নেই, তেরো শো বছরেরও অধিককাল ধরে একেক ‘মদীনাতুন্নবী’ –‘নবীর শহর’ বলা হচ্ছে। তেরো শো’ বছরেরও অধিককার ধরে এখানে এতো প্রেম এতো অনুরাগ এসে মিলিত হয়েচে যে, সকল আকার–আকৃতি এবং গতিবিধি লাভ করেছে একটা পারিবারিক সাদৃশ্য এবং চেহারার সকল পার্থক্য রূপান্তরিত হয়েচে একটি সাধারণ, সাদৃশ্যে, বিভিন্ন সুরের মিলিত ঐকতানের মতো।
এই সেই আনন্দ–সামঞ্জস্য সৃষ্টি করার এই ঐকতান, মানুষ যা এখানে উপলব্ধি করে প্রতি মুহূর্তে। যদিও রসূলুল্লাহ (সা) যা চেয়েছিলেন তার সাথে মদীনার আজকের জীবনের কেবল একিট আনুষ্ঠানিক এভং সুদুর সম্পর্কই রয়েছে, যদিও মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য আরো অঞ্চলের মতোই এখানে ইসলামের রূহানী চেতনাকে সস্তা করে ফেলা হয়েছে তবু এর মহান আত্মিক অতীতের সাথে একিট অনির্বচনীয় আবেগময় সম্পর্ক সবসময়ই জীবন্ত রয়েছে। । কেবল একটি মানুষের জন্য কোন নগরীকেই মানুষ কখনো এতো ভালোবাসেনি; কোন মানুষকেই, যিনি ইন্তেকাল করেছেন তেরো শো বছর আগে, যিনি সমাহিত আছেন এই মহান সবুজ গম্বজের নীচে, তাঁর মতো এতো আপন মনে করে এবং এতো বিপুর সংখ্যায় মানুষ ভালোবাসেনি কখনো।
অথচ তিনি কখনো দাবি করেননি তিনি মরণশীল মানুষ ছাড় অন্য কিছু এবং কখনো মুসলমানেরা তাঁর প্রতি আরোপ করেননি দেবত্ব যা করেছে অন্যান্য নবীর বহু–অনুসারী, সেইসব নবীদের মৃত্যুর পরে। বলাবাহুল্য, খোদ কুরআনেই রয়েছে বহু উক্তি, যাতে জোর দেয়া হয়েছে মুহাম্মদের মানবিকতার উপরঃ ‘মুহাম্মদ নবী ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর আগে অতীত হয়েছেন সকল নবী; তিনি যদি মারা যান বা নিহত হন তোমরা কি পশ্চাদপসরণ করবে?’ আল্লাহর বিরাটত্বের সামনে তাঁর একান্ত দীনতা কুরআনে ঘোষিত হয়েচে এভাবেঃ ‘বল, হে মুহাম্মদ, তোমাদের মন্দ কিংবা ভালো করার কোন ক্ষমতা নেই, এমনকি আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তা ছাড়া আামার ক্ষমতা নেই আমার নিজের ভালোমন্দের উপরও। আমি যদি অদৃশ্যের খবরই জানতাম আমি তো লাভ করতাম প্রভুত কল্যাণ আর কোনো অমংগলই স্পর্শ করতে পারতো না আমাকে। আমি তো বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য কেবল সতর্ককারী এবং সু সংবাদ দাতা.. ..।’
তিনি যে কেবল মানুষই ছিলেন, তিনি যে জীবন-যাপন করেছেন অন্য মানুষের মতো এবং তা করতে গিয়ে মানব –জীবনের আনন্দ উপভোগ এবং দুঃখ –কষ্টের স্বাদ গ্রহণ করেছেন, কেবল এ কারণেই তাঁর চারপাশে যাঁরা ছিলেন তাঁরা এতো প্রীতি ভালোবাসা দিায়ে এমনভঅবে তাঁকে ঘিরে রাখতে পেরেছিলেন।
এই প্রেম তাঁর মৃত্যুর পরও বেঁচে আছে এবং তাঁ অনুসারীদের হৃদয়ে তা আজো জাগ্রত রয়েছে বহু সুরের সম্মিলনে সৃষ্ট একটা ‘রাগিনীর’ মূল প্রেরণার মতো। এই প্রেম মদীনায় এখনো জীবন্ত রয়েছে। পুরানো নগরীর প্রত্যেকটি শিলা থেকে এ প্রেম কথা বলবে আপনার সংগে। আপনি আপনার হাত দিয়ে একেপ্রায় স্পর্শ করতে পারবেন, কিন্তু শব্দে একেবন্দী করতে পারবেন না.. ..।
দুই
আমি যখন মহান মসজিদ অভিমুখে বাজারের মধ্য দিয়ে চলছি, তখন আমার অনেকদিনের পরিচিত অনেকে পথ চলতে চলতে আমাকে অভিনন্দন জানায়। আমি কখনো এই দোকানীর প্রতি, কখনো বা ঐ দোকানীর প্রতি কিছুটা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাই। শেষ পর্যন্ত আমার বন্ধু আয- যুগাইবি আমাকে টেনে টেনে নিয়ে হাজির করলে সেই ছোট্ট প্লাটফরমটির উপর যেখানে বসে বেদুঈনদের কাছে কাপড় বিক্রি করেন।
-‘তুমি কখন ফিরছো মুহাম্মদ, আর কোত্থেকেই বা ফিরছো? তুমি এখানে ছিলে, সে তো কয়েক মাস আগের কথা!’
-‘আমি আসছি হাইল থেকে- আসছি নুফুদ থেকে।’
-‘তুমি কি কিছুদিন থাকবে না ঘরে?’
-‘না ভায়া, আমি পরশুই মক্কা রওয়ানা করছি।’
আয –যুগাইবী রাস্তার ওপারে কফির দোকানে যে ছেলেটি কাজ করে তাকে চীৎকার করে ডাকেন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা শুনতে পাই ছোটো ছোটো পেয়ালার টুংটাং শব্দ।
-‘কিন্তু কেন মুহাম্মদ, এই মুহূর্তে তুমি মক্কা যাচ্ছো কেন? হজ্জে’র মৌসুম তো চলে গেছে… ’
-‘হজ্জ করার বাসনায় আমি মক্কা যাচ্ছি না। ভালো কথা, আমি কি পাঁচ-পাঁচবার হজ্জ করিনি? কিন্তু কেন যেনো আমার মনে হচ্ছে, আরব দেশে আমি আর বেশি দিন থাকবো না। তাই আবার সে নগরটি একবার দেখতে চাই, যেখানে আামর এদেশের জীবনের শুরু হয়েছিলো.. . ‘তারপর সশব্দ হাসির সংগে আমি যোগ করি ‘কিন্ত ভাই, তোমকে আমি সত্য কথা বললো আসলে আমি নিজেই জানি না কেন আমি মক্কা যাচ্ছি; কিন্তু আমি জানি আমাকে যেতে হবে.. .’
আয –যুগাইবী নৈরাশ্যে তাঁর মাথা নাড়েন-‘এদেশ ছেড়ে এবং তোমার ভাইদের ছেড়ে চলে যাবে, এমন কথা তুমি কী করে বলতে পারলে?’
একটি পরিচিতি লোক দীর্ঘ স্ত্রস্ত পদক্ষেপে আমার পাশ কেটে আগিয়ে যায়-লোকটি জায়েদ, কাউকে খোঁজ করছে নিশ্চয়।
-‘জায়েদ, কোথঅয় যাচ্ছে?’
সে হঠাৎ তার গতি থামিয়ে উৎসুক মুখে আমার দিকে তাকায়-‘আপনাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছি চাচা, আপনার জন্য এক তাড়া চিঠি জমা ছিলো ডাকঘরে। এই নিন চিঠিগুলি । আর শায়ক আয –যুগাইবী, আসসালামুআলাইকু –আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।’
আয – যুগাইবীর দোকানের সামনে পায়ের উপর পা রেখে বসে খামগুলি ছিড়ে পড়তে থাকিঃ মক্কার বন্ধুদের কাছ থকে এসেছে কয়েকটি চিঠিঃ একটি চিঠি লিখেছেন সুইজারল্যান্ডের ‘নিউ শারখার সুইটুঙে’র সম্পাদক, আমি যে পত্রিকার সংবাদদাতা গত ছয় বছর ধরে। একটি চিঠি এসেছে ভারত থেকে, যাতে আমাকে তাগিদ দেয়া হয়েছে ওখানে গিয়ে পৃথিবীর একক বৃহত্তম মুসলিম সম্প্রদায়ের সংগে পচিয় করতে। কয়েকটা চিঠি লেখা হয়েছে নিকট প্রাচ্যের বিভিন্র অঞ্চল থেকে। আর একটি চিঠির উপর রয়েছে তেহরানের ডাকঘরের ছাপ। চিঠিটা লিখেছেন আমার পরম বন্ধ আলী আগা, যাঁর কাছ থেকে এক বছরেরও বেশি হলো আমি কোনো খবর পাইনি। আমি সেটি খুলে আলী আগার সুন্দর পরিপাটি শিকস্তা ১[শাব্দিক অর্থে ভাঙা-আরবী হরফের একটি পারস্য রূপ, যা দ্রুত লিখনের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।]হরলে লেখা পৃষ্ঠাগুলি উপর চোখ বুলিয়ে যাইঃ
আমার প্রিয়তম বন্ধ এবং ভাই , আমার হৃদয়ের জ্যোতি, পরম শ্রদ্ধার পাত্র আসাদ আগার প্রতি, আল্লাহ তাঁর হায়াত দারাজ করুন এবং প্রতি পদে তাঁর নিগাবান হোন। আমীন!
আস –সালামু আলাকুম, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, বর্ষিত হোক আল্লাহর রহমত, হরদম – সবসময়। আল্লাহর কাছে মুনাজাত করি, তিনি যেনো আপনাদে দেন স্বাস্থ্য ও সুখ, আর এ কথাও যখন জানি যে, আপনি খুশী হবেন, আমিও পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য ভোগ করছি, তাই প্রশাংসা আল্লাহর।
আমি আপনাকে দীর্ঘকাল চিঠিপত্র লিখিনি। কারণ গত কয়েখ মাস ধরে আমার জীবন আগিয়োছে এলোমেলো, বিশৃংখলভাবে। আমার পিতা, আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন, এক বছর আগে ইন্তেকাল করেছেন এবং আমি যেহেতু তাঁর ছেলেদের মধ্যে সকলের বড় সেজন্য আামদের পারিবারিক ব্যাপার –বিষয়াদি গুছাতে গিয়ে আমাকে অনেক সময় দিতে হয়েছে েএবং দুচিন্ত পোহাতে হয়েছে। আর এ আল্লাহরই মর্জি, তাঁর এ অযোগ্য বান্দার জীবনে এসেছে অপ্রত্যাশিত সমৃদ্ধি, কারণ গভর্নমেন্ট তাঁকে লেফটেন্যান্ট কর্ণেল পদে উন্নীত করোছেন। তদুপরি, আমি আশা করছি শীঘ্রই আমি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবো –এক লাবণ্যময়ী সুন্দরী মহিলা আমার চাচাতো বোন শিরির সংগে; আর এভাবে আমার পুরানো অব্যবস্থিত দিনগুলির সমাপ্তি আসছে ঘনিয়ে। আপনার বন্ধসুলভ হৃদয়ের কাছে এ তো খুবই জানা কথা যে , অতীতে আমি গোনাহ খাত এবং ভুলক্রটির উর্ধ্বে ছিলাম না, কিন্তু হাফিজ কি বলেননিঃ
‘হে আল্লাহ, মধ্য সাগরে তুমি নিক্ষেপ করেছে একটি তক্তা, তুমি কি আশা করতে পারো তক্তাটি শুকনা থাকুক?’
কাজেই প্রবীণ আলী আগা শেষ পর্যন্ত ঘর বাঁধতে এবং শ্রদ্ধার পাত্র হতে যাচ্ছেন। তিনি অতোটা শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন না যখন বাম নামক শহরে তাঁর সাথে আমার সাক্ষাত হয়, সাত বছরে কিচু আগে। আলী আগাকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিলে এই শহরটিতে। তাঁর বয়স ছিলো তখন মাত্র ছাব্বিশ বছর। তবু তাঁর অতীত দিনগুলি ছিলো চাঞ্চল্য ও কর্মতৎ পরতায় ভরপুর। রিজা খান ক্ষমতা দখল করার আগে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তেহরানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ সম্ভব ছলো তাঁর জন্য যদি না তিনি অতিমাত্রায় আমোদ –ফূর্তির মধ্যে নিজেকে ভাসিয়ে দিতেন। তাঁকে তাঁর উদ্বিগ্ন এবং প্রভাবশালী পিতা ইরানের দক্ষিণ –পূর্বতম এই অঞ্চলের যোগাযোগবিহীন বাম শহরে এই আশায় এনেছিলেন যে, তেহরানের আমোদ –ফুর্তি থেকে তাঁকে দরে সরিয়ে ফেললে তিনি শুধরে যেতে পারেন। কিন্তু বামে এসে আলী আগা নারী, শরাব আর আফিঙের মিঠা বিষের মধ্যে তার ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলে বলে মনে হয়। বলাবাহুল্য এ সবের প্রতি নিদারণ আসক্তি ছিলো আলী আগার।
১৯২৫ সালের এই সময়ে আলী আগা ছিলেন জেলা সামরিক পুলিশের একজন কমান্ডার। তাঁর মর্যাদা ছিলো একজন লেফটেন্যান্টের । আমি যখন বিলাল দশত-ই-লুত মরুভূমি পার হতে যাচ্ছি তখন আমি কিরমান প্রদেশের গভর্নরের প্রতি একটি পরিচয় –পত্র নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাত করি। ঐ পরিচয় –পত্রটি লিখিত হয়েছিলো প্রধানমন্ত্রী এবং ডিকটেটর রিজা খানে একটি চিঠিকে ভিত্তি করে। আমি তাঁকে পাই কমলারেবু, আলিয়েন্ডারও পাম গাছের এক ছায়াময় বাগিচায়, যেখানে ধারালো পাম পাতার তোরণের ফাঁকে ফাঁকে এসে পড়ছিলো সূর্যের রশ্নি। তাঁর পরণে ছিলো লম্বা হাতওয়ালা শা্র্ট। লনের উপর ছিলো একটি গালিচা বিছানো আর সে গালিচার উপর ছিলো লম্বা হাতাওয়ালা শার্ট। লনের উপর ছিলো একটি গালিচা বিছানো আর সে গালিচার উপর চিলো বর্তন আর অর্ধেক শূন্য হওয়া আরকের বোতল। বর্তনগুলতে খাদ্যবিশেষ ছিলো তখনো। আলী আগা বিনীতভাবে কৈফিয়ত দেন – ‘এই অভিশপ্ত গর্তের মধ্যে শরাব খাওয়া সম্ভব নয়’ এবং তারপর তিনি আমাকে বাধ্য করেন স্থানীয় আরক পান করতে; এ এমনি এক কড়া জিনিস যে, আমার মগজে গিয়ে পৌছুলো একটা ঘুষির মতো। পারস্যের উত্তর অঞ্চলের একজন মানুষের সন্তরণশীল চোখ দিয়ে কিরমানের চিঠিটির উপর তিনি দৃষ্টি বুলিয়ে যান; তারপর সেটিকে টোকা দিয়ে একদিকে রেখে বলেন, আপনি যদি কোন পরিচয় পত্র ছাড়াই আসতেন তবু আমি দশটি লোকের ভেতর দিয়ে আপনার এই সফরে অবশ্যই আপনার সংগী হতাম। আপনি আমার মেহমান। আমি কখনো আপনাকে বালুচী মরুভূমির ভেতর দিয়ে একা সওয়ারী হাঁকিয়ে যেতে দিতাম না।
কোনো এক যুবতী তখনো একটি গাছের ছায়ায় নিজেকে লুকিয়ে বসেছিলো। ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়ালে- পরণে তার হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হালকা আসমানী –রং সিল্কের কোর্তা এবং প্রকাণ্ড সাদা বালুচী সালোয়ার। মুখটা ওর ইন্দ্রিয়জ বাসনার প্রতীক , মনে হয় যেনো ভেতর থেকে তা জ্বলছে, স্পষ্ট ঠোঁটগুলি লাল এবং সুন্দর , তবে চোখ দুটি বিস্ময়করভাবে ঘোলাটে এবং উদাসীন, চোখের পাতা সুরমা দিয়ে রঞ্জিত।
-মেয়েটি অন্ধ, আলী আগা ফরাসী ভাষায় ফিসফিস করে আামকে বলেন, ‘কিন্তু ও গান গায় অদ্ভুত , চমৎকার!’
আলী আগা যে মহৎ নম্রতা ও শ্রদ্ধর সাথে মেয়েটির প্রতি ব্যবহার করলেন আমি তার প্রশংসা না করে পারি না। মেয়েচি একটি পেশাদার গায়িকা, ইরানের মেয়েদের এমন একটি শ্রেণীতে সে পড়ে যা কম –বেশি বারাঙনাদেরই সমান।অথচ তেহরানের কোনো সম্ভ্রান্ত মহিলার প্রতিও এর চেয়ে উত্তম ব্যবহার তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলো না।
আমরা তিনজনই গালিচার উপর বসে পড়ি এবং আলী আগা যাখন তা৭র কলকে এবং আফিঙের পাইপ টানতে ব্যস্ত তখন আমি বলুচী মেয়েটির সংগে কথা বলি। মেয়েচি তার অন্দতা সত্ত্বেও এমনভাবে হাসতে পারে যা কেবল তারাই পারে যারা বাস করে হৃদযের আনন্দের গভীরে এবং কথার ফাঁকে ফাঁকে সে এমন চাতুর্য এবং বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য করে চললো যাতে এই বিশাল পৃথিবীর কোনো সম্ভ্রান্ত মহিলার লজ্জিত হবার কোনো অবকাশ নেই। আলী আগা তাঁর পাই শেষ করে আলতো করে ওর হাত নিজের হাতে নিয়ে বলেন, ‘এই যে বিদেশী এখানে রয়েছেন, ইনি হচ্ছেন একজন অস্ট্রীয়। ইনি নিশ্চয়ই তোমার একটি গান শুনতে পছন্দ করবেন। ই এখন পর্যন্ত কখনো বলুচীদের গান শোনেননি।
সে দৃষ্টিহীন মুকের উপর ছিলো একটি সুদূর স্বপ্নিল মুকের ছাপ, যখন সে আলী আগার দেয়া বাঁশীটি নিয়ে তার তারে আঙুল বুলাতে লাগলো। সে গভীর ভাঙা স্বরে গাইলো একটি বালুচী গান, যার তার আবেোগষ্ণ ঠোঁট থেকে যেনো জীবনেরই একটি প্রতিধ্বনির মতো সুরেলা হয়ে উঠেছে বলে মনে হলো।
আমি চিঠির কথায় ফিরে যাচ্ছিঃ
ভাই এবং সম্মান্তি বন্ধু, আমি জানি না আপনার এখনো স্মরণ আছে কিনা, কিভাবে আমরা দু’জন এক সাথে সেই পুরানো দিনগুলিতে সফর করেছিলাম দশত-ই-লুতের মধ্য দিয়ে এবং কিভাবে আমাদেরকে বাঁচানোর জন্য লড়তে হয়েছিলো সেই বালুচী দস্যুদের সাথে.. .?
আমার কি মনে আছে, আলী আগার এই অপ্রাসাংগিক প্রশ্নে আমি মনে মনে হাসি এবং আমাকে ও আলী আগাকে দেখতে পাই সেই নগ্ন মরুভূমির জনশূন্য দশত-ই-লুত, যা তার বিশাল শূণ্যতাকে ছড়িয়ে রেখেছে বালুচীস্তানথেকে অনেক গভীরে, ইরানের একেবারে মাঝামাঝি পর্যন্ত। ইরানের পূর্বতম প্রদেশ সিসতান হয়ে সেখান থেকে আফগানিস্তান যাওয়ার জন্য আমি এই মরুভুমি পাড়ি দেবার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। যেহেতু আমি আসছিলাম কিরমান তেকে, এ ছাড়া অন্য কোন পথ ছিলো না আমার জন্য। উট ভাড়া করা এবং আমাদের সামনে যে দীর্ঘ পথ রয়েচে সে পথের জন্য খাবার কেনার উদ্দেশ্যে মরুভূমির কিনারে একটি সবুজ মরূদ্যানে আমরা থাকি, আমাদের সাথে এক প্রদর্শক হিসাবে যে বালুচী পুলিচেরা রয়েছে তাদের নিয়ে। ইন্দো-ইউরোপীয় টেলিগ্রাফের ষ্টেশন ঘর হলো আমাদের অস্থায়ী হেড কোয়ার্টার । লম্বা মোটা হাড্ডিওয়ালা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন ষ্টেশন মাষ্টারটি মুহূর্তের জন্য আমাকে তার দৃষ্টির বাইরে যেতে দিতের রাজী নয়। মনে হলো সে তার দৃষ্টি নিযে আমার অবস্থা সম্পর্কে একটা ধারণা করাবার চেষ্টা করছে।
-‘এর সম্পর্কে হুঁশিয়ার খাকবেন’, আলী আগা আমাকে কানে কানে বলেন, ‘এ একটি ডাকাত, আমি একে চিনি। আর ও জানে যে, আমি ওকে চিনি। কয়েক বছর আগে এ ছিলো একটি সত্যিকার দস্যু। কিন্তু এখন সে অনেক টাকা –কড়ি করেছে এবং মানী হয়ে উঠেছে। এখন সে তার সাবেক সংগীদের অস্ত্রসশ্ত্র সরবরাহ করে আরো অনেরক বেশি টাকা-পয়সা রোজগার করছে। আমি ওকে হাতে-নাতে ধরবার জন্য একিট সুযোগের অপেক্ষায় আছি; কিন্তু লোকটি ধূর্ত এবং কোনো কিছু প্রমাণ করা সত্যি কঠিন। আপনি অষ্ট্রিয়ার লোক, একথা শুনে সে ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে উটেছে। বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ট্রিয়া এবং জার্মানীর কিছু এজেন্ট এই অঞ্চলের গোত্রগুলিকে বৃটিশের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে চেয়েছিলো। তাদের সংগে ছিলো সোনার মোহরের থলে; আর আমাদের এই বন্ধুটি মনে করে-প্রত্যেক জার্মান এবং অস্ট্রিয়ানই একইভাবে সজ্জিত।
কিন্তু ষ্টেশন মাষ্টারের চাতুর্যে আমরা উপকৃত হই; কারণ সে আমার জন্য ওই এলাকার সবচেয়ে ভাল সরওয়ারী উটের দুটি যোগাড় করতে সক্ষম হয়েছিলো। দিনের বাকী অংশটি কাটলো মশক, উটরে পশমের দড়ি, চাউল, বিশুদ্ধ মাখন এবং মরু-সফরের জন্য প্রয়োজনীয় আরা নানা জিনিসের জন্য দর-কষাকষিতে।
পরদিন বিকাল বেলা আমরা যাত্র শুরু করি। আলী আগা স্থির করলেন, তিনি চারটি পুলিশসহ আমাদের আগে আগে গিয়ে রাত্রে তাঁবু গাড়ার জন্য একটি স্থান প্রস্তুত করবেন। তাঁদের উটগুলি লম্বিত রেখা দেখতে না দেখতে মিলিয়ে যায় দিগন্তের আড়ারে। আমরা-ইবরাহীম, আমি এবং পঞ্চম পুলিমটি-ওদের অনুসরণ করি অপেক্ষাকৃত মন্থর গতিতে।
আমরা হেলতে দুলতে থাকি, ( তখন তা কতো নতুনই না মনে হয়েছিলো আমার কাছে) হালকা-পাতলা উটগুলির হেরে –দুলে অদ্ভুদ কদমতালে চলার সংগে সংগে – প্রথমে হলদে বালিয়াড়ির ভেতর দিয়ে, মাঝে মাঝে দূরে দূরে ঘাসের গুচ্ছ –চিহ্ণিত, বালিয়াড়ি, তারপর আরো গভীরে, আরো ভেতরে প্রান্তরের মধ্যে – এক অন্তহীন, ধূসর প্রান্তর যা সমতল এবং শূণ্য – এতো শূণ্য যে, মনে হলো এ যেনো প্রবাহিত হচ্ছে না, বরং ভেঙে পড়েছে দিগন্তের দিকে; কারন চোখের সামনে এমন কিছু নেই যার উপর চোখ একটু বিশ্রাম করতে পারে- নেই ভূমির উপর কোনো উঁচু স্থান, কোনো পাথর, কোনো ঝোঁপঝাড়, এমন কি ঘাসের এটি ডগা – কেনো প্রাণীর শব্দ, পাখির কিচির-মিচির বা গুবরে পোকার গুনগুণ আওয়াজ এ বিশাল নীরবতা ভংগ করছে না; এমনকি বাতাস সামনে কোনো বাধা না থাকায় শূন্যের উপর নীচু দিয়ে বয়ে চলে নিঃশব্দে – না, তা নয়, শূন্যের মধ্যে তা পতিত হয়, মেন একট পাতর পড়ে অতর গর্তের বেতরে .. . এ মৃত্যুর নীরবতা নয়, বরং এখনো যার জন্ম হয়নি তারই নীরবতা, যা এখন পর্যন্ত কখনো জন্মলাভ করেনি তারই স্তব্ধতা – আদি শব্দে পূর্বর্তী নৈঃশ্বদ।
এবং তারপর তা ঘটলো। নীরবতা টুটে গেলো। এমনি মানুষের গলার স্বর পাখির গানের মতো মৃদু আঘাত হানলো বাতাসের আর যেনো তা ঝুলে রইলো শূন্যে আর আমার মনে হলো, আমি যেনো কেবল তা শুনছি না, বরং দেখছি –এমনি একাকী এবং অপ্রচ্ছন্নভাবে তা ভেসে চলেছে মরুপ্রান্তরের উপর দিয়ে। এ আর কেউ নয় , আমাদের বালুচী সেপাইটি। াতর যাযাবর জীবনের একটি গান গাইাছে যার অর্ধেকটা গাইছে সুর করে আর অর্ধেক করছে আবৃত্তি, দ্রুত তালে, পর্যায়ক্রমে –আবেগোষ্ণ এবং নাজুক শব্দের এক বিচিত্র সংগীত যা আমি বুঝতে পারচিরাম না। স্বল্প কয়েকটি রাগের মধ্যে বেজে উটলো তার গরার স্বর, একটিমাত্র সমতলে, যার মধ্যে নেই কোনো উত্থান এবং পতন, এবং এমনি একটানা সে গেয়ে চললো যে ক্রমে ক্রমে তা রূপান্তরিত হলো এক ধরনের উজ্জ্বল দীপ্তিতে, যখন তা ভাঙা ভাঙা রাগিনীটিকে ঢেকে দিলো কন্ঠ্য শব্দের আনুষংগিত ক্রীড়ায় এবং কেবল একই বিষয়ের বারবার আবৃত্তি এবং অদল –বদরের মাধ্যমে উম্মেচিত কররো তার সমতল সুরের মধ্যে এ অপ্রত্যাশিত ঐশ্বর্য –সমতল এবং সীমাহীন সেই দেশেরই মতো, যেখানে জন্ম হয়েছে এই গানের .. .।
আমরা মরুভূমির মধ্য দিয়ে যে অঞ্চল সফর করচি তাকে বলা হয় ‘আহমদের ঘন্টার মরুভূমি’। বাহু বছর আগে আহমদ নামে কোনো এ ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি কাফেলা পথ হারিয়ে ফেলে এখানে এসে এবং ওরা সকলেই –মানুস এবং জানোয়ার প্রত্যেকেই –পিয়াসে প্রাণ হারায়। আর আজো লোকে বলে, আহমদের উটেরা গলা যে ঘুঙৃর পরেছিলো তার ধ্বনি মাঝে মাঝে শুনতে পায় মুসাফিরেরা –ভৌতিক কান্নার মতো সেই শব্দ, যা গাফেল পথিককে মোহবিষ্ট করে তাদের পথ থেকে নিায়ে যায় দূরে এবং মরুভূমিতে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
আমরা সূর্যাস্তের কিছু পরেই আলী আগা এবং অগ্রবর্তী দলটিকে ধরে ফেলি এবং ‘কাহুর ’ তৃণের মধ্যে আমাদের তাঁবু গাড়ি –কয়েকদিনের জন্য এই শেস দেখতে পেলাম এই তৃণ। শুকনা ডারপালা দিয়ে আগুন ধরানো হরো এবং তৈরি হলো যা না হলেই নয় সেই চা, যকন আলী আগা তাঁর অভ্যাস টেনে চলেছেন আফিঙের পাইপ। উটগুলিকে খাওয়ানে হলো মোট বার্লি তৈরি খাবার আর আমদের চারদিকে বৃত্তাকারে সেগুলিকে বসিয়ে দেওয়া হলো হাঁটুর উপর। পুলিমের তিনজন লোককে ক্যাম্পের বাইরে বালিয়াড়ির উপর মোতায়েন করা হলো সন্ত্রাসী হিসাবে, কারণ আমরা যে অঞ্চলটিকে নিজেদের নিয়ে এসেছিলাম ঐ দিনগুলিতে সে অঞ্চরটি ছিলো মরুভূমির ভয়াল দানবদের ক্রীড়াক্ষেত্র – দক্ষিণ দিক থেকে আগত বালুচ উপজাতির হানা্দারদের।
আলী আগা সবেমাত্র তাঁর পাইপ এবং চা শেস করেছেন এবং পান করছেন আরক একাই – কারণ এ ব্যাপারে তাঁর সংগী হওযার মতো মন- মেজাজে ছিলো না আমার। হঠাৎ একটি রাইফেলের আওয়াজ রাত্রির নীরবতাকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়। আমাদের সন্ত্রাসীদের রাইফেল থেকে দ্বিতীয় একটি আওয়াজ তার জবাব দেয় এবং পরপরই অন্ধকারের মধ্যে কোথাও শোনা গেলো একটি চিৎকার। ইবরাহিম তার চমৎকার উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে বালু ছুঁড়ে মারে আগুনের উপর। চারদিক থেকে আরো উঠতে লাগরো রাইফেলের আওয়াজ। সন্ত্রাসীদের এখন দেখাক যাচ্ছে না। কিন্তু ওরা একে অপরকে ডাকছে তা আমরা শুনতে পাচ্ছি। আত্রমণকারীদের সংখ্যা কতো বুঝতে পারলাম না। কারণ ওরা নীরবতা বজায় রেখেছিলো –ভৌতিক নীরবতা –কেবল মাঝে মাঝে কোনো রাইফেল থেকে একটা অস্পষ্ট আলোর ঝিলিক – যা ছুরির মতো বিদ্ধ করছে অন্ধকারকে ওরা যে আছে তা জানিয়ে দিচ্ছে এবং দু একবার আবছা দেখতে পেরাম অন্ধকারের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দ ছুটে চলেছে সাদা পোশাক পরা কতকগুলি মূর্তি। নীচু লেবেলে তাক করে ছোড়া কয়েকটি বুলেট মাঁ করে আমাদের মাথার উপর চলে যায়; কিন্তু আমাদের কারো গায়ে লাগলো না। আস্তে আস্তে এই চাঞ্চল্য ও উত্তেজনা থেকে গেলো। আরো কয়েকটি গুলি ছোড়া হলো এবং রাত্রি শুষে নিলো তার শব্দ, আর হানাদারেরা আমাদের সতর্কতায় স্পষ্টতই নিরাশ হয়ে যেমন চুপি চুপি এসেছিলো তেমনি চুপি চপি গায়েব হয়ে গেলো।
আলী আগা সন্ত্রাসীদের ডাকলে পরে আমরা ছোটো –খাটো একটা আলোচনা বৈঠকে বসি। প্রথমে আমরা ঠিক করেছিলাম রাতটা এখানেই কাটাবো। কিন্তু যেহেতু আক্রমণকারী এ দলটি কতো শক্তিশালী সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই এবং আরো লোকজন নিয়ে ওরা আবার ফিরে আসবে কিনা তাও যখন আমরা জানি না, আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এখনি তাঁবু গুটিযে আমাদের রওয়ানা দেওয়া উচিত।
পীচের মতোই কালো আজকের রাত। ঘন নীচু মেঘপুঞ্জে ঢাকা পড়ে গেছে চাঁদ এবং তারা। সাধারণত গ্রীষ্মকালে মরুভূমিতে রাতের বেলা পথ চলাই ভালো। কিন্ত স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা এরূপ অন্ধকারে পথ চলার ঝুঁকি নিতাম না। কারণ, এতে পথ হারানো আশংকা রয়েছে- কেননা দশত –ই-লুতের কঠিন নুড়ি পাথর কোনো পথের চিহ্ণ ধরে রাখে না। প্রাচীনকালে এ ধরণের মরুভূমিতে ইরানের বাদশাহরা কাফেলার রাস্তা চিহ্নিত করার জন্য ইট দিয়ে তৈরি করতেন গাইড পোষ্ট, কিন্তু সেকালের অনেক ভালো জিনিসের মতোই এসব চিহ্ন মুছে গেছে বহুকাল আগে। আসলে এগুলির আর এখন দরকারও এখন নেই। ভারতের সীমান্ত থেকে দাশত-ই-লুতের ভেতর দিয়ে কিরমান পর্যন্ত ইন্দো-ইউরোপীয় টেলিগ্রাফের যে লাইন এই শতকের শুরুতে ব্রিটিশ সরকার স্থাপন করেচে তা-ই একই রকম সার্থকতার সংগে –বলা যায়, তারো চেয়ে উৎকৃষ্টভাবে –কাজ করছে গাইডের; কিন্তু রাতে তার এবং টেলিগ্রাফের খুঁটিগুরি দেখা যাচ্ছিলো না চোখে।
আতংকের সংগে আমরা আবিষ্কার করলাম এ ব্যাপারটি যখন আমাদের গাইডরূপে আগে আগে উট হাঁকিয়ে চলছিলো যে-পুলিশটি , সে প্রায় আধ ঘন্টা পর হঠাৎ তার উটের লাগাম টেনে ধরে লজ্জিত মুখে আলী আগাকে জানালোঃ
-হযরত, আমি আর টেলিগ্রাফের তার দেখতে পাচ্ছি না.. .।
মুহূর্তের জন্য আমরা সকলে স্তব্ধ হয়ে যায়। আমরা জানতাম টেলিগ্রাফ লাইন দ্বারা চিহ্নিত রাস্তার পামেই কেবল কুয়া রয়েছে; আর কুয়াগুলিরও একটি থেকে আরেকটির দুরত্ব অনেক। এখানে পথ হারানো মানেই হচ্ছে আহমদের সেই গল্পের কাফেলার মতোই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া.. .।
এরপর আলী আগা এমনভাবে কথা বললেন যা তাঁর স্বাভাবিক কথা বলার ধরণের চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা। যে কেউ নিরাপদে এই ধারণা করতে পারে যে, আরক এবং আফিঙই এর জন্য দায়ী। তিনি তার তার পিস্তল বার করে গর্জন করে উঠলেনঃ
-‘কোথায় তার? কুত্তার বাচ্চারা, কেন তার হারালি বল? হ্যাঁ, আমি জানি তোরা ঐ ডাকাতদের সংগে জোট বেঁধেছিস এবং আমাদের গুমরাহ করতে চাইছিস- যাতে আমরা মরি পানির অভাবে, আর তোদের সহজ লুটতরাজের বস্তু হয়ে উঠি।’
সত্যই এ তিরষ্কার ছিলো অন্যায়; কারণ কোনো বালুচ একবার যার সাথে বসে নুন-রুটি খেয়েছে সে কখনো তার বিশ্বাসের খেয়ানত করবে না। আমাদের পুলিশগুলি ওদের লেফটেন্যান্টের অভিযোগ পষ্টই আহত হয়ে আমাদের এই আশ্বাস দিলো যে, ওদের কোনো দোষ নেই, কিন্তু আলী আগা আবার চীৎকার করে ওঠেনঃ
-‘খামোশ, এক্ষুণি টেলিগ্রাফের তার খুঁজে বের কর; অন্যথায় আমি তোমাদের প্রত্যেককে গুলী করে সাবাড় করে দেবো-বুঝলে জাহান্নামীর পুত্ররা!’
অন্ধকারে আমি ওদের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, ওরা, এই আজাদ বালুচেরা এ অপমানে কতো গভীর আঘাত পেয়েছে! এমনকি, জবাব দেবার প্রয়োজন ও ওরা আর বোধ করলো না। তারপর হঠাৎ ওদের একজন- কিছুক্ষণ আগেই যে ছিলো আমাদের গাইড-আলাদা হয়ে দাঁড়ালো দল থেকে, চাবুক হানলো তার উটের গায়ে, তারপর এক লাফে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
-‘কোথায় যাচ্ছে?’ চীৎকার করে ওঠেন আলী আগা এবং জবাবে তিনি শুনতে পান কয়েকটি অস্পষ্ট শব্দ। কয়েক সেকেন্ডের জন্য শোনা গেলো উটের পায়ের নরম মোলায়েম আওয়াজ। তারপর সেই শব্দ ডুবে গেলো রাত্রিতে।
বালুচ পুলিমের কোনো দোষ নেই, এ বিষয়ে আমরা যে প্রত্যয় হয়েছিলো মুহূর্তকাল আগে, তা সত্ত্বেও আমার মনে দ্বিধাজড়িত এই ভাবনা খেলে যায়ঃ এখন সে গিয়েছে দস্যূদের কাছে! যা-ই হোক, আলী আগার ধারণাই ঠিক.. . আমি শুনতে পেলাম আলী আগা পিস্তল-কেস থেকে টেনে বের করছেন তাঁর পিস্তল, আর আমিও তাই কির। ইবরাহীম আস্তে আস্তে হাতে তুলে নেই তার গুলতি। আমরা আমাদের জীনের উপর বসে আছি নিশ্চল নিস্তব্ধ। পুলিশের একজন ঘোঁৎঘোঁৎ করে ওঠে অনুচ্চ স্বরে: অপর একজন পুলিশের রাইফেলের বাঁটের গুঁতা লাগে একটি জীনের উপর। দীর্ঘ কয়েক মিনিট চলে যায়। নীরবতা এমনি যে, সব কটি মানুষের নিশ্বাসের শব্দই যেনো প্রায় শোনা যাচ্ছে। তারপর হঠাৎ বিচ্ছিন্নভাবে একটি শব্দ ছুটে এলো অনেক দূর থেকে। আমার কাছে মনে হলো এটি কেবলই একটি ধ্বনি ‘–ও-ও-ও’। কিন্তু বালুচেরা এর অর্থ জানে এবং তার জবাবে ওদের একজন দুহাত মুখের উপর পেয়ালা মতো রেখে উত্তেজিতভাবে ব্রাহুই ভাষায় চীৎকার করে কিছু বলে। আবার সেই দূরের চীৎকার। পুলিশদের একজন এবার আলী আগার দিকে ফিরে ফার্সি ভাষায় বলেঃ
‘তার, ‘হযরত’, তার পেয়েছে ও!’
চাপা উত্তেজনা এবার মুক্তি পায়। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেরি আমরা সকলে, অনুসরণ করতে থাকি অদৃশ্য গাইডের গলার আওয়াজ, যে কিছুক্ষণ পর পর আমাদের দিচ্ছে পথের ডিরেকশন। আমরা যখন ওর কাছে পৌছলাম, সে তার জীনের উপর উঠে দাঁড়ালো এবং অন্ধকারের দিকে ইশারা করে বললোঃ
-‘এই যে টেলিগ্রাফের তার!’
এবং ঠিকই, কয়েক মিনিট পরই আমরা টেলিগ্রাফের একটি খুঁটির সংগে ধাক্কা খেতে খেতে বেঁচে যাই। আলী আগা প্রথম যে কাজটি করলেন তা তাঁরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক। তিনি সিপাইটির বেল্ট ধরে টেনে নিলেন নিজের কাছে এবং জীনের উপর ঝুঁকে পড়ে তার দুই গালে চুমু খেলেনঃ
‘-ভাইটি, তুমি নও, আমি কুত্তার বাচ্চা। আমাকে মাফ করে দাও!
পরে জানা গেলো মরুভূমির শিশু এই বালুচ সিপাইটি এঁকেবেঁকে চলছিলো উট হাঁকিয়ে কখনো ডাইনে কখনো বাঁয়ে। তারপর , একসময়ে আধ মাইল দূর থেকে শুনতে পেলো বাতাস তারের উপর আঘাত করে সাঁ সাঁ শব্দ-এই মুহূর্তে যখন আমি ঠিক তার নীচ যাচ্ছি, তখনো আমার ইউরোপীয় কানে প্রায় অনুভবের অতীত!
আমরা আস্তে আস্তে সতর্কতার সাথেআগাতে থাকি আঁধারে ঢাকা রাত্রির মধ্যে দিয়ে, অদৃশ্য টেলিগ্রাফের খুঁটি তেকে অদৃশ্য আরেক টেলিগ্রাফের খুঁটি পর্যন্ত। একজন পুলিশ সব সময়ই চলছে আমাদের আগে। আর যখন তার হাত একটা খুঁটির সাথে লাগছে সে চীৎকার করে তা বলছে আমাদের । আমরা আমাদের পথ খুঁজে পেয়েছি এবং আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, আমরা আমাদের পথ আর হারাবো না। আমি আমার স্বপ্ন থেকে জেগে উঠি এবং ফিরে যাই আলী আগার চিঠিতেঃ
লেফটেন্যান্ট বর্ণেল পতে উন্নীত হবার পর এই অধমকে নিযুক্ত করা হয়েছে সামরিক বাহিনীর জেনারেল স্টাফ-এ; আর কাজ, হে আমার বন্ধু এবং ভাই, একটি প্রাদেশিক শহরের গ্যারিসনের জীবন তেকে আমার কাছে বেশি আবেদন রাখে।
এ আবেদন সম্পর্কে আমি নিশ্চিত; রাজধানীর জীবন সম্পর্কে এবং তার চক্রান্ত, বিশেষ করে এর রাজনৈতিক চক্রান্ত সম্পর্কে সব সময়ই একটি স্বাভাবিক বিবেচনা রয়েছে আলী আগার। বস্তুত তিনি তার চিঠিতে তেহরানের রাজনৈতিক আবহাওয়া বর্ণনা করছেন-মসৃণ সমতলের নীচে সেইসব অন্তহীন বাদ-বিসংবাদের কথা, সেইসব জটিল চালের কথা যা দিয়ে বৈদেশিক শক্তিগুলি ইরানকে এতদিন রেখেছে একটা অস্থির অবস্থার মধ্যে, যে –কারণে এ বিস্ময়কর প্রতিভাশালী জাতি তার নিজস্ব রূপে প্রকাশ করে উঠতে পারছে না নিজেকে।
ঠিক এই মহূর্তে আমরা ইংলিশ তৈল কোম্পানী কর্তৃক হয়রান হচ্ছি। আমাদের সরকারের উপর সাংঘাতিক চাপ দেওয়া হচ্ছে কনসেশন আরো বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য এবং আমাদের গোলামকে আরো দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য। বাজার গুলিতে গুজবের জন্য কান পাতা যায় না আল্লাহই জানেন এ সবের পরিণতি কী!.. .
প্রাচ্যে দেশগুলির রাজনৈতিক জীবনে বাজারের ভূমিকা সবসময়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ; তেহরানের বাজারের বেলায় তা আরো খাস করে সত্যঃ এ বাজারে ইরানের গোপন হৃদয় স্পন্দিত হচ্ছে অব্যাহতভাবে, সকল প্রকার জাতীয় অবক্ষয় এবং সময়ের সকল অগ্রগতিকে অগ্রাহ্য করে। আলী আগার চিঠি পড়তে পড়তে, এই বৃহৎ বাজারটি , যা নিজেই একটা নগরীর মতো, এমন পষ্ট আমার চোখের সামনে আবার ভেসে ওঠে যেনো আমি মাত্র কালই তা দেখেছিঃ বড় বড় ফাঁকের জালির মতো আলো-আঁধারী রহস্যঘেরা অনেকগুলি হলের গোলকধাঁধা আর চলাচরের জন্য বিভিন্ন রাস্তা, যার উপর ছাদ তৈরি করেছে সূক্ষাগ্র তোরণ, দুই দিক থেকে এসে মিলিত হয়ে । সস্তা তুচ্ছ জিনিসপাতিতে ভর্তি আলোহীন ছোট্ট দোকানগুলি ছাড়িয়ে প্রধান রাস্তায় রয়েছে ছাদে ঢাকা প্রাংগণ, যে ছাদের মধ্যে আছে আলো প্রবেশের জন্য কাঁচের জানালা; এগুলি হচ্ছে; দড়ি একেকটি স্টোর, যেখানে ইউরোপ এবং এশিয়ার সবচেয়ে দামী রেশম বিক্রি হচ্ছে; দড়ি নির্মাতাদের কারখানার পরেই রৌপ্যকারদের কাঁচের কেস, যা সূক্ষ্ণ সোনা –রূপার ঝালরের কারুকার্যময়; বোখারা এবং ভারতের নানা রংয়ের সূতীবস্ত্র আর দুর্লভ পারস্য গালিচা মিশে গেছে একষাতে, শিকারের চিত্রসম্বলিত গালিচা; সেলাইর কালের পাশেই রয়েছে কাঁচ-মুক্তার গলার হার ও অটোমেটিক লাইটার, কালো হতভাগা ছাতাগুলি রয়েছে খোরাসানের ভেড়া চামড়ার পোশাকের পাশাপাশি, যার কিনারে কাজ করা হয়েছে হলুদ রংয়ের; এই সুদীর্ঘ হলের মধ্যে এসবই এসে মিশেছে একসাথে, যেনো একটি বৃহৎ এবং কিছুটা অযত্ন বিন্যস্ত দোকানের জানালায়।
এই পরস্পর বিজড়িত কুটির শিল্প ও বাণিজ্য দ্রব্যাদির অগণিত ছোট্ট – ছোট্ট গলিতে দোকানগুলি সাজানো হয়েছে পেশা অনুসারে। এখানে আপনি দেখতে পাবেন জীন নির্মাতা ও চর্মকারদের এক দীর্ঘ সারি, আরতার সাথে প্রধান রং হিসাবে পাবেন রং-করা চামড়ার লাল রং এবং চামড়ার কিছুটা টকটক গন্ধ, যা ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে; রয়েছে দর্জিরা –প্রর্তেকের জন্য নির্ধারিত উচু স্থান থেখে আপনি শুনতে পাচ্ছেন নিপুণ সেলাই কলগুলির একটানা শব্দ; প্রত্যেকটি দোকানীর জন্যই তিন থেকে চার বর্গফুট উঁচু একটা মেঝের উপর রয়েছে একেকটি দোকান; লম্বা লম্বা জামা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য, সবসময় একই রকমের জামা, যার ফলে, আপনি যখন হাঁটেন,কখনো কখনো আপনার মনেহবে আপনি নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছেন। বাজারের অন্যান্য বহু অংশৈও একই রকমের অনুভুতি হবে আপনার । তা সত্ত্বেও প্রত্যেকটি পৃথক ক্ষেত্রে এই বিপুল সাদৃশ্যেরি সাথে একঘেঁয়েমীর কোনো সম্পর্ক নেই। অপরিচিত লোকের মধ্যে এ সাদৃশ্য নেশা ধরিয়ে দেয় এবং একটা অস্বস্তিকর তৃপ্তিতে তার অন্তরকে দেয় পূর্ণ করে। আপনি যদি একশ বারও আসেন, আপনি সবসময়ই দেখবেন আপনার চারপাশে মেজাজ –মর্জি এবং আবহাওয়া একই, মনেহবে যেন কেনা পরিবর্তন ঘটেনি; কিন্তু সে মেজাজ এবং আবহাওয়অ হচ্ছে সমুদ্র-তরংগের সেই অফুরন্ত অনুরণশীল পরিবর্তনহীনতা যা সবসময়ই তার রূপ বদলায়, কিন্তু তার মূলকে রাখে অপরিবর্তিত।
আর তাম্রকারদের বাজারঃ যেনো দোলায়মান হাতুড়ির আঘাতে ব্রোঞ্জের তৈরি অনেকগুলি ঘন্টার ঐকতানঃ সে হাতুড়িগুলি তামা, ব্রোঞ্জ এবং পিতল পিটিয়ে দেয় বহু বিচিত্র রূপ, আকারহীন ধাতুন পাতকে রূপান্তরিত করে গামলা, বেসিন ও বড় বড় পাত্রে।ধ্বনির কী নিশ্চয়তার সংগে চলতে থাকে হাতুড়ির এই আঘাত, তাল কখনো উুঁচতে তুলে কখনো নীচুতে নামিয়ে, বাজারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত, প্রত্যেকেই হাতুড়ির বাড়ি দিতে গিয়ে অনুসরণ করছে অন্যের ছন্দকে, যাতে কানে কিছু অসংগত, বেসুরো না শোনায়; একশ কারিগর হয়তো হাতুড়ি চালাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন ধাতুর উপর ভিন্ন ভিন্ন দোকানে- কিন্তু সারা বাজারে শুনতে পাওয়া যাবে একটিমাত্র সংগীত – একটিমাত্র রাগিণী .. . একটা সমন্বয় খুঁজে পাওয়ার জন্য এই গভীর, প্রায়-সামাজিক বাসনার মধ্যে –যা কেবল সংগীতের চাইতে আরো গভীর কিছু –ধরা পড়ে ইরানের আত্মার গোপন মাধুর্য।
এরপর মসলার বাজারঃ নীরব অলিগলি, যার দুই পাশে সজ্জিত সাদা জমাট মিশ্রীর তাল, চাউলের বস্তা, বাদাম এবং পেস্তার স্তূপ, হেজেল নাট ও তরমুজের শাঁস, শুকনা খোবানী ও আদা-ভর্তি ডালা, দারুচিনি,হলুদ, গোলমরিচ, জাফরান ও পোস্তাদানা ভর্তি কাঁসার থালা, মৌরী মসলা, ভেনিলা, জিরা, লং এবং আরো অসংখ্য লতাগুল্ম ও শিকড়- ভর্তি বহু পাত্র, যেসব মসলা থেকি নির্গত হচ্ছে গাঢ়, অভিভূত করা সৌরভ। বুদ্ধের মতো পদ্মাসনকরে বসে আছে এইসব বিসম্য়কর বস্তুর মালিকেরা উজ্জ্বল পিতলের দাড়ি পাল্লার উপর ঝুঁকে এবং কখনো কখনো নীচু গলায় পথাচারীকে ডাকছে আর তার নিকট কি চই জিজ্ঞাস করচে। এখানে কথঅ মানে অস্ফুট ধ্বনি, ফিসফিস করে কিছু বলা, কারণ যখন ব্যাগ থেকে পাল্লায় চিনি তোলা হয় আস্তো আস্তে তখন কারো পক্ষে শোরগোল করা সম্ভব হয় না – যখন ওজন করা হচ্ছে .. . থাইম কিংবা জিরা.. . এর আর কিছু নয়; মন মেজাজকে হাতের উপকরণের সাথে খাপ খাইয়ে নেবার সেই ক্ষমতা যার বলে ইরানীরা পারে অগণিত রংয়ের পশমের সূতা থেকে গেরো দিয়ে চমৎকার গালিচা বুনতে –একটি একটি সূতা করে ইঞ্চির ভগ্নাংশের সঙ্গে ইঞ্চির ভগ্নাংশ জুড়ে দিয়ে- যে পর্যন্ত না গোটা গালিচাটি তৈরি হয়েওঠে তার লীলাময় পূর্ণতায়। পৃথিবীতে যে ইরানী গালিচার কোনো তুলনা নেই এ কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়। নিজের হাতের কাজের এই গভীর নীরবতা, েএ চিন্তামগ্নতা, এ আত্ম –নিমজ্জন আর কোথায় পাবেন? –কোথায় পাবেন এই চোখ, এই গভীর অতলতা যার কাছে সময় এবং সময়ের গতি এতো তুচ্ছ!
কোটরাবিশিষ্ট তাকগুলিতে, যা স্বাভাবিক তাকগুলির চাইতে বড়ো, বসে কাজ করছে চিত্রকরেরা –ছোটো ছোটো ছবি আঁকছে। ওরা বহুকাল আগে যেসব হাতে লেখা পুঁথি ছিঁড়েছুড়ে গেছে তা থেকে ছোটো ছবি নকল করছে, জীবনের বৃহৎ বিষয়গুলিকে রূপ দিচ্ছে নিশ্বাসের মতোই সূক্ষ্ণ রেকা এবং রঙেঃ যুদ্ধ এবং শিকারের চিত্র, প্রেম সুখ এবং দুঃখের ছবি। ওদের ব্রাশ স্নায়ুতন্ত্রের মতোই মিহি এবং সূক্ষ্ণ সূক্ষ্ণ বড়ি এবং বিন্দু বানিয়ে তা মাখানো হচ্ছে তার বাম হাতের আঙুল গুলিতে। নিখুঁত শুভ্র নতুন পাতাগুলিতে পুরানো চিত্রগুলি নতুন জীবন লাভ করে তুলির আঁচড়ের পর আঁচড়ে, শেডের পর শেড। মূলের থাক থাক সোনালী পটভূমির পাশাপাশি ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে নকলগুলি; উজ্জল পশ্চাদভূমি। একটা শাহী পার্কে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কমলালেবুর গাছগুলি এক নব বসন্তের আবর প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। রেশমী এবং পশমী পোশাক পরা তন্বীরা আবার তাদের চিত্তহারী অংগভংগীতে হয়ে ওঠে জীবন্ত; সেই পুরান বীর যোদ্ধাদের পলো খেলার উপরে নতুন সূর্য ওঠে .. আঁচড়ের পর আঁচড়ের শেডের পর শেড .. নির্বাক মানুষেরা অনুসরণ করে এক মৃত শিল্পীর বলিষ্ঠ সৃজনধর্মী প্রয়াসকে এবং সেই মৃত শিল্পীর মধ্যে ছিলো যেমন যাদু এদের মধ্যে রয়েছে তেমনিতরো প্রেমঃ আর এই প্রেম আপনাকে প্রা্রয় ভুলিয়ে দেয় নকরের অসম্পূর্ণতার কথা… ..
সময় আগিয়ে চলে; চিত্রকরেরা মাথা নুয়ে কাজ করে চলে, দিনের সাথে ঘটে না তাদের পরিচয়। সময় আগিয়ে চরে; বজারের পশ্চিম খন্ডের নিকটের রাস্তাগুলি ধীর গতিতে ক্রমশ আগিয় আগিয়ে ঢুকে পড়েছে দোকানগুলির মধ্যে; শিকাগো থেকে আমদানি করা কেরোসিনের বাতি, মাঞ্চেষ্টারের ছাপানো কাপড় এবং চেকোশ্লাভিকিয়ার চা-পাত্র আগিয়ে আসছে বিজয়ীর বেশে; কিন্তু চিত্রকরেরা তাদের জীর্ণ খড়ের মাদুরের উপর পদ্মাসন করে বসে সেকালের পরম আন্দময় সুরের মধ্যে প্রবেশ প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে নাজুক চোখ আর আঙুলের ডগা এবং তাদের শাহী শিকার এবং বিহ্বল প্রেমিকদের দিচ্ছে নতুন প্রাণ, দিনের পর দিন.. .
বাজারে লোক বেশুমার –অগুণতি; এদের মধ্যে রয়েচে ইউরোপীয় পোশাক পরা এবং প্রায়ই, ইউরোপীয় অথবা অর্ধ-ইউরোপীয় পোশাক পরা এবং প্রায়ই , ইউরেপীয় অথবা অর্ধ ইউরোপীয় স্যুটের উপর মাটির উপর ঝুলে পড়া আরবী ‘আবায়া’ পরা ভদ্রলোকেরা, দীর্ঘ ‘কাফতান’ পরা এবং কোমরে রেশমী ফিতা বাঁধা রক্ষণশীল শহুরে লোকেরা, আর নীল অথবা মেটে জ্যাকেট পর কৃষক ও কুটির শিল্পীরা। ইরানের শরীফ ভিক্ষুক গায়ক দরবেশদের দেকতে পাবেন তাদের সাদা ঢিলাঢালা লম্বা ঝুলাওয়ালা পোশাকে, কখনো চিতাবাগের একটি চামড়া কাঁধে, মাথায় বাবরি চুল এবং প্রত্যেকেরই শরীরের গঠন চমৎকার। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মেয়েলোকের তাদের সামর্থ অনুসারে কেউ পরে সিল্কের কাপড়, কেউ বা সূতী বস্ত্র। কিন্তু কাপড়ের রং সবসময়ই কালো আর প্রত্যেকের মুখের উপরই ঝোলানো থাকে ঐতিহ্যপূর্ণ খাটো তেহরানী নেকাব। যারা গরীব তারা পরে হালকা রঙের ফুলওয়ালা সূতী চাদর। সেকেরে মোল্লারা সুন্দর কাজ করা বস্ত্র দিয়ে ঢাকা গাধা অথবা খচ্চরে পিছে চড়ে চলাফেরা করে সাড়ম্বরে এবং অপরিচিত কাউকে দেখলে তার দিকে এমন গোঁড়া দৃষ্টি হানে যে, মনে হয় যেনো তা জিজ্ঞাস করছেঃ কি করছো তুমি এখানে? আমাদের দেশকে ধ্বংস করার জন্য যারা কাজ কর ছে তুমি তাদেরই একজন ?
পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ইরানীদের হয়েছে তার ফলে ইরানী মানুষেরা হয়ে উঠেছে সন্দেহপরায়ণ। ফিরিংগিদের দ্বারা তাদের দেশের কোনো উপকার হতে পারে এ আশা কোনো ইরানীই আসলে করে না। কিন্তু আলী আগাকে অনাবশ্যক নৈরাশ্যবাদী বলেও মনে হয় নাঃ
ইরানের বয়স হয়েছে, কিন্তু নিশ্য় ইরান মরতে এখনো প্রস্তুত নয়। আমাদের উপর বারবার জুলুম করা হয়েছে। বন্যাস্রোত বয়ে গেছে বহু জাতি আমাদের উপর দিয়ে এবং তাদের সবাই মৃত্যুবরণ করোছে; কিন্তু আমরা আছি। এর কারণ, আমরা ইরানীরা সবসময়ই আমাদের নিজের পথে চলি। কতবার বহিবিশ্ব নতুন জীবন পদ্ধতি চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে আমাদের উপর এবং প্রত্যেকবারই ব্যর্থ হয়েছে। আমরা বাইরের শক্তিকে শক্তি দিয়ে মুকাবিলা করি না, যার ফলে মাঝে মাঝে মনে হতে পারে আমরা যেনো ওদর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। কিন্তু আমরা হচ্ছি ‘মবিউন’ খান্দানের লোক সেই ক্ষুদ্র উপপোকা যা বাস করে দেয়ালের নীচে। আপনি, আমার হৃদয়ের জ্যোতি, আপনি ককনো না কখনো ইরানের নিশ্চয়ই দেখেছেন কিভাবে চাক্ষুষ কোনো কারন ছাড়াই হঠাৎ ধ্বসে পড়ে সুদৃঢ় দেয়ালবিশিষ্ট মজবুত দালানকোঠা। এর কারণ কি? আর কিছুই নয়, এ ছোট্ট পিঁপড়াগুলি যারা বহু বছর ধরে অক্লান্ত চেষ্টায় দালানের ভিতের মধ্যে খুঁড়ে খুঁড়ে সৃষ্টি করে রাস্তা এবং গহবর, সবসময় তারা আগায় চুল পরিমাণ দূরত্বে, ধীরগতিতে, ধৈর্যের সংগে, সকল দিকে! ফলে শেষ পর্যন্ত গৃহ- প্রাচীর হারিয়ে ফেলে তার ভারসাম্য েএবং পড়ে যায় হুমড়ি কেয়ে। আমরা ইরানীরা হচ্ছি এ ধরনের পিঁপড়া । আমরা পৃথিবীর কেনো শক্তিকে শোরগোল পূর্ণ অর্থহীন বল দিয়ে মুকাবিলা করি না। বরং ওদের ওদের সাধ্যমতো অন্যায় এবং জুলুম করবার সুযোগ দিই এবং আমরা নীরবে খুঁড়েতে থাকি আমাদের রাস্তা এবং গহ্বর, যতক্ষণ না একদিন ওদের ইমারত হঠাৎ ধ্বসে পড়ে।
আর আপনি কি দেখেননি পানিতে যখন পাথর পড়ে তখন কী ঘটে? পাথরটি ডুবে যায়; পানির সমতলের উপর দেখা যায় কয়েকটি বৃত্ত। বৃত্তগুলি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়। শেষপর্যন্ত শুরতে পানি যেমন নিস্তরংগ ছিলো আবার তেমনি নিস্তরংগ হয়ে যায়।
শাহ – আল্লাহ তাঁর হায়াত দারাজ করুন – তাঁকে বহন করতে হচ্ছে একট গুরুতর বোঝা, যার একদিকে রয়েছে ইরংরেজরা আর অন্যদিকে রয়েছে রুশরা। কিন্তু আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহর রহমতে তিনি খুঁজে পাবেন ইরানকে বাঁচাবার পথ…
বাহ্যত রিজা শাহের উপর আলী আগার দৃঢ়মূল বিশ্বাস অপাত্রে বিশ্বাস বলে মনে হয় না। আমি মুসলিম বিশ্বে যেসব গতিশীল ব্যক্তিত্বের সংগে মিলিত হবার সুযোগ পেযেছি শাহ হচ্ছেন নিঃসন্দেহে তাদের অন্যতম এবং যেসব রাজাকে আমি জানি তাদের মধ্যে কেবল িইবনে সউদকে তাঁর সংগে তুলনা করা যেতে পারে।
রিজা শাহের ক্ষমতারোহনের কাহিনী একটি কাল্পনিক রূপকথার মতো, যা কেবল প্রাচ্য জগতেই সম্ভব, যেখানে কখনো ব্যক্তির হিম্মত এবং প্রবল ইচ্ছা-শক্তি মানুষকে অখ্যাতি, অশ্রুতির অন্তরাল থেকে টেনে তুরতে পারে নেতৃত্বের শীর্ষ চূড়ায়। আমি যখন প্রথম তাঁকে জানবার সুযোগ পাই ইরানে আামর প্রথম অবস্থানকালে, ১৯২৪ সালের গ্রীষ্মের দিনগুলিতে, তখন তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং ইরানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ডিকটেটর। কিন্তু তাকে এতো আকস্মিকতার সংগে এতো অপ্রত্যাশিতভাবে দেশের হাল-হাকিকতের নিয়ন্ত্রণে দেখতে পেয়ে দেশের মানুষ যে ধাক্কা খেয়েছিরো, তার ধকল তারা তকনো পুরাপুরি কাটিয়ে ওঠেনি। আমার এখনো মনে আছে, তেহরানে জার্মানীর দূতবাসের এক বৃদ্ধ ইরানী ক্লার্ক কী তাজ্জবের সংগে একদিন আমাকে বলেছিলোঃ “আপনি কি জানেন, খুব বেশি দিন নয়, মাত্র দশ বছ আগে আমাদের এই প্রধানমন্ত্রী এই দূতাবাসের গেটের একজন সাধারণ সিপাইরূপে পাহারা দিতেন, আর এই আমি, নিজে মাঝে মাঝে তার হাতে দিতাম কোনো চিঠি বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ে পৌছিয়ে দেওয়ার জন্য এবং তাকে বকুনি দিয়ে বলতাম- “এই এই কুত্তার বাচ্চা, ছুটে যা বাজারে, বাজে কাজে সময় নষ্ট করিস না।…!”
হ্যাঁ,এ খুব বহু বছর আগের কথা নয়, যখন অশ্বারোহী পুলিশ রিজা তেহরানের দূতাবাস এবং সরকারী ভবনগুলির সামনে কাজ করতেন সান্ত্রী হিসাবে। আমি কল্পনায় তাঁর ছবি দেখতে পাচ্ছি যখন তিনি ইরানী কোসাক –ব্রিগেডের বিশ্রী উর্দী পরে দাঁড়াতেন তাঁর রাইফেলে ঠেস দিয়ে এবং চারপাশে বিভিন্ন রাস্তায় যে কর্মতৎপরতা চলছে তা দেখতেন তাকিয়ে তাকিয়ে; তাঁর চোখের সমুখ দিয়ে ইরানী লোকেরা পায়চারী করতো স্বপ্নের মতো, অথবা বিকালের ঠান্ডায় পানির খালের ধারে বসতো ওরা, যেমন আমি ওদের করতে দেখেছি। আর শুনতেন তাঁর পিঠের পেছনে ইংরেজদের ব্যাংক থেকে টাইপরাইটারদের বিশেষ শব্দ, ব্যস্ত মানুষের শোরগোল, চাঞ্চল্যের সমুদয় অস্ফুট ধ্বনিটি যা সুদূর ইউরোপ নিয়ে এসেছে তেহরানের ঐ প্রাসাদটিতে, যার সম্মুখ-ভাগটি খচিত নীল বর্তনের টুকরা দিয়ে। হতে পারে,প্রথম বারের মতো (আমাকে কেউ একথা বলেনি, কিন্তু কেন যেনো আামর মনে হয়, ঠিক এ রকমটিই ঘটে থাকবে) সিপাই রিজার অশিক্ষিত মাথায় জেগেছিলো এই বিস্ময়সূচক জিজ্ঞাসময় চিন্তুাঃ এই রকম হওয়াই কি অপরিহার্য?.. . হ্যাঁ, এ রকমটি হওয়াই কি অনিবার্য যে, অন্যান্য জাতির লোকের যখন কাজ করছে, চেষ্টা করচে, তখন আমাদের জীবনে বয়ে চলবে একটি স্বপ্নের মতো?
এবং হয়তো সেই মুহূর্তের পরিবর্তনের সেই বাসনা-যা সমস্ত মহৎ কর্ম, আবিস্ক্রিয়া ও বিপ্লবের জন্ম দেয় – দীপ্তিময় হয়ে উঠতে শুরু করেছিলো তাঁর মগজে এবং নির্বাক অবস্থায় চাইছলো তার অভিব্যক্তি….
অন্যান্য সময় তিনি হয়তো বৃহৎ কোনো ইউরোপীয় দূতবাসের দাখির দরোজার বাগানের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সান্ত্রী হিসাবে। সযত্ন-লালিত গাছগুলি আন্দোলিত হচ্ছে বাতাসে এবং নুড়ি পাতর বিছানো পায়ে –চলা রাস্তাগুলি মসমস করছে সাদা পোশাক পরা নওকরদের দরোজার ভেতর দিয়ে যে –সব ইরানী বার হয়ে যায় তার প্রত্যেকেই এর জন্য থাকে ভীত েএবং আত্মসচেতভাবেই তাকে তার পোমাক আর কাপড় –চোপড় টেনে লম্বা করে ধরতে বাধ্য করে এভং তার হাতগুলিকে করে তোলে কুন্ঠিত এলোমেলো। কখনো কখনো আসে সুন্দর নিখুঁত ঘোড়ার টানা গাড়ি এবং তার তার েভেতর থেকে বের হয়ে আসেন ইরানের রাজনীতিবিদেরা। সিপাই রিজা এদের অনেককেই দেখে চিনতে পারেন; ইনি হচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, উনি হচ্ছে অর্থমন্ত্রী। ওঁরা যকন সেই দরোজা দিয়ে প্রবেশ করেন সবসময়ই দেখা যায় তাঁদের মুখে উত্তেজনা এবং আশংকার ছাপ; আর যখন ওঁরা দূতাবাস ত্যাগ করেন তখন ওঁদের মুখ খুবই উজ্জ্বল, যেনো ওঁদের উপর মস্তবড় একটা অনুগ্রহ বর্ষিতহয়েছে; কখনো কখনো দেখা যায় ওঁদের মুখ বিমর্ষ এবং হাশামগ্ন যেনো এইমাত্র তাঁদের উপর মৃত্যুদণ্ড উচ্চারিত হয়েছে। প্রসাদের ভেতরকার ঐ বহস্যময় লোকেরাই ঘোষণা করেছে এই দণ্ড। সিপাই রিজা বিস্মিত হয়ে ভাবেন – এই রকমটি হওয়াই কি অনিবার্য …’
মাঝে মাঝে এ রকম হয় যে, রিজা যে অফিস-ভবন পাহারা দিচ্ছেন সেখান থেকে ছুটে বের হয়ে আসে একজন ইরানী ক্লার্ক আর তাঁর হাতে একটি চিঠি গুঁজে দিয়ে বলেঃ জলদি এটি অমুকের নিকট পৌছিয়ে দে। কুত্তার বাচ্চা, দৌড় দে, নইলে রাষ্ট্রদূত চটে যাবেন।’ এ ধরনের সম্বোধনে অভ্যস্ত ছিলেন রিজা, কারণ বিশেষণের ব্যবহারে তাঁর নিজের অফিসারেরা কম পটু নয়। তবে সম্ভবত – তাই বা কেমন করে বলি-প্রায় নিশ্চিতভাবেই ‘কুত্তার বাচ্চা’ এই শব্দ কটি তাঁকে ছুরির মতো বিদ্ধ করতো অপমানে, কারণ তিনি জানতেন, তিনি কুত্তার বাচ্চা নন; তিনি একটি মহান জাতির সন্তান, যে জাতি রুস্তম, দারায়ুস, নওশেরয়া, কাযখসরু, শাহ আব্বাস, নাদির শাহর মতো নামগুলিকে আপন বলে জানে। কিন্তু এই প্রাসাদের ভেতরে যারা বাস করে তারা এর কী জানে? চল্লিশ বছরের একটি সিপাইয়ের বুকের বেতর দিয়ে অন্ধকার বোবা স্রোতের মতো যে শক্তিগুলি প্রবাহিত হচ্ছে এবং কখনো কখনো যার চাপে তাঁর বুকের পাঁজরের বাঁধন ছিড়ে যেতে চাইছে আর অক্ষমের হতাশায় তাঁকে বাধ্য করছে নিজের হাত নিজেই কামড়াতে, ওহো, আমি যদি কেবল.. .?
