ভূমিকা
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লী আলা রাসলিহীল কারীম, আম্মাবাদ
কুরআনে কারীমের পরে রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস ইসলামী জ্ঞানের দ্বিতীয় উৎস ও ইসলামী জীবন ব্যবস্থার ভিত্তি। মুমিনের জীবন আবর্তিত হয় রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসকে কেন্দ্র করে। হাদীস ছাড়া কুরআন বুঝা ও বাস্তবায়ন করাও সহজ নয়। হাদীসের প্রতি এই স্বভাবজাত ভালবাসা ও নির্ভরতার সুযোগে অনেক জালিয়াত বিভিন্ন প্রকার বানোয়াট কথা ‘হাদীস’ নামে সমাজে প্রচার করছে। সকল যুগে আলিমগণ এসকল জাল ও বানোয়াট কথা নিরীক্ষার মাধ্যমে চিহ্নিত করে মুসলমানদেরকে সচেতন করেছেন।
আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে হাদীসের পঠন, পাঠন ও চর্চা থাকলেও সহীহ, যয়ীফ ও বানোয়াট হাদীসের বাছাইয়ের বিষয়ে বিশেষ অবহেলা পরিলক্ষিত হয়। যুগ যুগ ধরে অগণিত বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা কথা আমাদের সমাজে হাদীস নামে প্রচারিত হয়েছে ও হচ্ছে। এতে আমরা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলার কঠিন পাপের মধ্যে নিমজ্জিত হচ্ছি। এছাড়াও দুইভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। প্রথমত, এ সকল বানোয়াট হাদীস আমাদেরকে সহীহ হাদীসের শিক্ষা, চর্চা ও আমল থেকে বিরত রেখেছে। দ্বিতীয়ত, এগূলোর উপর আমল করে আমরা আল্লাহর কাছে পুরস্কার বদলে শাস্তি পাওনা করে নিচ্ছি।
১৯৯৮ সাল থেকে আমার মুহতারাম শ্বশুর ফুরফুরার পীর হযরত মাওলানা আবুল আনসার সিদ্দীকী আল-কুরাইশী সাহেব(হাফিজাহুল্লাহ) আমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন সমাজে প্রচলিত বানোয়াট ও জাল হাদীস সম্পর্কে বই লিখতে। তাঁর নির্দেশ অনুসারে কিছু বিষয় লিখে জমা করেছিলাম। ২০০২-২০০৩ সালে নেদায়ে ইসলামের কয়েক সংখ্যায় এ বিষয়ে কিছূ লিখেছিলাম। কিন্তু যোগ্যতার সীমাবদ্ধতা, সময়ের অভাব ইত্যাদি কারণে বিষয়টি পুস্তকাকারে প্রকাশ করা আর হয়ে উঠছিলনা। অবশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে পুস্তকটি প্রকাশ করতে পেরে তাঁর দরবারে অগণিত শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।
জাল হাদীসের বিষয়ে দুই প্রকারের বিভ্রান্তি বিরাজমান। অনেকেই মনে করেন ‘হাদীস’ মানেই রাসূল(স) এর বাণী। কাজেই কোনো হাদীসকে দূর্বল বলে মনে করার অর্থ, রাসূল(স) এর কথা বা বাণীকে অবজ্ঞা করা। কেউবা মনে করেন যত দূর্বল বা যয়ীফই হোক, যেহেতু রাসূল(স) এর কথা, কাজেই তাকে গ্রহণ ও পালন করতে হবে।
এই ধারণা নিঃসন্দেহে ভ্রান্ত। তবে এর বিপরীতে এরচেয়েও মারাত্মক বিভ্রান্তি অনেকের মাঝে বিদ্যমান। অনেক ‘অজ্ঞ’ পন্ডিত মনে করেন, হাদীস যেহেতু মৌখিকভাবে সনদ বা বর্ণনাকারীদের পরম্পরার মাধ্যমে বর্ণিত এবং রাসূল(স) এর কয়েকশত বৎসর পরে পরে লিখিত ও সংকলিত, কাজেই তার মধ্যে ভুলভ্রান্তি ব্যাপক। এজন্য হাদীসের উপর নির্ভর করা যাবেনা। কেউবা ভাবেন, হাদীসের মধ্যে অনেক জাল কথা আছে, কাজেই আমরা বিবেক বুদ্ধি অনুসারে কোনোটি মানবো আর কোনোটি মানবোনা।
এ সকল বিভ্রান্তির কারণ হলো, হাদীসের সনদ বিচারে ও হাদীসের নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সাহাবীগণ ও পরবর্তী যুগের মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণের সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা। এজন্য এই পুস্তকের প্রথম পর্বে হাদীসের পরিচয়, হাদীসের নামে মিথ্যার বিধান, ইতিহাস, হাদীসের নির্ভূলতা নির্ণয়ে সাহাবীগণ ও পরবর্তী মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষা পদ্ধতি, নিরীক্ষার ফলাফল, মিথ্যার প্রকারভেদ, মিথ্যাবাদী রাবীগণের শ্রেণীবিভাগ, জাল হাদীস নির্ধারণের পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করছি। আশা করি এই আলোচনা পাঠক মনের দ্বিধা ও অস্পষ্টতা দূর করবে এবং হাদীসের নির্ভূলতা রক্ষায় মুসলিম উম্মাহর অলৌকিক বৈশিষ্ট্য পাঠকের কাছে স্পষ্ট হবে।
দ্বিতীয় পর্বে আমাদের সমাজে প্রচলিত কতগুলো ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও জাল হাদীসের বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করেছি। উল্লেখ্য যে, জাল হাদীসের বিষয়ে আমি মূলত নিজের কোনো মতামত উল্লেখ করিনি। দ্বিতীয় হিজরীর তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ী ইমামগণ থেকে শুরু করে পরবর্তী যুগের অগণিত মুহাদ্দিস রাসূলুল্লাহ(স)এর নামে প্রচলিত সকল হাদীস সংকলন করে, গভীর নিরীক্ষা ও যাচাইয়ের মাধ্যমে যে সকল হাদীস ও রাবীদের বিষয়ে যে সকল মতামত প্রদান করেছেন আমি মূলত সেগুলির উপরই নির্ভর করেছি এবং তাঁদের মতামতই উল্লেখ করেছি। যে সকল হাদীস বিষয়ে মুহাদ্দিসগণ মতভেদ করেছেন সেগুলির ক্ষেত্রে তাঁদের মতভেদ উল্লেখ করেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি।
দুই একটি ক্ষেত্রে দেখেছি যে, আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছূ গ্রন্থে এমন কিছূ হাদীস রয়েছে যা সহীহ, যয়ীফ বা মাউযূ কোনো প্রকারের সনদেই কোনো গ্রন্থে পাওয়া যাচ্ছেনা। এগুলি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এই প্রকারের হাদীসের ক্ষেত্রে আমি নিজের মতামত প্রকাশ করেছি। পরবর্তী খন্ডগুলোতে এই প্রকারের হাদীস সম্পর্কে আরো বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করবো, ইনশা আল্লাহ।
এখানে উল্লেখ্য যে, এ ধরনের অনেক কথা সরাসরি হাদীস নামে বলা হয়। আবার অনেক কথা সওয়াব, ফযীলত, বরকত বা ক্ষতির কারণ হিসেবে সাধারণভাবে বলা হয়, কিন্তু পাঠক বা শ্রোতা কথাটিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের(স) এর কথা বলেই বোঝেন। এই জাতীয় অনেক কথা আমাদের দেশে প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়। সেগুলি সম্পর্কেও মাঝে মাঝে আলোচনা করেছি।
প্রচলন বুঝাতে মাঝে মাঝে প্রচলিত বুই-পুস্তক থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করেছি। এ সকল ক্ষেত্রে আমার উদ্দেশ্য কথাটির প্রচলন বোঝানো। লেখক বা বইয়ের সমালোচনা বা অবমূল্যায়ন আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং তাঁদের খেদমতের স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে হাদীসের নামে প্রচলিত বানোয়াট কথাগুলোর পাঠকদের সতর্ক করাই আমার উদ্দেশ্য। সকল লেখকই তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টার জন্য আল্লাহর কাছে পুরস্কার পাবেন। আমরা এ সকল লেখকের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি, তিনি এদের মহান খেদমত কবুল করুন, এদেরকে উত্তম পুরস্কার প্রদান করুন এবং আমাদের ও তাঁদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন।
বইয়ের কলেবল বৃদ্ধির একটি কারণ হলো, প্রায় সকল বিষয়ে বানোয়াট হাদীসগুলো আলোচনার সময় সে বিষয়ে বর্ণিত সহীহ হাদীসগুলির বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা হয়েছে। দুইটি কারণে তা করতে হয়েছে।
প্রথমত, অনেক সময় জালিয়াতগণ জাল হাদীস তৈরি করার সময় সহীহ হাদীসের কিছু শব্দ ও বাক্য তার সাথে জুড়ে দেয়। এছাড়া অনুবাদের কারণে অনেক সময় জাল ও সহীহ হাদীসের অর্থ কাছাকাছি মনে হয়। এজন্য শুধু জাল হাদীসটি উল্লেখ করলে সাধারণ পাঠকের মনে হতে পারে যে, এ বিষয়ের সকল হাদীসই বুঝি জাল। অথবা এই অর্থের একটি হাদীস অমুক গ্রন্থে রয়েছে, কাজেই তা জাল হয় কিভাবে।
দ্বিতীয়ত, শুধু জাল হাদীস চিহ্নিত করাই আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, বিশ্বাস ও কর্মে জাল হাদীস বর্জন করে সহীহ হাদীসের উপর আমল করে নিজেদের নাজাতের জন্য চেষ্টা করা। এজন্য জাল হাদীস উল্লেখের সময় সে বিষয়ক সহীহ হাদীসগুলি সম্পর্কে সংক্ষেপে হলেও কিছু বলেছি।
সম্মানিত পাঠককে একটি বিষয়ে সাবধান করতে চাই। আমরা জানি যে, নিজে কর্ম করার চেয়ে অন্যের সমালোচনা করা অনেক বেশি সহজ ও মানবীয় প্রবৃত্তির কাছে আনন্দদায়ক। এজন্য অনেক সময় আমরা একটি নতুন বিষয় জানতে পারলে সেই নতুন জ্ঞানকে অন্যের দোষ ধরার কাজে ব্যবহার করি।
আমাকে একজন বললেন, “অমুকেরা যয়ীফ বা জাল হাদীস নিয়ে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকে। কত বলি যে, আপনারা সহীহ হাদীসের কিতাব পড়ুন, কিন্তু তাঁরা শুনেননা।” আমি বললাম, “তাঁরা তো যয়ীফ হাদীস নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেয়ে ডাকছেন, আপনি সহীহ হাদীসের গ্রন্থগুলি নিয়ে কয়জনের দ্বারে গিয়েছন?” শুধু সমালোচনা কোনো কল্যাণ বয়ে আনেনা।
এই বই থেকে আমরা অনেক জাল হাদীসের কথা জানতে পারব। এ জ্ঞান আমাদেরকে সহজেই শয়তানের খপ্পরে ফেলে দিতে পারে। আমরা চায়ের দোকানে, মসজিদে, ওয়াযে, বিভিন্ন ব্যক্তি বা দলকে সমালোচনা করে বলতে পারব যে, তারা অমুক জাল হাদীসটি বলেন বা পালন করেন। এই কর্মের দ্বারা আমরা সওয়াবের পরিবর্তে গোনাহ অর্জন করব।
এই বইটি লেখার উদ্দেশ্য তা নয়। এই বইটি লেখার উদ্দেশ্য আমরা অনির্ভরযোগ্য, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হাদীসের পরিবর্তে সহীহ হাদীসগুলির উপর নির্ভর করে নিজেদের কর্ম ও বিশ্বাসকে আরো উন্নত করব। যে সকল সহীহ হাদীস আমরা জানতে পারব সেগুলো ব্যক্তিগতভাবে পালন করব এবং অন্যদেরকে পালন করতে উৎসাহ দেব। যে সকল জাল হাদীসের বিষয়ে জানতে পারব সেগুলি কখনোই আর হাদীস হিসেবে বলবনা বা পালন করবনা। কেউ তা করলে সম্ভব হলে ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের সাথে সংশোধনের চেষ্টা করব। সর্বাবস্থায় মহিমাময় ও করুণাময় আল্লাহর কাছে তার ও আমাদের নিজের ক্ষমা ও কবুলিয়তের জন্য দোআ করব।
সম্মানিত পাঠক, আমার যোগ্যতার কমতি বিষয়ে আমি সচেতন। আমি জানি এ বিষয়ে লেখালেখি করার যোগ্যতা মূলত আমার নেই। যা কিছু লিখেছি সবই মূলত ধার করা বিদ্যা। আর এতে ভুল ভ্রান্তি থাকাই স্বাভাবিক। কাজেই যে কোনো বিষয়ে আপনি যদি আমার ভুল ধরিয়ে দেন তবে আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব এবং আপনাকে ওস্তাদের সম্মান প্রদান করব।
আগেই বলেছি, এই পুস্তকটি লিখতে আমাকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন আমার শ্রদ্ধাভাজন শ্বশুর ফুরফুরার পীর মাওলানা আবুল আনসার সিদ্দিকী। মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি, তিনি যেন তাকে সর্বোত্তম পুরস্কার প্রদান করেন, তাঁকে, তাঁর সন্তান সন্ততি, আত্মীয় স্বজন ও ভক্তবৃন্দকে হেফাজত করেন। এছাড়া অনেক বন্ধু বান্ধব, সহকর্মী, ছাত্র ও শুভান্যুধ্যায়ী আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। বন্ধুবর ড. মো. আবু সিনা, ড. মো. অলি উল্যাহ, জনাব আ.শ.ম. শুআইব আহমদ ও জনাব মো. আব্দুল মালেক বইটির পান্ডুলিপি দেখে অনেক গঠনমূলক পরামর্শ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ সবাইকে উত্তম পুরস্কার প্রদান করুন।
বানানের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে বাংলা একাডেমী মতামত অনুসরণ করা হয়েছে। তবে আরবী-ফারসী শব্দের ক্ষেত্রে মূল উচ্চারণের কাছাকাছি বর্ণ ব্যবহারের চেষ্টা করেছি। বিষয়টি কঠিন। অগণিত আরবী শব্দ ফারসী-উর্দূর প্রভাবে ভুল উচ্চারণে ও ভুল প্রতিবর্ণে বাংলা ভাষার সম্পদে পরিণত হয়েছে। এগুলি অনেক ক্ষেত্রে সেভাবেই রাখা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসের খেদমতে একটি অতি নগন্য প্রচেষ্টা এই গ্রন্থ। আমার কর্মের মধ্যে অনেক ত্রুটি রয়েছে। মহান আল্লাহর দরবারে সকাতরে প্রার্থনা করি, তিনি দয়া করে ভুলত্রুটি ক্ষমা করে এই নগন্য খেদমতটুকু কবুল করেন এবং একে আমার, আমার পিতামাতা, স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়, বন্ধূগণ ও সকল পাঠকের নাজাতের ওসীলা বানিয়ে দেন। আমীন!
আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর
প্রথম পর্ব
হাদীস ও হাদীসের নামে জালিয়াতি
১.১. ওহী ও হাদীস
১.১.১. ওহী এবং মানবতার সংরক্ষণে তার গুরুত্ব
মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি মানবজাতিকে অত্যন্ত ভালবাসেন। মানুষকে তিনি সৃষ্টির সেরা হিসেবে তৈরি করেছেন। তাকে দান করেছেন জ্ঞান, বিবেক, যুক্তি ও বিবেচনা শক্তি যা তাকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। মানুষের এই জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষ তার জ্ঞান, বিবেক ও বিবেচনা দিয়ে তার পার্থিব জগতের বিভিন্ন বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারে এবং নিজেকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু তার ইন্দ্রিয়ের বাইরের কিছু সে জানতে পারেনা। এজন্য ইন্দ্রিয়ের অতীত কোনো বিষয়ে মানুষের জ্ঞান, বিবেক বা যুক্তি দিয়ে সঠিক সমাধানে পৌছাতে অনুরূপভাবে সক্ষম হয়না। আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালেই তা বুঝতে পারি।
জাগতিক বিষয়গুলি মানূষ অভিজ্ঞতা ও গবেষণার মাধ্যমে জানতে পারে। কিভাবে চাষ করলে বেশি ফল ফসল হবে, কিভাবে বাড়ি বানালে বেশি টেকসই হবে, কিভাবে গাড়ি চালালে দ্রুত চলবে, কিভাবে রান্না করলে খাদ্যমানের বেশি সাশ্রয় হবে, কিভাবে ব্যবসা করলে লাভ বেশি হবে বা পুঁজির নিরাপত্তা বাড়বে, কিভাবে চিকিৎসা করলে আরোগ্যের সম্ভাবনা, নিশ্চয়তা বা হার বাড়বে ইত্যাদি বিষয় মানবীয় অভিজ্ঞতা, গবেষণা, যুক্তি ও চিন্তার মাধ্যমে জানা যায়।
কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস, কর্ম ও আচার আচরণ বিষয়ক জ্ঞান কখনো অভিজ্ঞতা বা ঐন্দ্রিক জ্ঞানের মাধ্যমে জানা যায়না। আল্লাহর সম্পর্কে বিশ্বাস কিরূপ হতে হবে, কিভাবে নবী রাসূলগণের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে, পরকালের সঠিক বিশ্বাস কি, কিভাবে আল্লাহকে ডাকতে হবে, কোন্ কর্ম করলে তাঁর রহমত ও বরকত বেশি পাওয়া যাবে, কিভাবে চললে আখিরাতে মুক্তির সম্ভাবনা বাড়বে, কোন্ পদ্ধতিতে চললে দ্রুত আল্লাহর বন্ধুত্ব অর্জন করা যাবে, কোন্ কাজ করলে বেশি সওয়াব অর্জন করা যাবে, কোন্ কর্মে পাপের ক্ষমালাভ হয় ইত্যাদি অধিকাংশ ধর্মীয় ও বিশ্বাসীয় বিষয় কখনোই অভিজ্ঞতা বা গবেষণার মাধ্যমে চূড়ান্তরূপে জানা যায়না বা এ বিষয়ক কোনো সমস্যা গবেষনা বা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে চূড়ান্ত সমাধান করা যায়না।
এজন্য আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে সৃষ্টির সেরা রূপে সৃষ্টি করার পরও তার পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী রাসূলগণ প্রেরণ করেছেন। তিনি যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কিছু মহান মানুষকে বেছে নিয়ে তাদের কাছে তাঁর বাণী, ওহী বা প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেছেন। মানুষ যুক্তি, বুদ্ধি, বিবেক, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যেসব বিষয় জানতে পারেনা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা সে সকল বিষয় ওহীর মাধ্যমে শিক্ষা দান করেছেন। এছাড়া মানুষ বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে যে সকল বিষয় ভাল বা মন্দ বলে বুঝতে পারে সে সকল বিষয়েও ভাল-মন্দের পর্যায়, গুরুত্ব, পালনের উপায় ইত্যাদি তিনি ওহীর মাধ্যমে জানিয়েছেন।
ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের সংরক্ষণ ও তার অনুসরণ ব্যতীত মানব জাতি ও মানব সভ্যতার সংরক্ষণ সম্ভব নয়। স্বার্থের সংঘাত, হানাহানি ও স্বার্থপরতা দূর করে প্রকৃত ভালবাসা, সেবা ও মানবীয় মূল্যবোধগুলির বিকাশ করতে ওহীর জ্ঞানের উপরই নির্ভর করতে হবে। বিশ্বাস, সততা, পাপ, পূণ্য, স্রষ্টা, পরকাল ইত্যাদি বিষয়ে ওহীর বাইরে মানবীয় বিবেক, অভিজ্ঞতা বা গবেষণার আলোকে যা কিছু বলা হয় সবই বিতর্ক, সংঘাত ও বিভক্তি বৃদ্ধি করে। কারণ এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সত্য কখনোই ওহী ছাড়া মানবীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে জানা যায়না। মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের বিকৃতি বা বিলুপ্তির কারণেই বিভিন্ন জাতি বিভ্রান্ত হয়েছে।
১.১.২. ওহীর বিকৃতি বা বিলুপ্তির কারণ
কুরআন হাদীসের বর্ণনা ও বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই যে, ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ দুটিঃ
১. অবহেলা, মুখস্ত না রাখা বা অসংরক্ষণের ফলে ওহীলব্ধ জ্ঞান বা গ্রন্থ হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া।
২. মানবীয় কথাকে ওহীর নামে চালানো বা ওহীর সাথে মানবীয় কথা বা জ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটানো।(খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর, কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা, পৃ ১১-১৫)।
প্রথম পর্যায়ে ওহীর জ্ঞান একেবারে হারিয়ে যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ওহী নামে কিছু জ্ঞান সংরক্ষিত থাকে, যার মধ্যে মানবীয় জ্ঞান ভিত্তিক কথাও সংরক্ষিত থাকে। কোন কথাটি ওহী বা কোন কথাটি মানবীয় তা জানার ব পৃথক করার কোনো উপায় থাকেনা। ফলে ‘ওহী’ নামে সংরক্ষিত গ্রন্থ বা জ্ঞান মূল্যহীন হয়ে যায়। পূর্ববর্তী অধিকাংশ জাতি দ্বিতীয় পদ্ধতিতে ওহীর জ্ঞানকে বিকৃত করেছে। ইহুদী, খ্রীস্টান ও অন্যান্য অধিকাংশ ধর্মাবলম্বীদের নিকট ‘ধর্মগ্রন্থ’, Divine Scripture ইত্যাদি নামে কিছু গ্রন্থ সংরক্ষিত রয়েছে। যেগুলির মধ্যে অগণিত মানবীয় কথা, বর্ণনা ও মতামত সংমিশ্রিত রয়েছে। ওহী ও মানবীয় কথাকে পৃথক করার কোনো পথ নেই এবং সেগুলো থেকে ওহীর শিক্ষা নির্ভেজালভাবে উদ্ধার করার কোনো পথ নেই।
১.১.৩. দুই প্রকার ওহীঃ কুরআন ও হাদীস
কুরআন করীমে বারংবার এরশাদ করা হয়েছে যে, মহিমাময় আল্লাহ তাঁর মহান রাসূলকে দুইটি জিনিস প্রদান করেছেনঃ একটি ‘কিতাব’ বা ‘পুস্তক’ এবং দ্বিতীয়টি ‘হিকমাহ’ বা ‘প্রজ্ঞা’।(সূরা বাকারা ১২৯, ১৫১, ২৩১; সূরা আল ইমরান ১৬৪; সূরা নিসা ১১৩; সূরা আহযাব ৩৪; সূরা জুমুআহ ২)।
এই পুস্তক বা কিতাব হলো কুরআন করীম, যা হুবহু ওহীর শব্দে ও বাক্যে সংকলিত হয়েছে। আর হিকমাহ বা প্রজ্ঞা হলো ওহীর মাধ্যমে প্রদত্ত অতিরিক্ত প্রায়োগিক জ্ঞান যা হাদীস নামে সংকলিত হয়েছে। কাজেই ইসলামে ওহী দুই প্রকারঃ কুরআন ও হাদীস। ইসলামের এই দুই মূল উৎসকে রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওহীর জ্ঞানকে হুবহু নির্ভেজালভাবে সংরক্ষণের জন্য একদিকে কুরআন ও হাদীসকে হুবহু শাব্দিকভাবে মুখস্ত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অপরদিকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয় এমন কোনো কথাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নামে বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
১.১.৪. হাদীসের ব্যবহারিক সংজ্ঞা
হাদীস বলতে রাসূল(স) এর কথা, কর্ম বা অনুমোদনকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের আলোকে রাসূলুল্লাহ(স) যা বলেছেন, করেছেন বা অনুমোদন করেছেন তাকে হাদীস বলা হয়।
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় “যে কথা, কর্ম, অনুমোদন বা বিবরণকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বলে প্রচার করা হয়েছে বা দাবি করা হয়েছে” তাই “হাদীস” বলে পরিচিত। এছাড়া সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ এর কথা, কর্ম বা অনুমোদনকেও হাদীস বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্ম, কথা বা অনুমোদনকে “মারফূ হাদীস” বলা হয়। কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে “মাউকূফ হাদীস” বলা হয় আর তাবেয়ীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে “মাকতূ হাদীস” বলা হয়। [ইরাকী, যাইনুদ্দীন আব্দুর রাহীম ইবনুল হুসাইন(৮০৬হি), আত-তাকয়ীদ ওয়াল ঈদাহ, পৃ ৬৬-৭০; ফাতহুল মুগীস, পৃ. ৫২-৬৩; সাখাবী, মুহাম্মদ ইবনু আবদুর রাহমান(৯০২ হি), ফাতহুল মুগীস ১/৮-৯, ১৭৭-১৫৫; সুয়ূতী, জালালুদ্দীন আবদুর রাহমান ইবনু আবী বকর(৯১১ হি), তাদরীবুর রাবী ১/১৮৩-১৯৪।]
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, যে কর্ম, কথা, অনুমোদন বা বর্ণনা রাসূলুল্লাহ(স) এর বলে দাবী করা হয়েছে বা বলা হয়েছে তাকেই মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় হাদীস বলে গণ্য করা হয়। তা সত্যই রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা কিনা তা যাচাই করে নির্ভরতার ভিত্তিতে মুহাদ্দিসগণ হাদীসের বিভিন্ন প্রকার ও পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন। আমরা পরবর্তী আলোচনায় সেগুলি ব্যাখ্যা করব।
১.১.৫. ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় হাদীসের গুরুত্ব
ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় হাদীসের গুরুত্বের বিষয়টি আলোচনা বাহ্যত নিষ্প্রয়োজনীয়। কুরআন করীমের অনেক নির্দেশ, রাসূলুল্লাহ(স) এর অগণিত নির্দেশ ও সাহাবীগণের কর্মপদ্ধতি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, ‘হাদীস’ ইসলামী জীবন ব্যবস্থার দ্বিতীয় উৎস ও ভিত্তি। বস্তুত মুসলিম উম্মাহর সকল যুগের সকল মানুষ এ বিষয়ে একমত। সাহাবীদের যুগ হতে শুরু করে সকল যুগে হাদীস শিক্ষা, সংকলন, ব্যাখ্যা ও হাদীসের আলোকে মানবজীবন পরিচালিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এভাবে গড়ে উঠেছে হাদীস বিষয়ক সুবিশাল জ্ঞান ভান্ডার। তবে কতিপয় ইহুদী, খৃস্টান প্রাচ্যবিদ ও মুসলিম উম্মাহর কোনো কোনো পন্ডিত বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্নভাবে হাদীসের গুরুত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে পক্ষে উপস্থাপিত দলীলসমূহকে আমরা চারভাগে ভাগ করতে পারিঃ
(১) কুরআন করীমের কিছু আয়াতের আলোকে দাবি করা হয় যে, ‘কুরআনেই সব কিছুর বর্ণনা’ রয়েছে। কাজেই হাদীস নিষ্প্রয়োজনীয়।
(২) হাদীসের বর্ণনা ও সংকলন বিষয়ক কিছু আপত্তি উথ্থাপন করে দাবি করা হয় যে, হাদীসের মধ্যে অনেক জালিয়াতি প্রবেশ করেছে। কাজেই তার উপর নির্ভর করা যায়না।
(৩) কিছু হাদীস উল্লেখ করে হাদীসের মধ্যে বিজ্ঞান বা জ্ঞানবিরোধী কথাবার্তা বা বৈপরীত্য আছে বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা।
(৪) কিছু হাদীস থেকে তাঁরা প্রমাণ(!) পেশ করেন যে, রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণ হাদীসের উপর গুরুত্ব প্রদান করতে নিষেধ করেছেন।
এ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা আমাদের গ্রন্থের পরিসরে সম্ভব নয়। তবে আমরা আমাদের এই গ্রন্থে হাদীসের জালিয়াতি ও সহীহ হাদীস থেকে জাল হাদীসকে পৃথক করার বিষয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের সকল আলোচনা এবং সাহাবীদের যুগ থেকে আজ পর্য্ন্ত মুসলিম উম্মাহর সকল শ্রমের মূল ভিত্তিটিই হলো এই যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসের অনুসরণ ছাড়া কুরআন পালন, ইসলাম পালন বা মুসলমান হওয়া যায়না। আমাদের জীবন চলার অন্যতম পাথেয় রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস। তবে আমাদের অবশ্যই বিশুদ্ধ ও প্রমাণিত হাদীসের উপর নির্ভর করতে হবে।
হাদীস বাদ দিলে আর কোনোভাবেই কুরআন মানা বা ইসলাম পালন করা যায়না। হাদীসের বিরুদ্ধে এ সকল মানুষের উথ্থাপিত যুক্তিগুলোর মধ্যে প্রথম যুক্তিটি আমরা আলোচনা করতে পারি। আমরা দেখতে পাব যে, কুরআন মানতে হলে হাদীস মানা আবশ্যক। নিম্নের বিষয়গুলি লক্ষ্য করুনঃ
(১) ‘ওহী’র মাধ্যমে যে নির্দেশনা মানব জাতি লাভ করে তার বাস্তব প্রয়োগ ও পালনের সর্বোচ্চ আদর্শ হন ‘ওহী প্রাপ্ত নবীগণ ও তাঁদের সাহচর্য্ প্রাপ্ত শিষ্য ও সঙ্গীগণ। তাঁদের জীবনাদর্শই মূলত অন্যদের জন্য ওহীর অুনসরণ ও পালনের একমাত্র চালিকা শক্তি। এজন্য সকল সম্প্রদায়ের মানুষেরা ধর্ম প্রচারক ও তাঁর শিষ্য, প্রেরিত ও সহচরদের জীবন, কর্ম ও আদর্শকে ধর্ম পালনের মূল উৎসরূপে সংরক্ষণ ও শিক্ষাদান করেন। আর রাসূলুল্লাহ(স) এর জীবন, কর্ম, ত্যাগ, ধৈর্য্, মানবপ্রেম, আল্লাহর ভয়, সত্যের পথে আপোষহীনত ….. ইত্যাদি হাদীস ছাড়া জানা সম্ভব নয়। একজন মুসলমানকে হাদীস থেকে বিচ্ছিন্ন করার অর্থই হলো তাঁকে রাসূলুল্লাহ(স) এর বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। একে অতি সহজেই তাঁকে কুরআন থেকে এবং ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সম্ভব হয়।
(২) হাদীসের উপর নির্ভর না করলে কুরআন এর পরিচয় লাভ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মুহাম্মদ(স) এর জীবন, পরিচয়, বিশ্বস্ততা, সততা, নব্যুয়ত ইত্যাদি কোনো তথ্যই হাদীসের মাধ্যম ছাড়া জানা সম্ভব নয়। তিনি কিভাবে কুরআন লাভ করলেন, শিক্ষা দিলেন, সংকলন করলেন…….ইত্যাদি কোনো কিছুই হাদীসের তথ্যাদি ছাড়া জানা সম্ভব নয়।
(৩) হাদীসের উপর নির্ভর না করলে কুরআন মানাও সম্ভব নয়।
কুরআন করীমে সকল কিছুর বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু তা সবই শুধুমাত্র ‘মূলনীতি’ বা ‘প্রাথমিক নির্দেশনা’ রূপে। কুরআন করীমের অধিকাংশ নির্দেশই ‘প্রাথমিক নির্দেশ’, ব্যাখ্যা ছাড়া যেগুলি পালন করা অসম্ভব। ইসলামের সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম সালাত বা নামায। কুরআন করীমে শতাধিক স্থানে সালাতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সালাতের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করা হয়নি। বিভিন্ন স্থানে রুকু করার বা সেজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে ‘যেভাবে তোমাদের সালাত শিখিয়েছি সেভাবে সালাত আদায় করা।’ কিন্তু কুরআন করীমের কোথাও সালাতের এই পদ্ধতিটি শেখানো হয়নি। ‘সালাত’ বা ‘নামায’ কী, কথন তা আদায় করতে হবে, কখন কত রাকায়াত আদায় করতে হবে, প্রত্যেক রাক‘আত কী পদ্ধতিতে আদায় করতে হবে, প্রত্যেক রাক‘আতে কুরআন পাঠ কিভাবে হবে, রুকু কয়টি হবে, সিজদা কয়টি হবে, কিভাবে রুকু ও সেজদা আদায় করতে হবে…ইত্যাদি কোনো কিছুই কুরআনে শিক্ষা দেওয়া হয়নি। কুরআনের সর্বশ্রেষ্ট নির্দেশকে আমরা কোনোভাবেই হাদীসের উপর নির্ভর না করে আদায় করতে পারছিনা। এভাবে কুরআন হাদীসের অধিকাংশ নির্দেশই হাদীসের ব্যাখ্যা ছাড়া পালন সম্ভব নয়।
(৪) কুরআন করীমে কিছু নির্দেশ বাহ্যত পরস্পর বিরোধী। যেমন কোথাও মদ, জুয়া ইত্যাদিকে বৈধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কোথাও তা অবৈধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও কাফির ও অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কোথাও সকল প্রকার বিরোধিতা এবং যুদ্ধ হতে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাদীসের নির্দেশনা ছাড়া এ সকল নির্দেশের কোনটি আগে, কোনটি পরে এবং কিভাবে সেগুলি পালন করতে হবে তা জানা যায়না। এজন্য হাদীস বাদ দিলে এসকল আয়াতের ইচ্ছামত ও মনগড়া ব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা সহজ হয়ে যায়।
মূলত এজন্যই ইহুদী, খৃষ্টান, কাদিয়ানী, বাহাঈ প্রমুখ সম্প্রদায় হাদীসের বিরুদ্ধে ঢালাও অপপ্রচার চালান। তাদের উদ্দেশ্য হলো মুসলিম উম্মাহকে কুরআন ও ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া। তারাও জানেন যে, হাদীসের সাহায্য ছাড়া কোনোভাবেই কুরআন মানা যায়না। শুধুমাত্র সরলপ্রাণ মুসলমানদের ধোঁকা দেয়ার জন্যই তারা মূলত ‘কুরআনের’ নাম নেন।
(৫) আমরা দেখেছি যে, আল্লাহ তাঁর রাসূল(স) কে দুইটি বিষয় প্রদান করেছেনঃ কিতাব(পুস্তক) ও হিকমাহ(প্রজ্ঞা)। স্বভাবতই কুরআনও প্রজ্ঞা ও হিকমাহ। তবে বারংবার পৃথকভাবে উল্লেখ করা থেকে আমার জানতে পারি যে, কুরআনের অতিরিক্ত প্রজ্ঞা বা জ্ঞান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (স) কে প্রদান করেছিলেন এবং তিনি কুরআন ছাড়াও অতিরিক্ত অনেক শিক্ষা মানব জাতিকে প্রদান করেছেন এই প্রজ্ঞা থেকে। আমরা জানি যে, কুরআনের যে অতিরিক্ত শিক্ষা তিনি প্রদান করেছিলেন, তাই ‘হাদীস’ রূপে সংকলিত। ‘হাদীস’ ছাড়া তাঁর প্রজ্ঞা জানার ও মানার আর কোনো উপায় নেই। কাজেই কুরআনের নির্দেশ অনুসারেই আমাদেরকে কুরআন ও হাদীসের অনুসরণে জীবন পরিচালিত করতে হবে।
(৬) কুরআনে রাসূলুল্লাহ(স) এর আনুগত্য করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আনুগত্য ছাড়াও তাঁকে অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ
-“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, এতে আল্লাহ তোমাদিগকে ভালবাসবেন, এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করবেন।” (সূরা আল ইমরানঃ৩১)।
আমরা জানি যে, আনুগত্য অর্থ আদেশ নিষেধ পালন করা। আর কারো অনুসরণ করার অর্থ হলো হুবহু তাঁর কর্মের মত কর্ম করা। হাদীসের উপর নির্ভর না করলে কোনোভাবেই রাসূলুল্লাহ(স) এর অনুসরণ করা সম্ভব নয়। কুরআন কারীমে আদেশ নিষেধ উল্লেখ করা হলেও কোথাও রাসূলুল্লাহ(স) কর্ম ও জীবনরীতি আলোচিত হয়নি। এজন্য শুধুমাত্র কুরআন দেখে রাসূলুল্লাহ(স) এর অনুসরণ করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। কাজেই কুরআনের নির্দেশ অনুসারে আল্লাহর প্রেম ও ক্ষমা লাভ করতে হলে অবশ্যই হাদীসের বর্ণনা অনুসারে রাসূলুল্লাহ(স)এর অনুসরণ করতে হবে।
(৭) কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছেঃ
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
-নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে। (সূরা আল আহযাবঃ২১)।
ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ(স) এর বাস্তব জীবননীতি কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, কুরআনের নির্দেশে রাসূলুল্লাহ(স) এর আদর্শ অনুসরণ করতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই হাদীসের উপর নির্ভর করতে হবে।
(৮) কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছে যেঃ
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا
-“রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।”(সূরা হাশরঃ৭)।
আমরা জানি যে, রাসূলুল্লাহ(স) তাঁর সুদীর্ঘ নব্যুয়তী জীবনে অনেক অনেক শিক্ষা প্রদান করেছেন তাঁর সাহাবীগণকে। জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে খুঁটিনাটি অনেক দিকনির্দেশনা তিনি প্রদান করেছেন। এ সকল শিক্ষা ও নির্দেশনাও ‘রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন’ এর অন্তর্ভূক্ত। কাজেই ‘রাসূল যা দিয়েছেন’ সবকিছু গ্রহণ করতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে কুরআনের পাশাপাশি হাদীসের উপর নির্ভর করতে হবে।
হাদীস সংকলন, লিখন, বর্ণনা ও জালিয়াতি বিষয়ক তাঁদের অন্যান্য আপত্তির বিষয় আমরা এই পুস্তকের অন্যান্য আলোচনা থেকে জানতে পারব। তবে এখানে আমরা বুঝতে পারছি যে, কুরআনের নির্দেশনা অনুসারেই আমাদেরকে হাদীসের আলোকে জীবন গঠন করতে হবে, হাদীসের আলোকে রাসূলুল্লাহ(স) এর হুবহু অনুসরণ করতে হবে, হাদীসের আলোকে রাসূলুল্লাহ(স) এর আদর্শে জীবন গড়তে হবে এবং হাদীসের ভিত্তিতেই আমাদেরকে কুরআনের নির্দেশাবলী পালন করতে হবে। আমরা আরো দেখছি যে, হাদীস ছাড়া কোনো অবস্থাতেই কুরআন পালন বা ইসলামী জীবন গঠন সম্ভব নয়।
হাদীসের এই গুরুত্বের বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ মূলত একমত। আর এজন্যই হাদীসের নামে জালিয়াতি ও মিথ্যা প্রতিরোধের সর্বোত্তম নিরীক্ষা ও বিচার পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন তাঁরা। তাঁদের নিরীক্ষা ও বিচার পদ্ধতির আলোচনার আগে আমরা মিথ্যার পরিচয় ও ওহীর নামে মিথ্যার বিধান আলোচনা করব। মহান আল্লাহর নিকট তাওফীক প্রার্থনা করছি।
১.২. মিথ্যা ও ওহীর নামে মিথ্যা
১.২.১. মিথ্যার সংজ্ঞা
প্রসিদ্ধ ও পরিজ্ঞাত বিষয় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। মিথ্যার সংজ্ঞা কি? সত্যের বিপরীতই মিথ্যা। যা সত্য নয় তাই মিথ্যা। এমন কিছু বলা, যা প্রকৃতপক্ষে ঠিক নয় বা সত্য নয় তাই মিথ্যা।
১.২.১.১. ইচ্ছাকৃত বনাম অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা
বিষয়টি স্পষ্ট। তবে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার বিষয়ে মুসলিম আলিমদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের আলেমগণ মনে করতেন যে, ভুল বশত যদি কেউ কিছু বলেন যা প্রকৃত অবস্থার বিপরীত তবে তা শরীয়তের পরিভাষায় মিথ্যা বলে গণ্য হবেনা। শুধুমাত্র জেনেশুনে মিথ্যা বললেই তা মিথ্যা বলে গণ্য হবে। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আলিমগণ এই ধারণার প্রতিবাদ করেছেন। তাঁদের মতে না জেনে বা ভুলে মিথ্যা বললেও তা শরীয়তের পরিভাষায় মিথ্যা বলে গণ্য হবে।
ইমাম আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ আন-নাবাবী(৬৭৬হি) বলেনঃ “হক্ক পন্থী আলেমদের মত হলো, ইচ্ছাকৃতভাবে, অনিচ্ছায়, ভুলে বা অজ্ঞতার কারণে প্রকৃত অবস্থার বিপরীত কোনো কথা বলাই মিথ্যা।” [নাবাবী, ইয়াহইয়া ইবনে শারাফ(৬৭৬ হি) শারহু সাহীহি মুসলিম ১/৯৪]
তিনি আরো বলেনঃ “আমাদের আহলুস সুন্নাহ-পন্থী আলিমগণের মতে মিথ্যা হলো প্রকৃত অবস্থার বিপরীত কোনো কথা বলা, তা ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা ভুলে হোক। মু্‘তাযিলাগণের মতে শুধু ইচ্ছাকৃত মিথ্যাই মিথ্যা বলে গণ্য হবে।” (নাবাবী, শারহু সাহীহি মুসলিম ১/৬৯)।
১.২.১.২. হাদীসের আলোকে অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা
হাদীসের ব্যবহার থেকে আমরা নিশ্চিত হই যে, ইচ্ছাকৃতভাবে, অনিচ্ছাকৃতভাবে, অজ্ঞতার কারণে বা যে কোনো কারণে বাস্তবের বিপরীত যে কোনো কথা বলাই মিথ্যা বলে গণ্য।
১. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ(রা) বলেনঃ আরবী(******)
-হাতিব ইবনু আবী বালতা‘আ(রা) এর একজন দাস রাসূল(স) এর নিকট আগমন করে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল!নিশ্চয় হাতিব জাহান্নামে প্রবেশ করবেন। তখন রাসূলুল্লাহ(স) বলেনঃ তুমি মিথ্যা বলেছ। সে জাহান্নামে প্রবেশ করবেনা; কারণ সে বদর ও হুদাইবিয়ায় উপস্থিত ছিল। (মুসলিম, আস সহীহ ৪/১৯৪২)।
এখানে রাসূলুল্লাহ(স) হাতিবের এই দাসের কথাকে মিথ্যা বলে গণ্য করেছেন। সে অতীতের কোনো বিষয়ে ইচ্ছাকৃত কোনো মিথ্যা বলেনি। মূলত সে ভবিষ্যতের বিষয়ে তার একটি ধারণা বলেছে। সে যা বিশ্বাস করেছে তাই বলেছে। তবে যেহেতু তার ভবিষ্যদ্বাণীটি বাস্তবের বিপরীত সেজন্য আল্লাহর রাসূল(স) তাকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন। এথেকে আমরা বুঝতে পারি যে, অতীত বা ভবিষ্যতের যে কোনো সংবাদ যদি বাস্তবের বিপরীত হয় তাহলে তা মিথ্যা বলে গণ্য হবে। সংবাদদাতার ইচ্ছা, অনিচ্ছা, অজ্ঞতা বা অন্য কোনো বিষয় এখানে ধর্তব্য নয়। তবে মিথ্যার পাপ বা অপরাধ ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত।
২. তাবেয়ী সালিম ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, আমার পিতা আবদুল্লাহ ইবনু উমারকে(রা) বলতে শুনেছিঃ আরবী(*****)
-এই হলো তোমাদের বাইদা প্রান্তর, যে প্রান্তরের বিষয়ে তোমরা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বল(তিনি এই স্থান হতে হজ্জের ইহরাম শুরু করেছিলেন বলে তোমরা বল।) অথচ রাসূলুল্লাহ(স) যুল হুলাইফা প্রান্তরে মসজিদের নিকট হতে হজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। (মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮৪৩)।
স্বভাবতই ইবনু উমার(রা)এসকল সাহাবী তাবেয়ীগণকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলার অভিযোগ করছেননা। রাসূলুল্লাহ(স) বিদায় হজ্জের সময় লক্ষাধিক সাহাবীকে নিয়ে হজ্জ করেন। তিনি মদীনা থেকে বের হয়ে ‘যুল হুলাইফা’ প্রান্তরে রাত্রি যাপন করেন এবং পরদিন সকালে সেখান থেকে হজ্জের এহরাম করেন। যুল হুলাইফা প্রান্তরের সংলগ্ন ‘বাইদা’ প্রান্তর। যে সকল সাহাবী কিছু দূরে ছিলেন তাঁরা তাঁকে যুল হুলাইফা থেকে এহরাম বলতে শুনেননি, বরং বাইদিয়া প্রান্তরে তাঁকে তালবীয়া পাঠ করতে শুনেন। তাঁরা মনে করেন যে, তিনি বাইদা থেকেই এহরাম শুরু করেন। একারণে অনেকের মধ্যে প্রচারিত ছিল যে, রাসূলুল্লাহ(স) বাইদা প্রান্তর থেকে এহরাম শুরু করেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমার যেহেতু কাছেই ছিলেন, সেহেতু তিনি প্রকৃত ঘটনা জানতেন।
এভাবে আমরা দেখছি যে, বাইদা থেকে এহরাম করার তথ্যটি ছিল অনিচ্ছাকৃত ভুল। যারা তথ্যটি প্রদান করেছেন তারা তাদের জ্ঞাতসারে সত্যই বলেছেন। কিন্তু তথ্যটি যেহেতু বাস্তবের বিপরীত এজন্য ইবনু উমার তাকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন।
১.২.১.৩. মিথ্যা বনাম ‘মাউদূ’(মাউযূ) ও ‘বাতিল’
(মূল আরবী উচ্চারণে আমরা মাউদূ বলতেই অভ্যস্ত। পক্ষান্তরে ফার্সী ও উর্দূ প্রভাবিত বাংলা ব্যবহারে আমরা মাউযূ বলে থাকি)।
হাদীসের পরিভাষায় ও প্রথম শতকে সাহাবী-তাবেয়ীগণের পরিভাষায় রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কথিত মিথ্যা কথাকে ‘মিথ্যা হাদীস’ বলে অভিহিত করা হতো। আবু উমামাহ(রা), বলেন রাসূলুল্লাহ(স) বলেনঃ আরবী(*******)
-যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে ‘মিথ্যা হাদীস’ বলবে তাকে জাহান্নামে বসবাস করতে হবে।(তাবারানী, সুলাইমান ইবনু আহমদ(৩৬০ হি), আল-মু’জামুল কাবীর ৮/১২২)
যে কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেননি তা তাঁর নামে বলা হলেও সাহাবীগণ বলতেনঃ এই হাদীসটি মিথ্যা, মিথ্যা হাদীস বা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করতেন। এই ধরনের মানুষদের সম্পর্কে ‘মিথ্যাবাদী’, ‘সে মিথ্যা বলে’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতেন। [ইবনু আবু হাতিম, আবদুর রাহমান ইবনু মুহাম্মাদ(৩২৭ হি), আল-জারহু ওয়াত তা’দীল ১/৩৪৯, ৩৫০, ৩৫১, ৩/৪০৭, ৬/২১২, ৮/১৬, ৫২, ৩২৫; যাহাবী, মুহাম্মদ ইবনু আহমাদ(৭৪৮ হি) মীযানুল ই‘তিদাল ১/২৭১, ২৮৫, ২/৮০, ১০৯, ১২২, ২৪১, ৩/৪, ৫০, ৩৭৫, ৪৬৭, ৪৭৫, ৪/৩১, ৯১, ১৭৮, ১৯১, ৪২০, ৪২৮, ৪৩৭, ৫/৩, ২৯, ৫২, ৫৪, ৮৮, ১২৮, ১৬৯, ২০৭, ২২০, ৬/২৪, ৫৫, ১৩৮,২৪৬, ২৪৯, ৫৩৪, ৫৪৫, ৫৬৬, ৭/২১৯, ৩৪১, ৩৯৩, ৮/১৬২, ১৮২, ১৯৬; ইবনু হাজার আসকালানী, আহমাদ ইবনু আলী(৮৫২ হি), ফাতহুল বারী, ১৩/১১৩; আল-মুনাবী, মুহাম্মদ আবদুর রাউফ(১০৩১ হি), ফাইদুল কাদীর ১/৫৪০, ৩/২১৯, ৫/৩০০, ৬/১৫, ২১৬, ২২১, ৩৫৩।]
দ্বিতীয় হিজরী শতক হতে হাদীসের নামে মিথ্যার প্রসারের সাথে সাথে এ সকল মিথ্যাবাদীদের চিহ্নিত করতে মুহাদ্দিসগণ মিথ্যার সমার্থক আরেকটি শব্দ ব্যবহার করতে থাকেন। শব্দটি (আরবী*****)। শব্দটির মূল অর্থ নামানো, ফেলে দেওয়া, জন্ম দেওয়া। বানোয়াট অর্থে ও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। [ইবনু দুরাইদ, মুহাম্মদ ইবনুল হাসান(৩২১হি), জামহারাতুল লাগহ ৩/৯৫; জাওহারী, ইসমাঈল ইবনে মুহাম্মাদ(৩৯৩ হি), আস-সিহাহ ৩/১২৯৯; ইবনু ফারিস, আহমদ(৩৯৫হি), মু‘জাম মাকাঈসুল লুগাহ ৬/১১৭-১১৮; ইবনুল আসীর, মুহাম্মদ ইবনুল মুবারক(৬০৬হি), আন-নিহাইয়াহ ৫/১৯৭, ১৯৮; ইবনূ মানযূর, মুহাম্মাদ ইবনুল মাকরাম(৭১১ হি), লিসানুল আরাব ৮/৩৯৬-৩৯৭; ফাল্লাতা, উমার ইবনু হাসান, আল ওয়াদউ ফিল হাদীস ১/১০৮]
ইংরেজীতেঃ To lay, lay Off, lay down, put down, set up…give birth, produce,…humiliate, to be low, humble(Hans Wehr, A Dictionary of Modern Written Arabic. P1076).
পরবর্তী যুগে মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় এই শব্দের ব্যবহারই ব্যাপকতা লাভ করে। তাঁদের পরিভাষায় হাদীসের নামে মিথ্যা বলাকে ‘ওয়াদউ’ এবং এ ধরনের মিথ্যা হাদীসকে ‘মাউদূ’ বলা হয়। ফার্সী উর্দূ প্রভাবিত বাংলা উচ্চারণে আমরা সাধারণত বলি ‘মাউযূ’।
অনেক মুহাদ্দিস ইচ্ছাকৃত মিথ্যা ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা বা ভুল উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি। উভয় প্রকার মিথ্যা হাদীসকেই তাঁরা মাউদূ হাদীস বলে অভিহিত করেছেন। বাংলায় আমরা মাউদূ অর্থ জাল বা বানোয়াট বলতে পারি।
মুহাদ্দিসগণ মাউযূ হাদীসের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন দুইভাবে; অনেক মুহাদ্দিস মাউযূ হাদীসের সংজ্ঞায় বলেছেন : “বানোয়াট জাল হাদীসকে মাউযূ হাদীস বলা হয়।” এখানে তাঁরা হাদীসের প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।
অন্যান্য মুহাদ্দিস মাউযূ হাদীসের সংজ্ঞায় বলেছেনঃ “যে হাদীস শুধুমাত্র কোনো মিথ্যাবাদী রাবী বর্ণনা করেছে তা মাউযূ হাদীস।” এখানে তাঁরা মাউযূ বা জাল হাদীসের সাধারণ পরিচয়ের দিকে লক্ষ্য করেছেন। আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখতে পাব যে, মুহাদ্দিসগণ মূলত তুলনামূলক নিরীক্ষার (Cross Examine) মাধ্যমে রাবীর সত্য মিথ্যা যাচাই করতেন।
কোনো কোনো মুহাদ্দিস ইচ্ছাকৃত মিথ্যা ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাঁরা অনিচ্ছাকৃত মিথ্যাকে ‘বাতিল’ ও ইচ্ছাকৃত মিথ্যাকে ‘মাউযূ’ বা ‘মাউদূ’ বলে উল্লেখ করেছেন। মুহাদ্দিসগণের তুলনামূলক নিরীক্ষা ও যাচাইয়ের মাধ্যমে যদি প্রমাণ হয় যে, এই বাক্যটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেননি, কিন্তু ভুল করে তাঁর নামে বলা হয়েছে, তাহলে তাঁরা সেই হাদীসটিকে ‘বাতিল’ বলে অভিহিত করেন। আর যদি নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখা যায় যে, বর্ণনাকারী ইচ্ছাপূর্বক বা জ্ঞাতসারে এই কথাটি রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে নামে বলেছে, তাহলে তাঁরা একে মাউযূ হাদীস নামে আখ্যায়িত করেন।
মিথ্যা হাদীস সংকলনের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ প্রথম পদ্ধতিই অনুসরণ করেছেন। তাঁরা ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত সকল প্রকার মিথ্যাকেই মাউযূ বলে গণ্য করেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য হলো যে কথা রাসূলে করীম(স) বলেননি বা যে কর্ম তিনি করেননি, অথচ তাঁর নামে কথিত বা প্রচারিত হয়েছে, সেগুলি চিহ্নিত করে ওহীর নামে জালিয়াতি রোধ করা। বর্ণনাকারী ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যাটি বলেছেন, নাকি ভুলবশত তা বলেছেন সে বিষয় তাঁদের বিবেচ্য বিষয় নয়। এ বিষয় বিবেচনার জন্য রিজাল ও জারহ ওয়াত্ তাদীল শাস্ত্রে পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে। (আল মা’লামী, মুকাদ্দিমাতুল ফাওয়াইদ, পৃ ৫৭)।
১.২.২. মিথ্যার বিধান
ওহী বা হাদীসের নামে মিথ্যা বলার বিধান আলোচনার আগে আমরা সাধারণভাবে মিথ্যা বলার বিধান আলোচনা করতে চাই। মিথ্যাকে ঘৃণা করা মানুষের সহজাত প্রবৃতির একটা অংশ। এজন্য সকল মানব সমাজে মিথ্যাকে পাপ, অন্যায় ও ঘৃণিত মনে করা হয়। কুরআন কারীমে ও হাদীস শরীফে মিথ্যাকে অত্যন্ত কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াতে মুমিনদিগকে সর্বাবস্থায় সত্যপরায়ণ হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাথে সাথে মিথ্যাকে ঘৃণিত পাপ ও কঠিন শাস্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সার্বক্ষণিক সত্যবাদিতার নির্দেশ দিয়ে এরশাদ হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ [٩:١١٩]
-হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভূক্ত হও।(সূরা তাওবাঃ ১১৯)
মিথ্যার ভয়ানক শাস্তির বিষয়ে বলা হয়েছেঃ
فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ [٢:١٠]
-তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাচারী। (সূরা বাকারাঃ ১০)
অন্যত্র এরশাদ করা হয়েছেঃ
فَأَعْقَبَهُمْ نِفَاقًا فِي قُلُوبِهِمْ إِلَىٰ يَوْمِ يَلْقَوْنَهُ بِمَا أَخْلَفُوا اللَّهَ مَا وَعَدُوهُ وَبِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ [٩:٧٧]
-পরিণামে তিনি(আল্লাহ) তাদের অন্তরে কপটতা স্থির করলেন আল্লাহর সাথে তাদের সাক্ষাৎ-দিবস পর্য্ন্ত, কারণ তারা আল্লাহর নিকট যে অঙ্গীকার করেছিল তা ভংগ করেছিল এবং তারা ছিল মিথ্যাচারী।(সূরা তাওবাঃ ৭৭)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছেঃ
إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ [٤٠:٢٨]
-আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেননা (সূরা মুমিনঃ ২৮)।
অগণিত হাদীসে মিথ্যাকে ভয়ংকর পাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এক হাদীসে আবুদল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(********)
-সত্য পূণ্য। সত্য পূণ্যের দিকে পরিচালিত করে এবং পূণ্য জান্নাতের দিকে পরিচালিত করে। যে মানুষ সদা সর্বদা সত্য বলতে সচেষ্ট থাকেন তিনি এক পর্যায়ে আল্লাহর নিকট ‘সিদ্দীক’ বা মহা সত্যবাদী বলে লিপিবদ্ধ হন। আর মিথ্যা পাপ। মিথ্যা পাপের দিকে পরিচালিত করে আর পাপ জাহান্নামের দিকে পারিচালিত করে। যে মানুষটি মিথ্যা বলে বা মিথ্যা বলতে সচেষ্ট থাকে সে এক পর্যায়ে মহা মিথ্যাবাদী বলে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। [বুখারী, মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল (২৫৬ হি), আস-সহীহ ৫/২২৬১, মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (২৬২ হি), আস-সহীহ ৪/২০১২, ২০১৩]।
হাদীস শরীফে মিথ্যা বলাকে মুনাফিকীর অন্যতম চিহ্ন বলে গণ্য করা হয়েছে। এমনকি বলা হয়েছে যে, মুমিন অনেক অন্যায় করতে পারে, কিন্তু কথনো মিথ্যা কথা বলতে পারেনা। সা’দ ইবনু আবু ওয়াক্কাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী (*******)
-মুমিনের প্রকৃতিতে সব অভ্যাস থাকতে পারে, কিন্তু খিয়ানত ও মিথ্যা থাকতে পারেনা। [বাযযার, আবু বাকর আহমদ ইবনু আমর (২৯২ হি), আল মুসনাদ ৩/৩৪১, হাইসামী, আলী ইবনু আবী বাকর (৮০৭ হি), মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৯২]
১.২.৩. ওহীর নামে মিথ্যা
মিথ্যা সর্বদা ঘৃণিত। তবে তা যদি ওহীর নামে হয় তাহলে তা আরো বেশি ঘৃণিত ও ক্ষতিকর। সাধারণভাবে মিথ্যা ব্যক্তিমানূষের বা মানবসমাজের জন্য জাগতিক ক্ষতি বয়ে আনে। আর ওহীর নামে মিথ্যা মানব সমাজের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক স্থায়ী ক্ষতি ও ধ্বংস করে। মানুষ তখন ধর্মের নামে মানবীয় বুদ্ধি প্রসূত বিভিন্ন কর্মে লিপ্ত হয়ে জাগতিক ও পারলৌকিক ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত হয়।
পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর দিকে তাকালে আমরা বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। আমরা আগেই বলেছি যে, মানবীয় জ্ঞান প্রসূত কথাকে ওহীর নামে চালানোই ধর্মের বিকৃতি ও বিলুপ্তির কারণ। সাধারণভাবে এ সকল ধর্মের প্রাজ্ঞ পন্ডিতগণ ধর্মের কল্যাণেই এ সকল কথা ওহীর নামে চালিয়েছেন। তারা মনে করেছেন যে, তাদের এ সকল কথা, ব্যাখ্যা, মতামত ওহীর নামে চালালে মানুষের মধ্যে ‘ধার্মিকতা’, ‘ভক্তি’ ইত্যাদি বাড়বে এবং আল্লাহ খুশি হবেন। আর এভাবে তারা তাদের ধর্মকে বিকৃত ও ধর্মাবল্বীদেরকে বিভ্রান্ত করেছেন। কিন্তু তারা বুঝেননি যে, মানুষ যদি মানবীয় প্রজ্ঞায় এ সকল বিষয় বুঝতে পারতো তাহলে ওহীর প্রয়োজন হতোনা।
এর অত্যন্ত পরিচিত উদাহরণ খৃস্টধর্ম। প্রচলিত বিকৃত বাইবেলের বিবরণ অনুযায়ী ‘যীশুখৃস্ট’ তাঁর অনুসারীদেরকে কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে, ইহুদী ধর্মের ১০ মূলনীতি পালন করতে, খাতনা করতে, তাওরাতের সকল বিধান পালন করতে, শূকরের মাংস ভক্ষণ থেকে বিরত থাকতে ও অনুরূপ অন্যান্য কর্মের নির্দেশ প্রদান করেন। মিথ্যাবাদী শৌল পৌল নাম ধারণ করে ‘খৃস্টধর্মের প্রচার ও মানুষের মধ্যে ভক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে’ প্রচার করতে থাকেন যে, শুধুমাত্র ‘যীশুখৃস্টকে’ বিশ্বাস ও ভক্তি করলেই চলবে, এ সকল কর্ম না করলেও চলবে। তিনি বলতেন, আমি প্রত্যেক জাতির কাছে আমার পছন্দ মত মিথ্যা বলি, যেন ঈশ্বরের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
এভাবে তিনি মানবতার ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করেন। ক্রমান্বয়ে এই পৌলীয় কর্মহীন ভক্তিধর্মই খৃস্টানদের মধ্যে প্রসার লাভ করে। ফলে বিশ্বের কোটি কোটি মানব সন্তান শিরক-কুফর ও পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেহেতু বিশ্বাসেই স্বর্গ, সেহেতু কোনোভাবেই ধর্মোপদেশ দিয়ে খৃস্টান সমাজগুলি থেকে মানবতা বিধ্বংসী পাপ, অনাচার ও অপরাধ কমানো যায়না।
ওহীর নামে মিথ্যা সবচেয়ে কঠিন মিথ্যা হওয়ার কারণে কুরআন কারীমে ও হাদীস শরীফে ওহীর নামে বা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলতে, সন্দেহজনক কিছু বলতে বা আন্দাজে কিছু বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবতীর্ণ উভয় প্রকার ওহী যেন কেয়ামত পর্য্ন্ত সকল মানুষের জন্য অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত থাকে সেজন্য সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
১.২.৪. মিথ্যা থেকে ওহী রক্ষার কুরআনী নির্দেশনা
‘ওহী’র নামে মিথ্যা বা অনুমান-নির্ভর কথা প্রচারের দুটি পর্যায়ঃ প্রথমত, নিজে ওহীর নামে মিথ্যা বলা ও দ্বিতীয়ত, অন্যের বলা মিথ্যা গ্রহণ ও প্রচার করা। উভয় পথ রুদ্ধ করার জন্যে কুরআন কারীমে একদিকে আল্লাহর নামে মিথ্যা বা অনুমান নির্ভর কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। অপরদিকে কারো প্রচারিত কোনো তথ্য বিচার ও যাচাই ছাড়া গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
১.২.৪.১. আল্লাহর নামে মিথ্যা ও অনুমান নির্ভর কথা বলার নিষেধাজ্ঞা
কুরআন কারীমে মহান আল্লাহ বারংবার আল্লাহর নামে মিথ্যা বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে না জেনে, আন্দাজে, ধারণা বা অনুমানের উপর নির্ভর করে আল্লাহর নামে কিছু বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলার অর্থ আল্লাহর নামে মিথ্যা বলা। কারণ রাসূলুল্লাহ(স) আল্লাহর পক্ষ থেকেই কথা বলেন। কুরআনের মত হাদীসও আল্লাহর ওহী। কুরআন ও হাদীস, উভয় প্রকারের ওহীই একমাত্র রাসূলুল্লাহ(স) এর মাধ্যমে বিশ্ববাসী পেয়েছে। কাজেই রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কোনো প্রকার মিথ্যা, বানোয়াট, আন্দাজ বা অনুমাননির্ভর কথা বলার অর্থই আল্লাহর নামে মিথ্যা বলা বা না-জেনে আল্লাহর নামে কিছু বলা। কুরআন কারীমে এ বিষয়ে বারংবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে কয়েকটি বাণী উল্লেখ করছি।
১. কুরআন কারীমে বারংবার এরশাদ করা হয়েছেঃ
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَىٰ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا
-আল্লাহর নামে বা আল্লাহর সম্পর্কে যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলে তার চেয়ে বড় জালিম আর কে? (সূরা আল আনআমঃ ২১, ৯৩, ১৪৪; সূরা আরাফঃ ৩৭ সূরা ইউনূস ১৭)।
২. এরশাদ করা হয়েছেঃ
قَالَ لَهُم مُّوسَىٰ وَيْلَكُمْ لَا تَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ كَذِبًا فَيُسْحِتَكُم بِعَذَابٍ ۖ وَقَدْ خَابَ مَنِ افْتَرَىٰ [٢٠:٦١]
-দূর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করোনা। করলে, তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দ্বারা সমূলে ধ্বংস করবেন। যে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে সেই ব্যর্থ হয়েছে। (সূরা তাহাঃ৬১)
৩. কুরআন কারীমে বারংবার না জেনে, আন্দাজে বা অনুমান নির্ভর করে আল্লাহ, আল্লাহর দ্বীন, বিধান ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন একস্থানে এরশাদ হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ [٢:١٦٨]
إِنَّمَا يَأْمُرُكُم بِالسُّوءِ وَالْفَحْشَاءِ وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ [٢:١٦٩]
-হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করোনা। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে তো কেবল তোমাদেরকে মন্দ ও অশ্লীল কার্যের এবং আল্লাহ সম্বন্ধে তোমরা যা জাননা এমন সব বিষয় বলার নির্দেশ দেয়। (সূরা আল বাকারাহঃ ১৬৮-১৬৯)
৪. অন্যত্র এরশাদ করা হয়েছেঃ
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ [٧:٣٣]
-“বল, আমার প্রতিপালক নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ এবং অসংগত বিরোধিতা এবং কোনো কিছুকে আল্লাহর শরীক করা –যার কোনো সনদ তিনি প্রেরণ করেননি এবং আল্লাহর সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যে সম্বন্ধে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই।” (সূরা আল আরাফঃ৩৩)
এভাবে কুরআনে ওহীর জ্ঞানকে সকল ভেজাল ও মিথ্যা থেকে রক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহিমাময় আল্লাহ, তাঁর মহান রাসূলুল্লাহ(স), তাঁর দ্বীন, তাঁরা বিধান ইত্যাদি বিষয়ে মিথ্যা, বানোয়াট, আন্দাজ বা অনুমান নির্ভর কথা বলা কঠিণভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
১.২.৪.২. যে কোনো তথ্য গ্রহণের পূর্বে যাচাইয়ের নির্দেশ
নিজে আল্লাহ বা তাঁর রাসূল(স)এর নামে মিথ্যা বলা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি অন্যের কোনো অনির্ভরযোগ্য, মিথ্যা বা অনুমান নির্ভর বর্ণনা বা বক্তব্য গ্রহণ করাও নিষিদ্ধ। যে কোনো সংবাদ বা বক্তব্য গ্রহণে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে কুরআন কারীম। এরশাদ করা হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ [٤٩:٦]
-“হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপী তোমাদের নিকট কোনো বার্তা আনয়ন করে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত না কর, এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।” (সূরা আল হুজুরাতঃ ৬)।
এই নির্দেশের আলোকে কেউ কোনো সাক্ষ্য বা তথ্য প্রদান করলে তা গ্রহণের পূর্বে সে জাতির ব্যক্তিগত সততা ও তথ্য প্রদানে তার নির্ভূলতা যাচাই করা মুসলিমের জন্য ফরয। জাগতিক সকল বিষয়ের চেয়েও বেশি সতর্কতা ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন রাসূলুল্লাহ(স) বিষয়ক বার্তা বা বাণী গ্রহণের ক্ষেত্রে। কারণ জাগতিক বিষয়ে ভুল তথ্য বা সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করলে মানুষের সম্পদ, সম্ভ্রম বা জীবনের ক্ষতি হতে পারে। আর রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস বা ওহীর জ্ঞানের বিষয়ে অসতর্কতার পরিণতি ঈমানের ক্ষতি ও আখিরাতের অনন্ত জীবনের ধ্বংস। এজন্য মুসলিম উম্মাহ সর্বদা সকল তথ্য, হাদীস ও বর্ণনা পরীক্ষা করে গ্রহণ করেছেন।
১.২.৫. মিথ্যা থেকে ওহী রক্ষায় হাদীসের নির্দেশনা
ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত সকল প্রকার বিকৃতি, ভুল বা মিথ্যা থেকে তাঁর বাণী বা হাদীসকে রক্ষা করার জন্য রাসূলুল্লাহ(স) তাঁর উম্মতকে বিভিন্ন প্রকার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেগুলির মধ্যে রয়েছেঃ
১.২.৫.১. বিশুদ্ধরূপে হাদীস মুখস্ত রাখার ও প্রচারের নির্দেশনা
বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ(স) তাঁর হাদীস বা বাণী হুবহু বিশুদ্ধরূপে মুখস্ত করে তা প্রচার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। জুবাইর ইবনু মুতয়িম(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(*****)
-“মহান আল্লাহ সমুজ্জল করুন সেই ব্যক্তির চেহারা যে আমার কোনো কথা শুনল, অতঃপর তা পূর্ণরূপে আয়ত্ত্ব করল ও মুখস্ত করল এবং যে তা শুনেনি তার কাছে পৌছে দিল।” [তিরমিযী, মুহাম্মদ ইবনু ঈসা(২৭৯ হি), আস-সুনান ৫/৩৩-৩৪; আবু দাউদ, সুলাইমান ইবনে আশ‘আস(২৭৫ হি)]
এই অর্থে আরো অনেক হাদীস অন্যান্য অনেক সাহাবী থেকে বর্ণিত ও সংকলিত হয়েছে।
১.২.৫.২. রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলার নিষেধাজ্ঞা
অপরদিকে কোনো মানবীয় কথা যেন তাঁর নামে প্রচারিত হতে না পারে সেজন্য তিনি তাঁদেরকে তাঁর নামে মিথ্যা বা অতিরিক্ত কথা বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(*****)
-তোমরা আমার নামে মিথ্যা বলবেনা, কারণ যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বলবে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে। [বুখারী, মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল(২৫৬ হি), আস-সহীহ ১/৫২, ফাতহুল বারী১/১৯৯]।
যুবাইর ইবনুল আউয়াম(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(******)
-যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বলবে তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। (বুখারী, আস-সহীস ১/৫২)
সালামাহ ইবনে আকওয়া(রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(******)
-আমি যা বলিনি সে কথা যে আমার নামে বলবে তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। (বুখারী, আস-সহীস ১/৫২)
এভাবে ‘আশারায়ে মুবাশশারাহ’ সহ প্রায় ১০০ জন সাহাবী এই মর্মে রাসূলুল্লাহ(স) এর সাবধান বাণী বর্ণনা করেছেন। আর কোনো হাদীস এত বেশি সংখ্যক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়নি।[নববী, ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ(৬৭৬ হি), শারহু সহীহ মুসলিম ১/৬৮, ইউনুল জাউযী, আল মাউযূ’আত]
১.২.৫.৩. বেশি হাদীস বলা ও মুখস্ত ছাড়া হাদীস বলার নিষেধাজ্ঞা
বেশি হাদীস বলতে গেলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ(স)। বিশুদ্ধ মুখস্ত ও নির্ভূলতা সম্পর্কে পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে কোনো হাদীস বর্ণনা করতে নিষেধ করেছেন। আবু কাতাদাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) মিম্বরের উপরে দাঁড়িয়ে বলেনঃ আরবী(*****)
-খবরদার! তোমরা আমার নামে বেশি বেশি হাদীস বলা হতে বিরত থাকবে। যে আমার নামে কিছু বলে, সে যেন সঠিক কথা বলে। আর যে আমার এমন কিছু বলে যা আমি বলিনি তাকে জাহান্নামে বসবাস করতে হবে। [ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/১৪; আলবানী, মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন, সহীহ সুনানি ইবনে মাজাহ ১/২৯, আল মুসতাদরাক ১/১৯৪]।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(********)
“তোমরা আমার থেকে হাদীস বর্ণনা পরিহার করবে, শুধুমাত্র যা তোমরা জান তা ছাড়া।”(তিরমিযী, আস-সুনান ৫/১৮৩)।
আবু মূসা মালিক ইবনু উবাদাহ আল গাফিকী(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) আমাদেরকে সর্বশেষ ওহীহত ও নির্দেশ প্রদান করে বলেনঃ আরবী(******)
-“তোমরা আল্লাহর কিতাব সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে ও অনুসরণ করবে। আর অচিরেই তোমরা এমন সম্প্রদায়ের নিকট গমন করবে যারা আমার নামে হাদীস বলতে ভালবাসবে। যদি কারো কোনো কিছু মুখস্ত থাকে তাহলে সে তা বলতে পারে। আর যে ব্যক্তি আমার নামে এমন কিছু বলবে যা আমি বলিনি তাকে জাহান্নামে তার আবাসস্থল গ্রহণ করতে হবে।” (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১২)
এভাবে বিভিন্ন হাদীসে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ(স) তাঁর উম্মাততে তাঁর হাদীস হুবহু ও নির্ভূলভাবে মুখস্ত রাখতে ও এইরূপ মুখস্ত হাদীস প্রচার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অপরদিকে পরিপূর্ণ মুখস্ত না থাকলে বা সামান্য দ্বিধা থাকলে সে হাদীস বর্ণনা করতে নিষেধ করেছেন। কারণ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, তিনি যা বলেননি সে কথা তাঁর নামে বলা নিষিদ্ধ ও কঠিনতম পাপ। ভুলক্রমেও যাতে তাঁর হাদীসের মধ্যে হেরফের না হয় এজন্য তিনি পরিপূর্ণ মুখস্ত ছাড়া হাদীস বলতে নিষেধ করেছেন। আমরা দেখতে পাব যে, সাহাবীগণ এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতেন।
১.২.৫.৪. মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারীদের থেকে সতর্ক করা
নিজের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি অন্যের বানানো মিথ্যা গ্রহণ করাও নিষিদ্ধ। মুসলিম উম্মাহর ভিতরে মিথ্যাবাদী হাদীস বর্ণনাকারী ব্যক্তিবর্গের উদ্ভব হবে বলে তিনি উম্মাতকে সতর্ক করেছেন। আবু হুরাইরা(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আরবী(******)
-শেষ যুগে আমার উম্মাতের কিছু মানুষ তোমাদেরকে এমন সব হাদীস বলবে যা তোমরা বা তোমাদের পিতা-পিতামহগণ কখনো শুননি। খবরদার! তোমরা তাদের থেকে সাবধান থাকবে, তাদের থেকে দূরে থাকবে। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১২)।
ওয়াসিলাহ ইবনুল আসকাহ(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(*****)
-কেয়ামতের পূর্বেই শয়তান বাজারে-সমাবেশে ঘুরে ঘুরে হাদীস বর্ণনা করে বলবে: আমাকে অমুকের ছেলে অমুক এই এই বিষয়ে এই হাদীস বলেছে। (ইবনু আদী, আহমদ, আল-কামিল ফী দুআফাইর রিজাল ১/১১৫)।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রা) বলেনঃ আরবী(******)
-শয়তান মানুষের রূপ ধারণ করে মানুষদের মধ্যে আগমন করে এবং তাদেরকে মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করে। এরপর মিথ্যা হাদীস শুনে সমবেত মানুষগুলো সমাবেশ ভেঙ্গে চলে যায়। অতঃপর তারা সে সকল হাদীস বর্ণনা করে বলে : আমি এক ব্যক্তিকে হাদীসটি বলতে শুনেছি যার চেহারা আমি চিনি তবে তার নাম জানিনা। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১২)
১.২.৫.৫. সন্দেহযুক্ত বা অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা
রাসূলুল্লাহ(স) যাচাই না করে কোনো হাদীস গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। যদি কেউ যাচাই না করে যা শুনে তাই হাদীস বলে গ্রহণ করে ও বর্ণনা করে তাহলে হাদীস যাচাইয়ে তার অবহেলার জন্য সে হাদীসের নামে মিথ্যা বলার পাপে পাপী হবে। ইচ্ছাকৃত মিথ্যা হাদীস বানানোর জন্য নয়, শুধুমাত্র সত্য মিথ্যা যাচাই না করে হাদীস গ্রহণ করাই তার মিথ্যাবাদী বানানোর জন্য যথেষ্ট বলে হাদীসে বলা হয়েছে। উপরন্তু, যদি কোনো হাদীসের বিশুদ্ধতা ও নির্ভূলতা সম্বন্ধে দ্বিধা বা সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তি সে হাদীস বর্ণনা করে তাহলে সেও মিথ্যাবাদী বলে গণ্য হবেও মিথ্যা হাদীস বলার পাপে পাপী হবে।
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(*******)
-একজন মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এতটুকেই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বর্ণনা করবে।(মুসলিম আস-সহীহ ১/১০)।
সামুরাহ ইবনে জুনদুব(রা) ও মুগীরাহ ইবনু শু’বা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(****)
-যে ব্যক্তি আমার নামে কোনো হাদীস বলবে এবং তার মনে সন্দেহ হবে যে, হাদীসটি মিথ্যা, সেও একজন মিথ্যাবাদী। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/৯)।
১.২.৬. হাদীসের নামে মিথ্যা বলার বিধান
১.২.৬.১. হাদীসের নামে মিথ্যা বলা কঠিনতম কবীরা গোনাহ
উপরে উল্লিখিত আয়াত ও হাদীসের আলোকে আমরা অতি সহজেই বুঝতে পারি যে, হাদীসের নামে মিথ্যা বলা ও মানুষের কথাকে হাদীস বলে চালানো জঘন্যতম পাপ ও অপরাধ। এ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোনোরূপ দ্বিধা বা সংশয় নেই। আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখতে পাব যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর সাহাবীগণ সামান্যতম অনিচ্ছাকৃত বা অসাবধানতামূলক ভুলের ভয়ে হাদীস বলা হতে বিরত থাকতেন। অনিচ্ছাকৃত ভুলকেও তাঁরা ভয়ানক পাপ মনে করে সতর্কতার সাথে পরিহার করতেন। এছাড়া অন্যের বানানো মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করাকেও তাঁরা মিথ্যা হাদীস বানানোর মত অপরাধ বলে গণ্য করতেন।
উপরে উল্লেখিত হাদীসগুলির আলোচনা প্রসঙ্গে ইমাম আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ আন-নাবাবী (৬৭৬ হি) বলেনঃ এ সকল হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলা কঠিনতম হারাম, ভয়ন্করতম কবীরা গোনাহ এবং তা জঘন্যতম ও ধ্বংসাত্মক অপরাধ। এ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ একমত। তবে অধিকাংশ আলিমের মতে এই অপরাধের জন্য কাউকে কাফির বলা যাবেনা। যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কোনো মিথ্যা বলবে সে যদি তার এই মিথ্যা বলাকে হালাল মনে না করে তাহলে তাকে কাফির বলা যাবেনা। সে পাপী মুসলিম। আর যদি সে এই কঠিনতম পাপকে হালাল মনে করে তাহলে সে কাফির বলে গণ্য হবে। তবে মুহাম্মদ আল জুআইনী ও অন্যান্য কতিপয় ইমাম এই অপরাধকে কুফরী বলে গণ্য্ করেছেন। জুআ্ইনী বলতেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলবে সে কাফির বলে গণ্য হবে এবং তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করতে হবে।
এ সকল হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে যে কোনো মিথ্যাই সমভাবে হারাম, তা যে কোনো বিষয়েই হোক। শরীয়তের বিধিভিধান, ফযীলত, নেককাজে উৎসাহ প্রদান, পাপের ভীতি বা অন্য যে কোনো বিষয়ে তাঁর নামে কোনো মিথ্যা বলা কঠিনতম হারাম ও ভয়ঙ্করতম কবীরা গোনাহ। এ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত রয়েছে। যাঁরা মতামত প্রকাশ করতে পারেন এবং যাঁদের মতামত গ্রহণ করা যায় তাঁরা সকলেই এই বিষয়ে একমত। (নববী, শারহু সহীহ মুসলিম ১/৬৯)।
১.২.৬.২. মাউযূ হাদীস উল্লেখ বা প্রচার করাও কঠিনতম হারাম
ইমাম নববী আরো বলেনঃ জ্ঞাতসারে কোনো মিথ্যা বা বানোয়াট হাদীস বর্ণনা করাও হারাম, তা যে অর্থেই হোকনা কেন। তবে মিথ্যা হাদীসকে মিথ্যা হিসেবে জানানোর জন্য তার বর্ণনা জায়েয। (নববী, তাকরীব, তাদরীবুর রাবী সহ ১/২৭৪)।
অন্যত্র, তিনি বলেনঃ যদি কেউ জানতে পারেন যে, হাদীসটি মাউযূ অর্থাৎ মিথ্যা বা জাল, অথবা তার মনে জোরালো ধারণা হয় যে, হাদীসটি জাল তাহলে তা বর্ণনা করা তার জন্য হারাম। যদি কেউ জানতে পারেন যে, হাদীসটি মিথ্যা এবং তারপরও তিনি সেই হাদীসটি বর্ণনা করেন, কিন্তু হাদীসটির বানোয়াট হওয়ার বিষয় উল্লেখ না করেন, তবে তিনিও হাদীস বানোয়াটকারী বলে গণ্য হবেন এবং এ সকল হাদীসে উল্লেখিত ভয়ানক শাস্তির অন্তর্ভূক্ত হবেন। (নববী, শারহু সহীহ মুসলিম ১/৭১)।
ইমাম যাইনুদ্দীন আব্দুর রাহীম ইবনুল হুসাইন আল-ইরাকী(৮০৬ হি) বলেনঃ মাউযূ বা জাল হাদীস যে বিষয়ে বা যে অর্থেই হোক, তা বলা হারাম। আহকাম, গল্প-কাহিনী, ফযীলত, নেককর্মে উৎসাহ, পাপ থেকে ভীতি প্রদর্শন বা অন্য যে কোনো বিষয়েই হোকনা কেন, যে ব্যক্তি তাকে মাউযূ বলে জানতে পারবে তার জন্য তা বর্ণনা করা, প্রচার করা, তার দ্বারা দলীল দেওয়া বা তার দ্বারা ওয়ায করা জায়েয নয়। তবে হাদীসটি যে জাল বা বানোয়াট সে কথা উল্লেখ করে তা বলা যায়। (ইরাকী, ফাতহুল মুগীস, পৃ. ১২০-১২১)।
১.২.৬.৩. হাদীস বানোয়াটকারীর তওবার বিধান
হাদীসের নামে মিথ্যা বলা ও অন্যান্য বিষয়ে মিথ্যা বলার মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য হলো, হাদীসের নামে মিথ্যাবাদীর তাওবা মুহাদ্দিসগণেল নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। যদি কোনো ব্যক্তির বিষয়ে প্রমাণিত হয় যে, তিনি কোনো কথাকে মিথ্যাভাবে রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বলে উল্লেখ করেছেন বা প্রচার করেছেন এবং এরপর তিনি তাওবা, তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতেও পারেন, তবে মুহাদ্দিসগণের নিকট তিনি তাওবার কারণে গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাবেননা। মুহাদ্দিসগণ কখনোই ঐ ব্যক্তির বর্ণিত হাদীস সত্য ও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করবেননা।
পঞ্চম শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহ আহমদ ইবনু সাবিত খাতীব বাগদাদী(৪৬৩ হি) বলেনঃ যে ব্যক্তি মানুষের সাথে মিথ্যা বলে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। তবে সে যদি তাওবা করে এবং তার সততা প্রমাণিত হয় তাহলে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে বলে ইমাম মালিক উল্লেখ করেছেন। আর যদি কেউ হাদীস জাল করে, হাদীসের মধ্যে কোনো মিথ্যা বলে বা যা শুনেনি তা শুনেছে বলে দাবি করে তাহলে তার বর্ণিত হাদীস সত্য বা সঠিক বলে গণ্য করা যাবেনা। আলিমগণ উল্লেখ করেছেন যে, সে যদি পরে তাওবা করে তাহলেও তার বর্ণিত কোনো হাদীস সত্য বলে গণ্য করা যাবেনা। ইমাম আহমদ(২৪১ হি) কে প্রশ্ন করা হয়: একব্যক্তি একটিমাত্র হাদীসের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলেছিল, তারপর সে তাওবা করেছে এবং মিথ্যা বলা পরিত্যাগ করেছে, তার বিষয়ে কী করণীয়? তিনি বলেনঃ তার তাওবা তার ও আল্লাহর মাঝে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে কবুল করতে পারেন। তবে তার বর্ণিত কোনো হাদীস আর কখনোই সঠিক বলে গ্রহণ করা যাবেনা বা কখনোই তার বর্ণনার উপর নির্ভর করা যাবেনা। ইমাম সুফিয়ান সাওরী(১৬১ হি), আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক(১৮১ হি)ও অন্যান্য ইমামও অনুরূপ কথা বলেছেন।
ইমাম বুখারীর অন্যতম ওস্তাদ আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর আল-হুমাইদী(২১৯ হি) বলেন, যদি কেউ হাদীস বর্ণনা করতে যেয়ে বলেঃ আমি অমুকের কাছে হাদীসটি শুনেছি, এরপর প্রমাণিত হয় যে, সে উক্ত ব্যক্তি হতে হাদীসটি শুনেনি, বা অন্য কোনোভাবে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তার মিথ্যা ধরা পড়ে তবে তার বর্ণিত কোনো হাদীসই আর সঠিক বা নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা যাবেনা। খতীব বাগদাদী বলেন, ইচ্ছাকৃত মিথ্যা ধরা পড়লে সেক্ষেত্রে এই বিধান। [খতীব বাগদাদী, আহমাদ ইবনু আলী ইবনু সাবিত(৪৬৩ হি), আল কিফাইয়াতু ফী ইলমুর রিওয়াইয়া, পৃ. ১১৭-১১৮]।
শাইখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলবী(১০৫২ হি) বলেনঃ যদি কোনো ব্যক্তির বিষয়ে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে জীবনে একবারও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলার কথা প্রমাণিত হয় তবে তার বর্ণিতে কোনো হাদীস সঠিক বা নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য হবেনা, যদিও সে তাওবা করে। (আব্দুল হক দেহলবী, মুকাদ্দিমাহ ফী উসূলিল হাদীস, পৃ. ৬৩-৬৪)।
১.২.৭. হাদীসের নামে মিথ্যা বলার উন্মেষ
আমরা জানি যে, সকল সমাজ, জাতি ও ধর্মে মিথ্যা ও মিথ্যাবাদী ঘৃণিত। সত্যবাদীতা সর্বদা ও সর্বত্র প্রশংসিত ও নিন্দিত। এজন্যই আরবের জাহেলী সমাজেও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অতুলনীয় সত্যবাদিতা প্রশংসিত হয়েছে। তিনি ‘আল-আমীন’ ও ‘আস-সাদিক’: বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদী বলে আখ্যায়িত হয়েছেন।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যবাদী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহচর সাহাবীগণকে অনুপম অতুলনীয় সত্যবাদিতার উপর গড়ে তুলেছেন। তাঁদের সত্যবাদিতা ছিল আপোষহীন। কোনো কষ্ট বা বিপদের কারণেই তাঁরা সত্যকে বাদ দিয়ে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেননি। উপরন্তু তিনি ওহীর নামে ও হাদীসের নামে মিথ্যা বলতে বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন এবং এর কঠিন শাস্তির কথা বারংবার বলেছেন।
আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখতে পাব যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে ইচ্ছাকৃত কোনো মিথ্যা তো দূরের কথা, সামান্যতম অনিচ্ছাকৃত ভুল বা বিকৃতিকেও তাঁরা কঠিনতম পাপ বলে গণ্য করে তা পরিহার করতেন।
এজন্য আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় বা তাঁর ইন্তিকালের পরে তাঁর সাহাবীগণের মধ্যে কখনোই কোনো অবস্থায় তাঁর নামে মিথ্যা বলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং আমরা দেখতে পাই যে, অধিকাংশ সাহাবী অনিচ্ছাকৃত ভুলে ভয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে কোনো হাদীসই বলতেননা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় মদীনার সমাজে কতিপয় মুনাফিক বাস করত। এদের মধ্যে মিথ্যা বলার প্রচলন ছিল। তবে এরা সংখ্যায় ছিল অতি সামান্য এবং সমাজে এদের মিথ্যাবাদিতা জ্ঞাত ছিল। এজন্য তাদের গ্রহণযোগ্যতা ছিলনা। তাদের কথা কেউ বিশ্বাস করতোনা এবং তারাও কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামে মিথ্যা বলার সাহস বা সুযোগ পাননি।
একটি ঘটনায় বর্ণিত হয় যে, এক যুবক এক যুবতীর পানিপ্রার্থী হয়। যুবতীর আত্মীয়গণ তার কাছে তাদের মেয়ে বিবাহ দিতে অসম্মত হয়। পরবর্তী সময়ে ঐ যুবক তাদের কাছে গমন করে বলে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তোমাদের বংশের যে কোনো মেয়ে বেছে নিয়ে বিবাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যুবকটি সেখানে অবস্থান করে। ইত্যবসরে তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বিষয়টির সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তিনি বলেন, যুবকটি মিথ্যা বলেছে। তোমরা তাকে জীবিত পেলে মৃত্যুদন্ড প্রদান করবে। ….তবে তাকে জীবিত পাবে বলে মনে হয়না। …..তারা ফিরে গিয়ে দেখেন যে, সাপের কামড়ে যুবকটির মৃত্যু হয়েছে।……..
এই বর্ণনাটি নির্ভরযোগ্য হলে এ থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় তাঁর নামে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলার একটি ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু এই বর্ণনাটির সনদ অত্যন্ত দূর্বল। কয়েকজন মিথ্যায় অভিযুক্ত ও অত্যন্ত দূর্বল রাবীর মাধ্যমে ঘটনাটি বর্ণিত। (যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ৩/৪০১-৪০২; ইবনু আদী, আল-কামিল ৪/৫৪)।
সাধারণভাবে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পরে যতদিন মুসলিম সমাজে সাহাবীগণের আধিক্য ছিল ততদিন তাঁর নামে মিথ্যা বলার কোনো ঘটনা ঘটেনি।
সময়ের আবর্তনে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। প্রথম হিজরী শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এ সময়ে অনেক সাহাবী মৃত্যুবরণ করেন। অগণিত নও মুসলিম ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে মিথ্যা বলার উন্মেষ ঘটে। ক্রমান্বয়ে তা প্রসার লাভ করতে থাকে।
২৩ হিজরী সালে যুন্নুরাইন উসমান ইবনু আফফান(রা) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৩৫ হিজরী পর্য্ন্ত প্রায় ১২ বৎসর তিনি খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে ইসলামী বিজয়ের সাথে সাথে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইসলামের প্রসার ঘটে। অগণিত মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষই ইসলামের প্রাণকেন্দ্র মদীনা থেকে বহুদূরে মিশর, কাইরোয়ান, কুফা, বাসরা, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, খোরাসান ইত্যাদি এলাকায় বসবাস করতেন। সাহাবীগণের সাহচর্য্ থেকেও তারা বঞ্চিত ছিলেন।
তাঁদের অনেকের মধ্যে প্রকৃত ইসলামী বিশ্বাস, চরিত্র ও কর্মের পূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারেন। এদের অজ্ঞতা, পূর্ববর্তী ধর্মের প্রভাব, ইসলাম ধর্ম বা আরবদের প্রতি আক্রোশ ইত্যাদির ফলে এদের মধ্যে বিভিন্ন মিথ্যা ও অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ইসলামের অনেক শত্রু সামরিক ময়দানে ইসলামের পরাজয় ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে মিথ্যা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে ইসলামের ধ্বংসের চেষ্টা করতে থাকে। আর সবচেয়ে কঠিন ও স্থায়ী মিথ্যা যে মিথ্যা ওহী বা হাদীসের নামে প্রচারিত হয়। ইসলামের শত্রুরা সে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে।
এ সময় এসকল মানুষ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বংশধরদের মর্যাদা, ক্ষমতা, বিশেষত আলী ইবনু আবী তালিব(রা) এর মর্যাদা, বিশেষ জ্ঞান, বিশেষ ক্ষমতা, অলৌকিকত্ব, তাকে ক্ষমতায় বসানোর প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয়ে ও উসমান ইবনু আফফান(রা) এর নিন্দায় অগণিত কথা বলতে থাকে। এ সব বিষয়ে অধিকাংশ কথা তারা বলতো যুক্তি তর্কের মাধ্যমে। আবার কিছু কথা তারা আকারে ইঙ্গিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামেও বানিয়ে বলতে থাকে। যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে সরাসরি মিথ্যা বলার দুঃসাহস এ সকল পাপাত্মাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। তখনো অগণিত সাহাবী জীবিত রয়েছেন। মিথ্যা ধরা পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। তবে মিথ্যার প্রবণতা গড়ে উঠতে থাকে।
৩য়-৪র্থ হিজরী শতকের অন্যতম ফকীহ, মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনী জারীর তাবারী(৩১০ হি) ৩৫ হিজরীর ঘটনা আলোচনা কালে বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু সাবা ইয়ামানের ইহুদী ছিল। উসমান(রা) এর সময়ে সে ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর বিভিন্ন শহরে ও জনপদে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক কথা প্রচার করতে থাকে। হিজাজ, বসরা, কূফা ও সিরিয়ায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি। তখন সে মিশরে গমন করে। সে প্রচার করতে থাকে: অবাক লাগে তার কথা ভাবতে যে ঈসা(আ) পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবে বলে বিশ্বাস করে, অথচ মুহাম্মাদ(স) পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন বলে বিশ্বাস করেনা। ঈসার পুণরাগমনের কথা সে সত্য বলে মানে, আর মুহাম্মদ(স) এর পুনরাগমনের কথা বলতে তা মিথ্যা বলে মনে করে।…….. হাজারো নবী চলে গিয়েছেন। প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতের একজনকে ওসীয়তের মাধ্যমে দায়িত্ব প্রদান করে গিয়েছেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রদত্ত ওহীয়ত ও দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তি আলী ইবনু আবী তালিব। …….. মুহাম্মাদ(স) শেষ নবী এবং আলী শেষ ওসীয়ত প্রাপ্ত দায়িত্বশীল। ……যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওসীয়ত ও দায়িত্ব প্রদানকে মেনে নিলনা, বরং নিজেই ক্ষমতা নিয়ে নিল, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে।……..[তাবারী, মুহাম্মাদ ইবনু জারীর(৩১০ হি), তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক ২/৬৪৭]।
এখানে আমরা দেখছি যে, আবদুল্লাহ ইবনু সাবা নিজের বিভ্রান্তিগুলিকে যুক্তির আবরণে পেশ করার পাশাপাশি কিছু কথা পরোক্ষভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে বলেছে। আলী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাকে দায়িত্ব প্রদান না করা জুলুম ইত্যাদি কথা সে বলেছে।
আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখবো যে, এই সময় মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে সত্যপরায়ণতার ক্ষেত্রে এই ধরণের দূর্বলতা দেখা দেওয়ায় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসের নামে মিথ্যা বলা প্রতিরোধের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ ও কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেন।
প্রথম হিজরী শতকের শেষদিকে নিজ নিজ বিভ্রান্ত মত প্রমাণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে বানোয়াট হাদীস তৈরি করার প্রবণতা বাড়তে থাকে। সাহাবীদের নামেও মিথ্যা বলার প্রবণতা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও বৃদ্ধি পেতে থাকে।
মুখতার ইবনু আবু উবাইদ সাকাফী(১-৬৭ হি) সাহাবীগণের সমসাময়িক একজন তাবিয়ী। ৬০ হিজরীতে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন(রা) এর শাহাদাতের পরে তিনি ৬৪-৬৫ হিজরীতে মক্কার শাসক আবুদল্লাহ ইবনু যুবাইরের(১- ৭৩ হি)পক্ষ হতে কুফায় গমন করেন। কুফায় তিনি ইমাম হুসাইনের হত্যায় জড়িতদের ধরে হত্যা করতে থাকেন। এরপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইরের আনুগত্য অস্বীকার করে নিজেকে আলীর পুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার প্রতিনিধি বলে দাবি করেন। এরপর তিনি নিজেকে ওহীর ইলহামপ্রাপ্ত, রাসূলুল্লাহ(স) এর বিশেষ প্রতিনিধি, খলীফা ইত্যাদি দাবি করতে থাকেন। অবশেষে ৬৭ হিজরীতে আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইরের বাহিনীর কাছে তিনি পরাজিত ও নিহত হন।
তার এ সকল দাবীদাওয়ার সত্যতা প্রমাণের জন্য তিনি একাধিক ব্যক্তিকে তার পক্ষে মিথ্যা হাদীস বানিয়ে বলার জন্য আদেশ, অনুরোধ ও উৎসাহ প্রদান করেন।
আবু আনার হাররানী বলেন, মুখতার ইবনু আবু উবাইদ সাকাফী একজন হাদীস বর্ণনাকারীকে বলেন, আপনি আমার পক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে একটি হাদীস তৈরী করুন, যাতে থাকবে যে, আমি তাঁর পরে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করব এবং তাঁর সন্তানের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করব। এজন্য আমি আপনাকে দশহাজার দিরহাম, যানবাহন, ক্রীতদাস ও পোশাক পরিচ্ছদ উপঢৌকন প্রদান করব। ঐ হাদীস বর্ণনাকারী বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে হাদীস বানানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কোনো একজন সাহাবীর নামে কোনো কথা বানানো যেতে পারে। এজন্য আপনি আপনার উপঢৌকন ইচ্ছামত কম করে দিতে পারেন। মুখতার বলেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে কিছু হলে তার গুরুত্ব বেশি হবে। ঐ ব্যক্তি বলেনঃ তার শাস্তিও বেশি কঠিন হবে। (ইবনুল জাওযী, আল মাউদূ’আত ১/১৬-১৭)।
মুখতার অনেককেই এভাবে অনুরোধ করে। প্রয়োজনে ভীতি প্রদর্শন বা হত্যা ও করেছেন। সালামাহ ইবনু কাসীর বলেন, ইবনু রাব’য়া খুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি একবার কূফায় গমন করি। আমাকে মুখতার সাকাফীর নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আমার সাথে একাকী বসে বলেন, জনাব, আপনিতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ পেয়েছেন। আপনি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে কোনো কথা বলেন তা মানুষেরা বিশ্বাস করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে একটি হাদীস বলে আমার শক্তি বৃদ্ধি করুন। এই ৭০০ স্বর্ণমুদ্রা আপনার জন্য। আমি বললামঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে মিথ্যা বলার পরিণতি নিশ্চিত জাহান্নাম। আমি তা বলতে পারবোনা। [বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল (২৫৬ হি), আত-তারীখূল কাবীর ৮/৪৩৮; আত-তারীখুস সাবীর ১/১৪৭]।
সাহাবী আম্মার ইবনু ইয়াসীরের(রা) পুত্র মুহাম্মাদ ইবনু আম্মারকেও মুখতার তার পক্ষে তাঁর পিতা আম্মারের সূত্রে হাদীস বানিয়ে প্রচার করতে নির্দেশ দেয়। তিনি অস্বীকার করলে মুখতার তাকে হত্যা করে। [বুখারী, আত-তারীখুস সাগীর ১/১৪৭, আল জারহু ওয়াত তা’দীল ৮/৪৩]।
প্রথম হিজরী শতকের শেষ দিক থেকে প্রখ্যাত সাহাবীগণের নামে মিথ্যা বলার প্রবণতা দেখা দেয়। বিশেষত আলী ইবনু আবু তালিব(রা) এর নামে মিথ্যা বলার প্রবণতা তাঁর কিছু অনুসারীর মধ্যে দেখা দেয়। তিনি আবু বাকর(রা) ও উমার(রা) কে মনে মনে অপছন্দ করতেন বা নিন্দা করতেন, তিনি অলৌকিক সব কাজ করতেন, তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের বানোয়াট কথা তারা বলতে শুরু করে।
প্রখ্যাত তাবেয়ী ইবনু আবু মুলাইকা আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদুল্লাহ(১১৭ হি) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাসের (৬৮ হি)নিকট পত্র লিখে অনুরোধ করি যে, তিনি যেন আমাকে কিছু নির্বাচিত প্রয়োজনীয় বিষয় লিখে দেন। তখন তিনি বলেঃ আরবী(********)
-বিশ্বস্ত ও কল্যাণকামী যুবক। আমি তার জন্য কিছু বিষয় বিশেষ করে পছন্দ করে লিখব এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দিব। তখন তিনি আলী(রা) এর বিচারের লিখিত পান্ডুলিপি চেয়ে নেন। তিনি তা থেকে কিছু বিষয় লিখেন। আর কিছু কিছু বিষয় পড়ে তিনি বলেনঃ আল্লাহর কসম, আলী এই বিচার কখনোই করতে পারেননা। বিভ্রান্ত না হলে কেউ এই বিচার করতে পারেনা।(মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৩)।
অর্থাৎ আলীর কিছু অতি উৎসাহী ও অতি ভক্ত সহচর তাঁর নামে এমন কিছু মিথ্যা কথা এসব পান্ডুলিপির মধ্যে লিখেছে যা তাঁর মর্যাদাকে ভুলুন্ঠিত করেছে, যদিও তারা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই এগুলো বাড়িয়েছে।
এ বিষয়ে অন্য তাবেয়ী তাঊস ইবনু কাইসার (১০৬ হি) বলেনঃ আরবী(********)
-ইবনু আব্বাস(রা) এর নিকট আলী(রা) এর বিচারের পান্ডুলিপি আনয়ন করা হয়। তিনি এক হাত পরিমাণ বাদে সেই পান্ডুলিপির সব কিছু মুছে ফেলেন। (মুসিলম, আস-সহীহ ১/১৩)।
প্রখ্যাত তাবেয়ী আবু ইসহাক আস সাবীয়ী(১২৯ হি) বলেন, যখন আলী(রা) এর এ সকল অতিভক্ত অনুসারী তাঁর ইন্তেকালের পরে এসকল নতুন বানোয়াট কথার উদ্ভাবন ঘটালো তখন আলী(রা) এর অনুসারীদের মধ্যে এক ব্যক্তি বলেনঃ আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন। কত বড় ইলম এরা নষ্ট করল! (মুসিলম, আস-সহীহ ১/১৩)।
তাবিয়ী মুগীরাহ ইবনু মিকসাম আদ-দাব্বী(১৩৬ হি) বলেনঃ আরবী(******)
-[আলী(রা) এর অনুসারীদের মধ্যে মিথ্যাচার এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে] আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ এর সাহচর্য্ লাভ করেছে এমন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ আলী(রা) হতে হাদীস বর্ণনা করলে তা সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা হতোনা। (মুসিলম, আস-সহীহ ১/১৩)।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, প্রথম হিজরী শতকের মাঝামাঝি থেকে ক্রমান্বয়ে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন স্বার্থে ও উদ্দেশ্যে হাদীসের নামে মিথ্যা বলার প্রবণতা দেখা দেয। যুগের বিবর্তনের সাথে সাথে এই প্রবণতা বাড়তে থাকে। হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে ক্রমেই মিথ্যাবাদীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং মিথ্যার প্রকার ও পদ্ধতিও বাড়তে থাকে। আমরা পরবর্তী পরিচ্ছেদে মিথ্যাবাদী জালিয়াতদের পরিচয়, শ্রেণীবিভাগ ও জালিয়াতির কারণসমূহ আলোচনা করব। তবে তার আগেই আমরা মিথ্যা প্রতিরোধে মুসলিম উম্মাহর কর্মপন্থা আলোচনা করতে চাই।
সাহাবীগণ ও তাঁদের পরবর্তী যুগগুলোর মুসলিম মনীষীগণ সকল প্রকার মিথ্যা থেকে বিশুদ্ধ হাদীসকে পৃথক রাখতে অত্যন্ত কার্য্কর ও বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বন করেছেন। আমরা এখানে তাঁদের কর্মধারা আলোচনা করতে চাই।
১.৩. মিথ্যা প্রতিরোধে সাহাবীগণ
ওহীর জ্ঞানের নির্ভূল ও অবিমিশ্র সংরক্ষণের বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের সামগ্রিক নির্দেশ, ওহীর নামে মিথ্যা বা আন্দাজে কথা বলার ভয়াবহ পরিণতি, হাদীসের নির্ভূল ও অবিমিশ্র সংরক্ষণে রাসূলুল্লাহ(স) এর বিশেষ নির্দেশ ও হাদীসের নামে মিথ্যা বলার নিষেধাজ্ঞার আলোকে সাহাবীগণ হাদীসে রাসূল (স) কে সকল প্রকার অনিচ্ছাকৃত, অজ্ঞতাপ্রসূত বা ইচ্ছাকৃত ভুল, বিকৃতি বা মিথ্যা থেকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তাঁরা একদিকে নিজেরা হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতেন। পরিপূর্ণ ও নির্ভূল মুখস্ত সম্পর্কে পূর্ণ নিশ্চিত না হলে তাঁরা হাদীস বলতেননা। অপরদিকে তাঁরা সবাইকে এভাবে পূর্ণরূপে হুবহু ও নির্ভূলভাবে মুখস্ত করে হাদীস বর্ণনা করতে উৎসাহ ও নির্দেশ প্রদান করতেন। তৃতীয়ত, তাঁরা সাহাবী ও তাবিয়ী যে কোনো হাদীস বর্ণনাকারীর হাদীসের নির্ভূলতা বিষয়ে সামান্যতম দ্বিধা হলে তা বিভিন্ন পদ্ধতিতে নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করার পরে গ্রহণ করতেন।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, তাঁদের যুগে ইচ্ছাকৃত ভুলের কোনো সম্ভাবনা ছিলনা। মানুষের জাগতিক কথাবার্তা ও লেনদেনেও কেউ বলতেননা। সততা ও বিশ্বস্ততাই ছিল তাঁদের বৈশিষ্ট্য। তা সত্ত্বেও অনিচ্ছাকৃত, অজ্ঞতাপ্রসূত বা আসাবধানতাজনিত সামান্যতম ভুল থেকে হাদীসে রাসূল(স) এর রক্ষায় তাঁদের কর্মধারা দেখলে হতবাক হয়ে যেতে হয়।
১.৩.১. অনিচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলা থেকে আত্মরক্ষা
আমরা জানি যে, মিথ্যা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত হতে পারে। অনিচ্ছাকৃত ভুলও মিথ্যা বলে গণ্য। সাহাবীগণ নিজে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ‘মিথ্যা’ থেকে আত্মরক্ষার জন্য নির্ভূলভাবে ও আক্ষরিকভাবে হাদীস বলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁদের সতর্কতার অগণিত ঘটনা হাদীস গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এখানে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি।
তাবিয়ী আমর ইবনু মাইমূন আল আযদী(74 হি) বলেনঃ আরবী(*********)
-আমি প্রতি বৃহস্পতিবার আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ(রা)এর নিকট আগমন করতাম। তিনি তাঁর কথাবার্তার মধ্যে রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, এ কথাটা কখনো বলতেননা। এক বিকেলে তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন’, এরপর তিনি মাথা নিচু করে ফেলেন। আমি তাঁর দিকে তাঁকিয়ে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁর জামার বোতামগুলি খোলা। তাঁর চোখ দুটি লাল হয়ে গিয়েছে এবং গলার শিরাগুলি ফুলে উঠেছে। তিনি বললেনঃ অথবা এর কম, অথবা এর বেশি, অথবা এর মত, অথবা এর কাছাকাছি কথা রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন। (ইবনু মাজাহ, আস সুনান 1/10-11, আস-সুনান 1/88, আল মুসতাদরাক ১/194)।
তাবিয়ী মাসরূক ইবনুল আজদা আবু আইশা (৬১ হি) বলেনঃ আরবী(***)
-একদিন আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ(রা) রাসূলুল্লাহ(স) হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তখন তিনি কেঁপে উঠেন এমনকি তাঁর পোশাকেও কম্পন পরিলক্ষিত হয়। এরপর তিনি বলেনঃ অথবা অনুরূপ কথা তিনি বলেছেন। (হাকিম, আল মুসতাদরাক 1/193)।
তাবিয়ী মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন(১১০ হি) বলেনঃ আরবী(****)
আনাস ইবনু মালিক(রা) যখন হাদীস বলতেন তখন হাদীস বর্ণনা শেষ করে বলতেন: অথবা রাসূলুল্লাহ(স) যা বলেছেন (আমার বর্ণনায় ভুল হতে পারে)। (ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/১১)।
হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সাহাবীগণ জ্ঞাতসারে একটি শব্দেরও পরিবর্তন করতেননা। আক্ষরিকভাবে হুবহু বর্ণনা করতেন তাঁরা। তাবেয়ী সা’দ ইবনু উবাইদাহ সুলামী (১০৩ হি) বলেন: সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু উমর(৭৩ হি) বলেন: রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(******)
-“পাঁচটি বিষয়ের উপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে: একমাত্র আল্লাহর ইবাদত বা তাওহীদ, সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত প্রদান করা, রামাদানের সিয়াম পালন এবং হ্জ্জ।” তখন এক ব্যক্তি বলে: “হজ্জ ও রামাদানের সিয়াম”। তিনি বলেন: “না, রামাদানের সিয়াম ও হজ্জ।” এভাবেই আমি রাসূলুল্লাহ(স) হতে শুনেছি। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/৪৫)।
ইয়াফুর ইবনু রূযী নামক তাবেয়ী বলেনঃ আমি শুনলাম, উবাইদ ইবনু উমাইর (৭২ হি) নামক প্রখ্যাত তাবিয়ী ও মক্কার সুপ্রসিদ্ধ ওয়ায়িয একদিন ওয়াযের মধ্যে বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(*****)
-“মুনাফিকের উদাহরণ হলো দুইটি ছাগলের পালের মধ্যে অবস্থানরত ছাগীর ন্যায়।” একথা শুনে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু উমার(৭৩ হি) বলেনঃ আরবী(****)
-দূর্ভোগ তোমাদের! তোমরা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলবেনা। রাসুলুল্লাহ(স) তো বলেছেন: “মুনাফিকের উদাহরণ হলো দুইটি ছাগলের পালের মধ্যে যাতায়াতরত (wandering, roaming) ছাগীর ন্যায়।” (মুসলিম, আস-সহীহ ১/৪৫)।
হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও পরিপূর্ণ নির্ভূলতা নিশ্চিত করার জন্য অধিকাংশ সাহাবী রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতেন। শুধুমাত্র যে কথাগুলি বা ঘটনাগুলি তাঁরা পরিপূর্ণ নির্ভূলভাবে মুখস্ত রেখেছেন বলে নিশ্চিত থাকতেন সেগুলিই বলতেন। অনেকে কখনোই রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কিছু বলতেননা। সাহাবীগণের সংখ্যা ও হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীগণের সংখ্যার মধ্যে তুলনা করলেই আমরা বিষয়টি বুঝতে পারি। রাসূলুল্লাহ(স) এর কম বেশি সাহচর্য্ লাভ করেছেন এমন সাহাবীর সংখ্যা লক্ষাধিক। নাম পরিচয় সহ প্রসিদ্ধ সাহাবীর সংখ্যা ১০ সহস্রাধিক। অথচ হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর সংখ্যা মাত্র দেড় হাজার।
সাহাবীদের নামের ভিত্তিতে সংকলিত প্রসিদ্ধ সর্ববৃহৎ হাদীসগ্রন্থ মুসনাদ আহমদ। ইমাম আহমদ এতে মোটামুটি গ্রহণ করার মত সকল হাদীস ও যয়ীফ হাদীস সংকলিত করেছেন। এতে ৯০৪ জন সাহাবীর হাদীস সংকলিত হয়েছে। পরিচিত, অপরিচিত, নির্ভরযোগ্য, অনির্ভরযোগ্য সকল হাদীসের বর্ণনাকারী সাহাবীর সংখ্যা একত্রিত করলে ১৫৬৫ হয়।
এখানে আরো লক্ষ্যণীয় যে, হাদীস বর্ণনাকারী সহস্রাধিক সাহাবীর মধ্যে অধিকাংশ সাহাবী মাত্র ১ টি থেকে ২০/৩০ টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ১০০ টির বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন এমন সাহাবীর সংখ্যা মাত্র ৩৮ জন। এঁদের মধ্যে মাত্র ৭ জন সাহাবী থেকে ১০০০ এর বেশি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বাকী ৩১ জন সাহাবী থেকে ১০০ হতে কয়েকশত হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকার অনেক ঘটনা সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে।
সাইদ ইবনু ইয়াযীদ(৯১ হি) একজন সাহাবী ছিলেন। ছোট বয়সে তিনি বিদায় হজ্জে রাসুলুল্লাহ(স) এর সাহচর্য্ লাভ করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি সাহাবীগণের সাহচর্যে জীবন কাটিয়েছেন। তিনি বলেনঃ আরবী(******)
-আমি আবদুর রাহমান ইবনু আউফ(রা), তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহ(রা), সাদ ইবনু আবী ওয়াক্কাস(রা) ও মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ(রা) প্রমূখ সাহাবীর সাহচর্যে সময় কাটিয়েছি। তাঁদের কাউকে রাসূলুল্লাহ(স) হতে হাদীস বলতে শুনিনি। তবে শুধুমাত্র তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহকে আমি ওহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে বলতে শুনেছি। (ইবনু আদী, আল কামিল ফী দুআফাইর রিজাইল ১/৯৩)।
তিনি আরো বলেনঃ “আমি সা’দ ইবনু মালিক(রা) এর সাহচর্যে মদীনা থেকে মক্কা পর্য্ন্ত গিয়েছি। এই দীর্ঘ পথে দীর্ঘ সময়ে তাঁকে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে একটি হাদীসও বলতে শুনিনি।”
হিজরী প্রথম শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী শা’বী(২০৪ হি) বলেনঃ “আমি আবুদল্লাহ ইবনে উমারের(রা) সাথে একটি বৎসর থেকেছি, অথচ তাঁকে রাসূলুল্লাহ(স) হতে কিছুই বলতে শুনিনি।”
অন্যত্র তিনি বলেনঃ “আমি দুই বৎসর বা দেড় বৎসর আবদুল্লাহ ইবনে উমার(রা) এর কাছে বসেছি। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁকে মাত্র একটি হাদীস বলতে শুনেছি…….।” (বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৬৫২; ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১৩/২৪৩)।
সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর(রা) বলেন, আমি আমার পিতা যুবাইর ইবনুল আওয়াম(রা) কে বললাম, অন্যান্য কোনো কোনো সাহাবী যেমন হাদীস বর্ণনা করেন আপনাকে তদ্রুপ হাদীস বলতে শুনিনা কেন? তিনি বলেনঃ “শুনে রাখ, ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আমি কখনো তাঁর সাহচর্য্ থেকে দূরে যাইনি। কিন্তু আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, আমার নামে (ইচ্ছাকৃতভাবে) যে ব্যক্তি মিথ্যা বলবে তাকে অবশ্যই জাহান্নামে বসবাস করতে হবে।(বুখারী, আস-সহীহ ১/৫২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/১৪)।
তাহলে যুবাইর ইবনু আওয়াম(৩৬ হি) এর হাদীস না বলার কারণ অজ্ঞতা নয়। তিনি নব্যূয়তের প্রথম কিশোর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এরপর দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর রাসূলুল্লাহ(স) এর সাহচর্যে জীবন কাটিয়েছেন। তাঁর ইন্তিকালের পরে তিনি প্রায় ২৫ বৎসর বেঁচে ছিলেন। অথচ তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৪০ টিরও কম। মুসনাদে আহমদে তাঁর থেকে ৩৬টি হাদীস সংকলিত হয়েছে। ইবনু হাযাম উল্লেখ করেছেন যে, নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য সনদে তাঁর নামে বর্ণিত সকল হাদীসের সংখ্যা মাত্র ৩৮ টি।(ইবনু হাযাম, আসমাউস সাহাবাহ আর-রুওয়াত, পৃ.৯৫)।
আমরা দেখেচি যে, অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে তিনি হাদীস বলা থেকে বিরত ছিলেন। কারণ রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলার শাস্তি জাহান্নাম। আর অনিচ্ছাকৃত ভুল বা শব্দগত পরিবর্তন ও তাঁর নামে মিথ্যা বলা হতে পারে। এজন্য তিনি হাদীস বর্ণনা থেকে অধিকাংশ সময় বিরত থাকতেন।
অন্যান্য সাহাবীও অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে এভাবে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতেন। তাবিয়ী আবদুর রহমান ইবনু আবী লাইলা(৮৩ হি) বলেনঃ “আমরা সাহাবী যাইদ ইবনু আরকাম(৬৮ হি) কে বললাম, আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস বর্ণনা করুন। তিনি বলেনঃ আমরা বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি এবং বিস্মৃতি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি। রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে হাদীস বলা খুবই কঠিন দায়িত্ব।”
সাহাবী সুহাইব ইবনু সিনান(রা) বলতেনঃ “তোমরা এস, আমি তোমাদেরকে যুদ্ধ বিগ্রহের কাহিনী বর্ণনা করবো। তবে কোনো অবস্থাতেই আমি ‘রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন’ একথা বলবনা। (আনসারুল আশরাফ ১/১৮৩)।
তাবিয়ী হাশিম হুরমুযী বলেন, আনাস ইবনু মালিক(রা) বলতেন, “ আমার ভয় হয় যে আমি অনিচ্ছাকৃত ভুল করে ফেলব। এই ভয় না থাকলে আমি অনেক কিছু তোমাদেরকে বলতাম যা আমি তাঁকে বলতে শুনেছি। কিন্তু তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক আমার নামে মিথ্যা বলবে তাকে জাহান্নামে বসবাস করতেই হবে। (আহমদ, আল মুসনাদ ৩/১৭২)।
এভাবে সাহাবীগণ অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতেন। এখানে লক্ষণীয় যে, আনাস ইবনু মালিক ও আবু কাতাদাহ দুজনেই বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(স)‘ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর নামে হাদীস বলার শাস্তি বর্ণনা করেছেন।’ কিন্তু তাঁরা অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে তাঁর নামে হাদীস বর্ণনা পরিহার করেছেন। কারণ ভুল হতে পারে জেনেও সাবধান না হওয়ার অর্থ ‘ইচ্ছাকৃতভাবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের সুযোগ দেওয়া।’ অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে সর্বাত্মক সতর্ক না হওয়ার অর্থ ইচ্ছাকৃত বিকৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া। কাজেই যে ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে সতর্ক না হওয়ার কারণে ভুল করল, সে ইচ্ছাকৃতভাবেই রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলল। কোনো মুমিন রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসের বিষয়ে অসতর্ক হতে পারেননা।
১.৩.২. অন্যের বলা হাদীস যাচাই পূর্বক গ্রহণ করা
এভাবে আমরা দেখেছি যে, সাহাবীগণ নিজেরা হাদীস বর্ণনার সময় আক্ষরিকভাবে নির্ভূল বলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন এবং কোনো প্রকারের দ্বিধা বা সন্দেহ হলে হাদীস বলতেননা। হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় তাঁদের দ্বিতীয় কর্মধারা ছিল অন্যের হাদীস বর্ণনা করার ক্ষেত্রেও অনুরূপ সতর্কতা অবলম্বন করা। অন্য কোনো সাহাবী বা তাঁদের সমকালীন তাবিয়ীর বর্ণিত হাদীসের আক্ষরিক নির্ভূলতা বা যথার্থতা(Accuracy) সম্বন্ধে সামান্যতম সন্দেহ হলে তাঁরা তা যাচাই না করে গ্রহণ করতেননা।
অর্থাৎ তাঁরা নিজে হাদীস বলার সময় যেমন ‘অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা’ থেকে আত্মরক্ষার সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন, তদ্রুপভাবে অন্যের বর্ণিত হাদীস সঠিক বলে গণ্য করার পূর্বে তাতে কোনো মিথ্যা বা ভুল আছে কিনা তা যাছাই করতেন। এই সূক্ষ্ম যাচাই ও নিরীক্ষাকে তাঁরা হাদীসের বিশুদ্ধতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য আল্লাহ ও তাঁর মহান রাসূলুল্লাহ(স)এর নির্দেশিত অন্যতম দায়িত্ব বলে মনে করতেন। এজন্য এতে কেউ কখনো আপত্তি করেননি বা অসম্মানবোধ করেননি।
১.৩.২.১. নির্ভূলতা নির্ণয়ে তুলনামূলক পরীক্ষা
পূর্বের আলোচনা হতে আমরা জেনেছি যে, মিথ্যা ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত উভয় প্রকারের হতে পারে। উভয় ধরনের মিথ্যা বা ভুল থেকে হাদীসকে রক্ষার জন্য সাহাবায়ে কেরাম কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
তাঁদের যুগে কোনো সাহাবী মিথ্যা বলতেননা এবং নির্ভূলভাবে হাদীস বলার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি করতেননা। তবুও তাঁরা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর কোনো ভুল হতে পারে সন্দেহ হলেই তাঁর বর্ণনাকে তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে তা গ্রহণ করতেন।
তুলনামূলক নিরীক্ষার প্রক্রিয়া ছিল বিভিন্ন ধরনের।
১. বর্ণিত হাদীস অর্থাৎ বাণী, নির্দেশ বা বর্ণনাকে মূল নির্দেশদাতার নিকট পেশ করে তার যথার্থতা ও নির্ভূলতা(Accuracy) নির্ণয় করা।
২. বর্ণিত বাণী, নির্দেশ বা বর্ণনা(হাদীস) কে অন্য কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তির বর্ণনার সাথে মিলিয়ে তার যথার্থতা ও নির্ভূলতা নির্ণয় করা।
৩. বর্ণিত বাণী, নির্দেশ বা বর্ণনা(হাদীস) কে বর্ণনাকারীর বিভিন্ন সময়ের বর্ণনার সাথে মিলিয়ে তার যথার্থতা ও নির্ভূলতা নির্ণয় করা।
৪. বর্ণিত হাদীসটির বিষয়ে বর্ণনাকারীকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে বা শপথ করিয়ে বর্ণনাটির যথার্থতা বা নির্ভূলতা নির্ধারণ করা।
৫. বর্ণিত বাণী, নির্দেশ বা হাদীসটির অর্থ কুরআন ও হাদীসের প্রসিদ্ধ অর্থ ও নির্দেশের সাথে মিলিয়ে দেখা।
এ সকল নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা হাদীস বর্ণনাকারী হাদীসটি সঠিকভাবে মুখস্ত রাখতে ও বর্ণনা করতে পেরেছে কিনা যাচাই করতেন।
সাহাবীগণের যুগ থেকে পরবর্তী সকল যুগে হাদীসের বর্ণনার নির্ভূলতা ও বিশুদ্ধতা নির্ধারণে এ সকল পদ্ধতিতে নিরীক্ষাই ছিল মুহাদ্দিসগণের মূল পদ্ধতি। আমরা জানি যে, বিশ্বের সকল দেশের সকল বিচারালয়ে প্রদত্ত সাক্ষ্যের যথার্থতা ও নির্ভূলতা নির্ণয়ের জন্য ও এই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়। কোনো বর্ণনা বা সাক্ষ্যের বিশুদ্ধতা ও নির্ভূলতা নির্ণয়ের জন্য এটাই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আমরা এখানে সাহাবীগণের যুগের কিছু উদাহরণ আলোচনা করব।
১.৩.২.২. মূল বক্তব্যদাতাকে প্রশ্ন করা
কোনো সাক্ষ্য বা বর্ণনার সত্যাসত্য যাচাইয়ের সর্বোত্তম উপায় বক্তব্যদাতাকে প্রশ্ন করা। রাসূলুল্লাহ(স) এর জীবদ্দশায় কোনো সাহাবী অন্য কোনো সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের নির্ভূলতা বিষয়ে সন্দীহান হলে রাসূলুল্লাহ(স) কে প্রশ্ন করে নির্ভূলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। বিভিন্ন হাদীসে এ সংক্রান্ত অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এখানে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি।
১. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ(রা) বিদায় হজ্জের বর্ণনার মধ্যে বলেনঃ আরবী(*******)
-[(বিদায় হজ্জের পূর্বে রাসূলুল্লাহ(স) আলী(রা) কে ইয়ামেন এর প্রশাসক রূপে প্রেরণ করেন। ফলে) আলী(রা) ইয়ামান থেকে মক্কায় হজ্জে আগমন করেন। তিনি মক্কায় এসে দেখেন যে, ফাতিমা(রা) উমরা পালন করে ‘হালাল’ হয়ে গিয়েছেন। তিনি রঙিন সুগন্ধময় কাপড় পরিধান করেছেন এবং সুরমা ব্যবহার করেছেন। আলী এতে আপত্তি করলে তিনি বলেনঃ আমার আব্বা আমাকে এভাবে করত নির্দেশ দিয়েছেন। আলী বলেনঃ আমি ফাতিমার বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ(স) এর কাছে অভিযোগ করলাম, সে যে রাসূলুল্লাহ(স) এর নির্দেশের কথা বলছে তাও বললাম এবং আমার আপত্তির কথাও বললাম। ….তখন রাসূলুল্লাহ(স) বলেনঃ ‘সে ঠিকই বলেছে, সে সত্যই বলেছে।(মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮৮৬-৮৯২)।
এখানে আমরা দেখতে পাই যে, আলী(রা) ফাতেমার(রা) বর্ণনার যথার্থতা সম্পর্কে সন্দীহান হন। তিনি তাঁর সত্যবাদিতায় সন্দেহ করেননি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ(স) এর বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝা ও বর্ণনা করার বিষয়ে তাঁর সন্দেহ হয়। অর্থাৎ তিনি অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার বিষয়ে সন্দীহান হন। এজন্য তিনি রাসূলুল্লাহ(স) কে প্রশ্ন করে নির্ভূলতা যাচাই করেন।
২. উবাই ইবনু কা’ব বলেনঃ আরবী(*******)
-একদিন রাসূলুল্লাহ(স) জুমু’আর দিনে খুতবায় দাঁড়িয়ে সূরা তাবারাকা(সূরা আল ফুরকান)পাঠ করেন এবং আমাদেরকে আল্লাহ নেয়ামত ও শান্তি সম্পর্কে ওয়ায করেন। এমতাবস্থায় আবু দারদা বা আবু যার আমার দেহে মৃদু চাপ দিয়ে বলেনঃ এই সূরা কবে নাযিল হলো, আমি তো এখনই প্রথম সূরাটি শুনছি। তখন উবাই তাকে ইশারায় চুপ থাকতে বলেন। সালাত শেষ হলে তিনি(আবু যার বা আবু দারদা) বলেনঃ আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, সূরাটি কখন নাযিল হয়েছে, অথচ আপনি আমাকে কিছুই বললেননা! তখন উবাই বলেনঃ আপনি আজ আপনার সালাতের কোনোই সাওয়াব লাভ করেননি, শুধুমাত্র যে কথাটুকু বলেছেন সেটুকুই আপনার(কারণ খুতবার সময় কথা বললে সালাতের সাওয়াব নষ্ট হয়।) তখন তিনি রাসূলুল্লাহ(স) এর নিকট যেয়ে বিষয়টি বললেনঃ তিনি বলেন ‘উবাই সত্য বলেছে।।’(ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৩৫২-৩৫৩)
৩. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস(রা) বলেনঃ আরবী(*******)
-আমাকে বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তি বসে সালাত আদায় করলে তা অর্ধেক সালাত হবে। তখন আমি তাঁর নিকট গমন করলাম। আমি দেখলাম যে, তিনি বসে সালাত আদায় করছেন। তখন আমি তাঁর মাথার উপর আমার হাত রাখলাম। তিনি বললেনঃ হে আবদুল্লাহ ইবনু আমর, তোমার বিষয় কি? আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে বলা হয়েছে যে, আপনি বলেছেন, কোনো ব্যক্তি বসে সালাত আদায় করলে তা অর্ধ সালাত হবে, আর আপনি বসে সালাত আদায় করছেন। তিনি বললেনঃ হ্যা, (আমি তা বলেছি), তবে আমি তোমাদের মত নই।(মুসলিম, আস-সহীহ ১/৫০৭)।
এভাবে অনেক ঘটনায় আমরা হাদীসে দেখতে পাই যে, কারো বর্ণিত হাদীসের যথার্থতা বা নির্ভূলতার বিষয়ে সন্দেহ হলে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ(স) কে প্রশ্ন করে যথার্থতা যাচাই করতেন। তাঁরা বর্ণনাকারীর সততার বিষয়ে প্রশ্ন তুলতেননা। মূলত তিনি বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝেছেন কিনা এবং নির্ভূলভাবে বর্ণনা করেছেন কিনা তা তাঁরা যাচাই করতেন। এভাবে তাঁরা হাদীসের নামে ‘অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা’ বা ভুলক্রমে বিকৃতি প্রতিরোধ করতেন।
১.৩.২.৩. অন্যদেরকে প্রশ্ন করা
সাক্ষ্য বা বক্তব্যের যথার্থতা নির্ণয়ের জন্য দ্বিতীয় পদ্ধতি বক্তব্যটি অন্য কেউ শুনেছেন কিনা এবং কিভাবে শুনেছেন তা খোঁজ করা। যে কোনো সাক্ষ্য বা বক্তব্যের নির্ভূলতা নির্ণয়ের জন্য তা সর্বজনীন পদ্ধতি। সকল বিচারালয়ে বিচারপতিগণ একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যের তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমেই রায় প্রদান করে থাকেন। একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যের মিল বিষয়টির সত্যতা প্রমাণ করে এবং অমিল প্রামাণ্যতা নষ্ট করে।
রাসূলুল্লাহ(স) এর ইন্তিকালের পর সাহাবীগণ এই পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। কোনো সাহাবীর বর্ণিত কোনো হাদীসের যথার্থতা বা নির্ভূলতা বিষয়ে তাঁদের কারো দ্বিধা হলে তাঁরা অনান্যা সাহাবীকে প্রশ্ন করতেন বা বর্ণনাকারীকে সাক্ষী আনতে বলতেন। যখন এক বা একাধিক ব্যক্তি বলতেন যে, তাঁরাও ঐ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(স) এর মুখ থেকে শুনেছেন, তখন তাঁরা হাদীসটি গ্রহণ করতেন। আবু বাকর সিদ্দীক(রা) এই পদ্ধতির শুরু করেন। পরবর্তী খলীফাগণ ও সকল যুগের মুহাদ্দিসগণ তা অনুসরণ করেন। এখানে সাহাবীগণের যুগের কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করছি।
১. সাহাবী কাবীসাহ ইবনু যুআইব (৮৪ হি) বলেনঃ আরবী(*******)
-“এক দাদী আবু বাকর(রা) এর নিকট এসে মৃত পৌত্রের সম্পত্তিতে তার উত্তরাধিকার দাবী করেন। আবু বাকর(রা) তাকে বলেনঃ আল্লাহর কিতাবে আপনার জন্য(দাদীর উত্তরাধিকার বিষয়ে) কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ(স) এর সুন্নাতেও আপনার জন্য কিছু আছে বলে আমি জানিনা। আপনি পরে আসবেন, যেন আমি এ বিষয়ে অন্যদের প্রশ্ন করে জানতে পারি। তিনি এ বিষয়ে মানুষদের প্রশ্ন করেন। তখন সাহাবী মুগীরাহ ইবনু শু’বা(রা) বলেনঃ আমার উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ(স) দাদীকে (পরিত্যক্ত সম্পত্তির) এক ষষ্ঠাংশ প্রদান করেন। তখন আবু বাকর(রা) বলেনঃ আপনার সাথে কি অন্য কেউ আছেন? তখন অন্য সাহাবী মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ আনসারী(রা) উঠে দাঁড়ান এবং মুগীরার অনুরূপ কথা বলেন। তখন আবু বাকর সিদ্দীক(রা) দাদীর জন্য ১/৬ অংশ প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন।”[মালিক ইবনু আনাস (১৭৯ হি), আল মুআত্তা ২/৫১৩]।
এখানে আমরা দেখছি যে, আবু বাকর সিদ্দীক(রা)হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতার শিক্ষা দিলেন। মুগীরাহ ইবনে শু’বার একার বর্ণনার উপরই তিনি নির্ভর করতে পারতেন। কারণ তিনি প্রসিদ্ধ সাহাবী এবং কুরাইশ বংশের অত্যন্ত সম্মানিত নেতা ছিলেন। সমাজের যে কোনো পর্যায়ে তাঁর একার সাক্ষ্যই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু তা সত্ত্বেও আবু বাকর(রা) সাবধানতা অবলম্বন করলেন। মুগীরার বিশ্বস্ততা প্রশ্নাতীত হলেও তাঁর স্মৃতি বিশ্বাসভঙ্গ করতে পারে বা তাঁর অনুধাবনে ভুল হতে পারে। এজন্য তিনি দ্বিতীয় আর কেউ হাদীসটি জানেন কিনা প্রশ্ন করেন। দুজনের বিবরণের উপর নির্ভর করে তিনি হাদীসটি গ্রহণ করেন।
এজন্য মুহাদ্দিসগণ আবু বাকর(রা) কে হাদীস সমালোচনার জনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লামা হাকিম নাইসাপূরী(৪০৫ হি) তাঁর সম্পর্কে বলেনঃ “তিনিই সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা হাদীস বর্ণনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। (মুহাম্মাদ মুস্তাফা আল-আযামী, মানহাজুন নাকদ ইনদাল মুহাদ্দিসীন, পৃ ১০)।
আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু তাহির ইবনুল কাইসুরানী(৫০৭ হি) সিদ্দীকে আকবারের জীবনী আলোচনাকালে বলেনঃ “তিনিই সর্বপ্রথম হাদীস গ্রহণ করার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেন।”
২. দ্বিতীয় খলীফা উমার(রা) এ বিষয়ে তাঁর পূর্বসূরী সিদ্দীকে আকবরের অনুসরণ করেছেন। বিভিন্ন ঘটনায় তিনি সাহাবীগণকে বর্ণিত কোনো হাদীসের জন্য দ্বিতীয় কোনো সাহাবীকে সাক্ষী হিসেবে আনয়ন করতে বলতেন। এ জাতীয় কতিপয় ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি।
আবু সাঈদ খুদরী(রা) বলেনঃ আরবী(*******)
-আমি আনসারদের এক মজলিসে বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় আবু মূসা আশআরী(রা) সেখানে আগমন করেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি অস্থির বা উৎকন্ঠিত। তিনি বলেনঃ আমি উমার(রা) এর ঘরে প্রবেশের জন্য তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করি। অনুমতি না দেয়ায় আমি ফিরে আসছিলাম। উমার(রা) আমাকে ডেকে বলেনঃ আপনার ফিরে যাওয়ার কারণ কি? আমি বললামঃ আমি তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করি, কিন্তু অনুমতি জানানো হয়নি। আর রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “যদি তোমরা তিনবার অনুমতি প্রার্থনা কর এবং অনুমতি না দেওয়া হয় তাহলে তোমরা ফিরে যাবে।” তখন উমার(রা) বলেনঃ আল্লাহর শপথ, এই বর্ণনার উপর আপনাকে অবশ্যই সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। (আবু মূসা বলেন): আপনাদের মধ্যে কেউ কি এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(স) হতে শুনেছেন? তখন উবাই ইবনে কা’ব (রা) বলেনঃ আমাদের মধ্যে যার বয়স সবচেয়ে কম সেই আপনার সাথে যাবে। (আবু সাঈদ খুদরী বলেন) আমি উপস্থিতদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়স্ক ছিলাম। আমি আবু মুসার(রা) সাথে যেয়ে উমারকে(রা) বললাম যে, রাসূলুল্লাহ(সা) একথা বলেছেন।(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২৩০৫; মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৬৯৪)।
৩. তাবেয়ী উরওয়া ইবনুয যুবাইর(৯৪ হি) বলেনঃ আরবী(*****)
-উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) মানুষদের কাছে জানতে চান, আঘাতের ফলে গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু হলে তার দিয়াত বা ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ(স) কি বিধান দিয়েছেন তা কেউ জানে কিনা? তখন মুগীরাহ ইবনু শু’বা (রা) বলেন: আমি তাঁকে এ বিষয়ে একজন দাস বা দাসী প্রদানের বিধান প্রদান করতে শুনেছি। উমার(রা) বলেন: আপনার সাথে এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য কাউকে আনয়ন করুন। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বলেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ(স) অনুরূপ বিধান দিয়েছেন।(বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৫৩১; মুসলিম, আস –সহীহ ৩/১৩১১)।
৪. সাহাবী আমর ইবনু উমাইয়াহ আদ-দামরী(রা) বলেনঃ আরবী(*****)
-তিনি একটি চাদর ক্রয়ের জন্য তা দাম করছিলেন। এমতাবস্থায় উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) তাঁর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। উমার বলেনঃ এটি কি? তিনি বলেনঃ আমি এই চাদরটি ক্রয় করে দান করতে চাই। এরপর তিনি তা ক্রয় করে তাঁর স্ত্রীকে প্রদান করেন এবং বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ(স) কে বলতে শুনেছিঃ ‘তোমরা স্ত্রীগণকে যা প্রদান করবে তাও দান বলে গণ্য হবে।’ তখন উমার বলেন: আপনার সাথে সাক্ষী কে আছে? তখন তিনি আয়েশা(রা) এর নিকট গমন করেন এবং দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়ান। আয়েশা(রা) বলেনঃ কে? তিনি বলেনঃ আমি আমর। আপনি কি শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ তোমরা স্ত্রীগণকে যা প্রদান করবে তাই দান? আয়েশা বলেনঃ হ্যাঁ। [বাইহাকী, আহমদ ইবনুল হুসাইন (৪৫৮ হি)]
৫. ওয়ালীদ ইবনু আবদুর রাহমান আল-জুরাশী নামক তাবিয়ী বলেনঃ আরবী(*********)
“সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু উমার(রা) অন্য সাহাবী আবু হুরায়রা(রা) এর নিকট দিয়ে গমন করছিলেন। সে সময় আবু হুরায়রা(রা) রাসূলুল্লাহ(স) হতে হাদীস বর্ণনা করছিলেন। হাদীস বর্ণনার মধ্যে তিনি বলেনঃ ‘কেউ যদি কারো জানাযার অনুগমন করে এবং সালাতে অংশগ্রহণ করে তবে সে এক কীরাত সাওয়াব অর্জন করবে। আর যদি সে তার দাফনে উপস্থিত থাকে তাহলে সে দুই কীরাত সাওয়াব অর্জন করবে। এক কীরাত ওহুদ পাহাড়ের চেয়েও বড়।’ তখন আবদুল্লাহ ইবনু উমার বলেনঃ আবু হুরাইরা আপনি ভেবে দেখুনতো আপনি রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কি বলছেন। তখন আবু হুরাইরা(রা)তাকে সাথে নিয়ে আয়েশা(রা) এর নিকট গমন করেন এবং তাঁকে বলেনঃ হে উম্মুল মুমিনীন, আমি আপনাকে আল্লাহর নামে কসম করে জিজ্ঞাসা করছি, আপনি কি রাসূলুল্লাহ(স) কে বলতে শুনেছেন যে, ‘কেউ যদি কারো জানাযার অনুগমন করে ও সালাতে অংশগ্রহণ করে তবে সে এক কীরাত সাওয়াব অর্জন করে। আর যদি সে তার দাফনে উপস্থিত থাকে তাহলে দুই কীরাত সাওয়াব অর্জন করবে।’ তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, অবশ্যই শুনেছি।”(আহমদ, আল-মুসনাদ ২/২, আল মুসতাদরাক ৩/৫৮৪)।
১.৩.২.৪. বিভিন্ন সময়ের বর্ণনার মধ্যে তুলনা করা
কোনো সাক্ষ্য বা বক্তব্যের নির্ভূলতা নির্ণয়ের জন্য অন্য একটি পদ্ধতি হলো তাকে একই বিষয়ে একাধিক সময়ে প্রশ্ন করা। যদি দ্বিতীয়বারের উত্তর প্রথমবারের সাথে হুবহু মিলে যায় তাহলে তবে তার নির্ভূলতা প্রমাণিত হয়। আর উভয়ের বৈপরীত্য অগ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে। সাহাবীগণ হাদীসের নির্ভূলতা নির্ণয়ে এ পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। একটি উদাহরণ দেখুন।
তাবিয়ী উরওয়া ইবনু যুবাইর বলেনঃ আরবী(******)
-“আমার খালাম্মা আয়েশা(রা) আমাকে বলেনঃ ভাগ্নে, শুনেছি সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস(রা) আমাদের এলাকা দিয়ে হজ্জে গমন করবেন। তমি তাঁর সাথে দেখা কর এবং তার থেকে প্রশ্ন করে শিখ। কারণ তিনি রাসূলুল্লাহ(স) হতে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছেন। উরওয়া বলেনঃ আমি তখন তাঁর সাথে সাক্ষাত করি এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করি। তিনি সে সব বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(স) থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি যে সকল কথা বলেন, তার মধ্যে তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ থেকে জ্ঞান ছিনিয়ে নেবেননা। কিন্তু তিনি জ্ঞানীদের কব্জা করবেন(মৃত্যুর মাধ্যমে তাদের গ্রহণ করবেন), ফলে তাদের সাথে জ্ঞানও উঠে যাবে। মানুষের মধ্যে মূর্খ নেতৃবৃন্দ অবশিষ্ট থাকবে, যারা ইলম ছাড়াই ফতওয়া প্রদান করবে এবং এভাবে নিজেরা বিভ্রান্ত হবে এবং অন্যদেরও বিভ্রান্ত করবে।” উরওয়া বলেনঃ আমি যখন আয়েশাকে(রা) একথা বললাম তখন তিনি তা গ্রহণ করতে আপত্তি করলেন। তিনি বলেন: তিনি কি তোমাকে একথা বলেছেন যে, একথা তিনি রাসূলুল্লাহ(স) হতে শুনেছেন? উরওয়া বলেনঃ পরের বছর আয়েশা(রা) আমাকে বলেন: আবদুল্লাহ ইবনু আমর আগমন করেছেন। তুমি তাঁর সাথে আগমন করে তাঁর সাথে কথাবার্তা বল। কথার ফাঁকে ইলম উঠে যাওয়ার হাদীসটির বিষয়েও কথাও বলবে। উরওয়া বলেনঃ আমি তখন তাঁর সাথে সাক্ষাত করি এবং তাঁকে প্রশ্ন করি। তিনি তখন আগেরবার যেভাবে বলেছিলেন সেভাবেই হাদীসটি বললেন। উরওয়া বলেনঃ আমি যখন আয়েশা(রা)কে বিষয়টি জানালাম তখন তিনি বলেনঃ আমি বুঝতে পারলাম যে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর ঠিকই বলেছেন। আমি দেখেছি যে, তিনি একটুও বাড়িয়ে বলেননি বা কমিয়ে বলেননি।(মুসলিম, আস-সহীহ ৪/২০৫৮-২০৫৯)।
এখানেও আমরা হাদীষ গ্রহণের ক্ষেত্রে সাহাবীগণের অকল্পনীয় সাবধানতার নমুনা দেখতে পাই। আয়েশা(রা) আবদুল্লাহ ইবনু আমরের সততা বা সত্যবাদিতায় সন্দেহ করেননি। কিন্তু সৎ ও সত্যবাদী ব্যক্তিরও ভুল হতে পারে। কাজেই বিনা নিরীক্ষায় তাঁরা কিছুই গ্রহণ করতে চাইতেননা। রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কথিত কোনো হাদীস তারা নিরীক্ষার আগেই ভক্তিভরে হৃদয়ে স্থান দিতেননা।
১.৩.২.৫. বর্ণনাকারীকে শপথ করানো
বর্ণনা বা সাক্ষ্যের নির্ভূলতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনে বর্ণনাকারী বা সাক্ষীকে শপথ করানো হয়। সত্যপরায়ণ ও আল্লাহভীরু মানুষ ইচ্ছাকৃত মিথ্যা কথা বলেননা। তবে তাঁর স্মৃতি তাঁকে ধোঁকা দিতে পারে বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের মধ্যে তিনি নিপতিত হতে পারেন। কিন্তু আল্লাহর নামে শপথ করতে হলে তিনি কখনো পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলবেননা। এজন্য সত্যপরায়ণ ব্যক্তির জন্য শপথ করানো সাক্ষ্য বা বক্তব্যের নির্ভূলতা যাচাইয়ের জন্য কার্য্কর পদ্ধতি। তবে মিথ্যাবাদীর জন্য শপথ যথেষ্ট নয়। তার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশ্ন (cross interrogation) এর মাধ্যমে তার বক্তব্যের যথার্থতা যাচাই করতে হয়।
সাহাবীগণ সকলেই ছিলেন সত্যপরায়ণ অত্যন্ত আল্লাহভীরু মানুষ। তা সত্ত্বেও অনিচ্ছাকৃত ভুলের সম্ভাবনা দূর করার জন্য সাহাবীগণ কখনো হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীকে শপথ করাতেন। আলী(রা) বলেনঃ আরবী(*****)
-আমি এমন একজন মানুষ ছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ(স)থেকে কোনো কথা নিজে শুনলে আল্লাহ আমাকে তা থেকে তাঁর মর্জিমত উপকৃত হতে তাওফীক প্রদান করতেন। আর যদি তাঁর কোনো সাহাবী আমাকে কোনো হাদীস শুনাতেন তবে আমি তাকে শপথ করাতাম। তিনি শপথ করলে আমি তার বর্ণিত হাদীস সত্য বলে গ্রহণ করতাম।(তিরমিযী, আস-সুনান ১/৪৪৬)।
১.৩.২.৬. অর্থ ও তথ্যগত নিরীক্ষা
‘ওহী’র জ্ঞান মানবীয় জ্ঞানের অতিরিক্ত, কিন্তু কখনোই মানবীয় জ্ঞানের বিপরীত বা বিরুদ্ধ নয়। অনুরূপভাবে হাদীসের মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘ওহী’ কুরআনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘ওহী’র ব্যাখ্যা, সম্পূরণ বা অতিরিক্ত সংযোজন হতে পারে, কিন্তু কখনোই তা কুরআনের বিপরীত বা বিরুদ্ধ হতে পারেনা।
সাহাবীগণের কর্মপদ্ধতি থেকে আমরা দেখতে পাই যে, তাঁরা এই মূলনীতির ভিত্তিতে বর্ণিত হাদীসের অর্থগত নিরীক্ষা করতেন। আমরা দেখেছি যে, সাধারণভাবে তাঁরা কুরআনের অতিরিক্ত ও সম্পূরক অর্থের জন্যেই হাদীসের সন্ধান করতেন। কুরআন কারীমে যে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই তা হাদীসে আছে কিনা তা জানতে চাইতেন। পাশাপাশি তাঁরা প্রদত্ত তথ্যের অর্থগত নিরীক্ষা করতেন। তাঁদের অর্থ নিরীক্ষা পদ্ধতি ছিল নিম্নরূপঃ
(১) হাদীসের ক্ষেত্রে প্র্রথম বিবেচ্য বিষয় হলো, তা রাসূলুল্লাহ(স) এ কথা বলে প্রমাণিত কিনা। যদি বর্ণনাকারীর বর্ণনা, শপথ বা অন্যান্য সাক্ষ্যের মাধ্যমে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয় যে, কথাটি রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, তবে সেক্ষেত্রে তাঁদের নীতি ছিল তাকে কুরআনের সম্পূরক নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করা এবং তারই আলোকে কুরআনের ব্যাখ্যা করা। ইতোপূর্বে দাদীর উত্তরাধিকার ও গৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা বিষয়ে আমরা তা দেখতে পেয়েছি। দাদীর বিষয়ে কুরআনে কিছু বলা হয়নি। এক্ষেত্রে হাদীসের বিবরণটি অতিরিক্ত সংযোজন। অনুমতি প্রার্থনার ক্ষেত্রে কুরআনে বলা হয়েছে যে, অনুমতি চাওয়ার পরে “যদি তোমাদেরকে বলা হয় যে, ‘তোমরা ফিরে যাও’ তবে তোমরা ফিরে যাবে।”(সূরা নূরঃ২৮)।
এক্ষেত্রে হাদীসের নির্দেশনাটি বাহ্যত এই কুরআনী নির্দেশনার ‘বিরুদ্ধ’। কারণ তা কুরআনী নির্দেশনাকে আংশিক পরিবর্তন করে বলছে যে, তিন বার অনুমতি প্রার্থনার পরে ‘তোমরা ফিরে যাও’ বলা না হলেও ফিরে যেতে হবে।
সাহাবীগণ উভয় হাদীসকে কুরআনের ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
(২) কোনো কথা রাসূলুল্লাহ(স) বলেননি বলে প্রমাণিত হলে বা গভীর সন্দেহ হলে, কোনোরূপ অর্থ বিবেচনা না করেই তা প্রত্যাখ্যান করতেন। আমরা দেখেছি যে, বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততায় ও নির্ভরযোগ্যতায় সন্দেহ হলে তাঁরা কোনোরূপ অর্থ বিবেচনা ছাড়াই সেই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করতেন।
(৩) কখনো কখনো দেখা গিয়েছে যে, বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততার কারণে বর্ণিত হাদীস বাহ্যত গ্রহণযোগ্য। তবে বর্ণনাকারীর অনিচ্ছাকৃত ভুলের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে তাঁরা সেই হাদীসের অর্থ কুরআনে কারীম ও তাঁদের জানা হাদীসের আলোকে পর্যালোচনা করেছেন এবং হাদীসটির অর্থ কুরআনে কারীম ও প্রসিদ্ধ সুন্নাতের সুস্পষ্ট বিপরীত হলে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এইরূপ অর্থ বিচার ও নিরীক্ষার কয়েকটি উদাহরণ দেখুনঃ
১. আবু আসসান আল আরাজ নামক তাবিয়ী বলেনঃ আরবী(****)
-দুই ব্যক্তি আয়েশা(রা) এর নিকট গমন করে বলেনঃ আবু হুরাইরা(রা) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন: নারী, পশু বা বাহন ও বাড়ি ঘরের মধ্যে অযাত্রা ও অশুভত্ব আছে। একথা শুনে আয়েশা(রা) এত বেশি রাগাণ্বিত হন যে, মনে হলো তাঁর দেহ ক্রোধে ছিন্নভিন্ন হয়ে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি বলেনঃ যিনি কুরআন নাযিল করেছেন তাঁর কসম, তিনি এভাবে বলতেননা। রাসূলুল্লাহ(স)বলতেনঃ “জাহিলিয়্যাতের যুগের মানুষেরা বলতঃ নারী, বাড়ি ও পশু বা বাহনে অশুভত্ব আছে।” এরপর আয়েশা(রা) কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ (সূরা আল হাদীসঃ ২২)।“পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্য্য় আসে আমি তা সংঘটিত করার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে।” (আহমদ, আল মুসনাদ ৬/১৫০, ২৪৬)।
এখানে আয়েশা(রা) আবু হুরাইরা(রা) এর বর্ণনা গ্রহণ করেননি। তিনি রাসূলুল্লাহ(স) হতে যা শুনেছেন এবং কুরআনের যে আয়াত পাঠ করেছেন তার আলোকে এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
২. উমরাহ বিনতে আবদুর রাহমান বলেনঃ আরবী(*******)
-‘আয়েশা(রা) এর নিকট উল্লেখ করা হয় যে, আবদুল্লাহ ইবনু উমার(রা) রাসূলুল্লাহ(স) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ‘জীবিতের ক্রন্দনে মৃতব্যক্তি শাস্তি পায়।’ তখন আয়েশা(রা) বলেনঃ আল্লাহ ইবনু উমারকে ক্ষমা করুন। তিনি মিথ্যা বলেননি। তবে তিনি বিস্মৃত হয়েছেন বা ভুল করেছেন(দ্বিতীয় বর্ণনায়ঃ শুনতে অনেক সময় ভুল হয়)। প্রকৃত কথা হলো, রাসূলুল্লাহ(স) এক ইহুদী মহিলার(কবরের) নিকট দিয়ে গমন করেন, যার জন্য তার পরিজনেরা ক্রন্দন করছিল। তিনি তখন বলেনঃ‘এরা তার জন্য ক্রন্দন করছে এবং সে তার কবরে শাস্তি পাচ্ছে।’ আল্লাহ বলেছেনঃ (সূরা আল আনআমঃ ১৬৪, সূরা ফাতির ১৮)। ‘এক আত্মা অন্য আত্মার পাপের বোঝা বহন করবেনা।’’’(মুসলিম, আস-সহীহ ২/৬৪০-৬৪৩)।
৩. ফাতিমা বিনতে কাইস(রা) নামক একজন মহিলা সাহাবী বলেন, তাঁর স্বামী তাঁকে তিন তালাক প্রদান করেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ(স) বলেন যে, তিনি(ঐ মহিলা) ইদ্দতকালীন আবাসন ও ভরণপোষণের খরচ পাবেননা। তাঁর এই কথা শুনে খলীফা উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) বলেনঃ আমরা আল্লাহর গ্রন্থ ও রাসূলে কারীম(স) এর সুন্নাত একজন মহিলার কথায় ছেড়ে দিতে পারিনা। কারণ আমরা বুঝতে পারছিনা যে, তিনি বিষয়টি মুখস্ত রেখেছেন না ভুলে গিয়েছেন। তিন তালাক প্রাপ্তা মহিলাও ইদ্দতকালীন আবাসন ও খোরপোশ পাবেন। মহিমাময় পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেছেনঃ(সূরা আত তালাকঃ১) তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বহিষ্কার করোনা এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়।”(মুসলিম, আস-সহীহ ২/১১১৮, আস-সুনান ২/২৯৭)।
১.৩.৩. ইচ্ছাকৃত মিথ্যার সম্ভাবনা রোধ করা
সাহাবীগণের যুগের প্রথম দিকে সাহাবীগণই হাদীস বর্ণনা করতেন। এক সাহাবী অন্য সাহাবীকে অথবা পরবর্তী প্রজন্ম তাবিয়ীগণকে হাদীস শুনাতেন ও শিক্ষা দিতেন। রাসূলুল্লাহ(স) এর ইন্তেকালের ২০/২৫ বছরের মধ্যে একদিকে যেমন অনেক সাহাবী ইন্তেকাল করেন, তেমনি অনেক সাহাবী হাদীস বর্ণনা ও শিক্ষাদান শুরু করেন। আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, এ সময় থেকে কোনো কোনো নও মুসলিম তাবেয়ীর মধ্যে ইচ্ছাকৃত মিথ্যার প্রবণতা দেখা দেয়। তখন সাহাবীগণ হাদীস গ্রহণের বিষয়ে আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে থাকেন।
এক সাহাবী অন্য সাহাবী হতে হাদীস বর্ণনা করলে শ্রোতা বা শিক্ষার্থী সাহাবী বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত সততা ও সত্যপরায়ণতায় কোনোরূপ সন্দেহ করতেননা বা তিনি নিজ কর্ণে হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(স) হতে শুনেছেন বা অন্য কেউ তাকে বলেছেন সে বিষয়েও প্রশ্ন করতেননা। রাসূলুল্লাহ(স) এর সাহচর্য্ প্রাপ্ত সকল মানুষই ছিলেন তাঁরই আলোয় আলোকিত মহান মানুষ ও সত্যবাদিতায় আপোষহীন। তবে বিস্মৃতি, অনিচ্ছাকৃত ভুল বা হৃদয়ঙ্গমের অপূর্ণতা জনিত ভুল হতে পারে বিধায় উপরোক্ত বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাঁরা বর্ণিত হাদীসের নির্ভূলতা যাচাই করতেন।
তাবিয়ী বর্ণনাকারীদের হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁরা উপরোক্ত নিরীক্ষার পাশাপাশি দুইটি অতিরিক্ত বিষয় যোগ করেন। প্রথমত, তাঁরা বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত সত্যপরায়ণতা ও বিশ্বস্ততার বিষয়ে অনুসন্ধান করতেন এবং দ্বিতীয়ত, তাঁরা বর্ণনাকারী কার নিকট হতে হাদীসটি শুনেছেন তা(Reference)জানতে চাইতেন।
তৃতীয় খলীফায়ে রাশেদ হযরত ওসমানের(রা)খেলাফত যুগে(২৩-৩৫ হি) মদীনার কেন্দ্র হতে দূরে অবস্থিত নও-মুসলিমদের মাঝে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার কারণে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভ্রান্তি ও হানাহানি ঘটে এবং নও-মুসলিমদের মধ্যে সত্যপরায়ণতার কমতি দেখা দেয়। তখন হতেই সাহাবীগণ উপরোক্ত দুইটি পদ্ধতি গ্রহণ করেন। প্রথম হিজরী শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন(১১০ হি) বলেনঃ “তাঁরা(সাহাবীগণ) সনদ বা তথ্যসূত্র সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করতেননা। যখন(উসমানের খেলাফতের শেষ দিকে,৩০-৩৫ হি) ফিতনা-ফাসাদ ঘটে গেল তখন তাঁরা বললেনঃ তোমাদেরকে যারা হাদীস বলেছেন তাঁদের নাম উল্লেখ কর। কারণ দেখতে হবে, তারা যদি আহলুস সুন্নাত বা সুন্নাত পন্থীগণের অন্তর্ভূক্ত হন তাহলে তাদের হাদীস গ্রহণ করা হবে। আর তারা যদি আহলুল বিদ‘আত বা বিদ‘আত পন্থী গণের অন্তর্ভূক্ত হন তাহলে তাদের হাদীস গ্রহণ করা হবেনা। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৫)।
প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস(রা) (৬৮ হি) বলেনঃ “আমরা তো হাদীস মুখস্ত করতাম এবং রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস (যে কোনো বর্ণনাকারী হতে) মুখস্ত করা হতো। কিন্তু তোমরা যেহেতু খানা খন্দক ও ভাল মন্দ সব পথেই চলে গেলে সেহেতু এখন(বর্ণনাকারীর বিচার নিরীক্ষা ছাড়া) কোনো কিছু গ্রহণ করার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত।
তাবিয়ী মুজাহিদ (১০৪ হি) বলেনঃ “বাশীর ইবনু কা’ব আল-আদাবী নামক একজন প্রাচীন তাবিয়ী আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাসের(রা) নিকট আগমন করেন এবং হাদীস বলতে শুরু করেন। তিনি বলতে থাকেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন। কিন্তু ইবনু আব্বাস তার দিকে কর্ণপাত ও দৃষ্টিপাত করলেননা। তখন বাশীর বলেনঃ হে ইবনু আববাস, আমার কি হলো! আপনি আমার হাদীস শুনেছেন কি? আমি আপনাকে রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস বর্ণনা করছি অথচ আপনি কর্ণপাত করছেননা। তখন ইবনু আব্বাস(রা) বলেনঃ একসময় ছিল যখন আমরা কাউকে বলতে শুনতাম ‘রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন’ তখনই আমাদের দৃষ্টিগুলি তার প্রতি আবদ্ধ হয়ে যেত এবং আমরা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তার প্রতি কর্ণপাত করতাম। কিন্তু যখন মানুষ খানাখন্দক ভাল মন্দ সব পথেই চলে গেল তখন থেকে আমরা আর মানুষদের থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করিনা, শুধুমাত্র সুপরিচিত ও পরিজ্ঞাত বিষয় ব্যতিরেকে। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৩)।
১.৩.৪. হাদীস বর্ণনা ও গ্রহণে সতর্কতার নির্দেশ
এভাবে সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনা ও গ্রহণে চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। পাশাপাশি তাঁরা অন্য সবাইকে এমন সতর্কতা অবলম্বন করতে উৎসাহ ও নির্দেশ প্রদান করতেন। এক্ষেত্রে কোনোরূপ অবহেলা বা ঢিলেমি তাঁরা সহ্য করতেননা। তাঁরা বিনা যাচাইয়ে হাদীস গ্রহণ করতে নিষেধ করতেন। অনেক সময় কারো হাদীস বর্ণনায় অনিচ্ছাকৃত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বা শ্রোতাদের মধ্যে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাঁকে হাদীস বলতে নিষেধ করতেন। এখানে কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করছি।
১. আবু উসমান আন-নাহদী বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব(রা) বলেনঃ ‘‘একজন মানুষের মিথ্যা বলার জন্য এই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে সবই বর্ণনা করবে।’’ (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১১)।
২. আবুল আহওয়াস বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রা) বলেনঃ ‘‘একজন মানুষের মিথ্যা বলার জন্য এই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে সবই বর্ণনা করবে।’’ (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১১)।
৩. সাহাবী আবদুর রাহমান ইবনু আউফ(রা) এর পুত্র মদীনার প্রখ্যাত আলিম, ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইবরাহীম ইবনু আবদুর রাহমান(৯৫ হি) বলেনঃ “উমার ইবনুল খাত্তাব(রা), আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রা), আবু দারদা(রা), আবু মাসঊদ(রা) কে ডেকে পাঠান। তিনি তাঁদেরকে বলেনঃ আপনারা রাসূলুল্লাহ(স) থেকে এত বেশি হাদীস বলছেন কেন? এরপর তিনি তাঁদেরকে মদীনাতেই অবস্থানের নির্দেশ দেন। তাঁর শাহাদাত পর্য্ন্ত তাঁরা মদীনাতেই ছিলেন।(তাবারানী, আল-মুজা’মুল আউসাত ৪/৮৬, নং ৩৪৪৯)।
এই তিনজন সাহাবী হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। উমার ইবনে খাত্তাব(রা) তাঁদের নির্ভূল হাদীস বলার ক্ষমতা বা যোগ্যতার বিষয়ে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ করেননি। কিন্তু বেশি হাদীস বললে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে। বিশেষত, কূফা বা সিরিয়ার মত প্রত্যন্ত এলাকায় যেখানে ইসলামী বিজয়ের সেই প্রথম দিনগুলিতে অধিকাংশ নও মুসলিম অনারব বসবাস করতেন, তাদের মধ্যে বেশি হাদীস বর্ণনা করলে অনেক শ্রোতা তা সঠিক ভাবে হৃদয়ঙ্গম ও মুখস্ত করতে পারবেননা বলে আশঙ্কা থাকে। এজন্য হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য উমার ইবনুল খাত্তাব তাঁদেরকে মদীনায় অবস্থানের নির্দেশ প্রদান করেন।