এবং প্রত্যেক ইরানীর হৃদয়ে কান্নার সংগে বাসকরে যে আত্ম –প্রতিষ্ঠার বাসনা –কখনো কখনো তা যন্ত্রণাদায়ক অপ্রত্যাশিত প্রচণ্ডতার সংগে জেগে উঠতো সিপাই রিাজার বুকের ভেতরে আর তার মনকে করে তুলছো স্বচ্ছ, যার ফরে, তিনি হঠাৎ দেখতে পেতেন একটি বিস্ময়কর, প্যাটার্ন, যা –কিছু তা৭র নযরে আসতো সমস্ত কিছুর মধ্যে. ..।
মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে। বলশেভিক বিপ্লবের পর রুশ সৈন্যরা পূর্বে ইরানের যে –উত্তরাঞ্চল দখল করেছিলো সেখান থেকে সরে পড়ে। কিন্তু তার পরে পরেই প্রভাবশালিী কুচুক খানের নেতৃত্বে এবং নিয়মিত রুশ স্থল ও নৌবাহিনীর সমর্থনে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী ইরানের গিলান প্রদেশে কমিউনিষ্টরা বিদ্রোহ করে বসে। সরকার ফৌজ প্রেরণ করে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে, কিন্তু ইরানী সিপাইদের ছিলো না তেমন শৃংখলাবোধ আর তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও ছিলো খুব কম, যার ফলে তারা বারবার হারতে থাকে। যে ব্যাটেলিয়ানে যোদ্ধ ছিলেন তখন সার্জেন্ট রিজা- পঞ্চাশের মতো তাঁর বয়স – সেই ব্যাটেলিয়নও একই ভাগ্যবরণ করে। কিন্তু একবার যখন দুর্ভাগ্যজনক হামলার পর তাঁর ইউনিটটি পলায়ন করতে উদ্যত, তখন রিজা নিজেজে স্থির রাখতে পারলেন না। তিনি তাঁর ভাঙা দল থেকে বার হয়ে এক পাশে দাঁড়িয়ে চীৎকার করে উঠলেন, যাতে প্রত্যেকেই শুনতে পাইঃ ‘কেন তোমরা পালাচ্ছে, ইরানীরা, শোনো ইরানীরা, কেন তোমরা পালাচ্ছে?’ তিনি তখন নিশ্চয়ই অনুভব করেচিলেন তাঁর চেতনার গভীরে –সুইডেনের দ্বাদশ চার্লসের মতো –যখন তিনি জখম হয়ে পড়েছিলেন পোলতাবা যুদ্ধক্ষেত্রে আর দেখছিলেন তাঁর সিপাইরা তাঁর পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে বধির, উদ্দেশ্যহীনভাবে এবং হতাশাব্যঞ্জক কন্ঠে তাদের ডেকে বলেছিলেন চীৎকার করে, ‘তোমরা কেন পালাচ্ছে সুইডিসরা? ওহে সুইডিসরা! কিন্তু তফাত এই যে, রাজা চার্লস আঘাতে আঘাতে জর্জরিত ছিলেন বলে রক্ত বের হচ্ছিলো তাঁর সারা গা তেকে। কিন্তু সিপাই রিজা ছিলেন অক্ষত আর তাঁর হাতে ছিলো গুরি ভর্তি একটি মাউজার পিস্তল আর তাঁর গলার স্বর ছিলো দৃঢ় এবং ভীতিজনক যখন তিনি সতর্ক করছিলেন তাঁর সংগীদেরকে, ‘যে-ই পালাবে, আমি তাকে গুগিল করে হত্যা করবো –সে যদি আমার ভাই হয়, তবুও।
ইরানী সিপাইদের কাছে এ ধরণের বিস্ফোরণ ছিলো নতুন জিনিস। তাদের দিশাহারা অবস্থা কেটে গিয়ে সৃষ্টি হলো বিস্ময়। তারা হয়ে উঠলো উৎসুক, জিজ্ঞাসুঃ কী রয়েছে এই লোকটির মনে? কয়েকজন অফিসার প্রতিবাদ করে এবং তাদের অবস্থা যে একেবারেই নৈরাশ্যজনক সে কখা বলে এবং ওদের একজন ব্যংগ করে ওঠেঃ ‘তাহলে ‘তুমিই’ আমাদের জন্য নিয়ে আসবে বিজয়!’ সেই মুহূর্তে রিজা হয়তো তার জীবনের আগেকার বছরগুলির সমস্ত হতাশা থেকে মুক্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং তাঁর সব নির্বাক আশা হয়তো উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলো সহসা। তিনি তাঁর সামনে দেখতে পেলেন এক যাদু –রজ্জুর প্রান্তদেশ, তিনি তা ধরলেন হাতের মুঠায়। ‘হ্যাঁ, দায়িত্ব নিলাম’– তিনি চীৎকার করে উঠলেন এবং সিপাইদের দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমরা কি আমাকে তোমাদের নেতা বলে মেনে নেবে?
কোনো জাতির মধ্যেই বীরপূজার মনোবৃত্তি অমন গভীরভাবে প্রোথিত নয় যেমন দেখা যায় ইরানীদের মধ্যে; আর এই মুহূর্তে এই লোকটিকে মনে হলো একজন বীর বলে! সিপাইগুলি তাদের আতংক আর পলায়নের কথা ভুলে যায় আর সহর্ষে গর্জন করে ওঠে, ‘তুমিই হবে আমাদের নেতা।’ ‘তা-ই হোক’, বলেন রিজা, ‘আমি নেতৃত্ব দেবো তোমাদের এবং যে কেউ পালাবার চেষ্টা করবে, আমি তাকে হত্যা করবো’। কিন্তু কেউ পালাবার কথা ভাবলো না। ভারী ন্যাপস্যাক ছুড়ে ফেলে দিয়ে ওরা ওদের রাইফেলে সংগীন ফিট করে। তারপর রিজার নেতৃত্বে গোটা ব্যাটেলিয়ানটি ঘুরে দাঁড়ায় এবং হঠাৎ আক্রমন করে একটি রুশ মোর্চা দখল করে আর সংগে অন্যান্য ইরনী ইউনিটগুলির সাহায্যে শত্রুকে পদদলিত করে, আর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ইরানীদের পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়ে যায় এই যুদ্ধে।
কয়েকদিন পর তেহরান থেকে প্রেরিত একটি টেলিগ্রাম দ্বারা রিজাকে উন্নীত করা হয় ক্যাপ্টেন পদে। এখন তিনি তাঁর নামের সংগে যুক্ত করতে পারলেন । ‘খান’ পদবীটি।
রশির মাথা ধরে তিনি লাফ মেরে চড়েছেন রশির উপর। হঠাৎ তার নাম হয়ে উঠেলো মশহুর। পর্যায়ক্রমে অতি দ্রুত তিনি উন্নীত হলেন মেজর পদে, মেজর থেকে কর্ণেল, কর্ণেল থেকে ব্রিগেডিয়ার। ১৯২১ সনে তিনি তরুণ সাংবাদিক জিয়াউদ্দীন এবং আরো তিনজন অফিসারকে ‘সংগে নিয়ে দখল করেন’ ক্ষমতা, দুর্নীতিপরায়ণ মন্ত্রীসভার সদস্যদের গ্রেপ্তার করেন এবং তার বিশ্বস্ত ব্রিগেডের সাহায্যে দুর্বল এবং তুচ্ছ তরুণ শাহ আহমদকে বাধ্য করলেন এটি নুতন মন্ত্রীসভা গঠন করতেঃ জিয়াউদ্দীন হলেন প্রধানমন্ত্র্রী এবং রিজা খান হলেন যুদ্ধমন্ত্রী। তিনি পড়তে জানতেন না, লিখতে জানতেন না, কিন্তু ক্ষমতা লাভের প্রচেষ্টায় তিনি ছিলেন অসুরের মতো এবং তিনি তাঁর সেনাবাহিনী ও লোকের কাছে হয়ে উঠলেন অকুণ্ঠ শ্রদ্ধ ও ভক্তির পাত্র, যারা বহু যুগ পরে এই প্রথম তাদের সামনে দেখতে পেলো একটি মানুষঃ একজন নেতা!
ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে দৃশ্য বদল হয় দ্রুত। জিয়াউদ্দীন অন্তর্হিত হলেন মঞ্চ থেকে এবং পুনরায় আবির্ভূত হলেন ইউরোপে, নির্বাসিতরূপে। রিজা খান রয়ে গেলেন প্রধান মন্ত্রী হিসাবে। সেই দিনগুলিতে গুজব রটেছিলো তেহরানেঃ রিজা খান, জিয়াউদ্দীন এবং শাহের ছোট ভাই, যুবরাজ –এই তিনজন মিলে ষড়যন্ত্র করছেন শাহকে সিংহাসন থেকে অপসারণ করার জন্য এবং কানা –ঘুষা চলছিলো – আজ পর্যন্ত কেউই তা জানে না তা সত্য কিনা- শেষমুহূর্তে এ ধরনের অনিশ্চিত এক প্রায়াসে তাঁর নিজের ভবিষ্যতে যাতে বিপন্ন হয়ে না পড়ে এজন্য রিজা কন তাঁর বন্ধদের কথা শাহর কাছে ফাঁস করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সত্য-মিথ্যা যা-ই হোক, প্রধানমন্ত্রী রিজা খান শিগগির কিছুদিন পরেই তরুণ শাহ আহমদকে প্রমোদ ভ্রমণের জন্য জাকজমকের সংগে ইরাক সীমান্ত পর্যন্ত যান শাহর সাথে সাথে, এবং শোনা যায়, তিনি নাকি শাহকে বলেছিলেন, ‘মহামান্য শাহ যদি কখনো ইরানে ফিরে আসেন, আপনি বলতে পারবেন রিজা খান এই দুনিয়ার কিছই বোঝে না।’
কারো সংগে ক্ষমতা ভাগাভাগি করার প্রয়োজন তার ছিলো না; নামে না হলেও কাজে তিনি হয়ে উঠরেন ইরানের প্রকচ্ছত্র প্রভু। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো তিনি লাফ মেরে পড়লেন কাজের উপর। গোটা ইরানের সংস্কার করতে হবে শির থেকে তল পর্যন্ত। এতোদিনকার শিথিল প্রশাসন ব্যবস্থা ছিলো এককেন্দ্রিক; সর্বোচ্চ নিলামদারের কাছে প্রদেশ –কে-প্রদেশ ইজারা দেওয়ার পুরানো প্রথা তিনি তুলে দিলেন; গভর্নরেরা ্পার প্রদশপাল রইলেন না, এখন থেকে তাঁরা হলেন কর্মচারী। ডিকটেটরের পোষ্য শিশু- সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠিত করা হলো পাশ্চাত্য প্যাটার্নে। পূর্বে যসব অবাধ্য উপজাতীয় সর্দার নিজেদের ছোটোখাটো রাজরাজড়া বলে গণ্য করতো এবং প্রায়ই তেহরান সরকারকে মানতে চাইতো না, তাদের বিরুাদ্ধে রিজা খান শুরু করলেন অভিযান; যে সব দস্যু –তুরস্ক যুগ যুগ ধরে গ্রামাঞ্চলে আতংক সৃষি।ট করে রেখেছিলো তাদেরকে তিনি দমন করলেন কঠোরভাবে; একজন আমেরিকান উপদেষ্টার সাহায্যে তিনি দেশের অর্থ- ব্যবস্থায় কিছুটা শৃংখলা ফিরিয়ে আনলেন; কর এবং শুল্ক আসতে লাগলো নিয়মিত। বিশৃংখলা দূর করে আনা হরো শৃংখলা।
মনে হয়, যেনো তুর্কীর মোস্তফা কামালের আন্দোলনের প্রতিধ্বনি তুলেই প্রজাতন্ত্রের ধারণা জেগে উঠলো ইরানে, প্রথমে একটা গুজব হিসাবে, তারপর জনগণের মধ্যকার অধিকতরো প্রগতিশীল লোকদের দাবি হিসাবে এবং শেষ পর্যায়ে , খোদ ডিকটেটরের জাহিরা লক্ষ্যরূপে। কিন্তু এখানে রিজা খান তাঁর বিচারে একটি ভুল করে বসেছিলেন বলে মনে হয়ঃ ইরানী জনতার মধ্য থেকে উঠলো প্রতিবিাদের বলিষ্ঠ চীৎকার।
প্রজাতন্ত্রী প্রবণতার বিরুদ্ধে জনগনের এই যে আপত্তি তার কারণ এ নয় যে, তারা শাসক রাজ পরিবারকে ভালবাসে, কারণ কাজার রাজবংশের প্রতি ইরানের কারোরই কোনো টান ছিলো না। এই পরিবারটি রক্তের দিক দিয়ে তুর্কোম্যান হওয়াতে সবসময়েই একে মনে করা হয়েছে বিদেশী; এর কারণ এও নয় যে, শাহ আহমদের গোলগাল, বাল-সুলভ মুখের জন্য ওদের কোনো আবেগাত্মক পূর্বানুরাগ ছিলো। এর কারণ সম্পূর্ণ ভিন্নঃ জনগণের নিজেদের ধর্ম হারাবার ভয়ই এর মূলে কাজ করেছে, যেমন তুর্কীরা তাদের ধর্মকে হারিয়েছে আতাতুর্কের বিপ্লবের পর। অজ্ঞতার কারণে ইরানীরা ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝতে পারেনি যে, প্রজান্ত্রী ধরনে রাষ্ট্র-ব্যবস্থার অনেক বেশি মিল রয়েছে ইসলামের জীবন পরিকল্পনার সংগে –রাজতন্ত্রী রাষ্ট্রব্যবস্থার চাইতে। তাদের ধর্মীয় নেতাদের রক্ষণশীলতা দ্বারা পরিচালিত হয়ে – এবং হয়তো সংগতভাবেই রিজা খান কর্তক কামাল আতাতুর্কের প্রকাশ্য প্রশংসায় আতংকিত হয়ে –ইরানীরা প্রস্তাবের মধ্যে তাঁর দেশে সবচেয়ে প্রভাবশালা শক্তি হিসাবে ইসলামের একটি বিপদই কেবল দেখতে পায়।
এক ভীষণ উত্তেজনায় পেয়ে বসে শহুরে লোকদের , বিশেষকরে যারা তেহরানে বাস করতো তাদের। এক উন্নত্ত জনতা লাঠি আর ঢিল –পাটকেলে সজ্জিত হয়ে রিজা খানের অফিস ভবনের সামনে জমায়েত হয় এবং ঠিক আগের দিন যিনি ছিলেন প্রায় দেবতুল্য তাঁকে অভিশাপ দেয় ও ভয় দেখাতে শুরু করে। রিজা খানের দেহরক্ষীরা জোর দিয়ে তাঁকে বোঝালো, তিনি যেনে এই উত্তেজনা থেমে যাওয়ার আগে বাইরে না বার হন। কিন্তু তাদের ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে একটিমাত্র আর্দালীকে সংগে নিয়ে এবং সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় তিনি অফিস প্রাংগণ ত্যাগ করেন একটি জানালা-ঢাকা ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়াগুলিকে খামিয়ে দেয়। ওদের মধ্যে কেউ কেউ গাড়ীর দরজা ভেংগে ফেলে আর চীৎকার করতে থাকেঃ ‘ওকে টেনে বের করে নিয়ে আসো – ওকে টেনে বের করো রাস্তায়!’ কিন্তু ইতিমধ্যে তিনি চাবুক নিয়ে তাঁর আশেপাশে যারা দাঁড়িয়েছিলো তাদের মাথায় এবং কাঁধে আঘাত করতে শুরু করলেনঃ কুত্তার বাচ্চারা, পালা, এখান থেকে পালা। কী হিম্মত তোদের! আমি হচ্ছি রিজা খান, তোরা তোদের মাগীদের কাছে ফিরে যা, ফিরে যা তোদের বিছানায়! এবং মাত্র কয়েক মিনিট আগে যে উন্নত্ত জনতা তাঁকে ভয় দেখাচ্ছিলো তারা পেছনে হটে যায়, একজন একজন করে সরে পড়ে এবং পামের অলি –গলিতে অদ্যৃ হয়ে যায়। একজন মহান নেতা আবার কথা বলেছেন তাঁর জাতির উদ্দেশ্যে; তিনি কথা বলেছেন ক্রোধের সংগে এবং তাতেই ওরা নত হয়ে পড়েছে। হতে পারে রিজা খান তাঁর জাতিকে যে ভালোবাসতেন সেই ভালোবাসা ভেদ করে সেই মুহূর্তে জন্ম নিয়েছিলো একটা ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের অনুভূতি, এবং তাই হয়তো দেশবাসীর প্রতি তাঁর প্রেমকে চিরদিনের জন্য আচ্ছন্ন হয়ে রেখেছিলো।
কিন্তু রিজা খানের গৌরবজনক সাফল্য সত্ত্বেও প্রজাতন্ত্র আর বাস্তবে রূপ নিলো না। এই পরিকল্পনার সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় এই –ই স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, জনগণের প্রতিরোধের মুকাবিলায় কেবলমাত্র সামরিক শক্তির পক্ষে একটি ‘সংস্কার আন্দোলন’ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। ব্যাপার এ নয় যে, ইরানীরা সংস্কার মাত্রেরই বিরোধী। কিন্তু তাদের এই সহজাত উপরব্দি ঘটেছিলো যে, আমদানি করা পাশ্চাত্য রাজনৈতিক মতবাদের পরিণতিই হবে- নিজেদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়পটভূমিকায় কোনো সময়ে একটি সুস্থ বিকাশ লাভের সকল আশার শেষ।
তখনো কিংবা খনো রিজা খনা তা বুঝতে পারেননি, যার ফলে তিনি তাঁর দেশের মানুষের সংগে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলেন। তাঁর প্রতি ওদের ভালোবাসা উবে যায় এবং ধীরে ধীরে তার স্থান দখল করে ভয়ংকর এক ঘৃণা ও বিদ্বেষ। ওরা জিজ্ঞাস করতে শুরু করলো নিাজেদেরঃ বীর প্রবর তাঁর জাতির জন্য আসলে কী করতে পেরেছেন? ওরা রিজা খানের সাফল্যগুলি গুণে দেখরো এক এক করেঃ সৈন্যবাহিনী পুনর্গঠন – কিন্তু তার জন্য দিতে হয়েছে ভয়ংকর মূল্যঃ যার জন্য পিঠ ভেংগে দেওয়া ট্যাক্সের বোঝা চাপানো হয়েছে এমনিতে জীবন্মৃত জাতির উপরে। উপজাতীয় বিদ্রোহগুলি দমন? কিন্তু তার সংগে দমন করা হয়েছে দেশপ্রেমিক অংশটিকেওঃ তেহরানে লোক দেখানোর মতো নির্মাণ তৎপরতা চলছে; কিন্তু পল্লী অঞ্চলে কৃষক সমাজের দুঃখ-দরিদ্র্য কেবল বেড়েই চলেছে। লোদের স্মরণে আসলে লাগলো মাত্র কয়েক বছর আগেই রিজা খান ছিলেন একজন দরিদ্র সিপাই, কিন্তু এখন তিনি ইরানের সবচেয়ে ধনী মানুষ এবং নিজের নোমেই যে কতো একর জমি রয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। এই গুলিই কি সংস্কার যা নিয়ে ঢাকঢোল পেটানো হয়েছিলো? ডিকটেটরে প্রভাবে তেহরানে যে অল্প কটি ঝকঝকে অফিস ভবন গড়ে উঠেছে এবং এখানে –ওখানে যে কটি বিলাস-বহুর হোটেল নির্মিত হয়েছে সেগুলি কি জনসাধারনের ভাগ্যোন্নয়নের কোন প্রমাণ বহন করে?
তাঁর জীবনের ঠিক এই পর্যায়ে আমি রিজা খানের পরিচয় জানতে পাই। তারঁ-ব্যক্তিগত উচ্চভিলাস এবং তাঁর বিরুদ্ধে স্বার্থপরতার যে অভিযোগ আনা হয়ে থাকে, এ সম্পর্খে গুজব যাই রটুক না কেন, যে মুহূর্তে তিনি ‘যুদ্ধ ওজারত’-এ তাঁর অফিসে আমাকে স্বাগত জানালেন, এই লোকটির মহত্ত্ব আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গেলো না। হয়তো এই অফিসটি ছিলো সবচেয়ে সাদাসিধা অফিস, যা কোথাও কখনো ব্যবাহর করেছেন একজন প্রধানমন্ত্রীঃ একটা ভেক্স, কালো অয়েলক্লতে মোড়া একটি সোফা, একজোড়া চেয়ার, ছোট্ট একটি বুক –শেলফ এবং মেঝেতে বিছানো উজ্জ্বল অথচ কম দামের একটি গালিচা ছাড়া আর কিছু না সেই কামরাটিতে। এবং পঞ্চাশ ও ষাটের মাঝামাঝি বয়সে, দীর্ঘদেহী ভারী গড়নের যে মানুষটি ডেক্সের পেছন থেকে ধীরে ধীরে দাঁড়ালেন, তাঁর পরনে ছিলো সাদামাটা একটি খাকি উর্দী, যাতে ছিলোনা পদ-মর্যাদাসূচক কোনো পদক রিবন অথবা ব্যাজ।
আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন জার্মান রাষ্ট্রদূত কাউন্ট ফন ডার শুলেনবার্গ (কারণ আমি নিজে অস্ট্রীয় এবং একটা মশহুর জার্মান সংবাদপত্রের প্রতিনিধি)। সেই প্রথম আনুষ্ঠানিক কথাবার্তার মধ্যেও আমি রিজা খানের প্রকৃতির গুরুগম্ভীর গতিময়তা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি। ধূসর খোঁচা –খোঁচা ঘন ভ্রূর তল থেকে এক জোড়া তীক্ষ্ণ বাদামী রঙের চোখ তাকাচ্ছিলো আমার দিকে –খাস পারসিকের চোখ, যা সাধারণত ঢাকা থাকে চোখের পুর পাতার নীচেঃ বিষণ্ণতা ও দৃঢ়তার অদ্ভুদ এক মিশ্রণ! তাঁর নাক এবং মুখের আশপাশে গাঢ় রেখাগুলিতে তিক্ততার অভিব্যক্তি, কিন্তু মোটা হাড্ডির উপর তাঁর মুখাবয়ব থেকে ফুটে উঠছিলো এক অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি যার ফলে তাঁর ঠোঁটের উপর ঠোঁট বসেছে চেপে এবং চোয়াল পড়েছে কঠিন চাপ। আপনি যখন মন দিয়ে শুনছেন তাঁর নীচু গলায় সুন্দর লেহানে কথাবার্তা, যা এমন একজন মানুষের কণ্ঠস্বর যিনি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এবং কথাকে শব্দ হয়ে উঠতে দেয়ার আগেই প্রত্যেকটি কথাকে তাঁর জিবের উপর ওজন করে দেখতে অভ্যস্ত –আপনার মনে হবে, আপনি এমন একলোকের সংগে কথা বলছেন যাঁর পেছনে রয়েছে ত্রিশ বছর স্টাফ অফিসার ও পদস্থ সামরিক কর্মকর্তার জীবনঃ এবং আপনার বিশ্বাস করা কঠিন হবে যে, মাত্র ছয় বছর আগে রিজা খান ছিলেন একজন সার্জেন্ট এবং মাত্র তিন বছর আগে তিনি লিখেতে ও পড়তে শিখেছেন!
তা৭র প্রতি আসার ঔৎসুক্য এবং হয়তো তাঁর জাতির প্রতি আমার অনুরাগ ও তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। কারণ তিনি প্রায় পীড়াপীড়ি করেই বললেন এই সাক্ষাৎ যেনো শেষ না হয় এবং আামাকে আর শুলেনবার্গকেও অনুরোধ করলেন – আমরা যেনো পরের হপ্তায় তেহরান তেকে কয়েক মাইল দূরে মানোরম মনোরম উদ্যান শেমরানে তাঁর গ্রীষ্মনিবাসে তাঁর সংগে চা খাই।
শুলেনবার্গের সংগে আমি ঠিক করলাম আমি প্রথম তাঁর কাছেই আসবো (বেশির –ভাগ বিদেশী দূতের মতোই তিনিও গ্রীষ্মকালটি কাটাচ্ছিলেন শেমরানে) এবং আমরা দুজন একত্রে যাবো প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে। কিন্তু কার্যত আমি পৌছুতে পারলাম না ঠিক সময়ে। কয়েকদিন আগে আমি শিকারের জন্য কিনেছি দুটি তাজী ঘোড়াসহ চার চাক্কার একটি ছোট্ট গাড়ি। ঘোড়াগুরি যে কী রকম তেজী ছিলো তা সম্পূর্ণ ধরা পড়লো তেহরানের বাইরে কয়েক মাইল দূরে, যখন কোনো একটা বদ প্রবৃত্তি বশে ওরা এমন একরোখা বেঁকেবসরো যে, কিছুতেই সামনে আগাবেনা, বরং ঘরে ফিরে যাবার জন্য ওরা জেদ করতে লাগলো। প্রায় কুড়ি মিনিট আমি ওদে সাথে সংগ্রাম করি। আখেরে আমি ইবরাহিমকে ঘোড়া এবং গাড়ি ঘরে ফিরে নিয়ে যেতে বলে পয়দল রওয়ান হই, অন্য কোনা যানবাহন পাওয়অ যায় কিনা তারই খোঁজে। দুমাইর পায়ে হাঁটার পর আমি এসে পৌছুই একটি গ্রামে; সেখানে ভাগ্রক্রমে পেয়ে গেলাম একট ‘দ্রসকী’, নিচু চার চাক্কাওয়ালা খোলা ঘোড়ার গাড়ি। কিন্তু যখন আমি জার্মান দূতবাসে পৌছলাম তখন নির্দিষ্ট সময় থেকে আমার প্রায় দেড় ঘন্টা দেরী হয়ে গেছে। আমি দেখতে পেরাম শলেনবার্গ ক্রদ্ধ বাঘের মতো পায়চারী করছেন এদিক-ওদিক; তাঁর চেহারায় স্বাভাবিক নম্রতা একদম নেই; তাঁর প্রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত এবং তাঁর শৃঙ্খলাবোধের বিচারে সময় রক্ষা না করার অপরাধ অধার্মিকতার চাইতে কম ছিলো না। আমাকে দেকেই তিনি ক্রোধে ফেটে পড়েলেনঃ ‘তুমি এ পারো না, একজন প্রধানমন্ত্রীর সংগে তুমি এ করতে পারো না! ‘তুমি ভুলে গেছো যে, রিজা খান একজন ডিকটেটর এবং আর সকল ডিকটেটরের মতোই অতি মাত্রায় স্পর্শকাতর?’
-‘কাউন্ট শুলেনবার্গ, আমার ঘোড়গুলি এ সূক্ষ্ণ পয়েন্টটি দেখতে পায়নি বলে মনে হয়’। -এছাড়া আমি কোনো জবাব খুঁজে পেলাম না, ‘চীনের সম্রাট হলেও আমার পক্ষে এর আগে পৌছুনা সম্ভব হতো না।’
এতো কাউন্টের রসবোধা আবার ফিরে আসে এবং তিনি বিপুল হাস্যে ফেটে পড়লেনঃ
-‘আল্লাহর কসম! এ রকম ব্যাপার আমার জীবনে ককনো ঘটেনি। তাহলে চলো যাই –পদাতিক সাম্ত্রী আমাদের মুখের উপর দরোজা বন্ধ না করে দিলেই হয় .. .।
সে তা করেনি। আমরা রিজা খানের প্রসাদে পৌছুনোর অনেক আগেই চায়ের মজলিস শেষ হয়ে গেছে এবং বাকি সব মেহমান বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু আমি যে প্রটোকল ভংগ করেছি, এজন্য রিজা খানকে মোটেই আহত হলো না। আমাদের দেরীর করণ শুনে তিনি উচ্চৈঃস্বরে বললেনঃ
-‘চমৎকার,আসি তোমার এই ঘোড়াগুলিকে দেখতে চাই। আমি মনে করি, নিশ্চয় এগুলি বিরোধী দলের। আমি জানি না এদের পুলিশ হেফাজতে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে কি না!
আমার এ অসময়ে আগমন, ইরানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী এবং একজন তরুণ সাংবাদিকের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতা বহির্ভূত একটি সহজ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথে বাধা না হয়ে সহায়কই হয়েছিলো। এর ফলে, পরবর্তীকালে আমি এমন স্বাধীনভাবে দেশের সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে পেরেছি যা বেশির ভঅগ বিদেশীকেই করতে দেয়া হয় না।
কিন্তু আলী আগার চিঠিতে সেই প্রথমদিকের দিনগুলির রিজা খান সম্পর্কে কোনো উল্লেখ নেই, যিনি এমনিতরো সরলভাবে জীবন কাটাতেন যা প্রদর্শনী –প্রিয় ইরানীদের কাছে প্রায় অবিশ্বাস্যঃ এ চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে রিজা শাহ পাহলভীর , যিনি ১৯২৫ সানে আরোহণ করেন ময়ূর সিংহাসনে। এতে উল্লে খ রয়েছে রাজার কখা যিনি বিনয় নম্রতার সমস্ত ভানই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন এবং এখ চাইছেন কামাল আতাতুর্কের অনুকরণে তাঁর প্রাচীন প্রাচ্য দেশে একটি সাড়ম্বর অহংকারী প্রতীচ্য মুখাবয়ব গড়ে তুলতে .. .
আমি এখন চিঠির শেষ কথা গুলিতে আসছিঃ
-‘প্রিয় দোস্ত, আপনি যদিও এখন পবিত্র মদীনাতুন্নবীতে আছেন, তবু আমি বিশ্বাস করি, আপনি আপনার এই নালায়েক দোস্ত এবং তার দেশকে ভোলেননি এবং কখনো ভুলবেন না।’
হে আলী আগা, আমার তরুণ বয়সের দিনগুলি দোস্ত – ‘আমার হৃদয়ের আলো ’এই বাকভংগীতেই আপনি নিজে হয়তো বলতেন, আপনার চিঠি আপনার চিঠি আমাকে স্মৃতিতে মাতাল করেছে; কারণ আমি পারস্যমতাল হয়ে পড়েছিলাম যখন আমি আপনার দেশকে জানতে শুরু করি, সেই পুরানো নিস্প্রভ রত্ন, যা স্থাপিত হয়েছে পুরাকালের স্বর্ণ, চিড় খাওয়া মর্মর ধূলাবালি এবং ছায়ায়, আপনার বিষণ্ণ দেশের সকল দিন রাত্রির, আপনার কওমের গাঢ় কালো স্বপ্নিল চোখের ছায়াপটে.. .
কুর্দীস্তানে পাহাড়গুলি পেছনে ফেলে যাওয়ার পর আমি যে প্রথম ইরানী শহরটি দেখতে পাই সেই কিরমানশহর কথা আমার মনে পড়ছে। এক অদ্ভুদ নিস্প্রভ অস্বচ্ছ আবহাওয়া ঘিরে আছে শহরটিকে, যেনো ঢাকা দেওয়া , অবনমিত –জীর্ণ, ছন্নছাড়া একথা না-ই বললাম। এতে সন্দেহ নেই- প্রতীচ্যের প্রত্যেকটি শহরেই দারিদ্র দৃশ্যমান সমতলের নিকটেই থাকে। ইউরোপের যে-কোন শহর থেকে দারিদ্র এখানে অনেক বেশি চোখে পড়ে। কিন্তু এর সাথে ইতিমধ্যেই আমি ছিলাম অভ্যস্ত। অর্থনীতির অর্থে এ ঠিক দারিদ্র নয়, যা এতা প্রবলভঅবে প্রকাশ পেয়েছে আমার নিকট; কারণ বলা হয় কিরমানশঅহ একটি সমৃদ্ধিশালী শহর। বরং এ হচ্ছে এমন এক ধরণের হতাশঅ যা প্রত্যক্ষভাবে আচ্ছন্ন করেছিলো ওদের, যার সংগে অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো যোগ ছিলো বলে মনে হয় না।
এখানকার সবলোকেরই চোখ বিশার এবং কালো। নাকের সন্ধিস্থলের উপর এসে মিলে যাওয়া পুরু কালো ভ্রুর নিচে ভারী চোখের পাতায় পর্দার মতো ঢাকা এই চোখ।ওদের বেশিরভাগই দেখতে চিকন –চাকন (আমি ইরানে কোনো মোটা লোক দেখেছি বলে মনে পড়ে না)। ওরা কখনো শ্বদ করে হাসে না এবং ওদের নীরব স্মিত হাস্যে এমন একটা অস্পষ্ট ব্যংগাত্মক ভাব রয়েছে যা প্রকাশ করে যতোটুকু গোপন করে তার চাইতে অনেক বেশি। মুখাবয়বে কোনো গতিময়তা নেই, নেই আকার ইংগিতে কথা বলার প্রয়াস; কেবলি নিশ্চুপ পরিমিতি গতি ও অংগভংগী- মনে হয় ওরা সবাই যেন মুখোশ পরে আছে।
প্রচ্যের সকল নগরীর মতোই এখানকার শহুরে জীবনের কেন্দ্র হচ্ছে বাজার। একজন অপরিচিত লোকের কাছে বাজারটি ভেসে ওঠে বাদামী, সোনালী-বাদমী এবং গারিচা-লাল কোমলীকৃত মিশ্রণরূপে –যেখানে রয়েছে ইস্তস্তত ঝকঝকে তামার থালা ও গামলা এবং হয়তো বা কাফেলার সরাইখানা দরোজার উপরে চিত্রিত হালকা- -নীল চীনামাটির বাসনের রং, যাতে চিত্রিত রয়েছে কালো চক্ষু যোদ্ধা ও ডানওয়ালা আজদাহার ছবি। আপনি যদি আরো একটু মনোযোগ দিয়ে তাকান, বাজারে আবিষ্কার করবেন দুনিয়ার সকল রং-কিন্তু এ বিচিত্র রংগুলির কোনোটিই সব কিছুকে টেনে নিচ্ছে এক সাথে। ছাদের ধনুকের মতো বাঁকানো তোরণগুরি ছেদা করা হয়েছে নির্দিষ্ট ব্যবধানে যাতে করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফাঁক দিয়ে ভেতরে আসতে পারে দিনের আলো। এসব ছিদ্রের মধ্য দিয়ে জমাট পদার্থ হয়ে ওঠে এবং অস্বচ্ছ তীর্যক আলোক-স্তম্ভের মতো দেখায়ে; মানুষ যে ওসবের ভেতর দিয়ে চলচে তা মনে হয় না, বরং এইগুলি –এই উজ্জ্বল স্তম্ভগুরিই যেনো এইসব ছায়া মানুষের ভেতর দিয়ে আগিয়ে যাচ্ছে .. .
কারণ, এই বাজারের লোকগুলি ভদ্র এবং ছায়ার মত নীরব। যদি কোনো ব্যবসায়ী কোনো পথচারীকে নিচু গলায় ডাকে, কেউই তার জিনিসপত্রের গুণকীর্তনের জন্য চীৎকার করে না বা গান গায় না, যা করা হয়ে থাকে আরবে বাজারগুলিতে। এখানে জীবনের পায়চারী নিঃশব্দ, মোলায়েম। মানুষ এখানে অন্যকে কনুই মেরে বা ধাক্কা দিয়ে আগায় না। ওরা খুবই বিনীত এবং এমনি সে বিনয়, যা মনে হবে নম্রতায় নুয়ে আছে আপনার দিকে; কিন্তু আসলে তা আপনাকে রাখে এক হাত দূরে। পষ্টতই ওরা লোক হিসাবে খুব চালাক এবং অপরিচিত লোকের সাথে কথা বলতে ওদের কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু কথা বলে কেবল ওদের ঠোঁট। ওদের অন্তর পশ্চাৎভুমিতে অন্যত্র কোথঅও দাঁড়িয়ে থাকে – দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ৈ অপেক্ষা করে, ওজন করে নিরসক্তভাবে.. .
চায়ের দোকানে বসে আছে মজুর শ্রেণীর কিছু লোক, খড়ের মাদুরের উপর –হয়তো ওরা হস্তশিল্পী দিনমজুর, কাফেলার উট বা ঘোড়া –গাঁধার চালক –সবাই এক সংগে ঘেষাঘেষি করে বসে আছে জ্বলন্ত কয়লা ভর্তি লোহার কাড়াইয়ের চারপাশে। লম্বা লম্বা দুটি পাইপ, আর তার সঙ্গে চীনামাটির কলকে পরিবেশন করাহচ্ছে তাদের নিকট; আফিমের মিষ্টি মিষ্টি গন্ধে ঘরের বাতাস আছে। তারা কোনো শব্দ উচ্চারন না করে পা্প টেনে চলে প্রত্যেক একবার লম্বা টান দিয়ে পাইপটি তুলে দিচ্ছে তার পাশের লোকটির হাতে; আর সেই সময়েই এমন একটি জিনিস দেখতে পেলাম যা আগে আর কখনো দেখিনি। অনেক, অনেক লোক আফিঙ খাচ্ছে, কেউ কেউ বেশ প্রাকশ্যে আর কেউ কেউ কিছুটা কম প্রকাশ্যে; দোকানী বসে থাকে তার গর্তের মতো দোকানটিতে;সরাইখানা তোরণওয়ালা প্রবেশদ্বারের নিচে বসে থাকে ভবগুরে নিষ্কর্মা কোনো লোক; তাম্রকার মুহূর্তের অবকাশ যাপন করছে তার কারখানা। ওরা সকলেই এখন পাইপ টানছে। একই রকম উদাস, কিছুটা ক্লান্ত মুখে, সীমাহীন, অবলম্বনহীন শূন্যতার দিকে নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে..
পুরু ঝুড়িসমেত টাটকা সবুজ পোস্তদান বাজারের সব জায়গায় বিক্রি করছে বিত্রেতারা এবং বাহ্যত একইভাবে তা খাচ্ছে লোকেরা। এ হচ্ছে আফিম খওয়ার আরেকটি মৃদু রূপ। এমন কিন, দরোজায়-দরোজায় কোণায়-কোণায় দাঁড়িয়ে বসে ছেলেরা পর্যন্ত কাচ্ছে পোস্তাদানা। দুই বা তিনজনের মধ্যে ওরা নিজেরা ভাগ করে নিচ্ছে মজার বস্তুটি, পরস্পরের প্রতি সেই বয়স্ক মানুষের সহনশীলতা নিয়ে, শিশুসুলভ স্বার্থপরতা না দেখিয়ে –শিশুসুলভ আনন্দ বা উৎফুল্লতাও প্রদর্শন না করে। কিন্তু েএর চাইতে ভিন্নই বা ওরা কিভাবে হতে পারতো? ওদের জীবনের একেবারে শুরুতেযখন ওরা কাঁদতো এবং ওদের মা-বাপকে বিরক্ত করতো তখন ওদের খাওয়ানো হতো পোস্তাদানা থেকে তৈরি এক কড়া পানীয়। ওরা যখন বড় হয় এবং রাস্তায় ছোটাছুটি করতে শুরু করে তার আগেই ওদের মধ্যে প্রশান্তি, দুর্বলতা ও দয়ামায়ার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এবং তখনই আমি বুঝতে পারলাম কী সেই জিনিস যা আমাকে এতো বিচলিত করেছিলো প্রবলভাবে, যখন আমি প্রথম দেখেছিলাম ইরানীদের ক্লান্ত বিসণ্ণ চোখ। ওদের মধ্যে একটি করুণ নিয়তির লক্ষণ আমি টের পেলাম , মজলুম মানুসের মুখে যেমন লেগে থাকে দুঃখের করুণ হাসি তেমনি; একইভাবে ওদের সংগে জড়িত রয়েছে আফিম; এ ওদের নম্রতার সংগে, ওদের অন্তরের ক্লান্তির সংগে জড়িত; এমনকি ওদের বৃহৎ দারিদ্র ও মহৎ মিতব্যয়িতার সংগেও এর সম্পর্ক রয়েছে। সম্ভবত, ততো বেশি পাপ বলে তা মনে হলো না –যতোটা তা একটা অভিব্যক্তি এবং হয়তো সাহায্যও! সাহায্য কিসের বিরুদ্ধে? প্রশ্নের বিস্ময়কর এক জগত।
আমি প্রতম যে ইরানী নগরীর সংগে পরিচিত হই সেই কিরমান –শহর স্মৃতি ও ছবির মধ্যে আমার মন বিচরণ করলো এতোক্ষণ। কারণ সে ছবিগুলি নানারূপ কিন্তু সব সময়েই মূলত অপরিবর্তিত অবস্থায় আমার সামনে ছিলো। আমি ইরানে যে দেড়টি বছর কাটাই তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি মেলায়েম সর্বব্যাপী বিষণ্ণতা ছিলো সর্বত্রই এর বৈশিষ্ট্য। গ্রামে শহরে, মানুসের রোজকার কাজে তাদের বিভিন্ন ধর্মী বিশ্বাসের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় দুঃখ-শোকের একটি গাঢ় রংঃ ১৩০০ বছর আগে যেসব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিলো তার জন্য রোদন, নীরব জামাতা আলী এবং আলীর দুই পুত্র হাসন এবং হোসেনের মৃত্যুর জন্য মাতম ওদের কাছে ইসলামের লক্ষ্য কি এবং মানুষের জীবনকে ইসলাম কোন পতে পরিচালিত করতে চায় তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে.. .
বহু সন্ধ্যায় বহু শহরে আমি দেখেছি, নারী এবং পুরুশের বিভিন্ন দল কোনো রাস্তায় জমায়েত হয়েছে এক মুসাফির দরবেশের চারপাশে, যিনি একজন ধর্মীয় সাধু পুরুষ, তাঁর পরণে সাদা পোষাক, পিঠের উপর চিতাবাঘের ছাল, ডান হাতে লম্বা হাতলওয়ালা কুড়াল এবং বাঁ হাতে নারকেলের মালার ভিক্ষা-পাত্র।তিনি আবৃত্তি করে চলেছেন অর্ধেক গানের মাধ্যমে, অর্ধেক কথায় সপ্তম শতকে রসূলুল্লাহর ইন্তেকালের পর খিলাফতনিয়ে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো তারই উপর একটি গাঁথা-ঈমান, রক্ত এবং মৃত্যুর এক শোকাবহ কাহিনী এবং সবসময়েই এর রূপ অনেকটা এই রকমঃ
শোনে লোকসকল, আল্লাহ যাদের মনোনীত করেছিলেন তাঁদের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো এবং নবী বংশের রক্ত কিভাবে পৃথিবীর উপর বইয়ে দেওয়া হয়েছিলো সে কাহিনী শোনোঃ
এক সময় নবী ছিলেন যাঁকে আল্লাহ তুলনা করেছিলেন জ্ঞানের নগরীরূপে এবং সেই জ্ঞানের নগরীর প্রবেশদ্বার ছিলেন তাঁর অনুসারীদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত সর্বশ্রেষ্ঠ বীর, তাঁর জামাতা আলী-পৃথিবীর জ্যোতি, নবীর পয়গামে অংশীদার, যাঁকে বলা হতো ‘আল্লাহর সিংহ’।
যখন নবীজি ইন্তেকাল করলেন তখন আল্লাহর সিংহ ছিলেন তাঁর সত্যিকার উত্তরাধিকারী, কিন্তু দুষ্টু লোকেরা সেই সিংহের আল্লাহ –নির্দেশিত অধিকার হরণ করে এবং অন্য একজনকে বানায় নবীর খলীফাঃ এবং প্রথম বিনা- অধিকারে জবর দখলকারের মুত্যুর পর তারই মতো দুষ্ট প্রকৃতির আরকজন তার উত্তরাধিকারী হয় এবং পরে আরো একজন।
এবং কেবল এই তৃতীয় তসরুফকারীর ধ্বংসের পর আল্লাহর ইচ্ছা ব্যক্ত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর সিংহ তাঁর এই ন্যায্য স্থানে উপনীত হন আমীরুল ম’মিনীন হিসাবে।
কিন্তু আলী এবং আল্লাহর শত্রুরা ছিলো সংখ্যায় অনেক এবং একদিন যখন তিনি সালাতে সিজদায় গিয়েছেন প্রভুর সম্মুখেতখন এক ঘাতকের তরবারীর আঘাতে তিনি নিহত হন। এই ভয়াবহ পাপ-কর্মে পৃথিবী কেঁপে ওঠে বেদনায়, পাহাড় পর্বত ক্রন্দন করে এবং অশ্রু বিসর্জন করে শিলারশিঃ
হে আল্লাহ, তোমার লানত বর্ষিত হোক অন্যায়চারীদের উপর এবং চিরস্থায়ী আজাব ওদের গ্রাস করুক।
আবার এক পাষণ্ড জালিম দেখা দিলো এবং আল্লাহর সিংগের পুত্র হাসান এবং হোসেন ,হযরত ফাতেমার দুই পুত্রকে সে বঞ্চিত করলো নবীর সিংহাসনে তাঁদের ন্যায্য উত্তরাধিকার থেকে। হাসানকে ষড়যন্ত্র করে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হরো এবং হোসাইন যখন ধর্ম রক্ষার্থে দাঁড়ালেন, তাঁর পরম সুন্দর জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হলো কারবালার প্রান্তরে যখন তিনি যুদ্ধের পর তৃষ্ণা মেটাবার জন্য হাঁটু গেঁড়ে বসেছিলেন একটি জলাশয়ের কাছে। ওহো, আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক পাষণ্ডদের উপর আর ফেরেশতাদের অশ্রু একসময় চুম্বন করেছিলেন রসূলুল্লাহ –নির্দয়ভাবে কেটে ফেলা হলো এবং তাঁর মস্তকহীন লাশ নিয়ে আসা হলো তাঁর রোরুদ্যমান সন্তানদের নিকট, যাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন তাঁদের পিতার প্রত্যাবর্তনের।
এবং যখন থেকে বিশ্বাসীরা আল্লাহর লানত কামনা করে আসছেন জালিমদের উপর এবং আলী, হাসান এবং হোসাইনের মৃত্যুর জন্য মাতম করে চলেছেন। আর হে বিশ্বাসীরা, তাঁদের মৃত্যুর জন্য তোমরা উচ্চৈঃস্বরে আহাজারী করো, কারণ যারা নবীর বংশধরদের জন্য কাঁদে আল্লাহ তাদের গুনাহ মাফ করে দেন.. .
আর এভাবে গাওয়া গাঁথা যে-সব রমণী শনছে তাদের মধ্যে সৃষ্টি করে আকুল কান্না, আর শুশ্রুমন্ডিত মানুষের মুখের উপর দিদয়ে নীরবে গড়াতে থাকে অশ্রুধারা.. .
আসলে, ইসলামী বিশ্বের যে-ক্ষত কখনো শুকায়নি সে ক্ষত সেই প্রথমদিকে যেসব ঘটনা সৃষ্টি করেছিলো সে –সবের সত্যিকার ঐতিহাসিক চিত্রের সাথে এই বাড়াবাড়ি শোকের মোটেই সম্পর্ক নেই। সে ক্ষতটি কী? মুসলিম সম্পদায় দুভা’গে বিভক্ত –সুন্নী এবং শিয়া দুই মাজহাবে –সুন্নীরা , যাদের নিয়ে মুসলি জাতিগুলির বেশিরভা্গই গঠিত, যারা খলীফার পদের জন্য নির্বাচনের নীতিতে সুদৃঢ়; শিয়ারা, যারা দাবি করে রসূলূল্লাহ তার তাঁর জামাতা হযরত আলীকে তাঁর ন্যায় সঙ্গত উত্তরাধিকারী এবং খলীফা মনোনীত করেছিলেন। আসলে কিন্তু রসূলূল্লাহ তাঁর কোনো খলীফা মনোনীত না করেই ইন্তেকাল করেন, যে কারণে মুসলিম উম্মাহর বিপুল সংখ্যাগুরু কর্তৃক তাঁর সবচেয়ে বয়স্ক এবং বিশ্বস্ত সহচর হযরত আবু বকর ‘খলিফা’ নির্বাচিত হন।আবু বকরের পর খলীফা হন উমর এবং উমরে পর উসমান। উসমানের মৃত্যুর পরই কেবল আলী খলীফা নির্বাচিত হন। আলীর পূর্ববর্তী তিন খলীফা সম্পর্কে মন্দ কিম্বা খারাপ কিছু আমি আমার ইরানের সেই দিনগুলিতে ও খুঁজে পাইন। ওরা রসূলূল্লাহ পরে ইসলামের মহত্তম মানুষ ছিলেন সন্দেহাতীতভাবেই এবং বহু বছর ধরে ওঁরা ছিলেন তাঁর ঘনিষ্টতম সহচর। ইসলাম মানুষকে যে অধিকার দিয়েছে স্বাধীনভাবে সে অধিকার প্রযেগ করেই মুসলিম উম্মাহ নির্বাচন করেছিলেন তাঁদের । তাঁরা জবর দখলকার ছিলেন না। এই তিনি খলীফা কর্তৃক ক্ষমতা লাভ নয়, বরং জনগণের এ সব নির্বাচনের ফল আলী এবং তাঁর অনুসারীরা সর্বান্তকরণে গ্রহণ করতে রাজী না হওয়ার ফলেই শুরু হয় পরবর্তী ক্ষমতার লড়াই, আলী নিহত হন এবং পঞ্চম খলীফা মাবিয়ার নেতৃত্বে মূল প্রজাতন্ত্রী ধরনের ইসলামী রাষ্ট্রের রূপান্তর ঘটলো বংশগত রাজতন্ত্রে –চূড়ান্ত নেতৃত্বে মূল পরিণতি ঘটলো কারবালা ময়দানে হোসাইনের শাহাদাতে।
হ্যাঁ, এসবই আমি জানতাম ইরানে আসার আগেই, কিন্তু আলী, হাসান এবং হোসাইনের নাম উচ্চারণের সংগে সংগেই ইরানীদের মধ্যে ১৩০০ বছর আগেই সেই পুরানা মর্মন্তুদ কাহিনী আজো যে অপরিসীম ভাবাবেগ সৃষ্টি করে তাতে আমি বিস্মিত হই। বিস্ময়ের সংগে আমি নিজেকে জিজ্ঞাস করথে থাকিঃ ওরা যে শিয়া মতবাদকে এভাবে আপন মনে করে আলিংগন করছে তার কারণ কি ইরানীদের স্বভাবজাত বিষাদ এবং ওদের নাটকীয়তাবোধ? না কি শিয়া মতবাদের উদ্ভবে যে ট্রাজিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে তাই ইরানীদের এই গভীর বিষাদের জন্ম দিয়েছে?
ক্রমে দীর্ঘ কয়েকটি মাস ধরে আমার মনে এর একটি চমকপ্রদ জবা ষ্পষ্ট আকারে নেয়।
স্প তম শতকের মাঝামাঝি উমরের সৈন্যবাহিনী যখন প্রাচীন সাসানীয় সাম্রাজ্য দখল করে ইসলামী জীবনাদর্শকে সংগে নিয়ে, তার অনেক পূর্বেই ইরানের জরতুস্ত্রীয় মতবাদ পরিণত হয়েছে একটি অনড় অনুষ্ঠান –সর্বস্বতায়, আর এ কারণে, আরব থেকে যে বেগমান নতুন ভাব –বন্যা এলো তাকে কার্যকরভাবে তা বাধঅ দিতে পারলো না। কিন্তু ইরানের বুকে আরব বিজয়ের বিস্ফোরণ যখন ঘটেছে সেই মুহূর্তে ইরান অতিক্রম করছিলো সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চাঞ্চল্যের যুগ, যে –চাঞ্চল্যের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছিলো জাতীয় পুনর্জাগরণের এক প্রতিশ্রুতির আভাস। আরব অভিযানের ফলে একটি মানসিক, সাংগঠনিক পুনর্জাগনের এই আশা চূর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যায় এবং ইরানীরা তাদের বিকাশের নিজস্ব ধারণা সাথে তখন থেকেই নিজেদেরকেখাপ খাইয়ে নেই।
অন্য আরো বহু দেশের মতোই ইরানে ইসলামের আবির্ভাব বিস্ময়কর সামাজিক অগ্রগতির পরিচায়ক। এর আঘাতে ইরানের সনাতন বর্ণপ্রথা ভেংগে চুরমার হয়ে যায়। এর স্থলে ইসলাম জন্ম নিলো স্বাধীন সমান মানুসের এই নতুন জনগোষ্ঠীর। সাংস্কৃতিক যে-সব শক্তি দীর্ঘকাল ধরে ছিলো সুপ্ত, অনুচ্চারিত ইসলাম সেগুলির জন্য উন্মুক্ত করে দিলো নব নাব প্রণালী। কিনউত তা সত্তেও দারায়স ও জারেক্সেসের গর্বিত বংশধরেরা কখনো ভুলতেপারলো না যে, তাদরে জাতীয় জীবনে ঐতিহাসিক নিরবচ্ছিন্নতা, তাদের গতকাল এবং আজকের মধ্যে মৌলিকসম্বন্ধ হঠাৎ টুটে গেছে। জেন্দাবেস্তীয় ধর্মের অদ্ভুত দ্বৈতবাদে এবং আব –আতশ – খাক –বাদ এই চারটি উপাদানের প্রায় সর্বেশ্বরবাদী পূজায় যে জাতীয় অন্তরংগতম চরিত্র খুঁজে পেয়েচিলো তার অভিব্যক্তি, সেই জাতিই আজ সম্মখীন হলো ইসলামের কঠোর আপসহীন তাওহীদের এবং পরম সত্যের জন্য তার উন্মাদনার। ইরানীয়দের পক্ষে ইসলামের জাতিচেতনা অতিক্রম করে যাওয়ার ধারণার নিকট তাদের গভীরমূল জাতীয় চেতনা সমর্পণ এ উত্তরণ ছিলো অতিমাত্রায় আকস্মিক এবং যন্ত্রণাদায়ক। এই নতুন ধর্মকে তারা খুব দ্রুত এবং জাহিরা স্বেচ্ছায় কবুল করলেও ওরা ওদের অবচেতন মনে ইসলামী ভাবাদর্শের এই বিজয়কে জাতি হিসাবে ইরানোর পরাজয় বলে গণ্য করতে থাকে, এবং ওরা পরাজিত হয়েছে আর ওদের প্রাচীন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের পটভূমি থেকে চিরকালের জন্য ওদের উপড়ে ফেলা হয়েছে এই উপলবদ্ধি – সকল অস্পষ্টতা সত্ত্বেও সুগভীর এই উপলদ্ধি-পরবর্তী শতকগুলিকে ওদের জাতীয় আত্মবিশ্বাস বিনাশের কারণ হয়ে ওঠে। অন্য বহু জাতির জন্য ইসলাম গ্রহণের আশু ফল হলো সাংস্কৃতিক বিকাশের পক্ষে একটি অতিশয় ইতমূলক উদ্দীপনা। কিন্তু ইরানীদের বেলায় এর প্রথম- এবং একদিক দিয়ে বলা যায় সবচেয়ে স্থায়ী প্রতিক্রিয়া হলো, গভীর অবমাননাবোধ ও অবদমিত বিক্ষোভ।
এই বিক্ষোভকে অবচেতনের ভাঁজের মধ্যে চাপা দিয়ে ঢেকে রাখতে হলো; কারণ এরই মধ্যে ইসলাম হয়ে উঠেছে ইরানের নিজের ধর্ম। কিন্তু আরব-বিজয়ের প্রতি ঘৃণাবশে ইরানীরা সহজাতভাবে তারই আশ্রই নেয়, মনস্ততত্ত্ব যাকে বর্ণনা করে ‘অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ’ বলেঃ ওরা মনে করতে লাগলো, ওদের আরব –বিজয়ীরা ওদের নিকট যে ধর্ম এনেচে তা একান্তভাবে আরবদেরই নিজস্ব ধর্ম। এ উদ্দেশ্য ওরা খুব সূক্ষ্ণভাবেই আরবদের যুক্তিভিত্তিক, মরমী রহস্য- বর্জিত আল্লাহ- উপলব্ধিকে দিলো এর সম্পূর্ণ বিপরীত এক রূপঃ মরমী গোঁড়ামী এবং বিষণ্ণ ভাববেগে। যে ধর্ম ছিলো আরবদের নিকট বর্তমান, বাস্তব এবং স্থৈর্য ও স্বাধীনতার উৎস, ইরানীদের মনে তাই রূপ নিলো অতিপ্রাকৃত এবং প্রতীকের গুঢ় আর্তিতে। আল্লাহ যে সমস্ত কিছুর উর্ধ্বে এবং তাঁর এই সমস্ত কিছু ছাড়িয়ে যাওয়া বিরাটত্ব যে মানুষের ধারণার অতীত, ইসলামের এ নীতিটিকে রূপান্তরিত করা হলো বিশেষভাবে নির্বাচিত মানুষের মাধ্যমে আল্লাহ নিজেকে দৈহিকভাবে ব্যক্ত করেন, এই মরমী মতবাদের (ইসলাম-পূর্ব ইরানে এ ধরনের অনেকগুলো মতবাদের অস্তিত্ব ছিলো) । এই মতবাদ অনুসারে নির্বাচিত মানুষদের মাধ্যমে আল্লাহ নিজেকে এ উদ্দেশ্যে প্রকাশ করেন যে,এ সব ব্যক্তি তাঁদের বংশধরের নিকট এই ঐশী সত্যের সার দিয়ে যাবেন । এ ধরনের একটা প্রবণতা যেখানে ছিলো সেখানে শিয়া মতবাদের সমর্থন খুবই একটা গ্রহণযোগ্য পন্থা হিসাবে গৃহিত হয়। কারণ, আলী এবং তাঁর বংশধরগণকে শিয়ারা যেভাবে ভক্তি করে, বলা যায় তাঁদের প্রতি প্রায় বেদত্ব আরোপ করে থাকে, তার মধ্যে যে মানুষরূপে আল্লাহর দেহ ধারণের এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁর বারবার অবতরনের ধারণার বীজ গোপন করয়েছে, এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই: আর এটি এমনি একটি ধারণা যা ইসলামের নিকট সম্পূর্ণ অজ্ঞাত অথচ ইরানী হৃদয়ের নিকট খুবই অন্তরংগ জিনিস।
নবী মুহাম্মদ যে কাউকে তাঁর স্থলবর্তী মনোনীত না করে ইন্তেকাল করেন, এমন কি, তাঁর মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে কোনো একজন মনোনীত করে যাওয়ার পরামর্শ্ দেওয়া হলে তিনি েয মনোনয়ন দান করতে অস্বীকার করেছিলেন, এ কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়। তিনি তাঁর মনোভাব দ্বারা প্রথমে এ কথাই বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, নবুয়তের রূহানী দিকটি এমনি একিট জিনিস যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না, দ্বিতীয়ত উম্মাহর ভাবী নেতৃত্ব হবে জনসাধারণ কর্তৃক অবাধ নির্বাচনের ফল এবং নবীর কেনো নির্দেশের ফল নয়। (তিনি স্থলবর্তী নিয়োগ করলে স্বাভাবিকভাবে তার অর্থ তাই মনে হতো)। আর এভাবেই তিনি উম্মাহর নেতৃত্বে কখনো সেকুলার ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে কিংবা আল্লাহ কর্তৃক রসূলের ‘স্থলবর্তী নিয়োগ প্রেরণার মতো কিছু’ হতে পারে – সুচিন্তিতভাবে এ ধারণাকে বাতিল করে দেন। অথচ শিয়া মতাবাদদের আসল লক্ষ্য হচ্ছে এই। ইসলামের মূল শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিভংগি নিয়ে এই মতবাদ যে কেবল রসূলের স্থলবর্তিতার উপরেই জোর দিলো তাই নয় বরং তার স্থলবর্তী হওয়ার অধিকার কেবলমাত্র ‘নবী বংশে’রই আছে অর্থাৎ তাঁরা চাচাতো ভাই এভং জামাতা আলী এবং তাঁর সন্তান-সন্ততিরাই কেবল তাঁর স্থলবর্তী হতে পারবেন, এ অধিকারও তারা সংরক্ষিত রাখলো নবী বংশের জন্য।
ইরানীদের মরমী প্রবণতার সংগে এর সংগতি রয়েছে ষোল আনা। কিন্তু রসূলুল্লাহর রূহানী সত্তা আলী এবং তাঁর পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে বেঁচে আছে এই দাবি যারা করলো, ইরানীরা তাদের দলে অত্যুৎসাহের সংগে যোগ দিয়ে কেবল যে একিট মরমী বাসনা পূরণ করলো তা নয়, তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আরো একটি অবচেতন মতলবও কাজ করেছে। আলী যদি রসূলূল্লাহর আইন –সংগত উত্তরাধিকারী এবং স্থলবর্তীই হয়ে থাকে, তাহলে অন্য তিনজন খলীফাই ছিলেন নিঃসন্দেহে অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখলকারী এবং তাঁদের মধ্যে ছিলেন উমর –সেই উমর যিনি ইরান বিজয করেছিলেন। সাসানী সাম্রাজ্যকে যে বিজেতা জয় করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে জাতীয় ঘৃণার এখন ধর্মীয় অর্থে, ব্যাখ্যা করা সম্ভব যে –ধর্ম হয়ে উঠেছে ইরারের ধর্ম্। আলীঅ এবং তাঁর পুত্র হাসন ও হোসাইনকে ইসলামের খলীফা হওয়ার ইলাহী –নির্দেশিত অধিকার থেকে উমর ‘বঞ্চিত’ করেছেন এবং এভাবে বিরোধিতা করোছেন আল্লাহরই ইচ্ছার –কাজেই আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আনুগত্যস্বরূপ সমর্থন করতে হবে আলীর দলকে। এভাবে জাতীয় বিরোধিতা থেকে জন্ম নিলো একটি মতবাদ।
ইরানীরা যে এভাবে শিয়া মাতবাদকে তাদের মনের সিংহাসনে বরণ করে নিযেছে এর মধ্যে আমি আরবদের ইরান বিজায়ের বিরুদ্ধে ইরানীদের একিট নিঃশ্বদ প্রতিবাদ দেখতে পেলাম। এখন আমি বুঝতে পারলাম কেন ইরানীরা অন্য দুই ‘ক্ষমতা অপহরণকারী’ আবু বকর এবং উসমানের চেয়ে উমরকে এত বেশি ঘৃণার সাথে লানত দিয়ে থাকে। মতবাদের বিচারে প্রথম খলীফা আবু বকরকেই গণ্য করা উচিত ছিলো প্রধান সীমালংঘনকারী –কিন্তু উমর যে ইরান জয় করেছিলেন.. .
তাহলে, ইরানে আলী পরিবারকে বিস্ময়কর গভীরতার সাথে যে ভক্তি করা হয় তার কারণ এই! ইরানের এই কান্ট আরবের ইসলামের উপর ইরানী প্রতিশোধ গ্রহণেরৃ একটি প্রতীক (যে ইসলাম মুহাম্মদসহ যে কোনো মানুষের প্রতি দেব্ত্ব আরোপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে অমন আপোসহীনভাবে)। এটা সত্য যে,শিয়া মতবাদের জন্ম ইরানে হয়নি; অন্যান্য মুসলিম দেশেও শিয়া মতাবলম্বঅ বিভিন্ন দল রয়েছে। কিন্তু সকল মানুষের আবেগ ও কল্পনার উপর এমন পরিপূর্ণ প্রভাব আর কোথাও বিস্তার করতে পারেনি এ মতবাদ।
ইরানীরা যখন আলী, হাসান এবং হোসাইনের মৃত্যুর জন্য মাতম করে তখন তারা কেবল আলী পরিবারের ধ্বংসের জন্য কাঁদে না –তারা নিজেদের জন্য এবং তাদের অতীত গৌরব হারানেরা জন্যও কাঁদে. ..
এই ইরানীরা –ওরা এক বিষাদগ্রস্থ কওম। ওদের এই বিষণ্ণতা ইরানী ল্যণ্ডস্কেপ তখা বূদৃশ্যে প্রতিফলিত-প্রতিফরিত পোড়ো যমির অনন্ত বিস্তারে, নির্জন পাহাড়ী রাস্তা এবং রাজপথগুলিতে, মাটির তৈরি বাড়ির দূরে দূরে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গ্রামসমূহে, ভেড়ার পালগুরিতে,যাদের সন্ধ্যার দিকে তাড়িয়ে নেওয়া হয় কুয়ার দিকে, ধূসর তামাটে ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের মতো। শহর বন্দরে কোনো রকম চেষ্টা উচ্ছলাত ছাড়াই জীবন বিন্দু বিন্দু ঝরছে মন্থর গতিতে, নিরবচ্ছিন্ন ফোঁটায়-মনে হয়, সবকিছুই যেনো একটি স্বপ্নের নেকাব দিয়ে ঢাকা এবং প্রত্যেকের মুখে ফুটে রয়েছে এক অলস প্রতীক্ষঅর চাহনি। রাস্তায় কখনো শোনা যেতো না সংগীত। যদি সন্ধ্যায় কোনো তাতার সহিস কোনো সরাইখঅনায় হঠাৎ গলা ছেড়ে গেয়ে উঠতো শ্রোতা যেো তার অজান্তেই বিস্ময়ে উৎকর্ণ হতো। প্রকাশ্যে কেবল বহু দরবেশই গাইতো গানঃ এবং ওরা সবসময়ই আলী, হাসান এবং হোসাইন সম্পর্কে সেই একই পুরানো মর্মান্তিক গাঁধা গাইতো সুর করে। এই গানগুলিকে ঘিরে জাল বুনতো মৃত্যু এবং অশ্রু আর শ্রোতাদের মগজে তা প্রবেশ করতো খুব কড় শরাবের মতো। মনে হতো দুঃখ সম্পর্কে একটা ভীতি যে দুঃখ স্বেচ্ছায়,প্রায় লোভাতুরতার সাথেই গৃহীত-ঘিরে আছে লোকগুলিকে।
ইরানে গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় দেখা যেতো নারী এবং পুরুসেরা স্থির হয়ে বসে আছে যমীনের উপর। রাস্তার দুপাশ বরাবর বিশাল এলম গাছের ছায়ার নিচ দিয়ে যে খালগুলি চলে গেছে সেগুলির তীরে ওরা বসতো আর তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকতো প্রবাহমান পানির দিকে। ওরা একে অপররের সাথে কথা বলতো না। ওরা কেবল পানির কুলকুল ধ্বনি শুনতে আর ওদের মাথার উপর দিয়ে বয়ে যেতো পাতার মর্মর ধ্বনি। যখনিই আমি ওদের দেখতাম আমার মনে পড়তো দাউদের স্তেস্ত্রের কথাঃ
ব্যবিলনের নদীগুলির তীরে, আমরা বসেছিলাম সেখানে আর রোদন করেছিরাম.. .
ওরা নহরগুলির কিনারে বসতো বিশাল বোবা অন্ধকার পাখির মতো, যেনো ওরা হারিয়ে গেছে প্রবাহমান পানির নীরব ধ্যানে। ওরা কি ভাবতো কেনো দীর্ঘ বহুকাল লালিত ধারনার কথঅ, যে ধারণা তাদেরই কেবল তাদের? ওরা কি প্রতীক্ষায় ছিলো? .. . কিসের?
এবং দাউদ গেয়েছিলেন, আমরা আমাদের বাণীগুলিকে ঝুলিয়ে রাখলাম উইলো বনের মধ্যে, উইলো শাখায়.. .।
তিন
-‘চলো জায়েদ’, আমরা যাই। এ কথা বলে আমি আলী আগার চিঠিখানা আমার পকেটে রাখি এবং আয-যুগাইবীকে বিদায় জানানোর জন্য উঠে দাঁড়াই।
কিন্তু তিনি মাথা নাড়িয়ে বলেন, ‘না ভাই, জায়েদকে এখানে কিছুক্ষনের জন্য আমার সাথে থাকতে দাও। ফেলে আসা এই মাসগুলিতে তোমার জীবনে যা কিছু ঘটেছে, তুমি যদি তা বলতে খুব বখিরি করে থাকে, তোমার বদলে জায়েদই সে কাহিনী বলুক না। তুমি কি মনে করো যে, তোমার জীবনে যা ঘটছে, তোমার বন্ধুরা সে বিষয়ে উৎসুক নয়?’
দাজ্জাল
এক
আমি মদীনার সবচেয়ে প্রচীন অঞ্চলে সর্পিল গতিপথে প্রবেশ করি। ছায়াতে শিকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের দেয়াল, পাথরে তৈরি; গলির উপর ঝুলে আছে ঘুলঘুরি দেয়া জানালা এবং ব্যালকনি.. . গলিগুলি দেখতে গিরিসংকটের মতোই এবং কোনো কোনো জায়গা এতা চিপা যে, দুজন মানুষের পক্ষেও একে অন্যের পাশ দিয়ে বিপরীতদিকে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। এক সময় আমি নিজেকে দেখতে পেলাম, প্রায় একম বছর আঘে একজন তুর্কী পন্ডিত কর্তৃক স্থাপিত ধূসর পাথরে তৈরি কুতুবখানার সম্মুখভাগের সামনে এই প্রংগণে, গেচের পেটানো ব্রোঞ্জের গ্রিলের পশ্চাতে রয়েছে এমন একটি নীরবতা –যেনো একিট আমন্ত্রণ! আমি পাথর বিছানো প্রাংগণ পার হয়ে প্রাংগণের মাঝখানে যে একাকী গাছটি নিশ্চল সারি সারি কাঁচ ঢাকা বুক-কেস-হাজার হাজার হাতে লেখা বই-আর সে-সবের মধ্যে আছে ইসলামী বিশ্বের জানা কিছু –কিছু দুর্লভ পান্ডুলিপি। এধরনের বই পুস্তকই গৌরব দান করেছে ইসলামী তমদ্দুনকে, যা হারিয়ে গেছে গত কালকের হওয়ার মতো!
আমি যখন যন্ত্রের সাহায্যে কাজ করা চামড়ার মলাটে ঢাকা এই পুস্তকগুলির দিকে তাকাই,তখন মুসরিমের অতীত ও মুসলিমের বর্তমানের অসংগতি আমাকে আঘাত করে এক যন্ত্রণাদায়ক ঘুষির মতো.. .
-‘তোমাকে কি যেনো পীড়া দিচ্ছে বেটা? মুখে এই তিক্ততার ছাপ কেন বলো তো?
আমি এই কন্ঠস্বরের দিকে ঘুরে দাঁড়াই এবং দেখি একটি ঘুলঘুলি দেয়া জানালার মাঝখানে, হাঁটুর উপর একটি ফলিও ভলিয়ম নিয়ে কার্পেটের উপর বসে আছেন আমার পুরানো বন্ধু ছোট্ট অবয়বের শায়খ আবদুল্লাহ বুলাইহদ। তাঁর তীক্ষ্ণ কৌতুকতরা চোখ দুটি একটি অন্তরংগ ঝিলিয়ে সংগে আমাকে অভিনন্দন জানালো, যখন আমি তাঁর কপালে চুমু খাই এবং তাঁর পাশেই বসে পড়ি। তিনি নযদের সর্বশ্রেষ্ঠ আলীম এবং ওয়াহাবী-দৃষ্টিভংগির সাথেমতবাদঘটিত এক ধরনের যে –সংকীর্ণতা জড়িত রয়েছে তা সত্ত্বেও মুসলিম দেশগুলিতে আজ পর্যন্ত যে-সব পরম তীক্ষ্ণধী মানুষের সাক্ষাৎ আমি পেয়েছি তিনি তাঁদেরই অন্যতম। আমার প্রতি তাঁর বন্ধুত্ব আরবে আমার জীবনকে সহজ এবং আনন্দময় করে তোলার জন্য অনেকখানি দায়ী। কারণ, ইবনে সউদের রাজত্বে খোদ রাজা ছাড়া আর যে কোনো মানুষের কথার চাইতে তাঁর কথারই মূল্য বেশি। তিনি চট করে তাঁর বইটি বন্ধ করে ফেলেন এবং আমাকে তার কাছে টেনে নেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে, আমার দিকে তাকিয়ে।
-‘হে শায়খ, আমি ভাবছিলাম, আমরা মুসলমানরা কতো দূরে চলে গেছি এ থেকে’- এবং তাকে রাখা বইগুলি দিকে আমি ইশারা করি-আমাদের বর্তমান দুঃখ-দুর্দশা আর অধপতনের দিকে!’
-‘বেটা’, জবাব দেন বৃদ্ধ,‘আমরা যা বুনেছি তাই তুলছি। একদিন আমরা মহান ছিরাম। ইসলামই আমাদেরকে বড়ো করেছিলো। আমরা ছিলাম একটি পয়গামের বাহক। যতোদিন আমরা সেই পয়গামের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলাম ততোদিন আমাদের হৃদয় ছিলো উদ্দীপিত, অনুপ্রাণিত আর আমাদের মন ছিলো আলোকিত, উদ্ভাসিত। কিন্তু যেই আমরা ভুলে গেলাম, কী উদ্দেশ্যে আল্লাহ মানোনীত করেছিলেন আমাদের, তখনিই ঘটলো আমাদের পতন। আমরা অনেক দূর চলে গেছি এ থেকে’ – এবং বইগুলির দিকে আমি যেভাবে ইশারা করছিলাম ‘শায়খ’ তারই পুনরাবৃত্তি করেন – ‘কারণ রসুলূল্লাহ সাল্লালাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ১৩০০ বছর আগে যা শিখিয়েছিলেন আমরা তা থেকে চলে গেছি অনেক –অনেক দূরে .. .’
-আর হ্যাঁ, তোমার কাজ কেমন চলছে?’ একটু থেমে তিনি জিজ্ঞাস করেন, কারণ তিনি জানের, আমি ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দিকের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলি সম্পর্কে অধ্যয়নে মগ্ন আছি।
-‘আমাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, শায়খ, কাজ খুব ভালো আগাচ্ছে না। আমি আমার অন্তরে স্বস্তি পাচ্ছি না এবং জানি না এর কারণ কী? আর এজন্যই আবার আমি ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছি মরু প্রান্তরে।’
ইবনে বুলাইহদ আমার দিকে তাকান স্মিত হাস্যস্ফুরিত তীর্যক চোখে –বুদ্ধি –দ্বীপ্ত মর্মভেদী সেই চোখে –এবং তাঁর মেহেদী-রাঙা দাড়ি আঙুল দিয়ে পাকাতে পাকাতে বলেনঃ মনের যা পাওনা তা পাবে মন আর দেহের যা পাওনা তা পাবে দেহ . .. তোমার এখন শাদি করা উচিত .. .’
অবশ্য আমি জানি যে, নযদে প্রায় সকল রকম পেরেশানিরই সমাধান বিবেচিত হয় ‘শাদি।’ আমি হাসি চেপে রাখতে পারলাম না।
-‘কিন্তু শায়খ, আপনি ভালো করেই জানেন আমি মাত্র দুবছর আগে আবার শাদি করেছি এবং এ বছর আমার একটি ছেলেও হয়েছে।
বৃদ্ধ তাঁর কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে বলেনঃ কোনো পুরুষ যদি স্বস্তি পায় তার স্ত্রীতে সে তার সাধ্যমতো বেশি সময় ঘরেই থাকে। তুমি ঘরেও তো সময় কাটাও না. .. আর তা ছাড়া দোসরা শাদি করে আজ পর্যন্ত কোন পুরুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি।’ (বর্তমানে তাঁর নিজেরও তিন স্ত্রী রয়েছেন যদিও তাঁর বয়স সত্তর এবং আমি শুনেছি তাঁর কনিষ্ঠা স্ত্রী, যাকে তিনি শাদী করেছেন মাত্র মাস দুয়েক আগে, তার বড় জোর ষোলো বছর হছেয়ে।)
-‘তা হতে পারে’, আমি পাল্টা জবাব দিই, ‘হতে পারে দোসরা স্ত্রী গ্রহণ করলে তাতে পুরুষ কষ্ট পায় না, কিন্তু জরুর ব্যাপার কী? তার কষ্ট কি বিবেচনার অপেক্ষা রাখে না?
-‘বেটা, কোনো রমণী যদি তার স্বামীর পুরা হৃদয়টাই দখল করে থাকে, সে ফের শাদি করার কথা চিন্তা করবে না, তার আর শাদির প্রয়োজনও হবে না। কিন্তু স্বামীর হৃদয় যদি সম্পূর্ণভাবে তার স্ত্রীর সংগে না থাকে, সেই স্ত্রীর কি কোনো লাভ হবে তার প্রতি উদাসীন খসমকে কেবল তার নিজের জন্য আটকে রেখে?
নিশ্চয়ই এর কোনো উত্তর নেই। এটা নিশ্চিত যে, ইসলাম এক বিয়ের পরামর্শ দেয়,কিন্তু বিশেষ অবস্থায় পুরুষকে চারটি পর্যন্ত বিয়ে করার অনুমতি দেয়। যে কেউ জিজ্ঞাস করতে পারে, এ অধিকার নারীকেও কেন দেওয়া হলো না। জবাবটি সহজ। মানুষের বিকাশ ও অগ্রগতির ধারায় মানুসের জীবনে প্রেমের যে আত্মিক বিষয়টি অনুপ্রবেশ করেছে, তা সত্ত্বেও, নারী-পুরুষ উভয়ের বেলায় যৌন কামনার অন্তর্নিহিত জীবতাত্ত্বিক যুক্তি হচ্ছে প্রজনান; এবং যেখানে একজন স্ত্রীলোক একবারে কেবল একজন পুরুষের কাছ থেকেই একটি সন্তান ধারণ করতে পারে এবং নয়টি মাস তাকে গর্ভে ধারণ করতে হয় আরেকবার গর্ভধঅরণ করতে সক্ষম হওয়ার পূর্বে, সেখানে এভাবেই পুরুষকে তৈরি করা হয়েছে যে, যতোবার একটি নারীকে সে আলিংগন করবে ততবারই সে একটি সন্তানের জন্ম দিতে পারে। কাজেই, যেখানে নারীর মধ্যে বহুপতিক হওয়ার সহজাত প্রবৃত্তি হতো প্রকৃতির জন্য কেবল অপচয়, সেখানে পুরষের বহু নারী সম্ভোগের সন্দেহাতীত প্রবণতা প্রকৃতির দৃষ্টিকোণ থেকেই জীবতত্ত্বের দিক দিয়ে যুক্তিসংগত। অবশ্য, একথা খুব স্পষ্ট যে, জৈবতাত্ত্বিক ব্যাপারটি হচ্ছে ভালোবাসার অনেকগুলি দিকের একটি দিক মাত্র এবং তাও কোনক্রমেই সবচেয়ে গুরিুত্বপূর্ণ দিক নয়। তা সত্ত্বেও এটি হচ্ছে একটি মৌলিক উপাদান। মানব প্রকৃতিকে ইসলামে যে প্রজ্ঞার সংগে সবচেয়ে বিচার করা হয় সে প্রজ্ঞাবশত ইসলামী আইন বিয়ের সামাজিক-জৈবতাত্ত্বিক ক্রিয়াটিকেই হিফাজত করে –এর বেশি কিছু করে না (এর মধ্যে অবশ্য সন্তানের যত্ন ও পড়ে)। আর এ কারণেই, পুরুষকে দেয় একাধিক বিয়ে করার অনুমতি এবং একই সংগে রমণীকে একাধিক স্বামী গ্রহনের অনুমতি দিতে করে অস্বীকার। বিয়ের আত্মিক দিকটি যেহেতু অচিন্তনীয় এবং আইনের ইখতিয়ার-বহির্ভূত, সেজন্য তা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে স্বামী আবার বিয়ে করার প্রশ্ন স্বভাতই ওঠে না। যখনি স্বামী তার স্ত্রীকে সমুদয় হৃদয় দিয়ে ভালোবাসায় অন্যকে অংশ দিতে রাজী নয় এবং স্ত্রী যদি এতো রাজী না হয সে তালাক দিতে পারে এবং স্বাধীনভাবে পরে আাবার বিয়ে করতে। যে কোন অবস্থায়, ইসলামী বিয়ে যেহেতু একটা পবিত্র ব্যাপার নয় বরং একটা সামাজিক চুক্তি, সেজন্য স্বামী-স্ত্রী দুজনেই তালাকের আশ্রয় নিতে পারে। এর বিশেষ কারণ আছে। অন্যত্র কম-বেশি যে কলংক জড়িত রয়েছে তালাকের সাথে, মুসলিম সমাজে তার অস্তিত্ব নেই (একমাত্র সম্ভাব্য ব্যতিক্রম হচ্ছে ভারতীয় মুসলমানেরা, যারা হিন্দু সমাজের সাথে শত শত বছরের সম্পর্কের ফলে এ বিষয়ে প্রভাবিত হয়েছে, কারণ হিন্দু সমাজে তালাক একেবারেই নিষিদ্ধ)।
বিয়ে কর এবং বিয়ের সন্ধান ছিন্ন করার ব্যাপারে নারী-পুরুষ উভয়কে ইসলামী আইন যে স্বাধীনতা দিয়েছে, তাতেই ব্যখ্যা মিলবে কেন ইসলামে ব্যভিচারকে জঘন্যতম অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। কারণ এ ধরনের স্বাধীনতা যেখানে রয়েছে সেখানে, আবেগাত্মক বা ইন্দ্রিয়জ যোগাযোগ ওজর হিসাবে গৃহীত হতে পারে না। এটা সত্য যে, মুসলমানদের অবনতির জয়েক শততে সামাজিক রীতিনীতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, আইন –প্রদাতা যেমনটি ইচ্ছা করেছিলেন সেরূপ স্বাধীনভাবে তারাক দেবার অধিকার প্রয়োগ স্ত্রীলোকের পক্ষে প্রায় কঠিন হয়ে পড়েছে। অবশই এর জন্য দায়ী ইসলাম নয়, দায়ী হচ্ছে প্রথা – ঠিক যেমন , স্ত্রীলোককে এতোকাল ধরে বহু মুসলিম দেশে অবরোধের অন্তরালে বন্দী রাখার জন্য দায়ী হচ্ছে প্রথা, ইসলামী আইন নয়; কারণ কুরআনে কিংবা নবীর সুন্নাহতে এই প্রথার সর্মথনে কিছুই পাওয়া যায় না, যা মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে বাইজান্টিয়ানদের কাছ থেকে।
শাইখ ইবনে বুলাইহিদ আমার আত্মগত চিন্তার বাধা দেন আমার দিকে এমনভাবে তাকিযে, যেনো তিনি সব জানেন। ‘তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত গ্রহনের দরকার নেই, বেটা। সিদ্ধান্ত যখনা আসার সময় হবে, তখন তা তোমার কাছে অমনি আসবে।’
দুই
কুতুব খানাটি নীরব নিস্তব্ধ; বৃদ্ধ শায়খ এবং আমি – কেবল এ দুজনেই রয়েছি গম্বুজওয়ালা কক্ষটিতে। কাছাকাছি ছোট্ট একটি মসজিদ থেকে আমে মাগরিবের আযান এবং পরমুহূর্তেই একই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় মসজিদের নবীর পাঁচটি মীনার থেকে। নবীর মসজিদটি এই মুহূর্তে আমাদের কাছে অদৃশ্য এবং বিপুল গাম্ভীর্য আর মাধুর্যময় গর্বের সংগে যেনো তাকিয়ে আছে সবুজ গম্বুজটির উপর। মীনারগুলিতে একটি থেকে ‘মুয়াজ্জিন’ বলছেঃ ‘আল্লাহু আকবর ’.. . গভীর , গাঢ়, নিম্মগ্রামে, ধীরে ধীরে সুর ওঠা –নামা করছে ধ্বনির দীর্ঘ বলয়ের আকারের মতোই। ‘আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ’… ‘আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ’… সে তার বাক্যাংশটি শেষ করার আগেই আমাদের সবচেয়ে নিকটে যে মীনার রয়েছে সে মীনার থেকে কিছুটা উচ্চগ্রামে শুর করে ‘মুয়াজ্জিন’ ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’, ‘আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ’এবং তৃতীয় মীনারে যখন একই সংগীত উচ্চতরো গ্রামে উঠতে থাকে ধীরে ধীরে, ততোক্ষনে প্রথম ‘মুয়াজ্জিন’ প্রথম বাক্যটির শেষ করে দ্বিতীয় শ্লোকটি শুরু করেছে.. . চতুর্থ এবং পঞ্চম মীনার থেকে ওঠা প্রথম বাক্যটির ধ্বনিগুলির একটা সুদূর স্বর-সংগতির সাথে মিরিত হয়েঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই,’ যখন প্রথম, দ্বিতীয় এবং পরে তৃতীয় মীনার থেকে কন্ঠস্বর নেমে আসে মোলায়েম পাখনায় ভর করে .. .‘এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল’। এভাবে প্রত্যেক শ্লোকয় দুবা্র করে আবৃত্তি করে পাঁচজন মুয়াজ্জিনের প্রত্যেকের আর আযান চলে আগিয়ে – ‘সালাতে আসো, সালাতে আসো, চিরস্থায়ী সুখের দিকে ছুটে আসো’। প্রত্যেকটি কন্ঠস্বর যেনো জাগিয়ে দেয় অন্যদেরেএবং সবকটি স্বরকে নিয়ে এসে মিলিত করে এক জায়গায়, যেনো তার একমাত্র উদ্দেশ্য, স্থান ছেড়ে দিয়ে সরে পড়া এবং অন্য এক বিন্দুতে গিয়ে আবার সুরটিকে কন্ঠে ধারণ করে, আর এভাবে একে নিয়ে যাওয়া শেষ শ্লোক পর্যন্ত ‘আল্রাহ সর্বশ্রেষ্ট, আল্রাহ সর্বশ্রেষ্ট, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই।’
মানুষের কণ্ঠস্বরের এই যে বুলন্দ, গভীর আলিংগন, পরস্পর থেকে দূরে সরে পড়া, এক হয়ে যাওয়া এবং এবং আলাদা হয়ে যাওয়া, মানুষের আর কোনো সুরের সংগে এর মিল নেই। এই নগরী এবং এর স্বরধ্বনির প্রতি উন্মাদ ভালোবাসায় যখন আমার হৃদপিণ্ড আছাড় –পিছাড় খাচ্ছে আমার কণ্ঠ পর্যন্ত, তখন আমি অনুভব করতে শুরু করি – আমার এই সব সফর আর বাউণ্ডুলেপনার একটি মাত্র অর্থই ছিলো সব –সময় –এই আহ্বানের অর্থ উপলব্ধি করা.. .
-‘আসো’, শায়খ ইবনে বুলাইহিদ আমাকে বলেন, ‘চলো, আমারা মসজিদে মাগরিবের সালাত আদায় করি.. .’
হারম বা মদীনার পবিত্র মসজিদকে তার বর্তমান রূপ দেওয়অ হয়েছে গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে। কিন্তু এর কোনো কোনো অংশ অনেক প্রাচীন –কোনো কোনোটি নির্মিত হয়েছে মিসরের মামলুক বংমের আমলে এবং কোনো কোনোটি তারও আগে। কেন্দ্রের যে হল ঘরটিতে নবীর মাযার রয়েছে তা ঠিক সেই জায়গাটির উপরে নির্মিত যেখানে সপ্তম শতকে তৃতীয় খলীফা উসমান তৈরি করেছিলেন ইমারতটি। এর মাথায় রয়েছে একটি বৃহৎ সবুজ গম্বুজ যার ভেতর দিকটা নানা রংয়ের কারুকার্যময় চিত্রে অপরূপ। ছাদটি দাঁড়িয়ে আছে অনেক –ক’টি পুরু সারি সারি মার্বেল স্বম্ভের উপর, যে স্বম্ভগুলি পারস্পপিরক সামঞ্জস্য বজায় রেখে অনেকগুলি ভাগে ভাগ করেছে ভেতরটাকে। মর্মরের মেঝের উপর বিছানো রয়েছে দামী গালিচা। তিনটি ‘মেহরাবে’র প্রত্যেকটির দুপাশে ঝুলছে অতি নিপুণভাবে কাজ করা ব্রোঞ্জের ঝাড়-বাতি। মেহরাবগুলি অর্ধবৃত্তাকার কুঠরীর মতো, যার মুখ রয়েছে মক্কা অভিমুখে; নীল সাদা চীনামাটির টালি দিয়ে কচিত এই মেহরাবগুলি –এর একটি সবসময়ই ‘ইমামে’র জন্য নির্ধারিত , যিনি পারিচালনা করেন জামাতের সালাত। দীর্ঘ তামার শিকলে ঝুলছে শত শত স্বচ্ছ কাঁচের গোলক; রাতের বেলা এদের ভেতরে জ্বালানো হয় ছোট ছোট বাতি, জায়তুনের তেরে এবং এগুলি সালাতরত সারি সারি মানুষের উপর ছড়িয়ে দেয় একটি মৃদু মোলায়েম ঝিকিমিকি আলো। দিনের বেলা একটা সবুজাত আলো –আঁধারী ভরে রাখে মসজিদটিকে এবং তাতে মনে হয়, এ যেনো একটি হ্রদের তলা, যেনো পানির ভেতর দিয়ে মানুষের মূর্তি সব সাঁতার কেটে চলেছে নগ্ন পায়ে, গালিচা এবং বিছানা মার্বেলের উপর দিয়ে; যেনো পানির দেয়াল দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে সালাতের সময় বৃহৎ হল ঘরের প্রান্ত থেকে ‘ইমামে’র কন্ঠস্ব ধ্বনিত হচ্ছে চাপা গলায়, কোনো প্রতিধ্বনি না তুলে।
রসূলের কবরটি দেখা যায় না, কারণ কবরটি ঝুলন্ত পুরু ব্রকেড দিয়ে ঢাকা এবং ব্রোঞ্জের গ্রীল দিয়ে ঘেরা দেওয়া। মিসরের মামলুক সুলতান কায়েত বে পঞ্চাদশ শতকে এ গ্রীলটি তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। আসলে কবরের মতো কোনো কাঠামো এখানে নেই, কারণ নবীজী যে ছোট্ট কক্ষটিতে বাস করতেন এবং যেখানে তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন তারই মেটে মেঝের নিচে তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছিলো। পরবতীকালে এই বাড়িটিকে ঘিরে একটি দরোজা –শূন্য দেয়াল তৈরি করা হয় আর এভাবেই কবরটি সম্পূর্ণ আড়াল করে দেয়া হয় বাইরের দৃষ্টি থেকে। রসূলের আমালে তাঁর ঘরের একেবারে সংগেই লাগানো ছিলো মসজিদটি। কয়েক শতাব্দীর পরিক্রমার পরে, কবরটির উপরে এবং কবরটিকে ছাড়িয়ে মসজিদটিকে সম্প্রসারিত করা হয়।
মসজিদের ভেতরে খোলা চতুষ্কোণ পাথর –বিছানো মেঝের উপর ছড়ানো রয়েছে সারি সারি কম্বল, লম্বা করে। সারি সারি মানুষ তার উপর বসেছে জানু গেঁড়ে, কুরআন পাঠ করছে, একে অপরের সাথে কথা বলছে, ধ্যান করছে অথবা কেবল আসেমী করে সময় কাটাচ্ছে মাগরিবের সালাতের প্রতীক্ষায়। ইবনে মুলাইহিদ যেনো হারিয়ে গেছেন এক নিঃশব্দ প্রার্থনায়।
সবসময় যেমন হয়ে থাকে, মাগরিবের আগে, দূর থেকে ভেসে আসছে একটি কন্ঠস্বর, কুরআনের একটি অংশ তিলাওয়াতের ধ্বনি। আজকে আবৃত্তি করা হচ্ছে ৯৬ তম ‘সূরা’ –মুহাম্মদের কাছে যা নাযিল হয়েছিলো সর্বপ্রথম – যা শুরু হয়েছে এ শব্দগুলি দিয়ে ‘পাঠ করো’ তোমার রবোর নামে –প্রতিপালকের নামে’.. . এই শব্দগুলির মাধ্যমেই মক্কার নিকটে হিরা গুহায় মুহাম্মদদের নিকট প্রথম এসেছিলো আল্লাহর আহ্বান।
প্রায়ই যেমন করেছেন তেমনি তিনি প্রর্থনা করছিলেন নির্জনে, ধ্যান করছিলেন আলো ও সত্যের সন্ধানে, যখন অকস্মাৎ তাঁর সামনে আবির্ভূত হলেন ফেরেশতা এবং তাঁকে আদেশ করলেন, ‘পাঠ করো’ এবং মুহাম্মদ –যিনি তাঁর আশেপাশের প্রায় সকল লোকের মতোই কখনো পড়তে শিখেননি – আর সবার উপরে তিনি জানতেন না কী পড়তে হবে – তাকে জবাব দিলেন, ‘আমি পড়তে পারি না’। এ কথা শোনার পর ফেরেশতা তাঁকে এতো জোরে আলিংগন করেন যে, মুহাম্মদের মনে হলো তাঁর গায়ের সমস্ত শক্তি যেনো নিঃশেষ হয়ে গেছে। তখন ফেরেশতা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে তাঁর আদেশের পুনরাবিৃত্তি করলেন, ‘পড়ো, পাঠ করো’। আবার মুহাম্মদ উত্তর করালেন, ‘আমি পড়তে জানি না’। তখন ফেরেশতা আবার তাঁকে সজোরে চেপে ধরলেন নিজের সংগে যার ফলে একসময় তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়লেন এবং তাঁর মনে হলো তাঁর মৃত্যু আসন্ন। আবার বজ্র গম্ভীর স্বরে আওয়াজ হলো, ‘পাঠ করো’ এবং তৃতীয়বারের মতো মুহাম্মদ যখন যন্ত্রণাকাতর হৃদয়ে ফিস ফিস করে বললেনঃ ‘আমি তো পড়তে জানি না’.. . তখন ফেরেশতা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে বললেনঃ
পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে –
যিনি সৃষ্টি করেছেন –
সৃষ্টি করেছেন মানুষকে শুক্রবিন্দু থেকে
পাঠ করো, তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত
তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে কলমের সাহায্যে
শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না.. .
আর এইভাবে মানুষের চৈতন্য, মেধা এবং জ্ঞানের প্রতি ইশারা করে নাযিল হতে শুরু করলো কুরআন, যে প্রক্রিয়া চলতে থাকে দীর্ঘ তেইশটি বছর ধরে, তেষট্টি বছর বয়সে মদীনায় রসূলের ওফাত পর্যন্ত।
তাঁর ঐশী প্রত্যাদেশের এই প্রথম অভিজ্ঞতার কাহিনী আমাদের একদিন দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেয় বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব খণ্ডে ইয়াকুবের সাথে ফেরেশতার ধ্বস্তাধ্বস্তির কথা। কিন্তু ইয়াকুব যেখানে বাধা দিয়েছিলেন, ষেখানের মুহাম্মদ ভীতি –মিশ্রিত শ্রদ্ধা ও যন্ত্রণায় নিজেকে সমর্পণ করেন ফেরেশতার আলিংগন, যার ফলে একসময়ে তাঁর সমস্ত শক্তিই চলে গেলো এবং তাঁর মধ্যে আর কিছুই রইলো না একটি কণ্ঠস্বর শোনার সামর্থ্য ছঅড়া –সে স্বর সম্পর্খে এ প্রশ্ন তোলা আর বলা আর সম্ভব ছিলো নাঃ স্বরটি কি ভেতর থেকে এলো না এসেছে বাইরে থেকে! তখন পর্যন্ত তিনি জানেন না যে, এর-পর থেকে তাঁকে একই সময়ে হতে হবে পূর্ণ এবং শূন্য এমন একজন মানুষ যার মধ্যে পুরাপুরি রয়েছে মানবসুলভ কামনা –বাসনা আর নিজের জীবন সম্পর্কে চেতনা, আর একই সংগে যিনি একটা পয়গাম গ্রহণ করার জন্য একটি নিষ্ক্রিয় যন্ত্রণারূপ। তাঁর হৃদয়ের কাছে মেলে ধরা হচ্ছিল চিনন্তন সত্যের অদৃশ্য গ্রন্থণা- যে সত্যৈই কেবল অনুভবযোগ্য সকল বস্তু ঘটনাকে দেয় তাৎপর্য –এই প্রত্যাশায় যে, তিনি সে –সবের মর্ম বুঝবেন –এবং তাঁকে বলা হলো সে কিতাব থেকে ‘পাঠ’ করে দুনিয়াকে শোনাতে , যাতে মানুষ বুঝতে পারে কী তারা জানে না এবং কার্যত কেবলমাত্র নিজের শক্তিতে তাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় কী!
দিব্যদৃষ্টির বিস্ময়কর তাৎপর্য মুহাম্মদকে অভিভূত করে। জ্বলন্ত ঝোপের সামনে মূসার মতো তিনিও নিজেকে নবুয়তের সুউচ্ছ মর্যাদার অনুপযুক্ত মনে করলেন এবং আল্লাহর সম্ভবত তাঁকে মনোনীত করেছেন একথা ভেবে কাঁপতে শুরু করলেন। আমরা শুনেছি, এরপর তিনি নিজের শহরে নিজের ঘরে ফিরে গেলেন এবং তাঁর স্ত্রী খাদিজাকে বললেনঃ ‘আমাকে চাদর দিয়ে ঢাকো’। কারণ তিনি ঝড়ের মুখে গাছের ডালের মতো কাঁপছিলেন। খাদিজা তাঁকে একটি কম্বল দিয়ে ঢেকে দেন এবং ধীরে ধীরে একসময় তাঁর কাঁপুনি থেমে যায়। এরপর তিনি খাদিজার নিকট বর্ণনা করলেন তাঁর কী হয়েছে এবং বললেনঃ ‘সত্যি আমার সম্পর্কে আমার ভয় হচ্ছে!’
কিন্তু কেবলমাত্র প্রেমই যে –স্বচ্ছ দৃষ্টি দান করতে পারে খাদিজা সেই দৃষ্টি দিয়ে তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলেন, মুহাম্মদের সামনে যে দায়িত্ব রয়েছে তাঁর বিরাটত্বে তিনি ভীত এবং তিনি উত্তর করলেনঃ ‘না আল্লাহর কসম! তিনি কখনো আপনার উপর এমন ভঅর চাপাবেন না যা আপনি বহন করতে অক্ষম এবং কখনো তিনি আপনাকে অপমানিত করবেন না; কারণ সবাই জানে, আপনি মানুষ হিসাবে উত্তম, আপনি আপনার আত্মীয়-স্বজনের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন, দুর্বলকে সাহায্যে করেন, অসহায়ের উপকার করেন এবং মেহমানদের প্রতি আপনি মহানুভব উদার, আর যারা সত্যি সত্যি বিপন্ন, তাদেরকে আপনি সাহায্য করে থাকেন।’ তাঁকে সান্তনা দেওয়ার দেওয়ার জন্য খাদিজা তাঁকে নিয়ে গেলেন তাঁর এক সুশিক্ষিত চাচাতো ভাই ওরাকার কাছে। ওয়ারাকা বহু বছর ধরে খৃষ্টধর্ম পালন করেছেন; আর জনশ্রুতি এই যে, তিনি বাইবেল পাঠ করতে পারতেন হিব্রু ভাষায়। সে সময়ে ওয়ারাকা বৃদ্ধ হয়েছেন এবং তিনি অন্ধ। খাদিজা তাঁকে বললেন, হে আমার পিতৃব্য পুত্র, আপনার এই স্বজনের প্রতি মনোযোগী হোন’। এবং মুহাম্মদ যখন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা আবার বললেন, তখন ওয়ারাকার ভয় –মেশানো শ্রদ্ধার সংগে তুললেন উপরে আর বললেন, ‘ইনিই তো ওহীর সেই ফেরেশতা, যাঁকে আল্লাহ পাঠিয়েছিলেন পূর্বেকার নবীদের নিকট। আহ্যি, আমি যদি বয়সে তরুণ হতাম! আমি যদি তখন বেঁচে থাকতাম এবং আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারতাম যখন আপনার জাতি আপনাকে তাড়িয়ে দেবে আপনার দেশ থেকে! একথা শুনে বিস্ময়প্লুত মুহাম্মদ জিজ্ঞাস করেনঃ ‘কেন, কেন ওরা আমাকে তাড়িয়ে দেবে দেশ থেকে?’ এবং জ্ঞানী ওয়ারাকা জবাবে বললেন, হ্যাঁ, ওরা আপনাকে তাড়িয়ে দেবে। আজ পর্যন্ত আপনার মতো এমন কোনো মানুষ তার জাতির কাছে আসেনি যে আপনি যা নিয়ে এসেছেন তা-ই নিয়ে এসেছিলো, অথচ উৎপীড়িত হয়নি!
হ্যাঁ, দীর্ঘ তের বছর ধরে ওরা তাঁর উপর চালায় জুলুম, যার ফলে একদিন তিনি বাধ্য হয়ে মক্কা ছেড়ে চলে গেলেন এবং পৌছুলেন গিয়ে মদীনায়। কারণ মক্কার লোকেরা চিরকালই ছিলো কঠিন –হৃদয়। .. .
কিন্তু মক্কার বেশির ভাগ লোক মুহাম্মদের প্রথম দাওয়াতের পর হৃদয়ের যে কাঠিন্য দেখিয়েছিালো তা বোঝা কি সত্যই তাতো কঠিন? ওদের মধ্যে কোনো রূহানী তৃষ্ণা ছিলো না; ওরা জানতো কেবল বাস্তব ব্যবহারিক উদ্যোগ। কারণ , ওরা বিশ্বাস করতো জীবনের পরিধি সম্প্রসারিত করা যেতে পারে কেবলমাত্র সেই উপায়গুলিকে প্রশস্ততরো করে যার সাহায্যে বাহ্য আরাম-আয়াস বাড়ানো সম্ভব। এই সব লোকেরা পক্ষে একটা নৈতিক দাবির কাছে আপোসহীনভাবে নিজেদের সমর্পণ করার চিন্তা সত্যি হয়তো অসহনীয় মনে হয়েছিলো –কারণ, ইসলাম শব্দটির মানেই তো শাব্দিক অর্থে ‘আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ’। তাছাড়া মক্কার লোকদের কাছে তাদের প্রতিষ্ঠিত নিয়মশৃংখলা এবং গোত্রগত রীতি –প্রথা ছিলো অতি মাত্রায় প্রিয়; মুহাম্মদের শিক্ষায় এসবই বিপন্ন হয়ে পড়লো। যখন তিনি আল্লাহর একত্বের কথা প্রচার করতে শুরু করলেন এবং প্রতিমা পূজাকে সবচেয়ে বড় পাপ বলে প্রকোশ্যে নিন্দা করতে আরম্ভ করলেন তখন ওরা তার মধ্যে ওদের চিরচারিত বিশ্বাসের উপরই কেবল আক্রমণ দেখলো না, বরং ওরা এও দেখতে পেলো যে, এতে করে ওদের জীবনের সামাজিক প্যার্টানটিকেই ধ্বংস করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে , যে-সব বিষয়কে ওরা ধর্মের এখতিয়ারের বাইরে নেহাতই ‘জাগতিক’ ব্যাপার বলে মনে করতো – যেমন অর্থনীতি, সামাজিক সাম্য ও সুবিচারের প্রশ্ন এবং সাধারণভাবে, কারণ ওদের ব্যবসাগত অভ্যাস, ওদের অবাধ যৌনচার ও গোত্রের মংগল সম্পর্কে ওদের দৃষ্টিভংগির সংগে এ হস্তক্ষেপ খুব খাপ খাচ্ছিলো না। ওদের কাছে ধর্ম ছিলো একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার –একটা মনোগত ভংগির বিষয়, আচরণের বিষয় নয়।
আর এ ছিলো তারই সম্পূর্ণ বিপরীত যার কথঅ আরবের নবী ধর্মের কথঅ বলতেন তখন তাঁর মনে ছিলো। তাঁর বিচারে সামাজিক –আচার –আচরণ এভং অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানগুলি ধর্মের গণ্ডির মধ্যে পড়ে নিশ্চয়ই এবং তিনি নিশ্চয়ই বিস্মিত হতেন যদি কেউ তাঁকে বলতো –ধর্ম হচ্ছে একেবারেই ব্যক্তিগত বিবেকের বিষয় এবং সামাজিক আচরণের সংগে এর কোন সম্পর্ক নেই। অন্য সবকিছুর চাইতে বেশি করে তাঁর পয়গামে এই দিকটাই তাঁর পয়গামকে মক্কার কাফিরদের নিকট অতোটা অরুচিকর করে তুলেছিলো। তিনি যদি সামাজিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করতেন নবীকে নিয়ে তাদের অসন্তোষ হয়তো আরো কম তীব্র হতো। এতে সন্দেহ নেই যে, ইসলাম তাদের বিরক্তি উৎপাদন করতো, কারণ ইসলামের ধর্মতত্ত্ব সংঘর্ষ সৃষ্টি করেছিলো তাদের নিজেদের ধর্মীয় দৃষ্টিভংগীর সংগে। কিন্তু খুব সম্ভব প্রথমদিকে কিছুটা আপত্তির পরও তারা এর সংগে মানিয়ে নিতো-কিছুকাল আগে যেমন তারা মানিয়ে নিয়েচিলো খৃষ্ট –ধর্মের খন্ড বিচ্ছিন্ন প্রচারের সংগে –যদি রসূলুল্লাহ কেবল খৃষ্টান পাদ্রীদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতেন এবং নিজের প্রচারকে সীমিত রাখতেন কয়েকটি বিষয়েঃ আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য মানুষকে তাগিদ দেওয়া, নাজাতের জন্য তাঁর কাছে প্রর্থনার করা এবং নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয়ে সুন্দর আচরণ করা। কিন্তু তিনি খৃষ্টান দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেননি এবং নিজেকে বিশ্বাস, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার মধ্যে সীমাব্ধ রাখেননি। কী করেই বা তাঁর পক্ষে তা সম্ভব ছিলো? তাঁর আল্লাহ কি তাঁকে আদেশ করেননি এই প্রার্থনা্ করতেঃ ‘হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি আমাদেরকে দাও এ জগতের কল্যাণ এবং ভাবী জগতের কল্যাণ।’
কুরআনের এই বাক্যটিরে কাঠামের ভেতরে ‘এই জগতের কল্যাণ’কে স্থান দেওয়া হয়েছে ‘ভাবী জগতের কল্যাণে’র আগে – প্রথমত এ কারণে যে, বর্তমানের স্থান ভবিষ্যতের আগে, বর্তমান ভবিষ্যতের অগ্রগামী এবং দ্বিতীয়ত এ করণেও যে, মানুষকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যার ফলে আত্মার ডাকে সাড়া দিতে হলে এবং পরবর্তী জীবনের কল্যাণ চাইতে হলে পূর্বে তাকে অবশ্যি তার দৈহিক এবং পার্থিব প্রয়োজনগুলি মেটানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। মুহাম্মদের পয়গামে এমন কোনো আধ্যাত্মিকতার ধারণা নেই যা দৈহিক জীবনের সাথে সম্পর্কহীন বা তার বিরোধী। এ পয়গাম সর্ম্পর্ণ রূপে দাঁড়িয়ে আছে এই ধারণার উপর যে, দেহ এবং আত্মা হচ্ছে একই সত্যের ভিন্ন দুটি দিক; কী সেই বাস্তব সত্যঃ মানুষ্য –জীবন।তাই, স্বভাবতই তিনি ব্যক্তি-মানুষেল মধ্যে কেবলমাত্র একটা নৈতিক মনোভংগি লালন করেই তুষ্ট হতে পারেন নি, বরং তিনি চেয়েছিলেন এই মনোভংগিটিকে এমন একটি নির্দিষ্ট সামাজিক স্কীমে রূপান্তরিত করেতে যা, সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তির জন্য সাম্ভাব্য বৃহত্তম পরিমাণ দৈহিক এবং বৈষয়িক স্বাচ্ছন্দ্যর বিধান করবে আর এভাবেই আত্মিক বিকাশেরও বৃহত্তম সুযোগের নিশ্চয়তা দেবে।
তিনি তাঁর প্রচার শুরু করলেন মানুষকে এই কথা ‘বলেঃ আমল বা কর্ম হচ্ছে ঈমানের অংগঃ’ কারণ আল্লাহ কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ধার ধারেন; তিনি নারী-পুরুষ প্রত্যেকের কর্মও দেখেন, বিশেষ করে সেই সব কর্ম যার প্রভাব পড়ে ব্যক্তির জীবনের গণ্ডির বাইরে অন্য মানুষের উপর। তিনি দুর্বলের উপর সবলের জুলুমের বিরুদ্ধে প্রচার করেন অগ্নি –গর্ভ শব্দালংকারের সাহায্যে, যা আল্লাহ তাঁকে দিয়েছিলেন। তিনি অশ্রুতপূর্ভ এই যুক্তি-বক্তব্য পেশ করলেন যে, আল্লাহর কাছে নারী এবং পুরুষ হচ্ছে সমান এবং সকল ধর্মীয় কর্তব্য ও আশা –আকাংখা দুয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য সমানভাবে; মক্কার সকল (১-একচেটিয়া ব্যবসা। ২- ইচ্ছামতো চড়া দামে আবর বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে পণ্যদ্রব্য সমুদয় ক্রয় করে ফেলা।)সরলমনা পৌত্তলিকের আতংকের সীমা থাকলো না যখন তিনি একথা পর্যন্ত ঘোষণা করে বসলেন যে, নারী তার নিজস্ব অধিকার বলেই একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি, পুরুষের সংগে মা, বোন, স্ত্রী অথবা কন্যা হিসাবে তার সম্পর্খের কারণেরই কেবল সে আলাদা ব্যক্তি নয়; আর এ কারণে, নারীর অধিকার আছে সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী হওয়ার , নিজের ব্যবসা –বাণিজ্য পরিচালনা করার এবং বিয়েতে স্বাধীনভাবে তার নিজেকে অন্যের হাতে তুলে দেবার! তিনি সকল রকমের জুয়া খেলা ও সকল প্রকার মরাব দূষণীয় বলে ঘোষণ করলেন, কারণ আল –কুরআনের ভাষায়ঃ ‘এ সবের মধ্যে মন্দ অনেক বেশি এবং সামান্য উপকারিতা আছে। কিন্তু উপকারিতার চাইতে ক্ষতিকর দিকটাই বেশি।’ সর্বোপরি তিনি দাঁড়ালেন, মানুষ মানুষেল উপর পুরুষানুক্রমিক যে জুলুম করে আসছে তার বিরুদ্ধে, দাঁড়ালেন সুদভিত্তিক কর্জের লাভের বিরুদ্ধে, সুদের হার যা-ই হোক , দাঁড়ালেন ব্যক্তি মনোপলি ১() এবং ‘কর্ণারে’র২()বিরুদ্ধে, অন্য মানুষের সম্ভাব্য প্রয়োজন নিয়ে জুয়া খেলার বিরুদ্ধে – যাকে আমরা আজাকল বলে থাকি ‘স্পেকুলেশন’ –দাঁড়ালেন গোত্রগত গ্রুপ সেন্টিমেন্টের দৃষ্টিতে ভালো অথবা মন্দ নিরূপণের বিরুদ্ধে, আধুনিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘জাতীয়তাবাদ’। বস্তুত গোত্রগত মনোভাব এবং বিচার –বিবেচনার কোনো নৈতিক বৈধতা আছে বলে তিনি স্বীকার করলেন না। তাঁর দৃষ্টিতে, সম্প্রদায়ভিত্তিক দলের জন্য একমাত্র বৈধ, অর্থাৎ নৈতিক মূল্যবোধের একটা সাধারণ মানদণ্ডের স্বাধীন সচেতন স্বীকৃতি- একই বংশ থেকে উৎপত্তির আকস্মিক ব্যাপারটাই নয়।
কার্যত যেসব সামাজিক ধ্যান –ধারণার তখন পর্যন্ত অলংঘনীয় বলে বিবেচিত হয়ে এসেছে তিনি তার প্রত্যেকটির ব্যাপক সংশোধনের জন্য জোর দিলেন এবং এ ভাবে, -বর্তমানকালের লোক যেমন বলে থাকে –তিনি ধর্মকে নিয়ে এলেন ‘রাজনীতিতে’। বলাবাহুল্য, সে সময়ের জন্য এ ছিলো রীতিমতো বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন।
সকল কালের প্রায় সকল জাতির মতোই মক্কার পৌত্তলিক শাসকদের এই বিশ্বাস ছিলো যে, তারা যেসব সামাজিক রীতিনীতি, চিন্তা-ভাবনা ও প্রথা –পদ্ধতির অভ্যাসের মধ্যে লালিত হয়ে এসেছে, সেগুলি হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম এবং তার চেয়ে ভালো আর কিছু ধারণাই করা যায় না। তাই, রাজনীতিতে ধর্ম আমদানী অর্থাৎ সামাজিক পরিবর্তনের জন্য আল্লাহর উপলব্ধিকে আরম্ভ বিন্দু করে তোলার জন্য নবীর এ প্রয়াসে স্বভাবতই ওরা বিক্ষুদ্ধ হয় এবং একে নীতি-বিগর্হিত, বাজদ্রোহমূলক এবং উচিত –অনুচিতের সকল ধারণার খেলাফ বলে নিন্দা করে। এবং যখন ওদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠলো মুহাম্মদ কেবল একজন স্বপ্নচারী নন, বরং তিনি মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করতে পারেন কর্মের উদ্দীপনা তখন প্রতিষ্ঠিত সমাজ –ব্যবস্থার রক্ষকেরা গ্রহণ করে এক জবরদস্ত পাল্টা ব্যবস্তা এবং তাঁকে এবং তাঁর সহচরগণকে নিপীড়ন শুরু করে দেয়.. .।
আসলে, একভাবে না একভাবে সকল নবীই তাঁদের নিজ –নিজ কালের প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। কাজেই, এ কি খুবই আশ্চর্যজনক যে, তাঁদের প্রায় সকলেই তাঁদের জাতি –গোষ্ঠীর দ্বারা উৎপীড়িত এভং উপহাসিত হয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে যিনি সকলের পরে এসেছেন সেই মুহাম্মদ আজো উপহাসিত হচ্ছেন পাশ্চাত্য জগতে?
তিন
‘মাগরিবে’র সালাত শেষ হওয়ার সাথে সাথে শায়খ ইবনে বুলইহিদ নযদি বেদুঈন এবং শহরবাসীদের এক উৎসুক চক্রের কেন্দ্র হয়ে উঠেন, কারণ, এরা তাঁর পাণ্ডিত্য এবং জাগতিক প্রজ্ঞা থেকে ফায়দা নিতে ইচ্ছুক। তিনি নিজেও ওদের অভিজ্ঞতা এবং দূর –দেশে ওদের সফর সম্পর্কে ওরা তাঁকে কী বলতে পারে তা শুনতে আগ্রহী। নযদিদের মধ্যে দীর্ঘ সফর মোটেই বিরল নয়; ওরা নিাজেদের বলে ‘আহলে আশশিদাদ’ –‘উটের জীনের উপর সওয়ার লোক’ – এবং ওদের অনেকের নিকট বাড়ির শয্যার চেয়ে উটের জীন অনেক বেশি পরিচিত। হার্বের যে তরুণ বেদুঈন ইরাকে তার সাম্প্রতিক সফর কালের অভিজ্ঞতার কথা এই মাত্র শায়েখের নিকট বর্ণনা করলো তার নিকট নিশ্চয় তা বেশি পরিচিত। এই সফরকালেই সেই তার জীবনে প্রথম ফিরিংগী অর্থাৎ ইউরোপীয়কে দেখতে পায়(ইউরোপীয়দের এই নামে তখনি আখ্যায়িত করে আরবরা যখন ওরা ক্রুসেডের যুদ্ধের সময় ফ্রাংকদের সম্পর্কে আসে।)
-‘আমাকে বলুন শায়খ, ফিরিংগীরা সবসময় মাথায় কেন হ্যাট পরে যা ওদের চোখ ঢেকে রাখে? ওরা আকাশ কী করে দেখতে পায়?’
-‘ওরা এ জিনিসটাকে দেখতে চায় না’,-শায়খ জবাব দিলেন, আমার দিকে চেয়ে চোখের পলক নেকেড় –‘হয়তো ওরা এই ভয় করে যে, আকাশের দৃশ্য ওদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারে আল্লাহর কথা; ওরা চায় না যে, হপ্তার দিনগুলিতে কেউ ওদের আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেয়.. .’
আমরা সবাই হেসে উঠি। কিন্তু তরুণ বেদুঈনটি তার জ্ঞানের সন্ধানে রীতিমতো জেদী।– ‘তাহলে আল্লাহ কেন ওদের প্রতি এতো দয়ালু এবং ওদের দিচ্ছেন ঐশ্চর্য, যা তিনি মুমিনদের দিচ্ছেন না?’
-‘ওহো, এতো খুবই সোজা কথা বেটা, ওরা সোনা –রূপার পূজা করে। তাই ওদের দেবতা ওদের পকেটে.. . কিন্তু আমার এই যে দোস্ত’, তিনি তাঁর হাত রাখেন আমার হাঁটুর উপর, ‘ইনি ফিরিংগীদের সস্পর্কে আমার থেকে অনেক বেশি জানেন, কারণ তিনি ওদের মধ্য থেকে এসেছেন, -আল্লাহ –মহিমান্বিত হোত তাঁর নাম –তিনিই তাঁকে অন্ধকার থেকে নিয়ে এসেছেন ইসলামের আলোতে।’
-‘ব্যাপার কি তাই ভাইয়া?’ জিজ্ঞাস করে উৎসুক বেদুঈন, ‘এ কি সত্য যে, আপনি নিজেই একজন ‘ফিরিংগী’ ছিলেন?’ –যখন আমি মাথা ঝুঁকিয়ে সায় দিই, সে ফিস ফিস করে বলে, প্রশংসা আল্লাহরই , যিনি যাকে ইচ্ছ পরিচালিত করেন সুপথে-আমাকে বলুন ভাইয়া, ‘ফিরিংগীরা’ যে আল্লাহ সম্পর্কে এত উদাসীন তার কারণ কী?’
-‘এ এক লম্বা কাহিনী, আমি জবাব দিই, কয়েক কথায় এর ব্যাখ্যা করা যাবে না। আমি এই মুহূর্তে তোমাকে যা বলতে পারি তা এই যে, ‘ফিরিংগীদের দুনিয়া হয়ে উঠেছে ‘দাজ্জালে’র দুনিয়া –চোখ ঝলসানো প্রবঞ্চকের দুনিয়া। তুমি কি আমাদের নবীর এই ভবিষ্যৎবানীর কথা কখনো শোনোনি যে, আখেরী জামানায় দুনিয়ার বেশি ভাগ লোকই এই বিশ্বাসে ‘দজ্জালে’র অনুসারী হয়ে উঠবে যে, সে –ই আল্লাহ!’
এবং ও যখন জিজ্ঞাসু চোখে আমার দিকে তাকালো , আমি তখন শায়খ ইবনে বুলাইহিদের সম্মতি নিয়ে বর্ণণা করি বাইবেলের সর্বশেষ গ্রন্থে উল্লিখিত ‘দাজ্জালে’র আবির্ভাব সম্পর্কিত ভবিষ্যতবাণী –যার একটি চোখ হবে অন্ধ কিন্তু তার থাকবে আল্লাহর দেয়া রহস্যময় ক্ষমতা। পৃথিবীর দূরতম অঞ্চলে যা বলা হচ্ছে তা-ও সে শুনতে পাবে তার কান দিয়ে এবং অসীম দূরত্বে যা কিছু ঘটছে তার এক চোখ দিয়ে দেখতে পাবে; সে উড়ে কয়েকদিনের মধ্যে ঘুরে আসবে পৃথিবী; মাটির নিচে থেকে হঠাৎ করে নিয়ে আসবে সোনা-রূপার ভাণ্ডার; তার হুকুমে বর্ষণ হবে, তরুলতা উৎপন্ন হবে, সে হত্যা করবে খোদ আল্লাহ বলে এবং ভক্তিতে তার সামনে সিজদায় যাবে-কিন্তু যাদের ঈমান মজবুত তারা আগুনের হরফে তার কপালে যা লেখা আছে তা পড়তে পাবেঃ ‘আল্লাহকে অস্বীকারকরী’ এই কথা –এবং এভাবে তারা জানতে পারবে যে, মানুষের বিশ্বাস পরীক্ষা করার জন্য দজ্জাল একটা ছলনা ছাড়া কিছু নয়.. .
এবং যখন আমার বেদুঈন বন্ধুটি দু’চোখ বিস্ফারিত করে আামার দিকে তাকায় এবং গুনগুন করে বলে, ‘আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় মাগি’, আমি তখন ইবনে বুলাইহিদের দিকে ঘুরে বলিঃ
-‘হে শায়খ, এই রূপক কাহিনীটি কি আধুনিক কারিগরী সভ্যতার একটি যথোচিত বর্ণনা নয়? এ সভ্যতা হচ্ছে এক-চক্ষুঃ অর্থাৎ এ কেবল জীবনের একটি দিক, তার বৈষয়িক উন্নতির দিকে তাকায় এবং জীবনের রূহানী দিক সম্পর্কে এ বে-খবর। এর কারিগরী তেলেসমাতির সাহায্যে মানুষকে দিয়েছে তার স্বাভাবিক সামর্থ্যের বাইরে অনেক দূরের বস্তু দেখার ও দূরের শব্দ শোনার ক্ষমতা, দিয়েছে ধরণাতীত গতিতে অসীম দূরত্ব অতিক্রম করার সামর্থ্য। এই সভ্যতার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান দ্বারা ‘বর্ষানো’ হয় বৃষ্টি এবং জন্মানো হয় তরুলতা’ এবং মাটির নিচে থেকে উদঘাটিত করা হয় অপ্রত্যাশিত ঐশ্বর্যের ভাণ্ডার। এই বিজ্ঞানের ওষুধ জীবন দেয় তাকে যার মৃত্যু মনে হয় অবশ্যম্ভাবী, অন্যদিকে এর যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক ধ্বংসলীলা ধ্বংস করে জীবনকে আর এ বৈষয়িক অগ্রগতি এতোই প্রচণ্ড এবং এতোই চোখ ঝলসানো যে, দুর্বল ঈমানের লোকেরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, নিজের অধিকারেই এ হচ্ছে একজন ‘খোদা’, কিন্তু যারা তাদের স্রষ্টা সম্পর্খে সচেতন রয়েছে তারা স্পষ্টতই বুঝতে পারে যে, ‘দজ্জালে’র পূজা করা মানে আল্লাহকে অস্বীকার করা.. .।’
-‘তুমি ঠিক বলেছো মুহাম্মদ, তুমি ঠিক বলেছো’, উত্তেজিতভাবে আমার হাঁটুর উপর থাবা মারতে মারতে চীৎকার করে উঠেন বুলাইহিদ, -‘দাজ্জাল’ সম্পর্কিত ভবিষ্যত বাণীটির প্রতি এভাবে তাকানোর কথা কখনো আমার মনে হয়নি, কিন্তু তুমি ঠিক বলেছে! মানুষের অগ্রগতি এবং বিজ্ঞানের উন্নতি যে আমাদের আল্লাহরই একটা রহমত, এটা উপলব্ধি না করে অজ্ঞাবশত মানুষ ক্রমেই বেশি –বেশি সংখ্যায় ভাবতে শুরু করেছে যে, এ খোদাই একটা লক্ষ্য এবং পূজা পাওয়ার যোগ্য।’
হ্যাঁ, আমি নিজে নিজে ভাবি –পশ্চিমের লোক সত্যই নিজেদের সঁপে দিয়েছে ‘দাজ্জালে’র পূজায়। অনেককাল আগেই পশ্চিমের মানুষ হারিয়েছে তার সকল নিষ্কলুষতা এবং প্রকৃতির সংগে তার সকল অভ্যন্তরীণ সংহতি। তার কাছে জীবন হয়ে উঠেচে একট হয়রানী। সে সন্দেহবাদী এবং সে কারণে সে তার ভাই থেকেত বিচ্ছিন্ন এবং নিজের অন্তরে নিঃসংগ। এই নিঃসংগতার মধ্যে যাতে নিশ্চিহ্ন হযে যেতে না হয় সেজন্য বাহ্য উপায়ে জীবনের উপর প্রবুত্ব করার জন্য অবশ্যি চেষ্টা করতে হবে তাকে –‘বেঁচে আছি’ কেবলমাত্র এই অনুভূতি তাকে আর দিতে পারছে না অন্তরের নিরাপত্তা; যন্ত্রণার সংগে মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে তাকে অবশ্যই হামেশা কুস্তি লকড়তে হবে জীবনের সাথে, যেহেতু সে সকল প্রকার অতীন্দ্রিয় জিজ্ঞাসা হারিয়ে বসেছে এবং স্থির করেছে যে, তাকে বাদ দিয়েই সে চলবে, তাই তাকে ক্রমাগত উদ্ভাবন ও আবিষ্কার করতে হবে তার নিজের জন্য যান্ত্রিক মিত্র। আর এভাবেই শুরু হয়েছে কারিগরি ক্ষেত্রে তার উন্মত্ত বেপরোয়া প্রয়াস। সে প্রত্যেকদিন নতুন নতুন মেশিন আবিষ্কার করছে এবং তার প্রত্যেকটিকে দিচ্ছে তার আত্মার কিছু না কিছু যেনো সেগুলিই তার অস্তিত্বের জন্যে লড়াই করে। মেশিনগুলি তা অবশ্যই করে কিন্তু একই সংগে সেগুলিই তার জন্য দৃষ্টি করে নিত্য-নতুন অভাব,নতুন নুতন বিপদ, নতুন নতুন ভয় এই নতুনতরো আরো কৃত্রিম মিত্রের জন্য এক অতৃপ্ত তৃষ্ণা। তার আত্মা নিজেকে হারিয়ে ফেলে উৎপাদনশীল মেশিনের নিয়ত প্রবলতরো, নিয়ত উদ্ভটতরো, নিত্য প্রচণ্ডতরো চাকার ঘূর্ণনে; এবং মেশিনটিও হারিয়ে ফেলে তার নিজের সত্যিকার উদ্দেশ্য-মানব জীবনকে রক্ষা এবং ঐশ্বর্য্যশালী করাই যায় মানে –এবং নিজেই হয়ে ওঠে একটি দেবতা, ইস্পাতের সর্বগ্রাসী রাক্ষস। এই অতৃপ্ত দেবতার পুরুত প্রচারকেরা এ বিষয়ে সচেতন বলে মনে হয় না যে, আধুকি কালের কারিগরি উন্নতির দ্রুততা কেবল জ্ঞান –বিজ্ঞানের নিশ্চিত বিকাশেরেই ফল নয়, আত্মিক হতাশারও ফল, এবং পশ্চিমের মানুষ যে-চমকপ্রদ বৈষয়িক উন্নতির আলোকে প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব স্থাপন করবে বলে আপন ইচ্ছার কথা ঘোষণা করে, সেগুলি কিন্তু তাদের অন্তরতম তাৎপর্যের দিক দিয়ে আত্মরক্ষামূলক ধরনেরঃ ওদের উজ্জ্বল মুখাবয়বের পেছনে ওঁত পেতে আছে অজানার আতংক।
পাশ্চাত্য সভ্যতার মানুষ ও সমাজের প্রয়োজন ও তার আত্মার চাহিদার মধ্যে একট সামঞ্জস্যপূর্ণ ভারসাম্য স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। এ সভ্যতা তার কিছুকাল আগের ধর্মীয় নীতিশাস্ত্র বর্জন করেছে, কিন্তু নিজের মধ্য থেকে অন্য কোনো নৈতিক পদ্ধতি সৃষ্টি করতে পারেনি য, যতো তত্ত্বমূলকই হোক, যুক্তিগ্রাহ্য হবে। শিক্ষায় এর অতো অগ্রগতি সত্ত্বেও লোক-মাতানো চুতর বক্তারা যেসব স্লোগান উদ্ভাবন করা প্রয়োজন মনে করে, উদ্ভট হলেও সে –সবের শিকার হওয়ার জন্য মানুষের মধ্যে যে নির্বোধ প্রস্তুতি রয়েছে, পাশ্চাত্য সভ্যতা তা জয় করতে পারেনি। এ সভ্যতা সংগঠনের কৌশলকে একট চারুকলায় উন্নীত করেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীরা যেসব শক্তির জন্ম দিয়েছে সেগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে পাশ্চাত্য জাতিগুলি রোজই তাদের চূড়া্ত অক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে, এবং এই মুহূর্তে তা এমন একটি পর্যায়ে এসে পৌছেছে যখন বাহ্যত অপরিসীম বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা আর বিশ্বব্যাপী বিশৃংখলা পাশাপাশি আগাচ্ছে, হারত ধরাধরি করে। তার বিজ্ঞানে জ্ঞানের যে আলো ছাড়চ্ছে –যে আলো নিঃসন্দেহেই মহৎ – তা থেকে সর্বপ্রকার ধর্মমুখিনতা বঞ্চিত পাশ্চাত্যবাসী আজ আর নৈতিক কোনো ফায়দাই লাভই করতে পারছে না। তার ক্ষেত্রে কুরআনের এ কথাগুলি প্রযোজ্যঃ
ওদের উপমা হচ্ছে অমন একটি জাতের উপমা যারা প্রজ্জ্বলিত করেছে আগুন, কিন্তু যখন তা তাদের রেখে দিলেন অন্ধকারে যার মধ্যে ওরা দেখতে পায় না –বোবা, বধির এবং অন্ধঃ এবং তবু ওরা ফিরে আসে না।
এবং, তবু ওদের অন্ধত্বের অহমিকায় পাশ্চাত্যের লোকেরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, অন্য কিছু নয়, ‘ওদের’ সভ্যতাই পৃথিবীতে আনবে আলো আর সুখ-শান্তি.. . আঠারো এবং উনিশ শতক ওরা সারা পৃথিবীতে খৃষ্টধর্মের সত্য বিস্তার করতে চেয়েছিলো; কিন্তু এখন যেহেতু ওদের ধর্মীয় উদ্দীপনা এতাটা ঠাণ্ডা হয়ে পড়েছে যে, ধর্মকে ওরা নেপথ্য সংগীতের বেশি কিছু মনে করে না-যাকে ‘বাস্তবে’ জীবনের সহচর হিসাবে থাকতে দেওয়া হয়, কিন্তু তার উপর প্রভাব খাটাতে দেওয়া হয় না-তখন তারা খৃষ্টধর্মের পরিবর্তে ‘পাশ্চাত্য জীবন পদ্ধতির’ জড়বাদী তত্ত্ব প্রচার করতে শুরু করেছেঃ তত্ত্বকথাটি কী?-এ বিশ্বাস যে কারখানায়, গবেষণাগারে এবং পরিসংখ্যান –বিদদের টেবিলের উপরই মানুষের সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব।
এবং এভাবে ‘দজ্জাল’ আবির্ভূত হয়েছে স্বরূপে.. .।
চার
নীরবতা জেঁকে থাকে অনেকক্ষণ। এরপর ‘শায়খ’ আবার বলেনঃ আবার বলেনঃ ‘বেটা, ‘দজ্জাল’ বলতে কী বোঝায় এই উপলদ্ধিই কি তোমাকে ইসলাম কবুল করতে বাধ্য করেছে?
-‘একদিক দিয়ে, আমার মনে হয়, তা’ই হয়েছে, কিন্তু এ ছিলো কেবল শেষ পদক্ষেপ।’
-‘শেষ পদক্ষেপ.. .হ্যাঁ তুমি কী করে ইসলামের পথ ধরেছো যে কাহিনী একবার আমাকে বলেছিলে। কিন্তু ঠিক কখন এবং কেমন করে তোমার মনে একথঅ প্রথম উদয় হলো যে, তোমার অভীষ্ট লক্ষ্য হতে পারে ইসলাম?’
-‘কখন? একটু ভাবতে দিন আমাকে.. . আমার মনে হয়; ব্যাপারটি ঘটেছিলো আফগানিস্তানে, শীতকালের একদিনে, যখন আমার ঘোড়ার একটি নল হারিয়ে গিয়েছিলে, আর সে কারণে, এক গ্রামে এক কমারকে খুঁজতে হচ্ছিলো আমার। গ্রামটি ছিলো আমার পথ থেকে বেশ দূরে। সেখানেই এক জন লোক আমাকে বলেছিলো, কিন্তু আপনি তো তো একজন মুসরমান, কেবল আপনি নিজে তা জানেন না এই যা.. . এ হচ্ছে আমার ইসলাম গ্রাহণের আট মাস আগরে কথঅ.. . আমি হিরোত থেকে যাচ্ছিলাম কাবুলে.. .’
হিরাত থেকে কাবুরের পথ ধরে আমি চলছি সওয়ারী পিঠে। আমার সংগে রয়েছে ইবরাহীম এবং একজন আফগান সৈনিক। মধ্য আফাগানিস্তানের বরফ –ঢাকা পার্বত্য উপত্যকা আর হিন্দুকুশের গিরি-পথগুলি ধরে আমরা চলছিলাম-সওয়ারী হাঁকিয়ে। ভীষণ ঠাণ্ডা পড়েছে তখন, বরফ চকচক করছে এবং আমাদের সকল দিকেই দাঁড়িয়ে আছে সাদা-কালো খাড়া উচু পাহাড়।
সেদিন আমার মনের মধ্যে একটা দুঃখ , আর একই সংগে আমি অনুভব করছিলাম আশ্চর্যজনক এ সুখ। আমি দুঃখ বোধ করছিলাম এজন্য যে, যে –লোকগুলির সংগে আমি গত ক’টি মাস এক সাথে বাস করেছি ওদের ঈমান যে আলো, যে-শীক্ত, যে-বুদ্ধি ওদের দিতে পারতো, মনে হলো তা থেকে ওদের আড়াল করে রেখেছে একটি পুরু অস্বচ্ছ পর্দাঃ আর আমি সুখ বোধ করছিলাম এ কারণে যে, সেই ঈমানের আলো, শক্তি এবং বুদ্ধি রয়েছে আমারই সাথে সম্মকে, সাদা-কালো পাহাড়গুলির নিকটে, েএতো নিকট যেনো হাত দিয়ে আমি স্পর্শ করতে পারছি।
আমার ঘোড়া খোঁড়াতে শুরু করলো এবং কিচু একটা যেনো তার খুরের মধ্যে ক্লিং করে শব্দ করে উঠলোঃ একট নাল ঢিলা হয়ে পড়েছে এবং কেবলমাত্র দুটি পেরেকের উপর ভর করে ঝুলে আছে।
-‘ধারে কাছে কি এমন কোনা গাঁ আছে যেখানে একজন কামার পেতে পারি?’ আমি আমাদের আফগান সংগীদের জিজ্ঞাস করি।
-‘এখানে থেকে এক লীগেরও কিছু কম দূরে দেহ-জাংগি নামে একটি গাঁ রয়েছে। ওখানে একজন কামার আছে, আর আছে হাজারাজাতের ‘হাকিমে’র একটি কিল্লা।’
সুতারাং চকচকে বরফের উপর দিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ৈ আমরা চললাম দেহ-জংগি, একটু মন্থর গতিতে, যাতে আমার ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে না পড়ে।
‘হাকিম’ বা জেলা শাসকটি ছিলেন বেঁটে-খাটো হাসি –খুশি এক তরুণ। বন্ধুভাবাপন্ন এই লোকটি তাঁর ছোটো –খাটো নির্জনতায় একজন বিদেশী মেহমান পেয়ে খুশী হলেন। তখন পর্যন্ত যে সব আফগানের সংগের আমার দেখা হয়েছে এবং পরেও আমি যে –সব আফগানকে দেখেছি তাদের মধ্যে এই তরুণই ছিলেন সবচেয়ে সাদাসিধা নিরহংকার, যদিও তিনি ছিলেন বাদশাহ আমান উল্লাহর খুব ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তিনি ওখানে আমকে দুদিন অবস্থান করতে বাধ্য করেন।
দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যায় আমরা বসেছি রোজকার মতো ভুরি ভোজনে। এরপর একজন গেঁয়ো লোক সেতারের সংগে একটি গাঁধা গেয়ে আমাদের আপ্যায়িত করে। সে গান গাইছিলো পুশতুতে –যেভাষা আমি বুঝি না –কিন্তু তার গানের কয়েকটি ফার্সী শব্দ স্পষ্ট যেনো লাফ দিয়ে উঠলো মৃদুষ্ণ গালিচা –ঢাকা গরম পক্ষ এবং জানালার ফাঁক দিয়ে বরফের যে ঠাণ্ডা দীপ্তি এসেছে তারই পটভুমিতে।আমার মনে আছে, সে গাইছিলো গোলিয়াতের সংগে দাউদের যুদ্ধের কথা-ঈমানের সংগে পশু-শক্তির সংগ্রামের কথা-যদিও আমি গানের শব্দগুলি খুব অনুসরণ করতে পারছিলাম না, তবু গানের বক্তব্য স্পষ্ট হয়ে উঠলো আমার কাছে যখন তা শুরু হরো নরম মোলায়েম সুরে এবং তারপর তা উর্ধ্বাভিসারীহলো আবেগের প্রচণ্ড উচ্ছ্বাসে, একটা চূড়ান্ত বিজয়ের সহর্ষ চিৎকারে!
গানটি যখন থামলো, হাকিম মন্তব্য করেনঃ ‘দাউদ ছিলেন ক্ষুদ্র কিন্তু তাঁর ঈমান ছিলো বড়.. .
আমি তাঁর সংগে এই কথাগুলি যোগ না করে পারলাম না, ‘এবং আপনার সংখ্যায় অনেক কিন্তু আপনাদের ঈমান কম।’
আমার মেজবান আমার দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকান এবং আমি প্রায় অনিচ্ছাকৃতভাবে যা বলে ফেলেছি তাতে অপ্রতিভ হয়ে তড়িঘড়ি আমার কথার ব্যাখ্যা শুরু করে দিই। আমার ব্যাখ্যা রূপ নেয় প্রশ্নের তীব্র স্রোতের।
-‘এ কেমন করে হলো যে , আমপনার মুসলমানেরা, আত্মবিশ্বাস হারিয় ফেললেন, যার ফলে একদিন আপনপাদের পূর্বপুরষেরা একশ ‘ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ধর্মকে বিস্তৃত করেছিলেন আরব দেশ থেকে পশ্চিমে সুদূর আটলান্টিক পর্যন্ত এবং পূবদিকে মহাচীনের অভ্যন্তরে, আর এখন নিজেদের এতে সহজে এতা দূর্বলের মতো সমর্পণ করছেন পাশ্চাত্যের চিন্তাধারা ও রীতিনীতির নিকট । কেন! আপনার, – যাঁদের পূর্বপুরুষেরা একদিন এমন একসময়ে পৃথিবীকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলার আলোকে উদ্ভাসিত করেছিলেন যখন ইউরোপ নিমজ্জিত ছিলো চরম বর্বরতা ও অজ্ঞতার মধ্যে; এখন সাহস সঞ্চয় করতে পারছেন না আপনাদের আপন প্রগতীশীল উজ্জ্বল ধর্মাদর্শের দিকে ফিরে যাওয়ার? এ কি করে সম্ভব হলো যে, আতাতুর্ক, সেই নগণ্য মুখোশধারী ব্যক্তিটি, যে ইসলামের কোনো মূল্য আছে বলেই স্বীকার করে না, আপনার – মুসলমানদের কাছে সে হয়ে উঠেছে ‘মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রতীক?’
আমার মেজবান স্তব্ধ, নির্বাক। বাইরে তখন বরফ পড়ছে। দেহ-জাংগি পৌছানোর আগে আগে আগে আমি বেদিন ও আনন্দ –মিশানো যে তরং অনুভব করছিলাম আবার তা অনুভব করি। আমি উপলদ্ধি করলাম –অতীতের সেই গৌরব যা একদিন ছিলো বাস্তব এবং সেই লজ্জায় যা একটি মহৎ সভ্যতার এই পরবর্তীকালের সন্তানদের অপমানে ঢেকে দিচ্ছিলো!
-আমাকে বলু- এ কেমন করে হলো যে, আপনাদের নবীর ধর্ম এবং এর সকল সরলতা ও স্বচ্ছতা আপনাদের আলিমদের বন্ধ্যা ধ্যান-ধারণা ও কূটতর্কের জঞ্জালের নীচে চাপা পড়ে গেলো? এ কেমন করে হলো যে, আপনাদের রাজা-বাদশাহ এবং বড় বড়ব জমিদারেরা ধন-ঐশ্বর্য এবং বিলাসিতার মধ্যে ফূর্তিতে মাতলামী করছে যখন তাদের বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভাইয়েরা কোনো রকম জীবন ধারণ করছে অনির্বচনীয় দারিদ্র ও নোংরা পরিবেশে-যদিও আপনাদের নবী শিখিয়েছিলেন ‘কোনো মানুষই দাবি করতে পারে না সে মুমিন যদি সে নিজে পেট বোঝঅই করে খায় যখন তার প্রতিবেশী থাকে ক্ষুধার্ত?’ আপনি কি আমাকে বোঝাতে পারেন, আপনারা কে কেন স্ত্রীলোকদের ঠেলে সরিয়ে দিয়েছেন জীবনের পশ্চাদভূমিতে যদিও নবী এবং তাঁর সহচরদের চারপাশে যেসব মহিলা ছিলেন তাঁরা তাঁদের পরুষদের জীবনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ব্যাপকভাবে? এ কেমন করে হলো যে, আপনার-মুসলমানদের মধ্যে অতো বেশি লোক অজ্ঞ এবং অতি সামান্য সংখ্যক মানুষই কেবল শিখতে ও পড়তে পারে-যদিও আপনাদের নবী ঘোষণা করেছিলেন, ‘জ্ঞানের অনুসন্ধান করা প্রত্যেক মুসলিম নর এবং নারীর জন্য বাধ্যতামূলক পবিত্রম কর্তব্য’, যদিও তিনি বলেছিলেন, ‘কেবলেই যে ব্যক্তি ধার্মিক তার উপার জ্ঞানী মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অন্য সকল তারার উপ র পূর্ণিমার চাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের মতো?
তখনো কোনো কথা না বলে পলকহীন দৃষ্টিতে মেজবান আমার দিকে তাকিয়ে আছেন এবং আমি ভাবতে শুরু করি, আমার এই বিস্ফোরণে তিনি হয়ত আহত হয়েছেন, তাঁর অন্তরের গভীরে। বীণাবাদক লোকটি আমাকে অনুসরণ করার মতো ফার্সী বোঝে না বলে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে বিদেশী লোকটির দিকে- যে এতো আবেগের সংগে কথা বলেছে ‘হাকিমে’র সাথে। শেষ পর্যন্ত ‘হাকিম’ তাঁর চওড়া হলদে ভেড়ার চাদরটি গায়ে জড়ালেন, যেন তাঁর ঠান্ডা লেগেছে। তারপর ফিসফিস করে বললেনঃ
‘কিন্তু .. . আপনি তো একজন মুসলমান।.. .’
আমি সশব্দ হাসিতে উচ্চকিত হই এবং বলিঃ না, আমি মুসলিম নই। কিন্তু আমি ইসলামের মধ্যে এতো সৌন্দর্য দেখতে পেয়েছি যে, মাঝে মাঝে আমি রেগে যাই যখন দেখি আপনার এর অপচয় করছেন। .. . আমি যদি খুব রূঢ় কথা বলে থাকি আমাকে মাফ করবেন। আমি দুশমন হিসাবে কথা বলিনি।’
আপনি একজন মুসলমান; কেবল আপনি নিজে জানেন না, এই যা.. .।’ কেন আপনি এখানে, এই মুহূর্তে বলছেন না ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ –আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর রাসূল?” এবং কেন কার্যত একজন মুসলমান হচ্ছেন না, যেমনি আপনি ইতিমধ্যেই আছেন আপনার অন্তরে? বলুন ভাই, এখনি একথা উচ্চারণ করুণ, আগামীকাল আমি আপনার সাথে যাবো কাবুল আপনা নিয়ে যাবো ‘আমীরে’র কাছে, আর তিনি দু’বাহু বাড়িয়ে আপনাকে অভ্যর্থনা। তিনি আপনা দেবেন ঘরবাড়ি, বাগান এবং গরু-বাছুর, আর আমরা সবাই আপনাকে ভালোবাসবো। বলুন ভাইজান.. .
-‘আমি যদি কখনো একথা উচ্চারণ করি তা করবো এ কারণে যে, আমার মন শান্তিতে স্তিতি লাভ করেছে –‘আমীরে’র ঘরবাড়ি এবং বাগিচার জন্য নয়।’
কিন্তু তিনি জেদ করতে থাকে, ‘আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ ইসলাম সম্পর্কে যা জানি আপনি তো এখনি তার চাইতে অনেক বেশি জানেন। কী সেই জিনিসটি যা আপনি এখনো বুঝতে পারেননি?’
-‘প্রশ্নটি বোঝার নয়, বরং সন্দেহমুক্ত হয়ে এই বিশ্বাস করার প্রশ্নঃ এ প্রত্যয় যে, কুরআন প্রকৃত আল্লাহর বাণী এবং একজন মহামানবের বিস্ময়কর সৃষ্টি কেবল নয়.. .’