অন্য ঘটনায় আমরা দেখতে পাই যে, উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) নিজে কুরআন ও হাদীসের কিছু বিষয় হজ্জ মওসূমে মক্কায় জনসম্মুখে আলোচনা করতে চান। কিন্তু সাহাবী আবদুর রাহমান ইবনু আউফ(রা) তাঁকে বলেন যে, মক্কায় উপস্থিত অগণিত অনারব ও নও মুসলিম হজ্জ পালনকারী হয়ত আপনার কথা ঠিকমত বুঝতে পারবেননা। এতে ভুল বুঝা ও অপব্যাখ্যার সুযোগ এসে যাবে। কাজেই আপনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করার পর বিষয়গুলি আলোচনা করবেন। উমার(রা) এই পরামর্শ অনুসারে মক্কায় বিষয়গুলি আলোচনার সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করেন।(বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৫০৩-২৫০৪)।
১.৪. জালিয়াতি প্রতিরোধে মুসলিম উম্মাহ
উপরের আলোচনা হতে আমরা স্পষ্টরূপে দেখতে পাই যে, ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত, অনুধাবনগত বা অসাবধানতাজনিত সকল প্রকার মিথ্যা হতে বিশুদ্ধ হাদীসকে নির্ভেজালভাবে সংরক্ষণের জন্য সাহাবীগণ যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তা একদিকে যেমন যৌক্তিক, প্রায়গিক, বৈজ্ঞানিক ও সূক্ষ্ম, অন্যদিকে তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে একক ও অনন্য। অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীগণ তাঁদের ধর্মের মূল শিক্ষা বা ওহী সংরক্ষণের জন্য এরূপ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। যা প্রচারিত হয়েছে তাই সংকলিত করা হয়েছে। অবশেষে ওহীর সাথে মানবীয় জ্ঞানের মিশ্রণের মাধ্যমে ওহীর বিকৃতি ও অবলুপ্তি ঘটেছে।
তাবিয়ীগণের যুগ থেকে মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ সাহাবীগণের পদাঙ্ক অনুসরণ করে হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আপোষহীন ছিলেন। তাঁরা হাদীস এর সংরক্ষণ ও বানোয়াট কথা থেকে বিশুদ্ধ হাদীসের বাছাই এর জন্য তাঁদের জীবনের সকল আরাম আয়েশ পরিত্যাগ করেছেন।
এই পরিচ্ছেদে আমরা সংক্ষেপে তাঁদের মূলনীতিগুলো আলোচনা করবে।
১.৪.১. হাদীস শিক্ষা ও সংরক্ষণ
মহান আল্লাহ উম্মাতে মুহাম্মাদীর প্রথম যুগের মানুষদেরকে তাঁর মহান রাসূল(স) এর হাদীস সংরক্ষণের বিষয়ে একটি সঠিক ও সময়োপযোগী কর্মের তাওফীক প্রদান করেন। প্রথম হিজরী শতক থেকে সাহাবী, তাবিয়ী ও তৎপরবর্তী যুগের আলিমগণ মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি গ্রামগঞ্জ, শহর ও জনপদ ঘুরে ঘুরে সকল হাদীস ও বর্ণনাকারীদের তথ্য সংগ্রহ করতেন। হাদীস শিক্ষা, লিখে রাখা, শিখানো ও হাদীস কেন্দ্রিক আলোচনাই ছিল ইসলামের প্রথম তিন চার শতকের মানুষদের অন্যতম কর্ম, নেশা, পেশা ও আনন্দ।
তাবেয়ীগণের যুগ থেকে বা হিজরী প্রথম শতকের মাঝামাঝি থেকে পরবর্তী প্রায় তিন শতাব্দী পর্য্ন্ত সময়কালে আমরা দেখতে পাই যে, হাদীস বর্ণনাকারীগণ দুই প্রকারের। অনেক হাদীস বর্ণনাকারী বা ‘রাবী’ নিজ এলাকার ‘রাবী’ বা মুহাদ্দিসগণের নিকট হতে এবং সম্ভব হলে অন্যান্য দেশের কিছু মুহাদ্দিসের নিকট হাদীস শিক্ষা করেছেন। এরপর তিনি হাদীস বর্ণনা ও শিক্ষায় রত থেকেছেন। তাঁর নিকট হতে যে শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়েছে তাকে সেই হাদীসগুলি শিক্ষা দিয়েছেন। এরা সাধারণভাবে ‘রাবী’ বা বর্ণনাকারী নামে পরিচিত।
অপরদিকে এই যুগগুলিতে অনেক মুহাদ্দিস নিজ এলাকার সকল ‘রাবী’র নিকট হতে হাদীস শিক্ষা ও লিপিবদ্ধ করার পরে বেড়িয়ে পড়েছেন তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি জনপদ সফর করতে। তাঁরা প্রত্যেকে দীর্ঘ কয়েক বছর বা কয়েক যুগ এভাবে প্রতিটি জনপদে গমন করে সকল জনপদের সকল ‘রাবী’ বা মুহাদ্দিসের নিকট হতে হাদীস শুনেছেন ও লিপিবদ্ধ করেছেন। একজন সাহাবীর বা একজন তাবেয়ীর একটিমাত্র হাদীস বিভিন্ন ‘রাবী’র মুখ হতে শুনতে ও সংগ্রহ করতে তাঁরা মক্কা, মদীনা, খোরাসান, সমরখন্দ, মারভ, ওয়াসিত, বাসরা, কূফা, বাগদাদ, দামেস্ক, হালাব, কায়রো, সান‘আ ইত্যাদি অগণিত শহরে সফর করেছেন। একটি হাদীসই তাঁরা শত শত সনদে সংগ্রহ করে তুলনার মাধ্যমে নির্ভুল ও ভুল বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেছেন।
একটি নমুনা দেখুন। তৃতীয় হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইবরাহীম ইবনু সাঈদ আল জাওহারী আল বাগদাদী(২৪৭ হি)। তার সমসাময়িক মুহাদ্দিস আবদুল্লাহ ইবনু জাফার ইবনু খাকান বলেনঃ আমি ইবরাহীম ইবনু সাঈদকে আবু বাকর সিদ্দীক(রা) হতে বর্ণিত একটি হাদীসের বিষয়ে প্রশ্ন করলাম। তিনি তার খাদেমকে বললেনঃ গ্রন্থাগারে ঢুকে আবু বাকর সিদ্দীক(রা) এর হাদীস সংকলনের ২৩ তম খন্ডটি নিয়ে এস। আমি বললামঃ আবু বাকর(রা) থেকে ২০ টি হাদীসও সহীহ সনদে পাওয়া যায়না, আপনি কিভাবে তাঁর হাদীস ২৩ টি খন্ডে সংকলন করলেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ কোনো একটি হাদীস যদি আমি কমপক্ষে ১০০ টি সনদে সংগ্রহ করতে না পারি তাহলে আমি সেই হাদীসের ক্ষেত্রে নিজেকে এতিম বলে মনে করি। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ১/১৫৪-১৫৫)।
হাদীস গ্রহণের সময় তাঁরা সংশ্লিষ্ট ‘রাবী’ কে বিভিন্ন প্রশ্ন করে তার বর্ণনার যথার্থতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেছেন। সাথে সাথে তার ব্যক্তিগত সততা, তার শিক্ষকগণ ও এলাকার অন্যান্য রাবীগণের বিষয়ে সেই এলাকার প্রসিদ্ধ আলেম, মুহাদ্দিস ও শিক্ষার্থীগণকে প্রশ্ন করেছেন। এভাবে সংগৃহীত সকল তথ্য তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা সকল রাবী ও তাদের বর্ণিত সকল হাদীসের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান প্রদান করেছেন। এ সকল নিরীক্ষক ও সমালোচক হাদীস বিশেষজ্ঞগণ একদিকে রাবী বা হাদীস বর্ণনাকারী এবং সাথে সাথে ‘নাকিদ’ বা হাদীস সমালোচক ও হাদীসের ইমাম বলে পরিচিত। ইসলামের প্রথম চার শতাব্দীতে এই ধরনের শতাধিক ইমাম ও নাকিদ আমরা দেখতে পাই। হাদীসে রাসূলের খেদমতে এদের পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। জ্ঞান ও সভ্যতার ইতিহাসে তা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার যোগ্য। অন্য কোনো জাতির ইতিহাসে এর সামান্যতম নজির নেই। এদের কর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণের জন্যও শত শত পৃষ্ঠার গ্রণ্থ প্রণয়ণের প্রয়োজন।
এ সকল নাকিদ মুহাদ্দিস বা ইমাম এভাবে সকল হাদীস ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাদি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসের বিশুদ্ধ ও নির্ভেজাল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। তাঁরা হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা চিহ্নিত করেছেন, মিথ্যাবাদীকে চিহ্নিত করেছেন, বিশুদ্ধ হাদীসকে মিথ্যা ও সন্দেহজনক বর্ণনা থেকে পৃথক করেছেন। তাঁরা নিম্নের পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করেছেন।
১. সকল হাদীসের সনদ, সূত্র বা Reference সংরক্ষণ।
২. সনদের সকল রাবীর ব্যক্তিগত পরিচয়, জন্ম, মৃত্যু, শিক্ষা, উস্তাদ, ছাত্র, কর্ম, সফর ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ।
৩. রাবীগণের ব্যক্তিগত সততা, বিশ্বস্ততা ও সত্যপরায়ণতা যাচাই করা।
৪. বর্ণিত হাদীসের অর্থগত নিরীক্ষা ও যাচাই করা।
৫. সনদে উল্লেখিত প্রত্যেক রাবী তার উর্ধ্বতন রাবীর নিকট হতে স্বকর্ণে হাদীসটি শুনেছেন কিনা তা যাচাই করা।
৬. সংগৃহীত সকল হাদীসের তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা থেকে নির্ভুল বর্ণনাগুলি পৃথক করা।
৭. সংগৃহীত তথ্যাদি ও তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে যে সকল রাবীর মিথ্যাচার ধরা পড়েছে তাদের মিথ্যাচার উম্মাহর সামনে তুলে ধরা।
৮. সংগৃহীত সকল হাদীস সনদসহ গ্রন্থায়িত করা।
৯. রাবীদের নির্ভুলতা বা মিথ্যাচার বিষয়ক তথ্যাদি গ্রন্থায়িত করা।
১০. পৃথক গ্রন্থে বিশুদ্ধ হাদীস সংকলিত করা।
১১. পৃথক গ্রন্থে মিথ্যা ও জাল হাদীসগুলি সংকলিত করা।
১২. জাল বা মিথ্যা হাদীস সহজে চেনার নিয়মাবলি বের করা।
নিম্নে আমরা এ সকল বিষয়ে আলোচনা করব।
১.৪.২. সনদ সংরক্ষণ
আমরা দেখেছি যে, সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সনদ বা তথ্য সূত্র বলার রীতি চালু করেন। যেন সূত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে হাদীসের সত্যাসত্য যাচাই করা যায়। পরবর্তী যুগগুলোতে সনদ সংরক্ষণের বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করা হয়। হাদীস বর্ণনাকারী ব্যক্তির প্রসিদ্ধি, সততা, মহত্ব, পান্ডিত্য ইত্যাদি যত বেশিই হোকনা কেন, তিনি কার নিকট হতে হাদীসটি শুনেছেন এবং তিনি কোন সূত্রে হাদীসটি বলেছেন তা উল্লেখ না করলে মুহাদ্দিসগণ কখনোই তার বর্ণিত হাদীসকে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেননি। উপরন্তু তিনি এবং তার সনদে বর্ণিত প্রত্যেক রাবী পরবর্তী রাবী থেকে হাদীসটি নিজে শুনেছেন কিনা তা যাচাই করেছেন। সনদের গুরুত্ব বুঝাতে অনেক কথা তাঁরা বলেছেন।
প্রথম হিজরী শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন বলেনঃ “এই জ্ঞান হলো দ্বীন(ধর্ম)। কাজেই কার নিকট হতে তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছ তা দেখে নেবে।” (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৪)।
সুফিয়ান ইবনু উ‘আইনাহ(১৯৮ হি) বলেনঃ “একদিন ইবনু শিহাব যুহরী (১২৫ হি) হাদীস বলছিলেন। আমি বললামঃ আপনি সনদ ছাড়াই হাদীসটি বলুন। তিনি বলেনঃ তুমি কি সিঁড়ি ছাড়াই ছাদে আরোহন করতে চাও?” (সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ২/১৬০)।
দ্বিতীয় হিজরী শতকের অন্যতম মুহাদ্দিস সুফিয়ান ইবনু সাঈদ আস সাউরী(১৬১ হি) বলেনঃ “সনদ মুমিনের অস্ত্র স্বরূপ।” (সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ২/১৬০)।
উতবাহ ইবনু আবু হাকীম (১৪০ হি) বলেন, একদিন আমি ইসহাক ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু আবী ফারওয়া(১৪৪ হি) এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। সেখানে ইবনু শিহাব যুহুরী(১২৫ হি)উপস্থিত ছিলেন। ইবনু আবী ফারওয়া হাদীস বর্ণনা করে বলতে থাকেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, …..। তখন ইবনু শিহাব যুহুরী তাকে বলেন, হে ইবনু আবী ফারওয়া, আল্লাহ আপনাকে ধ্বংস করুন! আল্লাহর নামে কথা বলতে আপনার কত্ত বড় দুঃসাহস! আপনি হাদীস বলছেন অথচ হাদীসের সনদ বলছেননা। আপনি আমাদেরকে লাগামহীন হাদীস বলছেন।(যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ১/৩৪৪)।
প্রসিদ্ধ তাবি তাবিয়ী আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক(১৮১ হি) বলেনঃ “সনদ বর্ণনা ও সংরক্ষণ দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সনদ বর্ণনার ব্যবস্থা না থাকলে যে যা চাইত তাই বলত।”(মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৫)।
তৃতীয় হিজরী শতকের মুহাদ্দিস আবু ইসহাক ইবরাহীম ইবনু ইসহাক ইবনু ঈসা(২১৫ হি) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক(১৮১ হি) কে বললাম, একটি হাদীসে বলা হয়েছে, ‘তোমরা সালাতের সাথে পিতামাতার জন্য সালাত আদায় করা এবং তোমার সিয়ামের সাথে পিতামাতার জন্য সিয়াম পালন করা নেককর্মের অন্তর্ভুক্ত।’ তিনি বলেনঃ হাদীসটি আপনি কার নিকট হতে শুনেছেন? আমি বললামঃ শিহাব ইবনু খিরাশ থেকে। তিনি বলেনঃ শিহাব নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি, তিনি কার নিকট হতে শুনেছেন? আমি বললামঃ তিনি হাজ্জাজ ইবনু দীনার থেকে। তিনি বলেনঃ হাজ্জাজ নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি, তিনি কার নিকট হতে শুনেছেন? আমি বললামঃ তিনি বলেছেন-রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন। ইবনুল মুবারক বললেনঃ হে আবু ইসহাক, হাজ্জাজ ইবনু দীনার ও রাসূলুল্লাহ(স) এর মাঝে বিশাল দূরত্ব রয়েছে, যে দূরত্ব অতিক্রম করতে অনেক বাহনের প্রয়োজন। অর্থাৎ হাজ্জাজ দ্বিতীয় হিজরীর শেষের দিকের একজন তাবে-তাবেয়ী। অন্তত ২/৩ জন ব্যক্তির মাধ্যম ছাড়া তিনি রাসূলুল্লাহ(স) এর নিকট পৌঁছাতে পারেননা। তিনি যেহেতু বাকী সনদ বলেননি, সেহেতু হাদীসটি গ্রহণযোগ্য নয়। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৬)।
এভাবে প্রথম হিজরী শতাব্দী থেকে মুসলিম উম্মাহ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সনদ (uninterrupted chain of authorities) উল্লেখ অপরিহার্য্ বলে গণ্য করেছেন। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় হাদীস বলতে দুইটি অংশের সমন্বিত রূপকে বুঝায়। প্রথম অংশঃ হাদীসের সূত্র বা সনদ ও দ্বিতীয় অংশঃ হাদীসের মূল বক্তব্য বা মতন।
একটি উদাহরণ দেখুন। ইমাম মালিক ইবনু আনাস(১৭৯ হি) ২য় হিজরী শতকের একজন প্রসিদ্ধ হাদীস সংকলক। তিনি তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে বলেনঃ আরবী(*****)
-“মালিক, আবুয যিনাদ(১৩০ হি) থেকে, তিনি আ’রাজ(১১৭ হি) থেকে, তিনি আবু হুরাইরা(৫৯ হি) থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) শুক্রবারের কথা উল্লেখ করে বলেনঃ এই দিনের মধ্যে একটি সময় আছে কোনো মুসলিম যদি সেই সময় দাঁড়িয়ে সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ তাকে তা প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ(স) হাত দিয়ে ইঙ্গিত করেন যে, এই সুযোগটি স্বল্প সময়ের জন্য।[মালিক ইবনু আনাস (১৭৮), আল মুআত্তা ১/১০৮]।
উপরের হাদীসের প্রথম অংশ “মালিক, আবযু যিনাদ থেকে…. আবু হুরাইরা থেকে” হাদীসের সনদ বা সূত্র। শেষে উল্লেখিত রাসূলুল্লাহ(স) এর বাণীটুকু হাদীসের ‘মতন’ বা বক্তব্য। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় হাদীস বলতে শুধু শেষের বক্তব্যটুকুই নয়, বরং সনদ ও মতন এর সম্মিলিত রূপকেই হাদীস বলা হয়। একই বক্তব্য দুইটি পৃথক সনদে বর্ণিত হলে তাকে দুইটি হাদীস বলে গণ্য করা হয়। অনেক সময় শুধু সনদকেই হাদীস বলা হয়।(ইবনু হাজার আসকালানী, লিসানুল মীযান ৩/২৫৩)।
১.৪.৩. সনদ বনাম লিখিত পান্ডুলিপি
উপরের হাদীস ও হাদীস গ্রন্থসমূহে সংকলিত অনুরূপ অগণিত হাদীস হতে কেউ ধারণা করতে পারেন যে, সাহাবী, তাবেয়ী বা তাবে-তাবেয়ীগণ সম্ভবত হাদীস লিপিবদ্ধ বা সংকলিত করে রাখতেননা, শুধুমাত্র মুখস্ত ও মৌখিক বর্ণনা করতেন। এজন্য বোধহয় মুহাদ্দিসগণ এভাবে সনদ উল্লেখ করে হাদীস সংকলিত করেছেন। অনেকেই ধারণা করেন যে, হাদীস তৃতীয় বা চতূর্থ হিজরী শতকেই লিপিবদ্ধ বা সংকলিত হয়েছে, এর পূর্বে তা মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল।
বিষয়টি কখনো তা নয়। হাদীস বর্ণনা বা সংকলনের পদ্ধতির সম্পর্কে অজ্ঞতা বা অগভীর ভাসাভাসা জ্ঞানই এই কঠিন বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে। বস্তুত হাদীস বর্ণনা বা সংকলনের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ সূক্ষ্মতম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তাঁরা মৌখিক বর্ণনা ও লিখিত পান্ডুলিপির সমন্বয়ের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনায় ভুলভ্রান্তি অনুপ্রবেশের পথ রোধ করেছেন। হাদীস শিক্ষা, সংগ্রহ ও সনদ বর্ণনায় সর্বদা মৌখিক বর্ণনা ও শ্রুতির পাশাপাশি লিখনি ও পান্ডুলিপির উপর নির্ভর করা হতো। অনুরূপভাবে হাদীস নিরীক্ষা ও জালিয়াতি নির্ধারণেও পান্ডুলিপির উপর নির্ভর করা হতো।
১.৪.৩.১. হাদীস শিক্ষা, সংগ্রহ ও সনদ বর্ণনায় পান্ডুলিপি
সাহাবীগণ সাধারণত হাদীস মুখস্ত করতেন এবং কখনো কখনো লিখেও রাখতেন। সাহাবীগণের হাদীস লিখে রাখার প্রয়োজনও তেমন ছিলনা। আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, অধিকাংশ সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ২০/৩০ টির বেশি নয়। রাসূলুল্লাহ(স) এর সাহচর্যে কাটানোর দিনগুলির স্মৃতি থেকে ২০/৩০ টি বা ১০০ টি, এমনকি হাজারটা ঘটনা বা কথা বলার জন্য লিখে রাখার প্রয়োজন হতোনা। তাছাড়া তাঁদের জীবনে আর কোনো বড় বিষয় ছিলনা। রাসূলুল্লাহ(স) এর স্মৃতি আলোচনা, তাঁর নির্দেশাবলী হুবহু পালন, তাঁর হুবহু অনুকরণ ও তাঁর কথা মানুষদের শোনানোই ছিল তাঁদের জীবনের অন্যতম কাজ। অন্য কোনো জাগতিক ব্যস্ততা তাঁদের মন মগজকে ব্যস্ত রাখতে পারতনা। আর যে স্মৃতি ও যে কথা সর্বদা মনে জাগরুক ও কর্মে বিদ্যমান তা তো আর পৃথক কাগজে লিখার দরকার হয়না। তা সত্ত্বেও অনেক সাহাবী তাঁদের মুখস্ত হাদীস লিখে রাখতেন এবং লিখিত পান্ডুলিপির সংরক্ষণ করতেন। (মুহাম্মাদ আজ্জাজ আল খাতীব, আস-সুন্নাত কাবলাত তাদবীন, পৃ. ৩০৩-৩২১)।
সাহাবীগণের ছাত্রগণ বা তাবেয়ীগণের যুগে থেকে হাদীস শিক্ষা প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল লিখিত পান্ডুলিপি সংরক্ষণ করা। অধিকাংশ তাবেয়ী ও পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসগণ হাদীস শুনতেন, লিখতেন ও মুখস্ত করতেন। পান্ডুলিপি সামনে রেখে বা পান্ডুলিপি থেকে মুখস্ত করে তা ছাত্রদের শোনাতেন। তাঁদের ছাত্ররা শোনার সাথে সাথে তা নিজেদের পান্ডুলিপিতে লিখে নিতেন এবং শিক্ষকের পান্ডুলিপির সাথে মিলাতেন। তাবেয়ীগণের যুগ, অর্থাৎ প্রথম হিজরী শতাব্দীর শেষাংশ থেকে এভাবে সকল পঠিত হাদীস লিপিবদ্ধ করে রাখা হাদীস শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। এ বিষয়ক অগণিত বিবরণ হাদীস বিষয়ক গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে। দু একটি উদাহরণ দেখুন।
তাবিয়ী আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আকীল(১৪০ হি) বলেনঃ “আমি এবং আবু জা‘ফর মুহাম্মাদ আল বাকির(১১৪ হি) সাহাবী জাবির ইবনু আবদুল্লাহ(৭০ হি) এর নিকট গমন করতাম। আমরা সাথে ছোট ছোট বোর্ড বা স্লেট নিয়ে যেতাম যেগুলিতে আমরা হাদীস লিপিবদ্ধ করতাম।” [রামহুরমুযী, হাসান ইবনে আবদুর রহমান(৩৬০ হি)]
তাবিয়ী আমির ইবনু শারাহীল শা’বী (১০২ হি) বলেনঃ “তোমরা যা কিছু আমার নিকট হতে শুনবে সব লিপিবদ্ধ করবে। প্রয়োজনে দেয়ালের গায়ে লিখতে হলেও তা লিখে রাখবে।”(প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৬)।
তাবিয়ী আবু কিলাবাহ আবদুল্লাহ ইবনু যাইদ(১০৪ হি) বলেনঃ “ভুলে যাওয়ার চেয়ে লিখে রাখা আমার কাছে অনেক প্রিয়।” (ইবনু রাজার, শারহু ইলালিত তিরমিযী, পৃ. ৫৭)।
তাবিয়ী হাসান বসরী(১১০ হি) বলেনঃ“আমাদের নিকট পান্ডুলিপিসমূহ রয়েছে, যেগুলি আমরা নিয়মিত দেখি ও সংরক্ষণ করি।”(রামহুরমুযী, আল মুহাদ্দিস আল ফাসিল, ৩৭০-৩৭১)।
প্রসিদ্ধ তাবি তাবিয়ী আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক(১৮১ হি) বলেনঃ “হাদীস শিক্ষার সময় পান্ডুলিপি আকারে লিখে না রাখলে আমরা মুখস্তই করতে পারতামনা।”(ইবনু রাজার,শারহু ইলালিত তিরমিযী, পৃ. ৫৭)।
এ বিষয়ক অগণিত বর্ণনা লিপিবদ্ধ করতে পৃথক গ্রন্থের প্রয়োজন।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, তাবেয়ীগণের যুগ থেকে মুহাদ্দিসগণ হাদীস শিক্ষার সাথে সাথে তা লিখে রাখতেন। হাদীস শিক্ষা দানের সময় তাবিয়ী ও তাবে তাবেয়ীগণ সাধারণত পান্ডুলিপি দেখে হাদীস পড়ে শেখাতেন। কখনো বা মুখস্ত পড়ে হাদীস শেখাতেন তবে পান্ডুলিপি নিজের হেফাজতে রাখতেন যাতে প্রয়োজনের সময় তা দেখে নেয়া যায়।
তাবিয়ীগণের যুগে বা তৎপরবর্তীযুগে কতিপয় মুহাদ্দিস ছিলেন যারা পান্ডুলিপি ছাড়াই হাদীস মুখস্ত করতেন ও বর্ণনা করতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরা হাদীস বর্ণনায় দূর্বল বলে প্রমাণিত হয়েছেন। পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, এরা পান্ডুলিপির উপর নির্ভর না করায় মাঝে মাঝে বর্ণনায় ভুল করতেন। বস্তুত মৌখিক শ্রবণ ও পান্ডুলিপির সংরক্ষণের মাধ্যমেই নির্ভরযোগ্য বর্ণনা করা সম্ভব। এজন্য যে সকল ‘রাবী’ শুধুমাত্র পান্ডুলিপির উপর নির্ভর করে বা শুধুমাত্র মুখস্তশক্তির উপর নির্ভর করে হাদীস বর্ণনা করতেন তাঁদের হাদীস মুহাদ্দিসগণ দূর্বল বা অনির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। কারণ তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে এদের বর্ণনায় ভুল ও বিক্ষিপ্ততা ধরা পড়ে। এই জাতীয় অগণিত বিবরণ আমরা রিজাল ও জারহু ওয়াত তা’দীল বিষয়ক গ্রন্থগুলিতে দেখতে পাই। দুই একটি উদাহরণ দেখুনঃ
আবু আম্মার ইকরিমাহ ইবনু আম্মার আল ইজলী(১৬০ হি) দ্বিতীয় শতকের একজন প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি হাদীস মুখস্তকারী হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর মুখস্ত হাদীসগুলিকে লিপিবদ্ধ করে পান্ডুলিপি আকারে সংরক্ষণ করতেননা, ফলে প্রয়োজনে তা দেখতে পারতেননা। এজন্য তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে কিছু ভুল পাওয়া যেত। ইমাম বুখারী(১৫৬ হি) বলেনঃ “তাঁর কোনো পান্ডুলিপি ছিলনা, এজন্য তাঁর হাদীসে বিক্ষিপ্ততা পাওয়া যায়।(যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ৫/১১৪)।
দ্বিতীয় হিজরী শতকের একজন প্রসিদ্ধ হাদীস বর্ণনাকারী মুহাদ্দিস জারীর ইবনু হাযিম ইবনু যাইদ(১৭০ হি)। তাঁর বিষয়ে ইবনু হাজার বলেনঃ “তিনি নির্ভরযোগ্য।….. তবে তিনি যখন পান্ডুলিপি না দেখে শুধুমাত্র মুখস্ত স্মৃতির উপর নির্ভর করে হাদীস বলতেন তখন তাঁর ভুল হতো।” (ইবনু হাজার, তারকীবুত তাহযীব, পৃ. ১৩৮)।
দ্বিতীয় হিজরী শতকের একজন রাবী আব্দুল আযীয় ইবনু ইমরান ইবনু আব্দুল আযীয(১৭০ হি)। তিনি মদীনার অধিবাসী ছিলেন এবং সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনু আউফের বংশধর ছিলেন। মুহাদ্দিসগণ তাঁকে দূ্র্বল ও অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। কারণ তাঁর বর্ণিত হাদীসের মাঝে ভুল ভ্রান্তি ব্যাপক। আর এই ভুলভ্রান্তির কারণ হলো পান্ডুলিপি ব্যতিরেকে মুখস্ত বর্ণনা করা। তৃতীয় হিজরী শতকের মদীনার মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক উমার ইবনু শাব্বাহ(২৬২ হি) তাঁর ‘মদীনার ইতিহাস’ গ্রন্থে এই ব্যক্তির সম্পর্কে বলেনঃ “তিনি হাদীস বর্ণনায় অনেক ভুল করতেন; কারণ তাঁর পান্ডুলিপিগুলো পুড়ে যাওয়ার ফলে তিনি স্মৃতির উপর নির্ভর করে মুখস্ত হাদীস বলতেন।”(ইবনু হাজার, তাহযীবুত তাহযীব ৬/৩১২)।
ইবনু হাজার আসকালানীর ভাষায়ঃ “তিনি একজন পরিত্যক্ত রাবী। তাঁর পান্ডুলিপিগুলো পুড়ে যায়। এজন্য তিনি স্মৃতির উপর নির্ভর করে হাদীস বলতেন। এতে তাঁর ভুল হতো খুব বেশি।” (ইবনু হাজার, তাকরীবুত তাহযীব পৃ. ৩৫৮)।
তৃতীয় শতকের একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হাজিব ইবনু সুলাইমান আল মানবিজী(২৬৫ হি)। তিনি ইমাম নাসাঈর উস্তাদ ছিলেন। তিনি হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও পান্ডুলিপি না থাকার কারণে ভুল হতো। ইমাম দারাকুতনী(৩৮৫ হি) বলেনঃ “তিনি হাদীস মুখস্ত বলতেন এবং স্মৃতির উপরেই নির্ভর করতেন। তাঁর কোনো পান্ডুলিপি ছিলনা। এজন্য তাঁর হাদীসে ভুল দেখা দেয়।” (যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ২/১৬৪)।
তৃতীয় শতকের একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম ইবনু মুসলিম, আবু উমাইয়া(২৭৩ হি)। তাঁর সম্পর্কে তাঁর ছাত্র মুহাম্মাদ ইবনু হিব্বান(৩৫৪ হি) বলেনঃ “তিনি তুরতুসের অধিবাসী ছিলেন এবং নির্ভরযোগ্য ছিলেন। তিনি মিশরে আগমন করেন এবং কোনো পান্ডুলিপি ছাড়া মুখস্ত কিছু হাদীস বর্ণনা করেন; যে সকল হাদীস বর্ণনায় তিনি ভুল করেন। এজন্য তাঁর বর্ণিত কোনো হাদীস আমি দলীল হিসেবে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নই। শুধুমাত্র যে হাদীসগুলি তিনি পান্ডুলিপি দেখে বর্ণনা করেছেন সেগুলিই গ্রহণ করা যায়। (ইবনু হিব্বান, মুহাম্মাদ(৩৫৪ হি), আস-সিকাত ৯/১৩৭)।
ইমাম শাফেয়ী(২০৪ হি) দ্বিতীয় হিজরী শতকের অন্যতম আলিম। তিনি লিখেছেনঃ “যে মুহাদ্দিস এর ভুল বেশি হয় এবং তার কোনো বিশুদ্ধ লিখিত পান্ডুলিপি নেই তার হাদীস গ্রহণ করা যাবেনা।”
(শাফেয়ী, আল রিসালাহ, পৃ. ৩৮২)।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, দ্বিতীয় হিজরী শতক হতে হাদীস শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য শিক্ষকের নিকট হতে মৌখিক শ্রবণ ও লিখিত পান্ডুলিপি সংরক্ষণ উভয়ের সমন্বয়ের উপর নির্ভর করা হতো। সুপ্রসিদ্ধ ‘হাফিজ-হাদীসগণ’, যারা আজীবন হাদীস শিক্ষা করেছেন ও শিক্ষা দিয়েছেন এবং লক্ষ লক্ষ হাদীস মুখস্ত রেখেছেন, তাঁরাও পান্ডুলিপি না দেখে হাদীস শিক্ষা দিতেননা বা বর্ণনা করতেননা।
৩য় শতকের অন্যতম মুহাদ্দিস আলী ইবনুল মাদীনী(২৩৪ হি) বলেনঃ “হাদীস মুখস্ত করার ক্ষেত্রে আমাদের সাথীদের মাঝে আহমাদ ইবনু হাম্বল(২৪১ হি) এর চেয়ে বড় বা বেশি যোগ্য আর কেউই ছিলেননা। তা সত্ত্বেও তিনি পান্ডুলিপি সামনে না রেখে হাদীস বর্ণনা করতেননা। আর তাঁর মধ্যে রয়েছে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।” (যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১১/২১৩)।
অপরদিকে ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বাল (২৪১ হি) বলেনঃ “অনেকে আমাদেরকে স্মৃতি থেকে হাদীস শুনিয়েছেন এবং অনেকে আমাদেরকে পান্ডুলিপি থেকে হাদীস শুনিয়েছেন। যারা পান্ডুলিপি দেখে হাদীস শুনিয়েছেন তাঁদের বর্ণনা ছিল বেশি নির্ভুল।”(ইবনু রাজাব, শারহু ইলালিত তিরমিযী, পৃ. ৫৭)।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকে মুহাদ্দিসগণ হাদীস শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়ের সমন্বয়কে অত্যন্ত জরুরী মনে করতেন: প্রথমত হাদীসটি উস্তাদের মুখ থেকে শাব্দিকভাবে শোনা বা তাকে মুখে পড়ে শোনানো ও দ্বিতীয়ত পঠিত হাদীসটি নিজে হাতে লিখে নেওয়া ও তৃতীয়ত উস্তাদের পান্ডুলিপির সাথে নিজের লেখা পান্ডুলিপি মিলিয়ে সংশোধন করে নেওয়া। কোনো মুহাদ্দিস স্বকর্ণে শ্রবণ ব্যতীত শুধু পান্ডুলিপি দেখে হাদীস শেখালে বা পান্ডুলিপি ছাড়া শুধু মুখস্ত হাদীস শেখালে তা গ্রহণ করতে তাঁরা আপত্তি করতেন। ইমাম আহমদ হাম্বলের পুত্র আবদুল্লাহ (২৯০ হি) বলেনঃ
“ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মা’ঈন(২৩৩ হি) বলেনঃ ইমাম আব্দুল রাজ্জাক সান‘আনী (২১১ হি) আমাকে বলেন: তুমি আমার নিকট হতে অন্তত একটি একটি হাদীস লিখিত পান্ডুলিপি ছাড়া গ্রহণ কর। আমি বললাম: কখনোইনা, আমি লিখিত পান্ডুলিপির প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র মৌখিক বর্ণনার উপর নির্ভর করে একটি অক্ষরও গ্রহণ করতে রাজী নই।”(আহমাদ, আল-মুসনাদ ৩/২৯৭)।
আব্দুর রাযযাক সান’আনীর মত সুপ্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণনাকারী মুহাদ্দিসের নিকট থেকেও লিখিত ও সংরক্ষিত পান্ডুলিপির সমন্বয় ব্যতিরেকে একটি হাদীস গ্রহণ করতেও রাজী হননি ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন!
এ বিষয়ে তাঁদের মূলনীতি দেখুন। তৃতীয় শতকের অন্যতম মুহাদ্দিস ও হাদীস বিচারক ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন বলেনঃ “যদি কোনো ‘রাবী’র হাদীস তিনি সঠিকভাবে মুখস্ত ও বর্ণনা করতে পেরেছেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ হয় তাহলে তার কাছে তার পুরাতন পান্ডুলিপি চাইতে হবে। তিনি যদি পুরাতন পান্ডুলিপি দেখাতে পারেন তবে তাকে ইচ্ছাকৃত ভুলকারী বলে গণ্য করা যাবেনা। আর যদি তিনি বলেন যে, আমার মূল প্রাচীন পান্ডুলিপি নষ্ট হয়ে গিয়েছে, আমার কাছে তার একটি অনুলিপি আছে তাহলে তার কথা গ্রহণ করা যাবেনা। অথবা যদি বলেন যে, আমার পান্ডুলিপিটি আমি পাচ্ছিনা তাহলেও তাঁর কথা গ্রহণ করা যাবেনা। বরং তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে বুঝতে হবে। (খতীব বাগদাদী, আল-কিফাইয়াতু ফী ইলমির রিওয়াইয়া পৃ. ১১৭)।
১.৪.৩.২. সনদে শ্রুতি বর্ণনার অর্থ ও প্রেক্ষাপট
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, প্রথম হিজরী শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই হাদীস লিখে মুখস্ত রাখা হতো। মুহাদ্দিসগণ লিখিত পান্ডুলিপি দেখে হাদীস বর্ণনা করতেন, নিরীক্ষা করতেন, বিশুদ্ধতা যাচাই করতেন এবং প্রত্যেকেই তাঁর শ্রুত হাদীস লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। এখন প্রশ্ন হলো, তাঁরা হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে লিখিত পুস্তকের রেফারেন্স প্রদান না করে শুধুমাত্র মৌখিক বর্ণনার উপর কেন নির্ভর করতেন? তাঁরা কেন ‘আমাকে বলেছেন’, ‘আমাকে সংবাদ দিয়েছেন’ ইত্যাদি বলতেন? তাঁরা কেন বললেননা, অমুক পুস্তকে এই কথাটি লিখিত আছে…… ইত্যাদি?
প্রকৃত বিষয় হলো সাহাবীগণের যুগ হতেই ‘পুস্তক’ এর চেয়ে ‘ব্যক্তির’ গুরুত্ব বেশি দেয়া হয়েছে। পান্ডুলিপির নির্ভরতা ও এতদসংক্রান্ত ভুল ভ্রান্তির সম্ভাবনা দূর করার জন্য মুহাদ্দিসগণ পান্ডুলিপির পাশাপাশি বর্ণিত হাদীসটি বর্ণনাকারী উস্তাদ থেকে স্বকর্ণে শ্রবণের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন। এজন্য হাদীস শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে গ্রন্থ বা পান্ডুলিপির রেফারেন্স প্রদানের নিয়ম ছিলনা। বরং বর্ণনাকারী শিক্ষকের নাম উল্লেখ করার নিয়ম ছিল। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় ‘হাদ্দাসানা আখবারানা’ অর্থাৎ ‘আমাকে বলেছেন’ কথাটির অর্থ হলো আমি তাঁর পুস্তক তাঁর নিজের কাছে বা তাঁর অমুক ছাত্রের কাছে পড়ে স্বকর্ণে শুনে তা থেকে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছি। কেউ কেউ ‘আমি তাঁকে পড়তে শুনেছি’, বা ‘আমি পড়েছি’ এরূপ বললেও , সাধারণত ‘হাদ্দাসানা’ বা ‘আখবারানা’ বা ‘আমাদেরকে বলেছেন’ বলেই তাঁরা এক বাক্যে বিষয়টি উপস্থাপন করতেন।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, উপরে উল্লেখিত মুয়াত্ত গ্রন্থের সনদটির অর্থ এই নয় যে, মালিক আবুয যিনাদ থেকে শুধুমাত্র মৌখিক বর্ণনা শুনেছেন এবং তিনি আ’রাজ থেকে মৌখিক বর্ণনা শুনেছেন এবং তিনি আবু হুরাইরা থেকে মৌখিক বর্ণনা শুনেছেন। বরং এখানে সনদ বলার উদ্দেশ্য হলো এই সনদের রাবীগণ প্রত্যেকে তাঁর ওস্তাদের কাছ হতে হাদীসটি শুনেছেন, লিখেছেন এবং লিখিত পান্ডুলিপি মৌখিক বর্ণনার সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন।
তৃতীয় শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল বুখারী (২৫৬ হি) এই হাদীসটি মুয়াত্তা থেকে উদ্ধৃত করেছেন।
তিনি বলেনঃ আমাদেরকে আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা বলেছেন, মালিক থেকে আবু যিনাদ থেকে, তিনি আ’রাজ থেকে, তিনি আবু হুরাইরা থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) শুক্রবারের কথা বলেনঃ এই দিনের মধ্যে একটি সময় আছে কোনো মুসলিম যদি সেই সময়ে দাঁড়িয়ে সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ তাকে তা প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ(স) হাত দিয়ে ইঙ্গিত করেন যে, এই সুযোগটি স্বল্প সময়ের জন্য। (বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহীহ ১/৩১৬)।
এখানে ইমাম বুখারী মুয়াত্তা গ্রন্থের হাদীসটি হুবহু উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু তিনি এখানে মুয়াত্তা গ্রন্থের উদ্ধৃত দেননি। বরং তিনি ইমাম মালিকের একজন ছাত্র থেকে হাদীসটি শুনেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। বাহ্যত পাঠকের কাছে মনে হতে পারে যে, ইমাম বুখারী মূলত শ্রুতির উপর নির্ভর করেছেন। কিন্তু প্রকৃত বিষয় কখনোই তা নয়। ইমাম মালিকের নিকট হতে শতাধিক ছাত্র মুয়াত্তা গ্রন্থটি পূর্ণরূপে শুনে ও লিখে নেন। তাঁদের বর্ণিত লিখিত মুয়াত্তা গ্রন্থ তৎকালীন বাজারে ‘ওয়াররাক’ বা ‘হস্তলিখিত পুস্তক’ ব্যবসায়ীদের দোকানে পাওয়া যেত। ইমাম বুখারী যদি এইরূপ কোনো পান্ডুলিপি কিনে তার বরাত দিয়ে হাদীসটি উল্লেখ করতেন তবে মুহাদ্দিসগণের বিচারে বুখারীর উদ্ধৃতিটি দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হতো। কারণ পান্ডুলিপি নির্ভরতার মধ্যে বিভিন্ন প্রকার ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য ইমাম মালিকের ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থটি তাঁর মুখ থেকে আগাগোড়া শুনে ও পান্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে বিশুদ্ধ পান্ডুলিপি বর্ণনা করতেন যে সকল মুহাদ্দিস ইমাম বুখারী সে সকল মুহাদ্দিসের নিকট যেয়ে মুয়াত্তা গ্রন্থটি প্রথম থেকে শেষ পর্য্ন্ত স্বকর্ণে শুনেছেন। ইমাম বুখারী তাঁর গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে মুয়াত্তা গ্রন্থের হাদীসগুলি উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু কখনোই গ্রন্থের উদ্ধৃতি প্রদান করেননি। বরং যাদের কাছে তিনি গ্রন্থটি পড়েছেন তাদের সূত্র প্রদান করেছেন। যেমন এখানে তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামার সূত্র উল্লেখ করেছেন। এখানে তাঁর কথার অর্থ হলো ‘আমি আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামার’ নিকট ইমাম মালিকের গ্রন্থটির মধ্যে এই হাদীসটি আমি স্বকর্ণে পঠিত শুনেছি।
৩য় শতাব্দীর অন্যতম মুহাদ্দিস ইমাম মুসলিমও (২৬২ হি) এই হাদীসটি মুয়াত্তা থেকে উদ্ধৃত করেছেন।
তিনি বলেনঃ “আমাদেরকে কুতাইবা ইবনু সাঈদ বলেন, মালিক থেকে, আবযু যিনাদ থেকে, তিনি আ’রাজ থেকে, তিনি আবু হুরাইরা থেকে , রাসূলুল্লাহ(স) শুক্রবারের কথা উল্লেখ করে বলেন……………..।”(মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ, আস-সহীহ ২/৫৮৩)।
এখানে ইমাম মুসলিমও একইভাবে পুস্তকের উদ্ধৃতি না দিয়ে পুস্তকটির বর্ণনাকারীর উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন। ৫ম শতকের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম বাইহাকী আহমদ ইবনুল হুসাইন(৪৫৮ হি) তাঁর ‘আস-সুনানুল কুবরা’ নামক হাদীস গ্রন্থে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন।
তিনি বলেনঃ “আমাদেরকে আলী ইবনু আহমদ ইবনু আবদান বলেন, আমাদেরকে আহমদ ইবনু উবাইদ সাফফার বলেন, আমাদেরকে ইসমাঈল কাযী বলেন, আমাদেরকে আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা কা’নাবী বলেন, তিনি মালিক থেকে, তিনি আবুয যিনাদ থেকে, তিনি আ’রাজ থেকে, তিনি আবু হুরাইরা থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) শুক্রবারের কথা উল্লেখ করে বলেন……..।”(বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ৩/২৪৯)।
সনদটি দেখে কেউ ভাবতে পারেন যে, ৫ম শতাব্দী পর্য্ন্ত মুহাদ্দিসগণ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে শুধু মৌখিক বর্ণনার উপর নির্ভর করতেন। রাসূলুল্লাহ(স) হতে গ্রন্থাগার পর্য্ন্ত মাঝে ৮ জন বর্ণনাকারী। সকলেই শুধু মৌখিক বর্ণনা ও শ্রুতির উপর নির্ভর করেছেন! কাজেই ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা খুবই বেশি!!
কিন্তু প্রকৃত অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইমাম বাইহাকীর এই সনদের অর্থ হলোঃ ইমাম মালিকের লেখা মুয়াত্তা গ্রন্থটি আমি আলি ইবনু আহমদ ইবনু আবদান এর নিকট পঠিত শুনেছি। তিনি তা আহমদ ইবনু উবাইদ সাফফার নিকট পড়েছেন। তিনি পুস্তকটি ইসমাঈল কাযীর নিকট পাঠ করেছেন। তিনি পুস্তকটি আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা কা’নবীর নিকট পাঠ করেছেন। তিনি মালিক থেকে….। এর দ্বারা তিনি প্রমাণ করলেন যে, তিনি মুয়াত্তা গ্রন্থটি বাজার থেকে ক্রয় করে নিজে পাঠ করে তার থেকে হাদীস সংগ্রহ করেননি। বরং তিনি মুয়াত্তার পান্ডুলিপি সংগ্রহ করে এমন এক ব্যক্তির নিকট তা পাঠ করে শুনেছেন যিনি নিজে গ্রন্থটি বিশুদ্ধ পাঠের মাধ্যমে আয়ত্ত করেছেন…..এভাবে শেষ পর্য্ন্ত। বাইহাকী এই সনদটি আরো অনেকগুলি সনদে উল্লেখ করেছেন। সকল সনদেই তিনি মৌখিক বর্ণনা ও শ্রুতির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি মূলত বলেছেন যে, ইমাম মালিকের মুয়াত্তা গ্রন্থটি বিভিন্ন উস্তাদের নিকট বিভিন্ন সনদে বিশুদ্ধরূপে পড়ে শ্রবণ করেছেন।(বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ৩/২৪৯)।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, লিখিত পান্ডুলিপির সাথে মৌখিক বর্ণনা ও শ্রুতির সমন্বয়ের জন্য মুহাদ্দিসগণ পান্ডুলিপি বা পুস্তকের বরাত প্রদানের পরিবর্তে শ্রবণের বরাত প্রদানের নিয়ম প্রচলন করেন। তাঁদের এই পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক। বর্তমান যুগে প্রচলিত গ্রন্থের নাম, পৃষ্ঠা সংখ্যা ইত্যাদি উল্লেখ করে ‘Reference’ বা তথ্যসূত্র দেওয়ার চেয়ে এভাবে শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে ‘Reference’ দেওয়া অনেক নিরাপদ ও যৌক্তিক। তৎকালীন হস্তলিখিত গ্রন্থের যুগে শুধুমাত্র গ্রন্থের উদ্ধৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে গ্রন্থ পাঠে ভুলের সম্ভাবনা, গ্রন্থের মধ্যে অন্যের সংযোজনের সম্ভাবনা ও অনুলিপিকারের ভুলের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু গ্রন্থাকারে মুখ থেকে গ্রন্থটি পঠিতরূপে গ্রহণ করলে এ সকল ভুল বা বিকৃতির সম্ভাবনা থাকেনা।
ইহুদী খৃস্টানগণ তাঁদের ধর্মগ্রন্থ লিখতেন পান্ডুলিপির উপর নির্ভর করে। এতে বাইবেলের বিকৃতি সহজ হয়েছিল। ইহুদী খৃস্টান পন্ডিতগণ একযোগে স্বীকার করেন যে, প্রচলিত বাইবেলের মধ্যে লক্ষ্য লক্ষ্য বিকৃতি বিদ্যমান। যেগুলিকে তাঁরা ভুল(erratum) বা পাঠের বিভিন্নতা(various readings)বলে উল্লেখ করেন।(T.H. Horne, An Introduction to the Critical Study and Knowledge of the Holy Scriptures 2/325.; রাহমাতুল্লাহ কিরানবী, ইযহারুল হক ২/৫৪২)।
এই বিকৃতি ও ভুলের প্রতিরোধ ও প্রতিকার করতে পেরেছিলেন মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ মৌখিক বর্ণনা ও শ্রুতির বিষয়ে গুরুত্বারোপের মাধ্যমে।
আমরা আরো বুঝতে পারছি যে, হাদীস তৃতীয় শতাব্দীতে বা পরবর্তীকালে সংকলিত হয়েছে মনে করাও ভুল। মূলত প্রথম শতাব্দী থেকেই হাদীস সংকলন করা হয়েছে।পরবর্তী সংকলকগণ তাঁদের গ্রন্থ পূর্ববর্তী সংকলকদের সংকলিত পুস্তকগুলি সংকলিত করেছেন। তবে মুহাদ্দিসগণ কখনোই হাদীস বর্ণনার তথ্য সূত্র হিসেবে পান্ডুলিপির উল্লেখ করেননি। বরং পান্ডুলিপির পাশাপাশি মৌখিক বর্ণনা ও শ্রুতির উপর তাঁরা বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
১.৪.৪. ব্যক্তিগত সততা যাচাই
বিশুদ্ধ ও প্রমাণিত হাদীসকে হাদীসের নামে কথিত ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুল বা মিথ্যা থেকে পৃথক করার জন্য মুহাদ্দিসগণের দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল সনদে উল্লেখিত সকল ‘রাবী’র ব্যক্তিগত তথ্যাদি সংগ্রহ করা এবং ব্যক্তিগত সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও ধার্মিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। এ বিষয়ে তাঁরা নিজেরা ‘রাবী’র কর্ম পর্যবেক্ষণ করতেন এবং প্রয়োজনে সমকালীন আলিম, মুহাদ্দিস ও শিক্ষার্থীগণকে প্রশ্ন করতেন।
সাহাবীগণের সমকালীন ১ম হিজরী শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী আবুল আলিফী রুফাই ইবনু মিহরান(৯০ হি) বলেনঃ কোনো স্থানে কোনো ব্যক্তি হাদীস বলেন বা শিক্ষাদান করেন জানলে আমি হাদীস সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তার নিকট গমন করতাম। সেখানে যেয়ে আমি তার সালাত পর্যবেক্ষণ করতাম। যদি দেখতাম, তিনি সুন্দর ও পূর্ণরূপে সালাত প্রতিষ্ঠা করছেন তবে আমি তার নিকট অবস্থান করতাম এবং তার নিকট হতে হাদীস লিখতাম। আর যদি তার সালাতের বিষয়ে অবহেলা দেখতাম তবে আমি তার নিকট থেকে হাদীস শিক্ষা না করেই ফিরে আসতাম। আমি বলতামঃ যে সালাতে অবহেলা করতে পারে সে অন্য বিষয়ে বেশি অবহেলা করবে।(ইবনু হাদী, আল-কামিল ১/১৩২)।
তাঁরা শুধু হাদীস বর্ণনাকারীর বাহ্যিক কর্মই দেখতেননা, তার আচরণ, আখলাক, সততা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদিও জানার চেষ্টা করতেন। দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ তাবিয়ী আসিম ইবনু সুলাইমান আল আহওয়াল(১৪০ হি) বলেন, আমি আবুল আলিয়া(৯০ হি) কে বলতে শুনেছি, তোমরা (দ্বিতীয় শতকের তাবিয়ীগণ) তোমাদের পূর্ববর্তীদের চেয়ে সালাম সিয়াম বেশি পালন কর বটে, কিন্তু মিথ্যা তোমাদের জিহবায় প্রবাহিত হয়ে গিয়েছে। (ইবনু আদী, আল কামিল ১/১৩৩)।
এছাড়া উক্ত রাবীকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে এবং তার পান্ডুলিপির সাথে মুখের বর্ণনা মিলিয়ে তাঁর সততা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। নিজেদেরকে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি মূলত সমকালীন আলিমদের মতামতের মাধ্যমে তারা রাবীর সত্যতা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতেন। ইয়াহইয়া ইবনু মুগীরাহ(২৫৩ হি) বলেনঃ আমি প্রখ্যাত তাবি তাবিয়ী জারীর ইবনুল আবদুল হামিদ(১৮৮ হি)কে তার ভাই আনাস ইবনুল আবদুল হামিদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেনঃ তার হাদীস লিখবেনা; কারণ সে মানুষের সাথে কথাবার্তায় মিথ্যা কথা বলে। সে হিশাম ইবনু উরওয়াহ, উবাইদুল্লাহ ইবনু উমার প্রমুখ মুহাদ্দিস থেকে হাদীস শিখেছে। কিন্তু যেহেতু মানুষের সাথে কথাবার্তায় তার মিথ্যা বলার অভ্যাস আছে সেহেতু তার হাদীস গ্রহণ করবেনা।(ইবনু আবু হাতিম, আল জারহু ওয়াত তা’দীল ২/২৮৯)।
তবে সর্বাবস্থায় তাঁদের মূল সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতো ব্যক্তির প্রদত্ত তথ্যের তুলনামূলক নিরীক্ষা। এজন্য অগণিত ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে, একজন মুহাদ্দিস কোনো একজন রাবী সম্পর্কে অনেক প্রশংসা শুনে কেবল ভক্তি ও আগ্রহ সহকারে তার নিকট হাদীস শিখতে গিয়েছেন। কিন্তু যখনই তার বর্ণিত হাদীসের মধ্যে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা ও ভুল দেখতে পেয়েছেন তখনই সে ব্যক্তির বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত পাল্টে গিয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনুল মুহাররির আল জাযারী ২য় শতকের একজন আলিম ও বুযুর্গ ছিলেন। খলীফা মানসূরের শাসনামলে(১৩৬-১৫৮ হি) তিনি বিচারকের দায়িত্বও পালন করেন। তবে তিনি হাদীস বর্ণনায় অত্যন্ত দূর্বল ছিলেন। তিনি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলতেন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক(১৮১ হি)বলেনঃ আবদুল্লাহ ইবনু মুহাররিকের নেক আমল, বুজুর্গী ও প্রসিদ্ধির কথা শুনে আমার মনে তার প্রতি এত ভক্তি জন্মেছিল যে, আমাকে যদি এখতিয়ার দেয়া হতো যে, তুমি জান্নাতে যাবে অথবা আবদুল্লাহ ইবনুল মুহাররিকের সাথে সাক্ষাত করবে, তাহলে আমি তার সাথে সাক্ষাতের পর জান্নাতে যেতে চেতাম। কিন্তু যখন আমি তার সাথে সাক্ষাত করলাম তখন তার বর্ণিত হাদীসের মধ্যে মিথ্যার ছড়াছড়ি দেখে আমার মনের সব ভক্তি উবে গেল। ছাগলের শুকনা লাদিও আমার কাছে তার চেয়ে বেশি প্রিয়।(ইবনু আদী, আল-কামিল ৪/১৩২)।
১.৪.৫. সাহাবীগণের সততা
এভাবে প্রতিটি হাদীস বর্ণনাকারীর ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ ব্যক্তিগত সততা ও বর্ণনার যথার্থতা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিরীক্ষা ও যাচাই করেছেন। ‘রাবী’র ব্যক্তিগত প্রসিদ্ধি, যশ, খ্যাতি ইত্যাদি কোনো কিছুই তাঁদেরকে এই যাচাই ও নিরীক্ষা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখতে পাব যে, যাচাই ও নিরীক্ষার ভিত্তিতে অনেক দেশবরেণ্য সুপ্রসিদ্ধ ব্যক্তিকেও তাঁরা হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হলেন সাহাবীগণ। একমাত্র সাহাবীগণের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ ব্যক্তিগত সততা ও বিশ্বস্ততা নিরীক্ষা করেননি। তাঁরা সকল সাহাবীকে ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও সত্যপরায়ণ বলে মেনে নিয়েছেন।
ইহুদী খৃস্টান পন্ডিতগণ ও শিয়াগণ মুহাদ্দিসগণের এ মূলনীতির সমালোচনা করেন। তাঁরা সাহাবীগণের সততায় বিশ্বাস করতেননা। বরং তারা সাহাবীগণকেই জালিয়াত বলে অভিযুক্ত করেন।
সাহাবীগণের সততা ও বিশ্বস্ততা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। তাঁদের সততার বিষয়ে হাদীসের নির্দেশনাও আমি এখানে আলোচনা করব না। আমি এখানে যুক্তি, বিবেক ও কুরআনের আলোকে সাহাবীগণের সততার বিষয়টি আলোচনা করব।
(১) মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ সাহাবীগণের বিষয়ে মূলত ‘বিশ্বজনীন’ মানবীয় মূলনীতির ভিত্তিতে কাজ করেছেন। বিশ্বের সর্বত্র স্বীকৃত মূলনীতি হলো, যতক্ষণ না কোনো মানুষের বিষয়ে মিথ্যাচার প্রমাণিত হবে, ততক্ষণ তাকে ‘সত্যবাদী’ বলে গণ্য করতে হবে এবং তার সাক্ষ্য গ্রহণ করতে হবে। ‘তার সাথে তার ভাইয়ের মামলা বা শত্রুতা আছে’ এই অভিযোগে অন্যান্য ক্ষেত্রে তার বর্ণিত সংবাদ বা তথ্য বাতিল করা যায়না। মুসলিম উম্মাহ এই নীতির ভিত্তিতেই সাহাবীগণের বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। সাহাবীগণ পরস্পরে যুদ্ধ করেছেন, বিভিন্ন বিরোধিতা ও জাগতিক সমস্যায় পড়েছেন, কিন্তু কখনো কোনোভাবে প্রমাণিত হয়নি যে, তাঁদের মধ্য থেকে কেউ কোনো অবস্থাতে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলেছেন। সাহাবীদের বিরুদ্ধে যারা বিষোদগার করেন, তাঁরা একটিও প্রমাণ পেশ করতে পারেননি যে, অমুক ঘটনায় অমুক সাহাবী হাদীসের নামে মিথ্যা বলেছেন বলে প্রমাণিত হয়েছিল। ইতিহাসে সাহাবীদের বিরুদ্ধে অনেক কথা লিখিত রয়েছে। কিন্তু তাঁরা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলেছেন বলে কোনো তথ্য প্রমাণিত হয়নি। কাজেই তাঁদের দেওয়া তথ্য গ্রহণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কোনো সাধারণ সন্দেহের ভিত্তিতে, হয়ত তিনি মিথ্যা বলেছেন এই ধারণার উপরে কারো সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করা যায়না।
(২) আমরা দেখেছি যে, সাহাবীগণ হাদীস গ্রহণ ও বিচারের সময় তা নিরীক্ষা করতেন। অন্যান্য সাহাবীর বর্ণনা তাঁরা অনেক সময় যাচাই করেছেন। একটি ঘটনাতেও কারো ক্ষেত্রে কোনো মিথ্যা বা জালিয়াতি ধরা পড়েনি। বরং সাহাবীগণের সত্যবাদিতা, সততা ও এক্ষেত্রে তাঁদের আপোসহীনতা ইতিহাসখ্যাত। হাদীস বর্ণনা ও গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের সতর্কতা ছিল অতুলনীয়।
(৩) যে কোনো ধর্ম প্রচারক বা মতাদর্শের প্রতিষ্ঠাতার মত ও পরিচয় তাঁর সহচরদের মাধ্যমেই লাভ করা সম্ভব। এজন্য সকল ধর্মেই নবী, রাসূল বা ধর্ম প্রবর্তকদের সহচরদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। এদের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোনোভাবেই নবী বা রাসূলের বাণী, বাক্য ও আদর্শ জানা সম্ভব নয়। সাহাবীগণের প্রতি সন্দেহ ও অনাস্থার অর্থই হলো রাসূলুল্লাহ(স)কে অস্বীকার করা এবং ইসলামকে ব্যবহারিক জীবন থেকে মুছে দেয়া। কারণ কুরআন, হাদীস বা ইসলাম সবই আমরা এ সকল সাহাবীর মাধ্যমে লাভ করেছি।
(৪) সাহাবীগণের সততায় অবিশ্বাস করার অর্থ রাসূলুল্লাহ(স) এর নব্যুয়ত অস্বীকার করা। যারা মনে করেন যে, অধিকাংশ সাহাবীই স্বার্থপর, অবিশ্বাসী বা ধর্মত্যাগী ছিলেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে মনে করেন যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ(স) একজন ব্যর্থ নবী ছিলেন(নাউজুবিল্লাহ)। লক্ষ মানুষের সমাজে অজ্ঞাত অখ্যাত দুই চারজন মুনাফিক থাকা কোনো অসম্ভব বিষয় নয়। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন রাসূলুল্লাহ(স) এর সাহচর্যে থেকেছেন এবং সাহাবী হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন, তাঁদেরকেও যদি কেউ প্রবঞ্চক বলে দাবি করেন, তবে তিনি মূলত রাসূলুল্লাহ(স)এর ব্যর্থতার দাবি করেছেন।
একজন ধর্মপ্রচারক যদি নিজের সহচরদের হৃদয়গুলিকে ধার্মিক বানাতে না পারেন, তবে তিনি কিভাবে অন্যদেরকে ধার্মিক বানাবেন! তাঁর আদর্শ শুনে, ব্যবহারিকভাবে বাস্তবায়িত দেখে ও তাঁর সাহচর্য্ থেকেও যদি মানুষ ‘সততা’ অর্জন করতে না পারে, তবে শুধু সেই আদর্শ শুনে পরবর্তী মানুষদের সততা অর্জনের কল্পনা বাতুলতা মাত্র।
আজ যিনি মনে করেন যে, কুরআন পড়ে তিনি সততা শিখেছেন, অথচ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছে কুরআন পড়ে, জীবন্ত কুরআনের সাহচর্যে থেকেও আবু হুরাইরা সততা শিখতে পারেননি, তিনি মূলত নবী মুহাম্মাদ(স)এর নব্যুয়তকেই অস্বীকার করেন। মানবীয় দুর্বলতা, ক্রোধ, দলাদলি ইত্যাদি এক বিষয় আর প্রবঞ্চনা বা জালিয়াতি অন্য বিষয়। ধর্মের নামে জালিয়াতি আরো অনেক কঠিন বিষয়। কোনো ধর্ম প্রবর্তক যদি তাঁর অনুসারীদের এই কঠিনতম পাপের পঙ্কিলতা থেকে বের করতে না পারেন, তবে তাকে কোনোভাবেই সফল বলা যায়না। কোনো স্কুলের সফলতা যেমন স্কুলের ছাত্রদের পাশের হারের উপর নির্ভর করে, তেমনি ধর্মপ্রচারকের সফলতা নির্ভর করে তার সাহচর্য্ প্রাপ্তদের ধার্মিকতার উপর।
(৫) সর্বোপরি কুরআনে বিশ্বাসী কোনো মুসলমান কখনোই সাহাবীদের সততায় সন্দেহ করতে পারেননা। কুরআনে বারংবার সাহাবীদের ধার্মিকতার সাক্ষ্য দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ক অল্প কয়েকটি আয়াত এখানে উল্লেখ করছি।
মহিমাময় আল্লাহ এরশাদ করেছেনঃ আরবী(*********)
-“মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছেন, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। এ মহাসাফল্য।(সূরা ৯ তাওবাঃ ১০০)।
এখানে সাহাবীগণকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, প্রথম অগ্রগামী মুহাজিরগণ, দ্বিতীয়ত, প্রথম অগ্রগামী আনসারগণ এবং তৃতীয়ত তাঁদেরকে যারা নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করেছেন। প্রথম দুই পর্যায়ের সাহাবীগণকে সফলতার মাপকাঠি ও অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী এই দুইভাগের অন্তর্ভুক্ত।
কুরআন কারীমে অন্যান্য অনেক স্থানে সকল মুহাজির ও সকল আনসারকে ‘প্রকৃত মুমিন’ ও জান্নাতী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।(সূরা আনফাল:৭২,৭৪ আয়াত, সূরা হাশর: ৮,৯,১০ আয়াত)।
হুদাইবিয়ার প্রান্তরে ‘বাইয়াতে রেদওয়ান’ সম্পর্কে এরশাদ করা হয়েছেঃ
لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا [٤٨:١٨]
“মুমিনগণ যখন বৃক্ষতলে আপনার নিকট ‘বাইয়াত’ গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন।”(সূরা ৪৮ ফাতহঃ১৮)।
হাদীস বর্ণনাকারী প্রসিদ্ধ সকল সাহাবীই এই ‘বাইয়াতে’ অংশগ্রহণ করেছিলেন। একজন মুনাফিকও এতে অংশ নেয়নি।
তাবূকের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবীর প্রশংসায় এরশাদ হচ্ছেঃ
لَٰكِنِ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ جَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ ۚ وَأُولَٰئِكَ لَهُمُ الْخَيْرَاتُ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ [٩:٨٨]
“কিন্তু রাসূল এবং যারা তার সঙ্গে ঈমান এনেছে, তারা নিজ সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে; তাদের জন্যই কল্যাণ আছে এবং তারাই সফলকাম।”(সূরা ৯ তাওবাঃ৮৮)।
হাদীস বর্ণনাকারী প্রসিদ্ধ সকল সাহাবীই এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একজন মুনাফিকও এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি। রাসূলুল্লাহ(স)এর সকল সাহাবীর ঢালাও প্রশংসা করে ও তাঁদের ধার্মিকতা, সততা ও বিশ্বস্ততার ‘ঢালাও’ ঘোষণা দিয়ে এরশাদ করা হয়েছেঃ
وَاعْلَمُوا أَنَّ فِيكُمْ رَسُولَ اللَّهِ ۚ لَوْ يُطِيعُكُمْ فِي كَثِيرٍ مِّنَ الْأَمْرِ لَعَنِتُّمْ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ [٤٩:٧]
“কিন্তু আল্লাহ তোমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং তাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন। তিনি কুফরী, পাপ ও অবাধ্যতাকে তোমাদের নিকট অপ্রিয় করেছেন। তারাই সৎপথ অবলম্বনকারী।”(সূরা: ৪৯ হুজুরাতঃ ৭)।
অন্যত্র মক্কা বিজয়ের পূর্বে ও পরে ইসলামগ্রহণকারী উভয় প্রকারের সাহাবীগণকে ‘ঢালাওভাবে’ কল্যাণ বা জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে।
وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ لَا يَسْتَوِي مِنكُم مَّنْ أَنفَقَ مِن قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ ۚ أُولَٰئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِينَ أَنفَقُوا مِن بَعْدُ وَقَاتَلُوا ۚ وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ [٥٧:١٠]
“তোমাদের মধ্যে যারা (মক্কা) বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং সংগ্রাম করেছে, তারা এবং পরবর্তীরা সমান নয়; তারা মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ তাদের চেয়ে, যারা পরবর্তীকালে ব্যয় করেছে এবং সংগ্রাম করেছে। তবে আল্লাহ উভয়েরই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।”(সূরা ৫৭ হাদীসঃ ১০)।
এখানে উল্লেখ্য যে, হাদীস বর্ণনাকারী প্রসিদ্ধ সাহাবীগণ সকলেই মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং সংগ্রাম করেছেন।
সাহাবীগণের প্রশংসায়, তাঁদের সততা, বিশ্বস্ততা, ঈমান ও জান্নাতের সাক্ষ্য সম্বলিত আরো অনেক আয়াত কুরআন কারীমে রয়েছে।
হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ সাহাবীগণের মধ্যে রয়েছেন আবু হুরাইরা, আবদুল্লাহ ইবনু উমার, আনাস ইবনু মালিক, আয়েশা, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস, জাবির ইবনু আবদুল্লাহ, আবু সাঈদ খুদরী, আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ, আবদুল্লাহ ইবনু আমর, আলী ইবনু আবু তালিব, উমার ইবনুল খাত্তাব, উম্মু সালামাহ, আবূ মূসা আশ‘আরী, বারা ইবনু আযিব, আবূ যার গিফারী, সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস, আবূ উমামা বাহিলী, হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান, সাহল ইবনু সাদ, উবাদা ইবনুস সামিত, ইমরান ইবনুল হুসাইয়িন, আবূ দারদা, আবূ কাতাদা, আবূ বকর সিদ্দীক, উবাই ইবনু কা’ব মু‘আয ইবনু জাবাল, উসমান ইবনু আফফান প্রমুখ প্রসিদ্ধ সাহাবী।
তাঁরা সকলেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ(স) এর প্রসিদ্ধ সহচর, মক্কা বিজয়ের আগে ইসলাম গ্রহণকারী, তাবূক যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, বাইয়াতে রেদোয়ানে অংশগ্রহণকারী বা প্রথম অগ্রগামী মুহাজির ও আনসার।
কুরআন যাকে সৎ, ঈমানদার ও সফলকাম বলে সাক্ষ্য দিচ্ছে এবং কুরআন যার জন্য কল্যাণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করছে তার সততার বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করার অর্থ কুরআনের সাক্ষ্য অস্বীকার করা।
১.৪.৬. তুলনামূলক নিরীক্ষা
হাদীসের বিশুদ্ধতা নির্ণয় কিংবা বিশুদ্ধ হাদীসকে অশুদ্ধ হাদীস থেকে পৃথক করার ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণের অন্যতম পদ্ধতি ছিল সার্বিক নিরীক্ষা(Cross Examine)। এক্ষেত্রে মূলত তাঁরা সাহাবীগণের কর্মধারার অনুসরণ করেছেন।
১.৪.৬.১. তুলনামূলক নিরীক্ষার মূল প্রক্রিয়া
হযরত আবু হুরাইরা(রা)একজন সাহাবী। অনেক তাবিয়ী তাঁর নিকট হতে হাদীস শিক্ষা করেছেন। এদের মধ্যে অনেক তাবিয়ী দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে থেকেছেন এবং অনেকে অল্প দিন থেকেছেন। কোনো সাহাবী বা মুহাদ্দিস একেক ছাত্রকে একেকটি হাদীস শিখাতেননা। তাঁরা তাঁদের নিকট সংগৃহীত হাদীসগুলি সকল ছাত্রকেই শিক্ষা দিতেন। ফলে সাধারণভাবে আবূ হুরাইরা(রা)বর্ণিত সকল হাদীসই তাঁর অধিকাংশ ছাত্র শুনেছেন। তাঁরা একই হাদীস আবু হুরাইরার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। মুহাদ্দিসগণ আবু হুরাইরার(রা)সকল ছাত্রের বর্ণিত হাদীস সংগ্রহ ও সংকলিত করে সেগুলি পরস্পরের সাথে মিলিয়ে নিরীক্ষা করেছেন।
যদি দেখা যায় যে, ৩০ জন তাবেয়ী একটি হাদীস আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন, তন্মধ্যে ২০/২৫ জন হাদীসটি আবু হুরাইরা যে শব্দে বলেছেন হুবহু সেই শব্দে মুখস্ত ও লিপিবদ্ধ করেছেন। আর বাকী কয়জন হাদীসটি ঠিকভাবে মুখস্ত রাখতে পারেননি। এতে তাদের মুখস্ত ও ধারণ শক্তির দূর্বলতা প্রমাণিত হল।
যদি আবু হুরাইরার কোনো ছাত্র তাঁর নিকট হতে ১০০টি হাদীস শিক্ষা করে বর্ণনা করেন এবং তন্মধ্যে সবকয়টি বা অধিকাংশ হাদীসই তিনি এভাবে হুবহু মুখস্ত রেখে বিশুদ্ধভাবে বর্ণনা করতে পারেন তাহলে তা তার গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। অপরদিকে যদি এরূপ কোন তাবেয়ী ১০০টি হাদীসের মধ্যে অধিকাংশ হাদীসই এরূপভাবে বর্ণনা করেন যে, তার বর্ণনা অন্যান্য তাবেয়ীর বর্ণনার সাথে মেলেনা তাহলে বুঝা যাবে যে তিনি হাদীস ঠিকমত লিখতেননা ও মুখস্ত রাখতে পারতেননা। এই বর্ণনাকারী তাঁর গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন। তিনি ‘যয়ীফ’ বা দুর্বল রাবী বলে চিহ্নিত হন।
ভুলের পরিমাণ ও মাত্রার উপর নির্ভর করে দুর্বলতার মাত্রা বুঝা যায়। যদি তার কর্মজীবন ও তার বর্ণিত এ সকল উল্টা পাল্টা হাদীসের কারণে প্রমাণিত হতো যে তিনি ইচ্ছাপূর্বক রাসূলুল্লাহ(স)থেকে বর্ণিত হাদীসের মধ্যে বেশি কম করেছেন অথবা ইচ্ছাপূর্বক হাদীসের নামে বানোয়াট কথা বলেছেন তাহলে তাকে ‘মিথ্যাবাদী’ রাবী বলে চিহ্নিত করা হতো। যে হাদীস শুধুমাত্র এই ধরণের মিথ্যাবাদী বর্ণনাকারী একাই বর্ণনা করেছেন সেই হাদীসকে কোনো অবস্থাতেই রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা হিসেবে গ্রহণ করা হতোনা। বরং তাকে মিথ্যা বা ‘মাউযূ’ হাদীস বলে চিহ্নিত করা হতো।
অনেক সময় দেখা যায় যে, আবু হুরাইরার(রা) কোনো ছাত্র এমন একটি বা একাধিক হাদীস বলছেন যা অন্য কোনো ছাত্র বলছেননা। এক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ উপরের নিয়মে নিরীক্ষা করেছেন। যদি দেখা যায় যে, উক্ত তাবিয়ী ছাত্র আবূ হুরাইরার সাহচর্যে অন্যদের চেয়ে বেশি ছিলেন, তাঁর বর্ণিত অধিকাংশ হাদীস তিনি সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ ও মুখস্ত রাখতেন বলে নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, তাঁর সততা ও ধার্মিকতা সবাই স্বীকার করেছেন, সে ক্ষেত্রে তার বর্ণিত অতিরিক্ত হাদীসগুলিকে সহীহ(বিশুদ্ধ) বা হাসান(সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য) হাদীস হিসেবে গ্রহণ করা হতো।
আর যদি উপরোক্ত তুলনামূলক নিরীক্ষায় প্রমাণিত হতো যে তাঁর বর্ণিত হাদীসগুলির মধ্যে অধিকাংশ হাদীস বা অনেক হাদীস গ্রহণযোগ্য রাবীদের সাথে কম বেশি অসামঞ্জস্যপূর্ণ তবে তার বর্ণিত এই অতিরিক্ত হাদীসটিও উপরের নিয়মে দুর্বল ও মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হতো।
সাধারণত একজন তাবেয়ী একজন সাহাবী থেকেই হাদীস শিখেতেননা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রত্যেক তাবেয়ী চেষ্টা করতেন যথাসম্ভব বেশি সংখ্যক সাহাবীর নিকট হতে হাদীস শিখতে। এজন্য তাঁরা তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের যে শহরেই কোনো সাহাবী বাস করতেন সেখানেই গমন করতেন। মুহাদ্দিসগণ উপরের নিয়মে সকল সাহাবীর হাদীস, তাদের থেকে সকল তাবেয়ীর হাদীস, তাঁদের থেকে বর্ণিত তাবে তাবেয়ীগণের হাদীস একত্রিত করে তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে ও বর্ণনাকারীগণের ব্যক্তিগত জীবন, সততা, ধার্মিকতা ইত্যাদির আলোকে হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা নিরূপন করতেন।
পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এই ধারা অব্যাহত থাকে। একদিকে মুহাদ্দিসগণ সনদসহ রাসূলুল্লাহ(স)এর নামে কথিত সকল হাদীস সংকলিত করেছেন। অপরদিকে ‘রাবী’গণের বর্ণনার তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে তাদের বর্ণনার সত্যাসত্য নির্ধারণ করে তা লিপিবদ্ধ করেছেন। (জারহ তাদীল বিষয়ক সকল গ্রন্থেই এ বিষয়ক বিবরণাদি সংকলিত রয়েছে। বিশেষভাবে দেখুন: মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ, কিতাবুত তাময়ীয, ইবনু আদী, আল কামিল ফী দু’আফাইর রিজাল, ড. মুহাম্মাদ মুসতাফা আ’যামী, মানহাজুন নাকদ ইনদাল মুহাদ্দিসীন।)
ইমাম তিরমিযী আবু ইসা মুহাম্মাদ ইবনু ইসা(২৭৫ হি) বলেন, আমাদেরকে আলী ইবনু হুজর বলেছেন, আমাদেরকে হাফস ইবনু সুলাইমান বলেছেন, তিনি কাসীর ইবনু যাযান থেকে, তিনি আসীর ইবনু দামুরাহ থেকে, তিনি আলী ইবনু আবু তালিব থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করবে, মুখস্ত করবে, কুরআনের হালালকে হালাল হিসেবে পালন করবে ও হারামকে হারাম হিসেবে বর্জন করবে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তার পরিবারের দশ ব্যক্তির বিষয়ে তার সুপারিশ কবুল করবেন, যাদের প্রত্যেকের জন্য জাহান্নামের শাস্তি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।”
হাদীসটি এভাবে সংকলিত করার পর ইমাম তিরমিযী হাদীসটির দুর্বলতা ও অগ্রহণযোগ্যতার কথা উল্লেখ করে বলেনঃ এই হাদীসটি গরীব(দুর্বল বা অগ্রহণযোগ্য)। এই একটিমাত্র সূত্র ছাড়া অন্য কোনো সূত্রে হাদীসটি জানা যায়না। এর সনদ সহীহ নয়। হাফস ইবনু সুলাইমান(১৮০ হি) হাদীসের ক্ষেত্রে দুর্বল।
ইমাম তিরমিযীর এই মতামত তাঁর ও দীর্ঘ তিন শতকের অগণিত মুহাদ্দিসের নিরীক্ষার ভিত্তিতে প্রদত্ত। তাঁদের নিরীক্ষার সংক্ষিপ্ত পর্যায়গুলি নিম্নরূপঃ
১. তাঁরা হাফস ইবনু সুলাইমান বর্ণিত সকল হাদীস সংগ্রহ করেছেন।
২. হাফস যে সকল শিক্ষকের সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের অন্যান্য ছাত্র বা হাফসের ‘সহপাঠী’ রাবীদের বর্ণনা সংগ্রহ করে তাঁদের বর্ণনার সাথে তার বর্ণনার তুলনা করেছেন।
৩. এই হাদীসে হাফসের উস্তাদ কাসীর ইবনু যাযানের সূত্রে বর্ণিত সকল হাদীস সংগ্রহ করে হাফসের বর্ণনার সাথে তুলনা করেছেন।
৪. কাসীরের ওস্তাদ আসিম ইবনু দামিরাহ বর্ণিত সকল হাদীস তার অন্যান্য ছাত্রদের সূত্রে সংগ্রহ করে হাফসের এই বর্ণনার সাথে তুলনা করেছেন।
৫. আলী(রা) এর অন্যান্য ছাত্রদের সূত্রে বর্ণিত সকল হাদীস সংগ্রহ করে তুলনা করেছেন।
৬. আলী(রা) ছাড়া অন্যান্য সাহাবী থেকে বর্ণিত হাদীসের সাথে এই বর্ণনার তুলনা করেছেন।
এই নিরীক্ষা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁরা দেখেছেনঃ
ক. এই হাদীসটি এই একটিমাত্র সূ্ত্র ছাড়া কোনো সূত্রে বর্ণিত হয়নি। অন্য কোনো সাহাবী থেকে কেউ বর্ণনা করেননি। আলীর অন্য কোনো ছাত্র হাদীসটি আলী থেকে বর্ণনা করেননি। আসিমের অন্য কোনো ছাত্র তা তার থেকে বর্ণনা করেননি। কাসীরের অন্য কোনো ছাত্র তা বর্ণনা করেননি।
এভাবে তাঁরা দেখেছেন যে দ্বিতীয় হিজরীর শেষ প্রান্তে এসে হাফস ইবনু সুলাইমান দাবী করেছেন যে, এই হাদীসটি তিনি এই সূত্রে শুনেছেন। তাঁর দাবীর সত্যতা প্রমাণের জন্য কোনো সাক্ষী পাওয়া গেলনা।
খ. এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাদীসটি গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নের সম্মুখীন হলো। কারণ সাধারণভাবে এরূপ ঘটেনা যে, আলী(রা) বর্ণিত একটি হাদীস তাঁর ছাত্রদের মধ্যে আসীম ছাড়া কেউ জানবেননা। আবার আসিম একটি হাদীস শেখাবেন তা একমাত্র যাযান ছাড়া কেউ জানবেননা। আবার যাযান একটি হাদীস শেখাবেন তা হাফস ছাড়া কেউ জানবেননা।
গ. এখন দেখতে হবে যে, হাফস বর্ণিত অন্যান্য হাদীসের অবস্থা কি? মুহাদ্দিসগণ নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখেছেন যে, হাফস তার ওস্তাদ যাযান ও অন্যান্য সকল উস্তাদের সূত্রে যত হাদীস বর্ণনা করেছেন প্রায় সবই ভুলে ভরা। এজন্য তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, হাফস যদিও কুরআনের বড় কারী ও আলিম ছিলেন, কিন্তু তিনি হাদীস বর্ণনায় দূর্বল ছিলেন। তিনি ইচ্ছাকৃত মিথ্যা না বললেও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা বা ভুল বলতেন খুব বেশি। এজন্য তাঁরা তাকে দুর্বল ও পরিত্যক্ত গণ্য করেছেন। (মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ, আত-তাময়ীয পৃ. ১৬৯)।
হাদীস বর্ণনাকারী বা ‘রাবী’র বর্ণনার যথার্থতা নির্ণয়ের এই সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনেকেই বুঝতে পারেননা।ফলে মুহাদ্দিস যখন কোনো ‘রাবী’ বা হাদীসের বিষয়ে বিধান প্রদান করেন তখন তারা অবাক হয়েছেন বা আপত্তি করেছেন। কেউ বলেছেন, এ হলো রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বিচারের ধৃষ্টতা। কেউ বলেছেনঃ এ হলো অকারণে, না জেনে বা আন্দাজে নেককার মানুষদের সমালোচনা। বর্তমান যুগেই নয়, ইসলামের প্রথম যুগগুলিতেও অনেক মানুষ এই ধারণা পোষণ করতেন। (মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ, আত-তাময়ীয, ১৬৯)।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, ‘রাবী’ ও ‘হাদীসের’ সমালোচনায় হাদীসের ইমামগণের সকল বিধান ও হাদীস বিষয়ক মতামত এই নিরীক্ষার ভিত্তিতে। কোনো মুহাদ্দিস যখন কোনো রাবী বা হাদীস বর্ণনাকারী সম্পর্কে বলেন যে, তিনিঃ নির্ভরযোগ্য, পরিপূর্ণ মুখস্তকারী, মুখস্তকারী, সত্যপরায়ণ, চলনসই, দুর্বল, অনেক ভুল করেন, আপত্তিকর হাদীস বর্ণনাকারী, পরিত্যক্ত, মিথ্যাবাদী, হাদীস বানোয়াটকারী ইত্যাদি তখন বুঝতে হবে যে, তার এই ‘সংক্ষিপ্ত মতামতটি’ তার আজীবনের অক্লান্ত পরিশ্রম, হাদীস সংগ্রহ ও তুলনামূলক নিরীক্ষার ফল।
অনুরূপভাবে যখন তিনি কোনো হাদীসের বিষয়ে বলেনঃ হাদীসটি সহীহ, যয়ীফ, আপত্তিকর, বানোয়াট, মুরলাস, সহীহ হলো যে হাদীসটি সাহাবীর বাণী………..ইত্যাদি তাহলেও আমরা বুঝতে পারি যে, তিনি তাঁর আজীবনের সাধনার নির্যাস আমাদেরকে দান করলেন।
এভাবে আমরা মুহাদ্দিসগণের কর্মধারা সম্পর্কে জানতে পেরেছি। এবার আমরা এই কর্মধারার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি আলোচনা করব।
১.৪.৬.২. নিরীক্ষামূলক প্রশ্নাবলী
মুহাদ্দিসগণ নিরীক্ষামূলক প্রশ্নের মাধ্যমে রাবীর ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা যাচাই করার চেষ্টা করতেন। এ বিষয়ক ২/১টি ঘটনা দেখুনঃ
১. দ্বিতীয় হিজরী শতকের একজন তাবেয়ী উফাইর ইবনু মা’দান বলেনঃ “উমর ইবনু মুসা আল ওয়াজিহী আমাদের নিকট হিমস শহরে আগমন করেন। আমরা হিমসের মসজিদে তার নিকট(হাদীস শিক্ষার্থে) সমবেত হই। তিনি বলতে থাকেনঃ আপনাদের নেককার শাইখ আমাদেরকে হাদীস বলেছেন। আমরা বললামঃ নেককার শাইখ বলতে কাকে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেনঃ খালিদ ইবনু মাদান। আমি বললামঃ আপনি কত সনে তাঁর নিকট হাদীস শুনেছেন। তিনি বললেনঃ আমি ১০৮ হিজরীতে তাঁর নিকট হাদীস শিক্ষা করি। আমি বললামঃ কোথায় আপনার সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়েছিল। তিনি বলেনঃ আরমিনিয়ায় যুদ্ধের সময়। আমি বললামঃ আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং মিথ্যা বলা হতে বিরত থাকুন। খালিদ ইবনু মা’দান ১০৪ হিজরী সনে মৃত্যু বরণ করেছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, তাঁর মৃত্যুর ৪ বছর পরে আপনি তাঁর নিকট হতে হাদীস শিক্ষা করেছেন। অপরদিকে তিনি কখনোই আরমিনিয়ায় যুদ্ধে যাননি। তিনি শুধুমাত্র বাইযান্টাইন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।(ইবনু আবু হাতীম, আল জারহু ওয়াত তা’দীল ৬/১৩৩, যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৫/২১৭)।
এভাবে এই রাবীর মিথ্যাবাদিতা প্রমাণিত হওয়ার কারণে মুহাদ্দিসগণ তাকে পরিত্যক্ত ও মিথ্যাবাদী ‘রাবী’রূপে চিহ্নিত করেছেন। আবু হাতেম রাযী বলেনঃ উমর ইবনু মূসা পরিত্যক্ত, সে মিথ্যা হাদীস তৈরি করত। বুখারী বলেনঃ তার বর্ণিত হাদীস আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য। ইবনু মাঈন বলেনঃ লোকটি নির্ভরযোগ্য নয়। ইবনু আদী বলেনঃ লোকটি বানোয়াটভাবে হাদীসের সনদ ও মতন তৈরি করত। দারাকুতনী, নাসাঈ প্রমূখ মুহাদ্দিস বলেনঃ সে পরিত্যক্ত। (প্রাগুক্ত)।
২. আবুল ওয়ালীদ তাইয়ালিসী হিশাম ইবনু আবদুল মালিক(২২৭ হি) বলেনঃ “আমি আমির ইবনু আবী আমের আল খাযযায এর নিকট থেকে হাদীস লিপিবদ্ধ করতে শুরু করেছিলাম। একদিন হাদীসের সনদে তিনি বললেনঃ ‘আমাদেরকে আতা ইবনু আবু রাবাহ(১১৪ হি) বলেছেন’। আমি প্রশ্ন করলাম, আপনি কত সালে আতা থেকে হাদীস শুনেছেন? তিনি বললেনঃ ১২৪ হিজরী সালে। আমি বললামঃ আতা তো ১১৩/১১৪ হিজরীতে ইন্তিকাল করেছেন।”
এভাবে তাঁর বর্ণনায় মিথ্যা ধরা পড়ে। এই মিথ্যা ইচ্ছাকৃত হতে পারে আবার অনিচ্ছাকৃত হতে পারে। ইমাম যাহাবী(৭৪৮ হি) বলেনঃ যদি তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে একথা বলে থাকেন তাহলে তিনি একজন মিথ্যাবাদী ও বানোয়াট হাদীস বর্ণনাকারী। আর যদি তিনি ভুলক্রমে আতা ইবনুস সাইব(১৩৬ হি) নামের অন্য তাবিয়ীকে আতা ইবনু আবু রাবাহ বলে ভুল করে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে যে, তিনি একজন অত্যন্ত অসতর্ক, জাহিল ও পরিত্যাজ্জ রাবী।(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৪/১৮)।
৩. প্রথম হিজরী শতকের একজন রাবী সুহাইল ইবনু যাকওয়ান আবু সিনদী ওয়াসিতী। তিনি আয়েশা(রা) হতে হাদীস শুনেছেন বলে দাবি করতেন। মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষামূলক প্রশ্নের মাধ্যমে তার মিথ্যাচার ধরা পড়েছে। ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন বলেন, আমাদেরকে আব্বাদ বলেছেনঃ সুহাইল ইবনু যাকওয়ানকে আমরা বললামঃ আপনি কি আয়েশা(রা)কে দেখেছেন? তিনি বললেনঃ হ্যা, দেখেছি। আমরা বললাম, বলুনতো তিনি দেখতে কেমন ছিলেন? তিনি বলেনঃ তাঁর গায়ের রং কালো ছিল। সুহাইল আরো দাবি করেন যে, তিনি ইবরাহীম নাখেয়ীকে দেখেছেন, তাঁর চোখ দুটি ছিল বড় বড়।
সু্হাইলের এই বক্তব্য তাঁর মিথ্যাচার ধরিয়ে দিয়েছে। কারণ আয়েশা(রা) ফর্সা ছিলেন। আর ইবরাহীম নাখয়ীর চোখ নষ্ট ছিল।(ইবনউ আদী, আল কামিল ৪/৫২১-৫২২)।
১.৪.৬.৩. শব্দগত ও অর্থগত নিরীক্ষা
হাদীসের সংগ্রহ ও নিরীক্ষার ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ হাদীসের শব্দ, বাক্য বিন্যাস ও অর্থের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতেন। বর্ণিত হাদীসটির মধ্যে ব্যবহৃত শব্দাবলী, বাক্যের ব্যবহার ইত্যাদি রাসূলুল্লাহ(স) এর ভাষা ও ভাবের সাখে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা লক্ষ্য রাখতেন। বর্ণিত হাদীসটির অর্থ মানবীয় যুক্তি, জ্ঞান, বিবেক বিরোধী কিনা, অথবা কুরআন ও হাদীসের সুপরিচিত বক্তব্যের স্পষ্ট বিরোধী কিনা তা বিবেচনা করতেন। ফলে অনেক সময় বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত সততা প্রমাণিত হওয়া সত্বেও তাঁর বর্ণিত হাদীসকে তাঁরা মিথ্যা বা বানোয়াট বলে প্রত্যাখ্যান করতেন। পরবর্তী আলোচনায় পাঠক এ বিষয়ক অনেক উদাহরণ দেখতে পাবেন।
১.৪.৬.৪. ‘রাবী’র ওস্তাদকে প্রশ্ন করা
মুহাদ্দিসগণ কোনো রাবীর নিকট হতে হাদীস সংগ্রহের পর চেষ্টা করতেন তিনি যে ওস্তাদের সূত্রে হাদীসটি বলেছেন তাঁর কাছে যেয়ে সরাসরি তাকে প্রশ্ন করার মাধ্যমে বর্ণনাটি যাচাই করার। এজন্য প্রয়োজনে তাঁরা হাজার মাইল পরিভ্রমণের কষ্ট স্বীকার করতেন। উক্ত শিক্ষকের মৃত্যুর কারণে তার নিকট প্রশ্ন করা সম্ভব না হলে তাঁরা তার অন্যান্য ছাত্রের বর্ণনা সংগ্রহ করে তুলনা করতেন। এই জাতীয় একটি ঘটনা উল্লেখ করছি।
দ্বিতীয় হিজরী শতকের একজন তাবেয়ী হাদীস বর্ণনাকারী ‘রাবী’ হাসান ইবনু উমারাহ আল বাজালী(১৫৩ হি)। তিনি বড় আলিম ও ফকীহ ছিলেন এবং কিছুদিন বাগদাদ এর বিচারপতি ছিলেন। কিন্তু হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। সমকালীন নাকীদ বা সমালোচক হাদীসের ইমামগণ তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে তার দুর্বলতা প্রমাণ করেন। এ বিষয়ে দ্বিতীয় হিজরীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, নাকিদ ও ইমাম আল্লামা শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ(১৬০ হি) বলেনঃ “হাসান ইবনু উমারাহ আমাকে ৭ টি হাদীস বলেন। তিনি বলেন যে, তিনি হাদীসগুলি হাকাম ইবনু উতাইবাহ(১১৩ হি) এর নিকট হতে শুনেছেন, তিনি ইয়াহইয়া ইবনুল জাযযার থেকে শুনেছেন। আমি হাকাম ইবনু উতাইবাহ এর সাথে সাক্ষাত করে সেগুলি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বলেনঃ এগুলির মধ্যে একটি হাদীসও আমি বলিনি। (ইবনু আদী, আল কামিল ফী দুআফাইর রিজাল ২/২৮৩)।
আবু দাউদ তায়ালিসী সুলাইমান ইবনু দাউদ(২০৪ হি) বলেনঃ শু’বা আমাকে বলেনঃ আমাকে হাসান ইবনু উমারাহ বলেন, আমাকে হাকাম ইবনু উতাইবাহ বলেছেন, আবদুর রহমান ইবনু আবু লাইলা বলেছেন, আলী(রা) বলেছেনঃ “উহুদের শহীদগণকে গোসল দেওয়া হয়, কাফন পরানো হয় এবং জানাযার সালাত আদায় করা হয়।” এরপর আমি হাকামের নিকট গমন করে উহুদের শহীদগণের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বলেনঃ তাঁদের গোসল করানো হয়নি এবং কাফন পরানো হয়নি। আমি বললামঃ তাহলে হাসান ইবনু উমারাহ যে আপনার সূত্রে এইসব কথা বর্ণনা করেছে? তিনি বলেনঃ আমি কখনোই তাকে এই হাদীস বলিনি।”(প্রাগুক্ত ২/২৮৪)।
আবু দাউদ তায়ালিসী আরো বলেনঃ আমাকে শু’বা বললেনঃ তুমি জারীর ইবনু হাযিম(১৭০ হি) এর নিকট গমন করে তাকে বলঃ আপনার জন্য হাসান ইবনু উমারাহ হতে হাদীস বর্ণনা জায়েয নয়; কারণ সে মিথ্যা বলে। তায়ালিসী বলেনঃ আপনি কিভাবে তা জানলেন? তিনি বলেনঃ তিনি আমাকে হাকাম ইবনু উতাইবাহর সূত্রে অনেক হাদীস শুনিয়েছেন যেগুলোর কোনো ভিত্তি আমি পাইনি।
তায়ালিসী বলেনঃ আমি বললামঃ সেগুলি কি? শু’বা বলেনঃ আমি হাকামকে বললামঃ জারজ সন্তানের বিষয়ে আপনার মত কি? তিনি বলেনঃ তাদের জানাযা পড়া হবে। আমি বললামঃ এই হাদীস কার হতে বর্ণিত? হাকাম বলেনঃ হাসান বসরী থেকে বর্ণিত। অথচ হাসান ইবনু উমারাহ বলছেনঃ তাকে হাকাম হাদীসটি ইয়াহইয়া ইবনুল জাযযার থেকে আলীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।(মুসলিম, আস-সহীহ ১/২৩-২৪)।
এভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, শু’বা হাসান ইবুন উমারাহ এর বর্ণিত হাদীসগুলি তার উস্তাদের নিকট পেশ করে হাসানের বর্ণনার অযথার্থতা ও তার ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ভুল বা মিথ্যা প্রমাণ করলেন। এইরূপ অগণিত ঘটনা আমরা রিজাল গ্রন্থসমূহে দেখতে পাই। মূলত মুহাদ্দিসগণের সফরের একটি বড় অংশ ব্যয় করতেন সংকলিত হাদীসসমূহ ‘রাবী’র ওস্তাদের নিকট পেশ করে সেগুলোর যথার্থতার কাজে।
১.৪.৬.৫. বিভিন্ন বর্ণনাকারীর বর্ণনার তুলনা
মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষার অন্যতম দিক ছিল রাবীর সতীর্থ বা সহপাঠিগণের বর্ণনা সংগ্রহ ও তুলনা করে তার যথার্থতা নির্ণয় করা। তুলনা ও নিরীক্ষার এই প্রক্রিয়া ছিল তাঁদের সার্বক্ষণিক হাদীস চর্চার প্রধান বৈশিষ্ট্য। হাদীস শ্রবণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা সেই হাদীসকে স্মৃতিতে সংরক্ষিত অন্যদের বর্ণিত হাদীসগুলির সাথে তুলনা করতেন। এরপর প্রয়োজন ও সুযোগ অনুসারে অন্যান্য রাবীগণকে প্রশ্ন করতেন, তাঁদের বর্ণনার সাথে এই বর্ণনার তুলনা করতেন এবং প্রয়োজন মত পান্ডুলিপির সাথে মেলাতেন।
দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আবু দাউদ তায়ালিসী(২০৪ হি) বলেন, আমরা একদিন আমাদের উস্তাদ শু’বা ইবনুল হাজ্জাজের(১৬০ হি) নিকট বসে ছিলাম। এমতাবস্থায় সমসাময়িক রাবী হাসান ইবনু দীনার সেখানে আগমন করেন। শু’বা তাকে বলেনঃ আপনি এখানে বসুন। তিনি বসেন এবং হাদীস থেকে বলেনঃ আমাদেরকে হামীদ ইবনু হিলাল বলেছেন, তিনি মুজাহিদ(২১-১০৪ হি) থেকে, তিনি উমার ইবনুল খাত্তাবকে(২১ হি) বলতে শুনেছেন……। হাদীসটি শুনে শু’বা অবাক হয়ে বলেনঃ মুজাহিদ উমার থেকে কোনো হাদীস শুনেছেন? এ কিভাবে সম্ভব?এ সময় হাসান ইবনু দীনার উঠে চলে যান। অন্য একজন রাবী আবুল ফাদল বাহর ইবনু কুনাইয আস সাক্কা(১৬০ হি) সেখানে আগমন করেন। শু’বা তাকে বলেনঃ আবুল ফাদল, আপনি হামীদ ইবনু হিলাল থেকে কোনো হাদীস শুনেছেন? তিনি বলেন, হ্যা, শুনেছি। আমাদেরকে হামীদ ইবনু হিলাল বলেছেন, আমদেরকে বনু আদী গোত্রের আবু মুজাহিদ নামের একজন আলিম বলেছেন, তিনি উমার ইবনুল খাত্তাবকে বলতে শুনেছেন…….। তখন শু’বা বলেনঃ তাহলে এই হলো আসল বিষয়।(ইবনু আদী, আল কামিল৩/১১৭)।
হাসান ইবনু দীনার তার হাদীস বর্ণনায় ভুল করেছেন। প্রসিদ্ধ রাবী মুজাহিদের জন্ম উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) এর শাহাদাতের দুই এক বছর পূর্বে। তিনি উমরের নিকট হতে কোনো হাদীস শুনেননি। তিনি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে রাবীর নামে ভুল করেছেন। বাহার আস সাক্কা এর বর্ণনার সাথে তুলনা করে শু’বা বুঝতে পারলেন হাসান ইবনু দীনারের ভুল কোথায়। তিনি হামীদ ইবনু হিলালের উস্তাদের নাম ঠিকমত মনে রাখতে পারেননি। এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি ইচ্ছাকৃত মিথ্যা না বললেও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা বলেন। তিনি হাদীস নির্ভুলরূপে মুখস্ত রাখতে বা বর্ণনা করতে পারেননা।
তৃতীয় শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘নাকিদ’ মুহাদ্দিস ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন(২৩৩ হি) মূসা ইবনু ইসমাঈল(২২৩ হি) এর নিকট গমন করে হাম্মাদ ইবনু সালামাহ ইবনু দীনারের(১৬৭ হি)বর্ণিত হাদীসগুলির পান্ডুলিপি পাঠ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। মূসা বলেনঃ আপনি এই পান্ডুলিপিগুলি আর কারো কাছে শুনেননি? ইয়াহইয়া বলেনঃ আমি ইতোপূর্বে হাম্মাদের ১৭ জন ছাত্রের কাছে তাদের নিকট সংকলিত হাম্মাদের বর্ণিত হাদীসগুলির পান্ডুলিপি পড়ে শুনেছি। আপনি ১৮ তম ব্যক্তি যার কাছে আমি হাম্মাদের বর্ণিত হাদীসগুলি পড়তে চাই। মূসা বলেনঃ কেন? ইয়াহইয়া বলেনঃ কারণ হাম্মাদ ইবনু সালামাহ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে দুই/এক স্থানে ভুল করতেন; এজন্য আমি তার ভুল ও তার ছাত্রদের ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে চাই। যদি দেখি যে, হাম্মাদের সকল ছাত্রই একইভাবে বর্ণনা করেছেন তাহলে বুঝতে পারব যে, হাম্মাদ এভাবেই বলেছেন এবং এক্ষেত্রে ভুল হলে তা হাম্মাদেরই ভুল। আর যদি দেখি যে, ছাত্রদের বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে তাহলে বুঝতে পারব যে, এক্ষেত্রে ভুল ছাত্রের নিজের।এভাবে আমি হাম্মাদের নিজের ভুল এবং তাঁর ছাত্রদের ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারব।(যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৭/৪৫৬)।
মুহাদ্দিসগণের তুলনামূলক নিরীক্ষার অগণিত উদাহরণ ও ব্যাখ্যা ইমাম মুসলিম বিস্তারিতভাবে তার ‘আত-তাময়ীয’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায় একটি উদাহরণ এখানে পেশ করছি। তিনি বলেনঃ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ভুল হাদীসের সনদে বা মতনে হতে পারে। মতনে ভুলের একটি উদাহরণ। আমাকে হাসান হুলওয়ানী ও আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদুল্লাহ দারিমী বলেছেন, আমাদেরকে কাসীর ইবনু যায়ীদ বলেছেন, আমাদেরকে ইয়াযীদ ইবুন আবী যিয়াদ বলেছেন, কুরাইব ইবনু আবী মুসলিম(৯৮ হি)থেকে, তিনি ইবনু আব্বাস থেকে, তিনি বলেনঃ আমি আমার খালা(নবী পত্নী)মাইমুনার ঘরে রাত্রি যাপন করি। …রাসূলুল্লাহ(স) রাত্রে উঠে ওযূ করে (তাহাজ্জুদের) সালাতে দাঁড়ান। তখন আমি তাঁর ডান পার্শ্বে দাঁড়াই। তিনি আমাকে ধরে তাঁর বাম পার্শে দাঁড় করিয়ে দেন।……”
ইমাম মুসলিম বলেনঃ এই হাদীসটি ভুল। কারণ নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীগণ সহীহ বর্ণনায় এর বিপরীত কথা বর্ণনা করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন যে, ইবনু আব্বাস রাসূলুল্লাহ(স) এর বামে দাঁড়িয়েছিলেন এরপর তিনি তাকে তাঁর ডানদিকে দাঁড় করিয়ে দেন। …..আমি এখানে কুরাইব ইবনু আবু মুসলিম থেকে তাঁর অন্যান্য ছাত্রদের বর্ণনা এবং এরপর ইবনু আব্বাস থেকে ইবনু আব্বাসের অন্যান্য ছাত্রদের বর্ণনা উল্লেখ করব, যারা কুরাইবের সতীর্থ ছিলেন এবং তাঁরই অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
১. আমাদেরকে ইবনু আবী উমর বলেন, আমাদেরকে সুফিয়ান সাওরী বলেছেন, আমর ইবনু দীনার থেকে, কুরাইব থেকে ইবনু আব্বাস থেকে, তিনি মাইমূনার গৃহে রাত্রি যাপন করেন। রাসূলুল্লাহ(স) রাত্রে উঠে ওযু করে সালাতে দাঁড়ান। ইবনু আব্বাস বলেনঃ আমি তখন উঠে রাসূলুল্লাহ(স) যেভাবে নামায পড়েন সেভাবে ওযু করে তাঁর নিকট আগমন করি এবং তাঁর বামে দাঁড়াই। তিনি তখন আমাকে তাঁর ডান দিকে দাঁড় করিয়ে দেন।
২. মাখরাহ ইবনু সুলাইমান কুরাইব থেকে, ইবনু আব্বাস থেকে অনুরূপভাবে বর্ণনা করেছেন।
৩. সালামা ইবনু কুহাইল কুরাইব থেকে, ইবনু আব্বাস থেকে অনুরূপভাবে।
৪. সালিস ইবনু আবীল জা’দ কুরাইব থেকে, ইবনু আব্বাস থেকে অনুরূপভাবে।
৫. হুশাইম আবু বিশর থেকে সাঈদ ইবনু জুবাইর থেকে ইবনু আব্বাস থেকে।
৬. আইয়ুব সাখতিয়ানী, আবদুল্লাহ ইবনু সাঈদ জুবাইর থেকে, তার পিতা সাঈদ ইবনু জুবাইর থেকে, ইবনু আব্বাস থেকে।
৭. হাকাম ইবনু উতাইবাহ সাঈদ ইবনু জুবাইর থেকে।
৮. ইবনু জুরাইজ আতা ইবনু আবী রাবাহ থেকে, ইবনু আব্বাস থেকে।
৯. কাইস ইবনু সাঈদ আতা ইবনু আবী রাবাহ থেকে, ইবনু আব্বাস থেকে।
১০. আবু নাদরাহ(মুনযির ইবনু মালিক)ইবনু আব্বাস থেকে।
১১. শা’বী ইবনু আব্বাস থেকে।
১২. তাঊস ইকারামাহ থেকে, ইবনু আব্বাস থেকে।
ইমাম মুসলিম বলেনঃ এভাবে কুরাইব থেকে এবং ইবনু আব্বাসের অন্যান্য ছাত্রদের থেকে সহীহ বর্ণনায় প্রমাণিত হলো যে, রাসূলুল্লাহ(স) ইবনু আব্বাসকে তাঁর বামে দাঁড় করিয়েছিলেন বলে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তা সন্দেহাতীতভাবে ভুল। (মুসলিম, আত-তাময়ীয, পৃ. ৬২-৬৩)।
পাঠক, এখানে ইমাম মুসলিমের নিরীক্ষার গভীরতা ও প্রামাণ্যতা লক্ষ্য করুন। তিনি এই একটি হাদীস ইবনু আব্বাস থেকে ১৩ টি সূত্রে সংকলিত করে তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক বর্ণনাকে ভুল বা মিথ্যা বর্ণনা থেকে পৃথক করলেন।
তিনি প্রথমে উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াযিদ ইবনু আবী যিয়াদ নামক ‘রাবী’র সূত্রে বর্ণনা করলেন যে, কুরাইব তাকে বলেছেন, ইবনু আব্বাস তাকে বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ(স) এর ডানে দাঁড়ান এবং তিনি তাকে বামে দাঁড় করিয়ে দেন। এরপর তিনি ইয়াযিদের ওস্তাদ ‘কুরাইবের’ অন্যান্য ছাত্রদের বর্ণনার সাথে তা মেলালেন। কুরাইবের অন্য তিনজন প্রসিদ্ধ ছাত্র মাখরামাহ, সালামা ও সালিমের বর্ণনা ইয়াযিদের বর্ণনার বিপরীত। তাঁরা তিনজনই বলেছিলেন যে, কুরাইব বলেছেন, ইবনু আব্বাস বামে দাঁড়িয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ(স) তাকে ডানে দাঁড় করান। এতে প্রমাণিত হলো যে, ইয়াযিদ ইবনু আবী যিয়াদ হাদীসটি মুখস্ত রাখতে পারেননি।
ইমাম মুসলিম এখানেই থামেননি। তিনি এরপর কুরাইব ছাড়াও ইবনু আব্বাসের অন্য ৫ জন ছাত্র: সাঈদ ইবনু জুবাইর, আতা ইবনু আবী রাবাহ, আবু নুদরাহ, শা’বী ও ইকরামাহ থেকে হাদীসটির বিবরণ সংকলিত করে তার সাথে উপরের বর্ণনাটির তুলনা করেছেন। এই ৫ জনের বর্ণনাও প্রমাণ করে যে, ইয়াযিদ ইবনু আবী যিয়াদ হাদীসটির ভুল বর্ণনা দিয়েছেন। এতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হলো যে, ইবনু আব্বাস তাঁর সকল ছাত্রকে বলেছেন যে, তিনি প্রথমে বামে দাঁড়িয়েছিলেন, পরে রাসূলুল্লাহ(স) তাকে ডানে দাঁড় করিয়ে দেন। ইবনু আব্বাসের সকল ছাত্রের ন্যায় কুরাইবও তাঁর ছাত্রদের এই কথায় বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু ইয়াযিদ তাঁর স্মৃতির দুর্বলতার কারণে হাদীসটি ভুলভাবে বর্ণনা করেছেন।
এইরূপ ব্যাপক তুলনা ও নিরীক্ষা মুহাদ্দিসগণ প্রতিটি হাদীসের ক্ষেত্রে করতেন। হাদীস ও রাবীর বিধান বর্ণনায় তাঁদের প্রতিটি মতামতই এইরূপ গভীর ও ব্যাপক তুলনা ও নিরীক্ষার ভিত্তিতে প্রদত্ত।
আরেকটি উদাহরণ দেখুন। দ্বিতীয় হিজরী শতকের মিশরের একজন প্রসিদ্ধ আলিম, ফকীহ ও মুহাদ্দিস ছিলেন আবু আবদুর রহমান আবদুল্লাহ ইবনু লাহী’য়া উক্ববা আল হাদরামী আল গাফিকী(১৭৪ হি)। তিনি একজন প্রসিদ্ধ হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন এবং অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। মুহাদ্দিসগণ তাঁর বর্ণিত সকল হাদীস তুলনামুলক নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে দেখতে পেয়েছেন যে, তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে ভুলের পরিমাণ খুবই বেশি। নাকিদ মুহাদ্দিসগণ তাঁর বর্ণিত হাদীসগুলি তাঁর নিকট থেকে বা তাঁর ছাত্রদের নিকট হতে সংকলিত করেছেন। এরপর তিনি যেসকল ওস্তাদের সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের অন্যান্য ছাত্রদের থেকে হাদীসগুলি সংগ্রহ ও সংকলন করেছেন। এরপর এ সকল বর্ণনার সনদ ও মতনের তারতম্য দেখতে পেয়ে ‘ইবনু লাহীয়াহ’ কে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন।
ইবনু লাহীয়াহ এর মারাত্মক ভুলের উদাহরণ হিসেবে ইমাম মুসলিম বলেনঃ আমাদেরকে যুহাইর ইবনু আরব বলেছেন, আমাদেরকে ইসহাক ইবনু ঈসা বলেছেন, আমাদেরকে আব্দুল্লাহ ইবনু লাহীয়াহ বলেছেন, মূসা ইবনু উকবাহ(১৪১ হি) আমার কাছে লিখে পাঠিয়েছেন, আমাকে বসুর ইবনু সাঈদ বলেছেন, যাইদ ইবনু সাবিত(রা) থেকে, তিনি বলেছেনঃ “রাসূলুল্লাহ(স) মসজিদের মধ্যে হাজামত করেন বা সিংগার মাধ্যমে দেহ থেকে রক্ত বের করেন।” ইবনু লাহীয়াহ এর ছাত্র ইসহাক ইবনু ঈসা বলেনঃ আমি ইবনু লাহীআকে বললামঃ তাঁর বাড়ির মধ্যে কোনো নামাজের স্থানে? তিনি বললেনঃ মসজিদে নববীর মধ্যে।”
ইমাম মুসলিম বলেনঃ হাদীসটির বর্ণনা সকল দিক হতে বিকৃত। এর সনদ ও মতন উভয় ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল রয়েছে। ইবনু লাহীয়াহ এর মতনের শব্দ বিকৃত করেছেন এবং সনদে ভুল করেছেন। এই হাদীসের সহীহ বিবরণ আমি উল্লেখ করছি।
আমাকে মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম বলেন,আমাদেরকে বাহায ইবনু আসাদ বলেন, আমাদেরকে উহাইব ইবনু খালিদ ইবনু আজলান(১৬৫ হি) বলেন, আমাকে মূসা ইবনু উকবাহ বলেন, আমি আবুন নাদর সালিম ইবনু আবু উমাইয়াহ(১২৯ হি) কে বলতে শুনেছি, তিনি বুসর ইবনু সাইদ থেকে, তিনি যাইদ ইবনু সাবিত থেকে বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ(স)মসজিদের মধ্যে চাটাই দিয়ে একটি ছোট ঘর বানিয়ে তার মধ্যে কয়েক রাত সালাত আদায় করেন…..।”
ইমাম মুসলিম বলেনঃ “আমাকে মুহাম্মাদ ইবনুল মাসাল্লা বলেন, আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবনু জা’ফর বলেছেন, আমাদেরকে আবদুল্লাহ ইবনু সাঈদ ইবনু আবী হিনদ আল ফারাযী (১৪৫ হি) বলেছেন, আমাদেরকে আবুন নাদর সালিম বলেছেন, তিনি বুসর ইবনু সাঈদ থেকে, তিনি যাইদ ইবনু সাবিত থেকে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ(স) চাটাই দিয়ে মসজিদের মধ্যে একটি ঘর বানিয়ে নেন…।”
ইমাম মুসলিম বলেনঃ এভাবে আমরা সঠিক বর্ণনা পাচ্ছি উহাইব ইবনু খালিদ(১৬৫ হি) থেকে মূসা ইবনু উকবাহ থেকে, আবুন নাদর থেকে। এছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনু সাঈদ ইবনু আবী হিনদ আল ফারাযী(১৪৫ হি) দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আবুন নাদর থেকে যে বর্ণনা করেছেন তাও উল্লেখ করলাম। ইবনু লাহীয়া এখানে হাদীসের মতন বর্ণনায় ভুল করেছেন তার কারণ তিনি হাদীসটি মূসার নিকট হতে স্বকর্ণে শুনেননি। শুধুমাত্র লিখে পাঠানো পান্ডুলিপির উপর নির্ভর করেছেন যা তিনি উল্লেখ করেছেন। (এজন্য তিনি বা ঘর বানিয়েছেন শব্দটিকে বা রক্ত বাহির করেছেন বলে পড়েছেন।) যারা মুহাদ্দিসের নিজের মুখ হতে স্বকর্ণে না শুনে বা মুহাদ্দিসকে নিজে পড়ে না শুনিয়ে শুধুমাত্র লিখিত পান্ডুলিপির উপর নির্ভর করে হাদীস বর্ণনা করেন তাদের সকলের ক্ষেত্রেই আমরা এই বিকৃতির ভয় পাই।
আর সনদের ভুল হলো, মূসা ইবনু উকবাহ হাদীসটি আবুন নাদর সালিম এর নিকট হতে গ্রহণ করেছেন। আবুন নাদর হাদীসটি বুসর ইবনু সাঈদ থেকে শিখেছেন। কিন্তু ইবনু লাহিয়াহ সনদ বর্ণনায় আবুন নাদর এর নাম উল্লেখ না করে বলেছেনঃ মূসা হাদীসটি বুশর থেকে শুনেছেন। (মুসলিম, আত-তাময়ীয, পৃ. ১৮৭-১৮৮)।
এখানে লক্ষণীয় যে, ইমাম মুসলিম দুই পর্যায়ে তুলনা করেছেন। প্রথমত ইবনু লাহীয়াহর উস্তাদ মূসার অন্য ছাত্র উহাইবের বর্ণনার সাথে ইবনু লাহীয়াহর বর্ণনা তুলনা করেছেন। উভয় বর্ণনা প্রমাণ করেছে যে, ইবনু লাহিয়াহ সনদ বর্ণনায় ও মতন উল্লেখে মারাত্মক ভুল করেছেন।
১.৪.৬.৬. বিভিন্ন সময়ের বর্ণনার মধ্যে তুলনা করা
সাক্ষ্য বা বর্ণনার নির্ভুলতা যাচাইয়ের অন্যতম পদ্ধতি বর্ণনাকারীকে বিভিন্ন সময়ে একই বিষয়ে প্রশ্ন করা। এই পদ্ধতি সাহাবীগণ ব্যবহার করতেন হাদীস বর্ণনাকারীর বর্ণনার নির্ভুলতা যাচাইয়ের জন্য। পরবর্তী মুহাদ্দিসগণও এই পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। এখানে ২ টি উদাহরণ উল্লেখ করছি।
১. উমাইয়া শাসক মারওয়ান ইবনুল হাকাম(৬৫ হি) এর সেক্রেটারী আবুয যুআইযাহ বলেন, একদিন মারওয়ান আমাকে বলেনঃ আবু হুরাইরা(রা) কে ডেকে আনাও। আবু হুরাইরা উপস্থিত হলে তিনি আবু হুরাইরাকে বিভিন্ন বিষয়ে হাদীস জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। আর আমাকে পর্দার আড়ালে বসে সেগুলি লিখতে নির্দেশ দিলেন। এরপর একবৎসর অতিক্রান্ত হয়ে গেলে মারওয়ান পুনরায় আবু হুরাইরাকে ডেকে পাঠান এবং আমাকে পর্দার আড়ালে আগের বছরে লেখা পান্ডুলিপি নিয়ে বসতে বলেন। তিনি আবু হুরাইরাকে সেই বিষয়গুলি সম্পর্কে আবার প্রশ্ন করেন এবং আবু হুরাইরা গত বছরে বলা হাদীসগুলি পুনরায় বলেন। আমি মিলিয়ে দেখলাম যে, তিনি একটুও কম বেশি করেননি বা কোনো শব্দ আগে পিছেও করেননি।”(হাকিম, আল মুসতাদরাক ৩/৫৮৩)।
২. উমারাহ ইবনুল কা’কা বলেনঃ আমাকে ইবরাহীম নাখয়ী (৯৬ হি)বলেনঃ তুমি আমাকে আবু যুর’আ ইবনু আমর ইবনু জারীব থেকে হাদীস বর্ণনা কর। আবু যুর’আর নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ হলো, আমি তাকে একটি হাদীস সম্পর্কে প্রশ্ন করি। এরপর দুই বৎসর পরে আমি তাকে হাদীসটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। দ্বিতীয়বার তিনি হুবহু প্রথমবারের মতই বর্ণনা করেন, একটি অক্ষরও বেশি কম করেননি। (ইবনু হাজার আসকালানী, তাহযীবুত তাহযীব ১২/১০৯)।
১.৪.৬.৭. স্মৃতি ও শ্রুতির সাথে পান্ডুলিপির তুলনা
আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, তাবেয়ীগণের যুগ থেকে ‘রাবী’ ও মুহাদ্দিসগণ সাধারণভাবে প্রত্যেক শিক্ষকের নিকট হতে শিক্ষা করা হাদীসগুলি পৃথকভাবে পান্ডুলিপি আকারে লিপিব্ধ করে সংরক্ষণ করতেন। তাঁরা পান্ডুলিপির সাথে মুখস্ত বর্ণনার তুলনা করে নির্ভুলতা যাচাই করতেন। প্রয়োজনে তাঁরা পান্ডুলিপির হস্তাক্ষর, কালি ইত্যাদি পরীক্ষা করতেন। এখানে বর্ণিত হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে পান্ডুলিপির সাহায্য গ্রহণের কয়েকটি নযির উল্লেখ করছি।
(১) দ্বিতীয় হিজরী শতকের একজন মুহাদ্দিস খলীফা ইবনু মূসা বলেন, আমি গালিব ইবনু উবাইদুল্লাহ আল জাযারী নামে একজন মুহাদ্দিসের নিকটে হাদীস শিক্ষা করতে গমন করি। তিনি আমাদেরকে হাদীস লেখাতে শুরু করে তার পান্ডুলিপি দেখে বলতে থাকেনঃ আমাকে মাকহুল(১১৫ হি) বলেছেন…, আমাকে মাকহুল বলেছেন…., এভাবে তিনি মাকহুলের সূত্রে হাদীস লেখাতে থাকেন। এমন সময় তাঁর প্রশ্রাবের বেগ হয়, তিনি উঠে যান। তখন আমি তার পান্ডুলিপির উপর নযর করে দেখি সেখানে লেখা রয়েছেঃ আমাকে আবান ইবনু আবী আইয়াশ(১৪০ হি) বলেছেন, আনাস থেকে, আবান বলেছেন, অমুক থেকে….। তখন আমি তাকে পরিত্যাগ করে সেখান হতে উঠে আসলাম। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৮)।
অর্থাৎ, এই রাবী তার হাদীসগুলি আবানের নিকট হতে শুনেছেন ও লিখেছেন। তবে আবান মুহাদ্দিসগণের নিকট দুর্বল বলে ও অনির্ভরযোগ্য বলে পরিচিত। এজন্য তিনি হাদীস পড়ার সময় তার নাম বাদ দিয়ে প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মাকহুলের নামে হাদীসগুলি বলেছিলেন। খলীফা সুযোগ পেয়ে তার মুখের বর্ণনার সাথে লিখিত পান্ডুলিপির তুলনা করে তার জালিয়াতি ধরে ফেলেন।
(২) দ্বিতীয় শতকের নাকিদ ইমাম, আবদুর রহমান ইবনু মাহদী (১৯৮ হি) বলেন, একদিন সুফিয়ান সাওরী (১৬১ হি) একটি হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ হাদীসটি আমাকে বলেছেন হাম্মাদ ইবনু আবী সুলাইমান(১২০ হি), তিনি আমর ইবনু আতিয়্যাহ আত তাইমী(মৃত্যু ১০০ হিজরীর কাছাকাছি) নামক তাবিয়ী থেকে তিনি সালমান ফারসী(৩৪ হি) থেকে।
আবদুর রহমান বলেনঃ আমি বললামঃ হাম্মাদ ইবনু আবী সুলাইমান তো এই হাদীস রিবয়ী ইবনু হিরাশ(১০০ হি) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি সালমান ফারসী থেকে। (অর্থাৎ, আপনার সনদ বর্ণনায় ভুল হয়েছে, হাম্মাদের উস্তাদ আমর ইবনু আতিয়্যাহ নয়, বরং রিবয়ী ইবনু হিরাশ।) সুফিয়ান সাওরী বলেছেনঃ এই সনদ কে বলেছেন? আমি বললামঃ আমাকে হাম্মাদ ইবনু সালামাহ(১৬৭ হি) বলেছেন, তিনি হাম্মাদ ইবনু আবী সুলাইমান হতে এই সনদ উল্লেখ করেছেন। সুফিয়ান বললেনঃ আমি যা বলছি, তাই লেখ। আমি বললামঃ শু’বা ইবনুল হাজ্জাজও (১৬০ হি) আমাকে এই সনদ বলেছেন। তিনি বললেনঃ আমি যা বলছি তাই লিখ। আমি বললামঃ হিশাম দাসতুআয়ীও (১৫৪ হি) আমাকে এই সনদ বলেছেন। তিনি বললেনঃ হিশাম? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি কয়েক মুহুর্ত চুপ থেকে বললেন, আমি যা বলছি তাই লিখ। আমি হাম্মাদ ইবনু আবী সুলাইমানকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ আমি আমর ইবনু আতিয়্যাহ থেকে হাদীসটি শুনেছেন।
আব্দুর রাহমান বলেনঃ আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস এসে গেল যে, এখানে সুফিয়ান সাওরী ভুল করলেন। অনেকদিন যাবত আমি এই ধারণা পোষণ করে থাকলাম যে, এই হাদীস বলতে সুফিয়ান সাওরী ভুল করলেন। এরপর একদিন আমি আমার ওস্তাদ মুহাম্মাদ ইবনু জা’ফার গুনদার (১৯৩ হি) এর মাধ্যমে শু’বা ইবনুল হাজ্জাজের যে হাদীসগুলি শুনেছিলাম সেগুলির লিখিত পান্ডুলিপির মধ্যে দেখলাম যে, শু’বা বলেছেন, আমাকে হাম্মাদ ইবনু আবী সুলাইমান বলেছেন, তাকে রিবয়ী ইবনু হিরাশ বলেছেন, সালমান ফারসী থেকে। শু’বা বলেছেনঃ হাম্মাদ একবার বলেন যে, তিনি আমর ইবনু আতিয়্যাহ হতে হাদীসটি শুনেছেন।
আবদুর রহমান বলেনঃ পান্ডুলিপি দেখার পর আমি বুঝতে পারলাম যে, সুফিয়ান সাওরী ঠিকই বলেছিলেন। তাঁর নিজের মুখস্তের বিষয়ে তাঁর গভীর আস্থা থাকার কারণে অন্যান্যদের বিরোধিতাকে তিনি পাত্তা দেননি। (ইবনু আবী হাতিম, আল জারহু ওয়াত তা’দীল ১/৬৪-৬৫)।
(৩) দ্বিতীয় শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহ আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক(১৮১ হি) বলেন, যদি মুহাদ্দিসগণ শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ(১৬০ হি) থেকে বর্ণিত হাদীসের সঠিক বর্ণনার বিষয়ে মতভেদ করেন তাহলে মুহাম্মাদ ইবনু জা’ফর গুনদার(১৯৩ হি) এর পান্ডুলিপিই তাদের মধ্যে চূড়ান্ত ফায়সালা করবে। গুণদার এর পান্ডুলিপির বর্ণনাই সঠিক ও নির্ভুল বলে গৃহীত হবে।(ইবনু আবী হাতিম, প্রাগুক্ত ১/২৭১)।
(৪) তৃতীয় শতকের তিনজন মুহাদ্দিস, মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম ইবনু উসমান আর রাযী(২৭০ হি), ফাদল ইবনু আব্বাস ও আবু যুরু’আ রাযী উবাইদুল্লাহ ইবনু আব্দুল করিম(২৬৪ হি) একত্রে বসে হাদীস আলোচনা করছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম একটি হাদীস বলে যাতে ফাদল আপত্তি উঠান। তিনি অন্য একটি বর্ণনা বলেন। দুজনের মধ্যে হাদীসটি নিয়ে বচসা হয়। তাঁরা তখন আবু যুরআকে সালিস মানেন। আবু যুরআ মতামত প্রকাশে অনীহা করেন। কিন্তু মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম চাপাচাপি করতে থাকেন। তিনি বলেনঃ আপনার নীরবতার কোন অর্থ নেই। আমার ভুল হলে তাও বলেন। আর তাঁর ভুল হলে তাও বলেন। আবু যুর’আ তখন তাঁর পান্ডুলিপি আনতে নির্দেশ দেন। তিনি ছাত্র আবুল কাসিমকে বলেন, তুমি গ্রন্থাগারে ঢুকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারি বাদ দিবে। এরপরের সারির বই গুণে প্রথম থেকে ১৬ খন্ড পান্ডুলিপি রেখে ১৭ তম খন্ডটি নিয়ে এস। তিনি যেয়ে বর্ণনা অনুসারে পান্ডুলিপিটি নিয়ে এসে আবু জুরআকে প্রদান করেন। আবু যুরআ পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে হাদীসটি বের করেন। এরপর তিনি পান্ডুলিপিটি মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিমের হাতে দেন। মুহাম্মাদ পান্ডুলিপিতে সংকলিত হাদীসটি পড়ে বলেনঃ হ্যাঁ, তাহলে আমারই ভুল হয়েছে। আর ভুল তো হতেই পারে।”(ইবনু আবী হাতিম, প্রাগুক্ত ১/৩৩৭: ইবনু হাজার, তাহযীবুত তাহযীব ৭/৩০)।
(৫) তৃতীয় হিজরীর একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আব্দুল রাহমান ইবনু উমর আল ইসপাহানী রুস্তাহ(২৫০ হি)। তিনি একদিন হাদীসের আলোচনা কালে আবু জুরআ রাযী(২৬৪ হি) ও আবু হাতিম রাযী মুহাম্মাদ ইবনু ইদরীস(২৭৭ হি) উভয়ের উপস্থিতিতে একটি হাদীস বর্ণনা করে বলেনঃ আমাদেরকে আব্দুর রাহমান ইবনু মাদী বলেছিলেন, তিনি সুফিয়ান সাওরী থেকে, তিনি আ’মাশ থেকে, তিনি আবু সালিহ থেকে তিনি আবু হুরাইরা থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “যোহরের সালাত ঠান্ডা করে আদায় করবে; কারণ উত্তাপের কাঠিণ্য জাহান্নামের প্রশ্বাস থেকে।” একথা শুনেই প্রতিবাদ করেন আবু যুর’আ রাযী। তিনি বলেনঃ আপনি(তাবিয়ী আবু সালিহ এর উস্তাদ সাহাবীর নাম আবু হুরাইরা উল্লেখ করে) ভুল বললেন। সকলেইতো হাদীসটি আবু সাঈদ খুদরীর সূত্রে বর্ণনা করেন। কথাটি আব্দুর রাহমান এর মনে খুবই লাগে। তিনি বাড়ি ফিরে নিজের নিকট রক্ষিত পান্ডুলিপি পরীক্ষা করে আবু যুরআর কাছে চিঠি লিখে বলেনঃ “আমি আপনাদের উপস্থিতিতে একটি হাদীস আবু হুরাইরার সূত্রে বর্ণনা করেছিলাম। আপনি বলেছিলেন যে, আমার বর্ণনা ভুল, সবাই হাদীসটি আবু সাঈদের সূত্রে বর্ণনা করেন। কথাটি আমার মনে খুবই আঘাত করেছিল। আমি বিষয়টি ভুলতে পারিনি। আমি বাড়িতে ফিরে আমার নিকট সংরক্ষিত পান্ডুলিপি পরীক্ষা করে দেখেছি। সেখানে দেখলাম যে, হাদীসটি আবু সাঈদের সূত্রেই বর্ণিত। যদি আপনার কষ্ট না হয় তাহলে আবু হাতীম ও অন্যান্য সকল বন্ধুদের জানিয়ে দিবেন যে, আমার ভুল হয়েছিল। আল্লাহ আপনাকে পুরস্কৃত করুন। ভুল স্বীকার করে লজ্জিত বা অপমানিত হওয়া(ভুল গোপন করে) জাহান্নামের আগুনে পোড়ার চেয়ে উত্তম।(ইবনু আবী হাতিম, আল জারহু ওয়াত তা’দীল ১/৩৩৬)।
(৬) তৃতীয় হিজরী শতকের অন্যতম মুহাদ্দিস সুলাইমান ইবুন হারাব(২২৪ হি) বলেনঃ আমি যখন আমার সমসাময়িক প্রসিদ্ধ ‘নাকিদ’ মুহাদ্দিস ইয়াহইয়া ইবনু মা‘য়ীন(২৩৩ হি) এর সাথে বিভিন্ন হাদীস আলোচনা করতাম, তখন তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, এই হাদীসটি ভুল। আমি বলতামঃ এর সঠিক রূপ কি হবে? তিনি বলতেন তা জানিনা। তখন আমি আমার পান্ডুলিপি দেখতাম। আমি দেখতে পেতাম যে, তাঁর কথাই ঠিক। পান্ডুলিপিতে হাদীসটি অন্যভাবে লিখা হয়েছে।(ইবনু আবী হাতিম, প্রাগুক্ত ১/৩১৪)।
(৭) ইমাম আহমদ হাম্বল(২৪১) কে প্রশ্ন করা হয়ঃ আবুল ওয়ালিদ কি পরিপূর্ণ নির্ভরযোগ্য? তিনি বলেনঃ না। তাঁর পান্ডুলিপিতে নোকতা দেওয়া ছিলনা এবং হরকত দেওয়া ছিলনা। তবে তিনি শু’বা ইবনুল হাজ্জাজের নিকট থেকে যে হাদীসগুলি শুনেছিলেন ও লিখেছিলেন সেগুলি তিনি বিশুদ্ধভাবে বর্ণনা করেছেন।(আহমদ ইবনু হাম্মাল, আল ইলাল ওয়া মা’রিফাতুর রিজাল ২/৩৬৯)।
(৮) তৃতীয় হিজরী শতকের একজন হাদীস বর্ণনাকারী ইয়াকূব ইবনু হুমাইদ ইবনু কাসিব(২৪০ হি)। ইমাম আবু দাউদ(২৭৫ হি) বলেন, ইয়াকূব এর বর্ণিত হাদীসগুলির মধ্যে অনেক হাদীস দেখতে পেলাম যেগুলি অন্য কেউ এভাবে বর্ণনা করেননা। এজন্য আমরা তাকে তার মূল পান্ডুলিপি দেখাতে অনুরোধ করি। তিনি কিছুদিন যাবত আমাদের অনুরোধ উপেক্ষা করেন। এরপর তিনি তার পান্ডুলিপি বের করে আমাদেরকে দেখান। আমরা দেখলাম তার পান্ডুলিপিতে অনেক হাদীস নুতন তাজা কালি দিয়ে লেখা। পুরাতন লেখা ও নতুন লেখার মধ্যে পার্থক্য ধরা পড়ে। আমরা দেখলাম অনেক হাদীসের সনদের মধ্যে রাবীর নাম ছিলনা, তিনি সেখানে নতুন করে রাবীর নাম বসিয়েছেন। কোনো কোনো হাদীসের ভাষার মধ্যে অতিরিক্ত শব্দ বা বাক্য যোগ করেছেন। এজন্য আমরা তার হাদীস গ্রহণ করা হতে বিরত থাকি। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৭/২৭৬-২৭৭; সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১১/১৫৯)।
(৯) চতূর্থ হিজরী শতকের অন্যতম মুহাদ্দিস আবু আহমদ আব্দুল্লাহ ইবনু আদী(৩৬৫ হি) বলেনঃ মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনুল আশ‘আশ নামক এক ব্যক্তি মিশরে বসবাস করতেন এবং হাদীস বর্ণনা করতেন। আমি হাদীস সংগ্রহের সফরকালে মিশরে তার নিকট গমন করি। তিনি আমাদেরকে একটি পান্ডুলিপি বের করে দেন। পান্ডুলিপিটির কালি তাজা এবং কাগজও নতুন। এতে প্রায় এক হাজার হাদীস ছিল, যেগুলি তিনি হযরত আলীর বংশধর মূসা ইবনু ইসমাঈল ইবনু মূসা ইবনু জা’ফর সাদিক ইবনু মুহাম্মাদ বাকির ইবনু যাইনুল আবিদীন ইবনু হুসাইন ইবনু আলী থেকে তাঁর পিতা পিতামহদের সূত্রে রাসূলুল্লাহ(স) থেকে শুনেছেন বলে দাবি করেন। এর প্রায় সকল হাদীসই অজ্ঞাত, অন্য কেউ এই সনদে বা অন্য কোনো সনদে তা বর্ণনা করেনি। কিছু হাদীসের বা মতন অন্যান্য সহীহ হাদীসে পাওয়া যায়, তবে এই সনদে নয়। তখন আমি সনদে উল্লেখিত মূসা ইবনু ইসমাঈল সম্পর্কে আলী বংশের সমকালীন অন্যতম নেতা হুসাইন ইবনু আলীকে প্রশ্ন করি ।তিনি বলেনঃ এই মূসা ৪০ বছর যাবত মদীনায় আমার প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি কখনোই কোনোদিন বলেননি যে, তিনি তাঁর পিতা পিতামহদের সূত্রে বা অন্য কোনো সূত্রে কোনো হাদীস তিনি শুনেছেন বা বর্ণনা করেছেন। ইবনু আদী বলেনঃ এই পান্ডুলিপির হাদীসগুলির মধ্যে আমরা কোনো ভিত্তি খুঁজে পাইনি। এগুলি তিনি বানিয়েছিলেন বলে বুঝা যায়। (ইবনু আদী, আল কামিল ৬/৩০১-৩০২; ইবনুল জাউযী, আদ দুআফা ৩/৪৩, ৯৭)।
১.৪.৭. নিরীক্ষার ভিত্তিতে হাদীসের প্রকারভেদ
নিরীক্ষার ভিত্তিতে মুহাদ্দিসগণ হাদীসকে মূলত তিনভাগে ভাগ করেছেনঃ সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদীস, হাসান বা ভাল অর্থাৎ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ও যয়ীফ বা দুর্বল। যয়ীফ হাদীস দুর্বলতার কারণ ও দুর্বলতার পর্যায়ের ভিত্তিতে বিভিন্নভাবে বিভক্ত।
এখানে সাধারণ পাঠকের অনুধাবনের জন্য এগুলি সহজ ব্যাখ্যার চেষ্টা করব। মনে করুন একজন বিচারক একজন হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত সাক্ষ্য প্রমাণাদি নিরীক্ষা করে দেখেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো সে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় এক ব্যক্তিকে খুন করেছে। প্রদত্ত সাক্ষ্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে তিনি সম্ভাব্য চার প্রকার রায় প্রদান করতে পারেনঃ ১. মৃত্যুদন্ড, ২. যাবজ্জীবন কারাদন্ড, ৩. কয়েক বছরের কারাদন্ড বা ৪. বেকসুর খালাস। মোটামুটিভাবে হাদীসের নির্ভরতার ক্ষেত্রেও এই পর্যায়গুলি রয়েছে।
১.৪.৭.১. সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদীস
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় যে হাদীসের মধ্যে ৫টি শর্ত পূরণ হয়েছে তাকে সহীহ হাদীস বলা হয়। ১. ‘আদালত’: হাদীসের সকল রাবী পরিপূর্ণ সৎ ও বিশ্বস্ত বলে প্রমাণিত,
২. ‘যাবত’: সকল রাবীর ‘নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা’ পূর্ণরূপে বিদ্যমান বলে প্রমাণিত,
৩. ‘ইত্তিসাল’: সনদের প্রত্যেক রাবী তাঁর উর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে হাদীসটি শুনেছেন বলে প্রমাণিত,
৪. ‘শুযূয মুক্তি’: হাদীসটি অন্যান্য প্রামাণ্য বর্ণনার বিপরীত নয় বলে প্রমাণিত এবং
৫. ‘ইল্লাত মুক্তি’: হাদীসটির মধ্যে সূক্ষ্ম কোনো সনদগত বা অর্থগত ত্রুটি নেই বলে প্রমাণিত। (ইরাকী, আত-তাকয়ীদ, পৃ. ২৩-২৫; ফাতহুল মুগীস, পৃ. ৭-৮; সাখাবী, ফাতহুল মুগীস ১/২৫-৩১; সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/৬৩-৭৪; মাহমুদ তাহহান, তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস, পৃ. ৩৪-৩৬)।
প্রথম তিনটি শর্ত সনদ কেন্দ্রিক এবং শেষোক্ত দুইটি শর্ত মূলত অর্থকেন্দ্রিক। এগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা অপ্রাসঙ্গিক। তবে সাধারণ পাঠকের জন্য আমরা বলতে পারি যে, প্রদত্ত সাক্ষ্য প্রমাণাদির বিষয়ে যতটুকু নিশ্চয়তা অনুভব করলে একজন বিচারক মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিতে পারেন, বর্ণিত হাদীসটি সত্যিই রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন বলে অনুরূপভাবে নিশ্চিত হতে পারলে মুহাদ্দিসগণ তাকে ‘সহীহ’ বা বিশুদ্ধ হাদীস বলে গণ্য করেন। নিরীক্ষার মাধ্যমে যে সকল বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীস এই মানের নির্ভুল বা সহীহ বলে গণ্য করা হয় তাদের নির্ভরযোগ্যতা বুঝাতে মুহাদ্দিসগণ আরবীতে নির্ভরযোগ্য, প্রামাণ্য ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন।
১.৪.৭.২. ‘হাসান’ বা সুন্দর বা গ্রহণযোগ্য হাদীস
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় হাসান হাদীসেও উপরোক্ত ৫টি শর্তের বিদ্যমানতা অপরিহার্য্। তবে দ্বিতীয় শর্তের মধ্যে যদি সামান্যতম দূর্বলতা দেখা যায় তবে হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলা হয়। অর্থাৎ হাদীসের সনদের রাবীগণ ব্যক্তিগতভাবে সৎ, প্রত্যেকে হাদীসটি উর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে শুনেছেন বলে প্রমাণিত, হাদীসটির মধ্যে ‘শুযূয’ বা ‘ইল্লাত’ নেই। তবে সনদের কোনো রাবীর নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা বা ‘যাবত’ কিছুটা দুর্বল বলে বুঝা যায়। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। এইরূপ ‘রাবী’র বর্ণিত হাদীস ‘হাসান’ বলে গণ্য।(ইরাকী, আত-তাকয়ীদ, পৃ. ৪৫-৬১; ফাতহুল মুগীস, পৃ.৩২-৪৮; সাখাবী, ফাতহুল মুগীস ১/৭৬-১১০; সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/১৫৩-১৭৮; মাহমূদ তাহহান, তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস, পৃ. ৪৫-৫০)।
পরিভাষার বিস্তারিত ব্যাখ্যা অপ্রাসঙ্গিক। তবে আমরা সাধারণ পাঠকদের জন্য বলতে পারি যে, যে পর্যায়ের প্রমাণাদির ভিত্তিতে একজন বিচারক খুনের অভিযোগে অভিযুক্তকে বিস্তারিত শাস্তি দেন, কিন্তু মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন শাস্তি প্রদান করেননা, সেই পর্যায়ের প্রমাণাদির ভিত্তিতে মুহাদ্দিসগণ একটি হাদীসকে ‘হাসান’ বলে গণ্য করেন। যে সকল বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীস ‘হাসান’ বা গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বুঝাতে মুহাদ্দিসগণ আরবীতে সত্যপরায়ণ, অসুবিধা নেই, চলনসই ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন।
১.৪.৭.৩. ‘যয়ীফ’ বা দুর্বল হাদীস
যে ‘হাদীসের’ মধ্যে হাসান হাদীসের শর্তগুলির মধ্যে কোনো একটি অবিদ্যমান থাকে, মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় তাকে ‘যয়ীফ’ হাদীস বলা হয়। অর্থাৎ রাবীর বিশ্বস্ততার ঘাটতি, তাঁর বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণনা বা স্মৃতির ঘাটতি, সনদের মধ্যে কোনো একজন রাবী বা তাঁর উর্ধ্বতন রাবী থেকে থেকে সরাসরি বা স্বকর্ণে হাদীসটি শুনেননি বলে প্রমাণিত হওয়া বা দৃঢ় সন্দেহ হওয়া, হাদীসটির মধ্যে ‘শুযূয’ বা ‘ইল্লাত’ বিদ্যমান থাকা…..ইত্যাদি যে কোনো একটি বিষয় কোনো হাদীসে বিদ্যমান থাকলে হাদীসটি ‘যয়ীফ’ বলে গণ্য।(ইরাকী, আত তাকয়ীদ, পৃ.৬২; ফাতহুর মুগীস পৃ.৪৯; সাখাবী, ফাতহুল মুগীস ১/১১১; সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/১৭৯; মাহমুদ তাহহান, তাইসীরু মুসতালাহ, পৃ. ৬২-৬৩)।
শর্ত পাঁচটির ভিত্তিতে যয়ীফ হাদীসকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন মুহাদ্দিসগণ। সেগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা অপ্রাসঙ্গিক। তবে আমরা বুঝতে পারি যে, কোনো হাদীসকে যয়ীফ বলে গণ্য করার অর্থ হলো, হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। বর্ণনাকারীদের দুর্বলতা বুঝাতে মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমনঃ দুর্বল, কিছুই নয়, মূল্যহীন, অজ্ঞাত পরিচয়, জঘন্য উল্টাপাল্টা হাদীস বর্ণনাকারী, পরিত্যক্ত, মিথ্যাবাদী ইত্যাদি।
‘যয়ীফ’ বা দুর্বল হাদীসের দুর্বলতার তিনটি পর্যায় রয়েছে।
১.৪.৭.৩.১. কিছুটা দুর্বল
বর্ণনাকারী ভুল বলেছেন বলেই প্রতীয়মান হয়, কারণ তিনি যতগুলো হাদীস বলেছেন তার মধ্যে বেশ কিছু ভুল রয়েছে। তবে তিনি ইচ্ছাকৃত ভুল বলতেননা বলেই প্রমাণিত। এরূপ ‘যয়ীফ’ হাদীস যদি অন্য এক বা একাধিক পর্যায়ের কিছুটা যয়ীফ সূত্রে প্রমাণিত হয় তাহলে তা হাসান বা গ্রহণযোগ্য হাদীস বলে গণ্য হয়।
১.৪.৭.৩.২. অত্যন্ত দুর্বল(যায়ীফ জিদ্দান, ওয়াহী)
এইরূপ হাদীসের বর্ণনাকারীর সকল হাদীস তুলনামূলক নিরীক্ষা করে যদি প্রমাণিত হয় যে, তাঁর বর্ণিত অধিকাংশ বা সকল হাদীসই অগণিত ভুলে ভরা, যে ধরনের ভুল সাধারণত অনিচ্ছাকৃতভাবে হয় তার চেয়েও মারাত্মক ভুল, তবে তার বর্ণিত হাদীস পরিত্যক্ত, একেবারে অগ্রহণযোগ্য বা অত্যন্ত দুর্বল বলে গণ্য করা হবে। এরূপ দুর্বল হাদীস অনুরূপ অন্য দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হলেও তা গ্রহণযোগ্য হয়না।
১.৪.৭.৩.৩. মাউযূ বা বানোয়াট হাদীস
যদি প্রমাণিত হয় যে, এরূপ দুর্বল হাদীস বর্ণনাকারী ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে সমাজে প্রচার করতেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে হাদীসের সূত্র(সনদ) বা মূল বাক্যের মধ্যে কম বেশি করতেন, তবে তার বর্ণিত হাদীসকে ‘মাউযূ’ বা বানোয়াট হাদীস বলে গণ্য করা হয়। বানোয়াট হাদীস জঘন্যতম দুর্বল হাদীস।(বিস্তারিত দেখুনঃ হাকিম নাইসাপুরী(৪০৫ হি), মারি’ফাতু উলুমিল হাদীস, পৃ. ১৪-১৭. ৩৬-৪০, ৫২-৬২, ১১২-১৫১, আল ইরাকী, ফাতহুল মুগীস, পৃ. ৭-৫১, ১৩৮-১৭৮, আত তাকয়ীদ ওয়াল ইদাহ, পৃ.২৩-৬৩, ১৩৩-১৫৭, ৪২০-৪২১, ড. মাহমুদ তাহহান, তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস, পৃ. ৩৩-১২৫, ১৪৪-১৫৫)।
১.৪.৮. গ্রন্থাকারে হাদীস সংকলন ও সংরক্ষণ
জালিয়াতি ও মিথ্যা থেকে হাদীসকে হেফাজতের জন্য মুহাদ্দিসগণের অন্যতম কর্ম ছিল গ্রন্থাকারে সনদসহ সকল হাদীস সংকলন করা। আমরা দেখেছি যে, তাবিয়ীগণের যুগ বা প্রথম হিজরী শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই শিক্ষা, মুখস্ত ও শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে হাদীস লিখে রাখার প্রচলন ছিল। তবে নির্দিষ্ট নিয়মে গ্রন্থাকারে হাদীস সংকলন শুরু হয় দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকে। তৃতীয় হিজরী শতকে এই কর্ম পূর্ণতা লাভ করে। পরবর্তী দুই শতাব্দীতেও সনদসহ হাদীস সংকলনের ধারা চালু থাকে এবং কিছু গ্রন্থ সংকলিত হয়। প্রত্যেক যুগের মুহাদ্দিসগণ পূর্ববর্তীযুগের মুহাদ্দিসগণের সংকলিত হাদীসগুলি সনদসহ সংকলিত করেন। এছাড়া তাঁরা মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র সফর ও হাদীস সংগ্রহ অভিযান চালিয়ে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কথিত সকল হাদীস সংগ্রহ ও সনদ সহ সংকলিত করেন। বিভিন্ন পদ্ধতিতে এসকল গ্রন্থ সংকলিত হয়ঃ
১. সনদসহ প্রচলিত সকল হাদীস সংকলন করা।
২. শুধুমাত্র বিশুদ্ধ বা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হাদীস সংকলন করা।
৩. বর্ণনাকারীদের বিবরণসহ তাঁদের বর্ণিত হাদীস সংকলন করা।
৪. শুধুমাত্র অনির্ভরযোগ্য বা বানোয়াট হাদীস সংকলন করা।
দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় ৪ শতাব্দী পর্য্ন্ত হাদীস সংকলনের যে ধারা চালু থাকে এর প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কথিত ও প্রচারিত সকল হাদীস সংকলিত করা। যাতে মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ নিরীক্ষাভিত্তিক বিধানের আলোকে এগুলির মধ্য থেকে বিশুদ্ধ ও নির্ভুল হাদীস বেছে নিতে পারেন। অনেকে বর্ণনাকারী রাবী বা বর্ণনাকারী সাহাবীর নামের ভিত্তিতে হাদীস সংকলিত করতেন। সবারই মূল উদ্দেশ্য ছিল হাদীস নামে প্রচলিত সব কিছু সংকলিত করা।
এজন্য আমরা দেখতে পাই যে, অধিকাংশ হাদীস গ্রন্থে সহীহ, যয়ীফ, মাউযূ সকল প্রকারের হাদীস সংকলিত হয়েছে। এখানে অজ্ঞতার কারণে অনেকে ভুল ধারণায় পড়েন। উপরের পরিচ্ছেদগুলিতে আলোচিত সাহাবী ও পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসদের হাদীস বিচার, সনদ যাচাই, নিরীক্ষা ইত্যাদি থেকে অনেকে মনে করেন যে, মুহাদ্দিসদের এসকল বিচার ও নিরীক্ষার মাধ্যমে যাদের ভুল বা মিথ্যা ধরা পড়েছে তাদের হাদীসতো তারা গ্রহণ করেনন এবং সংকলনও করেননি। কাজেই কোনো হাদীসের গ্রন্থে হাদীস সংকলনের অর্থই হলো এসকল হাদীস নিরীক্ষার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়েছে বলেই উক্ত মুহাদ্দিস হাদীসগুলিকে তাঁর গ্রন্থে সংকলিত করেছেন।
এই ধারণাটি একেবারেই অজ্ঞতাপ্রসূত এবং প্রকৃত অবস্থার একেবারেই বিপরীত। কয়েকজন সংকলক বাদে কোনো সংকলকই শুধুমাত্র বিশুদ্ধ বা নির্ভরযোগ্য হাদীস সংকলনের উদ্দেশ্যে গ্রন্থ রচনা করেননি। অধিকাংশ মুহাদ্দিস, মুফাসসির, আলিম ও ইমাম হাদীস সংকলন করেছেন সহীহ, যয়ীফ বা বানোয়াট সকল প্রকার হাদীস সনদসহ একত্রিত করার উদ্দেশ্যে; যেন রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কথিত বা প্রচারিত সবকিছুই সংরক্ষিত হয়। তাঁরা কোনো হাদীসই রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বা কাজ হিসেবে সরাসরি বর্ণনা করেননি। বরং সনদসহ, কে তাদেরকে হাদীসটি কার সূত্রে বর্ণনা করেছেন তা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা মূলত বলেছেন, “অমুক ব্যক্তি বলেছেন যে, ‘এই কথাটি হাদীস’, আমি তা সনদসহ সংকলিত করলাম।” হাদীস প্রেমিক পাঠকগণ এবার সহীহ, যয়ীফ ও বানোয়াট হাদীস বেছে নিন। এ সকল সংকলকের কেউ কেউ আবার হাদীস বর্ণনার সাথে সাথে তার সনদের আলোচনা করেছেন। এ সকল সংকলকের কেউ কেউ আবার হাদীস বর্ণনার সাথে সাথে তা সনদের আলোচনা করেছেন এবং দুর্বলতা বা সবলতা বর্ণনা করেছেন।
অল্প কয়েকজন সংকলক শুধু সহীহ হাদীস সংকলনের চেষ্টা করেন। এদের মধ্যে তৃতীয় শতকের প্রসিদ্ধতম মুহাদ্দিস ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল আল বুখারী(২৫৬ হি) ও ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল কুশাইরী(২৬১ হি)অন্যতম। তাঁদের পরে আবদুল্লাহ ইবনু আলী ইবনুল জারূদ(৩০৭ হি), মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক ইবনু খুযাইমা(৩১১ হি), আহমদ ইবনু মুহাম্মাদ, ইবনুশ শারকী(৩২৫ হি), কাসিম ইবনু ইউসুফ আল বাইয়ানী(৩৪০ হি), সাঈদ ইবনু উসমান, ইবনুস সাকান(৩৫৩ হি), আবু হাতিম মুহাম্মাদ ইবনু হিব্বান আল বুসতি(৩৫৪ হি), আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ হাকিম নাইসাপূরী(৪০৫হি), যিয়াউদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহিদ আল মাকদিসী(৬৪৩ হি) প্রমুখ মুহাদ্দিস শুধুমাত্র সহীহ হাদীস সংকলনের চেষ্টা করে ‘সহীহ’ গ্রন্থ রচনা করেছেন। (কাত্তানী, আর-রিসালাতুল মুসতাতরাফা, পৃ.২০-২৬)।
কিন্তু পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসগণের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে শুধুমাত্র বুখারী ও মুসলিমের গ্রন্থদ্বয়ের সকল হাদীস সহীহ বলে প্রমাণিত হয়েছে। বাকী কোনো গ্রন্থেরই সকল হাদীস সহীহ বলে প্রমাণিত হয়নি। বরং কোনো কোনো গ্রন্থে যয়ীফ, বাতিল ও মিথ্যা হাদীস সংকলিত হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।
দ্বাদশ হিজরী শতকের অন্যতম আলিম হযরত ইমাম শাহ ওয়ালীওল্লাহ দেহলভী(১১৭৬ হি/১৭৬২ খ্রী.) হাদীসের গ্রন্থগুলিকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। প্রথম পর্যায়ে রয়েছে তিনখানা গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও মুয়াত্তা ইমাম মালিক। এই তিনখানা গ্রন্থের সকল সনদসহ বর্ণিত হাদীসই গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে সে সকল গ্রন্থ যেগুলির হাদীস মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হলেও সেগুলোতে কিছু অনির্ভরযোগ্য হাদীসও রয়েছে। মোটামুটিভাবে মুসলিম উম্মাহ এ সকল গ্রন্থকে গ্রহণ করেছেন এবং তাদের মধ্যে এগুলি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এই পর্যায়ে রয়েছে তিনটি গ্রন্থঃ সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে তিরমিযী। ইমামা আহমাদ এর মুসনাদ ও প্রায় একই পর্যায়ের।
তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে ঐ সকল গ্রন্থ যা ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম প্রমুখ মুহাদ্দিস এর আগের বা পরের যুগে সংকলিত হয়েছে, কিন্তু তার মধ্যে বিশুদ্ধ, দুর্বল, মিথ্যা, ভুল সব ধরনের হাদীসই রয়েছে, যার ফলে বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিস ভিন্ন এ সকল গ্রন্থ হতে লাভবান হওয়া সম্ভব নয়। এ সকল গ্রন্থ মুহাদ্দিসদের মধ্যে তেমন প্রসিদ্ধি লাভ করেনি। এই পর্যায়ে রয়েছেঃ মুসনাদে আবী ইয়ালা, মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, মুসান্নাফে ইবনু আবী শাইবা, মুসনাদে আবদ ইবনু হুমাইদ, মুসনাদে তায়ালিসী, ইমাম বাইহাকীর সংকলিত হাদীস গ্রন্থসমূহ(সুনানে কুবরা, দালাইলুন নবুওয়্যাত, শুয়াবুল ঈমান, …………ইত্যাদি), ইমাম তাহাবীর সংকলিত হাদীস গ্রন্থসমূহ(শারহ মায়ানাল আসার, শারহ মুশকিলিল আসার,….ইত্যাদি), তাবারানীর সংকলিত হাদীস গ্রন্থসমূহ(আল মু’জামুল কবীর, আল মু’জামুল আওসাত, আল মু’জামুস সাগীর,……..ইত্যাদি)। এ সকল গ্রন্থের সংকলকদের উদ্দেশ্য ছিল যা পেয়েছেন তাই সংকলন করা। তাঁরা নিরীক্ষা ও যাচাইয়ের দিকে মন দেননি।
চতূর্থ পর্যায়ের গ্রন্থগুলি হলো ঐ সকল গ্রন্থ যা কয়েক যুগ পরে সংকলিত হয়। এ সকল গ্রণ্থের সংকলকরা মূলত নিম্ন পর্যায়ের হাদীস সংকলন করেছেনঃ (১) যে সকল হাদীস পূর্ব যুগে অপরিচিত বা অজানা থাকার কারণে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে সংকলিত হয়নি, (২) যে সকল হাদীস কোনো অপরিচিত গ্রন্থে সংকলিত ছিল, (৩)লোকমুখে প্রচলিত বা ওয়াযেদের ওয়াযে প্রচারিত বিভিন্ন কথা, যা কোনো হাদীসের গ্রন্থে স্থান দেয়নি, (৪) বিভিন্ন দুর্বল ও বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত কথাবার্তা, (৫)যে সকল ‘হাদীস’ মূলত সাহাবী বা তাবেয়ীদের কথা, ইহুদীদের গল্প বা পূর্ববর্তী যামানার জ্ঞানী ব্যক্তিদের কথা, সেগুলিকে ভুলক্রমে বা ইচ্ছাপূর্বক কোনো বর্ণনাকারী হাদীস বলে বর্ণনা করেছেন, (৬)কুরআন বা হাদীসের ব্যাখ্যা জাতীয় কথা যা ভুলক্রমে কোনো সৎ বা দরবেশ মানুষ হাদীস বলে বর্ণনা করেছেন, (৭) হাদীস থেকে উপলব্ধিকৃত অর্থকে কেউ কেউ ইচ্ছাপূর্বক হাদীস বলে চালিয়ে দিয়েছেন, অথবা (৮) বিভিন্ন সনদে বর্ণিত বিভিন্ন হাদীসের বাক্যকে একটি হাদীস বলে বর্ণনা করেছেন। এ ধরনের হাদীসের সংকলন গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ ইবনে হিব্বানের আদ দুয়াফা, ইবনে আদীর আল কামিল, খতীব বাগদাদী, আবু নুয়াইম আল আসফাহানী, ইবনে আসাকের, ইবনুন নাজ্জার ও দাইলামী কর্তৃক সংকলিত গ্রন্থসমূহ। খাওয়ারিজমী কর্তৃক সংকলিত মুসনাদ ইমাম আবু হানীফাও প্রায় এই পর্যায়ে পড়ে। এ পর্যায়ের গ্রন্থসমূহের হাদীস হয় দুর্বল বা বানোয়াট।
পঞ্চম পর্যায়ের গ্রন্থসমূহে ঐ সকল হাদীস রয়েছে যা ফকীহগণ, সূফীগণ বা ঐতিহাসিকগণের মধ্যে প্রচলিত ও তাঁদের লেখা বইয়ে পাওয়া যায়। যে সকল হাদীসের কোনো অস্তিত্ব পূর্বের চার পর্যায়ের গ্রন্থে পাওয়া যায়না। এসব হাদীসের মধ্যে এমন হাদীসও রয়েছে যা কোনো ধর্মচ্যূত ভাষাজ্ঞানী পন্ডিত পাপাচারী মানুষ তৈরি করেছেন। তিনি তার বানোয়াট হাদীসের জন্য এমন সনদ তৈরি করেছেন যার ত্রুটি ধরা দুঃসাধ্য, আর তার বানোয়াট হাদীসের কথাও এমন সুন্দর যে রাসূলুল্লাহ(স)এর কথা বলে সহজেই বিশ্বাস হবে। এ সকল বানোয়াট হাদীস ইসলামের মধ্যে সুদূরপ্রসারী বিপদ ও ফিতনা সৃষ্টি করেছে। তবে হাদীস শাস্ত্রে সুগভীর পান্ডিত্যের অধিকারী বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ হাদীসের ভাষা ও সূত্রের(সনদের) তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে তার ত্রুটি খুঁজে বের করতে সক্ষম হন।
শাহ ওয়ালউল্লাহ(রাহ) বলেনঃ প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের হাদীস গ্রন্থের উপরই শুধু মুহাদ্দিসগণ নির্ভর করেছেন। তৃতীয় পর্যায়ের হাদীস গ্রন্থসমূহ থেকে হাদীস শাস্ত্রে সুগভীর পান্ডিত্যের অধিকারী ইলমুর রিজাল ও ইলাল শাস্ত্রে পন্ডিত বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ ছাড়া কেউ উপকৃত হতে পারেননা, কারণ এ সকল গ্রন্থে সংকলিত হাদীসসমূহের মধ্য হতে মিথ্যা হাদীস ও নির্ভরযোগ্য হাদীসের পার্থক্য শুধু তাঁরাই করতে পারেন। আর চতুর্থ পর্যায়ের হাদীসগ্রন্থসমূহ সংকলন করা বা পাঠ করা এক ধরনের জ্ঞান বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়। সত্য বলতে, রাফেযী, মুতাযিলী ও অন্যান্য সকল বিদ’আতী ও বাতিল মতের মানুষেরা খুব সহজেই এ সকল গ্রন্থ থেকে তাদের মতের পক্ষে বিভিন্ন হাদীস বের করে নিতে পারবেন। কাজেই, এ সকল গ্রন্থের হাদীস দিয়ে কোনো মত প্রতিষ্ঠা করা বা কোনো মতের পক্ষে দলীল দেওয়া আলেমদের নিকট বাতুলতা ও অগ্রহণযোগ্য। (শাহ ওয়ালীওল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ১/৩৮৫-৩৯১)।
এখানে উল্লেখ্য যে, হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় এবং সহীহ হাদীসকে দুর্বল ও মাউযূ হাদীস থেকে পৃথক করার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণের দৃঢ়তা ছিল আপোষহীন ও অনমনীয়। দুনিয়ার বুকে কোনো যুগে কোনো ইমাম, মুহাদ্দিস, ফকীহ বা আলিম কখনো বলেননি যে, কোনো হাদীসের গ্রন্থে একটি হাদীস বর্ণিত থাকলেই হাদীসকে সহীহ বলা যাবে। অমুক আলিম যেহেতু হাদীসটি সংকলন করেছেন, কাজেই হাদীসটি হয়তো সহীহ হবে।
তেমনিভাবে সংকলক যত মর্যাদাসম্পন্নই হোক, তাঁর সংকলিত কোনো হাদীসের মধ্যে দুর্বলতা বা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার সম্ভাবনা থাকলে তা স্পষ্টরূপে বলতে কোনো দ্বিধাই তাঁরা কখনোই করেননি। হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষাকে তাঁরা সকল ব্যক্তিগত ভালবাসা ও শ্রদ্ধার উপরে স্থান দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসের নামে সকল মিথ্যা ও ভুল চিহ্নিত করে বিশুদ্ধ হাদীসকে ভুল ও মিথ্যা ‘হাদীস’ থেকে পৃথক রাখার এই প্রবল দৃঢ়তার কারণেই মুহাদ্দিসগণ কখনোই কারো দাবী বিনা যাচাইয়ে মেনে নেননি। তাঁরা কখনোই মনে করেননি যে, অমুক মহান ব্যক্তিত্ব যেহেতু হাদীসটিকে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন, সেহেতু তাঁর মতামত বিনা যাচাইয়ে মেনে নেওয়া উচিত।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম সহ উপরের সকল ‘সহীহ’ হাদীসের গ্রন্থে সংকলিত প্রতিটি হাদীসের সনদ পরবর্তী কয়েক শতাব্দী যাবৎ মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নিরীক্ষা পদ্ধতিতে বিচার ও যাচাই করেছেন। এই বিচারের মাধ্যমেই তাঁরা ঘোষণা দিয়েছেন যে, বুখারী ও মুসলিম তাঁদের লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে সংকলিত সকল হাদীস ‘সহীহ’ বলে মেনে নেওয়ার কারণ এই নয় যে, ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম হাদীসগুলিকে সহীহ বলেছেন, তাঁদের ব্যক্তিগত মর্যাদা এখানে একেবারেই মূল্যহীন। প্রকৃত বিষয় হলো, তাঁরা হাদীসগুলিকে সহীহ বলে দাবি করেছেন এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে মুহাদ্দিসগণ তাঁদের সংকলিত হাদীসগুলির সনদ যাচাই করেছেন এবং তাঁদের দাবীর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।
অন্য আরো লেখক শুধুমাত্র সহীহ বা সহীহ ও হাসান হাদীস সংকলনের উদ্দেশ্যে গ্রন্থ রচনা করেছেন। কেউ কেউ সহীহ ও যয়ীফ হাদীস সংকলন করবেন ও জাল ও মাঊদু হাদীস বাদ দিবেন বলে ঘোষণা করেছেন। পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসগণ তাঁদের দাবি কখনোই বিনা যাচাইয়ে মেনে নেননি। বরং তাঁদের সংকলিত সকল হাদীস যাচাই করে তাঁদের গ্রন্থাবলীর বিষয়ে বিধান প্রদান করেছেন। এ সকল যাচাইয় দেখা গিয়েছে যে, অধিকাংশ লেখক ও সংকলকই তাঁদের ঘোষণা ও সংকল্প পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কারো দাবিই মুহাদ্দিসগণ বিনা যাচাইয়ে গ্রহণ করেননি।
১.৪.৯. গ্রন্থাকারে রাবীগণের পরিচয় সংরক্ষণ
উপরের আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাই যে, দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দী হতে মুহাদ্দিসগণ সনদসহ সকল হাদীস সংকলন করেন, যেন সনদ পর্যালোচনা করে বিশুদ্ধ হাদীসকে মিথ্যা বা ভুল থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায়।
দ্বিতীয় হিজরী শতক হতে মুহাদ্দিসগণ হাদীস সংকলনের পাশাপাশি রাবীগণের গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ক তথ্যাবলী গ্রন্থাকারে সংকলন করতে থাকেন; যেন এ সকল তথ্যের আলোকে হাদীসগ্রন্থগুলিতে সংকলিত হাদীসগুলির সনদ বিচার করা যায়। এই জাতীয় গ্রন্থ প্রণয়নেও ক্রম বিবর্তন ঘটে।
২য় হিজরী শতকের মাঝামাঝি থেকে মুহাদ্দিসগণে প্রথমে নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য সকল বর্ণনাকারীর বিবরণ একত্রে সংকলন করতে শুরু করেন। ইমাম লাইস ইবুন সা’দ(১৭৫ হি), আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক(১৮১ হি) প্রমুখ মুহাদ্দিস দ্বিতীয় হিজরীর মাঝামাঝি হতে এই জাতীয় গ্রন্থ প্রণয়ন শুরু করেন। এ সকল গ্রন্থে নির্ভরযোগ্য, অনির্ভরযোগ্য সকল রাবীর জীবনী, তাদের বর্ণিত কিছু হাদীস ও তাদের বর্ণিত হাদীসের নিরীক্ষার ভিত্তিতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বা অগ্রহণযোগ্যতা বিষয়ক বিধান সংকলিত হয়েছে। পরবর্তী শতকগুলোতে এ জাতীয় গ্রন্থ রচনার ধারা অব্যাহত থাকে। তৃতীয় হিজরী শতকে আহমাদ ইবনু হাম্বাল, আলী ইবনুল মাদানী, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, ও পরবর্তী যুগের অগণিত মুহাদ্দিস এই জাতীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন।
দ্বিতীয় পর্যায়ের মুহাদ্দিসগণ শুধুমাত্র মুহাদ্দিসগণ ও মিথ্যাবাদী রাবীদের বিষয়ে পৃথক গ্রন্থ রচনা শুরু করেন। দ্বিতীয় শতকের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল কাত্তান(১৯৮ হি) সর্বপ্রথম ‘আদ-দুআফা’ নামে এই জাতীয় গ্রন্থ রচনা শুরু করেন। পরবর্তী শতকগুলোতে এ জাতীয় গ্রন্থ রচনার ধারা অব্যাহত থাকে। এ সকল গ্রন্থে দুর্বল ও মিথ্যাবাদী রাবীগণ, তাদের বর্ণিত কিছু হাদীস ও তাদের বিষয়ে ইমামদের মতামত সংকলন করা হয়েছে। এগুলির পাশাপাশি তৃতীয় হিজরী শতক থেকে কোনো কোনো মুহাদ্দিস শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত রাবীদের বিষয়ে পৃথক গ্রন্থ রচনা শুরু করেন।
বস্তুত, রাবীগণের বিবরণ সংগ্রহ ও সংকলন মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণের একটি অতুলনীয় কর্ম। প্রথম হিজরী শতাব্দী থেকে পরবর্তী ৬০০ বৎসর যাবত মুহাদ্দিসগণ মুসলিম দেশের প্রতিটি জনপদ ঘুরে ঘুরে প্রত্যেক রাবীর নাম, বংশ, জন্ম, মৃত্যু, শিক্ষা, কর্ম, শিক্ষক, ছাত্র ইত্যাদি ব্যক্তিগত সকল তথ্যসহ তাঁর বর্ণিত হাদীসের নিরীক্ষা ও নিরীক্ষার ভিত্তিতে তার সম্পর্কে তার সমসাময়িক ও পরবর্তী মুহাদ্দিসগণের মতামত ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে সংরক্ষণ করেছেন। হাদীসে রাসূলকে বিকৃতি ও জালিয়াতি থেকে সংরক্ষণ করার জন্য তাঁরা এভাবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের তথ্য সংরক্ষণ করছেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এর কোনো নযির নেই। এ সকল তথ্যের ভিত্তিতে যে কোনো যুগে যে কোনো গবেষক যে কোনো হাদীসের সনদ বিচার ও নিরীক্ষা করতে সক্ষম হন।
১.৪.১০. জাল হাদীস গ্রন্থাকারে সংরক্ষণ
১.৪.১০.১. মিথ্যাবাদী রাবীদের পরিচয় ভিত্তিক গ্রন্থ রচনা
হাদীসের নামে মিথ্যা চিহ্নিত করার জন্য অন্যতম পদক্ষেপ ছিল মিথ্যাবাদীদের জালিয়াতি পৃথকভাবে সংকলন করা।এক্ষেত্রে প্রথম পদ্ধতি ছিল দুর্বল ও মিথ্যাবাদী বর্ণনাকারীদের বিষয়ে সংকলিত গ্রন্থগুলি।
ইসলামের প্রথম শতাব্দীগুলো ছিল ইসলামী জ্ঞান ও বিশেষত হাদীস চর্চার স্বর্ণযুগ। হাজার হাজার শিক্ষার্থী হাদীস শিক্ষা করতেন। শত শত মহাদ্দিস, ইমাম সমাজে বিদ্যমান। সবাই সনদসহ হাদীস শুনতেন ও শেখাতেন। সনদের মধ্যে উল্লেখিত কোনো ব্যক্তির পরিচয় জানা না থাকলে জেনে নিতেন। সেই যুগে মিথ্যাবাদী রাবীদের নাম ও পরিচয় জানা থাকলেই তাদের মিথ্যা ও জালিয়াতি থেকে আত্মরক্ষা করা সম্ভব ছিল। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ হিজরী শতাব্দীতে সংকলিত অনেক হাদীস গ্রন্থই বিষয়ভিত্তিক না সাজিয়ে বর্ণনাকারী রাবী বা সাহাবীগণের নামের ভিত্তিতে সাজানো হতো। কারণ রাবীর ভিত্তিতেই হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা। এছাড়া সবাই সকল হাদীস পড়তেন। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট বিষয়ের হাদীস পড়ার প্রবণতা তখন ছিলনা।
এজন্য আমরা দেখতে পাই যে, দ্বিতীয় হিজরী ৬ষ্ঠ হিজরী পর্য্ন্ত ৪ শতাব্দী যাবৎ হাদীসের নামে প্রচারিত ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে অন্যতম কর্ম ছিল দুর্বল ও মিথ্যাবাদী রাবীদের বিষয়ে পৃথক গ্রন্থ রচনা করা। এ সকল গ্রন্থে এ সকল রাবীদের নাম, পরিচয়, তাদের বর্ণিত কিছু ভুল বা মিথ্যা হাদীস, তাদের বিষয়ে মুহাদ্দিসগণের তুলনামূলক নিরীক্ষার ফলাফল ও মতামত সংকলিত করা হতো।
১.৪.১০.২. মিথ্যা বা জাল হাদীস সংকলন
৬ষ্ঠ হিজরী শতক পর্য্ন্ত এই জাতীয় গ্রন্থগুলিই ছিল হাদীসের নামে, মিথ্যাচারী ও তাদের মিথ্যাচার সম্পর্কে জানার প্রধান উৎস। ৬ষ্ঠ শতকের পরও এই জাতীয় গ্রন্থ রচনা অব্যাহত থাকে। তবে জাল হাদীস চিহ্নিত করণ প্রক্রিয়ায় নতুন ধারার সৃষ্টি হয়।
কালের আবর্তনে হাদীস চর্চাসহ জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে মুসলিস উম্মাহর মধ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়। বর্ণনাকারীদের পরিচয় জানার আগ্রহ কমতে থাকে। স্বল্প সময়ে ও স্বল্প চেষ্টায় যে কোনো জিনিস শিখে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। রাবীদের নামের ভিত্তিতে সংকলিত গ্রন্থ থেকে মিথ্যা হাদীস জেনে নেওয়ার সময় ও আগ্রহ হ্রাস পায়। এজন্য মুহাদ্দিসগণ বিষয়ভিত্তিক জাল ও বানোয়াট হাদীস সংকলন শুরু করেন যেন পাঠক সহজেই কোনো বিষয়ে কোনো হাদীস জাল কিনা তা জেনে নিতে পারেন। ৫ম হিজরী শতক থেকে এই জাতীয় গ্রন্থ প্রণয়ন শুরু হয়। ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে ইবনুল জাউযীর কর্মের মাধ্যমে এই ধারা বিশেষভাবে গতিলাভ করে। বর্তমান যুগ পর্য্ন্ত তা অব্যাহত আছে। প্রথম দিকে মুহাদ্দিসগণ এ সকল মাঊদূ হাদীস সনদ সহকারে উল্লেখ করে সনদ আলোচনার মাধ্যমে এগুলির মিথ্যাচার প্রমাণ করতেন। পরবর্তী সময়ে সনদ উল্লেখ ব্যতিরেকে শুধুমাত্র বানোয়াট হাদীসগুলি একত্রে সংকলন করা হয়।
এ সকল গ্রন্থের মধ্যে কিছু বিষয়ভিত্তিক বিন্যস্ত। কিছু গ্রন্থে হাদীসের প্রথম অক্ষর অনুসারে(Alphabetacilly) সাজানো হয়। অধিকাংশ মুহাদ্দিস শুধুমাত্র মাঊযূ হাদীস একত্রিত করেন।কোনো কোনো মুহাদ্দিস সমাজে প্রচলিত হাদীস সমূহ একত্রিত করে সেগুলোর মধ্যে কোনটি সহীহ ও কোনটি বানোয়াট তা বর্ণনা করেন। কেউ কেউ বানোয়াট হাদীস ছাড়াও দুর্বল হাদীস ও সংকলিত করেছেন। বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই বিষয়ে গত ৯ শতাব্দীতে অর্ধশতাধিক গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এখানে এই জাতীয় প্রধান গ্রন্থগুলি ও লেখকদের নাম উল্লেখ করছি।
১. আল মাউদূআত, আবু সাঈদ মুহাম্মাদ ইবুন আলী আন-নাক্কাশ(৪১৪ হি)।
২. যাখীরাতুল হুফফায, মুহাম্মাদ ইবনু তাহির ইবনুল কাইসুরানী(৫০৭ হি)।
৩. আল-আবাতীল ওয়াল মানাকীর, হুসাইন ইবনু ইবরাহীম আল-জূযকানী(৫৪৩ হি)।
৪. কিতাবুল কুসসাল ওয়াল মুযাককিরীন, আবুল ফারাজ আব্দুর রাহমান ইবনু আলী, ইবনুল জাউযী(৫৯৭ হি)।
৫. আল-মাউদূআত, আবুল ফারাজ, ইবনুল জাউযী(৫৯৭ হি)।
৬. আল ইলালুল মুতানাহিয়া, আবুল ফারাজ ইবনুল জাউযী(৫৯৭ হি)।
৭. আল আহাদীসুল মাউদূআহ ফীল আহকামিল মাশরূআ, আবু হাফস উমার ইবনু বাদর আল মাউসিলী(৬২২ হি)।
৮. আল মুগনী আন হিফযিল কিতাব, উমার আল মাউসিলী(৬২২ হি)।
৯. আল উকূফ আলাল মাউকূফ, উমার আল মাউসিলী(৬২২ হি)।
১০. আল-মাঊদূআত, হাসান ইবনু মুহাম্মাদ আস-সাগানী(৬৫০ হি)।
১১. আদ-দুররুল মুলতাকিত, আস-সাগানী(৬৫০ হি)।
১২. আহাদীসুল কুসসাস, আহমাদ ইবুন আব্দুল হালীম, ইবনু তাইমিয়া(৭২৮ হি)।
১৩. মুখতারাসুল আবাতীল, মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ যাহাবী(৭৪৮ হি)।
১৪. তারতীবু মাউদূআতি ইবনিল যাওযী, যাহাবী(৭৪৮ হি)।
১৫. আল মাঊদূআত ফিল মাসাবীহ, উমার ইবনু আলী আল কাযবীনী(৭৫০ হি)।
১৬. আল-মানারুল মুনীফ, ইবনু কাইয়িম আল জাউযিয়্যাহ(৭৫১ হি)।
১৭. আল আহাদীস আল্লাতী লা আসলা লাহা ফিল এহইয়া, আব্দুল ওয়াহাব ইবনু আলী আস-সুবকী(৭৭১ হি)।
১৮. আত-তাযকিরা ফিল আহাদীসিল মুশতাহিরা, মুহাম্মাদ ইবনু বাহাদুর আয-যারকাশী(৭৯৪ হি)।
১৯. তাবঈনুল আজাব ফী মা ওরাদা ফী শাহরী রাজাব, ইবনু হাজর আসকালানী আহমাদ ইবনু আলী(৮৫২ হি)।
২০. আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুর রাহমান সাখাবী(৯০২ হি)।
২১. আল-লাআলী আল-মাসনূআহ, জালালুদ্দীন আব্দুর রাহমান সুয়ূতী(৯১১ হি)।
২২. আত-তাআক্কুবাত আলাল মাউদূআত, সুয়ূতী(৯১১ হি)।
২৩. আদ-দুরারুল মুনতাশিরাহ, সুয়ূতী(৯১১ হি)।
২৪. তাহযীরুল খাওয়াস মিন আহাদীসিল কুসসাস, সুয়ূতী(৯১১ হি)।
২৫. আল গাম্মায আলাল লাম্মায, আলী ইবনু আব্দুল্লাহ আস-সামহুদী(৯১১ হি)।
২৬. তাময়ীযূত তাইয়ীবি মিনাল খাবিস, আব্দুর রাহমান আয যাবীদী(৯৪৪ হি)।
২৭. আশ-শাযারাহ ফীল আহাদীসিল, মুশতাহিরাহ, মুহাম্মাদ ইবনু আলী আদ-দিমাশকী(৯৫৩ হি)।
২৮. তানযীহুশ শারীয়াহ, আলী ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু ইরাক(৯৬৩ হি)।
২৯. তাযকিরাতুল মাউদূআত, মুহাম্মাদ তাহির ফাতানী(৯৮৬ হি)।
৩০. আল আসরারুল মারফূআহ, মুল্লা আলী কারী(১০১৪ হি)।
৩১. আল মাসনূ ফী মা’রিফাতুল মাঊদী, মুল্লা আলী কারী(১০১৪ হি)।
৩২. মুখতাসারুল মাকাসিদ, মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল বাকী যারকানী(১১২২ হি)।
৩৩. আল জাদ্দুল হিসসীস ফী বায়ানি মা লাইসা বিহাদীস, আহমদ ইবনু আব্দুল কারীম আমিরী(১১৪৩ হি)।
৩৪. কাশফুল খাফা ওয়া মুযিলুল ইলবাস, ইসমাঈল ইবনু মুহাম্মাদ আল আজলূনী(১১৬২ হি)।
৩৫. আল কাশফুল ইলাহী আন শাদীদিদ দা’ফি ওয়াল মাউদূ ওয়াল ওয়াহী, মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ আত-তারাবলুসী(১১৭৭ হি)।
৩৬. আন-নাওয়াফিহুল আতিরাহ, মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ আস-সান‘আনী(১১৮১ হি)।
৩৭. আন-নুখবাতুল বাহিয়্যাহ, মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ আস-সাবনাবী(১২৩২ হি)।
৩৮. আল ফাওয়াইদুল মাজমূআ, মুহাম্মাদ ইবনু আলী শাওকানী(১২৫০ হি)।
৩৯. আসনাল মাতালিব, মুহাম্মাদ ইবনু সাইয়িদ দারবীশ(১২৭৬ হি)।
৪০. হুসনুল আশার, মুহাম্মাদ দারবীশ(১২৭৫ হি)।
৪১. আল আশারুল মারফূআহ, আব্দুল হাই লাখনাবী(১৩০৪ হি)।
৪২. আল লু’লু আল মারসূ, মুহাম্মাদ ইবনু খালীল আল মাশীশী(১৩০৫ হি)।
৪৩. তাহযীরুল মুসলিমীন, মুহাম্মাদ ইবনুল বাশীর আল মাদানী(১৩২৯ হি)।
বর্তমান শতকেও এ বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছে ও হচ্ছে। প্রিয় পাঠক, এখন আমাদের মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, একই বিষয়ে এত গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা কি?