কিন্তু পরবর্তী ক’টি মাস আমার সে আফগান বন্ধুর কথাগুলি মন থেকে আমি কখনো সরিয়ে রাখতে পারলাম না।
কাবুল থেকে আমি দক্ষিণ আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে প্রাচীন নগরী গজনী হয়ে কয়েক হপ্তা ঘোড়ায় চড়ে সফর কর। গজনী থেকেই প্রায় এক হাজার বছর আগে মহাবীর মাহমুদ বার হয়েছিলেন ভারত বিজয়ে। আমি চলি বিদেশী শহরের মতো দেখতে কান্দাহারের ভেতর দিয়ে, যেখানে আপনি সাক্ষাত পাবেন পৃথিবীর দুর্ধর্ষতম যোদ্ধা উপজাতিগুলির। আমি পাড়ি দিই আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের মরুভূমি এবং আবার ফিরে আসি হিরাতে,যেখান থেকে শুরু হয়েছিলো আফগানিস্তা পায়ে চলার রাস্তা।
সে ছিলো ১৯২৬ ইংরেজি। শীতকালের শেষ দিকে আমি হিরাত ত্যাগ করি- আমরার স্বদেশমুখী দীর্ঘ সফরের প্রথম পর্যায়ে আমি ট্রেনে করে যাই আফগান সীমান্তে থেকে রুশ তুর্কিস্থানের মার্ভে, সেখান থেকে সমরখন্দে- সমরখন্দ থেকে বোখারায় এবং তাসখন্দে, আর সেখনা থেকে তুর্কমান স্তেপ অঞ্চল পাড়ি দিয়ে যাই উরাল আর মস্কোতে।
সোভিয়েত রাশিয়ার যে ছাপ আমার মনে প্রথম এবং সবচেয়ে স্থায়ীভাবে মুদ্রিত হয়ে আছে তা হচ্ছে মর্ভের রেল ষ্টেশনে একটা মস্ত বড়ো, অতি সুন্দরভাবে চিত্রিত পোষ্টার-যাতে দেখানো হয়েছিলোঃ নীল রংয়ের ঢিলা জামা পরা এক তরুণ প্রলেতারিয়া বুট জুতা দিয়ে লাথি মেরে মেঘ-ভরা আকাশে থেকে ফেলছে এক হাস্যকর সাদা দাড়িওয়ালা জোব্বা পরা ভদ্রলোককে। পোষ্টারের নীচে এই রুশ উপকথাটি ছিলো লিখিতঃ এভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রমিকেরা খোদাকে লাথি মেরে তাড়িয়েছে আকাশ থেকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সোশ্যালিষ্ট রিপাবলিকের ‘বেজবোজনিকি’ (নাস্তিক) এসোসিয়েশন কর্তৃক প্রকাশিত।
যেখানে যাই, প্রত্যেক জায়গাই , এ ধরনের সরকার অনুমোদিত ধর্ম-বিরোধী প্রচারণ হুমড়ি খেড়ে পড়ে চোখের উপরঃ সরকারী দালান-কোঠায়, সড়কে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে যে কোন ইবাদত খানার আশেপাশে। তুর্কিস্থানে স্বভাবতই এসব ইবাদতখানার বেশির ভাগ ছিলো মসজিদ। প্রকাশ্য সালাতের জামাত নিষিদ্ধ ঘোষিত না হলেও মানুষ যাতে জামাতে শরিক হতে না পারে তার জন্য কর্তৃপক্ষ সকল চেষ্টাই করতো। আমি প্রায় শুনতাম, বিশেষ করে বোখারা এবং তাসখন্দেঃ যে মানুষই মসজিদে ঢোকে পুলিশ গোয়েন্দারা তার নাম টুকে রাখছেঃ কুরআনের কপিগুলি এক জায়গায় জমা করে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। আর তরুণ বেজবোজনিকিদের একটি মজার খেলা ছিলো মসজিদের ভেতরে শূকরের মাথা নিক্ষেপ করে। সত্যি একটি চমৎকার রীতি বলতে হয়।
এশীয় এবং ইউরোপীয় রাশিয়ার ভেতর দিয়ে কয়েক হপ্তা ভ্রমনের পর আমি যখন পোলাণ্ডের সীমান্ত অতিক্রম করি, আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আমি সোজা চলে যাই ফ্রাংকফুর্ট এবং হাযির হই গিয়ে আমার সংবাদপত্রের এতোদিনের পরিচিত এলাকার মধ্যে। একথা বুঝতে আমার খুব দেরী হলো না যে, আমার অনুপস্থিতিকালে আমার নাম খুবেই মশহুর হযে পড়েছে এবং মধ্য ইউরোপের বৈদেশিক সংবাদদাতাদের মধ্যে সবচেযে যারা বেশি পরিচিত আমাকে এখন তাঁদেরই অন্যতম বলে মনে করা হচ্ছে। আমার কয়েকটি প্রবন্ধ-বিশেষ করে ইরানীদের জটিল ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে যে প্রবন্ধগুলি লিখেছিলাম সেগুলি-বিখ্যাত প্রচ্যবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো এবং সেগুলি যে স্বীকৃত লাভ করেছে তা মামুলি নয়। এই কৃতিত্বের বদৌলতে বার্লিনের একাডেমী অব জিওপলিটিক্স-এ কয়েকটি ভাষণ দেওয়ার জন্য আমি আমন্ত্রিণ হই। সেখানেই আমাকে বলা হলো- আমার বয়েসের একজন মানুষকে (তখনো ছাব্বিশ হয়নি আমার বয়ষ) এ ধরণের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে যা এর আগে কখনো ঘটেনি। সর্বসাধারনের অধিকতরো উপযোগী প্রবন্ধগুলি ফ্রাংকফুর্টার শঅইটৃঙের অনুমতি নিয়ে পুনর্মুদ্রণ করেছে অন্য অনেক সংবাদপত্র। আমি জানতে পারলাম, আমার একটি প্রবন্ধ পুনর্মুদ্রিত হযেছে প্রায় ত্রিশ বার সবদিক আমার ইরান সফর হয়েছিলো খুবই ফলপ্রসূ।
.. . …. … .. .. .. .. . এ সময়েই আমি এলসাকে বিয়ে করি। যে দুবছর আমি ইউরোপ থেকে দূরে ছিলাম তা আমাদের ভালবাসাকে দুর্বলতরো না করে বরং আরো মজবুত করেছিলো; আর এমন একটা খুশী আর আনন্দের সাথে আমি আমাদের দু’জনের বয়সের বৃহৎ ব্যবধান সম্পর্খে তার আশংকা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলাম জীবনে যা এর আগে আর কখনো আমি অনুভব করিনি।
-কিন্তু তুমি কেমন করে আমাকে বিয়ে করবে? এলসা যুক্তি পেশ করে, তোমার বয়স এখন ছাব্বিশও নয়, আর আমি এখন চল্লিশের উপরে। একটু ভেবে দেখোঃ তোমার বয়স যখন ত্রিশ হবে আমার বয়স হবে তখন পঁয়তাল্লিশ, আর যখন তুমি যখন চল্লিশে পৌছুবে আমি তো তখন বুড়ি.. .।
আমি উচ্চৈস্বরে হেসে উঠিঃ ‘তাতে কি হয়েছে? তোমাকে ছাড়া আমি আমার ভবিষ্যৎ কল্পনাও করতে পারি না।’
এবং শেষ পর্যন্ত এলসা হার মানে।
আমি অতিশয়োক্তি করিনি যখন আমি বললাম, এলসাকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের কল্পনা করা আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়। সৌন্দর্য আর সহজাত মাধুর্য এলসাকে আমার নিকট এমন পরম আকর্ষণীয়া করে তুলেছিলো যে, অন্য কোনো স্ত্রীলোকের দিকে আমি তাকাতেও পারতাম না। আর জীবন থেকে আমি কী চাই এ বিষয়ে তার সুগ্রাহী বোধ আমার আশা ও আকাংখাকে করে আলোকিত এবং এগুলিকে করে তোলে আরো বেশি কংক্রীট, আরো বেশি ধার্য- আমার নিজের চিন্তা –ভাবনা যা কখনো করতে পারতো, তা থেকে এগুলিকে আরো কংক্রীট, আরো ধার্য করে তোলে।
একবার –খুব সম্ভব আমাদের বিয়ের এক হপ্তা পরে-এলসা মন্তব্য করেঃকী আশ্চর্য যে সকল মানুষের মধ্যে তুমিই ধর্মে মিষ্টি-সিজমকে অবজ্ঞা করছো.. . তুমি নিজেই তো একজন মিস্টিক-ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে এক ধরনের মিস্টিক, তোমার চারপাশের জীবনের দিকে তুমি আগাচ্ছো তোমার আঙুলের ডগায় পরশ করে করে, প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই একটা সুক্ষ্ণ জটিল মিষ্টিক নকশা দেখে দেখে-অনেক কিছুর মধ্যেই –যা অন্য মানুষের কাছে মনে হয় অতি তুচ্ছ, অতি সাধারণ.. .অথচ যে মুহূর্তে তুমি ধর্মের দিকে তাকাও তুমি তখন একেবারেই মগজসর্বস্ব। অন্য প্রায় সকল লোকের ক্ষেত্রেই তো এর বিপরীতটিই বরং হতো.. .
কিন্তু এলসা সত্যিই হতবুদ্ধি হয়নি। আমি যখন ইসলামের কথা তাকে বলতাম তখন আমি যে কিসের সন্ধানে রয়েছি তা সে জানতো, যদিও সে হয়তো আমার মতো এতো তীব্র তাগিদ অনুভব করেনি, তবু আমার প্রতি তার ভালোবাসাই তাকে আমার এ অনুসন্ধানে আমার অংশী করে তোলে।
প্রয়ই আমরা দুজন এক সংগে কুরআন পাঠ করি এবং কুরআনের বিভিন্ন ভাবধঅর নিয়ে দুজনে আলোচনা করি; আর এলসাও আমার মতোই এর নৈতিক শিক্ষা এর এর বাস্তব ব্যবহারিক নির্দেশেল মধ্যে যে আন্তরিক সংযোগ রয়েছে ক্রমেই অধিকতরো প্রভাবিত হয়ে উঠতে থাকে। আল –কুরআনের মতে, মানুষেল কাছ থেকে আল্লাহ অন্ধ আনুগত্য চান না, বরং আবেদন জানান তার বুদ্ধির প্রতি; তিনি মানুষের নিয়তি থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকেন না, বরং তিনি ‘তোমার ঘাড়ের রগের চাইতেও তোমার নিকটতরো’। তিনি ধর্ম এবং সামাজিক আচরণের মধ্যে টেনে দেননি কোনো ভেদরেখাঃ আর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সম্ভবত এই যে, আল্লাহ এই স্বতঃসিদ্ধ থেকে শুরু করেননি যে, জীবন মাত্রই জড় ও আত্মার দ্বন্ধে ভারাক্রান্ত এবং আলোর দিকেপথ পেতে হলে আত্মাকে মুক্ত করতে হবে দেহের বন্ধন থেকে। জীবনের অস্বীকৃতি এবং আত্মা –নিগ্রহ, তা যে ধরনেরই হোক না কেন, রসূল তাঁর নিন্দা করেছেন তাঁর এই ধরনের উক্তিতে, ‘জেনে রেখো, কৃচ্ছসাধন আমার জন্য নয়’ এবং ‘ইসলামে সন্ন্যাসবাদের স্থান নেই’। মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে কেবল যে একিট ইতিবাচক ফলপ্রসূ প্রবৃত্তি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তা নয়, তাকে একটি নৈতিক স্বতঃসিদ্ধের পবিত্রতায়ও মণ্ডিত করা হয়েছে। কার্যত মানুষকে এই শিক্ষাই দেওয়া হয়েছেঃ তুমি যে কেবল তোমার জীবনের পুরাপুরি ব্যবহারই ‘করতো পারো’ তা নয়, তুমি তা করতে ‘বাধ্যও’ বটে।
ইসলামের একটি সুসংহত রূপ এমন এক চূড়ান্ততা ও নিশ্চয়তা নিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগলো যে, মাঝে মাঝে আমি বিস্ময়-বিমূঢ় হয়ে পড়তাম। এমন প্রক্রিয়ায় এটি আকার নিচ্ছিলো যাকে এক ধরনের মানসিক ওসমসিস বলেই বর্ণনা করা যেতে পারে, অর্থাৎ গত চার বছর ধরে জীবন পথে আমার টুকরা টুকরা যে জ্ঞান হয়েছে আমার পক্ষে সজ্ঞানে সেগুলিকে একত্রে গেঁথে তোলা এবং ‘বিধিবদ্ধ’ করার কোনো চেষ্টা ছাড়াই ধীরে ধীরে তা আকার নিচ্ছিলো। আমি আমার সামনে এমন একটা কিছু দেকতে পেলাম, যা এক নিখুঁত স্থাপত্য-শিল্পেরই অনুরূপ, যার সব কটি উপাদান-উপকরণকেই এরূপ সংগুতি রেকে ধারণ করা হয়েছে, যেনো প্রত্যেকটিই অপরের পরিপূরক ও সহায়ক হয়, যাতে বাহুল্য কিছু নেই এবং অভাবও কিছুরই নেই-এমন একটি সমতা ও সমাহিত ভাব, যা মানুষেল মধ্যে এ ধারণার জন্ম দেয় যে, ইসলামের দৃষ্টিভংগি এবং স্বতঃসিদ্ধের মধ্যেই রয়েছে প্রত্যেকটি বিষয়ের অবস্থান ‘তার যথাযথ স্থানে’।
তের-শ বছর আগে একটি মানুষ দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা করেছিলেনঃআমি একজন মরণশীল মানুষ মাত্র; কিন্তু যিনি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাকে আদেশ করেছেন তাঁর বাণী তোমাদের নিকট পৌছে দেওয়ার জন্য। তোমরা যাতে তাঁর দৃষ্টি-পরিকল্পনার সাথে সংগুতি রেখে জীবন-যাপন করতো পারো, সেজন্য তিনি আমকে আদেশ করেছেন, তাঁর অস্তিত্ব, সর্বশক্তিমত্তা ও সর্বদর্শিতার বিষয় তোমাদের ‘স্মরণ করিয়ে দিতে এবং তোমাদের সামনে আরচরণের একটি কর্মসূচী পেশ করতে। তোমরা যদি আমার এই তাগিদ ও এই কর্মসূচী গ্রহণ করো, তাহলে আমাকে অনুসরণ করো’। এই ছিলো মুহাম্মদ (সা) –এর নবুয়তের সারকথা।
তিনি যে সামাজিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন সে হচ্ছে এক সরল জীবনের পরিকল্পনা, যা কেবল প্রকৃত মহত্তের সংগেই ধরাধরি করে চলে। এর সূচনা এই সূত্র থেকে যে, মানুষ এক জৈব সত্তা, যার রয়েছে জৈব চাহিদা এবং মানুষের স্রষ্টা কর্তৃক মানুষের প্রকৃতি এমনভাবেই সৃষ্ট যে, তাদের দৈহিক-মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজন পুরাপুরি মিটানোর জন্য তাদের অবশ্যি দলবদ্ধভাবে জীবন যাপন করতে হবেঃ সংক্ষেপে, মানুষ একে অন্যের উপর ‘নির্ভরশীল’। কোনো ব্যক্তির আধ্যাত্মিক উচ্চতা (সকল ধর্মেরই মূল লক্ষ্য) লাভে ধারাবাহিকতা নির্ভর করে সে তার চতুষ্পার্শের লোকদের কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছে কি না, তাদরে দ্বারা উৎসাহিত ও রক্ষিত হয়েছে কি না, তার উপরঃ অবশ্য তার চারপাশের লোকেরাও তার কাছ থেকে আশা করে একই রূপ সহযোগীতা। মানুষের এই পারষ্পরিক নির্ভরশীলতাই হচ্ছে সেই কারণ যার জন্য ইসলামের ধর্মকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীনীতি থেকে আলাদা করা যায়নি। মানুষের বাস্তব ব্যক্তিত্বের বিকাশের পথে বাধা পায় নূন্যতম সংখ্যক এবং উৎসাহ পায় যতো বেশি সম্ভব মনে হয়। এই-ই-আর কিছুই নয়-সমাজের সত্যিকার কর্তব্য সম্পর্কে ইসলামের ধারণা! আর এ কারণেই এটা খুব স্বাভঅবিক ছিলো যে, নবী মুহাম্মদ তাঁর রিসালাতের তেইশ বছরে যে –ব্যবস্থাকে রূপ দিয়েছিলেন তার সম্পর্খে কেবল রূহানী ব্যাপারের সংগেই ছিলো না, সকল প্রকার ব্যক্তিগত ও সামাজিক কাজকর্মের একটা কাঠামোও তাতে দেওয়া হয়েছিলো। এ ব্যবস্থায় কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের ধঅরণাকেই উচ্চে তুলে ধরা হয়নি, এই সদাচরণের ফলস্বরূপ যে সুষম সমাজের উদ্ভব হওয়া উচিত সে ধারণাকেও দিয়েছে সম্যক গুরুত্ব। একটি রাষ্ট্রনৈতিক সম্প্রদায়ের রূপরেখা মাত্র এতে দেওয়া হয়েছে-কেবল রূপরেখাই, কারণ মানুসের রাজনৈতিক প্রয়োজনের খুঁটিনাটি কালের দ্বারা সীমিত এবং সে কারনে পরিবর্তনশীল-আরো রয়েছে ব্যক্তিগত অধিকার ও সামাজিক দায়িত্বের স্কীম, যাতে ঐতিহাসিক বিবর্তনতের বাস্তবতাকে আগাম ধরে নেওয়অ হয়েছে সঠিকভাবে। ইসলামী জীবনপদ্ধতির আওতায় পড়ে জীবনের সকল দিক-নৈতিক এবং দৈহিক, ব্যক্তিগত এবং সামাজিক। রাসূলের শিক্ষায় দেহ এবং মনের সমস্যাকে, যৌন ও অর্থনৈতিক প্রশ্নকে তাদের ন্যায্য স্থান দেওয়া হয়েছে ধর্মতত্ত্ব ও ইবাদতের সমস্যার পাশাপশি এবং জীবনের সংগে যা –কিছু সম্পর্কিত কখনো এতোটা তুচ্ছ বিবেচিত হয়নি যে, ধর্মীয় চিন্তার বৃত্তের মদ্যে তাকে আনা যাবে না – এমন কি, ব্যবসা- বাণিজ্য, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির অধিকার অথবা ভূমি স্বত্বের মতো নেহাৎ জাগতিক সমস্যাকে ও অতোটা তু্চ্ছ জ্ঞান করা হয়নি!
ইসলামী আইনের সবকটি ধারাই পরিকল্পিত হয়েছে জন্ম, জাতি , লিংগ পার্থক্য না করে অথবা সামাজিক আনুগত্য নির্বিশেষে, সমাজের সকল সদস্যের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা ও কল্যাণ বিধান হিসাবে। এ সমাজের প্রতিষ্ঠাতা বা তাঁর বংশধরদের জন্য কোন সুযোগ সুবিধা ও সংরক্ষিত ছিলো না। এবং অসিত্ব ছিলো না শ্রেণীর ধারণার। যার ইসলামে বিশ্বাস করে তাদের সকলের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য সকল অধিকার, কর্তব্য সুযোগ-সুবিধা । আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্য কোনো কোনো পুরোহিতের প্রয়োজন নেই, কারণ তিনি জানেন যা তাদে হাতে আছে তাদের সম্মুকে এবং যা ওরা গোপন করে ওদের পশ্চাৎদেশে । আনুগত্য কেবল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি, নিজের মা-বাপের প্রতি ,এবং যে সমাজের লক্ষ্য পৃথিবীতে আল্লাহর রাজ্য স্থাপন সেই সমাজের প্রতি। এছাড়া আর কারো প্রতি কোনো আনুগত্যকে ইসলাম স্বীকার করে না, এবং এতে ঐ জাতীয় আনুগত্যের কোনো অবকাশ নেই যাতে বলা হয়, ‘ভালো হোক মন্দ হোক আমার দেশ’, অথবা ‘আমার জাতিই ঠিক’। এই নীতির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মহানবী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে একাধিকবার বলেছেনঃ সে আমার উম্মত নয় যে গোত্রগত দলীয় লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করে; সে আমার উম্মত নয় গোত্রগত দলীয় স্বার্থের জন্য লড়াই করে এবং সে আমার উম্মত নয় যে গোত্রগত দলপ্রীতির জন্য মারা যায়।
ইসলামের পূর্বে সকল রাজনৈতিক সংগঠন-এমকি ধর্মতান্ত্রিক অথবা আধা-ধর্মতান্ত্রিক ভিত্তির সংগঠনগুলিও-সীমাবদ্ধ ছিলো গোত্র এবং গোত্রগত সমরূপতার সংকীর্ণ ধারণার দ্বারা। তাই প্রাচীন মিসরের দেবতা-রাজারা নীল উপত্যকা এবং তার অধিবাসীদের সীমান্তের ওপারে কোনো কিছুর চিন্তা করতো না এবং হিব্রুদের প্রথম- দিকের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যখন আল্লাহই রাজ্য শাসন করেন বলে মনে করা হতো তখনো অনিবার্যভাবেই আল্লাহ ছিলেন বনি-ইসরাঈলের আল্লাহ! পক্ষান্তরে, কুরআনী চিন্তাধঅরার কাঠামোর মধ্যে জন্ম অথবা গোত্রের প্রতি আনুগত্যের কোন স্থান নেই। ইসলামে এমন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সমাজের ধারণা করা হয়েছে যা গোত্র ও জাতের গতানুগতিক বিভাগকে অস্বীকার করে। এদিক দিয়ে ইসলাম ও খৃষ্টধর্মের লক্ষ্য অভিন্ন; একথা বলা যেতে পারেঃ উভয়েই একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রাদায় গঠন করতে চায় , যা গড়ে উঠবে সাধারণ একটি আদর্শের প্রতি তাদের আনুগত্যের ভিত্তিতে। কিন্তু খৃষ্টধর্মে যেখানে এই নীতির কেবল নৈতিক ওকালতি করেই সন্তুষ্ঠ থেকেছে এবং সীজারকে তার প্রাপ্য দেবার জন্য খৃষ্টধর্মের অনুসারীদের পরামর্শ দিয়ে এ ধর্মের বিশ্বজনীন আবেদনকে কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে সীশাবদ্ধ রেখেছে, সেখানে ইসলাম দুনিয়ার সামনে এমন একট রাষ্ট্রনৈতিক সংগঠনের স্বপ্ন মেলে ধরেছে যেখানে ঐশী চেতনাই হবে মানুষের ব্যবহারিক আচরণের প্রধান চাবিকাঠি এবং সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠানের একমাত্র ভিত্তি।
এভাবে, খৃষ্টধর্ম যা অপূর্ণ রেখে দিয়েছিলো তা পূর্ণ করে ইসলাম মানুষের বিকাশের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেঃ আর এক হচ্ছে, একটি মুক্ত আদর্শভিত্তিক সমাজের প্রথম দৃষ্টান্ত যা অতীতের রুদ্ধ, জাত অথবা ভৌগলিক দিক দিয়ে সীমাব্ধ, সমাজগুলি বিপরীত।
ইসলাম এমন একটি সভ্যতা কল্পনা করে এবং জন্ম দেয় যাতে জাতীয়বাদের অবকাশ নেই, নেই কোন কায়েমী স্বার্থ, কোন শ্রেনী-বিভাগ, কোন চার্চ পুরোহিত প্রথা জন্মগত আভিজাত্য। আসলে জন্মগত কোনো বৃত্তিই ইসলামে নেই। লক্ষ্য ছিলো আল্লাহর দিকে লক্ষ্য রেখে ধর্মতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এবং মানুষে মানুষে গণতন্ত্র স্থাপনের। এই নতুন সভ্যতার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য-যা ইসলামকে মানব ইতিহাসে আর সকল আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিয়েছে –এই বাস্তব বিষয় যে, এ সভ্যতা সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছা –সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে উঠবে বরে কল্পনা করা হয়েছিলে এবং কার্যত স্বেচ্ছ-সম্মতির ফলেই তার জন্ম হয়েছিলো। ইতিহাসে পরিচিতি অন্য সকল সম্প্রদায়ে এবং সভ্যতায়ই পরস্পর বিরোধী স্বার্থের চাপ এবং পাল্টা পাপের সামাজিক প্রগতি –ইসলামে কিন্তু তা নয়। এখানে সমাজের প্রগতি হচ্ছে একটি মৌলিক সংবিধানের অবিচ্ছদ্য অংশ অন্য কথায়, মূলেই বিদ্যমান রয়েছে একটি প্রকৃত সামাজিক চুক্তিঃ পরবর্তী কালের ক্ষমতাধিকারীরা তাদের সুযোগ –সুবিধা রক্ষা করার জন্য যে বাক্যলংকারের আশ্রয় নিয়েছিলো সে বিচারে নয়-ইসলামী সভ্যতার বাস্তব ঐতিহাসিক উৎস হিসাবেই। আল কুরআন বলেঃ
দেখো, আল্লাহ বিশ্বাসীদের নিকট থেকে তাদের দেহ –প্রাণ এবং ধন সম্পদ খরিদ করে নিয়েছেন, পরিবর্তে তাদের দিয়েছেন জান্নাতের ওয়াদা.. . তাহলে তোমরা যা খরিদ করেছো তার জন্য আনন্দ করো, কারণ এ তো এক মহাসাফল্য।
আমি জানতাম, এই মহাসাফল্য –ইতিহাসে লিপিব্ধ সত্যিকার সামাজিক চু্ক্তির একমাত্র দৃষ্টান্ত মাত্র কিছু কালের জন্য রূপায়িত হয়েছিলো বাস্তবে। অথবা এ –ও বলা যায়, মাত্র কিছুকালের জন্যই একে বাস্তবে রুপায়িত করার জন্য ব্যাপক আকারে চেষ্টা করা হয়েছিলো। রসূলের মৃত্যুর পর একশ বছরের কম সময়ের মধ্যে ইসলামের আদি-রাষ্ট্রীয় রূপটি দূষিত হতে শুরু তরে এবং পরবর্তী শতকগুলিতে মূল কর্মসূচীটিকে ধীরে ধীরে পশ্চাতভূমিতে ঠেলে দেওয়া হয়। স্বাধীন নরনারীর স্বাধীন সম্মতির স্থান গ্রহণ করে ক্ষমতার জন্য্ বংশগত দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ। বংশগত রাজতন্ত্র যা ইসলামের ধর্মীয় চিন্তাধারার ঘোর বিরোধী যেমন বহু –ঈশ্বরবাদ তেমনি বিরোধী ইসলামের রাষ্ট্রনৈতিক ধ্যান-ধারণার শিগগিরিই মঞ্চ দখল করে বসলো এবং তার সংগে এলো বিভিন্ন রাজবংশের মধ্যে সংঘর্ষ ও ষড়যন্ত্র, গোত্রগত আনুগত্য ও ভালোমন্দের ধারণা,জোর –জুলুম এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সেবাদাসী স্তরে ধর্মের সাধারণ অধঃপতন। সংক্ষেপে, ইতিহাসে সুপরিচিত ‘কায়েমী স্বার্থবাদী’দের সমগ্র দলটিই এসে হাজির হলো। কিছুকাল মহান ইসলামী চিন্তাবিদেরা ইসলামের সত্যিকার আদর্শকে বিকৃতির হাত থেকে বাঁচিয়ে উচ্ছে তুলে ধরার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁদের পরে যাঁরা ছিলেন প্রতিভার দিক দিয়ে নিম্মতরো পর্যায়ের; তাঁরা দুই কিম্বা তিন শতাব্দী পরে হারিয়ে গেলেন বুদ্ধিবৃত্তিক মামুলী রীতি-প্রথার বদ্ধ জলায়। তাঁরা নিজেরা চিন্তা করার দায়িত্ব ত্যাগ করলেন এবং পূর্ববর্তী যুগগুলির মৃত বাগধারাগুলির পুনরাবৃত্তি করেই তাঁরা তুষ্ট থাকলেন, তাঁরা ভুলে গেলেন যে, প্রত্যেকটি মানবিক ‘মতই’ সময়ের দ্বারা সীমিত এবং তাতে ভ্রান্তির অবকাশ আচে আর এর কারণে চিরকাল তার নতুন রূপদানের প্রয়োজন আছে। ইসলামের মূল প্রবর্তনা শুরুতে যা ছিলো এতো প্রবল এবং প্রচন্ড-কিছুকালের জন্য মুসলিম কমনওয়েলথকে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিশাল উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ছিলো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক এবং শৈল্পিক কৃতিত্বের সেই উজ্জ্বল স্বপ্নের জগতে, যাকে ইতিহাসবিদেরা বর্ণনা করেন ইসলামের সোনালী যুগ বলে। কিন্তু আর কয়েক শতকের মধ্যেই এই উদ্যম ও প্রবর্তনাও মরে গেলো আত্মিক পুষ্টির অভাবে এবং মুসলিম সভ্যতা ক্রমেই হয়ে উঠলো অধিকতরো মাত্রায় স্রোতোহীন এবং সৃজনী-শক্তিবর্জিত।
. .. .. . .. . .. .
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমার ধারণায় কোনো অস্পষ্টতা ছিলো না। যে-চার বছর আমি ঐসব দেশে কাটিযেছি তা থেকেই আমি দেখিছি যদিও ইসলাম এখনো জীবন্ত, যা ইসলামের অনুসারীদের বিশ্বকে দেখার বিশিষ্ট ভংগিতে এবং ইসলামের নৈতিক কর্তব্য বিষয়ক সূত্রগুলির নীরব স্বীকৃতিকে দৃশ্যমান, তবু তারা নিজেরা সেই সব লোকের মতোই ইসালমের পরিকল্পনাকে কার্যকরী করতে আজকের মুসলমানদের ব্যর্থতার চাইতেও, ঐ স্কীমের মধ্যেই যে –শক্তি ও সম্ভাবনা নিহিত রযেছে তার প্রতিই আমি ছিলাম বেশি আকৃষ্ট। আমার জন্য এটুকু জ্ঞানই যথেষ্ট ছিলো যে, ইসলামের ইতিহাসের একেবারে শুরুতে স্বল্পকালের জন্য হলেও ঐ স্কীমটিকে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য একট সফল চেষ্টা ‘করা হয়েছিলো’। এবং যা এক সময়ে সম্ভব মনে হয়েছিলো তা অন্য সময়েও হয়তো সত্যি সম্ভব হতে পারে। আমিনিজেকে বলি- মুসলমানেরা যদি মূল শিক্ষা থেকে সরে গিয়ে আলস্য এবং অজ্ঞতায় নিমজ্জিত হয়েই থাকে,তাতে কী হয়েছে? আরবের নবী তেরোশো বছর আগে তাদের সামনে যে আদর্শ তলে ধরেছিলেন তার যদি সে আদর্শ মোতাবিক জীভন যাপন না করে তাতেই বা কি হলো-যদিসেই আদর্শটিই, যার এর বাণী শুনাবর জন্য আন্তরিকভাবেই ইচ্ছুক তাদে সকলের জন্য আজো উন্মক্ত থেকে থাকে?
এবং এ-ও হতে পারে, আমি মনে মনে ভাবি, পরে যারা এসেছে তাদের জন্য এ বাণীর প্রয়োজন আরে অনিবার্যভাবেই বেশি-মুহাম্মদের কালের লোকদের চাইতেও । াতরা এমন একটা পরিবেশে বাস করতো যা আমদের পরিবেশ থেকে ছিলো অনেক বেশি সরল, আর এজন্য তাদরে সমস্য এবং অসুবিধাদির সমাধান ছিলো অনেক বেশি সহজ। আমি যে জগতে বাস করছি তার সমগ্রটাই টলটলায়মান;কারণ আত্মিক দিক দিয়ে এবং সে কারণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়েও ভাল কি এবং মন্দ কি সে সম্পর্কে কেনো ঐক্যমত্য নেই। আমি বিশ্বাস করতাম না যে, ব্যক্তি মানুসের ‘পরিত্রাণে’র প্রয়োজন আছেঃ কিন্তু এ আমার বিশ্বাস যে, আধুনিক সমাজের পরিত্রাণ আবশ্যক রয়েছে। আগের যে কোন সময়ের চাইতে ক্রমবর্ধমান নিশ্চয়তার সংগে আমি অনুভব করি, আমাদের এই কাল নতুন এক সমাজচুক্তির জন্য একটি দার্শনিক ভিত্তির মুখাপেক্ষীঃ এ কালের জন্য দরকার এমন একটি বিশ্বাসের, যা কেবল প্রগতির জন্য বৈষয়িক-প্রগতির শূন্যতা আমাদের নিকট উদঘটিত করে দেবে এবং তা সত্ত্বেও এই পৃথিবীর জীবনকে দেবে ন্যায্য পাওনা, আমাদের তা শেখাবে কী করে রূহানী এবং দৈহিক প্রয়োজনের মধ্যে স্থাপন করতে হবে ভারসাম্য; আর এভাবেই আমাদের বাঁচাবে সেই বিপর্যই থেকে যার মধ্যে আমরা ধেয়ে চলেছি হঠকারিতার সংগে।
.. . … …… .. .
একথা অত্যুক্তি হবে না যে, আমর জীবনেরে এই সময়টিতে,মনকে দখল করেছিলো ইসলামের সমস্যা – এটা তখন সমস্যই ছিলো আমার নিকট – অন্য সবকিছুকে আড়াল করে। সেই মুহূর্তে আমার একান্ত সমাহিত ভাব উঠেছিলো তার প্রাথমিক পর্যায়গুলিকে-যখন তা একটি অপরিচিত হয়তো বা আকর্ষণীয় আদর্শ ও সংস্কৃতির প্রতি এক বুদ্ধিবৃত্তিক আকর্ষনই কেবল ছিলো। কিন্তু তখন তা সত্যের জন্য এক তীব্র আবেগময় অনুসন্ধান হয়ে উঠেছে। এই অনুসন্ধানের সাথে তুলনায় গত দুবছরের সফরের দুঃসাহসিক অভিযানের চাঞ্চল্য পর্যন্ত তুচ্ছ হয়ে গেলোঃ পরিণাম হলো এই ফ্রাঙ্কফুর্টার শাইটুঙ-এর সম্পাদক আমার কাছ থেকে যে নতুন বইটি ন্যায় সংগতভাবেই আশা করছিলেন তা লেখার জন্য মনোযোগ দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়লো।
ডাঃ সাইমন বইটির রচনার ব্যাপারে আমর স্পষ্ট গড়িমাসি পহেলা প্রশ্রয়ের নযরেই দেখেছিলেন। আর যা-ই হোক আমি একটা দীর্ঘ সফর শেষে এই মাত্র ফিরে এসেছি এবং কোনো-না-কোনো রকমের ছুটি আমার পাওনা হয়েছে। আমার সাম্প্রতিক বিয়েও লেখার রুটিন থেকে কিছুটা অবকাশের প্রযোজনীয়তা আবশ্যক করে তুললো। কিন্তু এ ছুটি আর অককাশ যখন ডাঃসাইমন যা যুক্তিসঙ্গত মনে করেন তা ছাড়িয়ে, দীর্ঘতর হতে লাগলো তখন তিনি বললেন, আমর এখন মর্ত্যলোকে ফিরে আসা উচিত। পেছনের দিকে তাকালে মনে হয় তিনি ছিলেন খুবই বিবেচক; কিন্তু এ সময়ে তাকে ভিন্ন রকম মনে কহলো। ‘বইটি’ সম্পর্কে তাঁর ঘন ঘন এবং জরুরী জিজ্ঞাসার ফল তাঁর আশার বিপরীত হলোঃ আমার মনে হলো, যেনো একটা বোঝা আমার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে, আমি বইটির কথা মনে হলেই বিরক্ত বোধ করতে শুরু করলাম। আমি এখন পর্যন্ত যা দেখেছি তা বর্ণনা করার চাইতে এখনো আমাকে যা আবিষ্কার করতে হবে তাই নিয়ে ছিলাম অধিকতর ব্যস্ত।
শেষ পর্যন্ত ডঃ সাইমন ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে কর্কশ ;মন্তব্য করে বসলেনঃ আমি মনে করি না যে, কখনো তোমার দ্বারা এই বইটি লেখা হবে। তুমি তো ‘হরর লিব্রি’তে ভুগছো।
কিছুটা যেনো হুলবিদ্ধ নিয়েই আমি জবাব দিইঃ আমর অসুখ এর চেয়ে আরো মারাত্মক কিছুও হতে পারে। সম্ভবত আমি ভুগছি ‘হরর স্ক্রিভেন্ডিতে’।
-‘ভালো, তোমার যদি ঐ পীড়াই হয়ে থাকে’, তিনি তৎক্ষণাৎ মুখের উপর জবাব দেন –‘তুমি কি মনে করো’, ‘ফ্রাংকফুটার শাইটুঙ’ তোমার উপযুক্ত স্থান’? কথার পিঠে কথা বেড়ে চলো এবং আমাদের মতানৈক্য ক্রমে রূপ নেয় বিবাদে। সেদিনিই আমি ‘ফ্রাংকফুটার শাইটুঙ’ থেকে ইস্তফা দিই এবং এক হপ্তা পর এলসাকে নিয়ে বার্লিনের পথে রওয়ান করি।
অবশ্য সাংবাদিকতা ত্যাগ করার ই্চ্ছা আমার ছিলো না। কারণ , লেখা আমাকেযে স্বচ্ছন্দ জীবিকা এবং আনন্দ যুগিয়েছিলো (যা সাময়িক ভাবে নষ্ট করে দিয়েচিলো ওই ‘বইটি’) তা বাদ দিলেও মুসলিম জাহানে আবার আমার ফিরে যাওয়ার একমা্রত উপায় এই-ই ছিলো। আর মুসলিম জাহানে আমি ফিরে যেতে চাইছিরাম যে কেনো মূল্যে। কিন্তু গত চার বছরে আমি যে খ্যাতি লাভ করেছি, তাতে আমর জন্য খবরের কাগজের সংগে নতুন সংযোগ স্থাপন কঠিন ছিলো না। ফ্রাংকফুটারের সংগে আমর সম্পর্ক কেটে যাওয়ার পর আমি খুবেই সন্তোষজনক চুক্তি করি অন্য তিনটি সংবাদপত্রের সংগেঃ পত্রিকাগুলি হচ্ছে –জুরিখের ‘নিউজরখা শাইটুঙ’, আমস্টার্ডামের ‘টেলিগ্রাফ’ এবং কোলানের ‘কোলনিশে শাইটুঙ’। এখন থেকে এই তিনটি পত্রিকায় একযোগে মুদ্রিত হবে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কিত আমার প্রবন্ধগুলি। ফ্রাংকফুটার শাইটুঙ –এর সাথে এই সংবাদপত্রগুলি তুলনীয় না হলেও ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাসমূহের অন্তর্গত ছিলো এগুলি।
সাময়িকভাবে আমি আর এলসা বার্লিনে ঠিকান গাড়ি। ওখানে আমি ‘একাডেমী অব জিও-পলিটিক্স-এ আমার ধারাবাহিক ভাষণগুলি সম্পূর্ণ করবো এবং ইসলাম বিষয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাবো, এই ছিলো আমার ইরাদা।
আমাকে আবার দেখতে পেয়ে আমার সাবেক সাহিত্যিক বন্ধুরা খুশী হলো। কিন্তু আমি যখন মধ্যপ্রাচ্য যাই তখন আমাদের সাবেক সম্পর্কের সূত্রগুলি যেস্থানে রেখে গিয়েছিলাম ঠিক সেই জায়গা থেকে সে সম্পর্ক আবার শুরু করা কেন যেনো আর সহজ ছিলো না। আমরা অপরিচিত হয়ে উঠেছি, আমরা আর এই বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষায় কথা বলীছ না। বিশেষ করে, আমি যে ইসলাম নিয়ে মগ্ন রয়েছি সে বিষয়ে আমার কোন বন্ধু থেকেই সহৃদয় কোনো উপলব্ধি পেলাম না। আমি যখন তাদের বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে, একটি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সামাজিক ধারণা হিসাবে ইসলাম তুলনায় অন্য যে কোন ভাবাদর্শ থেকে শ্রেষ্ঠতর, তখন তারা প্রত্যেকেই, বলা যায় ব্যতিক্রম ব্যতিরেকেই, বিস্ময় বিমূঢ়তার সংগে মাথা নাড়লো। কখনো কখনো ইসলামের কোনো –না কোনো প্রস্তাবের যুক্তিবত্তা ওরা স্বীকার করলেও ওদের অধিকাংশরেই মত ছিলোঃ পুরানো ধর্মগুলি হচ্ছে অতীতের বিষয় আর আমাদের কালের দাবী হচ্ছেঃ এক নতুন ‘মানবতাবদী’ দৃষ্টিভংগি। এমনকি, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সকল বৈধতা যারা এক কথায উড়িয়ে দিতো না, তারা ও এই পশ্চিমী জনসাধারণের এ মনোভাব ত্যাগ করতে কিছুতেই প্রস্তুত ছিলো না যে, জাগতিক ব্যাপরের সংগে প্রকাশ্য সম্পর্কিত হওয়ায় সেই –‘অতীন্দ্রিয়বাদ’ ইসলামে নেই, মানুষ যা ধর্ম থেকে প্রত্যাশা করার অধিকার রাখে।
এ আবিষ্কারে বরং আমি তাজ্জব হই যে, ইসলামের সে দিকটিই, যা আমাকে পয়রা আকৃষ্ট করেছে, অর্থাৎ দৈহিক এবং আত্মিক এই পৃথক পৃথক সত্যকে ভাগ না করা এবং ঈমান লাভের জন্য যুক্তির উপর তাগিদ –তা সে-সব বুদ্ধিজীবীর হৃদয়ে অতি সামান্যই আবেদন জাগালো যারা অন্য দিক দিয়ে জীবনে যুক্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে দাবী করতে অভ্যস্ত। কেবলমাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রে এসেই ওরা ওদের খুবই –অভ্যস্ত যু্ক্তিবাদী ও বাস্তববাদী ভূমিকা থেকে সহজভাবেই পিছু হটে যায়। এ ব্যাপারে আমার সেই স্বল্প কটি বন্ধু, যার ধর্মের প্রতি অনুরাগী এবং তারা যারা ধর্মকে জীর্ণ প্রথার বেশি কিছু ভাবতে আর রাজী নয়, তাদের মধ্যে কোনো ব্যবধানই আমি দেখতে পেলাম না।
অবশ্য ওদের সংকট কোথায় এক সময আমি বুঝতে পারি। আমি দেখতে শুরু করলাম –যেসব মানুষ খৃশ্চান ভাবধারার পরিবেশে মানুষ হয়েছে – যে চিন্তাধারায় জোর দেওয়া হয়েছে, সকল সত্যিখার ধর্মীয় অভিজ্ঞাতায় নিহিত বলে অনুমতি ‘অতি প্রাকৃতের উপর’ –তাঁদের দৃষ্টিতে একটি প্রবল যুক্তিবাদী দৃষ্টিভংগির ধর্মের আধ্যাত্মিক মূল্য থেকে একটা বিচ্যুতি বলে মনে হয়ে থাকে। এই মনোভংগি বিশ্বাসী খৃশ্চানদের মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ ছিলো না –অন্য কোনো ধর্মের সংস্পর্শে না এসে কেবল খৃষ্টধমেৃর সংগে ইউরোপের সূদীর্ঘ সহবাসের ফলে সংশয়বাদী ইউরোপীয়রা পর্যন্ত অবচেতনভাকে খৃশ্চীয় ধ্যান-ধারণার লেন্স দিয়ে সকল ধর্মীয় অভিজ্ঞতার প্রতি তাকাতে শিছেছে। এবং কেবল সেই অবস্থায়ই এরা ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে ‘সত্য’ বলে গণ্য করে যদি এর সংগে গুপ্ত এবং বুদ্ধির অজ্ঞেয় কোনো কিছুর সামনে সভয় ঐশী ভক্তির পুরক-রোমাঞ্চ থাকে। ইসলাম সে চাহিদা পূরণ করে নাঃ একটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক সমতলে জীবেনের দৈহিক এবং আত্মিক দিকগুলির মধ্যে একটি সমন্বয় সাধনের উপর ইসলাম জোর দেয়। বস্তুত ইসলামের বিশ্ব –দৃষ্টি-খৃশ্চীয় বিশ্ব –দৃষ্টি থেকে এতই পৃথক যে, একটির সত্যতা গ্রহণ করলে অন্যটির সত্যতা সম্পর্কে অপরিহার্যভাবেই প্রশ্ন উঠবে, কারণ খৃশ্চীয় বিশ্ব-দৃষ্টির উপরই পাশ্চাত্যের প্রায় সকল নৈতিক ধ্যান-ধারণার ভিত্তি।
আর আমার ক্ষেত্রে ব্যাপার হলো এইঃ আমি টের পাচ্ছিলাম আমাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ইসলামের দিকে। কিন্তু শেষবারের মতো একটি দ্বিধা আমাকে বাধ্য করলো চূড়ান্ত অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপটি মূতবি রাখতে। ইসলাম গ্রহণ করার চিন্তা মনে হলো একট সেতুতে ওঠার প্রাস, যে-সেতুটি দুটি ভিন্ন জগতের মধ্যকার শূন্যতার উপর দাঁড়িয়ে আছেঃ এত দীর্ঘ সে সেতু যে, সেতুর অপর প্রান্ত দৃষ্টিগোচর হয়ে ওঠার আগে এমন একবিন্দু পর্যন্ত পৌছুতে হবে যেখান থেকে ফিরে আসার আর পথ নেই। আমি খুব ভাল করেই জানতাম –আমি যদি মুসলমান হয়ে পড়ি তাহলে যে জগতের মধ্যে আমি মানুষ হয়েছি তার সাথে আমার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলতে হবে। এর অন্য কোনো বিকল্পই আর সম্ভব ছিলো না। মুহাম্মদের বাণী সত্যি সত্যি অনুসরণ করা আর সম্পূর্ণ উল্টা ধ্যান-ধারণায় শাসিত সমাজের সাথে একই সংগে অন্তরের সম্পর্ক বজায় রেখে চলা সম্ভব ছিলো না। কিন্তু ইসলাম কি সত্যিই আল্লাহর কাছ থেকে আগত বাণী –নাকী কেবলই একজন মহান অথচ ভূল-ক্রটির অধীনে মানুষের প্রজ্ঞামাত্র.. .?
একদিন , ১৯২৬ সনের সেপ্টেম্বর মাসে আমি েএবং এলসা আমর দুজন সফর করছিলাম বার্লিনের ভূগর্ভস্থ রেলপথে। ওটি ছিরো একটি প্রথম শ্রেণীর কামরা । আমার উদ্দেশ্যহীন দৃষ্টি পড়লো আমার ঠিক বিপরীতদিকে বসা পরিপাটি পোশাক পরা একজন মানুষের উপরঃবোঝা যাচ্ছে লোকটি একজন ধনী ব্যবসায়ী,তাঁর হাটার উপর রয়েছে একটি চমৎকার ব্রীফকেস এবং ডান হাতে একটা বড় আকারের হীরার আংটি। আমার মনে এ অলস ভাবনার উদয় হলো এ স্থূলকায় লোকটির চেহারা , তখনকার দিনে মধ্য ইউরোপের সর্বত্র সমৃদ্ধির যে চিত্র দেখ যেতো সেই চিত্রের মধ্যে কি চমৎকারই না মানিয়েছেঃ যে সমৃদ্ধি এ কারণে আরো বেশি পষ্ট যে, তা এসেছিলো কয়েক বছর স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির পরে, যখন গোটা অর্থনৈতিক জীবনই লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছিলো এবং কদর্য চেহারা হয়ে পড়েছিলো ব্যতিক্রমহীন। এখন প্রায় সব লোকই ভাল পোশাক পরে, খেতে পায় প্রচুর, আর এজন্য আমার বিপরীতদিকের লোকটিকে কোনো ব্যতিক্রম মনে হলো না। কিন্তু আমি যখন তার মুখের দিকে তাকালাম, মনে হলো একটি সুখী মুখের দিকে তাকাচ্ছি। মনে হলো, লোকটি যেনো উদ্বিগ্নঃ এবং কেবল উদ্বিগ্ন নয়, বরং তীব্র অসুখী; চার চোখ দুটি উদাস দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে আর মুখের কোণা যেনো যন্ত্রণায় কুঁচকানো,তবে দৈহিক যন্ত্রণায় নয়।আমি অভদ্র হতে চাইনা। এজন্য আমি আমার চোখ সরিয়ে নিই এবং তার ঠিক পরেই দেখতে পাই একটি মহিলাকে, দেখতে বেশ নাজনীন,সুন্দরী। তার মুখেও দেখা গেলো এক অদ্ভুত অসুখী অভিব্যক্তি, যেনো এমন যেন এমন কিছু সে ভাবছে অথবা এমন কিছুর অভিজ্ঞতা তার হচ্ছে যা তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক। তা সত্ত্বেও তার মুখ অচঞ্চল রয়েছে, যেনো একটা স্থির হাসির মধ্যে; আমার সন্দেহ নেই মেয়েটির জন্য এ ছিলো একটি অভ্যস্ত ব্যাপার। এরপর আমি ঘুরে কম্পার্টমেন্টের অন্য সকল যাত্রীর মুখের উপর তাকাতে থাকি –ব্যতিক্রমহীনভাবে সবিই সেই সব লোকের মুখ, যাদের পরণে রয়েছে মূল্যবান পোশাক, যার খায় দায় প্রচুরঃ আর ওদের প্রায় সকলের মধ্যেই দেখতে পেলাম দুঃখের এক অভিব্যক্তি, এতো গোপন যে, সেই মুখের মালিক সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন বলেই মনে হলো।
সত্যি ভাবি অদ্ভুদ ব্যাপার। আমি আমার চারপাশে এর আগে আর কখনো একগুলি অসুখী মুখ দেখিনি, কিংবা ওদের মধ্যে থেকে এই মুহূর্তে যা এতো প্রবলভাবে উচ্চারিত হচ্ছে হয়তো এর আগে আমিই কখনো তার খোঁজ করিনি। ধারণাটা এতো তীব্র হলো যে, আমি এলসাকে সে সম্পর্কে বলি। এবং সেও চারদিকে তাকাতে লাগলো-মানুষের চেহারা পড়তে অভ্যস্ত এক চিত্রকরের সজাগ চোখ মেলে। তারপর সে বিস্মিত হয়ে মুখ ফেরালো আমার দিকে আর বললোঃ ‘তুমি ঠিকই বলেছো, ওরা সকলেই এভাবে তাকাচ্ছে যেনো জাহান্নামের কষ্ট ভোগ করছে- আমি ভেবে বিস্মিত হইঃ ওরা নিজেরা কি জানে, ওদের ভেতর কী ঘটছে?’
আমি জানি যে, ওরা তা জানে না। -যদি জানতোই তাহলে যেভাবে ওরা জীবনের অপচয় করে চলেছে তা করতে পারতো না। বাধ্যতামুলক সত্যে বিশ্বাস ক’রে, নিজেদের জীবন-মান উন্নত করার কামনার বাইরে জীবনের কোনো লক্ষ্য না রেখে, অধিকতরো বৈষয়িক আরাম-আয়েসের উপকরণ, অধিকতরো সুক্ষ্ম যন্ত্রপাতি(gadgets)এবং সম্ভবত অধিকতরো ক্ষমতা অর্জনের আশা ছাড়া অন্য কোনো আশাই রেখে এভাবে জীবনকে বরবাদ করা সম্ভব হতো না ওদের পক্ষে-
আমরা যখন বাড়ি ফিরে এলাম হঠাৎ আমার চোখ পড়লো আমার ডেস্কের উপর, যার উপর মেলা রয়েছে একখন্ড কুরআন যা আমি আগে পড়ছিলাম। যান্ত্রিকভাবে আমি কুরআনটি হাতে তুরে নিই তুলে রাখবার জন্য। কিন্তু আমি যখন ওটি বন্ধ করতে যাচ্ছি আমার চোখ পড়লো আমার সামনে মেলা পৃষ্ঠাটির উপর এবং আমি পড়তে শুরু করিঃ
-তোমরা, আরো চাই, আরো বেশি চাই, এই লোভে আচ্ছন্ন হয়ে থাকো যতক্ষণ না তোমারা পৌছাও তোমাদের কবরে- না, এটা ঠিক নয়, তোমারা জানতে পারবে-না, ওটা ঠিক নয়, অবশ্যই জানতে পারবে তোমরা; যদি তোমরা জানতে সুনিশ্চিত জ্ঞানের সাহয্যে নিশ্চয়ই তোমরা দেখতে পেতে তোমরা রয়েছো জাহান্নামের মধ্যে। একসময় অবশ্য তা দেখতে পাবে নিশ্চিত দৃষ্টিতে এবং সেই দিন তোমাদের জিজ্ঞাস করা হবে তোমরা কি করেছিলে যে –অনুগ্রহ তোমাদের দান করা হয়েছিলো তা দিয়ে?
মুহূর্তের জন্য আমি নির্বাক হয় যাই, আমার মুখে কোনো কথা সরে না। মনো হরো বইটি আমার হাতে কাঁপছে। তারপর আমি তা তুলে দিলাম এলসার হাতে-এটি পড়ো আমরা পাতাল রেলপথে যা দেখেছিলাম একি তারই জবাব নয়?
হ্যাঁ, এটি তারই জবাবঃ এমন এক চূড়ান্ত জবাব যে অকস্মাৎ সমস্ত সন্দেহ চুরমার হয়ে গেলো। এখন আমি উপলব্ধি করলাম সন্দেহতীতভাবে-আমার হাতে যে কিতাবটি আমি ধরে আছি তা একটি ইলাহী প্রত্যাদিষ্ট কিতাবঃ কারণ যদিও তা মানুষের সামনে পেশ করা হয়েছিলো ১৩০০ বছরেও বেশি আগে, তবু এতে এমন কিছুর আগাম ধারণ করা হয়েছে যা কেবল আমাদের এই জটিল যান্ত্রিক, অবাস্তব কল্পনা-কবলিত জামানায়ই,সত্য হতে পারে।
লোভ মানুষের সবসময়ই ছিলোঃ কিন্তু এর আগে লোভ কখনো জিনিসপত্র সংগ্রহের কেবল একটা আগ্রহকে ছাপিয়ে উঠতে পারেনি এবং এমন নেশা হয়ে উঠতে পারেনি যা অন্য সবকিছুর প্রতি দৃষ্টিকে করে দেয় ঝাপসাঃ একটি অদম্য-অধিক পাওয়ার অধিক করার, অধিক ফন্দি আঁটার, গতকালের চাইতে আজকে বেশি এবং আজকের চাইতে আগামীকাল বেশিঃ একটি দানব সওয়ার হয়েছে মানুষের কাঁধের উপরে এবং তাদের হৃদয়ে চাবৃক কষে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এমন সব লক্ষ্যের দিকে যা ঝলমল করছে দূরে, বিদ্রপাত্মকভাবে এবং যখনি তার কাছে পৌছুনো হচ্ছে তা মিলিয়ে যাচ্ছে তুচ্ছ শূন্যতায়। সবসময়ই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে-সামনে রয়েছে নতুন নতুন লক্ষ্য- আরো অধিক উজ্জ্বল, আরো অধিক প্রলোভন জাগানো লক্ষ্য, যতক্ষণ না সেগুলি দিগন্ত সীমানায় রয়েছে এবং সেই ক্ষুধা, সেই অতৃপ্ত ক্ষুধা, নিত্য-নতুন লক্ষ্যের জন্য যা চিবিয়ে খাচ্ছে মানুষের আত্মাকেঃ না, যদি তোমরা জানতে তোমরা দেখতে পেতে সেই জাহান্নাম, যার মধ্যে তোমরা রয়েছো-
আমি দেখতে পেলাম দূর আরবের সুদূর অতীতের কোনো মানুষের মানবিক প্রজ্ঞামাত্র এ নয়। তিনি যতো প্রজ্ঞাবানই হোন, এ রকম প্রকজন মানুষের পক্ষে কিছুতেই আপন শক্তিতে এই বিশ শতকের নিজস্ব যন্ত্রণা আগাম দেখা সম্ভব ছিলো না। কুরআন থেকে উচ্চারিত হলো একটা কণ্ঠস্বর যা বৃহত্তর মহত্তর মুহাম্মদের কণ্ঠস্বর থেকে. ..।
পাঁচ
নবীর মসজিদের প্রংগনে নেমে এসেছে অন্ধকার, যার মধ্যে এখানে ওখানে কিচু আলো ফুটে উঠেছে কেবল খিলানের থামগুলির মধ্যে লম্বা শিকলে ঝুলানো তেরের প্রদীপগুলি থেকে। শায়খ আবদুল্লাহ বুলাইহিদ তাঁর বুকের উপর মাথা ঝুঁকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। তাঁকে যে জানে না তার মনে হতে পারে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন; কিন্তু আমি জানি, তিনি আমার বর্ণনা শনছেন গভীর তন্ময়তার সাথে এবং মানুষ ও তাদের হৃদয় সম্পর্কে তাঁর নিজের যে বিপুল অভিজ্ঞতা রয়েছে তারই নকশাটির সাথে তা মিলিয়ে দেখবার চেষ্টা করছেন। অনেকক্ষণ পর তিনি তাঁর মাথ তোলেন এবং চোখ মেলে চানঃ
-এবং তারপর? তারপর তুমি কি করলেন?
– যা স্বাভাবিক এবং অনিবার্য তা-ই-শায়খ। আমি আমার এক মুসলিম বন্ধুকে খুঁজে বর করলাম। তিনি একজন ভারতীয় এবং সে সময়ে বার্লিনের ছোট্ট মুসলিম সমাজটির প্রধান ছিলেন তিনি। আমি তাঁকে বললামঃ আমি ইসলাম কবুল করতে চাই। তিনি আমার দিকে তাঁর ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং আমি আমার ডান হাত সেই হাতে রাখলাম আর দু’জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে ঘোষণা করলাম ঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর রসূল ১[ঈমান সম্পর্কে এই ঘোষণা মুসলমান হওয়ার জন্য একমাত্র আবশ্যকীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইসলামে রাসূল এবং নবী শব্দ দুটির একটিকে অপরটির পরিবর্র্তে ব্যবহার করা যায় প্রধান প্রধান নবীদের ক্ষেত্রে, যাঁরা একেকটি নতুন বাণী বহণ করেন, যেমন মুহাম্মদ, ঈসা, মূসা, ইবরাহীম] কয়েক সপ্তাহ পরে আমার স্ত্রীও ইসলাম কবুল করেন।
-‘এবং তোমার লোকেরা তখন কি বললো?’
-‘হ্যাঁ, ওরা তা পছন্দ করেনি। আমি যখন আমার আব্বাকে জানালাম আমি মুসলমান হয়েছি, তিনি আমার চিঠির জবাব পর্যন্ত দিলেন না। কয়েকমাস পর আমার বোন আমাকে লিখলো, আমার আব্বা আমাকে মৃত বলে গণ্য করেন.. . তখন আমি আরেকটিক চিঠি পাঠাই এবং তাঁকে এ নিশ্চয়তা দিই যে, আমার ইসলাম গ্রহণ তার প্রতি আমার মনোভাব বা তাঁর জন্য আমার ভালবাসায় কোনো পরিবর্তন আনেনি। বরং ইসলাম আমাকে আমার আব্বা-আম্মাকে সকলের উপরে ভালবাসতে ও সম্মান করতে শেখায়। কিন্তু এ চিঠিরও জবাব মিলেনি।’
-তোমার আব্বা নিশ্চয় তাঁর ধর্মের প্রতি খুবই অনুরাগী.. .’
-‘তা নয় শায়খ, তিনি তা নন এবং এটিই হচ্ছে এ কাহিনীর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক। আমার মনে হয়, তিনি আমাকে রেনিগেড –মুর্তাদ মনে করেন, তাঁর ধর্ম থেকে ততোটা নয় (কারণ ধর্ম কখনো তেমন প্রবলভাবে তাঁকে ধরে রাখেনি) যতোটা সেই সমাজ থেকে যার মদ্যে তিনি মানুষ হয়েছেন এবং সেই প্রস্তুতি থেকে যার সাথে তিনি যুক্ত।’
-‘আর, এরপর কি তাঁর সংগে তোমার দেখা হয়নি’?
-‘না, আমাদের ইসলাম গ্রহনের পরপরই আমি এবং আমার স্ত্রী ইউরোপ ত্যাগ করি। ওখানে আর থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। আর কখনো ফিরে যাইনি আমি’.. .২[১৯৩৫ সনে আমাদের সম্পর্ক আবার পুনরুজ্জীবিত হয়, যখন আমার পিতা আমার ইসলাম গ্রহণের কারণগুলি শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলেন এবং তার মর্যাদও দিতে পারলেন, যদিও আর কখনো আমাদের সাক্ষাৎ বা দেখা হয়নি। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত আমরা নিয়মিত পত্র যোগাযোগ বজায় রাখি; ঐ বছরই নাৎসীরা আমার আব্বা ও বোনকে ভিয়েনা থেকে নির্বাসন দেয় এবং পরে তারা নাৎসী বন্দী শিবিরে মারা যান।
জিহাদ
এক
আমি যখন নবীর মসজিদ থেকে বের হচ্ছি তখন একিট হাত বন্দী করলো আমার একটি হাত; আমি মাথা ঘুররিয়ে সেনুসি নেতা সিদি মুহাম্মদ আজজুবাইয়ের সদয় প্রবীণ চোখের মুকাবিলা হলাম।
-‘বাবা, তোমাকে দীর্ঘ ক’মাস পরে দেখে কতো যে খুশী হয়েছি! নবীর এই আশিসপূত নগরীতে তোমার পদক্ষেপের উপর আল্লাহর আশিসপুত বর্ষিত হোক।.. .
মসজিদ থেকে প্রধান বাজারে দিকে যে নুড়ি বিছানো রাস্তাটি গিয়েছে আমরা ধীরে ধীরে হাতে হাত ধরে হাঁটি সেই পথে। উত্তর আফ্রিকার আরব এবং বারবারেরা মাথায় পাগাড়সহ যে চৌগা পরে সেই চৌগা পরা সিদি মুহাম্মদ মদীনায় একজন সুপরিচিত ব্যক্তি। এখানে তিনি বাস করছে কয়েক বছর ধরে। আমরা যখন আগাচ্ছি তখন বহু মানুষই আমাদের পথে থামাচ্ছে তাঁকে অভিবাদন জানানোর জন্য । এই অভিবাদন কেবল তাঁর সত্তর বছর বয়সের প্রতি তাযিমের জন্য, লিবিয়ার বীরোচিত আযাদী সংগ্রামের একজন নেতা হিসাবে তাঁর খ্যাতির জন্যও।
-‘বাবা আমি তোমাকে জানাতে চাই, সৈয়দ আহমদ মদীনায় রয়েছে। তাঁর স্বাস্থ্য ভাল যাচ্ছে না। তোমাকে দেখলে তিনি খুবই খুশি হবেন। তুমি কতদিন থাকবে এখানে?’
-‘কেবল আসছে পরশু পর্যন্ত,’ আমি জবাব দিই, ‘কিন্তু সৈয়দ আহমদকে না দেখে আমি নিশ্চয় যাবো না। চলুন, আমরা এখুনি তাঁর কাছে যাই।
-গোটা আরব এমন কোনো লাক নেই যাকে আমি সৈয়দ আহমদের চেয়ে বেশি ভালোবাসিঃ কারণ, তিনি যে রকম সম্পূর্ণভাবে, যে-রকম নিঃস্বার্থভাবে একটি আদর্শের জন্য নিজেকে কুরবান করেছেন সে রকম কুরবান করেছে এমন কোনো মানুষই খুঁজে পাওয়া যাবেনা। তিনি একজন পণ্ডিত এবং যোদ্ধা। তিনি তাঁর গোটা জীবনকে নিয়োজিত করেছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের আত্মিক পুনরুজ্জীবনের জন্য এবং তাঁর রাজনৈতিক আযাদীর সংগ্রামে-কারণ তিনি ভালোই জানেন, এর একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। কতো স্পষ্টই না আমার মনে পড়ছে বহু বছর আগে মক্কার সৈয়দ আহমদের সাথে আমার প্রথম মুলাকাতের কথা.. .
পবিত্র নগরীর উত্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আবু কুবাইস পাহাড়- বহু প্রাচীন উপকথাও ইতিকথার কেন্দ্র। এছাড়া , যেখানে মুকুটের মতো রয়েছে দুটি নিচু মীনার সম্বলিত একটি ছোট্ট চুনকাম করা মসজিদ, সেখান থেকি নীচের দিকে তাকালে একটি চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে মক্কা উপত্যকার, যার ঠিক তলদেশেই রয়েছে বর্গাকার কা’বার মসজিদ এবং বার্ণাঢ্য, ইতস্তত ছড়ানো রংগশালার মতো ঘরবাড়ি, যা সকল দিকে পাহাড়ের নগন্ন শিলাময় ঢালু বেয়ে যেনো উঠে আসছে উপরের দিকে। আবু কুরাইস পাহাড়ের চূড়ার নীচেই রয়েছে এক সারি পাতুরে দালান, যা সংকীর্ণ সমতল খাঁজ থেকে ঝুলছে এক গুচ্ছ ঈগলে নীড়ের মতোঃ সেনুসি ভ্রাতৃ-সংঘের মক্কী কেন্দ্র। এখানে যে বৃদ্ধ লোকটির সাথে আমি মুলাকাত করি, তাঁর নাম সারা মুসলিম জগতে মহশুরঃ মহান সেনুসি সৈয়দ আহমদঃ িএখানে তিনি একজন নির্বাসিত ব্যক্তি। দীর্ঘ ৩০ বছরের সংগ্রাম এবং কৃষ্ণসাগর ও ইয়েমেনের পর্বতগুলির মধ্যবর্তী স্থানে তাঁর সাত বছর ছুটাছুটির পর সাইরেনিকায় তাঁর নিজের ফিরে আসার সকল পথ দেওয়া হয়েছে বন্ধ করে। আর কোনো নামই উত্তর আফ্রিকার ঔপনিবেশিক শাসকদের অতো বিনিদ্র রজনীর কারণ ছিলো না । এমন কি, উনিশ শতকের আলজিরিয়ার মহান আবদুল কাদিরের নামও নয়, কিংবা মরোক্কোর আবদুল করিমের নাম পর্যন্ত নয়, যিনি ফরাসী শাসকদের বুকের ভেতরে একটা প্রচন্ড কাঁটার মতো ছিলেন অধিকতরো সাম্পতিক-কালে। এই নামগুলি মুসলমানদের কাছে যতো অবিস্মরণীয় হোক, এঁদের কেবল রাজনৈতিক তাৎপর্যই ছিলো। কিন্তু সৈয়দ আহমদের নেতৃত্ব এবং তাঁর তরীকা বহু বছর ধরে কাজ করেছে একটা বিপুল আধ্যাত্মিক শক্তি হিসাবে।
তাঁর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেন আমার জাভার বন্ধু হাজী অজোস সালিম। ইন্দোনেশিয়াতে রাজনৈতিক আযাদীর জন্য যে লড়াই চলছিলো তাতে একজন নেতার মর্যাদা ছিরো হাজী সালিমের। তিনি মক্কায় এসেছিলেন হজ্জ করতে। সৈয়দ আহমদ যখন শুনরেন আমি সম্প্রতি ইসলাম কুবল করেছি তিনি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে নরম যবানে বললেনঃ
-‘আমার তরুণ ভাই, তোমাকে খোশ আমদেদ তোমার ভাইদের মধ্যে.. .।’
ধর্ম এবং আযাদীরজন্য আপোসহীন যোদ্ধা, যিনি আগিয়ে চলেছেন বার্ধক্যের দিকে, তাঁর সুন্দর ভ্রূ-জোড়ার উপর খোদিত দেখতে পেরাম দুঃখ –যন্ত্রণার ছাপ। সামান্য সাদা দাড়ি এবং যন্ত্র্যণা-চিহ্ণিত গভীর রেখার মধ্যে ইন্দ্রিয়গতভাবে সুচতুর মুখের অধিকারী সাঈদ আহমদের মুখমণ্ডল ছিলো ক্লান্ত। চোখের পাতা একান্তভাবেই ঝুলে আ ছে চোখের উপর, যার জন্য মনে হয় চোখ দুটি যেনো ঘুমে ঢুলছে। তাঁর কণ্ঠস্বরের ধ্বনিও দুঃখ- বেদনায় একই রমক মোলায়েম ও ভারাক্রান্ত। কিন্তু কখনো কখনো তার মধ্যে হঠাৎ উদ্দীপনা জেগে ওঠে; তখন চোখ দুটি তাঁর হয়ে ওঠে জ্বলজ্বললে, তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয় প্রসাদগুণ, সংগীতের কম্পন এবং তাঁর সাদা চৌগার ভাঁজের ভেতর থেকে উর্ধ্বে উত্থিত হয় একটি বাহু, ঈগলের ডানার মতো!
তিনি এমন একটি ভাবাদর্শ , এমন একটি মিশনের উত্তরধিকারী যা কার্যে পরিণত হলে হয়তো বা আধুনিক ইসলামে একটি পুনরুজ্জীবন ঘটতোঃ বয়সের এবং অসুস্থতা সত্ত্বেও এবং তাঁর জীবননের উদ্দেশ্য বানচাল হলেও উত্তর আফ্রিকার এই মহান বীর তাঁর উজ্বল দীপ্তি হারাননি। তাঁর ছিলো সেই অধিকার হতাশ না হও্য়ার। তিনি জানতেন, ইসলামের সত্যিকার মর্মানুযায়ী ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের আকাংখা-যা সেনুসি আন্দোলনের লক্ষ্য মুসলিম জাতিগুলির হৃদয় থেকে কখনো তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
.. .. .. .. .. ..