আসল বিষয় হলো দ্বিতীয় হিজরী শতক শুরু হওয়ার পর হাদীসের নামে জালিয়াতির প্রচেষ্টা কখনো থামেনি। পরবর্তী অনুচ্ছেদে জালিয়াত ও জালিয়াতির পরিচিতির আলোচনায় আমরা এসকল বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারব। ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা যেমন অব্যাহত থেকেছে, তেমনি সে সকল মিথ্যাকে চিহ্নিত করা ও বিশুদ্ধ হাদীস থেকে তা পৃথক করার প্রচেষ্টাও অব্যাহত থেকেছে। বিভিন্ন মুসলিম দেশে নতুন নতুন কথা হাদীসের নামে প্রচারিত হয়েছে। তখন সেই দেশের প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ গবেষণার মাধ্যমে সেগুলির সত্যতা ও অসত্যতা নির্ণয় করেছেন। এ সকল কথা কোনো হাদীসের গ্রন্থে সনদসহ বর্ণিত হয়েছে কিনা, সনদের গ্রহণযোগ্যতা কিরূপ, এই অর্থে অন্য কোনো হাদীস বর্ণিত হয়েছে কিনা ইত্যাদি বিষয় তাঁরা নির্ণয় করেছেন। এছাড়া পূর্ববর্তী গবেষকদের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল থাকলে তা পরবর্তী লেখকগণ আলোচনা করেছেন। এভাবে এ বিষয়ে লেখনী ও গবেষণার ধারা অব্যাহত থেকেছে।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, গত দেড় হাজার বছরে সকল যুগে ও সকল শতকে মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ হাদীসে রাসূলের হেফাযতে জাগ্রত প্রহরায় সদা সতর্ক থেকেছেন। তাঁরা সদা সর্বদা চেষ্টা করেছেন রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসের নামে মিথ্যাচারের সকল প্রচেষ্টা চিহ্নিত করে হাদীস নামের মিথ্যা কথার খপ্পর থেকে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করার। মহান আল্লাহ এ সকল মানুষদেরকে উত্তম পুরস্কার প্রদান করুন।
১.৫. মিথ্যার কারণ ও মিথ্যাবাদীদের প্রকারভেদ
হাদীসের নামে মিথ্যার উদ্ভব আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, ইসলামের গোপন শত্রুরা মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য সর্বপ্রথম হাদীসের নামে মিথ্যা কথা মুসলিম সমাজে ছড়াতে থাকে। ওহীর উপরেই ধর্মের ভিত্তি। এজন্য ওহীর মাধ্যমে কোনো কথা প্রমাণিত করতে পারলেই তা মুসলিম সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পায়। কুরআন যেহেতু অগণিত মানুষের মুখস্ত, এজন্য কুরআনের নামে সরাসরি মিথ্যা বা বানোয়াট কিছু বলার সুযোগ কখনোই ছিলনা। এজন্য হাদীসের নামে মিথ্যা বলার চেষ্টা তারা করেছে।
ক্রমাণ্বয়ে আরো অনেক মানুষ বিভিন্ন প্রকারের উদ্দেশ্যে হাদীসের নামে মিথ্যা বলতে থাকে। এছাড়া অনেক মানুষ অজ্ঞতা, অবহেলা বা অসাবধানতাবশতঃ হাদীসের নামে মিথ্যা বলেন। কারো মুখে কোনো ভাল কথা, কোনো প্রাচীন প্রাজ্ঞময় বাক্য, কোনো সাহাবী বা তাবিয়ীর কাছে শুনে কারো কাছে ভাল লেগেছে। পরবর্তীতে তা বলার সময় রাসূলুল্লাহ(স)এর কথা বলে বর্ণনা করেছেন। এভাবে বিভিন্ন কারণে হাদীসের নামে জালিয়াতি চলতে থাকে।
আমরা দেখেছি যে, মিথ্যা দুই প্রকারঃ ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত। অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার কারণ মূলত স্মৃতির বিভ্রাট, হাদীস মুখস্তকরণে অবহেলা বা হাদীস গ্রহণে অসতর্কতা। আর ইচ্ছাকৃত মিথ্যার কারণ অধিকাংশে ধর্মের ক্ষতি বা উপকার(!)করা।
আমরা জানি যে, ওহীর সম্পর্ক ধর্মের সাথে। কাজেই ওহীর নামে মিথ্যা বলার সকল উদ্দেশ্যই ধর্মকেন্দ্রিক। কেউ ধর্মের নামে ধর্মের ক্ষতি করার জন্য হাদীস বানিয়েছেন। কেউ ধর্মের নামে কামাই রুজি করার জন্য বা নিজের ফাতওয়া, দল বা বংশকে শক্তিশালী করার জন্য হাদীস বানিয়েছেন। কেউ ধর্মের নামে নিজের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করতে হাদীস বানিয়েছেন। কেউ নিঃস্বার্থভাবে (!) মানুষদের ভালকাজে উৎসাহদান ও খারাপ কাজ থেকে নিরুৎসাহিত করার জন্য হাদীস বানিয়েছেন। এ সকল কারণ আমরা তিন শ্রেণিতে ভাগ করতে পারিঃ ১. ধর্মের ক্ষতি করা, ২. ধর্মের উপকার করা ও ৩. নিজের জাগতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা।
মিথ্যার কারণ ও মিথ্যাবাদীদের প্রকরণ সম্পর্কে ৭ম হিজরী শতকের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনুস সালাহ আবু আমর উসমান ইবনু আব্দুর রাহমান(৬৪৩ হি) বলেনঃ হাদীস বানোয়াটকারী জালিয়াতগণ বিভিন্ন প্রকারের। এদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকারক একদল মানুষ যারা নেককার ও দরবেশ বলে সমাজে পরিচিত। এরা তাদের অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির জন্য সাওয়াবের আশায় বানোয়াট কথা হাদীসের নামে সমাজে প্রচার করতেন। এদের বাহ্যিক পরহেযগারী, নির্লোভ জীবন যাপন ইত্যাদি দেখে মানুষ সরল নামে এদের কথা বিশ্বাস করে এসকল বানোয়াট কথা হাদীস বলে গ্রহণ করতো। এরপর হাদীসের অভিজ্ঞ ইমামগণ সূক্ষ্ম নিরীক্ষার মাধ্যমে এদের মিথ্যাচার ও জালিয়াত ধরে ফেলেন ও প্রকাশ করে দেন। ………….সাওয়াবের উদ্দেশ্যে নেককাজের ফজীলত ও অন্যায় কাজের শাস্তি বিষয়ক মিথ্যা ও বানোয়াট কথাকে হাদীস নামে প্রচার করাকে এধরনের কেউ কেউ জায়েয মনে করত। (ইরাকী, আত তাকঈদ পৃ. ১২৮-১২৯, সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/২৮১-২৮৪)।
আল্লামা যাইনুদ্দীন ইরাকী(৮০৬ হি) বলেনঃ হাদীস জালকারীগণ তাদের জালিয়াতির উদ্দেশ্য ও কারণের দিক থেকে বিভিন্ন প্রকারের।
১. অনেক যিনদীদেরকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য হাদীস বানিয়েছে। হাম্মাদ ইবনু যাইদ বলেছেনঃ যিনদীকগণ রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে দশ হাজার হাদীস তৈরি করেছে।
২. কিছু মানুষ নিজেদের ধর্মীয় মতামত সমর্থন করার জন্য হাদীস জাল করেছে।
৩. কিছু মানুষ খলীফা ও আমীরদের পছন্দসই বিষয়ে হাদীস জাল করে তাদের প্রিয়ভাজন হতে চেষ্টা করেছে।
৪. কিছু মানুষ ওয়াজ ও গল্প বলে অর্থ কামাই করার মানসে হাদীস জাল করেছে।
৫. কিছু মানুষ নিজে ভাল ছিলেন, কিন্তু তাদের পুত্র বা পরিবারের কোনো সদস্য তাদের পান্ডুলিপির মধ্যে মিথ্যা হাদীস লিখে রাখতো। তারা বেখেয়ালে তা বর্ণনা করতেন।
৬. কেউ কেউ নিজেদের ফতোয়া বা মাসআলার দলীল প্রতিষ্ঠার জন্য হাদীস বানাতেন।
৭. কেউ কেউ নতুনত্ব ও অভিনবত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন অপ্রচলিত সনদ ও মতন তৈরি করতেন।
৮. কিছু মানুষ এভাবে মিথ্যা হাদীস তৈরি করাকে দ্বীনদারী বলে মনে করতেন। তারা তাদের বিভ্রান্তির কারণে মনে করতেন যে, মানুষদের ভাল করার জন্য ও ভাল পথে ডাকার জন্য মিথ্যা বলা যায়। এরা নেককার, সংসারত্যাগী বুযুর্গ হিসেবে সমাজে পরিচিত। হাদীস জালিয়াতির ক্ষেত্রে এদের ক্ষতিই সবচেয়ে মারাত্মক। কারণ তারা এই কঠিন পাপকে নেককর্ম ও সাওয়াবের কাজ মনে করতেন। কাজেই কোনোভাবেই তাদেরকে এ থেকে বিরত রাখা যেতনা। আর তাদের বাহ্যিক তাকওয়া, নির্লোভ জীবন ও দরবেশী দেখে মানুষরা প্রভাবিত হতেন এবং তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে গ্রহণ করতেন ও প্রচার করতেন। এজন্যই ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল কাত্তান(১৯৮ হি) বলতেন, হাদীসের বিষয়ে নেককার বুযুর্গ চেয়ে বেশি মিথ্যাবাদী আমি দেখিনি। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৭-১৮)।
তিনি নেককার বুযুর্গ বলতে বুঝিয়েছেন সেইসব জাহিলকে যারা নিজেদের নেককার মনে করেন এবং বুযুর্গীর পথে চলেন, কিন্তু হালাল হারাম বুঝেননা। (ইরাকী, ফাতহুল মুগীস, পৃ. ১২২-১২৪)।
আমরা এখানে হাদীসের নামে জালিয়াতির প্রধান কারণগুলি ও এতে লিপ্ত মানুষদের বিষয়ে কিছু বিস্তারিত আলোচনা করব।
১.৫.১. যিনদীক ও ইসলামের গোপন শত্রুগণ
ইসলামের ইতিহাসের প্রথম অর্ধশতকের মাঝে ইসলামী বিজয়ের মাধ্যমে এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে প্রবেশ করে। এসব দেশের অনেক অমুসলিম নাগরিক স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। অনেকে তাদের পূর্ব ধর্ম অনুসরণ করতে থাকেন। ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ হতে তাঁদের নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। পক্ষান্তরে কিছু মানুষ তাদের পূ্র্ব ধর্ম ও মতামতের প্রতি আনুগত্য ও ভালবাসা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের কথা বলেন। তারা সমাজে মুসলিম বলে গণ্য হলেও প্রকৃতপক্ষে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানো ও তথ্য সন্ত্রাসের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের বিশ্বাস ও কর্ম নষ্ট করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ শ্রেণীর মানুষদেরকে ‘যিনদীক’ বলা হতো। এরা তাদের ঘৃণ্য উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য অগণিত মিথ্যা কথা সমাজে হাদীস হিসাবে প্রচার করতো। আমরা দেখেছি যে, আব্দুল্লাহ ইবনু সাবার নেতৃত্বে এই শ্রেণীর মানুষেরাই প্রথম বানোয়াট হাদীস প্রচার শুরু করে।
এ সকল ভন্ড যিনদীক কখনো বা ‘আলীর(রা)’ এর ভক্ত সেজে তাঁর ও তাঁর বংশের পক্ষে বানোয়াট হাদীস প্রচার করত। কখনো বা সূফী দরবেশ সেজে মানুষকে ধোঁকা দিত এবং পারসিক বা ইহুদী খৃস্টানদের বৈরাগ্য ও সন্নাস মার্কা দরবেশীর পক্ষে হাদীস বানাতো। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী বিশ্বাস নষ্ট করা ও তাকে হাস্যাষ্পদ ও অযৌক্তিক হিসেবে পেশ করা।
এখানে লক্ষণীয় যে, তারা সনদসহ হাদীস বানাতো। তৎকালীন সময়ে সনদছাড়া হাদীস বলার কোনো উপায় ছিলনা। তারা প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও নির্ভরযোগ্য রাবীগণের নাম জানতো। বিভিন্ন সহীহ হাদীসের সনদ তাদের মুখস্ত ছিল। এসকল সনদের নামে তারা হাদীস বানাতো।
এগুলো দিয়ে সাধারণ মানুষদের ধোঁকা দেওয়া খুবই সহজ ছিল। তবে ‘নাকিদ’ মুহাদ্দিসগণের কাছে এই ধোঁকার কোনো কার্য্কারিতা ছিলনা। তাঁরা উপরে বর্ণিত নিরীক্ষার মাধ্যমে তাদের জালিয়াতি ধরে ফেলতেন। যেমন একজন বলল যে, আমাকে ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল কাত্তান বলেছেন, তিনি সুফিয়ান সাওরী থেকে, তিনি ইবনু সিরীন থেকে, তিনি আনাস ইবনু মালিক থেকে তিনি রাসূলুল্লাহ(স) থেকে……….। তখন তাঁরা উপরের পদ্ধতিতে সনদে বর্ণিত সকল রাবীর অন্যান্য ছাত্রদের বর্ণিত হাদীসের সাথে এর তুলনা করতেন। পাশাপাশি এই ব্যক্তির অন্যান্য বর্ণনা ও তার কর্ম বিচার করে অতি সহজেই জালিয়াতি ধরে ফেলতেন।
এদের বানানো একটি হাদীস দেখুনঃ
মুহাম্মাদ ইবনু শু’জা নামক এক ব্যক্তি বলেছে, আমাকে হিব্বান ইবনু হিলাল, তিনি হাম্মাদ ইবনু সালামা থেকে, তিনি আবুল মাহযাম থেকে তিনি আবু হুরাইরা থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) কে প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মহান প্রভুর সৃষ্টি কী থেকে? তিনি বলেনঃ তিনি একটি ঘোড়া সৃষ্টি করেন, এরপর ঘোড়াটিকে দাবড়ান। ঘোড়াটির দেহ থেকে যে ঘাম নির্গত হয় সেই ঘাম হতে তিনি নিজেকে সৃষ্টি করেন।(নাউজুবিল্লাহ) (ইবনুল জাউযী, আল-মাউদূআত ১/৬৪)।
আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে, মহান আল্লাহ সম্পর্কে মুসলিম বিশ্বাসকে হাস্যাষ্পদরূপে তুলে ধরা ও মুসলিম বিশ্বাসকে তামাশার বিষয়ে পরিণত করাই এই জালিয়াতির উদ্দেশ্য।
এ সকল জালিয়াত অনেক সময় তাদের জালিয়াতের কথা বলে বড়াই করত। আব্দুল করীম ইবনু আবীল আরজা দ্বিতীয় হিজরী শতকের এইরূপ একজন জালিয়াত। ধর্মদ্রোহিতা, জালিয়াতি ইত্যাদি অপরাধে তার মৃত্যুদন্ড প্রদানের নির্দেশ দেন তৎকালীন প্রশাসক মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান ইবনু আলী। শাস্তির পূর্বে সে বলে, আল্লাহর কসম, আমি চার হাজার বানোয়াট হাদীস জালিয়াতি করে মুসলমানদের মধ্যে প্রচার করে দিয়েছি। (ইবনুল জাউযী, আল-মাউদূআত ১/১৫)।
তৃতীয় আব্বাসীয় খলীফা মাহদী (শাসনকাল ১৫৮-১৬৯ হি) বলেন, আমার কাছে একজন যিনদীক স্বীকার করেছে যে, সে ৪০০ হাদীস বানোয়াট করেছে যেগুলি এখন মানুষের মধ্যে প্রচারিত হচ্ছে। (ইবনুল জাউযী, আল-মাউদূআত ১/১৫)।
১.৫.২. ধর্মীয় ফিরকা ও দলমতের অনুসারীগণ
সাধারণত মানুষ নিজের ক্ষুদ্রত্ব ও সীমাবদ্ধতা অনুভব করতে চায়না। সেই প্রাচীন যুগ হতে বর্তমান যুগ পর্য্ন্ত অগণিত মানুষ নিজের বুদ্ধি, বিবেক, বিচার ও প্রজ্ঞা দিয়ে ‘ওহী’র দুর্বলতা! ও অপূর্ণতা!! দূর!!! করতে চেষ্টা করেছে ও করছে। সকলেরই চিন্তা ওহীর মধ্যে কেন এই কথাটি থাকলোনা। এই কথাটি না হলে ধর্মের পূর্ণতা আসছেনা। ঠিক আছে, আমি এই কথাটি ওহীর নামে বলি। তাহলে ধর্ম পূর্ণতা লাভ করবে!!!
এদের মধ্যে অনেকে নিজে কোনো মনগড়া ধর্মীয় মতবাদ তৈরি করেছে বা অনুসরণ করেছে এবং এই মতের পক্ষে ‘ওহী’ জালিয়াতি করেছে। রাসূলুল্লাহ(স) এর ইন্তিকালের পরে অর্ধ শতাব্দী অতিক্রান্ত হতে না হতেই মুসলিম সমাজে নও মুসলিমদের মাঝে পূর্ববর্তী ধর্মের প্রভাব, ইসলামের গোপন শত্রুদের অপপ্রচার ও বিভিন্ন সমাজের সাহিত্য, দর্শন ইত্যাদির প্রভাবে নতুন নতুন ধর্মীয় মতবাদের উদ্ভব ঘটে। আলী(রা) ও সকল সাহাবীর বিরুদ্ধে জিহাদ ও মনগড়া ইসলাম প্রতিষ্ঠার উন্মাদনা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় খারিজী মতবাদ। আলী(রা) এর ভক্তি ও ভালবাসার ছদ্মাবরণে মুসলমানদের মধ্যে ইহুদী, খ্রীস্টান ও অগ্নিপূজকদের মতবাদ ছড়ানোর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় শিয়া মতবাদ। মহান আল্লাহর মর্যাদা রক্ষার ভুয়া দাবীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কাদারীয়া’ মতবাদ, যাতে তাকদীর বা মানুষের ভাগ্যের বিষয়ে মহান আল্লাহর জ্ঞানকে অস্বীকার করা হতো। মহান আল্লাহর ক্ষমতা প্রমাণের বাড়াবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাবারিয়া’ মতবাদ, যাতে মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতাকে অস্বীকার করা হতো। মহান আল্লাহর একত্ব প্রতিষ্ঠার মনগড়া দাবিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাহমিয়া’, ‘মুতাজিলা’ ইত্যাদি মতবাদ, যেখানে মহান আল্লাহর গুণাবলী অস্বীকার করা হতো।
রাসূলুল্লাহ(স) এর সাহাবীগণ কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা হুবহু আক্ষরিকভাবে বিশ্বাস ও পালন করেছেন। সাহাবীগণকে ভালবাসতে হবে আবার রাসূলুল্লাহ(স) এর বংশধরদেরকেও ভালবাসতে হবে। উভয়ের মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই, নেই কোনো বাড়াবাড়ির অবকাশ। মানুষের ভাগ্যের বিষয়ে আল্লাহর জ্ঞান ও নির্ধারণ যেমন সত্য, তেমনি সত্য মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতা।উভয় বিষয়ের সকল আয়াত ও হাদীস সহজভাবে বিশ্বাস করেছেন তাঁরা। এগুলির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য তাঁরা দেখেননি।
কিন্তু নতুন মতের উদ্ভাবকগণ কুরআন হাদীসের কিছু নির্দেশনা মানতে গিয়ে বাকীগুলি অস্বীকার করেছেন বা ব্যাখ্যা করেছেন। প্রত্যেকে নিজের মতকেই সঠিক বলে মনে করেছেন। প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেছেন যে, তার মতই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স) পক্ষে এবং এই মতের পক্ষে হাদীস বানানোর অর্থ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের(স) পক্ষে হাদীস বানানো। কিছু বানোয়াট বা মিথ্যা কথাকে ওহীর নামে বা হাদীসের নামে বলে যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ‘সঠিক পছন্দের!! মতকে’ শক্তিশালী করা যায় তাহলে অসুবিধা কি?! এতো ভাল কাজ বলে গণ্য হওয়া উচিত। এজন্য তাদের কেউ কেউ যখন তাদের মতের পক্ষে স্পষ্ট কোনো হাদীস পাননি তখন প্রয়োজনে নিজেদের পক্ষে ও বিপক্ষবাদীদের বিপক্ষে হাদীস বানিয়ে প্রচার করেছেন। ফিকহী ও মাসআলাগত মতভেদ এর ক্ষেত্রেও কখনো কখনো মিথ্যা হাদীস তৈরী করা হয়েছে।(ফালাতা, উমার ইবনু হাসান, আল-ওয়াদউ ফিল হাদীস ১/২২৩-২৬৩)।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী অগ্রগামী ছিলেন শিয়াগণ। নবী বংশের ভক্তির নামে তারা অগণিত বানোয়াট কথা ধর্মবিশ্বাসের অংশ বানিয়েছিলেন। এরপর সেগুলির সমর্থনে অগণিত হাদীস বানিয়ে প্রচার করেছেন। নবীদের পরে সকল মানুষের মধ্যে আলীর শ্রেষ্ঠত্ব, আলীর অগণিত অলৌকিক ক্ষমতা, আলীর পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে আসা, আলী বংশের মাহাত্ম্য, তাঁকে ও তাঁর বংশধরদেরকে বাদ দিয়ে যারা খলীফা হয়েছেন তাঁদের যুলুম ও শাস্তি, যারা তাঁর বিরোধিতা করেছেন তাঁদের ভয়ন্কর পরিণতি ও শাস্তি, যারা তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মানেননি বা অন্যান্য সাহাবীদেরকে ভালবেসেছেন তাদের ভয়ন্কর শাস্তি ইত্যাদি বিষয়ে অগণিত বানোয়াট কথাকে তারা হাদীস নামে প্রচার করেছেন।
তাঁদের জালিয়াত এত ব্যাপক ছিল যে, তাদের আলেমগণও সে কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। ৭ম হিজরী শতকের প্রখ্যাত শিয়া আলীম, আলী(রা) এর বক্ততা সংকলন ‘নাহজুল বালাগাত’ এর ব্যাখ্যাকার ইবনু আবীল হাদীদ আব্দুল হামীদ ইবনু হিবাতুল্লাহ(৬৫৬ হি) বলেনঃ ফযীলত বা মর্যাদা জ্ঞাপক হাদীসের ক্ষেত্রে প্রথম মিথ্যাচারের শুরু হয়েছিল শিয়াদের দ্বারা। তারা প্রথমে তাদের নেতার পক্ষে বিভিন্ন হাদীস জালিয়াতি করে প্রচার করেন। বিরোধীদের সাথে প্রচন্ড শত্রুতা ও হিংসা তাদেরকে এই কর্মে উদ্বুদ্ধ করে।……(মুহাম্মাদ আজ্জাজ আল খাতীব, আস-সুন্নাতু কাবলাত তাদবীন পৃ. ১৯৫)।
১.৫.৩. নেককার সংসারত্যাগী সরল বুযুর্গগণ
রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা কথা বলা ও প্রচার করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন ও ঘৃণ্য ভুমিকা পালন করেছে কুরআন ও সুন্নাতের শিক্ষার বিষযে অজ্ঞ কিছু ধার্মিক মানুষের ‘মানুষকে ভাল পথে নেওয়ার আগ্রহ।’ কুরআনের ফযীলত, বিভিন্ন সূরার ফযীলত, বিভিন্ন সময়ে বা দিনে বিভিন্ন প্রকারের সালাতের ফযীলত, বিভিন্ন প্রকার যিকির এর ফযীলত ইত্যাদি সর্বপ্রকারের নেককর্মের ফযীলত, বিভিন্ন পাপ বা অন্যায় কাজের শাস্তি ইত্যাদি বিষয়ে অসংখ্য হাদীস বানানো হয়েছে এই উদ্দেশ্যে।(ফাল্লাতা, আল ওয়াদউ ১/২৬৩-২৬৯)।
জাল হাদীস তৈরী ও প্রচারের ক্ষেত্রে এ সকল নেককার মানুষরা ছিলেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক। এদেরকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। কিছু নেককার মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলতেন। এরা এদের সরলতার নামে হাদীসের নামে যা শুনতেন তাই বিশ্বাস করতেন এবং বর্ণনা করতেন। অনেক সময় কোনো সুন্দর কথা বা জ্ঞানের বাক্য শুনলে তারা তা অসতর্কভাবে হাদীস বলে বর্ণনা করতেন। আর কিছু নেককার বলে পরিচিত মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলতেন।
১.৫.৩.১. নেককারগণের অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা
সূফী দরবেশ আল্লাহওয়ালা মানুষেরা সরলমনা ভাল মানুষ। সবাইকে সরল মনে বিশ্বাস করা ও দয়া করাই তাঁদের কাজ। আর মুহাদ্দিসগণের কাজ হচ্ছে দারোগার কাজ। দরবেশ এর শুরু বিশ্বাস দিয়ে আর দারোগার শুরু অবিশ্বাস দিয়ে। কোনো মানুষ যদি তার কোনো বিপদের কথা বলে, বা কোনো অপরাধের জন্য ওজর পেশ করে তখন সাধারণত সরলপ্রাণ মানুষেরা তা বিশ্বাস করে ফেলেন। কিন্তু একজন দারোগা প্রথমেই অবিশ্বাস দিয়ে শুরু করেন। তিনি তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে জানতে চেষ্টা করেন, সে ধোঁকা দিচ্ছে না সত্যি বলছে। এরপর তিনি তা বিশ্বাস করেন।
কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফের অগণিত নির্দেশের আলোকে সাহাবীগণের যুগ থেকে সাহাবীগণ ও পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ ওহী বা রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় সদাজাগ্রত প্রহরী বা দারোগার দায়িত্ব পালন করছেন। সূক্ষ্ম নিরীক্ষা ও যাচাই ছাড়া তাঁরা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে বলা কোনো কথা সঠিক বলে গ্রহণ করেননি।
পক্ষান্তরে সরলপ্রাণ সংসারত্যাগী ‘যাহিদ’ দরবেশগণ অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কোনো কথা শুনামাত্র আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কেউ মিথ্যা বলতে পারেন কখনো তাঁরা তা চিন্তা করেননি। তাঁরা যা শুনেছেন সবই ভক্তের হৃদয়ে শুনেছেন, সরল বিশ্বাসে মেনে নিয়েছেন, আমল করেছেন ও অন্যকে আমল করতে উৎসাহ দিয়েছেন। এজন্য তাবে-তাবেয়ীগণের যুগ হতেই মুহাদ্দিসগণ এ ধরনের নেককার দরবেশদের হাদীস গ্রহণ করতেননা। ইমাম মালিক(১৭৯ হি) বলতেনঃ মদীনায় অনেক দরবেশ আছেন, যাদের কাছে আমি লক্ষ টাকা আমানত রাখতে রাজি আছি, কিন্তু তাঁদের বর্ণিত একটি হাদীসও আমি গ্রহণ করতে রাজি নই।(ড. আমীন আবু লাবী, ইলমু উসূলিল জারহী ওয়াত তা’দীল, ১৬৬-১৬৭)।
ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল কাত্তান(১৯৮ হি) বলেনঃ “নেককার বুযুর্গরা রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসের বিষয়ে যত বেশি মিথ্যা বলেন অন্য কোনো বিষয়ে তাঁরা এমন মিথ্যা বলেননা।” ইমাম মুসলিম(২৬১ হি) এই কথার ব্যাখ্যা বলেনঃ “এই সকল নেককার মানুষেরা ইচ্ছা করে মিথ্যা বলেননা, কিন্তু বেখেয়ালে তাঁরা মিথ্যাচারে লিপ্ত হন। কারণ তাঁরা হাদীস সঠিকভাবে মুখস্ত রাখতে পারেননা, উল্টে পাল্টে ফেলেন, অধিকাংশ সময় মনের আন্দাজে হাদীস বলেন, ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যাচারে লিপ্ত হন।”(মুসলিম আস-সহীহ ১/১৭-১৮)।
ইবনুস সালাহ(৬৪৩ হি), নববী(৬৭৬ হি), ইরাকী (৮০৬ হি) ও অন্যান্য মুহাদ্দিস অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার একটি উদাহরণ পেশ করেছেন। এই অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা হাদীসটি ইমাম ইবনু মাজাহ তাঁর সুনানে সংকলন করেছেন। তিনি বলেছেনঃ আমাদেরকে ইসমাঈল ইবুন মুহাম্মাদ আত-তালহী বলেছেন, আমাদেরকে সাবিত ইবনু মূসা আবু ইয়াযীদ বলেছেন, তিনি শারীক থেকে, তিনি আ’মাশ থেকে, তিনি আবু সুফিয়ান থেকে, তিনি জাবির(রা) থেকে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “যার রাতের সালাত অধিক হবে দিবসে তার চেহারা সৌন্দর্য্ময় হবে।”(ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৪২২)।
মুহাদ্দিসগণ তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতরূপে জানতে পেরেছেন যে, এই কথা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে বানোয়াট কথা। তবে তা ইচছাকৃত মিথ্যা না অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা এ বিষয়ে তাঁরা মতভেদ করেছেন।
ইবনু মাজহার উস্তাদ ইসমাঈল ও অনেক মুহাদ্দিস এই হাদীসটি আবু ইয়াযিদ সাবিত ইবনু মূসা ইবনু আব্দুর রাহমান(২২৯ হি) থেকে শুনেছেন ও লিখেছেন। একমাত্র তিনিই এই হাদীসটির বর্ণনাকারী। তিনি দাবি করেন যে, শারীক ইবনু আব্দুল্লাহ(১৭৮ হি) তাকে এই হাদীসটি বলেছেন।
মুহাদ্দিসগণ শারীকের সকল ছাত্রের হাদীস, শারীকের উস্তাদ সুলাইমান ইবনু মিহরান আল আ’মাশ(১৪৭ হি) এর সকল ছাত্রের হাদীস, আ’মাশের উস্তাদ আবু সুফিয়ান তালহা ইবনু নফি’ এর সকল ছাত্রের হাদীস এবং জাবির(রা) এর অন্যান্য ছাত্রের হাদীস সংগ্রহ করে তুলনা করেছেন এবং নিশ্চিত হয়েছেন যে এই হাদীসটি একমাত্র সাবিত ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেননি। তাঁরা দেখেছেন যে, সাবিত ‘শারীক’ এর এমন কোনো ঘনিষ্ট ছাত্র বা দীর্ঘকালীন সহচর ছিলেননা যে, সাবিত আর কাউকে হাদীসটি না বলে শুধুমাত্র তাকেই এই হাদীসটি বলেছেন। এভাবে সামগ্রিক নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, সাবিত ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা বলেছেন।
সাবিত ইবনু মূসা তৃতীয় হিজরী শতকের একজন নেককার আবিদ ও সংসারত্যাগী দরবেশ ছিলেন। তাঁর ধার্মিকতার কারণে সাধারণভাবে মুহাদ্দিসগণ তাঁর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করতেন। তবে তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা দেখেছেন যে, তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে বেশ কিছু হাদীস ভুল বা মিথ্যা বলে প্রমাণিত। তিনি যে সকল উস্তাদের সূত্রে হাদীসগুলি বলেছেন, সে সকল ওস্তাদের দীর্ঘদিনের বিশেষ ছাত্র বা অন্য কোনো ছাত্র সেই হাদীস বলছেননা। এজন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস তাঁকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলেছেন। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন(২৩৩ হি) সাবিত সম্পর্কে বলেনঃ ‘তিনি মিথ্যাবাদী’।(যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ২/৮৯, ইবনু হাজার, তাহযীবুত তাহযীব ২/১৪)।
পক্ষান্তরে আবু হাযিম রাযী(২৭৭ হি), ইবনু আদী(৩৬৫ হি) প্রমুখ মুহাদ্দিস সাবিতের এই মিথ্যাকে অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা বলেছেন। তাঁরা বলেছেন, সাবিত মূলত হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেননা। সাধারণ আবিদ ছিলেন। তিনি সর্বমোট ৭/৮টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এগুলির মধ্যে দুইটি হাদীস বাদে বাকীগুলি তিনি ঠিকমত বর্ণনা করেছেন। এতে মনে হয় তাঁর ভুল অনিচ্ছাকৃত। এজন্য তাঁরা তাকে স্পষ্টভাবে ‘মিথ্যাবাদী’ না বলে ‘দুর্বল’ বলেছেন। (ইবনু আদী, আল-কামিল ২/৯৯; যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ২/৮৯)।
কোনো কোনো মুহাদ্দিস সাবিতের অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার কারণ উল্লেখ করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু নুমাইর(২৩৪ হি) বলেন, হাদীসটি বাতিল। সাবিত বুঝতে না পেরে হাদীসটি বলেছেন। শারীক ইবনু আব্দুল্লাহ হাসি মশকরা করতে ভালবাসতেন। শারীক ইবুন আব্দুল্লাহ হাসি মশকরা করতে ভালবাসতেন। আর সাবিত ছিলেন নেককার আবিদ মানুষ। সম্ভবত, শারীক যখন হাদীস বলছিলেন তখন শারীক সেখানে উপস্থিত হন। শারীক বলছিলেনঃ আমাদেরকে আ’মাশ, তিনি আবু সুফিয়ান থেকে, তিনি জাবির(রা) থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ(স) থেকে। এমতাবস্থায় সাবিত সেখানে প্রবেশ করেন। সাবিতকে দেখে শারীক হাদীস বলা বন্ধ করে তার সরলতা মন্ডিত উজ্জল চেহারা লক্ষ্য করে বলেনঃ ‘যার রাতের সালাত অধিক হয়, দিবসে তার চেহারা সৌন্দর্য্ময় হয়। শারীকের এই কথা সাবিত অসাবধানতাবশত উপরের সনদে বর্ণিত হাদীস মনে করেন। এভাবে তিনি শারীকের একটি কথাকে ভুলবশত রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বলে বর্ণনা করেছেন। এ কারণে ইবনু সালাহ, নববী, ইরাকী ও অন্যান্য কোনো মুহাদ্দিস এই হাদীসটিকে অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার উদাহরণ হিসেবে পেশ করেছেন। (ইবনু আদী, আল কামিল ২/৯৯, যাহাবী; মীযানুল ই’তিদাল ২/৮৮; ইরাকী আত তাকয়ীদ, পৃ. ১২৯; ফাতহুল মুগীস, পৃ. ১২৭,১২৮)।
১.৫.৩.২. নেককারগণের অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা
নেককার বলে পরিচিত কিছু মানুষ এর চেয়েও জঘন্য কাজে লিপ্ত হতেন। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বানোয়াট কথা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে বলতেন। হাদীস জালিয়াতির ক্ষেত্রে এরাই ছিলেন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও ক্ষতিকারক।
তারা যে সকল বিষয়ে হাদীস বানিয়েছেন, তার অনেক বিষয়ে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। কিন্তু এ সকল নেককার মানুষ অনুভব করেছেন যে, এ সকল সহীহ হাদীসের ভাষা ও সেগুলিতে বর্ণিত পুরস্কার ও শাস্তিতে মানুষের আবেগ আসেনা। তাই তারা আরো জোরালো ভাষায়, বিস্তারিত কথায়, অগণিত পুরস্কার ও কঠিনতম শাস্তির কথা বলে হাদীস বানিয়েছেন, যেন মানুষেরা তা শুনেই প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এভাবে তাঁরা ‘ওহীর’ অপূর্ণতা (!) মানবীয় বুদ্ধি দিয়ে পূরণ(!) করতে চেয়েছেন। সবচেয়ে কঠিন বিষয় ছিল যে, তাদের ধার্মিকতার(?) কারণে সমাজের অনেক মানুষই এসকল জালিয়াতির খপ্পড়ে পরতেন। তাঁরা এগুলিকে হাদীস বলে বিশ্বাস করেছেন। শুধুমাত্র নাকিদ মুহাদ্দিসগণ তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে তাদের জালিয়াতি ধরেছেন।
শয়তান এদের বুঝিয়েছিলেন যে, আমরাতো রাসূলুল্লাহ(স) এর বিরুদ্ধে নয়, পক্ষেই কথা বলছি। এ সকল মিথ্যা ছাড়া মানুষদের হেদায়াত করা সম্ভব নয়। কাজেই ভাল উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলা শুধু জায়েযই নয় বরং ভাল কাজ।
শয়তান তাদের বুঝতে দেয়নি যে, তাদের সকল চিন্তাই ভুল খাতে প্রবাহিত হয়েছে।মিথ্যা ছাড়া মানুষকে ভাল পথে আনা যাবেনা একথা ভাবার অর্থ হলো, ওহী মানুষকে হেদায়াত করতে সক্ষম নয়। কুরআন কারীম ও বিশুদ্ধ হাদীস তার কার্য্কারিতা হারিয়ে ফেলেছে। কাজেই আজগুবি মিথ্যা দিয়ে মানুষকে হেদায়াত করতে হবে! কি জঘন্য চিন্তা!
তাদের এসব মনগড়া কথা যে ওহীর পক্ষে বা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষে সে কথা দাবী করার অধিকার তাদের কে দিয়েছে? তারা যে কথাকে ইসলামের পক্ষে বলে মনে করছে তা সর্বদা ইসলামের সবচেয়ে ক্ষতি করেছে। আজগুবি গল্প, অল্প কাজের অকল্পনীয় সাওয়াব, সামান্য অন্যায় বা পাপের ঘোরতর শাস্তি, সৃষ্টির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাল্পনিক কাহিনী, কাল্পনিক অলৌকিক কাহিনী, বিভিন্ন বানোয়াট ফযীলতের কাহিনী ইত্যাদি মুসলিম উম্মাহকে ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে বিচ্যূত করেছে। অগণিত কুসংস্কার ছাড়িয়েছে তাদের মধ্যে। নফল ইবাদতের সাওয়ারে বানানো মনগড়া কল্পকাহিনী মুসলিম উম্মাহকে ফরয দায়িত্বে ভুলিয়ে দিয়েছে। অগণিত মনগড়া আমল মুসলমানদেরকে কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত কর্ম ও দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে বানোয়াট হাদীসগুলি আলোচনার সময় এসবের অনেক উদাহরণ দেখতে পাব।
ওহীর পক্ষে মিথ্যা বলার কারণেই যুগে যুগে সকল ধর্ম বিকৃত হয়েছে। ওহীর পক্ষে মিথ্যা বলে বিভ্রান্ত হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ খৃস্টধর্মের বিকৃতিকারী পৌল নামধারী শৌল এবং তার অনুসারী খৃস্টানগণ। এরা ঈশ্বরের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, যীশুর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ও অধিক সংখ্যক মানুষকে সুপথে আনয়ন করার জন্য ওহীর নামে মিথ্যা বলেছে। এরা ভেবেছে যে, আমরা ঈশ্বরের বা যীশুর পক্ষে বলছি, কাজেই এই মিথ্যায় কোনো দোষ নেই। কিন্তু তারা মূলত শয়তানের খেদমত করেছে। এজন্য মহিমাময় আল্লাহ কুরআন কারীমে ইরশাদ করেছেনঃ
আরবী(********)
-“বল হে কিতাবীগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে অন্যায় বাড়াবাড়ি করোনা; এবং যে সম্প্রদায় ইতোপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে, অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সরলপথ থেকে বিচ্যূত হয়েছে তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করোনা।”(সূরা ৫ মায়িদাঃ ৭৭)।
মুসলিম উম্মাহর মধ্যেও এই ধরনের পথভ্রষ্ট খেয়াল খুশীমত ওহী বানানো সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব দেখা দিয়েছে। তবে সনদ ও সনদ নিরীক্ষা ব্যবস্থার ফলে এদের জালিয়াতি ধরা পড়ে গিয়েছে।
এ সকল ‘নেককার জালিয়াতগণ’ বিভিন্ন পদ্ধতিতে হাদীস তৈরি করতেন।
ক. কিছু মানুষ কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআনের বিভিন্ন সূরা তিলাওয়াতের ‘অগণিত’ কাল্পনিক সাওয়াব বর্ণনা করে হাদীস তৈরি করতেন।
খ. অন্য অনেকে প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত বিভিন্ন নেক আমলের সাওয়াব বর্ণনায় হাদীস বর্ণনা করতেন। যেমন তাসবীহ, যিকির, তাহাজ্জুদ, চাশত ইত্যাদি ইবাদতের জন্য সহীহ হাদীসে অনেক সাওয়াব বর্ণিত আছে। তারা মনে করতেন যে, এ সকল হাদীস মানুষের চিত্ত আকর্ষণ করতে পারেনা। এজন্য এসকল বিষয়ে আকর্ষণীয়(!) হাদীস তৈরি করতেন। অনুরূপভাবে সুন্নাতের পক্ষে ও বিদয়াতের বিপক্ষে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। এ সকল জালিয়াত সেগুলিতে খুশি হতে পারেননি। তাঁরা সুন্নাতের সাওয়াব, মর্যাদা এবং বিদ’আতের পাপ ও বিদ’আতীদের কঠিন পরিণতি ও ভয়ঙ্কর শাস্তির বিষয়ে অনেক হাদীস বানিয়েছেন।
গ. কেউ কেউ বিভিন্ন প্রকারের নেক আমল তৈরি করে তার ফযীলতে হাদীস বানাতেন। যেমন বিভিন্ন মাসের বিশেষ পদ্ধতির সালাত, সপ্তাহের প্রত্যেক দিনের জন্য বিশেষ সালাত, আল্লাহকে স্বপ্নে দেখা, রাসূলুল্লাহ(স) কে স্বপ্নে দেখা, জান্নাতে নিজের স্থান দেখা ইত্যাদি বিভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিশেষ সালাত। অনুরূপভাবে বিভিন্ন ‘দুরুদ’, ‘যিকির’, ‘দোয়া’, ‘মুনাজাত’ ইত্যাদি বানিয়ে সেগুলির বানোয়াট ফযীলত উল্লেখ করে হাদীস তৈরি করেছেন। এরূপ অগণিত ‘ইবাদত’ তারা তৈরি করেছেন এবং এগুলির ফযীলতে কল্পনার ফানুস উড়িয়ে অগণিত সাওয়াব ও ফযীলতের কাহিনী বলেছেন।
ঘ. অনেক মানুষের অন্তর নরম করার জন্য সংসারত্যাগ, লোভ, ত্যাগ, ক্ষুধার ফযীলত, দারিদ্র্যের ফযীলত, বিভিন্ন কাহিনী, শাস্তি, পুরস্কার ও অনুরূপ কল্পকাহিনী বানিয়ে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে চালিয়েছেন।
এখানে এই ধরনের দু’এক ব্যক্তির স্বীকারোক্তি উল্লেখ করছি। এ সকল মানুষ মুহাদ্দিসগণের নিকট তাদের মিথ্যা সনদগুলি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করত। তবে তাঁদের নিরীক্ষামূলক প্রশ্নের সামনে অনেক সময় স্বীকার করতো যে, তারা হাদীস জালিয়াতি করছে।
দ্বিতীয় হিজরী শতকের একজন প্রখ্যাত আলিম, আবিদ ও ফকীহ আবু ইসমাহ নূহ ইবনু আবু মারিয়াম(১৭৩ হি)। হাদীস, ফিকহ, ইতিহাস ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে তার চৌকস পান্ডিত্যের কারণে তাকে ‘আল-জামি’ বলা হতো। খলীফা মানসূরের সময়ে (১৩৬-১৫৮ হি) তাকে খোরাসানের মারভ অঞ্চলের বিচারপতি নিয়োগ করা হয়। তাকে সেই এলাকার অন্যতম আলীম বলে গণ্য করা হতো। মু’তাযিলা, জাহমিয়া, আহলুর রাই ফকীহ ও বিদ’আতী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর ছিলেন।
এত কিছু সত্ত্বেও তিনি হাদীসের নামে মিথ্যা কথা বলতেন। তিনি কুরআনের বিভিন্ন সূরার ফযীলতে কিছু হাদীস বর্ণনা করতেন। মুহাদ্দিসগণ তাকে প্রশ্ন করেনঃ আপনি ইকরিমাহ থেকে আবু ইবনু আব্বাস থেকে কুরআনের প্রত্যেক সূরা ফযীলতে যেসব হাদীস বলেন তা আপনি কোথায় পেলেন? ইকরিমাহ এর ঘনিষ্ঠ ছাত্রগণ বা অন্য কোনো ছাত্র এই হাদীস বর্ণনা করেননা, অথচ আপনি কিভাবে তা পেলেন? তখন তিনি বলেনঃ আমি দেখলাম, মানুষ কুরআন ছেড়ে দিয়েছে। তারা আবু হানীফার ফিকহ ও ইবুন ইসহাকের মাগাযী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এজন্য আমি তাদেরকে কুরআনের দিকে ফিরিয়ে আনতে এই হাদীস বানিয়েছি। (ইবনুল জাউযী, আল-মাউদূআত ১/১৮; যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ৭/৫৫-৫৭)।
তৃতীয় হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ আবিদ, আলিম ও ওয়ায়িয আহমদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু গালীব গুলাম খালীল(২৭৫ হি)। তিনি রাজধানী বাগদাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংসারত্যাগী আবিদ বলে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি সর্বদা শাক-সব্জি খেতেন, অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন এবং অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ওয়ায করতেন। ‘আহলুর রাই’ বলে কথিত (হানাফী) ফকীহগণের বিরুদ্ধে, মু’তাযিলা, শিয়া, কাদারিয়া, জাবারিয়া ও অন্যান্য বিদ’আতী মতের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। সাধারণের মধ্যে তার ওয়াজের প্রভাব ছিল অনেক। শ্রোতাদের মন নরম করতে ও তাদের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে তিনি নিত্য নতুন গল্পকাহিনী হাদীসের নামে জালিয়াতি করে বলতেন। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণের নামে সনদ তৈরি করে তিনি মিথ্যা হাদীসগুলি বলতেন।
আবু জা’ফার ইবনুশ শুআইরী বলেন, একদিন গুলাম খালীস হাদীস বলতে গিয়ে বলেন, আমাকে বাকর ইবনু ঈসা(২০৪ হি) বলেছেন, তিনি আবু উওয়ানা থেকে………। আমি বললাম, বাকর ইবনু ঈসা তো অনেক পুরাতন মানুষ। ইমাম আহমদ(২৪১ হি) ও তাঁর পর্যায়ের মানুষেরা তার নিকট হতে হাদীস শুনেছেন। আপনি তাকে জীবিত দেখেননি। একথা বলার পর তিনি চুপ করে চিন্তা করতে থাকেন। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তিনি আমার বিরুদ্ধে কিছু বলে ফেলেন কিনা। এজন্য আমি বললামঃ হতে পারে যে, আপনার উস্তাদ বাকর ইবনু ঈসা অন্য আরেক ব্যক্তি। তিনি চুপ করে থাকলেন। পরদিন তিনি আমাকে বললেনঃ আমি গতরাতে চিন্তা করে দেখেছি, বসরায় আমি বাকর ইবনু ঈসা নামের ৬০ ব্যক্তির নিকট হতে হাদীস শুনেছি।(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ১/২৮৫)।
মিথ্যার বাহাদুরী দেখুন! হাদীসের ‘নকিদ’ ইমামদের নিকট এই ধরনের ‘ঠান্ডা’ মিথ্যার কোনো মূল্য নেই। বসরায় কোন যুগে কতজন রাবী ছিলেন নামধামসহ তাদের বর্ণিত হাদীস তার সংগ্রহ ও সংকলিত করেছেন।এজন্য এরা অনেক সময় জালিয়াতি স্বীকার করতে বাধ্য হতো।
চতুর্থ শতকের অন্যতম মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবনু আদী(৩৬৫ হি)বলেন হাদীস সংগ্রহের সফরে যখন হাররান শহরে ছিলাম তখন আবু আরূবার মজলিসে আবু আবদুল্লাহ নাহাওয়ান্দী বলেন, আমি গুলাম খালীলকে বললাম, শ্রোতাদের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তারকারী যে হাদীসগুলি বলছেন সেগুলি কোথায় পেলেন? তিনি বলেনঃ মানুষের হৃদয় নরম করার জন্য আমি এগুলি বানিয়েছি।(ইবনু আদী, আল কামিল ১/১৯৫)।
এ সকল নেককার মানুষের জালিয়াতির ক্ষতি সম্পর্কে হাদীস শাস্ত্রের সকল ইমামই আলোচনা করেছেন। ইতোপূর্বে আমরা এ বিষয়ে ইবনুস সালাহ, নববী ও ইরাকীর বক্তব্য দেখেছি। এ বিষয়ে আল্লামা সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী হানাফী(৮১৬ হি) লিখেছেনঃ “মাওযূ বা বানোয়াট হাদীসের প্রচলনে সবচেয়ে ক্ষতি করেছেন দুনিয়াত্যাগী দরবেশগণ, তাঁরা অনেক সময় সাওয়াবের নিয়্যতেও মিথ্যা হাদীস বানিয়ে বলেছেন।”(আবদুল হাই লাখনবী, যাফরুল আমানী ফী মুখতাসারিল জুরজানী, ৪৩৩ পৃ)।
ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হি) বলেনঃ “বর্ণিত আছে যে, কোনো কোনো সূফী সাওয়াবের বর্ণনায় ও পাপাচারের শাস্তির বর্ণনায় মিথ্যা হাদীস বানানো ও প্রচার করা জায়েজ মনে করতেন।”(মোল্লা আলী কারী, শারহু শারহি নুখবাতুল ফিকর, পৃ. ৪৫১)।
সুয়ূতী(৯১১ হি) বলেন, জালিয়াতের উদ্দেশ্য অনুসারে জালিয়াতগণ বিভিন্ন প্রকারের। এদের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ও ক্ষতিকর ছিলেন কিছু মানুষ যাদেরকে সংসারত্যাগী নির্লোভ নেককার মনে করা হতো। তাঁরা তাঁদের বিভ্রান্তির কারণে আল্লাহর নিকট সাওয়াব পাওয়ার আশায় মিথ্যা হাদীস বানাতেন। …………..(২য় শতকের প্রখ্যাত দরবেশ) আবু দাউদ নাখয়ী সুলাইমান ইবনু আমর রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায়ে ও দিনের পর দিন নফল সিয়াম পালনে ছিলেন অতুলনীয়। তা সত্ত্বেও তিনি মিথ্যা হাদীস বানিয়ে প্রচার করতেন।……আবু বিশর আহমদ ইবনু মুহাম্মাদ আল মারওয়াযী খোরাসানের অন্যতম ফকীহ, আবিদ ও সুন্নাতের সৈনিক ছিলেন।
সুন্নাতের পক্ষে এবং বিদ’আত ও বিদ’আতপন্থীদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন খড়গহস্ত। কিন্তু তিনি মিথ্যা কথাকে হাদীস বলে মনে করতেন। ……..ওয়াহাব ইবনু ইয়াহইয়া ইবুন হাফস(২৫০ হি) তার যুগের অন্যতম নেককার আবিদ ও ওয়ায়িয ছিলেন। ২০ বৎসর কারো সাথে তিনি কোনো জাগতিক কথা বলেননি। তিনিও হাদীসের নামে জঘন্য মিথ্যা কথা বলতেন। (সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/২৮১-২৮৩)।
আল্লামা আলী কারী (১০১৪ হি) লিখেছেনঃ অত্যধিক ইবাদত বন্দেগিতে লিপ্ত সংসারত্যাগী দরবেশগণ শবে-বরাতের নামায, রজব মাসের নামায ইত্যাদি বিভিন্ন ফযীলতের বিষয়ে অনেক বানোয়াট কথা হাদীস নামে প্রচার করেছেন। তাঁরা মনে করতেন, এতে তাঁদের সওয়াব হবে, দ্বীনের খেদমত হবে। বানোয়াট হাদীসের ক্ষেত্রে নিজেদের এবং অন্যান্য মুসলমানদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন এই সকল মানুষ। তাঁরা এই কাজকে নেককাজ ও সাওয়াবের কাজ মনে করতেন, কাজেই তাঁদেরকে কোনোভাবেই বিরত রাখা সম্ভব ছিলনা। অপরদিকে তাঁদের নেককর্ম, সততা, ইবাদত বন্দেগী ও দরবেশির কারণে সাধারণ মুসলিম ও আলিমগণ তাঁদের ভালবাসতেন ও অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। তাঁদের কথাবার্তা আগ্রহের সাথে গ্রহণ করতেন ও বর্ণনা করতেন। অনেক সময় ভাল মুহাদ্দিসও তাঁদের আমল আখলাকে ধোঁকা খেয়ে তাঁদের বানোয়াট ও মিথ্যা হাদীস অসতর্কভাবে গ্রহণ করে নিতেন। (মুল্লা আলী কারী, শারহু শারহি নুখবাতুল ফিকর, পৃ. ৪৪৭-৪৪৮)।
১.৫.৪. আমীরদের মোসাহেবগণ
উপরে ব্যাখ্যাত উদ্দেশ্যগুলি মূলত ধর্মীয়। ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছাড়াও জাগতিক বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অনেক মানুষ হাদীস বানিয়েছে অর্থ কামাই, সম্মান বা সুনাম অর্জন, রাজা-বাদশাহদের দৃষ্টি আকর্ষণ, দরবারে মর্যাদা লাভ, রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে তারা হাদীস বানিয়েছে।
শাসক-প্রশাসকদের কাছে যাওয়ার ও তাদের প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য মানুষ অনেক কিছুই করে থাকে। দ্বিতীয় হিজরী শতকে কোনো কোনো দুর্বল ঈমান ‘আলিম’ খলীফা বা আমীরদের মন জয় করার জন্য তাদের পছন্দ মোতাবেক হাদীস বানানোর চেষ্টা করেছেন। এই ধরনের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তৃতীয় হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস যুহাইর ইবুন হারব(২৩৪ হি) বলেনঃ তৃতীয় আব্বাসী খলীফা মুহাম্মাদ মাহদী(রাজত্বকাল ১৫৮-১৬৯ হি) এর দরবারে কয়েকজন মুহাদ্দিস আগমন করেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন গিয়াস ইবনু ইবরাহীম আন-নাখায়ী। খলীফা মাহদী উন্নত জাতের কবুতর উড়াতে ও কবুতরের প্রতিযোগিতা করাতে ভালবাসতেন। খলীফার পছন্দের দিকে লক্ষ্য করে গিয়াস নামক ঐ ব্যক্তি তার সনদ উল্লেখ করে বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ ‘তীর নিক্ষেপ, ঘোড়া ও পাখি ছাড়া আর কিছুতে প্রতিযোগিতা নেই।’ একথা শুনে মাহদী খুশী হন এবং উক্ত মুহাদ্দিসকে ১০ হাজার টাকা হাদীয়া প্রদানের নির্দেশ দেন। কিন্তু যখন গিয়াস দরবার ত্যাগ করছিলেন তখন মাহদী বলেন, আমি বুঝতে পারছি যে, আপনি মিথ্যা বলেছেন। আমি আপনাকে মিথ্যা বলতে প্ররোচিত করেছি। তিনি কবুতরগুলি জবাই করতে নির্দেশ দেন। তিনি আর কখনো উক্ত মুহাদ্দিসকে তার দরবারে প্রবেশ করতে দেননি।(খতীব বাগদাদী, আহমদ ইবনু আলী, তারীখ বাগদাদ ১২/৩২৩-৩২৪)।
এখানে লক্ষণীয় যে, মূল হাদীসটি সহীহ, যাতে ঘোড়দৌড়, উটদৌড় ও তীর নিক্ষেপে প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার প্রদানে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। [তিরমিযী, মুহাম্মাদ ইবনু ঈসা(২৭৯ হি), আস-সুনান ৪/২০৫]। এই ব্যক্তি খলীফার মনোরঞ্জনের জন্য সেখানে পাখি শব্দটি যোগ করেছে।
পঞ্চম আব্বাসী খলীফা হারুন আর রাশীদ(শাসনকাল ১৯৩-১৭০ হি) রাষ্ট্রীয় সফরে মদীনা আগমন করেন। তিনি মসজিদের নববীর মিম্বারে উঠে বক্ততা প্রদানের ইচ্ছা করেন। তাঁর পরনে ছিল কাল শেরওয়ানী। তিনি এই পোশাকে মিম্বারে নববীতে আরোহন করতে দ্বিধা করছিলেন। মদীনার মশহুর আলিম ও বিচারক ওয়াহব ইবনু ওয়াহব আবুল বুখতুরী তখন বলেনঃ আমাকে জা’ফর সাদিক বলেছেন, তাঁকে তাঁর পিতা মুহাম্মাদ আল বাকির বলেছেন, জিবরাঈল (আ)কালো শেরোয়ানী পরিধান করে রাসূলুল্লাহ(স) এর নিকট আগমন করেন। (খতীব বাগদাদী, তারিখ বাগদাদ ১৩/৪৫২)।
এভাবে তিনি খলীফার মনোরঞ্জনের জন্য একটি মিথ্যা কথাকে হাদীস বলে চালালেন। আবুল বুখতুরী হাদীস জালিয়াতিতে খুবই পারদর্শী ছিলেন।
১.৫.৫. গল্পকার ওয়ায়েযগণ
ওয়াযের মধ্যে শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ, মনোরঞ্জন, তাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার ও নিজের সুনাম, সুখ্যাতি ও নগদ উপার্জন বৃদ্ধির জন্য অনেক মানুষ ওয়াযের মধ্যে বানোয়াট কথা হাদীস নামে বলেছেন। মিথ্যা ও জাল হাদীসের প্রসারে এসকল ওয়ায়েয ও গল্পকারদের ভূমিকা ছিল খুব বড়। হাদীসের নামে মিথ্যা কথা বানিয়ে বলতে এদের মিথ্যা কথা ও প্রত্যুৎপন্নমতিতা ছিল খুব বেশি। তাদের অনেকেই শ্রোতাদের অবাক করে পকেট খালি করার জন্য শ্রোতাদের চাহিদা মত মিথ্যা বানিয়ে নিতেন দ্রুত। এছাড়া কোনো জালিয়াতের জাল হাদীস বা গল্প কাহিনী আকর্ষণীয় হলে অন্যান্য ওয়ায়িয জালিয়াতরা তা চুরি করত এবং নিজের নামে সনদ বানিয়ে প্রচার করত।(ফাল্লাতা, আল ওয়াদউ ১/২৭২-২৭৯)।
এদের বুদ্ধি ও দুঃসাহসের নমুনা দেখুন। তৃতীয় হিজরী শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন(২৩৩ হি) ও ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল(২৪১ হি)। তৃতীয় হিজরী শতকের প্রথমার্ধে বাগদাদে ও পুরো মুসলিম বিশ্বে তাঁদের পরিচিতি। তাঁরা দুজন একদিন বাগদাদের এক মসজিদে সালাত আদায় করেন। সালাতের পরে এজন ওয়ায়িয ওয়ায করতে শুরু করেন। ওয়াযের মধ্যে তিনি বলেন, আমাকে আহমাদ ইবনু হাম্বাল ও ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন দুজনেই বলেছেন, তাঁদেরকে আব্দুর রাযযাক, তাঁকে মা’মার, তাঁকে কাতাদাহ, তাঁকে আনাস বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “যদি কেউ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে তবে এর প্রত্যেক অক্ষর থেকে একটি পাখি তৈরি করা হয়, যার ঠোঁট স্বর্ণের, পালকগুলি মহামূল্যবান পাথরের……..। এভাবে সে আজগুবি গল্প ও অনেক সাওয়াবের কাল্পনিক কাহিনী বর্ণনা করে।ওয়ায শেষে উপস্থিত শ্রোতাদের অনেকেই তাকে কিছু কিছু ‘হাদীয়া’ প্রদান করেন।
ওয়ায চলাকালীন আহমদ ও ইয়াহইয়া অবাক হয়ে একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করেন, এ হাদীস কি আপনি ঐ ব্যক্তিকে বলেছেন? উভয়েই বলেন, জীবনে আজই প্রথম হাদীসটি শুনেছি। ওয়ায শেষে মানুষের ভীড় কম পেয়ে ইয়াহইয়া লোকটিকে কাছে আসতে ইঙ্গিত করে। লোকটি কিছু হাদীয়া পাবে ভেবে তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসে। ইয়াহইয়া তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ হাদীসটি তোমাকে কে বলেছে? লোকটি জবাব দিল, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন ও আহমদ ইবনু হাম্বাল। তিনি বলেন, আমিতো ইয়াহইয়া আর ইনি আহমদ। আমরা দুজনের কেউই এ হাদীস জীবনে শুনিনি, কাউকে শেখানোতো দূরের কথা। মিথ্যা যদি বলতেই হয় তবে অন্য কারো নামে বল, আমাদের নামে বলবেনা। তখন লোকটি বলে, আমি সবসময় শুনতাম যে, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন লোকটি আহম্মক, এখন তার প্রমাণ পেলাম। ইয়াহইয়া বললেন, কিভাবে? সে বলে, আপনারা কি মনে করেন যে, দুনিয়াতে আপনারা ছাড়া আর কোনো ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন ও আহমদ ইবনু হাম্বাল নেই? আমি আপনার সাথী আহমদ ছাড়া ১৬ জন আহমদ ইবনু হাম্বাল এর কাছে হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করেছি। একথা শুনে আহমদ ইবনু হাম্বাল মুখে কাপড় দিয়ে বলেন, লোকটিকে যেতে দিন। লোকটি দুজনের দিকে উপহাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেল। (ইবনুল জাউযী, আল মাউদূয়াত ১/২১-২২)।
৪র্থ হিজরী শতকের অন্যতম মুহাদ্দিস আবু হিতাম মুহাম্মাদ ইবনু হিব্বান আল বুসুতী(৩৫৪ হি) বলেনঃ আমি আমার হাদীস সংগ্রহের সফরকালে সিরিয়ার ‘তাজরোয়ান’ নামক শহরে প্রবেশ করি। শহরের জামে মসজিদে সালাত আদায়ের পরে এক যুবক দাঁড়িয়ে ওয়ায শুরু করে। ওয়াযের মধ্যে সে বলে, আমাকে আবু খালীফা বলেছেন, তাঁকে ওয়ালীদ বলেছেন, তাঁকে শু’বা বলেছেন, তাঁকে কাতাদাহ বলেছেন, তাঁকে আনাস (রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, যদি কেউ কোনো মুসলিমের প্রয়োজন পূরণ করে তাহলে আল্লাহ তাকে এত এত পুরস্কার প্রদান করেন…..এভাবে সে অনেক কথা বলে। তার কথা শেষ হলে আমি তাকে ডেকে বললাম, তোমার বাড়ি কোথায়? সে বলেঃ আমি বারদায়া এলাকার মানুষ। আমি বললা, তুমি কি কখনো বসরায় গিয়েছ? সে বললঃ না। তাহলে কিভাবে তুমি আবু খালীফা থেকে হাদীস বর্ণনা করছ, অথচ তুমি তাঁকে কখনো দেখনি? যুবকটি বললঃ এ বিষয়ে প্রশ্ন করা ভদ্রতা ও আদাবের খেলাফ। এই একটি মাত্র সনদই আমার মুখস্ত আছে। আমি যখনই কোনো হাদীস বা কথা কারো কাছে শুনি, আমি তখন সেই কথার আগে এই সনদটি বসিয়ে দিয়ে কথাটি বর্ণনা করি। ইবনু হিব্বান বলেন, তখন আমি যুবকটিকে রেখে চলে আসলাম।(ইবনুল জাউযী, আল মাউদূআত ১/২২)।
৬ষ্ঠ হিজরী শতকের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আবুল ফারাজ ইবনুল জাউযী(৫৯৭ হি) বলেন, আমার এলাকায় একজন ওয়ায়িয আছেন। তিনি বাহ্যত পরহেযগার ও আল্লাহভীরু মানুষ। কাজে কর্মে দরবেশী ও তাকওয়া প্রকাশ করেন। তার বিষয়ে আমার দুজন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য আলিম বন্ধু বলেছেন, এক আশুরার দিনে ঐ লোকটি বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, যে আশুরার দিনে এই কাজ করবে তার এই পুরস্কার, যে এই কাজ করবে তার এই পুরস্কার……..এভাবে অনেক কাজের অনেক পুরস্কার বিষয়ক হাদীস তিনি বলেন। আমরা জিজ্ঞেস করলা, এই হাদীসগুলি আপনি কোথা হতে মুখস্ত করলেন? তিনি বলেনঃ আল্লাহর কসম, আমি কখনো এই হাদীসগুলি শিখিনি বা মুখস্ত করিনি। এই মুহুর্তেই এগুলি আমার মনে এল এবং আমি বললাম।(ইবনুল জাউযী, আল মাউদূআত ১/২০)।
ইবনুল জাউযী বলেন, আমার সমকালীন একজন ওয়ায়িয এ সকল মিথ্যা হাদীস দিয়ে একটি বইও লিখেছে। সেই বইয়ের একটি জাল হাদীস নিম্নরূপঃ একদিন হাসান(রা) ও হুসাইন (রা) খলীফা উমার(রা) এর ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। উমার(রা) ব্যস্ত ছিলেন। হাতের কাজ শেষ করে মাথা উঠিয়ে তিনি তাঁদের দুজনকে দেখতে পান। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁদেরকে চুমু থান, প্রত্যেককে ১০০০ মুদ্রা প্রদান করেন এবং বলেন, আমাকে ক্ষমা করুন, আমি আপনাদের আগমন বুঝতে পারিনি। তাঁরা দুজনে ফিরে যেয়ে তাঁদের পিতা আলী(রা) এর নিকট উমরের(রা) আদব ও বিনয়ের কথা উল্লেখ করেন। তখন আলী(রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ(স) কে বলতে শুনেছি, উমার ইবনুল খাত্তাব ইসলামের নূর ও জান্নাতবাসীদের প্রদীপ। তাঁরা দুজনে উমারের(রা) কাছে ফিরে যেয়ে তাঁকে এই হাদীস শোনান। তখন তিনি কাগজ ও কালি চেয়ে নিয়ে লিখেনঃ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, জান্নাতের যুবকদের দুই নেতা আমাকে বলেছেন যে, তাঁরা তাঁদের পিতা আলী মুরতুযা থেকে, তাঁদের নানা নবী মুসতাফা(স) থেকে, তিনি বলেছেন, উমার ইসলামের নূর ও জান্নাতবাসীদের প্রদীপ। উমার ওসীয়ত করেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর যেন তাঁর কাফনের মধ্যে বুকের উপরে কাগজটি রাখা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর ওসীয়ত মত কাজ করা হয়। পরদিন সকালে সকলে দেখতে পান যে, কাগজটি কবরের উপরে রয়েছে এবং তাতে লিখা রয়েছেঃ হাসান ও হুসাইন সত্য বলেছেন, তাঁদের পিতা সত্য বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) সত্য বলেছেন, উমার ইসলামের নূর ও জান্নাতবাসীদের প্রদীপ।
ইবনুল জাউযী বলেন, সবচেয়ে দুঃখ ও আফসোসের বিষয় হলো, এই জঘন্য মিথ্যা ও আজগুবি কথা লিখেই সে সন্তুষ্ট থাকেনি। আমাদের যুগের অনেক আলিমকে তা দেখিয়েছে। হাদীসের সনদ ও বিশুদ্ধতাবিষয়ক জ্ঞানের অভাব আলিমদের মধ্যেও এত প্রকট যে, অনেক আলিম এই জঘন্য মিথ্যাকেও সঠিক বলে উল্লেখ করেছেন। (ইবনুল জাউযী, আল মাউদূআত ১/২০-২১)।
১.৫.৬. আঞ্চলিক, পেশাগত বা জাতিগত বৈরিতা
বিভিন্ন বংশ, জাতি, দেশ বা শহরের মানুষেরা নিজেদের প্রাধান্য বা মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক সময় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। আরব জাতি ও আরবী ভাষার পক্ষে , ফার্সী ভাষা ও পারসিক জাতির বিপক্ষে হাদীস বানানো হয়েছে। অনুরূপভাবে ফার্সী ভাষার পক্ষে ও আরবী ভাষার বিপক্ষে হাদীস জালিয়াতি করা হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণের বা পেশার পক্ষে বা বিপক্ষে হাদীস বানানো হয়েছে। এ সকল বানোয়াট কথার মধ্যে রয়েছেঃ ‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত ভাষা হলো ফার্সী ভাষা।’ ‘আল্লাহ যখন ক্রোধান্বিত হন তখন আরবীতে ওহী নাযিল করেন, যখন সন্তুষ্ট থাকেন তখন ফার্সীতে ওহী নাযিল করেন।’ ‘আরশের আশেপাশে যে সকল ফেরেশতা রয়েছেন তাঁরা ফার্সী ভাষায় কথা বলেন।’ অনুরূপভাবে তাঁতীদের বিরুদ্ধে, স্বর্ণকারদের বিরুদ্ধে ও অন্যান্য পেশার বিরুদ্ধে কুৎসা ও নিন্দামূলক হাদীস তৈরি করা হয়েছে পেশাগত হিংসাহিংসির কারণে।
বিভিন্ন শহর, দেশ বা জনপদের ফযীলতে বা নিন্দায় হাদীস বানানো হয়েছে। বলতে গেলে তৃতীয় হিজরী শতকের পরিচিত প্রায় সকল শহর বা দেশের প্রশংসায় বা নিন্দায় হাদীস বানানো হয়েছে। মক্কা, মদীনা ইত্যাদি যে সকল শহরের ফযীলতে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে সেগুলির জন্যও অনেক চিত্তাকর্ষক জাল হাদীস বানানো হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুনঃ ইবনুল জাউযী, আল-মাউদূআত ১/৩৫৭-৩৭৩, ২/১৪৭-১৬১; ফাল্লাতা, আল ওয়াদউ ১/২৬০-২৬৩)।
১.৫.৭. প্রসিদ্ধির আকাঙ্খা
আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, তৎকালীন যুগে সনদ ও মতন ছিল হাদীসের দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সনদ ও মতনের সম্মিলিত রূপকেই হাদীস বলা হত। এই সমন্বিতরূপের হাদীস মুহাদ্দিসগণের কাছে সুপরিচিত ছিল। অনেক সময় কোনো মুহাদ্দিস প্রসিদ্ধির বা স্বকীয়তার জন্য এই সমন্বিত রূপের মধ্যে পরিবর্তন আনতেন। এক সনদের হাদীস অন্য সনদে বা এক রাবীর হাদীস অন্য রাবীর নামে বর্ণনা করতেন। মিথ্যার প্রকারভেদের মধ্যে আমরা মিথ্যা সনদ বানানোর বিষয়ে দু একটি উদাহরণ উল্লেখ করব, ইনশাল্লাহ।
১.৬. মিথ্যার প্রকারভেদ
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় ‘হাদীসের নামে মিথ্যা’ বলার বিভিন্ন প্রকার ও পদ্ধতি রয়েছে। এই অনুচ্ছেদে আমরা সেইগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করবো ইনশাল্লাহ।
১.৬.১. সনদে মিথ্যা
‘সনদ’ ও ‘মতন’ এর সম্মিলিত রূপই হাদীস। হাদীস বানাতে হলে সনদ জালিয়াতি অত্যাবশ্যক। আবার অনেক সময় সনদ জালিয়াতিই ছিল জালিয়াতের মূখ্য উদ্দেশ্য। মিথ্যাবাদীগণ তাদের উদ্দেশ্য ও সামর্থ্য অনুসারে সনদে জালিয়াতি করত। এসব জালিয়াতি কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়।
১.৬.১.১. বানোয়াট কথার জন্য বানোয়াট সনদ,
সনদ ছাড়া কোনো হাদীস গ্রহণ করা হতোনা। কাজেই একটি মিথ্যা কথাকে হাদীস বলে চালাতে হলে তার সাথে একটি হাদীস বলতে হবে। অধিকাংশক্ষেত্রে জালিয়াতগণ নিজেদের মনগড়াভাবে বিভিন্ন সুপরিচিত আলিমদের নামে সনদ বানিয়ে নিত। অথবা তাদের মুখস্ত কোনো সনদ বিভিন্ন বানোয়াট হাদীসের আগে জুড়ে দিত। আমরা ইতোপূর্বে আলোচিত বিভিন্ন বানোয়াট হাদীসে তা দেখতে পেয়েছি। এভাবে অধিকাংশ বানোয়াট হাদীসের সনদও মনগড়া। একটি উদাহরণ দেখুনঃ
ইমাম ইবনু মাজাহ বলেন, আমাকে সাহল ইবনু আবী সাহল ও মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল বলেছেন তাদেরকে আব্দুস সালাম ইবনু সালিহ আবুস সালাত হারাবী বলেছেনঃ আমাকে আলী রেযা, তিনি তাঁর পিতা মূসা কাযিম, তিনি তাঁর পিতা জাফর সাদিক, তিনি তাঁর পিতা মুহাম্মাদ বাকির, তিনি তার পিতা আলী যাইনুল আবেদীন, তিনি তাঁর পিতা ইমাম হুসাইন(রা), তিনি তাঁর পিতা আলী(রা) হতে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “ঈমান হলো অন্তরের মা’রিফাত বা জ্ঞান, মুখের কথা ও বিধিবিধান অনুসারে কর্ম করা।”
তাহলে অন্তরের জ্ঞান, মুখের স্বীকৃতি ও কর্মের বাস্তবায়নের সামষ্টিক নাম হলো ঈমান। কথাটি খুবই আকর্ষণীয়। অনেক তাবেয়ী ও পরবর্তী আলিম এভাবে ঈমানের পরিচয় প্রদান করেছেন। ইমাম মালিক, শাফেয়ী, আহমদ ইবনু হাম্বাল প্রমুখ এই মত গ্রহণ করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা বলেনঃ ঈমান মূলত মনের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতির নাম। কর্ম ঈমানের অংশ নয় বরং দাবি ও পরিণতি। ঈমান ও কর্মের সমন্বয়ে ইসলাম। এই হাদীসটি সহীহ হলে তা ইমাম আবু হানীফার মতের বিভ্রান্তি প্রমাণ করে। কিন্তু মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষায় হাদীসটি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে।
পাঠক লক্ষ্য করুন। এই হাদীসের রাবীগণ রাসূলুল্লাহ(স) এর বংশের অন্যতম বুযুর্গ ও শিয়া মাযহাবের ১২ ইমামের ৭ জন। এজন্য সহজেই আমরা সরলপ্রাণ মুসলমানরা ধোঁকা খেয়ে যাই। কিন্তু রাসূলুল্লাহ(স) এর সুন্নাতের হেফাজতে নিয়োজিত মুহাদ্দিসগণকে এভাবে প্রতারণা করা সম্ভবপর ছিলনা। তাঁরা তাঁদের নিয়মে হাদীসটি নিরীক্ষা করেছেন। তাঁরা তাঁদের নিরীক্ষায় দেখেছেন যে, সনদে উল্লেখিত ৭ প্রসিদ্ধ ইমাম এর কোনো ছাত্র এই হাদীসটি বর্ণনা করেননি এবং অন্য কোনো সনদেও হাদীসটি বর্ণিত হয়নি।
শুধুমাত্র আব্দুস সালাম আবুস সালাত দাবি করলেন যে, ইমাম আলী রেযা(২০৩ হি) তাকে এই হাদীসটি বলেছেন। এভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর ইন্তিকালের ২০০ বছর পরে এসে আবুস সালত নামের এই ব্যক্তি হাদীসটি প্রচার করেছেন। মুহাদ্দিসগণ তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখেছেন যে, আব্দুস সালাম আবুস সালাত নামক এই ব্যক্তি অনেক হাদীস শিক্ষা করেছেন ও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তার বর্ণিত হাদীসের মধ্যে অনেক ভুল। তিনি এমন সব হাদীস বিভিন্ন মুহাদ্দিস বা আলিম এর নামে বলেন যা তাদের অন্য কোনো ছাত্র বলেননা। এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি হাদীস ঠিকমত মুখস্ত রাখতে পারতেননা। তবে তিনি ইচ্ছাকৃত মিথ্যা হাদীস বলতেন কিনা তা নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন ও কতিপয় ইমাম বলেছেন যে, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ভাল ছিলেন বলেই দেখা যায়। শিয়া হলেও বাড়াবাড়ি করতেননা। কিন্তু তিনি অগণিত উল্টাপাল্টা ও ভিত্তিহীন(মুনকার) হাদীস বলেছেন যা আর কোনো বর্ণনাকারী কখনো বর্ণনা করেননি। তবে তিনি ইচ্ছা করে মিথ্যা বলতেননা বলে বুঝা যায়। অপরপক্ষে আল জুযানী, উকাইলী প্রমুখ ইমাম বলেছেন যে, তিনি মিথ্যাবাদী ছিলেন। (বিস্তারিতঃ ইবনু হাজার আসকালানী, তাহযীবুত তাহযীব ৬/২৮৫-২৮৬, তাকরীবুত তাহযীব, পৃ. ৩৫৫)।
যারা তিনি অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে মন্তব্য করেছেন, তাঁরা হাদীসটিকে বাতিল, ভিত্তিহীন, খুবই যয়ীফ ইত্যাদি বলে অভিহিত করেছেন। আর যারা তাকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাবাদী বলে দেখেছেন, তাঁরা হাদীসটিকে মাওযূ বা বানোয়াট বলে অভিহিত করেছেন। (আল-বুসীরী, যাওয়াইদ ইবনু মাজাহ, পৃ.৩৭)।
অষ্টম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইবনুল কাইয়িম মুহাম্মাদ ইবুন আবু বাকর(৭৫১ হি) হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং আমলকে ঈমানের অংশ বলে গণ্য করতেন। তাঁর মতে ঈমান হলো অন্তরের জ্ঞান, মুখের স্বীকৃতি ও বিধিবিধান পালন। তিনি এই মতের পক্ষে দীর্ঘ আলোচনার পরে বলেন, তবে এই বিষয়ে আব্দুস সালাম ইবনু সালিহ বর্ণিত যে হাদীসটি ইবনু মাজাহ সংকলন করেছেন, সে হাদীসটি মাউযূ, তা রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা নয়।(ইবনুল কাইয়েম, হাশিয়াত আবী দাউদ ১২/২৯৪)।
আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এই সনদের সকল রাবী অত্যন্ত প্রসিদ্ধ সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। এ হলো জাল হাদীসের একটি বৈশিষ্ট্য। অধিকাংশক্ষেত্রে জালিয়াতগণ তাদের জালিয়াতি চালানোর জন্য প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সনদ তৈরি করতো। তাদের এই জালিয়াতি সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিলেও নিরীক্ষক মুহাদ্দিসদের ধোঁকা দিতে পারতোনা। কারণ সনদে জালিয়াতের নাম থেকে যেতে। জালিয়াত যাকে উস্তাদ বলে দাবী করত, তার নাম থাকত। উস্তাদের অন্যান্য ছাত্রের বর্ণিত হাদীস এবং এই জালিয়াতের বর্ণিত হাদীসের তুলনা ও নিরীক্ষার মাধ্যমে মুহাদ্দিসগণ জালিয়াতি ধরে ফেলতেন।
জালিয়াতির আরেকটি উদাহরণ দেখুন। ইসমাঈল ইবুন যিয়াদ দ্বিতীয় হিজরী শতকের এজন হাদীস বর্ণনাকারী। তিনি বলেনঃ আমাকে সাওর ইবনু ইয়াযিদ (১৫৫ হি) বলেছেন, তিনি খালিদ ইবনু মা’দান থেকে(মৃ. ১০৩ হি), তিনি মু’আয ইবনু জাবাল থেকে বর্ণনা করেছেন, আমরা বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমরা কি বিনা ওযূতে কুরআন স্পর্শ করতে পারব? তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, তবে যদি গোসল ফরয হয়ে থাকে তাহলে কুরআন স্পর্শ করবেনা। আমরা বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, তাহলে কুরআনের বাণী ‘পবিত্রগণ ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করেনা’ (সূরা ওয়াকিয়াঃ ৭৯) এর অর্থ কি? তিনি বলেনঃ এর অর্থ হলো- কুরআনের সাওয়াব মুমিনগণ ছাড়া কেউ পাবেনা।”
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই হাদীসটি বানোয়াট। হাদীসের ইমামগণ ইসমাঈল ইবু যিয়াদ(আবী যিয়াদ) নামক এই ব্যক্তির বর্ণিত হাদীসসমূহ সংগ্রহ করে অন্যান্য সকল বর্ণনার সাথে তুলনামূলক নিরীক্ষা করে দেখতে পেয়েছেন যে, এই ব্যক্তির বর্ণিত হাদীস কোনোটিই সঠিক নয়। তিনি একজন ভাল আলিম ছিলেন এবং মাওসিল নামক অঞ্চলের কাযী বা বিচারক ছিলেন। কিন্তু তিনি শু’বা(১৬০ হি), ইবনু জুরাইজ(১৫০ হি), সাওর(১৫৫ হি) প্রমুখ তৎকালীন বিভিন্ন সুপরিচিত মুহাদ্দিসের নামে এমন অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন যা তারা কখনো বলেননি বা তাদের কোনো ছাত্র তাদের থেকে বর্ণনা করেননি।
যেমন এখানে সাওর এর নামে হাদীসটি বলেছেন তিনি। সাওর দ্বিতীয় হিজরী শতকের সিরিয়ার অন্যতম প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও ফকীহ ছিলেন। তাঁর অগণিত ছাত্র ছিল। অনেকে বছরের পর বছর তাঁর কাছ হতে হাদীস শিক্ষা করেছেন। কোনো ছাত্রই তাঁর কাছ হতে হাদীসটি বর্ণনা করেনি। অথচ ইসমাঈল তার নামে হাদীসটি বললেন। অবস্থা দেখে মনে হয় তিনি ইচ্ছাপূর্বক এভাবে বানোয়াট হাদীস বলতেন। ইমাম দারকুতনী, ইবনু আদী, ইবনুল হিব্বান, ইবনুল জাউযী ও অন্যান্য ইমাম এ সকল বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, তাকে দাজ্জাল ও মিথ্যাবাদী বলেছেন। তার বর্ণিত সকল হাদীস, যা একমাত্র তিনিই বর্ণনা করেছেন, অন্য কেউ বর্ণনা করেননি, এরূপ সকল হাদীসকে তাঁরা মাওযূ বা বানোয়াট বলে গণ্য করেছেন।
এই ইসমাঈল বর্ণিত আরেকটি বানোয়াট ও মিথ্যা কথা যা তিনি রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেনঃ তিনি বলেনঃ আমাকে গালিব আল কাত্তান, তিনি আবু সাঈদ মাকরাবী থেকে তিনি আবু হুরাইরা(রা) হতে বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ভাষা হলো ফার্সী ভাষা, আর জান্নাতের অধিবাসীদের ভাষা হলো আরবী ভাষা।” (ইবনু আদী, আল কামিল ১/৫১০-৫১১, ইবনু হিব্বান, মাজরুহীন ১/১২৯)।
১.৬.১.২. প্রচলিত হাদীসের জন্য বানোয়াট সনদ
আমরা দেখেছি যে, অনেক সময় জালিয়াতের উদ্দেশ্য হতো নিজের স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য তারা প্রচলিত মতন বা বক্তব্যের জন্য বিশেষ সনদ তৈরি করত। এখানে একটি উদাহরণ উল্লেখ করছি।
ইমাম মালিক দ্বিতীয় হিজরী শতকের মুহাদ্দিসগণের অন্যতম ইমাম। তিনি তাঁর উস্তাদ নাফী থেকে আব্দুল্লাহ ইবনু উমারের সূত্রে রাসূলুল্লাহ (স) থেকে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। এজন্য “মালিক, নাফি থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার থেকে” অত্যন্ত সহীহ ও অতি প্রসিদ্ধ সনদ। এই সনদে বর্ণিত সকল মুহাদ্দিসগণের নিকট সংরক্ষিত।
তৃতীয় হিজরী শতকের একজন রাবী আব্দুল মুনইম ইবনু বাশীর বলেন, আমাকে মালিক বলেছেন, তিনি নাফি থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ থেকে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য তাদের সকলের সময়ে বরকত দান করুন।” [খালীলী, খালীল ইবনু আব্দুল্লাহ (৪৪৬ হি), আল ইরশাদ, পৃ. ৭]।
৫ম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আল্লামা খালীল ইবনু আব্দুল্লাহ আল খালীলী (৪৪৬ হি) বলেনঃ এটি একটি মাউদূ বা বানোয়াট হাদীস। আব্দুল মুনইম নামক এই ব্যক্তি ছিল একজন মিথ্যাবাদী জালিয়াত। ইমাম আহমদের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, আমি একদিন তোমার পিতাকে বললামঃ আমি আবদুল মুনইম ইবনু বাশীরকে বাজারে দেখলাম। তিনি বলেনঃ বেটা, সেই মিথ্যাবাদী জালিয়াত এখনো বেঁচে আছে? এই হাদীস এই সনদে একেবারেই ভিত্তিহীন ও অস্তিত্বহীন। কখনোই কেউ তা মালিক থেকে বা নাফি থেকে বর্ণনা করেনি। এই হাদীস মূলত সাখার আল গামিদী নামক সাহাবী রাসূলুল্লাহ(স) হতে বর্ণনা করেছেন।(খালীলী, আল ইরশাদ, পৃ. ৭)।
এখানে আমরা দেখছি যে, আল্লামা খালীলী হাদীসটিকে মাওযূ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আবার তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে্, হাদীসটি অন্য সাহাবী থেকে বর্ণিত। তাঁর উদ্দেশ্য হলো, এই সনদে এই হাদীসটি মাউদূ। এই সনদ ও মতনের সম্মিলিত রূপটি বানোয়াট। তিনি সংক্ষেপে মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষার ফলাফলও বলে দিয়েছেন। ইমাম মালিকের অগণিত ছাত্রের কেউ এই হাদীসটি তাঁর সূত্রে এই সনদে বর্ণনা করেননি। একমাত্র আব্দুল মুনইম দাবি করেছে যে, ইমাম মালিক তাঁকে হাদীসটি বলেছেন। আর আব্দুল মুনইম এর বর্ণিত অন্যান্য সকল হাদীসের আলোকে মুহাদ্দিসগণ তার মিথ্যাচার ধরেছেন এবং তাকে মিথ্যাবাদী বলে চিহ্নিত করেছেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, এই হাদীসের মতনটি মিথ্যা। মতনটি অন্য বিভিন্ন সনদে সাখর আল গামিদী ও অন্যান্য সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষায় তা সহীহ বলে প্রমাণিত হয়েছে। (তিরমিযী, আস-সুনান ৩/৫১৭, ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/৭৫২)।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, আব্দুল মুনইম একটি প্রচলিত ও সহীহ মতন এর জন্য একটি সুপ্রসিদ্ধ সহীহ সনদ জাল করেছে। আর সেই যুগে প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য এইরূপ বানোয়াট সনদের কি গুরুত্ব ছিল তা আমাদের যুগে এসে অনুধাবন করা অসম্ভব। মুহাদ্দিসগণ সাখার আল গামিদীর সূত্রে হাদীসটি জানতেন। কিন্তু তাঁরা যখনই শুনেছেন যে, অমুক শহরে এক ব্যক্তি মালিকের সূত্রে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তখন তাঁরা তার কাছে গিয়েছেন, তার হাদীস লিখেছেন ও নিরীক্ষা করেছেন। যখন নিরীক্ষার মাধ্যমে লোকটির জালিয়াতি ধরা পড়েছে তখন তারা তা প্রকাশ করেছেন। আবার অন্যান্য মুহাদ্দিস তার কাছে গিয়েছেন। মোটামুটি লোকটি বেশ মজা অনুভব করছে যে, কত মানুষ তার কাছে হাদীস শুনতে আসছে! কিভাবে সে সবাইকে বোকা বানাচ্ছে!! কিন্তু তার জালিয়াতি যে ধরা পড়বে তা নিয়ে সে মাথা ঘামায়নি। কোনো জালিয়াতই ধরা পড়ার চিন্তা করে জালিয়াতি করেনা।
ইবরাহীম ইবনুল হাকাম ইবনু আবান তৃতীয় হিজরী শতকের একজন হাদীস বর্ণনাকারী। তিনি এভাবে হাদীস বর্ণনায় কিছু জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণ করতেন। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বাল এর মত প্রসিদ্ধ ইমামও তার কাছে হাদীস শিখতে গমন করেন। ইমাম আহমদ পরবর্তীকালে বলতেনঃ “ইবরাহীম ইবনুল হাকামের কাছে হাদীস শিখতে বাগদাদ হতে ইয়ামেনের এডেন পর্য্ন্ত সফর করলাম। সফরের টাকাগুলি ‘ফী সাবিলিল্লাহ’ চলে গেল।”(ইবনুল জাউযী, আদ-দুআফা ওয়াল মাতরূকীন ১/৩০)।
১.৬.১.৩. সনদের মধ্যে কম বেশি করা
রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা যেভাবে শুনতে হবে ঠিক অবিকল সেভাবেই বলতে হবে। সনদের মধ্যে কোনোরূপ কম বেশি বলাও তাঁর নামে মিথ্যা বলা। মুহাদ্দিসগণ এজন্য প্রচলিত সনদের মধ্যে কম বেশি করাকে বানোয়াটি ও জালিয়াতি বলে গণ্য করেছেন। মাউকূফ বা মাকতূ হাদীসকে অর্থাৎ সাহাবীর কথা বা তাবিয়ীর কথাকে মারফূ হাদীসরূপে বা রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা রূপে বর্ণনা করা, মুরসাল বা মুনকাতি হাদীসকে মুত্তাসিলরূপে বর্ণনা করা, সনদের কোনো একজন দুর্বল বর্ণনাকারীর পরিবর্তে অন্য একজন প্রসিদ্ধ বর্ণনাকারীর নাম ঢুকানো বা যে কোনো প্রকারে হাদীসের সনদের মধ্যে পরিবর্তন করা হাদীসের নামে মিথ্যাচার বলে গণ্য। এ ধরনের মিথ্যাচার ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত হতে পারে। ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচারী মিথ্যাবাদী বা জালিয়াত বলে গণ্য। অনিচ্ছাকৃত মিথ্যাচারী অগ্রহণযোগ্য, দুর্বল ও পরিত্যক্ত বলে গণ্য। এ বিষয়ে দুই একটি উদাহরণ দেখুন।
আবু সামারাহ আহমদ ইবনু সালিম ২য়-৩য় হিজরী শতকের একজন ‘রাবী’। তিনি বলেনঃ আমাদেরকে শরীক বলেছেন, আ’মাশ থেকে, তিনি আতিয়্যাহ থেকে তিনি আবু সাঈদ খুদরী থেকে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “আলী সকল সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ।”
হাদীসের ইমামগণ নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখেছেন যে, এই আবু সালামাহ আহমাদ ইবনু সালিম অত্যন্ত দুর্বল রাবী ছিলেন। তিনি বিভিন্ন আলিম ও মুহাদ্দিস থেকে তাদের নামে এমন সব হাদীস বর্ণনা করেছেন যা অন্য কেউ বর্ণনা করেননি। তার একটি মিথ্যা বা ভুল বর্ণনা হলো এই হাদীসটি। এই হাদীসটি শারীক ইবনু আব্দুল্লাহর অন্যান্য ছাত্রও বর্ণনা করেছেন। এছাড়া শারীকের উস্তাদ আ’মাশ থেকে শারীক ছাড়াও অন্য অনেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তারা বলেছেন, আ’মাশ থেকে, তিনি আতিয়্যাহ থেকে বলেছেন, হযরত জাবির বলতেনঃ “আমরা আলীকে আমাদের মধ্যে উত্তম বলে মনে করতাম।”
তাহলে আমরা দেখেছি যে, আবু সালামাহ ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে তিনটি বিষয় পরিবর্তন করেছেন।
প্র্রথমত, হাদীসটি আতিয়্যাহ জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন, অথচ আবু সালামাহ আতিয়্যার উস্তাদের নাম ভুল করে আবু সাঈদ খুদরী বলে উল্লেখ করেছেন। এভাবে তিনি সনদের মধ্যে সাহাবীর নাম পরিবর্তন করেছেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি হাদীসটির সনদ বা মতনও পরিবর্তন করেছেন।
তৃতীয়ত, তিনি সনদের মধ্যে পরিবর্তন করে জাবির এর কথাকে রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বলে চালিয়েছেন।
হাদীসটি মূলত জাবিরের(রা) নিজের কথা, অথচ তিনি একে রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর এটিই হলো সবচেয়ে মারাত্মক পরিবর্তন। কারণ এখানে রাসূলুল্লাহ(স) যা বলেননি তা তাঁর নামে বলা হয়েছে, যা অত্যন্ত বড় অপরাধ। কোনো সাহাবী, তাবেয়ী বা বুযুর্গের কথা বা জ্ঞানমূলক প্রবাদকে রাসূলুল্লাহ (স) এর কথা হিসেবে উল্লেখ করা মাওযূ বা বানোয়াট হাদীসের একটি বিশেষ প্রকার। আমরা একটু পরেই বিষয়টি আবার উল্লেখ করব, ইনশা আল্লাহ।(ইবনু আদী, আল কামিল ১/২৭৭-২৭৮)।
ইবরাহীম ইবনুল হাকাম ইবনু আবান তৃতীয় হিজরী শতকের একজন রাবী।তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে জালিয়াতি করতেন। তবে সনদের মধ্যে। তৃতীয় শতকের মুহাদ্দিস আব্বাস ইবনু আব্দুল আযীম বলেনঃ ইবরাহীম ইবনুল হাকাম তার পিতার সূত্রে তাবিয়ী ইকরিমাহ থেকে রাসূলুল্লাহ(স) হতে কিছু হাদীস শিক্ষা করেন ও লিখেন। এই হাদীসগুলি তার পান্ডুলিপিতে এভাবে মুরসাল রূপেই লিখিত ছিল, কোনো সাহাবীর নাম ছিলনা। পরবর্তী সময় তিনি এগুলিতে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, আবু হুরাইরা প্রমুখ সাহাবীর (রা) নাম উল্লেখ করে বর্ণনা করতেন। এই সনদগত মিথ্যাচারের ফলে তিনি গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন। (ইবনু আদী, আল কামিল ১/২৪১-২৪২)।
১.৬.১.৪. সনদ চুরি বা হাদীস চুরি
হাদীস জালিয়াতির ক্ষেত্রে মিথ্যাবাদীদের একটি বিশেষ পদ্ধতি হলো-চুরি। ‘হাদীস চুরি’ অর্থ হলো, কোনো মিথ্যাচারী রাবী অন্য একজন রাবীর কোনো হাদীস শুনে সেই হাদীস উক্ত রাবীর সূত্রে বর্ণনা না করে বানোয়াট সনদে তা বর্ণনা করবে। চুরি কয়েক প্রকারে হতে পারেঃ
ক. ‘চোর’ জালিয়াত মূল সনদ ঠিক রাখবে। তবে যার নিকট হতে হাদীসটি শুনেছে তার নাম না বলে তার উস্তাদের নাম বলবে এবং নিজেই সে উস্তাদের নিকট শুনেছে বলে দাবী করবে।
খ. চোর জালিয়াত মূল সনদের মধ্যে কিছু পরিবর্তন করবে। সনদের মধ্যে একজন রাবীর নাম পরিবর্তন করে সে নতুন সনদ বানাবে।
গ. চোর জালিয়াত হাদীসটির মতন এর মত নতুন সনদ বানাবে। একজন দুর্বল বা মিথ্যাচারী রাবীর বর্ণিত কোনো হাদীস তার মুখে বা কোনো স্থানে শুনে তার ভাল লাগে। হাদীসটির আকর্ষণীয়তার কারণে তারও ইচ্ছা হয় হাদীসটি বলার। তবে হাদীসটি মূল জালিয়াতের নামে বললে তার সম্মান কমে যায়। এছাড়া এতে আকর্ষণীয়তা ও নতুনত্ব থাকেনা। সেজন্য সে এই জাল হাদীসটির জন্য আরেকটি জাল সনদ তৈরি করবে।
জাল হাদীস চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে চুরির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দুর্বল বা জাল হাদীস অনেক সময় ১০/১৫ টি সনদে বর্ণিত থাকে। এতগুলি সনদ দেখে অনেক সময় মুহাদ্দিস ধোঁকা খেতে পারেন। তিনি ভাবতে পারেন, হাদীসের সনদগুলি দুর্বল হলেও যেহেতু এতগুলি সনদে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সেহেতু হয়ত এর কোনো ভিত্তি আছে। এক্ষেত্রে তাকে দুইটি বিষয় নিশ্চিত হতে হবে। প্রথমত, তাকে দেখতে হবে যে, প্রত্যেক সনদেই মিথ্যাবাদী রাবী আছে কিনা। যদি দেখা যায় যে, হাদীসটি নির্দিষ্ট কোনো যুগে নির্দিষ্ট কোনো রাবীর বর্ণনায় প্রসিদ্ধি লাভ করে। সেই যুগের মুহাদ্দিসগণ হাদীসটিকে সেই রাবীর হাদীস বলে চিহ্নিত করেছেন। এরপর কোনো কোনো দুর্বল বা জালিয়াত রাবী তা উক্ত রাবীর ওস্তাদ থেকে বা অন্য কোনো সনদে বর্ণনা করেছেন। এক্ষেত্রে বুঝা যাবে যে, পরের রাবীগণ ‘চুরি’ করেছেন।
এখানে চুরির কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করছি।
আমরা ইতোপূর্বে নেককারদের অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার উদাহরণ হিসেবে তৃতীয় হিজরী শতকের মাশহুর আবিদ সাবিত ইবনু মূসা(২২৯ হি) বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করেছি, যে হাদীসে বলা হয়েছেঃ ‘যার রাতের সালাত(তাহাজ্জুদ) অধিক হবে দিবসে তার চেহারা সৌন্দর্য্যময় হবে।’ এই হাদীসটি সর্বপ্রথম সাবিতই বলেন। মুহাদ্দিসগণ সাবিতের মুখে হাদীসটি শোনার পরে বিস্তারিত নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে, সাবিত ছাড়া ইতোপূর্বে কেউ হাদীসটি বলেননি। কিন্তু এই হাদীসটি সাবিতের মাধ্যমে পরিচিতি ও প্রসিদ্ধি লাভের পরে কোনো দুর্বল বা মিথ্যাচারী রাবী এই হাদীসটি সাবিতের উস্তাদ শারীক থেকে বা অন্যান্য সনদে বর্ণনা করেছেন। মুহাদ্দিসগণ এগুলিকে চুরি বলে চিহ্নিত করেছেন। এ সকল চোর জালিয়াতের একজন আব্দুল হামীদ ইবনু বাহর আবুল হাসান আসকারী, তিনি সাবিতের পরের যুগে দাবী করেন যে, তিনিও হাদীসটি শারীক থেকে শুনেছেন। ৪র্থ হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনু আদী বলেন, আমাকে হাসান ইবনু সুফিয়ান বলেছেন, আমাকে আব্দুল হামীদ ইবনু বাহর বলেছেন, আমাদেরকে শারীক বলেছেন, আ’মাশ থেকে, আবু সুফিয়ান থেকে জাবির থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি রাত্রে সালাত(তাহাজ্জুদ) আদায় করে তবে দিনে তার চেহারা সৌন্দর্য্যময় হবে।’ ইবনু আদী বলেন হাদীসটি সাবিত ইবনু মুসা হতে প্রসিদ্ধ। তার থেকে পরবর্তীতে অনেক দুর্বল রাবী হাদীসটি চুরি করেছে। আব্দুল হামীদ তাদের একজন। (ইবনু আদী, আল কামিল ৫/৩২২)।
চতুর্থ হিজরী শতকের একজন জালিয়াত রাবী হাসান ইবনু আলী ইবনু সালিহ আল আদাবী। আল্লামা ইবনু আদী বলেনঃ আমি লোকটির নিকট হতে হাদীস শুনেছি ও লিখেছি। লোকটি হাদীস জাল করত ও চুরি করত। একজনের হাদীস অন্যজনের নামে বর্ণনা করত। এমন সব লোকের নাম বলে হাদীস বলতো যাদের কোনো পরিচয় জানা যায়না।
এরপর তিনি এই হাসান ইবনু আলীর হাদীস চুরির অনেক উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইবনু আদী বলেনঃ আমাকে হাসান ইবনু আলী আদাবী বলেন, আমাদেরকে হাসান ইবনু আলী ইবনু রাশিদ বলেছেন, তিনি শারীক থেকে, তিনি আ’মাশ থেকে, তিনি আবু সুফিয়ান থেকে, তিনি জাবির থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ ‘যার রাতের সালাত অধিক হবে, দিবসে তার চেহার সৌন্দর্য্যময় হবে।’ ইবনু আদী বলেনঃ হাদীসটি সাবিত ইবনু মুসার হাদীস। সাবিতের পরে অনেক দুর্বল রাবী হাদীসটি চুরি করে বিভিন্ন রাবীর নাম দিয়ে চালিয়েছে। এই সনদে হাসান ইবনু আলী আল আদাবী হাদীসটিকে হাসান ইবনু আলী ইবনু রাশিদের নামে চালাচ্ছে। অথচ হাসান ইবনু আলী ইবনু রাশিদ প্রসিদ্ধ ও সত্যপরায়ণ রাবী ছিলেন, তিনি কখনোই এই হাদীসটি শারীক থেকে বা অন্য কোনো সনদে বর্ণনা করেননি। তাঁর পরিচিত কোনো ছাত্র হাদীসটিকে তাঁর থেকে বর্ণনা করেননি। (ইবনু আদী, আল কামিল ২/৩৩৮-৩৪১ আরো দেখুন ৬/৩০৩)।
২য় শতকের একজন দুর্বল রাবী ‘হুযাইল ইবনুল হাকাম’। তিনি বলেন, আমাকে আব্দুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ(১৫৯ হি) বলেছেন, তিনি ইকরিমাহ থেকে, তিনি ইবনু আব্বাস থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “প্রবাসের মৃত্যু শাহাদাত বলে গণ্য।” হাদীসটির একমাত্র বর্ণনাকারী এই হুযাইল নামক রাবী। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকের মুহাদ্দিসগণ বিস্তারিত সন্ধান ও নিরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে, এই হাদীসটি একমা্ত্র এই ব্যক্তি ছাড়া কোনো রাবী আব্দুল আযীয থেকে বা অন্য কোনো সূত্রে বর্ণনা করেননি।
এই যুগের অন্য একজন রাবী ইবরাহীম ইবনু বাকর আল আ’ওয়ার। তিনি এসে দাবী করলেন যে, তিনি হাদীসটি আব্দুল আযীয থেকে শুনেছেন। তিনিও বললেনঃ আমাদেরকে আব্দুল আযীয বলেছেন, ইকরিমাহ থেকে ইবনু আব্বাস থেকে ………। মুহাদ্দিসগণ নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করলেন যে, ইবরাহীম নামক এই ব্যক্তি হাদীসটি চুরি করেছেন। তাঁরা দেখলেন যে, ইবরাহীম আব্দুল আযীয হতে হাদীস শুনেননি। যখন হুযাইল হাদীস বলতেন তখনও তিনি বলেননি যে, তিনিও হাদীসটি শুনেছেন। হুযাইলের সূত্রে যখন হাদীসটি মুহাদ্দিসগণের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করে তখন তিনিও হাদীসটি হুযাইলের সূত্রে জানতে পারেন। এখন হুযাইলের সূত্রে হাদীসটি বললে তার মর্যাদা কমে যাবে! এজন্য তিনি হুযাইলের সনদ চুরি করলেন। হুযাইলের উস্তাদকে নিজের উস্তাদ দাবী করে তিনি হাদীসটি বলতে শুরু করলেন। (ইবনু আদী, আল কামিল ১/২৫৭)।
১.৬.২. মতনে মিথ্যা
জালিয়াতির প্রধান ক্ষেত্র হলো হাদীসের ‘মতন’ বা মূল বক্তব্য। মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে প্রচলিত মিথ্যা কথা মূলত দুই প্রকারের হতে পারেঃ জালিয়াত নিজের মনগড়া কথা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে বলবে অথবা প্রচলিত কোনো কথাকে তাঁর নামে বলবে। উভয় প্রকারের মিথ্যা কথা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত হতে পারে।
১.৬.২.১. নিজের মনগড়া কথা হাদীস নামে চালানো
অনেক সময় আমরা দেখতে পাই যে, মিথ্যাবাদী রাবী নিজের মনগড়া কথা হাদীস নামে চালাচ্ছে। আল্লামা সুয়ূতী (৯১১ হি) উল্লেখ করেছেন যে, মাউযূ বা মিথ্যা হাদীসের মধ্যে এই প্রকারের হাদীসের সংখ্যা বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জালিয়াত প্রয়োজন ও সুবিধা অনুসারে একটি বক্তব্য বানিয়ে তা হাদীস নামে চালায়। (সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/২৮৭)।
উপরে উল্লিখিত বিভিন্ন উদাহরণের মধ্যে আমরা এই প্রকারের অনেক জাল হাদীস দেখতে পেয়েছি। কুরআনের বিভিন্ন সূরার ফযীলতে বানানো, দেশ, জাতি, দল, মত ইত্যাদির পক্ষে বা বিপক্ষে বানানো জাল হাদীসগুলি সবই একই পর্যায়ের।
১.৬.২.২. প্রচলিত কথা হাদীস নামে চালানো
অনেক সময় দুর্বল রাবী বা মিথ্যাবাদী রাবী ভুলক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো সাহাবী বা তাবেয়ীর কথা, অথবা কোনো প্রবাদ বাক্য, নেককার ব্যক্তির বাণী, পূর্ববর্তী নবীদের নামে প্রচলিত কথা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো কথা, কোনো প্রসিদ্ধ পন্ডিতের বাণী বা অনুরূপ কোনো প্রচলিত কথাকে ‘হাদীসে রাসূল’ বলে বর্ণনা করেছেন। আল্লামা ইরাকী(৮০৬ হি) এই জাতীয় মাউদূ হাদীসের দুইটি উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। প্রথম উদাহরণ ‘দুনিয়ার ভালবাসা সকল পাপের মূল।’ আল্লামা ইরাকী বলেন, এই বাক্যটি মূলত কোনো নেককার আবিদের কথা। ঈসা(আ) এর কথা হিসেবেও প্রচার করা হয়। তবে রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা হিসেবে এর কোনো ভিত্তি নেই।
আর দ্বিতীয় উদাহরণ ‘পাকস্থলী রোগের বাড়ি আর খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ সকল ঔষধের মূল।’ কথাটি চিকিৎসকদের কথা। হাদীস হিসেবে এর কোনো ভিত্তি নেই। (সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/২৮৭)।
উপরে ‘সনদের মধ্যে কম বেশি করা’ শীর্ষক অনুচ্ছেদে আমরা এই জাতীয় কিছু উদাহরণ দেখেছি। এই প্রকারের মিথ্যা বা জালিয়াতির আরো অনেক উদাহরণ আমরা দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখতে পাব। এখানে আমাদের দেশে আলেমগণের মধ্যে প্রচলিত এইরূপ একটি হাদীসের কথা উল্লেখ করছি।
আমাদের দেশে প্রচলিত হাদীস বলে একটি কথাঃ “মুসলিমগণ যা ভাল মনে করবেন তা আল্লাহর নিকট ভাল।”
আমাদের দেশে সাধারণভাবে কথাটি হাদীসে নববী নামে পরিচিত। কথাটি মূলত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) এর। একে রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বলে বর্ণনা করলে তাঁর নামে মিথ্যা বলা হবে। ইবনু মাসউদ(রা) বলেনঃ আল্লাহ তাঁর বান্দাদের হৃদয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। তিনি মুহাম্মাদ(স) এর হৃদয়কে সমস্ত সৃষ্টিজগতের মধ্যে সর্বোত্তম সর্বশ্রেষ্ঠ হৃদয় হিসেবে পেয়েছেন। এজন্য তিনি তাঁকে নিজের জন্য বেঁছে নেন এবং তাঁকে রিসালাতের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেন। এরপর তিনি মুহাম্মাদ(স) এর হৃদয়ের পরে অন্যান্য বান্দাদের হৃদয়গুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। তখন তিনি তাঁর সাহাবীগণের হৃদয়গুলিকে সর্বোত্তম হিসেবে পেয়েছেন। এজন্য তিনি তাঁদেরকে তাঁর নবীর সহচর ও পরামর্শদাতা বানিয়ে দেন, তাঁরা তাঁর দ্বীনের জন্য যুদ্ধ করেন। অতএব মুসলমানগণ [অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ(স) এর সহচর পরামর্শদাতা পবিত্র হৃদয় সাহাবীগণ) যা ভালো মনে করবেন তা আল্লাহর নিকটও ভাল। আর তাঁরা যাকে খারাপ মনে করবেন তা আল্লাহর নিকটও খারাপ।(আহমাদ, আল মুসনাদ ১/৩৭৯, হাকিম, আল মুসতাদরাক ৩/৮৩)।
কোনো কোনো ফকীহ বা আলিম ভুলবশত কথাটি হাদীসে নববী বলে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসগণ হাদীসের সকল গ্রন্থ তালাশ করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(স) হতে বর্ণিত হয়নি। আল্লামা যাইলায়ী আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (৭৬২ হি), ইবনু কাসীর ইসমাঈল ইবনু উমার (৭৭৪ হি), ইবনু হাজার আসকালানী আহমাদ ইবনু আলী (৮৫২ হি), সাখাবী, মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুর রাহমান (৯০২ হি) ও অন্যান্য মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের(রা) কথা হিসেবে হাসান সনদে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা হিসেবে কোথাও বর্ণিত হয়নি।
১.৬.৩. অনুবাদে, ব্যাখ্যায় ও গবেষণায় মিথ্যা
হাদীসের নামে মিথ্যার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো অনুবাদ ও ব্যাখ্যা। প্রচলিত বই পুস্তক ও ওয়ায নসীহত পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, আমরা সাধারণত হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে নিজেদেরকে ১০০% ঢালাও স্বাধীনতা প্রদান করে থাকি। হাদীসের মূল বক্তব্যকে আমরা আমাদের পছন্দমতো কম বেশি করে অনুবাদ করি, অনুবাদের মধ্যে আমাদের অনেক মতামত ও ব্যাখ্যা সংযোগ করি এবং সবকিছুকে ‘হাদীস’ নামেই চালাই। অথচ সাহাবায়ে কেরাম সামান্য একটি শব্দের হেরফের এর কারণ গলদঘর্ম হয়ে যেতেন!
কুরআন ও হাদীসের আলোকে কিয়াস ও ইজতিহাদ ইসলামী ফিকহের অন্যতম উৎস। যে সকল বিষয়ে কুরআন ও হাদীস স্পষ্ট কোনো বিধান দেওয়া হয়নি কিয়াস ও ইজতিহাদের মাধ্যমে সেগুলির বিধান নির্ধারণ করতে হয়। যেমন রাসূলুল্লাহ(স) উম্মাতকে সালাত শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু কোন কাজটি ফরজ, কোনটি মুস্তাহাব ইত্যাদি বিস্তারিত বলেননি। বিভিন্ন হাদীসের আলোকে মুজতাহিদ তা নির্ণয় করার চেষ্টা করেন। অনুরূপভাবে মাইক, টেলিফোন, প্লেন ইত্যাদি বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে কিছু বলা হয়নি। কুরআন ও হাদীসের প্রাসঙ্গিক নির্দেশাবলীর আলোকে কিয়াস ও ইজতিহাদের মাধ্যমে এগুলির বিধান অবগত হওয়ার চেষ্টা করেন মুজতাহিদ।
তবে কিয়াস বা ইজতিহাদ দ্বারা কোনো গাইবী বিষয় জানা যায়না বা ইবাদত বন্দেগী করা যায়না। হজ্জের সময় ইহরাম পরিধানের উপর কিয়াস করে সালাতের মধ্যে ইহরাম পরিধানের বিধান দেয়া যায়না। অনুরূপভাবে মসজিদুল হারামে সালাতের ১ লক্ষগুণ সাওয়াবের কিয়াস করে তথায় যাকাত প্রদানের সাওয়াব ১ লক্ষগুণ বৃদ্ধি হবে বলা যায়না। অথবা আমরা বলতে পারিনা যে, রামাদানে যাকাত দিলে ৭০ গুণ সাওয়াব এবং রামাদানে মসজিদে হারামে যাকাত প্রদান করলে ৭০ লক্ষ গুণ সাওয়াব।
এখানে কিছু উদাহরণ উল্লেখ করছি। ইমাম তিরমিযী তাঁর সুনানগ্রন্থে জিহাদের ফযীলতের অধ্যায়ে নিম্নের ‘হাসান’ বা গ্রহণযোগ্য হাদীসটি সংকলন করেছেন। খুরাইম ইবনু ফাতিক (রা)বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “যদি কেউ আল্লাহর রাস্তায় কোনো ব্যয় করেন তবে তার জন্য সাতশত গুণ সাওয়াব লেখা হয়।”
ইমাম ইবনু মাজাহ সংকলিত একটি যয়ীফ হাদীসে বলা হয়েছে “যদি কেউ নিজে বাড়িতে অবস্থান করে আল্লাহর রাস্তায় খরচ পাঠিয়ে দেয়, তবে সে প্রত্যেক দিরহামের জন্য ৭০০ দিরহাম (সাওয়াব) লাভ করবে। আর যদি সে নিজে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং এই জন্য খরচ করে তবে সে প্রত্যেক দিরহামের জন্য ৭ লক্ষ দিরহাম (সাওয়াব) লাভ করবে। এরপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেনঃ ‘আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা বৃদ্ধি করে দেন।”(ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/৯২২)।
হাদীসটির একমাত্র বর্ণনাকারী ইবনু আবী ফুদাইক। তিনি বলেন, “খালীল ইবনু আব্দুল্লাহ নামক এক ব্যক্তি হাসান বসরীর সূত্রে হাদীসটি বলেছেন। মুহাদ্দিসগণ খালীল ইবনু আব্দুল্লাহ নামক এই ব্যক্তির বিশ্বস্ততাতো দূরের কথা তার কোনো পরিচয়ও জানতে পারেননি। এজন্য আল্লামা বুসিরী বলেনঃ “এই সনদটি দুর্বল; কারণ খলীল ইবনু আব্দুল্লাহ অজ্ঞাত পরিচয়।”
তাবিয়ী মুজাহিদ বলেনঃ আবু হুরাইরা(রা) একবার সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত ছিলেন। শত্রুর আগমন ঘটেছে মনে করে হঠাৎ করে ডাকাডাকি করা হয়। এতে সকলেই ছুটে সমুদ্র উপকূলে যান।তখন বলা হয় যে, কোনো অসুবিধা নেই। এতে সকলেই ফিরে আসলেন। শুধু আবু হুরাইরা দাঁড়িয়ে রইলেন। তখন একব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করেন, আবু হুরাইরা, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন? তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ(স) কে বলতে শুনেছিঃ “আল্লাহর রাস্তায় এক মুহুর্ত অবস্থান করা লাইলাতুল কাদরে হজরে আসওয়াদের নিকট কিয়াম(সালাত আদায় করা) করার চেয়ে উত্তম।” (ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১০/৪৬২)।
উপরের হাদীসগুলিতে আল্লাহর পথে ব্যয়, অবস্থান ইত্যাদির সাওয়াব উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর সকল আলিম একমত যে, এখানে আল্লাহর রাস্তায় বলতে অমুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুসলিম রাষ্ট্রের যুদ্ধ বা জিহাদ বুঝানো হয়েছে। সকল মুহাদ্দিসই হাদীসগুলিকে জিহাদ বা যুদ্ধের অধ্যায়ে সংকলন করেছেন। এখানে আমরা অনুবাদে যদি ‘আল্লাহর রাস্তায়’ বলি বা ‘জিহাদ’ বলি তবে হাদীসগুলির সঠিক অনুবাদ হবে।
অন্য একটি সহীহ হাদীস কাব ইবনু আজরা(রা) বলেন, “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ(স) এর নিকট দিয়ে গমন করে। সাহাবীগণ লোকটির স্বাস্থ্য, শক্তি ও উদ্দীপনা দেখে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ লোকটি যদি আল্লাহর রাস্তায়(জিহাদে) থাকত! তখন রাসূলুল্লাহ(স) বলেনঃ যদি লোকটি তার ছোট ছোট সন্তানদের জন্য উপার্জনের চেষ্টায় বেরিয়ে থাকে তবে সে আল্লাহর রাস্তাতেই রয়েছে। যদি সে তার বৃদ্ধ পিতামাতার জন্য উপার্জনের চেষ্টায় বেরিয়ে থাকে তাহলে সে আল্লাহর রাস্তাতেই রয়েছে। যদি সে নিজেকে পরনির্ভরতা থেকে মুক্ত রাখতে উপার্জনের চেষ্টায় বেরিয়ে থাকে তাহলে সে আল্লাহর রাস্তাতেই রয়েছে।” (হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/৩২৫)।
এখানে অর্থ উপার্জনের জন্য কর্ম করাকে ‘আল্লাহর রাস্তায় থাকা’ বা ‘আল্লাহর রাস্তায় চলা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। অন্যান্য হাদীসে ইলম শিক্ষা, হ্জ্জ, সৎকাজে আদেশ, ঠান্ডার মধ্যে পূর্ণরূপে ওযু করা, মসজিদে সালাতের অপেক্ষা করা, নিজের নফসকে আল্লাহর পথে রাখার চেষ্টা করা ইত্যাদি কর্মকে জিহাদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমরা উপরের হাদীসগুলির সঠিক ও শাব্দিক অর্থ বর্ণনা করার পরে বলতে পারি যে, বিভিন্ন হাদীসে হালাল উপার্জন, ইলম শিক্ষা, সৎকাজে আদেশ, হজ্জ আদায় ইত্যাদি কর্মকেও ‘আল্লাহর রাস্তায় কর্ম’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। কাজেই আমরা আশা করি যে, এইরূপ কর্মে রত মানুষেরাও এ সকল হাদীসে উল্লেখিত জিহাদের সাওয়াব পেতে পারেন।
কিন্তু আমরা যদি সেরূপ না করে সরাসরি বলি যে, ‘হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, হালাল উপার্জনে এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে থাকা হাজরে আসওয়াদের নিকট লাইলাতুল কদরের সালাত আদায় অপেক্ষা উত্তম’, অথবা ‘সৎকাজে আদেশের জন্য র্যালি বা মিছিলে একটি টাকা ব্যয় করলে ৭০ লক্ষ টাকার সাওয়াব পাওয়া যাবে’….তবে তা মিথ্যাচার বলে গণ্য হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ(স) কখনোই এভাবে বলেননি।
অনুরুপভাবে উপরের হাদীসগুলিতে আল্লাহর পথে যুদ্ধে ব্যয় করলে ৭০০ বা ৭ লক্ষ গুণ সাওয়াবের কথা বলা হয়েছে। অন্য হাদীসে বলা হয়েছেঃ “সালাত, সিয়াম ও যিকর(এগুলির সাওয়াব) আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার চেয়ে সাতশত গুণ বর্ধিত হয়।”
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলেছেন যে, এ হাদীসে স্পষ্ট অর্থ হলো, ঘরে বসে সালাত, সাওম ও জিকির পালন করলে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য অর্থ ব্যয়ের চেয়েও সাতশত গুণ বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়। কেউ কেউ এখানে কিছু কথা উহ্য রয়েছে বলেও মনে করেন। তাঁরা বলছেন, এই হাদীসের অর্থ হলো, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত অবস্থায়’ সালাত, সিয়াম ও যিকর পালন করলে সেগুলির সাওয়াব আল্লাহর রাস্তায় অর্থ ব্যয়ের চেয়ে সাতশত গুণ বর্ধিত হয়।(হাশিয়াতু ইবনুল কাইয়িম ৭/১২৭)।এখানে আমাদের দায়িত্ব হলো হাদীসটি শাব্দিক অর্থ বলার পরে আমাদেরকে ব্যাখ্যা পৃথকভাবে বলা।
এখানে বিভিন্নভাবে হাদীসের নামে মিথ্যা বলার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন কেউ গুণভাগ করে বলতে পারেন যে, ‘জিহাদে যেয়ে অর্থ ব্যয় করলে ৭ লক্ষ গুণ সাওয়াব। আর ঘরে বসে যিকর করলে তার ৭ শত গুণ সাওয়াব। এর অর্থ হলো ঘরে বসে যিকর করলে ৪৯ কোটি নেক আমলের সাওয়াব।’ তিনি যদি উপরের হাদীসগুলির সঠিক অনুবাদ করার পর পৃথকভাবে এই ব্যাখ্যা করেন তবে অসুবিধা নেই। কিন্তু তিনি যদি এই কথাটিকে হাদীসের কথা বলে বুঝান তবে তিনি হাদীসের নামে মিথ্যা বললেন। কারণ রাসূলুল্লাহ(স) কখনোই এভাবে বলেননি। তিনি আল্লাহর পথে খরচের চেয়ে ৭০০ গুণ বৃদ্ধি বলতে মূল সওয়াবের সাথে ৭০০ গুণ নাকি ৭০০ গুণের ৭০০ গুণ বুঝাচ্ছেন তাও স্পষ্ট করে বলেননি। কাজেই তিনি যা স্পষ্ট করে বলেননি, তা তাঁর নামে বলা যায়না। তবে পৃথকভাবে ব্যাখ্যায় বলা যেতে পারে।
অনুরূপভাবে যদি কেউ বলেন যে, ‘হাদীসশরীফে বলা হয়েছে, হালাল উপার্জনের জন্য কর্মরত অবস্থায়, হজ্জের সফরে থাকা অবস্থায়, ইলম শিক্ষারত অবস্থায়, দাওয়াতে রত অবস্থায়, সৎকাজের আদেশের জন্য মিছিলে থাকা অবস্থায় বা নফসকে শাসনরত অবস্থায় যিকর করলে ৪৯ কোটি গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়’ তবে তিনিও হাদীসের নামে মিথ্যা বললেন।
হাদীসের নামে মিথ্যা বলার একটি প্রকরণ হলো, অনুবাদের সময় শাব্দিক অনুবাদ না করে অনুবাদের সাথে নিজের মনমতো কিছু সংযোগ করা বা কিছু বাদ দিয়ে অনুবাদ করা। অথবা রাসূলুল্লাহ(স) যা বলেছেন তার ব্যাখ্যাকে হাদীসের অংশ বানিয়ে দেওয়া। আমাদের সমাজে আমরা প্রায় সকলেই এই অপরাধে লিপ্ত রয়েছি। আত্মশুদ্ধি, পীর মুরিদী, দাওয়াত-তাবলীগ, রাজনীতিসহ মতভেদীয় বিভিন্ন মাসলা মাসাইল এর জন্য আমরা প্রত্যেক দলের ও মতের মানুষ কুরআন ও হাদীস থেকে দলীল প্রদান করি। এই দলীল প্রদান খুবই স্বাভাবিক কর্ম ও ঈমানের দাবি। তবে সাধারণত আমরা আমাদের এই ব্যাখ্যাকেই রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে চালাই।
রাসূলুল্লাহ(স) দ্বীন প্রচার করেছেন আজীবন। দ্বীনের জন্য তিনি ও তাঁর অনেক সাহাবী চিরতরে বাড়িঘর ছেড়ে ‘হিজরত’ করেছেন। কিন্তু তিনি কখনোই দাওয়াতের জন্য সময় নির্ধারণ করে বিভিন্ন এলাকায় সফরে বাহির হননি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেকে হিজরত না করলেও অন্তত কিছুদিনের জন্য বিভিন্নস্থানে যেয়ে দাওয়াতের কাজ করেছেন। কিন্তু আমরা এই কর্মের জন্য যদি বলি যে, তিনি দাওয়াতের জন্য ‘বাহির’ হতেন, তবে পাঠক বা শ্রোতা নির্ধারিত সময়ের জন্য বাহির হওয়া বুঝবেন। অথচ তিনি কখনোই এভাবে দাওয়াতের কাজ করেননি। এতে তাঁর নামে মিথ্যা বলা হবে।
যদি আমরা বলি যে, ‘রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণ মিলাদ মাহফিল করতেন’ তবে অনুরূপভাবে তাঁর নামে মিথ্যা বলা হবে। কারণ তাঁরা কখনোই শুধু ‘মিলাদ’ আলোচনা বা উদযাপনের জন্য কোনো মাহফিল করেননি। তবে রাসূলুল্লাহ(স) তাঁর জন্ম বিষয়ক দুই চারিটি ঘটনা সাহাবীদেরকে বলেছেন। এ সকল হাদীস সাহাবীগণ তাবেয়ীগণকে বলেছেন। এগুলির জন্য তাঁরা কোনো মাহফিল করেননি বা এগুলিকে পৃথকভাবে আলোচনা করেননি। আজ যদি কোনো মুসলিম ‘আনুষঙ্গিক আনুষ্ঠানিকতা’ ছাড়া অবিকল রাসূলুল্লাহ(স) ও সাহাবীগণের পদ্ধতিতে এসকল হাদীস বর্ণনা করেন, তবে কেউই বলবেননা যে, তিনি মিলাদ মাহফিল করেছেন। এতে আমরা বুঝি যে, মিলাদ মাহফিল বলতে যে অর্থ আমরা সকলেই বুঝি সেই কাজটি তিনি করেননি।
এজন্য্ আমাদের উচিত, রাসূলুল্লাহ(স) কি করেছেন বা বলেছেন এবং তা থেকে আমরা কি বুঝলাম তা পৃথকভাবে বলা। আমরা দেখেছি যে, একটি শব্দ হেরফের এর ভয়ে সাহাবীগণ কিভাবে সন্ত্রস্ত হয়েছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।
১.৭. মিথ্যার পরিচয় ও চিহ্নিতকরণ
১.৭.১. মিথ্যা চিহ্নিতকরণের প্রধান উপায়
১.৭.১.১. জালিয়াতের স্বীকৃতি
মিথ্যা হাদীসের পরিচিতি ও চিহ্নিত করনের পদ্ধতি উল্লেখ করে আল্লামা ইবনুস সালাহ(৬৪৩ হি) বলেনঃ হাদীস মাঊদূ বা জাল কিনা তা জানা যায় জালিয়াতের স্বীকৃতির মাধ্যমে অথবা স্বীকৃতির পর্যায়ের কোনো কিছুর মাধ্যমে। মুহাদ্দিসগণ অনেক সময় বর্ণনাকারীর অবস্থার প্রেক্ষিতে তার জালিয়াতি ধরতে পারেন। কখনো বা বর্ণিত হাদীসের অবস্থা দেখে জালিয়াতি ধরেন। অনেক বড় বড় হাদীস বানানো হয়েছে যেগুলির ভাষা ও অর্থের দুর্বলতা সেগুলির জালিয়াতির সাক্ষ্য দেয়। (ইরাকী, আত-তাকঈদ, পৃ. ১২৮)।
আল্লামা নববী, ইরাকী, সাখাবী, সুয়ূতী ও অন্যান্য মুহাদ্দিসও মিথ্যা বা জাল হাদীস চিহ্নিত করার পদ্ধতিগুলো উল্লেখ করেছেন।
১.৭.১.২. সনদবিহীন বর্ণনা
সাধারণভাবে জালিয়াতের স্বীকৃতি পাওয়া যায়না। এজন্য মুহাদ্দিসগণ এর উপর নির্ভর করেননা। তারা সনদ বিচার বা তুলনামূলক নিরীক্ষা ও নিরীক্ষামূলক প্রশ্নাবলীর মাধ্যমে ‘স্বীকৃতির পর্যায়ের তথ্যাদি’ সংগ্রহ করে সেগুলির ভিত্তিতে জালিয়াতি নির্ণয় করেন। এজন্য নিরীক্ষাই হলো জালিয়াতি নির্ণয়ের প্রধান পন্থা। প্রধানত দুইটি কারণে মুহাদ্দিসগণ হাদীসকে বানোয়াট, ভিত্তিহীন, জাল বা মিথ্যা বলে গণ্য করেন। প্রথমত, হাদীসের সনদে মিথ্যাবাদীর অস্তিত্ব ও দ্বিতীয়ত, হাদীসের কোনো সনদ না থাকা।
মূলত, প্রথম কারণটিই জালিয়াতি নির্ধারণের মূল উপায়। দ্বিতীয় পর্যায়টি ইসলামের প্রথম অর্ধ সহস্র বৎসরে দেখা যায়নি। হিজরী ৪র্থ/৫ম শতক পর্য্ন্ত কোনো মানুষই সনদ ছাড়া কোনো হাদীস বলতেননা বা বললে কেউ তাতে কর্ণপাত করতেননা। এজন্য জঘন্য জালিয়াতকেও তার মিথ্যার জন্য কোনো সনদ তৈরি করতে হতো। পরবর্তী যুগগুলোতে ক্রমান্বয়ে মুসলিম সমাজে কিছু কিছু কথা হাদীস নামে প্রচারিত হয় যেগুলো লোকমুখে প্রচারিত হলেও কোনো গ্রন্থ বা পুস্তিকায় সনদসহ পাওয়া যায়না। স্বভাবতই মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ একবাক্যে সেগুলিকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও জাল বলে গণ্য করেছেন।
রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে প্রচারিত সকল প্রকারের মিথ্যা বা ভিত্তিহীন কথাকে প্রতিহত করা এবং তাঁর নামে প্রচলিত কথার উৎস ও সূত্র নির্ণয় করার বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ ছিলেন আপোষহীন। এজন্য আমরা দেখতে পাই যে, ৭ম/৮ম হিজরী শতাব্দী থেকে শুরু করে বর্তমান যুগ পর্য্ন্ত অগণিত জানবাজ মুহাদ্দিস তাঁদের জীবনপাত করেছেন এ সকল প্রচলিত কথার সূত্র বা উৎস সন্ধান করতে। দ্বিতীয় শতাব্দী হতে শুরু করে পরবর্তী প্রায় অর্ধসহস্র বৎসর ধরে লেখা অগণিত হাদীস, ফিকহ, তাফসীর, ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য, জীবনী ইত্যাদি সকল প্রকার পুস্তক পুস্তিকার মধ্যে তাঁরা এগুলো সন্ধান করেছেন। এই সন্ধানের পরেও যে সকল হাদীস নামে প্রচলিত কথার কোনো সনদ তাঁরা পাননি সেগুলিকে তাঁরা ভিত্তিহীন, সূত্রবিহীন, বানোয়াট বা মিথ্যা বলে গণ্য করেছেন।
১.৭.১.৩. মিথ্যাবাদীর বর্ণনা
জাল বা মিথ্যা হাদীস চেনার অন্যতম উপায় হলো যে, হাদীসটির সনদে এমন একজন রাবী রয়েছেন, যাকে মুহাদ্দিসগণ নিরীক্ষার মাধ্যমে মিথ্যাবাদী বলে চিহ্নিত করেছেন এবং একমাত্র তার মাধ্যম ছাড়া অন্য কোনো সূত্রে হাদীসটি বর্ণিত হয়নি। এজন্য জাল বা মিথ্যা হাদীসের সংজ্ঞায় মুহাদ্দিসগণ বলেছেনঃ “ যে হাদীস শুধুমাত্র কোনো মিথ্যাবাদী রাবী বর্ণনা করেছে তা মাঊদূ হাদীস।”
এই মিথ্যাবাদী রাবীর উস্তাদ বা পূর্ববর্তী রাবীগণ এবং তার ছাত্র বা পূর্ববর্তী রাবীগণ বিশ্বস্ত, সত্যবাদী ও নির্ভরযোগ্য হলেও কিছু যায় আসেনা। মুহাদ্দিসগণ নিরীক্ষার মাধ্যমে যদি দেখতে পান যে, এই ব্যক্তি উস্তাদ হিসেবে যার নাম উল্লেখ করেছে তাঁর অন্য কোনো ছাত্রই হাদীসটি বর্ণনা করছেননা বা অন্য কোনো সূত্রে ও হাদীসটি বর্ণিত হয়নি, তাহলে তাঁরা নিশ্চিত হন যে, এই মিথ্যাবাদী তার উস্তাদের নামে সনদটি বানিয়ে মিথ্যা হাদীসটি প্রচার করেছে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন মুহাদ্দিস এই মিথ্যাবাদীর নিকট হতে হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন নিরীক্ষা, পর্যালোচনা বা সংকলনের জন্য।
১.৭.১.৩.১. মিথ্যাবাদীর পরিচয়
যে সকল রাবী মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করেন বলে মুহাদ্দিসগণ বুঝতে পেরেছেন তাদেরকে তাঁরা বিভিন্ন প্রকার বিশেষণে বিশেষিত করেছেন। কখনো তাদেরকে স্পষ্টত মিথ্যাবাদী ও জালিয়াত বলে আখ্যায়িত করেছেন। কখনো বা তাদেরকে মিথ্যাবাদী বা জালিয়াত না বলে অন্যান্য শব্দ ব্যবহার করেছেন। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, প্রথম তিন শতাব্দীর মুহাদ্দিসগণ সাধারণত সহজে কাউকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলতে চাইতেননা। বিশেষত, যে ব্যক্তির বিষয়ে মুহাদ্দিসগণ অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা বলেছেন বলে ধারণা করেছেন তার বিষয়ে কিছু নরম শব্দ ব্যবহার করতেন। মিথ্যাবাদী রাবীগণের বিষয়ে মুহাদ্দিসগণের পরিভাষাকে আমরা সংক্ষেপে নিম্নোক্ত কয়েক ভাগে ভাগ করতে পারিঃ
১. সরাসরি মিথ্যাবাদী বা জালিয়াত বলে উল্লেখ করাঃ রাবীর মিথ্যাচারিতা বোঝাতে মুহাদ্দিসগণ বলে থাকেন মিথ্যাবাদী, জঘন্য মিথ্যাবাদী, মিথ্যা বলে, দাজ্জাল, জঘন্য জালিয়াত, জাল করে, অভিযুক্ত, একটি হাদীস জাল করেছে, সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী, মিথ্যার একটি স্তম্ভ, অমুক মুহাদ্দিস তাকে জালিয়াত বলে উল্লেখ করেছেন, অমুক তাকে মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেছেন………ইত্যাদি।
২. বাতিল হাদীস বা বালা মুসিবত বর্ণনাকারী বলে উল্লেখ করাঃ রাবীর মিথ্যাচারিতা বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত পরিভাষাগুলোর অন্যতম- বাতিল হাদীস বর্ণনা করে, তার কিছু বাতিল হাদীস রয়েছে, তার কিছু বালা মুসিবত আছে, তার বর্ণিত বালা মুসিবতের মধ্যে অমুক হাদীসটি…….,…এই হাদীসের বিপদ অনেক……খবীস হাদীস বর্ণনা করে…….হাদীস চুরি করে…….
৩. মুনকার(আপত্তিকর) বা মাতরূক(পরিত্যক্ত) বলে উল্লেখ করাঃ ‘মুনকার’ অর্থ অস্বীকারকৃত, আপত্তিকৃত, অন্যায়, গর্হিত ইত্যাদি। মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন অর্থে রাবীকে এবং হাদীসকে মুনকার বলে অভিহিত করেছেন। অনেকে দুর্বল হাদীস বা দুর্বল রাবীকে মুনকার বলেছেন। কেউ কেউ মিথ্যাবাদী রাবীকে মুনকার বলেছেন। বিশেষত, ইমাম বুখারী রাবীগণের ত্রুটি উল্লেখের বিষয়ে অত্যন্ত নরম শব্দ ব্যবহার করতেন। তিনি সরাসরি কাউকে মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেননি। বরং অন্য মুহাদ্দিস যাকে মিথ্যাবাদী বলেছেন, তিনি তাকে ‘মুনকার’ বলেছন, অথবা ‘মাতরূক’ বা ‘মাসকূত আনহু’, ‘মানযূর ফীহ’ অর্থাৎ ‘পরিত্যক্ত’, ‘তাঁর বিষয়ে আপত্তি রয়েছে’ বলেছেন।
মুহাদ্দিসগণের মধ্যে প্রচলিত আরেকটি পরিভাষা ‘মাতরূক’, অর্থাৎ ‘পরিত্যক্ত’ বা ‘পরিত্যাজ্য’। সাধারণত মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত দুর্বল রাবীকে ‘পরিত্যক্ত’ বলেন। তবে ইমাম বুখারী, নাসাঈ, দারাকুতনী ও অন্য কতিপয় মুহাদ্দিস মিথ্যাবাদী রাবীকে ‘মাতরূক’ বলে অভিহিত করেছেন। বিশেষত ইমাম বুখারী ও ইমাম নাসাঈ কাউকে মাতরূক বা পরিত্যক্ত বলার অর্থই হলো যে, তাঁরা তাকে মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত করেছেন।
অনুরূপভাবে মুহাদ্দিসগণ যদি বলেন যে, অমুকের হাদীস বর্ণনা করা বৈধ নয়-তাহলেও তার মিথ্যাচারিতা বুঝা যায়।
৪. তার হাদীস কিছুই নয়, মূল্যহীন—বলে উল্লেখ করা
কেউ কেউ রাবীর মিথ্যাচারিতা বুঝাতে রাবীকে বা তার বর্ণিত হাদীসকে মূল্যহীন, কিছুই নয়, এক পয়সাতেও নেওয়া যায়না বা অনুরূপ কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ীর কথা প্রনিদান যোগ্য। ইমাম ইসমাঈল ইবনু ইয়াহইয়া মুযানী(২৬৪ হি) বলেনঃ একদিন এক ব্যক্তি সম্পর্কে আমি বলি যে, লোকটি মিথ্যাবাদী। ইমাম শাফেয়ী(২০৪ হি) আমাকে বলেন, তুমি তোমার কথাবার্তা পরিশিলীত কর। তুমি ‘মিথ্যাবাদী’ না বলে বল ‘তার হাদীস কিছুই নয়’।
৫. পতিত, ধ্বংসপ্রাপ্ত, অত্যন্ত দুর্বল………ইত্যাদি বলে উল্লেখ করাঃ কিছু শব্দ দ্বারা মুহাদ্দিসগণ রাবীর কঠিন দুর্বলতা ব্যক্ত করেছেন। যেমন: পতিত, অত্যন্ত দুর্বল, একেবারেই বাতিল, ধ্বংসপ্রাপ্ত, তার হাদীস চলে গেছে, উড়ে গেছে……ইত্যাদি। এ সকল রাবীর হাদীস ইচ্ছাকৃত মিথ্যা না হলেও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা এবং একেবারেই অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ের। অনেক মুহাদ্দিস এই পর্যায়ের রাবীর হাদীসকেও জাল বা মিথ্যা বলে গণ্য করেছেন।
১.৭.১.৩.২. মিথ্যা হাদীসের বিভিন্ন নাম
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, জাল বা মিথ্যা হাদীসকে মাঊযূ বলা হলেও, জাল হাদীস বুঝানোর জন্য মুহাদ্দিসগণের আরো কিছু প্রচলিত পরিভাষা রয়েছে। সেগুলির মধ্যে রয়েছেঃ
১. বাতিলঃ আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, মুহাদ্দিসগণ অনেক সময় মিথ্যা হাদীসকে ‘মাউযূ’ বা ‘জাল’ না বলে বাতিল বলেন। বিশেষত, অনেক মুহাদ্দিস রাবীর ইচ্ছাকৃত মিথ্যার বিষয়ে নিশ্চিত না হলে হাদীসকে ‘মাউযূ’ বলতে চাননা। এক্ষেত্রে তাঁরা ‘বাতিল’ শব্দটি ব্যবহার করেন। অর্থাৎ হাদীসটি মিথ্যা ও বাতিল তবে রাবী তা ইচ্ছেকৃতভাবে জাল করেছে কিনা নিশ্চিত নয়।
২. সহীহ নয়ঃ জাল হাদীস বুঝানোর জন্য মুহাদ্দিসগণের অন্যতম পরিভাষা হলো ‘হাদীসটি সহীহ নয়’। এই কথাটি কেউ কেউ ভুল বোঝেন। তাঁরা ভাবেন, হাদীসটি সহীহ না হলে হয়তো হাসান বা যয়ীফ হবে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। জাল হাদীস আলোচনার ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ যখন বলেন যে, হাদীসটি সহীহ বা বিশুদ্ধ নয়, তখন তাঁরা বুঝান যে, হাদীসটি অশুদ্ধ, বাতিল ও ভিত্তিহীন। তবে ফিকহী আলোচনায় কখনো কখনো তাঁরা ‘সহীহ নয়’ বলতে ‘যয়ীফ’ বুঝিয়ে থাকেন।
৩. কোনো ভিত্তি নেই, কোনো সূত্র নেইঃ মুহাদ্দিসগণ জাল ও মিথ্যা হাদীস বুঝাতে অনেক সময় বলেন, হাদীসটির কোনো ভিত্তি নেই, সূত্র নেই। এদ্বারা তাঁরা সাধারণভাবে বুঝান যে, হাদীসটি জনমুখে প্রচলিত একটি সনদবিহীন বাক্য মাত্র, এর সহীহ, যয়ীফ বা মাঊদূ কোনো প্রকারের কোনো সনদ বা সূত্র নেই এবং কোনো গ্রন্থে তা সনদ সহ পাওয়া যায়না। কখনো কখনো জাল বা বাতিল সনদের হাদীসকেও তাঁরা এভাবে ‘এর কোনো ভিত্তি নেই’ বলে আখ্যায়িত করেন।
৪. জানিনা, কোথাও দেখিনি, পাইনিঃ মুহাদ্দিসগণ একমত যে, হাদীস সংকলিত হয়ে যাওয়ার পরে, কোনো প্রচলিত বাক্য যদি সকল প্রকারের অনুসন্ধানের পরও কোনো গ্রন্থে সনদসহ পাওয়া না যায় তাহলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে যে, কথাটি বাতিল ও ভিত্তিহীন। যে সকল মুহাদ্দিস তাঁদের জীবন হাদীস সংগ্রহ, অনুসন্ধান, যাচাই ও নিরীক্ষার মাধ্যমে অতিবাহিত করেছেন, তাঁদের কেউ যদি বলেন, এই হাদীসটি আমি কোথাও দেখিনি, কোথাও পাইনি, আমি চিনিনা, জানিনা, পরিচিত নয়……….তবে তাঁর কথাটি প্রমাণ করবে যে, এই হাদীসটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা।
৫. গরীব(অপরিচিত), অত্যন্ত গরীবঃ গরীব শব্দের অর্থ প্রবাসী, অপরিচিত বা অনাত্মীয়। যে হাদীসটি সকল পর্যায়ে শুধুমাত্র একজন রাবী বর্ণনা করেছেন মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় তাকে সাধারণত ‘গরীব’ হাদীস বলা হয়। এই পরিভাষা অনুসারে গরীব হাদীস সহীহ হতে পারে, যয়ীফও হতে পারে।
কিন্তু কোনো কোনো মুহাদ্দিস জাল হাদীস বোঝাতে এই পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ যে হাদীসের বিষয়ে বলেছেন ‘জানিনা, ভিত্তিহীন……..’, সেগুলির বিষয়ে তাঁরা বলেছেন ‘গরীব’ বা ‘গরীবুন জিদ্দান’ অর্থাৎ অপরিচিত বা অত্যন্ত অপরিচিত। ইমাম দারাকুতনী, খতীব বাগদাদী, যাহাবী প্রমুখ মুহাদ্দিস এভাবে এই পরিভাষাটি কখনো কখনো ব্যবহার করেছেন। এই পরিভাষাটি বেশি ব্যবহার করেছেন ৮ম শতকের প্রসিদ্ধ হানাফী ফাকীহ ও মুহাদ্দিস আল্লামা আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসূফ যাইলায়ী (৭৬২ হি)।
১.৭.২. ভাষা, অর্থ ও বুদ্ধিবৃত্তিক নিরীক্ষা
বর্ণনাকারীর বর্ণনার নির্ভুলতা যাচাইয়ের পাশাপাশি মুহাদ্দিসগণ বর্ণনার অর্থও যাচাই করেছেন। কুরআন কারীম, সুপ্রসিদ্ধ সুন্নাত, বুদ্ধি-বিবেক, ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠিত সত্য বা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্যে সুস্পষ্ট বিরুদ্ধ কোনো বক্তব্য তাঁরা হাদীস হিসেবে গ্রহণ করেননি।
হাদীসের বিষয়বস্তু, ভাব ও ভাষাও অভিজ্ঞ নাকিদ মুহাদ্দিসগণকে হাদীসের বিশুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করে।আজীবন হাদীস চর্চার আলোকে তাঁরা কোনো হাদীসের ভাষা, অর্থ বা বিষয়বস্তু দেখেই অনুভব করতে পারেন যে, হাদীসটি বানোয়াট। বিষয়টি খুব কঠিন নয়। যে কোনো বিষয়ের গবেষক সেই বিষয়ে বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একজন নজরুল বিশেষজ্ঞকে পরবর্তী যুগের কোনো কবির কবিতা নিয়ে নজরুলের বলে চালালে তা ধরে ফেলবেন। কবিতার ভাব ও ভাষা দেখে তিনি প্রথমে বলে উঠবেন, এ তো নজরুলের কবিতা হতে পারেনা! কোথায় পেয়েছেন এই কবিতা? কিভাবে??
অনুরূপভাবে যে কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ের সাথে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট গবেষক সেই বিষয়ে বিশেষ অভিজ্ঞতা ও অনুভুতি লাভ করেন, যা দিয়ে তিনি সেই বিষয়ক তথ্যাদি সম্পর্কে প্রাথমিক বিচারের যোগ্যতা লাভ করেন।
হাদীস শাস্ত্রের প্রাজ্ঞ ইমামগণ, যাঁরা তাঁদের পুরো জীবন হাদীস, শিক্ষা, মুখস্ত, তুলনা, নিরীক্ষা ও শিক্ষাদান করে কাটিয়েছেন তাঁরাও রাসূলুল্লাহ(স) এর আদেশ, নিষেধ, উপদেশ, পুরস্কার বর্ণনা, শাস্তি বর্ণনা, শব্দ চয়ন, বিষয়বস্তু, ভাব, অর্থ ইত্যাদি সম্পর্কে বিশেষ অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি লাভ করেন। এর আলোকে তাঁরা তাঁর নামে প্রচারিত কোনো বাক্য বা হাদীস শুনলে সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করতে পারেন যে, এই বিষয়, এই ভাষা, এই শব্দ বা এই অর্থ রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস হতে পারে বা পারেনা। এর পাশাপাশি তাঁরা অন্যান্য নিরীক্ষার মাধ্যমে এর জালিয়াতি নিশ্চিত করেন।
মুহাদ্দিসগণের হাদীস সমালোচনা সাহিত্যের সুবিশাল ভান্ডারে আমরা অগণিত উদাহরণ দেখতে পাই যে, হাদীসের বর্ণনাকারী মিথ্যাবাদী গণ্য না হওয়া সত্ত্বেও হাদীসের ভাষা, ভাব ও অর্থের কারণে মুহাদ্দিসগণ হাদীসটিকে ‘পরিত্যক্ত’, জাল বা বানোয়াট বলে গণ্য করেছেন।
মুহাদ্দিসগণের এ বিষয়ক কর্মধারা আলোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, এক্ষেত্রে তাঁরা সাহাবীগণের পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। আমরা দেখেছি যে, কোনো হাদীসের বিচারের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম বিবেচ্য বিষয় হলো, কথাটি রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বলে প্রমাণিত কিনা তা যাচাই করা। প্রমাণিত হলে তা গ্রহণ করতে হবে, অপ্রমাণিত হলে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং কোনোরূপ দ্বিধা থাকলে তা অতিরিক্ত নিরীক্ষা করতে হবে। এভাবে ভাষা ও অর্থগত নিরীক্ষায় হাদীসের তিনটি পর্যায় রয়েছে।
১.৭.২.১. মূল নিরীক্ষায় সহীহ বলে প্রমাণিত
যদি বর্ণনাকারীগণের সাক্ষ্য ও সকল প্রাসঙ্গিক নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, কথাটি রাসূলুল্লাহ(স) এর কর্ম, বাণী বা অনুমোদন, তবে তা ‘ওহী’র নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এখানেও ‘শুযূয’ বা ‘ইল্লাত’ এর বিচার করতে হবে, যেখানে ভাষা ও অর্থগত নিরীক্ষার প্রক্রিয়া বিদ্যমান। তবে এক্ষেত্রে নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষ্যণীয়ঃ
প্রথমত, এই পর্যায়ের প্রমাণিত কোনো হাদীসের মধ্যে ভাষাগত বা অর্থগত দুর্বলতা বা অসংলগ্নতা পাওয়া যায়না। কারণ শব্দগত বা অর্থগতভাবে অসংলগ্ন হাদীস বর্ণনা করা, অথবা বুদ্ধি, বিবেক, বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক তথ্যের বিপরীতে কোনো হাদীস বর্ণনা করাকেই রাবীর দুর্বলতা বলে বিবেচনা করা হয়েছে। অনেক সৎ ও প্রসিদ্ধ রাবী এইরূপ হাদীস বর্ণনা করার ফলে দুর্বল বলে বিবেচিত হয়েছেন এবং তাঁদের বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এজন্য সনদ ও সাধারণ অর্থ নিরীক্ষায় (৫টি শর্ত পূরণকারী) ‘সহীহ’ বলে প্রমাণিত কোনো হাদীসের মধ্যে ভাষাগত ও অর্থগত দুর্বলতা পাওয়া যায়না।
দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিবেক, বুদ্ধি বা আকল এর নির্দেশনা আপেক্ষিক। একজন মানুষ যাকে বিবেক বিরোধী বলে গণ্য করেছেন, অন্যজন তাকে বিবেক বা বুদ্ধির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করতে পারেন। এজন্য মুসলিম উম্মাহর মূলনীতি হলো, কোনো কিছু ‘ওহী’ বলে প্রমাণিত হলে তা মেনে নেওয়া। যেমন কুরআন কারীমে চুরির শাস্তি হিসেবে হস্তকর্তনের বিধান রয়েছে। বিষয়টি কারো কাছে বিবেকবিরুদ্ধ মনে হতে পারে। কিন্তু মুমিন কখনোই এই যুক্তিতে এই বিধানটি প্রত্যাখ্যান করেননা। বরং বুদ্ধি, বিবেক ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে এই বিধানের যৌক্তিকতা বুঝতে চেষ্টা করেন। হাদীসের ক্ষেত্রেও মুমিনগণ একইরূপ মূলনীতি অনুসরণ করেন।
তৃতীয়ত, বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক তথ্যের ক্ষেত্রেও মুমিনগণ একইরূপ মূলনীতি অনুসরণ করেন। স্বভাবতই কুরআন ও হাদীসে বিজ্ঞান বা ইতিহাস শিক্ষা দেওয়া হয়নি। তবে প্রাসঙ্গিকক্রমে এ জাতীয় কিছু কথা আলোচিত হয়েছে। ‘ওহী’ বলে প্রমাণিত কোনো বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ যদি কোনো ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক তথ্যের বিপরীত হয়, তবে তাঁরা কখনোই সেই বক্তব্যকে ভুল বা মিথ্যা মনে করেননা। যেমন কুরআন কারীমের কোনো আয়াতের বাহ্যিক অর্থ দ্বারা মনে হতে পারে যে, পৃথিবী সমতল বা সূর্য্ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণরত। এক্ষেত্রে মুমিনগণ এসকল বক্তব্যের সঠিক অর্থ বুঝার চেষ্টা করেন। হাদীসের ক্ষেত্রেও একই নীতি তাঁরা অনুসরণ করেন।
চতুর্থত, নিরীক্ষায় প্রমাণিত কোনো ‘সহীহ হাদীস’ এর সাথে অন্য কোনো ‘সহীহ হাদীস’ বা কুরআনের আয়াতের মূলত কোনো বৈপরীত্য ঘটেনা। বাহ্যত কোনো বৈপরীত্য দেখা দিলে মুহাদ্দিসগণ ঐতিহাসিক ও পারিপার্শ্বিক তথ্যাদির বিপরীতে ‘ডকুমেন্টারি’ প্রমাণের মাধ্যমে সেই বৈপরীত্য সমাধান করেছেন। কিন্তু কখনোই ঢালাওভাবে শুধু বাহ্যিক বৈপরীত্যের কারণে কোনো প্রমাণিত তথ্যকে অগ্রাহ্য করেননি। আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ(স) কোন স্থান হতে হজ্জের ‘তালবিয়া’ পাঠ শুরু করেন সে বিষয়ে একাধিক ‘সহীহ’ বর্ণনা রয়েছে, যেগুলি বাহ্যত পরস্পর বিরোধী। মুহাদ্দিসগণ এই বাহ্যিক বৈপরীত্যের সমাধানের জন্য ঐতিহাসিক ও পারিপার্শিক তথ্যাদি বিবেচনা করেছেন, যা আমরা এই পুস্তকের প্রথমে আলোচনা করেছি।
এভাবে কোনো হাদীস ডকুমেন্টারি পরীক্ষায় ‘ওহী’ বলে প্রমাণিত হওয়ার পরেও যদি বাহ্যত অন্য কোনো হাদীস বা আয়াতের সাথে তার বৈপরীত্য দেখা যায়, তবে মুহাদ্দিসগণ সেই বৈপরীত্যের ইতিহাস, কারণ ও সমাধান অনুসন্ধান করেছেন ও লিপিবদ্ধ করেছেন।
১.৭.২.২. মূল নিরীক্ষায় মিথ্যা বলে প্রমাণিত
যদি কোনো কথা বা বক্তব্যের বিষয়ে প্রমাণিত হয় যে, কথাটি রাসূলুল্লাহ(স) এর বাণী নয়, বরং বর্ণনাকারী ভুলে বা ইচ্ছায় তাঁর নামে মিথ্যা বলেছেন, তবে সেক্ষেত্রে সেই বক্তব্যটির ভাষা বা অর্থ বিবেচনা করা হয়না। কোনোরূপ বিবেচনা ছাড়াই তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। অধিকাংশ জাল হাদীসই এই পর্যায়ের। জালিয়াতগণ সাধ্যমত সুন্দর অর্থেই হাদীস বানাতে চেষ্টা করেন।
১.৭.২.৩. মূল পরীক্ষায় দুর্বল বলে পরিলক্ষিত
যদি প্রমাণিত হয় যে, বর্ণনাকারী ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও সত্যপরায়ণ, তবে তিনি তাঁর বর্ণনায় কিছু ভুল করতেন, তবে সেক্ষেত্রে তাঁর দুর্বলতার মাত্রা অনুসারে বর্ণিত হাদীসটিকে হাসান বা যয়ীফ বলে গণ্য করা হয়। এছাড়া কোনো বর্ণনাকারীর পরিচয় জানা না গেলেও হাদীসটি সাধারণভাবে দুর্বল বলে গণ্য করা হয়। এই পর্যায়ের অনেক হাদীসকে মুহাদ্দিসগণ শব্দ ও অর্থগত নিরীক্ষার মাধ্যমে ‘জাল’ বলে গণ্য করেছেন। জাল হাদীস বিষয়ক গ্রন্থাবলীতে এরূপ অনেক হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলির সনদে কোনো মিথ্যায় অভিযুক্ত না থাকলেও সেগুলিকে জাল বলা হয়েছে। আবার এই জাতীয় কিছু হাদীসের বিষয়ে মুহাদ্দিসগণ মতভেদ করেছেন। বাহ্যিক সনদের কারণে কেউ কেউ তা দুর্বল বা ‘হাসান’ বললেও, অর্থের কারণে অন্যরা তা জাল বলে গণ্য করেছেন। এখানে দুইটি উদাহরণ উল্লেখ করছিঃ
(১) আনাস(রা) এর সূত্রে ‘আরশ’ এর বর্ণনায় একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আনাস বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ(স) কে মহিমাময় প্রভুর আরশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বলেন, আমি জিবরাঈলকে মহিমাময় প্রভুর আরশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বলেন, আমি মীকাঈলকে মহিমাময় প্রভুর আরশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বলেন, আমি ইসরাফীলকে মহিমাময় প্রভুর আরশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বলেন, আমি রাফীকে মহিমাময় প্রভুর আরশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বলেন, আমি লাওহে মাহফূযকে মহিমাময় প্রভুর আরশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বলেন, আমি কলমকে মহিমাময় প্রভুর আরশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বলেন, আরশের ৩ লক্ষ ৬০ হাজার খুঁটি আছে,…. ইত্যাদি……।
হাদীসটির সনদে ‘মুহাম্মদ ইবনু নাসার’ নামক একজন দুর্বল রাবী রয়েছেন, যাকে স্পষ্টত মিথ্যাবাদী বলা হয়নি। তবে মুহাদ্দিসগণ একমত যে, হাদীসটি জাল। ইবনু হাজার বলেনঃ “এই হাদীসটির মিথ্যাচার সুস্পষ্ট। হাদীস সাহিত্যে যার দখল আছে তিনি কখনোই এই বিষয়ে দ্বিমত করবেননা।”(ইবনু ইরাক, তানযীহুশ শারীয়াহ ১/২১১)।
(২) তাবি-তাবিয়ী ফুদাইল ইবনু মারযূক (১৬০ হি) বলেছেন, ইবরাহীম ইবনু হাসান থেকে, ফাতিমা বিনতুল হুসাইন ইবনু আলী(১০০ হি) থেকে, আসমা বিনতু উমাইস(রা) থেকে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) এর উপর ওহী নাযিল হচ্ছিল। এ সময়ে তাঁর মস্তক ছিল আলী(রা) এর কোলে। এজন্য আলী আসরের সালাত আদায় করতে পারেননি। এমতাবস্থায় সূর্য্ ডুবে যায়। তিনি আলীকে বলেনঃ তুমি কি সালাত আদায় করেছ? তিনি বলেনঃ না। তখন তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ, আলী যদি আপনার এবং আপনার রাসূলের আনুগত্যে থেকে থাকেন তবে তাঁর জন্য আপনি সূর্য্ ফিরিয়ে দিন। আসমা বলেনঃ আমি দেখলাম, সূর্য্ ডুবে গেল। এরপর ডুবে যাওয়ার পরে তা আবার উদিত হলো।”
এই সনদে আসমা বিনতু উমাইস প্রসিদ্ধ মহিলা সাহাবী। ফাতিমা বিনতুল হুসাইন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য রাবী। ফূযাইল ইবনুল মারযূক সত্যপরায়ণ রাবী, তবে তিনি ভুল করতেন। ইবরাহীম ইবনু হাসান কিছুটা অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি। তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়না। তবে যেহেতু কেউ তাকে অগ্রহণযোগ্য বলে স্পষ্টত কিছু বলেননি, এজন্য ইবনু হিব্বান তাকে গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, সনদ বিচারে হাদীসটি ‘হাসান’ বলে গণ্য হতে পারে। কোনো কোনো মুহাদ্দিস বাহ্যিক সনদের দিকে তাকিয়ে এইরূপ মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ইবনু তাইমিয়া, ইবনু কাসীর, যাহাবী ও অন্যান্য অনেক মুহাদ্দিস হাদীসটির ‘মতন’ বা ‘মূলপাঠ’কে জাল বলে গণ্য করেছেন।
তাঁদের বিস্তারিত আলোচনার সারসংক্ষেপ হলো, সূর্য্ অস্তমিত হওয়ার পরে উদিত হওয়া একটি অত্যাশ্চর্য্ ঘটনা। আর মানবীয় প্রকৃতি অস্বাভাবিক ও অলৌকিক ঘটনা বর্ণনায় সবচেয়ে বেশি আগ্রহ বোধ করে। এজন্য স্বভাবতই আশা করা যায় যে, অন্তত বেশ কয়েকজন সাহাবী থেকে তা বর্ণিত হবে। কিন্তু একমাত্র আসমা বিনতে উমাইস(রা) ছাড়া অন্য কোনো সাহাবী থেকে তা বর্ণিত হয়নি। এইরূপ ঘটনা সূর্য্গ্রহণের চেয়ে অধিক আশ্চর্য্জনক বিষয়। আমরা দেখি যে সূর্য্ গ্রহণের ঘটনা অনেক সাহাবী হতে বর্ণিত, অথচ এই ঘটনাটি এই একটি মাত্র সূত্রে বর্ণিত।
এরপর আসমা(রা) এর ২০ জনেরও অধিক প্রসিদ্ধ ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন। এইরূপ একটি অত্যাশ্চর্য্ ঘটনা তাঁর অধিকাংশ ছাত্রই বর্ণনা করবেন বলে আশা করা যায়। কিন্তু বস্তুত তা ঘটেনি। শুধুমাত্র ফাতেমার সনদে তা বর্ণিত হচ্ছে। ফাতেমার ছাত্র বলে উল্লেখিত ‘ইবরাহীম ইবনু হাসান’ অনেকটা অজ্ঞাত পরিচয় তিনি ফাতেমার নিকট হতে আদৌ শুনেছেন কিনা তা জানা যায়না। অনুরূপ আরেকটি সনদেও ঘটনাটি আসমা বিনতে উমাইস(রা) হতে বর্ণিত। সেই সনদেও দুইজন অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী ও একজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। এতবড় একটি ঘটনা এভাবে দুই একজন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ বলবেননা তা ধারণা করা কষ্টকর।
অন্যদিকে ঘটনাটি কুরআন ও হাদীসের অন্যান্য বর্ণনার সাথে বাহ্যত সাংঘর্ষিক। খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ(স) নিজে ও আলী(রা) সহ অন্যান্য সকল সাহাবী আসরের সালাত আদায় করতে ব্যর্থ হন। সূর্যাস্তের পরে তাঁরা কাযা সালাত আদায় করেন। অন্যদিন ঘুমের কারণে রাসূলুল্লাহ(স) সহ সাহাবীগণের ফজরের সালাত এভাবে কাযা হয়। এই দুইদিনে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ(স) ও আলী(রা)সহ সাহাবীগণের জন্য সূর্য্ কে ফেরত আনা বা নেওয়া হলোনা, অথচ এই ঘটনায় শুধু আলীর জন্য তা করা হবে কেন? আর ওযরের কারণে সালাতের সময় নষ্ট হলে তো কোনো অসুবিধা হয়না। এছাড়া আলী(রা) রাসূলুল্লাহ(স) এর সাথে জামাতে সালাত আদায় করবেননা, আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্য্ন্ত এক/দেড় ঘন্টা যাবত ওহী নাযিল হবে ইত্যাদি বিষয় স্বাভাবিক মনে হয়না।
এই জাতীয় আরো অন্যান্য বিষয়ের ভিত্তিতে তাঁরা বলেন যে, এই ‘মতন’টি ভুল বা বানোয়াট। এ সকল অজ্ঞাত পরিচয় রাবীগণ কেউ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ভুল করেছেন।(ইবনু ইরাক, তানযীহুশ শারীয়াহ ১/৩৭৮-৩৮২; আলবানী, যায়ীফাহ ২/৩৯৫-৪০১)।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ভাষা, অর্থ ও বুদ্ধিভিত্তিক নিরীক্ষার ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণের পদ্ধতি অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুক্ষ্ম। যে কোনো বিচারালয়ে বিচারক বুদ্ধিভিত্তিক ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণকে ডকুমেন্টারি প্রমাণের পরে বিবেচনা করেন। কোনো অভিযুক্তের বিষয়ে অপরাধীর মোটিভ ও যৌক্তিকতা স্পষ্টভাবে দেখতে পারলেও পাশাপাশি প্রমাণাদি না থাকলে তিনি শুধুমাত্র মোটিভ বিবেচনায় শাস্তি দেননা। অনুরূপভাবে কোনো অভিযুক্তের বিষয়ে যদি তিনি অনুভব করেন যে, তার জন্য অপরাধ করার কোনো যৌক্তিক বা বিবেকসংগত কারণ নেই, কিন্তু সকল ডকুমেন্ট ও সাক্ষ্য প্রমাণাদি সুস্পষ্টরূপে তাকে অপরাধী বলে নির্দেশ করছে, তখন তিনি তাকে অপরাধী বলে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন। মুহাদ্দিসগণও এভাবে সর্বপ্রথম ‘ডকুমেন্টারি’ প্রমাণগুলির নিরীক্ষা করেছেন এবং তারপর ভাষা, অর্থ ও তথ্য বিবেচনা করেছেন। দ্বিতীয় পর্বে শব্দ ও অর্থগত নিরীক্ষার কিছু মূলনীতি আমরা দেখতে পাব, ইনশাল্লাহ।
১.৭.৩. মিথ্যা হাদীস চিহ্নিতকরণে মতভেদ
জাল হাদীস চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কখনো কখনো মুহাদ্দিসগণের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এই মতভেদ সীমিত ও খুবই স্বাভাবিক। আমরা দেখতে পেয়েছি যে, হাদীসের নির্ভূলতা যাচাই করা অবিকল বিচারালয়ে প্রদত্ত সাক্ষ্য প্রমাণের নির্ভুলতা প্রমাণ করার মতই একটি কর্ম। বিভিন্ন কেসে আমার বিচারকগণের মতভেদ দেখতে পাই। এর অর্থ এই নয় যে, বিচারকার্য্ একটি অনিয়ন্ত্রিত কর্ম এবং বিচারকগণ ইচ্ছামাফিক মানুষদের ফাঁসি দেন বা একজনের সম্পত্তি অন্যজনকে প্রদান করেন। প্রকৃত বিষয় হলো, সাক্ষ্য প্রমাণের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কখনো কখনো বিচারকগণ মতভেদ করতে পারেন। হাদীসের নির্ভুলতা নিরীক্ষার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে, অধিকাংশ হাদীসের বিষয়ে মুহাদ্দিসগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কিছু সংখ্যক হাদীসের বিষয়ে তাঁদের মতভেদ রয়েছে। এই মতভেদকে আমরা দুইভাগে ভাগ করতে পারি। ১. পরিভাষাগত মতভেদ ও ২. প্রকৃত মতভেদ।
১.৭.৩.১. মতভেদ কিন্তু মতভেদ নয়
অনেক সময় মুহাদ্দিসগণের মতভেদ একান্তই পরিভাষাগত। উপরে আমরা দেখেছি যে, মিথ্যাবাদী বা জালিয়াত রাবীর পরিচয় জ্ঞাপনে এবং জাল হাদীস চিহ্নিতকরণে মুহাদ্দিসগণ একই পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। এতে কখনো কখনো দেখা যায় যে, একটি হাদীসকে একজন মুহাদ্দিস ‘মুনকার’ বা ‘বাতিল’ বলেছেন এবং অন্যজন তাকে ‘মাঊদূ’ বলেছেন।
এইরূপ একটি পরিভাষাগত বিষয় ‘যয়ীফ’ শব্দের ব্যবহার। ইলমু হাদীসের পরিভাষায় সকল প্রকার অগ্রহণযোগ্য হাদীসকেই ‘যয়ীফ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। যয়ীফ হাদীসের বিভিন্ন প্রকারের মধ্যে এক প্রকারের হলো জাল বা মাউদূ হাদীস। কোনো হাদীসকে যয়ীফ বলে আখ্যায়িত করার অর্থ হাদীসটি দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য। তা জাল হতে পারে নাও হতে পারে।
আমরা দেখতে পাই যে, অনেক মুহাদ্দিস হাদীস সংকলন ও নিরীক্ষার ক্ষেত্রে, বিশেষত বৃহদাকার গ্রন্থাদির ক্ষেত্রে অনেক হাদীস দুর্বল বা জয়ীফ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ সকল দুর্বল হাদীসের কোনো কোনো হাদীসকে অন্যান্য মুহাদ্দিস ‘মাউযূ’ বা জাল বলে উল্লেখ করেছেন। বিষয়টি বাহ্যত মতভেদ হলেও তা প্রকৃত মতভেদ নয়। কোনো মুহাদ্দিস যদি বলেন যে, হাদীসটি যয়ীফ তবে মাউযূ নয় এবং অন্যান্য মুহাদ্দিস বলেন যে, হাদীসটি মাউযূ, তবে তা মতভেদ বলে গণ্য হবে। কিন্তু যে সকল মুহাদ্দিস সাধারণত ‘মাউযূ’ পরিভাষা ব্যবহার করেননি, বরং সকল ‘অনির্ভরযোগ্য’ হাদীসকে সংক্ষেপে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি মতভেদ বলে গণ্য নয়।
১.৭.৩.২. প্রকৃত মতভেদ
কিছু হাদীসের বিষয়ে মুহাদ্দিসগণের প্রকৃত মতভেদ দেখতে পাওয়া যায়। এই জাতীয় অধিকাংশ হাদীসের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণের মতভেদ ‘যয়ীফ বনাম মাউযূ’। কোনো মুহাদ্দিস বলেছেন, হাদীসটি মাউযূ নয় বরং যয়ীফ বলে গণ্য। পক্ষান্তরে কেউ কেউ তাকে মাউযূ বলে গণ্য করেছেন। অল্প কিছু হাদীসের ক্ষেত্রে ‘সহীহ বনাম মাউযূ’ মতভেদ দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ কোনো কোনো মুহাদ্দিস একটি হাদীসকে মাউযূ বলে গণ্য করেছেন, কিন্তু অন্য মুহাদ্দিস হাদীসটিকে সহীহ বলে গণ্য করেছেন। এ সকল মতভেদের ক্ষেত্রে পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন নিরীক্ষার মাধ্যমে কোনো একজন এর মতকে অগ্রাধিকার প্রদান করেছেন। বিষয়টি অনেকটা বিচারের রায়ের ক্ষেত্রে মতভেদ ও আপীলের মত।
১.৭.৩.৩. মতভেদের কারণঃ
কয়েকটি কারণে এই জাতীয় মতভেদ হয়ে থাকে।
১.৭.৩.৩.১. সনদের বিভিন্নতা
অনেক সময় একজন মুহাদ্দিস এক বা একাধিক সনদের ভিত্তিতে একটি হাদীসকে জাল বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি জানতে পারেননি যে, হাদীসটি অন্য কোনো সনদে বর্ণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্য একজন মুহাদ্দিস অন্য এক বা একাধিক সনদের কারণে হাদীসটিকে গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেন।
১.৭.৩.৩.২. রাবীর মান নির্ধারণে মতভেদ
‘রাবী’র বর্ণিত হাদীসগুলির তুলনামূলক নিরীক্ষা হাদীসের বিশুদ্ধতা নির্ণয়ের মূল মাপকাঠি। আর এ কারণেই রাবীর বর্ণনা বিচারে কিছু মতভেদ হয়। এদিক থেকে আমরা রাবীগণকে তিন পর্যায়ে বিভক্ত করতে পারি। (১) পূর্ণ গ্রহণযোগ্য রাবীগণ, যাদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে সকল মুহাদ্দিসগণ একমত, (২)পূর্ণ অনির্ভরযোগ্য রাবীগণ, যাদের দুর্বলতা বা জালিয়াতির বিষয়ে নিরীক্ষক মুহাদ্দিসগণ একমত এবং (৩) মতভেদীয় রাবীগণ, যাদের গ্রহণযোগ্যতার মান নির্ধারণে মুহাদ্দিসগণ মতভেদ করেছেন।
যে সকল রাবী কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে মুহাদ্দিসগণ দেখেছেন যে, তাঁদের বর্ণিত হাদীসে বেশ কিছু উল্টাপাল্টা ও ভুল বর্ণনা রয়েছে এবং কিছু সহীহ বর্ণনাও রয়েছে এদের বিষয়ে মুহাদ্দিসগণ কখনো কখনো মতভেদ করেছেন। তাদের বর্ণিত হাদীসের মধ্যে শুদ্ধ ও ভুল বর্ণনার হার, কারণ ও ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বা অনিচ্ছাকৃত ভুল নির্ধারণের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ মাঝে মাঝে মতভেদ করেছেন।
এছাড়া অনেক সময় কোনো কোনো মুহাদ্দিস আংশিক তথ্যের উপর নির্ভর করে রায় দিয়েছেন, যা অন্য কোনো মুহাদ্দিস সামগ্রিক তথ্যের উপর নির্ভর করে বাতিল করেছেন। যেমন একজন বর্ণনাকারীর কিছু হাদীস বিশুদ্ধ বা ভুল দেখে একজন মুহাদ্দিস তাকে গ্রহণযোগ্য বা অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। অন্য মুহাদ্দিস তাঁর সকল বর্ণিত হাদীস তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে অন্য বিধান প্রদান করেছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, এ সকল মতভেদের ক্ষেত্রে পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসগণ পর্যালোচনা করেছেন এবং মতামত প্রদানকারীদের বিভিন্ন মতামতের ভারসাম্য, বিচক্ষণতা, গভীরতা ইত্যাদির ভিত্তিতে মতবিরোধের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতিমালা নির্ণয় করেছেন। (ইরাকী, ফাতহুল মুগীস, পৃ. ১৫১-১৭০)।
১.৭.৩.৩.৩. মুহাদ্দিসের নীতিগত বা পদ্ধতিগত মতভেদ
কখনো কখনো রাবী বা হাদীসের বিধান প্রদানে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে পদ্ধতিগত কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কেউ কেউ বেশি ঢিলেমি ও কেউ বেশি কড়াকড়ি করেছেন। পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ এ সকল বিষয়ে পর্যাপ্ত নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে তাদের মতভেদ নিরসন করেছেন। যেমন, চতুর্থ শতকের মুহাদ্দিস ইবনু হিব্বান আবু হাতিম মুহাম্মাদ আল বুসতী(৩৫৪ হি), ৬ষ্ঠ শতকের মুহাদ্দিস ইবনুল জাওযী আবুল ফারাজ আব্দুর রাহমান ইবনু আলী(৫৯৭ হি) ভিত্তিহীন কঠোরতার জন্য অভিযুক্ত। পক্ষান্তরে তৃতীয় শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইমাম তিরমিযী ইবনু ঈসা(২৭৯ হি), ৪র্থ-৫ম শতকের মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ হাকিম নাইসাপুরী (৪০৫ হি), ১০ম শতকের মুহাদ্দিস জালালুদ্দিন সুয়ূতী(৯১১ হি) প্রমুখ ঢিলেমির জন্য পরিচিত ছিলেন। এখানে কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করছি।
(১) ইবনু হিব্বান ও ইবনুল জাওযীর কড়াকড়ি জাত ভুলের উদাহরণ। দ্বিতীয় হিজরী শতকের রাবী আফলাহ ইবনু সাঈদ আনসারী(১৫৬ হি) বলেন, আমাদেরকে উম্মু সালামার গোলাম আব্দুল্লাহ ইবনু রাফি বলেছেন, আমি আবু হুরাইরা(রা) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “তোমার জীবন যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে খুব সম্ভব তুমি এমন কিছু মানুষ দেখতে পাবে যাদের হাতে গরুর লেজের মত(ছড়ি বা বেত) থাকবে। (নিরীহ মানুষদের সন্ত্রস্ত করবে বা আঘাত করবে।) তারা সকালেও আল্লাহর ক্রোধের মধ্যে থাকবে, বিকেলেও আল্লাহর ক্রোধের মধ্যেই থাকবে।
এই হাদীসটিকে ইবনু হিব্বান ও ইবনুল জাওযী বানোয়াট ও জাল বলে গণ্য করেছেন। তাদের দাবি, এই হাদীসের বর্ণনাকারী আফলাহ ইবনু সাঈদ হাদীস উল্টাপাল্টা বলতেন, জাল হাদীস বর্ণনা করতেন। পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসগণের মতামতের আলোকে দেখেছেন যে, ইবনু হিব্বান ও ইবনুল জাওযীর এই মত সম্পূর্ণ ভুল। কোনো মুহাদ্দিসই কখনো বলেননি যে, আফলাহ জাল হাদীস বর্ণনা করেন। এমনকি কেউ বলেননি যে, আফলাহ দুর্বল বা অনির্ভরযোগ্য। মুহাম্মদ ইবনু সাদ(২৩০ হি), ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন(২৩৩ হি), আবূ হাতিম রাযী(২৭৭ হি), নাসাঈ (৩০৪ হি)ও অন্যান্য মুহাদ্দিস বিস্তারিত নিরীক্ষার মাধ্যমে তাকে নির্ভরযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ইবনু হিব্বান বা ইবনুল জাওযী কোনো প্রমাণ পেশ করতে পারেননি যে, আফলাহ অন্য রাবীদের বিপরীত উল্টাপাল্টা কোনো হাদীস বর্ণনা করেছেন। সর্বোপরি এই হাদীসটি আফলাহ ছাড়াও অন্য নির্ভরযোগ্য রাবী আবু হুরাইরার সূত্রে বর্ণিত করেছন। কাজেই হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ এবং ইবনু হিব্বান ও ইবনুল জাওযী ভুল বলে প্রমাণিত।(মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৬৮০)।
(২)ইমাম তিরমিযীর ঢিলেমিজাত ভুলের উদাহরণ। তিনি বলেনঃ “আমাদেরকে মুসলিম ইবনু আমর আবু আমর আল হাযযা মাদানী বলেছেন, আমাদেরকে আব্দুল্লাহ ইবনু নাফী আস সাইগ বলেন, তিনি কাসীর ইবনু আব্দুল্লাহ থেকে তার পিতা থেকে তার দাদা(আমর ইবনু আউফ) থেকে বলেন, “নবী আকরাম দুই ঈদে প্রথম রাকায়াতে কুরআন পাঠের পূর্বে ৭ এবং দ্বিতীয় রাকায়াতে কুরআন পাঠের পূর্বে ৫ তাকবীর বলেছেন। (তিরিমিযী, আস-সুনান ২/৪১৬)।
হাদীসটি উল্লেখ করে ইমাম তিরমিযীর বলেনঃ কাসীরের দাদার হাদীসটি হাসান। এই বিষয়ে যত হাদীস বর্ণিত হয়েছে তন্মধ্যে এই হাদীসটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। (তিরিমিযী, আস-সুনান ২/৪১৬)।
এভাবে তিনি এই হাদীসটিকে গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, তার মতে এই বিষয়ে এটিই হলো সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হাদীস।
মুহাদ্দিসগণ ইমাম তিরমিযীর এই প্রবল মতের বিরোধিতা করেছেন। কারণ, মুহাদ্দিসগণ এই হাদীসের বর্ণনাকারী কাসীর ইবনু আব্দুল্লাহকে অত্যন্ত দুর্বল রাবী বলে গণ্য করেছেন। উপরন্তু অনেকেই তাকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনু হাম্বাল বলেনঃ সে অত্যন্ত দুর্বল ও একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন বলেনঃ সে দুর্বল। ইমাম আবু দাউদ বলেনঃ লোকটি জঘন্য মিথ্যাবাদী ছিল। ইমাম শাফেয়ী বলেনঃ সে সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদীদের একজন। ইমাম নাসাঈ ও দারাকুতনী বলেনঃ সে পরিত্যক্ত, অর্থাৎ মিথ্যা হাদীস বলার অভিযোগে অভিযুক্ত। ইবনু হিব্বান বলেনঃ সে তার পিতা থেকে দাদা থেকে একটি মিথ্যা হাদীসের পুস্তিকা বর্ণনা করেছে। শুধুমাত্র সমালোচনার প্রয়োজন ছাড়া কোনো গ্রন্থে সে সকল হাদীস উল্লেখ করাও জায়েয নয়। ইবনু আব্দুল বারর বলেনঃ এই ব্যক্তি যে দুর্বল সে বিষয়ে ইজমা বা ঐকমত্য হয়েছে।(ইবনু হাজার, তাহযীবুত তাহযীব ৮/৩৭৭)।
এজন্য আবুল খাত্তাব উমর ইবনু হাসান ইবনু দাহিয়া(৬৩৩ হি) বলেনঃ “ইমাম তিরমিযী তাঁর গ্রন্থে কত যে মাউযূ বা বানোয়াট ও অত্যন্ত দুর্বল সনদকে হাসান বা গ্রহণযোগ্য বলেছেন তার ইয়ত্তা নেই। এই হাদীসটিও সেগুলির একটি।[যাইলায়ী, আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসূফ(৭৬২ হি)]।
(৩) ইমাম হাকীম এর মুসতাদরাক এর উদাহরণ। হাদীসকে সহীহ বলার ক্ষেত্রে হাকীমের দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি। তিনি তাঁর মুসতাদরাক গ্রন্থে অনেক জাল হাদীসকে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন।
একটি উদাহরণ দেখুনঃ হাকিম বলেন, আমাদেরকে আবুল হাসান আলী ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু উকবা শাইবানী কুফায় অবস্থানকালে বলেছেন, আমাদেরকে কাযী ইবরাহীম ইবনু আবিল আনবাস বলেছেন, আমাদেরকে সাঈদ ইবনু উসমান আল খাররায বলেছেন, আমাদেরকে আব্দুর রাহমান ইবনু সাঈদ আল মুয়াযযিন বলেছেন, আমাদেরকে কাতার ইবনু খালীফাহ বলেছেন, আবুত তুফাইল থেকে, তিনি আলী ও আম্মার(রা) থেকে: তাঁরা উভয়ে বলেনঃ “নবী ফরয সালাতসমূহে জোরে জোরে (সশব্দে) ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করতেন এবং তিনি সালাতুল ফযরে কুনুত পাঠ করতেন……।”
ইমাম হাকিম হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন, “এই হাদীসটির সনদ সহীহ। এর রাবীদের মধ্যে কেউ দুর্বল বলে গণ্য হয়েছেন বলে জানিনা।”(হাকিম, আল মুসতাদরাক ১/৪৩৯)।
ইমাম যাহাবী, যাইলায়ী, ইবনু হাজার প্রমুখ মুহাদ্দিস হাকিমের এই সিদ্ধান্ত ভুল বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম যাহাবী বলেন, এই হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল, মাউযূ বা জাল বলেই প্রতীয়মান হয়। সনদের দুইজন রাবী অত্যন্ত দুর্বলঃ (১)সাঈদ ইবনু উসমান আল খাররায এবং (২) তার উস্তাদ আব্দুর রাহমান ইবনু সাঈদ আল মুয়াযযিন। (হাকিম, আল মুসতাদরাক ১/৪৩৯)।
এইরূপ আরো উদাহরণ আমরা দ্বিতীয় পর্বে দেখতে পাব ইনশাআল্লাহ।
(৪)দশম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধতম মুহাদ্দিস ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী। ইলম হাদীসের বিভিন্ন ময়দানে তাঁর খেদমত রয়েছে। পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ বিভিন্নভাবে তাঁর গ্রন্থাবলীর উপর নির্ভর করেন। তিনি তাঁর প্রণীত ও সংকলিত ‘আল জামি’ আস-সগীর’, ‘আল জামি’ আল-কাবীর’ ‘আল খুসাইসুল কুবরা’ বিভিন্ন গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, তিনি এ সকল গ্রন্থে সহীহ ও যয়ীফ হাদীস উল্লেখ করবেন তবে কোনো জাল হাদীস নয়। কিন্তু পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ তাঁর এ সকল গ্রন্থে কিছু জাল হাদীসও দেখতে পেয়েছেন। বিশেষত, ইমাম সুয়ূতী নিজেই জাল হাদীসের বিষয়ে অনেকগুলো বই লিখেছেন। বেশ কিছু হাদীস ইমাম সুয়ূতী জাল বলে চিহ্নিত করে জাল হাদীস বিষয়ক গ্রন্থে সংকলন করেছেন। আবার তিনি নিজেই সেগুলিকে ‘আল জামি’ আস-সগীর’, ‘আল জামি’ আল-কাবীর’ ‘আল খুসাইসুল কুবরা’ গ্রন্থাদিতে সংকলিত করেছেন।
একটি উদাহরণ দেখুন। পঞ্চম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হামযা ইবনু ইউসূফ জুরজানী(৪২৭ হি) ও আহমদ ইবনু আলী খাতীব বাগদাদী (৪৬৩ হি) একটি হাদীস সংকলন করেছেন। তাঁরা তাঁদের সনদে তৃতীয় হিজরী শতকের একজন হাদীস বর্ণনাকারী ইসহাক ইবনুস সালত হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এই ইসহাক ইবনুস সালত বলেন, আমাদেরকে ইমাম মালিক ইবনু আনাস বলেছেন, আমাদেরকে আবুয যুবাইর মাক্কী বলেছেন, আমাদেরকে জাবিন ইবনু আব্দুল্লাহ(রা) বলেছেন, “আমি রাসূলুল্লাহ(স) হতে এমনি তিনটি (অলৌকিক) বিষয় দেখেছি যে, তিনি কুরআন আনয়ন না করলেও আমি তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করতাম। (একবার) আমরা এক দূরবর্তী মরূভূমিতে গমন করি। তখন নবী(স) ইসতিনজার পানি হাতে নিলেন। তিনি দুইটি খেজুরগাছ দেখে আমাকে বললেন, হে জাবির, তুমি গাছ দুটির নিকট যেয়ে তাদেরকে বল, তোমরা একত্রিত হও। এতে গাছ দুইটি এমনভাবে একত্রিত হয়ে গেল যেন তার একই মূল হতে উৎপন্ন। তখন রাসূলুল্লাহ(স) ইসতিনজা সম্পন্ন করলেন। আমি তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে তাকে দিলাম। আর আমি বললাম, তাঁর পেট থেকে যা বের হয়েছে তা হয়ত আল্লাহ আমাকে দেখাবেন এবং আমি তা ভক্ষণ করব। কিন্তু আমি দেখলাম যে, মাটি পরিস্কার সাদা। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি ইসতিনজা করেননি? তিনি বলেন, হ্যাঁ, তবে আমাদের নবীগণের বিষয়ে যমীনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, আমাদের থেকে মলমূত্র যা নির্গত হবে তা আবৃত করে ফেলতে……।”
ইমাম মালিক ছিলেন দ্বিতীয় হিজরী শতকের অন্যতম প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস। অগণিত মুহাদ্দিস তাঁর নিকট হতে হাদীস শিক্ষা করেছেন। মূলত, সেই সময়ের সকল মুহাদ্দিসই তাঁর নিকট হতে হাদীস শিখেছেন। অনেকেই বছরের পর বছর তাঁর সান্যিধ্যে থেকে হাদীস শিখেছেন। এ সকল অগণিত ছাত্রের কেউই এই হাদীসটি বর্ণনা করেননি। অনুরূপভাবে তাবিয়ী আবুয যুবাইর বা সাহাবী জাবির (রা) থেকেও অন্য কোনো সূত্রে তা বর্ণিত হয়নি। একমাত্র ইসহাক ইবনুস সালত নামক এই ব্যক্তি দাবি করেছেন যে, ইমাম মালিক তাকে হাদীসটি বলেছেন। এই ব্যক্তি অত্যন্ত দুর্বল ও বাতিল হাদীস বর্ণনাকারী বলে চিহ্নিত হয়েছেন। আরো লক্ষণীয় হলো, এই ইসহাকের বর্ণনাও তৃতীয় বা চতুর্থ শতকে কোনোরূপ প্রসিদ্ধি বা পরিচিতি লাভ করেনি। ৫ম শতকে কেউ কেউ হাদীসটি বর্ণনা করেননি। জুরজানী ও খতীব হতে ইসহাক পর্য্ন্ত সনদও অন্ধকারাচ্ছন্ন। এজন্য খতীব বাগদাদী, হামযা ইবনু ইউসূফ জুরজানী, যাহাবী, ইবনু হাজার আসকালানী প্রমুখ মুহাদ্দিসের মতামতের আলোকে ইমাম সুয়ূতী নিজেই হাদীসটিকে জাল বলে গণ্য করেছেন এবং জাল বিষয়ক ‘যাইলুল লাআলী’ নামক গ্রন্থে তিনি তা উল্লেখ করেছেন।
আবার তিনি নিজেই রাসূলুল্লাহ(স) এর মুযিজা, অলৌকিকত্ব ও বৈশিষ্ট্যাবলী বিষয়ক ‘আল-খুসাইসুল কুবরা’ নামক গ্রন্থে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। অথচ তিনি দাবী করেছেন যে, এই গ্রন্থে তিনি কোনো মাউযূ বা জাল হাদীস উল্লেখ করবেননা। পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ তাঁর এই স্ববিরোধিতা ও হাদীসের বিশুদ্ধতা নির্ণয়ে তাঁর ঢিলেমেরি কথা উল্লেখ করেছেন।(হামযা ইবনু ইউসূফ জুরজানী, তারীখ জুরজান, পৃ. ৫২৬, সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ৫০)।
১.৮. মিথ্যা হাদীস বিষয়ক কিছু বিভ্রান্তি
১.৮.১. হাদীস গ্রন্থ বনাম জাল হাদীস
অজ্ঞতা বশত অনেকে মনে করেন যে, কোনো হাদীস কোনো হাদীস গ্রন্থে সংকলিত থাকার অর্থ হলো হাদীসটি সহীহ, অথবা অন্তত উক্ত গ্রন্থের সংকলকের মতে হাদীসটি সহীহ। যেমন কোনো হাদীস যদি সুনাসু ইবনু মাজাহ বা মুসান্নুফূ আবদুর রাযযাক গ্রন্থে সংকলিত থাকে তার অর্থ হলো, হাদীসটি নিশ্চয় সহীহ, নইলে ইবনু মাজাহ বা আব্দুর রাযযাকের মত অত বড় মুহাদ্দিস তা গ্রহণ করলেন কেন? অন্তত, ইবনু মাজাহ বা আবদুর রাযযাকের মতে হাদীসটি সহীহ, নইলে তিনি তাঁর গ্রন্থে হাদীসটির স্থান দিতেননা।
আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, এই ধারণাটির উভয় দিকই ভিত্তিহীন। অধিকাংশ মুহাদ্দিসই তাঁদের গ্রন্থে সহীহ, যয়ীফ, মাউযূ সকল প্রকার হাদীসই সংকলন করেছেন। তাঁরা কখনোই দাবি করেননি বা পরিকল্পনাও করেননি যে, তাঁদের গ্রন্থে শুধু সহীহ হাদীস সংকলন করবেন। কাজেই কোনো হাদীস সুনানে ইবনু মাজাহ বা মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক-এ সংকলিত থাকাতে কখনোই বুঝা যায়না যে, হাদীসটি সহীহ বা ইবনু মাজাহ বা আবদুর রাযযাক এর মতে সহীহ।
ইবনু হিব্বান, ইবনু খুযাইমা, ইবনুস সাকান, হাকিম ও অন্যান্য যে সকল মুহাদ্দিস তাঁদের গ্রন্থে শুধু সহীহ হাদীস সংকলনের চেষ্টা করেছেন, তাঁদের গ্রন্থে কোনো হাদীস সংকলিত হলে আমরা মনে করব যে, হাদীসটি উক্ত মুহাদ্দিসের মতে সহীহ। তবে এতে প্রমাণিত হয়না যে, হাদীসটি প্রকৃতপক্ষে সহীহ। আমরা উপরের আলোচনায় দেখেছি যে, কোনো মুহাদ্দিসের দাবিই উম্মাহর অন্যান্য মুহাদ্দিস নিরীক্ষা ছাড়া গ্রহণ করেননি। এজন্য আমরা অন্যান্য মুহাদ্দিসের নিরীক্ষার আলোকে হাদীসটির বিধান বর্ণনা করব।
আমাদের সমাজে ‘সিহাহ সিত্তাহ’(সিহাহ সিত্তাহ পরিভাষাটি ভারতীয় ব্যবহার।এই ছয়টি গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা সুপরিচিত। তবে গ্রন্থগুলি ‘সহীহ’ নয়। বরং ২টি গ্রন্থ সহীহ এবং বাকিগুলি সুনান। এজন্য মুহাদ্দিসগণের মধ্যে সুপরিচিত পরিভাষা হলো ‘আল কুতুবুস সিত্তা’ ‘পুস্তক ছয়টি’। ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়া অন্য কোথাও সিহাহ সিত্তা পরিভাষাটি প্রচলিত নয়) নামে প্রসিদ্ধ ৬ টি গ্রন্থের মধ্যে ২টি সহীহ গ্রন্থঃ ‘‘সহীহ বুখারী’’ ও “সহীহ মুসলিম” ছাড়া বাকি ৪টির সংকলক ও শুধুমাত্র সহীহ হাদীস বর্ণনা করবেন বলে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁরা তাঁদের গ্রন্থগুলিতে সহীহ হাদীসের পাশাপাশি অনেক দুর্বল ও বানোয়াট হাদীসও সংকলন করেছেন। তবে তাঁদের গ্রন্থগুলির অধিকাংশ হাদীস নির্ভরযোগ্য হওয়ার কারণে পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ সাধারণভাবে তাঁদের গ্রন্থগুলির উপর নির্ভর করেছেন, সাথে সাথে তাঁরা এসকল গ্রন্থে সংকলিত দুর্বল ও বানোয়াট হাদীস সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান প্রদান করেছেন। আল্লামা আবদুল হাই লাখনবী(১৩০৪ হি)এক প্রশ্নের উত্তরে লিখেছেনঃ ‘এই চার গ্রন্থে সংকলিত সকল হাদীস সহীহ নয়। বরং এ সকল গ্রন্থে সহীহ, হাসান, যয়ীফ ও বানোয়াট সকল প্রকারের হাদীস রয়েছে। (আল আজইবাতুল ফাযিলা লিল আসইলাহ আল আশারাতিল কামিলা পৃ. ৬৬)।
ইতোপূর্বে আমরা এ বিষয়ে শাহ ওয়ালীউল্লাহর (রহ) বিবরণ দেখেছি। আমরা দেখেছি যে, তিনি সুনানে আবী দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে তিরমিযী: এই তিনটি গ্রন্থকে তৃতীয় পর্যায়ভুক্ত করেছেন, যে সকল গ্রন্থের হাদীসসমূহ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হলেও সেগুলিতে কিছু অনির্ভরযোগ্য হাদীসও রয়েছে। কিন্তু তিনি ‘সুনান ইবনি মাজাহ’কে এই পর্যায়ে উল্লেখ করেননি। এর কারণ হলো, ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইয়াজীদ ইবনু মাজাহ আল কাযবীনী(২৭৫ হি) সংকলিত ‘সুনান’ গ্রন্থটিকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত করেননি। হিজরী ৭ম শতক পর্য্ন্ত মুহাদ্দিসগণ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অতিরিক্ত এই তিনটি সুনান গ্রন্থকেই মোটামুটি নির্ভরযোগ্য এবং হাদীস শিক্ষা ও শিক্ষাদানের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতেন। ৫ম-৬ষ্ঠ হিজরী শতকের মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ইবনু তাহির মাকসিদী, আবুল ফাদল ইবনুল কাইসুরানী(৫০৭ হি) এগুলির সাথে সুনান ইবনু মাজাহ যোগ করেন।
তাঁর এই মত পরবর্তী দুই শতাব্দী পর্য্ন্ত মুহাদ্দিসগণ গ্রহণ করেননি। ৭ম শতকের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনুস সালাহ আবু আমর উসমান ইবনু আবদুর রাহমান(৬৪৩ হি), আল্লামা আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ আন-না্বাবী(৬৭৬ হি) প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসের মূল উৎস হিসেবে উপরের ৫টি গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন। সুনানে ইবুন মাজাহ কে তাঁরা এর মাঝে গণ্য করেননি। পরবর্তী যুগের অনেক মুহাক্কিক আলিম এদের অনুসরণ করেছেন। অপরদিকে ইমাম ইবনুল আসীর মুবারাক ইবনু মুহাম্মাদ (৬০৬ হি)ও অন্য কতিপয় মুহাদ্দিস ৬ষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে ইমাম মালিকের মুআত্তাকে গ্রহণ করেছেন।
সুনান ইবনি মাজাহকে উপরের তিনটি সুনানের পর্যায়ভুক্ত করতে আপত্তির কারণ হলো ইমাম ইবনু মাজাহর সংকলন পদ্ধতি এই তিন গ্রন্থের মত নয়। উপরে তিন গ্রন্থের সংকলক মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হাদীস সংকলনের উদ্দেশ্যে গ্রন্থ প্রনয়ণ করেছেন। বিষয়বস্তুর প্রয়োজনে কিছু যয়ীফ হাদীস গ্রহণ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলির দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম ইবনু মাজাহ তৎকালীন সাধারণ সংকলন পদ্ধতির অনুসরণ করেছেন। আমরা দেখেছি যে, এ সকল যুগের অধিকাংশ সংকলক সনদসহ প্রচলিত সকল হাদীস সংকলন করতেন। এতে সহীহ, যয়ীফ, মাউদূ সব প্রকারের হাদীসই তাঁদের গ্রন্থে স্থান পেত। সনদ বিচার ছাড়া হাদীসের নির্ভরতা যাচাই করা সম্ভব হতোনা। ইমাম ইবনু মাজাহও মূলত এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তিনি সহীহ বা হাদীস সংকলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি সহীহ ও হাসান হাদীসের পাশাপাশি অনেক যয়ীফ ও কিছু মাউযূ বা বানোয়াট হাদীসও সংকলন করেছেন। তিনি এসকল যয়ীফ ও বানোয়াট হাদীসের ক্ষেত্রে কোনো মন্তব্য করেননি।
৮ম হিজরী শতক থেকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস সুনানে ইবনি মাজাহকে ৪র্থ সুনান গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করতে থাকেন। মুআত্তা ও সুনান ইবনি মাজাহ এর মধ্যে পার্থক্য হলো, মুআত্তা গ্রন্থের হাদীস সংখ্যা কম এবং এই গ্রন্থের সকল সহীহ হাদীস উপরের ৫টি গ্রন্থের মধ্যে সংকলিত। ফলে এই গ্রন্থটিকে পৃথকভাবে অধ্যয়ন করলে অতিরিক্ত হাদীস জানা যাচ্ছেনা। পক্ষান্তরে সুনান ইবনি মাজাহ এর মধ্যে উপরের ৫টি গ্রন্থের অতিরিক্ত সহস্রাধিক হাদীস রয়েছে। এজন্যই পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসগণ এই গ্রন্থটিকে ৪র্থ সুনান হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
ইমাম ইবনু মাজাহ এর সুনান গ্রন্থে মোট ৪৩৪১টি হাদীস সংকলিত হয়েছে। তন্মধ্যে প্রায় তিন হাজার হাদীস উপরের পাঁচটি গ্রন্থে সংকলিত। বাকী প্রায় দেড় হাজার হাদীস অতিরিক্ত। ৯ম হিজরী শতকের মুহাদ্দিস আল্লামা আহমদ ইবনু আবী বাকর আল-বূসীরী(৮৪০ হি) ইবনু মাজাহর এ সকল অতিরিক্ত হাদীসের সনদ আলোচনা করেছেন। আল্লামা বূসীরী ১৪৭৬ টি হাদীসের সনদ আলোচনা করেছেন, যেগুলি উপরের ৫টি গ্রন্থে সংকলিত হয়নি, শুধুমাত্র ইবনু মাজাহ সংকলন করেছেন। এগুলির মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সহীহ বা হাসান হাদীস এবং প্রায় এক তৃতীয়াংশ হাদীস যয়ীফ। এগুলির মধ্যে প্রায় অর্ধশত হাদীস মাউযূ বা বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছেন মুহাদ্দিসগণ।(ইবনুল কাউসূরানী, শুরুতুল আইম্মাহ আস-সিত্তাহ পৃ. ১৩, ২৪-২৬)।
১.৮.২. আলিমগণের গ্রন্থ বনাম জাল হাদীস
হাদীসের গ্রন্থ ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন ইসলামী গ্রন্থে হাদীস উল্লেখ করা হয়। তাফসীর, ফিকহ, ওয়ায, আখলাক, ফযীলত, তাসাউফ, দর্শন, ভাষা, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ক পুস্তকাদিতে আরো অনেক হাদীস উল্লেখ করা হয়। সাধারণত এ সকল গ্রন্থে সনদবিহীনভাবে হাদীস উল্লেখ করা হয়। অনেকেই অজ্ঞতাবশত ধারণা করেন যে, এ সকল গ্রন্থের লেখকগণ নিশ্চয় যাচাই বাছাই করেই হাদীসগুলি উল্লেখ করেছেন। সহীহ না হলে কি আর তিনি হাদীসটি লিখতেন?
এই ধারণাটিও ভুল, ভিত্তিহীন এবং উপরের ধারণাটির চেয়েও বেশি বিভ্রান্তিকর। সাধারণত প্রত্যেক ইলমের জন্য পৃথক ক্ষেত্র রয়েছে। এজন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক বিষয়ের আলিম অন্য বিষয়ে অত সময় দিতে পারেননা। মুফাসসির, ফকীহ, ঐতিহাসিক, সূফী, ওয়ায়িয ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কর্মরত আলিম ও বুযুর্গ স্বভাবতই হাদীসের নিরীক্ষা, যাছাই বাছাই ও পর্যালোচনার গভীরতায় যেতে পারেননা। সাধারণভাবে তাঁরা হাদীস উল্লেখ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রচলিত গ্রন্থ, জনশ্রুতি ও প্রচলনের উপরে নির্ভর করেন। এজন্য তাঁদের গ্রন্থে অনেক ভিত্তিহীন, সনদহীন ও জাল কথা পাওয়া যায়।
আল্লামা নবাবী তাঁর “তাকরীব” গ্রন্থে এবং আল্লামা সুয়ূতী তাঁর “তাদরীবুর রাবী” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কুরআন কারীমের বিভিন্ন সূরার ফযীলতে অনেক মিথ্যা কথাকে কিছু বুযুর্গ দরবেশ হাদীসে বলে সমাজে চালিয়েছেন। কোনো কোনো মুফাসসির, যেমন- আল্লামা আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম আস সালাবী নিশাপূরী(৪২৭ হি) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে, তাঁর ছাত্র আল্লামা আলী ইবনে আহমাদ আল ওয়াহিদী নিশাপূরী(৪৬৮ হি) তাঁর “বাসীত”, “ওয়াসিত”, “ওয়াজীয” ইত্যাদি তাফসীর গ্রন্থে, আল্লামা আবুল কাশেম মাহমূদ ইবনে উমর আয-যামাখশারী (৫৩৮ হি) তাঁর কাশশাফ গ্রন্থে, আল্লামা আব্দুল্লাহ ইবনে উমর আল বাইযাবী(৬৮৫ হি) তাঁর “আনওয়ারুত তানযীল” বা “তাফসীরে বাইযাবী” গ্রন্থে এসকল বানোয়াট হাদীস উল্লেখ করেছেন। তাঁরা এই কাজটি করে ভুল করেছেন। সুয়ূতী বলেনঃ “ইরাকী(৮০৬ হি)বলেছেন যে, প্রথম দুইজন-সা’লাবী ও ওয়াহিদী সনদ উল্লেখপূর্বক এসকল বানোয়াট বা জাল হাদীস উল্লেখ করেছেন।” ফলে তাঁদের ওজর কিছুটা গ্রহণ করা যায়, কারণ তাঁরা সনদ বলে দিয়ে পাঠককে সনদ বিচারের দিকে ধাবিত করেছেন, যদিও মাউযূ বা মিথ্যা হাদীস সনদসহ উল্লেখ করলেও সঙ্গে সঙ্গে তাকে মাউযূ না বলে চুপ করে যাওয়া জায়েয নয়। কিন্তু পরবর্তী দুইজন-যামাখশারী ও বাইযাবী –এর ভুল খুবই মারাত্মক। কারণ, তাঁরা সনদ উল্লেখ করেননি, বরং রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বলে সরাসরি ও স্পষ্টভাবে এ সকল বানোয়াট হাদীস উল্লেখ করেছেন। (জালালুদ্দীন সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/৩৪১)।
মোল্লা আলী কারী কোনো কোনো বানোয়াট হাদীস উল্লেখপূর্বক লিখেছেনঃ “কুতুল কুলুব”, “এহইয়াউ উলূমুদ্দীন”, “তাফসীরে সা’লাবী” ইত্যাদি গ্রন্থে হাদীসটির উল্লেখ আছে দেখে ধোঁকা খাবেননা।(মুল্লা আলী কারী, আল-আসরারুল মারফুয়া, পৃ. ২৮৯)।
আল্লামা আব্দুল হাই লাখনবী হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলীর নাম ও পর্যায় বিন্যাস উল্লেখ করে বলেনঃ “আমরা ফিকহী গ্রন্থাবলির নির্ভরযোগ্যতার যে পর্যায় উল্লেখ করলাম তা সবই ফিকহী মাসায়েলের ব্যাপারে। এ সকল পুস্তকের মধ্যে যে সকল হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলির বিশুদ্ধতা বা নির্ভরযোগ্যতা বিচারের ক্ষেত্রে এই বিন্যাস মোটেও প্রযোজ্য নয়। এরূপ অনেক নির্ভরযোগ্য ফিকহী গ্রন্থ রয়েছে যেগুলির উপর মহান ফকীহগণ নির্ভর করেছেন, কিন্তু সেগুলি জাল ও মিথ্যা হাদীসে ভরপুর। বিশেষত ‘ফাতওয়া’ বিষয়ক পুস্তকাদি। বিস্তারিত পর্যালোচনা করে আমাদের নিকট প্রমাণিত হয়েছে যে, এসকল পুস্তকের লেখকগণ যদিও ‘কামিল’ ছিলেন, তবে হাদীস উল্লেখ করার ক্ষেত্রে তাঁরা অসতর্ক ছিলেন।(আবদুল হাই লাখনবী, আন-নাফি আল কাবীর, পৃ. ১২-১৩)।
এজন্য মুহাদ্দিসগণ ফিকহ, তাফসীর, তাসাঊফ, আখলাক ইত্যাদি বিষয়ক গ্রন্থে উল্লেখিত হাদীসগুলি বিশেষভাবে নিরীক্ষা করে পৃথক গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন ৬ষ্ঠ হিজরী শতকের প্রখ্যাত হানাফী ফকীহ আল্লামা বুরহানুদ্দীন আবুল হাসান আলী ইবনে আবু বকর আল মারগীনানী (৫৯৩ হি) তাঁর লেখা ফিকহ শাস্ত্রের প্রখ্যাত গ্রন্থ “হেদায়া”য় অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। তিনি ফকীহ হিসাবে ফিকহ মাসায়েল নির্ধারণ ও বর্ণনার প্রতিই তাঁর মনোযোগ ও সার্বিক প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন। হাদীস উল্লেখের ক্ষেত্রে তিনি যা শুনেছেন বা পড়েছেন তা বাছবিচার না করেই লিখেছেন। তিনি কোনো হাদীসের সহীহ বা যয়ীফ বিষয়ে কোনো মন্তব্যও করতে যাননি। পরবর্তী যুগে আল্লামা জামালুদ্দীন আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবনে ইউসূফ যাইলায়ী হানাফী(৭৬২ হি), আল্লামা আহমাদ ইবনে আলী ইবনে হাজার আসকালানী(৮৫২ হি) প্রমুখ মুহাদ্দিস এসকল হাদীস নিয়ে সনদভিত্তিক গবেষণা করে এর মধ্য থেকে সহীহ, যয়ীফ ও বানোয়াট হাদীস নির্ধারণ করেছেন।
অনুরূপভাবে হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী(৫০৫ হি) তাঁর প্রসিদ্ধ “এহইয়াউ উলুমিদ্দীন” গ্রন্থে ফিকহ ও তাসাউফ আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। তিনি দার্শনিক ও ফকীহ ছিলেন, মুহাদ্দিস ছিলেননা। এজন্য হাদীসের সনদ বাছবিচার না করেই যা শুনেছেন বা পড়েছেন সবই উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী যুগে আল্লামা যাইনুদ্দীন আবুল ফাদল আব্দুল রহীম ইবনে হুসাইন আল-ইরাকী(৮০৬ হি) ও অন্যান্য সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস তাঁর উল্লিখিত হাদীসসমূহের সনদ ভিত্তিক বিচার বিশ্লেষণ করে সহীহ, জাল ও বানোয়াট হাদীসুগলি নির্ধারণ করেছেন। এছাড়া ৮ম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ শাফিয়ী ফকীহ ও মুহাদ্দিস আল্লামা ওয়াহাব ইবনু আলী আস-সুবকী (৭৭১ হি) ‘এহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থে উল্লিখিত কয়েকশত জাল ও ভিত্তিহীন হাদীস একটি পৃথক পুস্তকে সংকলিত করেছেন। পুস্তকটির নাম ‘আল আহাদীস আল্লাতী লা আসলা লাহা ফী কিতাবিল এহইয়া’, অর্থাৎ ‘এহইয়াউ উলূমিদ্দীন গ্রন্থে সংকলিত হাদীসসমূহ’।
১.৮.৩. কাশফ ইলহাম বনাম জাল হাদীস
সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় সুপ্রসিদ্ধ বুযুর্গ ও আল্লাহর প্রিয় ওলী-রূপে প্রসিদ্ধ আলিমগণের বিষয়ে। যেহেতু তাঁরা ‘সাহেবে কাশফ’ বা কাশফ সম্পন্ন ওলী ছিলেন, সেহেতু আমরা ধারণা করি যে, কাশফের মাধ্যমে প্রদত্ত তথ্যের বিশুদ্ধতা যাচাই না করে তো তাঁরা আর লিখেননি। কাজেই তাঁরা যা লিখেছেন বা যা বলেছেন তা বিশুদ্ধ বলে গণ্য হবে।
আল্লামা সুয়ূতী(৯১১ হি), আব্দুল হাই লাখনবী(১৩০৪ হি)প্রমুখ আলিম এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁরা ইমাম গাযযালীর ‘‘এহইয়াউ এলুমিদ্দীন” ও অন্যান্য গ্রন্থে, হযরত আবদুল কাদির জিলানী লিখিত কোনো কোনো গ্রন্থে উল্লেখিত অনেক মাউযূ বা বানোয়াট হাদীসের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন যে, কেউ হয়তো প্রশ্ন করবেনঃ এত বড় আলেম ও এত বড় সাহেবে কাশফ ওলী, তিনি কি বুঝতে পারলেন না যে, এই হাদীসটি বানোয়াট? তাঁর মত একজন ওলী কিভাবে নিজ গ্রন্থে মাউদূ হাদীস উল্লেখ করলেন? তাঁর উল্লেখের দ্বারা কি বুঝা যায়না যে, হাদীসটি সহীহ? এই সন্দেহের জবাবে তাঁরা যে ব্যাখ্যাগুলি উল্লেখ করেছেন সেগুলির ব্যাখ্যা নিম্নরূপঃ
১.৮.৩.১. বুযুর্গগণ যা শুনেন তাই লেখেন
বস্তুত সরলপ্রাণ বুযুর্গগণ যা শুনেন তাই লিখেন।এজন্য কোনো বুযুর্গের গ্রন্থে তাঁর সুস্পষ্ট মন্তব্য ছাড়া কোনো হাদীস উল্লেখ করার অর্থ এই নয় যে, তিনি হাদীসটিকে সহীহ বলে নিশ্চিত হয়েছেন। মূলত তাঁরা যা পড়েছেন বা শুনেছেন তা উল্লেখ করেছেন মাত্র। তাঁরা আশা করেছেন হয়তো এর কোনো সনদ থাকবে, হাদীসের বিশেষজ্ঞগণ তা খুঁজে দিবেন।
১.৮.৩.২. হাদীস বিচারে কাশফের কোনো ভূমিকা নেই
হাদীস বিচারের ক্ষেত্রে কাশফের কোনোই অবদান নেই। কাশফ, স্বপ্ন ইত্যাদি আল্লাহর পক্ষ হতে দেয়া নেয়ামত মাত্র, আনন্দ ও শুকরিয়ার উৎস। ইচ্ছামতো প্রয়োগের কোনো বিষয় নয়। আল্লাহ তা’য়ালা কাশফের মাধ্যমে হযরত উমারকে (রা) শত শত মাইল দূরে অবস্থিত সিরিয়ার সেনাবাহিনীর অবস্থা দেখিয়েছিলেন, অথচ তাঁকে হত্যা করার জন্য তাঁরই পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আবু লু’লুর কথা টের পেলেননা হযরত উমার(রা)।
এছাড়া কাশফ, স্বপ্ন ইত্যাদি দ্বারা কখনোই হক বাতিলের বা ঠিক বেঠিকের ফায়সালা হয়না। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে বিভিন্ন মতবিরোধ ও সমস্যা ঘটেছে, কখনোই একটি ঘটনাতেও তাঁরা কাশফ, ইলহাম, স্বপ্ন ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁরা হক বা বাতিল জানার চেষ্টা করেননি। খুলাফায়ে রাশেদীন-আবু বকর, উমার, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম-এর দরবারে অনেক সাহাবী হাদীস বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাকারীর ভুলভ্রান্তি সন্দেহ হলে তাঁরা সাক্ষী চেয়েছেন অথবা বর্ণনাকারীকে কসম করিয়েছেন। কখনো কখনো তাঁরা বর্ণনাকারীর ভুলের বিষয়ে বেশি সন্দিহান হলে তাঁর বর্ণিত হাদীসকে গ্রহণ করেননি।কিন্তু কখনোই তাঁরা কাশফের মাধ্যমে হাদীসের সত্যাসত্য বিচার করেননি। পরবর্তী প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনা করেছেন, শুনেছেন ও হাদীসের সহীহ, যয়ীফ ও বানোয়াট নির্ধারণের জন্য সনদ বর্ণনার ব্যবস্থা নিয়েছেন। বর্ণনাকারীর অবস্থা অনুসারে হাদীস গ্রহণ করেছেন বা যয়ীফ হিসেবে বর্জন করেছেন। কিন্তু কখনোই তাঁরা কাশফের উপর নির্ভর করেননি।
হাদীসের বিশুদ্ধতা নির্ণয়ের জন্য সনদের উপর নির্ভর করা সুন্নাতে খুলাফায়ে রাশেদীন ও সুন্নাতে সাহাবা। আর এ বিষয়ে কাশফ, ইলহাম বা স্বপ্নের উপর নির্ভর করা খেলাফে সুন্নাত, বিদয়াত ও ধ্বংসাত্মক প্রবণতা।
১.৮.৩.৩. কাশফ, ইলহাম সঠিকত্ব জানার মাধ্যম নয়
ইসলামী আকীদার গ্রন্থে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে যে, কাশফ বা ইলম কোনো কিছুর সঠিকত্ব জানার মাপকাঠি নয়। ৬ষ্ঠ শতকের অন্যতম হানাফী আলিম উমার ইবনু মুহাম্মাদ আন-নাসাফী(৫৩৭ হি) তাঁর “আল আকাইদ আল নাসাফিয়্যাহ” ও ৮ম শতকের প্রখ্যাত শাফেয়ী আলিম সা’দ উদ্দীন মাসউদ ইবনু উমার আত-তাফতাযানী (৭৯১ হি) তাঁর “শারহুল আকাইদ আন নাসাফিয়্যাহ”তে লিখেছেনঃ “হকপন্থীদের নিকট ‘ইলহাম’ যা ‘ফয়েযরূপে প্রদত্ত ইলকা’ নামে পরিচিত তা কোনো কিছুর সঠিকত্ব জানার মাধ্যম হতে পারেনা।”(মুজাদ্দিদে আলফেসানী, মাকতুরাত শরীফ ১/১, পৃ. ৮৮, ১৭৮, ১৯৫, ১৯৬…..)।
কোনো কোনো অনভিজ্ঞ বুযুর্গ স্বপ্ন, কাশফ, ইলহাম ইত্যাদির ভিত্তিতে ‘হাদীসের’ বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের দাবি করলেও অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ বুযুর্গগণ এর কঠিন বিরোধিতা করেছেন। ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ ও সংস্কারক মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রাহ) হক্ক-বাতিল বা বিশুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা জানার ক্ষেত্রে কাশফ, ইলহাম ইত্যাদির উপর নির্ভর করার কঠিন আপত্তি ও প্রতিবাদ করেছেন। তিনি বারংবার উল্লেখ করেছেন যে, কুরআন-হাদীসই কাশফ, ইলহাম ইত্যাদির সঠিক বা বেঠিক হওয়ার মানদন্ড। কাশফ কখনোই হাদীস বা কোনো মতামতের সঠিকত্ব জানার মাধ্যম নয়।
১.৮.৩.৪. সাহেবে কাশফ ওলীগণের ভুলত্রুটি
বাস্তবে আমরা দেখতে পাই যে, অনেক প্রখ্যাত সাধক, যাদেরকে আমরা সাহেবে কাশফ বলে জানি, তাঁরা তাঁদের বিভিন্ন গ্রন্থে এমন অনেক কথা লিখেছেন যা নিঃসন্দেহে ভুল বা অন্যায়।হযরত আবদুল কাদের জিলানী(৫৬১ হি) লিখেছেন যে, ঈমান বাড়ে এবং কমে। ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি স্বীকার করাকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত ও ফেরকায়ে নাজীয়ার আলামত বলে গণ্য করেছেন এবং ঈমানের হ্রাস বৃদ্ধি না মানাকে বাতিলদের আলামত বলে গণ্য করেছেন। তিনি লিখেছেন যে, কোনো মুসলমানের উচিত নয় যে সে বলবেঃ “নিশ্চয় আমি মুমিন”, বরং তাঁকে বলতে হবে যে, “ইনশা আল্লাহ আমি মুমিন।” ইমাম আবু হানীফা(রাহ) ও তাঁর অনুসারীগণ যেহেতু ঈমানের হ্রাস বৃদ্ধি স্বীকার করেননা, আমলকে ঈমানের অংশ মনে করেননা এবং ‘ইনশা আল্লাহ আমি মুমিন’ বলাকে আপত্তিকর মনে করেন, সেজন্য তিনি তাঁকে ও তাঁর অনুসারীগণকে বাতিল ও জাহান্নামী ফিরকা বলে উল্লেখ করেছেন। [আব্দুল কাদের জিলানী, গুনিয়াতুত তালিবীন(অনুবাদ-নুরুল আলম রঈসী), পৃ. ৬, ৭, ১৪৯, ১৫১,১৫২, ১৫৫, ২১১, ২২৭]।
ইমাম গাযযালী লিখেছেন যে, গান বাজনা ও নর্তন কুর্দন ইত্যাদি আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার পথে সহায়ক ও বিদ‘আতে হাসানা। তিনি গান বাজনার পক্ষে অনেক দুর্বল ও জাল হাদীস উল্লেখ করেছেন।(আবু হামিদ গাযালী, এহইয়াউ উলূমিদ্দীন ২/২৯২-৩৩২)
এরূপ অগণিত উদাহরণ তাঁদের গ্রন্থে পাওয়া যায়। কাজেই, তাঁরা যদি কোনো হাদীসকে সহীহ বলেও ঘোষণা দেন তারপরও তার সনদ বিচার ব্যতিরেকে তা গ্রহণ করা যাবেনা। কারণ রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা, সকল বানোয়াট কথাকে চিহ্নিত করা দ্বীনের অন্যতম ফরজ। কেউ সন্দেহযুক্ত হাদীস রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে বর্ণনা করলেও তাঁকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। কাজেই, এক্ষেত্রে কোনো শিথিলতার অবকাশ নেই।
১.৮.৪. বুযুর্গগণের নামে জালিয়াতি
এখানে আরেকটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার। তা হলো, হাদীসের নামে জালিয়াতির ন্যায় নেককার বুযুর্গ ও ওলী-আল্লাহগণের নামে জালিয়াতি হয়েছে প্রচুর। এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়ঃ
(১) জালিয়াতগণ ধর্মের ক্ষতি করার জন্য অথবা ধর্মের ‘উপকার’ করার জন্য জালিয়াতি করত। বিশেষ করে যারা ধর্মের অপূর্ণতাকে(!) দূর করে আরো আকর্ষণীয় ও জননন্দিত করতে ইচ্ছুক ছিলেন তাদের জালিয়াতিই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক। আর উভয় দলের জন্য বিশেষ করে দ্বিতীয় দলের জন্য রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে জালিয়াতি করার চেয়ে ওলী-আল্লাহগণের নামে জালিয়াতি করা অধিক সহজ ও অধিক সুবিধাজনক ছিল।
(২) বুযুর্গদের নামে জালিয়াতি অধিকতর সুবিধাজনক এজন্য যে, সাধারণ মানুষদের মাঝে তাঁদের নামের প্রভাব ‘হাদীসের’ চেয়েও বেশি। অনেক সাধারণ মুসলমানকে ‘হাদীস’ বলে বুঝানো কষ্টকর। তাকে যদি বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ(স) অমুক কাজ করেছেন, করতে বলেছেন……তবে তিনি তা গ্রহণ করতেও পারেন আবার নাও পারেন। কিন্তু যদি তাকে বলা হয় যে, আব্দুল কাদের জিলানী বা খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী বা……অমুক ওলী এই কাজটি করেছেন বা করতে বলেছেন তবে অনেক বেশি সহজে তাকে ‘প্রত্যায়িত’ (Convinced) করা যাবে এবং তিনি খুব তাড়াতাড়ি তা মেনে নিবেন। ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দীর সোনালী দিনগুলির পরে যুগে যুগে সাধারণ মুসলিমদের এ অবস্থা। কাজেই বুযুর্গদের নামে জালিয়াতি বেশি কার্য্কর ছিল।
(৩) ওলী-আল্লাহদের নামে জালিয়াতি সহজতর ছিল এজন্য যে, হাদীসের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর নিবেদিত মুহাদ্দিসগণ যেভাবে সতর্ক প্রহরা ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা রেখেছিলেন, এক্ষেত্রে তা কিছুই ছিলনা বা নেই। কোনো নিরীক্ষা নেই, পরীক্ষা নেই, সনদ নেই, মতন নেই, ঐতিহাসিক বা অর্থগত নিরীক্ষা নেই- যার যা ইচ্ছা বলছেন। কাজেই অতি সহজে জালিয়াতগণ নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে পারতেন।
(৪) হাদীস জালিয়াতির জন্যও এ সকল বুযুর্গের নাম ব্যবহার ছিল অত্যন্ত কার্য্কর। এ সকল বুযুর্গের নামে বানোয়াট কথার মধ্যে অনেক জাল হাদীস ঢুকিয়ে দিয়েছে তারা। এ সকল বুযুর্গের প্রতি ‘ভক্তির প্রাবল্য’-র কারণে অতি সহজেই ভক্তিভরে এ সকল বিষ ‘গলাধঃকরণ’ করেছেন মুসলমানরা। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পেরেছে জালিয়াতগণ।
১.৮.৪.১. কাদেরীয়া তরীকা
আব্দুল কাদের জিলানী (রাহ) হিজরী ৬ষ্ঠ শতকের(দ্বাদশ খ্রিস্টীয় শতকের) প্রসিদ্ধতম ব্যক্তিত্ব। একদিকে তিনি হাম্বলী মাযহাবের বড় ফকীহ ছিলেন। অন্যদিকে তিনি প্রসিদ্ধ সাধক ও সূফী ছিলেন। তাঁর নামে অনেক তরীকা, কথা ও পুস্তক মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত। এ সকল তরীকা, কথা ও পুস্তক অধিকাংশ বানোয়াট। কিছু কিছু পুস্তক তাঁর নিজের রচিত হলেও পরবর্তীকালে এগুলির মধ্যে অনেক বানোয়াট কথা ঢুকানো হয়েছে। এখানে আমরা তাঁর নামে প্রচলিত কাদেরীয়া তরীকা ও ‘সিররুল আসরার’ পুস্তিকটির পর্যালোচনা করব।
প্রচলিক কাদেরীয়া তরীকার আমল, ওযীফা, মুরাকাবা ইত্যাদি পদ্ধতির বিবরণ আব্দুল কাদির জিলানী(রাহ) এর পুস্তকে পাওয়া যায়না। ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেন যে, আব্দুল কাদির জিলানীর(রাহ) এর ওফাতের প্রায় দুইশত বছর পরে তাঁর এক বংশধর ‘গাওসে জিলানী” ৮৮৭ হিজরী সালে (১৪৮২ খ্রিস্টাব্দ) ‘কাদেরিয়া তরিকা’-র প্রচলন করেন। বিভিন্ন দেশে ‘কাদেরিয়া তরিকা’-র নামে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত। হযরত আব্দুল কাদির জিলানীর নিজের লেখা প্রচলিত বইগুলিতে যে সকল আমল, ওযীফা ইত্যাদি লিখিত আছে প্রচলিত ‘কাদেরিয়া তরিকা’র মধ্যে সেগুলি নেই।
আমাদের দেশে প্রচলিত কাদেরিয়া তরিকার সূত্র বা ‘শাজারা’ থেকে আমরা দেখি যে, শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী(১১৭৬ হি/১৭৬২ খ্রিস্টাব্দ)থেকে তা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু শাহ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর ‘আল কাওলুল জামীল’ গ্রন্থে কাদেরীয়া তরীকার যে বিবরণ দিয়েছেন তার সাথে সাইয়্যেদ আহমেদ বেলব্রীর(১২৪৬ হি) ‘সিরাতে মুস্তাকিমের’ বিবরণে পার্থক্য দেখা যায়। আবার তাঁদের দুইজনের শিখানো পদ্ধতির সাথে বর্তমানে আমাদের দেশে প্রচলিত কাদেরিয়া তরিকার ওযীফা ও আশগালের অনেক পার্থক্য দেখা যায়। এগুলির কোনটি তাঁর নিজের প্রবর্তিত ও কোনটি তাঁর নামে পরবর্তীকালে প্রবর্তিত তা জানার কোনো উপায় নেই।
১.৮.৪.২. সিররুল আসরার
হযরত আব্দুল কাদির জিলানীর(রাহ) নামে প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ একটি পুস্তক ‘সিররুল আসরার’। পুস্তকটিতে কুরআন-হাদীসের আলোকে অনেক ভালো কথা বলা রয়েছে। পাশাপাশি অনেক জাল হাদীস ও বানোয়াট কথা পুস্তকটিতে বিদ্যমান। অবস্থাদৃষ্টি দেখা যায়, পরবর্তীকালের কেউ এ বইটি লিখে তাঁর নামে চালিয়েছে। কয়েকটি বিষয় এ জালিয়াতি প্রমাণ করেঃ
১. এ পুস্তকের বিভিন্ন স্থানে লেখক ‘ফরিদ উদ্দীন আত্তার’ এর বিভিন্ন বাণী ও কবিতার উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন। যেমন এক স্থানে বলেছেনঃ “হযরত শাইখ ফরিদ উদ্দীন আত্তার(রহঃ) বলেন…..”(আব্দুল কাদের জিলানী, সিররুল আসরার, পৃ.২৭)। এখানে লক্ষণীয় যে, ফরিদ উদ্দীন আত্তার(রহঃ) ৫১২ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬২৬ হিজরীত ইন্তিকাল করেন। আর আব্দুল কাদির জিলানীর জন্ম ও মৃত্যু যথাক্রমে ৪৭১ হিজরী ও ৫৬১ হিজরীতে। ফরীদ উদ্দীন আত্তার বয়সে তাঁর ৪০ বছরের ছোট এবং তাঁর ইন্তিকালের সময় ফরিদউদ্দীন আত্তারের তেমন কোনো প্রসিদ্ধি ছিলনা। কাজেই ‘হযরত শাইখ……’ ইত্যাদি বলে তিনি আত্তারের উদ্ধৃতি প্রদান করবেন এ কথা কল্পনা করা যায়না।
২. এই পুস্তকে শামস তাবরীয- এর উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। লেখক বলেনঃ “হযরত শাস তাবরীয(রঃ) বলেছেন……….………..(আব্দুল কাদের জিলানী, সিররুল আসরার, পৃ.২৭)।
উল্লেখ্য যে, শামস তাবরীয ৬৪৪ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্ম সঠিকভাবে জানা হয়নি। তবে ৫৬০ হিজরী এর পরে তাঁর জন্ম বলে মনে হয়। অর্থাৎ আব্দুল কাদির জিলানী(রাহঃ) এর মৃত্যুর সময় শামস তাবরীয এর জন্মও হয়নি। অথচ তিনি তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।
৩. এই পুস্তকে বারংবার জালালুদ্দীন রুমীর উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়েছে। যেমন লেখক বলেছেনঃ আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী তাঁর অমর কাব্য মসনবীতে বলেছেন………..(আব্দুল কাদের জিলানী, সিররুল আসরার, পৃ. ২৫, ২৯)। লক্ষ্যণীয় যে, জালালুদ্দীন রুমী (৬০৪-৬৭৬ হি) আব্দুল কাদির জিলানীর ইন্তিকালের পরে প্রায় অর্ধশত বৎসর পরে জন্মগ্রহণ করেন! রুমীর জন্মের অর্ধশত বৎসর পূর্বে তাঁর মসনবীর উদ্ধৃতি প্রদান করা হচ্ছে!!
এভাবে আমরা বুঝতে পারি যে, এই পুস্তকটি পুরোটাই জাল, অথবা এর মধ্যে অনেক জাল কথা পরবর্তীতে ঢুকানো হয়েছে। এই পুস্তকটির মধ্যে অগণিত জাল হাদীস ও জঘন্য মিথ্যা কথা লিখিত রয়েছে। আর আব্দুল কাদির জিলানী(রাহঃ) এর নামে এগুলো খুব সহজেই বাজার পেয়েছে।
১.৮.৪.৩. চিশতীয়া তরীকা
আমাদের দেশের অন্যতম প্রসিদ্ধ বুযুর্গ হযরত খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী(৬৩৩ হি), কুতুব উদ্দীন বখতীয়ার কা’কী (৬৫৩ হি), ফরীদ উদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শক্কর(৬৬৩ হি) ও নিযাম উদ্দীন আউলিয়া(৭২৫ হি) রাহিমাহুমুল্লাহ। এদের নামেই চিশতীয়া তরীকা প্রচলিত। এছাড়া এদের নামে অনেক কথা, কর্ম ও বই পুস্তকও প্রচলিত। এগুলির মধ্যে এমন অনেক কথা রয়েছে যা স্পষ্টতই মিথ্যা ও বানোয়াট। এখানে চিশতীয়া তরীকা ও এঁদের নামে প্রচলিত দু একটি বইয়ের বিষয়ে আলোচনা করব।
ভারতের বিভিন্ন দরবারের চিশতীয়া তরীকার আমল, ওযীফা ইত্যাদির মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। উপযুক্ত বুযুর্গগণের নামে প্রচলিত পুস্তকাদিতে এ সকল ‘তরীকা’ বা পদ্ধতির কিছুই দেখা যায়না। আবার এ সকল পুস্তকে যে সকল যিকর-ওযীফার বিবরণ রয়েছে সেগুলিও প্রচলিত চিশতীয়া তরীকার মধ্যে নেই। চিশতীয়া তরীকার ক্ষেত্রেও শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী বিবরণের সাথে সাইয়েদ আহমদ ব্রেলবীর বিবরণের পার্থক্য দেখা যায়। আবার তাঁদের দুইজনের শেখানোর পদ্ধতির সাথে বর্তমানে আমাদের দেশে প্রচলিত চিশতীয়া তরীকার ওযীফা ও আশগালের পার্থক্য দেখা যায়। এগুলির কোনটি অরিজিনাল আর কোনটি বানোয়াট তা জানার কোনো উপায় নেই।
১.৮.৪.৪. আনিসুল আরওয়াহ, রাহাতিল কুলুব……….ইত্যাদি
এ সকল মহান মাশাইখ রচিত বলে কিছু পুস্তক প্রচলিত। এগুলি ‘উস্তাদ বা পীরের সাহচর্য্যের স্মৃতি ও আলোচনা’ হিসেবে রচিত। খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী তাঁর উস্তাদ উসমান হারুনীর সাথে তাঁর দীর্ঘ সাহচর্য্যের বিবরণ ‘আনিসুল আরওয়াহ’ নামক পুস্তকে। খাজা কুতুব উদ্দীন বখতীয়ার কাকী তাঁর উস্তাদ মঈন উদ্দীন চিশতীর সাথে তার সাহচর্য্যের স্মৃতিগুলি লিখেছেন ‘দলিলুল আরেফীন’ পুস্তকে। খাজা ফরীদ উদ্দীন গঞ্জে শক্কর তাঁর উস্তাদ কুতুব উদ্দীন এর সাহচর্য্যের স্মৃতিগুলি লিখেছেন ‘ফাওয়ায়েদুস সালেকীন’ পুস্তকে। খাজা নিজাম উদ্দীন আউলিয়া তাঁর উস্তাদ ফরীদ উদ্দীন এর সাহচর্য্যের স্মৃতিগুলি লিখেছেন ‘রাহাতিল কুলব’ পুস্তকে। প্রসিদ্ধ গায়ক আমীর খসরু তাঁর উস্তাদ নিজাম উদ্দীনের সাহচর্য্যের স্মৃতিগুলি লিখেছেন ‘রাহাতুল মুহিব্বীন’ পুস্তকে।
এ সকল পুস্তক পাঠ করলে প্রতীয়মান হয় যে, এগুলি পরবর্তী যুগের মানুষদের রচিত জাল পুস্তক। অথবা তাঁরা কিছু লিখেছিলেন সেগুলির মধ্যে পরবর্তী যুগের জালিয়াতগণ ইচ্ছামত অনেক কিছু ঢুকিয়েছে। এই পুস্তক গুলিতে কুরআন হাদীস ভিত্তিক অনেক ভালো কথা আছে। পাশাপাশি অগণিত জাল হাদীস ও মিথ্যা কথায় সেগুলি ভরা। এ ছাড়া ঐতিহাসিক তথ্যাবলী উল্টাপাল্টা লেখা হয়েছে। এমন সব ভুল রয়েছে যা প্রথম দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে।
প্রত্যেক বুযুর্গ তাঁর মাজালিসগুলির তারিখ লিখেছেন। সন তারিখগুলি উল্টাপাল্টা লেখা। যাতে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, পরবর্তীকালে এঁদের নামে এগুলি জালিয়াতি করা হয়েছে। শাওয়ার মাসের ৪ তারিখ বৃহস্পতিবার ও ৭ তারিখ রবিবার লেখা হয়েছে। অর্থাৎ শাওয়ালের শুরু সোমবারে। কিন্তু ১৫ই জিলক্বদ সোমবার লেখা হয়েছে। অর্থাৎ জিলক্বদ এর শুরুও সোমবারে। শাওয়াল মাস ২৮ দিনে হলেই শুধু তা সম্ভব।(খাজা মঈন উদ্দীন, আনিসুল আরওয়াহ(ফাওয়ায়েদুস সালেকীন) পৃ. ১৩৫, ১৪৩, ১৪৪)।
আবার পরের মাজলিশ হয়েছে ৫ই জিলহজ্জ বৃহস্পতিবার। জিলক্বাদ এর শুরু সোম, মঙ্গল, বুধবার যেদিনই হোক, কোনোভাবেই ৫ই জিলহ্জ্জ বৃহস্পতিবার হয়না। আবার পরের মাজলিশ ২০শে জিলহ্জ্জ শনিবার! ৫ তারিখ বৃহস্পতিবার হলে ২০ তারিখ শনিবার হয় কি করে? (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৭, ১৪৯)।
২০ শে রজব সোমবার এবং ২৭ শে রজব রবিবার লেখা হয়েছে। ৫ই শাওয়াল শনিবার অথচ ২০ শে শাওয়াল বৃহস্পতিবার(নিযাম উদ্দীন আওলিয়া, রাহাতুল মুহিব্বীন, পৃ. ২৪, ৪৩, ৮৩, ৮৮), এইরূপ অগণিত অসঙ্গতি যা প্রথম নজরেই ধরা পড়ে।
কাকী(রাহ) উল্লেখ করেছেন যে, ৬১৩ হিজরীতে তিনি বাগদাদে তাঁর পীর মঈন উদ্দীন চিশতীর নিকট মুরীদ হন। এরপর কয়েক মাজলিশ তিনি বাগদাদেই থাকেন। এরপর তিনি তাঁর সহচরদের নিয়ে আজমীরে আগমন করেন। এভাবে আমরা নিশ্চিত জানতে পারছি যে, ৬১৩ হিজরী এর পরে হযরত মঈন উদ্দীন চিশতী ভারতে আগমন করেন। হযরত বখতীয়ার কাকী আরো উল্লেখ করেছেন যে, আজমীরে অবস্থানকালে আজমীরের রাজা পৃথ্বীরাজ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতো। একপর্যায়ে তিনি বলেন, আমি পৃথ্বিরাজকে মুসলমানদের হাতে জীবিত বন্দী অবস্থায় অর্পণ করলাম। এর কয়েকদিন পরেই সুলতান শাহাবুদ্দীন ঘোরীর সৈন্যগণ পৃথ্বিরাজকে পরাজিত ও বন্দী করে। [আনিসুল আরওয়াহ(দলিলুন আরেফীন ও ফাওয়ায়েদুস সালেকীনসহ পৃ. ৬২, ১১৯, ১৩৮]।
অথচ ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, ৬১৩ হিজরীর প্রায় ২৫ বছর পূর্বে ৫৮৮ হিজরীতে তারাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বিরাজকে পরাজিত করে আজমীর দখল করেন। আর ৬১৩ হিজরীতে খাজা মঈন উদ্দীন এর আজমীর আগমনের ১০ বৎসর পূর্বে ৬০৩ হিজরীতে শাহাবুদ্দীন ঘোরী মৃত্যুবরণ করেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, এ সকল কাহিনী সবই বানোয়াট। অথবা মঈন উদ্দীন(রাহঃ) অনেক আগে ভারতে আগমন করেন। এক্ষেত্রে আনিসুল আরওয়াহ,দলিলুন আরেফীন, ফাওয়ায়েদুস সালেকীন ইত্যাদি পুস্তকে লেখা সন-তারিখ ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাদি বানোয়াট।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, হাদীসের নামে জালিয়াতির ন্যায় বুযুর্গদের নামেও জালিয়াতি হয়েছে ব্যাপক। হাদীসের ক্ষেত্রে যেমন সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা পদ্ধতি রয়েছে, বুযুর্গদের ক্ষেত্রে তা না থাকাতে এদের নামে জালিয়াতি ধরার কোনো পথ নেই। জালিয়াতগণ বুযুর্গদের নামে জালিয়াত পুস্তক লিখে সেগুলির মধ্যে জাল হাদীস উল্লেখ করেছে, এবং তাঁদের লেখা বইয়ের মধ্যে জাল হাদীস ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখন এ সকল জাল হাদীসের বিরুদ্ধে কিছু বললেই সাধারণ মুসলিম বলবেন, অমুক বুযুর্গের পুস্তকে এই হাদীস রয়েছে, তা জাল হয় কিভাবে?! এভাবে জালিয়াতগণ একঢিলে দুই পাখি মেরেছে।
১.৮.৫. জাল হাদীস বনাম যয়ীফ হাদীস
পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে আমরা দেখেছি যে, জাল হাদীস যয়ীফ বা দুর্বল হাদীসের একটি প্রকার। জাল হাদীসের বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ যেরূপ কঠোরতা অবলম্বন করেছেন, যয়ীফ হাদীসের বিষয়ে অনেক মুহাদ্দিস তদ্রুপ কঠোরতা অবলম্বন করেননি। দুইটি ক্ষেত্রে তাঁরা যয়ীফ হাদীসের ব্যবহার বা উল্লেখ কঠোরভাবে নিষেধ করেছেনঃ (১) আকীদা বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এবং (২) শরীয়াতের আহকাম বা বিধানাবলীর ক্ষেত্রে। এসব ক্ষেত্রে একমাত্র সহীহ হাদীসের উপর নির্ভর করতে হবে। শুধু তাই নয়, আকীদা বা বিশ্বাস প্রমাণের ক্ষেত্রে মূলত ‘মুতাওয়াতির’ বা বহু সাহাবী ও তাবিয়ী বর্ণিত হাদীস, যা সাহাবীগণের মধ্যেই বহুল প্রচারিত ছিল বলে প্রমাণিত এরূপ হাদীসের উপর নির্ভর করতে হবে। কারণ শুধু কুরআন কারীম ও এইরূপ ‘মুতাওয়াতির হাদীস’ দ্বারাই ‘একীন’ বা ‘দৃঢ়বিশ্বাস’ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সহীহ বা হাসান হাদীসের উপর নির্ভর করতে হবে। (সুযূতী, তাদরীবুর রাবী ১/১৩২; ইবনু জামায়াহ, আল মানহালু রাবী, পৃ. ৩২)।
১.৮.৫.১. যয়ীফ হাদীসের ক্ষেত্র ও শর্ত
পক্ষান্তরে তিনটি বিষয়ে ‘অল্প যয়ীফ’ হাদীস বলা অনেকে অনুমোদন করেছেন।
(১) কুরআন কারীমের ‘তাফসীর’ বা শাব্দিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে, (২) ইতিহাস বা ঐতিহাসিক বর্ণনার ক্ষেত্রে, (৩) বিভিন্ন নেক আমলের ফযীলত বা সাওয়াব বর্ণনার ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে তাঁরা নিম্নরূপ শর্তগুলি উল্লেখ করেছেনঃ
(১) যয়ীফ হাদীসটি অল্প দুর্বল হবে, বেশি দুর্বল হবেনা।
(২) যয়ীফ হাদীসটি এমন নেক আমলের ফযীলত বর্ণনা করবে যা সহীহ হাদীসের আলোকে ভালো ও জায়েয।
(৩) যয়ীফ হাদীসের উপর আমল করার ক্ষেত্রে একথা মনে করা যাবেনা যে, রাসূলুল্লাহ(স) সত্যি এ কথা বলেছেন। সাবধানতামূলকভাবে আমল করতে হবে। অর্থাৎ মনে রাখতে হবে যে, হাদীসটি নবী(স) এর কথা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, তবে যদি সত্য হয় তাহলে এই সাওয়াবটা পাওয়া যাবে, কাজেই আমল করে রাখি। আর সত্য না হলেও মূল কাজটি যেহেতু সহীহ হাদীসের আলোকে মুস্তাহাব সেহেতু কিছু সাওয়াবতো পাওয়া যাবে। (বিস্তারিত দেখুনঃ আব্দুল হাই লাখনবী, যাফরুল আমানী, পৃ. ২০৯-২২৪)।
যয়ীফ হাদীসের ক্ষেত্রে কোনো কোনো মুহাদ্দিসের এই মতটি ভুল বুঝে অনেক সময় এর মাধ্যমে সমাজে জাল হাদীসের প্রচলন ঘটেছে। বস্তুত, বিভিন্ন মুসলিম সমাজে প্রচলিত অধিকাংশ জাল ও ভিত্তিহীন হাদীস এই পথ দিয়ে মুসলিম সমাজে প্রচলিত হয়েছে। সমাজে অগণিত জাল হাদীসের প্রচলনের পিছনে কয়েকটি কারণ রয়েছেঃ
(১) অযোগ্য ও ইলমহীন মানুষদের ওয়ায, নসীহত ও বিভিন্ন দ্বীনি দায়িত্ব পালন,
(২) সাধারণ আলিমদের অবহেলা ও অলসতা,
(৩) প্রসিদ্ধ ও যোগ্য আলিমদের ঢিলেমি,
(৪) হেদায়াতের আগ্রহ এবং
(৫) ইতিহাস, সীরাত ও রাসূলুল্লাহ(স) এর মুযিজা বর্ণনার আগ্রহ।
১.৮.৫.২. হেদায়াত ও ফযীলতে যয়ীফের নামে জাল হাদীস
জাল হাদীস প্রচলনের ক্ষেত্রে শেষের কারণদ্বয় সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। হেদায়াতের আগ্রহে অনেক যোগ্য আলেম ওয়ায, ফাজায়েল, আত্মশুদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ক পুস্তকে সহীহ হাদীসের পাশাপাশি অনেক যয়ীফ হাদীস উল্লেখ করেছেন। এ সকল যয়ীফ হাদীসের মধ্যে অনেক জাল হাদীস তাঁদের পুস্তকে স্থান পেয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা এগুলির জালিয়াতি বা দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেননি। ফলে সাধারণ পাঠকগণ এগুলিকে ‘সহীহ হাদীস’ বলেই গণ্য করেছেন।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, কুরআনের এত আয়াত, এত সহীহ হাদীস সবকিছু উল্লেখ করার পরও বোধ হয় মানুষের মনে হেদায়াতের কথাটি ঢুকানো গেলনা। কিছু যয়ীফ বা অনির্ভরযোগ্য কথা না বললে বোধ হয় মানুষের মনে আসর করা যাবেনা। কুরআনে ও সহীহ হাদীসে উল্লেখিত শাস্তির কথা এবং কুরআনে ও সহীহ হাদীসে উল্লেখিত পুরস্কার, সাওয়াব ও ফযীলতের কথা বোধ হয় মানুষের মনে সত্যিকার আখেরাতমুখিতা, আল্লাহ ভীতি ও আমলের আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়। এজন্যই তাঁরা বোধ হয় আয়াতে কুরআনী ও সহীহ হাদীসের পরে এ সকল যয়ীফ বা ভিত্তিহীন কথাগুলি উল্লেখ করেন।
১.৮.৫.৩. ইতিহাস ও সীরাতে যয়ীফের নামে জাল হাদীস
ইতিহাস, সীরাত ও যয়ীফ বর্ণনার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। সকল বিষয়ের লেখকই সেই বিষযে সর্বাধিক তথ্য সংগ্রহ করতে চান। তথ্য সংগ্রহের এই আগ্রহের ফলে প্রথম যুগ হতেই অনেক আলিম কিছুটা দুর্বল হাদীস গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তী যুগে এই আগ্রহের ফলে সীরাতুন্নবী গ্রন্থগুলির মধ্যে অগণিত ভিত্তিহীন জাল হাদীস অনু্প্রবেশ করেছে।
ইতোপূর্বে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর আলোচনা থেকে জেনেছি যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে প্রচলিত সকল হাদীসই ৪র্থ-৫ম শতাব্দীর মধ্যে সংকলিত হয়ে গিয়েছিল। এর পরবর্তী যুগে অতিরিক্ত যা কিছু সংকলিত হয়েছে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরবর্তী যুগে বানানো জাল ও ভিত্তিহীন কথা। এই প্রকারের গ্রন্থগুলিকে তিনি ৪র্থ ও ৫ম পর্যায়ে উল্লেখ করেছেন।
ইতিহাস, সীরাত ও মুযিজা বিষয়ক গ্রন্থগুলির অবস্থাও আমরা এ থেকে বুঝতে পারবো। প্রথম ছয়শত বৎসরে সংকলিত এই জাতীয় গ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম হলোঃ ইবনু ইসহাকের(১৫০হি) ‘সীরাহ’, ওয়াকেদীর(২০৭ হি) মাগাযী, ইবনু হিশামের(২১৮ হি)সীরাহ, ইবনু সা’দ (২৩০ হি)এর তাবাকাত, খালীফা ইবনু খাইয়াতের(২৪০হি) তারিখ, বালাযুরির(২৭৯ হি) ফুতুহুল বুলদান, ফিরইয়াবীর(৩০১ হি) দালাইলুন নবু্ওয়াত, তাবারীর(৩১০ হি) তারীখ, মাসঊদীর(৩৪৫ হি) তারীখ, বাইহাকীর(৪৫৮ হি) দালাইলুন নবুওয়াত ইত্যাদি। এ সকল পুস্তকে প্রচুর ‘অত্যন্ত যয়ীফ’ হাদীস ও কিছু জাল হাদীস গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও আমারা দেখতে পাই যে, পরবর্তী যুগের লেখকগণ আরো অনেক কথা সংগ্রহ করেছেন যা এ সকল গ্রন্থে মোটেও পাওয়া যাচ্ছেনা।
পরবর্তীযুগের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলির অন্যতম হলো সুয়ূতীর(৯১১ হি) আল খাসাইসুল কুবরা, কাসতালানীর(৯২৩ হি) আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, মুহাম্মাদ ইবনু ইউসূফ শামীর(৯৪২ হি) সুবুলুল হুদা বা সীরাহ শামিয়াহ। এ সকল গ্রন্থের লেখকগণ দাবি করেছেন যে, তাঁরা তাঁদের গ্রন্থে যয়ীফ হাদীস উল্লেখ করবেন কিন্তু জাল হাদীস উল্লেখ করবেননা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, তাঁরা এমন অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন, যেগুলিকে তাঁরা নিজেরাই অন্যত্র জাল ও মিথ্যা বলে উল্লেখ করেছেন।
এর পরবর্তী পর্যায়ের গ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম হলো আলী ইবনু বুরহান উদ্দীন হালাবীর(১০৪৪ হি) সীরাহ হালাবিয়াহ, যারকানীর(১১২২ হি) শারহুল মাওয়াহিব ইত্যাদি গ্রন্থ। এ সকল গ্রন্থের লেখকগণ কোনো বাছবিচারই রাখেননি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল যত বেশি পারা যায় তথ্যাদি সংকলন ও বিন্যাস করা। এজন্য কোনোরূপ বিচার ও যাচাই ছাড়াই সকল প্রকার সহীহ, যয়ীফ, মাউযূ ও সনদবিহীন বিবরণ একত্রিত সংমিশ্রিত করে বিন্যাস করেছেন। ফলে অগণিত জাল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা এগুলিতে স্থান পেয়েছে। আর জাল হাদীসের মধ্যে নতুনত্ব ও আজগুবিত্ব বেশি। এজন্য এ সকল পুস্তকে সহীহ হাদীসের পরিবর্তে জাল হাদীসের উপরেই বেশি নির্ভর করা হয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হয়, কুরআন কারীম ও অসংখ্য সহীহ হাদীস দিয়ে রাসূলুল্লাহ(স) এর নুবুওয়াত, মুজিযা ও মর্যাদা প্রমাণ করা বোধহয় সম্ভব হচ্ছেনা, অথবা এ সকল মিথ্যা ও জাল বর্ণনাগুলি ছাড়া বোধহয় তাঁর মর্যাদার বর্ণনা পূর্ণতা পাচ্ছেনা!!
এ পর্যায়ের গ্রন্থগুলির লেখকগণ অধিকাংশ বর্ণনারই সূত্র উল্লেখ করেননি। যেখানে সূত্র উল্লেখ করেছেন, সেখানেও তাঁদের অবহেলা অকল্পনীয়। একটি উদাহরণ উল্লেখ করছি। সীরাহ হালাবিয়ার লেখক বলেনঃ “আমি ‘তাশরীফাত ফিল খাসাইস ওয়াল মুজিযাত’ নামক একটি বই পড়েছি। এই বইটির লেখকের নাম আমি জানতে পারিনি। এই বইয়ে দেখেছি, আবু হুরাইরা(রা) হতে বর্ণিত, হযরত রাসূলে কারীম(স) হযরত জিব্রাঈল(আ)কে জিজ্ঞেস করেন, হে জিব্রাঈল, আপনার বয়স কত? ……হাদীসটি বুখারী সংকলন করেছেন। (হালাবী, আলী ইবনু বুরহান উদ্দীন, সীরাহ হালাবীয়া ১/৪৯)।
এই হাদীসটি বুখারী তো দূরের কথা কোনো হাদীস গ্রন্থেই নেই। এই অজ্ঞাত নামা লেখকের বর্ণনার উপর নির্ভর করে গ্রন্থকার হাদীসটি উদ্ধৃত করলেন। একটু কষ্ট করে সহীহ বুখারী বা ইমাম বুখারীর লেখা অন্যান্য গ্রন্থ খুঁজে দেখলেননা। এভাবে তিনি পরবর্তী যুগের মুসলমানদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে একটি জঘন্য মিথ্যা কথা প্রচলনের স্থায়ী ব্যবস্থা করে দিলেন।
আমাদের দেশের আলিমগণ “সীরাহ হালাবিয়া” জাতীয় পুস্তকের উপরই নির্ভর করেন, ফলে অগণিত জাল কথা তাদের লেখনীতে বা বক্তব্যে স্থান পায়। প্রসিদ্ধ আলেম ও বুযুর্গ আব্দুল খালেক(রাহ) তাঁর ‘সাইয়েদুল মুরসালীন’ গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, তিনি মূলত এই ‘সীরাহ হালাবিয়া’(সীরাত-ই-হালাবী) গ্রন্থটির উপরেই নির্ভর করেছেন। স্বভাবতই তিনি গ্রন্থাকারের প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোনো তথ্যই যাচাই করেননি। ফলে এই মূল্যবান গ্রন্থটির মধ্যে আমরা অগণিত জাল ও ভিত্তিহীন হাদীস দেখতে পাই।
আমরা দেখেছি যে, যয়ীফ হাদীসের উপর আমল জায়েয হওয়ার শর্ত হলো, বিষয়টি বিশ্বাস করা যাবেনা, শুধু কর্মের ক্ষেত্রে সাবধানতামূলক কর্ম করা যাবে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো, বিশ্বাস ও কর্ম বিচ্ছিন্ন করা মুশকিল। কারণ যয়ীফ হাদীসের উপর যিনি আমল করেছেন তিনি অন্তত বিশ্বাস করেছেন যে, এই আমলের জন্য এই ধরনের সাওয়াব পাওয়া যেতে পারে। বিশেষত রাসূলুল্লাহ(স) এর জীবনী ও মুজিযা বিষয়ক বর্ণনার ক্ষেত্রে একজন মুমিন কিছু শুনলে তা বিশ্বাস করেন। শুধু তাই নয়, এ সকল ‘যয়ীফ’ বা ‘জাল’ কথাগুলি তাঁর ঈমানের অংশে পরিণত হয়। এভাবে তাঁর বিশ্বাসের ভিত্তি হয় যয়ীফ বা জাল হাদীসের উপর।
১.৮.৬. নিরীক্ষা বনাম ঢালাও ও আন্দাযী কথা
জাল হাদীসের ক্ষেত্রে জঘন্যতম ও সবচেয়ে মারাত্মক বিভ্রান্তি হলো, নিরীক্ষা ব্যতিরেকে ঢালাও মন্তব্য। আমরা ইতোপূর্বে বারংবার উল্লেখ করেছি এবং পূর্বের সকল আলোচনা থেকে নিশ্চিতরূপে বুঝতে পেরেছি যে, ওহী বা ধর্মীয় শিক্ষার বিশুদ্ধতা রক্ষা ও সূত্র সংরক্ষণ মুসলিম উম্মাহর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় তাঁদের ধর্মগ্রন্থ, ধর্ম প্রচারক বা প্রবর্তকের শিক্ষা ও নির্দেশাবলীর বিশুদ্ধতা রক্ষায় এইরূপ সচেষ্ট হয়নি।
সাহাবীগণের যুগ থেকে সকল যুগের মুসলিম আলিম ও মুহাদ্দিসগণ রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে প্রচারিত প্রতিটি কথা চুলচেরা নিরীক্ষা, পর্য্যবেক্ষণ ও যাচাই করে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু অনেক ‘প্রাচ্যবিদ’, তাঁদের চিন্তাধারায় প্রভাবিত অনেক মুসলিম ও অনেক অনভিজ্ঞ বা অজ্ঞ মুসলিম চিন্তাবিদ বা গবেষক হাদীসের বিশুদ্ধতা ও নির্ভুলতার বিষয়ে ঢালাও মন্তব্য ও মতামত ব্যক্ত করেন। হাদীস যেহেতু জাল হয়েছে, কাজেই কোনো হাদীসই নির্ভরযোগ্য নয়, অথবা অমুক হাদীসের অর্থ সঠিক নয় কাজেই তা জাল বলে গণ্য হবে……ইত্যাদি। কেউ কেউ মনে করেন, মুহাদ্দিসগণ সম্ভবত শুধু সনদই বিচার করেছেন, অর্থ, শব্দ, বাক্য, ভাব ইত্যাদি বিচার ও নিরীক্ষা করেননি। এগুলি সবই ভিত্তিহীন ধারণা ও উর্বর মস্তিষ্কের বর্বর কল্পনা মাত্র। মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষা পদ্ধতির সাথে পরিচয়হীনতা এর মূল কারণ। এর চেয়েও বড় কারণ ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ ও ইসলাম থেকে মানুষদের বিচ্যূত করার উদগ্র বাসনা।
ইহুদী খ্রিস্টান প্রাচ্যবিদ পন্ডিতগণ, কাদিয়ানী, বাহাঈ ইত্যাদি অমুসলিম সম্প্রদায় ও শিয়া সম্প্রদায় ছাড়াও কিছু ‘জ্ঞানপাপী’ পন্ডিত হাদীসের বিরুদ্ধে এরূপ ঢালাও মন্তব্য করেন অথবা মর্জিমাফিক অর্থ বিচার করে হাদীস ‘জাল’ বলে ঘোষণা করেন। তারা নিজেদেরকে মুসলিম দাবি করতে চান, কিন্তু ইসলাম পালন করতে চাননা। এরা সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ্জ, হালাল ভক্ষণ, পবিত্রতা অর্জন ইত্যাদি কোনো কর্মই করতে রাজি নন। কুরআনে উল্লেখিত এসব বিষয়কে ইচ্ছামত ব্যাখ্যা করে বাতিল করে দিতে চান। কিন্তু ভয় হলো হাদীস নিয়ে। হাদীস থাকলে তো ইচ্ছামত ব্যাখ্যা অচল। রাসূলুল্লাহ(স) এর ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত। এজন্য তারা নির্বিচারে হাদীসকে জাল বলে বাতিল করে দিতে চান।
আশা করি, এ গ্রন্থের আলোচনা থেকে পাঠক এ সকল মানুষের মতামতের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পেরেছেন। আমরা বুঝতে পেরেছি যে, মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষা ও বিচার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক। তাঁরা সনদ, শ্রুতি, পান্ডুলিপি, ভাষা, অর্থ, ও প্রাসঙ্গিক সকল প্রমাণের আলোকে যে সকল হাদীসকে সহীহ বলে চিহ্নিত করেছেন সেগুলির বিশুদ্ধতা ও যথার্থতা সম্পর্কে তথ্য প্রমাণবিহীন ঢালাও সন্দেহ একমাত্র জ্ঞানহীন মুর্খ বা বিদ্বেষী জ্ঞানপাপী ছাড়া কেউই করতে পারেনা। আর এই নিরীক্ষার ভিত্তিতে যে সকল হাদীসকে তাঁরা জাল ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছেন সেগুলিকে গায়ের জোরে হাদীস বলে দাবি করাও রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলার ভয়ঙ্কর দুঃসাহস ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে তথ্য ভিত্তিক নিরীক্ষার দরজা সর্বদা উন্মুক্ত।
১.৮.৭. জাল হাদীস বিষয়ক কিছু প্রশ্ন
আমরা প্রথম পর্বের আলোচনা শেষ করেছি। দ্বিতীয় পর্বে আমরা আমাদের সমাজে প্রচলিত অনেক জাল হাদীস ও ভিত্তিহীন কথাবার্তা উল্লেখ করব। এ সকল জাল ও ভিত্তিহীন কথাবার্তা পাঠের সময় পাঠকের মনে বারংবার কয়েকটি প্রশ্ন জাগতে পারে। প্রশ্নগুলির উত্তর পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে আমরা জানতে পেরেছি। তবুও এখানে প্রশ্নগুলি আলোচনা করতে চাই।
আমরা দেখতে পাব যে, মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীসের মধ্যে এমন অনেক কথা আছে যা অত্যন্ত সুন্দর, অর্থবহ, মূল্যবান ও হৃদয়স্পর্শী। তখন আমাদের কাছে মনে হবে, কথাটি তো খুব সুন্দর, একে বানোয়াট বলার দরকার কি? অথবা এত সুন্দর ও মর্মস্পর্শী কথা হাদীস না হয়ে পারেনা। অথবা এই কথার মধ্যে তো দোষ নেই, এর বিরুদ্ধে লাগার প্রয়োজন কি? ইত্যাদি।
এর উত্তরে আমাদের বুঝতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ (স) এর শিক্ষা ও বাণীকে অবিকল নির্ভেজালভাবে হেফাজত করা উম্মাতের প্রথম দায়িত্ব। তিনি বলেননি, এমন কোনো কথা তাঁর নামে বলাই জাহান্নামের নিশ্চিত পথ বলে তিনি বারবার বলেছেন। কাজেই কোনো বাণীর ভাব বা মর্ম কখনোই আমাদের কাছে প্রথমে বিবেচ্য নয়। প্রথম বিবেচ্য হলো, তিনি এই বাক্যটি বলেছেন কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা। কোনো কথার অর্থ যত সুন্দর ও হৃদয়স্পর্শী হোক সে কথাটিকে আমরা রাসূল(স) এর কথা বা হাদীষ বলতে পারিনা যতক্ষণ না বিশুদ্ধ সনদে তাঁর থেকে বর্ণিত না হয়। রাসূলুল্লাহ(স) যে কথা বলেছেন বলে আমরা নিশ্চিতরূপে জানি না সে তাঁর নামে বর্ণনা করার কঠিনতম অপরাধ থেকে আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন।
দ্বিতীয় বিষয় হলো, আমরা প্রায়ই দেখব যে, আমরা যে সকল হাদীসকে বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছি, এ সকল হাদীসকে অনেক বুযুর্গ তার গ্রন্থে হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে কেউ হয়তো বলতে পারেন, অমুক আলেম বা বুযুর্গ এই হাদীস বলেছেন, তিনি কি তাহলে জাহান্নামী?