সাঈদ আহমদের দাদা ছিলেন মাহন আলজিরীয় পণ্ডিত মুহাম্মদ ইবনে আলী আস-সেনুসি,(উপনামটি বানু সেনুস গোত্র থেকে গৃহীত, যে গোত্রে জন্ম হয়েছিলো তাঁর) যিনি এই শতকের প্রথমার্ধে স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি ইসলামী ভ্রাতৃসমাজের যা একদিন সত্যিকার এক ইসলামী কমনওয়েলথ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে দেবে। বহু বছর বহু আরব দেশে ঘুরে বেড়ানো ও পড়াশোনার পর মুহাম্মদ ইবনে আলী সেনুসি তরীকার প্রথম ‘জাভিয়া’ বা মোকাম স্থাপন করেন মক্কায় আবু কুবাইস পাহাড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হেজাজের বেদুঈনদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক অনুসারী পেয়ে যান। অবশ্য তিনি মক্কায় বসে থাকলেন না, তিনি ফিরে গেলেন উত্তর আফ্রিকায়, শেষ পর্যন্ত সাইরেনিকা ও মিসরের মধ্যবর্তী মরুভূমিতে অবস্থিত যাগবু নামক এক মরূদ্যানে, স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। ওখান থেকেই তাঁর বাণী বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়লো সারা লিবিয়াতে এবং লিবিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে। তিনি যখন ১৮৫৯ সালে ইন্তেকাল করেন, তখন সেনুসিদের (এই তরীকার সকল লোকই এই নামে পরিচিতি হয়ে ওঠে) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এক বিশাল রাষ্ট্র-ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে শুরু করে বিষুব অঞ্চলের আফ্রিকার গভীরে এবং আলজিরীয় সাহারার তুয়ারেগ নামক অঞ্চল অবধি।
অবশ্য ‘স্টেট’ বা রাষ্ট শব্দটি দ্বারা এই অনুপম সৃষ্টির নিখুঁত বর্ণনা হয় না, কারণ মহান সেনুসি কখনো তাঁর নিজের জন্য কিংবা তাঁর বংশধরদের জন্য একটি ব্যক্তিগত শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চাননি; তাঁর লক্ষ্য ছিলো ইসলামের নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি সাংগঠনিক বুনিয়াদ তৈরি করা। তাঁর এই লক্ষ্যের স্বার্থেই তিনি ঐ এলাকায় চিরাচরিত গোত্রীয় কাঠামো ভেঙে ফেলার জন্য কিছুই করলেন না। এমনকি, লিবিয়ার উপর তুর্কী সুলতানাতের নামমাত্র প্রভুত্বকেও তিনি চ্যালেঞ্জ করেননি-তুর্কীর সুলতানকেই তিনি ইসলামের খলীফা বলে মেনে নিতে থাকেন- তিনি তাঁর সমস্ত প্রয়াস নিয়োজিত করলেন বেদুঈনদের ইসলামের মূল শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে, যা থেকে ওরা দূরে সরে গিয়েছিলো অতীতে, এবং তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সেই উপলব্ধি আনতে যা ছিলো কুরআনের লক্ষ্য, কিন্তু বহু তকের গোত্রীয় দ্বন্ধ সংঘর্ষের ফলে লোপ পেয়েছিলো বহুলাংশে। উত্তর আফ্রিকার সর্বত্র যে বিপুল সংখ্য জাভিয়া গড়ে উঠলো সেনুসিয়া সেগুলি থেকে তাদের বাণী বহন করে নিয়ে গেলো বৃহত্তম অঞ্চলের গোত্রগুলির কাছে এবং কয়েক যুগের মধ্যেই প্রায় এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এনে দিলো আরব ও বারবার, উভয়ের মধ্যে। ধীরে ধীরে অতীতের আন্তগোত্রীয় অরাজকতার অবসান ঘটলো এবং মরুভূমির এককালের উচ্ছৃংখল যোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়ে উঠলো পারস্পরিক সহায্যের আন্তরিকতায়, এতোকাল তাদের নিকট যা অপরিচিত। জাভিয়াগুলিতে তাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা পেলো-কেবল ইসলামী শিক্ষা নয়, বহু ব্যবহারিক শিল্প এবং হাতের কাজেও , যা আগে নিন্দার চোখে দেখতো যুদ্ধবাজ যাযাবরেরা। শত শত বছর ধরে যেসব এলাকা ছিলো বন্ধ্যা সেসব অঞ্চলে আরো বেশি এবং আরো উন্নত ধরনের কুয়া খনন করতে ওদের উৎসাহিত করা হলো, আর সেনুসি পরিচালনায় ধূসর মরুভূমির বুকে সমৃদ্ধশালী বসতি গড়ে উঠতে লাগলো, দূরে দূরে, একেকটি বিন্দুর মতো। তেজারতিকে উৎসাহ দেওয়া হলো এবং সেনুসি ব্যবস্থার ফলে যে শান্তি-শৃংখলা এলো তার ফলে সে-সব অঞ্চলেও সফর সম্ভব হলো যেখানে অতীতে কোনো কাফেলার পক্ষেই আগানো ছিলো অসম্ভব লুণ্ঠিত না হয়ে। সংক্ষেপে, এই তরীকার প্রভাব সভ্যতা এবং প্রগতির জন্য এক প্রচণ্ড প্রেরণা হয়ে দাঁড়ালো; অন্যদিকে, ওদের অনঢ় ধর্মনিষ্ঠা, পৃথিবীর এ অংশের লোকদের অতীতে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে এই নতুন সমাজের নৈতিক মানকে তা থেকে উন্নীত করলো অনেক উপরে। প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ, গোত্র এবং গোত্রের সর্দারেরা স্বেচ্ছায় মেনে নিলো মহান সেনুসির রূহানী নেতৃত্ব; এমনকি, লিবিয়ার উপকূলভাগের শহরগুলির তুর্কী কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত দেকতে পেলো, এ তরীকার নৈতিক নেতৃত্বের ফলে তাদের পক্ষে এককালের ‘দুর্ধর্ষ ’বেদুঈন গোত্রগুলির সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহণ এখন অনেক বেশি সহজ হয়েছে।
এভাবে, একদিকে যেমন এ তরীকা তার প্রয়াসকে কেন্দ্রীভূত করলো স্থানীয় লোকদের পরিচালনা-ক্ষমতা থেকে আলাদা করা প্রায অসম্ভব হয়ে উঠলো। সেনুসি তরীকার এই ক্ষমতার ভিত্তি ছিলো ধর্মীয় ব্যাপারে সরল বেদুঈন এবং উত্তর আফ্রিকার তুয়ারেগদেব কিছুকাল আগেকার বন্ধ্যা অনুষ্ঠান-সর্বস্বতা থেকে মুক্ত করে তাদের জাগ্রত করার সামর্থ্য, ইসলামের মর্মবাণীর সাথে সত্যিকার সংগতি রেখে জীবন-যাপন করবার বাসনায় ওদের অন্তর কানায় কানায় ভরে দেবার ক্ষমতা এবং ওদের মধ্যে, ওরা সকলেই যে আযাদী, মানবিক মর্যাদা ও ভ্রাতৃত্বের জন্য কাজ করছে এ উপলব্ধি সৃষ্টির কৃতিত্ব। রাসূলের সময় থেকে মুসলিম বিশ্বের কোথাও এমন ব্যাপক আকারের কোনো আন্দোলন আর দেখা যায়নি, যা এই সেনুসি আন্দোলনের মতো ইসলামী জীবন পদ্ধতির এতোটা নিকট, এতোটা কাছাকাছি পৌছেছিলো!
এই শান্তিপূর্ণ যুগ উনিশ শতকের শেষ কোয়ার্টারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো যখন ফ্রান্স দক্ষিণদিকে আগাতে শুরু করলো আলজিরিয়া থেকে বিষুব আফ্রিকার দিকে, আর ধাপে ধাপে দখল করতে লাগলো সেসব অঞ্চল , যা আগে স্বাধীন ছিলো এ তরীকার নেতৃত্বে। ওদের এই আযাদী রক্ষা করতে গিয়ে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার পুত্র এবং উত্তরাধিকারী মুহাম্মদ আল মাহাদী তরবারী ধারণ করতে বাধ্য হন- তাঁর পক্ষে সে তরবারী আর কখনো সংবরণ করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘ সংগ্রাম ছিলো সত্যিকার ইসলামী ‘জিহাদ’, আত্মরক্ষার জন্য এক যুদ্ধ, যার বর্ণনা করা হয়েছে কুরআনে এভাবেঃ
আল্লাহর পথে তোমরা সংগ্রাম করো তাদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করে তোমাদের বিরুদ্ধে; কিন্তু তোমরা নিজেরা হয়ো না আগ্রাসনকারী, কারণ নিশ্চয় আল্লাহ আগ্রাসনকারীদের পছন্দ করেন না.. . যুদ্ধ করো তাদের বিরুদ্ধে যতক্ষণ না অত্যাচার নির্মূল হয়েছে এবং সকল মানুষ অবাধে আল্লাহর ইবাদত করতে পারছে। কিন্তু ওরা যদি বিরত হয়, বন্ধ করতে হবে সকল শত্রুতা.. .।
কিনতু ফরাসীরা ক্ষান্ত হয়নি। ওরা ওদের বেয়নটের মাথায় ত্রিবর্ণ রঞ্জিত ঝাণ্ডা বহন করে নিয়ে গেরো গভীর হতে আরো গভীরে-মুসলিম দেশগুলির ভেতরে।
মুহাম্মদ আল মাহদী যখন ইন্তেকাল করলেন ১৯০২ সালে, তখন তাঁর ভাতিজা সৈয়দ আহমদ তাঁর স্থলে এই তরীকার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। উনিশ বছর বয়স থেকে , তাঁর চাচার জীবৎকালে এবং পরে যখন তিনি নিজেই হলেন মহান সেনুসি, একটানা যুদ্ধ করে চললেন, এখন যাকে ফরাসী বিষুব আফ্রিকা বলা হয়, সে অঞ্চরে, ফরাসী অনুপ্রবেশে বিরুদ্ধে। ইতালীয়ানরা যখন ১৯১১ সানে ত্রিপলীতানিয়া এবং সাইরেনিকা অবরোধ করে তখন তাঁকে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয় দুই ফ্রন্টে। এই নতুন এবং অধিকতরো চাপ তাঁকে তাঁর প্রধান মনোযোগ উত্তর দিকে ফেরাতে বাধ্য করলো। তুর্কীদের সংগে পাশাপাশি এবং পরে তুর্কী কর্তৃক লিবিয়া পরিত্যক্ত হলে একাই সৈয়দ আহমদ এবং তাঁর সেনুসি মুজাহিদীন –এই নামেই এই যোদ্ধরা অভিহিত কতো নিজেদেরকে-সাফল্যের সংগে যুদ্ধ পরিচালনা করেন হানাদারদের বিরুদ্ধে-ইতালীয়রা, তাদরে উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্র আর বিপুলতরো সংখ্যা সত্ত্বেও মাত্র উপকূলের কয়েকটি শহরেই কোনো রকমে তাদের পা রাখতে সক্ষম হলো!
ব্রিটিশ শক্তি তখন মজবু হয়ে আসন গেড়েছে মিসরে! উত্তর আফ্রিকার অভ্যন্তরভাগে ইতালীয়দের ক্ষমতা বিস্তার করতে দেখে ওরা পষ্টতই তেমনটি উদ্বিগ্ন ছিলো না। এ সব কারনে, সে সময় ব্রিটিশ শক্তি সেনুসিদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিলো না। এই নিরপেক্ষ মনোভাব সেনুসি তরীকার জন্য ছিলো পরম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ‘মুজাহিদীনে’র সমস্ত রসদ আসতো মিসর থেকে, যেখানে প্রায় গোটা জনগোষ্ঠীয় ছিলো তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এটা খুবই সম্ভাব্য মনে হয় যে, ব্রিটেনের এই নিরপেক্ষতার ফলে শেষ পর্যন্ত সেনুসিয়া সাইরেনিকা থেকে ইতালীয়দের সম্পূর্ণভাবে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হতো। কিন্তু ১৯১৫ সনে তুরস্ক মহাযুদ্ধে জার্মানীর পক্ষে অংশ গ্রহণ করে এবং ইসলামের খলীফা হিসাবে উসমানী সুলতান মহান সেনুসিকে আহবান জানালেন মিসরের ব্রিটিশ শক্তির উপর আক্রমণ চালিয়ে তুর্কীদের সাহয্যে করতে। যেহেতু ব্রিটশ সরকার মিসরে তাদের অধিকারে পশ্চাৎভাগের নিরাপত্তার জন্য অন্য সকল সময়ের চাইতে স্বভাবতই অধিকতর ব্যগ্র ছিরো সে কারণে তারা সৈয়দ আহমদকে নিরপেক্ষ থাকার জন্য অনুরোধ করে। এই নিরপেক্ষতার বিনিময়ে ওরা প্রস্তুত ছিলো লিবিয়ার সেনুসি তরীকাকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিতে- এমনকি, পশ্চিমাঞ্চলে মরুভূমির কিছু সংখ্যক মিসরীয় ওযেসিসও সেনুসিদের হাতে ছেড়ে দিতে ওরা তৈরি ছিলো।
সৈয়দ আহমদ যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ করতেন, তাহলে কাণ্ডজ্ঞান যার নির্দেশ দেয় দ্ব্যর্থহীনভাবে, তিনি কেবল তারই অনুসরণ করতেন। তুরস্কের প্রতি তাঁর বিশেষ কোনো আনুগত্য ছিলো না; কারণ এই তুরস্কই কয়েক বছর আগে লিবিয়াকে লিখে দিয়ে দিয়েছিলো ইতালীর হাতে, যার জন্য একা সানুসিকেই দাঁড়াতে হলো ইতালীর বিরুদ্ধে লড়বার জন্য। ব্রিটিশ শক্তি সানুসির বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কোনো কাজই করেনি, বরং তাদের সুযোগ দিয়েছিলো মিসর থেকে রসদ পাবার, আর মিসরই ছিলো তাদের রসদ পাওয়অর একমাত্র উপায়। অধিকিন্তু বার্লিনের মন্ত্রণালয় উসমানী সুলতান যে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন তা নিশ্চয় কুরআনে লিপিবদ্ধ শর্তাবলী পুরণ করেনি। আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করছিলো না তুর্কীরা, বরং ওরা এক অমুসলিম শক্তির সাথে আগ্রাসনী যুদ্ধে হাত মিলিয়েছিলো। তাই ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিবেচনা সমভাবে মহান সেনুসিকে, কেবল একটি মাত্র পদক্ষেপেরই দিকে আঙুলি নির্দেশ করেঃ যে যুদ্ধ তাঁর নিজের যুদ্ধ নয় তা থেকে দূরে সরে থাকা। সবচেয়ে প্রভাবশালী সেনুসি নেতাদের কয়েকজন-আমার বন্ধু তিনি সিদি মুহাম্মদ আজজুবাই ছিলেন তাঁদের একজন –সৈয়দ আহমদকে নিরপেক্ষ থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের দুর্বল খলীফাকে রক্ষা করার অত্যুচ্চ অথচ অবাস্তব আকাংখাই প্রবল হয়ে দাঁড়ালো যুক্তির নির্দেশের উপর এবং তাঁকে একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে করলো প্ররোচিত। তিনি নিজেকে তুর্কীর পক্ষে বলে ঘোষণা করেন এবং পশ্চিমের মরুভূমিতে ব্রিটিশ শক্তিকে আক্রমণ করে বসেন।
বিবেকের এই দ্বন্ধ এবং ঘটনাক্রমে তার পরিণতি সৈয়দ আহমদের বেলায় অধিকতরো করুণ হয়ে উঠলো-কারণ তাঁর ক্ষেত্রে, এ কেবল ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের প্রশ্ন ছিলো না, বরং এতে করে সম্ভবত অপূরণীয় ক্ষতিসাধিত হলো তাঁর সমগ্র জীবনের এবং তাঁর আগের দুই পুরুষের, সকল সেনুসির জীবনের মহৎ লক্ষ্যটিরই। আমি তাঁকে জানি বলেই আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, তাঁর এ কাজের পেছনে যে উদ্দেশ্য ছিলো, তা ছিলো চূড়ান্তভাবেই স্বার্থলেশশূন্য-মুসলিম জাহানের সংহতি রক্ষাকরার বাসনাই ছিলো তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু এ ব্যাপারেও আমার সন্দেহ সমান্যই যে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর পক্ষে এর চেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কখনো সম্ভব ছিলো না। ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে তিনি কুরবানী দিয়েছিলেন সেনুসি তরীকার গোটা ভবিষ্যৎকেই-সে সময়ে তা পুরাপুরি উপলব্ধি না করে।
তা থেকেই তিনি বাধ্য হলেন তিনটি ফ্রন্টে যুদ্ধে চালিয়ে যেতে। উত্তরে ইতালয়দের বিরুদ্ধে, দক্ষিণ-পশ্চিমে ফরসীদরে বিরুদ্ধে এবং পূর্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। শুরুর দিকে তিনি কিছু কিছু সাফল্য অর্জন করেন। সুয়েজ খাল অভিমুখে জার্মান-তুর্কীর অগ্রাভিযানে কোণঠাসা হয়ে ব্রিটিশ শক্তি পশ্চিমের মরুভূমির ওয়েসিসগুলি থেকে সরে পড়লে সৈয়দ আহমদ সংগে সংগেই সেগুলি দখল করে নেন। মুহাম্মদ আজ্জুবাইর নেতৃত্বে (যিনি তাঁর প্রজ্ঞঅবশত এত তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এই চেষ্টার) উটের উপর সওয়ার ধাবমান ফৌজের বিভিন্ন ব্যুহ ঢুকে পড়লো কায়রের একেবারে আশেপাশে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই যুদ্ধের গতি বদলে গেলো আকস্মিকভাবেঃ জার্মান-তুর্কী বাহিনীর ক্ষিপ্র অগ্রাভিযান ঠেকিয়ে দেওয়া হলো সিনাই উপত্যকায় এবং অগ্রাভিযান ঠেকিয়ে দেওয়া হলো সিনাই উপত্যকায় এবং অগ্রাভিযান রূপ নিলো পশ্চাদ-অপসরণে। কিছু পরেই পশ্চিমের মরুভুমিতে ব্রিটিশ পাল্টা আক্রমণ করে সেনুসি ফৌজকে, সীমান্ত অঞ্চলের মরূদ্যান এবং কূপগুলি দখল করে নেই, আর এমনিভাবে মুজাহিদীনে’র রসদ পবার একমাত্র পথটিকে দেয় কেটে। সাইারেনিকার অভ্যন্তরভাগ একা সক্ষম ছিলো না জীবন-মরণ যুদ্ধে লিপ্ত জনগোষ্ঠীকে রসদ যুগিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে, আর যে স্বল্প কটি জার্মান ও অস্ট্রীয় সাবমেরিন অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ এনে পৌছালো, তারাও নামমাত্র সাহায্যের বেশি কিছু নিয়ে এলো না।
১৯১৭ সনে সৈয়দ আহমদ তাঁর তুর্কী উপদেষ্টাদের পরামর্শে সাবমেরিন করে ইস্তাম্বুল যান অধিকতরো কার্যকরী সাহায্য-সমর্থনের ব্যবস্থা করার জন্য। কিন্তু রওনা করার আগেই সইরেনিকায় তিনি তরীকার নেতৃত্ব দিয়ে যান তাঁর চাচাতো ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ আল ইদরিসকে। *[১৯৫২ সাল থেকে লিবিয়ার বাদশাহ] প্রকৃতির দিক দিয়ে সৈয়দ আহমদের চেয়ে অধিকতরো আপোসকামী ইদরিস কাল বিলম্ব না করেই ব্রিটিশ এবং ইতালীয়দের সাথে সন্ধি করার প্রয়াস পান। ব্রিটিশেরা তো শুরু থেকেই সেনুসিদের সংগে এই সংঘর্ষ না-পছন্দ করেছে।কাজেই ওরা দ্বিধা না করে সন্ধি করতে ইতালী সরকার সৈয়দ ইদরিসকে ‘সেনুসিদের আমীর’ বলে সরকারীভাবে স্বীকৃতি দান করে। ইদরিস ১৯২২ সন পর্যন্ত সাইরেনিকার অভ্যন্তরভাগে এক টলটলায়মান আধা-স্বাধীনতা বজায় রাকতে সক্ষম হন। কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে উঠলো, ইতালীয়রা আসলে তাদের চুক্তি মেনে চলতে চায়নি, বরং গোটা দেশটিকেই ওদের শাসনের আওতায় আনার জন্য বদ্ধপরিকর, তখন সৈয়দ ইদরিস তার প্রতিবাদে ১৯২৩ ইংরেজির শুরুর দিকে মিসর ত্যাগ করেন-একজন বিশ্বস্ত , বহুদিনের অনুসরারী উমর আল মুখতারের হাতে সেনুসিদের নেতৃত্ব তুলে দিয়ে। এর পরেই ঘটে প্রত্যাশিত সন্ধি-ভংঘ এবং সাইরেনিকার যুদ্ধ আবার শুরু হয়ে যায়।
এদিকে তুরস্কে সৈয়দ আহমদ হতাশার পর হতাশার সম্মুখীন হতে লাগলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিলো, তাঁর উদ্দেশ্য হাসিলের সাথে সাথে তিনি সাইরেনিকায় ফিরে আসবে। কিন্তু সে উদ্দেশ্য কখনো হাসিল হলো না, কারণ তিনি যেই ইস্তাম্বুল ঢুকলেন, অমনি বিচিত্র-সব ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেলো, যার ফলে তিনি তাঁর প্রত্যাবর্তন স্থগিত রাখতে বাধ্য হলেন হপ্তার পর হপ্তা, মাসের পর মাস।তাঁর কাছে এ প্রায় স্পষ্ট হয়ে উঠলোঃ সুলতানকে যারা ঘিরে আছে তারা সত্যি চায় না যে, সেনুসিরা সফল হোক, বিজয়ী হোক। তুর্কীদের এ আশংকা বরাবরকার-পাছে নবজাগ্রত আরবেরা মুসলিম জাহানে আবার তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে! সেনুসিদের বিজয়ে অনিবার্যভাবেই ঘোষিত হবে এ জাতীয় আর পুনর্জাগরণের কথা এবং মহান সেনুসিকে-তুরস্কেও যাঁর খ্যাতি অনেকটা রূপকথার মতোই-করে তুলবে খিলাফতের সন্দেহাতীত উত্তরাধিকারী। তাঁর নিজের যে এ ধরনের কেনো উচ্চাকংখাই নেই তাতেও তুরস্কের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারীদের-সন্দেহ দূর হলো না- এবং যদিও তাঁর মর্যাদার উপযোগী পরম সম্মান এবং সকল সম্মানই তাঁকে দেওয়া হলো তবু বিনয়ের সংগে অথচ কার্যকরীভাবেই তুরস্কে আটক করা হরো সৈয়দ আহমদকে। ১৯১৮ সনে উসমানী খিলাফত ভেঙে পড়লে এবং তারপর মিত্র শক্তি ইস্তাম্বুল দখল করে নিলে তাঁর অলীক আসার মৃত্যু –ঘন্টা বেজে উঠলো এবং যুগপৎ তাঁর জন্য সাইরেনিকার সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেলো।
কিন্তু মুসলিম সংহতির জন্য উদ্দাম প্রেরণা সৈয়দ আহমদকে নিস্ক্রিয় থাকতে দিলো না। মিত্র শক্তি যখন ইস্তাম্বুল অবতরণ করছে তখন তিনি সীমান্ত পার হয়ে গিয়ে পৌছুলেন এশিয়া মাইনরে কামাল আতাতুর্কের সঙ্গে যোগ দেবার জন্য.. . তখনো তিনি কেবল মোস্তফা কামাল নামে পরিচিত-যিনি সবেমাত্র তুর্কী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করেছেন আনাতোলিয়ার অভ্যন্তরে।
মনে রাখতে হবে, শুরুতে কামালের তুর্কীর বরীরেচিত সংগ্রামে ছিলো ইসলামী সংগ্রামেরই লক্ষণ, আর সেই ভয়ংকর দিনগুলিতে কেবলমাত্র ধর্মীয় উদ্দীপনাই তুর্কী জাতিকে দিয়েছিলো বহু গুনে প্রবল গ্রীক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সামর্থ্য, যে গ্রীক শক্তিকে মিত্র শক্তি মদদ যুগিয়েছিলো তাদরে সমস্ত সাহায্য-সম্ভার দিয়ে।
তুর্কীরা লক্ষ্য হাসিলের স্বার্থে সৈয়দ আহমদ তাঁর মহৎ রূহানী ও নৈতিক ক্ষমতা নিয়োজিত করে অবিশ্রান্তভাবে ছুটাছুটি করতে লাগলেন আনাতোলিয়ার বিভিন্ন শহরে এবং গাঁয়ে; আর ডাক দিলেন জনসাধারণকে ‘গাজী’ বা ‘ধর্মের’ রক্ষক মোস্তফা কামালকে সমর্থন করতে। আনাতোলিয়ার সরল চাষীদের মধ্যে কামালী আন্দোলনের সাফল্যে মহান সেনুসির এ প্রয়াসের এবং তাঁর সংগে, তার নামের দীপ্তি ঔজ্জ্বল্যের অবদান অপরিমেয়; কারণ এ সব সলল চাষীর কাছে জাতীয়বাদী স্লোগানের কোন অর্থই ছিলো না; অথচ ওরা যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করে এসেছে ইসলামের জন্য তাদের জান কুরবান করা তাদের জন্য এক গৌরবের বিষয়।
কিন্তু মহান সেনুসি এখানেও আবার তাঁর বিচারে ভুল করে বসলেন-অবশ্য তুর্কী জনসাধারণের ক্ষেত্রে নয়, কারণ ওদের ধর্মীয় উদ্দীপনাই ওদের চেয়ে বহু গুণে শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে ওদের করেছিলো বিজয়ী। সেনুসি ভুল করলেন, তুর্কী জনগোষ্ঠীর নেতার মতলব সম্পর্কে। কারণ ‘গাজী’র বিজয় অর্জনের সংগে সংগে তাঁর কাছে পষ্ট হয়ে উঠলোঃ তাঁর আসল মতলব এবং তাঁর জাতির মধ্যে যে প্রত্যাশা সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দুয়ের মধ্যে তফাত বিপুল। আতাতুর্ক পুনরুজ্জীবিত এবং নতুন জীবনী-শক্তিতে সঞ্জীবিত ইসলামের উপর তাঁর সমাজ-বিপ্লবের ভিত্তি-এমনকি, আতাতুর্কের দৃষ্টিকোণের বিচারেও –অনাবশ্যকভাবে। কারণ তিনি সহজেই পারতেন তাঁর জাতির প্রচন্ড ধর্মীয় উৎসাহকে সংহত করে প্রগতিমুখী একটি সক্রিয় উদ্যেগ সৃষ্টির জন্য কাজে লাগতে। এজন্য, যা কিছু ওদের সংস্কৃতিকে রূপ দিয়েছে আর ওদের করে তুলেছে এক মহৎ জাতি, সে-সব থেকে ওদের সমূলে উৎপাটিত না করেই তিনি তা করতে পারতেন।
আতাতুর্কের ইসলাম-বিরোধী বিভিন্ন সংস্কারে চরম হতাশ হয়ে সৈয়দ আহমদ তুরস্কে সকল রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা থেকে সরে দাঁড়ালেন এবং অবশেষে ১৯২৩ সনে চলে গেলেন দামেশকে-সেখানে আতাতুর্কের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ পলিসির বিরোধী হলেও –তিনি আবার মুসলিম সংহতির লক্ষ্যে তুরস্কের সংগে মিলিত হবার জন্য সিরীয়দের বোঝাবার চেষ্টা করেন। স্বভাবতই ফরাসী ম্যান্ডেটরী সরকার তাঁকে চরম অবিশ্বাসের চোখে দেখতে শুরু করেন। ১৯২৪ সনের দিকে তাঁর বন্ধু-বান্ধবরা যখন জানতে পারলেন তাঁর গ্রেফতারী আসন্ন, তখন তিনি একটি মোটর গাড়িতে করে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে পৌছুলেন গিয়ে নযদ সীমান্তে আর সেখান থেকে রওয়ানা হলেন মক্কা, যেখানে আন্তরিকতার সংগে তাঁকে গ্রহণ করলেন বাদশা ইবনে সউদ।
দুই
-‘আর ‘মুজাহিদীনে’র কাজকর্ম কেমন চলছে, হে সিদি মুহাম্মদ’? আমি জিজ্ঞাস করি, কারণ প্রায় এক বছর হলো আমি কোনো খবর পাচ্ছি না সাইরেনিকা থেকে।
সিদি মুহাম্মদ আজ্জুবাই-এর গোল সাদা দাড়ি শোভিত মুখখানা কালো হয়ে ওঠেঃ ‘খবর ভালো নয় বাবা। যুদ্ধ শেষ হয়েছে কয়েক মাস আগে।‘ মুজাহিদীন’ ভেঙে পড়েছে। ওদের শেষ বুলেটও খরচ হয়ে গেছে। এখন আমাদের হতভাগা জাত এবং ওদের উৎপীড়কদের কহরের মাঝখানে আছে কেবল আল্লাহর রহমত.. .
-‘আর সাইয়িদ ইদরিসের খবর কি?’
-‘সাইয়িদ ইদরিস? দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দেন সিদি মুহাম্মদ, সাইয়িদ ইদরিস এখনো আছেন মিসরে, নির্বল প্রতীক্ষারত -কিসের প্রতীক্ষা-খুবই একজন ভাল মানুষ তিনি, আল্লাহ তাঁকে রহম করুন, তবে তিনি যোদ্ধ নন। তিনি বাস করতেন তাঁর বই-পুস্তকের মধ্যে-তলোয়ার খুব খাপ খায় না তাঁর হাতে.. .
-‘কিন্তু উমর আল –মুখতার-তিনি নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণ করেন নি? তিনি কি মিসর চলে গিয়েছিলেন?’
সিদি মুহাম্মদ তাঁর পথেল উপর থেম যান এবং বিস্ময়ে পলকহীন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকানঃ ‘উমর .. .? তাহলে এ .. . ও তুমি শোনো নি?’
-‘কী শুনিনি ‘
-‘বেটা, তিনি বলেন মোলায়েমভাবে, ‘সিদি উমর, আল্লাহ তাঁর উপর রহমত করুন, প্রায় এক বছর হলো মারা গেছেন তিনি.. .।
উমর আল-মুখতার মারা গেছেন .. . সােইরেনিকার সেই সিংহপুরুষ যাঁর সত্তর বছরে অধিক বয়স শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর দেশের আযাদীর জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বাধ্য হতে পারেনি.. . তিনি মৃত.. . সুদীর্ঘ দশটি বছর .. . ভয়ংকর দশটি বছর তিনি ছিলেন তাঁর জাতির প্রতিরোধ শক্তির প্রাণ, তার রূহ যে-সব বাধা-বিঘ্ন জয়ের আশা নেই সে-সবের বিরুদ্ধে, তাঁর ফৌজের চাইতে দশ গুণ বেশি ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে .. . যে ইতালীয় ফৌজ আধুনিকতম অস্ত্রশস্ত্রে সাঁজোয়া গাড়ি, উড়োজাহাজ এবং কামানে সজ্জিত-যখন উমর এবং তাঁর অর্ধ-উপবাসী মুজাহিদীনে’র কিছুই ছিলো না রাইফেল এবং কয়েকটি ঘোড়া ছাড়া, যা নিয়ে তাঁকে এমন এক দেশে লড়তে হয়েছে একটি বেপরোয়া গেরিলা যুদ্ধ যে দেশ পরিণত হয়েছিলো একটি বিশাল বন্দী শিবিরে.. .।
আমার স্বর আমার পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে যখন আমি বলিঃ ‘সাইরেনিকা থেকে আমার ফিরে আসার পর গত দেড় বছর ধরে আমি প্রতি মুহূর্তেই জেনেছি তাঁর এবং তাঁর সমর্থকদের ধ্বংস নিশ্চিত। তাঁর মুজাহিদীনে’র মধ্যে যারা বেঁচে ছিলো তাদের নিয়ে মিসরের ভেতরে সরে পড়ার জন্য আমি তাঁকে কত করেই না বুঝিয়েছিলাম যাতে করে তিনি তাঁর কওমের লোকজনের মধ্যে বেঁচে থাকতে পারেন.. .আর কী শান্তভাবেই না তিনি তাঁকে বোঝানোর জন্য আমার এই চেষ্টাকে ঠেকিয়েছিলেন, একথা চূড়ান্তভাবে জেনেও যে মৃত্যু, আর কিছু নয়, মৃত্যু তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে সাইরেনিকায়। আর এখন, শত যুদ্ধের পর সেই বহু প্রতীক্ষিত মৃত্যু তাঁকে শেষ পর্যন্ত কব্জা করেছে .. . কিন্তু বলুন কখন পতন ঘটলো তাঁর?’
মুহাম্মদ আজ্জুবাই আস্তে করে তাঁর মাথা নাড়েন এবং আমরা যখন বাজারের চিপা রাস্তা থেকে বের হলাম আল-মানাখার খোলা অন্ধকার চকে, তিনি আমাকে বললেনঃ
-‘যুদ্ধে ওঁর মৃত্যু হয়নি, তিনি যখন হন এবং জীবিত অবস্থায় বন্দী হন এবং তারপরই তাঁকে ইতালীয়রা হত্যা করে. . ওরা তাঁকে একজন সাধারণ চোরের মতো ফাঁসি দেয়.. .।
-‘কিন্তু কী করে ওরা তা করতে পারে, আমি বিস্মিত কন্ঠে প্রশ্ন করি। গ্রাৎসিয়ানিও তো এ ধরনের ভয়ংকর কাজ করতে সাহস পেতো না!
-কিন্তু সে-ই তা করেছে, সে-ই তা করেছে, তিনি জবাব দেন বিদ্রুপ মেশানো হাসির সংগে। জেনারেল গ্রাৎসিয়ানি নিজেই তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারার আদেশ দেয়।সিদি উমর এবং তাঁর বিশ পঁশিচ জন সংগী ছিলেন ইতালী অধিকৃত এলাকার অনেক ভেতরে, যখন তাঁরা স্থির করেন তাঁরা রসূলের সহাবা সিদি রফির মাযারে গিয়ে য়িয়ারত করবেন। মাযারটি ছিলো কাছেই। কোনো না কোনোভঅবে ইতালীয়রা তাঁর উপস্থিতির কথা জানতে পায় এবং বহু লোক দিয়ে উপত্যকার দু’দিকই বন্ধ করে দেয়। পালিয়ে বাঁচার আর কোনো পথ ছিলো না। সিদি উমর এবং মুজাহিদীন আত্মরক্ষার জন্য লড়াই করেন, শেষ পর্যন্ত তিনি আর তাঁর দুই সংগী বেঁচে রইলেন। অবশেষে তিনি যে ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন, শত্রুর গুলীতে সে ঘোড়াটি মারা যায় এবং ঘোড়াটি পড়ে যাওয়ার সংগে সংগে তিনিও মাটিতে গড়িয়ে পড়েন। কিন্তু বৃদ্ধ সিংহ তখনো রাইফেল বাগিয়ে গুলি চালিয়ে যেতে থাকেন। এক সময় একটি বুলেট এসে তাঁর একটি হাত চুরমার করে দেয়; তখন তিনি অন্য হাত দিয়ে গুলি করতে থাকে, কিন্তু এক সময় গুলিও ফুারিয়ে গেলো। তখন ওরা তাঁকে ধরে ফেলে এবং তাঁকে বেঁধে সুলূকে নিয়ে যায়। ওখানে তাঁকে নিয়ে হাজির করা হয় জেনারেল গ্রাৎসিয়ানির সম্মুখে। সে তাঁকে জিজ্ঞাস করেঃ তুমি কী বলবে যদি ইতালী সরকার তার মহৎ করুণ বশে তোমাকে বেঁচে থাকবার অনুমতি দেয়? ‘তুমি কি ওয়াদা করতে রাজী আছো তুমি তোমার জীবনের বাকি বছরগুলো শান্তিপূর্ণভাবে কাটাবে?’ কিন্তু সিদি উমর জবাব দিলেনঃ ‘তোমার লোকসকল আর তোমার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধে ক্ষান্ত দেবো না যতক্ষণ না তোমরা দেশ ত্যাগ করছো অথবা আমি আমি আমার জীবন থেকে বিদায় নিয়েছি। মানুষের অন্তরে যা আছে, যিনি তা জানেন, তাঁর নামে কসম করে আমি তোমাকে বলছি, যদি এই মুহূর্তে আমার হাত দুটি বাঁধা না থাকতো, আমি আমার খালি হাত নিয়ে তোমার সংগে লড়তাম যদিও আমি বৃদ্ধ এবং বিধ্বস্ত.. .।
এতে জেনারের গ্রাৎসিয়ানি হো হো করে হেসে ওঠে এবং সুলুকের বাজারের মধ্যে সিদি উমরকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করার হুকুম দেয়। ওরা সে হুকুম কার্যকরী করে। আর বিভিন্ন তাঁবুতে যে-সব হাজার হাজার মুসলিম নর-নারীকে কয়েদ করে রাখা হয়েচিলো তাদের গরু-ভেড়ার পালের মতো একত্র করে হাঁকিয়ে নিয়ে এসে ফাঁসি-কাষ্ঠে তাদের নেতার মৃত্যু দেখেতে বাধ্য করে.. .।১[ইতালীয়দের এই বীরোচিত কর্মটি ঘটেছিলো ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৩১ ইংরেজি।]
তিন
তখন হাত ধরাধরি করে মুহাম্মদ আজ্জুবাই আর আমি চলেছি সেনুসি ‘জাভিয়া’ তথা ধর্মীয় আস্তানার দিকে। বিশাল চকের উপর অন্ধকার ছড়িয়ে আছে। বাজারের হট্টগোল আমরা ফেলে এসেছি পেছনে। আমাদের স্যান্ডেলের নীচে বলু দেবে যাচ্ছে। এখানে ওখানে দেখা যাচ্ছে ভারবাহী উটের একেকটি দল বিশ্রাম করছে; দূরে চকের বাহির্ভাগে এক সারি ঘর-বাড়ি অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে মেঘাচ্ছন্ন রাতের আকাশের পটভূমিকায়। এ দৃশ্য আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় সুদূরের একটি অরণ্যের প্রান্তভাগের কথা, সাইরেনিকার মালভূমি অঞ্চলের সেই সব জোনিপার অরণ্যের কথা, যেখানে আমি প্রথম সিদি উমর আল মুখতারের সাক্ষাৎ পেয়েছিলামঃ এবং সেই নিষ্ফল সফরের স্মৃতি আমার বুকের ভেতর উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে অন্ধকার, বিপদ এবং মৃত্যুর সমস্ত করুণ রসসহ। আমি দেকতে পাই-একটি ছো্ট্ট নিবু নিবু আগুনের উপর নুয়ে পড়া সিদি উমরের গম্ভীর বিষণ্ণ মুখ এবং শুনতে পাই তাঁর ভাঙা ভাঙা, গম্ভীর কণ্ঠস্বরঃ আমাদের ধর্ম এবং আমদের আযাদীর জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হবে যতোক্ষণ না আমরা হানাদারদের তাড়িয়ে দিতে পেরেচি অথবা আমরা নিজেরা মৃত্যুবরণ করেছি.. . আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই.. .।’
.. . .. . .. .
এ ছিলো এক অদ্ভুদ মিশন, যা আমাকে সাইরেনিকায় নিয়ে আসে ১৯৩১ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে। কয়েক মাস আগে-সঠিকভাবে বলতে গেলে ১৯৩০-এর শরৎকালে-মহান সেনুসি মদীনায় এসেছিলেন। আমি তাঁর এবং মুহাম্মদ আজ্জুবাই-এর সহবতে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাই মুজাহিদীনের মারাত্মক সংকটের কথা আলোচনা করে, যারা উমর আল-মুখতারের নেতৃত্বে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলো সাইরেনিকায়। স্পষ্ট বোঝা গেলো, ওরা যদি বহির্বিশ্ব থেকে দ্রুত এবং কার্যকরী মদদ না পায়, ওরা আর বেশি দিন টিকে থাকতে সক্ষম হবে না।
সাইরেনিকার পরিস্থিতি ছিলো মোটামুটি এইরূপঃ উপকূলের সব ক’টি শহর এবং জবল আখদার যাকে বলা হয় মধ্য সাইরেনিকার ‘সবুজ পর্বতমালা’- তার উত্তর অঞ্চলের কয়েকটি স্থান রয়েছে ইতালীয়দের কঠোর নিয়ন্ত্রণে। এসব সুরক্ষিত স্থানের ফাঁকে যেসব জায়গা রয়েছে সেখানে নিরবিচ্ছন্নভাবে টহল দিয়ে চলেছে সাঁজোয়া গাড়ি এবং বেশ কিছু সংখ্যক পদাতিক ফৌজ, যাদের বেশির ভাগই হচ্ছে ইরিত্রিয় ‘আশকারী’ বা লস্কর ওদের সমর্থনে এক স্কোয়াড্রন বিমান ঘন-ঘন উড়ছে আকাশে, গ্রাম্যঞ্চলের উপর দিয়ে। বেদুঈন (যাদের নিয়ে গঠিত ছিলো সেনুসি প্রতিরোধ বাহিনীর মূল শক্তি) পক্ষে সঙ্গে সঙ্গে শত্রুর নযর না পড়ে এবং আকাশ হতে বিমান হামলার শিকার না হয়ে চলাফেরা মোটেই সম্ভব ছিলো না। প্রায়ই এরকম ঘটতো যে, একটি সন্ধানী বিমান হয়তো বেতারযোগে নিকটতম পোষ্টে বার্তা পাঠিয়েছে কোনো বেদুঈন কবিলার তাঁবুর অস্তিত্ব সম্পর্কে, বিমানের মেশিনগান যখন ওদের ছত্রভংগ হতে দিচ্ছে না, তখন কয়েকটি সাঁজোয়া গাড়ি ছুটে এলো সোজাসুজি তাঁবু, উট এবং মানুষের মধ্য দিয়ে-আওতার মধ্যে যা পেলো নারী, পুরুষ, ছেলেমেয়ে, জীব-জানোয়ার সবাইকে নির্বিচারে হত্যা করতে করতে-এবং যে ক’টি মানুষ আর জীবজন্তু বেঁচে রইলো তাদের গরু-ভেড়ার পারের মতো এক জায়গায় জমা করে তাড়িয়ে নেওয়া হলো উত্তর-দিকে, কাঁটাতরের বৃহৎ বেষ্টনীর মধ্যে, যা ইতালীয়রা স্থাপন করেছে উপকূলভাগে। সে সময়ে, ১৯৩০-এর শেষের দিকে প্রায় ৮০ হাজার বেদুঈন আর তার সংগে কয়েক লাখ গরু-ভেড়া উটকে ওরা অতোটুকু জায়গার মধ্যে এন পশুর পালের মতো জমা করে, যে জায়গায় ঐ সংখ্যার সিকি ভাগরেও রসদ ছিলো না। ফলে মানুষ এবং জীব-জানোয়ারের মৃত্যুহার হলো ভয়াবহ। অধিকিন্তু,ইতলীয়রা সমুদ্র-উপকূল থেকে দক্ষিণের জাগবুবের দিকে মিসর সীমান্ত বরাবর এটি কাঁটাতারের প্রতিবন্ধক গড়ে তুলছিলো, বীর মাঘারিবা কাবিলা তাদের অজেয় সর্দার আল –আতয়বিস –এর নেতৃত্বে-যিনি ছিলেন উমর আল মুখতারের দক্ষিণ হস্ত- তখনো অবিচলিতভাবে বাধা দিয়ে যাচ্ছে শত্রুকে সাইরেনিকার পশ্চিম উপকূলের নিকটে। কিন্তু বেশির ভাগ কবিলাই ইতালীয়দের বিপুলতরো সংখ্যা এবং উন্নততরো অস্ত্রশস্ত্রের কাছে ইতিমধ্যে হার মেনেছে। আরো দক্ষিণে অনেক ভেতর ভাগে নব্বই বছর বয়স্ক আবু কারাইমের নেতৃত্বে জুবইয়া কবিলা তখনো মরণ পণ জিহাদ করে চলেছে-তাদের কবিলার কেন্দ্র জালু মরুদ্যান হাতছাড়া হওয়ার পরও। অভ্যন্তরভাগে বেদুঈনেরা বিপুল সংখ্যায় মারা যাচ্ছিলো অনাহারে এবং রোগ ব্যাধিতে।
সিদি উমরের পক্ষে যুদ্ধে জন্য একবারে যে সৈন্য সমাবেশ সম্ভব ছিলো তা বড়জোর সংখ্যায় এক হাজারের কিছু বেশি হতে। অবশ্য লোকের অভাবই এর কারণ নয়। মুজাহিদীন যে ধরণের গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলো তাতে যোদ্ধাদের বড় দল করে কাজ করা সুবিধাজনক ছিলো না। বরং এ ধরণের যুদ্ধ নির্ভর করতো আঘাত করতে সক্ষম ছোট্ট দলের ক্ষীপ্রতা ও গতিশীলতার উপর যা হঠাৎ শূণ্য থেকে আর্বিভূত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে একটি ইতালীয় ব্যূহ অথবা দূরবর্তী ঘাঁটির উপর-এর অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নেবে। তারপর কোনো চিহ্ণ না রেখেই সাইরেনিকার মালভূমি ঘন জুনিপার অরণ্যে এবং শুকিয়ে যাওয়া নদীর উঁচু নীচু ভঙ্গুঁর উপত্যকায় গায়েব হয়ে যাবে। যতো দুঃসাহসীই হোক না কেন, জীবন মৃত্যুকে যতোই পায়ের ভৃত্য মনে করুক না কেন, এ ধরনের ছোট ছোট দলের পক্ষে যে, জনসংখ্যা আর অস্ত্রশস্ত্রের দিক দিয়ে প্রায় অপরিসীম সম্পদের অধিকারী দুশমনের উপর নিশ্চিত জায়লাভ কখনো সম্ভব নয়, তা ছিলে সুস্পষ্ট। কাজেই, প্রশ্নটি ছিলো , কী করে মুজাহিদীনের শক্তি বৃদ্ধি করা যায়, যাতে করে ওরা হানাদারদের উপর বিচ্ছিন্ন আক্রমণ চালিয়ে ওদের কেবল ক্ষতিগ্রস্থ করতেই সক্ষম হবে না, বরং দুশমন যে সব অবস্থানে আসন গেড়েছে মজবুত ভাবে, সেগুলিওে কেড়ে নিতে সক্ষম হবে, পারবে নতুন আক্রমনের মুকাবিলায় সে অবস্থানগুলিকে নিজের অধিকারে রাখতে।
সেনুসি শক্তিকে এভাবে বাড়াতে হলে তা নির্ভর করছিলো কয়েকটি বিষয়ের উপরঃ মিসর থেকে নিয়মিতভাবে অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য যাতে আসতে পারে তার ব্যবস্থা; বিমান এবং সাঁজোয়া গাড়ির মারত্মক ধ্বংসলীলার মুকাবিলা করার জন্য অস্ত্রশস্ত্র বিশেষ করে, ট্যাংক বিধ্বংসী রাইফেল এবং ভারী কামান; এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের জন্য কারিগরী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকজন এবং মুজাহিদীন’কে এসব ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ, এবং সর্বশেষে সাইরেনিকার বিভিন্ন মুজাহিদীন দলের মধ্যে নির্ভরযোগ্য বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা আর মিসরীয় এলাকার অভ্যন্তরে গোপন সরবরাহ –ডিপো!
প্রায় এক হ্প্তা, সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা, মহান সেনুসি সিদি মুহাম্মদ এবং আমি এক সংগে বসে পরামর্শ্ করি- কী করা যায়। সিদি মুহাম্মদ বললেন-কখনো কখনো সাইরেনিকায় মুজাহিদীনের কিছু শক্তি বৃদ্ধি করলেও তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁর বিশ্বাস, লিবীয় মরুভূমির অনেক দক্ষিণে কুফ্রা মরুদ্যানটিকে ভবিষ্যতের সকল যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু করে গড়ে তুলতে হবে আবার। কারণ কুফ্রা এখনো ইতালীয় সৈন্যবাহিনীর নাগালের অনেক দূরে রয়েছে। উপরন্তু সাইয়িদ আহমদের নেতৃত্বে সেনুসি তরীকার হেড কোয়ার্টর ছিলো এই কুফা। কুফা মিশরীয় মরুদ্যান বাহরিয়া এবং ফারাফ্রা অভিমুখি সরাসরি, যদিও দীর্ঘ এবং দুস্তর, মরু কাফেলার পথের উপর অবস্থিত এবং সে কারণে, দেশের অন্য যে-কোন স্থানের চাইতে এ স্থানে অনেক বেশি কার্যকরভাবে রসদের ব্যবস্থা করা সম্ভব। তাছাড়া, মিসরের বিভিন্ন ক্যাম্পে যে বহু হাজার সাইরেনীয় মুহাজির বাস করছে, তাদের জন্যও এটিকে করা যেতে পারে নতুন করে সমাবেশের কেন্দ্র। আর এভাবে তা হয়ে উঠতে পারে উত্তরাঞ্চলে সিদি উমরের গেরিলা বাহিনীর জন্য জনশক্তির একটি নিয়মিত সংরক্ষণাগার। ঠিক মতো সুশিক্ষিত হলে এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হলে কুফ্রা নিচু উড়ে যাওয়া বিমান থেকে কামানের আক্রমণ ঠেকাতে পারবে। অন্য দিকে খুব উচু থেকে বোমা বর্ষণ করলে এতো দূর দূর ব্যবধানে অবস্থিত তাঁবুগুলির সত্যিকার বিপদের আশংকা সামান্যই থাকবে।
মহান সেনুসি বললেনঃ এভাবে সংগ্রামের পদ্ধতি নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব হলে তিনি নিজে কুফায় ফিরে যাবেন ভাবী সকল অপারেশন সেখান থেকে পরিচালনা করার জন্য ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের সংগে নতুন করে সদ্ভাব স্থাপন করা সাইয়িদ আহমদের জন্য জরুর। বলা বহুল্য, ১৯১৫ সনে ব্রিটিশ শক্তির উপর আক্রমণ করে সাইয়িদ আহমদ ব্রিটিশ সরকারকে একবারে অযথাই অতি ঘোর শত্রুতে পরিণত করেছিলেন। সম্পর্কের এ ধরনের উন্নতি হয়তো অসম্ভব নয়, কারণ ইতালীর সম্প্রসারণবাদী মেজাজে ব্রিটেন খুব খুশী ছিলো না। বিশেষ করে, যখন মুসোলিনী ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দুনিয়াকে জানাচ্ছেন ভূমধ্যসাগরের উভয় তীরে ‘রোমান সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ তার অভিপ্রায় এবং লোভাতুর দৃষ্টিতে তিনি যখন তাকাচ্ছেন মিসরে দিকেও। সেনুসিদের ভাগ্য সম্বন্ধে আমার এই গভীর আগ্রহের কারণ একটি ন্যায়সংগত লক্ষ্য হাসিলের জন্য চরম বীরত্বের প্রতি আমার প্রদ্ধাই কেবল নয়, আমি আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম সেনুসিদের বিজয় গোটা আরব জগতের উপর যে সাম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তাই নিয়ে। অনেক মুসলমানের মতোই আমিও বুহ বছর ধরে আামর আশা স্থাপন করেছিলাম ইবনে সউদের উপর, ইসলামী পুর্জাগরণের একজন সম্ভাব্য নেতা হিসাবে। কিন্তু এখন যখন সে আশা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে গোটা মুসলিম জাহানে আমি কেবল একটি আন্দোলনই দেখতে পেলাম যা আন্তুরিকভাবে প্রায়াস চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামী সমাজের আদর্শের বাস্তব রূপায়নের জন্যঃ আর সে আন্দোলন হচ্ছে সেনুসি আন্দোলন, বেঁচে থাকর জন্য এ মুহূর্তে মরণপণ জিহাদে লিপ্ত।
এবং সাইয়িদ আহমদ জানতেন, সেনুসি আন্দোলনের লক্ষ্যের সাথে আমার আবেগ অনুভূতি খুবই নিবিড়-গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। তাই তিনি মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকালেন এবং সোজা আমার চোখের উপর চোখ রেলে বললেনঃ
-হে মুহাম্মদ, তুমি কি আমাদের তরফ থেকে যেতো পারো সাইরেনিকা এবং দেখে আসতে পারো মুজাহিদীনে’র জন্য কী করা যায়? হয়তো আমার লোকদের চাইতে স্বচ্ছতরো দৃষ্টিতো তুমিই সক্ষম হবে সব কিছু দেখতে..
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ি নিঃশব্দে, যদিও আমার উপর তাঁর আস্থা সম্পর্কে আমি ছিলাম সজাগ। তাই, তাঁর পরামর্শে পুরাপুরি বিস্মিত হইনি। তবু, এতে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হলো। এমন বৃহৎ একটি এ্যাডভেঞ্চারের সম্ভাবনা আমাকে এতোটা বিহ্বল করে তুললো, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু তারো চাইতে বেশি যা আমাকে রোমাঞ্চিত করে তুললো তা এই ভাবনা যে, যে-আদর্শের জন্য নিজেদের কুরবান করেছে বহু মানুষ, তারৈই জন্য আমিও হয়তো কিছু করতে সক্ষম হবো!
সাইয়িদ আহমদ তাঁর মাথার উপর একটি তকের দিকে হাত বাড়ালেন এবং রেশমী কাপড়ে মোড়া একখন্ড কুরআন হাতে নিলেন। সেইটিকে তাঁর হাঁটুর উপর রেখে তিনি আমার ডান হাত তঁর দুই হাতের মধ্যে নিয়ে তা রাখলেন কুরআনের উপরঃ
‘শপথ করো মুহাম্মদ, তাঁর নামে যিনি জানেন মানুষের অন্তরে যা কিছু আছে-তুমি সব সময়ই ‘মুজাহিদীনে’র বিশ্বাস রক্ষা করবে.. .।’
আমি শপথ নিলাম –এবং আমি কী শপথ গ্রহণ করলাম, সে বিষযে আমার জীবনে কখনো ঐ মুহূর্তের চাইতে বেশি নিশ্চিত ছিলাম না।
সাইয়িদ আহমদ আমার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করলেন তার জন্য চূড়ান্ত গোপনীয়তা ছিলো অপরিহার্য; যেহেতু মহান সেনুসির সংগে আমার সম্পর্ক ছিলো সুপরিজ্ঞাত এবং সে সম্পর্ক জেদ্দায় যেসব কূটনৈতিক দূতাবাস ছিলো তাদের নযর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলো না। সে কারণে, প্রাকাশ্যে মিসর অভিমুখে যাত্রা করে ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া আক্কেলমন্দের কাজ হতো না। ফয়সাল আদ-দাবীশের বিদ্রোহের পেছনে যে ষড়যন্ত্র সম্প্রতি আমি উদঘাটন করেছি, তা ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিতে আমার মর্যাদা নিশ্চয় বাড়ায়নি। বরং খুবই সম্ভব যে, আমি যে মুহূর্তে মিসরের মাটিতে পা রাখবো তখন থেকেই ওরা আমার গিতিবিধির উপর তীক্ষ্ণ নযর রাখবে। তাই আমরা স্থির করলাম, আমার মিসর যাওয়ার কথাও গোপন রাখা হবে। আমি আরবের পালতোলা জাহাজের কোনো না কোনো একটিতে চড়ে পাড়ি দেবো লোহিত সাগর এবং পাসর্পোট আর ভিসা ছাড়াই লকিয়ে উজান মিসরের কোন এক নির্জন স্থানে নেমে পড়বো। মিসরে আমি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবো একজন শহরে হেজাযীর ছদ্মবেশে, কারণ তেজারতির উদ্দেশ্যে অথবা সম্ভাব্য হজ্জ্ব যাত্রীর সন্ধানে ওখানে মক্কা মদীনা থেকে যে বহু সংখ্যক লোক যায় মিসরে বিভিন্ন শহর এবং গ্রামেরলোকেরা তাদের সব সময়ে দেখে আর আমি যেহেতু অতি স্বছন্দে হেজাবী-উপ-ভাষায় কথা বলতে পারি, সে করণে এ দুটি পবিত্র নগরীর একটির বাসিন্দা হিসাবে আমি সব জায়গায়েই অনায়অসে নিজেকে চালিয়ে নিতে পারবো।
ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ করার জন্য কয়েক হপ্তার প্রস্তুতির প্রয়োজন হলো। এই প্রস্তুতির মধ্যে ছিলো সাইরেনিকায় সিদি উমরের সংগে এবং তৎসহ মিসরে যাঁদের সংগে সেনুসিদের সম্পর্ক রয়েছে তাঁদের সাথে গোপন পত্র বিনিময়ের ব্যবস্থা। এবং এভাবে ১৯৩১ সনের জানুয়ারির প্রথম হপ্তায়ই য়ায়েদ এবং আমি হেজাযের বন্দর-শহর ইয়ানবু ত্যাগ করে উপকূলের এমন একটি অংশে গিয়ে পৌছুলাম যেখানে মানুষের গতিবিধি ছিলো বরল। আসমানে চাঁদ ছিলো না, কৃষ্ণপক্ষের রাত, আসমান রাস্তার উপর দিয়ে স্যান্ডেল পায়ে হাঁটা ছিলো খুবই কষ্টকর। একবার যখন আমি হোঁচট খেলাম তখন আমার হেজাযী কাপ্তানের নীচে গোঁজা লুপার পিস্তলের বাটের আঘাত লাগলো আমার পাঁজরে এবং এর ফলে, আমি যে –দুঃসাহসিক অভিযানে বের হয়েছি তার ভয়ংকর প্রকৃতি আমার মনে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠলো।
এখানে আমি চলছি এক নির্দিষ্ট স্থানের দিকে, এক অপরিচিত আরব নাবিকের সংগে, যে আমাকে তার পালতোলা ডিঙিতে করে সমুদ্দুর পার কের গোপনে মিসরীয় উপকূলের কোথাও নামিয়ে দেবে। আমার কাছে এমন কোনো কাগজপত্রই ছিলো না আমার পরিচয় ব্যক্ত করে দিতে পারে। কাজেই আমি যদি মিসরে ধরাও পড়ি, প্রমাণ করা সহজ হবে না, আমি কে! কিন্তু আমার সামনে যে বিপদ রয়েছে তার তুলনায় মিসরের কোনো জেলে কয়েক হপ্তা কাটানোর বিপদও আমার জন্য কিছুই ছিলো না। ইতালীয় পাহারাদর-বিমান যাতে দেখতে না পায় সেভাবে এবং সম্ভবত সাঁজোয়া গাড়ির টহলদারের দৃষ্টি এড়িয়ে আমাকে পশ্চিমের গোটা মরুভূমিটি প্রস্থে পাড়ি দিতে হবে এবং পৌছুতে হবে অমন একটি দেশের কেন্দ্রস্থলে, যেখানে তরবারীর ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা কেউ জানে না। আমি এ কাজ কেন করছি? প্রশ্ন করি নিজেকে।
যদিও বিপদ আমার কাছে অপরিচিত নয়, কেবল একটা রোমাঞ্চের প্রত্যাশায় আমি কখনো তা চাইনি। যখন আমি কোনো বিপদের মধ্যে গিয়ে পড়েছি, প্রত্যেকবারই তার মূলে ছিলো জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাত এক আন্তর-দোলার (Urge)প্রতি সাড়া, যা আমার নিজের জীবনের সংগে ছিলো অত্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে সম্পর্কিত। তাহলে, আমার এই বর্তমান উদ্যোগটির তাৎপর্য কী? আমি কি সত্যি বিশ্বাস করি আমার হস্তক্ষেপ ‘মুজাহিীনে’র পক্ষে ফিরিয়ে দেবে স্রোত? আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হলোঃ কিন্তু আমার অন্তরের গহনে আমি জানি, একটি অবাস্তব কল্পনা-সর্বস্ব মিশন নিয়ে আমি বের হয়েছি। তা হলে, আল্লাহর শপথ, এভাবে কি আমি আমার জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি যা আগে কখনো করিনি এবং সামনে প্রতিশ্রুতি যখন এত সামান্র?
কিন্তু প্রশ্নটি সচেতনভাবে গঠিত হওয়ার আগেই তার জবাব আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যখন আমি ইসলামের সাথে পরিচিত হয়ে উঠি এবং ইসলামকে আমার জীবন-বিধান হিসাবে গ্রহণ করি-আমার মনে হয়েছিলো-আমার সমস্ত জিজ্ঞাসা এবং সমস্ত সন্ধান সমাপ্ত হয়েছে। কিন্তু ক্রমে ক্রমে খুবই ধীরে ধীরে আমি সজাগ হয়ে উঠলাম যে, এখানেই শেষ নয়ঃ কারণ নিজের বাধ্যতা মুলক বলে কোনো জীবন-বিধান গ্রহণ , অন্ততপক্ষে আমর কাচে তা সমমতের মানুষদের মধ্যে অনুসরনের একটি বাসনার সংগে অবিচ্ছেদ্যভাবে বিজড়িত। কেবলমাত্র একটা ব্যক্তিগত অর্থে তা অনুসরণ করা নয়, বরং আমার কাছে ইসলাম ছিলো একটি পথ, লক্ষ্য নয় এবং উমর আল – মুখতারের বেপরোয়অ গেরিলারা তাদের জীবন আর রক্ত দিয়ে সংগ্রাম করে চলেছে সেই পথে চলার স্বাধীনতার জন্য, ঠিক যেমনটি করেছিলেন বীর সহাবারা তেরো’শ বছর আগে। ফল যতো অনিশ্চিতই হোক, তাদরে এই কঠোর এবং ঘোর সংগ্রামে তাদের সাহায্য করা আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবেই অপরিহার্য ছিলো , সালাতের মতোই.. .
এবং তার পরেই দেখা গেলো উপকূলভাগ। যে-সব ছোটো মৃদু ঢেউ আঘাত করছে তীরে নূড়ি পাথরের উপর সেই ঢেউগুলির মোলায়েম স্ফীতির উপর দোল খাচ্ছে দাঁড়ের নৌকা, যা আমাদের নিয়ে যাবে দূরে, অন্ধকারে নোঙর করা জাহাজে। অপেক্ষমান নৌকায় যখন নিঃসংগ দাঁড়টানা লোকটি দাঁড়ালো আমি তখন যায়েদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলিঃ
-‘ভায়া যায়েদ, তুমি কি জানো আমরা এমন এক দুঃসাহসিক অভিযানে বের হয়েছি যা আদ –দাবিশের সম্মিলিত সকল ‘ইখওয়ানে’র চাইতেও তোমার এবং আমার জন্য অধিকতরো খতরনাক প্রমানিত হতে পারে? তোমার কি মদীনার শান্তি এবং তোমার বন্ধু-বান্ধবের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না?’
‘-চাচা, আপনার পথই আমার পথ,’ যায়েদ জবাব দেয়, আপনি নিজেই কি আমাকে বলেননি যে, যে পানির স্রোত নেই তা হয়ে ওঠে বাসি এবং দূষিত? চলুন আমরা আগিয়ে যাই-আর পানি যেনো চলতে চলতে হয়ে ওঠে পরিষ্কার.. .
জাহাজটি হচ্ছে সেই সব বড় বিদঘুটে পালতোলা কিশতী’র একটি যা আরবের উপকূলে ঘেঁষে চলাচল করেঃ সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি এই জাহাজ, শুঁটকি আর সমুদ্র-শৈবালের গন্ধে ভরপুর। কিশতীটির পশ্চাৎভাগে রয়েছে একটি উঁচু পাটাতান, ল্যাটিন পদ্ধতিতে পাল খাটানোর জন্য দুটি মাস্তুল, আর দুই মাস্তুলের মাঝখানে রয়েছে একটি বড়ো, নীচু সিলিংবিশিষ্ট কেবিন। জাহাজের ‘রইস’ বা চালক হচ্ছেন মস্কটের এক বয়োবৃদ্ধ অভিজ্ঞ আরব। বহু রঙের এক মস্ত বড় পাগড়ীর তল থেকে ছেটো ছোটো তসবীর দানার মতো দুটি চোখ আমার দিকে অর্ধ নিমিলিত দৃষ্টিতে তাকালো, তাতে দেকলাম সতর্ক অভিব্যক্তি, যাতে বাঙময হয়ে উঠেছে অবৈধ কাজের ঝুঁকি নেয়া এবং অবৈধ অভিযানে কাটানো বহু বছর-আর তার কোমরে গোঁজা বাঁকা রূপার আবরণে ঢাকা ডেগারটি কেবল অলংকার বলে মনে হলো না।
-‘মারহাবা, হয়া মারহাবা, হে বন্ধুরা’, সে চিৎকার করে খোশ আমদেদ জানায় আমরা জাহাজে পা দেবার সাথে সাথে, ‘এ নিশ্চয় এক শুভ মুহূর্ত!
কতোবারই না ও, আমি মনে মনে ভাবি, একইভাবে সে আন্তরিক খোশ আমদেদ জানিয়েছে গরীব ‘হাজীদের’, যাদের সে গোপনে লুকিয়ে জাহাজে তুলেছে মিসরে, আর ওদের কল্যাণ সম্পর্কে নতুন কের কোনো চিন্তা না করেই নামিয়ে দিয়েছে হেজাযের উপকূলে-যাতে করে ওরা ফাঁকি দিতে পারে মোটা হজ্জ্ব ট্যাক্স, যা সৌদী সরকার আল্লাহর ঘরে যারা হজ্জ্ব করতে যায় তাদের উপর ধার্য করেছে! আর কতোবারই না সে ঠিক এই কথাগুলিই বলেছে দাস-ব্যবসায়ীদের, যারা ইসলামী আইন সম্পূর্ণ ভংগ করে, কোনো না কোনো হতভাগা হাবশীকে বন্দীকরেছে ইয়েমেনের দাস-বিক্রির হাটে বিক্রি করার জন্য! কিন্তু তা সত্ত্বেও –আমি নিজেকে সান্তুনা দিই, -আমাদের এই ‘রইস’ যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তার পটভূমি যতোই আপত্তিকর হোক না কেন, তা আমাদের অবশ্যি কাজে লাগবে। কারণ লোহিত সাগর পরিক্রমণ করে এর রাস্তা সম্পর্কে তার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে খুব কম নাবিকেরই তা আছে। আর এ কারণে আমাদের সে এক নিরাপদ উপকূলে নামিয়ে দিতে সক্ষম হবে, এ বিষয়ে নির্ভর করা যায় তার উপর।
.. . .. . .. . .. .