আমরা দেখেছি যে, বুযুর্গগণের নামে জালিয়াতি হয়েছে অনেক। এ সকল হাদীস বুযুর্গগণ সত্যিই বলেছেন নাকি জালিয়াতগণ তাঁদের নামে চালিয়েছে তা আমরা জানিনা। যদি তাঁরা বলেও থাকেন, তবে আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, একজন বুযুর্গের অসংখ্য কর্মের মধ্যে কিছু ভুল থাকতে পারে। তাঁদের অসংখ্য ভাল কাজর মধ্যে এ সকল ভুল ভ্রান্তি কিছুই নয়। মূলতঃ তাঁরা মুজতাহিদ ছিলেন। মুজতাহিদ তাঁর সঠিক কর্মের জন্য আল্লাহর কাছে দ্বিগুণ পুরস্কার পান। আর তিনি তার ভুলের জন্য একটি পুরস্কার পান। (সহীহ বুখারী)। এছাড়া আল্লাহ বলেছেনঃ “পূণ্য কাজ অবশ্যই পাপকে দূর করে দেয়।”(সূরা হুদঃ ১১৪ আয়াত)। তাই যিনি অনেক পূণ্য করেছেন তাঁর সামান্য ভূল পূণ্যের কারণে দূরীভূত হয়ে যাবে।
কোনো বুযুর্গ বা সত্যিকারের আল্লাহ ওয়ালা মানুষ কখনোই জেনে শুনে কোনো জাল বা মিথ্যা কথা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে বলতে পারেননা। না জেনে হয়তো কেউ বলে ফেলেছেন। কিন্তু তাই বলে আমরা জেনেশুনে কোনো জাল হাদীস বলতে পারিনা। আমাদের দায়িত্ব হলো, কোনো হাদীসের বিষয়ে যদি আমরা শুনি বা জানি যে, হাদীসটি জাল তবে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তা বলা ও পালন করা বর্জন করব। যদি এ বিষয়ে আমাদের সন্দেহ হয় তবে আমরা মুহাদ্দিসগণের তথ্যাদির আলোকে ‘তাহকীক’ বা গবেষণা করে প্রকৃত বিষয় জানতে চেষ্টা করব। মহান আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের কর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন, অন্য কারো কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেননা। কাজেই আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বা সন্দেহজনক কিছু বলা থেকে আত্মরক্ষা করতে হবে।
তৃতীয় প্রশ্ন যা আমাদের মনে আসবে তা হলো, এতসব বুযুর্গ কিছূ বুঝলেননা, এখন আমরা কি তাঁদের চেয়েও বেশি বুঝলাম? এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হলো, এই গ্রন্থে আলোচিত জাল হাদীসগুলিকে জাল বলার ক্ষেত্রে আমার মত অধমের কোনো ভূমিকা নেই। এখানে আমি মূলত পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসগণের মতামত বর্ণনা করেছি। পাঠক তা বিস্তারিত দেখতে পাবেন।
দ্বিতীয় পর্বঃ
প্রচলিত মিথ্যা হাদীস ও ভিত্তিহীন কথা
২.১. অশুদ্ধ হাদীসের বিষয়ভিত্তিক মূলনীতি
জাল ও নির্ভরযোগ্য হাদীস সংকলনের একটি বিশেষ পদ্ধতি হল, যে সকল বিষয়ে সকল হাদীস বা অধিকাংশ হাদীস বানোয়াট বা অনির্ভরযোগ্য সে সকল বিষয়কে একত্রিত করে সংকলিত করা। বানোয়াট হাদীস চিহ্নিত করনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে আগ্রহী মুসলিম বিভিন্ন গ্রন্থের সহায়তা ছাড়াই সহজে বুঝতে পারবেন যে, এই হাদীসটি বানোয়াট; কারণ এই হাদীসটি যে বিষয়ে বর্ণিত সেই বিষয়ে কোন সহীহ হাদীস নেই। এই পদ্ধতিতে রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে অন্যমত গ্রন্থ ৭ম হিজরী শতকের অন্যতম মুহাদ্দিস ও হানাফী ফকীহ উমার ইবনু বাদর আল মাউসিলী(৫৫৭-৬২২ হি) রচিত ‘আল মুগনী’ গ্রন্থ। এছাড়া হিজরী একাদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হানাফী ফকীহ ও মুহাদ্দিস মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হি), ত্রয়োদশ হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ শাফেয়ী ফকীহ, মুহাদ্দিস ও সূফী সাধক মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়েদ দরবেশ হুত(১২৭৬ হি) এবং অন্যান্য মুহাদ্দিসও এ বিষয়ক কিছু মূলনীতি উল্লেখ করেন।
২.১.১. উমার ইবনু বাদর মাউসিলী হানাফী
যিয়াউদ্দীন আবু হাফস উমার ইবনু বাদর ইবনু সাঈদ ইবনু মুহাম্মাদ আল মাউসিলী হানাফী হাদীস, তাফসীর, ফিকহ ইত্যাদি বিষয়ে অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। সেগুলির মধ্যে অন্যতম “আল মুগনী আনিল হিফযি ওয়াল কিতাব বি কাউলিহিম লাম ইয়াসিহ শাইউন ফী হাযাল বাব” নামক গ্রন্থটি। এই দীর্ঘ নামের প্রতিপাদ্য হলোঃ ‘মুহাদ্দিসগণ যে বিষয়ে বলেছেন যে, এই বিষয়ে কোন হাদীসই সহীহ নয় সেইগুলির বিবরণ। এইগুলির জন্য অন্য কোনো গ্রন্থ পাঠ বা মুখস্ত করার প্রয়োজনীয়তা থাকবেনা।’ এ গ্রন্থে সংক্ষিপ্ত পরিসরে তিনি ১০১ টি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন, যে সকল বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদীসই অশুদ্ধ বলে মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন। কোনো বিষয়ে কিছু হাদীস বিশুদ্ধ হলে তা উল্লেখ করে বাকি সকল হাদীস অশুদ্ধ বলে জানিয়েছেন।
২.১.২. যে সকল বিষয়ে সকল হাদীস অশুদ্ধ
আল্লামা মাউসিলী পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষা ও বিস্তারিত গবেষণার আলোকে উল্লেখ করেছেন যে, নিম্নলিখিত বিষয়গুলিতে বর্ণিত সকল হাদীসই অশুদ্ধ। এগুলি হয় বানোয়াট অথবা অত্যন্ত দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য।
১. ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি্
ঈমান বাড়ে কমে, অথবা বাড়ে না ও কমে না এবং কথা ও কর্মও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত অথবা অন্তর্ভুক্ত নয়, এই অর্থে রাসূলুল্লাহ(স) হতে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি। এ বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদীস বানোয়াট বা অত্যন্ত দুর্বল। এ বিষয়ে কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াত ও বিভিন্ন হাদীসের প্রাসঙ্গিক নির্দেশনার আলোকে মুসলিম উম্মাহর ইমামগণ মতভেদ করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে সরাসরি কোনো সহীস হাদীস বর্ণিত হয়নি।
২. মুরজিয়া, জাহমিয়্যা, কাদারিয়্যাহ ও আশ‘আরিয়্যাহ সম্প্রদায়
এ সকল সম্প্রদায় সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী মূলক কোনো সহীহ হাদীস রাসূলুল্লাহ(স) থেকে বর্ণিত হয়নি। এদের বিষয়ে বর্ণিত হাদীসগুলি বানোয়াট বা অত্যন্ত দুর্বল। সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ ও ইমামগণ কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার আলোকে এ সকল সম্প্রদায়ের বিষয়ে কথা বলেছেন।
৩. আল্লাহর বাণী সৃষ্ট নয়
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(স) হতে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত সকল হাদীসই বানোয়াট।
কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াত, বিভিন্ন হাদীসের প্রাসঙ্গিক নির্দেশনা ও সাহাবীগণের মতামতের আলোকে তাবিয়ীগণ, তাবে-তাবিয়ীগণ ও পরবর্তী ইমামগণ একমত যে, কুরআন আল্লাহর বাণী, তা তাঁর মহান গুণাবলীর অংশ ও তা সৃষ্ট নয়। বিভ্রান্ত মু’তাযিলা সম্প্রদায় কুরআনকে সৃষ্ট বস্তু বলে বিশ্বাস করতো। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরী শতকে এই বিষয়টি মুসলিম সমাজের অন্যতম বিতর্কের বিষয় ছিল। এজন্য অনেক জালিয়াত এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে হাদীস বানিয়ে প্রসিদ্ধি লাভের চেষ্টা করেছে। মুহাদ্দিসগণ একমত পোষণ করেছেন যে, কুরআন সৃষ্ট নয়। তবে এই অর্থে হাদীস জালিয়াতির সকল প্রচেষ্টা তারা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
৪. নূরের সমুদ্রে ফিরিশতাগণের সৃষ্টি
জিবরাঈল(আ) প্রতিদিন নূরের সমূদ্রে ডুব দিয়ে উঠে শরীর ঝাড়া দেন এবং প্রতি ফোটা নূর হতে ৭০ হাজার ফেরেশতা সৃষ্টি করা হয়। এই অর্থে ও এই জাতীয় সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
৫. মুহাম্মাদ বা আহমদ নাম রাখার ফযীলত
মুহাম্মাদ বা আহমদ নাম রাখার ফযীলতে প্রচারিত সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এ বিষয়ে অনেক বানোয়াট হাদীস প্রচারিত হয়েছে। মুহাম্মাদ বা আহমদ নামধারীদের আল্লাহ শাস্তি দিবেননা, যাদের পরিবারে কয়েক ব্যক্তির নাম মুহাম্মাদ হবে, তাদের ক্ষমা করা হবে, বরকত দেওয়া হবে ইত্যাদি বিভিন্ন কথা বানিয়ে হাদীসের নামে প্রচার করা হয়েছে। এই নাম দুটি নিঃসন্দেহে উত্তম নাম। রাসূলুল্লাহ(স) এর মহব্বতে সন্তানদের এই নাম রাখা ভাল। তবে এই বিষয়ক বিশেষ ফযীলত জ্ঞাপক হাদীসগুলি বানোয়াট।
৬. আকল অর্থাৎ বুদ্ধি বা জ্ঞানেন্দ্রিয়
বুদ্ধি বা জ্ঞানেন্দ্রিয়ের প্রশংসা বা ফযীলতে বর্ণিত সকল হাদীস ভিত্তিহীন। কুরআন ও হাদীসে জ্ঞান শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং জ্ঞানীগণের প্রশংসা করা হয়েছে। তবে ইন্দ্রিয়ের প্রশংসায় রাসূলুল্লাহ(স) থেকে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি। জালিয়াতগণ বুদ্ধি বা জ্ঞানেন্দ্রিয়ের প্রশংসায় অনেক হাদীস বানিয়েছে। যেগুলিতে বুদ্ধির প্রশংসা করা হয়েছে, মানুষের কর্ম নয় বরং বুদ্ধি অনুসারে পুরস্কার লাভ করবে; বুদ্ধিহীন বা নির্বোধের সালাতের চেয়ে বুদ্ধিমানের সালাতের সাওয়াব বেশি…ইত্যাদি কথা বলা হয়েছে। এগুলি সবই বানোয়াট। কোনো জন্মগত বা বংশগত বিষয়ই আখিরাতের মুক্তি বা মর্যাদার বিষয় নয়। মানুষের ইচ্ছাকৃত কর্মই মূলত তার মুক্তির মাধ্যম। যার বুদ্ধি বেশি ও বুদ্ধি সৎকর্মে ব্যবহার করেন তিনি তার কর্মের জন্য প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হবেন। কিন্তু জন্মগত বা প্রকৃতিগত বুদ্ধি কোনো মুক্তি বা সাওয়াবের বিষয় নয়।
৭. খিযির(আ) ও ইলিয়াস(আ) এর দীর্ঘ জীবন
সূরা কাহাফের মধ্যে মহান আল্লাহ তায়ালা মূসা(আ) এর সাথে আল্লাহর একজন বান্দার কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছেন। কুরআনে এই বান্দার নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বান্দার নাম ‘খাযির’(প্রচলিত বাংলায়ঃ খিযির)। এই একটি ঘটনা ছাড়া অন্য কোনো ঘটনায় খিযির(আ) এর বিষয়ে কোনো সহীহ বর্ণনা জানা যায়না। তাঁর জন্ম, বাল্যকাল, নব্যুয়ত, কর্ম, কর্মক্ষেত্র, এই ঘটনার পরবর্তীকালে তাঁর জীবন ও তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে কোনো প্রকারের কোনো বর্ণনা কোনো সহীহ হাদীসে জানা যায়না। তিনি আবে হায়াতের পানি পান করেছিলেন ইত্যাদি কথা সবই ইহূদী-খৃস্টানদের মধ্যে প্রচলিত কথা মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে।
আল্লামা মাউসিলী বলেন, খিযির(আ) ও ইলিয়াস (আ) দীর্ঘ জীবন পেয়েছেন, তাঁরা রাসূলুল্লাহ(স) কে দেখেছেন বা কথা বলেছেন, তাঁর পরে বেঁচে আছেন, ইত্যাদি অর্থে বর্ণিত সকল হাদীসই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বালকে খিযির(আ) ও ইলিয়াস(আ) এর দীর্ঘ জীবন ও জীবিত থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তিনি বলেন-………শয়তানই এই বিষয়টি মানুষের মধ্যে প্রচার করেছে।
ইমাম বুখারীকে প্রশ্ন করা হয়, খিযির(আ) ও ইলিয়াস (আ) কি এখনো জীবিত আছেন? ইমাম বুখারী বলেন, তা অসম্ভব; কারণ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আজকের দুনিয়ায় যারা জীবিত আছেন তাদের সকলেই ১০০ বৎসরের মধ্যে মৃত্যুবরণ করবেন।
ইবনুল জাউযী খিযির(আ) ও ইলিয়াস(আ) এর দীর্ঘ জীবনের বিষয়ে বলেন, এই কথাটি কুরআনের আয়াতের পরিপন্থী। আল্লাহ তায়ালা কুরআন কারীমে উল্লেখ করেছেনঃ “আপনার পূর্বে কোনো মানুষকেই আমি অনন্ত জীবন দান করিনি; সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরজীবি হয়ে থাকবে?” (সূরা ২১, আম্বিয়া; আয়াত ৩৪)।
উল্লেখ্য যে, কোনো কোনো আলিম খিযিরের(আ) জীবিত থাকার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তাঁরা বিভিন্ন বুযুর্গের কথার উপর নির্ভর করেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য হাদীস রাসূলুল্লাহ(স) হতে বর্ণিত হয়নি।
৮. কুরআনের বিভিন্ন সূরার ফযীলত
আল্লামা মাউসিলী বলেন, কুরআনের ফযীলতের বিষয়ে কিছু হাদীস সহীহ, তবে এ বিষয়ে অনেক বানোয়াট হাদীস সমাজে প্রচার করা হয়েছে। নিম্নলিখিত সূরা বা আয়াতের বিষয়ে বিশেষ মর্যাদা বা ফযীলত জ্ঞাপক সহীহ বা হাসান হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সূরা ফাতিহা, সূরা বাকারাহ, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, আয়াতুল কুরসী, সূরা আল ইমরান, সূরা কাহাফ, সূরা কাহাফের প্রথম বা শেষ দশ আয়াত, সূরা মূলক, সূরা যিলযাল, সূরা কাফিরূন, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস। এছাড়া অন্যান্য সূরার ফযীলতে বর্ণিত হাদীসগুলি বানোয়াট বা অত্যন্ত দূর্বল। এছাড়া উপরের সূরাগুলির ফযীলতেও অনেক বানোয়াট কথা হাদীস নামে প্রচার করা হয়েছে।
৯. আবু হানীফা(রাহ) ও শাফিয়ীর(রাহ) প্রশংসা বা নিন্দা
এ বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদীস মিথ্যা বা বানোয়াট।
১০. রোদে পানি গরম করাঃ রোদে গরম করা পানি ব্যবহার করলে অসুস্থতা বা অমঙ্গল হতে পারে অর্থে রাসূলুল্লাহ(স) হতে বর্ণিত সকল হাদীস মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
১১. ওযূর পরে রুমাল ব্যবহারঃ ওযূর পরে রাসূলুল্লাহ(সা) আর্দ্র আঙ্গুলগুলি মুছতেন বা মোছার জন্য রুমাল ব্যবহার করতেন বলে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি।
১২. সালাতের মধ্যে সশব্দে বিসমিল্লাহ পাঠঃ আল্লামা মাউসিলী বলেন, ইমাম দারাকুতনী বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) সালাতের মধ্যে সশব্দে‘ বিসমিল্লাহ…’ পাঠ করেছেন অর্থে বর্ণিত কোনো হাদীসই সহীহ নয়।
১৩. যার দায়িত্বে সালাত (কাযা) রয়েছে তার সালাত হবেনাঃ ইমাম মাউসিলী বলেন, এই অর্থে বর্ণিত সকল হাদীস ভিত্তিহীন।
১৪. মসজিদের মধ্যে জানাযার সালাত আদায়ে নিষেধাজ্ঞাঃ ইমাম মাউসিলী বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা)থেকে এ বিষয়ে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি।
১৫. জানাযার তাকবীরগুলিতে হাত উঠানোঃ রাসূলুল্লাহ(সা) জানাযার প্রথম তাকবীর ছাড়া অন্য কোনো তাকবীরের সময় হাত উঠিয়েছেন বলে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি।
১৬. সালাতুল রাগাইবঃ সালাতুল রাগাইব বা রজব মাসের প্রথম জুম’আর দিনে বিশেষ নফল সালাতের ফযীলত বিষয়ক সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
১৭. সালাতু লাইলাতুল মি‘রাজঃ মি’রাজের রাত্রিতে বিশেষ নফল সালাত আদায়ের ফযীলত বিষয়ক সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
১৮. সালাতু লাইলাতু নিসফি বিন শাবানঃ শবে বরাতের রাত্রিতে বিশেষ পদ্ধতিতে বিশেষ কিছু রাকা‘আত নফল সালাতের বিশেষ ফযীলত বিষয়ক সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
১৯. সপ্তাহের প্রত্যেক দিন ও রাত্রের জন্য বিশেষ নফল সালাতঃ আল্লামা মাউসিলী বলেন, এ বিষয়ক সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তিনি আরো বলেনঃ নফল সালাতের বিষয়ে শুধুমাত্র নিম্নের সালাতগুলির বিষয়ে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছেঃ ফরয সালাতের আগে পরে সুন্নাত সালাত, তারাবীহ, দোআ বা চাশত, রাতের সালাত বা তাহাজ্জুদ, তাহিয়্যাতুল মাসজিদ, তাহিয়্যাতুল ওযূ, ইসতিখারার সালাত, কুসূফের(চন্দ্র বা সূর্য্ গ্রহণের) সালাত, ইসতিসকার সালাত।(সালাতুত তাসবীহও সহীহ হাদীসে বর্ণিত)।
২০. ঈদের তাকবীরের সংখ্যাঃ আল্লামা মাউসিলী বলেন, ইমাম আহমদ বলেছেন, ঈদের তাকবীরের সংখ্যার বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে বর্ণিত সকল হাদীসই যয়ীফ। (সাহাবীগণ থেকে তাঁদের কর্ম হিসাবে এ বিষয়ে অনেক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুনঃ লেখকের অন্য বই –“হাদীসের সনদ বিচার পদ্ধতি ও সহীহ হাদীসের আলোকে সালাতুল ঈদের অতিরিক্ত তাকবীর”।
২১. সুন্দর চেহারার অধিকারীদের প্রশংসাঃ এ অর্থে বর্ণিত সকল হাদীসই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।
২২. আশুরার ফযীলতঃ আশুরার দিনে সিয়াম সাধনার ফযীলত সহীহ হাদীসে প্রমাণিত। এছাড়া এই দিনে দান করা, খেযাব মাখা, তেল ব্যবহার, সুরমা মাখা, বিশেষ পানাহার ইত্যাদি বিষয়ক সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
২৩. রজব মাসে সিয়ামের ফযীলতঃ রজব মাসে বা এই মাসের কোনো তারিখে নফল সিয়ামের ফযীলত বিষয়ক সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
২৪. ঋণ থেকে উপকার নেওয়াই সুদঃ আল্লামা মাউসিলী বলেন, একটি কথা প্রচলিত আছেঃ “ যে কোনো কর্জ বা ঋণ হতে উপকার নেওয়াই সুদ।” এ অর্থে বর্ণিত হাদীসের সনদ সহীহ নয়। সূদের জন্য হাদীসে সুনির্ধারিত সংজ্ঞা ও পরিচিতি রয়েছে।
২৫. অবিবাহিতদের প্রশংসায় কথিত সকল কথা ভিত্তিহীন।
২৬. ছুরি দিয়ে মাংস কেটে খাওয়ার নিষেধাজ্ঞাঃ একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, খাওয়ার সময় ছুরি ব্যবহার করা বা ছুরি দিয়ে মাংস কেটে খাওয়া আ’জামীদের আচরণ, মুসলমানদের তা পরিহার করতে হবে। এই হাদীসটি বানোয়াট পর্যায়ের। সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ(স) ছুরি দিয়ে ছাগলের গোশত কেটে খেয়েছেন।
২৭. আখরোট, বেগুন, বেদানা, কিশমিশ, মাংস, তরমুয, গোলাপ ইত্যাদির উপকার বা ফযীলত বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদীস বানোয়াট বা ভিত্তিহীন।
২৮. মোরগ বা সাদা মোরগের প্রশংসা বিষয়ক সকল কথা বানোয়াট।
২৯. আকীক পাথর ব্যবহার, বা অন্য কোনো পাথরের গুণাগুণ বিষয়ক সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
৩০. স্বপ্নের কথা মহিলাদেরকে বলা যাবেনা মর্মে সকল হাদীস ভিত্তিহীন।
৩১. রাসূলুল্লাহ(সা) ফার্সী ভাষায় কথা বলেছেন বা ফার্সী ভাষার নিন্দা করেছেন মর্মে সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
৩২. জারজ সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবেনা মর্মে বর্ণিত সকল কথা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
৩৩. ফাসেক ব্যক্তির গীবত করার বৈধতাঃ প্রচলিত বানোয়াট কথার মধ্যে রয়েছে “ফাসেক ব্যক্তির গীবত নেই।” অর্থাৎ ফাসিক ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার মধ্যে বিরাজমান সত্য ও বাস্তব দোষের কথা উল্লেখ করলে তাতে গীবত হবেনা বা গোনাহ হবেনা। এই অর্থে বর্ণিত সকল কথা বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও বাতিল। এই প্রকার বানোয়াট কথা অগণিত মুমিনকে ‘গীবতের’ মত ভয়ংকর পাপের মধ্যে নিপতিত করে।
৩৪. অমুক মাসে, অমুক সালে অমুক কিছু ঘটবে এইরূপ সন, তারিখ ও স্থানভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণীগুলো বানোয়াট।
৩৫. দাবা খেলার উপর নিষেধাজ্ঞা বিষয়কঃ হাদীস শরীফে শরীরচর্চা মূলক খেলাধুলার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ভাগ্যনির্ভর খেলাধুলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বুদ্ধিনির্ভর কিন্তু শরীরচর্চা বিহীন দাবা খেলার বৈধতার বিষয়ে সাহাবীগণের যুগ থেকেই আলিমগণ মতভেদ করেছেন। অনেক সাহাবী এই খেলা কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। তবে এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে কিছু বর্ণিত হয়নি। আল্লামা মাউসিলী বলেন, এই অর্থে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি। এ বিষয়ক হাদীসগুলি দুর্বল বা বানোয়াট পর্যায়ের।
২.১.৩. মোল্লা আলী কারী ও দরবেশ হুত
১০ম-১১শ হিজরী শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও হানাফী ফকীহ মোল্লা আলী ইবনু সুলতান মুহাম্মাদ নূরুদ্দীন আল হারাবী আল কারী(১০১৪ হি) রচিত বিভিন্ন মূল্যবান পুস্তকের মধ্যে দুইটি পুস্তক জাল হাদীস বিষয়ক। একটির নাম ‘আল আসরারুল মারফূয়া’ বা ‘আল মাউদূ’আত আল কুবরা’ ও অন্যটির নাম ‘আল মাসনূ ফিল হাদীসিল মাউদূ’ বা ‘আল মাউদূ‘আত আস-সুগরা’। উভয় গ্রন্থের শেষে জাল হাদীস বিষয়ক কিছু মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ হিজরী শতকের সুপ্রসিদ্ধ সিরীয় আলেম ও সূফী মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়েদ দরবেশ হুত(১২০৯-১২৭৬ হি)। তাঁর রচিত মূল্যবান গ্রন্থগুলির একটি ‘আসনাল মাতালিব’। এই গ্রন্থে তিনি সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন সহীহ, যয়ীফ ও মাউযূ হাদীসের আলোচনা করেছেন। গ্রন্থের শেষে তিনি জাল হাদীস বিষয়ক কিছু মূলনীতি উল্লেখ করেছেন। এই দুই আলিমের উল্লেখিত মূলনীতির আলোকে আমি এখানে সংক্ষেপে কিছু বিষয় উল্লেখ করছি (বিস্তারিত দেখুন, আল আসরার পৃ ২৭৭-২৫৯; আল-মাসনূ, পৃ. ১৭৮-২২০; আসনাল মাতালিব, পৃ. ২৬৯-৩০০)।
২.১.৪. জাল হাদীস বিষয়ক কতিপয় মূলনীতি
১. ভবিষ্যতের যুদ্ধ বিগ্রহ বিষয়ক বর্ণনাসমূহ প্রায় সবই অনির্ভরযোগ্য ও গল্পকারদের বিবরণ। ভবিষ্যদ্বাণী ও ভবিষ্যৎ ঘটনাবলীর বিষয়ে অতি অল্প সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যেগুলি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতের যুদ্ধ-বিগ্রহ, ফিতনা-ফাসাদ ইত্যাদি বিষয়ে বর্ণিত ও প্রচলিত অধিকাংশ হাদীসই অনির্ভরযোগ্য বা ভিত্তিহীন।
২. রাসূলুল্লাহ(সা) এর যুদ্ধবিগ্রহের বা জীবনের বিভিন্ন ঘটনার বিস্তারিত ইতিহাস বা মাগাযী বিষয়ক অধিকাংশ হাদীসের কোনো সনদ বা গ্রহণযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়না। এ সকল বিষয়ে অল্প কিছু সহীহ হাদীস রয়েছে। বাকি সবই গল্পকারদের বৃদ্ধি। ইতিহাসের ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাকের ইতিহাস প্রসিদ্ধ। তিনিও ইহুদী খৃস্টানদের তথ্য সংগ্রহ করতেন।
৩. তাফসীরের ক্ষেত্রে সহীহ সনদের তাফসীর ও শানে নুযূল খুবই কম। এ বিষয়ক অধিকাংশ হাদীস ই নির্ভরযোগ্য সনদ বা সূত্রবিহীন। বিশেষত, মুহাম্মাদ ইবনু সাইব ‘আল কালবী’(১৪৬ হি) বর্ণিত সকল তাফসীরই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এছাড়া মুকাতিল ইবনু সুলাইমান(১৫০ হি) এর বর্ণিত তাফসীরও অনুরূপ। এরা জনশ্রুতি, ইহুদী-খৃস্টানদের ইসরাঈলীয় বর্ণনা ইত্যাদির সাথে অগণিত মিথ্যা মিশ্রিত করেছেন।
৪. নবীগণের কবর সম্পর্কে যা কিছু প্রচলিত সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। রাসূলুল্লাহ(সা) ছাড়া অন্য কোনো নবীর কবর সম্পর্কে কিছু জানা যায়না।
৫. মক্কা শরীফে অনেক সাহাবীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কবরের স্থান সম্পর্কে কিছুই জানা যায়না। ‘মু‘য়াল্লা’ গোরস্থানে খাদীজাতুল কুবরা(রা) এর কবর বলে পরিচিত স্থানটিও কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়নি। এক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে বলেন যে, এই স্থানটি খাদীজা(রা) এর কবর। পরে ক্রমান্বয়ে তা মক্কাবাসীদের মধ্যে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়।
৬. মক্কার ঠিক কোন স্থানটিতে রাসূলুল্লাহ(সা) জন্মগ্রহণ করেছেন তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়না। এ নিয়ে মতভেদ আছে।
৭. কুদায়ীর ‘আশ-শিহাব’ গ্রন্থের অতিরিক্ত হাদীসসমূহ।
৪র্থ হিজরী শতকের পরে কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীস সংকলন গ্রন্থ রচনা করেছেন। এ সকল হাদীস গ্রন্থের মধ্যে কিছু গ্রন্থে সংকলিত প্রায় সকল হাদীসই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এগুলির অন্যতম হলো ৫ম হিজরী শতকের মিশরীয় আলিম কাযি আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু সালামাহ আল কুদায়ী(৪৫৪ হি) প্রণীত ‘আশ-শিহাব’ নামক গ্রন্থটি। এই গ্রন্থটিতে তিনি প্রায় ১৫০০ হাদীস সংকলন করেছেন। এর মধ্যে কিছু হাদীস পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোতে সংকলিত ‘সিহাহ সিত্তা’ বা অন্যান্য প্রসিদ্ধ গ্রন্থে সংকলিত। অবশিষ্ট হাদীসগুলি তিনি নিজের সনদের সংকলন করেছেন। এই ধরনের হাদীসগুলি প্রায় সবগুলি বানোয়াট, ভিত্তিহীন বা অত্যন্ত দূর্বল সনদে সংকলিত।
৮. ইবনু ওয়াদ’আনের ‘চল্লিশ হাদীস’ গ্রন্থের সকল হাদীস
৫ম হিজরী শতকের অন্য একজন আলিম ছিলেন ইরাকের মাউসিলের কাযি আবূ নাসর মুহাম্মাদ ইবনু আলী ইবনু ওয়াদ’আন(৪৯৪ হি)। তিনি ‘আল আরবাঈন’ বা ‘চল্লিশ হাদীস’ নামে হাদীসের একটি সংকলন রচনা করেন। এই সংকলনের সকল হাদীসই জাল বা বানোয়াট কথা। ইমাম সুয়ূতী বলেন, এই ‘চল্লিশ হাদীস’ নামক গ্রন্থের হাদীস নামক জাল কথাগুলির বক্তব্য খুবই সুন্দর। এগুলির মধ্যে হৃদয়গলানো ওয়ায রয়েছে। কিন্তু কথা সুন্দর হলেইতো তা রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা বলে গণ্য হবেনা। বিশুদ্ধ সনদে তাঁর থেকে বর্ণিত হতে হবে। এই গ্রন্থের সকল হাদীসই জাল। তবে জালিয়াতগণ কোনো কোনো জাল হাদীসের মাঝে সহীহ হাদীসের কিছু বাক্য ঢুকিয়ে দিয়েছে।
৯. শারাফ বালখী রচিত ‘ফাযালুল উলামা’ নামক বইয়ের সকল হাদীস।
১০. ‘কিতাবুল আরূস’ নামক একটি প্রচলিত গ্রন্থ। এই গ্রন্থে নব দম্পতি ও বিবাহিতদের বিষয়ে অনেক জাল কথা সংকলন করা হয়েছে। জালিয়াত বইটি ইমাম জাফর সাদিকের নামে প্রচার করেছে।
১১. তৃতীয়-চতূর্থ হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ আলিম ‘হাকিম তিরমিযী’ মুহাম্মাদ ইবনু আলী (মৃত্যু. আনু. ৩২০ হি)। তিনি ‘নাওয়াদিরুল উসূল’ ও অন্যান্য অনেক প্রসিদ্ধ পুস্তক রচনা করেন। তাঁর গ্রন্থগুলিতে অনেক জাল হাদীস রয়েছে। এমনকি মুহাদ্দিসগণ বলেছেন যে, তিনি তাঁর গ্রন্থগুলিকে জাল হাদীস দিয়ে ভরে ফেলেছেন। ফলে তাঁর গ্রন্থের কোনো হাদীস নিরীক্ষা ছাড়া গ্রহণ করা যাবেনা।
১২. ইমাম গাযযালী রচিত ‘এহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থে উল্লেখিত কোনো হাদীস নিরীক্ষা ছাড়া গ্রহণ করা যাবেনা। ইমাম গাযযালীর মহান মর্যাদা অনস্বীকার্য্য। তবে তিনি হাদীস উল্লেখের ব্যাপারে কোনো যাচাই বাছাই করেননি। প্রচলিত কিছু গ্রন্থ ও জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে অনেক জাল ও ভিত্তিহীন হাদীস তিনি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
১৩. আল্লামা ইমাম আবুল লাইস সামারকান্দি নাসর ইবনু মুহাম্মাদ (৩৭৩ হি) রচিত ‘তানবীহুল গাফিলীন’ গ্রন্থের অবস্থাও অনুরূপ। এই গ্রন্থে অনেক মাউযূ বা জাল ও বানোয়াট হাদীস রয়েছে।
১৪. ৬ষ্ঠ শতকের প্রসিদ্ধ আলিম শু’আইব ইবনু আব্দুল আযীয খুরাইফীশ(৫৯৭ হি)। তিনি ওয়ায উপদেশ ও ফযীলত বিষয়ে ‘আর-রাওদুল ফাইক’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যা প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই গ্রন্থটিতেও অনেক জাল হাদীস স্থান পেয়েছে।
১৫. তাসাউফের গ্রন্থগুলিতে সূফী বুযুর্গগণের সরলতার কারণে অনেক জাল হাদীস স্থান পেয়েছে।
১৬. ইমাম হাকিম(৪০৫ হি) তাঁর ‘আল মুসতাদরাক’ গ্রন্থে অনেক যয়ীফ, বাতিল ও মাউযূ হাদীসকে ‘সহীহ’ বলে উল্লেখ করেছেন। হাদীসের বিশুদ্ধতা নির্ণয়ে তিনি খুবই দুর্বলতা দেখিয়েছেন। এজন্য তাঁর মতামতের উপর নির্ভর করা যায়না।
১৭. কুদা‘য়ীর ‘আস-শিহাব’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখেন ৬ষ্ঠ শতকের একজন মুহাদ্দিস ‘মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু আহমাদ ইবনু হাবীব আল আমিরী’(৫৩০ হি)। তিনিও হাদীসের বিশুদ্ধতা নির্ণয়ের বিষয়ে বিশেষ ঢিলেমি ও দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন। এই গ্রন্থের অনেক দুর্বল, জাল ও ভিত্তিহীন হাদীসকে সহীহ বা হাসান বলে উল্লেখ করেছেন। আব্দুল রাউফ মুনাবী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস তাঁর এ সকল ভুল উল্লেখ করেছেন। এজন্য নিরীক্ষা ছাড়া তাঁর মতামত অগ্রহণযোগ্য।
১৮. আলীর(রা) এর প্রতি রাসূলুল্লাহ(সা) এর অসীয়ত নামে প্রচলিত অসীয়ত
আলী(রা) এর নামে একাধিক জাল অসীয়ত প্রচলিত আছে। প্রসিদ্ধ জাল অসীয়ত এর শুরুতে একটি বাক্য সহীহ হাদীস হতে নেওয়া হয়েছে। পরের সকল বাক্য জাল ও মিথ্যা। এই অসীয়তের শুরুতে বলা হয়েছেঃ ‘হে আলী মূসা(আ) এর কাছে হারূন(আ) এর মর্যাদা যেরূপ, আমার কাছেও তোমার মর্যাদা সেরূপ। তবে আমার পরে কোনো নবী নেই।’ জালিয়াত এই বাক্যটি সহীহ হাদীস হতে নিয়েছে। এরপর বিভিন্ন ভিত্তিহীন কথা উল্লেখ করেছে। যেমনঃ হে আলী, মুমিনের আলামত তিনটি-……মুনাফিকের আলামত………..হিংসুকের আলামত……..পুরো অসীয়তটিই বাতিল, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা কথায় ভরা। মাঝে মধ্যে দুই একটি সহীহ হাদীসের বাক্য ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। [এই জাল অসীয়তটি পুরোটাই বাংলায় ছাপা হয়েছে। দেখুন, আল্লামা সুয়ূতী, নবী কারীম(সা) এর অসীয়ত, অনুবাদ মাওলানা মুহাম্মাদ রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (ঢাকা,ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় সংস্করণ ২০০৩), পৃ. ১১-২৪]
এছাড়া আলী(রা) এর নামে আরো একাধিক অসীয়ত জালিয়াতগণ তৈরি করেছে। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, ‘আলীর প্রতি রাসূলুল্লাহ(সা) এর অসীয়ত’ নামে প্রচারিত সবই জাল। তবে এগুলির মধ্যে জালিয়াতগণ দুই একটি সহীহ হাদীসের বাক্য ঢুকিয়ে দিয়েছে, যেগুলি অন্য সনদে বর্ণিত হয়েছে।
১৯. আবূ হুরাইরার(রা) এর প্রতি রাসূলুল্লাহ(সা) এর অসীয়ত
আবূ হুরাইরা(রা) এর প্রতি রাসূলুল্লাহ(সা) এর অসীয়ত নামে আরেকটি জাল ও বানোয়াট হাদীস প্রচলিত আছে। এই অসীয়তটিও আগাগোড়া জাল ও মিথ্যা। তবে জালিয়াতগণ তাদের অভ্যাসমত এর মধ্যে অন্য সনদে বর্ণিত দুই চারটি সহীহ হাদীসের বাক্য জোড়াতালি দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে। (এই জাল অসীয়তটিও পূর্বের অসীয়তটির সাথে বাংলায় ছাপা হয়েছে। দেখুন- আল্লামা সুয়ূতী, নবী করীম(সা) এর অসীয়ত, পৃ. ২৭-৩৮)।
২০. বিলালের মদীনা পরিত্যাগ ও স্বপ্ন দেখে মদীনায় আগমনের কাহিনী
রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের পরে বিলাল(রা) জিহাদের উদ্দেশ্যে মদীনা ছেড়ে সিরিয়া এলাকায় গমন করেন এবং সিরিয়াতেই বসবাস করতেন। কথিত আছে যে, একদিন তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ(সা) তাঁকে যিয়ারতের উৎসাহ দিচ্ছেন। তখন তিনি মদীনায় আগমন করেন…..ইত্যাদি। আল্লামা কারী বলেন, সুয়ূতী উল্লেখ করেছেন যে, এই কাহিনীটি বানোয়াট। সম্ভবত ইবনু হাজার মাক্কী ইমাম সুয়ূতীর এই আলোচনা দেখতে পাননি; এইজন্য তিনি এই জাল কাহিনীটিকে তার যিয়ারত বিষয়ক পুস্তকটিতে উল্লেখ করেছেন।
২১. সপ্তাহের বিশেষ দিন বা রাতের জন্য বিশেষ নামাজের বিষয়ে বর্ণিত সবকিছু বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।অনুরূপভাবে আশুরার দিনের বা রাতের নামায, রজব মাসের প্রথম রাতের নামায, রজব মাসের অন্যান্য দিন বা রাতের নামায, রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতের নামায ইত্যাদি সকল কথাই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
আল্লামা আলী কারী বলেন, কূতুল কুলুব, এহইয়াউ ঊলূমিদ্দীন, তাফসীরে সা’আলাবী ইত্যাদি গ্রন্থে এ সকল হাদীস রয়েছে দেখে পাঠক ধোঁকা খাবেননা। এগুলি সবই বানোয়াট।
২২. হাসান বসরী হযরত আলী(রা) হতে খিরকা বা সূফী তরীকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বলে যা কিছু প্রচলিত আছে সবই ভিত্তিহীন বাতিল কথা।
২৩. রাসূলুল্লাহ(সা) উমার(রা)ও আলী(রা) কে তাঁর জামা বা খিরকা দিয়েছিলেন উয়াইস কারণীকে পৌছে দেয়ার জন্য এবং তাঁরা তাঁকে তা পৌছে দিয়েছিলেন মর্মে যা কিছু বলা হয় সবই বাতিল ও ভিত্তিহীন।
২৪. কুতুব-আকতাব, গওস, নকীব-নকাবা, নাজীব-নুজাবা, আওতাদ ইত্যাদি বিষয়ক সকল হাদীস বাতিল ও ভিত্তিহীন।
২৫. মেহেদি বা মেন্দির বিশেষ ফযীলত বা প্রশংসায় বর্ণিত সকল হাদীস ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। শুধুমাত্র মেহেদী দিয়ে খেযাব দেওয়ার উৎসাহজ্ঞাপক হাদীসগুলি নির্ভরযোগ্য।
২৬. আজগুবি সাওয়াব বা শাস্তি
মুহাদ্দিসগণ সনদ বিচার ছাড়াও যে সমস্ত আনুষঙ্গিক অর্থ ও তথ্যগত বিষয়কে জাল হাদীসের চিহ্ন হিসাবে উল্লেখ করেছেন তন্মধ্যে অন্যতম বিষয় হলো আজগুবি সাওয়াব ও শাস্তির বিবরণ।
বিভিন্ন প্রকারের সামান্য নফল ইবাদত বা অত্যন্ত সাধারণ ইবাদত, যিকির, দোয়া, কথা, কর্ম বা চিন্তার জন্য অগণিত আজগুবি সাওয়াবের বর্ণনা। এক্ষেত্রে জালিয়াতগণ কখনো সহীহ হাদীসে প্রমাণিত যিকির, সালাত, দোয়া বা ইবাদতের এইরূপ আজগুবি সাওয়াব বলেছে। কখনো বা বানোয়াট যিকির, সালাত, দোয়া, সিয়াম ইবাদত তৈরি করে তার বানোয়াট আজগুবি সাওয়াব বর্ণনা করেছে। এ সকল জাল হাদীসের ভাষা নিম্নরূপঃ যে ব্যক্তি অমুক যিকির করবে, অমুক বা অমুক কাজটি করবে তার জন্য এক লক্ষ নেকী, এক লক্ষ পাপ মোচন……। অথবা তার জন্য জান্নাতে এক লক্ষ বৃক্ষ রোপন, প্রত্যেক গাছের……….গোড়া স্বর্ণের……….ডালপালা………পাতা……….ইত্যাদি কাল্পনিক বর্ণনা। অথবা তার জন্য একলক্ষ শহীদের সাওয়াব, সিদ্দীকের সাওয়াব………। অথবা তার জন্য একটি ফিরিশতা/পাখি বানানো হবে, তার এত হাজার বা এত লক্ষ মুখ থাকবে…….ইত্যাদি। অথবা অমুক দোয়া পাঠ করলে লোহা গলে যাবে, প্রবাহিত পানি থেমে যাবে….প্রত্যেক অক্ষরের জন্য এত লক্ষ ফেরেশতা ইত্যাদি।
২৭. স্বাভাবিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বিপরীত কথা
এই জাতীয় বানোয়াট কথাগুলির মধ্যে রয়েছেঃ
১. ‘বেগুন সকল রোগের ঔষধ’ বা ‘বেগুন যে নিয়্যাতে খাওয়া হবে, সেই নিয়্যাত পূরণ হবে’।
২. ‘যদি কেউ কোনো কথা বলে এবং সে সময়ে কেউ হাঁচি দেয় তাহলে সেই কথার সত্যতা প্রমাণ করে।’
৩. তোমরা ডাল খাবে; কারণ ডাল বরকতময়। ডাল কলব নরম করে এবং চোখের পানি বাড়ায়। ৭০ জন নবী ডালের মর্যাদা বর্ণনা করেছেন।
৪. স্বর্ণকার, কর্মকার ও তাঁতীগণ সবচেয়ে বেশি মিথ্যাবাদী।
২৮. অবান্তর, অপ্রয়োজনীয় ও ফালতু বিষয়ের আলোচনা
যে সকল কথা সাধারণ জ্ঞানী মানুষেরা আলোচনা করতে ইচ্ছুক নয়, সকল জ্ঞানীর সরদার সাইয়িদুল বাশার রাসূলুল্লাহ(সা) সে বিষয়ে কথা বলতে পারেননা। এই জাতীয় কথাবার্তার মধ্যে রয়েছেঃ
১. চাউল যদি মানুষ হতো তবে ধৈর্য্যশীল হতো, কোনো ক্ষুধার্ত তা খেলেই পেট ভরে যেত।
২. আখরোট ঔষধ ও পনির রোগ। দুটি একত্রে পেটে গেলে রোগমুক্তি।
৩. তোমরা লবণ খাবে। লবণ ৭০ প্রকার রোগের ঔষধ।
৪. তারকাপুঞ্জ আরশের নিচে একটি সাপের ঘাম….
৫. আল্লাহ ক্রোধান্বিত হলে ফার্সী ভাষায় ওহী নাযিল করেন।
৬. সুন্দর চেহারার দিকে তাকালে দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায়। সুন্দর চেহারাকে আল্লাহ জাহান্নামে শাস্তি দিবেননা।
৭. চোখের নীল রং শুভ।
৮. আল্লাহ মাথার টাকের মাধ্যমে কিছু মানুষকে পবিত্র করেছেন, যাদের মধ্যে প্রথম হযরত আলী(রা)।
৯. নাকের মধ্যে পশম গজানো কুষ্ঠরোগ হতে নিরাপত্তা দেয়।
১০. কান ঝিঁঝিঁ করা বা কান ডাকা বিষয়ক হাদীসগুলি বানোয়াট।
এই জাতীয় বানোয়াট কথার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন গাছ, সবজি, ঔষধি ইত্যাদির উপকার বর্ণনায় প্রচারিত হাদীস। অনুরূপভাবে মোরগ, সাদা মোরগ ইত্যাদির ফযীলতে বানোয়াট হাদীসও এই পর্যায়ভুক্ত।
২৯. চিকিৎসা, টোটকা বা খাদ্য বিষয়ক অধিকাংশ কথাই বানোয়াট
এই জাতীয় ফালতু কথার মধ্যে রয়েছে
১. অমুক অমুক কাজে স্মৃতিশক্তি কমে বা লোপ পায়। অমুক কাজে অমুক রোগ হয়। অমুক কাজ করলে অমুক রোগ দূর হয়……..ইত্যাদি।
২. অমুক খাদ্যে কোমর মজবুত হয়, অমুক খাদ্যে সন্তান বেশি হয়। মুমিন মিষ্ট এবং সে মিষ্টি পছন্দ করে। ঝুটা মুখে খেজুর খেলে কৃমি মরে।
৩০. উজ পালোয়ান, কোহে কাফ ইত্যাদি বাস্তবতা বর্জিত কথাবার্তা
এই জাতীয় ভিত্তিহীন বাতিল কথাবার্তার মধ্যে রয়েছেঃ
১. উজ ইবনু উনুক বা ওজ পালোয়ানের কাল্পনিক দৈর্ঘ্য….‘উজ পালোয়ান’ বিষয়ক সকল কথাই মিথ্যা ও বানোয়াট।
২. কোহে কাফ বা কাফ পাহাড়ের বর্ণনায় প্রচারিত ও বর্ণিত হাদীসসমূহ। এ বিষয়ক সকল কথাই ভিত্তিহীন, জাল ও মিথ্যা।
৩. পৃথিবী পাথরের উপর পাথর একটি ষাঁড়ের শিঙ এর উপর।…….একটি মাছের উপর…./ষাঁড়টি নড়লে শিঙ নড়ে আর ভূমিকম্প হয়……..। এ জাতীয় সকল কথাই মিথ্যা ও বানোয়াট যা অসৎউৎসাহী ও নির্লজ্জ্ জালিয়াতগণ হাদীসের নামে প্রচার করেছে।
৩১. বিশুদ্ধ হাদীসের স্পষ্ট বিরোধী কথাবার্তা কুরআনের অনেক আয়াত ও অগণিত সহীহ হাদীসের শিক্ষা হলো, আখিরাতের মুক্তি নির্ভর করে কর্মের উপর, নাম কিংবা বংশের উপর নয়। অনুরূপভাবে কর্মের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্ম হলো ফরয, যা করা অত্যাবশ্যক ও হারাম যা বর্জন করা অত্যাবশ্যক। এরপর ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব ইত্যাদি কর্ম রয়েছে। সমাজে অনেক কথা প্রচলিত রয়েছে যা এই ইসলামী শিক্ষার স্পষ্ট বিরোধী। সনদ বিচারে সেগুলি দুর্বল বা জাল বলে প্রমাণিত। তবে সনদ বিচার ছাড়া শুধু অর্থ বিচার করলেও এর জালিয়াতি ধরা পড়ে।
যেমন, অনেক হাদীসের সামান্য মুস্তাহাব কর্মের পুরস্কার বা সাওয়াব হিসেবে বলা হয়েছে, এই কর্ম করলে তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবেনা বা তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে….ইত্যাদি। অনুরূপভাবে মুহাম্মাদ বা আহমাদ নাম হওয়ার কারণে জাহান্নাম হতে মুক্তি দেওয়া হবে। এই প্রকারের সকল হাদীস বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
২.২. মহান স্রষ্টা কেন্দ্রিক জাল হাদীস
১. আল্লাহকে কোনো আকৃতিতে দেখা চক্ষু আল্লাহকে দেখতে পারেনা বলে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছেঃ
لَّا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ ۖ
-তিনি দৃষ্টির অধিগম্য নন, কিন্তু দৃষ্টিশক্তি তাঁর অধিগত।(সূরা ৬ঃ আনআম, আয়াত ১০৩)।
অন্যত্র এরশাদ হয়েছেঃ “কোনো মানুষের জন্যই সম্ভব নয় যে, আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে বা পর্দার আড়াল থেকে ছাড়া তাঁর সাথে কথা বলবেন।”(সূরা ৪২, শূরাঃ আয়াত ৫১)।
অন্যত্র এরশাদ করা হয়েছেঃ “মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার প্রতিপালক তার সাথে কথা বললেন, তখন সে বলল, হে আমার প্রতিপালক, আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখব। তিনি বলেনঃ তুমি কখনই আমাকে দেখতে পাবেনা। তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর, তা স্বস্থানে স্থির থাকলে তুমি আমাকে দেখবে। যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ল…..।”(সূরা ৭ঃ আরাফ, আয়াত ১৪৩)।
কুরআন কারীমের এ সকল সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকে মুসলিম জাতি একমত যে, পৃথিবীতে কেউ আল্লাহকে দেখতে পারেনা। রাসূলুল্লাহ(সা) হতে একটি সহীহ হাদীসও বর্ণিত হয়নি যাতে বলা হয়েছে, “আমি জাগ্রত অবস্থায় পৃথিবীতে বা মি‘রাজে চর্মচক্ষে বা অন্তরের চক্ষে আল্লাহকে দেখেছি।” স্বপ্নের ব্যাপারে কোনো মতভেদ নাই। তবে রাসূলুল্লাহ(সা) জাগ্রত অবস্থায় অন্তরের দৃষ্টিতে আল্লাহকে দেখেছেন কিনা সে বিষয়ে সাহাবীগণ মতভেদ করেছেন। আয়েশা (রা) বলেন, “যে ব্যক্তি বলে যে, মুহাম্মাদ (সা) তাঁর প্রতিপালককে দেখেছেন, সে ব্যক্তি আল্লাহর নামে জঘন্য মিথ্যা কথা বলে।”(বুখারী, আস-সহীহ ৩/১১৮১, মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৫৯)। ইবনু মাসউদ ও অন্যান্য সাহাবীগণও এই মত পোষণ করেছেন। পক্ষান্তরে ইবনু আব্বাস(রা) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, “মি’রাজের রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ(সা) অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে আল্লাহকে দেখেছিলেন। আল্লাহ যেমন মূসা(আ)কে ‘কথা বলার’ মুজিযা প্রদান করেছিলেন, তেমনি তিনি মুহাম্মাদ(সা) কে অন্তরের দৃষ্টিতে দর্শনের মুজিযা দান করেছিলেন।”(ইবনু খুযাইমা, কিতাবুত তাওহীদ ২/৪৭৭-৫৬৩)।
যারা রাসূলুল্লাহ(সা) এর দর্শন দাবি করেছেন, তাঁরা একমত যে-এই দর্শন রাসূলুল্লাহ(সা) এর জন্য একটি বিশেষ মুযিজা, যা আর কারো জন্য নয় এবং এই দর্শন হৃদয়ের অনুভব, যেখানে কোনো আকৃতির উল্লেখ নেই। রাসূলুল্লাহ(সা) আল্লাহকে কোনো আকৃতিতে দেখেছেন, অথবা তিনি ছাড়া কোনো সাহাবী আল্লাহকে দেখেছেন মর্মে যা কিছু বর্ণিত সবই জাল ও মিথ্যা।
মি’রাজের রাত্রিতে বা আরাফার দিনে, বা মিনার দিনে বা অন্য কোনো সময়ে বা অবস্থায় রাসূলুল্লাহ(সা) তাঁর মহান প্রভু মহিমাময় আল্লাহকে বিশেষ কোনো আকৃতিতে দেখেছেন অর্থে সকল হাদীস বানোয়াট। যেমন, তাকে যুবক অবস্থায় দেখেছেন, তাজ পরিচিত অবস্থায় দেখেছেন, উটের বা খচ্চরের পিঠে দেখেছেন বা অনুরূপ সকল কথা মিথ্যা ও বানোয়াট।(ইবনু ইরাক, তানযীহুশ শারীয়াহ ১/১৩৭-১৩৯)।
এ জাতীয় ভিত্তিহীন একটি বাক্য হলোঃ “আমি আমার প্রভুকে একজন দাঁড়ি গোফ উঠেনি এমন যুবকরূপে দেখেছি।”- এ জঘন্য কথাটিকে মুহাদ্দিসগণ জাল বলে ঘোষণা করেছেন। (ইবনুল জাওযী, আল-মাওযূ’আত ১/৮০-৮১, সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/২৮-৩১, মুল্লা আলী কারী, আল আসরার ১২৬ পৃ.)।
অনুরূপভাবে উমরের(রা) নামে জালিয়াতগণ বানিয়েছে, “আমার প্রভুর নূর দ্বারা আমার অন্তর আমার প্রভুকে দেখেছে।” আলী(রা) এর নামে জালিয়াতগণ আরো জঘন্য কথা বানিয়েছে, “যে প্রভুকে আমি দেখিনা, সে প্রভুর ইবাদত আমি করিনা।”(সিররুল আসরার, পৃ. ৫৭-৫৮)।
২. ৭, ৭০ বা ৭০ হাজার পর্দা
সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “মহান আল্লাহর নূরের পর্দা রয়েছে।”(মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৬১)। কিন্তু পর্দার সংখ্যা, প্রকৃতি ইত্যাদির বিস্তারিত বিবরণ সহীহ হাদীসে পাওয়া যায়না। কিছু হাদীসে মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর পর্দার সংখ্যার কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন ওয়াযে ৭০ হাজার নূরের পর্দা, ৭০ টি পর্দা, ৭টি পর্দা ইত্যাদি কথা বলা হয়। মুহাদ্দিসগণ বিস্তারিত আলোচনা ও নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখেছেন যে, এই অর্থের হাদীসগুলি কিছু সন্দেহাতীতভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট কথা আর কিছু যয়ীফ, দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য কথা।
৩. আরশের নিচে বিশাল মোরগ বিষয়ে
আমাদের সমাজে ওয়াযে আলোচনায় অনেক সময় আরশের নিচের বিশাল মোরগ, এর আকৃতি, এর ডাক ইত্যাদি সম্পর্কে বলা হয়। এ সংক্রান্ত হাদীসগুলি ভিত্তিহীন, বানোয়াট বা অত্যন্ত দুর্বল।(সুয়ূতী, লাআলী ১/৬০; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/১৫৫, ১৮৯)।
৪. যে নিজেকে চিনল সে আল্লাহকে চিনল
আমাদের সমাজে ধার্মিক মানুষের মাঝে অতি প্রচলিত একটি বাক্য হলো- “যে নিজেকে জানল, সে তার প্রভুকে জানল।” অনেক আলেম তাঁদের বইয়ে এই বাক্যটিকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা বলে সনদবিহীনভাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মুহাদ্দিসগণ একবাক্যে বলেছেন যে, এই বাক্যটি রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা নয়, কোনো সনদেরই তাঁর থেকে বর্ণিত হয়নি। কোনো কোনো মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, বাক্যটি তৃতীয় হিজরী শতকের একজন সূফী ওয়ায়েয ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায আল-রাযী(২৫৮ হি)-র নিজের বাক্য। তিনি ওয়াজ নসীহতের সময় কথাটি বলতেন, তার নিজের কথা হিসেবে, হাদীস হিসেবে নয়। পরবর্তীতে অসতর্কতাবশত কোনো কোনো আলিম কথাটিকে হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৫. মুমিনের কালব আল্লাহর আরশ
আমাদের সমাজে ধার্মিক মানুষের মাঝে বহুল প্রচারিত একটি বাক্যঃ“মুমিনের হৃদয় আল্লাহর আরশ।” এ বিষয়ে বিভিন্ন বাক্য প্রচলিতঃ “হৃদয় প্রভুর বাড়ি।” “মুমিনের হৃদয় আল্লাহ আরশ।” “আমার যমিন এবং আমার আসমান আমাকে ধারণ করতে পারেনি, কিন্তু আমার মুমিন বান্দার কলব বা হৃদয় আমাকে ধারণ করেছে।”- এগুলি সবই বানোয়াট বা জাল হাদীস। কোনো কোনো লেখক এই বাক্যগুলিকে তাঁদের গ্রন্থে সনদবিহীনভাবে হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাদীসের হাফেয যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণ অনেক গবেষণা করেও এগুলোর কোনো সনদ পাননি, বা কোনো হাদীসের গ্রন্থে এগুলোর উল্লেখ পাওয়া পাননি।রাসূলুল্লাহ(সা)হতে কোনো সনদেই এ সকল কথা বর্ণিত হয়নি। এজন্য তাঁরা এগুলিকে মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীসের মধ্যে গণ্য করেছেন। (মুল্লা আলী কারী, আল আসরার, ১৭০ ও ২০৬ পৃ., আল-মাসনূয়, ১০০ ও ১৩০ পৃ.)।
৬. আমি গুপ্তভান্ডার ছিলাম
প্রচলিত একটি বানোয়াট কথা যা হাদীস নামে পরিচিতঃ “আমি অজ্ঞাত গুপ্তভান্ডার ছিলাম। আমি পরিচিত হতে পছন্দ করলাম।তখন আমি সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করলাম; যেন আমি পরিচিত হই।”
ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, সমাজে প্রচলিত জাল হাদীসগুলি দুই প্রকারের। এক প্রকারের জাল হাদীস যেগুলির সনদ আছে এবং কোনো গ্রন্থে সনদসহ তা সংকলিত আছে। সনদ নিরীক্ষার মাধ্যমে মুহাদ্দিসগণ সেগুলির জালিয়াতি ধরে ফেলেছেন। দ্বিতীয় প্রকারের জাল হাদীস যেগুলি কোনো গ্রন্থেই সনদসহ বর্ণিত হয়নি। অথচ লোকমুখে প্রচলিত হয়ে গিয়েছে এবং তার সূত্র ধরেই কোনো কোনো আলিম তাঁর গ্রন্থে সনদবিহীনভাবে উল্লেখ করেছেন। এই প্রকারের সম্পূর্ণ অস্তিত্ববিহীন ও সনদবিহীন বানোয়াট একটি কথা হলো এই বাক্যটি।(ইবনু তাইমিয়া, আহাদীসুল কুসসাস, পৃ.৫৫; মোল্লা আলী কারী, আল আসরার পৃ. ১৭৯)।
৭. কিয়ামাতে আল্লাহ মানুষদেরকে মায়ের নামে ডাকবেন
আরেকটি বানোয়াট ও মিথ্যা কথা হলোঃ কিয়ামাতের দিন আল্লাহ মানুষদেরকে মায়ের নামে ডাকবেন। এই বাক্যটি একদিকে বানোয়াট বাতিল কথা, অন্যদিকে সহীহ হাদীসের বিপরীত। ইমাম বুখারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস সংকলিত বিভিন্ন সহীহ হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে, কিয়ামতের দিন মানুষদের পরিচয় পিতার নামের সাথে প্রদান করা হবে। বলা হবে, অমুক, পিতা অমুক বা অমুক ব্যক্তির পুত্র অমুক।(সাখাবী, আল মাগাদীস, পৃ. ১৩৯; সুয়ূতী আল লাআলী ২/৪৪৯)।
৮. জান্নাতের অধিবাসীদের দাড়ি থাকবেনা
জান্নাতের অধিবাসীদের দাড়ি থাকবেনা, সবাই দাড়িবিহীন যুবক থাকবে। শুধুামাত্র আদম(আ) এর দাড়ি থাকবে। কেউ বলছে শুধু মূসা(আ) বা হারূন(আ) এর দাড়ি থাকবে বা ইবরাহীম(আ) ও আবু বকর(রা) এর দাড়ি থাকবে। এগুলি সবই মিথ্যা ও বানোয়াট কথা।(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৩/৩৯৩; মুল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ৭৫)।
৯. আল্লাহ ও জান্নাত জাহান্নাম নিয়ে চিন্তা ফিকির করা
প্রচলিত একটি মিথ্যা হাদীস হলোঃ “মহান আল্লাহর মহত্ত্ব, জান্নাত ও জাহান্নাম নিয়ে এক মুহুর্ত চিন্তা ফিকির করা সারা রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়ার চেয়ে উত্তম।”(ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/১৪৮)।
২.৩. পূর্ববর্তী সৃষ্টি ও নবীগণ ও তাফসীর বিষয়ক
পূর্ববর্তী সৃষ্টি, পূর্ববর্তী নবীগণ ও ঘটনা কাহিনীর বিষয়ে কুরআন কারীম সংক্ষেপে আলোচনা এসেছে। শুধুমাত্র যে বিষয়গুলিতে মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক শিক্ষা রয়েছে সেগুলিই আলোচনা করা হয়েছে। এ সকল সৃষ্টি ও নবীগণের ঘটনা ইহুদীদের মধ্যে অনেক বিস্তারিতভাবে প্রচলিত।
কুরআন কারীমে যেহেতু এ সকল বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা নেই, সেহেতু সাহাবী তাবেয়ীগণের যুগ হতেই অনেক মুফাসসির এ সকল বিষয়ে ইহুদীদের বর্ণনা কৌতুহলের সাথে শুনতেন। পাশাপাশি তাবিয়ী পর্যায়ে অনেক ইহুদী আলেম ইসলাম গ্রহণ করার পরে এ সকল বিষয়ে তাদের সমাজে প্রচলিত অনেক গল্প কাহিনী মুসলমানদের মধ্যে বলেছেন।
এ সকল গল্প কাহিনী গল্প হিসেবে শুনতে বা বলতে ইসলামে নিষেধ করা হয়নি। তবে এগুলিকে সত্য বলে মনে করতে ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে। কোনো কোনো মুফাসসির ও ঐতিহাসিক পূর্ববর্তী নবীগণ বিষয়ক বিভিন্ন আয়াতের তাফসীরে ও তাদের জীবন কেন্দ্রিক ইতিহাস বর্ণনায় ইহুদী খৃস্টানগণের বিকৃত বাইবেল ও অন্যান্য সত্য-মিথ্যা গল্পকাহিনীর উপর নির্ভর করেছেন। প্রথম যুগগুলিতে মুসলিমগণ গল্প হিসেবেই এগুলি শুনতেন। তবে পরবর্তী যুগে এ সকল কাহিনীকে মানুষ সত্যি মনে করেছেন। কেউ কউ এগুলিকে হাদীস হিসেবে প্রচার করেছেন।
কুরআনে বারংবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, ইহুদী ও খৃস্টানগণ তাদের উপর অবতীর্ণ আল্লাহর কালাম তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিলকে বিকৃত করেছে। অনেক কথা তারা নিজেরা রচনা করে আল্লাহর কালাম বলে চালিয়েছে। এজন্য হাদীস শরীফে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাদের কথা বর্ণনা করা যাবে, তবে শর্ত হলো, কুরআনের সত্যায়ন ছাড়া কোনো কিছুকে সত্য বলে গ্রহণ করা যাবেনা। সাহাবীগণ ইহুদী খৃস্টানদের তথ্যের উপর নির্ভর করাকে নিন্দা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, “ কিভাবে তোমরা ইহুদী খৃস্টানদেরকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা কর? অথচ তোমাদের পুস্তক যা রাসূলুল্লাহ(সা) এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে যা নবীনতর, তোমরা তা বিশুদ্ধ অবস্থায় পাঠ করেছ, যার মধ্যে কোনোরূপ বিকৃতি প্রবেশ করতে পারেনি। এই কুরআন তোমাদেরকে বলে দিয়েছে যে, পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের অনুসারীগণ আল্লাহর পুস্তককে পরিবর্তন করেছে এবং বিকৃত করেছে। তারা স্বহস্তে পুস্তক রচনা করে বলেছে যে তা আল্লাহর পক্ষ হতে প্রাপ্ত। পার্থিব সামান্য স্বার্থ লাভের জন্য তারা এরূপ করছে। তোমাদের নিকট যে জ্ঞান আগমন করেছে(কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান) তা কি তোমাদেরকে তাদেরকে কিছু জিজ্ঞাসা করা থেকে নিবৃত করতে পারেনা।”(বুখারী, আস সহীহ, ৬/২৬৭৯)।
এতকিছু সত্ত্বেও ক্রমান্বয়ে মুসলিম সমাজে ইসরাঈলী রেওয়ায়াত প্রবেশ করতে থাকে। পরবর্তী যুগে মুসলিমগণ এগুলিকে কুরআন বা হাদীসের কথা বলেই বিশ্বাস করতে থাকেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই বইয়ের পরিসরে সম্ভব নয়। এজন্য সংক্ষেপে কিছু বিষয়ের জন্য ইঙ্গিত করছি।
১. বিশ্ব সৃষ্টির তারিখ বা বিশ্বের বয়স বিষয়ক
বিশ্ব সৃষ্টির তারিখ, সময়, বিশ্বের বয়স, আদম(আ) হতে ঈসা(আ) পর্য্যন্ত সময়ের হিসাব, আর কতদিন বিশ্ব থাকবে তার হিসাব ইত্যাদি বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বাতিল, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথা। জালিয়াতগণ এ বিষয়ে অনেক কথা বানিয়েছে।
ইহুদী ও খৃস্টানগণের বাইবেলে বিশ্ব সৃষ্টির বয়স উল্লেখ করা হয়েছে। মানব সৃষ্টির সময় বলা হয়েছে। বাইবেল এর হিসেব অনুসারে বর্তমান বিশ্বের বয়স মাত্র ৭০০০(সাত হাজার) বছর মাত্র। এ কথা ঐতিহাসিকভাবে ও বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল বলে প্রমাণিত। এ সকল মিথ্যা ও ভুল তথ্যের উপর নির্ভর করে মুসলিম ঐতিহাসিকগণও অনেক কথা লিখেছেন। আর জালিয়াতগণ এই মর্মে অনেক জাল হাদীসও বানিয়েছে।
২. মানুষের পূর্বে অন্যান্য সৃষ্টির বিবরণ
মানব জাতির পূর্বে জিন ভিন্ন অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী এই বিশ্বে ছিল কিনা সে বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। তবে মানুষের পূর্বে মহান আল্লাহ জিন জাতিকে মানুষের মতই বুদ্ধি, ইচ্ছাশক্তি ও ইবাদতের দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন বলে কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। জিন জাতির সৃষ্টির বিস্তারিত বিবরণ কুরআন কারীমে নেই। কোনো সহীহ হাদীসেও এ বিষয়ক কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়না।
জিন জাতির সৃষ্টি রহস্য, জিন জাতির আদি পিতা, জিন জাতির কর্মকান্ড, জিন জাতির নবী পয়গাম্বর, তাদের আযাব-গযব, তাদের বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ, নবী-রাসূলের নাম ইত্যাদি বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই ইহুদী খৃস্টানদের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার, লোককথা ও অনির্ভরযোগ্য কল্প-কাহিনী।
কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইবলীস জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত। আদমকে সেজদা করার নির্দেশ অমান্য করে সে অভিশপ্ত হয়। এই ঘটনার পূর্বে তার জীবনের কোনো ইতিহাস সম্পর্কে কোনো সহীহ বর্ণনা নেই। ইবলিসের জন্ম-বৃত্তান্ত, বংশ ও কর্ম তালিকা, জ্ঞান-গরিমা, ইবাদত-বন্দেগী ইত্যাদি বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বিভিন্ন মানুষের কথা, ইসরায়েলী রেওয়ায়াত ও অনির্ভরযোগ্য বিবরণ। ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ জাতীয় পুস্তকগুলি এ সকল মিথ্যা কাহিনীতে পরিপূর্ণ।
৩. সৃষ্টির সংখ্যাঃ ১৮ হাজার মাখলুকাত
একটি বহুল প্রচলিত কথা হলোঃ ১৮ হাজার মাখলুকাত। অর্থাৎ এই মহাবিশ্বে সৃষ্ট প্রাণীর জাতি-প্রজাতির সংখ্যা হলো ১৮,০০০ মাত্র। এই কথাটি একান্তই লোকশ্রুতি ও কোনো কোনো আলিমের মতামত। আল্লাহর অগণিত সৃষ্টির সংখ্যা কত লক্ষ বা কত কোটি সে বিষযে কোনো তথ্য কোনো সহীহ এমনকি যয়ীফ হাদীসেও বর্ণিত হয়নি।
৪. নবী-রাসূলগণের সংখ্যা
কুরআন কারীম থেকে জানা যায় যে, মহান আল্লাহ সকল যুগে সকল জাতি ও সমাজেই নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। এরশাদ করা হয়েছেঃ (আরবী*********)
-“প্রত্যেক জাতিতেই সতর্ককারী প্রেরণ করা হয়েছে।”(সূরা ৩৫, ফাতির, আয়াত ২৪। আরো দেখুন সূরা ১০, ইউনূস, আয়াত ৪৭)।
এ সকল নবী রাসূলের মোট সংখ্যা কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। বরং কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছে যে, এই নবী-রাসূলগণের কারো কথা আল্লাহ তাঁর রাসূলকে(সা) জানিয়েছেন এবং কারো কথা তিনি তাঁকে জানাননি। এরশাদ করা হয়েছেঃ
وَرُسُلًا قَدْ قَصَصْنَاهُمْ عَلَيْكَ مِن قَبْلُ وَرُسُلًا لَّمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ ۚ
-“অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি যাদের কথা ইতোপূর্বে আপনাকে বলেছি এবং অনেক রাসূল প্রেরণ করা হয়েছে যাদের কথা আপনাকে বলিনি।” (সূরা ৪: নিসা, আয়াত ১৬৪। আরো দেখুন সূরা ৪০, গাফির/মুমিন, আয়াত ৭৮)।
আমাদের মধ্যে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ কথা যে, নবী রাসূলগণের সংখ্যা ১ লক্ষ ২৪ হাজার বা ২ লক্ষ ২৪ হাজার। এখানে লক্ষণীয় যে, নবী-রাসূলগণের সংখ্যার বিষয়ে একটি সহীহ হাদীসও বর্ণিত হয়নি। একাধিক যয়ীফ বা মাউযূ হাদীসে এ বিষয়ে কিছু কথা বর্ণিত হয়েছে। ২ লক্ষ ২৪ হাজারের স্পষ্ট বর্ণনা সম্বলিত কোনো সনদ সহ হাদীস আমি কোথাও দেখতে পাইনি। তবে ১ লক্ষ ২৪ হাজার বা অন্য কিছু সংখ্যা এ ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়েছে। সেগুলি নিম্নরূপঃ
ক. ১ লক্ষ ২৪ হাজারঃ একাধিক সনদে বর্ণিত হয়েছে- নবী রাসূলগণের সংখ্যা ১ লক্ষ ২৪ হাজার। কিন্তু সবগুলি সনদই অত্যন্ত দুর্বল। কোনো কোনো মুহাদ্দিস এই অর্থের হাদীসকে জাল বলে গণ্য করেছেন।
ইবনু হিব্বান প্রমুখ মুহাদ্দিস তাঁদের সনদে ইবরাহীন ইবনু হিশাম ইবনু ইয়াহইয়া আল গাশশানী(২৩৮ হি) নামক তৃতীয় হিজরী শতকের একজন রাবীর সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এই ইবরাহীম বলেন, আমাকে আমার পিতা, আমার দাদা থেকে, তিনি আবূ ইদরীস খাওলানী থেকে, তিনি আবূ যার গিফারী থেকে বলেছেনঃ “আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! নবীগণের সংখ্যা কত? তিনি বলেন, এক লক্ষ ২৪ হাজার।আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, এদের মধ্যে রাসূল কত জন? তিনি বলেন, তিন শত তের জন, অনেক বড় সংখ্যা।”(ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১/৭৬-৭৯)।
এই হাদীসের একমাত্র বর্ণনাকারী ইবরাহীম ইবনু হিশাম নামক রাবীর বিষয়ে মুহাদ্দিসগণের কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তাবারানী ও ইবনু হিব্বান তাকে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। অন্যান্য মুহাদ্দিস তাকে মিথ্যাবাদী রাবী বলে চিহ্নিত করেছেন। আবূ যুরআ বলেনঃ লোকটি কাযযাব বা অত্যধিক মিথ্যাবাদী। আবূ হাতিম রাযী তার নিকট হাদীস গ্রহণ করতে গমন করেন। তিনি তার নিকট হতে তার পান্ডুলিপি নিয়ে তার মৌখিক বর্ণনার সাথে মিলিয়ে অগণিত বৈপরীত্য ও অসামঞ্জস্য দেখতে পান। ফলে তিনি বলেনঃ বুঝা যাচ্ছে যে, লোকটি কখনো হাদীস শিক্ষার পিছনে সময় ব্যয় করেনি। লোকটি মিথ্যাবাদী বলে মনে হয়। যাহাবী তাকে মাতরূক বা পরিত্যক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ১/২০১; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ১/১২২)।
যেহেতু হাদীসটি একমাত্র ইবরাহীম ইবনু হিশাম ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেননি, সেহেতু ইবনুল জাউযী ও অন্যান্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীসটিকে জাল ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছেন।(ইবনু কাসীর, আত-তাফসীর ১/৫৮৬-৫৮৭)।
ইমাম আহমাদ এই অর্থে অন্য একটি হাদীস সংকলন করেছেন। এই হাদীসে মু’আন ইবনু রিফা’আহ নামক একজন রাবী বলেন, আমাকে আলী ইবনু ইয়াযীদ বলেছেন, কাসিম আবূ আব্দুর রাহমান থেকে, তিনি আবূ উমামা(রা) থেকে…নবীগণের সংখ্যা কত? তিনি বলেন, ১ লক্ষ ২৪ হাজার…….। (আহমাদ, আল মুসনাদ ৫/২৬৫)।
এই হাদীসের রাবী মু‘আন ইবনু রিফা‘আহ আস-সুলামী কিছুটা দুর্বল রাবী ছিলেন।(ইবনুল জাউযী, আদ-দু‘আফা ৩/১২৬; যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ৬/৪৫৫)। তার ওস্তাদ আলী ইবনু ইয়াযিদ আরো বেশি দুর্বল ছিলেন। ইমাম বুখারী তাকে মুনকার বা আপত্তিকর বলেছেন। ইমাম নাসাঈ, দারাকুতনী প্রমুখ মুহাদ্দিস তাকে পরিত্যক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। (নাসাঈ, আদ-দু‘আফা পৃ.৭৭)। তার ওস্তাদ কাসিম আবূ আব্দুর রাহমানও (১১২ হি) দুর্বল ছিলেন। এমনকি ইমাম আহমদ, ইবনু হিব্বান প্রমুখ মুহাদ্দিস বলেছেন যে, কাসিম সাহাবীগণের নামে এমন অনেক কথা বর্ণনা করেন যে, মনে হয় তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই এই ভুলগুলি বলছেন। তিনি দাবী করতেন যে, তিনি ৪০ জন বদরী সাহাবীকে দেখেছেন, অথচ তার জন্মই হয়েছে প্রথম শতকের মাঝামাঝি। (ইবনুল জাউযী, আদ দু‘আফা ৩/১৪)।
এ থেকে আমরা দেখতে পাই যে, এই হাদীসটিও অত্যন্ত দুর্বল। আরো দুই একটি এইরূপ অত্যন্ত দুর্বল সনদে এই সংখ্যাটি বর্ণিত হয়েছে। সামগ্রিক বিচারে এই সংখ্যাটি মাউযূ বা জাল না হলেও অত্যন্ত দুর্বল বলে গণ্য। মহান আল্লাহই ভাল জানেন।(ইবনু কাসীর, তাফসীর ১/৫৮৭-৫৮৮)।
খ. ৮ হাজার পয়গম্বর
আবূ ইয়ালা মাউসিলী মূসা ইবনু আবীদাহ আর রাবাযী থেকে, তিনি ইয়াযিদ ইবনু আবান আর-রাকাশী থেকে বর্ণনা করেছেন, আনাস ইবনু মালিক(রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেনঃ “মহান আল্লাহ ৮ হাজার নবী প্রেরণ করেছেন। ৪ হাজার বনী ইসরাঈলের মধ্যে এবং বাকী চার হাজার অবশিষ্ট মানব জাতির মধ্যে। (ইবনু কাসীর, তাফসীর ১/৫৮৮)।
এই হাদীসটিও দুর্বল। ইমাম ইবনু কাসীর বলেন, “এই সনদটিও দুর্বল। আর-রাবাযী দুর্বল। তার উস্তাদ রাকাশী তার চেয়েও দুর্বল।” ইবনু কাসীর বলেছেন যে, আরো একটি সনদে এই সংখ্যাটি বর্ণিত হয়েছে। সনদটি বাহ্যত মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। (ইবনু কাসীর, তাফসীর ১/৫৮৮)।
গ. এক হাজার বা তারও বেশি পয়গাম্বর
ইমাম আহমাদ প্রমুখ মুহাদ্দিস সংকলিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন, “আমি এক হাজার বা তারও বেশি নবীর শেষ নবী।” ইবনু কাসীর, হাইসামী প্রমুখ মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, সংখ্যার বর্ণনায় অন্যান্য হাদীসের চেয়ে এই হাদীস কিছুটা গ্রহণযোগ্য, যদিও এর সনদেও দুর্বলতা রয়েছে। (ইবনু কাসীর, তাফসীর ১/৫৮৮)।
৫. নবী-রাসূলগণের নাম
কুরআনে ২৫ জন নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছেঃ
আদম(২৫ বার তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। দেখুন সূরা বাকারাহ, আয়াত ৩১……), ইদরিস (২ বার, দেখুন সূরা মারিয়াম, আয়াত ৫৬……), নূহ(৪৩ বার, দেখুন সূরা আল-ইমরান, আয়াত৩৩….), হুদ(৮ বার, দেখুন সূরা বাকারাহ, আয়াত ১২৪……), সালিহ(৯ বার, দেখুন সূরা আল আরাফ, আয়াত ৭৩…..), ইবরাহীম(৬৯ বার, দেখুন সূরা বাকারাহ, আয়াত ১২৪…….), লূত(১৭ বার, দেখুন সূরা হুদ ৭০ আয়াত…), ইসমাঈল(১২ বার, দেখুন সূরা বাকারা ১২৫ আয়াত……), ইসহাক(১৭ বার, দেখুন সূরা বাকারা ১৩৩ আয়াত….), ইয়াকূব(১৬ বার, সূরা বাকারা ১৩২ আয়াত…….), ইউসূফ(২৭ বার সূরা আনয়াত ৮৪ আয়াত…….), আইয়ূব(৪ বার, সূরা নিসা ১৬৩ আয়াত……), শুয়াইব(১১ বার, দেখুন সূরা আল আরাফ ৮৫ আয়াত…..), মূসা(১৩৬ বার, দেখুন সূরা বাকারা ৫১ আয়াত…..), হারূন(২০ বার, দেখুন সূরা বাকারা ২৪৮ আয়াত…..), ইউনূস(৪ বার, দেখুন সূরা নিসা ১৬৩ আয়াত…..), দাউদ(১৬ বার, দেখুন সূরা বাকারা ২৫১ আয়াত…….), সুলাইমান(১৭ বার, সূরা বাকারা ১০২ আয়াত…….), ইলইয়াস(৩ বার, সূরা আনআম ৮৫ আয়াত……), ইলইয়াসা(২ বা)র, সূরা আনআম ৮৬ ও সূরা সাদ ৪৮ আয়াত), যুলকিফল(২ বার, সূরা আম্বিয়া ৮৫ ও সূরা সাদ ৪৮ আয়াত), যাকারিয়া(৭ বার, দেখুন সূরা আল ইমরান ৩৭ আয়াত……), ইয়াহইয়া(৫ বার, দেখুন সূরা আল ইমরান ৩৯ আয়াত…..), ঈসা(২৫ বার, দেখুন সূরা বাকারা ৮৭ আয়াত….), মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)[৪ বার তাঁর নাম উল্লেখিত হয়েছে। সূরা আল ইমরান ১৪৪, সূরা আহযাব ৪০, সূরা মুহাম্মাদ ২ ও সূরা আল ফাতহ ২৯ আয়াত। আল্লাহ কুরআনে সকল নবী রাসূলের ক্ষেত্রে তাঁদের নাম ধরে সম্বোধন করেছেন এবং তাঁদের ঘটনা বর্ণনার সময় তাঁদের নাম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মুহাম্মাদ(সা) এর ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। তাঁকে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে কুরআন মাজীদে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘হে নবী’, ‘হে রাসূল’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আর তাঁর সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে তাঁর সম্মানিত উপাধি নবী, রাসূল বা আবদ বলা হয়েছে। এজন্য কুরআনে শুধুমাত্র ৪ টি স্থান ছাড়া কোথাও তাঁর নাম উল্লেখিত হয়নি।] (ইবনু কাসীর, তাফসীর ১/৫৮৬; কুরতুবী, তাফসীর ৩/৩১)।
কুরআন কারীমে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উযাইরকে ইহুদীগণ আল্লাহর পুত্র বলে দাবি করত।(সূরা ৯ তাওবা, আয়াত ৩০)। কিন্তু তাঁর নবুয়্যত সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। আবূ হুরাইরা(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন, “আমি জানিনা যে, উযাইর নবী ছিলেন কিনা।”(আবূ দাউদ, আস সুনান ৪/২১৮; আযীম আবাদী, আউনুল মা’বুদ ১২/২৮০।)
মূসার খাদেম হিসেবে ইউশা ইবনু নূন এর নাম হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ(সা) হতে বর্ণিত কোনো সহীহ হাদীসে অন্য কোনো নবীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। কোনো কোনো অত্যন্ত যয়ীফ বা জাল হাদীসে আদমের পূত্র শীষ(আ) এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কালুত, হাযকীল, হাযালা, শামূয়েল, জারজীস, শামঊন, ইরমিয়, দানিয়েল প্রমুখ নবীগণের নাম, জীবনবৃত্তান্ত ইত্যাদি বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই মূলত ইসরাঈলীয় বর্ণনা ও সেগুলির ভিত্তিতে মুফাসসির ও ঐতিহাসিকদের মতামত।
৬. আসমানী সহীফার সংখ্যা
মহান আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বারংবার এরশাদ করেছেন যে, তিনি নবী ও রাসূলগণকে গ্রন্থাদি প্রদান করেছেন। কিন্তু এ সকল কিতাব ও সহীফার কোনো সংখ্যা কুরআন কারীমের বা কোনো সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়নি। ‘১০৪’ কিতাব ও সহীফার কথাটি আমাদের দেশে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। কোনো নির্ভরযোগ্য হাদীসে কথাটি পাওয়া যায়না। উপরে ১ লক্ষ ২৪ হাজার পয়গম্বর বিষয়ক যে হাদীসটি আবূ যার(রা) হতে বর্ণিত হয়েছে, সেই হাদীসের মধ্যে এই ১০৪ সহীফা ও কিতাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা দেখেছি যে, এই হাদীসটি জাল অথবা অত্যন্ত দুর্বল।
৭. নবী রাসূলগণের বয়স বিষয়ক বর্ণনা
কুরআন কারীমে নূহ(আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি ৯৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন। এছাড়া অন্য কোনো নবীর আয়ুষ্কাল কুরআন কারীমে বর্ণনা করা হয়নি। আদম(আ) এর আয়ুষ্কাল এক হাজার বৎসর বলে একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ক আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়না। নবীগণের আয়ুষ্কাল বিষয়ক যা কিছু প্রচলিত বই পুস্তকে লিখিত রয়েছে সবই ইহুদী খৃস্টানগণের বিকৃত গ্রন্থাবলি হতে গৃহীত।
৮. নবী-রাসূলগণের জীবন বৃত্তান্ত
উল্লেখিত নবী রাসূলগণের জীবনবৃত্তান্ত কুরআন কারীমে বা হাদীস শরীফে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি। ইলইয়াস, ইলইয়াসা ও যুলকিফল(আ) সম্পর্কে শুধুমাত্র নাম উল্লেখ ছাড়া কিছুই বলা হয়নি। ইদরিস(আ) এর বিষয়টিও প্রায় অনুরূপ। অন্যান্য নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রে তাঁদের জীবনের শিক্ষণীয় কিছু দিক শুধু আলোচনা করা হয়েছে। তাঁদের বিস্তারিত জীবন বৃত্তান্ত সম্পর্কে যা কিছু বলা হয় তা অধিকাংশই ইসরাঈলীয় রেওয়ায়াত ও জনশ্রুতি। আমাদের দেশের প্রচলিত ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ ও বিভিন্ন নবীর জীবনী বিষয়ক পুস্তকাদিতে যা কিছু লেখা হয়েছে তার অধিকাংশই এ সকল জাল, ভিত্তিহীন ও ইসরাঈলীয় রেওয়ায়াত এর সমষ্টি। এই গ্রন্থের সীমিত পরিসরে এ সকল দিক বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। এছাড়া সকল বিষয় বিস্তারিত আলোচনার যোগ্যতাও আমার নেই। এখানে সংক্ষেপে কিছু বিষয়ের উল্লেখ করছি।
৯. আদম(আ) ও হাওয়া(আ)
৯.১. গন্দম ফল
আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত কথা যে, আদম(আ)গন্দম গাছের ফল খেয়েছিলেন। কথাটি একেবারেই ভিত্তিহীন ও কুরআন হাদীসে কোথাও তা নেই। আদম ও হাওয়া(আ) কে আল্লাহ তাআলা একটি বিশেষ বৃক্ষের নিকট গমন করতে নিষেধ করেন। পরবর্তীতে তাঁরা শয়তানের প্ররোচণায় এই বৃক্ষ হতে ভক্ষণ করেন। কুরআন ও হাদীসে বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়টি বলা হয়েছে। কিন্তু বৃক্ষ বা ফলের নাম কোথাও বর্ণিত হয়নি। পরবর্তীযুগে মুফাসসিরগণ বিভিন্ন গাছের নাম বলেছেন। ইহুদীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, আদম(আ) গন্দম, অর্থাৎ গম গাছের ফল ভক্ষণ করেন! কেউ বলেছেন আঙ্গুর, কেউ বলেছেন খেজুর….ইত্যাদি। এগুলি সবই আন্দায কথা। হাদীসে এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। মুমিনের দায়িত্ব হলো, এই ঘটনা হতে শিক্ষা গ্রহণ করা, গাছের বা ফলের নাম জানা নয়। সর্বাবস্থায় এ সকল মানবীয় মতামতকে আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের(সা) কথা বলে মনে করা যাবেনা।(ইবনু কাসীর, কাসাসুল আম্বিয়া ১/১৯)।
এই গন্দম ফল নিয়ে আরো অনেক বানোয়াট কথা আমাদের দেশে প্রচলিত কাসাসূল আম্বিয়া ও এই জাতীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়।আদমের মনে কূটতর্ক জন্মে, জিবরাঈল(আ) তা বের করে পুঁতে রাখেন, সেখান থেকে গন্দম গাছ হয়…….ইত্যাদি…..। সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা।
৯.২. আদম(আ) ও হাওয়া(আ) এর বিবাহ ও মোহরানা
কুরআনের বাহ্যিক বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, আদম(আ) এর জান্নাতে প্রবেশের পূর্বেই হাওয়া(আ) কে সৃষ্টি করা হয় এবং উভয়কে একত্রে জান্নাতে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সাহাবীগণের যুগ থেকে কোনো কোনো মুফাসসির বলেছেন যে, আদম জান্নাতে অবস্থানের কিছুদিন পরে হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়। কুরআনে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আদম হতে হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে এই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কুরআন কারীম বা হাদীস শরীফে দেওয়া হয়নি। মুফাসসিরগণ বিভিন্ন কথা বলেছেন। প্রচলিত আছে যে, আদম ও হাওয়ার মধ্যে বিবাহের মোহরানা ছিল দুরুদ শরীফ পাঠ……ইত্যাদি। এ সকল কথার কোনো সনদ বা ভিত্তি আছে বলে জানা যায়না।
৯.৩. ইবলীস কর্তৃক ময়ূর ও সাপের সাহায্য গ্রহণ
ইবলিস সাপ ও ময়ূরের সাহায্যে আদম ও হাওয়া(আ) কে প্ররোচনা প্রদানের চেষ্টা করে বলে অনেক কথা প্রচলিত রয়েছে। এগুলি ইহুদী খৃস্টানদের হতে গ্রহণ করা হয়েছে বলে গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন।(মুহাম্মাদ আবূ শাহবাহ, আল-ইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউদূ‘আত, পৃ. ১৭৮-১৮০)।
৯.৪. পৃথিবীতে অবতরণের পরে
পৃথিবীতে অবতরণের পরে আদম ও হাওয়া(আ) সম্পর্কে কুরআন কারীমে কোনো কিছু বলা হয়নি। সহীহ হাদীসেও এ বিষয়ক বিশেষ কিছু পাওয়া যায়না। তাঁরা কোথায় অবতরণ করেছিলেন, কোথায় বসবাস করেছিলেন, কি কর্ম করতেন, কোন ভাষায় কথা বলতেন, কিভাবে ইবাদত বন্দেগী করতেন, সংসার ও সমাজ জীবন কিভাবে যাপন করতেন ইত্যাদি বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়না। এ সকল বিষয়ে যা কিছু প্রচলিত প্রায় সবই মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণের মতামত বা বিভিন্ন গল্পকারদের গল্প। দুই একটি দুর্বল সনদের হাদীসও এ সকল বিষয়ে বর্ণিত আছে। আল্লাহই ভাল জানেন।
৯.৫. আদম(আ) কর্তৃক কাবা ঘর নির্মাণ
আদম(আ) পবিত্র কাবা ঘর নির্মাণ করেছিলেন বলে প্রচলিত আছে। মূলত বিভিন্ন ঐতিহাসিক, মুফাসসির বা আলিমের কথা এগুলি। এ বিষয়ক হাদীসগুলি দুর্বল সনদে বর্ণিত। কোনো কোনো মুহাদ্দিস এ বিষয়ক সকল বর্ণনাই অত্যন্ত যয়ীফ ও বাতিল বলে গণ্য করেছেন। আল্লামা ইবনু কাসীর বাইতুল্লাহ বিষয়ক আয়াতগুলি উল্লেখ করে বলেন, এ সকল আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্য বিশ্বের সকল মানুষের জন্য নির্মিত সর্বপ্রথম বরকতময় ঘর ‘বাইতুল্লাহ’ কে ইবরাহীম(আ) নির্মাণ করেন। এই স্থানটি সৃষ্টির শুরু হতেই মহা সম্মানিত ছিল। আল্লাহ সেই স্থান ওহীর মাধ্যমে তাঁর খলীলকে দেখিয়ে দেন। তিনি আরো বলেন, “রাসূলুল্লাহ(সা) হতে একটি সহীহ হাদীসও বর্ণিত হয়নি যে, ইবরাহীম(আ) এর পূর্বে কাবাঘর নির্মাণ করা হয়েছিল….এ বিষয়ক সকল বর্ণনা ইসরায়েলী রেওয়ায়াত। আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, এগুলিকে সত্যও মনে করা যাবেনা, মিথ্যাও মনে করা যাবেনা। (তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/১৭৩-১৭৪)।
১০. নূহ(আ) এর নৌকায় মলত্যাগ করা ও পরিষ্কার করা
এ বিষয়ে অনেক মুখরোচক গল্প প্রচলিত রয়েছে। এগুলির কোনো ভিত্তি কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীসে আছে বলে জানতে পারিনি। বাহ্যত এগুলি বানোয়াট গল্প যা গল্পকাররা বানিয়েছে। নূহ(আ) এর নৌকার বিবরণ, কোন্ কাঠে তৈরি, তাতে কোন্ প্রাণী কোথায় ছিল, শয়তান কিভাবে প্রবেশ করল ইত্যাদি বিষয়েও অগণিত বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কাহিনী প্রচলিত। এ সকল বিষয়ে সহীহ হাদীসে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
১১. ইদরীস(আ) এর শশরীরে আসমানে গমন
কুরআন কারীমে দুই স্থানে ইদরীস(আ)এর উল্লেখ রয়েছে। একস্থানে এরশাদ করা হয়েছেঃ “ এবং ইসমাঈল, এবং ইদরীস এবং যুলকিফল সকলেই ধৈর্য্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত।(সূরা ২১ আম্বিয়াঃ আয়াত ৮৫)। অন্যত্র এরশাদ করা হয়েছেঃ আরবী(*****)
-“এবং আপনি স্মরণ করুন এই কিতাবের মধ্যে ইদরীসের কথা, সে ছিল সত্যনিষ্ঠ, নবী এবং আমি তাকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চস্থানে(মর্যাদায়)।”(সূরা ১৯ঃ মারইয়াম, ৫৬-৫৭ আয়াত)।
হাদীস শরীফেও ইদরীস(আ) সম্পর্কে তেমন কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি। তাঁর জন্ম, বংশপরিচয়, কর্মস্থল, ইত্যাদি সম্পর্কে যা কিছু বলা হয় সবই ইসরাঈলীয় বর্ণনা বা গল্পকারদের বানোয়াট কাহিনী। বিশেষ করে আমাদের সমাজে প্রসিদ্ধ আছে যে, চারজন নবী চিরজীবিঃ খিযির ও ইলিয়াস(আ) পৃথিবীতে এবং ইদরীস ও ঈসা(আ) আসমানে। প্রচলিত আছে যে, ইদরীস(আ) কে জীবিত অবস্থায় সশরীরে ৪র্থ বা ৬ষ্ঠ আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি সেখানে জীবিত আছেন। অথবা সেখানে তাঁর মৃত্যু হয় এবং এরপর আবার জীবিত হন…….। এ সকল কথা সবই ভিত্তিহীন ইসরায়েলীয় রেওয়ায়াত। ঈসা(আ) ছাড়া অন্য কোনো নবীর জীবিত থাকা, জীবিত অবস্থায় আসমানে গমন ইত্যাদি কোনো কথা রাসূলুল্লাহ(সা) হতে কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীসেও বর্ণিত হয়নি।
আল্লাহ তাঁকে উচ্চস্থানে উন্নীত করেছেন অর্থ তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। যে মর্যাদার একটি বিশেষ দিক হলো আল্লাহ তাঁকে ইন্তেকালের পরে অন্য কয়েকজন মহান নবী রাসূলের সাথে রূহানীভাবে আসমানে স্থান দান করেছেন। সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মি’রাজের রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ(সা) আসমানে ৮ জন নবীর সাথে সাক্ষাত করেন। ১ম আসমানে আদম, ২য় আসমানে ইয়াহইয়া, ৩য় আসমানে ইউসূফ, ৪র্থ আসমানে ইদরীস, পঞ্চম আসমানে হারূন, ৬ষ্ঠ আসমানে মূসা, ৭ম আসমানে ইবরাহীম(আ) এর সাথে সাক্ষাত হয়।(বুখারী, আস-সহীহ ১/১৩৬, ৩/১১৭৩,১২১৬-১২১৭,১৪১০-১৪১১; মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৪৮-১৫০)। শুধু ঈসা(আ) ব্যতীত অন্য সকল নবীকে এই মর্যাদা প্রদান করা হয়েছিল স্বাভাবিক মৃত্যুর পরে।(ইবনু কাসীর, কাসাসুল আম্বিয়া ১/৬১-৬২; দরবেশ হুত, আসনাল মাতালিব , পৃ. ২৫)।
১২. হুদ(আ) ও শাদ্দাদের বেহেশত
শাদ্দাদের জন্মকাহিনী, জীবনকাহিনী, শাদ্দাদের বেহেশতের লাগামহীন বিবরণ, বেহেশতে প্রবেশের পূর্বে তাঁর মৃত্যু ইত্যাদি যা কিছু কাহিনী বলা হয় সবই বানোয়াট, ভিত্তিহীন কথা। কিছু ইহুদীদের বর্ণনা ও কিছু জালিয়াতগণের কাল্পনিক গল্প কাহিনী। এ বিষয়ক কোনো কিছুই রাসূলুল্লাহ(সা) থেকে কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীসে বর্ণিত হয়নি।
অনেকে আবার এই মিথ্যাকে আল্লাহর নামেও চালিয়েছেন। এক লেখক লিখেছেন, “সে বেহেশতের কথা স্বয়ং আল্লাহ তাআলাও কোরআন পাকে উল্লেখ করেছেন যে, হে মুহাম্মাদ! শাদ্দাদ পৃথিবীতে এমন বেহেশত নির্মাণ করেছিল, দুনিয়ার কোনো মানুষ কোনোদিনই ঐরূপ প্রাসাদ বানাতে পারেনাই…।”(মাও. মো. আশরাফুজ্জামান, ছহী কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২৩৫; এম.এন.এম. ইমদাদুল্লাহ, আদি ও আসল কাছাছুল আম্বিয়া ১/৯৮)।
কি জঘন্য মিথ্যা কথা! আল্লাহর কালামের কি জঘন্য বিকৃতি!! এখানে কুরআন কারীমের সূরা ফাজরের ৬-৭ আয়াতের অর্থকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। মূলত অনেক মুফাসসির এ আয়াতের তাফসীরে সনদবিহীনভাবে এ সকল বানোয়াট ও মিথ্যা কাহিনী উদ্ধৃত করেছেন। আবার ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ গ্রন্থে সনদবিহীনভাবে এগুলি উল্লেখ করা হয়েছে। সবই মিথ্যা কথা।
এ বিষয়ে ইমাম ইবনু কাসীর বলেনঃ “অনেক মুফাসসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইরাম শহর সম্পর্কে এ সকল কথা বলেছেন। এদের কথায় পাঠক ধোঁকাগ্রস্থ হবেননা। ….এ সকল কথা সবই ইসরায়েলীয়দের কুসংস্কার ও তাদের কোনো কোনো যিনদীকের বানোয়াট কল্প কাহিনী। এগুলি দিয়ে তারা মূর্খ সাধারণ জনগণের বুদ্ধি যাচাই করে, যারা যা শোনে তাই বিশ্বাস করে।”(ইবনু কাসীর, তাফসীর ৪/৫০৯)।
১৩. ইবরাহীম(আ)
১৩.১. ইবরাহীম(আ) এর পিতা যেখানে আল্লাহ কুরআনকে তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জিল এর বিশুদ্ধতা বিচারের মানদন্ড বলে ঘোষণা করেছেন, সেখানে কোনো কোনো তাফসীরকারক বা আলেম বাইবেল এর বর্ণনাকে বিশুদ্ধতার মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করে তার ভিত্তিতে কুরআনের বর্ণনাকে ব্যাখ্যা করেন। এর একটি জঘন্য উদাহরণ হলো ইবরাহীম(আ)এর পিতার নাম। মহান আল্লাহ বলেনঃ (*******)
-“এবং যখন ইবরাহীম তাঁর পিতা আযরকে বললেন।”(সূরা আনআমঃ আয়াত ৭৪)।
এখানে সুস্পষ্টভাবে ইবরাহীম এর পিতার নাম আযর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাইবেলে বলা হয়েছে যে, ইবরাহীম(আ) এর পিতার নাম ছিল ‘তেরহ’।(বাইবেল, আদি পুস্তক ১১/২৪-৩২)। কুরআন কারীমে সাধারণত নব্যূয়ত, দাওয়াত ও মু’জিযা বিষয়ক তথ্য ছাড়া নবীগণের পিতা, মাতা, জন্মস্থান, জীবনকাল ইত্যাদি বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য আলোচনা করা হয়না। কখনো কখনো ইহুদীদের মিথ্যাচারের প্রতিবাদের জন্য কিছু তথ্য প্রদান করা হয়। যেমন ইহুদীরা তাদের বাইবেল বিকৃত করে লিখেছে যে, আল্লাহ ৬ দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং ৭ম দিনে বিশ্রাম করেন। কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছে যে, মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতে আল্লাহর কোন শ্রম হয়নি বা বিশ্রামের প্রয়োজন হয়নি।
এখানে ইবরাহীমের পিতার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ সম্ভবত ইব্রাহীমের পিতার নামের ক্ষেত্রে ইহুদীদের ভুলটি তুলে ধরা। সর্বাবস্থায় মুমিনের জন্য কুরআন হাদীসের বর্ণনার পরে আর কোনো বর্ণনার প্রয়োজন হয়না। এ জন্য অধিকাংশ প্রাজ্ঞ মুফাসসির বলেছেন যে, ইবরাহীম(আ) এর পিতার নাম ‘আযর’ ছিল। কুরআনের এই তথ্যই চূড়ান্ত। ইহুদী-খৃস্টানদের তথ্যের দিকে দৃষ্টি দেয়ার কোনোই প্র্রয়োজন মুসলিম উম্মাহর নেই। বাইবেলের বর্ণনায় প্রভাবিত হয়ে কোনো কোন মুফাসসির সমন্বয় করতে চেয়েছেন। কেউ বলেছেন যে, ‘আযর’ ও ‘তেরেহ’ দুইটিই ইবরাহীম(আ) এর পিতার নাম ছিল। যেমন ইয়াকূব(আ) এর আরেকটি নাম ছিল ইস্রাঈল। কেউ বলেছেন, একটি ছিল তাঁর উপাধি, অপরটি নাম। অনুরূপ আরো কিছু মতামত আছে। এ সকল ব্যাখ্যায় কুরআনের বর্ণনাকে বিকৃত করা হয়নি। সকলেই একমত যে, এখানে ‘তাহার পিতা’ বলতে ইব্রাহীমের জন্মদাতা পিতাকে বুঝানো হয়েছে এবং ‘আযর’ তারই নাম অথবা উপাধি……।(ইবনু কাসীর, তাফসীর ২/১৫০-১৫১, তাবারী, তাফসীর ৭/২৪২-২৪৯)।
তবে সবচেয়ে জঘন্য ও মিথ্যা একটি মত প্রচলিত আছে যে, বাইবেলের বর্ণনাই ঠিক। ইবরাহীমের পিতার নাম তেরহ ছিল, তার নাম কখনোই আযর ছিলনা। তারা কুরআনের বর্ণনাকে সরাসরি মিথ্যা না বলে এর একটি উদ্ভট ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন যে, ইবরাহীমের এক চাচার নাম ছিল আযর। কুরআনে চাচাকেই পিতা বলা হয়েছে। এভাবে তারা বাইবেলের বর্ণনাকে বিশুদ্ধতার মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করে কুরআনে কারীমের স্পষ্ট অর্থকে বিকৃত করেছেন।
পিতা অর্থ চাচা বলা মূলত কুরআনের অর্থ বিকৃতি করা এবং কোনো প্রকার প্রয়োজনীয়তা ছাড়া স্পষ্ট অর্থকে অস্বীকার করা। কোনো কোনো ব্যতিক্রম স্থানে চাচাকে পিতা বলার দূরবর্তী সম্ভাবনা থাকলেও আমাদেরকে দুটি বিষয় মনে রাখতে হবেঃ প্রথমত, নিজের জন্মদাতা পিতা ছাড়া কাউকে নিজের পিতা বলা বা নিজেকে তার সন্তান বলে দাবি করা হাদীস শরীফে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কুরআনের স্পষ্ট অর্থ অন্যান্য আয়াত বা হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া রূপক বা ঘোরালো ভাবে ব্যাখ্যা করা বিকৃতির নামান্তর। সহীহ বুখারীতে সংকলিত হাদীস থেকেও আমরা জানতে পারি যে, আযরই ইবরাহীমের জন্মদাতা পিতা এবং এই আযরকেই ইবরাহীম হাশরের ময়দান ভৎসর্ণা করবেন এবং একটি জন্তুর আকৃতিতে তাকে জাহান্নামে ফেলা হবে। (বুখারী, আস-সহীহ ৩/১২২৩; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৮/৫০০)।
এই বিকৃতি ও অপব্যাখ্যা সমর্থন করার জন্য কেউ কেউ দাবি করেন যে, ইবরাহীমের জন্মদাতা পিতা কাফির ছিলেননা; কারণ আদম(আ) হতে রাসূলুল্লাহ(সা) পর্য্ন্ত তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ কাফির মুশরিক ছিলেননা। এই কথাটি ভিত্তিহীন এবং কুরআন কারীম, সহীহ হাদীস ও ঐতিহাসিক তথ্যাদির সুস্পষ্ট বিপরীত। কুরআন কারীম এবং সহীহ হাদীসে বারংবার ইবরাহীমের পিতাকে কাফির বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ(সা) এর দাদা আবদুল মুত্তালিব কুফরী ধর্মের উপর ছিলেন বলে বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ(সা) তাঁর চাচা আবূ তালিবকে মৃত্যুর সময়ে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলে তিনি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করে বলেন-আমি আব্দুল মুত্তালিব এর ধর্মের উপরই থাকব।(বুখারী, আস-সহীহ ১/৪৫৭, মুসলিম, আস-সহীহ ১/৫৪)। স্বভাবতই আমর ইবনু লুহাই এর যুগ হতে আব্দুল মুত্তালিব এর যুগ পর্য্যন্ত পূর্বপুরুষগণও শিরকের মধ্যে লিপ্ত ছিলেন, যদিও তাঁরা সততা, নৈতিকতা, জনসেবা ইত্যাদির জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন।(ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ আন নববিয়্যাহ ১/৯৩-৯৪)। রাসূলুল্লাহ(সা) এর পূর্বপুরুষগণ সকলেই অনৈতিকতা, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা মুক্ত ছিলেন।(তাবারী, আত তাফসীর ১১/৭৬, ইবনু কাসীর, তাফসীর ২/৪০৪)।
১৩.২. ইবরাহীম(আ) এর তাওয়াক্কুল
ইবরাহীম(আ) এর নামে বানোয়াট একটি গল্প আমাদের মধ্যে প্রচলিত। এই ঘটনায় বলা হয়েছে, তাঁকে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয় তখন জিবরাঈল(আ) এসে তাঁকে বলেনঃ আপনার কোনো প্রয়োজন থাকলে আমাকে বলুন। তিনি বলেনঃ আপনার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। জিবরাঈল(আ) বলেন, তাহলে আপনার প্রভুর কাছে আপনি প্রার্থনা করুন। তখন তিনি বলেনঃ “তিনি আমার অবস্থা জানেন, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। অতএব আমার আর কোনো প্রার্থনার প্রয়োজন নেই।”
এই কাহিনীটি ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা। ইহুদীদের মধ্যে প্রচলিত কাহিনী, সনদহীনভাবে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে। মুহাদ্দিসগণ একে জাল বলে গণ্য করেছেন। কুরআন কারীমে হযরত ইবরাহীম(আ) এর অনেক দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কখনো কোনো প্রয়োজনে দোয়া করেননি এরূপ কোনো ঘটনা কুরআন বা হাদীসে বর্ণিত হয়নি।(ইবনু ইরাক, তানযীহুশ শারীয়াহ ১/২৫০, আজলূনী, কাশফুল খাফা ১/১৩৬)।
‘তাওয়াক্কুল’ এর নামে দোয়া পরিত্যাগ করা কুরআন ও হাদীস শিক্ষার বিপরীত। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সকল বিষয় আল্লাহর কাছে চাইতে হাদীস শরীফে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সকল বিষয় বিস্তারিত জানতে পড়ুন ‘রাহে বেলায়েত’ বইটি।
১৩.৩. পুত্রের গলায় ছুরি চালানো
কুরআন কারীমে সূরা ‘সাফফাত’ এ মহিমাময় আল্লাহ ইবরাহীম(আ) কর্তৃক পুত্রকে কুরবানী করতে উদ্যত হওয়ার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। এরশাদ করা হয়েছেঃ“(ইবরাহীম বলল)হে আমার প্রতিপালক, আমাকে এক সৎকর্ম পরায়ণ সন্তান দান কর। অতঃপর আমি তাকে এক স্থির বুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন তাঁর পিতার সঙ্গে কাজ করবার মত বয়সে উপনীত হল তখন ইবরাহীম বলল, বৎস আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবাই করছি, এখন তোমার অভিমত কি বল? সে বলল, হে আমার পিতা, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীল পাবেন। যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তার পুত্রকে কাত করে শায়িত করল, তখন আমি তাকে আহবান করে বললাম, হে ইবরাহীম, তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যিই পালন করলে। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করে থাকি।(সূরা ৩৭: সাফফাত, ১০০-১০৫ আয়াত)।
এখানে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক মিথ্যা ও কুরআন হাদীসের বিপরীত কথা আমাদের সমাজে হাদীস ও তাফসীর হিসেবে প্রচলিত। কয়েকটি বিষয়ের দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
প্রথমত, কুরআন কারীমে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইবরাহীম তাঁর পুত্রকে যবাই করতে স্বপ্নে দেখেছিলেন। আমাদের দেশে প্রচলিত আছে যে, ইবরাহীম স্বপ্নে দেখেন যে, ‘তোমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কুরবানী কর।’ এই কথাটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীসে এই প্রকারের কোনো বিবরণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়না।
দ্বিতীয়ত, কুরআন কারীমে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইবরাহীম তাঁর পুত্রকে জানান যে, তিনি তাকে জবাই করার স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু আমাদের মধ্যে প্রচলিত আছে যে, ইবরাহীম তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকে দাওয়াত খাওয়া…..ইত্যাদি মিথ্যা কথা বলে ঘর হতে বের করে নিয়ে যান।…..সর্বশেষ তিনি পুত্রকে সত্য কথা জানান। এ সকল কথা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে রাসূলুল্লাহ(সা) কর্তৃক বর্ণিত হয়নি। এ ছাড়া এই কথাগুলি নবীগণের মর্যাদার খেলাফ। আল্লাহর খলীল তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকে কেন মিথ্যা কথা বলবেন?
তৃতীয়ত, প্রচলিত আছে যে, ইবরাহীম(আ) পুত্র ইসমাঈলকে দড়ি দিয়ে ভাল করে বাঁধেন। এরপর শুইয়ে তাঁর গলায় বারংবার ছুরি চালান………। এগুলি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা। কুরআনে তো স্পষ্ট করেই বলা হচ্ছে যে, জবাই করার প্রস্তুতি নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহর পক্ষ হতে আহবান এসে যায়। কোনো ছুরি চালানোর ঘটনা ঘটেনি। হাদীস শরীফেও বর্ণিত হয়েছে যে, জবাইয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়েই আল্লাহর পক্ষ হতে বিকল্প জানোয়ার প্রদান করা হয়।(ইবনু কাসীর, তাফসীর ৪/১৬)।
এ বিষয়ে ত্রয়োদশ হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ সিরীয় মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়িদ দরবেশ হুত(১২৭৬ হি) বলেন, হযরত ইবরাহীম(আ) এর বিষয়ে যে গল্প প্রচলিত আছে যে, তিনি তাঁর পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন, কিন্তু কাটেনি……এই গল্পটি জাল, মিথ্যা এবং যিন্দীকদের বানানো…।(দরবেশ হুত, আসনাল মাতালিব, পৃ. ২৮৩-২৮৪)।
১৪. আইউব (আ) এর বালা মুসীবত
কুরআনে বলা হয়েছে যে, আইঊব(আ) বিপদগ্রস্ত হয়ে সবর করেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন এবং তাকে বিপদাপদ থেকে উদ্ধার করেন। তাঁকে তাঁর সম্পদ ও সন্তান ফিরিয়ে দেন।(সূরা আম্বিয়া, ৮৩-৮৪ আয়াত;সূলা সাদ, ৪১-৪৪ আয়াত)।
আইঊব(আ) এর বালা মুসিবত বা বিপদাপদের ধরণ, প্রকৃতি, বিবরণ, সময়কাল, তাঁর স্ত্রীর নাম, আত্মীয় স্বজনের নাম ইত্যাদি সম্পর্কিত কোনো বর্ণনা কুরআন কারীম বা সহীহ হাদীসে নেই। এ বিষয়ক যা কিছু বলা হয় সবই মূলত ইসরায়েলীয় রেওয়ায়াত। অধিকাংশ বিবরণের মধ্যে লাগামহীন কাল্পনিক বর্ণনা রয়েছে। বিভিন্ন মুফাসসির এ বিষয়ে বিভিন্ন কথা বলেছেন। বিশেষত, ওয়াহব ইবনু মুনাব্বিহ, কা’ব আল-আহবার প্রমুখ তাবিয়ী আলিম, যারা ইহুদী ধর্ম হতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ ও তাঁদের মধ্যে প্রচলিত কাহিনী সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন তাঁরাই এ সকল গল্প ‘গল্প’ হিসেবে বলেছেন।(ইবনু কাসীর, কাসাসুল আম্বিয়া ১/২৩০-২৩৬; আবূ শুহবাহ, আল ইসরাইলিয়্যাত, পৃ. ২৭৫-২৮২)।
এগুলিকে গল্প হিসেবে বলা যেতে পারে। কিন্তু কখনোই সত্য মনে করা যাবেনা। বিশেষত এ সকল গল্পে আইয়ূব(আ) এর রোগব্যাধির এমন কাল্পনিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে যা একজন নবীর মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোনো সহীহ হাদীসে বর্ণিত হলে আমরা তা গ্রহণ করতাম ও ব্যাখ্যা করতাম। কিন্তু যেহেতু সহীহ হাদীসে এ বিষয়ে কিছুই বর্ণিত হয়নি এবং এগুলি ইসরায়েলী বর্ণনা ও রেওয়ায়াতদের গল্প, সেহেতু এগুলি পরিত্যাজ্য। এ বিষয়ে দরবেশ হুত(১২৭৬ হি) বলেন, “আইঊব(আ) এর গল্পে বলা হয় যে, আল্লাহ তাঁর উপরে ইবলীসকে ক্ষমতাবান করে দেন। তখন ইবলীস তাঁর দেহের মধ্যে ফুঁক দেয়। এতে তাঁর দেহ কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়। এমনকি তার শরীরের মাংস পচে যায় এবং পোকা পড়তে থাকে……ইত্যাদি। এগুলি গল্পকাররা বলেন এবং কোনো কোনো মুফাসসির উল্লেখ করেছেন।…..এ সকল কথা সবই নির্ভেজাল জাল, মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। যেই এ কথা বলুন বা উদ্ধৃত করুননা কেন, তাঁর মর্যাদা যতই বেশি হোকনা কেন, তাতে কিছু যায় আসেনা। এ সকল কথা আল্লাহর কিতাবে বলা হয়নি এবং তাঁর রাসূলের(সা) কোনো হাদীসেও বর্ণিত হয়নি। এমনকি কোনো যয়ীফ বা বাতিল সনদের হাদীসেও তা বর্ণিত হয়নি। এ সবই সনদবিহীন বর্ণনা….।”(দরবেশ হুত, আসনাল মাতাবিল, পৃ. ২৮৪)।
১৫. দায়ূদ (আ) এর প্রেম
নবী দায়ূদ(আ) এর সম্পর্কে একটি অত্যন্ত নোংরা গল্প বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থ ও পরবর্তী যুগের দুই একটি হাদীস গ্রন্থে পাওয়া যায়। গল্পটি মূলত ইহুদীদের বাইবেল থেকে ও তাবিয়ীগণের যুগে বিদ্যমান ইহুদী আলেমদের মুখ থেকে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো কোনো গ্রন্থে এই ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামেও প্রচার করা হয়েছে।
ইহুদীদের নোংরামির একটি অন্যতম দিক হলো তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত ও যাবূর এর মধ্যে তাদেরই নবী-রাসূলগণের নামে ভাষায় প্রকাশের অযোগ্য অশ্লীল গল্প কাহিনী লিখে রেখেছে। এ সকল গল্প রামায়ণ মহাভারতের দেবদেবীর পাপাচারের কাহিনীকেও হার মানায়। সেগুলির মধ্যে একটি হলো দায়ূদ(আ) এর নামে প্রেম, ব্যভিচার ও হত্যার কাহিনী। এই গল্পটিই মুসলিম সমাজে কিছুটা সংশোধিতরূপে প্রচারিত। গল্পরি সার সংক্ষেপ নিম্নরূপঃ একদিন দায়ূদ(আ) হঠাৎ করে একজন গোসলরত মহিলাকে একনজর দেখে ফেলেন। এতে তিনি মহিলাটির উপর অত্যন্ত আসক্ত হয়ে পড়েন।মহিলাটির স্বামীর নাম ছিল উরিয়া যিনি একজন যোদ্ধা ছিলেন। দায়ূদ প্রধান সেনাপতির সাথে ষড়যন্ত্র করেন উরিয়াকে যুদ্ধের মাঠে হত্যা করার জন্য। এক পর্যায়ে উরিয়া নিহত হলে দায়ূদ উক্ত মহিলাকে বিবাহ করেন। (নাউজুবিল্লাহ)।(তাবারী, আত-তাফসীর ২৩/১৪; আল কুরতুবী, তাফসীর ১৫/১৬৬-১৮৫)। বাইবেলে এই ঘটনাটি আরো অনেক নোংরাভাবে লেখা হয়েছে।(বাইবেল, ২ শমূয়েল, ১১:১-২৭)।
এই ঘটনাটি শুধু মিথ্যা এবং নবীদের প্রকৃতি বিরোধীই নয়; উপরন্তু তা মানবীয় বুদ্ধিরও বিপরীত। একজন বিবেকবান বয়স্ক মানুষ যার অগণিত স্ত্রী রয়েছে এবং যিনি একজন জনপ্রিয় শাসক তিনি একটিবার মাত্র দৃষ্টি পড়ার ফলে এমনভাবে প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়বেন এবং এইরূপ হত্যা ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেবেন তা কল্পনা করা যায়না।(মুহাম্মাদ আবূ শাহবাহ, আল ইসরাঈলীয়্যাত, পৃ. ২৬৪-২৭০)।
১৬. হারূত মারূত
ইহুদীগণের মধ্যে যাদুর প্রচলন ছিল। তারা আরো দাবি করতো যে, সুলাইমান(আ) যাদু ব্যবহার করেই ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। তারা আরো দাবি করতো যে, স্বয়ং সুলাইমান(আ) এবং হারূত ও মারূত নামক দুই ফেরেশতা তাদেরকে যাদু শিক্ষা দিয়েছিলেন। এদের এই মিথ্যাচারের প্রতিবাদে কুরআন কারীমের সূরা বাকারার ১০২ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছেঃ
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُو الشَّيَاطِينُ عَلَىٰ مُلْكِ سُلَيْمَانَ ۖ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَٰكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ ۚ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ ۖ
“এবং সুলাইমানের রাজত্বে শয়তানগণ যা আবৃত্তি করত তারা(ইহুদীরা) তা অনুসরণ করতো। সুলাইমান কুফরী করেনি বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত। এবং যা বাবিলে হারূত ও মারূত এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। তারা কাউকে শিক্ষা দিতেননা, এই কথা না বলা পর্য্যন্ত যে, ‘আমরা পরীক্ষা স্বরূপ, সুতরাং তোমরা কুফরী করিওনা।…”
এই আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যায় সাহাবী ও তাবেয়ীগণের যুগ হতেই মুফাসসিরগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস(রা) ও অন্য কোনো কোনো মুফাসসির বলেছেন যে, হারূত ও মারূতের উপর ব্যবহৃত আরবী অর্থ (না)। অর্থাৎ হারূত মারূত ফিরিশতাদ্বয়ের উপরও যাদু অবতীর্ণ করা হয়নি। সুলাইমান(আ) সম্পর্কে যেমন ইহুদীদের দাবি মিথ্যা তেমনি হারূত ও মারূত সম্পর্কেও তাদের দাবি মিথ্যা।
তবে সাধারণভাবে মুফাসসিরগণ বলেছেন যে, ইহুদীগণ যখন কারামত মুযিজা ও যাদুর মধ্যে পার্থক্য না করে সবকিছুকেই যাদু বলে দাবি করতে থাকে তখন আল্লাহ দুইজন ফিরিশতাকে দায়িত্ব প্রদান করেন যাদুর প্রকৃতি এবং যাদু ও মুজিযার মধ্যে পার্থক্য শিক্ষা দানের জন্য। তারা মানুষদের এই পার্থক্য শিক্ষা দিতেন এবং বলতেন, তোমরা এই জ্ঞানকে যাদুর জন্য ব্যবহার করে কুফরী করবেনা। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেকেই যাদু ব্যবহারের কুফরীতে নিমগ্ন থাকতো।
কোনো কোনো মুফাসসির বলেছেন, তাঁরা দুইজন মানুষ ছিলেন; বিশেষ জ্ঞান, পান্ডিত্য বা সৎকর্মশীলতার কারণে তাদেরকে মানুষ ফেরেশতা বলে অভিহিত করতো। তাঁরা এভাব মানুষকে যাদুর অপকারিতা শিক্ষা দিতেন।
হারূত ও মারূত সম্পর্কে কুরআনে আর কোনো কিছুই বলা হয়নি। সহীহ হাদীসেও এ বিষয়ে কিছু পাওয়া যায়না। কিন্তু এ বিষয়ক অনেক গল্প কাহিনী হাদীস নামে বা তাফসীর নামে তাফসীরের গ্রন্থগুলিতে বা সমাজে প্রচলিত। কাহিনীটির সারসংক্ষেপ হলো, মানবজাতির পাপের কারণে ফিরিশতাগণ আল্লাহকে বলেন, মানুষের এত অপরাধ আপনি ক্ষমা করেন কেন বা শাস্তি প্রদান করেননা কেন? আল্লাহ তাদেরকে বলেন, তোমরাও মানুষের প্রকৃতি পেলে এমন পাপ কাজ করতে। তারা বলেন, কক্ষনো না। তখন তারা পরীক্ষার জন্য হারূত ও মারূত নামক দুইজন ফিরিশতাকে নির্বাচিত করেন। তাদেরকে মানবীয় প্রকৃতি প্রদান করে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়। তারা যোহরা নামক এক পরমা সুন্দরী নারীর প্রেমে পড়ে মদপান, ব্যভিচার ও নরহত্যার পাপে জড়িত হন। পক্ষান্তরে যোহরা তাদের নিকট মন্ত্র শিখে আকাশে উড়ে যায়। তখন তাকে একটি তারকায় রূপান্তরিত করা হয়।………
এই গল্পগুলি মূলত ইহুদীদের মধ্যে প্রচলিত কাহিনীমালা। তবে কোনো কোনো তাফসীর গ্রন্থে এগুলি হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ক সকল হাদীসই অত্যন্ত দুর্বল ও জাল সনদে বর্ণিত হয়েছে। কোনো কোনো মুহাদ্দিস বিভিন্ন সনদের কারণে কয়েকটি বর্ণনাকে গ্রহণযোগ্য বলে মত প্রকাশ করেছেন। অনেক মুহাদ্দিস সবগুলিই জাল ও বানোয়াট বলে মত দিয়েছেন।
আল্লামা কুরতুবী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস ও মুফাসসির উল্লেখ করেছেন যে, এ সকল গল্প ফিরিশতাগণ সম্পর্কে ইসলামী বিশ্বাসের বিপরীত। ইহুদী, খৃস্টান ও অন্যান্য অনেক ধর্মে ফিরিশতাগণকে মানবীয় প্রকৃতির বলে কল্পনা করা হয়। তাদের নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি ও সিদ্ধান্তশক্তি আছে বলেও বিশ্বাস করা হয়। ইসলামী বিশ্বাসে ফিরিশতাগণ সকল প্রকার মানবীয় প্রবৃত্তি, নিজস্ব চিন্তা বা আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদের প্রবৃত্তি থেকে পবিত্র। তাঁরা মহান আল্লাহকে কিছু জানার জন্য প্রশ্ন করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা আল্লাহর কোনো কর্ম বা কথাকে চ্যালেঞ্জ করবেন এরূপ কোনো প্রকারের প্রকৃতি তাদের মধ্যে নেই। কাজেই এ সকল কাহিনী ইসলামী আকীদার বিরোধী।
এ বিষয়ে আল্লামা ইবনু কাসীর ও অন্যান্য কতিপয় মুহাদ্দিস সকল বর্ণনা একত্রিত করে তুলনামূলক নিরীক্ষার ভিত্তিতে বলেছেন যে, এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে কোনো প্রকার সহীহ হাদীস বা নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়নি। তাঁর নামে বর্ণিত এ বিষয়ক হাদীসগুলি জাল। তবে সাহাবীগণ থেকে তাঁদের নিজস্ব কথা হিসেবে এ বিষয়ে কিছু কিছু বর্ণনার সনদ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। একথা খুবই প্রসিদ্ধ যে, এ সকল বিষয়ে কোনো কোনো সাহাবী (রা) ইহুদীদের মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন কাহিনী শুনতেন ও বলতেন। সম্ভবত এ সকল বর্ণনার ভিত্তিতেই তারা এগুলি বলেছেন। আল্লাহই ভাল জানেন।(তাবারী, ১/৪৫১-৪৬৪; ইবনু কাসীর, ১/১৩৫-১৪৪)।
পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের বিষয়ে আরো অনেক বানোয়াট গল্প এবং ইসরাঈলীয় বর্ণনা আমাদের সমাজে প্রচলিত। ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ জাতীয় বই পুস্তক এই সকল মিথ্যা কাহিনীতে ভরপুর। সেগুলির বিস্তারিত আলোচনার জন্য অনেক বৃহৎ পরিসরের প্রয়োজন। আপাতত এখানেই এই বিষয়ক আলোচনা শেষ করেছি।
২.৪. রাসূলুল্লাহ(সা) সম্পর্কে
রাসূলুল্লাহ(সা) এর সীমাহীন ও অতুলনীয় মর্যাদা, ফযীলত, মহত্ত্ব ও গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে কুরআন কারীমের অগণিত আয়াতে ও অনেক সহীহ হাদীসে। এ সকল আয়াত ও হাদীসের ভাব গম্ভীর ভাষা, বুদ্ধিভিত্তিক আবেদন ও আত্মিক অনুপ্রেরণা অনেক মুমিনকে আকৃষ্ট করতে পারেনা। এজন্য অধিকাংশ সময় আমরা দেখতে পাই যে, এ সকল আয়াত ও সহীহ হাদীস বাদ দিয়ে সাধারণত একেবারে ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও অত্যন্ত অনির্ভরযোগ্য হাদীসগুলি আমরা সর্বদা আলোচনা করি, লিখি ও ওয়ায নসীহতে উল্লেখ করি।
আমরা দেখেছি যে, মুসলিম সমাজে প্রচলিত জাল হাদীসের অন্যতম তিনটি ক্ষেত্র হলোঃ (১) ফাযায়েল বা বিভিন্ন নেক আমলের সাওয়াব বিষয়ক গ্রন্থাদি, (২) পূর্ববর্তী নবীগণ বা কাসাসুল আম্বিয়া জাতীয় গ্রন্থাদি এবং (৩) রাসূলুল্লাহ(সা) এর জন্ম, জীবনী, মুজিযা বা সীরাতুন্নবী বিষয়ক গ্রন্থাদি। যুগের আবর্তনে ক্রমান্বয়ে এ সকল বিষয়ে জাল ও ভিত্তিহীন কথার প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ হিজরী শতকে সংকলিত সীরাত, দালাইল বা মুজিযা বিষয়ক গ্রন্থাবলিতে অগণিত ভিত্তিহীন ও জাল বর্ণনা স্থান পেয়েছে, যেগুলি পূর্ববর্তী কোনো হাদীসের গ্রন্থতো দূরের কথা, কোনো সীরাত বা মুজিযা বিষয়ক গ্রন্থাদিতেও পাওয়া যায়না।
আল্লামা আবূল কালাম আযাদ তাঁর ‘রাসূলে রাহমাত’ গ্রন্থে তুলনামূলক আলোচনা ও নিরীক্ষা করে এই জাতীয় কিছু বানোয়াট ও ভিত্তিহীন গল্পের উল্লেখ করেছেন। যেমন, রাসূলুল্লাহ(সা)এর জন্মের পূর্বে হযরত আসিয়া(আ) ও মরিয়ম(আ) এর শুভাগমন এবং হযরত আমিনাকে রাসূলুল্লাহ(সা)এর জন্মের সুসংবাদ প্রদান, রাসূলুল্লাহ(সা) এর গর্ভধারণের শুরু থেকে জন্মগ্রহণ পর্য্ন্ত সময়ে হযরত আমিনার কোনোরূপ কষ্টক্লেশ না হওয়া……ইত্যাদি।(মাওলানা আবূল কালাম আযাদ, রাসূলে রাহমত, বাংলা সংস্করণ, ই ফা বাংলাদেশ, পৃ. ৬৯-৮০)।
কেউ কেউ মনে করেন, রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে মিথ্যা দ্বারা আমরা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করেছি। কি জঘন্য চিন্তা! মনে হয় তাঁর সত্য মর্যাদায় ঘাটতি পড়েছে যে, মিথ্যা দিয়ে তা বাড়াতে হবে!! নাউজুবিল্লাহ। মহিমাময় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল খুবই অসন্তুষ্ট হন মিথ্যায় এবং সবচেয়ে জঘন্য মিথ্যা হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল(সা) এর নামে মিথ্যা বলা।
লক্ষ্যণীয় যে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পূর্ববর্তী নবীগণকে(আ)মূর্ত বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনেক মুজিযা বা অলৌকিক বিষয় প্রদান করেছিলেন। শেষ নবী ও বিশ্বনবীকেও তিনি অনেক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মুজিযা দিয়েছেন। তবে তাঁর মৌলিক বা অধিকাংশ মুজিযা বিমূর্ত বা বুদ্ধি ও জ্ঞানবৃত্তিক। ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মানুষকে রাসূলুল্লাহ(সা)এর মুজিযা অনুধাবনে সক্ষম করে। অনেক সময় সাধারণ মূর্খ মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ, আনন্দ দান, উত্তেজিত করা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে গল্পকার, ওয়ায়িয ও জালিয়াতগণ অনেক মিথ্যা গল্প কাহিনী বানিয়ে হাদীস নামে চালিয়েছে।
অনেক সময় এ বিষয়ক মিথ্যা হাদীসগুলিকে চিহ্নিত করাকে অনেকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর মর্যাদা ও শানের সাথে বেয়াদবী বলে ভাবতে পারেন। বস্তুত তাঁর নামে মিথ্যা বলাই হলো তাঁর সাথে সবচেয়ে বেশি বেয়াদবী ও দুশমনী। যে মিথ্যাকে শয়তানের প্ররোচণায় মিথ্যাবাদী তার মর্যাদার পক্ষে ভাবছে সেই মিথ্যা মূলত তাঁর মর্যাদার হানিকর। মিথ্যার প্রতিরোধ করা, মিথ্যা নির্ণয় করা এবং মিথ্যা থেকে দূরে থাকা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নির্দেশ। এই নির্দেশ পালনই তাঁর প্রতি আনুগত্য, অনুসরণ, ভক্তি ও ভালবাসা। এখানে রাসূলুল্লাহ(সা) কেন্দ্রিক কিছু বানোয়াট কথা উল্লেখ করছিঃ
১. আমিই শেষ নবী, আমার পরে নবী নেই, তবে…..
জালিয়াতদের তৈরি একটি জঘন্য মিথ্যা কথা। “আমিই শেষ নবী, আমার পরে নবী নেই, তবে আল্লাহ যদি চান।” কুরআন কারীমে রাসূলুল্লাহ(সা) কে শেষ নবী বলে ঘোষণা করা হয়েছে। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম সহ সকল হাদীস গ্রন্থে বিশুদ্ধতম সনদে সংকলিত অসংখ্য সাহাবী হতে বর্ণিত অগণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন, তাঁর পরে আর কোনো নবী হবেনা। তিনিই নবীদের অট্টালিকার সর্বশেষ ইট। তিনিই নবীদের সর্বশেষ। তাঁর মাধ্যমে নবুওতের পরিসমাপ্তি।
কিন্তু এত কিছুর পরেও পথভ্রষ্টদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। মুহাম্মাদ ইবনু সাঈদ নামক দ্বিতীয় হিজরী শতকের একজন যিনদীক বলে, তাকে হুমাইদ বলেছেন, তাকে আনাস ইবনু মালিক বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন, “আমি শেষ নবী, আমার পরে নবী নেই, তবে আল্লাহ যদি চান।”(ইবনুল জাউযী, আল-মাউযূআত, ১/২০৬, ইবনু ইরাক, তানযীহুশ শারীআহ ১/৩২১)।
এই যিনদীক ছাড়া কেউ এই অতিরিক্ত বাক্যটি “তবে আল্লাহ যদি চান” বলেননি। কোনো হাদীসের গ্রন্থেও বাক্যটি পাওয়া যায়না। শুধুমাত্র এই যিনদীকের জীবনীতে ও মিথ্যা হাদীসের গ্রন্থে মিথ্যাচারের উদাহরণ হিসেবে এই মিথ্যা কথাটি উল্লেখ করা হয়। তা সত্ত্বেও কাদিয়ানী বা অন্যান্য বিভ্রান্ত সম্প্রদায় এই মিথ্যা কথাটি তাদের বিভ্রান্তির প্রমাণ হিসেবে পেশ করতে চায়।
সুপথপ্রাপ্ত মুসলিমের চিহ্ন হলো তাঁর আত্মা, ইচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দ ও অভিরুচি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের(সা) নির্দেশনার নিকট সমর্পিত। এরই নাম ইসলাম। মুসলিম যখন হাদীসের কথা শুনেন তখন তাঁর একটি মাত্র বিবেচ্য; হাদীসটি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে কিনা। হাদীসের অর্থ তাঁর মতের বিপরীত বা পক্ষে তা নিয়ে চিন্তা করেননা। বরং নিজের মতকে হাদীসের অনুগত করে নেন।
বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্টদের পরিচয়ের মূলনীতি হলো তারা নিজেদের অভিরুচি ও পছন্দ অনুসারে কোনো কথাকে গ্রহণ করে। এর বিপরীতে সকল কথা ব্যাখ্যা ও বিকৃত করে। এরা কোনো কথা শুনলে তার অর্থ নিজের পক্ষে কিনা তা দেখে। এরপর বিভিন্ন বাতিল যুক্তিতর্ক দিয়ে তা সমর্থন করে। কোনো কথা তার মতের বিপক্ষে হলে তা যত সহীহ বা কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশই হোক তারা তা বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে বিকৃত ও পরিত্যাগ করে।
২. আপনি না হলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতামনা
“এ ধরনের বানোয়াট কথাগুলির একটি হলোঃ“আপনি না হলে আমি আসমান যমিন বা মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতামনা।” আল্লামা সাগানী, মোল্লা আলী কারী, আব্দুল হাই লাখনবী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস একবাক্যে কথাটিকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ এই শব্দে এই বাক্য কোনো হাদীসের গ্রন্থে কোনো প্রকার সনদে বর্ণিত হয়নি। (আল্লামা সাগানী, আল মাউদূ’আত, পৃ. ৫২; মোল্লা কারী, আল আসরার পৃ. ১৯৪; আব্দুল হাই লাখনবী, আল আসারুল মারফূয়া, পৃ. ৪৪)।
এখানে উল্লেখ্য যে, এই শব্দে নয়, তবে এই অর্থে দুর্বল বা মাঊযূ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করছি।
৩. আরশের গায়ে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নাম
একটি যয়ীফ বা বানোয়াট হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন, “আদম (আ) যখন ভুল করে(নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করে) ফেলেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেনঃ হে প্রভু, আমি মুহাম্মাদ এর হক(অধিকার) দিয়ে আপনার কাছে প্রার্থনা করছি যে আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। তখন আল্লাহ বলেন, হে আদম, তুমি কিভাবে মুহাম্মাদকে(সা) চিনলে, আমিতো এখনো তাকে সৃষ্টিই করিনি? তিনি বলেন, হে প্রভু, আপনি যখন নিজ হাতে আমাকে সৃষ্টি করেন এবং আমার মধ্যে আপনার রূহ ফুঁ দিয়ে প্রবেশ করান, তখন আমি মাথা তুলে দেখলাম আরশের খুঁটিসমূহের গায়ে লিখা রয়েছেঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। এতে আমি জানতে পারলাম যে, আপনার সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় বলেই আপনি আপনার নামের সাথে তাঁর নামকে সংযুক্ত করেছেন। তখন আল্লাহ বলেন, হে আদম, তুমি ঠিকই বলেছ। তিনিই আমার সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি। তুমি আমার কাছে তার হক্ক(অধিকার) দিয়ে চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। মুহাম্মাদ(সা) না হলে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতামনা।” (হাকিম, আল মুসতাদরাক ২/৬৭২)।
ইমাম হাকিম নাইসাপুরী হাদীসটি সংকলিত করে একে সহীহ বলেছেন। তবে সকল মুহাদ্দিস একমত যে, হাদীসটি যয়ীফ। তবে মাঊযূ কিনা মতভেদ করেছেন। ইমাম হাকিম নিজেই অন্যত্র এই হাদীসের বর্ণনাকারী রাবীকে মিথ্যাবাদী বলেছেন।
আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ইমাম হাকিম অনেক যয়ীফ ও মাঊযূ হাদীসকে সহীহ বলেছেন এবং ইমাম ইবনূল জাউযী অনেক সহীহ বা হাসান হাদীসকে যয়ীফ বলেছেন। এজন্য তাঁদের একক মতামত মুহাদ্দিসগণের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়, বরং তাঁদের মতামত তাঁরা পুনর্বিচার ও নিরীক্ষা করেছেন।
এই হাদীসটির সনদের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, সনদটি খুবই দুর্বল, যে কারণে অনেক মুহাদ্দিস এক মাউযূ হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। হাদীসটির একটিই সনদ: আবুল হারিস আব্দুল্লাহ ইবনু মুসলিম আল ফিহরী নামক এক ব্যক্তি দাবি করেন, ইসমাঈল ইবনু মাসলামা নামক এক ব্যক্তি তাকে বলেছেন, আব্দুর রাহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম তার পিতা,তার দাদা থেকে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব(রা) হতে বর্ণনা করেছেন।
বর্ণনাকারী আব্দুল হারিস একজন অত্যন্ত দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। এছাড়া আব্দুর রাহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম(১৮২ হি) খুবই দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ছিলেন। মুহাদ্দিসগণ তাঁর বর্ণিত হাদীস গ্রহণ করেননি। কারণ তিনি কোনো হাদীস ঠিকমতো বলতে পারতেননা, সব উল্টোপাল্টা বর্ণনা করতেন। ইমাম হাকিম নাইসাপুরী নিজেই তার ‘মাদখাল ইলা মারিফাতিস সহীহ’ গ্রন্থে বলেছেন: “আব্দুর রাহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম তার পিতার সূত্রে কিছু মাঊযূ বা জাল হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীস শাস্ত্রে যাদের অভিজ্ঞতা আছে তারা একটু চিন্তা করলেই বুঝবেন যে, এ সকল হাদীসের জালিয়াতির অভিযোগ আব্দুর রাহমানের উপরেই বর্তায়।”(ইবনু ইরাক, তানযীহুশ শারীয়াত ১/২৫০; আলবানী, সিলসিলাতুয যায়ীফাহ ১/৯০)।
এই হাদীসটি উমার(রা) হতে কোনো অন্য কোনো তাবেয়ী বলেননি, আসলাম থেকেও তাঁর কোনো ছাত্র বর্ণনা করেননি। যাইদ ইবনু আসলাম প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন। তাঁর অনেক ছাত্র ছিল। তাঁর কোনো ছাত্র এই হাদীস বর্ণনা করেননি। শুধুমাত্র আব্দুর রাহমান দাবী করছেন যে, তিনি এই হাদীসটি তাঁর পিতার নিকট শুনেছেন। তার বর্ণিত সকল হাদীসের তুলনামূলক নিরীক্ষা করে ইমামগণ দেখেছেন তাঁর বর্ণিত অনেক হাদীসই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা পর্যায়ের। এজন্য ইমাম যাহাবী, ইবনু হাজার ও অন্যান্য মুহাদ্দিস হাদীসটিকে মাউযূ বলে চিহ্নিত করেছেন। ইমাম বাইহাকী হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। কোনো কোনো মুহাদ্দিস বলেছেন যে, এই কথাটি মূলত ইহুদী খৃস্টানদের মধ্যে প্রচলিত শেষ নবী বিষয়ক কথা; যা কোনো কোনো সাহাবী বলেছেন। অন্য একটি দুর্বল সনদে এই কথাটি উমার(রা) এর নিজের কথা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আব্দুর রাহমান অন্যান্য অনেক হাদীসের মত এই হাদীসেও সাহাবীর কথাকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (তাবারানী, আল মুজামুল আউসাত ৬/৩১৩-৩১৪; মুসতাদরাক হাকিম ২/৬৭২; তারিখ ইবনু কাসীর ২/৩২৩, মোল্লা আলী কারী, আল আসরার পৃ. ১৯৪)।
এই মর্মে আরেকটি যয়ীফ হাদীস আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাসের কথা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এই হাদীসটিও হাকিম নাইসাপুরী সংকলন করেছেন। তিনি জানদাল ইবনু ওয়ালিক এর সূত্রে বলেন, তাকে আমর ইবনু আউস আল আনসারী নামক দ্বিতীয় হিজরী শতকের এক ব্যক্তি বলেছেন, তাকে প্রখ্যাত তাবে তাবেয়ী সাঈদ ইবনু আবূ আরূবাহ (১৫৭ হি), তাকে প্রখ্যাত তাবেয়ী কাতাদা ইবনু দিআমাহ আস-সাদূসী (১১৫ হি) বলেছেন, তাকে প্রখ্যাত তাবেয়ী সাঈদ ইবনু মুসাইআব(৯১ হি) বলেছেন, তাকে ইবনু আব্বাস(রা) বলেছেন, “মহান আল্লাহ ঈসা(আ) এর প্রতি ওহী প্রেরণ করে বলেন, তুমি মুহাম্মাদের উপর ঈমান আনয়ন কর এবং তোমার উম্মাতের যারা তাঁকে পারে তাদেরকে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নের নির্দেশ প্রদান কর। মুহাম্মাদ(সা) না হলে আদমকে সৃষ্টি করতামনা, মুহাম্মাদ(সা) না হলে জান্নাত ও জাহান্নামও সৃষ্টি করতামনা। আমি পানির উপর আরশ সৃষ্টি করেছিলাম। তখন আরশ কাঁপতে শুরু করে। তখন আমি তার উপরে লিখলামঃ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’; ফলে তা শান্ত হয়ে যায়।” (হাকিম, আল মুসতাদরাক ২/৬৭১)।
ইমাম হাকিম হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ। ইমাম যাহাবী তার প্রতিবাদ করে বলেন, “বরং হাদীসটি মাউযূ বলেই প্রতীয়মান হয়।” কারণ এই হাদীসটির একমাত্র বর্ণনাকারী এই ‘আমর ইবনু আউস আল আনসারী’ নামক ব্যক্তি। সে প্রসিদ্ধ কয়েকজন মুহাদ্দিস এর নামে হাদীসটি বর্ণনা করেছে। অথচ এদের অন্য কোনো ছাত্র এই হাদীসটি তাদের থেকে বর্ণনা করেনি। এই লোকটি মূলত একজন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি। তার কোনো পরিচয় পাওয়া যায়না। এই জানদাল ইবনু ওয়ালিক ছাড়া অন্য কোনো রাবী তার নাম বলেননি বা তার কোনো পরিচয়ও জানা যায়না। এজন্য ইমাম যাহাবী ও ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী বলেন যে, এই হাদীসটি ইবনু আব্বাসের নামে বানানো জাল বা মিথ্যা হাদীস। (যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ৫/২৯৯; ইবনু হাজার, লীসানুল মীজান ৪/৩৫৪)। এই অর্থে আরো জাল হাদীস মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন।
নূরে মুহাম্মাদী বিষয়ক হাদীসসমূহ প্রথমত, আল কুরআন ও নূরে মোহাম্মদী আরবী ভাষায় নূর অর্থ আলো, আলোকচ্ছটা, উজ্বলতা(light, ray of light, brightness) ইত্যাদি। আরবী, বাংলা ও সকল ভাষাতেই নূর, আলো বা লাইট যেমন ‘জড়’ আলো অর্থে ব্যবহৃত হয়, তেমনি আত্মিক, আধ্যাত্মিক ও আদর্শিক আলো বা পথ-প্রদর্শকের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লামা কুরতুবী বলেন, “আরবী ভাষায় নূর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা দৃষ্টিগ্রাহ্য আলো বা জ্যোতিকে বলা হয়। অনুরূপভাবে রূপকার্থে সকল সঠিক ও আলোকোজ্জ্বল অর্থকে ‘নূর’ বলা হয়। বলা হয়, অমূকের কথার মধ্যে নূর রয়েছে। অমুক ব্যক্তি দেশের নূর, যূগের সূর্য্ বা যূগের চাঁদ….।” (কুরতুবী, তাফসীর ১২/২৫৬)।
মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে নিজেকে নূর বলেছেন।
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ
“আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর নূর(জ্যোতি)। তাঁর নূরের উপমা যেন একটি দীপাধার যার মধ্যে রয়েছে একটি প্রদীপ……।”(সূরা ২৪: নূর, আয়াত ৩৫)। ইমাম তাবারী বলেছেন, “আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী নূর” একথা বলতে মহিমাময় আল্লাহ বুঝাচ্ছেন যে, তিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মধ্যকার সকলের হাদী বা পথপ্রদর্শক। তাঁরই নূরে তাঁরা সত্যের দিকে সুপথপ্রাপ্ত হয়।…..ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর নূর’ অর্থ তিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অধিবাসীদের হাদী বা পথপ্রদর্শক।……আনাস থেকে বর্ণিত, আল্লাহ বলেছেন, আমার হেদায়াতই আমার নূর……।”(তাবারী, তাফসীর ১৮/১৩৫; আরো দেখুন, ইবনু কাসীর, তাফসীর ৩/২৯০)।
মহিমাময় আল্লাহ কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে ‘কুরআন’ কে আলো বা নূর বলে উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ(সা) সম্পর্কে এরশাদ করা হয়েছেঃ
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ ۚ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ [٧:١٥٧]
“যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক এই উম্মী নবীর……যারা তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং তাঁর সাথে যে নূর অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।”(সূরা ৭: আরাফ, ১৫৭ আয়াত)।
এখানে রাসূলুল্লাহ(সা) এর উপর অবতীর্ণ ‘আল কুরআন’ কে নূর বলা হয়েছে। অন্যত্র কুরআনকে ‘রূহ’ বা ‘আত্মা’ ও নূর বলা হয়েছেঃ
وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا ۚ مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَٰكِن جَعَلْنَاهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَن نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا ۚ وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ [٤٢:٥٢]
“এইভাবে আমি আপনার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি রূহ(আত্মা), আমার নির্দেশ থেকে, আপনি তো জানতেন না যে, কিতাব কি এবং ঈমান কি! কিন্তু আমি একে নূর বানিয়ে দিয়েছি, যা দিয়ে আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ নির্দেশ করি……।”(সূরা ৪২: শূরা, আয়াত ৫২)।
অন্যত্র মূসা(আ) এর উপর অবতীর্ণ তাওরাতকেও নূর বলা হয়েছে।নূর….।”(সূরা: ৬, আনআম, আয়াত ৯১)।
অন্যত্র এরশাদ করা হয়েছে তাওরাত ও ইনজীল এর মধ্যে নূর ছিল।
আরবী(*********)
“নিশ্চয় আমি অবতীর্ণ করেছি তাওরাত, যার মধ্যে রয়েছে হেদায়াত ও নূর…….এবং আমি তাকে(ঈসাকে) প্রদান করেছি ইনজীল যার মধ্যে রয়েছে হেদায়াত ও নূর।(সূরা ৫ মায়েদা ৪৪ ও ৪৬ আয়াত)।
অন্য অনেক স্থানে মহান আল্লাহ সাধারণভাবে ‘নূর’ বা ‘আল্লাহর নূর’ বলেছেন। এর দ্বারা তিনি কি বুঝিয়েছেন সে বিষয়ে সাহাবী-তাবেয়ীগণের যুগ হতে মুফাসসিরগণ মতভেদ করেছেন। যেমন এক স্থানে বলেছেনঃ
يُرِيدُونَ أَن يُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا أَن يُتِمَّ نُورَهُ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ [٩:٣٢]
“তারা আল্লাহর নূরকে ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে চায়; কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূর পূর্ণ করবেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।”(সূরা ৬১: সাফ, আয়াত ৮; সূরা ৯: তাওবা, আয়াত ৩২)। এখানে আল্লাহর নূর বলতে কি বোঝানো হয়েছে সে বিষয়ে মুফাসসিরগণের মতভেদ রয়েছে। আল্লামা কুরতুবী বলেনঃ এখানে আল্লাহর নূরের ব্যাখ্যায় পাঁচটি মত রয়েছে। (১) আল্লাহর নূর অর্থ আল কুরআন, কাফিররা কথার দ্বারা তা বাতিল করতে ও মিথ্যা প্রমাণ করতে চায়। ইবনু আব্বাস ও ইবনু যাইদ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। (২) আল্লাহর নূর অর্থ ইসলাম, কাফিররা কথাবার্তার মাধ্যমে তাকে প্রতিরোধ করতে চায়। সুদ্দী একথা বলেছেন।(৩) আল্লাহর নূর অর্থ মুহাম্মাদ(সা)। কাফিররা অপপ্রচার ও নিন্দাচারের মাধ্যমে তার ধ্বংস চায়। দাহহাক এ কথা বলেছেন। (৪) আল্লাহর নূর অর্থ আল্লাহর দলীল-প্রমাণাদি, কাফিররা সেগুলি অস্বীকার করে মিটিয়ে দিতে চায়। ইবনু বাহর এ কথা বলেছেন। (৫) আল্লাহর নূর অর্থ সূর্য্। অর্থাৎ ফুৎকারে সূর্য্ কে নেভানোর চেষ্টা করার মত বাতুল ও অসম্ভব কাজে তারা লিপ্ত। ইবনু ঈসা একথা বলেছেন।(কুরতুবী, তাফসীর ১৮/৮৫)।
الر ۚ كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَىٰ صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ [١٤:١]
“এই কিতাব। আমি তা আপনার প্রতি নাযিল করেছি। যাতে আপনি মানবজাতিকে অন্ধকার হতে আলোতে বের করে আনেন….।” (সূরা ১৪: ইবরাহীম, আয়াত ১)।
এখানে স্বভাবতই অন্ধকার ও আলো বলতে জড় কিছুকে বুঝানো হয়নি। এখানে অন্ধকার বলতে অবিশ্বাসের অন্ধকার এবং আলো বলতে আল কুরআন অথবা ইসলামকে বুঝানো হয়েছে।
অনুরূপভাবে অন্যান্য বিভিন্ন আয়াতে নূর বা আল্লাহর নূর বলা হয়েছে এবং সেখানে ‘নূর’ অর্থ কুরআন, ইসলাম, মুহাম্মাদ(সা) ইত্যাদি অর্থ গ্রহণ করেছেন মুফাসসিরগণ। এই ধরনের একটি আয়াতঃ
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ۚ قَدْ جَاءَكُم مِّنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ [٥:١٥]
“হে কিতাবীগণ, আমার রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন, তোমরা কিতাবের যা কিছু গোপন করতে তিনি তার অনেক তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন এবং অনেক উপেক্ষা করে থাকেন। আল্লাহর নিকট হতে এক নূর ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের নিকট এসেছে।”(সূরা ৫: আল মায়েদা,আয়াত ১৫)
এই আয়াতে নূর বা জ্যোতি বলতে কি বুঝানো হয়েছে সে বিষয়ে মুফাসসিরগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন, এখানে নূর অর্থ কুরআন, কেউ বলেছেন ইসলাম, কেউ বলেছেন মুহাম্মাদ(সা)।(তাবারী, তাফসীর ৬/১৬১; কুরতুবী, তাফসীর ৬/১১৮; ইবনু কাসীর, তাফসীর ২/৩৫)।
এই তিন ব্যাখ্যার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। যারা ‘নূর’ অর্থ ইসলাম বা ইসলামী শরীয়ত বলেছেন, তাঁরা দেখেছেন যে, এই আয়াতে প্রথমে রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা বলা হয়েছে এবং শেষে কিতাব বা কুরআনের কথা বলা হয়েছে। কাজেই মাঝে নূর বলতে ইসলামকে বুঝানোই স্বাভাবিক। এ ছাড়া কুরআন কারীমে অনেক স্থানে নূর বলতে ইসলামকে বুঝানো হয়েছে।
এরা বলেন যে, আরবীতে ‘আলো’ বুঝাতে দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়-একটি ‘দিয়া’, অপরটি ‘নূর’। প্রথম আলোর মধ্যে উত্তাপ রয়েছে আর দ্বিতীয় আলো হলো স্নিগ্ধতাপূর্ণ আনন্দময় আলো। পূর্ববর্তী শরীয়তগুলির বিধিবিধানের মধ্যে কাঠিন্য ছিল। পক্ষান্তরে ইসলামী শরীয়তের সকল বিধিবিধান সহজ, সুন্দর ও জীবনমুখী। এজন্য ইসলামী শরীয়তকে নূর বলা হয়েছে।(ইবনু রাজাব, জামিউল উলূম ওয়াল হিকাম ১/২১৯)।
যারা এখানে নূর অর্থ কুরআন বুঝিয়েছেন, তাঁরা দেখেছেন যে, এই আয়াতের প্রথমে যেহেতু রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা বলা হয়েছে, সেহেতু শেষে ‘নূর’ ও ‘স্পষ্ট কিতাব’ বলতে কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে। কাজেই ‘নূর’ বলতে মুহাম্মাদ(সা)কে বুঝানোই স্বাভাবিক। এ বিষয়ে ইমাম তাবারী বলেনঃ “নূর বলতে এখানে মুহাম্মাদ(সা) কে বুঝানো হয়েছে, যার দ্বারা আল্লাহ হক্ক বা সত্যকে আলোকিত করেছেন, ইসলামকে বিজয়ী করেছেন এবং শিরককে মিটিয়ে দিয়েছেন। কাজেই যে ব্যক্তি তাঁর দ্বারা আলোকিত হতে চায়, তার জন্য তিনি আলো। তিনি হক্ক বা সত্য প্রকাশ করেন। তাঁর হক্ককে আলোকিত করার জন্য একটি দিক হলো যে, ইহুদীরা আল্লাহর কিতাবের যে সকল দিকগুলো গোপন করতো তার অনেক কিছু তিনি প্রকাশ করেছেন। (তাবারী, তাফসীর ৬/১৬১)।
সর্বোপরি, কুরআন কারীমে রাসূলুল্লাহ(সা) কে ‘আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ’ বা ‘নূর প্রদানকারী প্রদীপ’ বলা হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا [٣٣:٤٥] وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُّنِيرًا [٣٣:٤٦]
“হে নবী! আমরা আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারীরূপে এবং আলোকোজ্জ্বল(নূর প্রদানকারী)প্রদীপরূপে।” (সূরা ৩৩: আহযাব, আয়াত ৪৫-৪৬)।
উপরের আলোচনা হতে আমরা দেখতে পেলাম যে, কুরআন কারীমে সত্যের দিশারী, হেদায়াতের আলো ও সঠিক পথের নির্দেশক হিসেবে কুরআন কারীমকে ‘নূর’ বলা হয়েছে। অনুরূপভাবে কোনো কোনো আয়াতে ‘নূর’ শব্দের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো মুফাসসির রাসূলুল্লাহ(সা) কে বা ইসলামকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন।
কুরআন কারীমের এ সকল বর্ণনা হতে বুঝা যায় না যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ(সা), কুরআন বা ইসলাম নূরের তৈরি বা নূর হতে সৃষ্ট। আমরা বুঝতে পারি যে, এখানে কোনো সৃষ্ট, জড় বা মূর্ত নূর বা আলো বুঝানো হয়নি। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ(সা), ইসলাম ও কুরআন কোনো জাগতিক, জড়, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা মূর্ত আলো নয়। এ হলো বিমূর্ত, আত্মিক, আদর্শিক ও সত্যের আলোকবর্তিকা, যা মানুষের হৃদয়কে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের অন্ধকার হতে বিশ্বাস, সত্য ও সুপথের আলোয় জ্যোতির্ময় করে।
দ্বিতীয়ত, হাদীস শরীফে নূর মুহাম্মাদী কুরআন ও হাদীসে বারবার বলা হয়েছে যে মানুষকে মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে। সৃষ্টির উপাদান বলতে প্রথম সৃষ্টিকেই বুঝানো হয়। এরপর তার বংশধররা বংশ পরম্পরায় সেই উপাদান ধারণ করে। কুরআন কারীমে আদম(আ)কে মাটির উপাদান থেকে সৃষ্টি করার বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করা হয়েছে।পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ জাগতিক প্রক্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করে। কাউকেই নতুন করে মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়না। তবে সকল মানুষকেই মাটির মানুষ বা মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়।
কুরআন কারীমে ও হাদীস শরীফে অনেক স্থানে রাসূলুল্লাহ(সা)কে (বাশার) বা মানুষ, মানুষ ভিন্ন কিছুই নন, তোমাদের মতই মানুষ ইত্যাদি কথা বলা হয়েছে। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, রাসূলুল্লাহ(সা) এর সৃষ্টির উপাদানে কি কোনো বিশেষত্ব নেই?