আর সত্যই ঐ নৌকায় ওঠার চার রাত পার আমাদের নামিয়ে দেওয়া হলো আবার একটি ছোট্ট দাঁড়ের নৌকায় করে, উজান মিসরের উপকূলে, বন্দর কুসায়েরের উত্তরে। আমরা বিস্ময়ে অবাক হই, কেননা ‘রইস’ আমাদের সমুদ্দুর পার করে দেওয়ার জন্য কোন ভাড়া নিতে রাজী হলো না। ‘কারণ, ‘দাঁত বের করে হেসে হেসে সে বলে, ‘আমার মুনিব আমার পাওনা শোধ করে দিয়েছেন! আল্লাহ আপনার সহায় হোন।
আমি যেমনটি আশা করেছিলাম, কারো দৃষ্টি আকর্ষণ না করে বন্দর কুসাযেরে চলাফেরা করা আমাদের পক্ষে কঠিন হয়নি, কারণ হিজাযী পোশাকে লোকজনকে দেখতে এ শহরের লোকেরা অভ্যস্ত। আমাদের উপস্থিতির পরদিন সকালে নীল নদের তীরবর্তী আস-সিয়ূতগামী একটি নড়বড়ে বাসে আমাদের জন্য আসন বুক করি-আর, একদিকে ভয়ানক মোটা একটি স্ত্রীলোক, যে তার বিশাল কোলের উপর এক ঝুঁড়ি মোরগ নিয়ে বসেছে, অন্যদিকে এক বৃদ্ধ ‘কৃষক’, যে- আমাদের পোমাক দেখেই, দশ বছর আগে যে সে ‘হজ্জ্ব’ করেছিলো, তারই স্মৃতিচারণ শুরু করে- এ দুজনের চাপের মধ্যে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে যায়েদ আর আমি আমাদের আফ্রিকী সফরের প্রথম পর্যায় শুরু করি।
আমি সবসময় মনে করেছি, গোপন এবং বিপজ্জনক কাজের ঝুঁকি যে-ই নেয় তারই উপলব্ধি অনিবার্য যে, যার সংগেই তার সাক্ষাৎ হচ্ছে, তারই সন্দেহের পাত্র সে এবং তার ছদ্মবেশ ধরা পড়ে যেতে পারে সহজেই। কিন্তু আশ্চর্য, এই মুহূর্তে আমার মনে সে ভাবনা নেই! আরবে আমি আমার জীববনের যে বছরগুলি কাটিয়েছি, সে সময়ের মধ্যে এর অধিবাসীদের জীবনে আমি অতোটা পুরাপুরি প্রবেশ করেছি যে, কেমন করে যেনো কখনো আমার মনেই হতো না যে আমি নিজে ওদেরিই একজন ছাড়া অন্য কেউ! এবং যদিও আমি মক্কা ও মদীনার লোকদের বিশেষ ব্যবসায়ী মনোবৃত্তির শরীক কখনো হইনি, এই মুহুর্তে আমি আমার মালুমের ভূমিকার সাথে নিজেকে এমন সম্পূর্ণ অভ্যস্ত বলে উপলব্ধি করি যে, আমি কাল বিলম্ব না করেই আরো কজন যাত্রীর সাথে ‘হজ্বে’র ফযিলত সম্পর্খে প্রায় পেশাদার এক আলোচনায় জড়িয়ে পড়ি। যায়েদ এই খেলায় অংশ নেয় প্রচন্ড উৎসাহের সাথে আর এভাবে আমাদের সফরের কয়েকটি ঘন্টা কেটে যায় প্রাণবন্ত আলোচনায়।
আস—সিয়ূতে গিয়ে আমর ট্রেনে চাপি এবং শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌছুই ছোট্ট একটি শহর বনি সুয়েফে। ওখান থেকে আমরা সোজা চলে যাই আমাদের সেনুসি বন্ধু ইসমাঈল আধ-ধিবির ঘরে। তিনি একজন বেঁটে-খাটো, মজবুত হাসি-খুশি লোক, কথা বলেন উজান মিসরের সুরেলা আরবী ভাষায়। তিনি কেবল সাধারণ এক কাপড় ব্যবসায়ী বলে শহরের উল্লেখযোগ্য লোকদের মদ্যে তিনি গণ্য ছিলেন না; কিন্তু সেনুসি তরীকার প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রমাণিত হয়েছে বহুবার, আর সাইয়িদ আহমদের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত অনুরাগ তাঁকে করেছে দ্বিগুণ বিশ্বাসভাজন। তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে বটে; তবু তিনি তাঁর এক নওকরকে জাগিয়ে আমাদরে খাবার তৈরি করার জন্য বললেন এবং যখন আমরা খাবারের জন্য অপেক্ষা করছি, সেই অবসরে তিনি যে –যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন সেগুলি সম্পর্কে এক একটি করে বলতে থাকেন।
প্রথমত, সাইয়িদ আহমদের পয়গাম পাওয়ার সংগে সংগেই তিনি মিসরের রাজপরিবারের এক মশহুর ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করেন। বহু বছর ধরে এই লোকটি ছিলেন সেনুসি আদর্শের এক প্রবল এবং সক্রিয় সমর্থক। এই শাহযাদাকে আমার মিশনের উদ্দেশ্য পুরাপুরি অবহিত করা হলো। তিনি সহজেই রাজী হয়ে যান আমার হাতে প্রয়োজনীয় টাকা-কড়ি দেবার জন্য। সাইরেনিকার সীমান্ত আমাদের মরু-সফরের উদ্দেশ্য সওয়ারী েএবং দুটি বিশ্বস্ত রাহনুমার ব্যবস্থাও তিনি করলেন। আমাদের মেজবান আমাদের জানালেনঃ এই মুহূর্তে ওঁরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন বনি সুয়েফের বাইরে কোনো এক খেজুর বাগিচায়।
আমি আর যায়েদ এখন আমাদের হিজাযী পোশাক খুলে ফেলি। কারণ এ পোশাক পশ্চিমী মরুপথগুলিতে বেজায় ঔৎসুক্য সৃষ্টি করেতে পারে। এই পোশাকের জায়গায় আমাদের দেওয়া হলো উত্তর আফ্রিকার কাটিংয়ের সুতী ট্রাউজার এবং আঁট-সাঁট জামার আর তার সাথে দেওয়া হলো পশমের তৈরী এক প্রকার জোব্বা’-মাথা-ঢাকা আবরণসহ-যা সাধারণ লোকেরা পরে পশ্চিম মিসর এবং লিবিয়ায়। তাঁর বাড়ির ভিটার নিচ থেকে ইসমাঈল বার করলেন ইতালীয় ধরনের দুটি ছোটোখাটো বন্দুক যা ঘোড় –সওয়ার সিপাইদের জন্য উপযোগী ‘কারণ, ‘মুজাহিদীনের মধ্যে এ ধরনের রাইফেলের জন্য নতুন করে গুলী বারুদ সংগ্রহ করা তোমাদের জন্য হবে সহজতরো।”
পরের রাতেই আমরা আমাদের মেজবানের পথনির্দেশ মতো বার হয়ে পড়ি শহর ছেড়ে। আমাদের সাথে যে দুজন রাহনুমা দেওয়া হলো, দেখা গেলো ওরা মিসরের আওলাদ আলী গোত্রের বেদুঈন, যাদের মধ্যে রয়েছে সেনুসির অনেক সমর্থক। ওদের মধ্যে একজনের নাম আবদুল্লাহ, এক সজীবন প্রাণবন্ত তরুণ, যে এক বছর আগে সাইরেনিকার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো। আমরা ওখানে কী আশা করতে পারি সে বিষয়ে আমাদের প্রচুর খোঁজ-খবার দেওয়া তার পক্ষে ছিলো সহজ। অপরজনের নাম আমি আমি ভুলে গেছি। ও ছিলো হালকা –পাতলা, বিমর্ষ, কথা বলতো ক্বচিৎ। তবে সে –ও তার চেয়ে অধিক সুদর্শন আবদুল্লাহর চাইতে কম বিশ্বাস ভাজন ছিলো না। ওদের সাথে যে চারটি উট ছিলো –বিশারিন জাতের শক্ত সমর্থ দ্রুতগামী সেই উষ্ট্রীগুলি-স্পষ্টতই বেছে নেওয়া হয়েছিলো সেগুলির গুণের জন্য। ওদের পিঠে যে জীন চাপানো হলো, তা আরবে যে ধরনের জীন ব্যবহারে আমি অভ্যস্ত, তা থেকে খুব আলাদা নয়। আমাদের দ্রুত কোথাও বেশীক্ষণের জন্য না থেমে, চলতে হবে বলে আমাদের পথের সর্বত্র রান্না করা খাবার পাওয়ার প্রশ্ন উঠেনি। ফলে, আমাদের রসদ ছিলো সাদাসিধা ধরনরঃ বড়ো একটি বস্তা-বোঝাই খেজুর, আরেকটি ছোটা বস্তা, মোটা গমের ময়দায় তৈরি মিষ্টি আর কেজুর দিয়ে বস্তাটি এভাবে ঠেঁসে ভরা যে, তা ফেটে যায় আর কি! আর ছিলো তিনটি উটের সাথে বাঁধা চামড়ার মশক।
দুপুর রাতের সামান্য আগেই ইসমাঈল আমাদের আলিংগন করে এবং আমদের এই অভিযানে আল্লাহর রহমত কামনা করে। আমি দেখতে পেলাম ইসমাঈল খুবই বিচলিত। আবদুল্লাকে নেতা করে আমরা পামকুঞ্জ পেছনে ফেলে বের হয়ে পড়ি এবং কিছুক্ষণের মধ্যে উজ্জ্বল চাঁদের আলোতে দ্রুত কদম তালে কংকরময় মরুপ্রান্তরের উপর দিয়ে আমরা আগিয়ে চলি উত্তর-পশ্চিমদিকে।
মিসরীয় সীমান্ত প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত লোকদের মুকাবিলা এড়িয়ে চলা ছিলো আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়। আমরা জানতাম, ওদের মোটরগাড়ি আর উট সওয়ার কনষ্টেবলেরা পশ্চিমের মরুভূমির এই অঞ্চলে চহল দিতে পারে। এজন্য যে প্রধান প্রধান পথ ধরে কাফেলা চলে আমরা সেগুলি থেকে যতোদূর সম্ভব দূরে থাকবার জন্য যত্নবান হই। কিন্তু বাহরিয় আর নীলা উপত্যকার মদ্যে সুদূর উত্তর অঞ্চল পর্যন্ত যে –সব যানবাহন চলাফেরা করে, সেগুলি যেহেতু ফাইয়ুম হয়েই যায় সে কারণে বড় রকমের কোনো বিপদের ঝুকি এতে ছিলো না।
পয়লা রাতে আমরা অতিক্রম করি ত্রিশ মাইল পথ এবং দিনের বেলা আমরা ঝাউ গাছের এক জংগলে অবস্থান কির। পরের রাতে এবং তার পরের রাতগুলিতে আমরা আরো অনেক বেশি পথ অতিক্রম করি, যার ফলে, চতুর্থ দিনে ফজরের সময় আমরা সেই গভীর নিচু জায়গাটির কিনারে গিয়ে পৌছুই, যেখানে রয়েছে বাহরিয়্যা মরুদ্যান।
আমরা মরুদ্যানের বাইরে কিছু বড়ো বড়ো শিলার আড়ালে তাঁবু খাটাই। মরুদ্যানটিতে রয়েছে পৃথক পৃথক কয়েকটি বসতি এবং খামার, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে বাভিতি নামক গ্রাম। আমরা যখন তাঁবু খাটাচ্ছিলাম, তখন আবদুল্লাহ পায়ে হেঁটে খাড়া নিচু শিলার খাদ বেয়ে নেমে গেলো পামগাছের ছায়ায় ঢাকা নিচু জায়গাটিতে-বাভিতিতে আমাদের যোগাযোগের লোকটিকে খুঁজে বের করার জন্য সন্ধ্যার আগে তার পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব নয়। এজন্য আমরা শিলার ছায়ায় ঘুমানোর জন্য শুয়ৈ পড়িঃ রাতভর উট হাঁকিয়ে চলার শারীরিক কষ্ট আর শীতের পর কতো আরামদায়ক কতো সুখকর এই বিশ্রাম! তা সত্ত্বেও আমার খুব বেশি ঘুম হলো না, কারণ নানারকম আইডিয়া আমার মনকে দখল করে বসেছিলো।
আমাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে আমার মনে হলো, বনি সুয়েফ এবং বাহয়্যিার মধ্যে একটি স্থায়ী যোগাযোগের সূত্র রক্ষা করা খুব কঠিন হবে না। আমার দৃঢ় প্রত্যয় হলো, যতোচিত সাবধানতা অবলম্বন করলে এই দুই স্থানের মধ্যে বড়ো বড়ো কাফেলাও চলাফেরা করতে পারবে, করো নযরে না পড়ে। বাভিতিতে সীমানত্ প্রশাসনের চেক পোষ্ট থাকা সত্ত্বেও (আমরা আমাদের লুকানো জায়াগ থেকে মরুভূমির উপর দিয়ে দেকতে পাচ্ছিলাম এই চেক পোষ্টের ইমারতগুলি) বাহরিয়্যার দক্ষিণে অধিকতরো যোগাযোগবিহীন কোনো গ্রামে গোপন বেতার যন্ত্র স্থাপন সম্ভব হতে পারে। এ বিষয়ে কয়েক ঘন্টা পরে আবদুল্লাহ এবং তার সংগে আগত আমাদের যোগাযোগের লোক, বৃদ্ধ বার্বারটি আমাকে নতুন করে আশ্বাস দেয়। দেখা গেলো, এই মরুদ্যানটির উপর সরকার মোটামুটি খুবই শিথিল একটা কর্তৃত্ব খাটিয়ে থাকে এবং তারো চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এখানকার বাসিন্দারা বিপুল সংখ্যায় সেনুসি তরীখার অনুসারী।
উটের পিঠে প্রাণান্তকর পাঁচটি রাতঃ প্রথমে শিলা, কংকর ও উঁচুনিচু মাটির উপর দিয়ে এবং পরে সমতল বালিয়াড়ির উপর দিয়ে, বসতিশূন্য সিতরা মরুদ্যান এবং তার প্রাণহীন গাঢ় নীল হ্রদ ছাড়িয়ে, যার কিনার ঘিরে রয়েছে নল-খাগড়া এবং আরণ্যকে পামের ঝোপ-ঝাড়; সমতল থেকে নিচু আজ এলাকার উপর দিয়ে, যেখানে রয়েছে বিসম্য়কর অসমতল কড়িমাটির শিলা, যা চাঁদের আলো পড়ে একটি ভৌতিক অজাগতিক চেহারা লাভ করেছে এবং পঞ্চম রাতের মেষদিকে আমার চোখের সামনে প্রথম ভেসে উঠলো সীবা মরুদ্যানের ছবি।
বহু বছর ধরে আমার সযত্নে লালিত বাসনাগুলির একটি ছিলো এই সুদূর মরুদ্যানটি একবার দেখার, যা ছিলো এককালে একটি এমন** মন্দিরের পীঠস্থান এবং প্রাচীর বিশ্বের সর্বত্র মশহুর এক দৈবজ্ঞের লীলাভূমি। কিন্তু যে কারণেই হোক, আমার সেই বাসনা আগে কখনো সফল হয়নি। আর আজ, উষার উদয়কালে সেই মরুদ্যান প্রসারতি রয়েছে আমার সম্মুখেঃ একটি নিঃসংগ পাহাড়কে ঘিরে আছে বিস্তীর্ণ পাথ-বীথি; আর, সেইপাহাড়টিতে শহরের ঘরবাড়িগুলি-যাদের ভিত্তি রয়েছে শিলার গভীরে নিহিত গুহানিবাসেরেই মতো- স্তরের পর স্তর উঠে গেছে উপরের দিকে, পাহাড়টির সমতল শীর্ষদেশের উপর দণ্ডায়মান একটি উচু কৌণিক মীনার অভিমুখে; এ এমন একটি ভেঙে পড়া গাঁথুনির অদ্ভুদ জগাখিচুড়ি যা মানুষ কেবল স্বপ্নই দেখে থাকে.. . একটি প্রবল বাসনা আমাকে পেয়ে বসেঃ এর রহস্যজনক প্রচীর ভেদ করে এর মধ্যে ঢুকে পড়ি এবং সেই সব অলিগুলিতে ঘুরে বেড়াই যা ফিরাউনদের আমল প্রত্যক্ষ করেছে; আর সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখি যেখানে লিডিয়া রাজা ক্রীসাসকে দৈবজ্ঞ শুনিয়েছিলেন তাঁর বিনাশের ভবিষ্যৎবাণী আর ম্যাসিডোনিয়অর আলেকজাণ্ডারকে সংবাদ দিয়েছিলেন তাঁর বিশ্ববিজযের।
কিন্তু এবরও আমার এই বাসনা অপূর্ণই থেকে গোলো। যদিও এতো নিকটে, তবু সীবা শহরটি আমার জন্য বদ্ধই থেকে যাবে-যেখানে অপরিচিত বা বিদেশী লোক কখনো আসে না। কারণ যে-কোনো নতুন লোক এলেই সে সংগে সংগে নযরে পড়ে যাবে সবার। বহির্জগতের সংস্পর্শ থেকে এতো দূরের কোনো স্থান ভিজিট করা সত্যি বোকামীর কাজ হবে। কারণ, লিবিয়ার প্রায় সীমান্তে অবস্থিত বলে মিসরের সীমান্ত প্রশাসন এর উপর সবচেয়ে কড়া নযর রাখে। আর এতেও সন্দেহ নেই যে, ইতালীর বেতনভোগী গুপ্তচরে এ জা’গাটি পূর্ণ। এজন্য এ সফরে সীবা দর্শন আমার কিসমতে নেই। দুঃখের সাথে আমি নিজেকে সান্তনা দিয়ে সীবার চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলি।
আমরা িএকটি প্রশস্ত বৃত্ত পথে শহরের কিনার ঘুরে শেষ পর্যন্ত এক আরণ্যক পাক-ঝোপের নীচে তাঁবু খাটাই। আমাদের ইচ্ছা ছিলো না যে, সীমান্তের এতো কাছে যে সময়টুকু অপেক্ষা করা নেহাতই প্রয়োজন, তার বেশি আমরা এখানে অবস্থান করি। এজন্য আবদুল্লাহ বিশ্রাম না করেই দ্রুত উট হাঁকিয়ে ছুটে গেল নিকটবর্তী পল্লীটিতে একটি লোককে খোঁজার জন্য, যার উপর সাইয়িদ আহমদ দায়িত্ব দিয়েছিলেন সীমান্ত পার হয়ে আমাদের সাথে দেখা করতে। কয়েক ঘন্টা পর সে ফিরে এলো দুজন নতুন রাহনুমাকে নিয়ে, আর আনলো চারটি টাটকা নবীন উট, যা আমাদের বহন করে নিয়ে যাবে সামনের দিকে। এই রাহনুমারা হচ্ছে জাবল আখদারের বারাসা বেদুঈন কবিলার লোক; এর উমর আল-মুখতারের নিজস্ব লোক। বিশেষ করে তিনি ওদের পাঠিয়েছেন ইতালীর অধিকৃত জাগবুব ও জালু নামক দুটি মরুদ্যানের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গাটুকুর মধ্যে দিয়ে আমাদের পথ দেখিয়ে সাইরেনিকার মালভূমি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য। ওখানেই উমরের দেখা করতে হবে আমাকে।
আবদুল্লাহ এবং তার বন্ধু মিসরে তাদরে গাঁয়ের বাড়িতে ফিরে যাবার জন্য আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়। খলিল ও আবুদর রহমান-এই দুই মজাহিদিনের পথ নির্দেশে আমরা যাত্রা করি আমাদে হপ্তা দীর্ঘ পথেপ্রায় পানিশূন্য মরু-স্তেপ অঞ্চলের ভেতর দিয়ে, যা ধীরে ধীরে উচু হয়ে উঠে গেছে জাবল আখদারের দিকে। আমি জীবনে যতো মরু সফর করেছি তার মধ্যে এটিই ছিলো সবচেয়ে কঠিন; যদিও সতর্কতার সাথে দিনের বেলা আত্মগোপন করলে এবং কেবল রাতর বেলা পথ চললে ইতালীয় পাহারাদরদের নযরে পড়ার আশংকা খুব বেশি ছিলো না। তবু দূরে দূরে অবস্থিত ইঁদারাগুলি এড়িয়ে চলার আবশ্যকতা এ দীর্ঘ সফরকে একটা দুঃপ্ন করে তোলে। কেবল একবারই আমরা ওয়াদি আল-ম্রার একটি পরিত্যক্ত ইঁদারা থেকে আমাদের উটগুলিকে পানি খাওয়াতে পারলাম এবং আমাদের মশকগুলি আবার ভরে নিতে সক্ষম হলাম। আর এতেই আমরা প্রায় ভেঙে পড়ি।
যে-সময়ে ইঁদারাটিতে পৌছুতে পারবো বলে আমরা আশা করেছিলাম, সেকানে পৌছুই তার পরে। আসলে, আমরা যখন আপনাদের জানোয়ারগুলির জন্য পানিতুলতে শুরু করি, তখন পূব আসমনে সূর্যের আভাস দেখা দিচ্ছে আর যখন আমরা তা শেষ করলাম, তখন সূর্য গিয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিম আসমানে দিগন্তের উপরে। খলিলের কথামতো আমাদের এখনো পুরা দুঘন্টা কাটাতে হবে। সেই নিচু পাথুরে জায়গাটিতে পৌছুতে, যা হবে দিনের বেলা আমাদের লুকানোর স্থান। কিন্তু আমরা যেই আমাদের সফর শুরু করেছি, অমনি একটি উড়োজাহাজের অশুভ গুন-গুন আওয়াজ মরুভূমির নীরবতাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়ঃ েএবং কয়েক মিনিট পরেই একটি ছোট্ট একক পাইলট-চালিত উড়োজাহাজ আমাদের মাথার উপর দেখা দেয় এবং সোজা নিচে নেমে ক্রমে নিচু হয়ে আসা চক্রের আকারে ঘুরতে থাকে। গা ঢাকা দেবার কোনো জায়গায় ছিলো না। তাই, উট থেকে লাফিয়ে নেমে আমরা ছিটকে পড়ি, আর ঠিক সেই মুহুতেৃ পাইলট তার কামান থেকে গুলী শুরু করে।
-‘শুয়ে পড়ো, মাটির উপর শুয়ে পড়ো, আমি চীৎকার করে উঠি- ‘একটুও নড়ো না- মরার মতো পড়ে থাকো।
কিন্তু খলিল, মুজাহিদীনের সাথে তার বহু বছরের জীবনে এ ধরনের মুকাবিলার অভিজ্ঞতা নিশ্চয় বহু বার তার হয়েছে, মরার ভান করে সে পড়ে থাকলো না। সে একটি পাথরের উপর মাথা রেখে চিত হয়ে শুয়ে পড়লো এবং উচু করে তুলে ধরা একটি হাঁটুর ভরে তার রাইফেল ফেলে অগ্রসরমান উড়োজাহাজটির উপর গুলি করতে শুরু করলো, এলোপাতাড়ি নয়, প্রত্যেকবারই গুলি ছোঁড়ার আগে সতর্কতা সঙে লক্ষ্য স্থির করে, যেনো কোনো নির্দিষ্ট টার্গেট গুলী করার প্র্যাকটিস করছে। এ ছিলো ভয়ানক এক দুঃসাহসিক কাজ। কারণ উড়োজাহাজটি ফ্লাট ডাইভ মেরে সোজা ছুটে আসছিলো তার দিকে, বালুর উপর বুলেট ছুঁড়তে ছুঁড়তে। কিন্তু খলিলের গুলি নিশ্চয়ই উড়োজাহাজটিতে লেগেছিলো। কারণ, মুহূর্তের জন্য পালট খেয়ে উড়োজাহাজটি তার নাক আকাশমখো করে দ্রুত উপরে ঊঠে গেলো। পাইলটটি হয়তো ভেবেছিলো, নিজের নিরাপত্তার বিনিময়ে চারজন লোককে গুলী করা লাভজনক হবে না। সে দুএকবার আমাদের উপর ঘুরে তারপর পুব মুখে জাগবুবের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
-ঐ ইতালিয়ন কুত্তার বাচ্চারা কাপুরুষ বুজদীল, আমরা যখন আবার জমায়েত হচ্ছি, তখন খলিল শান্তভাবে বলে,ওরা হত্যা করতে চায়- কিন্তু নিজের চামাড়ায় আঁচড় লাগুক তা চায় না।
আমরা কেউই যখম হইনি। কিন্তু আব্দুর রহমানের উটটি মরে গেলো। তার গদি এবং থলে আমরা যাযেদের উটের পিঠে চাপিয়ে দেই এবং এখন থেকে সে যায়েদের পেছনে হালকা গদিতে বসে চলতে থাকে।
তিন দিন পর আমরা জাবল আখদারের জুনিপর বনাঞ্চলে প্রবেশ করি এবং যে-ঘোড়াগুলিকে আমাদের জন্য একদল মুজাহিদীনের হিফাযতে এক গোপন জায়গায় রাখা হয়েছিলো, সেগলির সাথে কৃতজ্ঞতার সাথে আমরা ক্লান্ত উটগুলিকে বদল করি। এখন থেকে মরুভূমি আমাদের পেছনে থাকবে। আমরা েএকটি পাহাড়ি শিলাময় মালভূমির উপর দিয়ে আমাদের ঘোড়া ছুটাই। মালভুমি অসংখ্য শুকনা স্রোত পথ দ্বারা জালের মতো চিহ্নিত আর একানে রয়েছে জুনিপার তরুরাজি, যা কোনো কোনো জায়গায় প্রায় অভেদ্র জংগল হয়ে আছে। ইতালীর অধিকৃত অঞ্চলের মধ্যে এই পথচিহ্নহীন বনাঞ্চলটি হচ্ছে মুজহিদীনের শিকারের জায়গা।
…. .. .. .. ..
আরো চার রাতের সফর আমাদরে নিয়ে পৌছালো ওয়াদি-আত-তাআবান নামক এক স্থানে। খুব সঠিকভাবেই জাগাটির নাম রাখা হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে, ‘শ্রান্ত ক্লান্ত জনের উপত্যকা’। এখানেই উমর –আল-মুখতারের সংগে আমাদের মুলাকাত করার কথা। গভীর অরণ্যে ঢাকা একিট খাদের মধ্যে নিজেদের নিরাপদে লুকিয়ে আমরা আমাদের ঘোড়াগুলিকে একটি শিলার আড়ালে সামনের দুপায় রশির বেড়ি পরিয়ে জাবল- আখদারের সিংহের আগমনের অপেক্ষায় থাকি। আজকের রাতটা বড়ো ঠাণ্ডা, নক্ষত্রহীন আর মর্মর ধ্বনি তোলার নীরবতায় ভারাক্রান্ত!
সিদি উমর আসতে আরো কয়েক ঘন্টা লাগবে; আর রাতটা যেহেতু গাঢ় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, আমাদরে দু্ই বরাসা বন্ধু দেখলো, এই সময়ের মধ্যে কয়েক মাইল পুবে বু-সফাইয়ার ইঁদারাগুলি থেকে আমদের মশকগুলি আবার ভর্তি করে না নেওয়ার কোন যু্ক্তিসংগত কারণ নেই! সত্যি, বু-সফাইয়া থেকে মাইলেরও কম দূরে রয়েছে একটি সুরক্ষিত ইতালীয় চৌকি-
-‘কিন্তু’ খলিল বলে, ‘ঐ খেকী কুত্তারা অমন ঘুটঘুটে আঁধার রাতে তাদের দেওয়ালের বাইরে আসতে হিম্মত করবে না।’
এভাবে. যায়েদকে সংগে নিয়ে খলিল দুটি খালি মশকসহ ঘোড়ায় চড়ে রওনা দেয়। শিলাময় পথের উপর দিয়ে চলতে গিয়ে যাতে কোনো আওয়াজ না হয়, সেজন্য ওরা ছেঁড়া কাপড় পেঁছিয়ে ওদের ঘোড়ার খুর বেঁধে দেয়। ওরা দুজন অন্ধকারে হারিয়ে গেলে,আমি আর আবদুর রহমান নিজেদের গরম করার জন্য ঘেঁষাঘেষি করে নিচু শিলায় হেলান দিয়ে বসি। আগুন জ্বলানো হবে খুবই বিপজ্জনক।
ঘন্টাখানেকের পর জুনিপার গাছগুলির মধ্যে কয়েকটি শাখা মর্মর করে উঠলো এবং পাথরের উপর একটি স্যাণ্ডেরের মোলায়েম শব্দ হলো। মুহূর্তেই সতর্ক আমার সংগী রাইফেল হাতে সোজা দাঁড়িয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য এবং অন্ধকারের দিকে তাকায় তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে। একটি নিচু গলার ডাক- যা শিয়ালের কান্নার চেয়ে অন্যরকম নয়-ভেসে এলে জংগলের মধ্যে থেকে। আর আবুদর রহমান মুখের সম্মুখে হাত দুটিকে পেয়ালার মতো করে একই ধরনের ধ্বনি দিয়ে তার জবাব দেয়। আমাদের সামনে দুটি মানুষের মূর্তি দেখা দিলো। ওরা ছিলো পায়দল এবং রাইফেলধারী। আরো কাছে আসার পর ওদের একজন বললোঃ ‘আল্লাহর পথ’- এবং তার উত্তরে আবদুর রহমন বলেঃ ‘লা হাওলা ওয়ালা কু’ওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’-আল্লাহ ছাড়া কোন ক্ষমতা নেই, কোনো শক্তি নেই কারো’ যা আমার কাছে এক সাংকেতিক শব্দ বলেই মনে হলো।
এই দুজন নতুন আগন্তুকের মদ্যে দুজনেরই পরণে ছিলো লিবীয় বদ্দুদের চাদর,টোটাফাঁটা জার্দ। ওদের একজন আবদুর রহমানকে চিনে বলে মনে হলো। কারণ আবুদর রহমন তার দুহাত ধরে আন্তরিকতার সাথে তাকে সম্বর্ধনা জানায়। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো দুই মুজাহিদীন পরপর আমার হাত ধরে একইভাবে। ওদের একজন বলেঃ ফি আমানিল্লাহ। আল্লাহ আপনার সহায় হোন, সিদি উমর আসছেন।
আমরা উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। সম্ভবত মিনিট দশেক পরে আবার জুনিপার ঝোঁপের মধ্যে পাতার সরসর শব্দ.. . তারপর ছায়ার ভেতর থেকে বের হয়ে আসে আরো তিনটি মানুষ তিন দিক থেকে এবং উদ্যত রাইফেল তোলে এসে পড়ে একেবারে আমদের উপর।ওরা যখন বুঝতে পারলো, ওরা আমাদেরই মুলাকাতের ইন্তেজারিতে ছিলো, সংগে সংগেই ওরা আবার ছড়িয়ে পড়লো ঝোঁপের ভেতর বিভিন্ন দিক। স্পষ্টত ওরা ওদের নেতার নিরাপত্তার উপর সতর্ক নযর রাখার জন্যই এভাবে ঝোঁপের ভেতর নানা দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
আর তারপর তিনি এলেন.. . এলেন একটি ছোট্ট ঘোড়ার সওয়ার হয়ে, যার খুর ছিলো কাপড় দিয়ে মোড়ানো। তাঁর দুপাশে দুজন করে লোক এলো হেঁটে হেঁটে, আর তাঁর পেছনে পেছনে এলো আরো কয়েকজন। আমরা যে শিলাগুলিতে ঠেস দিয়ে অপেক্ষা করছিলাম, তিনি যখন তার পাশে এসে পৌছুলেন, তখন তাঁর লোকদের একজন তাঁকে ঘোড়া থেকে নামাতে সাহায্য করলো আর আমি দেখতে পেলাম, তাঁর চলতে কষ্ট হচ্ছে (পরে আমি জানতে পেরেছিলাম, মাত্র দশদিন আগে হঠাৎ আক্রমণে তিনি যখম হয়েছিলেন); উদীয়মান চাঁদের আলোতে আমি তাঁকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিঅঃ একজন মাঝারি সাইজের লোক, মজবুত যাঁর হাড্ডিঃ খাটো, বরফের মতো সাদা দাড়ি তাঁর গভীর রেখা-চিহ্নিত মুখমণ্ডলের ফ্রেমের কাজ করছে। চোখ দুটি তাদরে কোটরের গভীরে লুকানো; চোখের চারপাশে যে ভাঁজ পড়েছে, তাতে আন্দাজ করা যায়, ভিন্ন অবস্থায় তাঁর চোখ দুটি হয়তো সহজেই হাসিতে স্ফুরিত হতো। কিন্তু এখন আর তাঁর এ চোখে কিছুই নেই, অন্ধকার যন্ত্রণা আর হিম্মত ছাড়া।
-খোশ আমদেদ বৎস, -এবং তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন তাঁর চোখ দুটি আমাকে আমার পা থেকে মাথা তক দেখছিলো, তীক্ষ্মভাবে, যেনো আমাকে যাচাই করা হচ্ছে-এমন মানুষের চোখ, বিপদ যার নিত্যসাথী!
তাঁর লোকদের একজন একটি কম্বল বিছিয়ে দিলো যমিনের উপর আর সিদি উমর তাঁর শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে সেখানেই বসে পড়লেন। আবদুর রহমান নুয়ে তাঁর হাত চুমু খায় এবং সর্দারের ইজাযত নিয়ে মাথার উপর ঝুলে থাকা শিলার কভারের নীচে সামান্য আগুন ধরাবার জন্য বসে পড়ে। সে আগুনের নিষ্প্রভ দীপ্তিতে সিদি উমর পড়লেন চিঠিখানা, যা আমি সাইয়িদ আহমদের কাছ থেকে সংগে করে এনেছি। চিঠিটি তিনি যত্নের সংগে পড়েন, তারপর সেটি ভাঁজ করে কিছুক্ষণের জন্য রাখেন তাঁর মাথার উপর, শ্রদ্ধা ও ভক্তির এমন একটা ভংগির সাথে, যা বলতে গেলে, আরব দেশে কখনো দেখা যায় না, দেখা যায় উত্তর আফ্রিকায়, প্রায়ই। আর তারপর স্মিত হাসির সংগে তিনি আমার দিকে মুখ ফিরানঃ
-‘সাইয়িদ আহমদ, আল্লাহ তাঁর হায়াত দারাজ করুন, তোমার সম্পর্কে অনেক ভাল কথা বলেছেন। তুমি আমাদের সাহায্য করতে চাও। কিন্তু আমি জানি না, সর্বশক্তিমান করুণাময় আল্লাহ ছাড়া আর কোত্থেকে মদদ আসতে পারে! বলতে কি, আমরা আমাদের জন্য বরাদ্দ সময়ের প্রায় শেষ কিনারে এসে পড়েছি!’
-‘কিন্তু এই পরিকল্পনা যা সাইয়িদ আহমদ উদ্ভাব করেছেন’- আমি মাঝপথে প্রশ্ন করি-‘সেটি কি একটি নতুন সূচনা হতে পারে না? যদি নিয়মিত সরবরাহের ব্যবস্থা করা যায় এবং ভবিষ্যত অভিযানের জন্য কুফরাকে কেন্দ্র করা যায়, তা’হলে কি ইতালীয়দের প্রতিহত করা সম্ভব হবে না?’
সিদি উমর যে স্মিত হাস্যের সাথে আমাকে জবাব দিলেন, তেমন তিক্ত ও অসহায় হাসি আমি জীবনে কখনো দেখিনিঃ কুফরা.. .? আমরা হারিয়েছি। প্রায় পনেরো দিন আগেই তা ইতালীয়রা দখল করে নিয়েছে.. .।’
খবরটি আমাকে স্তম্ভিত করে দেয়। অতীতের এই সব কটি মাস আমি আর সাইয়িদ আহমদ এই ধারনার উপরই আমাদের পরিকল্পনা তৈরি করে চলেছিলাম যে, দৃঢ় প্রতিরোধের জন্য কুফরাই হতে পারে নতুন করে সমাবেশের কেন্দ্র। এখন, কুফরা যখন হাতছাড়া হয়ে গেছে সেনুসিদের জন্য জাবল আখদারের নিপীড়িত মালভুমি ছাড়া আর কিছুই নেই।–কিছুই নেই নিশ্চিতভাবে ক্রমশঃ এঁটে আনা ইতালীয় দখলের অভিশাপ ছাড়া, স্থানের পর স্থান হারানো, মন্থর এবং অনিবার্যভাবে গলা টিপে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু মুহূর্তের জন্যও চাপ শিথিল না হয়ে!
-‘কুফরার পতন হলো কেমন করে?’
একটি ক্লান্ত ভংগিতে সিদি উমর তাঁর লোকদের একজনকে আরো কাছে আসতে ইংগিত করেনঃ এই লোকটি আপনাকে বলবে সে কাহিনী.. . কুফরা থেকে যে কটি লোক পালিয়ে বেঁচেছে, ও তাদেরই একজন। মাত্র গতকাল এসেছে।
কুফরার লোকটি আমার সামনেই তার পাছার উপর বসে পড়ে এবং তার ছেঁড়া জোড়া তালি দেয়া ‘বার্নাসটি’ তার চারদিকে টেনে জড়ো করে। সে কথা বলে আস্তে আস্তে, গলার আওয়াজে আবেগের কোন কাঁপন না তুলে, কিন্তু যে-সব বালা মুসিবত সে দেখেছে, তার দৃঢ় মুখমন্ডলে, তা প্রতিবিম্বিত হয়েছে বলে মনে হলো।
-ওরা আমাদের উপর হামলা করে তিন দিক থেকে তিনটি ব্যুহ রচনা করে বহু সাঁজোয়া গাড়ি আর ভারী কামান নিয়ে। ওদের উড়োজাহজগুলি একেবারে নিচুতে নেমে আসে এবং বোমা ফেলে বাড়ি-ঘরের উপর, মসজিদের উপর এবং খেজুর বাগিচার উপর। হাতিয়ার বহন করতে পারে এমন পুরুষের সংখ্যা আামদের মধ্যে ছিলো কয়েক’শ। এদের বাদ দিয়ে যারা বাকী রইলো, তারা হচ্ছে স্ত্রী লোক, ছেলে মেয়ে এবং যয়ীফের দল। আমরা লড়ি একের পর এক প্রত্যেকটি ঘর বাঁচাবার জন্য। আমাদের তুলনায় ওরা ছিলো অনেক বেশি শক্তিশালী। আখেরে কেবল আল-হাওয়ারী গ্রামটি রইলো আমাদের দখলে। ওদের সাঁজোয়া গাড়ির মুকাবিলায় আমাদের রাইফেলগুলি হয়ে পড়লো অকেজো এবং ওরা আমাদের পরাভূত করে ফেললো। আমরা মাত্র কজন বেঁচে যাই। আমি আত্মগোপন করি পাম-বাগিচায় একটি সুযোগের প্রতীক্ষায়, যাতে আমি ইতালী ব্যুহের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে পড়তে পারি। আর সারারাত আমি শুনলাম স্ত্রীলোকের যন্ত্রণাকাতর চীৎকার, কারণ ওদের উপর বলাৎকার করেছিলো ইতালীয় সৈন্যরা আর ইরিত্রীয় ‘আশকারীরা’। পরদিন, এক বুড়ি আমার জন্য কিছু পানি আর রুটি নিয়ে এলো, আমি যেখানে লুকিয়েছিলাম, সেখানে। সে আমাকে বললোঃ যে-সব লোক বেঁচে আছে, ইতালীয় জেনারেল তাদের সবাইকে সাইয়িদ মুহাম্মদ আল-মাহদীর কবরের কাছে জড়ো করে এবং তাদের চোখের সামনেই একখন্ড কুরআন ছিড়ে টুকরা টুকরা করে মাটির উপর নিক্ষেপ করে এবং তাদের উপর নিজের বুট রেখে চীৎকার করে ওঠেঃ ‘তোদের বদ্দু নবী এখন তোদের সাহায্য করুক না, যদি তার ক্ষমতা থাকে’। এরপর সে হুকুম দেয় মরূদ্যানের সব পামগাছ কেটে ফেলতে, ইঁদারাগুলিকে ধ্বংস রে দিতে এবং সাইয়িদ আহমদের গ্রন্থগারের সব কিতাব জ্বালিয়ে দিতে। পরদিন সে আদেশ করে-আমাদের কিছু মুরুব্বিজন ও উলামাকে তোলা হবে একটি উড়োজাহাজে-এবং ওঁদের অনেক উপরে উড়োজাহাজ থেকে নিক্ষেপ করা হলো মাটির উপর-চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মৃত্যু বরণ করার জন্য.. . তারপরের রাতও আমি সারা বেলা আমার লুকানোর স্থান থেকে শুনতে পাই স্ত্রীলোকদের চীৎকার, আর সেপাইদরে অট্টহাসি আর রাইফেলের শব্দ.. .। শেষে আমি সেই অন্ধকার রাতে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ি মরুভূমিতে। আর একটি ছোটো উট পেয়ে তারই উপর সওয়ার হয়ে উধাও হই.. .’
কুফরার লোকটি তার ভয়ংকর কাহিনী শেষ করলে সিদি উমর তাকে সস্নেহে মেলায়েমভাবে নিজের কাছে টেনে নিয়ে পুনরাবৃত্তি করেন, ‘কাজেই বৎস, দেকতে পাচ্ছে আমরা সত্যই আমাদের বরাদ্দ সময়ের কিনারে এসে পড়েছি’। এবং যেনো আমার চোখেল অব্যক্ত প্রশ্নে জবাবেরই আরো বললেনঃ ‘আমরা লড়ছি, যেহেতু আমরা লড়তে বাধ্য আমদের ধর্ম এবং আমাদের আযাদীর জন্য, যতোক্ষণ না আমরা হানাদারদের কোলে ঢলে পড়েছি।অন্য কোনো বিকল্প নেই আমাদের জন্য-‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’-‘আমরা আল্লাহরই এবং তাঁরই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন।’ আমরা আমাদের স্ত্রীলোক আর বালক-বালিকাদের পাঠিয়ে দিয়েছি মিসর, যেনো আল্লাহ যখন আমাদের মৃত্যু চান, তখন ওদের নিরাপত্তা সম্পর্কে আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা করতে না হয়।’
চাপা গুঞ্জন ধ্বনি অন্ধকার আসমানের কোনো জায়গায় ধীরে ধীরে শ্রুতিগোচর হয়ে ওঠে যেনো, সজ্ঞান চিন্তা ছাড়াই সিদি উমরের লোকদের একজন অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বালু ছিটাচ্ছে আগুনের উপর। জ্যোছনা-আলোকিত মেঘের পটভূমিকায় একটা অস্পষ্ট আকার ছাড়া অপর কিছুই মনে হলো না উড়োজাহাজটিকে; বেশ নিচু দিয়ে, আমাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেলো পুব দিকে এবং তার ইঞ্জিনের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো।
-‘কিন্তু সিদি উমর,’ আমি বলি-‘এখন যখন একটি পথ খোলা রয়েছে আপনার জন্য এবং আপনার মুজাহিদীনে’র জন্য-মিসরে সরে পড়াই কি বেহতর নয়? কারণ, মিসরে সাইরেনিকা থেকে আগত বহু মুহাজিরকে জমায়েত করা এবং একটা অধিকতরো কার্যকর ফৌজ গড়ে তোলা সম্ভব হতেও পারে। এখানকার সংগ্রাম কিছুকালের জন্য স্থগিত করাখাই উচিত, যাতে করে লোকেরা তাদের শক্তি কিছুটা ফিরে পেতে পারে.. . আমি জানি, মিসরে ব্রিটিশ শক্তি-তাদের দুপাশে শক্তিশালী ইতালীয় ফৌজের অবস্থান রয়েছে-এই চিন্তায় খুব সুখী হতে পারেনি। আল্লাহ জানেন, আপনারা যদি ওদের বোঝাতে পারেন যে, আপনারা ওদের দুশমন মনে করেন না, তাহলে ওরা হয় তো আপনাদের প্রস্তুতি নিয়ে মাথা ঘামাবে না. ..।
-না বাপ, এ আর সম্ভব নয়, অনেক বেশি দেরী হয়ে গেছে। তুমি যা বলেছো তা সম্ভব ছিলো আজ থেকে পনেরো –ষোলো বছর আগে, সাইয়িদ আহমদ তুর্কীকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশদের উপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে। তুর্কী অবশ্য আমাদের সাহায্য করেনি.. .। অনেক দেরী হয়ে গেছে; এখন আর তা সম্ভ নয়। আমাদের ভাগ্যকে সহজতরো করার জন্য ব্রিটেন আর তার কড়ে আঙুলও তুলবে না; আর ইতালীয়রা তো আমাদের নির্মূল করার জন্যই বদ্ধপরিকর। ভবিষ্যতে প্রতিরোধের সকল সম্ভাবনা চুরমার করে দিতে ওরা কসম খেয়েছে। আমি আর আমার অনুসারীরা যদি েএখন মিসর যাই, আমরা আর কখনো ফিরে আসতে পারবো না। আর তুমিই বলো, কী করে আমরা আমাদের লোকজনকে ত্যাগ করতে পারি এবং নেতৃত্বহীন অবস্থায় রেখে চলে যেতে পারি-আল্লাহর দুশমনের দ্বারা ধ্বংস হওয়ার জন্য?
-সাইয়িদ ইদরীস কী বলেন? তিনিও কি আপনার মত পোষণ করেন, সিদি উমর?
-সাইয়িদ ইদরীস হচ্ছেন এক মহৎ পিতার সুবোধ পুত্র, একজন ভালো মানুষ।
কিন্তু এ ধরনের একটি সংগ্রাম বরদাশত করার কলিজা আল্লাহ তাঁকে দেননি.. .
সিদি উমরের কণ্ঠস্বরে নৈরাশ্য ছিলো না-ছিলো গভীর আগ্রহ, যখন তিনি এভাবে তাঁর দীর্ঘ আযাদী সংগ্রামের অনিবার্য পরিণাম সম্পর্কে আমার সংগে আলাপ করছিলেনঃ তিনি জানতেন, মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই অপেক্ষা করছে না তাঁর জন্য। মৃত্যুভয় তাঁর নেই, মৃত্যু তিনি চাননি। কিন্তু মৃত্যুকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টাও তিনি করেননি এবং আমি নিশ্চিত যে, কী ধরনের মৃত্যু যে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে, তা-ও যদি তিনি জানতেন, তবু তা এড়াবার চেষ্টা তিনি করতেনা না। মনে হলো, তিনি তাঁর শরীর এবং মনের প্রতিটি অণুপরমাণুতে সচেতন যে, প্রত্যেক মানুষিই তার পরিণাম বহন করে চলেছে নিজের সংগে-সে যেখানেই যাক এবং যে কাজই করুক।
একটি মৃদু চাঞ্চল্য শ্রুতিগোচর হয়ে ওঠে ঝোঁপটির মধ্যে, এতো মৃদু যে স্বাভাবিক অবস্থায় অবস্থায় তা টের পাওয়া যেতো না; কিন্তু তখনকার অবস্থা মোটেই স্বাভাবিক ছিলো না। অপ্রত্যাশিত এলাকা থেকে যে-কোন রকম বিপদের আশংকায় আমার কান দুটি খাড়া রেখে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, চুপি চুপি পদচারণা আকস্মিকভাবে থেমে গেছে এবং কয়েক মিনিট পরেই আাবর শুরু হলো তার অস্পষ্ট ধ্বনি। ঝোঁপটি ফাঁক হয়ে গেলো আর তার মধ্যে থেকে বের হয়ে এলো দুজন যায়েদ এবং খলিল। তাদের সংগে দুজন সাস্ত্রী। তারা যে ঘোড়া কটি টেনে টেনে নিয়ে এসেছে, সেগুলির পিঠে চাপানো হয়েছে বোঝাই মশক। এমনভাবে মশকগুলি পানিতে ভর্ভি করা হয়েছে যে, সেগুলি ফুলে ঢোল হয়ে উঠেছে। সিদি উমরকে দেখে খলিল ছুটে আগিয়ে গেলো নেতাকে চুমু খাওয়ার জন্য, যখন আমি পরিচয় করিয়ে দিই যায়েদকে। সিদি উমর তাঁর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখরের যায়েদের কৃচ্ছ্রতাপূর্ণ মুখমন্ডল আর বাহুল্য-বর্জিত শরীরের উপর, স্পষ্ট অনুমোদনের সাথে। যায়েদের কাঁদের উপর তিনি হাত রেখে বললেনঃ
-‘আমার পিতৃপুরুষের দেশ থেকে আগত হে ভাই, তোমাকে খোশ আমদেদ। তুমি কোন আরব গোত্রের লোক?’-এবং যায়েদ যখন বলরো তার কওমের নাম শাম্মার, উমর স্মিত হাসির সাথে মাথা নেড়ে বললেনঃ ওহো, তুমি তাহলে সেই হাতিম আত তাইর কওমের লোক, মানুষের মধ্যে যিনি ছিলেন সবচেয়ে মহানুভব.. .।১(প্রাগ-ইসলামিক যুগের এই আরব যোদ্ধা ও কবি তাঁর মহানুভবতা ও বদান্যতার জন্য মশহুর। তাঁর নাম এখন এই গুনের সমার্থক হয়ে উ েঠছে, যে গুণটির প্রতি আরবেরা দিয়ে থাকে পরম গুরুত্ব। যায়েদ শাম্মার গোত্রের লোক। শা্মারেরা হাতিমের কওম-তাই থেকে উদ্ভুদ বলে ওরা দাবী করে।)
সিদি উমরের একজন লোক একটি টুকরা কাপকেড় বাঁধা কিছু খেজুর আমাদের সামনে রাখলেন তিনি নিজে এ সামান্য খাবারে আমাদের আমণ্ত্রণ জানালেন। আমরা খেয়ে ওঠার পর প্রবীণ যোদ্ধা দাঁড়িয়ে গেলেনঃ
-‘ভায়েরা, এখন এখান থেকে সরে পড়ার সময়। আমরা বু-স্ফাইয়ার ইতালীয় চৌকির একেবারেই কাছে রয়েছি। সূর্যোদয় পর্যন্ত এখানে থাকা হবে বিপজ্জনক।’
আমরা আমাদের ভাঙাচোরা ক্যাম্প গুছিয়ে ফেলি এবং সওয়ার হয়ে সিদি উমরকে অনুসরণ করি। আমাদের পেছনে চলে তাঁর বাকী লোকেরা পায়ে হেঁটে। যেই আমরা খাদ থেকে বের হয়ে হয়েছি, আমি দেখতে পেলাম সিদি উমরের দলটি-যা ধারণা করেছিলা, তার থেকে অনেক বড়োঃ এক এক করে কালো ছায়ামূর্তি টিলার আড়াল থেকে, গাছের পেছন থেকে তীরের মতো ছুটে এসে আমাদের সারিতে যোগ দিলো-যখন আরো কয়েকজন লোককে ডানে –বামে দূরে রাখা হয়েছে পাহাড়া দেয়ার জন্য। কোনো সাধারণ পর্যবেক্ষকের পক্ষেই ধারণা করা সম্ভব হতো না যে, আমাদরে চারপাশে প্রায় ত্রিশ জন লোক রয়েছে; কারণ ওদের প্রত্যেকেই আগাচ্ছে নীরবে, রেড ইণ্ডিয়ান গুপ্তচরের মতো।
সূর্যোদয়ের আগে আমরা পৌঁছুই উমর আল—মুখতারের নিজস্ব দাওআর বা গেরিলা বাহিনীতে প্রধান তাঁবুতে। তখন দুশর কিছু লোক নিয়ে গঠিত ছিলো এ বাহিনী। তাঁবু ফেলা হয়েছে এক গভীর সংকীর্ণ গিরিখাদের মধ্যে আর উপরে ঝুলে থাকা শিখাগুলির উপর জ্বলছে ছোটো ছোটো আগুন। কয়েকজন লোক ঘুমাচ্ছে মাটির উপর। অন্যেরা , সুবহে সাদের ধূসরতায় যাদের মনে হচ্ছে কতকগুলি অস্পষ্ট ছায়ার মতো-তাঁবুর নানা রকম দায়িত্বে ব্যস্তঃ ওরা ওদের অস্ত্রশস্ত্র সাফ করছে, পানি আনছে, খাবার রান্না করছে অথবা এখানে ওখানে গাছের সংগে যে অল্প কটি ঘোড়াকে বেঁধে রাখা হয়েছে সেগুলির পরিচর্যা করচে। প্রায় সকলেরই পরণে রয়েছে ছেঁড়া জোড়া তালি দেয়া কাপড়। তখন কিংবা তার পরে, এই পূরা দলটিতে একিট সম্পূর্ণ জার্দ ১(কম্বলের মতো পশমী চাদর, যা মিসর এবং লিবিয়ার লোকেরা পরে) অথবা বার্নাস ২( মাথা ঢাকা এক ধরনের পোশাক, যা উত্তর আফ্রিকার আরবও পরে) আমি দেখিনি। অনেকের গায়ে রয়েছে ব্যণ্ডেজ, যা দুশমনের সাথে ওদের সাম্প্রতিক মুকাবিলার সাক্ষ্য বহন করছে। বিস্ময়ের সংগে দুটি স্ত্রী লোককে আমি দেখতে পাই এই তাঁবুতেঃ একজন বৃদ্ধা, অপরজন তরুণী। ওরা একটি আগুনের পাশে বসে বসে মোটা ভোতা সূঁচ দিয়ে তন্ময় হয়ে মেরামত করছে একটি ছেড়া জীন।
-‘আমাদের এই দুটি বোন, আমরা যেখানেই যাই, আমাদের সংগে যায়’, -আমার নির্বাক বিস্ময়ের জবাব দেন সিদি উমর জানান,-‘ওরা আমাদের স্ত্রীলোকদের সংগে মিসরে আশ্রয় নিতে রাযী হয়নি; ওরা হচ্ছে মা-বেটি। ওদের পরিবারের সব ক’টি পুরুষই মারা গেছে সংগ্রামে।’
দুদিন এবং এক রাত ধরে-যখন তাঁবু উঠিয়ে নেয়া হচ্ছিলো মালভূমির খাদ এবং জংগলের ভেতরের আরেক জায়গায়-সিদি উমর এবং আমি, মুজাহিদীনের জন্য নিয়মিত রসদ কী করে সরবরাহ করা যায়, তার প্রত্যেকটি সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা এবং আলাপ-আলোচনা করি। ছিটেফোঁটা রসদ তখনো আসছিলো মিসর থেকে। মনে হলো ইতালীয়দের সংগে তাঁর সন্ধি-চু্ক্তির সময়ে, ব্রিটেনের সংগে যে মুহূর্তে সাইয়িদ ইদরীস একটি বোঝাপড়ায় আসেন, তখন থেকেই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ মিসরের অভ্যন্তরে সেনুসি তৎপরতাকে নতুন করে কিছুটা সহনশীলাতার সংগে দেখতে ইচ্ছুক ছিলো-অবশ্য যতোক্ষণ তা সীমিত থাকে স্থানীয় গতিবিধির মধ্যে; বিশেষ করে, যোদ্ধাদের যেসব ছোটো ছোটো দল ইতালীয় ব্যুহ ভেদ করে সমুদ্দুরের উপকূলে নিকটতম মিসরীয় শহর সেলুমে আসতো তাদের গনীমত বিক্রি করার জন্য, যার বেশির ভাগিই ছিলো ইতালীয় খচ্চর, তাদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যের বিনিময়ে সেই দলগুলির প্রতি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ, সরকারীভাবে লক্ষ্য রাখতো না। আসলে মুজাহিদীনের জন্য এ ধরনের অভিযান ছিলো চরম বিপজ্জনক এবং এ জাতীয় অভিযান প্রয়াই সম্ভব হতো না, বিশেষ করে েএ কারণে যে ইতালীয়রা খুব দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া তুলেছিলো মিসরের সীমান্ত বরাবর। সিদি উমর আমার সংগে একমত হন, একমাত্র বিকল্প হতে পারে, যে পথে আমি এসেছি সেই পথটিকে একটি রসদ সরবরাহের পথ হিসাবে ব্যবহার করা এবং মিসরের মরূদ্যান বাহরিয়্যা,ফারাফ্রা ও সীবায় গোপন ডিপো স্থাপন করা। কিন্তু এই পরিকল্পনা দীর্ঘ দিন ইতালীয়দের সতর্ক নযর এড়িয়ে চলতে সক্ষম হবে কিনা, এ বিষয়ে তিনি ছিলেন খুবই সন্দিহান।
[উমরের আশংকা যে খুবই বাস্তবভিত্তিক ছিলো, তা প্রমাণিত হলো। কয়েক মাস পর এ ধরনের সরবরাহ নিয়ে একটি কাফেলা সত্যি মুজাহিদীনের নিকট পৌঁছেছিলো; কিন্তু কাফেলাটি যখন জাগবুব এবং জালুর মধ্যবর্তী ফাঁকটুকুর মধ্য দিয়ে আগাচ্ছিলো তখনি তা ইতালীয়দের নযরে পড়ে যায়। এর পরপরই দুটি মরূদ্যান থেকে সমান দূরে, মরূদ্যান দুটির ঠিক মাঝখানে বির তারফাবিতে ইতালীয়রা একটি মজবুত চেকপোষ্ট স্থাপন করে; আর প্রায় নিরবিচ্ছিন্ন বিমান পাহারার সংগে এই চেকপোষ্টটি নতুন করে এ ধরনের অভিযানকে চরম বিপজ্জনক করে তোলো।]
এখন আমার ফেরার চিন্তা। আমি আমার এই পশ্চিমমুখী সফরে যে দীর্ঘ কষ্টকর পথ অনুসরণ করছি আমার সেই পথে ফিরে যেতে খুব উৎসাহ বোধ করছিলাম না। তাই সিদি উমরকে জিজ্ঞাস করি, এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত কোনো পথ পাওয়া যেতে পারে কি না। তিনি বললেন, একটি পথ আছে বটে, তবে তা বিপদসংকুলঃ কাঁটা তার ভেদ করে সেলুমে পৌছুনো। তখন সেলুম থেকে ময়দা আনার জন্য একদল মুজাহীদীন এ ধরনের একটি অভিযানে বের হতে প্রস্তুত ছিলো; আমি চাইলে ওদের সংগে যোগ দিতে পারি। আমি তাই করবো বলে সিদ্ধান্ত নিই।
যায়েদ এবং আমি উমর আল-মুখতারের কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নিই। আর কখনো তাঁর দেখা হবে না আমার সংগেঃ আট মাসেরও কম সময় পরে ইতালীয়রা উমরকে বন্দী করে এবং ফাঁসি দেয়.. .
উঁচু –নিচু ভূভাগের উপর দিয়ে এবং পূর্ব জাবল আখদারের জুনিপার অরণ্যের মধ্যে দিয়ে কেবল রাতে রাতে প্রায় এক হপ্তা চলার পর আমাদের বিশ জনের এই দলটি মিসর-সাইরেনিকার সীমান্ত সেই স্থানটিতে পৌছুলো, যেখানটায় কাঁটা তার ভেদ করে ঢুকে পড়বো বলে পরিকল্পনা করেছিলাম। উদ্দেশ্যহীনভাবে নির্বাচন করা হয়নি এ স্থানটি। সীমান্তের বেশিরভাগ জায়গার উপর দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হলেও তখনো সে বেড়া সম্পূর্ণ পূরা হয়নি। কেনো কোনো জায়গায়, যেমন এইখানে, কেবল মাত্র কাঁটা তারের বেড়া রয়েছে আট ফুট উঁচু এবং চার ফুট চওড়া অথচ এর মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে কাঁটাতারের বেড়ার তিনটি পৃথক পৃথক সারি, যা পাকা ভিতের উপর পোঁতা খুটির সংগে মোটা ভারী তারের প্যাঁচ কষে বাঁধা হয়েছে। আমরা যে জায়গাটি পছন্দ করেছি, তা থেকে সুরক্ষিত এই চৌকিটি ছিলো আধ মাইলের মতো দূরে। চৌকিটিতে সাঁজোয়া গাড়ি রয়েছে বলেও আমরা জানতাম। কিন্তু এ ছিলো দুটি বিকল্পের মধ্যে একটি গ্রহণ-হয় এই সেক্টর না হয় অন্য একটি সেক্টর-যা হয়তো কম সুরক্ষিত হতে পারে, অথচ যেখানে থাকতে পারে ডবল বা তিন লাইন কাঁটা তারের বেড়া।
মিসরীয় এলাকায় কয়েক মাইল ভেতরে সেনুসি তরীকার সমর্থকরা যাত্রী ও মালবাহী জানোয়ার নিয়ে আমাদের সাথে দেখা করবে, এ ব্যবস্থা করা হয়েছে পূর্বাহ্নেই। কাজেই আমাদের ঘোড়াগুলিকে বিপদে ফেলার কেনো প্রয়োজন হবে না। কয়েকজন ‘মুজাহিদীনে’র দায়িত্বে আমরা সেই ঘোড়াগুলিকে ফেরত পাঠিয়ে দিই আর যায়েদ এবং আমি সহ বাকী কসকলে মাঝরাতের কিছু আগে পায়ে হেঁটে তারের নিকট পৌছুই অন্ধকারেই ছিলো আমাদের আবরণ। কারণ ইতালীয়রা সমস্ত গাছপালা এবং ঝোঁপঝাড় কেটে সাফ করে ফেলেছিলো।
উত্তরে এবং দক্ষিণ কয়েকশ গজ ব্যবধানে পাহারাদার মোতাযেন করে আমদের ছয়জন লোক তার কাটার যন্ত্রে এবং ইতালীয় মজুরদের উপর ইতিপূর্বে হামলা চালিয়ে যেসব পুরু চামড়ার দস্তানা কব্জা করেছিলো সেগুলি সজ্জিত হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আগাতে থাকে। ওরা যখন আগাচ্ছিলো, তখন আমারা আমাদের রাইফেল নিয়ে ওদের কভারিং দিচ্ছিলাম। এ এক উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত। মৃদুতম শব্দের জন্য উৎকর্ণ আমি। শুনছি কেবল অগ্রসরমান দেহগুলির ভারে চাপ খাওয়অ নুড়ির শব্দ আর কখনো কখনো নিশাচার পাখির ডাক। তারপরে এলো কাঁটা তারে প্রথম দাঁত বসানো তার-কাটা কাচির কচকচ শব্দ। মনে হলো, একটা বিস্ফোরণ ঘটালো আমার কানের ভেতরে আর তারপরই ধাতব তন্তু কর্তনের মৃদুতরো আলাদা ধ্বনি.. . খশ্ খশ্ খশ্ .. . ঘষে ঘষে কেটে , কাঁটা তারের গভীর থেকে গভীরে.. .।
আরেকবার পাখির ডাক ধ্বনি হলো রাতের আসমানেঃ কিন্তু এবার আর তা পাখি নয়, একটি সংকেতঃ এই সংতে আসছে উত্তরদিকে আমরা যে পাহারাদার রেখেছি, তাদেরই একজনের কাছ থেকে-আসন্ন বিপদের সংকেত.. . এবং ঠিক একই মুহুর্তে আমা শুনতে পাই মোটরের গুঞ্জন ধ্বনি যা আসছে আমাদের দিকে। একটি সন্ধানী আলো তীর্যকভাবে বিচ্ছুরিত হয় আকাশে। একটিমাত্র লোকের মতো আমরা নিজের নিক্ষেপ করি যমিনের উপর, কেবল তার কাঁটায় নিয়োজিত লোকগুলি ছাড়া;ওরা তখন মরিয়া হয়ে তাড়াহুড়া করে ওদের কাজ করে চলেছে। এখন আর ওরা চুপি চুপি কাজ করার কথা ভাবছে না। বরং ভূতে পাওয়া মানুষের মতো কাঁচি দিয়ে কেটে চলেছে আর রাইফেলের বাটের আঘাতে আলগা করে দিচ্ছে কর্তিত কাঁটা তার। কয়েক সেকেন্ড পর একটি রাইফেলের আওয়াজ শোনা যায়ঃ আমাদের উত্তরদিকে প্রহরীর সংকেত। সাঁজোয়া গাড়ির চালক নিশ্চয় তাকে দেখে ফেলেছে, কারণ সন্ধান আলোর রশ্মি সহসাত ধাবিত হয় নিচ দিকে আর আমরা মেশিন গানের গুলির অশুভ শব্দ শুনতে পাই। ইঞ্জিনের গর্জন বাড়তে থাকে এবং তার কালো ছায়া শরীর আমাদের উপর দিয়ে চলে যায়, আর তার হেডলাইটের আলো সোজা এসে পড়ে যমিনে। আমাদের উপর এরপরে মেশিনগানের গুলির এক বিস্ফোরণ হলো। স্পষ্টতই, কামান চলাক তাক করেছিলো অনেক উপরের দিকে। আমি আমাদের মাথার উপর দিয়ে ছুটে যাওয়অ বুলেচের শা-শা শন-শন শব্দ শুনতে পাই। উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে আমরা তার জবাব দিই আমাদের রাইফেল দিয়ে।
-‘সার্চ লাইট! সার্চ লাইট।’ কেউ একজন চীৎকার করে ওঠে- সার্চ লাইটটিকে তাক করে গুলী ছোড়ো’ এবং কয়েক মুহূর্তেই সার্চ লাইটটি নিভে গেলো। সন্দেহ নেই যে, আমাদের অব্যর্থ লক্ষ্য রাইফেলধারীদের বুলেট লেগে চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে গেছে সার্চ লাইটটি। সাঁজোয়া গাড়িটি থেমে যায়। কিন্তু তার মেশিনগান অন্ধের মতো গুলী করে চলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের সম্মুখে উত্থিত এক চীৎকার আমাদের জানিয়ে দিলো ,কাঁটা তারের বেড়া কেটে ঢুকে পড়ার পথ তৈরি হয়ে গেছে এবং আমরা একজন একজন করে সেই সংকীণর্ উন্মুক্ত পথটি দিয়ে গা মুচড়িযে মুচড়িয়ে নিজেদের নিয়ে যাই বেড়ার ওপাশে আর তাতে কাঁটা তারে লেগে আমাদের গায়ের কাপড় এবং চামড়া ছিড়ে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। এরপর শুনতে পেলাম ছুটে আসা মানুষের শব্দ-এবং আরো দুটি জার্দ পরা মূর্তি কাঁটা তারের বেড়ার সেই ফাঁকে ঝাপিয়ে পড়ে। আমাদের সংগীরা আমাদের সংগে মিলিত হচ্ছে আবার। বোঝা গেলো, ইতালীয়রা গাড়ির মায়া ছেড়ে আমাদের সংগে সামনাসামনি মুকাবিলা করতে অনিচ্ছুক.. আর তারপর, আমরা এসে দাঁড়ালাম মিসরের মাটিতে, অথবা এ-ও বলা যায়ঃ আমরা দৌড়াতে থাকলাম, পাথরের আড়ালে, বালুর স্তূপ ও বিচ্ছিন্ন ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে গা বাঁচিয়ে-কারণ আমাদের পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে, থেকে থেকে গুলী চালাচ্ছিলো ওরা।
যখন ভোর বেলা, তখন আমরা মিসরীয় এলাকার ভেতর ঢুকে পড়েছি। আমরা এখন বিপদমুক্ত। আমাদের বিশজনের মত লোকের মধ্যে পাঁচ জনকে আমরা হারিয়েছি। সম্ভবত ওরা মারা গেছে; আর চারজন হয়েছে যখম, তবে খুবদ মারাত্মক নয়।
-‘আল্লাহ আমাদের প্রতি রহম করেছেন’। আহত মুজাহিদীনের মধ্যে একজন বলে-কাঁটা তারের বেড়া পার হতে গিয়ে কখনো কখনো আমরা আমাদের অর্ধেক লোককে হারিয়ে বসি; কিন্তু আল্লাহ মহান, কেউই মরে না, যার মৃত্যু আল্লাহ চান না.. . পবিত্র কুরআন কি বলেনি?.. . যাঁরা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলো না; কারণ তারা জিন্দা, জীবিত.. .?’
দুপপ্তা পর ফিরতি পথে মারসা মাতরুহ এবং আলোকজান্দ্রিয়া হয়ে আমারা পৌছুলাম উজান মিসর এবং সেখানে পূর্ব ব্যবস্থা মতো নৌকায় করে ইয়ানবো হায়ে আমি আর যায়েদ আবার ফিরে এলাম মদীনায়। গোটা অভিযানটির জন্যই লাগলো দুমাস.. . মনে হলো না হিজায থেকে আমাদের অনুপস্থিতি আদৌ কেউ লক্ষ্য করেছে.. .।
.. . .. .. .. . ..
আমি যখন মদীনায় সেই কদীম সেনুসি আস্তানার চৌকাটে সিদি মুহা্ম্মদ আজ জুবাইর-এর সংগে পা রাখি, তখন মৃত্যু আর হতাশার সেই সব অস্পষ্ট প্রতিধ্বনি আমার চেতনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে আর জুনিপার গাছের গন্ধ, মাথার উপর দিয়ে ছুটে যাওয়া বুলেটের শব্দে আমার হৃদপিণ্ডের ধড়াস ধড়াস। আর আশা নেই, ভরসা নেই এমন এক অভিযানের যন্ত্রণা আবার জেগে ওঠে আমার বুকের ভেতর; তারপর ধীরে ধীরে মুছে যায় আমার সাইরেনিক অভিযানের স্মৃতি। বেঁচে থাকে কেবল তার বেদনা!
চার
আবার আমি দাঁড়াই মহান সেনুসির সামনে এবং সেই বৃদ্ধ যোদ্ধার ক্লান্ত মুখের দিকে তাকাই। আবার আমি সেই হাতটিতে চুমু খাই, যা অতো দীঘৃকাল তলোয়ার ধারণ করেছে যে এখন আর তলোয়ার বহনের সামর্থ্য তার নেই।
-আল্লাহ তোমাকে রহম করুন, বাবা, তুমি আরাম করে বসো.. . এক বছরের বেশি হলো আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিলো, আর এই বছরের সাথে সাথে আমাদেরও আশা নিঃশেষ হয়েছে। কিন্তু তা’রীফ আল্লাহর তিনি যা ইচ্ছা করেন.. .।
নিশ্চয় বছরটি ছিলো সাইয়িদ আহমদের জন্য দুঃখময়। তাঁর মুখের রেখাগুলি আরো গভীর হয়েছে আর তাঁর গলার আওয়াজ খুবই নিচু হয়ে পড়েছে যা আগে কোনদিন তেমন ছিলো না। যয়ীঅ ঈগল মুষড়ে পড়েছেন। জড়োসড়ো হয়ে বসেছেন গালিচার উপর। তাঁর সাদা বার্নাস তাঁর শরীরে আঁটসাট করে বাঁধা-যেনো শরীরটাকে গরম করার জন্যই, আর তিনি অনন্ত শূন্যের দিকে তাকিয়ে আছেন নির্বাক, নিশ্চুপ।
-‘আমরা যদি কেবল উমর আল-মুখতারকে বাঁচাতে পারতাম’, ‘তিনি ফিসফিস করে বলেন, ‘আমরা যদি সময় থাকতে পালিয়ে মিসর চলে আসার জন্য তাঁকে কেবল রাযী করাতে পারতাম.. .’
-‘কেউই পারতো না সিদি উমরকে বাঁচাতে’, আমি তাঁকে সান্ত্বনা দিই, ‘তিনি নিজেই তাঁকে বাঁচাতে চাননি। বিজয়ী হতে না পারলে তাঁর মৃত্যু হোক, তা’ই তিনি চেয়েছিলেন, যখন তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিই, তখনি তা আমি বুঝেছিলাম হে সিদি আহমদ!’
সাইয়িদ আহমদ সাজোরে তাঁর মাথা নাড়েন,-হ্যাঁ, আমিও তা জানতাম,.. . আমিও তা.. . জানতাম কিন্তু জানতে পেরেছিলাম খুব দেরীতে। মাঝে মাঝে আমার মনেহয়, সতেরো বছর আগে ইস্তাম্বুল থেকে যে আহবান এসেচিলো, তাতে সাড়া দেয়া আমার ভুল হয়েছে.. . আর তা কি, সম্ভবত কেবল উমরেরেই নয়, বরঞ্চ সকল সেনুসিরই মৃত্যুর শরু ছিলো না?
এ প্রশ্নের কোনো জবাব আমার কাছে নেই। কারণ, হামেশাই আমার মনে হয়েছে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে অযথা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য সাইয়িদ আহমদের সিদ্ধান্ত ছিলো তাঁর জীবনের সবচেয়ে মারাত্মক ভূল।
-‘কিন্তু’, সাইয়িদ আহমদ আবার বলেন, ইসলামের খলীফা যখন আমার কাছে মদদ চাইলেন, তখন অন্য সিদ্ধান্তই আমার পক্ষে কি ক’রে সম্ভব ছিলো? আমি কি ঠিক করেছিলাম, না নির্বোধের মত কাজ করেছি? কিন্তু আল্লাহ ছাড়া আর কে-ই বা বলতে পারে, মানুষ যখন তার বিবেকের ডাকে সাড়া দেয়, তখন সে কি ঠিক করলো , না ভূল করলো?’
-সত্যিই কে তা বলতে পারে?’