রাসূলুল্লাহ(সা) কে নূর হতে সৃষ্টি করা হয়েছে মর্মে কিছু হাদীস প্রচলিত রয়েছে। এগুলির অর্থ আমাদের কাছে আকর্ষণীয় এবং মুমিনের কাছে এগুলি ভাল লাগে। একথা ঠিক যে, সৃষ্টির মর্যাদা তার কর্মের মধ্যে নিহিত, তার সৃষ্টির উপাদান, বংশ ইত্যাদিতে নয়। এজন্য আগুনের তৈরি জিন ও নূরের তৈর ফিরিশতার চেয়ে মাটির তৈরি মানুষ অনেক ক্ষেত্রে বেশি মর্যাদাবান। এরপরও যখন আমরা জানতে পারি যে, সৃষ্টির উপাদানেও আমাদের প্রিয়তম নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ(ﷺ ) এর বৈশিষ্ট্য রয়েছে তখন আমাদের ভাল লাগে। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, যে কোনো কথা যতই ভাল লাগুক, তা গ্রহণের আগে তার বিশুদ্ধতা যাচাই করা। কোনো কথাকে শুধুমাত্র তার অর্থের ভিত্তিতে নয়, বরং সাক্ষ্য প্রমাণের বিশুদ্ধতার ভিত্তিতে প্রথমে বিচার করা হয়। এরপর তার অর্থ বিচার করা হয়। এখানে এই অর্থের কয়েকটি জাল হাদীস উল্লেখ করছি।
৪. রাসুলুল্লাহ(ﷺ ) ও আলী (রা) নূর হতে সৃষ্টি
“আমাকে ও আলীকে নূর হতে সৃষ্টি করা হয়। আদমের সৃষ্টির ২ হাজার বৎসর পূর্বে আমরা আরশের ডান পার্শ্বে ছিলাম। অতঃপর যখন আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করলেন তখন আমরা মানুষদের ঔরসে ঘুরতে লাগলাম।” মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এটি একটি মিথ্যা ও জাল হাদীস। জা’ফর ইবনু আহমদ ইবনু আলী আল-গাফিকী নামক এক মিথ্যাবাদী জালিয়াত হাদীসটি বানিয়েছে এবং এর জন্য একটি সনদও সে বানিয়েছে।(ইবনুল জাউযী, আল মাউদূআত ১/২৫৪; সুয়ূতী, আল লাআলী ১/৩২০; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/৩৫১; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ, ২/৪৩৪)।
৫. রাসুলুল্লাহ(ﷺ ) কে আল্লাহর নূর, আবূ বকরকে তাঁর নূর…..হতে সৃষ্টি
“আল্লাহ আমাকে তাঁর নূর হতে সৃষ্টি করেছেন, আবূ বকরকে আমার নূর হতে সৃষ্টি করেছেন, উমারকে আবূ বকর এর নূর হতে সৃষ্টি করেছেন এবং আমার উম্মাতকে উমরের নূর হতে সৃষ্টি করেছেন……।”- মুহাদ্দিসগণ একমত যে হাদীসটি মিথ্যা ও বানোয়াট। আহমদ ইবনু ইউসূফ আল মানবিযী নামক এক ব্যক্তি এ মিথ্যা কথাটির প্রচারক। সে এই মিথ্যা কথাটির একটি সুন্দর সনদও বানিয়েছে। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ১/৩১৪; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ১/৩২৮; সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ৫০; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/৩৩৭)।
এই অর্থে আরেকটি বানোয়াট কথাঃ “আল্লাহ আমাকে তাঁর নূর হতে সৃষ্টি করেছেন, আবূ বকরকে আমার নূর হতে সৃষ্টি করেছেন, উমারকে আবূ বকর এর নূর হতে সৃষ্টি করেছেন এবং নবী রাসূলগণ ব্যতীত মুমিনগণের সকলকেই উমারের নূর হতে সৃষ্টি করেছেন।”(দাইলামী, আল ফিরদাউস ১/১৭১)।
এই অর্থে আরেকটি ভিত্তিহীন কথা, “আল্লাহ আমাকে তাঁর নূর হতে সৃষ্টি করেছেন, আবূ বকরকে আমার নূর হতে সৃষ্টি করেছেন, উমার ও আয়েশাকে আবূ বকর এর নূর হতে সৃষ্টি করেছেন আর আমার উম্মতের মুমিন পুরুষগণকে উমারের নূর হতে এবং মুমিন নারীগণকে আয়েশার নূর হতে সৃষ্টি করেছেন।” (কুরতুবী, তাফসীর ১২/২৮৬)।
৬. আল্লাহর মুখমন্ডলের নূরে রাসুলুল্লাহ(ﷺ ) এর সৃষ্টি
আব্দুল কাদের জিলানী(রাহ) এর নামে প্রচলিত ‘সিররুল আসরার’ নামক জাল পুস্তকটির মধ্যে জালিয়াতগণ অনেক জঘন্য কথা হাদীস নামে ঢুকিয়েছে। এ সকল জাল কথার একটিতে বলা হয়েছে, আল্লাহ বলেছেন, “আমি মুহাম্মাদকে আমার মুখমন্ডলের নূর হতে সৃষ্টি করেছি।”- এ জঘন্য মিথ্যা কথাটি কোনো জাল সনদেও বর্ণিত হয়নি। (সিররুল আসরার, পৃ. ১০)।
৭. রাসুলুল্লাহ(ﷺ ) এর নূরে ধান চাউলের সৃষ্টি
জালিয়াতদের বানানো আরেকটি মিথ্যা কথাঃ “চাউল আমা হতে এবং আমি চাউল হতে। আমার অবশিষ্ট নূর হতে চাউলকে সৃষ্টি করা হয়।”(তাহের ফাতানী, তাযকিরা, পৃ. ১৪৭; শাওকানী, আল ফাওয়াদ ১/২১১)।
৮. ঈমানদার মুসলমান আল্লাহর নূর দ্বারা সৃষ্ট
দায়লামী তার ‘আল ফিরদাউস’ নামক পুস্তকে ইবনু আব্বাস (রা) এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে বর্ণনা করেছেন, “মুমিন আল্লাহর নূরের দ্বারা দৃষ্টিপাত করেন, যে নূর হতে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”(দায়লামী, আল ফিরদাউস, ৪/১৭৮; সাখাবী, আল মাখাদিস, পৃ. ৪৩৬)। এই হাদীসটিও জাল। এর একমাত্র বর্ণনাকারী মাইসারাহ ইবনু আব্দুরাব্বিহ দ্বিতীয়-তৃতীয় হিজরী শতকের অন্যতম প্রসিদ্ধ জালিয়াত ও মিথ্যাবাদী রাবী। ইমাম বুখারী, আবূ দাউদ, আবূ হাতিম, ইবনু হিব্বান সহ সকল মুহাদ্দিস এ বিষয়ে একমত। তাঁরা তার রচিত অনেক জাল হাদীস উল্লেখ করেছেন। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল, ৬/৫৭৪-৫৭৫; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ৬/১৩৮-১৩৯)।
৯. নূরে মুহাম্মাদীই (ﷺ ) প্রথম সৃষ্টি
উপরের হাদীসগুলি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত নয়, যদিও হাদীসগুলি বিভিন্ন গ্রন্থে সনদসহ বা সনদবিহীনভাবে এবং মুহাদ্দিসগণ এগুলির সনদ আলোচনা করে জাল ও মিথ্যা বলে উল্লেখ করেছেন। বিশেষত, ‘মুমিন আল্লাহর নূরে সৃষ্টি’ এই হাদীসটি দাইলামীর গ্রন্থে রয়েছে। এই গ্রন্থের অনেক জাল হাদীসই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, কিন্তু এই হাদীসটি আমাদের সমাজে প্রসিদ্ধ নয়। পক্ষান্তরে একটি হাদীস, যা কোনো হাদীসের গ্রন্থে সংকলিত হয়নি, কোথাও কথাটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়না, সেই কথাটি আামদের সমাজে বহুল প্রচলিত। শুধু প্রচলিতই নয়, এই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, সনদহীন কথাটি সর্ববাদীসম্মত মহাসত্যের রূপ গ্রহণ করেছে এবং তা ইসলামী বিশ্বাসের অংশরূপে স্বীকৃত। এমন কি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের স্বীকৃত ‘আকিদা ও ফিকহ’ গ্রন্থেও যা হাদীসরূপে উল্লেখিত। হাদীসটি হচ্ছেঃ “আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন।” একটি সুদীর্ঘ হাদীসের অংশ হিসেবে হাদীসটি প্রচলিত। হাদীসটির সারসংক্ষেপ হলো, জাবির(রা) রাসুলুল্লাহ(ﷺ ) কে প্রশ্ন করেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম কি সৃষ্টি করেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “সর্বপ্রথম আল্লাহ তোমার নবীর নূরকে তাঁর নূর হতে সৃষ্টি করেন।” এরপর এ লম্বা হাদীসে উল্লেখ করা হয়, উক্ত নূরকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে তা হতে আরশ, কুরসী, লাওহ, কলম, ফিরিশতা, জিন, ইনসান এবং সমগ্র বিশ্বকে সৃষ্টি করা হয়।….
কথাগুলি শুনতে ভাল। যদি রাসুলুল্লাহ(ﷺ )এর নামে মিথ্যা কথা বলার বা যা শুনব তাই বলার অনুমতি থাকতো তাহলে আমরা নির্দ্বিধায় তা গ্রহণ করতাম ও বলতাম। কিন্তু যেহেতু তা নিষিদ্ধ তাই বাধ্য হয়েই আমাদের প্রতিবাদ করতে হয়। রাসুলুল্লাহ(ﷺ ) কে সর্বপ্রথম নূর হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, বা তাঁর নূর হতে বিশ্ব বা অন্যান্য সৃষ্টকে সৃষ্টি করা হয়েছে মর্মে যা কিছু প্রচলিত সবই ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও মিথ্যা কথা।
কেউ কেউ দাবী করেছেন যে, হাদীসটি বাইহাকী বা আব্দুর রাযযাক সান‘আনী সংকলন করেছেন। এই দাবিটি ভিত্তিহীন। আব্দুর রাযযাক সান‘আনীর কোনো গ্রন্থে বা বাইহাকীর কোনো গ্রন্থে এই হাদীসটি নেই। কোনো হাদীসের গ্রন্থেই এই কথাটির অস্তিত্ব নেই। সহীহ, যয়ীফ এমনকি মাঊযূ বা মিথ্যা সনদেও এই হাদীসটি কোনো হাদীসের গ্রন্থে সংকলিত হয়নি। সাহাবীগণের যুগ হতে আজ পর্য্ন্ত শত শত হাদীসের গ্রন্থ লিপিবদ্ধ ও সংকলিত হয়েছে, যে সকল গ্রন্থে সনদসহ হাদীস সংকলিত হয়েছে। আমাদের সমাজে প্রচলিত যে কোনো হাদীস(সহীহ/হাসান/যয়ীফ/মাঊযূ) এ সকল গ্রন্থের অধিকাংশে পাওয়া যাবে। যে কোনো হাদীস আপনি খুঁজে দেখুন, অন্তত ১০/১৫টি গ্রন্থে তা পাবেন। অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বা প্রসিদ্ধ হাদীস আপনি প্রায় সকল গ্রন্থেই দেখতে পাবেন। অর্থাৎ, এ ধরনের যে কোনো একটি হাদীস আপনি ৩০/৩৫টি হাদীসের গ্রন্থে এক বা একাধিক সনদে সংকলিত দেখতে পাবেন। কিন্তু হাদীস নামের “আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন”-বাক্যটি খুঁজে দেখুন. একটি হাদীসগ্রন্থেও পাবেননা। রাসুলুল্লাহ(ﷺ )যুগ হতে হতে পরবর্তী শত শত বৎসর পর্য্ন্ত কেউ এ হাদীসটি জানতেননা। কোনো গ্রন্থেও লিখেননি। এমনকি সনদবিহীন সিরাতুন্নবী, ইতিহাস, ওয়ায বা অন্য কোনো গ্রন্থেও তা পাওয়া যায়না।
যতটুকু জানা যায়, ৭ম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ আলিম মহিউদ্দীন ইবনু আরাবী আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবনু আলী তাঈ হাতিমী(৫৬০-৬৩৮হি/১১৬৫-১২৪০খৃ.) সর্বপ্রথম এ কথাগুলিকে হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইবনু আরাবী তাঁর পুস্তকাদিতে অগণিত জাল হাদীস ও বাহ্যত ইসলামী বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। পরবর্তী যুগে বুযুর্গগণ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবশত এ সকল কথার বিভিন্ন ওযর ও ব্যাখ্যা পেশ করেছেন। আবার অনেকে কঠিনভাবে আপত্তি করেছেন। বিশেষত মুজাদ্দেদী আলফে সানী হযরত আহমদ ইবনু আব্দুল আহাদ সারহিন্দী(১০৩৪ হি) ইবনু আরাবীর এ সকল জাল ও ভিত্তিহীন কথার প্রতিবাদ করেছেন বারংবার। কখনো কখনো নরম ভাষায়, কখনো কঠিন ভাষায়।(উদাহরণ-মাকতুবাত শরীফ ১/১, মাকতুব ৩১, (পৃষ্ঠা ৬৭, ৬৮) মাকতুব ৪৩)।
এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “ আমাদের নসস বা কুরআন ও হাদীসের পরিষ্কার অকাট্য বাণীর সহিত কারবার, ইবনু আরাবীর কাশফ ভিত্তিক ফসস বা ফুসূসূল হিকামের সহিত নহে। ফুতূহাতে মাদানীয়া বা মাদানী নবী(ﷺ )এর হাদীস আমাদেরকে ইবনে আরাবীর ফতূহাতে মাক্কীয়া জাতীয় গ্রন্থাদি হতে বেপরওয়া করে দিয়েছেন।”(প্রাগুক্ত, ১/১, মাকতুব ১০০, পৃষ্ঠা ১৭৮)।
অন্যত্র প্রকৃত সূফীদের প্রশংসা করে লিখেছেন, “তাহারা নসস, কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বাণী, পরিত্যাগ করত ফসস বা মহিউদ্দীন ইবনে আরাবীর ফসস বা ফূসূসূল হিকাম পুস্তকে লিপ্ত হননা এবং ফতূহাতে মাদানীয়া, অর্থাৎ হাদীস শরীফ বর্জন করত ইবনে আরাবীর ফুতূহাতে মাক্কীয়া পুস্তকের প্রতি লক্ষ্য করেননা।”(প্রাগুক্তু, ১/২, মাকতুব ২৪৩, পৃ. ২১১)।
সর্বাবস্থায় ইবনু আরাবী এই বাক্যটির কোনো সূত্র বা সনদ উল্লেখ করেননি। কিন্তু তিনি এর উপরে তাঁর প্রসিদ্ধ সৃষ্টিতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেন। খৃস্টান ধর্মাবলম্বীদের Theory of Logos এর আদলে তিনি নূরে মুহাম্মাদী তত্ত্ব প্রচার করেন। খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, ঈশ্বর সর্বপ্রথম তার নিজের ‘জাত’ বা সত্ত্বা হতে ‘কালেমা’ বা পুত্রকে সৃষ্টি করেন এবং তার থেকে তিনি সকল সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেন। ইবনু আরাবী বলেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম নূরে মুহাম্মাদী সৃষ্টি করেন এবং তার থেকে সকল সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেন।
ক্রমাণ্বয়ে কথাটি ছড়াতে থাকে। বিশেষত ৯ম/১০ম হিজরী শতক হতে লেখকগণের মধ্যে যাচাই বাছাই ছাড়াই অন্যের কথা উদ্ধৃতির প্রবণতা বাড়তে থাকে। শ্রদ্ধাবশত বা ব্যস্ততাহেতু অথবা অন্যান্য বিভিন্ন কারণে নির্বিচারে একজন লেখক আরেকজন লেখকের নিকট হতে গ্রহণ করতে থাকেন। যে যা শুনেন বা পড়েন তাই লিখতে থাকেন, বিচার করার প্রবণতা কমতে থাকে।
দশম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ আলিম আল্লামা আহমদ ইবনু মুহাম্মাদ আল কাসতালানী(৯২৩ হি) তার রচিত প্রসিদ্ধ সীরাত গ্রন্থ ‘আল মাওয়াহিব আল লাদুন্নিয়া’ গ্রন্থে এই হাদীসটি ‘মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকে’ সংকলিত রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। আগেই বলেছি, হাদীসটি মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক বা অন্য কোনো হাদীস গ্রন্থে বা অন্য কোথাও সনদসহ সংকলিত হয়নি। আল্লামা কাসতালানী যে কোনো কারণে ভুলটি করেছেন। তবে ভুলটি পরবর্তীকালে সাধারণ ভুলে পরিণত হয়। সকলেই লিখেছেন যে, হাদীসটি মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকে সংকলিত। কেউ একটু কষ্ট করে গ্রন্থটি খুঁজে দেখতে চাচ্ছেননা। সারাবিশ্বে ‘মুসান্নাফ’, ‘দালাইলুন নুবুওয়াহ’ ও অন্যান্য গ্রন্থের অগণিত পান্ডুলিপি রয়েছে। এছাড়া গ্রন্থগুলি মুদ্রিত হয়েছে। যে কেউ একটু কষ্ট করে খুঁজে দেখলেই নিশ্চিত হতে পারেন। কিন্তু কেউই কষ্ট করতে রাজী নয়। ইমাম সুয়ূতী ও অন্যান্য যে সকল মুহাদ্দিস এই কষ্টটুকু করেছেন তাঁরা নিশ্চিত করেছেন যে, এই হাদীসটি ভিত্তিহীন ও অস্তিত্বহীন কথা। (সুয়ূতী, আল হাবী ১/৩৮৪-৩৮৬)।
গত কয়েকশত বৎসর যাবত এই ভিত্তিহীন কথাটি ব্যাপকভাবে মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। সকল সীরাত লেখক, ওয়ায়েয, আলেম এই বাক্যকে এবং এ সকল কথাকে হাদীস বলে উল্লেখ করে চলেছেন। এই ভিত্তিহীন হাদীসটি, ইসলামের প্রথম ৫০০ বৎসরে যার কোনোরূপ অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়ন, তা বর্তমানে আমাদের মুসলিম সমাজে ঈমানের অংশে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এ হতে একটি কঠিন বিভ্রান্তি জন্ম নিয়েছে। উপরে আমরা দেখেছি যে, এই ভিত্তিহীন জাল হাদীসটিতে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তাঁর নূর হতে নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন।” এ থেকে কেউ কেউ বুঝেছেন যে, তাহলে আল্লাহর ‘সত্তা’ বা যাত একটি নূর বা নূরানী বস্তু। এবং আল্লাহ স্বয়ং তাঁর যাত বা সত্তার অংশ হতে তাঁর নবীকে সৃষ্টি করেছেন। কী জঘন্য শিরক! এভাবেই খৃস্টানগণ বিভ্রান্ত হয়ে শিরকে লিপ্ত হয়।
প্রচলিত বাইবেলেও যীশু খ্রীস্ট বারংবার বলেছেন যে, আমি মানুষ, আমাকে ভাল বলবেনা, আমি কিছুই জানিনা, ঈশ্বরই ভাল, তিনিই সব জানেন, একমাত্র তাঁরই ইবাদত কর…..ইত্যাদি। তবে যীশু ঈশ্বরকে পিতা ডেকেছেন। হিব্রু ভাষায় সকল নেককার মানুষকেই ঈশ্বরের সন্তান, ঈশ্বরের পুত্র ইত্যাদি বলা হয় এবং ঈশ্বরকে পিতা ডাকা হয়। তিনি বলেছেন: ‘যে আমাকে দেখল, সে ঈশ্বরকে দেখল।’ এইরূপ কথা সকল নবীই বলেন। কিন্তু ভন্ড পৌল হতে শুরু করে অতিভক্তির ধারা শক্তিশালী হতে থাকে। ক্রমান্বয়ে খ্রীস্টানগণ দাবি করতে থাকেন যীশু ঈশ্বরের ‘যাতের’ অংশ’। ঈশ্বর তাঁর সত্তা বা যাতের অংশ(Same substance) দিয়ে পুত্রকে সৃষ্টি করেন….। ৪র্থ-৫ম শতাব্দী পর্য্ন্ত আলেকজান্দ্রিয়ার প্রসিদ্ধ খৃস্টান ধর্মগুরু আরিয়াস ও তার অনুসারীগণ যীশুকে ঈশ্বরের সত্তার অংশ নয় বরং সৃষ্ট বা মাখলুক বলে প্রচার করেছেন। কিন্তু অতিভক্তির প্লাবনে তাওহীদ হেরে যায় ও শিরক বিজয়ী হয়।
এই মুশরিক অতিভক্তগণও সমস্যায় পড়ে গেল। বাইবেলেরই অগণিত আয়াতে যীশু স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আমি মানুষ। তিনি মানুষ হিসেবে তাঁর অজ্ঞতা স্বীকার করেছেন। এখন সমাধান কী? তারা ‘দুই প্রকৃতি তত্ত্বের’ আবিষ্কার করলেন। তারা বললেন, খৃস্টের মধ্যে দুটি সত্তা বিদ্যমান ছিল। মানবীয় সত্তা অনুসারে তিনি এই কথা বলেছেন। তবে প্রকৃতপক্ষে তিনি ঈশ্বর ছিলেন….।(বাইবেল: মথি ৪/১০; ১৯/১৭, মার্ক ১২/২৮, ২৯, ১৩/৩২, করিন্থীয় ৮/৬: গালাতীয়।)।
মুসলিম সমাজে আজ অনেকে এভাবে শিরকের মধ্যে নিপতিত হচ্ছেন। এই হাদীসটি যদি সহীহ বলে প্রমাণিত হতো তাহলেও এর দ্বারা একথা বুঝা যেতনা। আল্লাহ আদমের মধ্যে ‘তাঁর রূহ’ দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। ঈসা(আ) কে ‘আল্লাহর রূহ’ বলা হয়েছে। এতে কখনোই তাঁর নিজের রূহের অংশ বুঝানো হয়নি। বরং তাঁর তৈরি ও সৃষ্ট রূহকে বুঝানো হয়েছে। অনুরূপভাবে তাঁর নূর বলতেও একই কথা বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
আমাদের উচিত কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীসগুলির উপর নির্ভর করা এবং ভিত্তিহীন কথাগুলি রাসূলুল্লাহ(সা) এর উপর না বলা।
১০. নূরে মুহাম্মাদীর ময়ূররূপে থাকা
এ বিষয়ক প্রচলিত অন্যান্য কাহিনীর মধ্যে রয়েছে নূরে মুহাম্মাদীকে ময়ূর আকৃতিতে দেখা। এ বিষয়ক সকল কথাই ভিত্তিহীন। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা মাঊযূ হাদীসের গ্রন্থে এর কোনো প্রকার সনদ বা ভিত্তি উল্লেখ পাওয়া যায়না। বিভিন্নভাবে গল্পগুলি লেখা হয়েছে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা শাজারাতুল ইয়াকীন নামক একটি বৃক্ষ সৃষ্টি করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ(সা) এর নূর মোবারককে একটি ময়ূর আকৃতি দান করত স্বচ্ছ ও শুভ্র মতির পর্দার ভিতর রেখে তাকে সেই বৃক্ষে স্থাপন করলেন….ক্রমান্বয়ে সেই নূর হতে সবকিছু সৃষ্টি করলেন…….রূহদিগকে তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করতে নির্দেশ দিলেন…..ইত্যাদি ইত্যাদি। এ সকল কথার কোনো সনদ কোথাও পাওয়া যায়না।
১১. রাসূলুল্লাহ(ﷺ ) তারকারূপে ছিলেন
আমাদের দেশে প্রচলিত ধারণা, রাসূলুল্লাহ(ﷺ ) আদম সৃষ্টির পূর্বে তারকারূপে বিদ্যমান ছিলেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন ভাষ্য প্রচলিত। যেমন, রাসূলুল্লাহ(ﷺ ) ফাতিমা(রা) কে বলেন, জিবরাঈল তোমার ছোট চাচা……ইত্যাদি। এ বিষয়ে প্রচলিত সকল কথাই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। আমাদের দেশের সুপ্রসিদ্ধ একটি ইসলামী কেন্দ্র হতে প্রকাশিত খুতবার বইতে লেখা হয়েছেঃ “হযরত আবূ হুরাইরা(রা) হতে বর্ণিত, হযরত রাসূলে কারীম(ﷺ ) হযরত জিবরাঈল(আ) কে জিজ্ঞেস করেন, হে জিব্রাঈল, আপনার বয়স কত? তিনি উত্তর দিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি এ সম্পর্কে কিছু জানিনা। তবে এটুকু বলতে পারি যে, চতূর্থ পর্দায়(আসমানে) একটি সিতারা আছে যা প্রতি ৭০ হাজার বছর পর সেখানে উদিত হয়। আমি উহা এ যাবত ৭০ হাজার বার শরীফ)”(অনুবাদে এভাবেই লেখা হয়েছে, যদিও মূল আরবীতে ৭২ বলা হয়েছে)উদিত হতে দেখেছি। এতদশ্রবণে হুজুর( ﷺ) বললেন, হে জিব্রাঈল, শপথ মহান আল্লাহর ইজ্জতের, আমি সেই সীতারা। (বুখারী)”(শাহ মুহাম্মাদ মোহেববুল্লাহ, পীর সাহেব ছারছীনা শরীফ, খুতবায়ে ছালেহীয়া, পৃ. ৪২)।
এ ধরনের সকল কথাই ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা যা হাদীস নামে প্রচলন করা হয়েছে। (ইবনু তাইমিয়া, আল-ইসতিগাসাহ ফির রাদ্দী আলাল বাকরী ১/১৩৮; মাজমূউল ফাতাওয়া ১৮/৩৬৬-৩৬৭; আব্দুল হাই লাখনবী, আল আসার, পৃ. ৪২-৪৩)।
তবে সবচেয়ে দুঃখজনক কথা হলো, এ ভিত্তিহীন কথাটিকে বুখারী শরীফের বরাত দিয়ে চালানো হয়েছে। আমরা দেখেছি যে, সীরাহ হালাবিয়া গ্রন্থের লেখক একজন অজ্ঞাতনামা লেখকের উপর নির্ভর করে এই জাল হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু আমরা কি একটু যাচাই করবো না? এ সকল ইসলামী কেন্দ্রে এমন অনেক আলিম রয়েছেন যারা যুগ যুগ ধরে বুখারী পড়াচ্ছেন। বুখারী শরীফের অনেক কপি সেখানে বিদ্যমান। কিন্তু কেউই একটু কষ্ট করে পুস্তকটি খুলে দেখার চেষ্টা করলেননা। শুধু সহীহ বুখারীই নয়, বুখারীর লেখা বা অন্য কারো লেখা কোনো হাদীসের গ্রন্থেই এই কথাটি সনদসহ বর্ণিত হয়নি। অথচ সেই জাল কথাটিকে বুখারীর নামে চালানো হলো।
কেউ কেউ এই ভিত্তিহীন কথাটিকে শুধু বুখারীর নামে চালানোর চেয়ে ‘বুখারী ও মুসলিম’ উভয়ের নামে চালানো উত্তম মনে করলেন। উক্ত প্রসিদ্ধ দ্বীনি কেন্দ্রের একজন সম্মানিত মুহাদ্দিস, যিনি বহু বৎসর যাবত ছাত্রদেরকে ‘সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম’ পড়িয়েছেন তিনি এই হাদীসটি উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘মুসলিম শরীফ ও বুখারী শরীফ।’[আল্লামা মুহা. মুস্তাফা হামিদী, মীলাদ ও কিয়াম(ছারছীনা দারূচ্ছুন্নাত লাইব্রেরী), পৃ. ১৮]।
আমরা মনে করি যে, এ সকল আলিম ও বুযুর্গ জেনেশুনে মিথ্যা বলেননি। তাঁরা অন্য আলিমদের উদ্ধৃতির উপর নির্ভর করেছেন। কিন্তু আলিমদের জন্য এটি কখনোই গ্রহণযোগ্য ওযর নয়। এখন আমরা যতই বলিনা কেন, যে এই হাদীসটি বুখারী শরীফ বা মুসলিম শরীফের কোথাও নেই, আপনারা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম খুলে অনুসন্ধান করুন….সাধারণ মুসলমান ও ভক্তগণ সে সকল কথায় কর্ণপাত করবেননা। তাঁরা কোনোরূপ অনুসন্ধান বা প্রমাণ ছাড়াই বলতে থাকবেন, এতবড় আলিম কি আর না জেনে লিখেছেন!!
রাসূলুল্লাহ( ﷺ) এর নূরত্ব বনাম মানবত্ব
নূরে মোহাম্মদীর বিষয়ে আরো অনেক জাল ও সনদবিহীন কথা ইবনু আরাবীর পুস্তকাদি, সীরাহ হালাবিয়া, শারহুল মাওয়াহিব ইত্যাদি পুস্তকে বিদ্যমান। এ সকল পুস্তকের উপর নির্ভর করে আমাদের দেশে ‘সাইয়াদুল মুরসালীন’ ও অন্যান্য সীরাতুন্নবী বিষয়ক পুস্তকে এগুলি উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলির বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব হচ্ছেনা। সংক্ষেপে আমরা বলতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ( ﷺ) কে নূর দ্বারা তৈরি করা হয়েছে অর্থে বর্ণিত ও প্রচলিত সকল হাদীসই বানোয়াট। পাঠক একটু খেয়াল করলেই বিষয়টি বুঝতে পারবেন। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতূর্থ হিজরী শতকে ‘সিহাহ সিত্তাহ’ সহ অনেক হাদীসের গ্রন্থ সংকলন করা হয়েছে। এ সকল গ্রন্থে অনেক সাধারণ বিষয়েও অনেক হাদীস সংকলন করা হয়েছে। সহীহ, হাসান, যয়ীফ হাদীসের পাশাপাশি অনেক জাল হাদীসও এ সকল গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। কিন্তু ‘রাসূলুল্লাহ( ﷺ) নূর দ্বারা তৈরি অর্থে একটি হাদীসও কোনো পুস্তকে পাওয়া যায়না।
মুহাদ্দিসগণ হাদীসের গ্রন্থসমূহে কত ছোটখাট বিষয়ে অধ্যায় ও অনুচ্ছেদ লিখেছেন। অথচ ‘নূরে মোহাম্মদী’ বিষয়ে কোনো মুহাদ্দিস তাঁর হাদীস গ্রন্থে একটি অনুচ্ছেদও লিখেননি। অনেক তাফসীরের গ্রন্থে বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যায় অনেক সহীহ, যয়ীফ ও জাল হাদীস আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু সূরা মায়েদার উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় কোনো প্রাচীন মুফাসসিরই রাসূলুল্লাহর নূর হতে সৃষ্টি বিষয়ক কোনো হাদীস উল্লেখ করেননি।
ইতিহাস ও সীরাত বিষয়ক বইগুলোতে অগণিত যয়ীফ ও ভিত্তিহীন রেওয়ায়াতের ভিত্তিতে অনেক অধ্যায় ও অনুচ্ছেদ রচনা করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামের প্রথম ৫০০ বৎসরে লেখা কোনো একটি ইতিহাস বা সীরাত গ্রন্থে ‘নূরে মুহাম্মাদী’ বিষয়টি কোনোভাবে আলোচনা করা হয়নি। আসলে রাসূলুল্লাহ(সা) এর যুগ হতে পরবর্তী ৫/৬শত বৎসর পর্য্ন্ত মুসলিম উম্মাহর কোনো ব্যক্তি বা দল ‘নূরে মুহাম্মাদী’ তত্ত্বের কিছুই জানতেননা।
এখন আমাদের সামনে শুধু থাকলো, সূরো মায়েদার উপরোক্ত আয়াতটি, যে আয়াতের তাফসীরে কোনো কোনো মুফাসসির বলেছেন যে, এখানে নূর বলতে রাসূলুল্লাহ( ﷺ) কে বুঝানো হয়েছে। এখানে আমাদের করণীয় কি?
আমাদেরকে নিম্নের বিষয়গুলির প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।
(১) কুরআন হাদীসের নির্দেশনাকে নিজের পছন্দ অপছন্দের উর্ধে্ব সর্বান্তকরণে গ্রহণ করার নামই ইসলাম। সুপথপ্রাপ্ত মুসলিমের দায়িত্ব হলো, ওহীর মাধ্যমে যা জানা যাবে তা সর্বান্তকরণে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করা এবং নিজের পছন্দ ও মতামতকে ওহীর অনুগত করা। পক্ষান্তরে বিভ্রান্তদের চিহ্ন হলো, নিজের পছন্দ বা অপছন্দ অনুসারে ওহীকে গ্রহণ করা বা বাদ দেওয়া।
(২) কুরআন হাদীসে বারংবার অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ(সা) বাশার বা মানুষ। এরশাদ করা হয়েছেঃ ‘আপনি বলুন, আমি মানুষ রাসূল ভিন্ন কিছুই নই’, ‘আপনি বলুন, আমি তোমাদের মতই মানুষ মাত্র’।(সূরা ১৭, ইসরা, ৯৩ আয়াত; সূরা ১৮, কাহাফ, ১১০ আয়াত; সূরা ৪১, ফুসসিলাত, ৬ আয়াত)। অনুরূপভাবে, অগণিত সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) বারংবার বলেছেন যে, ‘আমি মানুষ’, ‘আমি তোমাদের মতই মানুষ’। এর বিপরীতে কুরআন কারীমে বা হাদীস শরীফে একস্থানেও বলা হয়নি যে, ‘আপনি বলুন, আমি নূর’। কোথাও বলা হয়নি যে, ‘মুহাম্মাদ নূর’। শুধু কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো মুফাসসির বলেছেন যে, তোমাদের কাছে ‘নূর’ এসেছে বলতে রাসূলুল্লাহ( ﷺ) কে বুঝানো হয়েছে। এই ব্যাখ্যাও রাসূলুল্লাহ( ﷺ) বা কোনো সাহাবী থেকে প্রমাণিত নয়, বরং পরবর্তী কোনো কোনো মুফাসসির এমন কথা বলেছেন।
(৩) এখন আমরা যদি কুরআন ও হাদীসের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাই তবে আমাদের করণীয় কি পাঠক তা খুব সহজেই বুঝতে পেরেছেন। আমরা কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন নির্দেশকেই গ্রহণ করব। আর মুফাসসিরদের কথা তার স্থানেই রাখব।
আমরা বলতে পারি, কুরআন ও হাদীসের কোথাও রাসূলুল্লাহ( ﷺ) কে স্পষ্টত নূর বলা হয়নি। কাজেই তাঁর বিষয়ে একথা বলা হতে বিরত থাকাই শ্রেয়।
অথবা আমরা বলতে পারি, কুরআন হাদীসের নির্দেশ অনুসারে নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ( ﷺ) মানুষ। তবে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মানব জাতির পথপ্রদর্শনের আলোক বর্তিকা হিসেবে তাঁকে নূর বলা যেতে পারে।
(৪) কিন্তু যদি কেউ বলেন যে, তিনি ‘হাকীকতে’ বা প্রকৃত অর্থে নূর ছিলেন, মানুষ ছিলেননা, শুধু মাজাযী বা রূপক অর্থেই তাঁকে মানুষ বলা যেতে পারে, তবে আমরা বুঝতে পারি যে, তিনি মন মর্জি অনুসারে কুরআন হাদীসের সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন নির্দেশনা বাতিল করে এমন একটি মত গ্রহণ করলেন, যার পক্ষে কুরআন ও হাদীসের একটিও দ্ব্যর্থহীন বাণী নেই।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর মর্যাদার প্রাচীনত্ব বিষয়ক সহীহ হাদীস
উপরোক্ত বাতিল ও ভিত্তিহীন কথার পরিবর্তে আমাদের সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হাদীসের উপর নির্ভর করা উচিত। সহীহ হাদীসে ইরবাদ ইবনু সারিয়া(রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ(সা) কে বলতে শুনেছি, “যখন আদম তাঁর কাদার মধ্যে লুটিয়ে রয়েছেন(তাঁর দেহ তৈরি করা হয়েছে কিন্তু রূহ প্রদান করা হয়নি) সেই অবস্থাতেই আমি আল্লাহ তাআলার নিকট খাতামুন নাবিয়্যীন বা শেষ নবী রূপে লিখিত। আমি তোমাদেরকে এর শুরু সম্পর্কে জানাব। তা হলো আমার পিতা ইবরাহীম(রা) এর দোয়া, ঈসার(আ) সুসংবাদ এবং আমার আম্মার দর্শন। তিনি যখন আমাকে জন্মদান করেন তখন দেখেন যে, তাঁর মধ্য হতে একটি নূর(জ্যোতি) নির্গত হলো যার আলোয় তাঁর জন্য সিরিয়ার প্রাসাদগুলি আলোকিত হয়ে গেল।”(হাকিম, আল মুসতাদরাক ২/৬৫৬, ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১৪/৩১৩)।
অন্য হাদীসে আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, “তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কখন আপনার জন্য নব্যূয়ত স্থিরকৃত হয়? তিনি বলেনঃ যখন আদম দেহ ও রূহের মধ্যে ছিলেন তখন।”
ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান, সহীহ গরীব বলেছেন। (তিরমিযী, আস-সুনান ৫/৫৮৫)।
অন্য হাদীসে মাইসারা আল ফাজর(রা) বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ(সা) কে বললাম, আপনি কখন নবী ছিলেন(অন্য বর্ণনায়, আপনি কখন নবী হিসেবে লিখিত হয়েছিলেন)? তিনি বললেন, যখন আদম দেহ ও রূহের মধ্যে ছিলেন।” হাদীসটি হাকিম সংকলন করেছেন ও সহীহ বলেছেন। যাহাবীও হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। (হাকিম, আল মুসতাদরাক ২/৬৬৫)।
অন্য হাদীসে আবূ হুরাইরা(রা) বলেনঃ “নবী(সা) কে বলা হলো, কখন আপনার জন্য নব্যূয়ত স্থিরকৃত হয়? তিনি বলেন, আদমের সৃষ্টি ও তাঁর মধ্যে রূহ ফুঁক দেওয়ার মাঝে।” (হাকিম, আল মুসতাদরাক ২/৬৬৫)।
এই অর্থে একটি যয়ীফ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ৫ম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আবূ নূআইম ইসপাহানী(৪৩০ হি) ও অন্যান্য মুহাদ্দিস হাদীসটি সংকলন করেছেন। তাঁরা তাঁদের সনদে দ্বিতীয় হিজরী শতকের একজন রাবী সাঈদ ইবনু বাশীর(১৬৯ হি) থেকে হাদীসটি গ্রহণ করেছেন। এই সাঈদ ইবনু বাশীর বলেন, আমাকে কাতাদা বলেছেন, তিনি হাসান থেকে, তিনি আবূ হুরাইরা থেকে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেনঃ “আমি ছিলাম সৃষ্টিতে নবীগণের প্রথম এবং প্রেরণে নবীগণের শেষ।” (ইবনু কাসীর, তাফসীর ৩/৪৭০; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৩/১৯১; মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ১৭৯)।
এই সনদে দুটি দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, হাসান বসরী মুদাল্লিস রাবী ছিলেন। তিনি এখানে ‘আন’ বা ‘থেকে’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। দ্বিতীয়ত, এই হাদীসের বর্ণনাকারী সাঈদ ইবনু বাশীর হাদীস বর্ণনায় দুর্বল ছিলেন। কোনো কোনো মুহাদ্দিস তাকে চলনসই বলে বর্ণনা করেছেন। অনেকে তাকে অত্যন্ত দুর্বল বলে গণ্য করেছেন। যাহাবী, ইবনু হাজার আসকালানী প্রমুখ মুহাদ্দিস তাঁর বর্ণিত হাদীসগুলি নিরীক্ষা করে এবং সকল মুহাদ্দিসের মতামত পর্যালোচনা করে তাকে ‘যয়ীফ’ বা দুর্বল বলে গণ্য করেছেন।(নাসাঈ, আদ-দুআফা, পৃ. ৫২; ইবনুল জাওযী, আদ-দুআফা ১/৩১৪; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৩/১৯০-১৯২)।
এই হাদীসটিকে কেউ কেউ তাবিয়ী কাতাদার নিজের মতামত ও তাফসীর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইবনু কাসীর এই হাদীসের বিষয়ে বলেন, “ সাঈদ ইবনু বাশীরের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। সাঈদ ইবনু আবূ আরূবাও হাদীসটি কাতাদার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি কাতাদার পরে হাসান বসরী ও আবূ হুরাইরার নাম বলেন নি, তিনি কাতাদা হতে বিচ্ছিন্ন সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আর কেউ কেউ হাদীসটিকে কাতাদার নিজের বক্তব্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহই ভাল জানেন।”(ইবনু কাসীর, তাফসীর ৩/৪৭০)।
এই সর্বশেষ হাদীসটি ছাড়া উপরের ৪টি হাদীসেই সহীহ বা হাসান সনদে বর্ণিত হয়েছে। এ সকল হাদীস সুস্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যে, আদম(আ) এর সৃষ্টি প্রক্রিয়া পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁর শ্রেষ্ঠতম সন্তান, আল্লাহর প্রিয়তম হাবীব, খালীল ও রাসূল মুহাম্মাদ(সা) এর নব্যূয়ত, খতমে নব্যূয়ত ও মর্যাদা সম্পর্কে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ভিত্তিহীন, সনদবিহীন কথাগুলোকে আন্দাযে, গায়ের জোরে বা বিভিন্ন খোঁড়া যুক্তি দিয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলার প্রবণতা ত্যাগ করে এ সকল সহীহ হাদীসের উপর আমাদের নির্ভর করা উচিত।
১২. আদম যখন পানি ও মাটির মধ্যে
এখানে উল্লেখ্য যে, উপরের সহীহ বা হাসান হাদীসগুলির কাছাকাছি শব্দে জাল হাদীস প্রচারিত হয়েছে। একটি জাল হাদীসে বলা হয়েছেঃ “আদম যখন পানি ও মাটির মধ্যে ছিলেন তখন আমি নবী ছিলাম।”
১৩. যখন মাটিও নেই, পানিও নেই
কোনো কোনো জালিয়াত এর সাথে একটু বাড়িয়ে বলেছেন, “আদম যখন পানি ও মাটির মধ্যে ছিলেন তখন আমি নবী ছিলাম। এবং যখন পানিও ছিল না এবং মাটিও ছিল না তখন আমি নবী ছিলাম।”
আল্লামা সাখাবী, সুয়ূতী, ইবনু ইরাক, মোল্লা আলী কারী, আজলূনী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস একবাক্যে বলেছেন যে, এই কথাগুলি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।(সাখাবী, আল মাকাদিস, পৃ. ৩৩১, সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ২০৩; মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ১৭৮)।
১৪. রাসূলুল্লাহ (সা), আবূ বাকর ও উমার(রা) একই মাটির সৃষ্ট
রাসূলুল্লাহ(সা) এর নূর নিয়ে যেমন অনেক বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা কথা প্রচলিত হয়েছে, তেমনি তাঁর সৃষ্ট মাটির বিষয়েও কিছু কথা বর্ণিত হয়েছে।
একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছেঃ “মহান আল্লাহ আমাকে, আবূ বাকরকে ও উমারকে একই মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই মাটিতেই আমাদের দাফন হবে।”
হাদীসটি বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেকটি সনদই দুর্বল। ইবনুল জাওযী একটি সনদকে জাল ও অপরটিকে ‘ওয়াহী’ বা অত্যন্ত দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন। পক্ষান্তরে সুয়ূতী, ইবনু ইরাক, তাহের ফাতানী প্রমুখ মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, এই দুটি সনদ ছাড়াও হাদীসটি আরো কয়েকটি দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে। এ সকল সনদে দুর্বল রাবী থাকলেও মিথ্যায় অভিযুক্ত নেই। কাজেই সামগ্রিকভাবে হাদীসটি ‘হাসান’ বা গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য। (ইবনু আদী, আল-কামিল ৭/১৫০; খতীব বাগদাদী, তারীখ বাগদাদ ২/৩১৩; ইবনুল জাউযী, আল মাওদূআত ১/২৪৪)।
১৫. রাসূলুল্লাহ (সা), আলী (রা), হারূন(আ)…..একই মাটির সৃষ্ট
পঞ্চম শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আহমদ ইবনু আলী আবূ বাকর খতীব বাগদাদী তাঁর ‘তারীখ বাগদাদ’ গ্রন্থে একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। তাঁর সনদে তিনি বলেন, ….আবূ ইসহাক ইবরাহীম ইবনূল হুসাইন ইবনু দাউদ আল কাত্তান ৩১১ হিজরীতে তার ছাত্র মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলকে বলেছেন। আবূ ইসহাক বলেন, আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবনু খালাফ আল মারওয়াযী বলেছেন, আমাদেরকে মুসা ইবনু ইবরাহীম আল মারওয়াযী বলেছেন, আমাদেরকে ইমাম মূসা কাযিম বলেছেন, তিনি তাঁর পিতা জাফর সাদিক থেকে, তিনি তাঁর পিতামহদের সূত্রে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন, “ আমি, হারূন ইবনে ইমরান(আ), ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া(আ) ও আলী ইবনে আবূ তালিব একই কাদা হতে সৃষ্ট।”(খতীব বাগদাদী, তারীখ বাগদাদ ৬/৫৮)।
লক্ষ্য করুন, এই সনদে রাসূল বংশের বড় বড় ইমামদের নাম রয়েছে। কিন্তু মুহাদ্দিসগণ একমত যে, হাদীসটি জাল ও মিথ্যা কথা। এই সনদের দুজন রাবী মুহাম্মাদ ইবনু খালাফ ও তার ওস্তাদ মূসা ইবনু ইবরাহীম উভয়ই মিথ্যাচার ও জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত। এই দুজনের একজন হাদীসটি বানিয়েছে। তবে জালিয়াতির ক্ষেত্রে বেশি প্রসিদ্ধ ছিল উস্তাদ মূসার। (ইবনুল জাউযী, আল-মাওদূআত ১/২৫৩-২৫৪; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৬/১৩৫; সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/৩২০)।
১৬. রাসূলুল্লাহ(সা), ফাতেমা, হাসান, হুসাইন (রা) একই মাটি হতে সৃষ্ট
পঞ্চম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আবূ নুআইম ইসপাহানী তার ‘ফাযাইলুস সাহাবাহ’ গ্রন্থে একটি হাদীস সংকলন করেছেন। এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) ফাতেমাকে(রা) সম্বোধন করে হাসান হুসাইন সম্পর্কে বলেছেন, “আমি এবং তোমরা একই মাটি হতে সৃষ্ট হয়েছি।” সুয়ূতী, ইবনে ইরাক প্রমূখ মুহাদ্দিসগণ হাদীসটিকে জাল বলেছেন।(সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ৬২; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/৪০০)।
১৭. রাসূলুল্লাহ (সা) এর অস্বাভাবিক জন্মগ্রহণ
আমাদের সমাজের কিছু কিছু মানুষের মধ্যে প্রচলিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মাতৃগর্ভ হতে অস্বাভাবিকভাবে বা অলৌকিকভাবে বের হয়ে আসেন। এ সকল কথা সবই ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে আন্দাযে মিথ্যা বলা। রাসূলুল্লাহ(সা) এর জন্ম বিষয়ে সহীহ হাদীসের সংখ্যা কম। এগুলিতে বা এছাড়াও এ বিষয়ে সনদসহ যে সকল যয়ীফ বর্ণনা রয়েছে সেগুলিতে এ সব কথা কিছূই পাওয়া যায় না।
এখানে একটি কথা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আমাদের মধ্যে অনেকেই আবেগতাড়িত হয়ে বা অজ্ঞতাবশত মনে করেন, অলৌকিকত্ব সম্ভবত মর্যাদার মাপকাঠি। যত বেশি অলৌকিকত্ব তত বেশি মর্যাদা। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। এই ভুল ধারণাকে পুঁজি করে আমাদের দেশে খৃস্টান মিশনারীগণ বিভিন্ন স্থানে অপপ্রচার চালান। তাদের একটি লিফলেটে বলা হয়েছেঃ কে বেশি বড়? হযরত মুহাম্মাদ (সা) নাকি ঈসা মসীহ? ঈসা মসীহ বিনা পিতায় জন্মলাভ করেছেন আর হযরত মুহাম্মাদের (সা) পিতা ছিল। ঈসা মসীহ মৃতকে জীবিত করতেন কিন্তু হযরত মুহাম্মাদ(সা) করতেন না। ঈসা মসীহ মৃত্যুর স্দা গ্রহণ করেন নি, বরং সশরীরে আসমানে চলে গিয়েছেন, কিন্তু হযরত মুহাম্মাদ(সা) মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেছেন……..।
এভাবে মুসলিম আকীদার কিছু বিষয়কে বিকৃত করে এবং প্রচলিত ভুল ধারণাকে পূঁজি করে তারা মুসলিম জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
অলৌকিকত্ব কখনো মর্যাদার মাপকাঠি নয়। নবীদেরকে আল্লাহ অলৌকিকত্ব বা মুজিযা প্রদান করেন হেদায়াতের প্রয়োজন অনুসারে, মর্যাদা অনুসারে নয়। মর্যাদার মূল মানদন্ড হলো আল্লাহর ঘোষণা। এছাড়া দুনিয়ার ফলাফল আমরা পর্যালোচনা করতে পারি। বিস্তারিত আলোচনা এই বিষয়ে সম্ভব নয়। শুধুমাত্র খৃস্টানদের এই বিষয়টিই আমরা আলোচনা করি।
ঈসা(আ) এর জন্ম অলৌকিক। এছাড়া মৃতকে জীবিত করা, অন্ধকে বা কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করা ইত্যাদি বড় বড় অলৌকিক মুজিযা তাকে প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর মর্যাদা আল্লাহর কাছে বেশি নয়। কারণ প্রথমত আল্লাহর ঘোষণা। দ্বিতীয়ত জাগতিক ফলাফল ও তা প্রমাণ করে। খৃস্টানদের প্রচলিত বাইবেল হতে বিচার করলে বলতে হবে যে, মানুষকে সুপথে পরিচালিত করা ও হেদায়াতের ক্ষেত্রে ঈসা(আ) এর দাওয়াতের ফলাফল সবচেয়ে কম। আল্লাহর হুকুমে ঈসা অনেক রুগীকে সুস্থ করেছেন, মৃতকে জীবিত করেছেন। কিন্তু বাইবেল পড়লে মনে হয়, জীন ভূত তাড়ানো ছাড়া তাঁর আর কোনো কাজ ছিল না। কিন্তু তিনি অনেক অবিশ্বাসীকে বিশ্বাসী করতে পারেন নি। অনেক মৃত হৃদয়কে জীবিত করতে পারেন নি। আল্লাহর হুকুমে তিনি অন্ধকে দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন, কিন্তু বিশ্বাসে অন্ধকে চক্ষু দান করতে পারেন নি। মাত্র ১২ জন বিশেষ শিষ্যের বিশ্বাসও এত দুর্বল ছিল যে, তার গ্রেফতারের সময় একজন বিশ্বাসঘাতকতা করেন এবং একজন তাকে অস্বীকার করে…..।(পবিত্র বাইবেলঃ মথি ২৬/২০-৭৫; মার্ক ১৪/১৭-৭২; লূক ২২/১-৬২; যোহন ১৮/১-২৭)।
পক্ষান্তরে মহিমাময় আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ(সা) কে অনেক অলৌকিকত্ব প্রদান করেছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় অলৌকিকত্ব হলো লক্ষাধিক মানুষকে বিভ্রান্তির অন্ধত্ব থেকে বিশ্বাসের আলো প্রদান করা। লক্ষাধিক মৃত হৃদয়কে জীবন দান করা।
কাজেই অলৌকিকত্ব সম্পর্কে মিথ্যা, দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য কথাবার্তাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা, সেগুলোকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর মর্যাদার মাপকাঠি বা নবুয়তের প্রমাণ মনে করা ইসলামের মূল চেতনার বিপরীত। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ(সা) এর শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা ও নবুয়ত প্রমাণ করতে আল কুরআনই যথেষ্ঠ। এর পাশাপাশি সহীহ হাদীসগুলির আমরা নির্ভর করব। আমাদের মানবীয় বুদ্ধি, আবেগ বা যুক্তি দিয়ে কিছু বাড়ানো বা কমানোর কোনো প্রয়োজন আল্লাহর দ্বীনের নেই।
১৮. হিজরতের সময় সাওর গিরি গুহায় আবূ বাকরকে সাপে কামড়ানো
১৩শ শতকের মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়েদ দরবেশ হুত বলেন, “সীরাতুন্নবী লেখকগণ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ(সা) এর হিজরতের সময়ে গুহার মুখে গাছ জন্মেছিল, গুহার পিছনে দরজা প্রকাশিত হয়েছিল এবং সেখানে একটি নদী দেখা গিয়েছিল, এবং গুহার মধ্যে আবূ বাকরকে(রা) সাপে কামড় দিয়েছিল-এগুলি সবই বাতিল কথা যার কোনো ভিত্তি নেই।(দরবেশ হুত, আসনাল মাতালিব, পৃ. ২৮৬)।
১৯. মিরাজের রাত্রিতে পাদুকা পায়ে আরশে আরোহণ
আমাদের সমাজে অতি প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ কথা যে, মিরাজের রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ(সা) জুতা পায়ে আরশে আরোহণ করেছিলেন। কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট একটি কথা।
মিরাজের ঘটনা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসিদ্ধ ৬টি হাদীস গ্রন্থ সহ সকল হাদীস গ্রন্থে প্রায় অর্ধশত সাহাবী হতে মিরাজের ঘটনা বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। সিহাহ সিত্তার এ বিষয়ক হাদীসগুলি আমি ভালভাবে পড়ার চেষ্টা করেছি। এছাড়া মুসনাদ আহমাদ সহ প্রচলিত আরো ১৫/১৬টি হাদীস গ্রন্থে এ বিষয়ক হাদীসগুলি পাঠ করার চেষ্টা করেছি। এ সকল হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) এর সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গমনের কথা বারবার বলা হয়েছে। কুরআন কারীমেও তাঁর সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গমনের কথা বলা হয়েছে। তিনি সিদরাতুল মুনতাহার উর্ধে্ব বা আরশে গমন করেছেন বলে কোথাও উল্লেখ করা হয় নি।
রাফরাফে চড়া, আরশে গমন করা ইত্যাদি কোন কথা সিহাহ সিত্তা, মুসনাদে আহমদ ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ কোনো প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থে সংকলিত কোনো হাদীস নেই। ৫/৬শ শতাব্দী পর্যন্ত সংকলিত ইতিহাস ও সিরাত বিষয়ক পুস্তকগুলিতেও এ বিষয়ে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। দশম হিজরী শতাব্দী ও পরবর্তী যুগে সংকলিত সীরাতুন্নবী বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থে মিরাজের বিষয়ে রাফরাফে আরোহণ, আরশে গমন ইত্যাদি ঘটনা বলা হয়েছে। শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলবীর আলোচনা হতে আমরা দেখেছি, যে সকল হাদীস কোনো প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থে পাওয়া যায় না, বরং ৫ম হিজরী শতকে বা তার পরে কোনো মুহাদ্দিস বা বিষয়ভিত্তিক লেখক তা সংকলন করেছেন, সেগুলি সাধারণত বাতিল বা অত্যন্ত দুর্বল সনদের হাদীস। বিশেষত ১১শ-১২শ শতাব্দীর গ্রন্থাদিতে সহীহ, যয়ীফ ও মাউদূ সবকিছু একত্রে মিশ্রিত করে সংকলন করা হয়েছে।
আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল বাকী যারকানী(১১২২ হি) ‘আল মাওয়্যাহিব আল লাদুন্যিয়া’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা ‘শারহুল মাওয়াহিব’ গ্রন্থে আল্লামা রাযী কাযবিনীর একটি বক্তব্য উদ্বৃত্ত করেছেন। তিনি বলেন, “একটি সহীহ, হাসান বা যয়ীফ হাদীসেও বর্ণিত হয় নি যে, রাসূলুল্লাহ(সা) সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করেছিলেন। বরং বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তথায় এমন পর্যায় পর্যন্ত পৌছেছিলেন যে, কলমের খসখস শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। যিনি দাবি করবেন যে, রাসূলুল্লাহ(সা) সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করেছিলেন, তাকে তার দাবির পক্ষে প্রমাণ পেশ করতে হবে। আর কিভাবে তিনি তা করবেন। একটি সহীহ বা যয়ীফ হাদীসেও বর্ণিত হয় নি যে, তিনি আরশে আরোহণ করেছিলেন। কারো কারো মিথ্যাচারের প্রতি দৃকপাত নিষ্প্রয়োজন।’’(যারকানী, শারহুল মাওয়াহিব ৮/২২৩)।
সর্বাবস্থায় আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত একটি জাল হাদীসঃ “মিরাজের রাত্রি যখন রাসূলুল্লাহ(সা)কে উর্ধ্বাকাশে নিয়ে যাওয়া হলো এবং আরশে মুআল্লায় পৌঁছালেন, তখন তিনি তার পাদুকাদ্বয় খোলার ইচ্ছা করেন। কারণ আল্লাহ তাআলা মূসা(আ) কে বলেছিলেন, “তুমি তোমার পাদুকা খোল; তুমি পবিত্র ‘তুয়া’ প্রান্তরে রয়েছ।”(সূরা তাহা, আয়াত ১২)। তখন আল্লাহর পক্ষ হতে আহবান করে বলা হয়, হে মুহাম্মাদ, আপনি আপনার পাদুকাদ্বয় খুলবেন না। কারণ আপনার পাদুকাসহ আগমনে আরশ সৌভাগ্যমন্ডিত হবে এবং অন্যদের উপরে বরকতের অহংকার করবে। তখন রাসূলুল্লাহ(সা) পাদুকাদ্বয় পায়ে রেখেই আরশে আরোহণ করেন।”
এই কাহিনীর আগাগোড়া সম্পূর্ণটাই বানোয়াট। এ কাহিনীর উৎপত্তি ও প্রচারের পর থেকে মুহাদ্দিসগণ বারংবার বলেছেন যে, এ কাহিনী সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমাদের দেশের অনেক প্রাজ্ঞ্য মুহাদ্দিসও এ সকল মিথ্যা কথা নির্বিচারে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলে থাকেন। এ সকল কথা তাঁরা কোন্ হাদীস গ্রন্থে পেয়েছেন তাও বলেন না, খুঁজেও দেখেন না, আবার যারা খুঁজে দেখে এগুলির জালিয়াতির কথা বলেছেন তাঁদের কথাও পড়েন না বা শুনতে চান না। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও তাঁর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন।
আল্লামা রাযীউদ্দীন কাযবীনী, আহমদ ইবনু মুহাম্মাদ আল মাককারী, যারকানী, আব্দুল হাই লাখনবী, দরবেশ হুত প্রমুখ মুহাদ্দিস এই কাহিনীর জালিয়াতি ও মিথ্যাচার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আব্দুল হাই লাখনবী এ প্রসঙ্গে বলেনঃ “এই ঘটনা যে জালিয়াত বানিয়েছে আল্লাহ তাকে লাঞ্চিত করুন। রাসূলুল্লাহ(সা) এর মিরাজের ঘটনায় বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অনেক বেশি। এত হাদীসের মধ্যে একটি হাদীসেও বর্ণিত হয় নি যে, রাসূলুল্লাহ(সা) মিরাজের সময় পাদুকা পরে ছিলেন। এমনকি একথাও প্রমাণিত হয় নি যে, রাসূলুল্লাহ(সা) আরশে আরোহণ করেছিলেন।” (আব্দুল হাই লাখনবী, আল আসার, পৃ. ৩৭)।
২০. মিরাজের রাত্রিকে আত্তাহিয়্যাতু লাভ
আমাদের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি কথা হলো, রাসূলুল্লাহ(সা) মিরাজের রাত্রিতে আত্তাহিয়্যাতু লাভ করেন। এ বিষয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটির সারসংক্ষেপ হলো, রাসূলুল্লাহ(সা) যখন মিরাজের রাত্রিতে আল্লাহর সবচেয়ে নৈকট্যে পৌছান তখন মহান আল্লাহকে সম্ভাষণ করে বলেনঃ আত-তাহিয়্যাতু লিল্লাহি…….। তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ আস-সালামু আলাইকা……….। তখন রাসূলুল্লাহ(সা) চান যে, তাঁর উম্মাতের জন্যও সালামের অংশ থাক। এজন্য তিনি বলেনঃ আসসালামু আলাইনা ওয়া…….। তখন জিবরাঈল ও সকল আকাশবাসী বলেনঃ আশহাদু…..। কোনো কোনো গল্পকার বলেনঃ আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা………বাক্যটি ফেরেশতাগণ বলেন……।
এই গল্পটির কোনো ভিত্তি আছে বলে জানা যায় না। কোথাও কোনো গ্রন্থে সনদ সহ এই কাহিনীটি বর্ণিত হয়েছে বলে জানা যায় নি। মিরাজের ঘটনা বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে ও সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও কোনো সনদসহ বর্ণনায় মিরাজের ঘটনায় এই কাহিনীটি বলা হয়েছে বলে আমি দেখতে পাই নি। সনদবিহীনভাবে কেউ কেউ তা উল্লেখ করেছেন। (কুরতুবী, তাফসীর ৩/৪২৫)। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম সহ অন্যান্য সকল হাদীসের গ্রন্থে ‘আত-তাহিয়্যাতু’ বা তাশাহহুদ বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও একথা বলা হয় নি যে, মিরাজ হতে তা গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন হাদীসে বলা হয়েছে, সাহাবীগণ সালাতের শেষ বৈঠকে সালাম পাঠ করতেন। আল্লাহকে সালাম, নবীকে সালাম, জিবরাঈলকে সালাম……। তখন তিনি তাঁদেরকে বললেন, এভাবে না বলে তোমরা ‘আত-তাহিয়্যাতু……’ বলবে।(বুখারী, আস-সহীহ ১/২৮৭; মুসলিম আস-সহীহ ১/৩০১)।
সকল হাদীসেই এরূপ বলা হয়েছে। কোথাও দেখতে পাই নি যে, ‘আত-তাহিয়্যাতু’ মিরাজ হতে গ্রহণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২১. মুহুর্তের মধ্যে মিরাজের সকল ঘটনা সংঘটিত হওয়া
প্রচলিত একটি কথা, রাসূলুল্লাহ(সা) এর মিরাজের সকল ঘটনা মুহুর্তের মধ্যে সংঘটিত হয়ে যায়। তিনি সকল ঘটনার পর ফিরে এসে দেখেন পানি পড়ছে, শিকল নড়ছে, বিছানা তখনো গরম রয়েছে ইত্যাদি। এ সকল কথার কোনো ভিত্তি আছে বলে জানতে পারি নি।
আমি ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, সিহাহ সিত্তা সহ প্রায় ২০ খানা হাদীস গ্রন্থের মিরাজ বিষয়ক হাদীসগুলি আমি অধ্যয়ন করার চেষ্টা করেছি। অধিকাংশ হাদীসে মিরাজে ভ্রমণ, দর্শন ইত্যাদি সবকিছু সমাপ্ত হতে কত সময় লেগেছিল সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ করা হয় নি। তাবারানী সংকলিত একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেনঃ “অতঃপর প্রভাতের পূর্বে আমি মক্কায় আমার সাহাবীদের নিকট ফিরে আসলাম। তখন আবূ বাকর আমার নিকট আগমন করে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি গত রাতে কোথায় ছিলেন? আমি আপনার স্থানে আপনাকে খুঁজেছিলাম, কিন্তু আপনাকে পাই নি।…….তখন তিনি মিরাজের ঘটনা বলেন।”(হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৭৩-৭৪। হাদীসটির সনদের একজন রাবীকে কেউ কেউ নির্ভরযোগ্য বলেছেন এবং কেউ কেউ দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন)।
এ হাদীস হতে বুঝা যায় যে, রাসূল(সা) প্রথম রাতে মিরাজে গমন করেন এবং শেষ রাতে তিনি ফিরে আসেন। সারা রাত তিনি মক্কায় অনুপস্থিত ছিলেন। এইরূপ আরো দুই একটি হাদীস হতে বুঝা যায় যে, মিরাজের ঘটনায় রাসূলুল্লাহ(সা) রাতের কয়েক ঘন্টা সময় কাটিয়েছিলেন।(হাইসামী, মাজমাউয যা্ওয়াইদ ১/৭৫-৭৬; ইবনু হাজার, আল মাতালিব ৪/৩৮৯-৩৮১)।
মিরাজের ঘটনায় কত সময় লেগেছিল তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। এই মহান অলৌকিক ঘটনা আল্লাহ সময় ছাড়া বা অল্প সময়ে যে কোনো ভাবে তাঁর মহান নবীর জন্য সম্পাদন করতে পারেন। কিন্তু আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, হাদীসে যা বর্ণিত হয় নি তা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে না বলা। আমাদের উচিত এ ধরনের ভিত্তিহীন কথা তাঁর নামে না বলা। তিনি ফিরে এসে দেখেন শিকল নড়ছে, পানি গড়ছে, বিছানা তখনো গরম রয়েছে ইত্যাদি কথা কোনো সহীহ এমনকি যয়ীফ হাদীসে সনদসহ বর্ণিত হয়েছে বলে জানতে পারি নি।
মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়্যিদ দরবেশ হুত(১২৭৬হি) এ বিষয়ে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ(সা) মিরাজের রাত্রিতে গমন করেন এবং ফিরে আসেন কিন্তু তখনো তার বিছানা ঠান্ডা হয় নি, এ কথাটি প্রমাণিত নয়।” (দরবেশ হুত, আসানিল মাতালিব, পৃ. ১১২)।
২২. মিরাজ অস্বীকারকারীর মহিলায় রূপান্তরিত হওয়া
আমাদের দেশে প্রচলিত একটি বানোয়াট কাহিনীতে বলা হয়েছে, মিরাজের রাত্রিতে মুহুর্তের মধ্যে এত ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল বলে মানতে পারেনি এক ব্যক্তি। ঐ ব্যক্তি একটি মাছ ক্রয় করে তার স্ত্রীকে প্রদান করে নদীতে গোসল করতে যায়। পানিতে ডুব দেওয়ার পর সে মহিলায় রূপান্তরিত হয়। এক সওদাগর তাকে নৌকায় তুলে নিয়ে বিবাহ করেন…….অনেক বছর পর আবার ঐ মহিলা পুরুষে পরিণত হয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে দেখেন যে, তার স্ত্রী তখনো মাছটি কাটছে…….। এগুলি সবই বানোয়াট কাহিনী।
২৩. হরিণীর কথা বলা বা সালাম দেওয়া
আমাদের দেশে প্রচলিত একটি গল্প যে, একটি হরিণী রাসূলুল্লাহ(সা) কে সালাম দেয়, তাঁর সাথে কথা বলে, অথবা শিকারীর নিকট হতে তাঁর নাম বলে ছুটি নেয়…….ইত্যাদি। এ সকল কথার কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যায় না ।(মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ৯৫; দরবেশ হুত, আসনাল মাতালিব, পৃ. ৮৬, ২৮৮)।
২৪. হাসান হুসাইনের ক্ষুধা ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রহৃত হওয়া
আমাদের দেশের অতি প্রচলিত ওয়ায ও গল্প, হাসান-হুসাইনের অভুক্ত থেকে ক্রন্দন, বিবি খাদিজা(রা)(!!)[হাসান-হুসাইনের জন্মের অনেক বছর আগে খাদীজা(রা) ইন্তিকাল করেন], ফাতেমা(রা) ও আলীর(রা) কষ্ট, রাসূলুল্লাহ(সা) কর্তৃক ইহুদীর বাড়িতে কাজ করা, ইহুদী কর্তৃক রাসূলুল্লাহ(সা) কে আঘাত করা…….ইত্যাদি। এ সকল কাহিনী সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। এগুলির কোনো ভিত্তি আছে বলে আমার জানা নেই।
২৫. জাবিরের (রা) সন্তানদের জীবিত করা
প্রচলিত একটি গল্পে বলা হয়, হযরত জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ(রা) রাসূলুল্লাহ(সা) কে দাওয়াত দেন। ইত্যবসরে জাবিরের এক পুত্র আরেক পুত্রকে জবাই করে। এরপর সে ভয়ে পালাতে গিয়ে চুলার মধ্যে পড়ে গিয়ে পুড়ে মারা যায়। জাবির(রা) এর স্ত্রী এ সকল বিষয় গোপন রেখে রাসূলুল্লাহ(সা) এর মেহমানদারি করেন। …….এরপর মৃত পুত্রদ্বয়কে তাঁর সামনে উপস্থিত করেন।…..রাসূলুল্লাহ(সা) এর দোয়ায় তারা জীবিত হয়ে উঠে। …….
পুরো কাহিনীটি আগাগোড়াই বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা।(দরবেশ হুত, আসানাল মাতাদিল, পৃ. ২৮২)।
২৬. বিলালের জারি
প্রচলিত বিলালের জারির সকল কথাই বানোয়াট।
২৭. উসমান ও কুলসুমের (রা) দাওয়াত সংক্রান্ত জারি
এ বিষয়ক প্রচলিত জারিতে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট কথা।
২৮. উকাশার প্রতিশোধ গ্রহণ
একটি অতি পরিচিত গল্প উকাশার প্রতিশোধ নেওয়ার গল্প। মূল মিথ্যা কাহিনীর উপর আরো শত রঙ চড়িয়ে এ সকল গল্প বলা হয়। মূল বানোয়াট কাহিনী হলো, রাসূলুল্লাহ(সা) ইন্তিকালের পূর্বে সাহাবীগণকে সমবেত করে বলেন, আমি যদি কাউকে যুলুম করে থাকি তবে আজ সে প্রতিশোধ বা বদলা গ্রহণ করুক। এক পর্যায়ে উকাশা নামক এক বৃদ্ধ উঠে বলেন, এক সফরে আপনার লাঠির খোঁচা আমার কোমরে লাগে। উকাশা রাসূলুল্লাহ(সা) এর কোমরে লাঠির খোঁচা মেরে প্রতিশোধ নিতে চান। হাসান, হুসাইন, আবূ বাকর, উমার(রা) প্রমূখ নিজেদের দেহ পেতে দেন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য, কিন্তু তিনি তাতে রাজি হন নি। উকাশার দাবি অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ(সা) নিজের গায়ের জামা খুলে দেন। উকাশা তাঁর পেটে চুমু দেন এবং তাঁকে ক্ষমা করে দেন।……….ইত্যাদি।
পুরো ঘটনাটিই বানোয়াট। তবে সনদবিহীন বানোয়াট নয়, সনদসহ বানোয়াট। পঞ্চম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আবূ নুআইম ইসপাহানী তার ‘হিলইয়াতুল আউলিয়া’ গ্রন্থে এই হাদীসটি সংকলন করেছেন। তিনি বলেন, আমাদেরকে সুলাইমান ইবনু আহমাদ বলেছেন, আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবনু আহমদ আল-বারা বলেছেন, আমাদেরকে আব্দুল মুনয়িম ইবনু ইদরীস বলেছেন, তিনি তাঁর পিতা হতে, ওয়াহব ইবনু মুনাব্বিহ থেকে, তিনি জাবির ও ইবনু আব্বাস(রা) হতে…….এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
এই হাদীসের বর্ণনাকারী আব্দুল মুনয়িম ইবনু ইদরীস(২২৮ হি) তৃতীয় হিজরী শতকে বাগদাদের প্রসিদ্ধ গল্পকার ওয়ায়েয ছিলেন। ইমাম আহমদ ও অন্যান্য মুহাদ্দিস সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই ব্যক্তি জালিয়াত ছিলেন। তার ওয়াযের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য এইরূপ বিভিন্ন গল্প তিনি সনদসহ বানিয়ে বলতেন। এই হাদীসটিও তার বানানো একটি হাদীস। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, হাদীসটি জাল, বানোয়াট ও জঘন্য মিথ্যা কথা।(আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ৪/৭৩-৭৫; ইবনুল জাওযী ১/২১৯;সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/২৭৭-২৮২; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/৩২৬-৩৩১)।
২৯. ইন্তিকালের সময় মালাকুল মাওতের আগমন ও কথাবার্তা
প্রসিদ্ধ একটি গল্প হলো, রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের সময় মালাকুল মওতের আগমন বিষয়ক। গল্পটির সার সংক্ষেপ হলো, রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের সময় মালাকুল মওত একজন বেদুঈনের বেশে আগমন করেন এবং গৃহের মধ্যে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করেন। এক পর্যায়ে ফাতিমা(রা) অনুমতি প্রদান করেন। তিনি গৃহে প্রবেশের পর অনেক কথাবার্তা আলাপ আলোচনার পরে তাঁর পবিত্র রূহকে গ্রহণ করেন……..। গল্পটি বানোয়াট। গল্পটি মূলত উপরের জাল হাদীসের অংশ। আরো অনেক গল্পকার এতে রঙ চড়িয়েছেন। (ইবনুল জাউযী ১/২১৯; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/৩২৬-৩৩১)।
৩০. স্বয়ং আল্লাহ তাঁর জানাযার নামায পড়েছেন!
আরেকটি প্রচলিত ওয়ায ও গল্প হলো, রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের পরে তাঁর গোসল ও কাফন সম্পন্ন করা হয় এবং তাঁর মুবারক দেহকে মসজিদে রাখা হয়। প্রথমে স্বয়ং আল্লাহ তাঁর জানাযার সালাত আদায় করেন! গল্পটি বানোয়াট। এই গল্পটিও উপর্যুক্ত আব্দুল মুনয়িম ইবনু ইদরিসের বানানো গল্পের অংশ।(ইবনুল জাউযী ১/২১৯; সুয়ূতী আল-লাআলী ১/২৭৭-২৮২; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/৩২৬-৩৩১)।
৩১. ইন্তিকালের পরে ১০ দিন দেহ মুবারক রেখে দেওয়া!
খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার নামে প্রচারিত ‘রাহাতুল কুলুব’ নামক বইয়ের বিষয়ে ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি। এই বইয়ের ২৪শ মজলিশে খাজা নিজামুদ্দিন লিখেছেন, ২রা রবিউল আউয়াল ৬৫৬ হিজরিতে (৮/৩/১২৫৮ খৃ.) তিনি তার পীর শাইখ ফরীদ উদ্দীন এর দরবারে আগমন করলে তিনি বলেন, “আজকের দিনটা এখানেই থেকে যাও, কেননা আজ হযরত রেসালাতে পানাহ [রাসূলুল্লাহ(সা)] এর উরস মোবারক। কালকে চলে যেও। এরপর বললেন, ইমাম সাবী(রহ) হতে রাওয়ায়েত আছে যে, হযরত রেছালাতে পানাহ এর বেছাল মোবারক রবিউল আউয়াল মাসের ২ তারিখে। তাঁর দেহ মোবারক মোজেযার জন্য ১০ দিন রাখা হয়েছিল। দুনিয়ার জীবিত কালে তাঁর পছিনা(ঘাম) মোবারকের সুগন্ধ ছিল উৎকৃষ্ট সুগন্ধির চেয়েও উৎকৃষ্ট। সেই একই খুশবু একইভাবে বেরিয়েছে ঐ দশ দিন, একটুও কমেনি(সুবহানাল্লাহ)। হুজুর পাক(সা) এর মোজেযা দেখে কয়েক হাজার ইহুদী তখন মোসলমান হয়েছিল। এ দশদিনের প্রতিদিন গরীব মিসকিনদেরকে খাবার পরিবেশন করা হয়েছে বিভিন্ন বিবিদের ঘর হতে। ঐ সময় হুজুর (সা) এর নয়টি হুজরা ছিল এবং নয়দিন তাঁদের সেখান হতে দান করা হয়েছে। এবং দশম দিন, অর্থাৎ ১২ই রবিউল আউয়াল দান করা হয়েছে হযরত সিদ্দিকে আকবার আবূ বাকর(রা) এর ঘর হতে। এদিন মদীনার সমস্ত লোককে পেটভরে পানাহার করানো হয়েছে এবং এ দিনই তাঁর পবিত্র দেহ মোবারক দাফন করা হয়েছে। এজন্যই মোসলমানগণ ১২ই রবিউল আউয়াল উরস করে এবং ১২ ই রবিউল আউয়াল দিনটি উরস হিসেবে প্রসিদ্ধ।”(খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া, রাহাতিল কুলুব, পৃ. ১৫০)।
আমরা জানিনা, হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া(রাহ)এর গ্রন্থের মধ্যে পরবর্তীকালে কেউ এই কথাগুলি লিখেছে, নাকি কারো মুখ হতে গল্পটি শুনে হযরত ফরীদ উদ্দীন(রাহ) এই কথাগুলি সরলমনে বিশ্বাস করেছেন এবং বলেছেন। আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, এ সমস্ত বইয়ের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের কোনো উপায় নেই। পুরো বইটিও জাল হতে পারে।
সর্বাবস্থায় রাসূলুল্লাহ(সা) এর মুবারক দেহ ১০ দিন দাফন বিহীন রাখা, হাজার হাজার ইহুদীর ইসলাম গ্রহণ, ১০ দিন খানা খাওয়ানো ইত্যাদি সকল কথাই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের দিন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাঠক সালাত অধ্যায়ে, রবিউল আওয়াল মাসের আমল বিষয়ক আলোচনার মধ্যে জানতে পারবেন, ইনশা আল্লাহ। তবে মুসলিম উম্মাহ একমত যে, রাসূলুল্লাহ(সা) সোমবার পূর্বাহ্নে ইন্তিকাল করেন। পরদিন মঙ্গলবার তাঁর গোসল ও জানাযার সালাত আদায় শেষে দিবাগত সন্ধ্যায় ও রাতে তাঁকে দাফন করা হয়।
৩২. রাসূলুল্লাহ (সা) জন্ম থেকেই কুরআন জানতেন
আব্দুল হাই লাখনাবী বলেন, প্রচলিত যে সকল মিথ্যা কথা রাসূলুল্লাহ(সা) সম্পর্কে বলা হয় তার মধ্যে রয়েছেঃ “রাসূলুল্লাহ(সা) জন্মলগ্ন হতেই কুরআন জানতেন এবং পাঠ করতেন।”(আবদুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ৩৮)।
এ কথা শুধু মিথ্যাই নয়, কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াতের স্পষ্ট বিরোধী। কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছে, “আপনি তো জানতেন না যে, কিতাব কি এবং ঈমান কি….”(সূরা শুরা, আয়াত ৫২)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, “আপনি তো আশা করেন নি যে, আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হবে। ইহা তো কেবল আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহ।(সূরা কাসাস, আয়াত ৮৬)।
৩৩. রাসূলুল্লাহ (সা) জন্ম হতেই লেখাপড়া জানতেন
আব্দুল হাই লাখনাবী বলেন, ওয়ায়েযদের মিথ্যাচারের একটি নমুনাঃ “রাসূলুল্লাহ(সা) উম্মী বা নিরক্ষর ছিলেন না। তিনি প্রকৃতিগতভাবে শুরু হতেই লিখতে ও পড়তে সক্ষম ছিলেন।”
এই কথাটিও সনদবিহীন ভিত্তিহীন কথা এবং এটি কুরআন কারীমের স্পষ্ট আয়াতের বিরোধী। কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছে, “আপনিতো এর পূর্বে কোনো পুস্তক পাঠ করেন নি এবং নিজ হাতে কোনো পুস্তক লিখেন নি যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষন করবে।”(সূরা ২৯, আনকাবুত, আয়াত ৪৮)।
৩৪. রাসূলুল্লাহ (সা) এর পবিত্র দাঁতের নূর
আব্দুল হাই লাখনাবী বলেন, প্রচলিত আরেকটি মিথ্যা কাহিনী নিম্নরূপঃ “এক রাত্রিতে আয়েশা(রা) এর হাত হতে তাঁর সূঁচটি পড়ে যায়। তিনি তা হারিয়ে ফেলেন এবং খোঁজ করেও পান নি। তখন নবীজি(সা) হেসে উঠেন এবং তাঁর দাঁতের একটি আলোকরশ্মি বেরিয়ে পড়ে। এতে ঘর আলোকিত হয়ে যায় এবং সেই আলোয় আয়েশা(রা) তাঁর সূচটি দেখতে পান। (আবদুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ৪৫)।
আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, অনেক লেখক ও আলেম তাঁদের বিভিন্ন গ্রন্থে সহীহ কথার পাশাপাশি অনেক বাতিল কথাও সংযোজন করেছেন। এতে অনেক সময় সাধারণ মুসলমানগণ বিভ্রান্ত হন। যেমন দশম হিজরী শতকের একজন মোল্লা মিসকীন মোহাম্মাদ আল ফিরাহী(৯৫৪ হি) কর্তৃক ফার্সী ভাষায় লিখিত ‘মা’আরিজুন নব্যুয়ত’ নামক সিরাতুন্নবী বিষয়ক একটি পুস্তক এক সময় ভারতে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিল। এই গ্রন্থে উপরের ঐ মিথ্যা হাদীসটি সংকলিত হয়েছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লামা লাখনবী বলেনঃ “এ কথা ঠিক যে, এই জাল ও মিথ্যা কথাটি ‘মা’আরিজুন নব্যুয়ত’ গ্রন্থে ও অন্যান্য সীরাতুন্নবী গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এ সকল গ্রন্থের লেখকগণ শুকনো ভিজে(ভাল মন্দ) সব কিছুই জমা করতেন। কাজেই এ সকল বইয়ের সব কথার উপর শুধুমাত্র ঘুমন্ত বা ক্লান্ত(অজ্ঞ বা অসচেতন) মানুষরাই নির্ভর করতে পারে।……”(আব্দুল হাই লাখনবী, আল-আসার. পৃ. ৪৫-৪৬)।
৩৫. খলীলুল্লাহ ও হাবীবুল্লাহ
প্রচলিত একটি ‘হাদীসে কুদসী’তে আবূ হুরাইরা(রা) এর সূত্রে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেনঃ “আল্লাহ ইবরাহীমকে(আ) খলীল(অন্তরঙ্গ বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করেছেন, মূসাকে(আ) নাজীই(একান্ত আলাপের বন্ধু) হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং আমাকে হাবীব(প্রেমাস্পদ) হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অতঃপর আল্লাহ বলেছেন, আমার মর্যাদা ও মহিমার শপথ, আমি আমার হাবীবকে আমার খালীল ও নাজীই এর উপর অগ্রাধিকার প্রদান করব।”
হাদীসটি ইমাম বাইহাকী ‘শুআইবুল ঈমান’ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। তিনি তাঁর সনদে বলেন, দ্বিতীয় হিজরী শতকের রাবী মাসলামা ইবনু আলী আল খুশানী(১৯০ হি) বলেন, আমাকে যাইদ ইবনু ওয়াকি, কাসিম ইবনু মুখাইরিমা হতে, আবূ হুরাইরা থেকে বলেন….।” হাদীসটি উদ্বৃত্ত করে বাইহাকী বলেন, “এই মাসলামা ইবনু আলী মুহাদ্দিসগণের নিকট দুর্বল।”(বাইহাকী, শুআইবুল ঈমান, ২/১৮৫)।
মাসলামা ইবনু আলী নামক এই রাবীকে মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। আবূ যুরআ, বুখারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস তাকে ‘মুনকার’ ও একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বলেছেন। নাসাঈ, দারাকুতনী প্রমুখ মুহাদ্দিস তাকে ‘মাতরূক’ বা পরিত্যক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা মিথ্যা অভিযুক্ত রাবীকেই মাতরূক বলেন। হাকিম তাকে জাল হাদীস বর্ণনাকারী বলে উল্লেখ করেছেন। (নাসাঈ, আদ-দুআফা, পৃ. ৯৭; ইবনুল জাউযী, আদ-দুআফা ৩/১২০)।
এজন্য অনেক মুহাদ্দিস এ হাদীসটিকে জাল বলে উল্লেখ করেছেন; কারণ এই একমাত্র পরিত্যক্ত রাবী ছাড়া কেউ হাদীসটি বর্ণনা করেন নি। অপরপক্ষে কোনো কোনো মুহাদ্দিস মাসলামাকে অত্যন্ত দুর্বল রাবী হিসেবে গণ্য করে হাদীসটিকে দুর্বল বলে গণ্য করেছেন।
পক্ষান্তরে বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য মুহাদ্দিস সংকলিত সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ(সা)কেও খলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেনঃ “তিনি আমাকে খলীল(অন্তরঙ্গ বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করেছেন যেরূপ তিনি ইবরাহীমকে খলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।”(বুখারী, আস সহীহ ৩/১৩৩৭; মুসলিম, আস সহীহ ১/৩৭৭)।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর ইন্তিকাল পরবর্তী জীবন বা হায়াতুন্নবী
কুরআন কারীমের অনেক আয়াতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, শহীদগণ মৃত নন, তাঁরা জীবিত ও রিযকপ্রাপ্ত হন। নবীগণের বিষয়ে কুরআন মাজীদে কিছু বলা না হলেও সহীহ হাদীসে তাঁদের মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছে। আনাস ইবনু মালিক(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেনঃ “নবীগণ তাঁদের কবরের মধ্যে জীবিত, তাঁরা সালাত আদায় করেন।” হাদীসটির সনদ সহীহ।(বাইহাকী, হায়াতুল আম্বিয়া, পৃ. ৬৯-৭৪; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/২১১)।
অন্য একটি যয়ীফ সনদের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “নবীগণকে ৪০ রাতের পর তাঁদের কবরের মধ্যে রাখা হয় না; কিন্তু তাঁরা মহান আল্লাহর সম্মুখে সালাত রত থাকেন; শিংগায় ফুঁক দেওয়া পর্য্ন্ত।” হাদীসটির বর্ণনাকারী আহমাদ ইবনু আলী আল হাসনবী মিথ্যাবাদী ও জালিয়াত বলে পরিচিত। এজন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস একে মাউযূ বলে গণ্য করেছেন। অন্যান্য মুহাদ্দিস এ অর্থের অন্যান্য হাদীসের সমন্বয়ে একে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন।(দাইলামী, আল ফিরদাউস ১/২২২; ৩/৩৫; সুয়ূতী, আল লাআলী ১/২৮৫)।
বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ(সা) মি’রাজের রাত্রিতে মূসা(আ) কে নিজ কবরে সালাত আদায় করতে দেখেছেন এবং ঈসা(আ) কেও দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে দেখেছেন। আল্লামা বাইহাকী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস এই দর্শনকে উপরের হাদীসের সমর্থনকারী বলে গণ্য করেছেন।(বাইহাকী, হায়াতুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৭-৮৫)।
কোনো কোনো হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি কোনো কোনো পূর্ববর্তী নবীকে হজ্জ পালনরত অবস্থায় দেখেছেন। এ সকল হাদীসকেও কোনো কোনো আলিম নবীগণের মৃত্যু পরবর্তী জীবনের নিদর্শন বলে গণ্য করেছেন। ইবনু হাজার আসকালানী বলেন, এই দর্শনের বিষয়ে কাজী ইয়াজ বলেন, এই দর্শনের ব্যাখ্যায় বিভিন্ন কথা বলা হয়েছে। একটি ব্যাখ্যা হলো, নবীগণ শহীদদের চেয়েও মর্যাদাবান। কাজেই নবীগণের জন্য ইন্তিকালের পরেও এইরূপ ইবাদতের সুযোগ পাওয়া দূরবর্তী কিছু নয়। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো, তাঁরা জীবিত অবস্থায় যেভাবে হ্জ্জ করেছেন রাসূলুল্লাহ(সা) কে তার সূরাত দেখানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(সা) কে ওহীর মাধ্যমে যা জানানো হয়েছে তাকে তিনি দর্শনের সাথে তুলনা করেছেন……।(ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৬/৪৮৭)।
রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকাল পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বিশেষভাবে কিছু হাদীস বর্ণিত। আবূ হুরাইরা(রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন, “কেউ আমার কবরের নিকট থেকে আমার উপর দুরুদ পাঠ করলে আমি শুনতে পাই। আর যদি কেউ দূর হতে আমার উপর দুরূদ পাঠ করে তাহলে আমাকে জানানো হয়।”(বাইহাকী, হায়াতুল আম্বিয়া ১০৩-১০৫ পৃ.; সাখাবী, আল কাউলুল বাদী ১৫৪ পৃ.)। হাদীসটির একটি সনদ খুবই দুর্বল হলেও অন্য আরেকটি গ্রহণযোগ্য সনদের কারণে ইবনু হাজার, সাখাবী, সুয়ূতী প্রমুখ মুহাদ্দিস এই সনদটিকে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন।(সুয়ূতী, আল লাআলী ১/২৮৩; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/৩৫৫; দরবেশ হুত, আসনাল মাতালিব, পৃ. ২১৬)।
আউস(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেনঃ “তোমাদের দিনগুলির মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো শুক্রবার।…কাজেই, এই দিনে তোমরা আমার উপর বেশি করে দুরূদ পাঠ করবে, কারণ তোমাদের দুরূদ আমার কাছে পেশ করা হবে।” সাহাবীগণ বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তো (কবরের মাটিতে) বিলুপ্ত হয়ে যাবেন, মিশে যাবেন, কিভাবে তখন আমাদের দুরূদ আপনার নিকট পেশ করা হবে?” তিনি বলেন, “মহান আল্লাহ মাটির জন্য নিষেধ করেছেন নবীদের দেহ ভক্ষণ করা।”(নাসাঈ, আস-সুনান ৩/৯১; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৩৪৫; আবূ দাউদ, আস-সুনান ১/২৭৫, ২/৮৮)।
আরো অনেক সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে, মুমিন বিশ্বের যেখান থেকেই সালাম ও দুরূদ পাঠ করবেন, ফিরিশতাগণ সেই সালাত ও সালাম রাসূলুল্লাহ(সা)এর রওযা মোবারকে পৌছিয়ে দিবেন। আম্মার বিন ইয়াসির(রা) এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে বর্ণিতঃ “মহান আল্লাহ আমার কবরে একজন ফেরেশতা নিয়োগ করেছেন, যাকে তিনি সকল সৃষ্টির শ্রবণশক্তি প্রদান করেছেন, কিয়ামত পর্য্ন্ত যখনই কোনো ব্যক্তি আমার উপর সালাত(দুরূদ)পাঠ করবে তখনই ঐ ফেরেশতা সালাত পাঠকারীর নাম ও তাঁর পিতার নাম উল্লেখ করে আমাকে তাঁর সালাত পৌছে দিয়ে বলবে: অমুকের ছেলে অমুক আপনার উপর সালাত প্রেরণ করেছে।” হাদীসটি বাযযার, তাবারানী ও আবুশ শাইখ সংকলন করেছেন। হাদীসের সনদে পরস্পর বর্ণনাকারী রাবীদের মধ্যে দুইজন রাবী দুর্বল। এজন্য হাদীসটি দুর্বল বা যয়ীফ। তবে এই অর্থে আরো কয়েকটি দুর্বল সনদের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সেগুলির সামগ্রিক বিচারে নাসিরুদ্দীন আলবানী ও অন্যান্য কিছু মুহাদ্দিস এ হাদীসটিকে হাসান বা গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন।(সাখাবী, আল কাওলুল বাদী, পৃ. ১৫৩-১৫৫; আলবানী, আস সহীহা ৪/৪৩-৪৫)।
উপরের হাদীসগুলি হতে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ(সা)এর ইন্তিকালের পরে তাঁকে পুনরায় জীবন দান করা হয়েছে। এই জীবন বারযাখী জীবন, যা একটি বিশেষ সম্মান বা গায়েবী জগতের একটি অবস্থা। এ বিষয়ে হাদীসে যতটুকু বলা হয়েছে ততটুকুই বলতে হবে। হাদীসের আলোকে আমরা বলব, এই অপার্থিব ও অলৌকিক জীবনে তাঁর সালাত আদায়ের সুযোগ রয়েছে। কেউ সালাম দিলে আল্লাহ তাঁর রূহ মোবারককে ফিরিয়ে দেন সালামের জবাব দেয়ার জন্য। রাওযার পাশে কেউ সালাম দিলে তিনি তা শুনেন, আর দূর হতে সালাম দিলে তা তাঁর নিকট পৌছানো হয়। এর বেশি কিছুই বলা যাবে না। বাকি বিষয় আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে। বুঝতে হবে যে, উম্মাতের জানার প্রয়োজন নেই বিধায় রাসূলুল্লাহ(সা) বাকি বিষয়গুলি বলেন নি।
কিন্তু এ বিষয়ে অনেক মনগড়া কথা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলা হয়। এ সকল কথা বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বলা হয়। মুমিনের উচিত গায়েবী বিষয়ে সম্পূর্ণরূপে কুরআন হাদীসের উপর নির্ভর করা এবং এর অতিরিক্ত কিছুই না বলা। গায়েবী জগত সম্পর্কে আমরা শুধুমাত্র ততটুকু কথা বলব, যতটুকু রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদেরকে বলে গিয়েছেন। বাকি বিষয় আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে। এর বাইরে কিছু বলার অর্থই হলো: প্রথমত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নামে আন্দাযে মিথ্যা কথা বলা। দ্বিতীয়ত, আমরা দাবি করবো যে, গায়েবী বিষয়ে আমাদের জানা জরুরী এমন কিছু বিষয় না শিখিয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) চলে গিয়েছেন, ফলে এখন আমাদেরকে যুক্তি ও গবেষণার মাধ্যমে তা জানতে হচ্ছে।
৩৬. তাঁর ইন্তিকাল পরবর্তী জীবন জাগতিক জীবনের মতই
এ সকল বানোয়াট কথার মধ্যে অন্যতম হলো, রাসূলুল্লাহ(সা) ও নবীগণের ইন্তিকাল পরবর্তী এই বারযাখী জীবনকে পার্থিব বা জাগতিক জীবনের মতই মনে করা। এই ধারণাটি ভুল এবং তা কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবীগণের রীতির পরিপন্থী। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও সূফী মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়্যিদ দরবেশ হুত ও অন্যান্য মুহাদ্দিস এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের পরবর্তী ঘটনাগুলি বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থ পাঠ করলেই আমরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ(সা) কে কখনোই জাগতিক জীবনের অধিকারী বলে মনে করেন নি। খলীফা নির্বাচনের বিষয়, গোসলের বিষয়, দাফনের বিষয়, পরবর্তী সকল ঘটনার মধ্যেই আমরা তা দেখতে পাই। রাসূলুল্লাহর(সা) জীবদ্দশায় তাঁর পরামর্শ, দোয়া ও অনুমতি ছাড়া তাঁরা কিছুই করতেন না। কিন্তু তাঁর ইন্তিকালের পর কোনো সাহাবী কখনো তাঁর রাওযায় দোয়া, পরামর্শ বা অনুমতি গ্রহণের জন্য আসেন নি। সাহাবীগণ বিভিন্ন সমস্যায় পড়েছেন, যুদ্ধ বিগ্রহ করেছেন এবং বিপদগ্রস্ত হয়েছেন। কখনোই খোলাফায়ে রাশেদীন বা সাহাবীগণ দলবেঁধে বা একাকী রাসূলুল্লাহ(সা) এর রাওযা মোবারকে গিয়ে তাঁর কাছে দোয়া-পরামর্শ চান নি।
আবূ বকরের(রা)খিলাফত গ্রহণের পরই কঠিনতম বিপদে পতিত হয় মুসলিম উম্মাহ। একদিকে বাইরের শত্রু, অপরদিকে মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিদ্রোহ, সর্বোপরি প্রায় আধা ডজন ভন্ড নবী। মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্বের সংকট। কিন্তু একটি দিনের জন্যও আবূ বাকর(রা) সাহাবীদেরকে নিয়ে বা নিজে রাসূলুল্লাহ(সা) এর রাওজায় গিয়ে তাঁর নিকট দোয়া চান নি। এমনকি আল্লাহর নিকট দোয়া করার জন্য রাওযা শরীফে উপস্থিত হয়ে কোনো অনুষ্ঠান করেন নি।
রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের পরে ফাতিমা, আলী ও আব্বাস(রা) খলীফা আবূ বাকর(রা) এর নিকট রাসূলুল্লাহ(সা) এর পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তারিধাকার চেয়েছেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে অনেক মতভেদ ও মনোমালিন্য হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশার(রা)সাথে আমীরুল মুমিনীন আলীর(রা) কঠিন যুদ্ধ হয়েছে, আমীর মুয়াবিয়ার(রা) সাথেও তাঁর যুদ্ধ হয়েছে। এসকল যুদ্ধে অনেক সাহাবী সহ অসংখ্য মুসলিম নিহত হয়েছেন। কিন্তু এ সকল কঠিন সময়ে তাঁদের কেউ কখনো রাসূলুল্লাহ(সা) এর কাছে পরামর্শ চান নি। তিনি নিজেও কখনো এ সকল কঠিন মুহুর্তে তাঁর কন্যা, চাচা, জামাতা, খলীফা কাউকে কোনো পরামর্শ দেন নি। এমনকি কারো কাছে রূহানীভাবেও প্রকাশিত হয়ে কিছু বলেন নি। আরো লক্ষণীয় যে, প্রথম শতাব্দীগুলির জালিয়াতগণ এ সকল মহান সাহাবীর পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক জাল হাদীস বানিয়েছে, কিন্তু কোনো জালিয়াতও প্রচার করে নি যে, রাসূলুল্লাহ(সা) ইন্তিকালের পর রাওযা শরীফ থেকে বা সাহাবীগণের মজলিসে এসে অমুক সাহাবীর পক্ষে বা বিপক্ষে যুদ্ধ করতে বা কর্ম করতে নির্দেশ দিয়েছেন। (দরবেশ হুত, আসানিল মাতালিব, পৃ. ২৯৮-২৯৯)।
৩৭. তিনি আমাদের দরূদ সালাম শুনতে বা দেখতে পান আব্দুল হাই লাখনবী বলেন, প্রচলিত যে সকল বানোয়াট ও মিথ্যা কথা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে, “যদি কেউ রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে দুরূদ পাঠ করে, তবে সেই ব্যক্তি যত দূরেই থাক, তিনি কারো মাধ্যম ছাড়াই তা শুনতে পান।”(আব্দুল হাই লাখনাবী, আলআসার, পৃ. ৪৬)।
এই কথাটি শুধু সনদবিহীন, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও মিথ্যা কথাই নয়; উপরন্তু তা উপরের সহীহ হাদীসগুলির বিরোধী।
৩৮. তিনি মীলাদের মাহফিলে উপস্থিত হন
আব্দুল হাই লাখনবী আরো বলেন, প্রচলিত যে সকল বানোয়াট কথা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে, “মাওলিদের ওয়াযের মজলিসে তাঁর মাওলিদ বা জন্মের কথা উল্লেখের সময় তিনি নিজে সেখানে উপস্থিত হন। এ কথার উপরে তারা তাঁর মাওলিদের বা জন্মের কথার সময় সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শনের জন্য কিয়াম বা দাঁড়ানোর প্রচলন করেছে।”(আব্দুল হাই লাখনাবী, আলআসার, পৃ. ৪৬)। একথাটিও সনদহীন, ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। উপরন্তু এ কথা উপরে উল্লেখিত সহীহ হাদীসগুলির সুস্পষ্ট বিরোধী।
৩৯. মিলাদ মাহফিলের ফযীলত
বর্তমান যুগে প্রচলিত মিলাদ মাহফিল সম্পর্কে আলিমদের মতভেদ সুপরিচিত। আমি আমার লেখা ‘এহইয়াউস সুন্নাহ’ ও ‘রাহে বেলায়াত’ পুস্তকদ্বয়ে কুরআন, সুন্নাহ ও ইতিহাসের আলোকে মীলাদের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও এ বিষয়ে আলিমগণের মতামত বিস্তারিত আলোচনা করেছি।(দেখুন এহইয়াউস সুনান, পৃ. ৪৬১-৪৯৫; রাহে বেলায়াত, পৃ. ২৯৬-২৯৭)। আমরা দেখেছি যে, মীলাদ মাহফিলের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ(সা) এর মীলাদ, সীরাত, শামাইল, সুন্নাত ইত্যাদি আলোচনা করা, দুরূদ সালাম পাঠ করা ইত্যাদি সবই সুন্নাত সম্মত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নাম ও পদ্ধতিগত কারণে বিভিন্ন মতভেদ দেখা যায়। এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিভিন্ন মত পোষণ করার ও প্রমাণ পেশ করার অধিকার সকলেরই রয়েছে। কিন্তু জালিয়াতি করার অধিকার কারোই নেই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ বিষয়েও অনেক জালিয়াতি হয়েছে। আমাদের দেশের একজন প্রসিদ্ধ আলেম এ জাতীয় অনেক জাল ও মিথ্যা কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেনঃ “হযরত আবূ বাকর(রা) এর বাণীঃ যে ব্যক্তি মীলাদ পাঠের নিমিত্ত এক দিরহাম(চারআনা) দান করবে ঐ ব্যক্তি আমার সাথে বেহেশতে সাথী হবে। হযরত ওমার ফারূক (রা) এর বাণীঃ যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবীর তাযিম ও সম্মান প্রদর্শন করবে সে প্রকৃতপক্ষে ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করবে। হযরত ওসমান গনী(রা) এর বাণীঃ যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবীর জন্য এক দিরহাম দান করলো, সে যেন বদর বা হোনাইনের যুদ্ধে যোগদান করলো। হযরত আলী(রা) এর বাণীঃ যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবীর তাযীম করবে এবং মীলাদ পাঠের কারণ হবে, সে দুনিয়া হতে ঈমানের সাথে ইন্তেকাল করবে।(আল্লামা মুহাম্মাদ মোস্তফা হামিদী, মীলাদ ও কিয়াম, পৃ. ৭০)।
এভাবে আরো অনেক তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীর নামে অনেক জাল কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ(সা) ও সাহাবীগণের হাদীসের ভাষা, শব্দ ও পরিভাষা সম্পর্কে যার ন্যূনতম জ্ঞান আছে তিনিও বুঝতে পারবেন যে, এগুলি সবই জাল কথা। সর্বোপরি কোনো সহীহ, যয়ীফ বা জাল সনদেও এই কথাগুলি বর্ণিত হয় নি। ইসলামের প্রথম ৬/৭ শতাব্দীর মধ্যে লিখিত কোনো গ্রন্থে সনদ বিহীনভাবেও এই মিথ্যা কথাগুলি উল্লেখ করা হয় নি। গত কয়েক শতাব্দী ধরে দাজ্জাল জালিয়াতগণ এ সকল কথা বানিয়ে প্রচার করছে।
৪০. রাসূলুল্লাহ (সা) এর ইলমুল গায়েব এর অধিকারী হওয়া
আব্দুল হাই লাখনবী বলেন, প্রচলিত যে সকল মিথ্যা কথা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে প্রচারিত হয় তার অন্যমত হলোঃ “রাসূলুল্লাহ(সা) সৃষ্টির শুরু হতে শেষ পর্যন্ত সকলের ও সব কিছুর বিস্তারিত জ্ঞান প্রদত্ত হয়েছিলেন। যা কিছু অতীত হয়েছে এবং যা কিছু ভবিষ্যতে ঘটবে সবকিছুরই বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি জ্ঞান তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। ব্যাপকতায় ও গভীরতায় রাসূলুল্লাহ(সা) এর জ্ঞান ও তাঁর প্রতিপালক মহান আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য নেই(নাউজুবিল্লাহ)। শুধুমাত্র পার্থক্য হলো, আল্লাহর জ্ঞান অনাদি ও স্বয়ংজ্ঞাত, কেউ তাঁকে শেখান নি। পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহর জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তাঁর প্রভুর শেখানোর মাধ্যমে।”
আল্লামা লাখনবী বলেন, এগুলি সবই সুন্দর করে সাজানো মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। ইবনু হাজার মাক্কী তার ‘আল মিনাহুল মাক্কিয়াহ’ গ্রন্থে ও অন্যান্য প্রাজ্ঞ আলিম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই কথাগুলি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, সামগ্রিক ও ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। একমাত্র তিনিই সকল অদৃশ্য জ্ঞানের একমাত্র অধিকারী বা আলিমুল গাইব। এই জ্ঞান একমাত্র তাঁরই বিশেষত্ব ও তাঁরই গুণ। আল্লাহর পক্ষ হতে অন্য কাউকে এই গুণ প্রদান করা হয় নি। হ্যাঁ, আমাদের নবী(সা) এর জ্ঞান অন্য সকল নবী রাসূলের(আ) জ্ঞানের চেয়ে বেশি। গাইবী বা অতিন্দ্রিয় বিষয় সম্পর্কে তাঁর প্রতিপালক অন্যান্য সবাইকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তার চেয়ে অধিকতর ও পূর্ণতর শিক্ষা দিয়েছেন তাঁকে। তিনি জ্ঞান ও কর্মে পূর্ণতম এবং সম্মান ও মর্যাদায় সকল সৃষ্টির নেতা।(আব্দুল হাই লাখনবী, আল আসার, পৃ. ৩৮)।
মোল্লা আলী কারীও অনুরূপ কথা বলেছেন।(মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ৩২৩-৩২৫)।
৪১. রাসূল (সা) এর হাযির নাযির হওয়া
রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইলমুল গায়েব ও মীলাদে উপস্থিতির সাথে সম্পৃক্ত আরেকটি প্রচলিত বানোয়াট কথা যে, তিনি ‘হাযির নাযির’। হাযির-নাযির দুইটি আরবী শব্দ। হাযির অর্থ উপস্থিত; নাযির অর্থ দর্শক, পর্যবেক্ষক বা সংরক্ষক। ‘হাযির-নাযির’ বলতে বুঝানো হয় সদাবিরাজমান ও সর্বজ্ঞ বা সবকিছুর দর্শক। স্বভাবতই যিনি সদাসর্বত্র বিরাজমান ও সবকিছুর দর্শক তিনি সর্বজ্ঞ ও সকল যুগের সকল স্থানের গায়েবী জ্ঞানের অধিকারী। কাজেই যারা রাসূলুল্লাহ(সা) কে ‘হাযির-নাযির’ দাবি করেন, তাঁরা দাবি করেন যে, তিনি শুধু সর্বজ্ঞই নন, উপরন্তু তিনি সর্বত্র বিরাজমান।
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়ঃ
প্রথমত, এই গুণটি শুধুমাত্র আল্লাহর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ আল্লাহ বারংবার এরশাদ করেছেন যে, বান্দা যেখানেই থাক, আল্লাহ তাঁর সাথে আছেন, তিনি তার নিকটে আছেন…… ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ(সা) সম্পর্কে কখনো ঘুণাক্ষরেও কুরআন ও হাদীসে বলা হয় নি যে, তিনি সর্বদা উম্মতের সাথে আছেন, অথবা সকল মানুষের সাথে আছেন, অথবা কাছে আছেন, অথবা সর্বত্র উপস্থিত আছেন, অথবা সবকিছু দেখছেন। কুরআনের আয়াত তো দূরের কথা, একটি যয়ীফ হাদীসও দ্বর্থহীনভাবে এই অর্থে কোথাও বর্ণিত হয় নি। কাজেই যারা এই কথা বলেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে মিথ্যা কথা বলেন। কেননা কোনো সহীহ, যয়ীফ এমন কি মাঊদূ হাদীসেও বর্ণিত হয় নি যে, তিনি বলেছেন, ‘আমি হাযির-নাযির’। অথচ তাঁর নামে এই মিথ্যা কথাটি বলা হচ্ছে। এমনকি কোনো সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী বা ইমাম কখনোই বলেন নি যে, ‘রাসূলুল্লাহ(সা) হাযির-নাযির’।
দ্বিতীয়ত, কুরআন হাদীসে বারংবার অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ও দ্বর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ(সা) ইলমুল গায়েব বা গোপন জ্ঞানের অধিকারী নন। রাসূলুল্লাহ(সা) কে হাযির নাযির বলে দাবি করা উক্ত সকল স্পষ্ট ও দ্বর্থহীন আয়াত ও হাদীসের সুস্পষ্ট বিরোধিতা করা।
তৃতীয়ত, আমরা দেখেছি যে, বিভিন্ন হাদীসে তিনি বলেছেন, উম্মাতের দুরূদ-সালাম তাঁর কবরে উপস্থিত করা হয়। আর রাসূলুল্লাহ(সা)কে হাযির নাযির দাবি করার অর্থ হলো এ সমস্ত হাদীস সবই মিথ্যা।উম্মাতের দুরূদ সালাম তাঁর নিকট উপস্থিত হয় না বরং তিনিই উম্মাতের নিকট উপস্থিত হন!! কাজেই যারা এই দাবিটি করছেন তারা শুধু রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে মিথ্যা বলেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। উপরন্তু তারা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ(সা) কে মিথ্যাবাদী বলে সাব্যস্ত করছেন, নাঊযুবিল্লাহ! নাঊযুবিল্লাহ!!
এ সকল মিথ্যার উৎস ও কারণ
এখন পাঠকের মনে প্রশ্ন হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ(সা) এইরূপ ইলমুল গাইবের অধিকারী, হাযির-নাযির, ইত্যাদি যখন কোনো হাদীসেই বর্ণিত হয় নি এবং কুরআনেও এভাবে বলা হয় নি, তখন কেন অনেক মানুষ এগুলি বলছেন? তাঁরা কি কিছুই বুঝেন না?
এই বইয়ের পরিসরে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। তবে সংক্ষেপে বলা যায় যে, ইলমুল গায়েব, হাযির-নাযির ও অন্যান্য বিষয়ে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলার পিছনে দুটি কারণ প্রধানঃ
প্রথম কারণঃ এ বিষয়ক কিছু বানোয়াট কথা বা বিভিন্ন আলিমের কথার উপর নির্ভর করা। পাশাপাশি দ্বর্থবোধক বিভিন্ন আয়াত বা হাদীসের উপর নির্ভর করে সেগুলিকে নিজের মত অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা। আর এ সকল দ্বর্থবোধক আয়াত ও হাদীসের বিশেষ ব্যাখ্যাকে বজায় রাখতে অগণিত আয়াত ও হাদীসের স্পষ্ট অর্থকে বিকৃত করা বা ব্যাখ্যার মাধ্যমে সেগুলিকে বাতিল করে দেওয়া।
ইসলামের পূর্ববর্তী ধর্মগুলির বিভ্রান্তির যে চিত্র কুরআন কারীমে উল্লেখ করা হয়েছে তাতে আমরা দেখতে পাই যে, এই বিষয়টি ছিল বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ। একটি উদাহরণ উল্লেখ করছি। আল্লাহ ঈসাকে(আ)বিনা পিতায় জন্ম দিয়েছেন, তাকে আল্লাহর কালিমা ও আল্লাহর রূহ বলেছেন। কিন্তু কখনোই তাঁকে ঈশ্বর বা ঈশ্বরের সত্ত্বার(যাতের) অংশ বলেন নি। প্রচলিত বাইবেলেও নেই যে, যীশু নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেছেন। কিন্তু খৃস্টানগণ দাবি করলেন, যেহেতু ‘আল্লাহর কালাম’ আল্লাহর গুণ ও তাঁর সত্ত্বার অংশ, সেহেতু যীশু ঈশ্বরের অংশ। আল্লাহর রূহ তাঁরই সত্ত্বা। যেহেতু যীশুকে ঈশ্বরের আত্মা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেহেতু তিনি ঈশ্বরের যাতের অংশ, ঈশ্বরের জাত ও ঈশ্বর….(God Incarnate)। এই অপব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে তাঁরা বাইবেলের অগণিত স্পষ্ট বাক্যের অপব্যাখ্যা করে এই আসমানী ধর্মটিকে বিকৃত করে। এজন্য আল্লাহ এরশাদ করেছেনঃ
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ ۚ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَىٰ مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِّنْهُ ۖ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ ۖ وَلَا تَقُولُوا ثَلَاثَةٌ ۚ انتَهُوا خَيْرًا لَّكُمْ ۚ إِنَّمَا اللَّهُ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ سُبْحَانَهُ أَن يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ ۘ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ وَكِيلًا [٤:١٧١]
“হে কিতাবীগণ! দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত বলো না। মরিয়ম তনয় ঈসা মাসীহ আল্লাহর রাসূল, এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মরীয়মের নিকট প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁর থেকে(আগত)আত্মা (আদেশ)। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আন এবং বলিও না ‘তিন’…..।”(সূরা ৪, নিসাঃ আয়াত ১৭১)।
এভাবে আল্লাহ তাঁদেরকে বাড়িয়ে বলতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ যতটুকু বলেছেন ততটুকুই বল। তাকে আল্লাহর কালিমা ও আল্লাহর রূহ বল, কিন্তু এ থেকে বাড়িয়ে বা ব্যাখ্যা দিয়ে তাঁকে ‘ঈশ্বর’ বা ‘ঈশ্বরের জাত’ বলো না এবং ত্রিত্ববাদের শিরকের মধ্যে নিপতিত হয়ো না।
ইসলামের প্রথম যুগ থেকে যারা বিভ্রান্ত হয়েছে তাদের মধ্যেও একই কারণ বিদ্যমান। খারিজী, শিয়া, কাদারিয়া, জাবারিয়া, মুরজিয়া, মু’তাযিলী ইত্যাদি সকল সম্প্রদায়ই কুরআন সুন্নাহ মানেন। একটি কারণেই তারা বিভ্রান্ত হয়েছেন। কুরআন ও হাদীসে যা কিছু বলা হয়েছে সাহাবীগণ তা সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করতেন। এগুলির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য দেখতেন না বা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের চেষ্টা করতেন না। কুরআন-হাদীসে যা বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁরা তাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। যেমন, কুরআন কারীমের বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া কারো কোনো হুকুম নেই। আবার অন্যত্র বিভিন্ন বিষয়ে মানুষকে হাকিম বানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাহাবীগণ উভয় বিষয় সমানভাবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু খারিজীগণ একটিকে গ্রহণ করেছে এবং অন্য সকল নির্দেশকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে বাতিল করে দিয়েছে।
অনুরূপভাবে কুরআন কারীমে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার কথা ও কর্মের কারণে বিপদাপদের কথা বলা হয়েছে। তেমনি সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায় হয় তাও বলা হয়েছে। সাহাবীগণ উভয় কথা সমানভাবে বিশ্বাস করেছেন। এগুলির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য খুঁজেন নি। কিন্তু কাদারিয়া, জাবারিয়া, মু’তাযিলা বিভিন্ন সম্প্রদায় একটি কথাকে মূল হিসেবে গ্রহণ করে বাকি কথাগুলিকে বিভিন্ন অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বাতিল করে দিয়েছেন।
কুরআন কারীমে পাপীদের অনন্ত জাহান্নাম বাসের কথা বলা হয়েছে। আবার শিরক ছাড়া সকল পাপ আল্লাহ ইচ্ছা করলে ক্ষমা করতে পারেন বলেও বলা হয়েছে। অগণিত সহীহ হাদীসে পাপী মুমিনের শাস্তিভোগের পরে জান্নাতে গমনের কথা বলা হয়েছে। সাহাবীগণ সবগুলিই সমানভাবে মেনেছেন। কিন্তু বিভ্রান্ত সম্প্রদায়গুলি একটিকে মানতে অন্যটি বাতিল করেছেন।
‘ইলমুল গায়িব’ বা হাযির-নাযির কথাটি ইসলামের প্রথম কয়েকশত বৎসর ছিল না। পরবর্তীকালে এর উৎপত্তি। এ বিষয়েও একই বিষয় পরিলক্ষিত হয়।
কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া আসমান যমীনের কেউ গায়েব জানেন না। বিভিন্ন আয়াতে বারংবার বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ(সা) ‘গাইব’ বা অদৃশ্য বিষয় জানেন না। মক্কী সূরায়, মাদানী সূরায়, মদীনায় অবতীর্ণ একেবারে শেষের দিকের সূরারয় সকল স্থানেই তা বলা হয়েছে। (দেখুন সূরা: ৬, আনআম ৫০, ৫৯; সূরা: ৭, আরাফ, ১৮৮; সূরা: ৯, তাওবা ১০১; সূরা: ১০, ইউনূস, ২০; সূরা: ১১, হুদ, ৩১; সূরা ২১, আম্বিয়া, ১০৯, ১১১; সূরা: ২৭, নামল, ৬৫; সূরা: ৪৬, আহকাফ, ৯; সূরা: জিন, ২৫)।
এর বিপরীতে একটি আয়াতেও বলা হয় নি যে, তিনি ‘আলিমুল গাইব’। তিনি ‘গাইবের সবকিছু জানেন’ একথা তো দূরের কথা ‘তিনি গাইব জানেন’ এ ধরনের একটি কথাও কোথাও বলা হয়নি। তবে বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ এরশাদ করেছেন, এগুলি গাইবের কথা আপনাকে ওহীর মাধ্যমে জানালাম………ইত্যাদি।
বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, তিনি গাইব বা অদৃশ্য জ্ঞানের মালিক নন, তিনি মনের কথা জানেন না, তিনি গোপন কথা জানেন না এবং তিনি ভবিষ্যত জানেন না।
আয়েশা, উম্মু সালমা, আসমা বিনতে আবূ বাকর, আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ, আনাস ইবনু মালিক, আবূ সাঈদ খুদরী, সাহল ইবনু সা’দ, আমর ইবনুল আস প্রমুখ প্রায় দশ জন সাহাবী(রাদিআল্লাহু আনহুম) থেকে অনেকগুলি সহীহ সনদে বর্ণিত ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন যে, কেয়ামতের দিন অনেক মানুষ আমার কাছে(হাউজে পানি পানের জন্য)আসবে, যাদেরকে আমি চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে, কিন্তু তাদেরকে আমার কাছে আসতে দেওয়া হবে না, বাধা দেওয়া হবে। আমি বলব: এরাতো আমারই উম্মত। তখন বলা হবে: আপনার পরে তারা কি আমল করেছে তা আপনি জানেন না।(বুখারী, আস-সহীহ ৪/১৬৯১, ১৭৬৬, ৫/২৩৯১; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৯৩-১৭৯৪)।
এ সকল অগণিত সহীহ হাদীসের বিপরীতে একটি হাদীসও তিনি বলেন নি যে, আমি ‘আলিমুল গাইব’ বা আমি সকল গোপন জ্ঞানের অধিকারী, অথবা আমি তোমাদের সকল কথাবার্তা বা কাজকর্মের সময় উপস্থিত থাকি, অথবা আমি ঘরে বসেই তোমাদের সকল কাজকর্ম ও গোপন বিষয় দেখতে পাই……এরূপ কোনো কথাই তিনি বলেন নি।
তবে বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) অনেক ভবিষ্যতের সংবাদ প্রদান করেছেন, অনেক মানুষের গোপন বিষয় বলে দিয়েছেন, কোনো কোনো হাদীসে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্ন বা সালাতের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি জান্নাত, জাহান্নাম সবকিছু দেখেছেন। এসব ঘটনায় প্রমাণ হয় না যে, রাসূলুল্লাহ(সা) গায়েবের সব জ্ঞান জানতেন বরং মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয়তম রাসূলকে যতটুকু জানিয়েছেন তিনি ততটুকুই জানতেন। অর্থাৎ গায়েবের একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা।
মনে রাখতে হবে, দ্বর্থবোধক কথার জন্য দ্বর্থহীন বা সুস্পষ্ট কথা বাতিল করা যাবে না। বরং দ্বর্থহীন কথাকে ভিত্তি ধরে অস্পষ্ট বা দ্বর্থবোধক কথার ব্যাখ্যা করতে হবে। কোনো একক হাদীসের জন্য কুরআনের স্পষ্ট বাণী বা মুতাওয়াতির ও মশহুর হাদীস বাতিল করা যাবে না। প্রয়োজনে কুরআন ও প্রসিদ্ধ হাদীসের জন্য একক ও দ্বর্থবোধক হাদীসের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা করতে হবে।
কিন্তু যারা ইলমুল গায়েবের দাবি করেন তাঁরা এসব দ্বর্থবোধক বা ফযীলত বোধক আয়াত ও হাদীসকে মূল ধরে এর ভিত্তিতে অগণিত সুস্পষ্ট আয়াত ও হাদীসকে ব্যাখ্যার মাধ্যমে বাতিল করে দেন। পাঠকের হৃদয়ঙ্গমের জন্য এখানে তাঁদের এইরূপ তিনটি দলীল আলোচনা করছি।
(১) কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে রাসূলুল্লাহকে(সা) ‘শাহিদ’ বা ‘শাহীদ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।(সূরা ৩৩: আহযাব, ৪৫; সূরা ৪৮:ফাতহ, ৮; সূরা ৭৩: মুযাম্মিল, ১৫; সূরা ২: বাকারা ১৪৩; সূরা ৪: নিসা, ৪১; সূরা ১৬: নাহল, ৮৯; সূরা ২২: হাজ্জ, ৭৮)। এই শব্দ দুইটির অর্থ ‘সাক্ষী’, ‘প্রমাণ’, ‘উপস্থিত’(witness, evidence, present) ইত্যাদি। সাহাবীগণের যুগ থেকে পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মুফাসসিরগণ এই শব্দের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে ও সাক্ষীরূপে প্রেরণ করেছেন। যারা তাঁর প্রচারিত দ্বীন গ্রহণ করবেন, তিনি তাঁদের পক্ষে সাক্ষ্য দিবেন। এছাড়া পূর্ববর্তী নবীগণ যে তাদের দীন প্রচার করেছেন সে বিষয়েও তিনি এবং তাঁর উম্মাত সাক্ষ্য দিবেন। অনেকে বলেছেন, তাঁকে আল্লাহ তাঁর একত্বের বা ওয়াহদান্যিয়াতের সাক্ষী ও প্রমাণ-রূপে প্রেরণ করেছেন।(তাবারী ২২/১৮, ২৬/৭৩; ইবনু কাসীস ৩/৪৯৮)।
এখানে উল্লেখ্য যে, অনেক স্থানে মুমিনগণকেও মানবজাতির জন্য ‘শাহীদ’ বলা হয়েছে।(সূরা ২: বাকারা, ১৪৩; সূরা ২২: হাজ্জ, ৭৮)। অনেক স্থানে আল্লাহকে ‘শাহীদ’ বলা হয়েছে।(সূরা ৪: নিসা,৭৯, ১৬৬; সূরা ৫:মায়িদা, ১১৭; সূরা ১০:ইউনূস, ২৯; সূরা ১৩:রাদ, ৪৩; সূরা ১৭: ইসরা, ৯৬; সূরা ২৯:আনকাবুত, ৫২; সূরা ৩৩:আহযাব, ৫৫; সূরা ৪৬:আহকাফ, ৮; সূরা ৪৮:ফাতহ, ২৮)।
যারা রাসূলুল্লাহকে(সা) সকল অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী বা হাযির-নাযির বলে দাবি করেন তাঁরা এই দ্বর্থবোধক শব্দটির একটি বিশেষ অর্থ গ্রহণ করেন। এরপর সেই অর্থের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে কুরআনের সকল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বাণী বাতিল করে দেন। তাঁরা বলেন, ‘শাহীদ’ অর্থ উপস্থিত। কাজেই তিনি সর্বত্র উপস্থিত। অথবা ‘শাহীদ’ অর্থ যদি সাক্ষী হয় তাহলেও তাঁকে সর্বত্র উপস্থিত থাকতে হবে। কারণ না দেখে তো সাক্ষ্য দেওয়া যায় না। আর এভাবে তিনি সদা সর্বদা সর্বত্র বিরাজমান বা হাযির নাযির ও সকল স্থানের সকল গোপন ও গাইবী জ্ঞানের অধিকারী।
তাঁদের এই ব্যাখ্যা ও দাবির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়।
প্রথমত, তাঁরা এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবী, তাবেয়ী ও পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের মতামত নিজেদের মর্জিমাফিক বাতিল করে দিলেন।
দ্বিতীয়ত, তাঁরা একটি দ্ব্যর্থবোধক শব্দের ব্যাখ্যাকে মূল আকীদা হিসেবে গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে কুরআন ও হাদীসের অগণিত দ্ব্যর্থহীন নির্দেশনা নিজেদের মর্জিমাফিক বাতিল করে দিলেন। তাঁরা এমন একটি অর্থ গ্রহণ করলেন, যে অর্থে একটি দ্বর্থহীন আয়াত বা হাদীসও নেই। সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী বা কোনো ইমামও কখনো এ কথা বলেন নি।
তৃতীয়ত, তাঁদের এই ব্যাখ্যা ও দাবি মূলতই বাতিল। তাদের ব্যাখ্যা অনুসারে প্রত্যেক মুসলমানকেই ‘সর্বজ্ঞ’, ‘ইলমে গাইবের অধিকারী’ ও ‘হাযির-নাযির’ বলে দাবি করতে হবে। কারণ মুমিনগণকেও কুরআন মাজীদে ‘শাহীদ’ অর্থাৎ ‘সাক্ষী’ বা ‘উপস্থিত’ বলা হয়েছে এবং বারংবার বলা হয়েছে যে, তাঁরা পূর্ববর্তী সকল উম্মাত সহ পুরো মানব জাতির সম্পর্কে কেয়ামতের দিন সাক্ষ্য দিবেন। আর উপস্থিত না হলে তো সাক্ষ্য দেওয়া যায় না। কাজেই তাদের ব্যাখ্যা ও দাবি অনুসারে বলতে হবে যে, প্রত্যেক মুমিন সৃষ্টির শুরু থেকে বিশ্বের সর্বত্র সর্বদা বিরাজমান এবং সবকিছু দেখছেন ও শুনছেন। কারণ না দেখে তারা কিভাবে মানব জাতির পক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবেন?
النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنفُسِهِمْ ۖ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ ۗ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَىٰ بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ
“নবী মুমিনগণের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর এবং তাঁর স্ত্রী তাদের মাতা। এবং আল্লাহর কিতাবে আত্মীয়গণ পরস্পর পরস্পরের ঘনিষ্ঠতর।”(সূরা ৩৩: আহযাব, আয়াত ৬)। এখানে ‘আউলা’ শব্দটির মূল হলো ‘বেলায়েত’ অর্থাৎ বন্ধুত্ব, নৈকট্য, অভিভাবকত্ব ইত্যাদি। ‘বেলায়েত’ অর্জনকারীকে ‘ওলী’ অর্থাৎ বন্ধু, নিকটবর্তী বা অভিভাবক বলা হয়। ‘আউল’ অর্থ ‘অধিকতর ওলী’। অর্থাৎ ‘অধিক বন্ধু’, ‘অধিক নিকটবর্তী’, ‘অধিক যোগ্য’, বা ‘অধিক দায়িত্বশীল’।(more entitled, more deserving, worthier, closer)। এখানে স্বভাবতই ঘনিষ্ঠতর বা নিকটতর(closer) বলতে ভক্তি, ভালবাসা, দায়িত্ব, সম্পর্ক ও আত্মীয়তা ঘনিষ্ঠতা বুঝানো হচ্ছে। মুমিনগণ রাসূলুল্লাহকে তাঁদের নিজেদের সত্ত্বার চেয়েও বেশি আপন, বেশি প্রিয় ও আনুগত্য ও অনুসরণের বেশি হক্কদার বলে জানেন। এই ‘আপনত্বের’ একটি দিক হলো যে, তাঁর স্ত্রীগণ মুমিনদের মাতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। আবার উম্মাতের প্রতি রাসূলুল্লাহ(সা) এর দরদ ও প্রেম তার আপনজনদের চেয়েও বেশি। রাসূলুল্লাহ(সা) স্বয়ং এ আয়াতের ব্যাখ্যায় এ কথা বলেছেন। হযরত জাবির, আবূ হুরাইরা প্রমূখ সাহাবী(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেনঃ “প্রত্যেক মুমিনের জন্যই দুনিয়া ও আখিরাতে আমি তার অধিকতর নিকটবর্তী। তোমরা ইচ্ছা করলে আল্লাহর বাণী পাঠ করঃ “নবী মুমিনগণের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর”। কাজেই যে কোনো মুমিন যদি মৃত্যুবরণ করে এবং সে সম্পদ রেখে যায়, তবে তার উত্তরাধিকারীগণ যারা থাকবে তারা সেই সম্পদ গ্রহণ করবে। আর যদি সে ঋণ রেখে যায় বা অসহায় সন্তান সন্তুতি রেখে যায় তবে তারা যেন আমার নিকট আসে; সে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব আমার উপরেই থাকবে। কারণ আমিই তার আপনজন “(বুখারী, আস-সহীহ ২/৮০৫,৮৪৫; ৪/১৭৯৫; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৫৯২, ৩/১২৩৭,১২৩৮)।
কিন্তু ‘হাযির-নাযির’ এর দাবিদারগণ দাবি করেন যে, এখানে দৈহিক নৈকট্য বুঝানো হয়েছে। কাজেই তিনি সকল মুমিনের নিকট হাযির আছেন।
এখানেও আমরা দেখেছি যে, একটি বানোয়াট ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তারা কুরআন ও হাদীসের অগণিত দ্ব্যর্থহীন নির্দেশকে বাতিল করে দিচ্ছেন। তারা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ(সা) এর ব্যাখ্যাকেও গ্রহণ করছেন না। সর্বোপরি তাদের এই ব্যাখ্যা সন্দেহাতীতভাবেই বাতিল।কারণ এই আয়াতেই বলা হয়েছে, “আত্মীয়গণ পরস্পর পরস্পরের ঘনিষ্ঠতর”। অন্যত্র ও বলা হয়েছে যে, “আত্মীয়গণ একে অপরের ঘনিষ্ঠতর বা নিকটতর”।(সূরা ৮:আনফাল, ৭৫)। তাহলে এদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আমাদের বলতে হবে যে, সকল মানুষই হাযির নাযির। কারণ সকল মানুষই কারো না কারো আত্মীয়। কাজেই তারা সদাসর্বদা তাদের কাছে উপস্থিত এবং তাদের সবকিছু দেখছেন ও শুনছেন!
অন্য আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে, নবী ও মুমিনগণ মানুষদের মধ্যে ইবরাহীম(আ) সবচেয়ে নিকটতর বা ঘনিষ্ঠতর।(সূরা ৩:আল ইমরান, ৬৮)। এখানে দাবি করতে হবে যে, সকল মুমিন ইবরাহীমের নিকট উপস্থিত……!
অন্য হাদীসে ইবনু আব্বাস(রা) বলেন, “যখন রাসূলুল্লাহ(সা) মদীনায় আগমন করেন, তখন ইহুদীদের আশুরায় সিয়াম পালন করতে দেখেন। তিনি তাদের এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। তারা বলে, এই দিনে আল্লাহ মূসা(আ) ও ইস্রায়েল সন্তানদেরকে ফেরাউনের উপর বিজয় দান করেন। এজন্য মূসা(আ) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই দিন সিয়াম পালন করেন। তখন তিনি বলেনঃ “তোমাদের চেয়ে আমরা মূসা(আ) এর নিকটতর। একথা বলে তিনি এই দিনে সিয়াম পালনের নির্দেশ প্রদান করেন।”(বুখারী, আস-সহীহ ৩/১২৪৪; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৭৯৫)।
এখন এই ব্যাখ্যা অনুসারে আমাদের দাবি করতে হবে যে, আমরা মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক সদস্য মূসার কাছে উপস্থিত ও বিরাজমান!!
(৩) আনাস ইবনু মালিক(রা) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। সালাতের পরে আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে(অন্য বর্ণনায়, মিম্বরে আরোহণ করে) তিনি বলেনঃ হে মানুষেরা! আমি তোমাদের ইমাম। কাজেই তোমরা আমার আগে রুকু করবে না, সেজদা করবে না, দাঁড়াবে না এবং সালাত শেষ করবে না।(অন্য বর্ণনায়, কাতারগুলি পূর্ণ করবে।) কারণ আমি তোমাদেরকে দেখতে পাই আমার সামনে এবং আমার পেছনে, যখন তোমরা রুকু কর এবং যখন তোমরা সেজদা কর।(অন্য বর্ণনায়, সালাতের মধ্যে এবং রুকুর মধ্যে আমি আমার পেছন থেকে তোমাদেরকে দেখি যেমন আমি সামনে থেকে তোমাদেরকে দেখি)।(বুখারী, আস-সহীহ ১/১৬২, ২৫৩; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৩২০, ৩২৪)।
এই হাদীস হতে আমরা রাসূলুল্লাহ(সা) এর একটি বৈশিষ্ট্যের কথা জানতে পারছি। হাদীসটি পাঠ করলে বা শুনলে যে কেউ অনুভব করবেন যে, বিষয়টি স্বাভাবিক দৃষ্টি ও দর্শনের বিষয়ে। মানুষ সামনে যেরূপ সামনের দিকে দেখতে পায়, রাসূলুল্লাহ(সা) সালাতের মধ্যে সেভাবেই পিছনে দেখতে পেতেন। হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে স্পষ্টভাবেই জানা যায় যে, এই দর্শন ছিল সালাতের মধ্যে ও রুকু সাজদার মধ্যে। অন্য সময়ে তিনি এইরূপ দেখতেন বলে কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। ইবনু হাজার আসকালানী বলেনঃ “হাদীসের বাহ্যিক বা স্পষ্ট অর্থ হতে বুঝা যায় যে, পিছন হতে দেখতে পাওয়ার এই অবস্থাটি শুধুমাত্র সালাতের জন্য খাস। অর্থাৎ তিনি শুধু সালাতের মধ্যেই এইরূপ পিছন হতে দেখতে পেতেন। এমনও হতে পারে যে, সর্বাবস্থায় তিনি এইরূপ দেখতে পেতেন। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ১/৫১৫)।
এই দ্বিতীয় সম্ভাবনা হাদীসের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিপরীত। তা সত্ত্বেও যদি তা মেনে নেওয়া হয় এবং মনে করা হয় যে, তিনি এইরূপ সর্বদা সামনে ও পেছনে দেখতে পেতেন, তবুও এ হাদীস দ্বারা কখনো বুঝা যায় না যে, তিনি দৃষ্টির আড়ালে, ঘরের মধ্যে, পর্দার অন্তরালে, মনের মধ্যে বা অনেক দূরের সবকিছু দেখতে পেতেন। তা সত্ত্বেও যদি কুরআন ও হাদীসের বিপরীত ও বিরোধী না হতো, তবে আমরা এই হাদীস হতে দাবি করতে পারতাম যে, তিনি এভাবে সর্বদা সর্বস্থানের সর্বকিছু দেখতেন এবং দেখছেন। কিন্তু আমরা দেখছি যে, বিভিন্ন আয়াতে এবং অগণিত সহীহ হাদীসে সুস্পষ্টত এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে বারংবার এর বিপরীত কথা বলা হয়েছে। মূলত মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম রাসূলুল্লাহ(সা) এইরূপ ঝামেলা ও বিড়ম্বনার দায়িত্ব হতে উর্ধে্ব রেখেছেন।
কিন্তু ইলমুল গাইব বা হাযির-নাযির দাবিদারগণ এখানে ‘তোমাদেরকে দেখতে পাই’ কথাটির ব্যাখ্যায় বলেন যে, তিনি সদা সর্বদা সর্বস্থানে সর্বজনকে দেখতে পান। আমরা দেখছি যে, এই ব্যাখ্যটি শুধু হাদীসের বিকৃতিই নয়, উপরন্তু অগণিত আয়াত ও সহীহ হাদীসের সুস্পষ্ট বিরোধী।
সর্বোপরি সামনে ও পেছনে দেখা বা গায়েবী দেখা দ্বারা ‘সদা সর্বদা সর্বত্র উপস্থিত’ বা সবকিছু দেখা প্রমাণিত হয় না। কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছে যে, শয়তান ও তার দল মানুষকে গায়েবীভাবে দেখেঃ “সে(শয়তান)ও তার দল তোমাদিগকে এমনভাবে দেখে যে, তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না।”(সূরা ৭:আরাফ, আয়াত ২৭)।
এখানে কি কেউ দাবি করবেন যে, যেহেতু ‘তোমাদিগকে দেখে’ বর্তমানকালের ক্রিয়া, সেহেতু শয়তান ও তার দলের প্রত্যেকে সদা সর্বদা সকল স্থানের সকল মানুষকে একইভাবে দেখতে পাচ্ছে বা দেখেই চলছে?!
এভাবে আমরা আমরা দেখছি যে, রাসূলু্ল্লাহ(সা) এর নামে এ সকল বানোয়াট ও মিথ্যা কথা যারা বলেন, তারা তাদের কথাগুলির পক্ষে একটিও দ্ব্যর্থহীন সুস্পষ্ট আয়াত বা হাদীস পেশ করছেন না। তাঁরা অপ্রাসঙ্গিক বা দ্ব্যর্থবোধক কিছু আয়াত বা হাদীসকে মনগড়াভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং এরপর এইরূপ ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে তাঁরা অগণিত আয়াত ও সহীহ হাদীস বাতিল করে দেন। যারা এইরূপ ব্যাখ্যার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ(সা) এর মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চান তাঁদের নেক নিয়্যত ও ভক্তি ভালবাসার বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তাঁরা ভাল উদ্দেশ্যে ওহীর নামে মিথ্যা বলছেন এবং রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে এমন বলছেন যা তিনি কখনোই নিজের বিষয়ে বলেন নি।
দ্বিতীয় কারণ, এ সকল কথাকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর মর্যাদা বৃদ্ধিকর বলে মনে করা এবং এসকল কথা বললে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা, ভক্তি বৃদ্ধি ও পূর্ণতা বলে মনে করা।
নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ(সা) এর প্রতি ভক্তি ভালবাসা এবং তাঁর প্রশংসা করা ঈমানের মূল ও মুমিনের অন্যতম সম্বল। তবে এজন্য কুরআন কারীমের অগণিত আয়াত ও সহীহ হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশের বাইরে আমাদের যয়ীফ, বানোয়াট ও মিথ্যা কথা বলতে হবে বা যুক্তি, তর্ক, ব্যাখ্যা, সম্ভাবনা ইত্যাদি নিয়ে কিছু কথা বানাতে হবে এই ধারণাটিই ইসলাম বিরোধী।
এ সকল ক্ষেত্রে মুমিনের জন্য নাজাতের একমাত্র উপায় হলো, সকল ক্ষেত্রে বিশেষত আকীদা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আক্ষরিকভাবে কুরআন ও সুন্নাহর উপর নির্ভর করা। আমাদের বুঝতে হবে যে, আকীদা ও ধর্মীয় বিশ্বাস এমন একটি বিষয় যা প্রত্যেক মুমিনকেই একইভাবে বিশ্বাস করতে হবে। আমলের ক্ষেত্রে কোনো আমল কারো ক্ষেত্রে জরুরী আর কারো জন্য কম জরুরী বা অপ্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু বিশ্বাসের বিষয় তা নয়। তা সকলের জন্য সমান। এজন্য আলিমগণ বলেছেন যে, বিশ্বাসের ভিত্তি হবে কুরআন কারীম বা মুতাওয়াতির হাদীসের উপর। অর্থাৎ যে বিষয়টি বিশ্বাস করা মুমিনের জন্য প্রয়োজন সেই বিষয়টি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ(সা) তাঁর সাহাবীদেরকে জানিয়েছেন এবং সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায়ই জানিয়েছেন। আর এইরূপ বিষয় অবশ্যই কুরআন কারীমে থাকবে এবং ব্যাপক প্রচারিত ‘মুতাওয়াতির’ হাদীসে থাকবে।
এছাড়া আরো বুঝতে হবে যে, বিশ্বাসের ভিত্তি গাইবী বিষয়ের উপর। এ সকল বিষয়ে ওহীর নির্দেশনা ছাড়া কোনো ফায়সালা দেওয়া যায় না। কর্ম বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে সুস্পষ্ট বিধান নেই এরূপ নতুন নতুন বিষয় উদ্ভাবিত হয়, এজন্য সেক্ষেত্রে কিয়াস ও ইজতিহাদের প্রয়োজন হয়। যেমন মাইক, ধুমপান ইত্যাদি বিষয়। কিন্তু বিশ্বাস বা আকীদার বিষয় সেরূপ নয়। এগুলোতে নতুন সংযোজন সম্ভব নয়। এজন্য এ বিষয়ে কিয়াস বা ইজতিহাদ অর্থহীন। আল্লাহর গুণাবলী, নবীগণের সংখ্যা, মর্যাদা, ফিরিশতাগণের সংখ্যা, সৃষ্টি, কর্ম, দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়ে ইজতিহাদের কোনো সুযোগ নেই। কুরআন ও হাদীসে যেভাবে যতটুকু বলা হয়েছে তাই বিশ্বাস করতে হবে। এ সকল কথাকে আমরা ওহীর কথাকে যুক্তি দিয়ে সমর্থন করতে পারি, কিন্তু যুক্তি দিয়ে কোনো কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারি না।
এজন্য মুমিনের মুক্তির একমাত্র উপায় হলো, কুরআন কারীমের সকল কথাকে সমানভাবে গ্রহণ করা এবং কোনো কথাকে প্রতিষ্ঠার জন্য অন্য কথাকে বাতিল বা ব্যাখ্যা না করা। অনুরূপভাবে সকল সহীহ হাদীসকে সহজভাবে মেনে নেওয়া। ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে সাহাবীগণের অনুসরণ করা। যে বিষয়ে সহীহ হাদীসে স্পষ্ট কিছু নেই এবং সাহাবীগণও কিছু বলেন নি, সে বিষয়ে চিন্তা না করা, কথা না বলা ও বিতর্কে না জড়ানো। মহান আল্লাহ আমাদের নফসগুলিকে কুরআন ও সুন্নাহর অনুগত করে দিন। আমিন।
২.৫. আহলু বাইত, সাহাবী ও উম্মাত সম্পর্কে
রাসূলুল্লাহ(সা) এর সুমহান মর্যাদার স্বাভাবিক দাবী যে, তাঁর পরিবার পরিজন ও সাথী সহচরগণের মর্যাদা ও সম্মান হবে নবীগণের পরে বিশ্বের সকল যুগের সকল মানুষের উর্ধে্ব। কুরআন ও হাদীসে যদি তাঁদের বিষয়ে উল্লেখ নাও থাকত, তবুও তাঁদের মহোত্তম মর্যাদার বিষয়ে যেকোনো জ্ঞানী ও বিবেকবান মানুষ সহজেই অনুধাবন করতে পারতেন।
এই স্বাভাবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে এবং তাঁদের মহিমা, মর্যাদা ও সম্মান বর্ণনা করেছেন কুরআন কারীমের অনেক আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ(সা) এর অগণিত বাণী। এসকল আয়াত ও হাদীসের বিস্তারিত আলোচনার জন্য পৃথক পুস্তক প্রয়োজন। এসবের সারকথা হলো, রাসুলুল্লাহ(সা) এর পরিজনকে এবং সাহাবীগণকে ভালবাসা ও সম্মান করা মানে তাঁকে ভালবাসা ও সম্মান করা এবং ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কুরআন ও হাদীসের এসকল মহান বাণী, সহজ ও হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা অনেক মুর্খ ভক্তের হৃদয়কে তৃপ্ত করতে পারেন নি। তৃপ্ত করতে পারে নি অতিভক্তির ভন্ডামিতে লিপ্ত অগণিত মানুষকে। ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আজগুবি ও অবাস্তব কথা বানিয়েছে তাঁরা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে। এভাবে তারা তাঁর নামে মিথ্যা বলার জঘন্যতম পাপ করার সাথে সাথে ইসলামের বুদ্ধিভিত্তিক আবেদনকে কলুষিত করেছে। মুমিনের ঈমান ও জ্ঞানীর অনুভবকে অপবিত্র করেছে। নিচে এই জাতীয় মিথ্যা, বানোয়াট ও অনির্ভরযোগ্য কিছু কথা উল্লেখ করছি।
১. পাক পাঞ্জাতন
আহলু বাইতের মধ্য থেকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর সাথে আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন(রা) কে একত্রিত করে পাঁচজনের বিশেষ মর্যাদা জ্ঞাপক অনেক বানোয়াট ও মিথ্যা কথা “পাক পাঞ্জাতন” নামে প্রচলিত আছে। “পাক পাঞ্জাতন” বিষয়ক সকল কথা বানোয়াট ও জঘন্য মিথ্যা কথা।
হযরত আলী ও ফাতিমা(রা) এর কথাকে কেন্দ্র করে মূর্খরা অনেক বানোয়াট, আজগুবি ও মিথ্যা কথা রটনা করেছে। যেমনঃ হযরত ফাতিমা (রা) একদিন একটি পাখির গোশত খেতে চান। হযরত আলী(রা) অনেক চেষ্টা করেও পাখিটি ধরতে পারেন নি।.……। জঘন্য মিথ্যা কথা এসব।
২. বিষাদ সিন্ধু ও অন্যান্য প্রচলিত পুঁথি ও বই
বিষাদ সিন্ধু বইয়ের ৯৫% কথা মিথ্যা। বিষাদ সিন্ধু একটি উপন্যাস, কোনো ইতিহাস বা ধর্মীয় পুস্তক নয়। উপন্যাস হিসেবে এর মূল্যায়ন হবে। কিন্তু দুঃখজনক কথা হলো, সমাজের সাধারণ মানুষেরা এই ধরনের বইয়ের কথা সত্য বলে বিশ্বাস করে। বিশেষত রাসূলুল্লাহ(সা) কে জড়িয়ে যে সকল মিথ্যা কথা বলা হয়েছে সে বিষয়ে খুবই সতর্ক থাকা দরকার। হযরত মুআবিয়াকে(রা) ভবিষ্যদ্বাণী করা, মুহাম্মাদ হানুফার বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা, হযরত হুসাইনের গলায় বারংবার ছুরির আঘাতে ক্ষত না হওয়া……..তাঁর হত্যাকারীর বেহেশতে নেওয়া ইত্যাদি সকল কথা বানোয়াট। মুহাম্মাদ হানুফা(মুহাম্মাদ ইবনু আলী, ইবনুল হানাফিয়্যাহ) বিষয়ক, ইয়াযিদের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ, তাঁর পাহাড়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকা ইত্যাদি কথা সবই মিথ্যা।
এখানে আরো উল্লেখ্য যে, বিষাদ সিন্ধু জাতীয় পুস্তাকাদি, পুঁথি সাহিত্য ও খাইরুল হাশর জাতীয় পুস্তকগুলিই আমাদের সমাজে মিথ্যা ও জাল হাদীস প্রচারের অন্যতম কারণ। এর পাশাপাশি রয়েছে ‘বার চাঁদের ফযীলত’, ‘নেক আমল’, ‘মকছুদুল মুমিনীন’, ‘নিয়ামুল কুরআন’, ‘নাফউল খালায়েক জাতীয় পুস্তক। সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ইসলামী শিক্ষার প্রসারে এ সকল পুঁথি পুস্তকের অবদান অনস্বীকার্য্। এ সকল পুস্তকের সম্মানিত লেখকগণ তাঁদের যুগের ও সময়ের সীমাবদ্ধতার মধ্য থেকে সাধ্যমত দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কল্যাণময় খেদমতের পাশাপাশি জাল হাদীস, ভিত্তিহীন কথাবার্তা, বিভিন্ন প্রকারের কুসংস্কার ও ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণার প্রসারেও এগুলি অবদান রেখেছে।
একসময় বাংলার যোগ্য আলিমগণ বাংলা ভাষায় পুস্তকাদি রচনা ‘দূষণীয়’ বলে গণ্য করতেন। এই ধ্বংসাত্মক বিভ্রান্তিই অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য আলিমদের ভুলভ্রান্তিপূর্ণ পুস্তক রচনার সুযোগ করে দেয়।
৩. ফাতিমা(রা) এর শরীর টেপার জন্য বাঁদী চাওয়া
এখানে অনুবাদের বিকৃতি ও মিথ্যার একটি নুমনা উল্লেখ করছি। প্রচলিত একটি পুস্তকে উল্লেখ লিখিত হয়েছে, “হাদীস শরীফে উল্লেখ আছেঃ একদিন বিবি ফাতিমা(রা) রাসূলুল্লাহ(সা) এর নিকট আসিয়া আরজ করিলেন, হে পিতা! আমাকে সমস্ত দিনই আটা পিষায় ও গৃহস্থালী কাজে নিয়োগ থাকিতে হয়। তাই আমার শরীরটা বেদনা ও দরদযুক্ত হইয়া যায়। অতএব আমাকে একটি বাঁদী ক্রয় করিয়া দিন যাতে সে আমার শরীরটা টিপিয়া দিতে ও গৃহকার্যে্ আমাকে সহায়তা করিতে পারে। তদুত্তরে হুজুর(সা) বলিলেন, হে মাতা! স্ত্রী লোকের পক্ষে আপন স্বামীর ও পরিবার পোষনের জন্য আটা পিষা গৃহ কার্যে্ আঞ্জাম করার ন্যায় পূণ্য কাজ আর কিছু্ই নাই। কিন্তু বাদী বা চাকরানীর সাহায্য নিলে ততদূর সাওয়াবের ভাগী হইতে পারিবে না। অতএব আমার উপদেশ মানিয়া সর্বদা নিম্নলিখিত দোয়া পাঠ করিতে থাক, নিশ্চয়ই তোমার শরীরের বেদনা দূর হইয়া যাইবে এবং শরীর সর্বদা সবল ও সুস্থ থাকিবে। আর অতিরিক্ত সাওয়াবও পাইবে। তখন হইতে বিবি ফাতিমা তাহাই করিতেন। দোওয়াঃ….. সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।”(মো. গোলাম রহমান, কাজী মাওলানা, মকছুদুল মো’মিনীন পৃ. ৫৫-৫৬)।
একটি সহীহ হাদীসের মনগড়া অনুবাদ করে এখানে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে অনেক মিথ্যা ও মনগড়া কথা বলা হয়েছে। উপরন্তু ফাতিমা(রা) এর জন্য অবমাননাকর কথাবার্তা বলা হয়েছে। মূল হাদীসটি বুখারী, মুসলিম ও অন্য সকল মুহাদ্দিস কাছাকাছি শব্দে সংকলন করেছেন। হাদীসটি নিম্নরূপঃ
“আলী (রা) বলেন যাঁতা চালানোর কারণে তাঁর হাতে কি কষ্ট হয় তা জানাতে ফাতিমা(আ) নবীজী(সা) এর নিকট গমন করেন। ফাতিমা শুনেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ(সা) এর নিকট কিছু যুদ্ধবন্দী দাস-দাসী এসেছে। তিনি রাসূলুল্লাহ(সা) এর বাড়িতে যেয়ে তাঁকে পান নি। তখন তিনি আয়েশা(রা)কে বিষয়টি জানান। যখন রাসূলুল্লাহ(সা) ঘরে আসেন তখন আয়েশা(রা) তাঁকে বিষয়টি জানান। আলী বলেন, আমরা রাতে বিছানায় শুয়ে পড়ার পর তিনি আমাদের নিকট আগমন করলেন। তখন আমরা উঠতে গেলাম। তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের জায়গাতেই থাক। তিনি এসে আমার ও ফাতিমার মধ্যখানে বসলেন। এমনকি আমি আমার পেটের উপর তাঁর পদযুগলের শীতলতা অনুভব করলাম। তিনি আমাদেরকে বললেন, তোমরা যা চাচ্ছ তার চেয়েও উত্তম বিষয় কি তোমাদের শিখিয়ে দেব না? তোমরা যখন তোমাদের বিছানায় শুয়ে পড়বে তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে। এই আমলটি তোমাদের জন্য দাসীর চেয়েও উত্তম। আলী বলেন, এরপর আমি কখনোই এই আমলটি ত্যাগ করি নি।”
এই হলো মূল ঘটনা, যা বুখারী ও মুসলিম সহ সকল মুহাদ্দিস বিভিন্ন সহীহ সনদে সংকলিত করেছেন। অথচ উপরের অনুবাদে সব কিছু বিকৃত করা হয়েছে এবং অনেক মিথ্যা কথা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলা হয়েছে।(সহীহ বুখারী ৩/১১৩৩, ৩/১৩৫৮, ৫/২০৫১, সহীহ মুসলিম ৪/২০৯১, ফাতহুল বারী ১১/১২০)।
৪. আবূ বাকর(রা) এর খেজুর পাতা পরিধান
প্রচলিত একটি পুস্তক হতে একটি ভিত্তিহীন কাহিনী উল্লেখ করছি। “ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পূর্বে হযরত আবু বাকর(রা)একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। যেদিন হযরত মুহাম্মাদ(সা) এর খেদমতে আসিয়া ইসলামে দীক্ষিত হইলেন সেইদিন হইতেই তাঁহার যাবতীয় সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় খরচ করিতে লাগিলেন। ……একদিন পরনের কাপড়ের অভাবে মসজিদে নামায পড়িতে যাইতে কিঞ্চিত দেরী হইয়াছিল। দেখিয়া হযরত মুহাম্মাদ(সা) বলিলেন, আবূ বাকর(রা), আমি জীবিত থাকিতেই ইসলামের প্রতি আপনাদের এত অবহেলা হইতেছে, আমি অভাবে আরও কত কি হয় বলা যায় না।…..তিনি বলিলেন, হুযুর আমার অবহেলার কিছুই নহে। বাস্তবিক আমার পরনে কাপড় ছিল না, সেই হেতু আমি ছোট একখানা কাপড়ের সহিত বালিশের কাপড় ছিঁড়িয়া খেজুর পাতা ও কাঁটা দ্বারা সেলাই করতঃ ধুইয়া ও শুকাইয়া পরিয়া আসিতে এত গৌণ হইয়াছে……..। ইহার কিছুক্ষণ পরে জীব্রাঈল সম্পূর্ণ খেজুর পাতার পোষাক পরিয়া হযরতের সম্মুখে হাজির হইলেন……। হযরত মুহাম্মাদ(সা)তাহাকে জিজ্ঞেস করিলেন, …….আজকে খেজুর পাতার পোষাক দেখিতেছি কেন? তদুত্তরে জীব্রাঈল(আ) বলিলেন, হযরত আবূ বাকর(রা) খেজুর পাতার সেলাই করা কাপড়ে নামায পড়িতে আসিয়াছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা সমস্ত ফেরেশতাগণকে ডাকিয়া বলিলেন, “দেখ হে ফেরেশতাগণ, আবূ বাকর আমার সন্তোষ লাভের জন্য কতইনা কষ্ট স্বীকার করিতেছেন। অতএব তোমরা যদি আজ অমার সন্তোষ চাও তবে এখনই আবূ বাকরের সম্মানার্থে সকলেই খেজুর পত্রের পোষাক পরিধান কর। নচেৎ আজই আমার দপ্তর হতে সমস্ত ফেরেশতার নাম কাটিয়া দিব।” এই কঠোর বাক্য শুনিয়া আমরা সকলেই তাঁহার সম্মানার্থে খেজুর পাতার পোশাক পরিধান করতে বাধ্য হইয়াছি।”(মো. গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, ১৪৯-১৫১)।
৫. আবূ বাকরের সাথে রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা উমার বুঝতেন না
জালিয়াতদের বানানো একটা কথা। উমার (রা) বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ(সা) যখন আবূ বাকর(রা) এর সাথে কথা বলতেন, তখন আমি তাঁদের মাঝে অনারব হাবশীর মত হয়ে যেতাম, যে কিছুই বুঝতে পারে না।”
জালিয়াত দাজ্জালরা বলতে চায় যে, রাসূলুল্লাহ(সা) আবূ বাকর(রা) এর সাথে এমন মারেফতী ভাষায়(!)কথা বলতেন যে, উমার(রা) ও তাঁদের কথা বুঝতে পারতেন না। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই কথাটি সনদবিহীন ভিত্তিহীন একটি মিথ্যা কথা।(ইবনুল কাইয়েম, আল মানার পৃ.১১৫, সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ.২০৩, ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/৪০৭, মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ৩৪২)।
৬. উমার(রা) কর্তৃক নিজ পুত্র আবু শাহমাকে দোররা মারা
প্রচলিত আছে যে, উমার(রা) তাঁর নিজ পুত্র আবু শাহমাকে ব্যভিচারের অপরাধে ১০০ বেত্রাঘাত করেন। এতে সেই পুত্রের মৃত্যু হয়। এই ব্যভিচার উদঘাটন, স্বীকারোক্তি, শাস্তি, পিতা-পুত্রের কথাবার্তা ইত্যাদি নিয়ে লম্বা চওড়া কাহিনী বলা হয়, যা শুনলে সাধারণ শ্রোতাগণের চোখে পানি আসে। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এগুলি ভিত্তিহীন মিথ্যা গল্প। ইবনুল জাওযী বলেন, “সাধারণ শ্রোতাগণকে কাঁদানোর জন্য জাহিল ওয়ায়িজগণ এগুলি বানিয়েছে।”(ইবনুল জাওযী, আল মাউদূআত ২/৪৪২)।
ইতিহাসে পাওয়া যায়, উমারের (রা) পুত্র আব্দুর রাহমান আবূ শাহমা মিশরের সেনাবাহিনীতে যুদ্ধরত ছিলেন। একদিন তিনি নাবীয বা খেজুর ভিজিয়ে তৈরি করা শরবত পান করেন। কিন্তু এই খেজুরের শরবতে মাদকতা এসে গিয়েছিল, ফলে আবূ শাহমার মধ্যে মাতলামি আসে। তিনি মিশরের প্রশাসক আমর ইবনুল আস(রা) এর নিকটে আগমন করে বলেন, আমি মাদকদ্রব্য পান করেছি, কাজেই আমাকে আপনি মাদক পানের শরীয়তী শাস্তি(বেত্রাঘাত) প্রদান করুন। আমর(রা) তাকে গৃহাভ্যন্তরে বেত্রাঘাত করেন। উমার(রা) তা জানতে পেরে আমরকে(রা) তিরস্কার করেন এবং বলেন সাধারণ মুসলিম নাগরিককে যেভাবে জনসমক্ষে শাস্তি প্রদান করা হয়, আমার পুত্রকেও সেভাবে শাস্তি প্রদান করা উচিত ছিল। আবূ শাহমা মদীনায় ফিরে গেলে তিনি নিজে তাকে পুনরায় শাস্তি প্রদান করেন। এর কিছুদিন পরে আবূ শাহমা ইন্তিকাল করেন। (ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূআত ২/৪৩৮-৪৪৩, ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/২২০)।
৭. উমার(রা) এর ইসলাম গ্রহণের দিনে কাবাঘরে আযান শুরু
প্রচলিত আছে যে, উমার(রা) যেদিন ইসলাম গ্রহণ করেন, সেই দিন হতে কাবাঘরে প্রথম আযান শুরু হয়। কথাটি ভুল। উমার(রা) হিজরতের পাঁচ বৎসর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। আর আযানের প্রচলন হয় হিজরতের পরে মদীনায়। উমারের(রা) ইসলাম গ্রহণের সময় এবং পরবর্তী প্রায় ৬ বৎসর যাবত আযানের কোনো প্রচলন ছিল না। প্রকৃত কথা হলো, উমারের(রা) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মক্কায় মুসলিমগণ কাবা ঘরের পাশে নামায আদায় করতে পারতেন না। মক্কার কাফিরগণ তাতে বাধা দিত। উমারের(রা) ইসলাম গ্রহণের পরে তিনি কাফিরদের বাধা প্রতিহত করে নিজে কাবা ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করেন এবং তাঁর সাথে অন্যান্য মুসলমানও সেখানে নামায আদায় করেন।(ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ আন-নববিয়্যাহ)।
এই তথ্যটি কিভাবে ক্রমান্বয়ে বিকৃত হয়েছে তার একটি নমুনা দেখুন। খাজা নিযামুদ্দীন আউলিয়া(রাহ) নামে প্রচলিত ‘রাহাতিল কুলুব’ গ্রন্থে রয়েছে তাঁর মুর্শিদ হযরত ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ গঞ্জে শক্কর বলেন, “যতদিন পর্যন্ত হযরত আমিরুল মোমেনীন ওমর এবনে খাত্তাব(রা) ইসলামে ঈমান আনেন নি ততদিন পর্যন্ত নামাযের আযান গুহা গহবরে দেওয়া হতো। কিন্তু যে দিন আমিরুল মোমেনীন হযরত উমর ফারূক(রা) ঈমান আনলেন সেদিন তিনি তলোয়ার মুক্ত করে দাঁড়িয়ে হযরত বেলাল(রা) কে বললেন, কা’বা ঘরের মিম্মারে উঠে আযান দাও। হযরত বেলাল তাঁর নির্দেশ মতো কাজ করলেন।[রাহাতুল কুলুব, পৃ. ৭১(১২ মজলিশ)]।
আমরা জানি যে, এই কথাগুলি কোনোটিই সঠিক নয়। উমারের(রা) ইসলাম গ্রহণের আগে বা পরে কখনোই মক্কায় গুহায়, গহবরে বা কাবাঘরে কোথাও আজান দেওয়া হয় নি। এছাড়া কাবাঘরের মিম্বার ছিল না বা নেই। আমরা বলতে পারি, এই পুস্তকটি সম্ভবত খাজা নিজামুদ্দীনের নামে জাল করে লেখা। অথবা সরলতার কারণে তাঁরা যা শুনেছেন সহজেই বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন।
৮. রাসূলুল্লাহ(সা) ইলমের শহর এবং আলী(রা) তাঁর দরজা
আমাদের সমাজে বহুল প্রচারিত হাদীস-“আমি জ্ঞানের শহর এবং আলী(রা) তাঁর দরজা।” এই হাদীসটিকে অভিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ হাদীসটিকে মিথ্যা না বলে যয়ীফ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম তিরমিযী এই অর্থে একটি হাদীস বর্ণনা করে নিজেই হাদীসটিকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। (তিরমিযী, আস-সুনান ৫/৫৯৬)।
ইমাম বুখারী, আবূ হাতিম, ইয়াহইয়া বিন সায়ীদ, যাহাবী প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে ভিত্তিহীন মিথ্যা বলে উল্লেখ করেছেন। (ইবনুল জাওযী, আল মাউদূআত ১/২৬১-২৬৫, সুয়ূতী, আল লাআলী ১/৩২৮-৩৩৬, মুল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ. ৭১-৭২)।
৯. আলীকে(রা)দরবেশী খিরকা প্রদানঃ
প্রচলিত একটি গল্পে বলা হয়েছেঃ “রাসূলুল্লাহ(সা) মিরাজ হতে ফিরে আসার পরে নিজের সাহাবা(রা) দেরকে ডেকে এরশাদ করলেন যে, আমার দরবেশী খিরকা ঐ ব্যক্তিকে প্রদান করবো যে আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে…….আবূ বাকর(রা)কে বললেন, যদি আমি তোমাকেই এই দরবেশি খিরকা দান করি তাহলে তুমি এর হক কিভাবে আদায় করবে?……এভাবে উমার(রা)কে জিজ্ঞেস করলেন……..উসমান(রা)কে জিজ্ঞেস করলেন………।এরপর আলী(রা)কে প্রশ্ন করলেন। আলী(রা) উত্তরে বললেন, আমি আল্লাহর বান্দাদের গোপনীয়তা রক্ষা করব। তখন তিনি আলীকেই খিরকা প্রদান করেন……” ইত্যাদি। পুরো কাহিনীটিই ভিত্তিহীন বানোয়াট।”(হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া, রাহাতিল কুলূব, পৃ. ৮-৯)।
১০. আলীকে ডাক, বিপদে তোমাকে সাহায্য করবে
মোল্লা কারী বলেন, শিয়াদের বানানো একটি জঘন্য জাল মিথ্যা কথাঃ “আলীকে ডাক, সে আশ্চর্য্য কর্মাদি প্রকাশ করে, তাকে তুমি বিপদে আপদে তোমার সহায়ক পাবে। হে মুহাম্মাদ, আপনার নব্যুয়ত দ্বারা, হে আলী, আপনার বেলায়াত দ্বারা।”(মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ. ২৬৫-২৬৬; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৪৮৯)।
বস্তুত, আমাদের সমাজে প্রচলিত সকল কুসংস্কার, শিরক ও বিদআতের উৎস হচ্ছে শিয়া মতবাদ ও শিয়া সম্প্রদায়। কুরআন কারীম ও সুস্পষ্ট সুন্নাতকে পরিত্যাগ করে তারা রাসূলুল্লাহ(সা) এর বংশের ১২ বা ৭ ইমামের নামে ভক্তিতে বাড়াবাড়ি করেন। ফলে এসকল নেককার মানুষের নামে বিভিন্ন প্রকার মিথ্যা ও ঈমান বিধ্বংসী কথা তাদের মধ্যে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের শত্রুদের পক্ষে সহজ হয়ে যায়। তাদের হৃদয়গুলি কুরআন কারীম ও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ(সা) এর সুন্নাতের বাঁধন হতে মুক্ত হয়ে গিয়েছে। হৃদয়ের মনিকোঠায় বসেছেন আলী ও তাঁর বংশের ইমামগণ। তাঁদের নামে জালিয়াতগণ যা বলেছে সবই তারা ভক্তিভরে মেনে নিয়েছেন এবং এই মিথ্যাগুলির ভিত্তিতে কুরআন কারীমের স্পষ্ট নির্দেশনার বিকৃত ব্যাখ্যা করেছেন।
এই সম্প্রদায়ের কঠিনতম অপরাধগুলির মধ্যে অন্যতম হলো, এরা আলী(রা)ও তাঁর বংশের ইমামদেরকে ঈশ্বর বানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ‘ঈশ্বরত্ব’ বা ‘ঐশ্বরিক শক্তি’ কল্পনা করেছে। এই কথাটি তাদের মধ্যে প্রচলিত একটি শিরক। যেখানে কুরআন ও সুন্নাহ বারংবার শিখাচ্ছে সকল বিপদে আপদে শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার, সেখানে এরা বানিয়েছে আলীর কাছে সাহায্য চাওয়ার কথা। বিপদে আপদে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে অলৌকিক সাহায্য প্রার্থনা করাই হলো সকল শিরকের মূল। এ বিষয়ে আমি ‘রাহে বেলায়াত’ নামক পুস্তকে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
এই জঘন্য মিথ্যা কথাটির ভিত্তিতে শিয়াগণ একটি দোয়া বানিয়েছে, যা দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজে অনেক সুন্নী মুসলিমের মধ্যেও প্রচলিত। এই শিরক-পূর্ণ দো’আটি প্রচলিত একটি পুস্তক হতে উদ্ধৃত করছিঃ “দোয়ায়ে নাদে আলী। তাহাজ্জুদ নামাজের পর আগে পরে দুরূদ শরীফ পড়ে এই দোয়া যত বেশি পারা যায় পড়ে দোয়া করিলে মনের বাসনা পূর্ণ হয় এবং কঠিন বিপদ দূর হয়ে থাকে। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। নাদে আলিয়ান মাজহারাল আজায়েবে তাজেদহু আউনাল্লাকা ফিন্নাওয়ায়েবে ওয়াকুল্লি হাম্মিন ওয়া গাম্মিন সাইয়ানজালি বি-আজমা-তিকা ইয়া আল্লাহু বিনুবুওয়াতিকা ইয়া মুহাম্মাদ বি-বিলায়িতিকা ইয়া আলী, ইয়া আলী, ইয়া আলী, লা ফাতা ইল্লা আলী, লা সাইফা ইল্লা জুল ফাক্কারে, নাছরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন কারীব, ওয়া বাশশেরিশ মোমিনীন, ফাল্লাহু খাইরুন হাফিজাও ওয়া হুয়া আরহামার রাহিমিন।”(মো. বসির উদ্দীন আহমদ, নেক আমল, পৃ. ১৮৬)।
১১. আলী(রা) কে দাফন না করে উটের পিঠে ছেড়ে দেওয়া
৪০ হিজরীর রামাদান মাসের ২৩ তারিখে হযরত আলী ইবনু আবূ তালিব(রা) তাঁর খেলাফতের রাজধানী কূফায় এক গুপ্তঘাতক খারিজীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ্য পুত্র হাসান ইবনু আলী(রা) তাঁর জানাযার সালাতে ইমামতি করেন। জানাযা শেষে কুফাতেই তাঁর বাড়ির অভ্যন্তরে তাঁকে দাফন করা হয়। কারণ ইমাম হাসান ও অন্যরা ভয় পাচ্ছিলেন যে, সাধারণ গোরস্তানের তাঁকে দাফন করলে খারিযীগণ তাঁর মৃতদেহ চুরি করবে এবং অপমানিত করবে। এ বিষয়টি প্রথম যুগের মুসলিমদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিল।
পরবর্তীকালে শিয়াগণ এ বিষয়ে একটি বানোয়াট ও মিথ্যা গল্প প্রচার করেছে। গল্পটির সারসংক্ষেপ হলো আলী(রা) কে দাফন না করে উটের পিঠের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়। উটটি হারিয়ে যায়।……পরবর্তীকালে ‘নাজাফ’ এ তাঁর কবরের খোঁজ পাওয়া যায়।
এ সকল কথা শুধু মিথ্যাই নয়, উপরন্তু তা আলী(রা), হাসান(রা), হুসাইন (রা) ও আলীর পরিবারের সকলের জন্যই কঠিন অবমাননাকর। ইন্তিকালের পর মৃতদেহ দাফন করা জীবিতদের উপর ফরয। এই ফরয দায়িত্বে অবহেলা করে তাঁরা আমিরুল মোমিনীন এর মৃতদেহ উটের পিঠে ছেড়ে দিবেন একথা একান্ত কান্ডজ্ঞানহীন মূর্খ ছাড়া কেউই বিশ্বাস করবে না। হাসান-হুসাইন(রা) তো দূরের কথা, একজন অতি সাধারণ মানুষও তার পিতার মৃতদেহ এভাবে ছেড়ে দিতে রাজি হবে না। সেও চাইবে যে, তার পিতার কবরটি পরিচিতি থাক, যেন সে ও তার বংশধররা তা জিয়ারত করতে পারে…..। কিন্তু সমস্যা হলো কুরআন সুন্নাহকে পরিত্যাগ করে অতিভক্তির অন্ধকারে হৃদয়কে নিমজ্জিত করার পরে ইমামগণের নামে যা কিছু বাতিল, শরীয়তবিরুদ্ধ, বুদ্ধি ও বিবেক বিরুদ্ধ কথা বলা হয়েছে, সবই শিয়ারা বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে বিশ্বাস করে নিয়েছে।
এই মিথ্যাচারের ভিত্তিতে নাজাফ শহরে একটি কবরকে শিয়াগণ আলীর কবর বলে বিশ্বাস ও প্রচার করেন। আলী(রা) এর শাহাদাতে তিনশত বছর পর্য্ন্ত কেউ বলেনি যে, আলীর কবর নাজাফে। প্রায় তিনশত বৎসর পরে বিভিন্ন জনশ্রুতি ও কুসংস্কারের ভিত্তিতে এই কবরটি আলীর(রা) কবর বলে পরিচিতি পেতে শুরু করে। কবরটির অবস্থা অবিকল বাবরী মসজিদের স্থলে রাম জন্ম-মন্দিরের কাহিনীর মত। সকল হিন্দু গবেষক ও ঐতিহাসিক একমত যে, অযোধ্যার বাবরী মসজিদের স্থানে কোনো কালেই রামমন্দির ছিল না। কিন্তু এই মিথ্যা কথাটি উগ্রপন্থী হিন্দুদের প্রচারে এখন প্রায় স্বতঃসিদ্ধ সত্যে পরিণত হয়েছে। হয়ত এক সময় এখানে রাম-মন্দির নির্মিত হবে। ভারতের কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করবে যে, এখানেই রামের জন্ম হয়েছিল। যেমন ভাবে কোটি কোটি শিয়া বিশ্বাস করে যে নাজাফের এই কবরটিই আলীর কবর। এজন্য তারা নাজাফ শহরকে বলে নাজাফ আল আশরাফ। মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ ও নাজাফ আশরাফ অর্থাৎ পবিত্র মক্কা, পবিত্র মদীনা ও মহাপবিত্র নাজাফ!!!(ইবনু তাইমিয়া, মাজমূউ ফতওয়া ২৭/৪৪৬; ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ৭/৩৩০; মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ২৮০)।
১২. আমার সাহাবীগণ নক্ষত্রতুল্যঃ
মুসলিম সমাজে প্রচলিত একটি হাদীস: “আমার সাহাবীগণ নক্ষত্রতুল্য, তাঁদের যে কাউকে অনুসরণ করলেই তোমরা সুপথ প্রাপ্ত হবে।”
হাদীসটি আমাদের মধ্যে এত প্রসিদ্ধ যে, সাধারণ একজন মুসলিম স্বভাবতই চিন্তা করেন যে, হাদীসটি বুখারী, মুসলিমসহ সিহাহ সিত্তা ও সকল হাদীসগ্রন্থেই সংকলিত। অথচ প্রকৃত বিষয় হলো, সিহাহ সিত্তাহ তো দূরের কথা অন্য কোনো প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থে এ হাদীসটি নেই। যয়ীফ ও জালিয়াত রাবীগণের জীবনীগ্রন্থে, কয়েকটি ফিকহ গ্রন্থে ও অপ্রসিদ্ধ দুই একটি হাদীসের গ্রন্থে এই বাক্যটি এবং এ অর্থের একাধিক বাক্য একাধিক সনদে বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেক সনদেরই একাধিক রাবী জালিয়াত হিসেবে প্রসিদ্ধ অথবা অত্যন্ত দুর্বল ও মিথ্যা বলায় অভিযুক্ত। এজন্য আবূ বাকর বাযযার আহমদ ইবনু আমর(২৯২ হি), ইবনু হাযম জাহিরী আলী ইবনু আহমদ(৪৫৬ হি), যাহাবী মুহাম্মাদ ইবনু আহমদ(৭৪৮ হি) ও অন্যান্য মুহাদ্দিস এই হাদীসটিকে জাল ও ভিত্তিহীন বলে গণ্য করেছেন। (আবদ ইবনু হুমাইদ, আল মুসনাদ, পৃ. ২৫০; ইবনু হাযম, আল ইহকাম ৬/২৪৪; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ২/১৪১-১৪২; সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ৪৯-৫০)।
আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, সাহাবীগণের মর্যাদা প্রমাণের জন্য আমরা এই ধরনের অনির্ভরযোগ্য হাদীসের উপর নির্ভর করি, অথচ কুরআনে অনেক স্থানে সুস্পষ্টভাবে তাঁদের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁদের মর্যাদার বিষয়ে অনেক সহীহ হাদীস প্রসিদ্ধ হাদীসের গ্রন্থসমূহে সংকলিত রয়েছে।
১৩. আমার আহলু বাইত নক্ষত্রতুল্য
উপরের হাদীসের ভাষাতেই আরেকটি হাদীসঃ “আমার আহলু বাইত অর্থাৎ বাড়ির মানুষেরা বা বংশধরেরা নক্ষত্রতুল্য, তাঁদের যে কাউকে অনুসরণ করলেই তোমরা সুপথ প্রাপ্ত হবে।”
নুবাইত ইবনু শারীত(রা) একজন সাহাবী ছিলেন। একাধিক তাবেয়ী তাঁর হতে হাদীস শিক্ষা ও ও বর্ণনা করেছেন। তাঁরই এক অধস্তন পুরুষ আহমদ ইবনু ইসহাক ইবনু ইবরাহীম ইবনু নুবাইত তৃতীয়-চতূর্থ হিজরী শতকে দাবি করেন যে, নুবাইতের লিখিত একটি পান্ডুলিপি তার নিকটে আছে। তিনি দাবী করেন, তিনি তার পিতা পিতামহের নিকট হতে এ পান্ডুলিপি পেয়েছেন। এতে লিখিত হাদীসগুলির একটি হাদীস। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এ লোকটি একজন জঘন্য মিথ্যাবাদী ছিলেন। তিনি নিজে জালিয়াতি করে এই পান্ডুলিপিটি লিখে তার উর্ধ্বতন দাদার নামে চালান। এই হাদীসটি এবং পান্ডুলিপিটির সকল হাদীস জাল। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল, ১/২১৬; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ১/১৩৬)।
১৪. আমার সাহাবীগণের বা আমার উম্মতের মতভেদ রহমত
একটি অতি প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ হাদীসঃ “আমার উম্মতের ইখতিলাফ(মতভেদ) রহমত বা করুণা স্বরূপ।” কখনো কখনো বলা হয়ঃ “আলেমদের এখতেলাফ বা মতবিরোধ রহমত।” এবং কেউ বলেন, “আমার সাহাবীগণের এখতেলাফ রহমত।”
মুহাদ্দিসগণ ঘোষণা করছেন যে, এই বাক্যটি রহমত হিসেবে সমাজে বহুমুখে প্রচলিত হলেও কোনো হাদীসের গ্রন্থে এই হাদীসটি সনদসহ পাওয়া যায় না। কোনো সহীহ, যয়ীফ এমনকি জাল সনদেও তা বর্ণিত হয় নি। সনদবিহীনভাবে অনেকেই বিভিন্ন গ্রন্থে এই বাক্যটি হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লামা সুবকী বলেছেনঃ “মুহাদ্দিসগণের নিকট এটি হাদীস বলে পরিচিত নয়। আমি এই হাদীসের কোনো সনদই পাই নি, সহীহ, যয়ীফ বা বানোয়াট কোনো রকম সনদই এই হাদীসের নেই।”(মোল্লা কারী, আল আসরার, ৫১পৃ.; সুয়ূতী, আল-জামি আস সগীর ১/১৩, আলবানী, যায়ীফাহ ১/১৪১)।
ইখতিলাফ বা মতভেদ মূলত নিন্দনীয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা অনুমোদিত বা প্রশংসিতও হতে পারে। আমরা ইখতিলাফের প্রশংসায় বা নিন্দায় অনেক কিছুই বলতে পারি। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে এই কথাটি বলতে পারি না, কারণ তা সনদবিহীন ভিত্তিহীন কথা।
১৫. মু’আবীয়ার কাঁধে ইয়াযীদঃ বেহেশতীর কাঁধে দোযখী
খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়ার নামে প্রচলিত ‘রাহাতুল কুলুব’ নামক পুস্তকে রয়েছে, হযরত ফরীদউদ্দীন গঞ্জে শক্কর বলেনঃ “হযরত রাসূলে মাকবুল(সা) একদিন সাহাবাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বসেছিলেন, এমন সময় মু’আবীয়া তাঁর পুত্র এজিদকে কাঁধে নিয়ে সেখান দিয়ে যাচ্ছিলো, তাঁকে দেখে হুজুর পাক(সা) মুচকি হেসে বললেন, ‘দেখ-দেখ, বেহেস্তীর কাঁধে দোযখী যাচ্ছে।’…..”(রাহাতিল কুলুব, পৃ. ১৩০)।
এই কথাটি যে ভিত্তিহীন বানোয়াট তা বুঝতে খুব বেশি জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে যার সাধারণ জ্ঞান আছে তিনিও জানেন যে, ইয়াযিদের জন্ম হয়েছে রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের প্রায় ১৪ বৎসর পরে।
১৬. সাহাবীগণের যুগে ‘যমিনবুসি’
খাযা নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রাহ) এর নামে প্রচলিত ‘রাহাতুল কুলুব’ পুস্তকে রয়েছে, “একদিন রাসূলুল্লাহ(সা) সাহাবাগণ দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে বসেছিলেন…….এমন সময় একজন আরবী এসে জমিনে আদব চুমু খেয়ে আরজ করলেন………।”(রাহাতিল কুলুব, পৃ. ১৩০)।
কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা। আমরা আগেই বলেছি যে, এই বইটি পুরোই জালিয়াতদের রচিত বলে প্রতীয়মাণ হয়। যমিন-বুসি তো দূরের কথা কদম বুসীর রীতিও রাসূলুল্লাহ(সা) এর যুগে প্রচলিত ছিল না। রাসূলুল্লাহ(সা) এর দরবারে তাঁর ২৩ বৎসরের নব্যুয়তের জিন্দেগীতে তাঁর লক্ষাধিক সাহাবীর কেউ কেউ দুই একবার এসেছেন। কেউ কেউ সহস্রাধিকবার এসেছেন। এ সকল ক্ষেত্রে তাঁদের সুন্নাত ছিল সালাম প্রদান। কখনো কখনো দেখা হলে তাঁরা সালামের পর হাত মিলিয়েছেন, বা মুসাফাহা করেছেন। দু’একটি ক্ষেত্রে তাঁরা একজন আরেকজনের কপালে চুমু খেয়েছেন বা কোলাকুলি করেছেন। কয়েকটি যয়ীফ বর্ণনায় দেখা যায়, কেউ কেউ রাসূল(সা) এর পায়ে চুমু খেয়েছেন। রাসূলুল্লাহ(সা) এর ২৩ বছরের নব্যুয়তী জিন্দেগীতে লক্ষ মানুষের অগণিত আগমনের ঘটনার মধ্যে মাত্র ৪/৫টি পদচুম্বনের ঘটনা যয়ীফ সনদে বর্ণিত হয়েছে। এ সকল ঘটনায় কোনো সুপরিচিত সাহাবী তাঁর পদচুম্বন করেন নি, করেছেন নতুন ইসলাম গ্রহণ করতে আসা বেদুঈন বা ইহুদী, যারা দরবারে থাকেনি বা দরবারের আদব জানত না। (আবূ বাকর মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহীম, আর রুখসাতু ফী তাকবীলীল ইয়াদ, ৫৫-৮০ পৃ.)।
আবু বাকর, উমার, উসমান, আলী, ফাতিমা, বিলাল(রা) ও তাঁদের মত প্রথম কাতারের শত শত সাহাবী প্রত্যেকে ২৩ বৎসরে কমপক্ষে ১০ হাজার বার তাঁর দরবারে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু কেউ কখনো একবারও তাঁর কদম মুবারকে চুমু খান নি বা সেখানে হাত রেখে সেই হাতে চুমু খান নি, তাঁর সামনে মাটিতে চুমু খাওয়া তো অনেক দূরের কথা।
ভারতের হিন্দুরা মানুষকে সেজদা, গড় বা প্রণাম করতে অভ্যস্ত ছিল। ইসলামের আগমনের পরে ভারতের মুসলমানদের মধ্যেও পীর, মুরুব্বী বা রাজা-বাদশাহকে সাজদা করা, তাদের পায়ে মুখ দিয়ে চুমু খাওয়া বা তাদের সামনে মাটিতে চুমু খাওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। এই রীতিটি নিঃসন্দেহে ইসলামবিরোধী। আর সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, একে হাদীস বলে চালানো।
১৭. আখেরী জামানার উম্মাতের জন্য চিন্তা
আব্দুল কাদের জীলানীর(রাহ) নামে প্রচলিত ‘সিররুল আসরার’ নামক গ্রন্থের মধ্যে ঢুকানো অগণিত ভিত্তিহীন জাল হাদীসের একটি নিম্নরূপঃ “আমার শেষ যামানার উম্মাতের জন্য আমার খুবই চিন্তা।”(সিররুল আসরার, পৃ. ১৫)।
সহীহ, যয়ীফ বা মাঊযূ কোনো সনদেই কোনো গ্রন্থে একথা পাওয়া যায় না। আমরা আগেই বলেছি এই বইটি পুরোই জাল বলে প্রতীয়মান হয়।
২.৬. তাবেয়ীগণ বিষয়ক
তাবেয়ী ও পরবর্তী যুগের বুযুর্গগণের বিষয়ে অগণিত বানোয়াট কথা প্রচলিত। তন্মধ্যে কয়েকটি প্রসিদ্ধ বিষয় উল্লেখ করছি।
১. উয়াইস করনী(রাহ)
রাসূলুল্লাহ(সা) এর জীবদ্দশায় ইয়ামানের কারণ গোত্রের উয়াইস ইবনু আমির নামক এক ব্যক্তির কথা সাহাবীগণকে বলেন এবং তাঁর ইন্তিকালের পরে উমারের(রা) সাক্ষাতের কথা সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী যুগে হযরত উয়াইসকে কেন্দ্র করে অনেক আজগুবী মিথ্যা কথা বানানো হয়েছে। অনেক বক্তা শ্রোতাগণকে বিমুগ্ধ করার জন্য আজগুবি কথা বানিয়েছেন। অনেক সরলপ্রাণ দরবেশ যা শুনেছেন তাই বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে কিছু আছে উয়াইস কেন্দ্রিক। আর কিছু কথা বানানো হয়েছে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে। এগুলি নিঃসন্দেহে খুব ভয়ঙ্কর ও কঠিনতম গোনাহের কারণ।
হযরত উয়াইস ইবনু আমির আল কারনী(রা) সম্পর্কে সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থে সংকলিত সহীহ হাদীসে যতটুকু বর্ণিত হয়েছে তার সার সংক্ষেপ হলোঃ হযরত উমার(রা) যখন খলীফা ছিলেন(১৩-২৩ হি) তখন তাঁর কাছে ইয়ামেনের সৈন্যদল আগমন করলে জিজ্ঞাসা করতেন, আপনাদের মধ্যে কি উয়াইস ইবনু আমির নামে কেউ আছেন? এভাবে একবার তিনি উয়াইসকে পেয়ে যান। তিনি বললেনঃ আপনি উয়াইস? উয়াইস বলেনঃ হ্যা। উমার বলেনঃ আপনি কারন গোত্রের শাখা মুরাদ গোত্রের মানুষ? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। উমার বলেনঃ আপনার শরীরে কুষ্ঠরোগ ছিল এবং শুধুমাত্র নাভীর কাছে একটি দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া বাকি সব আল্লাহ তাআলা ভাল করে দিয়েছেন? তিনি বলেনঃ হ্যাঁ। উমার বলেনঃ আপনার আম্মা আছেন? তিনি বলেনঃ হ্যাঁ। তখন উমার বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ(সা) কে বলতে শুনেছিঃ “ইয়ামানের সৈন্যদলের সাথে উয়াইস ইবনু আমির তোমাদের নিকট আগমন করবেন। তিনি কারনে গোত্রের শাখা মুরাদ গোত্রের মানুষ। তাঁর শরীরে কুষ্ঠ রোগ ছিল। আল্লাহ এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া বাকী সব ভাল করে দিয়েছেন। তাঁর আম্মা আছেন। তিনি তাঁর আম্মার সেবা করেন। তিনি যদি আল্লাহর কাছে কসম করে কিছু বলেন তবে আল্লাহ তাঁর কথা রাখবেন। যদি তুমি তার কাছে তোমার গোনাহ মাফের জন্য দোয়া চাইতে পার তবে চাইবে।” অন্য বর্ণনায়, “তাবেয়ীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন একব্যক্তি যার নাম উয়াইস।….তোমরা তাকে বলবে তোমাদের জন্য ক্ষমা চাইতে।”
একথা বলে হযরত উমার(রা)বলেনঃ আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তখন উয়াইস আল্লাহর কাছে উমারের গোনাহের ক্ষমার জন্য দোয়া করেন। উমার তাঁকে বলেনঃ আপনি কোথায় যাবেন? তিনি বলেনঃ আমি কুফায় যাব। উমার বলেনঃ তাহলে আমি আপনার জন্য কুফার গভর্ণরের কাছে চিঠি লিখে দিই? উয়াইস বলেনঃ অতি সাধারণ মানুষদের মধ্যে মিশে থাকাই আমার বেশি পছন্দ। পরের বছর কুফার এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হজ্জ্বে গমন করেন। তিনি খলীফা উমারের(সা) সাথে দেখা করলে তিনি তাকে উয়াইস সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। ঐ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বলেনঃ তাকে তো একটি অতি ভগ্ন বাড়িতে অতি দরিদ্র অবস্থায় দেখে এসেছি। তখন উমার(রা) রাসূলুল্লাহ(সা) এর উপরের হাদীসটি তাকে বলেন। তখন ঐ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি কুফায় ফিরে উয়াইসের নিকট গমন করে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য অনুরোধ করেন। উয়াইস বলেনঃ আপনি তো হজ্জের নেক সফর হতে ফিরে আসলেন, আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আপনি কি উমারের(রা) এর সাথে সাক্ষাত করেছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন উয়ায়েস তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে গোনাহ মাফের জন্য ক্ষমা চান। এই ঘটনার পর মানুষেরা উয়ায়েস সম্পর্কে জেনে যায়। ফলে তাঁর কাছে মানুষ আসা যাওয়া করতে থাকে। তখন উয়াইস লোকচক্ষুর আড়ালে কোথাও চলে যান।
পরবর্তী প্রায় দুই দশক হযরত উয়াইস কারনী লোকচক্ষুর আড়ালে সমাজের অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবন ধারণ করেছিলেন। যে এলাকায় যখন বসবাস করতেন সেখানের মসজিদে সাধারণ মুসল্লী হিসেবে নিয়মিত নামাযে ও ওয়ায আলোচনায় বসতেন। কখনো নিজেও কিছু বলতেন। মসজিদে বসে কয়েকজন কুরআন তিলাওয়াত করতেন বলেও জানা যায়। এভাবেই তিনি বিভিন্ন জিহাদে শরীক হতেন বলে জানা যায়। ৩৭ হিজরীতে হযরত আলী(রা) ও হযরত মু’আবিয়ার(রা) মধ্যে সিফফীনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে হযরত উয়াইস কারনী হযরত আলীর(রা) সেনাদলে ছিলেন। তিনি হযরত আলীর পক্ষে যুদ্ধ করতে করতে একসময় শহীদ হয়ে যান। (মুসলিম, আস-সহীহ, ৪/১৯৬৮-১৯৬৯; আহমদ, আল মুসনাদ ৩/৪৮০; হাকিম, আল মুসতাদরাক, ৩/৪৫৫-৪৬১)।
এই হলো তাঁর সম্পর্কে সহীহ বর্ণনা। তাঁকে কেন্দ্র করে অনেক বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা আমাদের দেশে প্রচলিত। তিনি নাকি তাঁর আম্মাকে বহন করতেন। তিনি নাকি উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ(সা) এর পবিত্র দাঁত আহত হওয়ার সংবাদে নিজের সকল দাঁত ভেঙ্গে ফেলেছিলেন, ইত্যাদি। এ সকল কথার কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। বলা হয়, হযরত উমার(রা) ও আলী(রা) নাকি তাঁর কাছে গিয়ে দেখা করেন বা দোয়া চান। এগুলি সবই মিথ্যা কথা। উপরের সহীহ হাদীসে আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ(সা) এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে উয়াইসই উমারের(রা) দরবারে এসেছিলেন।
তবে আরো মারাত্মক হলো তাঁকে কেন্দ্র করে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বানোয়াট কথা। যেমন বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ(সা) তাঁর ওফাতের পূর্বে তাঁর মোবারক পিরহান বা পোশাক উয়াইস কারনীর(রাহ) জন্য রেখে যান এবং হযরত উমার(রা) ও হযরত আলী(রা) তাঁকে সেই পোশাক পৌছে দেন। কথাগুলি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। ইবনু দাহিয়া, ইবনুস সালাহ, ইবনু হাজার আসকালানী, সাখাবী, মোল্লা আলী কারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস একমত যে, এগুলি সবই বাতিল ও বানোয়াট কথা। (ইবনুল জাওযী, আল মাউদূয়াত, ১/৩৫০; সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/৪৪৯; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/৩২-৩৬; মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ. ১৮১)।
২. হযরত হাসান বসরী(রাহ)
হযরত হাসান বসরী (রাহ)(২২-১০৯ হি) একজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী ছিলেন। তাঁকে কেন্দ্র করে অনেক মিথ্যা ও বানোয়াট কথা সমাজে প্রচলিত। যেমনঃ হাসান বসরী ও রাবেয়া বসরী দুইজনের কথাবার্তা, আলোচনা ইত্যাদি আমাদের সমাজে অতি প্রচলিত। অথচ দুইজন সমবয়সী বা সমসাময়িক ছিলেন না। রাবেয়া বসরী ১০০ হিজরী বা তার কাছাকাছি সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৮০/১৮১ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। হাসান বসরী যখন ইন্তিকাল করেন তখন রাবেয়া বসরীর বয়স মাত্র ১০/১১ বৎসর। এ থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, এই দুইজনকে নিয়ে প্রচলিত গল্পকাহিনীগুলো সবই বানোয়াট। তবে সবচেয়ে মারাত্মক হলো, তাঁকে কেন্দ্র করে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে মিথ্যা কথা বলা। যেমন, প্রচলিত আছে যে-হাসান বসরী আলীর(রা) মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে তরীকত গ্রহণ করেন বা চিশতিয়া তরীকতের খিরকা, লাঠি ইত্যাদি গ্রহণ করেন। এই বাক্যটি ভিত্তিহীন।
হযরত হাসান বসরী(রা) তাবেয়ীগণের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফকীহ, মুজাহিদ, ওয়ায়িজ ও সংসারত্যাগী বুজুর্গ ছিলেন। তিনি হাদীস ও ফিকহ শিক্ষা দানের পাশাপাশি জাগতিক লোভ লালসার বিরুদ্ধে এবং জীবনের আরাম আয়েশ ত্যাগ করে পরকাল কেন্দ্রিক করার জন্য ওয়ায করতেন, আখিরাতের কথা স্মরণ করে আল্লাহর প্রেমে ও আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি করতেন। তাঁর এসকল মজলিসের বিশেষ প্রভাব ছিল তৎকালীন যুগের মানুষদের মাঝে। পরবর্তী যুগের অধিকাংশ সূফী দরবেশ তাঁর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এবং তাঁর থেকে শিক্ষা নিয়েছেন।
হযরত হাসান বসরীর(রাহ) যুগে তাসাউফ, সূফী ইত্যাদি শব্দ অপরিচিত ছিল। এছাড়া প্রচলিত অর্থে তরীকতও অপরিচিত ছিল। তাঁরা মূলত কুরআন ও হাদীসের আলোকে আল্লাহর মহব্বত ও আখিরাতের আলোচনা করতেন এবং বেশি বেশি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকতেন। তরীকতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মানুষের কাছে গমনের রীতিও তখন ছিল না। বিভিন্ন সাহাবী ও তাবেয়ীর সামগ্রিক সাহচর্যে মানুষ হৃদয়ের পূর্ণতা লাভ করত। প্রায় ৫০০ শত বৎসর পরে যখন সমগ্র মুসলিম বিশ্ব বিচ্ছিন্নতা ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ও তাতারদের ভয়াবহ হামলায় ছিন্নভিন্ন, তখন হিজরী ৬ষ্ঠ ও ৭ম শতকে তরীকাগুলি প্রতিষ্ঠা ও প্রসার লাভ করে।
কাদেরীয়া তরীকার সম্পর্ক হযরত আব্দুল কাদির জিলানীর(রাহ)(মৃত্যু ৫৬১ হি/১১৬৬ খৃ.) সাথে। তবে তিনি প্রচলিত কাদেরীয়া তরীকা প্রতিষ্ঠা বা প্রচলন করে যান নি। তাঁর অনেক পরে তা প্রচলিত হয়েছে। রিফায়ী তরীকার প্রতিষ্ঠাতা আহমদ ইবনু আলী রিফায়ী (রাহ)(মৃত্যু ৫৭৮ হি)। সোহরাওয়ার্দী তরীকার প্রতিষ্ঠাতা শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী(রাহ)(মৃত্যু ৬৩২ হি)। হযরত মঈনুদ্দীন চিশতী (রাহ) চিশতিয়া তরীকার মূল প্রচারক। তিনি ৬৩৩ হিজরীতে(১২৩৬ খৃ.) ইন্তিকাল করেন। আলী ইবনু আব্দুল্লাহ শাযলী (রাহ)(৬৫৬ হি/১২৫৮ খৃ.) শাযলীয়া তারীকা প্রতিষ্ঠা করেন। মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ বুখারী বাহাউদ্দীন নকশাবন্দ(রাহ)(মৃ. ৭৯১ হি) নকশাবন্দীয়া তরীকার প্রতিষ্ঠা করেন। এঁরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে মাসনূন ইবাদতগুলি বেছে তার আলোকে মুসলিমগণের আধ্যাত্মিক উন্নয়েনের প্রচেষ্টা করেন। প্রকৃতপক্ষে সেই অন্ধকার ও কষ্টকর দিনগুলিতে তাঁরাই সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী যুগের একটি প্রচলিত একটি কথা হলো, চিশতীয়া তরীকা ও অন্য কিছু তরীকা হাসান বসরী(রাহ) হযরত আলীর(রা) মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ(সা) থেকে লাভ করেছেন। তিনি হযরত আলী(রা) হতে খিরকা ও খিলাফত লাভ করেছেন ও তরীকতের সাজ্জাদ-নশীন হয়েছেন। কথাটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
হাসান বসরী(রাহ) ২২ হিজরীতে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর বয়স যখন ১৩ বৎসর তখন ৩৫ হিজরীতে আলী(রা) খলীফা নিযুক্ত হন এবং খিলাফতের কেন্দ্র বা রাজধানী মদীনা হতে কুফায় স্থানা্ন্তরিত করেন। এরপর আর হাসান বসরী(রা) আলীকে (রা) দেখেন নি। তিনি আলী(রা) এর দরবারে বসে শিক্ষা গ্রহণেরই সুযোগ পান নি। ৪০ হিজরীতে হযরত আলী(রা) শহীদ হন। আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, হযরত আলী(রা) তাঁর যোগ্যতম সন্তানগণ, অগণিত নেতৃস্থানীয় ভক্ত, ছাত্র ও সহচরদের বাদ দিয়ে ১৩ বছরের কিশোরকে খিরকা ও খিলাফত দিয়ে যান নি বা সাজ্জাদ-নশীন করেন নি। ইবনু দাহিয়া, ইবনুস সালাহ, যাহাবী, ইবনু হাজার, সাখাবী, মুল্লা আলী কারী প্রমুখ মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, এগুলি সব ভিত্তিহীন ও বাতিল কথা। (সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ৩৩৫; মুল্লা কারী, আল-আসরার, পৃ. ১৮১)।
২.৭. আউলিয়া কেরাম ও বেলায়াত বিষয়ক
আল্লাহর ওলীগণের পরিচয়, কর্ম ও মর্যাদার বিষয়ে কুরআন কারীম ও সহীহ হাদীসে অনেক নির্দেশনা রয়েছে। এহইয়াউস সুনান ও রাহে বেলায়াত পুস্তকদ্বয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে অনেক মিথ্যা কথা মুসলিম সমাজে প্রচার করছে জালিয়াতগণ। অনেক সরলপ্রাণ নেককার বুযুর্গ এগুলি সরলপ্রাণে বিশ্বাস করেছেন। এখানে এ বিষয়ক কিছু কথা উল্লেখ করছি।
১. ওলীগণের কারামত বা অলৌকিক ক্ষমতা সত্য
প্রচলিত একটি গ্রন্থে লেখা হয়েছে: “আল্লাহ তাআলার বন্ধুদের শানে কোরান শরীফ ও হাদীস শরীফের কয়েকটি বাণী:………..কারামাতুন আউলিয়া হাক্কুন-আল হাদীস। অর্থ আউলিয়া এর অলৌকিক ক্ষমতা সত্য। [খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া(রাহ), রাহাতুল মুহিব্বীন, শেষ প্রচ্ছদ]। এখানে এই বাক্যটি আল হাদীস বলে বা রাসূলুল্লাহ(সা) এর বাণী বলে উল্লেখ করে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে জালিয়াতি করা হয়েছে। এখানে আমরা দুইটি বিষয় আলোচনা করবঃ (১) এই বাক্যটির উৎস ও (২) এই বাক্যটির অর্থ।
প্রথমত, বাক্যটির উৎস। “ওলীগণের কারামত সত্য”-এই বাক্যটি মুসলিম আলিমগণের বাক্য। এটি কোনো হাদীস নয়। রাসূলুল্লাহ(সা) কখনোই এই বাক্যটি বলেন নি বা তাঁর হতে কোনো সহীহ বা যয়ীফ সনদে তা বর্ণিত হয় নি। শুধু তাই নয়, ‘কারামত’ শব্দটিই কুরআন বা হাদীসের শব্দ নয়। নবী ও ওলীগণের অলৌকিক কর্মকে কুরআন ও হাদীসে ‘আয়াত’ বা চিহ্ন বলা হয়েছে। দ্বিতীয় তৃতীয় শতাব্দী হতে মুসলিম আলিমগণের পরিভাষায় নবী রাসূলগণের আয়াতকে ‘মুজিযা’ এবং ওলীগণের আয়াতকে ‘কারামত’ বলা হয়।
দ্বিতীয় হিজরী শতক হতে মুতাযিলা ও অন্যান্য কিছু সম্প্রদায়ের মানুষেরা ওলীগণের দ্বারা অলৌকিক কর্ম সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করেন। তাদের এই মতটি কুরআন সুন্নাহ বিরোধী। কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াত ও বিভিন্ন হাদীস প্রমাণ করে যে, নবীগণ ছাড়া্ও আল্লাহর নেককার মানুষদেরকে আল্লাহ কখনো কখনো অলৌকিক চিহ্ন বা ‘আয়াত’ প্রদান করেন। এজন্য সুন্নাতপন্থী আলিমগণ বলেনঃ “কারামাতুল আউলিয়া হাক্ক।”
দ্বিতীয়ত, বাক্যটির অর্থঃ
এভাবে আমরা দেখেছি যে, এই বাক্যটি রাসূলুল্লাহ(সা) এর বাণী নয়; বরং আলিমগণের বক্তব্য। কাজেই বাক্যটিকে হাদীস বলে জালিয়াতি করা হয়েছে। এছাড়া উপরের উদ্ধৃতিতে বাক্যটিকে ভুল অনুবাদ করা হয়েছে। ফলে অনুবাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জালিয়াতি ঘটেছে।
ক. কারামত বনাম অলৌকিক ক্ষমতাঃ
এই বাক্যে তিনটি শব্দ রয়েছেঃ কারামত, আউলিয়া, হক্ক। উপরের উদ্ধৃতিতে প্রথম শব্দ কারামতের অনুবাদ করা হয়েছে অলৌকিক ক্ষমতা। এই অনুবাদটি শুধু ভুলই নয়, বরং ইসলামী বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। কারামত অর্থ অলৌকিক আয়াত বা চিহ্ন, অলৌকিক ক্ষমতা নয়। মহিমাময় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো অলৌকিক ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করা শিরক।
কারামত শব্দটির মূল অর্থ সম্মাননা। ইসলামী পরিভাষায় কারামত অর্থ ‘নবী-রাসূলগণ ব্যতীত অন্যান্য নেককার মানুষের দ্বারা সংঘটিত অলৌকিক কর্ম।’ অলৌকিক চিহ্নকে অলৌকিক ক্ষমতা মনে করা শিরকের অন্যতম কারণ। খৃস্টানগণ দাবি করেন, ‘মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতা ঈশ্বর ছাড়া আর কারো নেই। যীশু মৃতকে জীবিত করেছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, যীশু ঈশ্বর বা তাঁর মধ্যে ঈশ্বরত্ব বা ঐশ্বরিক ক্ষমতা ছিল।’
কুরআন কারীমে বারংবার বলা হয়েছে, কোনো অলৌকিক কর্ম বা চিহ্ন কোনো নবী-রাসূল বা কউ নিজের ইচ্ছায় ঘটাতে বা দেখাতে পারেন না; শুধুমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটতে পারে। কোনো ওলী বা নেককার ব্যক্তি কর্তৃক অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, এই কর্মটি সম্পাদন করা ঐ ব্যক্তির ইচ্ছাধীন বা তার নিজের ক্ষমতা। এর অর্থ হলো একটি বিশেষ ঘটনায় আল্লাহ তাকে সম্মান করে একটি অলৌকিক চিহ্ন তাকে প্রদান করেছেন। অন্য কোনো সময়ে তা নাও দিতে পারেন।
একটিমাত্র উদাহরণ উল্লেখ করছি। নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, ২৩ হিজরীর প্রথম দিকে এক শুক্রবারে উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) মসজিদে নববীতে খুতবা প্রদান কালে উচ্চস্বরে বলে উঠেনঃ “হে সারিয়া, পাহাড়ে যাও।” সে সময়ে একজন মুসলিম সেনাপতি সারিয়া ইবনু যুরাইম পারস্যের এক যুদ্ধ ক্ষেত্রে যুদ্ধ করছিলেন। তিনি যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার উপক্রম করছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি উমারের এই বাক্যটি শুনতে পান এবং পাহাড়ের আশ্রয়ে যুদ্ধ করে জয়লাভ করেন। (তাবারী, তারীখ ২/৫৫৩-৫৫৪; ইবনু হাজার, আল ইসাবা ৩/৫-৬; আল মাকাদিস, পৃ. ৪৬৮)।
এই ঘটনায় আমরা উমার(রা) এর একটি বিশেষ কারামত দেখতে পাই। তিনি হাজার মাইল দূরের যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থা অবলোকন করেছেন, মুখে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং সে নির্দেশনা সারিয়া শুনতে পেয়েছেন।
এই কারামতের অর্থ হলো, মহান আল্লাহ তাঁর এই মহান ওলীকে এই দিনের এই মুহুর্তে এই বিশেষ ‘সম্মাননা’ প্রদান করেন, তিনি দূরের দৃশ্যটি হৃদয়ে অনুভব করেন, নির্দেশনা দেন এবং তাঁর নির্দেশনা আল্লাহ সারিয়ার নিকট পৌছে দেন। এর অর্থ এই নয় যে, উমার (রা) এর হাজার মাইল দূরের সবকিছু অবলোকন করার ক্ষমতা ছিল, অথবা তিনি ইচ্ছা করলেই এভাবে দূরের কিছু দেখতে পেতেন বা নিজের কথা দূরে প্রেরণ করতে পারতেন।
এই বছরেরই শেষে ২৩ হিজরীর জিলহজ্জ মাসের ২৭ তারিখে ফজরের সালাত আদায়ের জন্য যখন উমার(রা) তাকবীরে তাহরীমা বলেন, তখন তাঁরই পিছনে চাদর গাঁয়ে মুসল্লীরূপে দাঁড়ানো আল্লাহর শত্রু আবু লু’লু লুকানো ছুরি দিয়ে তাঁকে বারংবার আঘাত করে। তিনি অচেতন হয়ে পড়ে যান। চেতনা ফিরে পেলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, আমাকে কে আঘাত করল? তাঁকে বলা হয়, আবূ লু’লু। তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমাকে কোনো মুসলিমের রহাতে শহীদ হতে হলো না। এর কয়েকদিন পর তিনি ইন্তিকাল করেন। (ইবনু কাসীর, আল বিদায়া ৭/১৩০-১৩৮)।
এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মহান আল্লাহ প্রথম ঘটনায় হাজার মাইল দূরের অবস্থা উমারকে(রা) দেখিয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয় ঘটনায় পাশে দাঁড়ানো শত্রুর বিষয়ে তাঁকে জানতে দেন নি। কারণ ‘কারামত’ কখনোই ক্ষমতা নয়, কারামত আল্লাহর পক্ষ হতে দেওয়া সম্মাননা মাত্র।
খ. ওলী ও আউলিয়াঃ
‘বেলায়াত’ শব্দের অর্থ নৈকট্য, বন্ধুত্ব, অভিভাবকত্ব ইত্যাদি। “বেলায়াত” অর্জনকারীকে ওলী অর্থাৎ আল্লাহর বন্ধু, নিকটবর্তী বা অভিভাবক বলা হয়। ওলীদের পরিচয় প্রদান করে কুরআনে ইরশাদ করা হয়েছেঃ “জেনে রাখ! নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলীগণের কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা চিন্তাগ্রস্তও হবেন না- যারা ঈমান এনেছেন এবং যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি হতে আত্মরক্ষা করে চলেন বা তাকওয়ার পথ অনুসরণ করেন।”(সূরা ইউনূসঃ ৬২-৬৩)।
ঈমান অর্থ তাওহীদ ও রিসালাতের প্রতি বিশুদ্ধ, শিরক ও কুফর মুক্ত বিশ্বাস। ‘তাকওয়া’ শব্দের অর্থ আত্মরক্ষা করা। যে কর্ম বা চিন্তা করলে মহিমাময় আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন সেই কর্ম বা চিন্তা বর্জনের নাম তাকওয়া। মূলত সকল হারাম, নিষিদ্ধ ও পাপ বর্জনকে তাকওয়া বলা হয়।
এই আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানছি যে, দুটি গুণের মধ্যে ওলীর পরিচয় সীমাবদ্ধ। ঈমান ও তাকওয়া। এই দুটি গুণ যার মধ্যে যত বেশি ও যত পরিপূর্ণ হবে তিনি বেলায়াতের পথে তত বেশি অগ্রসর ও আল্লাহর তত বেশি প্রিয় বা ওলী বলে বিবেচিত হবেন। রাসূলুল্লাহ(সা) ওলী বা বেলায়াতের পথের কর্মকে দুইভাগে ভাগ করেছেনঃ ফরয ও নফল। সকল ফরয পালনের পরে অনবরত বেশি বেশি নফল ইবাদত পালনের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্যের পথে বেশি বেশি অগ্রসর হতে থাকে। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, প্রত্যেক মুসলিমই আল্লাহর ওলী। ঈমান ও তাকওয়ার গুণ যার মধ্যে যত বেশি থাকবে তিনি তত বেশি ওলী। হানাফী মাযহাবের অন্যতম ইমাম আবু জা’ফর তাহাবী(৩২১ হি) ইমাম আবু হানীফা, মুহাম্মাদ, আবু ইউসূফ রাহিমাহুমুল্লাহ ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকীদা বা বিশ্বাস বর্ণনা করে বলেনঃ “সকল মুমিন করুণাময় আল্লাহর ওলী। তাঁদের মধ্য থেকে যে যত বেশি আল্লাহর অনুগত ও কুরআনের অনুসরণকারী সে ততবেশি আল্লাহর নিকট সম্মানিত(তত বেশি ওলী)।(ইমাম তাহাবী, আল-আকীদাহ, পৃ. ৩৫৭-৩৬২)।
তাহলে ওলী ও বেলায়াতের মানদন্ড হচ্ছেঃ ঈমান ও তাকওয়া-সকল ফরয কাজ আদায় করা এবং বেশি বেশি নফল ইবাদত করা। যদি কোনো মুসলিম পরিপূর্ণ সুন্নাহ অনুসারে সঠিক ঈমান সংরক্ষণ করেন, সকল প্রকারের হারাম ও নিষেধ বর্জনের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করেন, তাঁর উপর ফরয যাবতীয় দায়িত্ব তিনিই পালন করেন এবং সর্বশেষ যথাসম্ভব নফল ইবাদত আদায় করেন তিনিই আল্লাহর ওলী বা প্রিয় মানুষ। এ সকল বিষয়ে যিনি যতটুকু অগ্রসর হবেন তিনি ততটুকু আল্লাহর নৈকট্য বা বেলায়াত অর্জন করবেন।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ‘বেলায়াত’ কোনো পদ-পদবী নয় এবং ইসলামের ‘ওলী’ বলে কোনো বিশেষ পদ বা পর্যায় নেই। প্রত্যেক মুমিনই ওলী। যে যত বেশি ঈমান ও তাকওয়া অর্জন করবেন তিনি তত বেশি ওলী।
গ. হক্কঃ
‘কারামাতুল আউলিয়া হক্ক’ বা ‘ওলীগণের অলৌকিক কর্ম সত্য’ অর্থ ‘ওলীগণ হতে অলৌকিক কর্ম প্রকাশ পাওয়া সম্ভব’। যদি কোনো বাহ্যত নেককার মুমিন মুত্তাকী মানুষ থেকে কোনো অলৌকিক কার্য্য প্রকাশ পায় তাহলে তাকে আল্লাহর পক্ষ হতে প্রদত্ত সম্মাননা বলে বুঝতে হবে। অনুরূপভাবে যদি কোনো নেককার বুযুর্গ মানুষ থেকে কোনো অলৌকিক কার্য্য প্রকাশিত হয়েছে বলে বিশুদ্ধ সূত্রে জানা যায় তবে তা সত্য বলে বিশ্বাস করতে হবে। তা অস্বীকার করা বা অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেয়া মু‘তাযিলীদের আকীদা।
‘ওলীদের কারামত সত্য’ বলে দুই প্রকারে ভুল অর্থ করা হয়।
প্রথমত, কেউ মনে করেন-ওলীদের নামে যা কিছু কারামত বা অলৌকিক কথা বলা হবে সবই সত্য মনে করতে হবে। কথাটি জঘন্য ভুল। বিশুদ্ধ সনদ ছাড়া কোনো বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। জাল হাদীসের মত অগণিত জাল কারামতির ঘটনা ওলীদের নামে সমাজে ছড়ানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কেউ মনে করেন যে, ‘ওলীগণের কারামত সত্য’ অর্থ ‘ওলীগণের কারামত থাকতেই হবে বা কারামতই ওলীগণের আলামত বা চিহ্ন। এই ধারণাটি কঠিন ভুল। বাহ্যিক আমল ছাড়া ওলীর পরিচয়ের জন্য কোনো চিহ্ন, মার্কা বা সার্টিফিকেট নেই। কোনো ‘কারামত’ বা অলৌকিকত্ব কখনোই বেলায়াতের মাপকাঠি নয়। আল্লাহর প্রিয়তম ওলীর কোনোপ্রকার কারামত নাও থাকতে পারে। আমরা জানি আল্লাহর প্রিয়তম ওলী সাহাবায়ে কেরামের অধিকাংশেরই কোনো কারামত বর্ণিত হয় নি। আবার পাপী বা কাফির মুশরিকের নিকট হতেও অলৌকিক কার্য্য প্রকাশিত হতে পারে। সর্বোপরি কারামতের অধিকারী ব্যক্তিও কোনো বিশেষ পদমর্যাদার ব্যক্তি নন বা পদস্খলন থেকে সংরক্ষিত নন। কর্মে ত্রুটি হলে তিনি শাস্তিভোগ করবেন। কুরআন থেকে আমরা জানতে পারি যে, অনেক সময় কারামতের অধিকারী ওলীও গোমরাহ ও বিভ্রান্ত হয়েছেন। (সূরা আরাফঃ আয়াত ১৭৫-১৭৭; ইবনু কাসীর, তাফসীর ২/২৬৫-২৬৮)।
২. ওলীগণ মরেন নাঃ
প্রচলিত একটি পুস্তকে লেখা হয়েছেঃ “নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোনো মৃত্যু নেই বরং তাঁরা স্থানান্তরিত হয় ধ্বংসশীল ইহজগত হতে স্থায়ী পরজগতে।”-আল হাদীস।(খাজা নিযামুদ্দিন আউলিয়া, রাহাতুল মুহিব্বীন, শেষ প্রচ্ছদ)।
এখানে উল্লেখ্য যে, আব্দুল কাদির জিলানীর(রাহ) নামে প্রচলিত ‘সিররুল আসরার’ পুস্তকে এই হাদীসটি অন্যভাবে উল্লেখ করা হয়েছেঃ “মুমিনগণের কোনো মৃত্যু নেই বরং তাঁরা স্থানান্তরিত হয় ধ্বংসশীল ইহজগত হতে স্থায়ী পরজগতে।”
দুটি কথাই রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে মিথ্যা, জঘন্য ও বানোয়াট কথা। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা বানোয়াট সনদেও তা বর্ণিত হয় নি।
আমরা জানি যে, প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর মাধ্যমে “ধ্বংসশীল ইহজগত হতে স্থায়ী পরজগতে স্থানান্তরিত হয়।” এখানে কারো কোনো বিশেষত্ব নেই। কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াত ও বিভিন্ন সহীহ হাদীস দ্বারা শহীদগণের পারলৌকিক বিশেষ জীবন প্রমাণিত। সহীহ হাদীসের আলোকে নবীগণের পারলৌকিক বিশেষ জীবন প্রমাণিত। এছাড়া অন্য কোনো নেককার মানুষের পারলৌকিক বিশেষ জীবন প্রমাণিত নয়। আলিমগণ, ওলীগণ, মুআযযিনগণ……..ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার নেককার মানুষের মৃত্যু পরবর্তী হায়াত বা জীবন সম্পর্কে যা কিছু বলা হয় সবই সনদবিহীন, ভিত্তিহীন বাতুল কথা।(দরবেশ হুত, আসানুল মাতালিব, পৃ. ২৯৫-২৯৬; দাইলামী, আল-ফিরদাউস ৩/৩৫)।
৩. ওলীগণ কবরে সালাত আদায়ে রত
ওলীগণের পারলৌকিক জীবন বিষয়ক আরেকটি জাল কথা, “নবীগণ ও ওলীগণ তাঁদের কবরের মধ্যে সালাত আদায় করেন, যেমন তাঁরা তাঁদের বাড়িতে সালাত আদায় করেন।”(সিররুল আসরার, পৃ. ৫৫)।
আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, নবীগণের ক্ষেত্রে হাদীসটি সহীহ। তবে এখানে ‘ওলীগণ’ শব্দটির সংযোগ বানোয়াট।
৪. ওলীগণ আল্লাহর সুবাস
প্রচলিত একটি পুস্তকে লিখিত হয়েছেঃ “আল আউলিয়াও রায়হানুল্লাহ-আল হাদীস। অর্থ আউলিয়া আল্লাহর সুবাস।” [খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া(রাহ), রাহাতুল মুহিব্বীন, শেষ প্রচ্ছদ]।
এই কথাটিও আল্লাহর রাসুল(সা) এর নামে বানোয়াট কথা। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা জাল সনদেও এই বাক্যটি রাসূলুল্লাহ(সা) হতে বর্ণিত হয়েছে বলে জানা যায় নি। ওলীগণকে আল্লাহর সুবাস বলায় কোনো অসুবিধা নেই। আল্লাহর রিযককে আল্লাহর সুবাস বলা হয়েছে, সন্তানকেও আল্লাহর সুবাস বলা হয়েছে।(তাবারী, তাফসীর ২৭/১২৩, ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৮/৬২১)। কিন্তু এই কথাটিকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলতে হলে সহীহ সনদে তা বর্ণিত হতে হবে।
৫. ওলীগণ আল্লাহর জুব্বার অন্তরালে
প্রচলিত একটি পুস্তকে লিখিত হয়েছেঃ “ইন্না আউলিয়াই তাহতা কাবাই লা ইয়ারিফুহুম গাইরী ইল্লা আউলিয়াই।–হাদীসে কুদসী। অর্থঃ নিশ্চয়ই আমার বন্ধুগণ আমার জুব্বার অন্তরালে অবস্থান করেন, আমি ভিন্ন তাঁদের পরিচিতি সম্বন্ধে কেহই অবগত নহে, আমার আউলিয়াগণ ব্যতীত।”[খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া(রাহ), রাহাতুল মুহিব্বীন, শেষ প্রচ্ছদ]।
এই কথাটিও একটি ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও জাল কথা। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা জাল সনদে ও এই কথাটি বর্ণিত হয়েছে বলে জানা যায় না। বিভিন্ন সনদবিহীন ভিত্তিহীন কথার মত এই কথাটিও পরবর্তী যুগে সমাজের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আর নবম দশম হিজরী শতকের কোনো কোনো আলিম ভিত্তিহীন জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে সনদবিহীনভাবে এই কথাটি তাদের পুস্তকে উল্লেখ করেছেন। (জুরজানী, আলী ইবনু মুহাম্মাদ (৮১৬ হি), তা’রীফাত, পৃ. ২৯৫)।
৬. ওলীদের খাস জান্নাতঃ শুধুই দীদার
আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে, আল্লাহর খাস ওলীগণ জান্নাতের নেয়ামতের জন্য ইবাদত করেন না, বরং শুধুই ‘মহব্বত’ বা ‘দীদারের’ জন্য। এই অবস্থাকে সর্বোচ্চ অবস্থা বলে মনে করা হয়। এই মর্মে একটি জাল হাদীসঃ “আল্লাহর এমন একটি জান্নাত আছে যেখানে হুর, অট্টালিকা, মধু এবং দুগ্ধ নেই।(বরং দীদারে ইলাহী মাওলার দর্শন)।” কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, সনদবিহীন একটি জাল কথা।(সিররুল আসরার, পৃ. ১৯-২০)।
৭. ওলী আল্লাহদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত সবই হারাম
উপরের অর্থেই আরেকটি বানোয়াট কথাঃ “আখিরাত ওয়ালাদের জন্য দুনিয়া হারাম আর দুনিয়া-ওয়ালাদের জন্য আখিরাত হারাম। আর আল্লাহ-ওয়ালাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই হারাম।”(অর্থাৎ যে পর্যন্ত কেউ ইহকাল ও পরকালের সুখ শান্তি এবং আশা-আকাঙ্খা বিসর্জন দিতে না পারবে, সে পর্যন্ত সে আল্লাহর নৈকট্য পাবে না)।
৬ষ্ঠ শতকের আলিম শীরাওয়াইহি ইবনু শাহরদার দাইলামী(৫০৯ হি) তার ‘আল ফিরদাউস’ এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তাঁর পুত্র শাহরদার ইবনু শীরওয়াহী আবূ মানসূর দাইলামী তার ‘মুসনাদুল ফিরদাউস’ গ্রন্থে হাদীসের একটি সনদ উল্লেখ করেছেন। সনদের অধিকাংশ রাবীই একেবারে অজ্ঞাত পরিচয়। অন্যরা দুর্বল। এজন্য হাদীসটিকে জাল বলে গণ্য করা হয়েছে।(দাইলামী, আল ফিরদাউস ২/২৩০; আলবানী, যায়ীফাহ ১/১০৫-১০৬)।
এই হাদীসে বলা হয়েছে যে, (১) আখিরাত-ওয়ালাদের জন্য দুনিয়া হারাম এবং (২) আল্লাহ-ওয়ালাদের জন্য দুনিয়া,আখিরাত-উভয়ই হারাম। এই কথা দুটি কুরআন কারীম ও অগণিত সহীহ হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। মহান আল্লাহ ঠিক এর বিপরীত কথা বলেছেন। তিনি তাঁর প্রিয়তম রাসূল(সা) ও শ্রেষ্ঠতম আল্লাহ-ওয়ালা সাহাবীগণসহ সকল আল্লাহওয়ালা ও আখিরাতওয়ালাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সৌন্দর্য ও আনন্দ হারাম করেন নি বলে ঘোষণা করেছেনঃ “আপনি বলুন: আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্য ও পবিত্র আনন্দ ও মজার বস্তুগুলি বের(উদ্ভাবন) করেছেন তা হারাম বা নিষিদ্ধ করলো কে? আপনি বলুন: সেগুলি মুমিনদের জন্য পার্থিব জীবনে এবং কিয়ামতে শুধুমাত্র তাদের জন্যই।”(সূরা আরাফঃ আয়াত ৩১-৩২)।
কুরআন কারীমে আল্লাহওয়ালা ও আখিরাতওয়ালাদিগকে দুনিয়া ও আখিরাতের নেয়ামত প্রার্থনা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ(সা) সর্বদা এভাবে দোয়া করতেন। আর আখেরাতের নেয়ামত তো আল্লাহওয়ালা ও আখেরাতওয়ালাদের মূল কাম্য।
মূল কথা হলো, আল্লাহওয়ালা হতে হলে, জান্নাতের নিয়ামতের আশা আকাঙ্খা বর্জন করতে হবে, এই ধারণাটিই কুরআন হাদীসের সুস্পষ্ট বিরোধী। কোনো কোনো নেককার মানুষের মনে এই ধারণা আসতে পারে। তবে রাসূলুল্লাহ(সা) ও সাহাবীগণ সর্বদা জান্নাতের নিয়ামত চেয়েছেন, সাহাবীগণকে বিভিন্ন নিয়ামতের সুসংবাদ দিয়েছেন। সর্বোপরি মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে সর্বোচ্চ মর্যাদার নবী-ওলীগণ এবং সাধারণ ওলীগণ সকলের জন্য জান্নাতের নিয়ামতের বর্ননা দিয়েছেন।
৮. শরীয়ত, তরীকত, মারেফত ও হাকীকত
এগুলি আমাদের মধ্যে অতি পরিচিত চারটি পরিভাষা। কুরআন-হাদীসে শরীয়ত শব্দটিই মূলত ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামের চারিটি পর্যায়, স্তর বা বিভাজন অর্থে তরীকত, মারিফাত ও হাকীকত পরিভাষাগুলি কুরআন হাদীসে কোথাও ব্যবহৃত হয় নি। কুরআন ও হাদীসের আলোকে পরবর্তী যুগের আলিমগণ এ সকল পরিভাষা বিভাজন করেছেন। জালিয়াতগণ এ বিষয়ে হাদীসও বানিয়েছে। মিথ্যাবাদীরা বলেছে, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেনঃ “শরীয়ত একটি বৃক্ষ, তরীকত তার শাখা-প্রশাখা, মারিফাত তার পাতা এবং হাকীকত তার ফল।”(সিররুল আসরার, পৃ. ৩৩)।
মিথ্যাবাদীদের আল্লাহ লাঞ্চিত করুন। তাদের বানানো আরেকটি কথা। “শরীয়ত আমার কথাবার্তা, তরীকত আমার কাজকর্মে, হাকীকত আমার অবস্থা এবং মারিফাত আমার মূলধন।”(আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৬)।
৯. ছোট জিহাদ এবং বড় জিহাদ
কথিত আছে, রাসূলুল্লাহ(সা) এক যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন করে বললেনঃ “আমরা ছোট জিহাদ হতে বড় জিহাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম।………বড় জিহাদ হলো মনের সাথে জিহাদ বা নিজের প্রবৃত্তির সাথে সংগ্রাম।” ইবনু তাইমিয়া হাদীসটি ভিত্তিহীন ও বাতিল বলে গণ্য করেছেন। ইরাকী, সুয়ূতী প্রমূখ মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসটি দুর্বল সনদে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে বর্ণিতে হয়েছে। পক্ষান্তরে সহীহ সনদে কথাটি ইবরাহীম ইবনু আবী আবলা(১৫২ হি) নামক প্রসিদ্ধ তাবেয়ী হতে নিজের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এজন্য ইবনু হাজার আসকালানী বলেছেন যে, হাদীসটি মূলত এই তাবেয়ীর বক্তব্য। অনেক সময় দুর্বল রাবীগণ সাহাবী বা তাবিয়ীর কথাকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (মোল্লা আলী কারী, আল আসরার, পৃ. ১২৭; দরবেশ হুত, আসানিল মাতালিব, পৃ. ১৫৩; আলবানী, যায়ীফাহ ৫/৪৭৮-৪৮১)।
১০. প্রবৃত্তির জিহাদিই কঠিনতম জিহাদ
আমাদের সমাজে এই অর্থে আরেকটি হাদীস প্রচলিত। “সবচেয়ে কঠিন জিহাদ প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ।” কথাটি রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা নয়। তাঁর কথা হিসেবে কোনো সনদেই তা বর্ণিত হয় নি। প্রসিদ্ধ তাবে তাবেয়ী ইবরাহীম ইবনু আদহাম(১৬১ হি) থেকে তাঁর নিজ বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত। (বাইহাকী, কিতাবুয যুহদ ২/১৫২)।
উল্লেখ্য যে, এই অর্থের কাছাকাছি সহীহ হাদীস রয়েছে। ফুদালাহ ইবনু উবাইদ(রা) বলেন, বিদায় হজ্জের ওয়াযের মধ্যে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেনঃ “আর মুজাহিদতো সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর আনুগত্যের জন্য নিজের প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করে।”(তিরমিযী, আস-সুনান ৪/১৬৫; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১১/২০৪)।
দুঃখজনক হলো, বিভিন্ন প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থে সংকলিত সহীহ বাদ দিয়ে ভিত্তিহীন বানোয়াট কথাগুলি আমরা রাসূলুল্লাহ(সা)এর নামে বলি।
১১. আলিম বনাম আরিফ
কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় ইসলামী ইলমের অধিকারীকে ‘আলিম’ বলা হয়। ‘মারিফাত’ অর্থে তত্ত্বজ্ঞান, গুপ্তজ্ঞান বা বিশেষ জ্ঞান বুঝানো. ‘আরিফ’ বলতে তত্ত্বজ্ঞান বুঝানো এবং আলিম ও আরিফ এর মাঝে পার্থক্য বুঝানোর বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে কিছু বলা হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় তা সবই বানোয়াট কথা। এইরূপ একটি জাল হাদীসঃ “আলিম নকশা অঙ্কিত করে এবং আরিফ(খোদাতত্ত্ব জ্ঞানে জ্ঞানী) তা পরিষ্কার করে।”(সিররুল আসরার, পৃ. ৪৯)।
১২. আল্লাহর স্বভাব গ্রহণ কর
সূফীগণের মধ্যে প্রচলিত একটি ভিত্তিহীন সনদবিহীন জাল হাদীস। “তোমরা আল্লাহর স্বভাব গ্রহণ কর বা আল্লাহর গুণাবলিতে গুণান্বিত হও।”(সিররুল আসরার, পৃ. ৫০)।
১৩. একা হও আমার নিকটে পৌছ
“একা হও আমার নিকটে পৌছাবে।”(সিররুল আসরার, পৃ. ৭৮)। উপরের কথাগুলি সবই সনদহীন, ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা মাউযূ সনদেও এই কথাগুলি বর্ণিত হয় নি।
১৪. সামা বা প্রেম-সঙ্গীত শ্রবণ করা কারো জন্য জায়েয….
‘সামা’ (সেমা) অর্থ ‘শ্রবণ’। সাহাবী-তাবেয়ীগণের যুগে সামা বলতে কুরআন শ্রবণ ও রাসূলে আকরামের জীবনী, কর্ম ও বাণী শ্রবণকেই বোঝান হতো। এগুলিই তাঁদের মনে আল্লাহ-প্রেমের ও নবী-প্রেমের জোয়ার সৃষ্টি করত। কোনো মুসলিম কখনোই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য বা হৃদয়ে আল্লাহর প্রেম সৃষ্টি করার জন্য গান শুনতেন না। সমাজের বিলাসী ও অধার্মিক মানুষের মাঝে বিনোদন হিসেবে গান বাজনার সীমিত প্রচলন ছিল, কিন্তু আলেমগণ তা হারাম জানতেন। ২/১ জন বিনোদন হিসেবে একে জায়েয বলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কখনোই এসকল কর্ম আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম বলে গণ্য হয় নি।
ক্রমান্বয়ে সামা বলতে গান-বাজনা বুঝানো হতে থাকে। আর গানের আবেশে উদ্বেলিত হওয়া ও নাচানাচি করাকে ‘ওয়াজদ’ অর্থাৎ আবেগ, উত্তেজনা, উন্মত্ততা বলা হতো। এই সামা বা সঙ্গীত ও ওয়াজদ অর্থাৎ গানের আবেশে তন্ময় হয়ে নাচানাচি বা উন্মত্ততা ৫ম হিজরী শতাব্দী থেকে সূফী সাধকদের কর্মকান্ডের অন্যতম অংশ হয়ে যায়। সামা ব্যতিরেকে কোনো সূফী খানকা বা সূফী দরবার কল্পনা করা যেত না। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী(৫০৫ হি)ও অন্য কোনো আলিম সূফীগণের প্রতি ভক্তির কারণে এইরূপ গান বাজনা ও নর্তন কুর্দনকে জায়েয বা শরীয়ত সঙ্গত ও বিদআতে হাসানা বলে দাবি করেছেন।(আবু হামিদ আল গাযালী, এহইয়াউ উলূমিদ্দীন ২/২৯২-৩৩২)।
এদিকে যখন সামা সঙ্গীতের ব্যাপক প্রচলন হয়ে গেল নেককার মানুষদের মাঝে তখন জালিয়াতগণ তাদের মেধা খরচের একটি বড় ক্ষেত্র পেয়ে গেল। তারা সামা, ওয়াজদ প্রভৃতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন হাদীস বানিয়ে প্রচার করে।
‘সিররুল আসরার’ পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে, হুযুর (সা) এরশাদ করেছেনঃ “সামা হলো কারো জন্য ফরয, কারো জন্য সুন্নাত এবং কারো জন্য বিদআত। ফরয হলো খাস লোকদের জন্য, সুন্নাত হলো প্রেমিকদের এবং বিদআত হলো গাফিল বা অমনোযোগীদের জন্য।”(সিররুল আসরার, পৃ. ৮৮-৮৯)।
এটি রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বানানো একটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা, যা কোনো যয়ীফ বা মাউযূ সনদেও কোথাও বর্ণিত হয় নি।
১৫. যার ওয়াজদ বা উন্মত্ততা নেই তার ধর্মও নেই, জীবনও নেই
গানের মজলিসে আবেগে উদ্বেলিত হয়ে অচেতন হওয়া বা নাচানাচি করাকে ইশকের বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হতো। জালিয়াতরা এ বিষয়ে কিছু হাদীস বানিয়েছে। সিররুল আসরার পুস্তকে এইরূপ একটি ‘হাদীস’ উল্লেখ করা হয়েছেঃ “যার ওয়াজদ বা উত্তেজনা-উন্মত্ততা নেই তার জীবন নেই/ধর্ম নেই।”(সিররুল আসরার, পৃ. ৮৬, ৮৯)।
এ কথাটিও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন সনদহীন বানোয়াট কথা।
১৬. যে গান শুনে আন্দোলিত না হয় সে মর্যাদাশীল নয়
এ বিষয়ে অন্য একটি জাল হাদীস প্রসিদ্ধ। এই হাদীসটির একটি সনদও আছে। সনেদের মূল রাবী মিথ্যাবাদী জালিয়াত। এই হাদীসে বলা হয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ(সা) এর নিকট একটি প্রেমের কবিতা পাঠ করা হয়। গানে বলা হয়ঃ ‘প্রেমের সর্প আমার কলিজায় দংশন করেছে। এর কোনো চিকিৎসক নেই, ঔষধও নেই। শুধু আমার প্রিয়তম ছাড়া। সেই আমার অসুস্থতা এবং সেই আমার ঔষধ।’ এই কবিতা শুনে তিনি উত্তেজিত উদ্বেলিত হয়ে নাচতে বা দুলতে থাকেন। এমনকি তাঁর চাদরটি গা থেকে পড়ে যায়। তাঁর সাথে সাহাবীগণও এভাবে নাচতে বা দুলতে থাকেন……। এরপর রাসূলুল্লাহ(সা) বলেনঃ “শ্রবণের সময় যে আন্দোলিত হয় না সে মর্যাদাশীল নয়।” মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই হাদীসটি জঘন্য মিথ্যা ও জাল কথা।(ইবনু তাইমিয়া, আহাদীসুল কুসসাস, পৃ. ৬০-৬১; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৫/১৯৮)।
১৭. গওস, কুতুব, আওতাদ, আকতাব, আবদাল, নুজাবা
আমাদের সমাজে ধার্মিক মানুষের মাঝে বহুল প্রচলিত পরিভাষা রয়েছে গওস, কুতুব, আওতাদ, আকতাব ইত্যাদি শব্দ। আমরা সাধারণভাবে আওলিয়া কেরামকে বুঝতে এ সকল শব্দ ব্যবহার করে থাকি। এছাড়া এসকল পরিভাষার বিশেষ অর্থ ও বিশেষ বিশেষ পদবীর কথাও প্রচলিত। আরো প্রচলিত আছে যে, দুনিয়াতে এতজন আওতাদ, এতজন আবদাল, এতজন গাওস, এতজন কুতুব ইত্যাদি সর্বদা বিরাজমান……….। এগুলি সবই ভিত্তিহীন কথা এবং আল্লাহ ও তাঁর মহান রাসূলের(সা) নামে বানোয়াট কথা। একমাত্র আবদাল ছাড়া অন্য কোনো কথা কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি।
গাওস, কুতুব, আওতাদ….ইত্যাদি সকল পরিভাষা, পদ-পদবী ও সংখ্যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এ সকল বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে কোনো কিছুই সহীহ বা গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি। শুধুমাত্র ‘আবদাল’ শব্দটি একাধিক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
আবদাল শব্দটি বদল শব্দের বহুবচন। আবদাল অর্থ বদলগণ। একাধিক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, কিছু সংখ্যক নেককার মানুষ আছেন যাদের কেউ মৃত্যুবরণ করলে তাঁর বদলে অন্য কাউকে আল্লাহ তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন। এজন্য তাঁদেরকে আবদাল বা বদলগণ বলা হয়।
এ বিষয়ে বর্ণিত প্রতিটি হাদীসেরই সনদ দুর্বল। কোনো সনদে মিথ্যাবাদী রাবী রয়েছে। কোনো সনদ বিচ্ছিন্ন। কোনো সনদে দুর্বল রাবী রয়েছেন। এজন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস আবদাল বিষয়ক সকল হাদীসকে এক কথায় ও ঢালাওভাবে মুনকার, বাতিল বা মাঊযূ বলে উল্লেখ করেছেন।
অন্য অনেক মুহাদ্দিস একাধিক সনদের কারণে এগুলিকে সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন মুহাদ্দিসের বিস্তারিত আলোচনা ও বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হাদীসগুলি পর্যালোচনা করে আমার কাছে দ্বিতীয় মতটিই সঠিক বলে প্রতয়িমান হয়েছে। দুইটি বিষয় ‘আবদাল’ শব্দটির ভিত্তি প্রমাণ করে। প্রথমত, এ বিষয়ক বিভিন্ন হাদীস। দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরী শতকের অনেক তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী, মুহাদ্দিস, ইমাম ও ফকীহ এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এতে বুঝা যায় যে, এই শব্দটির ভিত্তি ও উৎস রয়েছে।
অন্যান্য সকল বিষয়ের মত ‘আবদাল’ বিষয়েও অনেক মিথ্যা কথা হাদীস বলে প্রচারিত হয়েছে। এগুলির পাশাপাশি এ বিষয়ক নিম্নের তিনটি হাদীসকে কোনো কোনো মুহাদ্দিস মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন।
প্রথম হাদীসঃ শুরাইহ ইবনু উবাইদ(১০১ হি)নামক একজন তাবেয়ী বলেন, আলী(রা) এর সাথে যখন মুআবিয়া(রা) এর যুদ্ধ চলছিল, তখন আলী(রা) এর অনুসারী ইরাকবাসীগণ বলেন, হে আমিরুল মোমেনীন, আপনি মুয়াবিয়ার অনুসারী সিরিয়াবাসীগণের জন্য লানত বা অভিশাপ করুন। তখন তিনি বলেন, না। কারণ আমি রাসূলুল্লাহ(সা) কে বলতে শুনেছি-“আবদাল(বদলগণ) সিরিয়ায় থাকবেন। তাঁরা ৪০ ব্যক্তি। যখনই তাঁদের কউ মৃত্যুবরণ করবেন তখনই আল্লাহ তাঁর বদলে অন্য ব্যক্তিকে স্থলাভিষিক্ত করেন। তাঁদের কারণে আল্লাহ বৃষ্টি প্রদান করেন। তাঁদের কারণে শত্রুর উপরে বিজয় দান করেন। তাদের কারণে সিরিয়বাসীদের নিকট হতে আযাব দূরীভূত করবেন।”
এই হাদীসের সনদের সকল রাবীই নির্ভরযোগ্য এবং বুখারী ও মুসলিম কর্তৃক গৃহীত। শুধুমাত্র শুরাইহ ইবনু উবাইদ ব্যতিক্রম। তাঁর হাদীস বুখারী ও মুসলিমে নেই। তবে তিনিও বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য রাবী হিসেবে স্বীকৃত। কাজেই হাদীসটির সনদ সহীহ। কোনো কোনো মুহাদ্দিস সনদটি বিচ্ছিন্ন বলে মনে করছেন। তাঁরা বলেন, শুরাইহ বলেন নি যে, আলীর মুখ হতে তিনি কথাটি শুনেছেন। বরং তিনি শুধু ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। এতে মনে হয়, শুরাইহ সম্ভবত অন্য কারো মাধ্যমে ঘটনাটি শুনেছেন, যার নাম তিনি উল্লেখ করেন নি। তবে বিষয়টি নিশ্চিত নয়। সিফফীনের যুদ্ধের সময় শুরাইহ কমবেশি ৩০ বৎসর বয়সী ছিলেন। কাজেই তাঁর পক্ষে আলী(রা) থেকে হাদীস শ্রবণ করা বা এই ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা অসম্ভব ছিল না। এজন্য বাহ্যত হাদীসটির সনদ অবিচ্ছিন্ন বলেই মনে হয়।
যিয়া মাকদিসী উল্লেখ করেছেন যে, অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী সনদে এই হাদীসটি আলীর(রা) নিজের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। কাজেই এই হাদীসটি আলীর(রা) বক্তব্য বা মাউকূফ হাদীস হিসেবে সহীহ।(আহমাদ, আল মুসনাদ ১/১১২; সাখাবী, আল-মাকাদিস, পৃ. ৩২-৩৪; সুয়ূতী, আল-লাআলী ২/৩৩০-৩৩২; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/৩০৬-৩০৭)।
দ্বিতীয় হাদীসঃ তাবেয়ী আব্দুল ওয়াহিদ ইবনু কাইস বলেন, উবাদা ইবনুস সামিত(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেনঃ “এই উম্মাতের মধ্যে আবদাল(বদলগণ) ত্রিশ ব্যক্তি। এরা মহিমাময় দয়াময় আল্লাহর খলীল ইবরাহীম(আ) এর মত। যখন এদের কেউ মৃত্যুবরণ করেন, তখন মহিমাময় বরকতময় আল্লাহ তার বদলে অন্য ব্যক্তিকে স্থলাভিষিক্ত করেন।”
এই হাদীসটির বর্ণনাকারী আব্দুল ওয়াহিদ ইবনু কাইস এর বিষয়ে মুহাদ্দিসগণের মতভেদ রয়েছে। ইজলী ও আবূ যূর’আ তাকে গ্রহণযোগ্য বলে মত দিয়েছেন। অন্যান্য মুহাদ্দিস তাকে দুর্বল বলে গণ্য করেছেন। ইমাম আহমাদ হাদীসটিকে মুনকার, অর্থাৎ আপত্তিকর বা দুর্বল বলেছেন। কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীসটিকে হাসান পর্যায়ের বলে গণ্য করেছেন।
তৃতীয় হাদীসঃ আনাস(রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেনঃ “যমীন কখনো ৪০ ব্যক্তি হতে শুণ্য হবে না, যারা দয়াময় আল্লাহর খলীল ইবরাহীমের মত হবেন। তাঁদের কারণেই তোমরা বৃষ্টিপ্রাপ্ত হও, এবং তাঁদের কারণেই তোমরা বিজয়লাভ করো। তাঁদের মধ্য হতে কেউ মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তাঁর বদলে অন্য ব্যক্তিকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন।”
হাদীসটি তাবারানী সংকলন করেছেন। সনদের একাধিক বর্ণনাকারীর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে আপত্তি রয়েছে। এজন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীসটিকে দুর্বল বলে গণ্য করেছেন। তবে আল্লামা হাইসালামী হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলে গণ্য করেছেন।(তাবারানী, আল মু’জামুল আউসাত ৪/২৪৭; আলবানী, যায়ীফাহ ৯/৩২৫-৩২৭; যায়ীফুল জামি, পৃ. ৬৮৯)।
উপরের তিনটি হাদীস ছাড়াও আবদাল বিষয়ে আরো কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি হাদীস পৃথকভাবে যয়ীফ বা অত্যন্ত যয়ীফ হলেও সামগ্রিকভাবে আবদালের অস্তিত্ব প্রমাণিত। স্বভাবতই এই প্রমাণিত বিষয়কে কেন্দ্র করে অনেক জাল ও বানোয়াট কথা বর্ণিত হয়েছে। আবদাল বা বদলগণের দায়িত্ব, পদমর্যাদা ইত্যাদি বিষয়ে অনেক জাল ও বানোয়াট কথা বর্ণিত হয়েছে।
আবদাল বা বদলগণের নিচের পদে ও উপরে অনেক বানোয়াট পদ-পদবীর নাম বলা হয়েছে। যেমন ৩০০ জন নকীব/নুকাবা, ৭০ জন নাজীব/নুজাবা, ৪০ জন বদল/আবদাল, ৪ জন আমীদ/উমুদ, ১ জন কুতুব বা গাউস…….ইত্যাদি। ‘আবদাল’ ছাড়া বাকি সকল পদ-পদবী ও সংখ্যা সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। রাসূলুল্লাহ(সা) হতে বর্ণিত কোনো একটি সহীহ বা যয়ীফ সনদেও কুতুব, গাউস, নজীব, নকীব ইত্যাদির কথা কোনোভাবে বর্ণিত হয় নি। এছাড়া এদের দেশ, পদমর্যাদা, দায়িত্ব, কর্ম ইত্যাদি যা কিছু বলা হয়েছে সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। এ সকল বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে সহীহ বা যয়ীফ সনদে কিছু্ই বর্ণিত হয় নি, যদিও গত কয়েক শতাব্দীতে কোনো কোনো আলিম এ সকল বিষয়ে অনেক কিছুই লিখেছেন।(হাকিম তিরমিযী, নাওয়াদিরুল উসূল ১/২৬১-২৬৩; সাখাবী, আল মাকাদিস, পৃ. ৩২-৩৪; দরবেশ হুত, আসানুল মাতালিব, পৃ. ৬৩; আলবানী, যায়ীফুল জামি, পৃ. ২০৩, ৩৩৪,৩৬৭)।
এখানে এ সম্পর্কিত দুটি বিষয়ের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিঃ আবদালের পরিচয় ও আবদালের দায়িত্ব।
ক. আবদালের পরিচয়
আবদালের পরিচয় সম্পর্কে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয় নি। আবদাল বা বদলগণ নিজেদেরকে বদল বলে চিনতে বা বুঝতে পারেন বলেও কোনো হাদীসে কোনোভাবে উল্লেখ করা হয় নি। তবে বাহ্যিক নেক আমল দেখে দ্বিতীয় শতক থেকে নেককার মানুষকে আবদালের অন্তর্ভূক্ত বলে মনে করা হতো। কোনো কোনো যয়ীফ হাদীসে এ বিষয়ক কিছু বাহ্যিক আমলের কথা বলা হয়েছে। একটি দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছেঃ
“তাঁরা এই মর্যাদা বেশি বেশি (নফল) সালাত, সিয়াম বা দান-সদকা করে লাভ করেন নি…..বরং বদান্যতা, হৃদয়ের প্রশস্ততা ও সকল মুসলিমের প্রতি দয়া, ভালবাসা ও নসীহতের দ্বারা তা লাভ করেছেন।” হাদীসটির সনদ দুর্বল।(হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/৬৩; আজলূনী, কাশফুল খাফা ১/২৪-২৫)।
বিভিন্ন যয়ীফ হাদীস এবং তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের বক্তব্যের আলোকে আল্লামা সাখাবী, সুয়ূতী, আজলুনী প্রমুখ আলিম বদলগণের কিছু আলামত উল্লেখ করেছেনঃ অন্তরের প্রশস্ততা, ভাগ্যের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, হারাম হতে বিরত থাকা, আল্লাহর দ্বীনের জন্য ক্রোধান্বিত হওয়া, কাউকে আঘাত না করা, কেউ ক্ষতি করলে তার উপকার করা, কেউ কষ্ট দিলে তাকে ক্ষমা করা, উম্মাতে মুহাম্মদীর জন্য প্রতিদিন দোয়া করা, নিঃসন্তান হওয়া বা কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ না করা, কাউকে অভিশাপ না দেওয়া…..ইত্যাদি।(ইবনুল জাউযী, আল মাঊদূয়াত, ২/৩৩৫-৩৩৭; সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ৩২-৩৪; সুয়ূতী, আল লাআলী ২/৩৩০-৩৩২, ইবনু ইরাক, তানযীহ ৩০৬-৩০৭; তাহের ফাতানী, তাযকিরা, পৃ. ১৯৩-১৯৫)।
খ. আবদালের দায়িত্বঃ
আমাদের মধ্যে আরো প্রচলিত যে, গাওসের অমুক দায়িত্ব, কুতুবের অমুক দায়িত্ব,….ইত্যাদি। এগুলি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। অগণিত বুযুর্গ ও নেককার মানুষ সরল বিশ্বাসে এ সকল ভিত্তিহীন শোনা কথা সঠিক মনে করেন এবং বলেন। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি যে, আবদাল ব্যতীত বাকী সকল পদ-পদবী ও পরিভাষাই ভিত্তিহীন। আর আবদালের ক্ষেত্রে কোনো কোনো হাদীসে বলা হয়েছে ‘তাঁদের কারণে বা তাদের জন্য আল্লাহ বৃষ্টি দেন ইত্যাদি।” এই কথাটির দুটি অর্থ রয়েছে।
প্রথমতঃ নেক আমলের বরকত লাভ-
নেককার মানুষের নেক আমলের কারণে আল্লাহ জাগতিক বরকত প্রদান করেন। সহীহ হাদীসে আনাস(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) এর যুগে দুই ভাই ছিলেন। এক ভাই রাসূলুল্লাহ(সা) এর নিকট আগমন করতেন, অপর ভাই অর্থ উপার্জনের কর্মে নিয়োজিত থাকতেন। পেশাজীবি ভাই রাসূলুল্লাহ(সা) এর নিকট আগমন করে অন্য ভাই সম্পর্কে অভিযোগ করেন যে, সে তাকে কর্মে সাহায্য করে না। তখন তিনি বলেনঃ “হতে পারে যে, তুমি তার কারণেই রিযকপ্রাপ্ত হচ্ছ।”(তিরমিযী, আস সুনান, ৪/৫৭৪, হাকিম, আল মুসতাদরাক ১/১৭২)।
দ্বিতীয়তঃ তাঁদের দোয়া লাভ
দ্বিতীয় অর্থ হলো, তাঁদের দোয়ার কারণে আল্লাহ রহমত ও বরকত প্রদান করবেন। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের দোয়া কবুল করেন বলে বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। আবদাল বিষয়ক একাধিক যয়ীফ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এদের দোয়ার বরকত মানুষ লাভ করবে। নেককার মানুষদের প্রকৃতিই হলো যে, তাঁরা সদা সর্বদা সকল মুসলমানের ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। এই দোয়ার বরকত মুসলিম উম্মাহ লাভ করে। এখানে তিনটি ভুল ও বিকৃত অর্থ সমাজে প্রচলিতঃ
প্রথমত, দোয়া কবুলের বাধ্যবাধকতা
অনেকে দোয়া করেন ‘আবদাল’ বা এই প্রকারের কোনো নেককার মানুষ দোয়া করলে আল্লাহ শুনবেনই। কাজেই মহিমাময় আল্লাহ খুশি থাকুন আর বেজার থাকুন, আমি কোনো প্রকারে অমুক ব্যক্তির নিকট থেকে দোয়া আদায় করে নিতে পারলেই আমার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাবে। এই ধারণা শুধু ভুলই নয়, উপরন্তু ইসলামী বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক ও শিরকমূলক।
প্রথমত, কে বদল বা আবদাল তা আমরা কেউই জানি না। এ বিষয়ে সবই ধারণা ও কল্পনা। দ্বিতীয়ত, কারো দোয়া কবুল করা না করা সবই আল্লাহর ইচ্ছা। কুরআন কারীম হতে আমরা জানতে পারি মহিমাময় আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব ও খালীল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর(সা) মনের অব্যক্ত আশাটিও পূর্ণ করেছেন। আবার তিনি তাঁর মুখের দোয়াও কবুল করেন নি। তিনি একজন মুনাফিকের জন্য ক্ষমার দোয়া করেছিলেন, কিন্তু আল্লাহ কবুল করেন নি। উপরন্তু বলেছেন, ৭০ বার এভাবে দোয়া করলেও কবুল হবে না। একজন কারামত প্রাপ্ত ওলী, আল্লাহর মর্জির বাইরে দোয়া করেছিলেন বলে তাকে কঠিনভাবে শাস্তি দেওয়া হয়। (সূরা ৯, তাওবাঃ আয়াত ৮০; সূরা ৭, আরাফঃ ১৭৫-১৭৭; তাফসীর ইবনু কাসীর ২/২৬৫-২৬৯)।
দ্বিতীয়ত, দোয়া কবুলের মাধ্যম বা ওসীলা
‘তাঁর কারণে বা মাধ্যমে তুমি রিযিক পাও’, ‘তাঁদের কারণে বা মাধ্যমে তুমি বৃষ্টি পাও…..’ ইত্যাদি কথার একটি বিকৃত ও ইসলামী আকীদা বিরোধী ব্যাখ্যা হলো এই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণের দোয়া বা সুপারিশ ছাড়া বোধহয় আল্লাহ এগুলি দিবেন না। এরা বোধহয় রাজা-বাদশাহের মন্ত্রীদের মত, তাঁদের সুপারিশ ছাড়া চলবে না। পৃথিবীতে রাজা, শাসক ও মন্ত্রীদের কাছে কোনো আবেদন পেশ করতে হলে তাদের একান্ত আপনজনদের মাধ্যমে তা পেশ করলে তাড়াতাড়ি ফল পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে আল্লাহর কাছে সরাসরি চাওয়ার চেয়ে এদের মাধ্যমে চাওয়া হলে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
এই ধারণাগুলি সুস্পষ্ট শিরক। পৃথিবীর বাদশা আমাকে চেনেন না, আমার সততা ও আন্তরিকতার কথা তাঁর জানা নেই। কিন্তু তাঁর কোনো প্রিয়পাত্র হয়তো বা আমাকে চিনেন। তার সুপারিশ পেলে বাদশাহর মনে নিশ্চয়তা আসবে যে, আমি তাঁর দয়া পাওয়ার উপযুক্ত মানুষ। আল্লাহ তা’আলার বিষয় কি তদ্রুপ? তিনি কি আমাকে চেনেন না? আল্লাহর কোনো ওলী, কোনো প্রিয় বান্দা কি আমাকে আল্লাহর চেয়ে বেশি চেনেন? নাকি বেশি ভালবাসেন? অথবা বেশি করুণা করতে চান? এছাড়া পৃথিবীর বাদশাহ বা বিচারকের মানবীয় দুর্বলতার কারণে পক্ষপাতিত্বের বা ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভয় আছে, সুপারিশের মাধ্যমে যা দূরীভূত হয়। আল্লাহর ক্ষেত্রে কি এমন কোনো ভয় আছে?
কে আল্লাহর কাছে মাকবূল ও প্রিয় তা কেউই বলতে পারে না। আমরা আগেই দেখেছি, নেককার মানুষদের প্রকৃতিই হলো যে, তাঁরা সর্বদা সকল মুসলমানের ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। এই দোয়ার বরকত মুসলিমগণ লাভ করেন। এছাড়া কোনো মুসলিমকে ব্যক্তিগতভাবে, অথবা মুসলিম সমাজকে সমষ্টিগতভাবে কোনো নির্ধারিত নেককার ব্যক্তির কাছে যেয়ে দোয়া চাইতে হবে, এ কথা কখনোই এ সকল হাদীসের নির্দেশনা নয়। ইসলামের বরকতময় যুগগুলিতে সাহাবী, তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ী বা তৎকালীন মানুষের কখনোই এরূপ করেন নি।
তৃতীয়ত, দায়িত্ব বা ক্ষমতা
অনেকে মনে করেন, আবদাল বা আউলিয়ায়ে কেরামকে আল্লাহ বৃষ্টি, বিজয় ইত্যাদির দায়িত্ব ও ক্ষমতা দিয়েছেন। এরা নিজেদের সুবিধামতো তা প্রদান করেন। এই ধারণাটি হিন্দু ও মুশরিকদের দেব দেবতায় বিশ্বাসেরই মত শিরক। এই বিশ্ব পরিচালনায় আল্লাহ জীবিত বা মৃত কোনো নবী, ওলী বা কোনো মানুষকেই কোনো দায়িত্ব বা অধিকার প্রদান করেন নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় বা মনে করা হয় সবই জঘন্য মিথ্যা কথা ও কুরআন ও হাদীসের অগণিত স্পষ্ট কথার বিপরীত কথা।
আল্লাহ ফিরিশতাগণকে বিশ্ব পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়েছেন, কিন্তু কোনো ক্ষমতা দেন নি। কোনো জীবিত বা মৃত মানুষকে কোনোরূপ দায়িত্ব প্রদান করেন নি।
মুসলিম সমাজেরই অনেকেই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে মনের আন্দাযে ধারণা করেন যে, অমুক ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় বান্দা। এরপর মনের আন্দাযে ধারণা করেন যে, আল্লাহ তাকে হয়তো কোনো ক্ষমতা দিয়েছেন। এরপর মনগড়াভাবে এদের কাছে চাইতে থাকেন। আর এ সকল জঘন্য শিরককে সমর্থন করার জন্য কোনো কোনো জ্ঞানপাপী উপরের ‘আবদাল’ বিষয়ক হাদীসগুলি বিকৃত করে থাকেন।
১৮. আব্দুল কাদের জিলানী(রাহ) কেন্দ্রিক
মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের অবক্ষয়, বিচ্ছিন্নতা, অবক্ষয় ও বর্হিশত্রুর আক্রমণের যুগের, হিজরী ৬ষ্ঠ শতকের অন্যতম আলেম, ফকীহ ও সূফী ছিলেন হযরত আব্দুল কাদের জীলানি। তিনি ৪৭১ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৯০ বছর বয়সে ৫৬১ হিজরীতে(১১৬৬ খৃ)মৃত্যুবরণ করেন। তিনি হাম্বলী মাযহাবের একজন বড় ফকীহ ছিলেন। এছাড়া তাসাউফের বড় সাধক ও ওয়ায়িজ ছিলেন। তাঁর ওয়াযের প্রভাবে অগণিত মানুষ সেই অন্ধকার যুগে দ্বীনের পথে ফিরে আসে। তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর অনেক কারামত প্রসিদ্ধ লাভ করে। তাঁর ছাত্রগণ বা নিকটবর্তীগণ, যেমন যাহাবী, সামআনী ও অন্যান্যরা তাঁর বিশুদ্ধ জীবনী রচনা করেছেন। এছাড়া তিনি নিজে অনেক গ্রন্থ লিখে হাম্বলী মাযহাব অনুসারে মুসলিমগণের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের শিক্ষা প্রদান করেন। যদিও তিনি তৎকালীন মাযহাবী কোন্দলের প্রভাবে ইমাম আবূ হানীফা(রাহ) ও তাঁকে অনুসারীদেরকে জাহান্নামী ফিরকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন(আব্দুল কাদের জীলানী, গুনিয়াতুত তালেবীন, পৃ. ৬, ৭, ১৪৯, ১৫১, ১৫২, ১৫৫, ২১১, ২২৭), তবুও হানাফীগণ সহ সকল মাযহাবের মানুষেই তাঁকে ভক্তি করেন।
পরবর্তী যুগে তাঁর নামে অগণিত আজগুবি ও মিথ্যা কথা কারামতের নামে বানানো হয়। এ সকল কথা যেমন ভিত্তিহীন ও মিথ্যা, তেমনি তা ইসলামী ধ্যানধারণার পরিপন্থী। তবে এখানে আমাদের আলোচ্য হলো রাসূলুল্লাহ(সা) কেন্দ্রিক মিথ্যা কথা। আব্দুল কাদির জিলানীকে(রাহ) কেন্দ্র করে মিথ্যাবাদীদের বানোয়াট কথার একটি হলো, মি’রাজের রাত্রিতে নাকি রাসূলুল্লাহ(সা) আব্দুল কাদের জিলানীর(রাহ) কাঁধে পা রেখে আরশে উঠেছিলেন। কথাটি রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বানোয়াট জঘন্য মিথ্যা কথা। কোনো হাদীসের গ্রন্থেই এর অস্তিত্ব নেই। আর যে কথা রাসূলুল্লাহ(সা) বলেননি, কোনো হাদীসের গ্রন্থে নেই বা সনদ নেই, সে সকল আজগুবি বানোয়াট কথা একজন মুমিন কিভাবে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলতে পারেন সে কথা ভাবলে অবাক হতে হয়। যেখানে সাহাবীগণ তাঁদের মুখস্ত ও জানা কথা সামান্য কমবেশি হওয়ার ভয়ে বলতে সাহস পেতেন না, সেখানে নির্বিচারে যা শুনছি তাই তাঁর নামে বলে কিভাবে কিয়ামতের দিন তাঁর সামনে মুখ দেখাব!
২.৮. ইলম ও আলিমদের ফযীলত বিষয়ক
জ্ঞানার্জনের নির্দেশে এবং আলিম ও তালিব ইলম বা শিক্ষার্থীদের মর্যাদা বর্ণনায় অনেক আয়াতে কুরআনী ও সহীহ হাদীস রয়েছে। অপরদিকে ইলমের ফযীলত বর্ণনায় অনেক মিথ্যা হাদীস বানানো হয়েছে। অনেক নির্বোধ নেককার(!) মানুষ মানুষকে জ্ঞানার্জনের ফযীলত বর্ণনায় ও অনেক মিথ্যা হাদীস বানিয়েছেন। কি জঘন্য অপরাধ! তারা ভেবেছেন, কুরআন কারীমের আয়াত ও সহীহ হাদীস যথেষ্ট হচ্ছে না; সুতরাং আরো কিছু বানোয়াট ফযীলতের হাদীস না বললে হয়ত মানুষেরা ইলম শিখত আসবে না। যেহেতু আলিমরাই হাদীস প্রচার করেন, সেহেতু অনেক আলিম অনেক সময় সুন্দর অর্থবোধক এ সকল জাল হাদীসকে বিচার না করেই বর্ণনা করেছেন। এ কারণে ইলম ও আলিমদের ফযীলত বিষয়কে অনেক জাল হাদীস সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। এ সকল মিথ্যা হাদীস জানা ও তা বলা হতে বিরত থাকা আমাদের সকলের কর্তব্য। কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীসই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
১. কিছু সময় চিন্তা হাজার বৎসর ইবাদত হতে উত্তম
এ সকল বানোয়াট হাদীসের মধ্যে রয়েছেঃ “এক মুহুর্ত বা কিছু সময় চিন্তা-মুরাকাবা করা এক বৎসর ইবাদত হতে উত্তম।” কেউ বাড়িয়ে বলছেন ৭০ হাজার বৎসর ইবাদত হতে উত্তম। মুহাদ্দিসগণ কথাটি জাল বলে উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা হিসেবে তা মিথ্যা। কথাটি পূর্ববর্তী কোনো আলিমের উক্তিমাত্র।(মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ.৯৭; আলবানী, যয়ীফুল জামিয় ৫৮১ পৃ.)।
২. শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কালি উত্তম
ইলমের ফযীলতে বানানো অন্য একটি জাল হাদীস- “শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কালি উত্তম।” সাখাবী, যারকানী, মোল্লা আলী কারী প্রমুখ মুহাদ্দিস জানিয়েছেন যে, কথাটি খুব সুন্দর শুনালেও তা রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা নয়। যারকাশী বলেছেন, বাক্যটি আসলে হযরত হাসান বসরীর(রহ) উক্তি।
৩. আমার উম্মতের আলিমগণ বণী ইসরাঈলের নবীগণের মত
আলিম ও ধার্মিকগণের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি বাক্য। “আমার উম্মতের আলিমগণ বণী ইসরাঈলের নবীগণের মত”।
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই বাক্যটি নবীজী(সা) এর কথা নয়। বরং তাঁর নামে প্রচলিত একটি ভিত্তিহীন, সনদহীন মিথ্যা, জাল ও বানোয়াট কথা।(সাখাবী, আল মাকাদিস, ২৯৩ পৃ, মোল্লা কারী, আল আসরার ১৫৯ পৃ.)। অনেক ওয়ায়িয এ মিথ্যা হাদীসকে কেন্দ্র করে জাল গল্প বলেন যে, হযরত মূসা(আ) এর সাথে নাকি রাসূল মুহাম্মাদ(সা) এর এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল! নাউজুবিল্লাহ! কি জঘন্য বানোয়াট কথা!!
এখানে উল্লেখ্য যে, আলিমগণের ফযীলতে অন্য অনেক হাদীস রয়েছে যাতে আলিমগণকে নবীগণের কাছের মর্যাদার অধিকারী বলা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য(হাসান) একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ “আলিমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী।”
তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটি রেওয়ায়েত করেছেন। আমাদের উচিত বানোয়াট কথা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলে গোনাহগার না হয়ে এ সকল গ্রহণযোগ্য হাদীস আলোচনা করা।
৪. আলিমগণের চেহারার দিকে তাকান
আলিমদের ফযীলতে বানানো অন্য একটি জাল হাদীস। “আলিমের চেহারার দিকে তাকান আল্লাহর কাছে ৬০ বৎসরের সিয়াম ও কিয়াম(তাহাজ্জুদের) ইবাদতের চেয়ে অধিক প্রিয়।”
অন্য শব্দে বলা হয়েছেঃ “আলিমের চেহারা দিকে তাকান ইবাদত।”
এ দুটি বাক্যের কোনোটিই হাদীস নয়। মুহাদ্দিসগণ বাক্য দুটিকে মিথ্যা বা বানোয়াট হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন।(সাখাবী, আল মাকাসিদ, ৪৪২ পৃ.; মুল্লা কারী,আল আসরার, ২৫৩ পৃ)।
৫. আলিমের ঘুম ইবাদত
এ ধরনের আরেকটি জাল হাদীস-“আলিমের ঘুম ইবাদত।” মোল্লা আলী কারী বলেন-“রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা হিসেবে(মারফূ হাদীস) এই বাক্যটির কোনো অস্তিত্ব নেই।”
৬. মূর্খের ইবাদতের চেয়ে আলিমের ঘুম উত্তম
অনুরূপ আরেকটি ভিত্তিহীন জাল কথাঃ
“মূর্খের ইবাদতের চেয়ে আলিমের ঘুম উত্তম।”
দুটি বাক্যই জাল। সহীহ, যয়ীফ বা মাঊযু কোনো সনদেই এই কথা দুটির অস্তিত্ব নেই। তবে কাছাকাছি অর্থে একটি জয়ীফ হাদীস রয়েছে- “ইলমসহ নিদ্রা যাওয়া মুর্খতাসহ সালাত আদায় করা হতে উত্তম।”(আবূ নুয়াইম ইসপাহানী, হিলইয়াতুল আউলিয়া ৪/৩৮৫; মোল্লা আলী কারী, আল আসরার, পৃ. ২৫৫; আলবানী, যায়ীফুল জামি, পৃ. ৮৬১)।
৭. আলিমের সাহচর্য্য এক হাজার রাকাত সালাতের চেয়ে উত্তম
এ বিষয়ে অন্য একটি বানোয়াট হাদীসঃ “একজন আলিমের মজলিসে উপস্থিত হওয়া এক হাজার রাকা’য়াত নামায পড়ার চেয়ে উত্তম।” মুহাদ্দিসগণ বাক্যটিকে মিথ্যা হাদীস বলে গণ্য করেছেন।(মুল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ১১৩)। এই জাল হাদীসটির উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে আরো একটি কথা বলা হয়েছেঃ “ওলীদের সাহচর্য্যে এক মুহুর্ত থাকা একশত বৎসর রিয়াহীন নামাজ পড়ার চেয়েও উত্তম।” সৎ ও নেককার মানুষের সাহচর্য্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কুরআন ও হাদীসে এর বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে সাহচর্য্যের এই ফযীলত বানোয়াট।
৮. আসরের পর লেখাপড়া না করা
আমাদের দেশে অনেক আলিম ও মাদ্রাসা ছাত্রদের মধ্যে প্রচলিত আছে যে, আসরের পরে লেখাপড়া করলে চোখের ক্ষতি হয়। একটি বানোয়াট হাদীস হতে এই কথাটির উৎপত্তি। উক্ত বানোয়াট হাদীসে বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি তার চক্ষুদ্বয়কে ভালবাসে সে যেন আসরের পরে না লেখে।” কথাটি হাদীস নয়। এর কোনো ভিত্তি নেই। কম আলোতে, অন্ধকারে বা আলো আঁধারিতে লেখাপড়া করলে চোখের ক্ষতি হতে পারে। ডাক্তারগণ এ বিষয়ে অনেক কিছু বলতে পারেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো হাদীস নেই।(সাখাবী, আল মাকাদিস, পৃ. ৩৯৭; মুল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ২১৬)।
৯. চীনদেশে হলেও জ্ঞানের সন্ধান কর
আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত একটি কথাঃ “চীন দেশে হলেও জ্ঞানের সন্ধান কর।” অধিকাংশ মুহাদ্দিস একে জাল বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ একে অত্যন্ত দুর্বল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। দুইজন অত্যন্ত দুর্বল রাবী, যারা মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করতেন শুধুমাত্র তারাই রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা হিসেবে প্রচার করেছেন।(ইবনু আদী, আল কামিল ১/২৯২; ইবনুল জাউযী, আল মাউদুআত ১/১৫৪; সুয়ূতী, আল লাআলী ১/১৯৩)।
১০. রাতের কিছু সময় ইলম চর্চা সারারাত জেগে ইবাদতের চেয়ে উত্তম
আমাদের দেশের প্রসিদ্ধ একটি গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ “বোখারী শরীফের আরো একটি হাদীসে আছে-হযরত(দ) বলেছেন, রাত্রির এক ঘন্টা পরিমাণ(দ্বীনি) এলম শিক্ষা করা সমস্ত রাত্রি জাগরিত থাকিয়া ইবাদত করার চেয়েও ভাল।”(মোঃ গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃ. ২৫)।
এই কথাটি সহীহ বুখারীতো দূরের কথা অন্য কোনো হাদীস গ্রন্থেই রাসূলুল্লাহ(সা) এর বাণী হিসেবে সংকলিত হয় নি। ইমাম দারিমী তার সুনান গ্রন্থে অত্যন্ত দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন সনদে সাহাবী ইবনু আব্বাসের(রা) বাণী হিসেবে কথাটি সংকলিত করেছেন। রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে এ অর্থে যা কিছু বলা হয়েছে সবই জাল ও বানোয়াট।[দারিমী, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুর রহমান(২৫৫ হি), আস সুনান ১/৯৪, ১৫৭)।
১১. ইলম, আমল ও ইখলাসের ফযীলত
ইলম, আমল ও ইখলাসের গুরুত্ব সম্পর্কে কুরআন হাদীসে অনেক নির্দেশনা রয়েছে। সেগুলির পাশাপাশি কিছু জাল হাদীস সমাজে প্রচলিত। যেমনঃ “সকল মানুষ মৃত/ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত, শুধু আলিমগণ ছাড়া। সকল আলিমগণই ধ্বংসপ্রাপ্ত শুধু আমলকারীগণ ছাড়া। আমলকারীগণ সকলেই ধ্বংসপ্রাপ্ত/ডুবন্ত শুধু মুখলিসগণ ছাড়া। মুখলিসগণ কঠিন ভয়ের মধ্যে।”
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই কথাগুলি জাল। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা মাঊযূ সনদেও তা রাসূলুল্লাহ(সা) হতে বর্ণিত হয় নি। দরবেশ হুত বলেনঃ “সামারকান্দী তার ‘তানবীহুল গাফিলীন’ পুস্তকে এই ‘হাদীসটি’ উল্লেখ করেছে। আর ওয়ায়েজগণ তা নিয়ে মাতামাতি করেন। এই পুস্তকটিতে অনেক মিথ্যা ও মাউযূ হাদীস রয়েছে। এজন্য পুস্তকটির উপর নির্ভর করা যায় না।”(দরবেশ হুত, আসানুল মাতালিব, পৃ. ২৪৬, আলবানী, যায়ীফাহ ১/১৭৪)।
১২. ইলম সন্ধান করা পূর্বের পাপের মার্জনা
ইমাম তিরমিযী তাঁর সুনান গ্রন্থে নিম্নের হাদীসটি সংকলন করেছেনঃ “যদি কোনো ব্যক্তি ইলম শিক্ষা করে, তবে তা তার পূর্ববর্তী পাপের জন্য ক্ষতিপূরণ(পাপমোচনকারী) হবে।”(তিরিমিযী, আস সুনান ৫/২৯)।
ইমাম তিরমিযী ছাড়াও দারিমী, তাবারানী প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটি সংকলন করেছেন। সকলেই ‘অন্ধ আবূ দাঊদ’ নুফাই ইবনুল হারিস এর মাধ্যমে হাদীসটি সংকলন করেছেন। তিনি ১৫০ হিজরীর দিকে ইন্তিকাল করেন। সমসাময়িক ও পরবর্তীযুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, এই ব্যক্তি হাদীসের নামে মিথ্যা বলতেন।
সমসাময়িক প্রসিদ্ধ তাবেয়ী কাতাদা ইবনু দি‘আমা(১১৭ হি) তাকে মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, প্রসিদ্ধ তাবে-তাবেয়ী হাম্মাম ইবনু ইয়াহইয়া(১৬৫হি) বলেন, ‘অন্ধ আবূ দাউদ’ আমাদের নিকট এসে হাদীস বলতে থাকেন। তিনি সাহাবী বারা ইবনু আযিব(৭৩ হি), সাহাবী যাইদ ইবনু আকরাম(৬৮ হি) প্রমুখ সাহাবী থেকে হাদীস শুনেছেন বলে দাবি করেন। তিনি দাবি করেন যে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ১৮ জন সাহাবী হতে তিনি হাদীস শিক্ষা করেছেন। তখন আমরা প্রসিদ্ধ তাবেয়ী মুহাদ্দিস কাতাদার নিকট তার বিষয়ে প্রশ্ন করলাম। তিনি বলেন লোকটি মিথ্যা বলছে। সে এ সকল সাহাবীকে দেখেনি বা তাদের থেকে কোনো কিছু শুনে নি। কারণ কয়েক বছর আগে মহামারীর সময়েও আমরা তাকে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে দেখেছি।(মুসলিম, আস-সহীহ ১/২১-২২)।
ইমাম বুখারী, আহমাদ ইবনু হাম্বাল, আবু হাতিম রাযি প্রমুখ মুহাদ্দিস তাকে অত্যন্ত দুর্বল ও পরিত্যক্ত রাবী বলে উল্লেখ করেছেন। ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীন, নাসাঈ, ইবনু হিব্বান প্রমুখ মুহাদ্দিস তাকে মিথ্যাবাদী ও জালিয়াত বলে উল্লেখ করেছেন। এই ব্যক্তিটি ছাড়া অন্য কেউ কোনো সনদে এই হাদীসটি বর্ণনা করেন নি। এই ব্যক্তি দাবি করেন যে, তাকে আব্দুল্লাহ ইবনু সাখবারাহ নামক এক ব্যক্তি বলেছেন, তাকে তার পিতা সাখবারাহ বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(সা) এই কথাটি বলেছেন। এই আব্দুল্লাহ ইবনু সাখবারাহ নামক ব্যক্তিটিও অপরিচিত। অন্ধ আবূ দাউদ ছাড়া আর কেউ তার নাম উল্লেখ করেন নি বা তাকে চিনেন বলে উল্লেখ করেননি। অনুরূপভাবে এই ‘সাখবারাহ’ নামক সাহাবার কথাও এই অন্ধ আব্দুল্লাহ ছাড়া আর কেউ উল্লেখ করেন নি। এই নামে কোনো সাহাবী ছিলেন বলে অন্য কোনো সূত্র হতে জানা যায় না।(ইবনু হাজার, তাহযীব ১০/৪১৯; তাকরীব, পৃ. ৪৬৫; আস ইসাবা ৩/৩৫)।
হাদীসটি উল্লেখ করার পরে উপরের বিষয়গুলির দিকে ইঙ্গিত করে ইমাম তিরমিযী বলেনঃ “এই হাদীসটির সনদ দুর্বল। আবূ দাঊদ দুর্বল। আব্দুল্লাহ ইবনু সাখবারাহ এবং তার পিতার বিশেষ কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। এই অন্ধ আবূ দাঊদের বিষয়ে কাতাদা ও অন্যান্য আলিম কথা বলেছেন।”(তিরমিযী, আস-সুনান ৫/২৯)।
ইমাম তিরমিযী এখানে হাদীসটির সনদ দুর্বল বলেই ক্ষান্ত হয়েছেন। দুর্বলতার পর্যায় উল্লেখ করেন নি। আমরা জানি যে, দুর্বল বা যয়ীফ হাদীসের এক প্রকার জাল হাদীস। যে দুর্বল হাদীসের বর্ণনাকারী মিথ্যা হাদীস বর্ণনার অভিযোগে অভিযুক্ত সেই দুর্বল হাদীসকে জাল হাদীস বলা হয়। এ কারণে পরবর্তী কোনো কোনো মুহাদ্দিস এ হাদীসটিকে ‘জাল’ হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামী এই হাদীস উল্লেখ করে বলেনঃ “এর সনদে অন্ধ আবূ দাউদ রয়েছেন যিনি একজন প্রসিদ্ধ মিথ্যাবাদী ছিলেন।”(হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১২৩; আলবানী, যাঈফুল জামি, পৃ. ৮১৯)।
১৩. খালি পায়ে ভাল কাজে বা ইলম শিখতে যাওয়া
ইলম শিক্ষার জন্য বা কোনো ভাল কাজে পথ চলার জন্য খালি পায়ে চললে বেশে সওয়াব হবে বলে কিছু কথা প্রচলিত আছে। এগুলি সবই বাতিল কথা ও জাল হাদীস।(ইবনুল জাউযী, আল- মাঊদু’আত ১/১৫৫-১৫৭; সুয়ূতী, লাআলী ১/১৯৪-১৯৬; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/২৫১-২৫২)।
১৪. ইলম যাহির ও ইলম বাতিন
আল্লামা ইবনু হাজার আসকালানী, সুয়ূতী, মুল্লা আলী কারী প্রমুখ মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, ইলমুল বাতিন বা বাতিনী ইলমকে যাহেরী ইলম হতে পৃথক বা গোপন কোনো বিষয় হিসেবে বর্ণনা করে যে সকল হাদীস প্রচলিত সবই বানোয়াট ও মিথ্যা।(সুয়ূতী, যাইুলুল মাউযূআত, পৃ. ৪৪; মুল্লা আলী কারী, আল-মাসনূয়, পৃ. ৯৩)।
আমাদের সমাজে এ বিষয়ে সত্য ও মিথ্যা অনেক সময় মিশ্রিত হয়েছে এবং অনেক হাসান ও সহীহ হাদীসকে বিকৃত অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে। আমরা জানি যে, মানুষের জ্ঞানের দুটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় হলো-কোনো কিছু জানা। দ্বিতীয় পর্যায় হলো, এই জানা মনের গভীরে বা অবচেতনে বিশ্বাসে পরিণত হওয়া। যেমনঃ একজন মানুষ জানেন যে, ‘ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’, অথবা ‘ধুমপান বিষপান’। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ধুমপান করেন। কিন্তু তিনি কখনোই বিষপান করেন না। কারণ তার এই জ্ঞান সুগভীর বিশ্বাসে পরিণত হয় নি। যখন তা বিশ্বাসে পরিণত হবে তখন তিনি আর ধুমপান করতে পারবেন না, যেমন তিনি বিষপান করতে পারেন না।
ধর্মীয় বিধিবিধানের ক্ষেত্রেও জ্ঞানের এইরূপ দুটি পর্যায় রয়েছে। একজন মানুষ জানেন যে, প্রজ্জ্বলিত আগুনের মাঝে ঝাপ দিলে তিনি আগুনে পুড়ে যাবেন। এ কারণে তিনি কখনোই আগুনের মধ্যে ঝাপ দিবেন না। তাকে ধাক্কা দিয়ে আগুনের মধ্যে ফেলতে গেলেও প্রাণপণে বাধা দিবেন। আবার এই মানুষটিই জানেন এবং বিশ্বাস করেন যে, ‘নামায কাযা করলে জাহান্নামের প্রজ্জ্বলিত আগুনে পুড়তে হবে’, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি নামায কাযা করেন। কারণ তার এই ‘জ্ঞান’ ও ‘বিশ্বাস’ প্রকৃতপক্ষে মনের গভীরে বা অবচেতন মনের গভীর বিশ্বাসের জ্ঞানে পরিণত হয় নি। যখন এই জ্ঞানটি তার গভীর বিশ্বাসের জ্ঞানে পরিণত হবে তখন তিনি কোনো অবস্থাতেই নামায কাযা করতে পারবেন না, যেমনভাবে তিনি কোনভাবেই আগুনের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেন না। তিনি জাহান্নামের আগুন হৃদয় দিয়ে অবলোকন ও অনুভব করতে পারবেন।
এজন্য আমরা জানি যে, একজন সাধারণ ধার্মিক মুসলিম, যিনি সাধারণভাবে ফজরের নামায জামাতে আদায় করেন, তিনি যদি রাতে দেরি করে ঘুমাতে যান, তাহলে হয়ত ফজরের জামাতের জন্য তার ঘুম ভাঙবে না। কিন্তু এই ব্যক্তিরই যদি রাত ৪ টায় ট্রেন বা গাড়ি থাকে তাহলে রাতে কয়েকবার ঘুম ভেঙ্গে যাবে। কারণ গাড়ি ফেল করলে তার কিছু অসুবিধা হবে বা ক্ষতি হবে এই জ্ঞানটি তার অবচেতন মনের বা ‘কালবের জ্ঞানে’ পরিণত হয়েছে। কিন্তু নামাযের জামাত ফেল করলে কিছু ক্ষতি হবে এই জ্ঞানটি সেই প্রকারের গভীর জ্ঞানে পরিণত হয় নি। যখন তা এরূপ গভীর জ্ঞান বা কলবের জ্ঞানে পরিণত হবে তখন ফজরের জামাতের জন্যও তার বারবার ঘুম ভেঙ্গে যাবে।
প্রথম পর্যায়ের জ্ঞানের পালন ও আচরণই জ্ঞানকে দ্বিতীয় পর্যায়ে নিয়ে যায়। সকল ক্ষেত্রেই এই কথা প্রযোজ্য। ‘ধুমপানে বিষপান’ এই জ্ঞানটিকে যদি কারো মনে বারংবার উপস্থাপিত করা হয়, সে তা পালন করে, ধুমপানের অপকারিতার দিকগুলি বিস্তারিত পাঠ করে, এ বিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার, আলোচনা ইত্যাদিতে উপস্থিত হয়, তবে এক পর্যায়ে এই জ্ঞান তার গভীর জ্ঞানে পরিণত হবে এবং তিনি ধূমপান পরিত্যাগ করবেন। অনুরূপভাবে ‘গীবত জাহান্নামের পথ’ এই জ্ঞানটি যদি কেউ বারংবার আলোচনা করেন, এ বিষয়ক আয়াত ও হাদীসগুলি বারংবার পাঠ করেন, আখিরাতের গভীর বিশ্বাসে তিনি এর শাস্তি মন দিয়ে অনুভব করেন…..তবে এক পর্যায়ে তিনি গীবত পরিত্যাগ করবেন। তার মনই তাকে গীবত করতে বাধা দিবে।
আমরা জানি যে, দুই পর্যায়ের জ্ঞানই জ্ঞান। প্রথম পর্যায়ের জ্ঞানের আলোকে আল্লাহ বান্দাদের হিসাব নিবেন। যে ব্যক্তি জেনেছে যে, নামায কাযা করা হারাম, কিন্তু তারপরও সে তা কাযা করেছে, তার জন্য তার কর্মের শাস্তি পাওনা হবে। আর জ্ঞান যখন দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হয় তখন তা মানুষের জন্য আল্লাহর পথে চলাকে অতি সহজ ও আনন্দদায়ক করে তোলে। হাদীস শরীফে জ্ঞানকে এই দিক হতে দুই পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রা) বলেনঃ “অনেক মানুষ কুরআন পাঠ করে, কিন্তু তা তাদের গলার নিচে নামে না(হৃদয়ে গভীর জ্ঞানে পরিণত হয় না)। কিন্তু যখন তা অন্তরে পৌছে যায় এবং গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তখন তা তার কল্যাণ করে।”(ইবনু রাজাব, জামউল উলূম ওয়াল হিকাম, পৃ. ৩৪৩)।
প্রখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী(রহ)(১১০ হি) বলেছেনঃ “ইলম বা জ্ঞান দুই প্রকারেরঃ ১. জিহবার জ্ঞান, যা আদম সন্তানের বিরুদ্ধে আল্লাহর প্রমাণও ২. অন্তরের জ্ঞান। এই জ্ঞানই উপকারী জ্ঞান।(দারিমী, আস-সুনান ১/১১৪)।
হাসান বসরীর এই উক্তিটির সনদ নির্ভরযোগ্য। তবে অন্য সনদে এই উক্তিটি হাসান বসরীর সূত্রে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বর্ণিত হয়েছে। এক সনদে পরবর্তী এক রাবী দাবি করেছেন, হাসান বসরী বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(সা) উপরের বাক্যটি বলেছেন। অন্য সনদে পরবর্তী রাবী দাবি করেছেন, হাসান বসরী বলেছেন, সাহাবী জাবির(রা) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাজ(সা)উপরের বাক্যটি বলেছেন। এই দুটি সনদকে কোন কোন আলিম দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। তবে আল্লামা মুনযিরী হাদীসটির সনদ হাসান বলে উল্লেখ করেছেন।(দারিমী, আস-সুনান ১/১১৪; ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ ১/৪০৭; আল-মুনযিরী, আত-তারগীব ১/৫৮)।
এখানে উল্লেখ্য যে, ইমাম বুখারী সংকলিত একটি হাদীসে আবূ হুরাইরা(রা) বলেছেন, “ আমি রাসূলুল্লাহ(সা) হতে ইলম এর দুটি পাত্র সংরক্ষণ করেছি। একটি পাত্র প্রচার করেছি। অন্য পাত্রটি যদি প্রচার করি তবে আমার গলা কাটা যাবে।”(বুখারী,আস-সহীহ ১/৫৬)।
এই হাদীসটিকে কেউ কেউ ইলমুল বাতিন এর প্রতি ইঙ্গিত বলে বুঝাতে চেয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এখানে আবূ হুরাইরা(রা) উমাইয়া যুগের যালিম শাসকদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। খিলাফতে রাশিদার পরে যালিম শাসকদের আগমন, দ্বীনি বিষয়ে অবহেলো ইত্যাদি বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এবং ইয়াযীদ ও অন্যান্য যালিম শাসকদের নামও বলেছিলেন। আবূ হুরাইরা ও অন্যান্য অনেক সাহাবী উমাইয়া যুগে এ বিষয়ক হাদীসগুলি বলার ক্ষেত্রে এ ধরনের কথা বলতেন। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ১/২১৬-২১৭)।
এভাবে মুহাদ্দিসগণ একমত হয়েছেন যে, ‘ইলমুল বাতিন’ শব্দ এর কথা কোনো সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয় নি। তবে উপরের হাদীসে উল্লেখিত দ্বিতীয় পর্যায়ের জ্ঞানকে অনেকে ‘ইলমুল ক্বালব’(অন্তরের জ্ঞান) বা ‘ইলমুল বাতিন’(অবচেতনের জ্ঞান) বলে অভিহিত করেছেন। এই জ্ঞান কুরআন হাদীসের জ্ঞান বা শরীয়তের জ্ঞান হতে ভিন্ন কিছু নয়। বরং এই জ্ঞান হলো কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞানের প্রকৃত ও কাঙ্খিত পর্যায়। কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী শরীয়তের জ্ঞান অবিরত চর্চা, পালন ও অনুশীলনের মাধ্যমে যখন অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে এবং অবচেতন মন থেকে মানুষের কর্ম নিয়ন্ত্রণ করে তখন তাকে ‘ইলমুল ক্বালব’ বা ‘ইলমুল বাতিন’ বলা হয়।
কিন্তু পরবর্তীকালে ইলম যাহির ও ইলম বাতিন নামে অনেক প্রকারের ইসলাম বিরোধী কুসংস্কার মুসলিম সমাজে ছড়ানো হয়েছে। ইলম বাতিনকে গোপন কিছু বিষয় বা কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞানের বাইরে অর্জনীয় কোনো বিষয় বলে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ক কিছু হাদীস ও জালিয়াতগণ তৈরি করেছে। ‘ইলমু বাতিন ইলমু যাহির হতে পৃথক বা গোপন কোনো ইলম’ এই অর্থে প্রচলিত সকল কথাই জাল। এই জাতীয় কয়েকটি জাল হাদীস উল্লেখ করছি।
১৫. বাতিনী ইলম গুপ্ত রহস্য নবী-ফিরিশতাগণও জানেন না!