মহান সেনুসির মাথা দুলতে থাকে ডানি বাঁয়ে, যন্ত্রণায়-বিমূঢ়তায়। ঝুলে পড়া চোখের পাতার পেছনে চোখ দুটি ঢাকা আর আকস্মিক এক নিশ্চয়তার সাথে আমি বুঝতে পারলাম, এ চোখ আশার শিখায় আর ঝলসে উঠবে না কখনো।১[সাইয়িদ আহমদ মদীনায় ইন্তেকাল করেন পর বৎসর(১৯৩৩)]
পথের শেষ
এক
অনেক রাতে আমরা মদীনা ত্যাগ করি পূব দিকের পথ ধরে, যে পথে রসূলুল্লাহ তার বিদায় হ্জ্ব করতে মক্কা গিয়েছিলেন, তাঁর ইন্তেকালের কয়েক মাস আগে।
রাতের বাকি সময় চলেতে থাকি ঘনিয়ে আসা ভোরের মধ্য দিয়ে। আমরা আমাদের উটের পিঠে সওয়ার হয়ে চলতে থাকি; ফজরের সালাতের জন্য কিছুক্ষণ থেমে আমরা দিবসে প্রবেশ করি; ধূসর এবং মেঘাচ্ছন্ন দিবস। দুপুরের আগে বৃষ্টি শুরু হয় এবং দেকতে দেখতে পেলাম এবং স্থির করলাম তাদেরই একটি কালো তাঁবুতে আশ্রয় নেবো।
তাঁবুটি ছোট্ট। হারবের বদ্দুরের তাঁবু এটি। ওরা আমাদের দেখে স্বাগত জানায় উচ্চৈঃস্বরে, ‘হে মুসাফিরেরা, আল্লাহ আপনাদের হায়াত দারাজ করুন। খোশ আমদেদ!’ আমি ‘শাইখে’র তাবুতে ছাগ-পশমের মাদুরের উপর আমার কম্বল বিছিয়ে দিই আর শাইখের জরু, এই এলাকায় প্রায় সকল বদ্দু আওরতের মতোই যাঁর মুখ অনাবৃত, তাঁর সোয়ামীর সুন্দর স্বগত সম্ভাষণরি পুনরাবৃত্তি করেন। নির্ঘুম রাতের পর দ্রুত নিদ নেমে এলো আমার উপর, তাঁবুর ছাদের উপর বৃষ্টি পতনের মৃদংগ ধ্বনির মধ্যে। কয়েক ঘন্টা পর আমি যখন ঘুম থেতে জেগে উঠলাম, তখনো বৃষ্টির মৃদংগ বাজছে। আমাকে ঢেকে আছে রাতের অন্ধকার-ও হো, তা তো নয়-এ তো রাত নয়, কেবল তাঁবুর গাঢ় কালো চাঁদোয়অ; আর এর গন্ধ ভেজা পশমের গন্ধেরই মতো। আমি আমার বাহু দুটি প্রসারিত করি, আমার হাত গিয়ে লাগে আমার পেছনে মাটির উপর রাখা উটের একটি জীনের উপর। তার পুরানো কাঠের মসৃণতা স্পর্শ করতে চমৎকার লাগে। আঙুল দিয়ে এর উপর খেলা করা কী আনন্দদায়ক, যতক্ষণ না জীনের সম্মুখের উচুভাগ পর্যন্ত আঙুলগুলি গিয়ে মিশেছে লোহার মতো শক্ত ধারলো উটের অন্ত্রের সংগে-যা দিযে জীনটিকে সেলাই করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁবুতে আমি ছাড়া আর কেউই নেই।
কিছুক্ষণ পর আমি উঠে পড়ি এবং তাঁবুর খোলা অংশটিতে পা রাখি। বৃষ্টি যেন পিটিয়ে পিটিয়ে গর্ত খুঁড়ছে বালির ভেতর.. .লাখে লাখে ছোট গর্ত, যা এই মুহূর্তে দেখা দিচ্ছে এবং হঠাৎ মিলিয়ে যাচ্ছে নতুন গর্তের স্থান করে দেওয়ার জন্য-এবং ঘুরে, আমার ডানদিকে, নীল ধূসর গ্রানাইট শিলাখণ্ডের উপর স্প্রে করে ছড়িয়ে দিচ্ছে পানি, আমি কাউকেই দেখছি না, কারণ, দিনের এই সময়টিতে নিশ্চয় ওরা বের হয়ে পড়েছে তাদের উটের খবরদারী করতে;ড় নিচে অধিত্যকায়, আকাসিয়া গাছে কাছে অনেকগুলি কালে তাঁবু নিশ্চুপ হয়ে আছে বৃষ্টি-ঝরা বিকালের নীরবতায়। ওদেরই একটি থেকে একটি ধূসর ধুম্রকুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে উঠেছে উপরের দিকে.. . সান্ধ্য খাবারের সংকে। ধোঁয়অটা এতোই পাতলা এভং এতোই ক্ষীণ যে, বৃষ্টির মুকাবিলায় ঠেরে ওঠার ক্ষমতাই তার নেই.. . এবং তা লতিয়ে উঠছে কিনার ঘেঁষে, অসহায়ভাবে কাঁপতে কাঁপতে, প্রবল বাতাসে রমনীর কেশপাশের মতো। রূপালী ধূসর পানির ফিতার চলমান পর্দার অন্তরালে টিলাগুলি যেনো আন্দোলিত হচ্ছে; বাতাস বুনো আকাসিয়া গাছ আর স্যাঁতস্যাঁতে তাঁবুর পশমের গন্ধে ভারাক্রান্ত আছে।
ধীরে ধীরে পানি ছিটানো এবং ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি থেমে যায় এবং সান্ধ্য সূর্যের রশ্মির নিচে মেঘপুঞ্জ টুকরা হয়ে পালাতে শুরু করে। আমি নিচু কএকটি গ্রানাইট শিলাখণ্ডের দিকে আগিয়ে যাই। এ পাথরটির উপর এমন একটি গর্ত রয়েছে যা খাঞ্চার মতো বড়ো, যাতে আমোদ উৎসবের দিন মেহমানদের পুরা ভেড়ার রোষ্ট এবং ভাত পরিবেশন করা হয়। এখন একটি বৃষ্টির পানিতে ভর্তি। আমি যখন আমার বাহু দুটি এর ভেতর রাখি, পানি আমার কুনই পর্যন্ত পৌছোয়, মৃদুষ্ণ, বিস্ময়কররূপে আদুরে পরশ এবং আমি যখন পানির ভেতর আমার বাহু দুটি নাড়ি, মনে হলো আমার ত্বক যেনো পানি খাচ্ছে! একটি তাঁবু থেকে বের হয়ে আসে একটি নারী, মাথার উপর একটি বড় তামার পাত্র নিয়ে-বোঝাই যাচ্ছে, বৃষ্টির ফলে বহু পাথর ও শিলাখণ্ডের গর্তে যে পানি জমেছে, তারিই একটি থেকে সে তার পাত্রটি ভরে নেবার জন্য বের হয়েছে। ও তার বাহু দুটি কখনো প্রসারিত করছে সামনের দিকে, কখনো পাশে কখনো উর্ধ্বে, তার লাল প্রশস্ত জামার কিনার দুহাতে পাখার মতো ধরে এবং মৃদু দুলতে দুলতে সে আগাতে থাকে। শিলার উপর থেকে যখন পানি ধীরে ধীরে নিচের দিকে প্রবাহিত হয় তখন পানি যেমন দুলতে থাকে, তেমনি দুলে দুলে চলছে রমণী। আমি মনে মনে বলিঃ এ রমণী পানির মতোই সুন্দর.. . আমি দূর থেকে শুনতে পাই প্রত্যাবর্তনমুখী উটের ডাকঃ আর এই যে ওরা দেখা দিচ্ছে টিলার আড়াল থেকে একটি ছড়িয়ে পড়া দলের মতো, গাম্ভীর্যের সংগে শিথিল চরণ ফেলতে ফেলতে চলছে রাখালেরা-ওদের চালিয়ে নিয়ে আসে উপত্যকার ভেতরে, তীক্ষ্ম ছোট্ট ডাক হাঁকের সাহায্যে, তারপর তারা উচ্চারণ করে একটি বিশেষ শব্দ ‘গ-র-র.. .গ-র-র.. .’জানোয়ারগুলি যেনো হাঁটু ভেংগে বসে পড়ে; আর দেখা যায়, অনেকগুলি উট তাদের বাদামী রঙের পিঠ মাটির দিকে নমিত করছে তরংগিত ছন্দে। সন্ধ্যা যখন ঘনিায়ে আসছে লোকেরা ওদের উটের সামনের পা দুটিতে বেড়ি পরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নিজ নিজ তাঁবুতে। আর, এখানে এসেছে রাত তার কোমল অন্ধকার আর স্নিগ্ধ শীতলাত নিয়ে। বেশির ভাগ তাঁবুর সামনেই জ্বর আগুন; রান্নার পাত্র আর কড়াইয়ের টুঙটাঙ শব্দ আর রমণীদের হাসির আওয়াজ মিশে যায় পুরুষদের আকস্মিক ডাক-হাঁক ও তাদের টুকরা বিচ্ছিন্ন কথার সাথে, যা বাতাসে ভর করে ভেসে আসে আমার কাছে। উটের পরে ফিরে এসেছে ভেড়া-ছাগল; ওরাও কিছুক্ষণ ডাকে এবং কখনো কখনো কুকুর চীৎকার করে ওঠে, যেমনটি ওরা চীৎকার করে প্রতি রাতেই, আরবের প্রতিটি তাঁবুতে।
যায়েদকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। হয়তো কোনো একটি তাঁবুতে সে শুয়ে পড়েছে। আমি ধীরে ধীরে হেঁটে আরাম করে শোয়া উটগুলির দিকে যাই। ওরা ওদের মস্তবড় শরীর দিয়ে ওদের নিজেদের জন্য বালুর মদ্যে খুঁড়েছে গর্ত এবং আরাম করে শুয়ে আছে। কোনো কোনোটি জাবর কাটছে, আর অন্যেরা ওদের লম্বা গলা প্রসারিত করে দিয়েছে যমিনের উপর। কোনো কোনোটি মাথঅ উঁচু করে নাকের ভেতর দিয়ে শব্দ করে, যখন আমি পাশ দিয়ে যাই এবং খেলাচ্ছলে স্থূল কুঁজে হাত দিয়ে ধরি। একটি তরুণ উট ছানা তার মায়ের পাশে নিবিড়ভাবে গা ঘেঁষে পড়ে আছে। আমার হাতের স্পর্শে লাফ মেরে দাঁড়িয়ে যায়, যখন তার মা মাথা ঘুরিয়ে আমর দিকে তাকায় এবং বিরাট হা করে মোলায়েম ডাক ছাড়ে। আমি দুই বাহু দিয়ে উট ছানাটির গলা জাড়িয়ে ধরি এবং তাকে চেপে ধরে আমার মুখ গুঁজে দিই তার পিছের গরম লোমের মধ্যেঃ আর হঠাৎ সে নীরব , নিথর দাঁড়িয়ে যায়-মনে হলো তার সব ভয় যেনো চলে গেছে। কচি জন্তু-দেহের উত্তাপ আমার মুখ এবং বুক ভেদ করে প্রবেশ করে-আমি টের পাই, আমার হাতের তালুর নীচে রক্ত উত্থাল-পাতাল করছে ওর ঘাড়ের শিরায় আর আমার রক্তের স্পন্দনের সংগে তা মিশে গেছে- এবং আমার মধ্যে জাগ্রত করে এক সর্বপ্লাবী অনুভূতি-খোদ জীবনের সংগে নিবিড় সান্নিধ্যের অনুভূতি, জীবনের মাঝে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে বিসর্জনের এক আকুতির উপলব্ধি।
দুই
আমরা উটের পিঠে সওয়ার হয়ে চলেছি আর ওদের প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের পথের যেখানেই শেষ তারই নিকটতরো সান্নিধ্যে নিয়ে আসে আমাদের। এভাবে সূর্যকরোজ্জ্বল স্তেপ-ভূমির মধ্যে দিয়ে আমরা দিনের পর দিন চলতে থাকি। রাতের বেলা নক্ষত্রের নিচে আমরা ঘুম যাই এবং ভোরের স্নিগ্ধ শীতলাতয় আমরা জেগে উঠি-আর ধীরে ধীরে আমি আমার পথের শেষ প্রান্তের দিকে আগাতে থাকি।
কোনদিনই এ পথ ছাড়া আর কোনো পথ ছিলো না আমার জন্যঃ যদি ও বহু বছর তা আমি জানতাম না। এ আমাকে ডাক দিয়েছিরো মক্কা সম্বন্ধে আমার মন সচেতন হয়ে ওঠার বহু আগেই-এক প্রবল কন্ঠস্বরেঃ‘ আমার রাজ্য এই পৃথিবীতে, আমর রাজ্য ভাবী জগতেওঃ আমার রাজ্য অপেক্ষায় রয়েছে মানুষের দেহ এবং আত্মা ও দুয়েরই এবং মানুষ যা কিছু চিন্তা করে, অনুভব করে, এবং করে, – তার ব্যবসা বাণিজ্য, তার ইবাদত বন্দেগী, তার শয়নকক্ষ, তার রাজনীতি সমস্ত কিছুর উপর এ রাজ্য সম্প্রসারিত। আমর রাজ্যের শেষ নেই, সীমা নেই।’ এবং যখন কয়েক বছর পরে, আমার নিকট এসব পরিষ্কার হয়ে উঠলো, আমি জানতে পারলাম আমার স্থান কোথায়ঃ আমি জানতে পারলাম আমার জন্মের পর থেকেই ইসলামী ভ্রাতৃত্ব আমার ইন্তেজারে রয়েছে এবং আমি ইসলাম কবুর করলাম। আমার প্রথম যৌবনের সেই যে বাসন-ধ্যান ধারণার একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ আমার চাই, একটি ভ্রাতৃ-সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে চাই আমি, এতোদিনে শেষপর্যন্ত তা পূরণ হলো।
খুবই আশ্চর্যের বিষয়-হয়তো তাতো আশ্চর্যনক নয়, যদি কেউ বিবেচনা করে ইসলামের লক্ষ্য কী-মুসলমানদের মধ্যে মুসলমান হিসাবে আমার প্রথম অভিজ্ঞতাই হচ্ছে ভ্রাতৃত্বের.. .।
১৯২৭ সনের জানুয়ারির প্রথম দিনগুলিতে আমি আবার বের হয়ে পড়ি মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে। এবার আমার সংগে ছিলো এলসা আর তার কচি ছেলে, আর এবারই আমি অনুভব করলাম, এটাই হবে আমার শেষ যাত্রা।
কয়েকদিন ধরে আমরা সমুদ্র সফর কির ভূমধ্যসাগরের মধ্য দিয়ে, সমুদ্র ও আকাশের এক ঝিকিমিকি বৃত্তের ভেতর দিয়ে।–কখনো আমাদের অভ্যর্থনা জানায় সুদূর উপকূল এবং আমাদের পাশ কাটিয়ে দ্রুত ছুটে চলা জাহাজের ধুঁয়া; ইউরোপ হারিয়ে গেছে আমাদের অনেক অনেক পেছনে এবং আমি তার কথা প্রায় ভূলেই গিয়েছি।
প্রায়ই আমি আমাদের কেবিন-ডেকের আরাম-আয়েমের মধ্যে থেকে বেরহয়ে নিচে যাই জাহাজের সবচেয়ে কম ভাড়ার জীর্ণ স্থানটিতে, যেখানে রয়েছে লোহার তৈরি বাঙ্ক স্তরে স্তরে। জাহাজটি যাচ্ছিলো দূরপ্রাচ্যে তাই ডেক-যাত্রীদের বেশির ভাগই ছিলো চীনা, ছোট ছোট কারিগর ব্যবসায়ী, যারা বহু বছর ইউরোপে কঠিন পরিশ্রমের পর ফিরে যাচ্ছে স্বদেশে। তাছাড়া রয়েছে ইয়েমেনী আরবদের একটি ছোট্ট দল, যারা জাহাজে উঠেছে মার্সাই বন্দরে। দেশে ফিরছে ওরাও। পাশ্চাত্য বন্দরগুলির শব্দগন্ধ এখানে জড়িয়ে রয়েছে ওদের সংগে। ওরা এখনো বাস করছে দিন শেষের অন্তরাগের মধ্যে, যখন ওদের বাদামী হাত ইংরেজ, মার্কিন ও ওলন্দাজ জাহাজে কয়লা মারতো বেলচা দিয়ে; ওরা এখনো অদ্ভূত বিদেশী নগর বন্দরের কথা আলাপ করছে-নিউইয়র্ক, বুয়েনস আইরীজ, হেমবুর্গ। উজ্জ্বল অজানার হঠাৎ বাসনায় তাড়িয়ে হয়ে একদিন ওরা এডেন বন্দরে স্টোকার ও কয়লার স্টীমার ১[জাহাজের চুল্লিতে কয়লা দেওয়ার জন্য নিযুক্ত হোক] হিসাবে নিজেদের ভাড়াই বিকিয়ে দিয়েছিলো। ওরা ওদের পরিচিত জগত থেকে বের হয়ে পড়েছিলো পৃথিবীর ধারণাতীত বিস্ময়কর বৈচিত্রের আলিংগনে ওরা বেড়ে ছাড়িয়ে যাবে নিজেদেরঃ কিন্তু জাহাজ কিছুক্ষণ পরেই ভিড়বে এডেন বন্দরে আর ওদের জীবনের এই দিনগুলি হারিয়ে যাবে অতীতের মধ্যে। ওরা পশ্চিমের হ্যাটের বদলে নেবে পাগড়ী অথবা ‘কুফিয়া’, বিগত দিনকে বাঁচিয়ে রাখবে কেবল স্মৃতি হিসাবে এবং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত প্রত্যেকটি মানুষ ফিরে যাবে ইয়েমেনে, তার গাঁযের বাড়িতে। ওরা যেমনটি একদিন ঘর থেকে বের হয়ে পড়েছিলো, ঘরে কি ঠিক সেই মানুষ হিসাবেই ফিরবে, না বদলে যাওয়া মানুষরূপে? পাশ্চাত্য জগত কি ওদের আত্মাকে কব্জা করে ফেলেছে-নাকি কেবল ওদর ইন্দ্রিয়গুলিরই উপর হাত বুলিয়েছে?
এই লোকগুলির সমস্যা আমার মনে ঘনীভূত হয়ে বৃহত্তরো তাৎপর্যপূর্ণ একটি সমস্যার রূপ নিলো।
আমি চিন্তা করে বুঝতে পারি, আজকের মতো অতীতে কখনো একে অপরের এতো নিবিড় সান্নি্ধ্যে আসেনি ইসলাম এবং পাশ্চাত্য জগত। এই নৈকট্য একটি সংগ্রাম-দৃষ্টিগোচর এবং দৃষ্টির অগোচার-দুই-ই। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির চাপে বহু মুসরিম নারী এবং পুরুষের আত্মা ক্রমেই কুঁকড়ে যাচ্ছে।
জীবন মানের উন্নতি হওয়া উচিত মানুষের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে উন্নত করার উপায়-ওদের ইতিপূর্বেকার এই বিশ্বাস থেকে বিচ্যুতি হয়ে ওরা নিজেদের চালিত হতে দিচ্ছে ভিন্ন পথে। ওরা প্রগতি নামক সেই পৌত্তলিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে যে পূজায় পাশ্চাত্য জগত নিজেদের সমর্পণ করেছিলো, ঘটনার পশ্চাদভূমিতে কোনো এক স্থানে কেবল একটি সুরেলা টুঙটাঙ ধ্বনিতে ধর্মকে রূপান্তরিত করার পরে, আর এ কারণে, এসব মুসলিম নর-নারী ধীরে ধীরে নিজেদের ছোটো করে ফেলেছে, বড়ো করছে নাঃ কারণ সকল সাংস্কৃতিক অনুকরণই সৃজনশীলতার বিরোধী বলে যে কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীকে তা অনিবার্যভাবেই হেয় করে তোলে.. .
কথা এ নয় যে, পশ্চিমা জগতের কাছ থেকে মুসলমানদের খুব বেশি শেখার নেই, বিশেষ করে কারিগরি ক্ষেত্রে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা এবং পদ্ধতি অর্জন করা প্রকৃতপক্ষে অনুকরণ নয়ঃ আর খাস করে সে জাতির পক্ষে সে নিশ্চয় নয়, যার ধর্মই তাকে দেয় জ্ঞান অনুসন্ধানের নির্দেশ, যেখানেই তা পাওয়া যাক। বিজ্ঞান পাশ্চাত্যের নয়, প্রাচ্যেরও নয়; কারণ সকল বৈজ্ঞানিক আবি**য়াই হচ্ছে মানুষের বুদ্ধিগত প্রয়াসের অন্তহীন এক শৃংখলের মধ্যে কতকগুলি আঙটা মাত্র, যে যে প্রয়াস বেষ্টন করে সমগ্র মানবজাতিকে। প্রত্যেক বিজ্ঞানীই তাঁর পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীরা তা তাঁর নিজের জাতির হোক বা ভিন্ন জাতিরিই হোক, যে বুনিয়াদ স্থাপন করে গেছেন, তারই উপর নির্মাণ করেন ইমারত। আর নির্মাণের এই প্রক্রিয়া, সংশোধন ও উন্নয়ন চলতে থাকে মানুষ থেকে মানুষ, যুগ থেকে যুগান্তরে, সভ্যতা থেকে সভ্যতায়-যে কারনে, কোনো বিশেষ যুগ বা সভ্যতার বৈজ্ঞানিক সাফল্যকেই কখনো সেই যুগ বা সভ্যতারই নিজস্ব কীর্তি বলে গণ্য করা য়ায় না। সময়ের একেক পর্যায়ৈ অন্যান্য জাতির চাইতে অধিকতরো প্রাণবন্ত উদ্যমশীল একেকটি জাত বিজ্ঞানের সাধারণ ভাণ্ডারে অধিকতরো অবদান রাকতে সক্ষম হয়ে থাকেঃ কিন্তু শেষপর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় সকলেই অংশগ্রহণ করে এবং সংগতভাবেই। এমন একসময় ছিলো, যখন মুসলমানদের সভ্যতা ছিলো ইউরোপের সভ্যতা হতে অনেক বেশি বীর্যবান। এই সভ্যতা ইউরোপে চালান দেয় বৈপ্লবিক ধরনের বহু কারিগরি উদ্ভাবনের কল এবং তার চেয়ে বেশিঃ সেই ‘বৈজ্ঞঅনিক পদ্ধতি’র নিজস্ব মৌলিক নীতিগুলি, যার উপর গড়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতা। তা সত্ত্বেও রসায়নশাস্ত্রকে যাবির িইবনে হাইয়ানের মৌলিক আবিস্কার আরবীয় বিজ্ঞান বানিয়ে ফেলেনি; অথবা বীজগণিত এবং ত্রিকোণমিতিকেও মুসলিম বিজ্ঞান বলা যায় না, যদিও এর একটি উদ্ভাবিত হয়েছিল আল-খারিজমী কর্তৃক এবং অন্যটির উদ্ভাবক ছিলেন আল-বাত্তানি, আর ওঁদের দুজনই ছিলেন মুসলমান-ঠিক যেমন আমরা ‘ইংরেজ মাধ্যাকর্ষণতত্ত্ব’ বলে কোন কিছুর উল্লেখ করতে পারিনা, যদিও যে লোকটি এই তত্ত্বটির রূপ দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন একজন ইংরেজ। এ ধরনের সকল কৃতিত্বই হচ্ছে মানবজাতির সাধারণ সম্পদ। তাই, মুসলমানরা যদি বিজ্ঞান এবং কারিগরিশাস্ত্রে আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করে, যা অবশ্যি তাদের গ্রহণ করা উচিত, তাহলে অন্য মানুষের অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করার জন্য মানুষের মধ্যে যে বিবর্তনধর্মী বৃত্তি কাজ করে, ওরা কেবল অন্য মানুষের অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করার জন্য মানুষের মধ্যে যে বিবর্তনধর্মী বৃত্তি কাজ করে, ওরা কেবল তারই অনুসরণ করবে-তার বেশি নয়।
কিন্তু ওরা যদি পাশ্চাত্য জীবনের বহিরংগ, তার রীতিনীতি, আচার আচরণ ও সামাজিক ধ্যান-ধারণা গ্রহণ করে-যা করার প্রয়োজন মোটেই ওদের নেই-তাহলে ওরা কখনো লাভবান হবে না। কারণ এক্ষেত্রে, পাশ্চাত্য তাদের যা দিতে পারে তা তাদের নিজের সংস্কৃতি যা দিয়েছে এবং যার প্রতি তাদের নিজ ধর্ম-বিশ্বাসও পথ নির্দেশ করে, কোনোমতেই তা থেকে এ উৎকৃষষ্টতরো হবে না। মুসলমানরা যদি তাদের মাথা ঠাণ্ডা রাখে এবং প্রগতিকে গ্রহণ করে উপায় হিসাবে, লক্ষ্য হিসাবে নয়, তাহলে তারা যে কেবল তাদের নিজের অন্তরের স্বধীনতাই বজায় রাখতে পারবে, তা নয়; হয়তো জীবনের মধুরতা হারিয়ে যাওয়া গোপন রহস্যটুকুও তারা তুলে দিতে সক্ষম হবে পশ্চিমের মানুষের হাতে.. .।
.. . .. . .. . .. . ..
জাহাযের ইয়েমেনীদের মধ্যে একজন হালকা-পাতলা বেঁটে-খাটো লোক, যার নাক ঈগলের ঠোঁটের মতো, আর মুখমণ্ডল এতো প্রগাঢ় যে, মনে হলো যেনো তা জ্বলছে: কিন্তু তার অংগভংগি খবই শান্ত এবং পরিমিত। সে যখন শুনতে পেলো আমি একজন নও-মুসলিম, সে আমার প্রতি এক বিশেষ প্রীতি দেখাতে শুরু করলো। ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা দুজন ডেকের উপরে এক সংগে বসে কাটাই যখন সে আমাকে ইয়েমেনে তার পাহাড়ী গাঁয়ের কথা বলে চলে। তাঁর নাম মুহাম্মদ সালিহ।
এক সন্ধ্যায় আমি নিচে নেমে ডেকে তার সংগে দেখা করি। তার এক বন্ধু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে আছে লোহার বাংকের উপর। আমাকে বলা হলো, জাহাজের ডাক্তার নেমে ডেকে আসার প্রায়োজন বোধ করবে না মোটেই। লোকটি ভুগছে ম্যালেরিয়ায়। এজন্য আমি তাকে কুইনিন দিই। আমি যখন ওকে নিয়ে ব্যস্ত আছি, তখন অন্য ইয়েমেনীরা কোণায় জমা হয় ক্ষুদ্রাকৃতি মুহাম্মদ সারিহর চারপাশে। ওরা তীর্যক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় এবং মুহাম্মদ সালিহ ফিস ফিস করে যে পরামর্শ দিচ্ছে, তা গ্রহণ করে। শেষতক ওদের মধ্যে একজন আগিয়ে আসে। লোকটির দেহ দীর্ঘ, মুখের রঙ জলপাই-বাদমী আর চোখ দুটি তপ্ত কালো। সে আমাকে অফার করে একগাদা দলানো-মোচড়ানো ফরাসী নোটঃ
-‘আমরা নিজেদের মধ্যে থেকে েএগুলি যোগাড় করেছি। দুঃখের বিষয়, পরিমাণে খুব বেশি নয়। আপনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন আর এই অর্থ গ্রহণ করুন।’
আমি চমকে উঠে পিছনে দাঁড়াই এবং ওদের বুঝিয়ে বলি, ওদের দোস্তকে আমি ওষুধ দিয়েছি, টাকার জন্য নয়।
-‘না, না, আমরা াত জানি; তা সত্ত্বেও দয়া করে এ টাকা গ্রহণ করুন। কোনো কিছুর মুল্য হিসাবে এ আমরা শোধ করছি না- এ অর্থ হচ্ছে একটি সওগাত, একটি উপহার আপনার ভাইদের কাঝ থেকে। আমরা আপনাকে পেয়ে খুবই সুখী আর এজন্যই আপনাকে এ টাকা দিচ্ছি। আপনি একজন মুসলমান এবং আমাদের ভাই। এমনকি, আমাদের থেকেও আপনি শ্রেষ্ঠ।কারণ আমরা জন্মেছি মুসলমান হিসাবে, আমাদের পিতারা ছিলেন মুসলমান এবং আমদের দাদারাও; কিনউত আপনি ইসলামকে উপলব্ধি করেছেন আপনার নিজের অন্তর দিয়ে.. . ভাই, এই অর্থ গ্রহণ করুন রসূলুল্লাহর খাতিরে ‘
কিন্তু আমি তখনো আমার ইউরোপীয় রীতি-নীতির নিগড়ে বন্দী; নিজের সমর্থনে আমি বলি, “এক রুগ্ন বন্ধুর একটু খিদমতের বদলে কোনো উপহার গ্রহণ আমার পক্ষে সম্ভব নয়।.. . তা াড়া, আমার কাছে টাকাকড়ি রয়েছে যথেষ্ট। আমার চাইতে এর প্রয়োজন তোমাদের নিশ্চয় বেশি। তা সত্ত্বেও, তোমরা যদি এ টাকা দান করতে ইচ্ছা করো পোর্ট সৈয়দ গিয়ে গরীবদের দিয়ে দিও।”
-‘না’, আবার বলে ইয়েমেনী লোকটি, আপনি এ টাকা নিন আমাদের কাঝ থেকে-এবং আপনি যদি তা রাখতে চান, আপনি নিজের হাতেই দিয়ে দিন গরীবদের।’
এবং ওরা যখন আমার উপর পীড়পীড়ি করছে এবং আমার প্রত্যাখ্যানে বিচরিত হয়ে ওরা যখন করুণ এবং নীরব হয়ে গেরো, অকস্মাৎ আমি বুঝতে পাররামঃ আমি যেখান থেকে এসেছি, মানুষ সেখোনে ‘আমার’ এবং ‘তোমার’ মধ্যে প্রাচীর গড়ে তুলতে অভ্যস্তঃ কিন্তু এই সমাজ এমন একটি সমাজ-এর মধ্যে নেই কোনো প্রাচীর.. .
-‘টাকাটা আমাকে দাও ভাইয়েরা, আমি গ্রহণ করছি-আর ধন্যবাদ তোমাদের।’
তিন
‘-আসছে কাল, ‘ইনশাআল্লাহ’, আমরা থাকবো মক্কায়। তুমি যে আগুন জ্বালচো যায়েদ, এটিই হবে সর্বশেষ; আমাদের সফর শেষ হয়ে আসছে!
-কিন্তু নিশ্চয় চাচা, আবার ধরাতে হবে আগুন এবং আপনার আর আমার সামনে সবসময়ই থাকবে আরেকিট সফর।
-‘হতে পারে সে রকম, হে যায়েদ, আমার ভাই! কিন্তু কেমন করে যেনো আমি অনুভব করছি, এদেশে আর হবে না সেই সব সফর। আমি এতো দীর্ঘদিন আরবদেশে ঘূরে বেড়িয়েছি যে, এ আমার রক্তের সাথে মিশে গেছে এবং আমার আশংকা, আমি যদি এখন বের হয়ে না পড়ি, আর কখনো পারবো না বের .. . হতেঃ কিন্তু যায়েদ আমাকে চলে যেতেই হবে। তোমার কি সেই প্রবাদটি মনে নেই, যদি পরিষ্কার থাকতে হয়, পানিকে চলতেই হবে, বয়ে যেতে হবে! আমি আমার তারুণ্য থাকতে থাকতেই দেখতে চাই, আমাদরে মুসলমান ভাইয়েরা কিভাবে জীবন-যাপন করছে দুনিয়ার অন্যান্য অংশে-ভারত, চীনে, জাভায়.. .।
-‘কিন্তু চাচাজন, যায়েদ জবাব দেয় সবিস্ময় আতংকে-নিশ্চয় আরব দেশের প্রতি আপনার প্রেম নিঃশেষ হয়ে যায়নি।
-না যায়েদ, আমি চিরদিন যেমন ভালোবেসে এসেছি, তেমনি একে ভালোবসি; বরং বলা যায় তার চাইতে হয়তো বেশি ভালোবাসি। এতো বেশি ভারোবাসি যে, আমি ভাবতেও কষ্ট পাই, ভবিষ্যতে এর জন্য কী অপেক্ষা করছে! আমি শুনতে পেলাম, বাদশা নাকি তাঁর দেশকে ফিরিংগীদের জন্য খুলে দেবার পরিকল্পনা করেছেন, যাতে করে ওদের কাছ থেকে তাঁর অর্থাগম হতে পারে! তিনি ওদের আলহাসায় তেলের জন্য এবং হিজাযে সোনারজন্য মাটি খুঁড়ে অনুসন্ধান চালাবার অনুমতি দেবেন এবং কেবল আল্লাহই জানেন, এর পরিণাম কী হবে বেদুঈনদের জন্য! এদেশ আর কখনো থাকবে না এরকম.. .
মরুভূমির রাতের নিশ্চুপ নীরবতার মধ্যে থেকে ওঠে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে চলা উটের পদধ্বনি। এক এককী উট-সওয়ার অন্ধকার থেকে আমাদের ক্যাম্প-ফায়ারের আলোতে ছুটে আসে জীনের ঝালর উড়িয়ে, ‘আবায়া’ তরংগায়িত করে; হঠাৎ সে তার উটটিকে থামিয়ে দেয় এবং উটটি কখন হাঁটু গেড়ে নিচু হবে, তার জন্য অপেক্ষা না করেই সে লাফিয়ে নেমে পড়ে জীনের উপর থেকে। সংক্ষিপ্ত ‘আসসালামু আলাইকুম’- ‘আপনার প্রতি শান্তি হোক’- এক কথা বলে আর কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেই সে জানোয়ারটির পিঠ থেকে জীন খুলে নামাতে শুরু করে দেয়, জীনের সঙে বাঁধা থলেগুরি ছুঁড়ে মারে ক্যাম্প-ফায়ারের নিকটে আর তারপর বসে পড়ে মাটির উপর-তখনো নিশ্চুপ, মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে।
-‘আল্লাহ আপনাকে হায়াত দিন, হে আবু সাইয়িদ,’ যায়েদ বলে। কারণ বোঝা গেলো, নবাগত লোকটিকে সে চেনে। কিন্তু লোকটি তখনো নির্বাক। সে কারণে যায়েদ তার মুখ ফিরালো আমার দিকে এবং বললো,‘ এ হচ্ছে ইবনে সউদের ‘রাজাজিলদের একজন-শয়তান!
বিষণ্ণ আবু সাইয়িদের গায়ের রং ভীষণ কালো;তার মোটা ঠোঁট এবং একটি সিঁথি কেটে সযত্নে দুই পাটে বিভক্ত তার কোঁকড়ানো চুল-তার কোমরবন্ধে গোঁজা ডেগারটি খুব সম্ভব বাদশার দেয়া উপহার, সোনার খাপে ঢাকা, আর তার সওয়ারীটি হচ্ছে একটি চমৎকার মধু-রঙ উষ্ট্রী-উত্তরাঞ্চলের উটের বংশজাত। তার অংগ-প্রত্যংগগুলি চিকন-চাকন বহুল্যবর্জিত-মাথাটি সংকীর্ণ, কাঁধ আর পাছা দুটি শক্তিমস্ত, বলবান।
-‘তোমার কী হয়েছে আবু সাইয়িদ, তুমি তোমার বন্ধুদের সাথে কথা বলছো না কেন? তোমার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে নাকি!’
‘নূরা’.. . ফিস ফিস করে উচ্চারণ করে আবু সাইয়িদ এবং কিছুক্ষণ পর গরম কফি যখন ওর জিভের জড়তা ঘুচিয়ে দেয়, সে আমাদের বলতে শুরু করালো নূরা সম্পর্কেঃ নযদের আর্রাস শহরের একটি বালিকার নূরা (সে মেয়েটির পিতার নামও উল্লেখ করে; আর দেখা গেলো, আমি তাকে খুব ভালো করেই চিনি)। অন্য মেয়েদের সাথে নূরা যখন পানি তুলছিলো, তখন আবু সাইয়িদ তার প্রতি পুশিদা লক্ষ্য করে বাগিচার দেওয়ালের উপর দিয়ে, ‘এবং আমি টের পেলাম, যেনো একটি জ্বলন্ত কয়লা পড়েছে আমার হৃৎপিণ্ডের ভেতর। আমি ওকে ভালোবাসি, কিন্তু ওর বাপ, ওই কুত্তা ওর মেয়েকে কিছুতেই বিয়ে দেবে না আমার কাছে-ভিক্ষুক!-এবং বলে যে, নুরা নাকি আমাকে ভয় করে! আমি ওর দেনমোহর হিসাবে অনেক টাকা অফার করেছিলাম, আমার এক খণ্ড জামিও; কিন্তু সবসময়ই সে আমাকে প্রত্যাখান করে এবং আখেরে, ওকে শাদি দিয়ে দেয় ওর চাচাতো ভাইয়ের সাথে। আল্লাহর লানৎপড়ুক ওর উপর; আর নুরার উপর!’
তার মজবুত, গাঢ় কালো মুখের একদিক আলোকি হয়ে ওঠে ক্যাম্প-ফায়ারের আলোতে এবং তার মুখের উপর যে ছায়া নৃত্য করছে তা যেনো এক যন্ত্রণার জাহান্নামের ছায়া। বেশিক্ষণ বসে থাকা সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে; অস্থিরতায় অধীর হয়ে সে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। মুহুর্তের জন্য সে তার হাত দুটিকে ন্যস্ত রাখে জীনের উপর, আগুনের কাছে আবার ফিরে আসে এবং হঠাৎ ছুটে বের হয়ে পড়ে শূন্য রত্রির অন্ধকারে। আমরা শুনতে পাই, সে আমাদের তাঁবু খাটানোর জায়গার চারপাশে বৃহৎ বৃত্ত করে দৌড়াচ্ছে আর চীৎকার করছে- চীৎকার করছেঃ
-‘নূরার আগুন আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছে! আমার বুকের ভেতর নূরার আগুন জ্বলছে’- এবং আবার সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছেঃ ‘নূরা, নূরা!’
আবার সে আগিয়ে আসে ক্যাম্প-ফায়ারের দিকে এবং তার চারিদিকে বৃত্ত করে দৌড়াতে থাকে আর তার সাথে পত পত করে উড়তে থাকে তার ‘কাফতান’, যেনো চঞ্চল নৃত্যপরা আগুনের আলো এবং অন্ধকারে একটি ভৌতিক নিশাচার পাখি।
ও কি পাগল? আমার তা মনে হলো না। কিন্তু এও হতে পারে যে, ওর অন্তরের গহন অন্ধকার গহ্বর থেকে জেগে উঠে ছে আদিম পূর্বপুরুষের স্মৃতির সংগে সে সম্পর্কিত মানসিক আবেগ-আফ্রিকার অরণ্যের পূর্বপুরুষাগত স্মৃতি-সেই সব মানুষের স্মৃতি, যারা বাস করতো ভূত-প্রেত এবং অতিপ্রাকৃত রহস্যের মধ্যে-তখনো সেই সময়ের খুবই ঘনিষ্ট নৈকট্যে, যখন চৈতন্যের দিব্য স্ফুলিংগ জানোয়ারকে পরিণত করেছিলো মানুষে; আর সেই স্ফুলিংগ এখনো শক্তিশালী নয় যে , তা লাগামছাড়া প্রবৃত্তিগুলিকে এক সংগে বাঁধতে পারে এবং সেগুলিকে রূপান্তরিত করতে পারে একটি উচ্ছতরো ভাবাবেগে.. . মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, আমি যেনো সত্যি আমার সম্মুখে দেখতে পাচিছ আবু সাইয়িদের হৃদপিণ্ডখঅনি, রক্ত আর মাংসের একটি দলা জ্বলছে বাসনার আগুনে,যেনো সত্যিকার আগুন জ্বলছে, আর কেনো যেনো আমার মনে হলো এ তো খুবই স্বাভাবিক যে, এমনি ভয়ংকরভাবেই সে কাঁদবে, কাঁদবে আর দৌড়াবে বৃত্তের পর বৃত্ত তৈরি করে, একে উন্মাদের মতো, যতক্ষণ না পায়ে বেড়ি দেয়া উটগুলি তাদের গা তুলছে আতংকিত হয়ে তিন পায়ের উপর.. .।
তারপর ও ফিরে আসে আমাদের নিকট এবং দপ করে মাটির উপর বসে পড়ে। এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের দৃশ্যে যায়েদের মুখে যে বিরক্তি ফুঠে উঠলো তা আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। কারণ, একজন খাস আরবে শরীফ মেজাজের কাছে অমন লাগাম ছেঁড়া ভাবাবেগের চেয়ে ঘৃণ্য আর কিছুই নেই। কিন্তু যায়েদের মহৎ হৃদয় অল্পক্ষণের মধ্যেই নিজেকে সামলে নেয়। সে আবু সাইয়িদের আস্তিন ধরে সাজোরে টান দেয় এবং আবু সাইয়িধ যখন মাথা তুলে যায়েদের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তকাচ্ছে, যায়েদ তাকে নম্রভাবে টেনে নিয়ে এলো নিজের সান্নিধ্যেঃ
-‘ওহে আবু সাইয়িদ, তুমি এভাবে নিজেকে ভুলে যেতে পারছে কেমন করে? আবু সাইয়িদ, তুমি তো একজন যোদ্ধ.. . তুমি অনেক মানুষকে মেরেছে এবং প্রায়ই তুমি মানুষের হাতে মরতে মরতে বেঁচে গেছো! আর এখন কি না তুমি এক আওরাতের আঘাতে কূপোকাত? দুনিয়াতে নূরা ছাড়াও রয়েছে অন্য আওরাত.. . ওহে আবু সাইয়িদ,যোদ্ধ, নির্বোধ.. .’
আফ্রিকীটি যখন কাৎরাচ্ছে আস্তে আস্তে এবং দুহাত দিয়ে তার মুখ ঢেকে দিচ্ছে তখনো যায়েদ বলে চলেঃ
-‘খামুশ, হে আবু সাইয়িদ.. . মুখ তুলে চাওঃ তুমি আসমানের আলোকিত পথটি দেখতে পাচ্ছো?’
আবু সাইয়িদ সবিস্ময়ে আকাশের দিকে তাকায় আর আমি নিজের অজ্ঞাতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যায়েদের তর্জনী অনুসরণ করি আর আমার চোখ ফিরাই পাণ্ডুর অসমান পথটির দিকে-যা আকাশের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত পর্যন্ত। আপনারা এটিকে বলবেন ছায়াপথ; কিন্তু বদ্দুরা তাদের মরুসূলভ প্রজ্ঞার মাধ্যমে জানে, এ আর কিছু নয়- এ হচ্ছে সেই মেষের পথ যা ইবরাহীমের নিকট পাঠানো হয়েছিলো, যখন তিনি আল্লাহর প্রতি তাঁর আনুগত্যবশে এবং তাঁর অন্তরের নৈরাশ্যে ছুরি তুলে ধরেছিলেন তাঁর প্রথম-জাত পুত্রকে কুরবানী করার জন্য। সেই মেষের পথটিই আকাশে দৃশ্যমান রয়ে গেছে চিরকালের জন্য-রহমত ও করুণার প্রতীক- একমানব হৃদয়ের যন্ত্রণা উপশমের জন্য নিস্কৃতি প্রেরণ করা হয়েছিলো, তারই স্মৃতি হিসাবে, আর এ কারণেই, তা তাদের জন্যও একটি সান্তনা যারা আসবে পরে, ভবিষ্যতেঃ তাদের জন্য, যারা মরুভূমিতে একাকী অথবা দিশাহারা, আর তাদের জন্য যারা পথ চলে নিজ জীবনের মরু প্রান্তরের মধ্য দিয়ে কেঁদে কেঁদে নিঃসংগ পরিত্যাক্ত অবস্থায় টলতে টলতে , হোঁচট খেতে খেতে!
আর, যায়েদ আকাশের দিকেতার হাত তুলে কথা বলতে থাকে গাম্ভীর্যের সংগে কোনো রকম অহংকার না করেই, যেমনটি কেবল একজন আরব-ই পারেঃ
-এটি হচ্ছে সেই মেষের পথ যা আল্লাহ পাঠিয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহীমের নিকট, যখন তিনি কুরবানী করতে যাচ্ছিলেন তাঁর প্রথম সন্তানকে। এভাবেই আ্ল্লা দয়া প্রদর্শন করেছিলেন তাঁর বান্দাকে.. . তুমি কি মনে করো আল্লাহ তোমাকে ভুলে যাচ্ছেন? যায়েদের মর্মস্পর্শী কথায় আবু সাইয়িদের কালো মুখখানা শিশু-সুলভ বিস্ময়ে নমনীয় হয়ে ওঠে এবং তাতে ফুাটে ওঠে অধিকতরো স্থৈর্যের অভিব্যক্তি এবং –ছাত্র যেমন উস্তাদকে অনুসরণ করে তেমনি মনেোগের সাথে সে তাকায় আকাশের দিকে আর চেষ্টা করে সেখানে, তার নৈরাশ্যে একটি ফয়সালা খুঁজে পাওয়া র জন্য.. .।
চার
ইবরাহীম এবং তাঁর বেহেশতী মেষঃ এ জাতীয় চিত্রকল্প অতিসহজেই আসে এদেশের মানুষের মনে। সেই প্রচীন গোষ্ঠীপতির স্মৃতি আমাদের মধ্যে এতো স্পষ্ট ও জীবন্ত যে, তা পাশ্চাত্যের খৃষ্টানের মধ্যে এই স্মৃতি যতোটা জীবন্ত, তার চাইতে অনেক বেশি। খৃষ্টানেরা আর যা-ই হোক, তাদের ধর্মীয় চিত্রকল্পের জন্য প্রথমেই নির্ভর করে তৌরাতের উপর; এমনকি, ইহুদীদের চাইতেও এ স্মৃতি অনেক অনেক বেশি উজ্জ্বল ও জীবন্ত আরবদের কাছে, যদিও তৌরাত হচ্ছে ইহুদীদের দৃষ্টিতে মানুষের প্রতি আল্লাহর প্রথম ও শেষ কথা। হযরত ইবরাহীমের আধ্যাত্মিক উপস্থিথি প্রতিটি মুহূর্তে অনুভূত হয় আরবে, ঠিক যেমনটি হয় গোটা মুসলিম বিশ্বে, কেবল মুসলিম ছেলেদের ঘন ঘন তাঁর নামে (তাঁর আরবী রূপ ইবরাহীম রূপে) নামকরনে নয়, বরং ক্রমাগত ঘুরে আসে আল –কুরআন এবং মুসলমানদের দৈনিক সালাতে; উভয় ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে প্রথম সচেতন প্রচারক হিসাবে গোষ্ঠীপতির ভূমিকার স্মরণেওঃ যার মধ্যে মেলে প্রতি বছর মক্কায় হজ্জ করার উপর ইসলাম কেনো অমন বিপুল গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তার ব্যাখ্যা। যে মক্কার সঙে আদিকাল থেকেই নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে হযরত ইবরাহীমের কাহিনী। পাশ্চাত্যের বহু লোক যেমন ভুল করে মনে করে থাকে-হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক ইহুদী ধর্মের কিসসা-কহিনীর উপাদান ‘ধার’ করার চেষ্টাই যেনো ইবরাহীমকে নিয়ে আসে মুসলিম চিন্তার কক্ষপথে, কারণ ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, ইসলামের অভ্যুদয়ের অনেক আগেই ব্যক্তি হিসাবে হযরত ইবরাহীমের কথা সুপরিজ্ঞাত ছিলো আরবদের কাছে। আল কুরআনে এই গোষ্ঠীপতি সম্পর্খে প্রত্যেকটি উল্রেখ এমন শব্দ বিন্যাসের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ হয়েছে য, মুহাম্মদ (সা)-এর আমলের বহু-বহু যুগ আগেও যে তিনি আরব মনের সম্মুখে জীবন্ত ছিলেন, এতে কোনো সন্দেহ থাকে না। তাঁর নাম এবং তাঁর জীবেনের রূপরেখা সবসময় উল্লিখিত হয় কেনো ভূমিকা বা ব্যাখ্যা ছাড়াই, যা এমন এক ব্যাপার, যার সাতে আল-কুরআনের একেবারে প্রথমদিকের শ্রোতারাও নিশ্চয় পরিচিত ছিলেন। বস্তুত ইসলাম –পূর্বকালেও আরবদের নসবনামায় ইবরাহীমের একটি বিশিষ্ট স্থান দেখা যায় হাজরোর পুত্র ইসমাঈলের মাধ্যমে উত্তর অঞ্চলের আরব-গোষ্ঠীর জনক হিসাবে, য গোষ্ঠীটি আজ গোটা আরব-জাতির অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত।
আর এই গোষ্ঠীরই অন্তর্ভূক্ত ছিলো মুহাম্মদের গোত্র কুরাইশ।তৌরাতে ইসমাঈল এবং তাঁর মায়ের কহিনীর শুরুই কেবল উল্লিখিত হয়েছে। কারণ এ কাহিনীর পরবর্তী পরিণতির সাথে হিব্রু জাতির ভাগ্যের প্রত্যক্ষ কেনো যোগ নেই, আর হিব্রু জাতিরি বক্তব্য রয়েছে এ বিষয়ে।
এই ঐতিহ্য অনুসারে, আজ যেখানে মক্কা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে হাজেরা এবং ইসমাঈলকে রেখে চলে গিয়েছিলেন ইবরাহীম। এ কাহিনী যেভাবে চলে আসছে তা কোনো দিক দিয়েই অসম্ভব নয়, িযদি আমরা মনে করি যে, উট-সওয়ার কোনো যাযাবরের কাছে তিরিশ কিংবা তার বেশি দিনের সফর মোটেও অস্বাভাবিক ছিলো না, এবং অস্বাভাবিক নয়। যা-ই হোক, আরব ঐতিহ্য বলে, ইবরাহীম হাজেরা এবং তাঁদের শিশুকে নিয়ে এসেছিলেন এই উপত্যকাতেই-আরবের সূর্যের নীচে নগ্ন এবং উষার শিলা-গঠিত পাহাড়ের মধ্যকার এই গিরিখাতের মধ্যে, যার উপর দিয়ে বয়ে যায় লেলিহান আগুনের শিখার মতো মরুবায়ু, যে স্থান এড়িয়ে চলে শিকারী পাখিরাও! এমনকি আজো যখন ঘরবাড়ি, রাস্তা এবং বহু ভাষী ও বহু জাতির মানুষের মক্কা উপত্যকার পূর্ণ, তখনো চারপাশে যে নীরব নিথর পার্বত্য ঢাল রয়েছে, তার মদ্যে থেকে মরুভূমির নির্জনতা চীৎকার করতে থাকে, আর কাবার সম্মুখে হজ্বযাত্রী যে বিপুল সংখ্যক নর-নারী সিজদায় লুটিয়ে পড়ে তাদের উপর শূন্যে ভেসে বেড়ায় সুদীর্ঘ অতীতকালের বহু হাজার বচরের অশরিরী উপস্থিতি যাতে নিরবিচ্ছিন্ন িএবং প্রাণলেশহীন নীরবতা ঝুলে আছে শূন্য উপত্যকার উপর।
সেই মিসরীয় রমনী দ্বিতীয় স্ত্রী বিবি হাজেরা নৈরাশ্য ও হাতশার পক্ষে এ ছিলো একিট উপযুক্ত পরিবেশ, যিনি তাঁর স্বামীর প্রথমা ঔরসে জন্ম দিয়েছিলেন িএক পুত্র –সন্তানের, আর একারণে তাঁর স্বামীর প্রথমা স্ত্রীর অতোটা বিদ্বেষের কারণ হয়ে উঠেছিলেন যে, তাঁকে এবং তাঁর পুত্র ইসমাঈলকে দিতে হয়েছিলো নির্বাসন। গোষ্ঠীপতি হযরত ইবরাহীম মনে নিশ্চয় কষ্ট পেয়েছিলেন যখন তাঁর অনমনীয় স্ত্রীর মন পাবার জন্য তাঁকে এ কাজ করতে হয়েছিলো। কিন্তু আমাদ্রে মনে রাখতে হবে, তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রিয় পাত্র যে, তিনি এ নিশ্চিত বিশ্বাস রাখতেন, আল্লাহর রহমতের কোন সীমা নোই। তৌরাতের সৃজন বিষয়ক খণ্ডে আমরা জানতে পাই, আল্লাহ তাঁকে সান্তনা দিয়েছিলেন এভাবেঃ এই শিশু এবং তোমার এই স্ত্রীর এই অবস্থা দেখে তোমার যেনো কষ্ট না হয়.. . তাঁর পুত্র থেকে আমি উত্থান ঘটাবো এক জাতির, কারণ সে তোমার সন্তান। এবং এভাবে, হযরত ইবরাহীম সেই রোরুদ্যমানা রমণী এবং তাঁর পুত্রকে এই উপত্যকায় রেখে চলে গেছেন; ওদের দিয়ে গেলেন একটি মশক এবং খেজুর-ভর্তি একটি চামড়া, আর তিনি নিজে চলে গেলেন উত্তরদিকি মাদাঈন হয়ে কেনান দেশে।
সেই উপত্যকায় ছিলো একটিমাত্র বুনো সরহা গাছ। তারই ছায়ায় শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন হাজেরা। তাঁকে ঘিরে সাঁতরে চলা ঢেউ-খেলানো গরম বালু এবং শিলা-গঠিত ঢিলার ঢালের উপ র চোখ ঝলসানো আলো ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। কী চমৎকার ছিলো সে গাছের ছায়া.. . কিন্তু এই নীরবতা-এক ভয়ঙ্কর নীরবতা, যার মধ্যে শোনা যায় না কোনো জীবিত প্রাণীর নিশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত! দিন বিদায় নিচ্ছে, ধীরে ধীরে হাজেরা ভাবলেন, যদিন কেবল কোনো প্রাণীও আসতো এখানে-একটি পাখি, একটি জন্তু, হ্যাঁ.. . এমন কি, শিকারী পশুঃ ওহো, কী আনন্দেরই না হতো! কিন্তু কিছুই এলো না রাত ছাড়া, রাত এলো মরু –রাত্রির স্বস্তি নিয়ে, যেনো অন্ধকার ও আকাশের এক ছাদ-শীতলতা ছড়িয়ে, যা তার নৈরাশ্যের তিক্ততাকে দেয় হালকা করে। নতুন সাহস সঞ্চারিত কহয় হাজেরার বুকের ভেতর। তিনি তাঁর শিশুপুত্রকে কয়েকটি খেজুর খাওয়ান এবং দুজনই পানি খান মশক থেকে।
রাত শেষ হয় এবং আরেকটি দিন এবং পরে আরেকটি রাত। কিন্তু তিসরা রোজ যখন এলো তার আগুনে নিশ্বাস নিয়ে তখন আর মশকে পানি নেই এক ফোঁটাও এবং সমস্ত শক্তিকে ছাপিয়ে উঠলো হতাশা এবং আশা হয়ে দাঁড়ালো একটা ভাঙা পাত্রের মতো। আর শিশুটি যখন বৃথাই কাঁদতে লাগলো পানির জন্য, ক্রমেই দুর্বলতরো হয়ে আসা কন্ঠে হাজেরা চীৎকার করে উঠলেন আল্লাহর উদ্দেশ্যে। শিশুর কষ্টে উদভ্রান্ত হয়ে দুহাত উর্ধ্বে তুলে দৌড়াতে লাগলেন উপত্যকার ভেতর দিয়ে এদিক ওদিক, আর তাঁর এই হতাশার স্মরনেই মক্কায় এখন যাঁরা হজ্জ্ব করতে আসেন, সাতবার দৌড়ান এ দুটি পাহাড়ের মধ্যে- একদিন হাজের যেমন আর্ত চীৎকার করেছিলেন তেমনি চীৎকার করতে করেত,‘হে দয়াময়, হে করুণাময়, কে আমাদের প্রতি দয়া করতে, যদি না দয়া করো তুমি?’
এবং তখনই এলো জবাবঃ আর দেখো, একটি পানির ফোয়ারা উৎসারিত হয়েছে আর বইতে শুরু করছে বালির উপর দিয়ে! হাজেরা উল্লাসে চীৎকার করে উঠলেন এবং শিশুর মুখ চেপে ধরলেন সেই মহামূল্য তরল পদার্থটিতে, যাতে করে সে পান করতে পারে এবং তিনিও তাঁর সাথে পান করলেন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে, প্রার্থনার ভঙ্গিতে ‘জুম্মি জুম্মি’ বলতে-এমন একটি শব্দ যার কোনো অর্থ নেই, কেবল, জমি ফুঁড়ে উৎসারিত পানির শব্দের অনুকরণে যেনো বলতে চাইছেন-‘উৎসরিত হও, উৎসরিত হও’। পাছে না পানি ফুরিয়ে যায় এবং যমিনের নীচে হারিয়ে যায়, এজন্য হাজরো সে উৎসের চারপাশে বালি জমিয়ে জমিয়ে একটি ছোট্ট দেয়াল তৈরি করেন, যার ফলে পানির প্রবাহ তেমে গেলো এবং হয়ে উঠলো কুয়া। তখন থেকেই তা পরিচিতি হয়ে আসছে জমজম কূপ নামে এবং আজে টিকে আছে।
ওরা দুজন এখন তৃষ্ণার কবল থেকে রক্ষা পেয়েছেন এবং খেজুরের চললো আরো বেশ কিছুদিন। কয়েকদিন পর একদল বদ্দু যারা তাদের পরিবার পরিজন আর পশুপালনসহ দক্ষিণ আরতে তাদের স্বদেশ ত্যাগ করে এসেছে এবং খুঁজছে নতুন চারণ ক্ষেত্র, ঘটনাক্রমে যাচ্ছিলো এই উপত্যকার প্রবেশ পথ হয়ে। ওরা যখন দেখলো, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি চক্রাকারে ঘুরছে এর উপর ওরা সিদ্ধান্তে এরো, এখানে নিশ্চয় পানি আছে। ওদেরই কোনো কোনো লোক উট হাঁকিয়ে ছুটলো উপত্যকার ভেতরে, দেখবার জন্য ওখানে কী আছে এবং দেকতে পেলো এক শিশু নিয়ে একাকী এক রমণী বসে আছে কানায় কানায় পানিতে ভর্তি এক কুয়ার কিনারে। লোকগুলি ছিলো স্বভাবের দিক দিয়ে শান্ত। তাই ওরা অনুমতি চায় হাজেরার কাছে তাঁর উপত্যকায় বসতি স্থাপনের জন্য হাজেরা তা মনযুর করেন একটি শর্তেঃ জমজম কুয়াটি ইসমাঈল এবং তাঁর বংশধরদের সম্পদ হয়ে থাকবে চিরকাল।
আর ইবরাহীমের বেলায়-ইতিবৃত্ত বলে-কিছুকাল পরে তিনি ফিরে আসেন সে উপত্যকায় এবং আল্লাহর ওয়াদা মতো তিনি এসে জীবিত পান হাজেরা এবং তাঁর পুত্রকে। তখনে থেকে তিনি প্রায়ই আসতে থাকেন ওঁদের নিকট এবং তাঁর চোখের সামনেই ইসমাঈল হয়ে উঠলেন যৌবনে উপনীত এক পুরুষ এবং বিয়ে করেন দক্ষিণ আরবীয় কওমের এক বালিকাকে। কয়েক বছর পর গোষ্ঠীপতি ইবরাহীম স্বপ্নে নির্দেশ পান তাঁর প্রভুর উদ্দেশ্যে জমজম কুয়ার কাছে একটি ‘ইবাদতগাহ’ নির্মানের। এরপর তিনি তাঁর পুত্রের সাহায্যে নিয়ে নির্মাণ করেন মক্কায় যে ‘ইবাদত গৃহটি’ আজো বিদ্যমান এবং কা’বা নামে পরিচিত, তারই প্রথম মডেল বা নমুনাটি। এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত সর্বপ্রথম গৃহ বলে যা গণ্য হবে ভবিষ্যতে, সেই ঘর তৈরির জন্য ওঁরা যখন পাথর কাটছেন, তখন ইবরাহীম তাঁর মুখ আকাশের দিকে তোলেন এবং আবেগ-বিহবল কণ্ঠে বলে উঠেনঃ ‘লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক।’ “তোমার জন্য আমি প্রস্তুত হে আল্লাহ তোমার জন্য আমি তৈরি। আর এজন্যই মুসলমানর মক্কায় এক আল্লাহর জন্য স্থগিত প্রথম ইবাদতগৃহে হজ্ব করতে গিয়ে যখন পবিত্র নগরীর নিকটবর্তী হয়, তখন ওরা তোলে একই ধ্বনি,‘লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক।’
পাঁচ
‘লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক।…
আমি মক্কায় আমার পাঁচবার হজ্জ্বে কতোবার শুনেছি এই ধ্বনি। মনে হলো এখনো আমি তা শুনতে পাচ্ছি যখন শুয়ে আছি আগুনের পাশে, যায়েদ এবং আবু সাইয়িদের কাছে।
আমি আমার চোখ বুঁজি এবং চাঁদ ও সিতারা অন্তর্হিত হয় আমার সমুখ থেকে। আমি আমার মুখের উপর রাখি আমার বাহু এবং আগুনের আলোও এখন আর ভেদ করতে পারে না আমার চোখের পাতা। মরুভূমির সকল শব্দ ও ধ্বনি তলিয়ে গেলো। আমি আর কিছুই শুনতে পাই না আমার মনে ‘লাব্বায়েক’ ধ্বনি এবং কানে রক্তের অস্ফুট গুঞ্জন ও স্পন্দন ছাড়া। রক্ত অস্ফুট ধ্বনি তুলছে, ধুক ধুক করছে, আছড়ে পড়ছে জাহাজের খোলে আছড়ে-পড়া সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, আর ইঞ্জিনের ধড়ফড়ানির মতো। আমি শুনতে পাই ইঞ্জিনের ধড়ফড়ানি, অনুভব করি আমার নিচে জাহাজের তক্তার কাঁপুনি এবং নাকে পাই জাহাজের ধুঁয়া ও তেলের গন্ধ এবং শুনি সেই ধ্বনি ‘লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক।’ যেমন তা ধ্বনিত হয়েছিলো শত শত কণ্ঠে, সেই জাহাজে যা আমাকে বহন করে এনেছিলো ছবছর আগে আমার পয়লা হ্জ্ব-যাত্রায়, মিসর থেকে আরবে একটি সাগরের উপর, যার নাম লোহিত সাগর এবং কেউই জানে না, কেনো এ নাম হয়েছে এ সাগরের। কারণ আমরা জাহাজে করে চলছিলাম সুয়েজ খারের মধ্য দিয়ে, যার ডান পাশে পড়ে আফ্রিকার কয়েকটি পাহাড় আর বাঁদিকে রয়েছে সিনাই উপত্যকার গিরিশ্রেণী, দুই নগ্ন, অনাবৃত, শিলা-পঠিত পাহাড়, যাতে নেই কোনো গাছপালা। জাহাজের অগ্রগতির সাথে সাথে যা আগিয়ে চলেছে দূর হতে আরো দূরে, এবং দৃষ্টির প্রায় বাইরে, এমন আর এক কুয়াশা-ধূসর দূরত্বে গিয়ে আমরা পৌছুই যেখান থেকে ভূভাগ কেবল অনুভব করা যায়, ইন্দ্রিয় দিয়ে দেখা যায় না। সুয়েজ খারের বুকে এই সমস্ত পথটি জুড়ে আমরা যে পানি দেখতে পাই, তা লাল নয়, ধূসর এবং তারপর শেষ বিকালে আমরা যখন ঢুকে পড়ি খোলামেলা প্রসস্ত লোহিত সাগরে, দেখা গেলো, আদর করা বাতাসের মৃদু পরশের নীচে ভূমধ্যসাগরের মতোই লোহিত সাগরও নীল।
জাহাজে কেবল হজ্ব-যাত্রীরাই রয়েছে এবং তারা সংখ্যায় এতো বেশি যে, এতোগুলি লোককে বহন করার ক্ষমতা জাহাজের নেই বললেই চলে। সংক্ষিপ্ত হজ্ব মৌসুমের মুনাফার জন্য পাগল লোভী জাহাজ-কোম্পানীই যাত্রীদের আরাম –আয়াশের দিকে লক্ষ্য না রেখে, আক্ষরিক অর্থেই জাহাজটিকে বোঝাই করছে কানায় কানায়। ডেকের উপর কেবনিগুলিতে প্যাসেজে, প্রত্যেক সিড়িতে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেনীর ডাইনিং রুমগুলিতে, যাত্রী বহনের জন্যই জাহাজের যে খোলগুলি খঅলি করে মই লাগানো হয়েছে, সেগুলিতেঃ প্রত্যেকটি খালি জায়গা ও কোনে মানুষেকে একত্র গাগাগাদি করে ঠাসা হয়েছে খুবই যন্ত্রণাদয়কভাবে। ওদের প্রায় সকলেই মিসর এবং উত্তর আফ্রিকার হ্জ্বযাত্রী। পরম নম্রতার সাথে, কেবলমাত্র এই সফরের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ওরা কোনো প্রতিবাদ ও অভেোগ না করে সহ্য করে যাচ্ছে এহেন অনাবশ্যক কষ্ট। কিভাবে ওরা-নারী, পুরুষ, শিশু-গাদাগাদি ঠাসাঠাসি একেকটা দল হিসাবে ডেকের পাটাতনের উপর পশুর মতো শুয়ে আছে এবং অতি কষ্টের সাথে তাদের গেরস্থালীর বাসনপত্র ঘষামাজা করে পরিষ্কার করছে; রাঁধছে (কারণ, কোম্পানী কোনো খাবার সরবরাহ করছে না) কেমন করে সবসময় ঠেলাঠেলি করে ওরা পানির জন্য এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে টিনের মগ বা ক্যানভাস মোড়া পানির পাত্র নিয়ে, প্রতি মূহুর্তেই একটি যন্ত্রণা মানুষের এই চাপাচাপির মধ্যে; কেমন করে ওরা দিনে পাঁচবার জমায়েত হয় পানির কলের চারপাশে-কেননা অতোগুলি মানুষের জন্য অতি অল্প কটি ট্যাগই রয়েছে সালাতের আগে ওযু করার জন্য। কেমন করে ওরা যাতনা ভোগ করছে জাহাজের গভীর খোলের দম বন্ধ করা বাতাসে, ডেকের দুই তলা নীচের খোলগুলিতে যেখানে অন্য সময়ে< কেবল গাঁট এবং জিনিসপত্রের কেসই ভ্রমণ করে-যে কেউ তা দেখলে সে-ই উপলব্ধি করবে ঈমানের জোর, বিশ্বাসের শক্তি, যে শক্তিতে এর-হজ্বযাত্রীরা শক্তিমান;কারণ মক্কার চিন্তায় ওরা এমনি মশগুল, এমনি নিমগ্ন যে, ওদের এই কষ্ট ওরা আসলে অনুভব করছে বরেই মনে হয় না। ওদের মুখে কেবল হজ্বেরই কথা এবং যে আবেগ নিয়ে ওরা ওদের আসন্ন ভবিষ্যতের দিকে তাকাচ্ছে, তাতে দীপ্ত-উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ওদের মন। মেয়েলোকেরা প্রায়ই কোরাসে গাইছে পবিত্র নগরীর গান আর বারবার ঘুরে-ফিরে উঠছে একটি ধ্বনি-‘লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক।’
দ্বিতীয় দিনের প্রায় দুপুরের দিকে জাহাজের সিটি বেজে ওঠেঃ এ তারই সংকেত যে আমরা রাবিগের অক্ষাংশে পৌঁছে গেছি। রাবিগ জেদ্দার উত্তরের একটি ছোট্ট বন্দর, যেখানে প্রাচীন এক ঐতিহ্যে মুতাবিক, উত্তর অঞ্চল থেকে আগত পুরুষ হজ্বযাত্রীদের খুলে ফেলতে হয় তাদের দৈনন্দিন পোশাক-আশাক এবং পরতে হয় ইহরাম তথা হ্জ্বযাত্রীদের পোশাক। এ পোশাকের মধ্যে আছে সেলােই না করা দুই টুকরা সাদা পশমী অথবা সুতী কাপড়, যার এক খণ্ড পেঁচানো হয় কোমরে এবং পৌছে হাঁটুর নীচে পর্যন্ত এবং অন্য খণ্ডটি আলগাভাবে ঝুলানো হয় একটি কাঁধের উপর আর মাথা থাকে খোলা, অনাবৃত। এই যে পোশাক, যার মূলে রয়েছে রসূলের অতীতের একটি আদশ, এর যুক্তি এই যে, হজ্বের সময় আল্লাহর ঘর যিয়ারতের জন্য পৃথিবীর সব জায়গা থেকে যে মুমিনেরা এসে ভীড় করে, তারা একে অপরের অপরিচিত, এ অনুভূতি যেনো তাদের মধ্যে না থাকে- জাত ও জাতির মধ্যে অথবা ধনী কিংবা উঁচু-নিচুর মধ্যে কোনো ব্যবধানা যেনো না থাকে, যেনো ওরা সকলেই জানতে পারে-ওরা ভাই ভাই, আল্লাহ এবং মানুষের কাছে সমান। আর দেখতে না দেখতে আমাদের জাহাজ থেকে কোথায় গায়েব হয়ে গেলো পুরুষদের সকল রং-বেরংয়ের বার্ণাঢ্য পোশাক! এখন আর আপনি দেখতে পাবেন না তিউনিসের লাল ‘তারবুস’, মরক্কেবাসীদের জমকালো দামী বার্নাস অথবা মিসরীয় ‘লোহিনের’ রুচি-বিবর্জিত গল্পাবিয়াঃ এখন আপনার চারপাশে সর্বত্র রয়েছে হজ্বযাত্রীদের গায়ের উপর, যারা এখন নড়াচড়া করছে মহত্তর মর্যাদার সংগে হজ্বের উদ্দেশ্যে এই পরিবর্তনের স্পষ্টতই প্রভাবিত হয়ে। ইহরাম যেহেতু রমণীদের শরীরের অনেকখানি ব্যক্ত করে দেবে এজন্য মহিলা হজ্বযাত্রীরা ওদের স্বাভাবিক পোশাক-আশাকই পারেন। কিন্তু আমাদের জাহাজে যেমন দেখতে পেলাম-ওদের পোশাক হয়, কেবলি কালো না হয় কেবলি সাদা-মিসরীয় রমণীদের গায়ে কালো গাউন আর উত্তর আফ্রিকার স্ত্রীলোকদের পরণে সাদা-ওদের এই পোশাক বিন্দুমাত্র রঙের পরশু বুলায় না সামগ্রিম চিত্রের মধ্যে।
তৃতীয় দিনের ভোরবেলা জাহাজ নোঙর ফেলে আরবের উপকূলকে সামনে রেখে আমরা প্রায় সকলেই দাঁড়িয়ে আছি রেলিংয়ে এবং তাকাচ্ছি স্থলভাগের দিকে, যা ভোরের কুয়াশার মধ্য থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।
সকল দিকেই দেখতে পাচ্ছি অন্যান্য হজ্বযাত্রী জাহাজের ছায়া-শরীর এবং সেই সব জাহাজ ও স্থলভাগের মধ্যে পানিতে বিবর্ণ হলুদ ও পান্না সবুজের রেখাঃ পানির নিচে প্রবল প্রাচীর, লোহিত সাগরের পূর্ব উপকূলের সমুখে যে দীর্ঘ প্রতিকূল প্রাচীরমালা রয়েছে তারই অংশ। ওগুল ছড়িয়ে পুবদিকে দেখা যাচেছ পাহাড়ের মতোই একটা-কিছু নিচু এবং আলো আঁধারীতে ঢাকা; কিন্তু ওর পিছনদিকে আকস্মাৎ যখন সূর্য উঠলো এ আর পাহাড় রইলো না; হয়ে উঠলো সমুদ্র-তীরের একটি শহর, যা সমুদ্রের কিনার থেকে ধাপে ধাপে উঠে গেছে উপরদিকে, শহররের মধ্যভাগ পর্যন্ত ক্রমেই উচু হতে আরে উঁচু হয়ে ওঠা ঘরবাড়ি নিয়ে- একটি ছোট্ট নাজুক ইমারত যে- যা গোলাপী এবং হলদে –ধূসর প্রবাল পাথর দিয়ে তৈরিঃ জিদ্দা বন্দর। ক্রমে আমর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কোণ-তোলা ঝালর-দেয়া খিড়কি-জানালা এবং বেলকনির আড়াল আড়াল, বহু-বছরের আর্দ্র আবহাওয়া যাকে দিয়েছে একই রকম এক ধূসর রঙ। মধ্যস্থালে একটি মীনর উঠেছে আকাশ ফুঁড়ে, সাদা এবং উর্ধ্বে তোলা একটি আঙুরের মতোই, ঋজু, সরল।
আবার ধ্বনি উঠলো লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক-আত্মসমর্পণ এবং উদ্দীপনার এক হর্ষোৎফুল্ল ধ্বনি, যা জাহাজের সাদা পোশাক পরা উত্তেজিত হজ্ব-যাত্রীদের মদ্যে থেকে উঠে পানির উপর দিয়ে ধাবিত হয় তাদের পরম আশা ও স্বপ্নের দেশের দিকে!
ওদের আশা এবং আমরাওঃ কারণ আমার কাছে আরব উপকূলের এই দৃশ্য আমার বহু বছরের অনুসন্ধানের চূড়ান্ত পরিণতি। আমি আমার স্ত্রী এলসার দিকে তাকাই যে ছিলো আমার এ হজ্ব যাত্রায় আমার সহযাত্রী এবং তার চোখ্রে পাঠ করি একই অনুভূতি.. .
আর তারপর, আমরা দেখতে পাই এক ঝাঁক শুভ্র ডান তীরে বেগে আমাদের দিকে চুটে আসছে মূল স্থলভাগ থেকেঃ আরবের উপকূলীয় কিশতী লাতিন পালি উচিয়ে চিৎ হয়ে পড়ে থাকা সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে আসছে নৌকাগুলি, মোলায়েম ছন্দে নিঃশব্দে, যেনো দুই অদৃশ্য প্রবাল প্রচীরের মধ্যকার ফাঁক দিয়ে ঘুরে এঁকে বেঁকে, আমাদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য তৈরি আরবের পাঠানো প্রথম দূতেরা। নৌকাগুলি ধীরে ধীরে ক্রমেই কাছে ঘেঁষে আসে এবং শেষ পর্যন্ত সব কটিই ভিড় করে এক সংগে, জাহাজের পাশে মাস্তুল হেলিয়ে দুলিয়ে আর ওদের পালগুলি গুটানো হাতে লাগলো একটি পর একিট করে , অতিশয় ব্যস্ততার সংগে সুইশ সুইশ শব্দ করে আর পালে পৎ পৎ আওয়াজ তুরে-যেনো এক ঝাঁক বিশাল সারস পাখি নেমে পড়েছে খাবারের সন্ধানে। এবং মুহুর্তকাল আগের নীরবতা থেকে ওদের মধ্যে জাগরো এক কর্কশ আওয়াজ আর চিৎকারঃ এ হচ্ছে নৌকার মাঝিদের চিৎকার যারা এখন লাফিয়ে এক নৌকা থেকে আরেক নৌকায় উঠতে শুরু করছে এবং হামলা চলিয়েছে জাহাজের সিড়ির উপর হজ্বযাত্রীদের গাট্টি বোচক, বাক্স-পেটেরা ধরবার জন্য। আর পবিত্র ভূমির দৃশ্যে হজ্বযাত্রীরা উত্তেজনায় এতোই অভিভূত যে, ওরা নিজেদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে ওদের উপর যা ঘটেছে তাই ওরা মেনে নিচ্ছে!
নৌকাগুলি ভারী এবং প্রশস্ত, ওদের খোলের পারিপাট্যবিহীন এবড়ো-থেবড়ো গড়ন, ওদের উটু মাস্তুল আর পালের সৌন্দর্য ও ছিমছাম রূপের সাথে বিস্ময়করভাবে বেমানান। নিশ্চয় এ ধরনের একটি নৌকায় চড়েই, হয়তো বা এ জাতেরই একটি আরো কিচু বড়ো এক নৌযানে চড়ে সেই দুঃসাহসী সমুদ্রজয়ী সিন্দাবাদ বের হয়ে পড়েছিলো, যে-এডভেঞ্চারের জন্য কেউ তাকে অনুরোধ করেনি এমনি সব এডভেঞ্চারের উদ্দেশ্যে এবং নেমে পড়েছিলো এক দ্বীপে যা ছিলো আসলে.. . ওহো কী ভয়ংকর এক তিমি মাছের পিঠ.. . আর এ ধরনের জাহাজে করেই সিন্দাবাদের অনেক অনেক ফিনিশীয়রা এই লোহিত সাগরের মধ্যে দিয়ে পাল তুলে রওানা দিতো দক্ষিণদিকে আর আরব সাগর পাড়ি দিয়ে চলতো তাদের সফর.. গরম মসলা, আগর, ধূপধুনা এবং ওফিরের রত্নভাণ্ডারের সন্ধানে.. .।
আর এখন আমরা, সেই সব দুঃসাহসী বীর সমুদ্র-যাত্রীদের ক্ষীণ বামন উত্তরাধিকারীরা, নৌকায় করে চলেছি প্রবাল সাগরের মধ্যে দিয়ে, পানির নীচে নিমজ্জিত প্রবাল প্রাচীর এড়িয়ে, প্রশস্ত বক্র রেখায়ঃ হজ্বযাত্রী সব , গায়ে সাদা কাপড়, কেস, বাক্স, ট্রাংক আর বাণ্ডিলের ফাঁকে ফাঁকে ঠাসাঠাসি গাদাগাদি বোবা এক দংগল মানুষ.. . প্রত্যাশায় বুক আমাদের কাঁপছে, আমরা শিহরিত হচ্ছি!
প্রত্যাশঅয় ভরপুর ছিলাম আমিও। কিন্তু নৌকার গলুই-এ আমার হাতে আমার স্ত্রীর হাত নিয়ে যখন বসে আছি, কী করে আমার পক্ষে আগাম প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হতো যে, হজ্ব যাত্রার এ সজ সামান্য একটি প্রয়াস আমাদের জীবনকে বদলে দেবে এতো গভীরভাবে, অমন সম্পূর্ণভাবে? আবার, আমি ভাবতে বাধ্য হই সিন্দাবাদের কখা। সে যখন তার দেশের উপকূল ছেড়ে গিয়ে পড়েছিলো সমুদ্দুরে, আমার মতোই তারও কোনে ধারণাই ছিলো না ভবিষ্যৎ কী বহন করে আনতে যাচ্চে তার জন্য; পরে যেসব বিচিত্র এ্যাডভেঞ্চার তার জীবনে ঘটেছিলো সে তা আগাম দেখেনি, দেখার ইচ্ছাও তার ছিলো না; সে চেয়েছিলো কেবল সওদাগরি করতে আর টাকা কামাই করতে। আমি হজ্ব করা ছাড়া আর কিছুই চাইনি; কিন্তু তার এবং আমার জীবনে যেসব ব্যাপার ঘটবার ছিলো, প্রকৃতই যখন সেগুলি ঘটে গেলো, তখন আর আমাদের দুজনের কারো পক্ষেই পুরানো চোখ দিয়ে তাকানে সম্ভব হলো না আমাদের পৃথিবীর দিকে।
একথা ঠিক, বসবার সে নাবিককে যে জীন, যাদুগ্রস্থ স্ত্রীলোক বা বিশাল রক পাখির মুকাবিলা করতে হয়েছিলো, তেমন উদ্ভদ কল্পনা প্রসূত কিছুই আমার জীবনে ঘটেনিঃ কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার সে প্রথম হজ্ব আমর জীবনের গভীরে যে প্রভাব বিস্তার করেছিলো, ঐ নাবিকেরা সকল সমুদ্র যাত্রা মিলেও ওর জীবনে সে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এলসার জন্য মৃত্যু অপেক্ষা করছে সম্মুখে এবং তা কতো আসন্ন, আমাদের দুজনের কেউ তো তার কোনো পূর্ব আলামত পাইনি। তার আর আমার নিজের বেলায় আমি বুঝতে, আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমিই পশ্চিমা জগত ছেড়ে এসেছি মুসলমানদের মধ্যে থাকার জন্য; কিন্তু আমি জানতাম না যে, আমি আমার গোটা অতীতটাকেই পেছনে ফেলে যচ্ছি। কোনো রকম হুশিয়ারী না জানিয়েই আমার পুরানো পৃথিবী ফুরিয়ে আসছিলো আমার জন্যঃ পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণাও অনুভূতি, প্রয়াস –প্রচেষ্টা ও মানুসিক চিত্রকল্পের সেই পৃথিবী! আমার পেছনে একটি দরোজা বন্ধ হয়ে আসছিলো আস্তে আস্তে, এতো নীরবে, এতো চুপিচুপি যে, আমি এ বিষয়ে সচেতন পর্যন্ত ছিলাম নাঃ কিন্তু দিন সম্পূর্ণ বদলে যাবে আর তার সংগে সকল কামন-বাসনার লক্ষ্যও-এ ই ছিলো নিয়তি!
তখন পর্যন্ত, আমর প্রাচ্যের বহু দেখ দেখা হয়ে গেছে। ইউরোপের যে-কোনো দেখ থেকে ইরান এবং মিসরকে অনেক বেশি ভালো করে আমি জানি। বহুদিন হলো কাবুল আর অপরিচিত নয় আমার কাছে; দামেশক ও ইসফাহানের বাজারগুলি আমার জানা-শোনা। তাই আমি , ‘ততো তুচ্ছ আর মামুলি’ এসব এ কথা মনে করে পারিনি যখন আমি জিদ্দার একটি বাজারের মদ্যে দিয়ে হাঁটঠি এই প্রথমবার, আর প্রত্যক্ষ করছি প্রাচ্যের অন্যত্র যা অনেক বেশি পূর্ণরূপে দেখতে পাওয়া যায়, তারই একটি জগাখিচুড়ি এবং নিরবয়ব পুনরাবৃত্তি!
বাজারটি ঢেকে দেওয়া হয়েছে কাঠের তক্তা এবং ছালার চট দিয়ে, প্রচণ্ড রোদকে আড়াল করার জন্য; তারি ছেদা এবং ফাটা দিয়ে বশে আনা সূর্যরশ্মি আলো দিচ্ছে আর ছায়ান্ধকারকে মণ্ডিত করছে একটা সোনালী আভায়। এখানে ওখানে খোলা জায়গায় রয়েছে রান্না করার চুলা, যার সামনে নিগ্রো বালকেরা গোশতের ছোটো ছোটো টুকরা সেঁকছে গনগনে কয়লার উপরে, শিকে বিদ্ধ করে। আর রয়েছে কফির দোকান, বার্নিশ করা পিতলের বাসন এবং পামপাতার তৈরি আসন সমেতঃ চোখে পড়ছে ইউরোপীয় এবং প্রাচ্য রবিশে ভর্তি দোকানপাঠ! সর্বত্রই গুমোট, অসহ্য গরম, মাছের গন্ধ আর প্রবাল চূর্ণ। সব জায়গায় মানুষের ভিড়, সাদা পোশাক পরা অসংখ্য হজ্বযাত্রী আর জিদ্দার বার্ণঢ্য সংসারধর্মী নাগরিকেরা, যাদের চেহারায় পোশাকে এবং চাল-চলনে মিলন ঘটেছে মুসলিম জাহানের সকল দেশেরঃ হয়তো পিতা একজন হিন্দুস্থানী যখন তার নাম- তিনি নিজে হয়তো মালয় ও আরবোর মিশ্রণ-বিয়ে করেছেন এক নারীকে যিনি তাঁর পিতার দিক থেকে উজবেকের বংশধর আর মায়ের দিক থেকে সম্ভবত সোমালী খান্দানেরঃ এ হচ্ছে জীবন্ত সাক্ষ্য বহু শতাব্দীর হজ্বযাত্রা ও ইসলামী পরিবেশের, যাতে রঙের ভেদ বা জাতে জাতে বৈষশ্যের কোনো অবকাশ নেই। স্থানীয় এবং হজ্বযাত্রীদের দ্বারা আনীত রক্তের মিশ্রণ ছাড়াও সে সময়ে (১৯২৭) হিজাযে জিদ্দায় ছিলো একমাত্র স্থন, যেখানে অমুসলমানদের বাস করতে দেওয়া হতো। মাঝে মাঝে দেখা যায় ইউরোপীয় ভাষায় লেখা দোকানের সাইনবোর্ড, আর সাদা ট্রাপিক্যাল পোশাক, রোদ-ঠেকানো হেলমেট বা হ্যাট মাথায় লোকজন, কনস্যুলেটরগুলি উপরে পত পত করছে বিদেশী পতাকা।
এ সবই যেনো এখনো স্থলভাগের সাথে ততোটুকু সম্পর্কিত নয় যতোটুকু সমুদ্দুরের সাথেঃ বন্দরের শব্দ ও গন্ধের সংগে, ক্ষীণ-বংকিম প্রবলারেখা ছাড়িয়ে নোঙর ফেলা জাহাজের আর শামপা ত্রিকোণ পালওয়ালা জেলে নৌকার সংগে এমন একটা জগত যা ভূমধ্যসাগর থেকে খুব বেশি আলাদা নয়। যদিও কিছূ আলাদা মনে হচ্ছে এরি মধ্যে, বাড়িগুলি, মৃদুমন্দ বাতাসের উন্মকউত, যার সম্মুখভাগ জমকালো সুগঠিত, কাজ-করা কাঠ দিয়ে তৈরি জানালার ফ্রেম আর বেলকনিগুলি অতি পাতলা ও চিকন কাঠের শলার স্ক্রীন দিয়ে ঢাকা-যে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে খোলা জায়গার সবকিছু অবাধে দেখতে পারে ঘরের লোকেরা, অথচ পথচারী দেখতে পায় না ভেতরে কী রয়েছে। এ সব কাঠে র কাজ গোলাপী প্রবাল পাথরের দেয়ালের উর ধূসর সবুজ ফিতার মতো বসানো, নাজুক এবং অতি সামঞ্জস্যময়। এ আর ভূমধ্যসাগর নয় এবং সম্পূর্ণরূপে আরবও নয়; এ হচ্ছে লোহিত সাগরের উপকূলীয় জগত, যার উভয় তীরে দেখা যায় এ ধরনের স্থপত্য রীতি।
অবিশ্যি, এরি মধ্যে আরব তার নিজস্বতা ঘোষণা করলো ইস্পাতের মতো আকাশে, নগ্ন শিলা গঠিত পাহাড়ে এবং পুবদিকে বালিয়াড়িগুলিতে এবং মহত্তের সেই নিশ্বাসে ও সেই নগ্ন বিরলতায়, যা হামেশঅই অমন বিস্ময়করভাবে পরস্পর জড়াজড়ি করে আছে আরবের ভূ-দৃশ্যে।
পরদিন বিকালে আমাদের কাফেলা তার যাত্রা শুরু করে মক্কার পথে, এঁকে বেঁকে-হজ্বযাত্রী বেদুঈন, হাওদা পিঠে অথবা হাওদা ছাড়া উট, সওয়ারী উট, জমকালো রঙিন-কাপড় দিয়ে পিঠে ঢেকে দেয়া গাধা, এ সবের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে শহরের পুব প্রবেশ পথের দিকে। প্রায়ই মোটর গাড়ি ছুটে যাচ্ছে আমাদের পাশ দিয়ে-সৌদি আরবে একেবারে প্রথমিদিকের মোটর গাড়ি-বোঝাই বোঝাই হজ্বযাত্রী নিয়ে-হর্ণ বাজাতে বাজাতে। মনে হলে, উটগুলি বুঝতে পারছে এই নতুন দানবগুলি ওদের দুশমন। কারণ যখনি কোনো মোটরগাড়ি ওদের কাছে আসে ওরা সংকুচিত হয়ে পড়ে, প্রাণপ ণে বাড়ির প্রাচীরের দিকে ছুটে যায়, ওদের লম্বা গলা এদিক-ওদিক নাড়তে নাড়তে-হতভম্ব, অসহায় প্রাণী। ভীতিপ্রদভাবে, এক নতুন সময়ের উন্মেষ হচ্ছে এই দীর্ঘদেহী ধৈর্যশীল জানোয়ারগুলির জন্য এবং ভয় আর চরম অবলুপ্তির আলামতো ওদের ভয়ার্ত করে তুলছে। কিছুক্ষণ পরেই আমরা নগরীর সাদা প্রাচীর পেছনে ফেলে যাই এবং হঠাৎ আমরা নিজেদের দেখতে পাই একটি মরুভুমিতে-একটি প্রশস্ত প্রান্তরে, ধূসর-বাদামী, নির্জন-এখানে ওখানে কাটাবন ও স্তেপ ঘাসের ঘাসের গুচ্ছ, আর সেই প্রান্তর ভেদ করে নীচু বিচ্ছিন্ন কতকগুলি পাহাড় উঠেছে সমুদ্দুরে দ্বীপপুঞ্জের মতো, যার পুবদিকে প্রাচীর হেন দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা উচু শিলা-গঠিত সব পাহাড়, নীল ধূসর, দেখতে এবড়ো-থেবড়ো, প্রানের চিহ্ণ-বর্জিত। সেই ভয়াবহা প্রান্তরের সর্বত্র আনাগোনা করছে কাফেলে, অনেকগুলি দীর্ঘ মিছিল করে-শত শত, হাজার হাজার উট, জানোয়ার পেছনে, একই সারিতে, হাওদা, হ্জ্বযাত্রী এবং গাট্টি-বোচকাতে বোঝাই-কখনো হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ে আড়ালের আবার ফের আভাসে উঠছে চোখের সামনে। ক্রমশ সকল পথ গিয়ে মিলিত হয় একটিমাত্র ধূলি-ধূসর পথে, একই ধরনের কাফেলার দীর্ঘ শত শত বছরের পদচিহ্ণ দ্বারা তৈরি যে পথ।
মরুভূমির সেই নীরবাত, উটের পায়ের ঝপ ঝপ শব্দ, মাঝে মাঝে বেদুঈন উট চালকদের ডাক-হাঁক এবং এখানে ওখানে, কোনো হ্জ্বযাত্রীর নিচু গলার গানে যে নীরতা ভাঙে না বরং আরো গাঢ় হয়ে ওঠে, আমি হঠাৎ তারই বিরাট এক লোহমর্ষক অনুভূতিতে অভিভূত হয়ে পড়ি-সে সর্বপ্লাবী সেই অনুভূতি আমাকে এতোই বিহ্বল করে দিলো যে বলা যেতে পারে এ যেনো এক দিব্যসৃষ্টিঃ আমি নিজেকে দেখতে পেলাম এক অদৃশ্য অতল গহ্বরের উপর ঝুলন্ত এক সেতুর উপরঃ যে সেতু এতোই দীর্ঘ যে, আমি যে প্রান্ত থেকে এসেছি এরি মধ্যে তা হারিয়ে গেছে সুদূর অস্পষ্ট দূরত্বে, অথচ তার অন্য প্রান্তের আভাসও আমার চোখে ভেসে ওঠেনি এখনো। আমি দাঁড়িয়ে আছি মাঝখানেঃ আর আমার হৃদপিণ্ড আতংকে কুঁকড়ে গেলো যখন আমি এভাবে নিজেকে দেখতে পেলাম একটি সেতুর দুই প্রান্তের মাঝখানে-ইতমিধ্যেই এক প্রান্ত থেকে অনেক-অনেক দূরে এবং এখনো অন্য প্রান্তের খুব কাছে নই-আর দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মনে হলো, আমাকে এভাবে সবসময়ই থাকতে হবে দুই প্রান্তের মাঝখানে, হামেশাই গর্জনশীল অতল গহ্বরের উপর.. .
-যখন আমার সামনের উঢের উপর এক মিসরীয় রমণী হঠাৎ তোলে হজ্বযাত্রীদের সেই সুপ্রাচীন ধ্বনি ‘লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’- আর ভেঙে খান খান হয়ে যায় আার স্বপ্ন!
সবদিক থেকে আমি শুনতে পাচ্ছি মানুষেরা কোরসে ধ্বনি তুলছে ‘লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’-অথবা একজন মিসরীয় ‘কিষাণ’ রমণী গান গাইছে রসূলুল্লাহর সম্মানে, যার পর অপর একজন রমণীর উণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে একটি ‘গাত্রাফা’, আরব রমণীদের সেই হর্ষোৎফুল ধ্বনি, যা রমণীরা তুলে থাকে সকল উৎসবের সময়ে-যেমন বিয়ে-শাদি, শিশুর জন্ম, খৎনা আর সকল প্রকার ধর্মীয় মিছিলে িএবং হজ্বের মিছিলে তো বটেই। আগেকার দিনের বীরের দেশ আরবে, যখন সর্দারের কন্যারা সওয়ারীর পিঠে আরোহণ করে তাদের কবিলার পুরুষদের সাথে যুদ্ধে যেতো, ওদের অধিকতর বীরেচিত কার্যে অনুপ্রাণত ও উত্তেজিত করার জন্য (কারণ এই সব রমণীদের কোনো একজনকে নিহত হতে দেয়া এবং তারো চাইতে খারাপ, দুশমন কর্তৃক বন্দিনী হতে দেয়া চরম অসম্মানের কাজ বলে গণ্য হতো) তখন এই ‘গাত্রাফা’ প্রায়ই শোনা যেতো যুদ্ধের ময়দানে।
প্রায় সকল হজ্বযাত্রীই হাওদায় করে চলছে-একেকটি উটের পিঠে দুটি করে হাওদা, আর হাওদাগুলির দুলনি ধীরে ধীরে আরেহীকে করে তোলে মানসিক দিক দিয়ে ক্লান্ত, এলোমেলো আর স্লায়ুগুলিকে দেয়া নিদারুণ যন্ত্রণা, এমনি অবিশ্রান্ত সে আন্দোলন আর দুলনি। কিছুক্ষণের জন্য সমস্ত ক্ষমতা হারিয়ে ঝিমাতে থাকে আরোহী, হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে জেগে ওঠে, আবার ঘুমিয়ে পড়ে, আবার জেগে ওঠে ঘুম থেকে। যে-সব উট চালক কাফেলার সংগে সংগেদ চলেছে পায়ে হেঁটে, কিছুক্ষণ পর পর ওরা ওদের উটগুলিকে হাঁক ছেড়ে ডাকে। ওদের কেউ কেউ উটের দীর্ঘায়িত পদক্ষেপের ছন্দে মাঝে মাঝে গান ধরে।
সকালের দিকে আমরা বাহবা পৌছুই। ওখানে কাফেলা থামলো দিনের জন্য, কারণ গরম এতো বেশি যে, কেবল রাতের বেলয়ই সফর সম্ভব।
এ গ্রামটি-আসলে যা অগোছালো পর্ণকুটির, কফির দোকান, পামপাতার কয়েকটি কুঁড়ে ঘর এবং একটি ছোট্ট মসজিদ নিয়ে তৈরি দুটি সারি ছাড়া কিছুই নয়-জিদ্দা এবং মক্কার ঠিক মাঝখানে এমন একটি জায়গায় অবস্থিত, যেখানে কাফেলা এসে দিনের জন্য থাকে, বহুকাল ধরে। আমরা উপকূল পেছনে ফেলে আসার পর সারা পথে যে-দৃশ্য দেখতে দেখতে এসেছি এখানকার ভূ-দৃশ্যও তাইঃ এক মরুভূমি, এখানে ওখানে রয়েছে আলাদা আলাদা সব পাহাড়, আর পুবদিকে রয়েছে আরো উচু নীচু পর্বতমালা, যা উকূলের নিচু অঞ্চলটিকে পৃথক করে দিয়েছে মদ্যে আরবের মালভূমি থেকে। কিন্তু এখন আমাদের চারপাশের এ েোটা মরুভূমিকে মনে হচ্ছে সেনাবাহিনীর এক বিশাল ছাউনি, অসংখ্য তাঁবু, উট, হাওদা, গাট্টি-বোচকা, আর বহু ভাষার মিলন-আরবী, হিন্দুস্তানী, মালয়ী, ফারসী, সোমালী, তুর্কী, পশতু, আমহারা এবং আল্লাহই জানেন আরো কতো কতো ভাষা! আসলে এ হচ্ছে জাতিপুঞ্জের সত্যিকার জমায়েত, এক সমাবেশ। কিন্তু প্রত্যেকেই যেহেতু পরেছে সবাইকে একরূপ করে দেয় ‘ইহরাম’ সেজন্য কোন কোন লোক কোন বংশ বা কোন জাতির তা প্রায় নযরে পড়ছে না বললেই চলে এবং সকল জাতি মিলে দেখাচ্ছে যেনো একটিমাত্র জাতি!
সারারাত চলার পর হজ্বযাত্রীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু ওদের মধ্যে খুব কম লোকই জানে-বিশ্রামের সময়টিকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। ওদের প্রায় সকলের কাছেই সফর খুব সম্ভব একটি অতি অস্বাভাবিক উদ্যম, আর ওদের অনেকের কাছেই এ হচ্ছে ওদের জীবনের প্রথম সফর- যা অমনি এক নতুন সফর, অমনি এক মহান লক্ষ্যের অভিমুখে। স্বভাব্তই চঞ্চল হবার কারণ রয়েছে ওদের ওদের ছোটাছুটি করতে হবে এদিক-ওদিক-কোনোকিছু করবার জন্য ওদের হাতগুলিকে হাতড়াতে হবে, যদি তা ওদের থলে, বস্তা এবং গাট্টি-বোচকা খোলা ও বাঁধার চাইতে বেশি কিছু না-ও হয়, তবুঃ অন্যথায় পৃথিবীর সাথে ওদের সম্পর্ক হয়ে পড়বে ছিন্ন, ওরা নিজেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে বসবে অপার্থিব সুখে, যেমন হারিয়ে যায় মানুষ সমুদ্দুরে.. … … .
আমার মনে হলে, আমার তাঁবুর ঠিক পরের তাঁবুটিতে যে পরিবারটি রয়ে ওদের বেলায় তা-ই ঘটেছে; বোঝা যাচ্ছে ওরা বাংলাদেশের কোনো এক গ্রাম থেকে আগত হজ্বযাত্রী। ওরা ক্বচিৎ কথা বলছেঃ ওরা বসে আছে মাটিতে পায়ের উপর পা রেখে, ওদের অপলক দৃষ্টি নিবদ্ধ পুবে, মক্কার দিকে-মরুভূমির অভ্যন্তরে-মরুভূমির অভ্যন্তরে যা ঝিকমিক –করা উত্তাপে তেতে আছে। ওদের মুখে অমন একটি সুদূল প্রশান্তি রয়েছে যে, আমার মনে হলো, ওরা যেন ইতিমধ্যেই আল্লাহর ঘরের সম্মুখে অবস্থান করছে এবং প্রায় তাঁর উপস্থিতির মধ্যেই রয়েছে। লোকগুলির সৌন্দর্য দৃষ্টি আকর্ষন করে, হালকা পাতলা, কাঁধ পর্যন্ত ঝোলানো বাবাড়ি চুল, আর কুচকুচে তেলতেলে মসৃণ কালো দাড়ি।
ওদের একজন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে একটি কম্বলের উপরঃ তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসেছে দুটি তরুণী-ওদের লাল নীল রঙের প্রশস্ত সালোয়ার, রূপার কাজ করা জামা আর পিঠের উপর ঝুলে-পড়া গাঢ় কালো কেশদামের মধ্যে ওদের মনে হচ্ছে যেনো বহু রঙের ছোট্ট দুটি পাখি। ওদের মধ্যে যেটি বয়সে ছোট সে তার নাকের একটি ছেদায় পরছে একটি সোনার রিঙ।
বিকালে পীড়িত লোকিট মারা গেলো। প্রাচ্যের দেশগুরিতে মেয়েরা প্রায়ই যেরূপ মাতম করে, এ মেয়েগুলি তেমন কিছু করলো নাঃ কারণ এ লোকটি হজ্বের পথে মারা গেছে, পাক যমীনে, আর এজন্য সে ধন্য। লোকগুলি লাশটিকে গোসল করায় এবং মৃত লোকটি তার পোশাক হিসাবে যে কাপড় পরেছিলো তা-ই দিয়ে ওরা তার কাফন দেয়। তারপর ওদের মধ্যে একজন দাঁড়ায় তাঁবুর সম্মুখে, হাত দুটি পেয়ালার মতো করে মুখের কাছে আনে এবং উচ্চৈঃস্বরে আযান দেয়ঃ আল্লাহু আকবর’, ‘আল্লাহু আকবর’,- ‘আল্লাহ মহান’, ‘আল্লাহ মহান’, ‘লা-ইলাহা –ইল্লাহু মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ’- আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর রসূল!.. … . মৃতের জন্য দোয়া! তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর দয়া করুন। সকল দিক থেকে ইহরাম বাঁধা লোকেরা ছুটতে ছুটেতে এসে জমায়েত হয় এবং ‘ইমামে’র পিছে সারির পর সারি বেঁধে দাঁড়ায়, একটি বহৎ ফৌজের সিপাইদের মতো। জানাযায় সালাত শেষ হওয়ার পর ওরা একটি করব খোঁড়ে, একটি বৃদ্ধ লোক কুরআন থেকে কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে আর তারপর, ওরা ধুলি নিক্ষেপ করে মৃত হজ্বযাত্রীর উপর, যে কাঁৎ হয়ে শুয়ে আছে, তার মুখ মক্কার দিকে করে.. .।
দ্বিতীয় দিনের সকালে সূর্যোদয়ের আগ ধূলি-প্রান্তর সংকীর্ণ হয়ে আসে, পাহাড়গুলি পরস্পরের আরো কাছ ঘেঁষে এসে মিলিত হয়; আমরা একটি গিরিখাদ পার হয়ে যায় এবং ভোরের ফিকে আলোতে মক্কার প্রথম ইমারতগুলি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে-তারপর সূর্য যখন আসমানে উঠছে, আমরা প্রবেশ করি পবিত্র নগরীর রাস্তায়।
এখনকার ঘর-বাড়িগুলি জিদ্দার ঘরবাড়ির মতোই; একই ধরনের কাজ-করা পোচ-বিশিষ্ট জানালা আর ঢাকা বেলকনি; কিন্তু এগুলি তৈরি করতে যে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তা জিদ্দার হালকা রঙের প্রবাল পাথরের চেয়ে বেশি ভারী, বেশি পুরু মনে হলো। এখনো খুব সকাল; কিন্তু এরি মধ্যে গাঢ় সর্বব্যাপী উত্তাপ ক্রমেই বেড়ে উঠতে শুরু করেছে। অনেকগুলি বাড়ির সামনেই পাতার রয়েছে বেঞ্চি যার উপর শ্রান্ত, ক্লান্ত লোকেরা ঘুমিয়ে আছে। যে-সব কাঁচা রাস্তা দিয়ে আমাদের হেলে –দুলে –চলা কাফেলা নগরীর কেন্দ্রের দিকে আগয়ে চলেছে সেগুলি সংকীর্ণ হতে সংকীর্ণতরো হয়ে আসছে। হজ্ব উৎসবের আর মাত্র কদিন বাকী। এজন্য রাস্তায় ভিড় অতি প্রচণ্ড। অগণিত হ্জ্ব যাত্রীর গাদে সাদা ‘ইহরাম’ এবং অন্যরা অনেকে সাময়িকভাবে ইহরাম বদল করে পরেছে তাদের নিত্যদিনের কাপড়- মুসিলিম জাহানের সকল দোশের পোশাক; ভিস্তিরা নুয়ে পড়েছে ভারি মশকের ভারে অথবা বাঁকের নীচে, যা থেকে বালতির মতো দুদিক থেকে ঝূলছে পানিভর্তি পেট্রোলের টিন, গাধা-চালক এবং সওয়ারী গর্দভেরা চলছে ওদের গলার ঘন্টি বাজাতে বাজাতে, পিঠ ওদের উজ্জ্বল রঙিন কাপড়ে ঢাকা; আর এই যে মহামিলন-যেনো একে পূর্ণতা দানের জন্য বিপরীত দিক থেকে আসছে উটেরা, পিঠে শূন্য হাওদা চাপানো, আসছে ভিন্ন ভিন্ন স্বরে ডাক ছাড়তে ছাড়তে। সংকীর্ণ রাস্তাগুলিতে এমন হৈহুল্লা শোরগোল চলছে যে, আপনার মনে হতে পারে হজ্ব এমন কোনো জিনিস নয় যা বহু- বহু শতব্দী ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রত্যেক বছর, বরং এ যেনো হঠাৎ একটি চমক, একটি বিস্ময়, যার জন্য প্রস্তু ছিলো না মানুষ! শেষ পর্যন্ত আমাদরে কাফেলা আর কাফেলা রইলো না, হয়ে দাঁড়ালো এক বিশৃংখল জটলা-উট, হাওয়া গাট্টি-বোচকা, হজ্বযাত্রী, উট-চালক আর হট্টগোলের!
আমি থেকে হাসান আবিদ নাম এক মশহুর ‘মুতাব্বিফ’ বা মালুমের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম। এখন এক বিশৃংখলার মদ্যে তাকে কিংবা তার ঘর খুঁজে বের করার সম্ভাবনা খুবই কম মনে হলো। কিন্তু হঠাৎ কোনো এক ব্যক্তি চীৎকার করে উঠলো, ‘হাসান আবিদ’,-হাসান আবিদের হজ্বযাত্রিগণ! আপনার কোথায়? এবং বোতলের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা জিনের মতো এক তরুণ আচমকা দেখা দেয় আমাদের সামনে আর খুব নীচু করে মাথা ঝুঁকিয়ে তার পিছু পিছু চলার জন্য আমাদের অনুরোধ করে। হাসান আবিদই তাকে পাঠিয়েছে পথ দেখিয়ে ওর বাড়িতে আমাদের নিয়ে যাবার জন্য। যে তরুণটি আগে আমাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এসেছিলো, মুতাব্বিফে’র বাড়িতে পর্যাপ্ত নাশতার পর আমি তারিই সংগে পবিত্র মসজিদে যাই। মানুষ ভর্তি লোকজন গিজগিজ-করা রাস্তার ভেতর দিয়ে আমরা পায়ে হেঁটে চলি কসাইদের দোকান ছাড়িয়ে রেখেছে। আমরা আগিয়ে যাই ঝাঁক ঝাঁক মাছি, তরকারী, শাক-সব্জির গন্ধ, ধূলিবারিল ভেতর দিয়ে ঘামতে ঘামতে। তারপর আমরা অতিক্রম করি একটি সংর্কীর্ণ উপরদিকে ঢাকা বাজার, যেখানে কেবল বস্ত্র ব্যবসায়ীদেরই দোকন রযেছে, রঙের মহোৎসব। পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য স্থানের বাজারের মতোই এখানকার দোকানগুলি হচ্ছে কেবল কতকগুলি তাক, মাটি থেকে এক গজ উচু, যেখানে দোকানী বসেছে পায়ের উপর পা রেখে, সকল উপকরণ ও রঙের কাপড়ের থান স্তূপীকৃত তার চারপাশে, আর মাথার উপর ঝুলছে সারি সারি সকল রকম পোশাকের কাপড়, মুসলিম জাহানের সকল জাতির জন্য!
এবং এছাড়াও রযেছে সকল জাতের সকল পোশাকের সুরতের মানুষ কারো, মাথায় পাগড়ী, কারো মাথা খঅলি, কেউ কেউ নীরবে হাঁটছে মাথা নীচু করে, হয়তো বা হাতে একটি তসবিদানা নিয়ে। আর অন্যেরা ত্বরিৎ পদে দৌড়াচ্ছে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ; সোমালীদের নমনীয় বাদামী দেহ ওদের ঢিলেঢালা রোমক পোশাকের ভাঁজের ফাঁফে ফাঁকে চিকমিক করছে তামার মতো; আর আরবের মধ্যভাগের উচু অঞ্চলের লোকেরা, হালকা পাতলা শরীর, চিকন-চাকন মুখ, চাল –চলনে গর্বিত; বোরখার ভারি অংগ-প্রত্যংগ ও দৃঢ় মজবুত গড়নের উজবুকেরা, যারা মক্কায় এই গরমেও পরে আছে তুলাভরা কাপ্তান আর হাঁটু-উচা চামড়ার বুট; সারং –পরা জাভার মেয়েরা যাদের মুখ অনাবৃত এবং চোখের আকৃতি বাদামের মতো; মরক্কোর লোকেরা চলাফেরা করছে, ধীর পদক্ষেপে, সাদা, ‘বার্নাসে’ মর্যাদামণ্ডিত ওরা; মক্কার লোকদের পরণে সাদা সূতী পোশাক আর তালু ঢাকা হাস্যকর রকমের ছোট্ট গোল টুপী মাথায়; মিসরীয় ‘ফেলাহীন’দের মুখে উত্তেজনা, কালো চোখওয়ালা সাদা পোশাক পরা ভারতীয়রা উকি মারছে তাদের বিপুল তুষারশুভ্র পাগড়ির নীচ থেকে, আর ভারতীয় রমণীরা, ওদের সাদা বোরখা’য় এমনি অভেদ্যভাবে আচ্ছাদিত যে, ওদের দেখাচ্ছে চলন্ত তাঁবুর মতো; তিমবুকতু অথবা দাহমীর বিরাটকায় নিগ্রোরা রয়েছে এখানে, গায়ে ওদের নীল ঢিলে ঢালা পোশাক আর মাথায় তালু ঢাকা লাল টুপি; আর ক্ষুদ্র পরিপাটি দেহের অধিকারী চীনা মহিলারা, বিচিত্র রঙিন প্রজাপতির মতো, লঘু পদে হাঁটছে মাপা পদক্ষেপে, যা দেখাচ্ছে হরিণীর পায়ের খুরের মতো। সকল দিকেই এক চীৎকার ও ভিড়ের শোরগোলজাত উত্তেজনা, যার ফলে আমার মনে হলো, আমি রয়েছি আছড়ে-পড়া ঢেউয়ের একেবারে মাঝখানে, যে ঢেউয়ের কেবল কিছু খুঁটিনাটিই আমি ধারণা করতে পারি, তার সংহত একটা চিত্র কখনো নয়। সবকিছু ভেসে চলেছে অগণিত ভাষায় গুঞ্জনের এবং উষ্ণ অংগভংগি ও উত্তেজনার মধ্যে। আর এভাবেই এক সময় নিজেদের আমরা দেখতে পেলাম-পবিত্র মসজিদ ‘হারামে’র একটি প্রবেশ পথের সম্মুখে।
এটি তিনটি খিলানের এক প্রবেশপথ, পাথর-বিছানো সিড়ি উঠে গেছে ধাপে ধাপে, প্রবেশ পথের মুখ পর্যন্ত; মুখে বসে আছে এক অর্ধ-উলংগ ভারতীয় ভিক্ষুক, তার জিরজিরে কংকালসার হাত দুটি আমাদের দিকে বাড়িয়ে। আর তখুনি আমি প্রথম দেখতে পেলাম-পবিত্র গৃহের ভেতরের বর্গক্ষেত্রের মতো দেখতে স্থানটি, যা রয়েছে রাস্তার সমতল থেকে অনেক নীচে, প্রবেশপথের মুখ থেকে অনেক বেশি নিচুতে, আর এজন্য আমার চোখের সামনে তা উদ্ভাসিত হলো একটি গামলার মতোঃ এক বৃহৎ চতুর্ভুজ, যা বহু স্তম্ভের উপর স্থাপিত অর্ধবৃত্তাকার অনেকগুলি খিলান দ্বারা রেষ্টিত এবং তার মধ্যখানে রয়েছে বর্গাকৃতি সমান ছটি পার্শ্ববিশিষ্ট চল্লিশ ফুট উচু এক ইমারত, কালো চাদরে ঢাকা আর চাদরটিকে বেষ্ট করে রয়েছে একটি চওড়া ডোরা যার উপর কুরআনের আয়াতগুলি লেখা হয়েছে জরির হরফে; যা গিলাফের উপরের অংশকে পেঁচিয়ে বেষ্টন করেছে গিলাফটিকেঃ কা’বাঘর.. .।
তাহলে এ-হচ্ছে কা’বা, বহু বহু শতক ধরে কতো লাখো কোটি মানুষের আকাংখার লক্ষ্যস্থল! এই লক্ষ্যে পৌছুনোর জন্য যুগ যুগ ধরে অগণিত হজ্বযাত্রী কী বিপুল ত্যাগই না স্বীকার করেছে! অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে পথেই, অনেকেই এ লক্ষ্যে পৌছেছে বিপুল কষ্ট ও ক্ষতি স্বীকারের পর; তবু ওদে সকলের কাছেই এই ছোট্ট বর্গাকৃতি ইমারতটি ছিলো ওদের আকংখার শীর্ষবিন্দু আর এখানে পৌছুতে পারার অর্থই ছিলো সার্থকতা, পূর্ণতা। এখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রায় নিখুঁত কিউব (যা এর আরবী নামের ধাতুগত অর্থ-অর্থাৎ কা’বা) একটি কালো চাদরে সম্পূর্ণ ঢাকা, মসজিদের বিশাল চতুর্ভূজের ঠিক মাঝখানে একটি প্রশান্ত দ্বীপ যেনোঃ পৃথিবীর আর যে-কোনো স্থানের যে-কোনো স্থাপত্য –কর্মের চাইতেই অনেক বেশি শান্ত, স্লিগ্ধ। মনে অনেকটা এ কথাই উদয় হতে চায় যে, কাবাঘর যিনি প্রথম নির্মাণর করেছিলেন-কারণ ইবরাহীমের মূল ইমারতটি কয়েকবারই পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে একই আকারে-তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহর সামনে মানুষের বিনয় ও ক্ষুদ্রতার একটি রূপক- কাহিনী তৈরি করতে। কা’বাগৃহের নির্মাতা জানতেন স্থাপত্য –কর্মের ছন্দের কোনো সৌন্দর্যই, রেখার পূর্ণতাই-তা যতো মহৎ এবং বলিষ্ঠই হোক, আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণার প্রতি সুবিচার কখনো করতে পারে না, আর এজন্য তিনি নিজেকে সীমিত রেখেছিলেন কল্পনায় আনা যেতে পারে এমন একটি সরলতম তিন আয়তনের নকশার মধ্যে-বর্গাকৃতি সমান ছয় পার্শ্বের পাথরে তৈরি একটি ইমারত।
আমি পৃথিবীর বহু মুসলিম মসজিদ দেখেছি যেসব মসজিদের ভেতরে মহান শিল্পীদের হাত সৃষ্টি করেছে অনুপ্রাণিত শিল্প-নিদর্শন। আমি মসজিদ দেখেছি উত্তর আফ্রিকাতে, ঝলমলে ইবাদতগাহ, মর্মর পাথর আর সাদা অ্যালবাস্টারে তৈরি, আমি দেখেছি জেরুযালেমে মসজিদুল আকসা, যা প্রচণ্ডভাবে নিখুঁত এক গম্বুজ, এক নাজুক কাঠামের উপর স্থাপিত, কোনো রকম দ্বন্ধ্না বাধিয়ে হালকা এবং ভারির একত্র মিলানোর স্বপ্ন; আর ইস্তাম্বুলে আজিমুশশান প্রাসাদগুলি-যেমন সুলায়মানিয়া, ইয়েনী-ওয়ালিদে, রায়াজিদ মসজিদ আর এশিয়া মাইনরে ব্রুসার মসজিদ এবং ইরানের সাফাবিদ আমলের মসজিদসমূহ-পাথর, বহু রঙের ম্যাজোলিক টালী, মোজাইক, রূপার এম্বোজ করা দরোজার উপর বৃহৎ স্টেলাসিটে খিলান, শ্বেত পাথর এবং ফিরোজা নীল গ্যালারীসহ চিকন মীনার, মর্মর ঢাকা চতুর্ভুজ, যার মধ্যে রয়েছে ফোয়ারা, বয়োবৃদ্ধ কদলী বৃক্ষ-এ সকলের এক রাজকীয় সামঞ্জস্যপুর্ণ সমাবেশ; আর সমরখন্দে তাইমুর লঙের মসজিদগুলি মহৎ ধ্বংসাবশেষ –ওসবের অবক্ষয়ের মধ্যেও চমৎকার!
এ সমস্তই দেখেছি আমি-কিন্তু এই মূহুর্তে আমি কা’বার সম্মুখে যতো প্রচণ্ডভাবে অনুভব করছি-নির্মাতার হাত এসে পৌছেছে নিবিড়ভাবে, একেবারে তাঁর ধর্মীয় চেতনার এতো কাছে-তেমনটি জীবনে আর কখনো অনুভব করিনি। একটি কিউবের চরম সরলতায় রেখা-কর্মের সকল সৌন্দর্য সম্পূর্ণভাবে বিসর্জনের মদ্যে উচ্চারিত হয়েছে এই ভাবঃ মানুষ নিজ হাতে যে সৌন্দর্যই সৃষ্টি করতে সক্ষম হোক না কেন, তাকে আল্লাহর জন্য উপযুক্ত মনে করা হবে একেবারেই অর্থহীন আত্মশ্লাঘা; এক কারণে, আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করার জন্য সরলতম যে ধারণা মানুষের পক্ষে সম্ভব তাই মহত্তম। মিসরের পিরামিডগুলির গাণিতিক সরলতার যে ধারণা মানুষের পক্ষে মূলে ও ক্রিয়া করে থাকবে একই ধরনের অনুভূতি, যদিও সেখানে কিছুটা মানুষের আত্মশ্লাঘা ও তার এক অভিব্যক্তি খুঁজে পেয়েছিলাম, তার ইমারতগুলিকে যে বিপুর আকারে সে নির্মাণ করেছিলো, তার মধ্যে। কিন্তু এখানে কা’বায় এর আকার পর্যন্ত ঘোষণা করছে মানুষের আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পনের। এই ছোট্ট ইমারতটির দৃপ্ত বিনয়ের কোনো তুলনা সেই পৃথিবীতে।
কা’বায় প্রবেশের পথ মাত্র একটিই রয়েছে, রৌপ্যমণ্ডিত একটি দরোজা উত্তর-পুবদিকে, জমি থেকে প্রায় সাত ফুট উচুতে। যার ফলে, একানে পৌছুনো যায় কেবল অমন একটি কাঠের সিঁড়ির সাহায্যে যা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়, যা ঐ দরোজার সামনে স্থাপন করা হয় বছরের অল্প কটি দিনের জন্য ভেতরটি, যা সাধারণত বন্ধই থাকে (আমি পরবর্তীকালে কয়েকবার তা দেখেছি) খুবই সাদাসিধা: মেঝেটি মর্মর পাথরে তৈরি, অল্প কটি গালিচা বিছানো থাকে মেঝেয় এবং ব্রোঞ্জ আর রূপার বাতি ঝুলে একটি ছাদ থেকে, যাকে ধরে রেখেছে ভারি কাঠের কতকগুলি কড়িকাঠ। বস্তুত কা’বার ভের ভাগের খাস কোনো নিজস্ব মর্তবা নেই, কারণ কা’বার পবিত্রতা গোটা ইমারাতটি সংগে জড়িত-যা হচ্ছে ‘কিবলা’ অর্থাৎ সালাতের দিক, সমগ্র মুসলিম জাহানের জন্য। আল্লাহর একত্বের এই প্রতীকের দিকেই মুখক ফেরায় দুনিয়অর কোটি মুসলমান, দিনে পাঁচবার করে।
ইমারতটির পুব কোণে প্রোথিক এবং অনাবৃত অবস্থায় রাকা হয়েছে একটি ঘোর কালো পাথর, যাকে ঘিরে রয়েছে একটি চওড়া রূপার ফ্রেম। এই কালো পাথরটি, যা পুরুষের পর পুরুষ ধরে হজ্ব-যাত্রীদের চুমোয় চুমোয়, গর্ত হয়ে গেছে, অমুসলিমদের কাছে অনেক ভুল বোঝাবুঝির কারণ হয়ে আছে। ওদের বিশ্বাস, এ হচ্ছে একটি ভৌতিক প্রতীক যা মুহাম্মদ স্বীকার করে নিয়েছেন মক্কার কাফিরদের প্রতি একটি কনসেশন হিসাবে। আসল সত্য থেকে এর চেয়ে দূরের আর কিছুই হতে পারে না। ঠিক যেমন কা’বা একটি তাজিমের বিষয়, পূজার বিষয় নয়, তেমনি হচ্ছে এ কালো পাথরটিও। এটিকে সম্মান করা হয় হযরত ইব্রাহিম যে প্রথম ইমারতটি তৈরি করেছিলেন তারই একমাত্র অবশিষ্ট পাথর হিসাবে, আর যেহেতু বিদায় হজ্বের সময় রসূলুল্লাহর ওষ্ঠদ্বয় এ পাথরকে স্পর্শ করেছিলো কেবল সে কারণেই তখন থেকে একইভাবে সকল হজ্বযাত্রী একে চুমু খেয়ে এসেছেন। মহানবী ভালো করেই জানতেন যে, পরবর্তীকালের মুমিনেরা সবসময় অনুসরণ করতে তাঁর দৃষ্টান্ত। যখন তিনি এ পাথরটিকে চুমু খাচ্ছিলেন, তিনি জানতেন, অনাগতকালের সকল হজ্বযাত্রীর ঠোঁট এখানে এসে চিরকালই সাক্ষাৎ পারে তাঁর ওষ্ঠাধরের স্মৃতি! তাঁর পবিত্র ওষ্ঠাধরের স্মৃতরি –একটা প্রতীকী আলিংগনের আকারে যা তিনি রেখে গেছেন তাঁর সমস্ত উম্মতের জন্য কালোত্তীর্ণ এবং মৃত্যুঞ্জয়ী আলংগন-যখনি তার কৃষ্ণ পাথরটির উপর স্পর্শ করবে তাঁর পবিত্র ঠোঁট দুটি। আর হজ্বযাত্রীরা –যখন ওরা কালো পাথরটিকে চুমু খায়, তখন অনুভব করে ওরা রসূলুল্লাহকে আলিংগন করছে এবং আলিংগন করছে অন্য সকল মুসলমানকে যারা এখানে এসেছে তাদের আগে এবং যারা আসবে তাদের পরে!
কোনো মুসলিমই এ কথা অস্বীকার করবে না যে, রসূলুল্লাহর বহু বহু আগেও অস্তিত্ব ছিলো কা’বার। আসলে এর গুরুত্ব খাস করে এই বাস্তব সত্যের মধ্যই নিহিত। রসূলুল্লাহ দাবী করেনিনি যে, তিনি একটি নতুন ধর্মের স্থপয়িতা। পক্ষান্তরে কুরআনেরর কুরআনের দাবী অনুসারে আল্লাহর কাছে ‘আত্মসমর্পণ; অর্থাৎ ‘ইসলাম’, মানব চেতনার উন্মেষেল শুরু থেকেই মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হিসাবে রয়েছে। হযরত ইবরাহীম, মূসা, ঈসা এবং আল্লাহর আর সকল নবী এ-ই শিখিয়েছেন; এর মধ্যে কুরআন হচ্ছে ঐশী প্রত্যাদেশের সর্বশেষ। মুসলমানেরা এ কথাও অস্বীকার করেন না যে, এ পবিত্র গৃহটি ভরা ছিলো মূর্তি এবং ভৌতিক প্রতীকে, মুহাম্মদ সেগুলি ভেঙে ফেলার আগে, ঠিক যেমন মূসা সিনাইতে সোনার বাছুর ভেঙে চুরমার করেছিলেনঃ কারণ কা’বাঘরের এ মূর্তিগুলি স্থাপন করার অনেক অনেক আগেও প্রকৃত আল্রাহর ইবাদত হতো এখানে, আর তাই মুহাম্মদ যা করলেন, তা ইবরাহীমের মসজিদকে তাঁর মূল উদ্দেশ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠার বেশি কিছু ছিলো না।
.. . .. . .. . .. .
এবং এইখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি হযরত ইবরাহীমের ইবাদত গৃহের সামনে আর কোনো চিন্তা ছাড়াই তাকাই ( কারণ চিন্তা এবং ধ্যান এসেছিলো অনেক পরে) সেই বিস্ময়কর ইমারতের দিকে এবং আমার ভেতরের কোনো কোনো লুক্কায়িত প্রসন্ন বীজ থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এক গর্বিত উল্লাস, একটা গানের মতো।
মসৃণ মর্মরখণ্ড, যার উপর নৃত্য করছে সূর্যরশ্মির প্রতিবিম্ব, তাই দিয়ে, কা’বার চারিদিকে একটি প্রশস্ত বৃত্তের আকারে ঢেকে দেওয়অ হয়েছে মাটি এবং মর্মরখণ্ডগুলির উপরে বহু মানুষ. নারী এবং পুরুষ পদচারণা করছে, কালো চাদরে ঢাকা আল্লাহর ঘর, ঘুরে ঘুরে। ওদের মধ্যে কেউ কেউ কাঁদছে, কেউ কেউ আল্লাহকে চীৎকার করে ডাকছে মুনাজাতে, আর বুহ জনেরই মুখে কথা নেই, চোখে পানি নেই, কেবল ওরা হেঁটে চলেছে মাথা নিচু করে.. .।
কা’বাঘরের চারদিকে সাতবার পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করা হজ্বে’র অংশঃ ইসলামের এই কেন্দ্রীয় পবিত্র স্থানটির প্রতি কেবল সম্মান দেখানোর জন্যই নয়, বরং ইসলামী জীবন-ব্যবস্থার বুনিয়াদী দাবিটি কী, প্রত্যেককে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই এর লক্ষ্য। কা’বা হচ্ছে আল্লাহর একত্বের প্রতীক, আর কা’বাকে ঘিরে শরীরী প্রদক্ষিণ মানবিক ক্রিয়াকলাপের প্রতীকস্বরূপ এক অভিব্যক্তি, যার অর্থ এই যে, যা ‘অন্তজীবন’ পদটিতে নিহিত আমাদরে চিন্তা এবং অনুভূতিই কেবল নয়, বরং আল্লাহকে আমদের সক্রিয় বহিজীবন, আমাদের ক্রিয়াকলাপ এবং বাস্তব উদ্যেগ –প্রয়াসেরও কেন্দ্র করতে হবে অবশ্যই।
আর আমিও ধীরে ধীরে হয়ে পড়ি, মাঝে মাঝে আমি আমার নিকটে একটি পুরুষ বা স্ত্রীলোক সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি; আমার চোখের সামনে আলগা আলগা দ্রুত চলমান বহু চিত্র ভেসে ওঠে এবং মিলিয়ে যায়। সাদা ‘ইহরাম’ পরা এক বিশালদেহী নিগ্রোকে দেখতে পেলাম তার মজবুত কালো কব্জিতে চেনের মত জড়িয়ে রাখা হয়েছে একটি কাঠে র তসবীহ। এক যয়ীফ মালয়ী পা টিপে টিপে কিছুক্ষণ হাঁটলো আমার পাশাপাশি, তার বাহু দুটি যেন অসহায়, দিশাহারা অবস্থায় ঝুলে আছে তার বাটিক সারং ঘেঁষে। ঘন উদ্ধত ভরুর নীচে ধূসর চোখ কার চোখ এগুলি? এবং এই মুহূর্তে তা হারিয়ে গেলো ভিড়ের মদ্যে। এই কালো পাথরের সামনে বহু মানুষের মধ্যে রয়েছে এক ভারতীয় তরুণীঃ বোঝাই হচ্ছে, সে অসুস্থ; ওর সংকীর্ণ নাজুক মুখের উপর ফুটে আছে বিস্ময়কর রকমে প্রকাশ্য এক আরজু, যা দর্শকদের কাছ দৃষ্টি-গ্রাহ্য, স্বচ্ছ পরিষ্কার পুকুরের তলদেশে মাছ এবং শৈবালের পরানের মতো। সে তার ফ্যাকাশে হাত দুটির তালু উল্টিয়ে উচিয়ে রেখেছে কা’বার দিকে আর তার আঙুলগুলি কাঁপছে যেন এক নির্বাক প্রার্থনার সংগে তাল রেখে.. .।
আমি হেঁটে চলেছি; মিনিটের পর মিনিট কেটে যাচ্ছে এবং আমার হৃদয়ে ক্ষুদ্র এবং তিক্ত যা কিছু ছিলো সবই আমার হৃদয়কে ত্যাগ করতে শুরু করে। আমি হয়ে উঠি বৃত্তাকার স্রোতের অংশ-ওহো, আমরা যা করে চলেছি, এ-ই কি তা হলে তার অর্থঃ সচেতন হওয়া, উপলব্ধি করা যে, আমরা প্রত্যেকেই হচ্ছি একটা কক্ষপথে একটা গতির, এটা আন্দোলনের অংশ। এ-ই কি সম্ভবত সকল বেদিশা সকল বিভ্রান্তির শেষ? এবং মুহুর্তগুলি মিলিয়ে গেলো, সময় দাঁড়ালো চুপ করে স্থির হয়ে-আর এই হচেছ কেন্দ্র, বিশ্বজগতের!
নয় দিন পর এলসা মারা গেলো।
ও মারা যায় হঠাৎ এক হপ্তার কম অসুখে ভুগে। প্রথম মনে হয়েছিলো গরম এবং অনব্যস্ত খাবারের কারণে সামান্য অসুস্থতার বেশি কিছু নয়। পরে দেখা গেলো, এ হচ্ছে গ্রীষ্মমণ্ডলের এক অজ্ঞাত ব্যঅধি যার মুকাবিলায় একেবারেই হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছে মক্কার হাসপাতালের সিরীয় ডাক্তারেরা। আমাকে ঘিরে নামলো অন্ধ তমসা আর চরম নৈরাশ্য।
ওকে কবর দেওয়া হলো মক্কার ধুলিময় গোরস্তানে। ওর কবরের উপর স্থাপন করা হলো একটি পাথর। এই শিলাখন্ডে কোনো লিপি খোদাই করতে আমার মন মানলো না; কারণ আমার মনে হলো, শিলালিপির চিন্তা করা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করারিই শামিল আর এই মুহুর্তে আমি আমার ভবিষ্যৎ আর ধারণাও করতে পারিছি না।
এলসার কচি ছেলে আহমদ এক বছরেরও বেশি হয়ে গেলো আমার সাথে, আরবের অভ্যন্তরে। সে ছিলো আমার সংগী-এক সাহসী, দশক বছর বয়সের সহচর। কিন্তু কিছুদিন পর তাকেও আমার বিদায় জানাতে হলো। কারণ তার মা-এর পরিবার শেষ পর্যন্ত আমাকে রাজী করাতে সক্ষম হলো-আহমদকে অবশ্যি ইস্কুলে পাঠাতে হবে ইউরোপে। এরপর এলসার আর কিছুই রইলো না তার স্মৃতি এবং মক্কার গোরস্তানে একটি শিলাও এক ঘোর অন্ধকার ছাড়া, যা অপসৃত হয়েছিলো অনেক পরে, আরবের চিরন্তন আলিংগনে আমার নিজেকে সঁপে দেবার পর। রাত অনেক গড়িয়ে গেছে, কিন্তু আমরা এখনো বসে আছি নিষ্প্রভ ক্যাম্পফায়ারের চারপাশে। আবু সাঈদ, ততোক্ষণে তার কামনার প্রচণ্ড ঝড় কাটিয়ে উঠেছে; তার চোখ দুটি এখন করুণ, কিছুটা ক্লান্ত। নূরা সম্পর্কে সে আমাদের সাথে এভাবে কথা বলতে লাগলো, মানুষ যেভাবে কথা বলে থাকে তার কোনো প্রিয়জন সম্বন্ধে, যে মারা গেছে অনেক আগে।
-‘আপনি তো জানেন ও সুন্দরী ছিলো না, কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসতাম’।
আমাদের মাথার উপর পূর্ণ চাঁদ-একটা জীবন্ত প্রাণীর মতো তার পূর্ণতা। বিস্ময়কর বিষয় নয় যে, ইসলাম-পূর্ব যুগের আরবেরা চাঁদকে মনে করতো আল্লাহর এক কন্যা’ বলে? –দীর্ঘকেশী দেবী ‘আল-লাত’, যে তার রহস্যময় প্রজননের জন্ম দিতো। তার সম্মানে প্রাচীন মক্কার এবং তায়েফের যুবক-যুবতীরা পূর্ণিমার রাতগুলি উদযাপন করতো খোলা আসমানের নীচে, উচ্ছৃংখল মাতলামিতে, প্রেম-লীলা আর কাব্য প্রতিযোগিতায়। মাটির কলস আর চামড়ার বোতল থেকে প্রবাহিত হতো রক্তলাল সূরা, আর যেহেতু তা ছিলো অতিশয় লাল, অতিশয় উত্তেজক সেজন্য কবিরা মদনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত উন্মার্গ কবিতায় এর উপমা দিতো রমণীর খুনের সঙে। এই গর্বিত আবেগান্ধ তরুণেরা তাদের হৃদয়ের উচ্ছ্বাস ঢেলে দিতো আল-লাতের কোলে, ‘যার লাবণ্য চাঁদের কিরনের মতো, যখন চাঁদ পূর্ণ হয় ষোলকলায়, আর যার মহত্ত হচ্ছে এক ঝাঁক কালো সারস পাখির আকাশে ডানা মেলে ওড়ার মতো’- প্রাচীন কালের তারুণীময়ী শক্তিমতী এই দেবী, যে তার ডান বিস্তার করেছিলো দক্ষিণ আরব থেকে উত্তরদিকে এবং সুদূর হেল্লাস পর্যন্ত পৌছেছিল মতো লেটোর আকৃতিতে।
আল-লাতের এই পরিব্যাপ্ত ধোঁয়াটে প্রকৃতিপূজা এবং তার সাথে আরো এক দংগল দেবদেবীর পূজা থেকে, আল-কুরআনের এক আল্লাহর সমুচ্চ ধারণায় পৌছুনো ছিলো আরদের জন্য এক দীর্ঘ দরাজ পথের সফর। সে যা-ই হোক, মানুষ সবসময় তার আত্মার পথে দূর যাত্রা করতে ভালোবেসেছে-এখানে এই আরবেও, বিশ্বের অন্যান্য দেমের চাইতে তা মোটেও কম নয়ঃ দীর্ঘ সফরকে সে অতো গভীরভাবে ভালোবেসেছে যে, তার গোটা ইতিহাসকেই বর্ণনা করা যেতে পারে তার ধর্ম অনুসন্ধানের ইতিহাস বলে।
আরবদের কাছে এ অনুসন্ধান সবসময়ই পরমের অনুসন্ধান। এমনকি, ওদের একবারে আদকালেও যখন ওদে চারপাশের পৃথিবীকে অগণিত দেবতা ও দেও-দানব দিয়ে একবারে পূর্ণ করে ফেলেছিলো, তখনো ওরা সবসময় সচেতন ছিলো সেই পরম এক সম্পর্কে, যিুন তাঁর পরম সত্য তও মাহাত্ম্যে অবস্থান করেন সকল দেবদেবীর উপরে, এক অদৃশ্য, আবোধগর্ম, সর্বময় শক্তি, মানুষের কল্পনা-সাধ্য সবকিছুর বহু উর্ধ্বে, সকল কার্যের উপর শাশ্বত হেতু। ওদের কাছে দেবী ‘আল-লাত’ এবং তা ঐশী ভগ্নিদ্বয়, ‘মানত’ ও ‘উজ্জা’ আল্লাহর কন্য ‘র বেশি কিছু লাগ না, যারা অজ্ঞেয় এক এবং দুশ্যমান জগতের মধ্যে স্থাপন করে যোগসূত্র। মানুষের শৈমবকে যে-সব ধারণাতীত শক্তি ঘিরে ছিলো তারি প্রতীকঃ কিন্তু আরবীয় চিন্তার পশ্চাতভূমির গভীরে সবসময়েই বিদ্যমান ছিলো ‘এক’ –এর জ্ঞান, প্রতি মুহূর্তে সচেতন সজ্ঞান বিশ্বাসে জ্বলে উঠতে উন্মুখ। এর অন্যথা কি করেই বা হতে পারতো? ওরা এমন এক জাতি যা এক কঠোর আকাশ ও যমীনের মাঝখানে নীরবতা ও নির্জনতায় বিকাশ লাভ করেছে। এই কঠোর সাদাসিধা অন্তহীন স্থানের মধ্যে ওদের জীবন ছিলো সত্যি কষ্টকর। তাই, ওদের পক্ষে এমন একটি শক্তির আকাংখা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব ছিলো না, যা সকল সত্তা ও সৃষ্টিকে বেষ্টন করে থাকবে অভ্রান্ত সুবিচার ও করুণায়, কঠোরতা ও প্রজ্ঞায়ঃ আল্লাহ.. . মহান আল্লাহ । তিনি অবস্থান করেন অননত্কালব্যাপী এবং দীপ্তি ছড়িয়ে আলোকি করেন অনন্তকে; কিন্তু তুমি যেহেতু তাঁর কর্মের গণ্ডির মধ্যেই রয়েছে সে কারণে তিনি তোমার নিকটতরো-‘তোমার গর্দানের ধমনী থেকেও.. ‘
… … … …
ক্যাম্পাফায়ার নিভে গেছে। যায়েদ এবং আবু সাইয়িদ ঘুমাচ্ছে আর কাছেই আমাদের তিনিটি উষ্ট্রী শুয়ে আছে চাঁদের আলোয় শুভ্র বালুর উপর, আর জাবর কাটছে মৃদু কড়মড় শবদ করে, মাঝে মাঝে থেমে থেমে। চমৎকার প্রাণী.. . কখনে কখনো ওদের একটি অবস্থান বদলায় এবং তার শৃংগবৎ কুবের সমতল দিকে যমীনের উপর ঘষে, আর মাঝে মাঝে নাকের ভেতর দিয়ে শব্দ করে, যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। চমৎকার, সুস্পষ্টভাবে চিহ্ণিত। হ্যাঁ, মানুষ যত জন্তুকে ব্যবহার করে, সে সবের মধ্যে এই সকল ভূ-দৃশ্য থেকে স্বতন্ত্র, ভিন্নঃ সুনির্দিষ্ট কোনো অভিব্যক্তিহীন এই জীবগুলি দোল খায় বৈপরীত্যে মধ্যে, বিষণ্ণ এবং তা সত্ত্বেও অপরিসীম নম্র, বিনীত।
আমার ঘুম আসছে না, আর এজন্য আমি তাঁবু থেকে হাঁটতে হাঁটতে আগিয়ে যাই এবং নিকটবর্তী একটি টিলায় গিয়ে উঠি। পশ্চিম দিগন্তের উপর একেবারে নীচুতে আকোশে ঝুলে আছে চাঁদ এবং আলোকিত করছে নীচু শিলাগঠিত পাহাড়গুলিকে, যা জেগে উঠছে ভূতর মতো, মৃত প্রান্তরের মধ্য থেকে। এখান থেকে শুরু করে হেজাজের উপকূলীয় নিম্মঞ্চলগুলি বেয়ে চলেছে পশ্চিমদিকে, খুব আস্তে আস্তে ঢালু হতে হতেঃ এক সারি উপত্যকা, যাকে ছেদ করেছে বহু আঁকাবাঁকা শুকিয়ে যাওয়া স্রোতরেখা, যাতে কোনো প্রানের চিহ্ণই নেই , যেখানে গাঁ নেই, ঘরবাড়ি নেই, কোনো গাছপালা নেই-চাঁদের আলোর নগ্নতায় অনঢ় এসব উপত্যকা। এবং তবু, এই বজন প্রাণহীন ভূমি থেকেই, এই বালুময় উপত্যকা আর নগ্ন পাহাড়গুলির মাঝখানে থেকেই ফোয়ারার মতো উৎসারিত হলো মানব ইতিহাসে জীবনকে পরমতম স্বীকৃতি দেয়া ধর্ম… .
উষ্ণ এবং নিথবর এ রাত। আধো আলো এবং দূরত্বের কারণে পাহাড়গুলি যেনো নড়চে, আন্দোলিত হচ্ছে। চাঁদের আলোর নিচে এক স্লান, নীল, নিস্প্রভ দ্যোতি স্পন্দিত হচ্ছে। আর এই অনুজ্জ্বল নীলের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে এক দুগ্ধবৎ শুভ্র জ্যোতির আভাস ভৌতিক স্মৃতির মতো পৃথিবীর সকল রঙের; কিন্তু এ অপার্থিব নীল সব রঙকেই দেয় নিষ্প্রভ করে, গলে গিয়ে দিগন্তে রূপান্তরিত না হয়েই আর এ যেন অনধিগম্য, অজ্ঞেয় বস্তুর প্রতি এক প্রবল আহ্বান!
এখান থেকে খুব দূরে নয়; আমার চোখের কাছে লুকানো আরাফাত প্রান্তর রয়েছে এই প্রাণহীন বিজন উপত্যকা ও পাহাড়গুলির মাঝখানে-মক্কায় যে-সকল হজ্জ্বযাত্রী আসে, সকলেই বছরে যে প্রান্তরে একদিন জমায়েত হয় রোজ হাশরের স্মারক হিসাবে, যেদিন প্রত্যেক মানুষকে তার স্রষ্টার নিকট জবাবদিহি করতে হবে, দাঁড়িয়েছি, খালি মাথায়, হ্জ্জ্বযাত্রীর সাদা পোশাকে, অগনিত সাদা পোশাক-পরা হ্জ্জ্বযাত্রীর মধ্যে, যারা এসেছে তিনটি মহাদেশ থেকে। আমাদের সকলের মুখ ‘জাবল আর রহমা’র দিকে-‘রহমতের পাহাড়’ যা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মাঝখান থেকেঃ দাঁড়িয়ে এবং লক্ষ্য ক’রে কেটে গেছে দুপুর, কেটে গেছে কিবাল, সেই অনিবার্য দিবসের কথা ভাবতে ভাবতে ‘যখন তোমাদের প্রকাশ করা হবে দৃষ্টির সম্মুখে আর তোমাদের গোপন কিছুই থাকবে না লুক্কায়িত… ।
এবং আমি যখন পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে দাঁড়াই আর নীচের দিকে তাকাই, আমার সমুখের ভূ-দৃশ্যের জ্যোছনাধোয়া নীল, অদৃশ্য আরাফাত প্রান্তরের দিকে, যা মুহুর্তকাল আগওে ছিলো সম্পূর্ণ নির্জীব হঠাৎ তা জীবন্ত হয়ে ওঠে-এর মধ্য দিয়ে মানব-জীবনের যে স্রোত বয়ে গেছে তাদের সকলের জীবন প্রবাহ সমেত এবং ভরে ওঠে সব কোটি কোটি সেইসব নর-নারীর রহস্যময় কন্ঠস্বরে যারা সব ম্কা এবং মদীনার মধ্যে পদচারণা করেছে, উটের পিঠে সওয়ার হয়ে চলেছে, তেরো শো বারেরও বেশি হজ্জ উৎসব, তেরো শো বছরের সাদা পোশাক পরা কোটি কোটি হজ্জযাত্রী; আমি শুনতে পাই ওদের চলে যাওয়ার দিনগুলির শব্দ ও ধ্বনি, বিশ্বাস তথা ঈমানের সেই ডানা, যা ওদেরকে আগলে নিয়ে এসে জমা করেছে এই শিলাপাহাড় আর বালুময় দেশে এবং আপাত-নির্জীবতা আবার ঝাপ্টাচ্ছে জীবনের উষ্ণতায়, বহু শহকের পরিধির উপর, আর সে প্রবল পাখা ঝাপ্টা আমাকে টেনে নিয়ে আসে এর কক্ষপথের মধ্যে এবং আমার চলে যাওয়া দিনগুলিকে এসে হাজির করে বর্তমানের ভেতরে এবং আবার আমি উট হাঁকিয়ে চলেছি প্রান্তরের উপর দিয়ে-।
-উট হাঁকিয়ে, ধাবমান উটের পায়ের আঘাতে বজ্রধ্বনি তুলে, প্রান্তরের উপর দিয়ে, ইহরাম-পরা হাজার হাজার বেদুঈনের সংগে আমি ফিরে এসেছি আরাফাত থেকে মক্কায়-সেই গর্জনশীল, পৃথিবী কাঁপানো, অগণিত ধাবমান উষ্ট্রী ও মানুষের অনিবার্য তরংগের একটি ক্ষুদ্র কণা; মানুষগুলির হাতে উচু দণ্ডে ঝুলানো নিজ নিজ গোত্রের ঝাণ্ডা, যা বাতাসে বাড়ি মারছে মাদলের মতো, আর তারে গোত্রীয় যুদ্ধের চীৎকার ছিন্ন করে দিচ্ছে বাতাসকেঃ ‘ইয়া রাওগা, ইয়া রওগা’- যে ধ্বনি তোলে আতাইবা উপজাতির লোকের আহ্বান ক’রে তাদের পূর্বপুরুষকে, যার জবাবে হারব গোত্র হাক ছাড়ে ‘ইয়া আউফ, ইয়া আউফ’, এবং এর প্রায় সম্পূর্ণ বিরুদেধ প্রতিধ্বনি ওঠে সারির একেবারে ডানদিকের বিনার থেকে ‘শাম্মার, ইয়া শাম্মার’।
আমরা উট হাঁকিয়ে ছুটে চলেছি, উড়ে চলেছি প্রান্তরের উপর দিয়ে এবং আমার মনে হলো, আমরা উড়ছি বাতাসে ভর করে, এমন একটি আনন্দের মধ্যে আমরা নিজেদের হারিয়েছে যার শেষ সেই, যার সীমা নেই.. . এবং বায়ু আমার কানে আনন্দের এক উন্মাদ উল্লাস ঘোষণা করে তারস্বরেঃ তুমি আর বেগানা পর রইবে না কখনো-কখখনো না, কখখনো না!
আমার ডানদিকে রয়েছে আমার ভায়েরা এবং আমার বাঁদিকে রয়েছে ভায়েরা, ওরা সকলেই আমার অজানা; কিন্তু কেউই আমার পর নয়, বেগানা নয়ঃ আমাদের লক্ষ্যভিমুখে ছুটে চলার এই প্রচণ্ড উল্লাসে আমরা একটি মাত্র দল, একই লক্ষ্যের সন্ধানে! প্রশস্ত এই পৃথিবী আমাদের সম্মুখে আর আমারেদ হৃদয়ে মিটমিট করে জ্বলছে সেই শিখার একটি স্ফুলিংগ যা জ্বলেছিলো মহানবীর সাহাবাদের অন্তরে। আমার ডান দিকের ভায়ের এবং বাঁদিকের ভায়েরা-ওরা জানে যে, ওদের কাছ থেকে যা আশা করা হয়েছিলো তা থেকে ওরা পড়ে গেছে পেছনে এবং বহু শতকের পরিক্রমায় ওরে হৃদয় হয়ে উঠেছে ছোট্ট, সংকীর্ণঃ এবং তবু সাফল্যের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করা হয়নি ওদের নিকট থেকে, আমাদের কাছ থেকে… .!
সমুদ্রের মতো উদ্বেলিত ভিড়ের মধ্যে থেকে কোনো একজন তার গোত্রীয় চিৎকার ছেড়ে ঈমানের ধ্বনি তোলেঃ আমরা তারই ভাই, যে নিজেকে সমর্পণ করে আল্লাহর নিকট, এবং অপর একজন তার সাথে যোগ দেয়-‘আল্লাহু আকবর,-আল্লাহ মহান।
আর উপজাতিগুলির প্রত্যেকটি দল এই একই ধ্বনি তোলে। এই মুহূর্তে ওরা আর গোত্রীয় অহমিকায় মাতাল নযদি বেদুঈন নয়ঃ ওরা এমন মানুষ যারা জানে আল্লাহর রহস্য সত্যি-সত্যি অপেক্ষা করছে ওদের জন্য.. … আমাদের জন্য.. . হাজার হাজার ধাবমান উষ্ট্রের পদধ্বনি আর শত শত ঝাণ্ডার পতপত আওয়াজের মধ্যে ওদের চীৎকার ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় সাফল্যের তুমুল গর্জনেঃ আল্লাহ আকবর।
এ গর্জন প্রবল বিশাল তরংগের আকারে প্রবাহিত হয় উটের পিঠে ধাবমান হাজার হাজার মানুষের উপর দিয়ে, বিশাল বিস্তীর্ণ প্রান্তরের উপর দিয়ে, পৃথিবীর প্রত্যেকটি কিনার পর্যন্তঃ আল্লাহ আকবর! এই লোকগুলি ওদের ক্ষুদ্র তুচ্ছ জীবন ছড়িয়ে হয়ে উঠেছে বৃহৎ আর ওদের ঈমান এখন ওদের ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে সামনের দিকে, একত্বে, কোনো জরিপ করা হয়নি এমন সব দিগন্তের দিকে.. . আকাংখা এখন আর ছোট্ট এবং গোপন থাকবে না; এর জাগরণ হয়েছে, -চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া সাফল্যের সূর্যোদয়! মানুষ াতর এই সাফল্যের দীর্ঘ পদক্ষেপে আগিয়ে চলে, আল্লাহর দেয়া সকল গৌরব ও দীপ্তির সংগে; তার পদক্ষেপেই তার উল্লাস, তার জ্ঞানই মুক্তি, তআর তার পৃথিবী এমন একটি মণ্ডল যার নেই কোনো সীমা.. .।
উষ্ট্রগুলির গেতের গন্ধ, তাদের নিঃশ্বাস এবং হ্রেষাধ্বনি, তাদের অগণিত পায়ের আঘাতে ওঠা বজ্রের আওয়াজ, মানুষের চীৎকার, জীনের পেরেক থেকে ঝুলানো রাইফেলের টুং টুং, ধূলিবালি আর ঘাম ভেতরে এক আনন্দময়, সুখকর প্রশান্তি।
আমি আমার জীনের উপর ঘুরে বসি এবং আমার পেছনে দেখতে পাই হাজার হাজার সাদা সাদা কাপড়-পর উট সওয়ারদের, ঢেউয়ের পর ঢেউয়ে ভেঙে পড়া জটলা পাকানো ভিড় এবং ওদের ছাড়িয়ে সেই সেতুটি, যার উপর দিয়ে আমি এসেছিঃ এর শেষপ্রান্ত রয়েছে ঠিক আমার পেছনে আর এর শুরু ইতমধ্যে আরিয়ে গেছে দূর ব্যবধানের কুয়াশায়।