জালিয়াতগণ হাসান বসরী পর্যন্ত জাল হাদীস তৈরি করে বলেছে, হাসান বসরী(২২-১০৯ হি) বলেছেন, আমি সাহাবী হযরত হুযাইফা ইবনুল ইয়ামানকে(৩৬ হি) জিজ্ঞাসা করলাম, ইলম বাতিন কী? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ(সা)কে জিজ্ঞাসা করলাম, ইলম বাতিন কী? তিনি বলেন, আমি জিবরীলকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইলম বাতিন কী? তিনি বলেন, আমি আল্লাহকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইলম বাতিন কী? আল্লাহ বলেণ, “হে জীবরীল, তা হলো আমি ও আমার প্রিয়পাত্র অলীগণের মধ্যকার গোপন বিষয়। আমি তা তাদের অন্তরের মধ্যে প্রদান করি। কোনো নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা বা কোনো নবী-রাসূলও তা জানতে পারেন না।”
৫ম-৬ষ্ঠ হিজরী শতকের আলিম শীরাওয়াইহি ইবনু শাহরদার দাইলামী(৫০৯ হি) তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘আল ফিরদাউস’ এ এ কথাটিকে হাদীস হিসেবে সংকলিত করেছেন। কিন্তু আল্লামা ইবনু হাজার আসকালানী, জালালউদ্দীন সুয়ূতী, ইবনু ইরাক কিনানী, মোল্লা আলী কারী প্রমুখ প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিস হাদীসটির জালিয়াতি উদঘাটন করেছেন। হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ মিথ্যাবাদী ও হাদীস জালিয়াতি করতেন বলে প্রমাণিত। শুধু তাই নয়। জালিয়াতগণের কাছে কিছু ভুল থেকে যায়। এখানে তারা বলেছে, হাসান বসরী(রহ) হুজাইফাকে(রা) প্রশ্ন করেছিলেন। অথচ প্রকৃতপক্ষে হাসান বসরী জীবনে হুযাইফাকে দেখেনও নি, তাঁর নিকট হতে কিছু জিজ্ঞাসা করাতো দূরের কথা। (দাইলামী, আল ফিরদাউস ২/৩১২; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/২৮০, মোল্লা কারী, আল-আসনূ, পৃ. ৯২-৯৩)।
১৬. বাতিনী ইলম গুপ্ত রহস্য, আল্লাহ ইচ্ছেমত নিক্ষেপ করেন
এই জাতীয় আরেকটি জাল ও বাতিল কথা হলোঃ “বাতিনী ইলম মহান আল্লাহর গুপ্ত রহস্যগুলির একটি এবং আল্লাহর বিধানাবলির একটি। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার অন্তরে চান তা নিক্ষেপ করেন।” হাদীসটির একটি সনদ আছে। সনদটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অজ্ঞাত পরিচয় রাবীগণের সমষ্টি। আল্লামা যাহাবী, সুয়ূতী, ইবনু ইরাক প্রমুখ হাদীসটিকে জাল বলে উল্লেখ করেছেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, আল্লামা সুয়ূতী নিজে হাদীসটিকে জাল হিসেবে চিহ্নিত করে তার ‘যাইলুল লাআলী’ নামক জাল হাদীস বিষয়ক গ্রন্থে তা সংকলন করেছেন। কিন্তু তিনি আবার তাঁর ‘আল জামি আস সগীর’ নামক পুস্তকে হাদীসটি যয়ীফ হিসেবে উল্লেখ করেছন। অথচ তিনি দাবি করেছেন যে, ‘আল-জামি আস-সগীর’ পুস্তকে তিনি কোনো জাল হাদীস উল্লেখ করবেন না। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সকল প্রাজ্ঞ আলেমেরই ভল হতে পারে এবং কারো কথাই নির্বিচারে গ্রহণ করা যাবে না।”
এই বাতিল কথাটি কেউ কেউ অন্যভাবে বলেছেন। “বাতিনী ইলম আমার গুপ্ত রহস্যসমূহের একটি আমি আমার বান্দাদের অন্তরে স্থাপন করি। আর আমি ছাড়া কেউ তা জানে না।”(সিররুল আসরার, পৃ. ২৩)।
১৭. মানুষই আল্লাহর গুপ্ত রহস্য
একটি জাল ‘হাদীসে কুদসী’-তে বলা হয়েছে-“মানুষ আমার গুপ্তরহস্য এবং আমি মানুষের গুপ্তরহস্য।”(সিররুল আসরার, পৃ. ২৩, ৩১)।
১৮. বাতিনী ইলম লুক্কায়িত রহস্য শুধু আল্লাহওয়ালারাই জানেন
এই অর্থে আরেকটি অত্যন্ত দুর্বল, অনির্ভরযোগ্য বা জাল কথাঃ “ইলমের মধ্যে এমন এক প্রকার ইলম রয়েছে যা গোপনীয় বস্তুর মত। যে ইলম আল্লাহওয়ালা আলেমগণ ছাড়া কেউ জানেন না। তাঁরা যখন তা উচ্চারণ করেন তখন আল্লাহর সম্পর্কে ধোঁকাগ্রস্থ ছাড়া কেউ তা অস্বীকার করে না।”
দাইলামী ও অন্যান্য আলিম এই হাদীসটি সংকলন করেছেন। তাঁরা তাঁদের সনদে নাসর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হারিস নামক এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির সূত্রে বলেছেন, এই ব্যক্তি বলেছেন, তাকে আব্দুস সালাম ইবনু সালিহ আবুস সালত হারাবী বলেছেন, সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা থেকে, ইবনু জুরাইজ থেকে, আতা থেকে, আবূ হুরাইরা থেকে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন…।
হাদীসটির রাবী নাসর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হারিস অজ্ঞাত পরিচয়। তার উস্তাদ হিসেব আব্দুস সালাম ইবনু সালিহ অত্যন্ত দুর্বল বর্ণনাকারী। কোনো কোনো মুহাদ্দিস তাকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য মুহাদ্দিস তাকে অনিচ্ছাকৃত মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেছেন। মিথ্যার প্রকারভেদ অনুচ্ছেদে আমরা তার বিষয়ে আলোচনা করেছি। একমাত্র এই মিথ্যাবাদী ছাড়া অন্য কারো সূত্রে এই হাদীসটি বর্ণিত হয় নি।”(দাইলামী, আল ফিরদাউস ১/২১০; আলবানী, যায়ীফাহ ২/২৬২)।
১৯. মিরাজের রাতে ত্রিশ হাজার বাতিনী ইলম গ্রহণ
বাতিনী ইলম বিষয়ক একটি জঘন্য মিথ্যা কথা হযরত আব্দুল কাদির জিলানী(রাহ) এর নামে প্রচলিত ‘সিররুল আসরার’ নামক পুস্তকে নিম্নরূপে লেখা হয়েছেঃ “এই একান্ত গুপ্ত ত্রিশ হাজার এলম মেরাজ শরীফের রাতে আল্লাহ তাআলা হুযুর(সা) এর কলব মোবারকে আমানত রাখেন। হুযুর(সা) তাঁর অত্যন্ত প্রিয় সাহাবা এবং আসহাবে সুফফাগণ ব্যতীত অন্য কোনো সাধারণ ব্যক্তির নিকট সেই পবিত্র আমানত ব্যক্ত করেন নি।…..”(সিররুল আসরার, পৃ. ৪৫)।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের(সা) নামে কী জঘন্য ডাহা মিথ্যা কথা! রাসূলুল্লাহ(সা) এর একজন প্রিয় সাহাবী বা একজন সুফফাবাসী থেকেও এইরূপ কোনো কথা সহীহ বা যয়ীফ সনদে বর্ণিত হয় নি।
২০. রাসূলুল্লাহ(সা) এর বিশেষ বাতিনী ইলম
জালিয়াতদের বানানো একটি কথা যা হাদীস বলে প্রচলিত – “আল্লাহর সাথে আমার এমন একটি সময় আছে, যেখানে কোনো নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা বা প্রেরিত নবীর স্থান সংকুলান হয় না।”
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, কথাটি ভিত্তিহীন সনদহীন একটি জাল কথা, যদিও সুফিয়ায়ে কেরামের মধ্যে তা প্রচলন পেয়েছে। সূফী-দরবেশগণ সরলমনে যা শুনতেন তাই বিশ্বাস করতেন। ফলে জালিয়াতগণ তাঁদের মাঝে জাল কথা ছড়াতে বেশি সক্ষম হতো।(সাখাবী, আল মাকাদিস, পৃ. ৩৫৮; মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ১৯৭)।
২১. আলিমগণ বা তালিব ইলম গ্রামে গেল ৪০ দিন কবর আযাব মাফঃ
প্রচলিত একটি মিথ্যা কথাঃ “কোনো আলিম বা তালিব-ইলম(শিক্ষার্থী) কোনো গ্রামের মধ্য দিয়ে গমন করলে মহান আল্লাহ ৪০ দিনের জন্য সেই গ্রামের গোরস্থানের আযাব উঠিয়ে নেন।” কথাটি বানোয়াট ও মিথ্যা।(মুল্লা আলী কারী, আল আসরার, পৃ. ৭৪, নং ২৬১)।
২২. আলিমের সাক্ষাত/মুসাফাহা রাসূলুল্লাহর(সা) সাক্ষাত/মুসাফাহার মতঃ
প্রচলিত একটি জাল হাদীস-“ যে ব্যক্তি কোনো একজন আলিম/আলিমগণের সাথে সাক্ষাৎ করল, সে যেন আমার সাথেই সাক্ষাৎ করল, যে ব্যক্তি কোনো একজন আলিম/আলিমগণের সাথে মুসাফাহা করল, সে যেন আমার সাথেই মুসাফাহা করল, যে ব্যক্তি কোনো একজন মহআলিম/আলিমগণের মাজলিসে বসল, সে যেন আমার মাজলিসেই বসল। আর যে দুনিয়াতে আমার মাজলিসে বসেছে মহান আল্লাহ তাকে আগামীকাল (কিয়ামতের দিন) আমার সাথে জান্নাতে বসাবেন।”
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, কথাটি জাল ও মিথ্যা।(সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ৩৫; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/২৭২-২৭৩; মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ২৩২)।
এখানে উল্লেখ্য যে, কুরআন ও হাদীসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১. ইলম শিক্ষা করা, ২. নেককার মানুষের সাহচর্য্যে থাকা এবং ৩. নেককার মানুষদের আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা ও তাঁদের সাথে দেখা সাক্ষাত করা। এই তিনটি ইবাদত মুমিনের নাজাতের অন্যতম ভিত্তি। আলিমগনের সাহচর্য থেকেই এই তিনটি ইবাদত পালন করা যায়।
আলিমের নিজস্ব কোন ফযিলত নেই ।তার ফজিলত নির্ভর করবে তিনি কুরআন ও হাদীস থেকে যতটুকু ইলম ও আমল গ্রহন করবেন তার উপর ।অর্থাৎ আমলের ফযীলত দুইটি : ইলম ও আমল। নেককার আলেমের সাহচর্যের গুরুত্ব তিনটি:নেককার মানুষের সাহচর্যের সাধারন মর্যাদা ,নেককার মানুষের মহব্বতের সাধারন মর্যাদা ও ইলম শিক্ষার সুযোগ …..। এছাড়া আলেমের পিছনে সালাত আদায়,মসলিসে বসা,সাক্ষাত করা,মুসাফাহা করা ইত্যাদির বিষেশ ফযীলতে যা কিছু বলা হয় সবই ভিত্তিহীন ও জাল কথা।
২৩. য়ে দিন আমি নতুন কিছু শিখিনি সে দিন বরকতহীন
প্রচলিত একটি বাতিল কথা যা হাদীস নামে প্রচলিত :
“যদি আমার জীবনের এমন একটি দিন আসে যে দিন আমি আল্লাহর নৈকট্য প্রদানকারী কোন ঈমান বৃদ্ধি করতে পারি না, সেই দিনের সূর্যোদয়ে আমার জন্য কোনো বরকত না হোক।”
হাদীসটি আবূ নুআইম ইসপাহানী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস হাকাম ইবনু আব্দুল্লাহ নামক দ্বিতীয় শতকের এক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করছেন ।হাকাম বলেন ইবনু শিহাব যুহরী তাকে এই হাদীস বলেছনে,সাঈদ ইবনুল মূসাইযিব থেকে, আয়েশা থেকে রাসূলুল্লাহ(সা:)থেকে।আবু নু’নআইম বলেন’’এই হাদীস একমাত্র হাকাম ছাড়া কেউ বর্ণনা করেন নি। (আবু ন’আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ৮/১৮৮)।
হাকাম নামক এই ব্যক্তি সম্পর্কে মুহাদ্দিসগন একমত যে,লোকটি একজন জালিয়াত ও জঘন্য মিথ্যাবাদী ছিল।ইমাম আবু হাতিম রাযী বলেন,লোকটি জঘন্য মিথ্যাবাদী ছিল ।ইমাম দারাকুতনী,ইবনু আদী প্রমুখ মুহাদ্দিস বলেন,লোকটি একজন জঘন্য জালিয়াত ছিল।সে একটি জাল পান্ডুলিপি বানিয়ে তাতে ৫০ টির ও অধিক জাল হাদীস লিখে সেগুলো ইমাম যুহরীর নামে সঈদ ইবনু মুসাইয়িবের সুত্র প্রচার করে ।এগুলো সবই জাল ও ভিিত্তহীন।এছাড়া আরো অনেক জাল হদীস প্রচার করেছে।সকল মুহাদ্দিসই একমত যে লোকটি পরিত্যক্ত,মিথ্যাবাদী ও জালিয়াত(আল কামিল ২/৭৯.২০২-২০১৪;ইবনুল জাওয়ী, আদ-দুআফা ১/২২৭; যাহাবি,মীযানূল ই’তিদাল ২/৩৩৭)।
এই বাক্যটি অন্যভাবেও বর্ণিত:
“যদি আমার জীবনে এমন একটি দিন আসে যে দিন আমি কোনো একটি ভাল কর্ম বৃদ্ধি করতে পারি নি,সেই দিনে কোনো বরকত না হোক।”
এই বাক্যটিও উপরের জালিয়াত হাকাম ইবনু আব্দুল্লাহ সূত্রে বর্ণিত এর সনদে হাকাম পরে আরো জালিয়াত ও রাবী রয়েছে। সম্ভবত পরবর্তী কোনো দুর্বল রাবী ব্যাক্যটিকে একটু পরিবর্তীত করে ফেলেছে।
২৪. কুরআন্ দিয়ে হাদীস বীচার
ইসলামী ইলম-এর মূল উৎস দুইটি:কুরআন ও হাদিস্।আমারা দেখেছি য, হাদীসের জ্ঞানরে অতিরিক্ত তা কুরআনরে ব্যখ্যা হতে পারে বা কুরআানের সংযোজন হতে পারে্।প্রথম পর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি যে,এই মূলননীতিব ভীত্তিতে্ই সাহাবীগণের যুগ থেকে সকল যুগে মুসলিম উম্মাহর আলিমগন বুশুদ্ধতা,সূত্র, উৎস,অর্থ ইত্যাদি বিচার করেছেন।এ ক্ষেত্রেও জালিয়াতগণ বিভিন্ন রকমের জালিয়াতি করেছে।এ সকল জালিয়াতির উদ্দেশ্য হলো ‘ডকুমেন্টারী’নিরীক্ষা না করে ‘মনমর্জিত’ অর্থ বিচার করে হাদীস ‘গ্রহণ’করা। কেউ কুরআন দিয়ে হাদীস বিচার করার জন্য জাল হাদীস বানিয়েছে। কে্উ ‘ভাল-মন্দ’ অর্থ দেখে হাদীস বিচারের জন্য জাল হাদীস বানিয়েছে। কেউ নির্বিচারে‘ভক্তিভরে’ হাদীস গ্রহন করার জন্য জাল হাদীস বানিয়েছে। এই জাতীয় একটি হাদীস বলা হয়েছে:
“যখন তোমাদেরকে আমার থেকে কোন হাদীস বলা হবে, তখন তোমরা তা আল্লাহর কিতাবেরউপরে পেশ করবে (কুরআনের সাথে মিলিয়ে দেখবে।)যদি তা আল্লাহর কিতাবের সাথে সামন্জ্ঞস্যপূর্ণ হয় তবে তা গ্রহণ করবে।আর যদি তা তার বিরোধী হয় তবে তা প্রত্যাখ্যান করবে।”
এই হাদীসটি এবং এই অর্থে বর্ণিত বিভিন্ন বাক্য সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এই অর্থের অধিকাংশ বক্তব্যই সনদবিহীন মিথ্যা কথা।দুই একটি বাক্য এই অর্থে্ সনদসহও বর্ণিত হয়েছে, যেণ্ডলির সনদে মাতরূক, মুনকার বা পরিত্যক্ত ও মিথ্যায় অভিযুক্ত রাবী বিদ্যমান। মুহাদ্দিসগন উল্লেখ করেছেন যে ইসলামের গোপন শত্রু যিনদীকগন এসকল হাদিস তৈরি করে প্রচার করে।স্বভাবতই আমরা বুঝতে পারি যে,কোনো হাদীসই কোরআন ‘বিরোধী’ হয় না।তবে ‘ড়কুমেন্টারী’ প্রমান ছারা যদি ‘কোরআন’ হাদীস বিচার হয় তবে প্রত্যকেই তার নিজ ‘বুদ্ধি’ বা “মর্জি’ দিয়ে হাদীস বিচার করবে।একজন সহজেই বলতে পারবে যে, কুরআনে পাচঁ ওয়াক্ত সালাতের কথা নেই, বা তিন ওয়াক্তের কথা আছে। কাজেই পাচঁ ওয়াক্ত সালতের হাদীস গুলো কুরআন বিরোধী কাজেই তা প্রত্যাখান করতে হবে। অন্য জন বলবে বৎসরপূর্তির পরে যাকাত প্রধানের বিধান কুরআন বিরোধী।আরেকজন সহজেই বলতে পারবে,উকাশার প্রতিশোধ গ্রহনের কহিনী’ কুরআনের ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্দেশের সাথে সামণ্জ্ঞস্যপূর্ণ,কাজেই তা সহীহ।অথবা কুরআনে রাসুলুল্লাহ(সা)-কে রাহমাতুল্লল আলামীন বলা হয়েছে,কজেই’ ‘আপনি না হলে বিশ্ব সৃষ্টি করতাম না হদীসটি সহীহ। অথবা কুরআনে সাহাবীদের প্রশংসা করা হযেছে,কজেই আমার সাহাবীগণ নক্ষত্রতুল্য’হাদীসটি সহীহ। এভাবে প্রত্যেকেই নিজের মর্জি মত দাবী দাওয়া করতে থাকত এবং মুসলিম উম্মাহ অন্তহীন বিভ্রান্তির আবর্তে পড়তেন । এই উদ্দেশ্যই যিন্দীকগণ এই হাদীসগুলো বানিয়েছিল।তবে মুহাদ্দিসগণের সনদ নীরীক্ষার ফলে তাদের জালিয়াতি ধরা পড়েছে।
২৫. ‘ভাল’ অর্থ দেখে হাদীস বিচার
দ্বিতীয় পর্যয়ে হাদীসগুলীর মধ্যে রয়েছে: “আমার পক্ষ থেকে কোনো ‘কল্যাণ’বা ‘ভালো’ তোমাদের কাছে পোঁছালে আমি বলি অথবা নাই বলি তোমরা তা গ্রহন করবে,কারণ আমি তা বলি।আর তোমাদের নিকট কোন ‘খরাপ’বা ‘অকল্যানণ’ পৌছলে(তা গ্রহণ করবে না);কারণ আমি ‘খারাপ বলি না।”
এই অর্থের অন্য একটা হাদীস নিম্নরূপ:
‘“যখন আমার পক্ষ থেকে কোনো হাদিস তোমাদের বলা হবে যা ‘হক্ক’ বা সত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূ্র্ণ, তখন তোমরা গ্রহণ করিবে-আমি তা বলি অথবা নাই বলি।”/ এইরুপ ‘ভালমন্দ’ অর্থ্বিচার কের হাদিস গ্রহণের বিষয়ে কয়েকটি ‘হাদিস’ বর্ণিত হয়েছে। এই অর্থে বর্ণিত কিছু হাদিস সন্দেহাতীতভাবে জাল ও মিথ্যা বলে প্রামানিত। এণ্ডলির সনদে সুপরিচিত মিথ্যাবাদী রাবী বিদ্যমান। আর কিছু হাদীস অত্যন্ত দুর্বল সনদে বর্ণিত, যেণ্ডলির কেউ ‘যরীফ’ বলেছেন এবং কেউ মাউযূ বলছেন।
আমরা দেখেছি যে, সাহাবীগণের যুগ থেকেই হাদীস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ‘অর্থ বিচার করা হয়। তবে যে কোনো হাদীসের ক্ষেত্রে সর্ব-প্রথম বিচার্য হলো , কথাটি রসূলুল্লাহ … বলেছেন বলে প্রমনিত কিনাতিনি বলুন অথবা না বলুন, হক্ক, সত্য বা ভালর সাথে মিল হলেই তা ‘নির্বিচারে’ ‘হাদীস’ বলে গ্রহণ করার অর্থই হলো তিনি যা বলেন নি তা তাঁর নামে বলার পথ প্রশস্ত করা। আর অগনিত হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে। এজন্য মুহাদ্দসগন এ বিষয়ক ‘দুর্বল’ হাদিসণ্ডলিকেও অর্থগতভাবে বাতিল বলে গণ্য করেছেন । অনেক দুর্বল রাবী ভুল বশত এক হাদীসের সনদ অন্য হাদীসে জুড়ে দেন, মতন পাল্টে ফেলেন। জন্যকখনো কখনো দুর্বল বা অজ্ঞাত পরিচয় রাবীর হাদীসও অর্থ বিচারে মাউযূ বা বাতিল বলে গণ্য করা হয়।
২৬.ভক্তিতেই মুক্তি
সাধারণ মানুষ যাতে ‘নির্বিচারে’ জাল হাদীসণ্ডলিগ্রহণ করে, জালিয়াতগণ ‘ভক্তিতেই মুক্তি; মর্মে অনেক হাদীস বানিয়েছে। যেমনঃ ‘যদি কারো নিকট কোনো ‘ফযীলতের’ বা সাওয়াবের কথা পৌছে এবং সে তা বিশ্বাস করে, তবে আল্লাহ তাকে সে সাওয়াব দান করবেন;যদিও প্রকৃতপক্ষে তা সঠিক না হয়। অথবা তাকে যে কথাটি বলেছে সে যদিও মিথ্যাবাদী হয়।”
অনুরূপ আারেকটি মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীস: “যদি কারো কাছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ফজিলত বা সাওয়াবের কথা পৌছে কিন্তু সে তা সত্য বলে মেনে না নেয়,তবে সে সেই ফজীলতটি লাভ করবে না।”
দাজ্জালের বানানো আরেকটি বানোয়াট কথা:
“যদি তোমাদের কেউ কোনো পাথরেরে ব্যাপারও ভাল ধারণা পোষণ করে,তবে সেই পাথরও তার উপাকার করবে।”
এই কথা গুলো এবং এই অর্থে বণিত সকল কথা্ই জঘন্য মিথ্যা, যা মিথ্যাবাদী দাজ্জালগণ বানিযেছে এবং এগুলোর জন্য সনদও বানীয়েছে। তবে সাহাবীগণ হদীস বর্ণনার জন্য সনদ বলার অপরিহার্য্যতার রীতি প্রচলনের ফলে মুসলিম উম্মাহ এদের জালীয়াতি থেকে আত্মরক্ষার পথ পেয়েছেন। মুহ্হাদ্দীসগণ দেখেছেন যে, এই সকল হাদীস প্রত্যেকটির সনদে মিথ্যাবাদী ও জালীয়াত বিদ্যমান। এজন্য তারা এ সকল হাদীস জাল বলে চিহ্নিত করেছেন। আর একধিক সনদের কারনে কোনো মুহাদ্দীস এগুলোকে ‘অত্যন্ত দূর্বল’ বলে উল্লেখ করে এগুলির সহীহ হাদীস সম্মত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।
২.৯ ঈমান বিষয়ক
স্বদেশ প্রেম ঈমানের অংশ:
এটি অতি প্রচলিত একটি বাক্য “দেশপ্রেম ঈমানের অংশ।”
হাদীস হিসেবে কথাটি একেবারেই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। এছাড়া কথাটির অর্থও ইসলামী দৃষ্টীভঙ্গীর সাথে ততটা সামাঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কাজেই একে আলীমগণের কথা বা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিরি কথা বলে চালানোরও যৌক্তিকতা নেই। ঈমান ও ইসলাম ঐ সব কর্মের সমষ্টি যা মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছা শক্তির মাধ্যমে স্বেচ্ছায করতে পারে বা অর্জন করতে পারে। প্রাকৃতিকভাবে বা জন্মগতভাবে সে সকল বিষয় অর্জিত হয় তাকে ঈমানের বা ইসলামের অংশ বলা হয় না। কারণ এগুলো ঐচ্ছিক বা ইচ্ছাধীন কর্ম নয়। জন্মস্থুান,আবাসষ্থল,বন্ধুবান্ধব,স্ত্রী,সন্তান,পরিজন ও পিতামাতার প্রতি ভালবাসা একটি প্রকৃতিগত বিষয়। মানুষ সৃষ্টিগত ভাবে এদের প্রতি ভালবাসা অনুভব করে।এগুলী কোনটিই ঈমানের অংশ নয়। এজন্য পিতামাতার আনুগত্য ও সেবাকে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলা হয়েছে,পিতামাতার ভালবাসা কে নয়। অনূরূপভাবে দেশের প্রতি আবাসস্থলের প্রতি,পাড়া প্রতিবেশীর প্রতি মুসলিমের অনেক দায়িত্ব রয়েছে, যা তিনি ইচ্ছধীন কর্মের মাধ্যমে পালন করবেন।কিন্তু প্রকৃতিক ভালবাসাকে ঈমানের অংশ বলা ইসলামিক ধারনার সাথে পুরোপুরি মেলে না্।
কেউ প্রকৃতিক নিয়ম লঙ্গন করে,নীজ সন্তান, স্ত্রী, পিতামাতা, আবাসস্থল বা দেশকে ভাল না বাসে তাহলে আমরা তাকে অপ্রকৃতিস্হ,ম্যানিয়াক,পাগল ইত্যদি বলব।আর যদি এই অবস্থা তাকে তাকে উপর্যুক্ত দায়িত্বাদি পালন থেকে বিরত রাখে তাহলে আমরা তাকে পাপ ও আল্লাহর অবাধ্য বলব।
২. প্রচলিত ‘পাঁচ’ কালিমা
আমাদের দেশে ইসলামী ঈমান-আকীদার বিবরণের ক্ষেত্রে ‘পাচটি কালিমা’র কথা প্রচলিত আছে। এছাড়া ঈমানে মুজমাল ও ঈমানে মুফাসসাল নামে দুইটি ঈমানের কথা আছে। কায়েদা, আমপারা দ্বীনিয়াত ও বিভিন্ন প্রচলিত বই পুস্তকে এই কলিমাগুলি রয়েচে। এগুলিকে অত্যন্ত জরূরী মনে করা হয় এবং বিশেষভবাভে মুখস্থ করা হয়। এই বাক্যগুলির অর্থ সুন্দর। তবে সবগুলি বুাক্য এভাবে হাদীস শরীফে বর্ণীত হয় নি। এগুলিকে সব কুরআনের কথা হদীসের কথা মনে করলে ভুল হবে
(১)কালীমায়ে শাহাদত
কুরআন ও হদীসের ইসলামী ঈমান বা বিশ্বসের মূল হিসাবে দুইটি সাক্ষ্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,যা আমদের দেশে ‘কালীমায়ে শাহাদত’হিসাবে পরিচিত। এই কালীমায়ে আল্লাহর তোওহীদ এবং মুহাম্মদ(সা)এর রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করা হয়। প্রকৃতপক্ষে একমাত্র‘কালীমায়ে শাহাদতই’হাদীস শরীফের মূল বাক্য হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সালাতের (নামাজের) ‘তাশাহুদের’মধ্যে বাক্যদ্বয় এভাবে একত্রে বলা হয়ছে:
“আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই”
“আমি আরো সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, মুহ্হাম্মদ(সা)আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।”
প্রথম বাক্য: “আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই”
এই প্রথম বাক্যটির ক্ষেত্রে কোনো কোনো হাদীসে বলা হয়েছে:
“আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই,তিনি একক,তার কোনো শরীক নাই।”
দ্বীতিয় বাক্য: “আমি আরো সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, মুহ্হাম্মদ(সা)আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।”
আযানের মধ্যে এই বাক্য দুইটিকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
(২) কলিমায়ে তাইয়েবা
আমদের দেশে ‘কালীমায়ে তাইয়েবা বা “পবিত্র বাক্য” বলতে বুঝানো হয় তাওহীদ ও রিসালাতের একত্রিত ঘোষণা:
কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছে:
“আপনি কি দেখেন নি, কিভাবে আল্লাহ একটি উদাহারন পেশ করেছেন একটি ‘কালীমায়ে তাইয়েবা বা “পবিত্র বাক্য” একটি পবিত্র বৃক্ষের মত, তার শাখা প্রশাখা আকাশে প্রসারিত।”
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রা) ও অন্যন্য মুফ্ফা থেকে বর্ণীত হয়েছে যে এখনে ‘কালীমায়ে তাইয়েবা বলতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ এই বাক্যটি বুঝানো হয়েছে। কিন্তু (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) দুইটি বাক্য একত্রিতভাবে কোনো হাদীসে ‘কালীমায়ে তাইয়েবা’ হিসাব উল্লেখ করা হয়নি।
উপরের কালীমায়ে শাহাদতের দুইটা অংশের মূলই হলো কালিমা তাইয়েবায় তওহীদ ও রিসালাতের মূল বাক্যদুইটিকে একত্রে বলা হয়। আমরা দেখেছি যে, কালীমায়ে শাহাদতকে অনেক সময়’ “শাহাদাত” শব্দ উহ্য রেখে বলা হয়ছে।
এভাবে ‘কালিমা’ হিসাবে কোথও উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা য়ায না। একটা হাদীসে বর্ণীত হয়ছে যে,এভাবে এই বাক্যদ্বয় একত্রে আরশের গায়ে লিখা ছিল। আমরা্ এই পুস্তকের অন্য স্থানে উল্লেখ করেছি এই হাদীস অত্যন্ত দূর্বল ও বানোয়াট।
এখানে উল্লেখ্য যে, কালিমা তাইযেবার দুইটা অংশ পৃথকভাবে কুরআন কারীমে ও হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় বাক্যই্ কুরআনের অংশ এবং ঈমানের মূল সাক্ষ্যের প্রকাশ। উভয় বাক্যকে একত্রে বলার মধ্যে কোনো প্রকারের অসুবিধা নেই। তাবেয়ীগনের যুগ থেকেই কালিমা শাহাদতের মূল ঘোষণা হিসাবে এই বাক্যটির ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। কুরআন কারীমে কালিমাতু তাকওযা’’ তাকওয়ার বাক্য’ বলা হয়ছে। এর ব্যাখ্যায় তাবিয়ী আতা আল-খুরাসানী(১৩৫হি) বলেন: কালিমায়ে তাকওয়া হলো (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ)
(৩)(কালিমায়ে তাওহীদ)
কালিমায়ে তাওহীদ নামে আমাদের দেশে নিম্নের বাক্যটি প্রচলিত:
আরবী(******)
এই বাক্যটির অর্থ সুন্দর। তবে এই বাক্যটির কোনোরূপ গুরুত্ব এমনকি এ্রর কোনো প্রকারের উল্লেখ বা অস্তিত্ব কুরআন বা হাদীসেও পাওয়া যায় না।
৪.(কালিমায়ে তামজীদ)
কালিমায়ে তামজীদ হিসাবে নিম্নেরে বাক্যটি প্রচলিত:
আরবী(******)
এই বাক্যটির অর্থ ও সুন্দর। কিন্তু এভাবে এই বাক্যটি বলার কোনো নির্দেশনা, এর গুরুত্ব বা অস্তিত্ব কুরআন বা অস্তিত্ব কুরআন বা হাদীসে পাওয়া যায় না ।
৫. কালিমায়ে রাদ্দে কুফর
কালিমায়ে রাদ্দে কুফর নামে কয়েকটি বাক্য আমাদের দেশের বিভিন্ন বইয়ে দেখা য়ায।
আরবী(******)
বাক্যগুলোর অর্থ ভাল। কিন্তু বাক্যগুলি এভাবে কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না এবং এই বাক্যের কোনো বিশেষ গুরূত্বও হাদীস দ্বারা প্রমানীত নয়।
৬. ঈমানে মুজমাল
আরবী(******)
ঈমানে মুজমাল নামে প্রচলিত এই বাক্যটির অর্থ সুন্দর।তবে এই বাক্যটির পরবর্তী আলীমদের বানানো্ একটা সাধারন বাক্য।এরূপ কোনো বাক্য কোনোভাবে কোনো হাদীসে উল্লখ করা হয়নি।
৭.ঈমানে মুফাস্সাল
এক হাদীসে হযরত জিবরাঈল(আ) রাসূলুল্লাহ(সা)কে জিজ্ঞাসা করেন ঈমান কী? তিনি উত্তরে বলেন
আরবী(******)
“তুমি ঈমান আনবে আল্লাহর উপরে,তাঁর ফেরিশতাগণের উপরে, তাঁর কেতাবগুলির উপরে,তাঁর রাসূলগণের উপরে,শেষ দিবসের উপরে আনবে,এবং তুমি ঈমান আনবে তকদীরের উপরে:তার ভাল এবং তার মন্দের উপরে।”
ঈমানের এই ছয়টি রূকন বা স্তম্বের কথা কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে।এ ছাড়া এ বিষয়ে আরো অনেক হাদীস রয়েছে। এক্ষেত্রে লক্ষনীয় যে , ঈমানে মুফাস্সালের মধ্যে আখিরাতের বিস্বাস কে পৃথক দুইটা বাক্যে প্রকাশ করা হয়েছে (ইয়ওমিল আখির)ও(বা’সি বা’দাল মাউত): শেষ দিবস(আখিরাত) ও মৃত্যুর পরে উত্থান। উভয় বিষয় একই।
২.১০ সালাত বিষয়ক
২.১০.১ পবিত্রতা বিষয়ক
১. ‘কুলুখ ব্যবহার না করলে গোর আযাব হওযা
প্রচলিত একটি গ্রন্থে বলা হয়েছে: হাদীসে আছে,যাহারা বাহ্য- প্রস্রাবের পর কুলুখ ব্যবহার না করিবে তাহাদের ন্যায় কঠিন আযাব কাহারও হইবে না”। (মোঃ গোলাম রহমান, মকছুদোল মো‘মেনীন, পৃ. ৮৪)।
কথাটি এভাবে ঠিক নয়। এভাবে একে হাদীস বললে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নামে মিথ্যা বলা হবে। সম্ভবত এখানে একটি সহীহ হাদীসের অনুবাদ বিকৃত ভাবে করা হয়েছে। বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, পেশাব থেকে ভালভাবে পবিত্র না হওয়া কবর আযাবের অন্যতম কারণ। একটি হাদীসে আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লহ (সাঃ) বলেছেন:আরবী(******)
“কবরের অধিকাংশ শাস্ত পেশাব থেকে।”(ইনবনু মইবনু মাজাহ, আস সুনান ১/১২৫; হাকিম, আল মুসতাদরাক ১/২৯৩)।
নুইব উপরের কথাটি সম্ভবত এই হাদীসের বিকৃত অনুবাদ। এই হাদীস এবং এই অর্থের অন্য সকল হাদীসে পেশাব থেকে ভালভাবে পবিত্র হতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কোনো হাদীসেই বলা হয়নি যা, ‘কুলুখ’ ব্যবহার না করলে কোনো অন্যায় হবে বা শাস্তি হবে। মূল বিষয় হলো, মলমূত্র ত্যাগের পর পরিপূর্ণরূপে পবিত্র হওয়া ইসলামের অন্যতম বিধান। হাদীসের আলোকে আমরা দেখতে পাই যা, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইস্তিঞ্জার সময় কখনো পাথর বা ঢিলা ব্যাবহার করতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি পানি ব্যবহার করতেন। কখনো কখনো পাথর ও পানি দু’টিই ব্যবহার করতেন। সাহাবায়ে কেরামও এভাবেই ইস্তিঞ্জা করেছেন। পানি ও পাথর (কুলুখ) উভয়ই ব্যবহার করা উত্তম। তা না হলে শুধুমাত্র পানি ব্যবহার করা ভাল। তা না হলে শুধুমাত্র পাথর বা (কুলুখ) ব্যবহার করে পবীত্রতা অর্জন করতে হবে। এতেও মূল ওয়াজিব আদায় হবে কোনরূপ অপরাধ বা গোনাহ হবে না।বিভিন্ন হদীস থেকে বিষয়গুলি জানা যায়। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষনীয়। মলমূত্র পরিত্যাগের পরে পবিত্র হওয়ার দুটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় হলো মলমূত্র ত্যাগের পরে বসা অবস্থাতেই পানি অথবা পাথর উভয়ের ব্যবহারের মাধ্যমে ময়লা স্থানকে পরিষ্কার করা। একে আরবীতে ইসতিনজা বা ইসতিজমার বলা হয়। পবিত্রতার দ্বিতীয় পর্য়ায় হলো সতর্কতা বা সন্দহমুক্ত হওয়া। এর অর্থ হলো,পেশাব শেষে ইসতিনজার পরেও ওঠে দাঁড়ালে বা হাঠতে গেলে দুই এক ফোটা পেশাব বেরিয়ে আসতে পারে ভয় পেলে গলা খাঁকারি দিয়ে বা কয়েক পা হাঁটাচলা করে সন্দহ থেকে মুক্ত হওয়া। আরবীতে একে ‘ইসতিবরা’ বলা হয়।
হাদীস শরীফে প্রথম পর্যায়ে ইসতিনজার জন্য পানি ও পাথর ব্যবহারের কথা বলা হয়েছ। একটি জরীফ হাদীসে পেশাবের বসা অবস্থাতেই তিনবার পুরুষাঙ্গ টান দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া আর কোনো হদিস শরীফে বর্ণিত হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বা তার সাহাবীগণ ইস্তিঞ্জার সময় কখনো উঠে দাঁড়াননি হাঁটাচলা, লাফালাফি, গলাখাকারি ইত্যাদি কিছুই করেননি। পেশাব ও পায়খানা উভয় ক্ষেত্রেই তঁারা স্বাভাবিকভাবে বসা অবস্হাতেই পাথর বা পানি,অথবা প্রথমে পাথর এবং তারপর পানি ব্যবহার করে পরিচ্ছিন্নতা অর্জন করেছেন। পরবর্তী যুগের আলিমগণ সন্দেহের ক্ষেত্রে সতর্কতার জন্য এরূপ হাঁটা চলার বিধান দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, মানুষের তবিয়ত বিভিন্ন প্রকারের। যদি কারো একান্ত প্রয়োজন হয় তহলে উঠে দাঁড়িয়ে বা দুই এক পা হেঁটে, গলাখাকারি দিয়ে বা এধরনের কোনো কাজের মাধ্যমে তারা ‘পেশাবএকদম শেষ হয়েছে’ –এ বিষয়ে নি্শ্চিত হতে পারে। আর যার মনে হবে যে, বসা অবস্থাতেই সে পরিপূর্ণ পাক হয়ে গিয়েছে তার জন্য সুন্নতের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কাজেই ‘কুলুখ নিয়ে হাঁটাচলা করা’ অথবা দাবি করি যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এরূপ হাটাচলা করেছেন বা করতে বলেছেন তাহলে তাঁর নামে মিথ্যা দাবি করা হবে।
২. বেলালের ফযীলতে কুলুখের উল্লখ
প্রচলিত একটি বইয়ে রয়েছে: “হযরত (সাঃ) কদিন বিলাল (রা)-কেজিজ্ঞাসা করিলেন, ওহে বিলাল! আমি মেরাজের রাত্রীতে বেহেস্তের মধ্য তোমার পায়ের চিহ্ন দেখিতে পাইয়াছি। বলত এরূপ পূণ্যের কোন কাজ তোমার দ্বারা সম্পাদিত হইতেছে? তদুত্তরে বিলাল (রা) বলিলেন , আমি বাহ্য-প্রসাবের পর কুলূখ ব্যবহার করি, পবিত্রতার দিকে লক্ষ রাখি ও সদা সর্বদা অজুর সহিত থাকি। হুজুর (সাঃ)বলিলেন ইহাইতো সকল নেক কাজের মূল।”
বিভিন্ন হাদীসে বেলালের এই মর্যাদার বিষয়ে তিনি তিনটি বিষয় উল্লেক করেছেন: ওযু করলেই দুই রাক’আত সালত আদায় করা; আযান দিলেই দুই রাক’আত সালত আদায় করা এবং ওযু ভাঙ্গলেই ওযু করা্।প্রথম বিষয়টি বুখারী ও মুসলীম সংকলিত হাদীস রয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিষয়টী ইবনে খুইয়াম, হাকিম প্রমূখ মুহাদ্দীস সংকলিত একটি হাদীস রয়ছে। কুলুখের কথা কোথাও উল্লেখ করা হযেছে বলে জানা যায় না।
এখানে লক্ষণীয় যে,সাহাবীগণ সকলেই মল মূত্র পরিত্যাগের পরে কুলুখ ব্যবহার করতেন। এজন্য বিভিন্ন হাদীসে পানি ও কুলুখু উভয়ই ব্যবহার করার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
৩. খোলা স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করা
প্রচলিত একটি পুস্তকে রয়েছে: হাদীসে আছে যারা খোলা জায়গায় বসিয়া বাহ্য-প্রসাব করিবে, ফেরেস্তাগণ তাহাদীগকে বদদোয়া কিতে থাকিবেন। কথাটি এভাবে সঠিক নয়। খোলা বলতে মাথার উপরে খোলা বা চারিপিাশে খোলা কোনো স্তানে মলমুত্র পরত্যাগ করলে এ্ই বদদোয়ার কথা কোনো হাদিসে উল্লখ করা হয়েছে বলে যথাসাধ্য চেষ্টা করে জানতে পারি নি।মলমূত্র ত্যাগের সময় সতর অন্য দৃষ্টি থেকে আবৃত রাখা জরূরিঅন্য মনুষকে সতর দেখিয়ে মলমূত্র ত্যাগ করতে,মলমূত্র ত্যাগের সময় কথা বলতে হাদিসশরীফে নিষেধ করা হয়েছে এছারা মানুষের রাস্থায় ,মানুষের ব্যবহারের ছায়ায় মলত্যাগকে হাদীস শরীফে অভিশাপের বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. ফরয গোসল দেরী করা
গোসল ফরয হলে তা দেরী করলে পাপ হবে বা সেই অবস্থায় মাটির উপর হাটলে মাটি অভিসাপ দিবে ইত্যাদি সকল কথা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
গোসল ফরয হলে তা যথাসম্ভব দ্রুত সেরে নেয়া উত্তম।তবে গোসলের মূল প্রযোজনীয়তা হলো সালাত আদায় বা কুরআন পাঠের জন্য। এছারা মুমিন গোসল ফরয থাকা অবস্থায় সকল কর্ম যিক্র ও দোয়া করতে পারেন।কাজেই নামাজের ক্ষতি না হলে গোসল দেরি করলে গোনাহ হয় না।রাসুলুল্লাহ (সা) অনেক সময় প্রধম রাত্রিতে গোসল ফরয হলেও গোসল না করে শুয়ে পড়তেন এবং শেষ রাত্রিতে গোসল করতেন বলে সহীহ হদীসে বর্ণিত হয়েছে।
৫. শবে বরাত বা শবে কদরের গোসল
লাইলাতুল বারাআত ও লাইলাতুল কাদর-এর জন্য গোসল করার বিষয়ে যা কিছু বলা হয় তা সবই বানোয়াট।এই দু্ই রাত্রির জন্য গোসলের কোনো ফজিলত সহীহ হাদীসে বর্ণথ হয় নি।রন পরবর্তিতে এ বিষয়ক জাল হাদীসগুলি উল্লেখ করার আশা রাখি।
৬. ওযু, গোসল ইত্যাদির নিয্যাত
নিয়্যাত নামে ‘নাওইতু আন…’ বলে যা কিছু প্রচলিত আছে সবই পরবর্তী যুগের আলীমদের বানানো কথা। এগুলিকে হদীস মনে করলে বা রাসূলুল্লাহ(সা) এরুপ নয়্যাত পাঠ করতেন বা এভাবে নিয়্যাত করতে বলেছেন বলে মনে করলে বা দাবী করলে তা ভিত্তিহীন মিথ্যা দাবী হবে। নিয়্যাত অর্থ উদ্দেশ্য বা ইচ্ছা(intention)। উদ্দেশ্যের উপরেই ইবাদতের সওয়াব নির্ভর করে। নিয়্যাত মানুষের অভ্যন্তরের অভ্যন্তরীন সংকল্প বা ইচ্ছা, যা মানুষকে উক্ত কর্মে উদ্বুদ্ধ বা অনুপ্রানিত করেছে।নিয়্যাত করতে হয়,বলতে বা পড়তে হয় না।রাসূলুল্লাহ(সা)কখনো জীবনে একটিবারের জন্যও ওযু,গোসল,নামায,রোযা ইত্যাদি কোনো ইবাদতের জন্য কোনো প্রকার নিয়্যাত মুখে বলেননি। তার সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ,ইমাম আবু হানিফা(রহ:)-সহ চার ইমাম ও ফকীহ কখনো কোনো ইবাদতের নিয়্যাত মুখে বলেননি বা বলতে কাউকে নির্দেশ দেননি। পরবর্তী যুগের কোনো কোনো আলিম এগুলি বানিয়েছেন। তারা বলেছেন যে মুখের উচ্চারনের কোনো মূল্য নেই মনের মধ্যে উপস্থিত নিয়্যাতই মূল, তবে এগুলি মূখে উচ্চারন করলে মনের নিয়্যাত একটু দৃঢ় হয়। এজন্য এগুলো বলা ভাল। তাদের এই ভালোকে অনেকেই স্বীকার করেননি। হযরত আলফ সানী ওযু,নামায,রোযা ইত্যাদি যে কোনো ইবাদতের জন্য মুখে নিয়্যাত করাকে খারাপ বিদ’আত হিসাবে নিন্দা করেছেন এবং কঠোর ভাবে এর বিরোধিতা করেছেন। আমি “এহইয়াউস সুনান” গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
৭. ওযুর আগের দোয়া
আমাদের দেশে প্রচলিত বিভিন্ন পুস্তকে ওযুর পূর্বে পাঠ করার জন্য নিম্নের দোযাটি শেখানো হয়েছে আরবী(*******)
এ্ দোয়াটি বানোয়াট। বিভিন্ন হাদীসে ওযুর পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একটি হাদীসে ‘বিসমিল্লাহ ওয়া আল-হামদুলিল্লাহ’(আল্লাহর নামে ও প্রশংসা আল্লহ নিমিত্ত)বলার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তবে উপরের এই দোয়াটির কথা কোনো হাদীসে আছে বলে জানা যায় না।
৮. ওযুর ভিতরের দোয়া
বিভিন্ন পুস্তকে ওযুর পত্যেক অঙ্গ ধৌত করার সময় পঠের জন্য বিশেষ দোয়ার কথা উল্লেখ করা হযেছে।হাত ধোয়ার দোয়া,কুলি করার দোয়া, নাক পরিষ্কার করার দোয়া…ইত্যাদি। এই দোয়ার ভিত্তি যে হাদীসটি বানোয়াট। ইমাম দারাকুতনী,ইমাম নববী,ইমাম সুয়ূতী,মোল্লা আলী কারী ও অন্যা্ন্য মুহাদ্দীস সকলেই হাদীসটিকে বানোয়াট ও ভিত্তীহিন বলে উল্লেখ করেছেন।৬০৬
৯.ওযুর সময়ে কথা না বলা
ওযুর সময়ে কথা বলা যাবে না, বা কথা বললে কোনোরূপ অন্যায় হবে এ্ মর্মে কোনো হাদীস নির্ভরযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণূত হয় নি।
এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় তা কোনো কোনো আলিমের কথা মাত্র।
১০.ওযুর পরে সুরা ‘কাদ্র’ পাঠ করা
সহীহ হাদীসে ওযুর পরে পাঠ করার জন্য একাধিক দোয়ার উল্লেখ করা হয়েছে। ‘রহে বেলায়েত’ গ্রন্থে আমি দোয়াগুলো সনদ সহ আয়োচনা করেছি। আমাদের দেশে অনেক পুস্তকে এ সকল সহীহ দোয়ার বদলে কিছু বানোয়াট কথা লেখা হয়েছে। কোনো কোনো গ্রন্থে লেখা আছে “অজু করার পর ছুরা কদর পাঠ করলে সিদ্দিকের দরজা হছিল হইবে।
আলীর প্রতি রাসূলুল্লাহ(সা)-এর ওসীয়ত’ নামক জাল হাদীসটিতে এইরূপ কিছু কথা উল্লেখ আছে। ওসীয়তটির বিষয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
২.১০.২. মসজিদ ও আযান বিষয়ক
১. মসজিদে তৈরির উদ্দেশ্য হলো, সালাত আদায় করা,আল্লাহর জিকির আদায় করা,দ্বীনের আলোচনা করা ইত্যাদি মসজিদের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেনঃ আরবী(*****)
“এগুলিতে শুধুমাত্র আল্লাহর জিকির,সালাত, কুরআন তিলওয়াতের জন্য”।(মুসলিম, আস-সহীহ ১/২৩৬)।
মসজিদের মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় করতে এবং হারানো বা পলাতক কোনো কিছু খোজ করতে, উচ্চস্বরে কথা বলতে বা চৎকার করতে হাদীস শরীফে নিষেধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাধারণ জাগতিক কথাবার্তা বলার কোনো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা কোনো সহীহ হাদীসে বর্নিত হয় নি।সাহাবী গণ মসজীদের মধ্যই কবিতা পাঠ করতেন। জাবির (রা)বলেন:
রাসূলুল্লাহ(সা) যে স্থানে ফজরের সালাত ।আদায় করতেন সেখানে সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে থাকতেন। সূর্যোদয় পরে তিনি উঠতেন। তার বসা অবস্থায় সাহাবায়ে কেরাম কথাবার্থা বলতেন,জাহেলী যুগের কথা আলোচনা করতেন,কবিতা পাঠ করতেন এবং মুচকি হাসতেন।আর তিনি শুধু মুচকি হাসতেন। (সহীহ মুসলিম, ১/৪৬৩)।
আমাদের দেশে প্রচলিত কয়েকটা জাল হাদীস নিম্নরূপ:
“যে ব্যক্তি মসজিদে দুনিয়াবী কথাবার্থা বলবে আল্লাহ তার চল্লিশ বৎসরের আমল বাতিল করে দিবনে।”
আল্লামা সগনী, তাহের ফাতানী, মোল্লা আলী কারী, আজলূনী প্রমূখ মূহাদ্দীস একবাক্যে হাদীসকে জাল বলেছেন। মোল্লা কারী বলেন: এই কথাটি যেমন সনদগতভাবে বাতিল, তামনি এর অর্থও ইসলাম বিরোধী।”
অনুরুপ আরেকটি জাল ও বানোয়াট কথা:
“মসজিদে কথাবার্তা নেক আমলন খায়,যেরুপ কাঠ আগুন খায়।”
কোনো কোনো প্রসিদ্দ আলেম জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে এই বাক্যটিকে হাদীস উল্লেখ করেছেন। আল্লামা ইরাকী,ফাইরোযআবাদী,তাহের ফাতানী,মোল্লা আলী কারী ও অন্যান্য সকল মুহাদ্দীস একমত যে; এই বাক্যটি বানোয়াট ও ভিত্তীহিন ও সনদবীহিন একটি কথা যা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলা হয়েছে।
২.মসজিদে বাতি জ্বালানো ও ঝাড়ু দেওয়া
মসজিদ পরিষ্কার করা, ঝাড়ু দেওয়া, বাতি জালানো ইত্যাদি সাধারণভাবে নেক কর্ম । কিন্তু অন্যান্য সকল বিষয়ের মত এ বিষয়েও বিশেষ পুরুষ্কারের নামে কিছু জাল হাদীস বানানো হয়েছে। মসজিদে বাতি জ্বালালে এত এত সওয়াব, বা এত হাজার ফিরিশতা দোয়া করবে, এত হজ্জ বা উমরার সওয়াব মিলবে…………. সকল কথা বানোয়াট।
৩. আযানের সময় বৃদ্ধাঈুলি চোখে বুলানো আমাদের দেশে অনেক ধার্মিক মুসলমান আযানের সময় “আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” বাক্যটি শুনলে দুই হাতের আঙুলে চুমু খেয়ে তা তা দিয়ে চোখ মুছেন।এই মর্মে একটি বানোয়াট ও মিথ্যা হাদীসকে সত্য মনে করেই তারা এই কাজ করেন। এই বানোয়াট হাদীসটি বিভিন্ন ভাবে প্রচারিত। এক বর্ণমালায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আযানের এই বাক্যটি শুনে মুখে বলবে: আরবী(*******)
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহম্মদ (সাঃ) তার বান্দা ও রাসূল, আমি সন্তুষ্ঠ ও পরিতৃপ্ত হয়েছি আল্লাহকে প্রভু হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে ও মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবী হিসাবে গ্রহণ করে” আার এই কথাগুলি বলার সাথে সাথে দুই হাতের শাহাদত আঙুলের ভিতরের দিক দিয়ে তার দুই চক্ষু মুছবে তার জন্য শাফায়াত পাওনা হবে। কেউ কেউ বলেন : আযানের এই বাক্যটি শুনলে মুখে বলবে:
’’মারহাবা! আমার প্রিয়তম আমার চোখের শান্তি মুহম্মদ ইবনু আব্দুল্লাহকে”, এরপর তার বৃদ্ধাঙুলিদ্বয়কে চুমু খাবে এবং উভয়কে তার দুই চোখের উপর রাখবে। যদি কেউ এরূপ করে তবে কখনো তার চোখ উঠবে না বা চোখের দৃষ্ঠিশক্তি নষ্ঠ হবে না।
এই জাতীয় সকল কথাই বানোয়াট । কেউ কেউ এ সকল কথা আবু বকর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। মোল্লা আলী কারী বলেন, “আবু বকর (রা)থেকে বর্ণনা প্রমানিত হলে তা আমল করা যথেষ্ঠ হবে।” তবে হাদীসটি আবু বকর (রা)থেকে প্রমানিত নয়। ইমাম সাখাবী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস তা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বর্তমান যুগের অন্যতম হানাফী ফকীহ,মুহাদ্দিস ওসুফী আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাম লিখেছেন, তার উস্তাদ ও প্রখ্যাত হানাফী ফকীহ ও মুহাদ্দিস মুহাম্মদ যাহেদ আল- কাওসারীর গবেষনায় প্রমানিত হয়েছে যে,মুল্লাআলী কারী এ বিষয়ে ইমাম সাখাবীর বিস্তারিত আলোচনা জানতে পারন নি। ফলে তার মনে দ্বিধা ছিল। প্রকৃত বিষয় হলো হযরত আবু বকর (রা) বা অন্য কোনো সূত্রে হাদীসটির কোনো প্রকার নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায়নি মুহাদ্দিসগণ কমত হয়েছেন যে, এ বিষয়ক সকল বর্ণনা বানোয়াট। (ইমাম সাখাবী, আল-মাকসিদ, পৃ:৩৮৩-৩৮৪,নং১০২১, মুল্লা আলী কারী, আল-আসরার,পৃ:২১০,নং৮২৯, আল-মাসনূ’য় পৃ:১৩৪নং৩০০,যারকানী, মাখতাসারূল মাকসিদ,পৃ:১৭৪নং৯৪০, আল-আজলূনী,কাশফুল খাফা২/২০৬; শাওকানী,আল-ফাওয়াইদ১/৩৯)।
এখানে তিনটি বিষয় লক্ষনীয়:
প্রথমত, রোগমুক্তি, সুস্থতা ইত্যাদির জন্য বিভিন্ন ‘আমল’ অনেক সময় অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যবহার করা হয়। জন্য এই প্রকারের আমল করে ফল পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, এগুলি হাদীস দ্বারা প্রমানিত। কেউ রোগমুক্তি উদ্দেশ্যে কোনো শরীয়ত সম্মত আমল করতে পারেন।তবে বিশুদ্ধ সনদ ছাড়া এরূপ ‘আমল’ –কে হাদীস বলা যায় না।
দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কেমহস্সত করা ঈমানের অংশ ও অত্যন্ত পড় নেককর্ম। যদি কেউ হাদীসটির জালীয়াতী অবগত অবগত না হওয়ার কারনে এর উপরে আমল করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নাম শুনে হৃদয়ে মহব্বত ও ভলবাসা নিয়ে এভাবে আঙুলে চুমু খান,তবে তিনি এই জাল হাদীসে বর্ণীত সওয়াব না পেলেও,মূল মহব্বতের সওয়াব পাবেন,ইনশা আল্লাহ।তবে জেনেশুনে জাল হাদীসে উপর আমল করা জায়েয নয়।
তৃতীয়ত,এই জাল হাদীসের পরিবর্তে মুমিন একটি সহীহ হাদীসের উপর আমল করতে পারেন।দুই হাতের আঙ্গুল দিয়ে চোখ মুছার বিষয়টি বানোয়াট হলেও উপরের বাক্যগুলি মুখে বলার বিষয়ে অত্যন্ত বিশুদ্ধ হাদীস বর্নিত হয়েছ। রাসূলুল্লাহ (সা:)বলেছেন:যদি কেউ মুআযযিনকে শুনে বলে:
“এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই,তিনি একক,তাঁর কোনো শরীক নেই।এবং মুহাম্মদ(সা:) তার বান্দা ও রাসূল। আমি তুষ্ট ও সন্তুষ্ট আছি আল্লাহকে প্রভু হিসাবে,ইসলাম কে দ্বীন হিসাবে এবং মুহাম্মদকে(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)নবী হিসাবে।”রাসূলুল্লাহ (সা:) বেলেন ,যদি কেউ উপরেবাকগোলো বলে,তবে তার সকল গোনাহ ক্ষমা করা হবে। (মুসলিম ১/২৯০,নং৩৮৬,ইবনু খুযাইমাহ ১/২২০, ইবনু হিব্বান ৪/৫৯১)।
৪.আযানের জাওয়াবে সাদাকাত ও বারিরতা
আমাদের দেশে প্রচলন হলো,ফয়রের আযানে ‘আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাওম’শুনলে উত্তরে বলা হয়: “সাদাকাত ও বারিরতা(বারারতা)’।এই কথাটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।
বাখারী ও মুসলিম বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : “মুয়াযযিনকে যখন আযান দিতে শুনবে তখন মুয়াযযিন যা যা বলবে তোমরা তাই বলবে।” (বুখারী ১/২২১,মুসলিম ১/২৮৮)।
অন্য হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা বলেছেন,রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর কাছে ছিলাম। তখন বিলাল দাড়িয়ে আযান দিলেন। বিলাল আযান শেষ করলে রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন :“এই ব্যক্তি (মুয়াযযিন) যা বলল, তা যদি কেউ দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলে তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”(হাদীসটি হসান। সহীহ ইবনু হিব্বান ৪/৫৫৩,মুসতাদরাক হকীম ১/৩২১ মুসনাদ আহমদ ২/৩৫২,নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা ১/৫১০,৬/১৪৬ সহীহুত তারগীব ১/১৭৭)।
উপরের হাদীসদ্বয় থেকে বুঝা যায় যে,মুয়াযযিন যা বলবেন আযান শ্রবণকারী অবিকল তাই বলবেন। কোনো ব্যতিক্রম বলতে বলা হয়নি। তবে মুসলিম সংকলিত অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা:) একত্রে একটি ব্যতিক্রম শিক্ষা দিয়েছেন, তা হলো, মুয়াযযিন ‘হাইয়া আলাস সালাহ’ ও ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বললে, শ্রোতা ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলবেন। এই হাদীসে তিনি বলেছেন “এভাবে যে ব্যক্তি মুয়াযযিনের সাথে সাথে আযানের বাক্যগুলো অন্তর থেকে বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”(সহীহ মুসলিম১/২৮৯,নং৩৮৫)।
তাহলে, উপরের দুইটি বাক্য ছাড়া বাকি সকল বাক্য মুয়াযযিন যেভাবে বলবেন’ জওয়াব দানকারীও সেভাবেই বলবেন। ‘আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাওম’ বাক্যটিও এর ব্যতিক্রম নয়।এর জওযাবেও এই বাক্যটিই বলতে হবে এই বাক্যটির জন্য ব্যতিক্রম কিছু বলতে হবে তা কোনো হাদীসে বলা হয় নি। এজন্য মুল্লা আলী কারী “সাদাকাত ও বারিরতা” বাক্যটিকে জাল হদীসে তালিকাভুক্ত করে বলেছেন: “শাফেয়ী মযহাবের লোকেরা এই বাক্যটি বলা মুস্তাহাব বলেছেন, তবে হাদীসে কোনো অস্তিত্ব নেই।”(দেখুন:মুল্লা আলী কারী,আল আসরারূল মারফুয়া ১৪৬পৃ)।
৫.আযানের দোয়ার মধ্যে ‘ওয়াদ দারাজাতার রাফীয়াহ’
রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: যখন তোমরা মুয়াযযিনের আযান দিতে শুনব,তখন সে যরুপ বলে তদ্রূপ বলবে।এরপর আমার উপর সালাত পাঠ করবে; যে ব্যক্তি আমার উপর সালাত পাঠ করবে,আল্লা তাঁকে দ্শবার সালাত(রহমত) প্রদান করবেন।এরপর আমার জন্য‘ওসিলা চাইবে;কারণ‘ওসিলা’ হলো জান্নাতের এবন একটি মর্যাদা যা আল্লহর একজন মাত্র বান্দাই লাভ করবেন এবং আমি আশা করি আমিই হব সে বান্দা যে ব্যেক্তি আমার জন্য ‘ওসিলা’প্রার্থনা করবে তাঁর জন্য শাফায়ত প্রাপ্য হয়ে যাবে।(সহীহ মুসলিম ১/২৮৮,নং৩৮৪)।
অন্যান্য হাদীসে তিনি ‘ওসিলা’ প্রার্থনার নিম্নরূপ পদ্ধতি শিখিয়েছেন:
আরবী(*****) “হে আল্লাহ,এই পরিপূর্ণ আহ্বান এবং আসন্ন সালতের মালিক, আপনি প্রদান করূন মহাম্মদ(সা:)ওসিলা এবং মহামর্যাদা এবং তাকে উঠান সম্মানিতি অবস্থানে,যা আপনি তাকে ওয়াদা করেছেন।”
তিনি বলেছেন,“ মুয়াযযিনের আযান শুনে যে ব্যক্তি উপরের বাক্যগুলি বলবে,তার জন্য কিয়ামতের দিন আমার শাফায়ত প্রাপ্য হয়ে যাবে।” (সহীহ বুখারী ১/২২২,নং৫৮৯,৪/১৭৪৯,নং৪৪৪২)।
ইমাম বুখারীসহ সকল মুহাদ্দিস এভাবেই দোয়াটি সংকলন করেছেন। আমাদের দেশে প্রচলিত দোয়ার মধ্যে দুটি বাক্য অতিরিক্ত রয়েছে,যা উপরের দোয়াদিতে নেই। প্রথম বাক্যটিতে(ওয়াল ফাদীলাতা)-র পরে …………..(এবং সুউচ্চ মর্যাদা)বলা এবং দ্বীতিয় বাক্যটির দোয়ার শেষে:……………….(নিশ্চই আপনি ওয়াদা ভঙ্গ করেন না)বলা এই দ্বীতিয় বাক্যদি একটি দূর্বল হাদীসে বর্ণীত হয়েছে। (বাইহকী,আস-সুনানুল কুবরা ১/৪১০(৬০৩-৬০৪)। আর প্রথম বাক্যটি(ওয়াদ দারাজাতার রাফী’আহ)একেবারেই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা হাদীস নির্ভর। ইবনু হজার,সাখাবী,যারকানী,মুল্লা আলী কারী ও অন্যান্য মুহাদ্দীস বলেছেন যে এই বাক্যটি (ওয়াদ দারাজাতার রাফী’আহ) বানোয়াট। (ইবনু হাজার,তালখীসূল হবীর ১/২১১, সাখাবী,আল-মাকসিদ,পৃ ২২২-২২৩,যারকানী,মুখতাসারূল মাকাসিদ,পৃ৭০-৭১.আল আসরার,পৃ ১২২.মাবারাকপুরী,তুহফাতুল আহওয়াযী,পৃ১/৫৩২)।
৬.আযানের সময় কথা বলার পরিনতি
আযানের সময় কথা বলার নিষেধাঞ্জা বুঝাতে এই ‘হাদীসটি’ বলা হয়: “যে ব্যক্তি আযানের সময় কথা বলবে,তার ।ঈমান বিনষ্ট হওযার ভয় রয়েছে।”
আল্লামা সাগনী,আজলূনী প্রমুখ মুহাদ্দীস উল্লেখ করেছেন যে,বাক্যটি হাদীসের নামে বানানো ভিত্তিহীন জাল কথা।আযানের সময় কথা বলা যাবে না মর্মে কোনো নির্দেশনা হাদীসে বণিত হয়নি। (সাগনী,আল-মাউদূআত,পৃ.৮০;আজলূনী,কাশফুল খাফা ২/২৯৫,৩১৫)।
২.১০.৩ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বিষয়ক
সালাতের ৫ প্রকার ফযীলত ও ১৫ প্রকার শাস্তি
কুরআন হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, ৫ ওয়াক্ত ফরয সলাত যথাসময়ে আদায় করা মুমিনের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেস্ঠ দাযিত্ব। সালাতই মামিনের পরিচয এবং ঈমান ও কুফরির মধ্যে পার্থক্য। সালাত পরিত্যাগকারী কাফিরদের দলভুক্ত বলে গণ্য করা হবে। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব গ্রহন করা হবে। এভাবে অগনিত সহীহ হাদীস থেকে আমরা ফরয সালাতের গুরুত্ব ও সালাতের অবহেলা ভয়াভহ পরিণতি জানতে পারি।
কিন্তু সাধারন মানুষদের অবাক করার জন্য জালিয়াতিগণ এ বিষয়ে আরো অনেক কথা বানিয়ে সমাজে প্রচার করেছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, সমাজে প্রচলিত অনেক গ্রন্থেই কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীসের পরিবর্তে এই সকল বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথাগুলি লেখা হয়েছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রকারের ক্যালেন্ডার, পোষ্টার ইত্যাদিতেও এই সকল বানোয়াট কথাগুলো লিখে প্রচার করা হয়।এই বিষয়ে একটি জাল হাদীস আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। এই জাল হাদীসের সার সংক্ষেপ নিম্নরূপ:
যে ব্যাক্তি যথারীতি ও গুরূত্ব সহকারে নামায আদায় করবে আল্লাহ পাক থাকে পাঁচ প্রকারে সম্মানিত করবেন:রূজি রোজগার ও জীবনের সংকীর্নতা হতে মুক্তি দান করবেন, সে ব্যাক্তি পুলছেরাতের উপর দিয়ে বিদ্যুতের মত পার হয়ে যাবে এবং বিনা হিসাবে বেহেসাতে প্রবেশ করবে।আর য়ে ব্যাক্তি নামাজের ব্যাপারে অলশতা করে তাকে পনের প্রকার শাস্তি দেওযা হবে।তন্মধ্যে পাঁচ প্রকার দুনিয়াতে, তিন প্রকার মৃত্যুর সময় তিন প্রকার কবরে এবং তিন প্রকার কবর হতে বের হওয়ার পর।নামাজ শিক্ষা,আমলয়াত ইত্যাদি বইয়ে পাওয়া যায়। এজন্য এই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথাগুলি লিখে কলেবর বাড়াচ্ছি না।
এই দীর্ঘ হাদীসটি পুরোটাই ভিত্তিহীন ও জাল। কোনো হাদীস গ্রন্থে এই হাদীসটি পাওয়া যায় না। পরবর্তী যুগে কোনো কোনো আলিম তাদের ওয়ায নসীয়ত মূলক গ্রন্থে অন্য সকল প্রচলিত কথার সাথে এই কথাগুলিও হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হদীসের ইমামগণ স্পষ্ঠরূপে উল্লেখ করেছেন যে, এই কথাগুলি বাতিল ও জাল কথা। কোন ব্যক্তি এই জালিয়াতি করেছে তাও তাঁরা উল্লেখ করেছেন। ইমাম যাহাবী, ইবনু হাজার আসকালানী সয়ূতি, ইবনু ইরাক প্রমুখ মুহাদ্দিস এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।(যাহাবী, মীযানুল,ই’তিদাল৬/২৬৪;ইবনু হাজার,মীযানুল,ই’তিদাল৫/২৯৫;সুয়ুতি, যাইলুল লাআলী,পৃ৯৯ ইবনু ইরাক,তানযীহ২/১১৩-১১৪)। শাইখুল হাদীস আল্লামা মুহম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভি (রাহ) তার ‘ফাযায়েলে নামায’ গ্রন্থে এই জাল হাদীসটি আরবী ইবারত-সহ পুরোপুর উল্লেখ করেছেন। তিনি হাদীসটি উল্লেখ করার আগে বলেছেন, কেউ কেউ বলেছেন, এই কথাটি নাকি হাদীসে আছে…………………..। হাদীটি উল্লেখ করার পরে তিনি সংক্ষেপে বলেছেন যে, ইমাম যাহাবী, মাম সয়ূতী প্রমুখ মুহাদ্দিস এই হাদীসটি জালও বাতিল বলে উল্লেখ করেছেন। এর সনদের জালিয়াতদের পরিচয়ও তাঁরা তুলে ধরেছেন। (হযরত মাওলানা যাকারিয়া কান্দলভী, ফাযায়েলে আমল.পৃ ১০৪-১০৮)।
এভাবে আল্লামা যাকারিয়া (রাহ) হাদীসটির জালিয়াতির বিষয়টি উল্লেখ করে তাঁর আমানত আদায় করেছেন। কিন্তু অনুবাদে এই আমানত রক্ষা করাহয়নি। আল্লামা যাকারিয়া (রাহ)-এর এই আলোচনা অনুবাদে উল্লেখ করা হয় নি। অনুবাদের শুরুতে বলা হয়েছে: “এক হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে ……”। শেষে শুধুমাত্র লেখা হয়েছে ‘যাওয়াজির ইবন হাজার মাক্কী (রাহ)’। সাধারণ পাঠক একে নির্ভরযোগ্য হাদীস বা রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বলে বিশ্বাস করেছেন। অথচ মুহাদ্দীসগণ একমত যে, কোনো জাল হাদীস কে ‘জাল’ বলে উল্লেখ না করে হাদীস বলে বর্ণনা করা কঠিন হারাম। মহান আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
২ সালাত মুমিনদের মি’রাজ
একটি অতি প্রচলিত ভিত্তিহীন জাল হাদীস
“নামাজ মুমিনদের মিরাজ স্বরূপ।” (মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত পৃ.১২৩)।
এখনে লক্ষণীয় যে, এই অর্থের কাছাকাছি অনেক হাদীস রয়েছে! মুমিন সালাতের মধ্যে আল্লাহর সবছেয়ে নৈকট্য লাভ করেন, সালাতে দাঁড়ালে আল্লাহ মুমিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন …..ইত্যাদি সহীহ হদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এগুলির পরিবর্তে অনেকে এই ভিত্তিহীন কথটিকে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নামে বলে তাঁর নামে মিথ্যা বলার অপরাধী হয়ে যান।
৩. ৮০ হুকবা বা ১ হুকবা শাস্তি
“মাজালিসুল আবরার নামক কেতাবে বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফরমাইয়াছেন, যেই লোক সময়মত নামায পরিল না, নামাযের ওয়াক্ত শেষ হইবার পরে কাযা পরিল, সেই লোকও জাহান্নামে ৮০ হুকবা শাস্তি ভোগ করিবে। ৮০ বৎসরে এক হুকবা আর ৩৬০ দিনে এক বৎসর। ৩৬০*৮০ = ২৮,৮০০ দিন। অতএব তাকে ২৮,৮০০ দিন এক ওয়াক্ত নামায না পড়বার জন্য দোজখের আগুনে জ্বলিতে হইবে। আর আখেরাতের দিন হইবে দুনিয়ার এক সহস্র বৎসরের তুল্য। এই হিসাবে এক ওয়াক্ত নামায তরককারীকে দুই কোটি অষ্টাশি লক্ষ বৎসর জাহান্নামের আগুনে শাস্তি ভোগ করিতে হইবে।” (মুফতী হাবীব ছামদানী,বার চান্দের ফযীলত পৃ.১৩১।)
শাইখুল হাদীস আল্লামা যাকারিয়া কান্ধালভী (রাহ)এই হাদীসটিকে তার ‘ফাযায়েলে নামায গ্রন্থে নিম্নরূপে উদ্ধৃত করেছেন: “যে ব্যাক্তি ওয়াক্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করল না, এবং এরপর সে কাযা করল, তাকে জাহান্নামে এক হুকবা শস্তি প্রধান করা হবে। এক হুকবা ৮০ বৎসর এবং এক বৎসর ৩৬০ দিন এবং প্রত্যেক দিনের পরিমাণ এক হাজার বৎসরের সমান।”
হাদীসটি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন:
“মাজালিসুন আবরার নামক গ্রন্থে লেখা হয়েছে। আমার বক্তব্য হলো, আমার নিকটে যত হাদীস গ্রন্থ রয়েছে সেগুলির কোনো পুস্তকেই আমি এই হাদীসটি দেখতে পাই নি।…………….” (হযরত মাওলানা যাকারিয়া কান্দলভী,ফাযায়েলে আমল.পৃ ৫৭-৫৮)।
আর তাঁর মত একজন মুহাদ্দিস যে হাদীস কোনো হাদীসের গ্রন্থে খুজে পান নি সেই হাদীসের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। বস্তুত, হাদীসটি ভিত্তিহীন ও সনদহীন একটি বানোয়াট কথামাত্র। কোথাও কোনো প্রকার সহীহ, যরীফ বা বানোয়াট সনদেও এই কথাটি সংকলিত হয়নি। জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে শেষ যুগের কোনো কোনো আলীম তা নীজ গ্রন্থে সনদবিহীনভাবে সংকলন করেছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, একথাটি যে কোনো হাদীস গ্রন্থে নেই এবং ‘মাজালিসুল আবরার’ –এর লেখক সনদবীহীনভাবে তা উল্লেখ করেছেন, তা জানা সত্তেও ভাল আলীম ওয়াযে- আলোচনায় এবংলিখনিতেএই ‘হাদীস’ ও অনুরুপ অনেক জাল ও দুর্বল হাদীস উল্লেখ করেন। মানুষের হেদায়তের আগ্রহেই তারা তা করেন। মনে হয়, তারা চিন্তা করেন, কুরআন কারীমে হাজার হাজার আয়াত এবং প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থসমূহে হাজার হাজার সহীহ হাদীস মানুষদের হেদায়াত করতে আর সক্ষম নয়। কাজেই এগুলির পাশাপাশি কিছু দুর্বল (!) হাদীসেও আমাদের না বলে উপায় নেই!!
৪.জামাতে সালাত আদায়ে নবীগণের সাথে হজ্জ
জামাতে সালাত আদায় করা মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। কুরআনে মুমিনগণণকে একত্রে সালাত আদায় করার নার্দেশ দেওয়া হয়েছে। অগণিত সহীহ হাদীসে জামাতে সালাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জামাত ছেড়ে একা সালাত আদায়কারীকে মুনাফিক বলে চহ্নিত করা হয়েছে। আযান শোনার পরেও যে ব্যক্তি অসুস্থতা বা ভয়ের ওযর ছাড়া জামাতে না এসে একা সালাত আদায় করবে তার সালাত কবুল হবে না বলে সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে।
‘জামাতে সালাত আদায়ের’ বিধান সম্পর্কে ফিকহী পরিভাষাগত মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন সুন্নতে মুয়াক্কাদা, কেউ বলেছেন ওয়াজিব ও কেউ বলেছেন ফরয। এই মতভেদ একান্তই পরিভাষাগত। কারণ সকলেই একমত যে, পুরুষের জন্যওযর ছাড়া ফরয সালাত একা আদায় করলে কঠিন গুণাহ হবে। সালাত হবে কি না সে বিষয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে।
এ সকল সহীহ হাদীসের পাশাপাশি জালিয়াতগণ এবিষয়ে অনেক জাল হাদীস তৈরি করেছে । আর এ বিষয়েও সহীহ হাদীসগুলি বাদ দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাল হাদীসই বই পুস্তকে লেখা হয় ওওয়াযে বলা । সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে, ইশা ও ফজরের সালাত জামাতে আদায় করলে সারারাত্র তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ের সওয়াব হবে, ফজরের সালাত জামাতে আদায় করলে আল্লাহর দায়িত্বে থাকা যাবে…………ইত্যাদি। কিন্তু এ সকল ‘সামান্য’ সওয়াবের কথায় মন না দিয়া জালিয়াতগন বানিয়েছে: “যে ফযরের সালাত জামাতে আদায় করল সে যেন আদম (আ)এর সাথে ৭০ বার হজ্জ করল………….।” (সয়ূতি, যাইলুল লাআলী, পৃ.৮৩ সাগানী, আল-মাউদূ আত পৃ ৪২; ফাতানী , তাযকিরা, পৃ. ৩৯,১০৬; শাওকানী, আল –ফাওয়াইদ১/৫৫)। এভাবে প্রত্যেক ওয়াক্তের সাথে একজন নবীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে…………..।
অনরুপ বানোয়াট কথার মধ্যে রয়েছে: যে ব্যাক্তি ফযর ও ইশার সালাত জামাতে আদায় করল সে যেন আদমের(আ) পিছনে নামায আদায় করল …। এভাবে এক এক সালাতের জন্য এক এক নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে…..।(অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল , নেক কানুন, ১০২-১০৩)।
৫. মুক্তাদি আলিমের পিছনে সালাত নবীর পিছনে সালাত
জামাতে সালাত আদায়ের কারণে সওয়াব বৃদ্ধির কথা সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি। বিভিন্ন হাদীসে কুরআনের তিলাওয়াত ও জ্ঞানে পারদর্শি, হাদীসের জ্ঞানে পারদর্শি, হিজরতও অন্যান্য নেক আমলে অগ্রবর্তী ব্যাক্তিগণকে ইমামতি প্রদানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ইমামের ‘তাকওয়া’ বা ইলমের কারণে মুক্তাদিগণের ‘সাওয়াব’বা ‘বরকত’ বেশি হবে, এইরূপ অর্থে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয় নি।এই অর্থে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সবই অত্যন্ত যয়ীপ অথবা বানোয়াট। এইরূপ একটি ভিত্তিহীন কথা:
“যে ব্যক্তি কোনো মুত্তাকি আলিমের পিছনে সালাত আদায় করল, সে যেন একজন নবীর পিছনে সালাত আদায় করল।”
ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘হেদায়া’-র প্রণেতা আল্লামা আলী ইবনু আবী বাকর মারগীনানী(৫৯২হি) জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে এই কথাটিকে হাদীস হিসাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মুহাদ্দিসগণ অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই কথাটি কোনো হাদীস নয়। কোনো সহীহ বা যয়ীফ সনদে তা কোনো গ্রন্থে সংকলিত হয় নি। এজন্য আল্লামা যাইলয়ী, ইরাকী, ইবনু হাজার, সয়ূতী, সাখাবী, তাহের ফাতানী, মোল্লা আলী কারী, আজলূনী প্রমুখ মুহাদ্দিস এই কথাটিকে জাল হাদীস হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছেন। (মারগীনানী, হেদায়া১/৫৭; যাইলায়ী, নাসবুর ,রাইয়াহ ২-২৬; ইবনু হাজার , আদ-দিরাইয়া ১/১৬৮; সাখাবী, আল-মকসিদ, পৃ.১৪৭ ,২৩৫; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৩৭,১২২, ৩৩৭; তাহের ফাতানী, তাযকিরাতুল মাউদূ‘আত, পৃ.৪০; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ১/৫৫)।
৬. আলীমের পিছনে সালাত ৪৪৪০গুণ সওয়াব
এই জাতীয় আরেকটি বানোয়াট কথা হলো,
‘আলীমের পিছনে সালাত ৪৪৪০ গুণ সওয়াবপাওয়া যায়।’ (মোল্লা আলী কারী,আল-মাসূন,পৃ ১৫২; আল-আসরার, পৃ ১৪৭)।
৭.পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের রাক‘আত সংখ্যার কারণ
পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের রাকা‘আত সংখ্যা ১৭ হলো কেন, ফর ২ রাকা‘আত, যুহর ৪ রাকা‘আত, আসর ৪ রাকা‘আত, মাগরীব ৩ রাকা‘আত ও ইশা ৪ রাকা‘আত হলো কেন, বিতর ৩ রাকা‘ত হলো কেন, ইত্যাদি বিষয়ে প্রচলিত সকল কথাই ভিত্তিহীন ওমিথ্যা। অনুরূপভবে বিভিন্ন ওয়াক্তের সালাতকে বিভিন্ন নবীর আদায় করা বা প্রতিষ্ঠিত বলে যে সকল গল্প বলা হয় সবই ভিত্তিহীন। এই জাতীয় অনেক ভিত্তিহীন কথা আমাদের সমাজে প্রচলিত। এখানে একটি গল্প উল্লেখ করছি।
আমাদের অতি প্রসিদ্ধ কোনো কোনো পুস্তকে লেখা হয়েছে: বেতের নামাজ ওয়াজিব হইবার কারণ এই যে , এরশাদুত্বালবিন কিতবে লিখিত আছে হযরত (সাঃ) মেরাজ শরীফে যাইবার সময়ে যখন বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত তাশরীফ নিয়াছিলেন তকন সমস্ত পয়গম্বরের রুহ মুবারক হযরত (সাঃ)- এর সাক্ষাত ওআশির্বাদের জন্য আসিলে জিব্রাইল (আ) এর আদেশানুযায়ী হযরত (সাঃ) ইমাম হইয়া এক রাকাত নামায পরিলেন। তার পর মিকাইল (আ) ৭০ হাজার ফেরশতা লইয়া হযরত (সাঃ)-এর মোলাকাত ও দোয়ার প্রত্যাশী হইলে জিব্রাইল (আ)-এর আদেশ অনুযায়ী রাসূল (সাঃ) পুণরায় আরও এক রাকাত নামায পরড়লেন। ইহার পর ইস্রাফীল (আ) ৭০ হাজার ফেরেশতা লইয়া হযরত (সাঃ) – এর দোওয়ার প্রত্যাশী হইলে জিব্রাইল (আ) –এর হুকুম অনুযায়ী হযরত (সাঃ) তাহাদিগকে মুক্তাদি করিয়া এক রাকাত নামায পরড়িলেন। অতঃপর আজরাঈল (আ) বহু ফেরেশতা লইয়া এরুপ বাসনা করিয়া উপস্তিত হইলে জিব্রাইল (আ) বলিলেন, হে প্রিয় পয়গম্বর আপনি ইহাদিগকে সঙ্গে করিয়া দোওয়া কুনুত পাঠ করান। হযরত (সাঃ) তাহাই করিলেন সুতরাং ঐ তিন রাকাত নামাযই আমাদের উপর ওয়াজিব হইয়াছে এবং বেতের নামাযে দোওয়া কুনুত পরাও ওয়াজিব হইয়াছে।” (মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন,পৃ. ১৯২-১৯৩)।
কোনো কোনো জালিয়াত ঘুরিয়ে বলছে যে, তিনি মি’রাজের রাত্রিতে মূসা (আ) এর জন্য এক রাক‘আত, তার নিজের জন্য আরক এক রাকা‘আত এবং শেষে আল্লাহর নির্দশে তৃতীয় রাকা‘আত সালাত আদায় করেন। (অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, নেক কানুন পৃ. ১১৫)।
৮. উমরী কাযা
সালাত বা নামায মুমিনের জীবনে একটি ফরয ইবাদত যার কোনো বিকল্প নেই বা কাফফারা নেই । যতক্ষন হুশ বা চেতনা থাকবে সালাত আদায় করেই হবে। দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, দৌড়িয়ে, হেটে, ইশারায় বা যেভাবে সম্ভব সালাত আদায় করতে হবে। চেতন রহিত হলে সালাত মাফ হয়ে যাবে।কোনো ববিশেষ কারনে একান্ত বাধ্য হে দুই এক এক ওয়াক্ত সালাত ছুটে গেলে কাযা করতে হবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক ওয়াক্তের সালাতের কাযা করার কুনোরুপ বিধান হাদীস শরীফে দেয়া হয় ন। করণ, কোনো মুসলিম সালা পরিত্যাগ করতে পারে, এইরুপ চিন্তা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও সাহাবিগণের যগে ছিল না। সাহাবিগণ লতেন, একজন মুসলিম অনেক পাপ করতে পারে, কিন্তু মুসলিম কখনো সালাত পরিত্যাগ করতে পারে না।
পরবর্তী যুগের মুসলিম ও ফকীহগণ এ বিষয়ে মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভবে এক ওয়াক্ত সালাত ত্যাগ করলে সে ব্যাক্তি কাফির বা অমুসলিমে পরিণত হবে। কেউ বলেছেন, যদি কোনো ব্যাক্তি ‘সালাতের’ গুরুত্ব পুরুপুরি স্বিকার করেন. কিন্তু লসতা হেতু ত্যাগ করেছেন, তিনি ‘কাফিরের মত’ কঠিন পাপী বলে গণ্য হবেন,কিন্তু ‘কাফির’ বা অমসলিম বলে গ্য হবেন না। আর কেউ যদি মনে করেন যে, ৫ ওয়াক্ত সালাত নিয়মিত আদায় না করেও তিনি নামাযী মুসলমানদের মতই মুসলমান, তা হলে সেই ব্যাক্তি সালাতের গুরুত্ব অস্বিকার করার কারণে প্রকৃত কাফির বলে গণ্য হবেন।
সর্বাবস্থায় সকলেই একমত যে, ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘ সময়ের সালাত পরিত্যাগ করলে বা কাযা করলে পরে সেই সালাতের ‘কাযা’ করার বিষয়ে হাদীসে কোনোরুপ বিধান দেওয়া হয় নি। তবে জালিয়াতগণ এ বিষয়ে কিছু জাল হাদীস তৈরি করেছে। এছাড়া সমাজে কিছু প্রচলিত ভিত্তিহীন কতাবার্তাও এ বিষয়ে প্রচলিত আছে। দুইটি ক্ষেত্রে তা ঘটেছে। প্রথমত, উমরী কাযা ও দ্বিতীয়ত, কাফফারা বা এস্কাত। এবিষয়ে জালিয়াতদের বনানো একটি হাদীস:
“এক ব্যাক্তি বলে , হে রাসূল, আমি সালাত পরিত্যাগ করেছি। তিনি বলেন, যা পরিত্যাগ করেছ তা ‘কাযা’ কর। লোকটি বলল, হে আল্লহর রাসূল , আমি কিভাবে তা ‘কাযা’ করব? তিনি বলেন, প্রত্যাক ওয়াক্তের সালাতের সাথে অনুরূপ আদায় কর। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আগে, না পরে? তিনি বলেন, না, বরং আগে।”
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই হাদীসটি জাল, ভিত্তিহীন ওবাতিল।(জোযকানী,আল-আবাতিল ২/৪১৯; ইবনুল জাওযী, আল-মাওদূ‘আত ২/২৬; সুয়ূতি আল-লাআলী ২/২৪; ইবনু ইরাক , তানযীহ ২/৮০; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ১/৩৫)।
যদি কোনো মুসলমান দীর্ঘদিন সালাতে অবহেলার পরে অনুতপ্ত হয়ে নিয়মিত সালাত শুরু করেন, তখন তার প্রধান দায়িত্ব হবে বিগত দিনগুলির পরিত্যাক্ত সালাতের জন্য বেশি বেশি করে কাদাকাটি ও তাওবা করা । এরপর পাশাপাশি, অনেক ফকীহ বলেছেন যে, ঐ পরিত্যাক্ত সালাতগুলি নির্ধারন করে তা কাযা করবেন এভাবে ‘উমরী কাযা’ করার কোনো নির্ধারিত বিধান কুরআন বা হাদীসে নেই। এ হলো সাবধানতা মুলক কর্ম। আশা করা যায় যে, তাওবা ও কাযার মধ্যমে আল্লহ তার অপরাধ ক্ষমা করবেন।
৯. কাফফারা ও এস্কাত
ইসলামে সিয়াম বা রোযার জন্য কাফফারার বিধান রয়েছে। কোনো মুসলিম অপারগতার কারণে সিয়াম পালন করতেনা পারলে এবং কযার ক্ষমতাও না থাকলে তিনি তার প্রতিটি ফরয সিয়ামের পরিবর্তে একজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবেন। বিভিন্ন হাদীসের আলোকে প্রতিটি সিয়ামের পরিবর্তে ফীরর পরিমান খাদ্য প্রদানের বিধান দিয়েছেন ফকীহগণ।
কিন্তু সালাতের এরুপ কোনো কাফফারার বিধান হাদীসে দেওয়া হয় নি। কারণ সিয়ামের ক্ষেত্র যে অপারগতার সম্ভাবনা রয়েছে, সালাতের ক্ষেত্রে তা নেই। যতক্ষন চেতনা আছে, ততক্ষণ মুমিন ইশারা-ইঈিতে যেভাবে পাররবেন সেভাবেই তার সাধ্যানুসারে সালাত আদায় করবেন। কাজেই অপারগতার কোনো ভয় নেই। আর দীর্ঘস্থায়ীভাবে চেতনা রহিত হলে সালাতও রহিত হবে।
তবুও পরবর্তি যুগের কোনো কোনো ফকীহ সাবধানতামুলকভাবে সালাতের জন্যও কাফফারা বিধান দিয়েছেন। নিয়মিত সালাত আদায়কারি কোনো মুমিন যদি মৃত্যুর কারণে অসুস্থতার কারণে কিছু সালাত আদায় করতে না পারেন, তবে মৃত্যুর পরে তার জন্য সিয়ামের মত প্রত্যেক সালাতের বদলে একটি করে ‘ফিতরা’ প্রদানের বিধান দিয়েছেন।
কেউ কেউ এই বিধানকে আবার আজীবন সালাত পরিত্যাগকারী ও সালাতকে অবজ্ঞা ও উপহাসকারীর জন্যও প্রয়োগ করেছেন । এরপর খাদ্যের বদলে কুরআন প্রদানের এক উদ্ভট বিধান দিয়েছেন। প্রচলিত একটি পুস্তকে এ বিষয়ে লেখা হয়েছে: “এস্কাত করার নিয়ম এই যে , প্রথমত মুর্দার বয়স হিসাব করিবে। তম্মধ্য হইতে পুরুষের বার বছর ও স্ত্রী লোকের নয় বছর (নাবালেগী) বয়স বাদ দিয়ে বাকী বয়সের প্রত্যেক বৎসর ৮০ তোলা সেরের ওজনের ১০ মন ১০ সের ময়দার মুল্য ধরিয়া। ঐ মুল্যের পরিবর্তে নিজে এক জেলদ কোরআন শরীফ সকলের সম্মুখে কোনো গরীব মিছকীনের নিকট হাদীয়া করীয়া দিবে। এবং সকলের মোকাবেলা বলিবে যে, অমুকের উপরোক্ত হুকুমের জন্য খোদায়ী পাওনা এত হাজার , এত শত, এত মন ময়দার পরীবর্তে এই কালামুল্লা তোমার নিকট হাদীয়া করলাম। ঐ গরীব বা মিছকীন দুইজন সাক্ষির মোকাবেলা উহা কবুল করিলে ঐকালামুল্লাহ তাহারই হইয়া গেল এবং ময়দা আদায় করা তাহার উপর ওয়াজিব হইয়া গেল।” (মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনিন, পৃ. ১৮১)।
এই উদ্ভট নিয়মটি শুধু বানোয়াটই নয়, এ হলো আল্লাহর দ্বীনের সাথে চরম উপহাস! এর চেয়ে বড় উপহাস আর কি হতে পারে!! আজীবন সালাত আবমাননা করে, সালাতকে নিয়ে অবজ্ঞা উপহাস করে, মরার পরে এক জিলদ ‘কুরআন’ ফকীরকে দিয়েই মাফ!!!
২. ১০. ৪ . সুন্নাত-নফল সালাত বিষয়ক
ফরয সালাত যেমন মুমিন জীবনের শ্রেষ্ঠতম ইবাদত, তেমনি নফল সালাতও সর্বশ্রষ্ঠ নফল ইবাদত বং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়।ফরযের অতিরিক্ত কর্মকে “নফল” বলা হয়। কিছু সময়ে কিছু পরিমান “নফল” সালাত পালন করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উৎসাহ দিয়েছেন , বা তিনি নিজে তা পালন করেছেন । এগুলিকে ‘সুন্নাত’ ও বলা হয়। যে সকল নফল সালাতের বিষয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সেগুলিকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বলা হয়। এ ধরণের কিছু সুন্নাত সালাত সম্পর্কে হাদীসে বেশি গুরুত্ব প্রদানের ফলে কোনো ইমাম ফকীহ তাকে ওয়াজিব বলেছেন।
বিভিন্নসহীহ হাদীসে সাধারণভাবে যত বেশি পারা যায় নফল সালাত আদায়ের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এক সাহাবী প্রশ্ন করেন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় কর্ম কী? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন:
আরবী(*****)
“তুমি আল্লাহর জন্য বেশি বেশি সাজদা করবে (বেশি বেশি নফল সালাত আদায় করবে ); কারণ তুমি যকনই আল্লার জন্য একটি সাজদা কর , তকনই ার বিনিময়ে আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং তোমার একটি পাপ মোচন করেন।” (মুসলিম, আস-সহীহ ১/৩৫৩)।
অন্য এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট আবেদন করেন যে, তিনি জান্নাতে সহচর্য চন। তিনি বলেন:
“তাহলে বেশি বেশি সাজদা করে (নফল সালাত আদায় করে) তুমি আমাকে তোমার বিষয়ে সাহায্য কর।” মুসলিম, আস-সহীহ ১/৩৫৩)
অন্য হাদীসে আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: আরবী(******)
“সালাত সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয়, কাজেই যার পক্ষে সম্ভব হবে সে যেন যত বেশি পারে সালাত আদায় করে।” হাদীসটি হাসান।(তাবারানী, আল-মু‘জামু আউসাত ১/৮৪, হাঈসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ২/২৪৯, আলবানী, সহীহুত তারগীব১/২৫৬)।
সাধারণভাবে নফল সালাত ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বা স্থানে বিশেষ সালাতের বিষেশ মর্যাদা ও ফযীলতের কথাও সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আমরা ইতোপূর্বে আল্লামা মাওসিলির আলোচনা থেকে জানতে পেরেছি যে, সহীহ হাদীস থেকে নিম্নলিখিত বিশেষ সুন্নাত-নফল সালাতের কথা জানা যায়: ফরয সালাতের আগে পরে সুন্নাত সালাত, তারাবীহ, দোহা বা চাশত, রাতের সালাত বাতাহাজ্জুদ, তাহিয়্যাতুল মাসজিদ, তাহিয়্যাতুল ওযু, ইসতিখারার সালাত, কুসূফের সালাত, ইসতিখারার সালাত ওসালাতুত তাসবীহ। এছাড়া পাপ করে ফেললে দু রাকা‘আত সালাত আদায় করে তাওবা করার কথাও হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। কটি যয়ীফ হাদীসে ‘সালাতুত হাজাত’ বর্ণিত হয়েছে। সুন্নাত-নফল সালাতের বিষয়ে সহহহাদীস থাক সত্ত্বেও জালিয়াতগণ এ বিষয়ে অনেক জাল হাদীস প্রচার করেছে। অন্যান্য জাল হাদীসের মতই এগুলিতে অনেক আকর্ষনীয় অবান্তর সওয়াবের কথা বলা হয়েছে। জালিয়াতগণ দুটি ক্ষেত্রে কাজ করেছে।প্রথমত, সহীহ হাদীসে উল্লিখিত সুন্নাত-নফল সালাতগুলির জন্য বানোয়াট ফযীলত, সূরা বা পদ্ধতি তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সময়, স্থান বা কারণের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির সালাতের উদ্ভাবন করে সেগুলির কাল্পনিক সওয়াব, ফযীলত বা আসরের কাহীনি বানিয়েছে। আমাদের দেশে প্রচলিত এ বিষয়ক কিছু ভিত্তিহীন কথাবার্তা বা জাল হাদীসস এখানে উল্লেখ করছি।
সহীহ হাদীসে প্রমানিত সুন্নাত-নফল সালাত বিষয়ক বানোয়াট হাদীসগুলি বিস্তারিত আলোচনা করতে চাচ্ছি না। শুধুমাত্র এ সকল সালাত বিষয়ক মনগড়া পদ্ধতিগুলি আলোচনা করব। এরপর জালিয়াতগণ মনগড়াভাবে যে সকল সালাত ও তার ফযীলতের কাহীনি বানিয়েছে সেগুল উল্লেখ করব।
১.বিভিন্ন সালাতের জন্য নির্দিষ্ট সূরা বা আয়াত নির্ধারন করা
সহীহ হাদীসে প্রমানিত এ সকল সালাতের কোনো সালাতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সূরা বা আয়াত
নির্ধারন করে দেওয়া হয় নি। এ সকল সালাতের জন্য নির্ধারিত সুরা পঠের বিষয়ে , বা প্রথম রাকাতে অমুক সূরা বা অমুক আয়াত এতভাবে পাঠ করতে হবে বলে যা কিছু বর্ণীত হয়েছে সবই বানোয়াট বা ভিত্তিহীন কথা। কজেই ইসতিখারার সালাতের প্রথম রাকা’আতে অমুক সূরা দ্বীতিয় রাকাতে অমুক সূরা বা অমুক আয়াত, চাশতের সালাতের প্রথম ও দ্বীতিয় রাকাতে অমুক সূরা বা অমুখ আয়াত….শবে কদরের রাতের সালাতে অমুক সূরা বা অমুক আয়াত পড়তে হবে……ইত্যাদি সকল কথাই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। যে কোনো সূরা বা আয়াত দিয়ে এ সকল সালাত আদায় করা যাবে।কোনো নিদ্দিষ্ট সুরা বা আয়াত এ সকল সালাত আদায় করা যায়। কোনো নিদ্দিষ্ট সূরা বা আয়াতের কারনে এ সকল সালাতের সওয়াব বা বরকতের কোনো হেরফের হবে না।সূরা বা আয়াতের কারনে এ সকল সালাতের সওয়াব বা বরকতের কোনো হেরফের হবে না। সূরা বা আয়াতের দৈর্ঘ্য, মনযোগ, আবেগ ইত্যাদির কারনে সওয়াব কমবেশি হয়।
২.তারাবীহ সালাতের দোয়া ও মুনাজাত
রামাদানের কিয়ামুল্লাইলকে ‘সালাতুল তারাবীহ’ বা ‘বিশ্রামের সালাত’ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা:) এর যুগে তিনি নিজে ও সাহাবীগণ সাধারন রামাদান ও অন্যান্য সকল মাসেই মধ্যরাত থেকে শেষ রাত পর্যন্ত ৪/৫ ঘন্টা দাঁড়িয়ে একাকি কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদ ও তারাবীহ আদায় করতেন। খলীফা উমর(রা) এর সময় থেকে মুসলিমগণ জামাতে তারাবীহ আদায় করতেন। সাধারনত ইশার পর থেকে শেষ রাত বা সাহরীর পূর্ব সময় পর্যন্ত ৫/৬ ঘন্টা যাবৎ তাঁরা একটানা দাড়িয়ে দাড়িয়ে তারাবীহর সালাত আদায় করতেন।
যেহেতু এভাবে একটানা কয়েক ঘন্টা দাড়িয় সালাত আদায় করা খুবই কষ্টকর, সেহেতু পরবর্তী সময়ে প্রতি ৪ রাকা’আত সালাত আদায়ের পরে প্রায় ৪ রাকা’আত সালাতের সম পরিমান বিশ্রাম নেওয়ার রিতি প্রচলিত হয়। এজন্যই পরবর্তীকালে এই সালাত ‘সালাতুল তারাবীহ’ বলে প্রসিদ্ধ হয়। এই বিশ্রাম সালাতের বা ইবাদতের কোনো অংশ নয়। বিশ্রাম না করলে সওয়াব কম হবে বা বিশ্রামের কমবেশির কারণে সওয়াব কমবেশি হবে এইরুপ কোনো বিষয় নয়। বিশ্রাম মুলত ভালভাবে সালাত আদায়ের উপকরন মাত্র। বিশ্রামের সময়ে মুসল্লী যে কোনো কাজ করতে পারেন, বসে বা শুয়ে থাকতে পারেন বা দোযা বা যিকির –এ রত থাকতে পারেন। এ বিষয়ে কোনো নির্ধারিত কিছু নেই।
গত কয়েক শতাব্দী যাবত কোনো কোনো দেশে প্রতি চার রাকা’আত পরে একটি নির্দিষ্ঠ দোয়া পাঠ করা হয় এবং নির্ধারিত মুনাজাত করা হয়। অনেক সময় দোয়াটি প্রতি ৪ রাকা’আত অন্তে পাঠ করা হয়। দোয়াটি নিম্নরূপ: আরবী(*****)
মুনাজাতটি নিম্নরূপ:
আরবী(*******)
এ দোয়া ও মুনাজাত উভয়টিই বানোয়াট। সহীহ হাদীসে অনেক প্রকারের দোয়া ও মুনাজাত বর্ণিত হয়েছে।বিশ্রামের জন্য তো নয়ই,এমনকি অন্য কোনো স্থানে এই দুটি দোয়ার কোনো অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায় না।তবে একটি বানোয়াট ও জাল হাদীসে উপরের দোয়াটির অনুরূপ একটি দোয়া দেখতে পাওয়া যায়।এই জাল হাধীসটিতে বলা হয়েছে, আল্লাহর কিছু ফিরিশতা একটি নুরের সমুদ্রে এই দোয়াটি পাঠ করেন যে ব্যক্তি কোনো দিবসে মাসে ব বৎসরে এই দোয়াটি পাঠ করবেন সে এত এত পুরুস্কার লাভ করবে। (সয়ূতি, যাইলুল লাআলী, পৃ.১৪৭ ইবনু ইরাক,তানযীহ ২/৩২৬ আজলূনী, কাশফুল খাফা ১/৫৩ ১/৫৩৮)।
আমাদের উচিত এ সকল বানোয়াট দোয়া না পড়ে এ সময়ে দুরুদ পাঠ করা। অথবা কুরআন তিলাওয়াত বা মাসনূন যিক্র-এ মসগুল থাকা।
কোনো কোনো প্রচলিত পুস্তকে তারাবীহের দুই রাকাত অন্তে নিম্নের পাঠ করতে বলা হয়েছে আরবী(**** ) (মাও.গোলাম রহমান,মকছুদোল মো’মেনীন পৃ ২২৮)।
এ দোয়াটি ভিত্তিহীণ ও বানোয়াট।
৩. সালাতুল আওয়াবীন
রাসূলুল্লাহ (সা:) নিজে ও তার সাহাবীগণ মাগরীব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে বেশি বেশি নফল আদায় করতেন বলে সহীহ হাদীসে বর্ণীত হয়েছে। হযরত হুযাইফা (রা) বলেন “আমি নবীজি(সা)-র কাছে এসে তার সাথে মাগরীবের সালাত আদায় করলাম। তিনি মাগরীবের পরে ইশার সালাত পর্যন্ত নফল সালাতে রত থাকলেন।” হাদীসটি সহীহ। (ইবনু আবী শাইবা,মুসান্নাফ ২/১৫,নসাঈ,সুনানুল কুবরা ১/৫১,৫/৮০,সহীহুত)।
অন্য হাদীসে আনাস (রা) বলেন,সাহাবায়ে কেরাম মাগরীব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে সজাগ থেকে অপেক্ষা করতেন এবং নফল সালাত আদায় করতেন।”হাদীসটি সহীহ।হযরত হাসান বসরী বলতেন,ইশার মধ্যবর্তী সময়ে নামাযও রাতের নামায বা তাহাজ্জুদের নামায বলে গণ্য হবে। (বাইহাকী,আস সুনানুল কুবরা৩/১৯,সুনানু আবী দাউদি২/৩৫,মাজমাউয যাওয়াইদ২/২৩০, ইবনু আবী শাইবা,আল মুসান্নাফ২/১৫,সহীহুত তারগীব ১/৩১৩)।
বিভিন্ন হদীসে আমরা দেখতে পাই যে,কোনো কোনো সাহাবী তবেয়ীগণের এই সময়ে সালাত আদায়ের জন্য উৎসাহ প্রধান করতেন। (মুসান্নাফু ইবনু আবী শাইবা, ২/১৪-১৬)।
এ সকল হাদীসের আলোকে জানা যায় যে মাগরীব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়েমুমিন কিছু নফল সালাত আদায় করবেন। যিনি যত বেশি আদায় করবেন তিনি তত বেশি সওয়াব লাভ করবেন। এই সমযের সালাতের রাক’আত সংখ্যা বা বিশেষ ফযীলতে কোনো সহীহ হাদীসে বর্ণীত হয় নী। কিছু জাল বা অত্যন্ত যয়ীফ সনদে হাদীসে এই সময়ে ৪ রাক’আত,৬ রাক’আত,১০ বা ২০ রাক’আত সালাত আদায়ের বিশেষ ফযীলতের কথা বলা হয়েছে। যেমন , যে ব্যাক্তি এ সময়ে ৪ রাক’আত, সালাত আদায় করবে,সে এক যুদ্দের পর আরেক যুদ্দে জিহাদ করার সওয়াব পাবে।যে ব্যক্তি মাগরিবের পরে কোনো কথা বলা্র আগে ৬ রাক’আত,সালাত আদায় করবে তাঁর ৫০ বৎসরের গোনাহ ক্ষমা করা হবে। অথবা তাঁর সকল গোনাহ ক্ষমা করা হবে। অন্য বর্ণনায় –সে ১২ বৎসর ইবাদত করার সমপরিমাণ সওয়াব অর্জন করবে।। যে ব্যক্তি এই সময়ে ১০ রাক’আত,সালাত আদায় করবে , তাঁর জন্য জান্নাতে বাড়ি তৈরি করা হবে। যে ব্যক্তি এ সময়ে ২০ রাক’আত,সালাত আদায় করবে , তাঁর জন্য আল্লাহ জান্নাতে বাড়ি তৈরি করবেন। এ সকল হাদীস সবই বানোয়াট বা অত্যন্ত যয়ীফ সনদে বর্ণীত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী এ সময়ে ৬রাক’আত,সালাত আদায় করলে ১২ বৎসরের সওয়াব পাওয়ার হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন হাদীসটি অত্যান্ত দুর্বল।কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীসটিকে জাল ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছেন।(তিরমিযী ২/২৯৮ নং ৪৩৫,ইবনু মাজাহ ১/৩৬৯,নং১১৬৭,বইহাকী,আস সুনানুল কুবরা ৩/১৯,ইবনু আবী শাইবা,আল মুসান্নাফ২/১৪-১৫,বইহাকী শু’আবুল ঈমান৩/১৩৩,ইবনুল ,মুবারাক, আয-যুহদ পৃ.৪৪৫/৪৪৬,শাওকানী,নাইলূল আউতার৩/৬৫-67, মাজমাউয যাওয়াইদ২/২৩০)।
আমাদের দেশে এই ৬ রাক’আতে সূরা ফাতিহার পরে কোন্ সূরা পাঠ করতে হবে তাও উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলি সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা।
দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে,যে, কোনো কোনো সাহাবী-তাবেয়ী বলেছেন,সালাতুল মাগরিবের পর সালাতুল ইশা পর্যন্ত যে নফল সালাত আদায় করা হয় তা ‘সালাতুল আওয়াবীন’ অর্থাৎ বেশি বেশি তওবাকারীগনের সলাত। বিভিন্ন সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা:) চাশতের নামাযকে ‘সালাতুল আওয়াবীন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
৪. সালাতুল হাজাত
ইমাম তিরমিযী তাঁর সুনান গ্রন্থে ‘সলাতুল হাজাত’ বা প্রয়োজনের সালাত বিষয়ে একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। হাদীসটিতে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে বা কোনো মানুষের কাছে কারো কোনো প্রয়োজন থাকলে সে ওযু করে দুই রাকজ’আত সালাত আদায় করবে এবং এর পর একটি দোয়া পাঠ করে আল্লাহর কাছে তার প্রয়োজন মেটোনোর জন্য পার্থনা করবে । ইমাম তিরমিযী বলেন,হাদীসটির একমাত্র বর্ণনাকারী ফাইদ ইবনু আব্দুর রহমান দুর্বল রাবী। এজন্য হাদীসটি দুর্বল এই ফাইদকে ইমাম বুখারী ও অন্যান্য মাহাদ্দিস মুনকার,মাতরুক,পরিত্যক্ত ও মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী বলে গণ্য করেছেন। (তিরমিযী আস-সুনান ২/৩৪৪;ইবনু হাজার,তাহযীব৬/২২৯;তাকরীব পৃ৪৪৪;ইবনুল জাওযী,আল- মাউদূ’আত২/৬১সুয়ূতী,আল-লাআলী২/৪ল- মাউদূ’আত২/৬১সুয়ূতী,আল-লাআলী২/৪৮;ইবনু ইরাক,তানযীহ২/১১০)।
আমাদের দেশে ‘সলাতুল হাজাত’ নামে আরো অনেক বানোযাট পদ্ধতি প্রচলিত্। যেমন কোনো কোনো পুস্তকে বলা হয়েছে “হাজাতের (খেজের আ.)-এর নামাজ ২ রাকাত।….মনের বাসনা পূর্ণ হওয়ার জন্য খেজের আ. জনৈক বোজর্গ ব্যক্তিকে শিক্ষা দিয়াছেন। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতেহার পর সূরা কাফেরূন দশবার…..ইত্যাদি।” এগুলো সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা। (মো.বসির উদ্দীন আহমদ.নেক আমল পৃ.১৬৮)।
৫ সালাতুল ইসতিখারা
ইসতিখারার জন্য সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওযু করে দুই রাক’আত সালাত আদায় করে “আল্লাহুম্মা ইন্নী আসতাখীরুকা বি ইলমিকা….” দোয়াটি পাঠ করতে হবে। (বুখারী,আস-সহীহ ১/৩৯১,৫/২৩৪৫,৬/২৬৯০ইবনু হাজার,ফাতাহুল বারী ১১/১৮৩)।
কিন্তু আমাদের দেশে প্রচলিত কোনো কোনো গ্রন্থে এ বিষয়ে বিভিন্ন্ বানোয়াট পদ্ধতি ও দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে। একটি পুস্তকে বলা হয়েছে: কোনো জিনিসের ভাল মন্দ জানিতে হইলে এশার নামাজের পর এসাতেখারার নিয়তে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়িয়া নিয়া পরে কয়েক মর্তবা দুরূদ শরীফ পাঠ করিয়া “ছুবহানাক লা লানা ইল্লা মা আল্লামতানা……”১০০ বার পাঠ করিয়া আবার ২১ বার দুরূদ শরীফ পাঠ করিয়া পাক ছাপ বিছানায় শুইয়া থাকিবে……। (মো.বসির উদ্দীন আহমদ,নেক আমল,পৃ১৬৮)।
অন্য পুস্তকে বলা হয়েছে:হযরত আলী(কার্রা) বলিয়াছেন যে,স্বপ্নে কোনো বিষয় ভালমন্দ জানিতে হইলে নিম্নোক্ত নয়মে রাত্রে শয়ন করিবার পূর্বে দুই রাকাত করিয়া ছয় রাকাত নামাজ পরিবে। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতেহার পরে সূরা ওয়াশশামছে ৭ বার…..। (মো. শামছুল হুদা,নেয়ামুল কোরআন পৃ ২০২-২০৩)।
এ সকল কথা ও পদ্ধতি সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।আমরা বুঝি না,সহীহ হাদীস বাদ দিয়ে এ সকল বানোয়াট পদ্ধতি আমরা কেন উল্লেখ করি?
৬. হালকী নফল
রাসূলুল্লাহ (সা:) শেষ রাতে তাহাজ্জুদ আদায়ের পর বিত্র আদায় করতেন। এরপর দুই রাক’আত নফল সালাত আদায় করতেন। একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে,বিতর এর পরে দুই রাকাত নফল সলিাত আদায় করলে ‘তাহাজ্জুদ’বা কিয়ামুল্লাইলের সওয়াব পাওযা যায়। (দারিমী,আস-সুনান ১/৪৫২)। হাদীস দ্বারা এতটুকুই প্রমানিত। এ বিষয়ক প্রচলিত জাল ও ভিত্তিহীন কথার মধ্যে রয়েছে: বেতের নামাজ পড়ার পর দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলে একশত রাকাত নামাজ পড়ার সওয়াব হাসীল হয়। প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহার পর সূরা একলাছ ৩ বার করিয়া পাঠ করিয়া নামাজ আদায় করিতে হয়। এগুলি সবই ভিত্তিহিীন কথা বলে প্রতিয়মান হয়। (মো.বসির উদ্দীন আহমদ,নেক আমল,পৃ১৬৮)।
৭. আরো কিছু বানোয়াট ‘নামায’
বিভিন্ন নামে বিভিন্ন মনগড়া ও ভিত্তিহীন ফযীলতের বর্ণনা দিয়ে আরো কিছু ‘নামায’ প্রচলিত রয়েছে সমাজে। এগুলির মধ্যে রয়েছে ‘হেফযুল ঈমান’ নামায, কাফফারা নামায, বুজুর্গী নামায, দৌলত লাভের নামায, শোকরের নামায, পিতামাতার হকের নামায ইত্যাদি ইত্যাদি( লাখনবী,আল-আসার, পৃ.১০৩-১১৭; শাওকানী,আল-ফাওয়াইদা ১/৫৭-৮৫, মো.বসিরউদ্দীন আহমদ, নেক আমল, পৃ.১৬৮-১৭৫)।
৮. সপ্তাহের ৭ দিনের সালাত
সপ্তাহের ৭ দিনের দিবসে বা রাতে নির্ধারিত নফল সালাত ও তার ফজিলত বিষয়ক সকল হাদীস ই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা।মুমিন নিয়মিত তাহাজ্জুদ,চাশত ইত্যাদি সালাত আদায় করবেন । এছাড়া যথাসাদ্য বেশি বেশি নফল ালাত আদায় করবেন।এগুলো সহীহ হাদীসে বর্ণীত সওয়াবের আশা করবেন।কিন্তু জালিয়াতিগন কাল্পনিক সওযাব ও ফজিলত কাহীনি দিয়ে অনেক হাদীস বানিয়েছে,যাতে সপ্তাহের প্রত্যেক দিন ও রাতে বিশেষ বিশেষ সালাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।শুক্রবার রাত্রির নফল নামায ,শুক্রবার দিবসের নফল নামায,শনিবার রাত্রির নফল নামায,শনিবার দিবসের নফল নামায,….ইত্যাদি নামে প্রচলিত সবই বানোয়াট কথা।
যেমন আনাস (রা) ও অন্যান্য সাহাবীর নামে হাদীসে হিসাবে বর্ণীত হয়েছে যে, বৃহস্পতিবার দিবাগত শুক্রবারের রাত্রিতে এত রাকা’আত সালাত আদায় করবে…এতে জান্নাতে বালাখানা,ইত্যাদি অপরিমেয় সওয়াব লাভ করবে।শুক্রবার দিবসে অমুক সময়ে অমুক পদ্ধতিতে এত রাকা’আত সালাত আদায় করবে… এতে এত এত পুরস্কার লাভ করবে…। শনিবার রাত্রিতে যে ব্যাক্তি এত রাকা’আত সালাত অমুক সময়ে অমুক পদ্ধতিতে আদায় করবে সে অমুক অমুক পুরস্কার লাভ করবে…। শনিবার দিবসে অমুক পদ্ধতিতে এত রাকা’আত সালাত আদায় করলে অমুক অমুক ফল পাওয়া যাবে…।
এভাবে সপ্তাহের ৭ দিনের দিবসে ও রাত্রিতে বিভিন্ন পরিমাণে ও পদ্ধতিতে, বিভিন্ন সূরা বা দোয়া সহকারে যত প্রকারের সালাতের কথা বলা হথেছে সবই বানোয়াট ও জাল কথা।
আমাদের দেশে প্রচলিত বার চান্দের ফযীলত,নেক আমল,ওযীফা,ইত্যাদি পুস্তকেই এই সব মিথ্যা কথাগুলি হাদীস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।অথচ মুহাদ্দীসগণ সকলেই এগুলির জালিয়াতির বিষয়ে একমত।
অনেক সময়ে অনেক বড় আলিমও জনশ্রুতির উপরে অনেক কথা লিখে ফেলেন। সবার জন্য সব কথা ‘তাহকীক’বা বিশ্লেষন করা সম্ভব হয় না্। সপ্তাহের ৭ দিন বা রাতের নামাযও কোনো কোনো বড় আলিম ‘উল্লেখ করেছেন। তবে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই অর্থে বর্ণিত সকল হাদীসই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। এদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম যাহাবী,ইবনু হাজার,জোযকানী,ইবনুল জাওযী,সুয়ূতি,মুহাম্মাদ তাহের ফাতানী,মোল্লা আলী কারী,আব্দুল হাই লাখনবী,ইসমাঈল ইবনু মুহাম্মদ আজলূনী,শাওকানী প্রমুখ প্রসিদ্ধ মুহাদ্দীস। (৬৫৭ ইবনুল জাওযী,আল-মাউদূ’আত২/১১৩-১১৯,যাহাবী,তারতীবুলি মাউদূ’আত পৃ১৫৮-১৬০;ইবনুল কাইয়েম,আল-মানার,পৃ৪৯;সুয়ূতি,আল-লাআলী২/৪৯-৫২, ইরাক ,তানযীহ২/৫৮-৮৭;তাহের ফাতানী,তাযকীরতুল মাউদূ’আত,পৃ৪২;মোল্লা কারী, আল-আসরার,পৃ২৮৮,২৯৫-২৯৭,৩২৮;আজলুনী,কাশফুল খাফা,২/৫৫৬:আব্দুল হাই লাখনবী,আল আসরার,পৃ৪৭-৫৮শাওকানী আল-ফাওয়াইদ১/৬৯-৭২)।
সালাত বা নামায সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। মুমিন যত বেশি নফল সালাত আদায় করার চেষ্টা করবেন। তবে এর সাথে কোনো মনগড়া পদ্ধতি যোগ করা বা মনগড়া ফযীলতের বর্ণনা দেওয়া বৈধ নয়।
২.১১. বার চাঁদের সালাত ও ফযীলত বিষয়ক
বৎসরের বার মসে ও বিভিন্ন মাসের বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন আকৃতি ও প্রকৃতির সালাত ও সেগুলির আজগুবি ও উদ্ভট সব ফযীলতের বর্ণনা দিয়ে হাদীস বানিয়েছে জালিয়াতগণ।প্রচলিত ‘বার চাঁদের ফযিলত’জাতীয় গ্রন্থগুলি এই সব বাতিল কথায় ভরা।পাঠকদের সুবিধার্থে আমি আরবী মাসগুলির উল্লেখ করে,সে বিষয়ক সহীহ ও বানোয়াট কথাগুলি উল্লেখ করেছি।যদিও আমরা সালাত অধ্যায়ে রয়েছি,তবুও আমি সালাতের পাশাপাশি এ সকল মাসের সিয়াম ও অন্যান্য ফযীলত বিষয়ক কথাগুলি উল্লেখ করব;যাতে পাঠক একই স্থানে সংশ্লিষ্ঠ সকল বিষয় জানতে পারেন।
২.১১.১. মুহারাম মাস
ক. সহীহ ও যয়ীফ হাদীসের আলোকে মুহার্রাম মাস
আরবী পণ্জ্ঞিকার প্রথম মাস মুহার্রাম মাস। সহীহ হাদীসের আলোকে আমরা এই মাসের ফযীলত বা মর্যদা সম্পর্কে নিম্নের বিষয়গুলি জানতে পারি:
প্রথমত, এই মাসটি বৎসরের চারটি ‘হারাম’ মাসের অন্যতম। এই মাসগুলি ইসলামী শরিয়তে বিশেষভাবে সম্মানিত। এগুলিতে সধারণ ঝগরাঝাটি বা যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন: “আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় মাস বারটি, তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটি সুপ্রতিষ্টিত বিধান।সুতরাং এই নিষিদ্ধ মাসগুলির মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না….।”(সূরা ৯:তাওবা,আয়াত,৩৬।)
এই মাসগুলি হলো:মুহার্রাম,রজব,যিলকাদ ও যিলহাজ্জ মাস।
দ্বিতীয়ত, এই মাসকে সহীহ হাদীসে্ ‘আল্লাহর মাস’বলে আখ্যায়িতকরা হয়েছে আবং এই মাসের নফল সিয়াম সর্বোত্তম নফল সিয়াম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।সহীহ মুসলিমে সংকলিত হাদীসে রাসুলুল্লাহ(সা) বলেন:
আরবী(*****)
– “রামাদানের পরে সর্বোত্তম সিয়াম হল আল্লহর মুহার্রাম মাস।”
তৃতীয়ত, এই মাসের ১০ তারিখ ‘আশুরা’র দিনে সিয়াম পালনের বিশেষ ফযীলত রয়েছে।‘আশুরা’র সিয়াম সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ(সা) বলেন: “এই দিনের সিয়াম গত এক বৎসরের পাপ মার্জনা করে।”(মুসলিম,আস-সহীহ ২/৮২১)।
এই দিনে রাসুলুল্লাহ(সা) নিজে সিয়াম পালন করতেন উম্মতকে সিয়াম পালনের উৎসাহ দিয়েছেন এবং ১০ তারিখের সাথে সাথে ৯ বা ১১ তারিখে ও সিয়াম পালনে উৎসাহ দিয়েছেন। (ইবনু রাজাব, লাতাইফ১/৬৮-৭৬;আব্দুল হাই লাখনবী পৃ৯১-৯৪)।
চতুর্থত,সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমানিত হয়েছে যে, এই দিনে মহান আল্লাহ তার রাসুল মূসা (আ) ও তার সঙ্ঘী বনী ইসরাঈলকে ফির’আউনের হাত থেকে উদ্ধার করেন এবং ফির’আউনও তার সঙ্গি কে ডুবিয়ে মারেন। (বুখারী,আস-সহীহ২/৭০৪,৩/১২৪৪,মুসলিম,আস-সহীহ২/৭৯৬)।
সহীহ হাদীস থেকে মুহর্রাম মাস ও আশুরার সম্পর্কে শুধু এতটাকুই জানা যায়।পরবর্তীকালেঅনেক বানোয়াট ও মিথ্যা কাহিনী এক্ষেত্রে প্রচলিত হয়েছে। এখানে দুইটা বিষয় লক্ষনীয়:
প্রথম বিষয়: এই দিনটিকে ইহুদীগণ সম্মন করত। এ কারনে ইহুদীদের মধ্যে এই দিনটির কল্প কাহীনি প্রচলিত ছিল। পরবর্তী যুগে ইসরাঈল রেওয়োয়াত হিসেবে সেগুলি মাসলিম সমাজে প্রবেশ করছে। প্রথম যুগে মাসলিমগণ এগুলি সত্য ব মিথ্যা বলে বিস্বাস না করে ইসরাঈলী কাহিনী হিসাবেই বলেছেন।পরবর্তী যুগে তা হাদীসে পরিণত হয়েছে।
দ্বিতীয় বিষয়,রাসুলুল্লাহ(সা)-এর ইন্তিকালের অর্ধ শতাব্দী পরে ৬১ হিজরীর মুহর্রাম মাসের ১০তরিখে আশুরার দিনে তাঁর প্রিয়তম নাতি হযরত হুসাইন(রা) করবালার প্রান্তরে শহীদ হন। এই ঘটনা মাসলিম উম্মাহর মধ্যে চিরস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে। হুসাইন(রা)পক্ষের ও বিপক্ষের অনেক বিবেকহীন দার্বল ।ঈমান মানূষ‘আশুরার’ বিষয়ে অনেক হাদীস বানিয়েছে।কেউ দিনটিকে ‘শোক দিবস’হিসেবে এবং কেউ দিনটিকে ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন এর জন্য নানা প্রকারের কথা বানিয়েছেন।তবে মুহাদ্দীসগণের নিরীক্ষার পদ্ধতিতে এ সকল জালিযাতি ধরা খুবই সহজ ছিল।
মুহর্রাম ও আশুরার সম্পর্কে প্রচলিত অন্যান্য কথাবার্তাকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি:প্রথমমত,যে সকল ‘হাদিস’ কোনো কোনো মুহাদ্দীস জাল বা বানোয়াট বলে উল্লেখ করলেও, কেউ কেউ তা দূর্বল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এবং যে সকল হাদীস অত্যন্ত দূর্বল সনদে কোনো কোনো সাহাবী তাবেয়ীগণ থেকে তাঁরা নিজের বক্তব্য হিসাবে বণীত হয়েছে। বাহ্যাত ইসরাঈলী বর্ণনার ভিত্তিতে তাঁরা এগুলো বলেছেন। দ্বিদিদ দিতদ্বিতীয়ত,সকল মুহাদ্দিস যে সকল হাদীসকে জাল ও ভিত্তিহীন বলে একমত পোষণ করেছেন।
জাল বা দূর্বল হাদীস ও সাহাবী-তাবেয়ীগণের মতামত
১. অত্যন্ত দুর্বল সূত্রে কোনো কোনো সাহাবী বা তাবেয়ী থেকে বর্ণীত হয়েছে যে, এই দিনে আল্লাহ তা’আলা আদম (আ)-এর তাওবা কবুল করেন।
২. অনুরূপভাবে অনির্ভরযোগ্য সুত্রে বর্ণীত হয়েছে যে, এই দিনে নূহ(আ)এর নৌকা জূদী পর্বতের উপর থামে।
৩. অনুরূপ অনির্ভরযোগ্য সুত্রে বর্ণীত হয়েছে যে, এই দিনে ঈসা(আ) জন্মগ্রহণ করেন।
৪. মুহর্রাম মাস ও আশুরার দিনে দান-সদকার বিষয়ে যা কিছুই বর্ণিত হয়েছে,তিনি বলেছেন আশুরার দিনে সিয়াম পালন করলে যেহেতু এক বৎসরের সওয়াব পাওয়া যায়, সেহতু এই দিনে দান করলেও এক বৎসরের দানের সওয়াব পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া এই দিনে দানের বিষয়ে যা কিছু বলা হয়েছে সবকিছুই বাতিল ও ভিত্তিহীন কথা। (ইবনু রাজাব,লাতাইফ ১/৭৮; আব্দুল হাই লাখনবী,আল-আসার পৃ ৯৫/৯৬)।
৫. একটি হাদিসে বলা হয়েছে:
“যে ব্যাক্তি আশুরার দিনে তার পরিবারের জন্য প্রশস্তভাবে খরচ করবে আল্লাহ সারা বৎসরই প্রশস্ত রিয্ক প্রদান করবেন।” হাদীসটি কযেকটা সনদে বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেকটা সনদই অত্যন্ত দূর্বল। বিভিন্ন সনদের কারণে বাইহাকী, ইরাকী, সুয়ূতী প্রমুখ মুহাদ্দীস এই হাদীসকে জাল বলে গণ্য না করে ‘দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনু হজার হাদিসটিকে অত্যন্ত আপত্তিকর ও খুবই দূর্বল বলেছেন। অপরদিকে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইবনু তাহমিয়া প্রমুখ মুহাদ্দিস একে জাল বলে গণ্য করেছেন। তারা বলেন যে প্রত্যেক সনদই অত্যন্ত দূর্বল হওয়ার ফলে একাধিক সনদে এর গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পায় না। এছাড়া হাদীসটি সহীহ হাদীসের বিরোধী। সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইহুদীরা আশুরার দিনে উৎসব বা আনন্দ করবে, তোমরা তাদের বিরোধিতা করবে; এই দিনে সিয়াম পালন করবে এবং উৎসব বা আনন্দ করবে না। (ইবনু তাইমিয়া, আহাদীসুল কুস্সাস,পৃ.৭৯, ইবনুল জাওযী,আল-মাওদু’আত২/১১৩-১১৭; সুয়ূতী,আল-লাআলী ২/১০৯-২১৩; সাখাবী,আল-মাকাসিদ,পৃ ৪২৭;্আল-যারকশী,আত-তাযকিরা৩৪,১১৮;ইবনু ইরাক,তানযীহ ২/১৫০-১৫৭;ইবনু রাজাব,লাতাইফ১/৭৯;মোল্লা কারী,আল-আসরার.,পৃ২৪৪-২৪৫;শাওকানী,আল ফাওয়াইদ ১/১৩২-১৩৩;আব্দুল হাই লাখনবী,আল-আসার পৃ১০০/১০২)।
৬.অন্য হাদীসে বলা হয়েছে:
“যে ব্যক্তি আশুরার দিনে চোখে ‘ইসমিদ’ বা সুরমা ব্যবহার করবে কখনোই চোখ উঠবে না।’’ উপরের হাদীসটির মতই এই হাদীসটি একাদিক সনদে বর্ণীত হয়েছে। প্রত্যেক সনদেই অত্যন্ত দুর্বল বা মিথ্যাবাদী রাবী রয়েছে।কোনো কোনো মুহাদ্দীস একাধিক সনদের কারণে হাদীসটিকে দূর্বল হিসাবে গণ্য করলেও অধিকাংশ মুহাদ্দীস হাদীসটিকে জাল বা বানোয়াট হিসাবে গণ্য করেছেন। তারা বলেন,ইমাম হুসাইনের হত্যাকারীগণ আশুরার দিনে সুরমা মাখার বিদ’আতটি চালু করেন। এই কথাটি তাদেরই বানানো। কোনো দুর্বল রাবী বেখেয়ালে তা বর্ণনা করেছেন। (ইবনুল জাওযী,আল-মাওদু’আত২/১১৬;আত২/১১৩-১১৭; সুয়ূতী,আল-লাআলী ২/২১১;সাখাবী,আল-মাকাসিদ, পৃ ৪০১; ইবনু ইরাক,তানযীহ ২/১৫৭;ইবনু রাজাব,লাতাইফ১/৭৯; মোল্লা কারী,আল-আসরার.,পৃ২২২;মাসনূ,পৃ১৪১; শাওকানী,আল ফাওয়াইদ ১/১৩১-১৩২;আব্দুল হাই লাখনবী,আল-আসার পৃ১০০/১০২)।
খ.মুহর্রাম মাস বিষয়ক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথাবার্তা
উপরের কথাগুলো কোনো কোনো মুহাদ্দিস জাল বলে গণ্য করলেও কেউ কেউ তা দুর্বল বলে গণ্য করেছেন। নিচের কথাগুলি সকল মাহাদ্দিস একবাক্যে জাল বলে স্বীকার করেছেন। এগুলিকে আমরা তিন ভগে ভাগ করতে পারি:প্রথমত,মুহর্রাম বা আশুরার সিয়ামের ফজিলতের বিষয়ে জাল কথা, দ্বিতীয়ত,আশুরার দিনের বা রাতের জন্য বা মুহর্রাম মাসের জন্য বিশেষ সালাত ও তার ফযীলতের বিষয়ে জাল কথা এবং তৃতীয়ত, আশুরার দিনে অতীত ও ভবিষ্যতে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটেছে বা ঘটবে বলে জাল কথা।
১.মুহর্রাম বা আশুরার সিয়াম
আশুরার দিনে সিয়াম পালন করলে পূর্ববর্তী এক বৎসরের গোনাহের কাফফারা হবে বলে সহীহ হাদীসে আমরা দেখতে পেয়েছি। জালিয়াতগণ আরো অনেক কথা এ সম্পর্কে বানিয়েছে। প্রচলিত একটি পুস্তক থেকে উদ্ধৃতি করছি: “হাদীসে আছে-যে ব্যক্তি মহর্রমের মাসে রোযা রাখিবে, আল্লাহ তা’আলা তাহাকে প্রত্যেক রোযার পরিবর্তে ৩০ দিন রোযা রাখার সমান ছওয়াব দিবেন।আরও হাদীসে আছে-যে ব্যাক্তি আশুরার দিনে একটি রোযা রাখিবে সে দশ শাজার ফেরেশতার, দশ হাজার শহীদের ও দশ হাজার হাজীর ছওয়াব পাইবে “
আরও হাদীসে আছে –যে ব্যাক্তি আশুরার তারিখে স্নেহ-পরবশ হইয়া কোনো এতিমের মাথায় হাত ঘুরাইবে,আল্লাহতাআলা ঐ এতিমের মাথার পৃত্যেক চুলের পরিবর্তে তাহাকে বেহেশতের এক একটি ‘দরজা’প্রদান করিবেন।আর যে ব্যাক্তি উক্ত তারিখের সন্ধ্যায় রোযাদারকে খানা খাওয়াইবে বা ইফতার করাইবে, সে ব্যাক্তি সমস্ত উম্মতে মোহাম্মদীকে খানা খাওইবার ও ইফতার করাইবার ন্যায় ছওয়াব পাইবে।
হযরত(সা) আরও বলিলেন, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে রোযা রাখিবে,সে ৬০ বৎসর রোযা নামায করার সমতুল্য ছওয়াব পাইবে। যে ব্যক্তি ঐ তারিখে বিমার পোরছী করিবে, সে সমস্ত আওলাদে আদমের বিমার পোরছী করার সমতুল্য ছওয়াব পাইবে।….তাহার পরিবারের ফারাগতি অবস্থা হইবে। ৪০ বৎসর গুনাহর কাফ্ফারা হইয়া যাইবে।…(হাদীস)” (মাও.গোলাম রহমান, মকছুল মো’মেনীন,পৃ.৪৩০-৪৩১, পুনশ্চ:মুফতি হাবীব ছামদানী,বার চান্দের ফজীলত,পৃ১৩; অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল পৃ.২৯৮-৩০০)।
অনুরূপ আরেকটি মিথ্যা কথা হলো: “ হযরত রাসুলুল্লাহ(সা)এরশাদ করিয়াছেন,যে ব্যক্তি মহর্রম মাসের ১০ দিন রোযা রাখিবে,সে ব্যক্তি যেন ১০ হাজার বৎসর যাবৎ রোজা রাখিল এবং রাত্রিবেলা ইবাদতে জাগরিত থাকিল।….মহর্রম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।…তোমরা আল্লাহ তাআলার৫ পছন্দনীয় মাস মহর্রম মাসের সম্মান করিবে,আল্লাহ তাআলা তাহাকে জান্নাতের মধ্যে সম্মআনিত করিবেন এবং জাহান্নামের আযাব হইতে বাচাঁইয়া রাকিবেন…. মহর্রমের ১-০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ) ও অন্যান্য নবীদের উপর ফরজ ছিল।এই দিবসে ২০০০ নবী জন্মগ্রহন করিয়াছেন এবং ২০০০ নবীর দোয়া কবুল করা হইয়াছে…..।(মুফতি হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফজীলত, পৃ.১৩)।
মুহাদ্দীসগণ একমত যে, এগুলি সবই বানোয়াট কথা ও জাল হাদীস। (ইবনুল জাওযী,আল-মাওদু’আত ২/১১২-১১৭;সুয়ূতী,আল-লাআলী ২/১০৮-১০৯;ইবনু ইরাক,তানযীহ ২/১৪৯-১৫১;মোল্লা কারী,আল-আসরার.,পৃ ২৯৪; শাওকানী আল ফাওয়াইদ ১/১২৯-১৩০;১/১৩২-১৩৩; আব্দুল হাই লাখনবী,আল-আসার পৃ৯৪-৯৫)।
২. মুহর্রাম মাসের সালাত
মুহর্রাম মাসের কোনো দিবসে বা রাত্রে এবং আশুরার দিবসে বা রাত্রে কোনো বিশেষ সালাত আদাযের কোনো প্রকার নির্দেশনা বা উৎসাহ কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ক সকল কথাই বানোয়াট। আমাদের দেশে প্রচলিত কোনো কোনো পুস্তকে মুহর্রাম মাসের ১ম তারিখে দুই রাকা’আত সালাত আদায় করে বিশেষ ফযীলতের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এগুলি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। (মুফতি হাবীব ছামদানী,বার চান্দের ফজীলত,পৃ.১১-১২;অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল পৃ.২৯৮)।
৩.আশুরার দিনে বা রাতে বিশেষ সালাত
আশুরার দিনে সিয়াম পালনের উৎসাহ দেওয়া হলেও,হাদীস শরীফে আশুরার দিবসে বা রাতে বিশেষ সালাত আদায়ের বিধান দেওয়া হয় নি।তবে জালিয়াতগণ অনেক কথা বানিয়েছে।যেমন,যে ব্যক্তি আশুরার দিবসে যোহর ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ে… অথবা আশুরার রাত্রিতে এত রাকাত সালাত অমুক অমুক সূরা এতবার পাঠ করে আদায় করবে… সে এত এত পুরস্কার লাভ করবে। সরলপ্রাণ মুসলিমদের মন জয় করার জন্য জালিয়াতগণ এ সকল কথা বানিয়েছে,যা অনেক সময় সরলপ্রণ আলিম ও বুযুর্গকে ধোকাগ্রস্ত করেছে। (ইবনুল জাওযী, আল-মাওদু’আত ২/৪৫-৪৬; সুয়ূতী,আল-লাআলী ২/৫৪; ইবনু ইরাক,তানযীহ ২/৮৯; শাওকানী আল ফাওয়াইদ ১/৭৩; আব্দুল হাই লাখনবী,আল-আসার পৃ.৯০, ১১০-১১১)।
৪.আশুরায় অতীত ও ভবিষ্যত ঘটনাবলির বানোয়াট ফিরিস্তি
মিথ্যাবাদীরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর নামে জালিয়াতি করে বলেছে:
আশুরার দিনে আল্লাহ আসমান ও যমিন সৃষ্টি করেছেন।
এই দিনে তিনি পাহাড় পর্বত, নদ নদী… সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি কলম সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি লাওহে মাহফুজ সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আরশ সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আরশের উপরে সমাসীন হয়েছেন। এই দিনে তিনি কুরসী সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি জান্নাত সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি জিবরাঈল(আ)সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি ফিরিশতাগণকে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আদম(আ)সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আদম(আ)জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। এই দিনে তিনি ইদরীস (আ) কে আসমানে উঠিয়ে নেন। এই দিনে তিনি নূহ (আ)-কে নৌকা থেকে বের করেনে। এই দিনে তিনি দায়ূদের (আ) এর তওবা কবুল করেছেন। এই দিনে তিনি সুলাইমান(আ)-কে রাজত্ব প্রদান করেছেন। এই দিনে তিনি আইঊব(আ)-এর বিপদ-মসিবত দূর করেন। এই দিনে তিনি তাওরাত নাযিল করেন। এই দিনে ইবরাহীম(আ) জন্মগ্রহণ করেন…খলীল উপাধি লাভ করেন। এই দিনে ইবরাহীম(আ) নমরূদের অগ্নিকুন্ডু থেকে রক্ষা পান। এই দিনে ইসমাঈল(আ) কে কুরবানী করা হয়েছিল। এই দিনে ইওনুস (আ) কে মাছের পেট থেকে বাহির হন। এই দিনে আল্লাহ ইউসূফকে(আ) জেলখানা থেকে বের হন। এই দিনে ইয়াকুব (আ)দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান্। এই দিনে ইয়াকুব (আ)ইউসূফ(আ) এর সাথে সম্মিলিত হন। এই দিনে হযরত মুহাম্মদ(সা) জন্মগ্রহণ করেছেন।
কেউ কেউ বানিয়েছে:মুহর্রাম এর দুই তারিখে নূহ(আ)প্লাবন হতে মুক্তি পেয়েছেন,৩ তারিখে ইদরীস(আ) আসমানে উঠানো হয়েছে ৪ তারিখে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছে…..ইত্যাদি ইত্যাদি।
এইরূপ অগণিত ঘটনা এই মাসে বা এই দিনে ঘটেছে বা ঘটবে বলে উল্লেখ করেছে জালিয়াতরা তাদের এ কল্প কাহিনীতে। মোট কথা হলো,আশুরার দিনে মূসা (আ) ও তাঁর সাথীদের মুক্তি পাওয়া ছাড়া আর কোনো ঘটনা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমানিত নয়। আদমের(আ)তাওবা কবুল,নূহ (আ) এর নৌকা জূদি পর্বতের উপর থামাও । ঈসা(আ)জন্মগ্রহণ করার কথা অনির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো কোনো সাহাবী-তাবেয়ী থেকে বর্ণিত। আশুরা বা মুহর্রাম সম্পর্কে আর যা কিছু বলা হয় সবই মিথ্যা ও বাতিল কথা। দূঃখজনক হলো,আমাদের দেশে মুহর্রাম বা আশুরা বিষয়ক বই পুস্তকে,আলোচনা ও ওয়াযে এই সমস্ত ভিত্তিহীন কথা বার্তা উল্লেখ করা হয়। (ইবনুল জাওযী, আল-মাওদু’আত ২/১১২-১১৭; ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার পৃ.৫২; যাহাবী,মীযানুল ই’তিদাল ২/১৯০; ইবনু হাজার,লিসানুল মীযান ২/১৬৯; সুয়ূতী,আল-লাআলী ২/১০৮-১০৯; ইবনু ইরাক,তানযীহ ২/১৪৯; মোল্লা কারী, আল-আসরার,পৃ.৩০০; আব্দুল হাই লাখনবী,আল আসরার,পৃ.৯৪-৯৭; দরবেশ হূত,আসনাল মাতালিব,পৃ.২৭৭-২৭৮;আজলূনী,কাশফুল খাফা ২/৫৫৭)।
২.১১.২ সফর মাস
উপরের আলোচনা থেকে দেখা যায় যে মুহর্রাম মাসের জন্য কোনো বিশেষ কোনো সালাত নেই,তবে এই মাসের বিশেষ সিয়ামের কথা হাদীস শরীফে বর্ণীত হয়েছে এবং এ জন্য বিশষ সওয়াব রয়েছে। পক্ষান্তরে সফর মাসের জন্য কোনো বিশেষ সালাত ও নেই,সিয়াম ও নেই।
এই মাসের কোনো দিবসে বা রাত্রে কোনো প্রকারের সালাত আদাযের বিশেষ সওযাব বা ফযীলত কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। অনুরূপভাবে এই মাসের কোনো দিনে সিয়াম পালনেরও কোনো বিশেষ ফযীলত কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা। এই মাসকে কেন্দ্র করেও অনেক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথা মুসলিম সমাজে প্রচলিত হয়েছে। এগুলো কে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমত,সফর মাসের ‘অশুভত্ব’ ও ‘বালা-মুসিবত’ বিষয়ক,দ্বীতিয়ত,সফর মাসের প্রথম তারিখে বা অন্য সময়ে বিশেষ সালাত ও তৃতীয়ত,আখেরি চাহার শোম্বা বা শেষ বুধবার বিষয়ক।
প্রথমত,সফর মাসের অশুভত্ব বা এ মাসের বালা-মুসিবত
কোনো স্থান,সময়,বস্তু বা কর্মকে অশুভ,অযাত্রা বা অমঙ্গলময় বলে মনে করা ইসলামী বিস্বাসে ঘোর পরিপন্থি একটি কুসংস্কার। এ বিষয়ে আমরা পরিবর্তীকালে আলোচনা করব,ইনশা আল্লহ। এখনে লক্ষনীয় যে,আরবের মানুষেরা জাহেলী যুগ থেকে ‘সফর’ মাসকে অশুভ ও বিপদাপদের মাস বলে বিশ্বাস করত।রাসূল্লাহ(সা) তাদের এই কুসংস্কারের প্রতিবাদ করে বলেন,
আরবী(*****)
“…কোনো অশুভ –অযাত্রা নেই ।…(বুখারী,আস-সহীহ ৫/২১৫৮,২১৬১,২১৭১,২১৭৭; মুসলিম,আস-সহীহ৪/১৭৪২-১৭৮৫)।
অথচ এর পরেও মুসলিম সমাজে প্রচার করেছে যে জালিয়াতগণ। তারা জালিয়াতি করে রাসূলুল্লাহ(সা)এর নামে বলেছে, এই মাস বালা মুসিবতের মাস। এই মাসে এত লক্ষ এত হাজার….বালা নাজিল হয়।…এ মাসে আদম ফল খেয়েছিলেন। এ মাসে হাবিল নিহত হন। এ মাসে নূহের কউম ধংস হয়। এ মাসে ইবরাহীমকে আগুনে ফেলা হয়।….এই মাসের আগমনে রাসূলুল্লাহ ব্যাথিত হতেন। এ্ই মাস চলে গেলে খুশি হতেন। তিনি বলতেন: “ যে ব্যক্তি আমাকে সফর মাস অতিক্রান্ত হওয়ার সুসংবাদ প্রদান করবে আমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করার সুসংবাদ প্রদান করব।”….ইত্যাদি আনেক কথা বানিয়েছে। আর অনেক সরলপ্রাণ বুযুর্গও তাদের সকল জালিয়াতি বিশ্বাস করে ফেলেছেন। মুহাদ্দিসগণ একমত যে সফর মাসের সকল কথা ভিত্তিহীন মিথ্যা। (সাগানী আল মাউদু’আত পৃ.৬১;মোল্লা কারী,আল-আসরার.,পৃ ২২৫;তাহের ফাতানী,তযকীরা,পৃ১১৬;আজলূনী,কাশফুল খাফা ২/৩০৯;শাওকনী,আল-ফাওয়াইদ ২/৫৩৯ নিযামুদ্দীন আউলিয়া,রাহাতুল মুহিব্বীন,পৃ.১০১ রাহাতুল কুলুব,পৃ.১৩৮)।
দ্বিতীয়ত,সফর মাসের ১ম রাতের সালাত
উপরুক্ত মিথ্যা কথাগুলির ভিত্তিতেই একটি ভিত্তিহীন ‘সালাতের’উদ্বাভন করা হয়েছে।কেউ যদি সফর মাসের ১ম রাত্রিতে মাগরিবের পরে…বা ইশার পরে..চার রাকা’আত সালাত আদায় করে,অমুক অমুক সূরা বা আয়াত পাঠ করে…তবে সে বিপদ থেকে রক্ষা পাবে,এত পুরুষ্কার চাবে..ইত্যাদি।এগুলি সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা,যদিও অনেক আলেম এগুলি বিস্বাস করেছেন বা তাদের বইয়ে বিওযায়ে উল্লেখ করেছেন। (খাজা নিযামুদ্দীন আউলিয়া,রাহাতুল কুলুব,পৃ.১৩৮-১৩৯;মুফতি হাবীব ছামদানী,বার চান্দের ফজীলত,পৃ.১৪)।
তৃতীয়ত, সফর মাসের শেষ বুধবার
বিভিন্ন জাল হাদীসে বলা হয়েছে, বুধবার অশুভ এবং যে কোনো মাসের শেষ বুধবার সবছেয়ে অুশুভ দিন।আর সফর মাস যেহেতু অশুভ, সেহেতু সফর মাসের শেষ বুধবার বছরের সবছেয়ে বেশি অুশুভ দিন্ এবং এই দিন সবছেয়ে বশেি বালা মুসিবত নাযিল হয়। এই সবই ভিত্তিহীন কথাবার্তা অনেক সরলপ্রান বুযুর্গ বিস্বাস করেছেন। একজন লিখেছেন:সফর মাসে এক লাখ বিশ হাজার ‘বালা নাজিল হয়। এবং সবদিনের চেয়ে ‘আখেরী চাহার শুম্বা’-তে(সফর মাসে শেষ বুধবার)নাজিল হয় সবছেয়ে বেশি সুতরাং ঐ দিনে যে ব্যাক্তি নিম্নোক্ত নিয়মে চার রাকা’আত নামাজ পাঠ করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে ঐ বালা থেকে রক্ষা করবেন এবং পরবর্তী বছর পর্যন্ত তাকে হেফাজতে রাকবেন। (খাজা নিযামুদ্দীন আউলিয়া,রাহাতুল কুলুব,পৃ.১৩৯)।
এগুলি সবই ভিত্তিহীন কথা।তবে আমাদের দেশে বর্তমানে ‘আখেরী চাহার শুম্বা’-র প্রশিদ্ধ এই কারনে নয়,অন্য কারনে।প্রশিদ্ধ আছে,রাসুল্লাহ(সা) সফর মাসের শেষের দিকে অশুস্ত হয়ে পরেন। তিনি ষফর মাসের শেষ দিকে কিছুটা সুস্থ হন এবং গোসল করেন। এরপর তিনি পুনরায় অসুশস্থ হয়ে পড়েন এবং এই অসুস্থতাতেই তিনি পরের মাসে ইন্তিকাল করেন। এজন্য মাসলমানেরা এই দিনে তাঁর সর্বশেষ সুস্থতা ও গোসলের স্মৃতি উদযাপন করেন।
এ বিষয়ক প্রচলিত কাহীনির সার সংক্ষেপ প্রচলিত একটি পুস্তক থেকে উদ্ধৃতি করছি: “হযরত নবী করিম(সা) দুনিয়া হইতে বিদায় নিবার পূর্ববর্তী সফর মাসের শেষ সপ্তাহে ভীষনভাবে রোগআক্রান্ত হইয়া ছিলেন।অথঃপর তিনবি এই মাসের শেষ বুধবার সুস্থ হইয়া গোসল করত: কিছু খানা খাইয়া মসজিদে নববী তে হায়ীর হইয়া নামাযের ইমামতি করিয়াছিলেন।ইহাতে উপস্তিত সাহাবীগণ অত্যাধিক আনন্দিত হইয়াছিলেন।আর খুশির কারণে অনেক অনেক দান খয়রাত করেছিলেন।বর্নিত আছে হযরত আবু বকর(রা) খুশিতে ৭ সশস্র দীনার এবং হযরত উমর ইবনে খত্তাব(রা)৫ সহস্র দীনার,হযরত ওসমান(রা)১০সশস্র দীনার,হযরত আলী (রা)৩সহস্র দীনার,হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ(রা)১০০ উট ও ১০০ ঘোড়া আল্লাহর ওয়াস্তে দান করিয়াছিলেন।তৎপর হইতে মুসলমানগণ সাহাবীগণের নীতি অনুকরন ও অনুসরন করিয়া আসিতেছে ।” হযরত নবী করিম(সা)এর এই দিনের গোসল ইজীবনের শেষ গোসল ছিল। ইহার পর আর তিনি জীবিতদকালে গোসর করেন নাই। তাই সকল মাসলমানের এই দিনে ওযু গোসল করতঃ ইবাদৎ বন্দেগী করা উচিৎ এবং নবী করিম(সা)এর পৃতি দরূদ শরীফ পাঠ করতঃসাওযাব রেছানী করা কর্তব্য….। (মুফতি হাবীব ছামদানী,বার চান্দের ফজীলত,পৃ.১৫)।
উপরের এই কাহীনিটিই কমবেশি সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন গ্রন্থে লেখা রয়েছ। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেও কোনো সহীহ বা যয়ীফ শাদীসে এই ঘটনার কোনো প্রকারের উল্লেখ পা্ইনি। ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়া অন্য কোনো মুসলিন সমাজে সফর মাসের শেষ বুধবার পালনের রেওয়াজ বা কাহীনি প্রচলিত আছে বলে আমার জানা নেই।
ক. রাসুল্লাহ(সা)-এর সর্বশেষ অসুস্থতা
রাসুল্লাহ(সা)সফর ব রবিউল আউয়াল মাসের কত তারিখে অসুস্থ হয়ে পরেন এবং কত তারিখে ইন্তিকাল করেন সে বিষয়ে হদীস শরীফে কোনো ইঙ্গিত নেই অগনিত হদীসে তাঁর অসুস্থত,অসুস্থত-কালীন অবস্থা,কর্ম,উপদেশ,তাঁর ইন্তিকাল ইত্যাদির ঘটনা বিস্তারিত বর্ণিত
হয়েছে।কিন্তু কোথাও কোনো ভাবে কোনো দিন,তারিখ বা সময় বলা হয়নি।কবে তাঁর অসুস্ততার শুরু হয়,কতদিন অসুস্ত ছিলেন,কত তারিখে ইন্তিকাল করেনে সে বিষয়ে কোনো াদীসেই কিছা উল্লেখ করা হয় নাই।
২য় হিজরী শতক থেকে তাবি ও তাবিয়ী আলিমগণ রাসুল্লাহ(সা) এর জিবনে ঘটনাবী ঐতিহাসিক দিন তারিক সহকারে সাজাতে চেষ্টা করেন।তখন থেকে মুসলিম আলিমগণ এ বিষয়ে অনেখ মত পেশ করেছেন।
তাঁর অসুস্থতা সম্পর্কে অনেক মত রযেছে। কোউ বলেছেন সফর মাসের শেষ দিকে তাঁর অসুস্থতা শুরু।কেউ বলেছেন রবিজউল আউয়াল মাস থেকে তার অসুস্থতা শুরু। দ্বীতিয় হিজরী শতকের প্রখ্যাত তাবেয়ী ঐতিহাসিক ইবনু ইসহাক(১৫ হি/৭৬৮খৃ)বলেন:
রাসুল্লাহ(সা) যে অসুস্থায় ইন্তিকাল করেন, সেই অসুস্থার শুরু হয়েছিল সফর মাসের শেষ কযেক রাত থেকতে, অথবা রবিউল আউয়াল মাসের শুরু থেকে। (ইবনু হিশাম,আস-সীরাহ আন নববিয়্যাহ৪/২৮৯)।
কি বার থেকে তাঁর অসুস্থতা শুরু হয়েছিলি, সে বিষয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন শনিবার,কেউ বলেছেন বুধবার এবং কেউ বলেছেন সোমবার তাঁর অসুস্থতা শুরু হয়। (কাসতালানী,আহমদ ইবনু মাহাম্মদ,আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া৩/৩৭৩;যারকানী,শারহুল মাওয়াহিব ১২/৮৩)।
কয়েকদিন অসুস্থার পর তিনি ইন্তিকাল করেন , সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন ১০ দিন, কেউ বলেছেন ১২ দিন, কেউ বলেছেন ১৩ দিন, কেউ বলেছেন ১৪ দিন অসুস্থ থাকার পর তিনি ইন্তিকাল করেন। (কাসতালানী,আহমদ ইবনু মাহাম্মদ,আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া৩/৩৭৩;আল-লাদুন্নিয়া৩/৩৭৩;যারকানী,শারহুল মাওয়াহিব ১২/৮৩)।
সর্বাবস্থায়, কেউ কোনোভাবে বলছেন নাযে, অসুস্থতা শুরু হওয়ার পরে মাঝে কোন দিন তিনি সুস্থ ছিলেন।অসুস্থ অবস্থাতেই,ইন্তিকালের
কয়েকদিন আগে তিনি গোসল করেছিলেন বলে সহীহ হাদীসে বর্ণীত হয়েছে। বুখারী সংকলীত হাদীসে আয়েশা (রা) বলেন:
…………………………………………………………………………………………………………………রাসুল্লাহ(সা) যখন আমার গৃহে প্রবেশ করলেন এবং তার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেল, তখন তিনি বললেন,তোমরা আমার উপরে ৭ মশক পানি ঢাল….,যেন আরাম বোধ করে লোকদের নির্দেশেনা দিতে পারি। তখন আমরা এভাব তাঁর দেহে পানি ঢাললাম…। এরপর তিনি মানুষদের নিকট বেরিয়ে যেয়ে তাদরেকে নিয়ে সালাত আদায় করলেনে এবং তাদেরকে খুতবা প্রদান করলেন বা ওয়াজ করলেন। (বুখারি আস-সহীহ ১/৮৩,৪/২৬২৪,৫/২১৬০;হাকীম,আল-মুসতাদরাক ১/২৪৩;ইবনু শিব্বান,আস-সহীহ১৪/৫৬৬)।
এখানে স্পষ্ট যে রাসুল্লাহ(সা) তাঁর অসুস্থতার মধ্যেই অসুস্থতা ও জরের প্রকোপ কমানোর জন্য এভাবে গোসল করেন,যেন কিছুটা আরাম বোধ করেন এবং মসজিদে যেয়ে সবাইকে নসীহত করতে পারেন।
এই গোসল করার ঘটনাটি কত তারিখে বা কী বারে ঘটেছিল তা হাদিসে কোনো বর্ণনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নী।তবে আল্লামা ইবনু হজার আসকালানী সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম অন্যান্য হাদীসের সাথে এই হাদীসের সমন্বয় করে উল্লেখ করেছেন যে,এই গোসলের ঘটনাটি ঘটেছিল ইন্তিকালের আগের বৃহস্পতিবার অর্থাৎ ইন্তিকালের ৫ দিন আগে। (ইবনু শাজার,ফাতাহুল বারী ৮/১৪২)। ১২ই রবিউল আউয়াল ইন্তিকাল হলে তা ঘটেছিল ৮ ই রবিউল আউয়াল।
উপরের আলোচনা থেকে আমাদের নিকট প্রতিয়মান হয় যে সফর মাসের শেষ বুধবার রাসুল্লাহ(সা) এর সুস্থ হওয়া, গোসল করা এবং এজন্য সাহাবীগণের আনন্দিত হওযা ও দান সদকা করার এ সকল কাহিনীর কোনোরুপ ভিত্তি নেই। আল্লাহই ভাল জানেন। সেহেতু মূল ঘটনাটিই প্রমানিত নয়, সেহেতু সেই ঘটনা উদযাপন করা বা পালন করার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। এরপরেও আমাদের বুঝতে হবে যে,কোন্আনন্দ বা দঃখের ঘটনা আনন্দিত বা দঃখিত হওযা এক কথা, আর প্রতি বৎসর সেই দিনে আনন্দ বা দঃখ করা বা “আনন্দ দিবস” বা “শোক দিবস”উদযাপন করা সম্পূর্ন অন্য কথা। উভয়ের মধ্যে আসমান জমিন পার্থক্য।
রাসুল্লাহ(সা)-এর জিবনে অনেক আনন্দের দিন বা মূহর্ত এসেছে, যখন তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হযেছেন,শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য আল্লাহর দরবারে সাজদাবনত হয়েছেন। কোনো কোনো ঘটনায় তার পরিবারবর্গ ও সাহাবীগনেরও আনন্দিত হয়েছেন বিভিন্নভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু পরের বছর বা পরবর্তী কোনো সময় সেই দিন বা মূহুর্তকে তারা বাৎসরিক আনন্দ দিবস হিসাবে উৎযাপন করেন নি। এজন্য রাসুল্লাহ(সা) ওর নির্দেশ বা সাহাবীদের কর্ম ছাড়া এইরূপ কোনোদিন বা মুহুর্ত পালন করা বা এগুলিতে বিশেষ ইবাদতকে বিশেষ সওয়াবের কারণ বলে মনে করার কোনো সুযোগ নেই।
খ.আখেরী চাহারা শোম্বার নামায
উপরের আলোচনা থেকে জানতে পারেছি য়ে,সফর মাসের শেষ বুধবার কোনো প্রকার বিশেষশত্ব হাদীস দ্বারা প্রমানিত হয়নি। এই দিনে কোনোরূপ ইবাদত, বন্দেগি, সালাত , যিকির, দোয়া,দান,সদকা ইত্যাদি পালন করলে অন্য কোনো দিনের চেয়ে বেশি বা বিশেষ কোনো স্ওয়াব বা বরকতলাভ করা যাবে বলে ধারনা করা ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা।এজকন্য আল্লামা আব্দুল হাই লাখনবী লিখেছেন য়ে,সফর মাসের শেষ বুধবারে যে বিশেষ নফল সালাত বিশেষ কিছু সুরা বা আয়াত ও দোয়া পাঠের মাধ্যমে আদায় করা হয় তা বানোয়াট ও ভিত্তহীন। (আব্দুল হাই লখনবী,আল-আসার,পৃ১১১)।
২.১১.৩. রবিউল আউয়াল মাস
মহা নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম ও ইন্তিকালের মাস হিসাবে রবিউল আউয়াল মাস মুসলিমে মানষে বিশেষ মর্যদার আসনে অধিষ্টিত।এই মাসের ফযীলত,ও আমল বিষয়ক হাদসে আলোচনা করারয ্আগে আমরা রাসুল্লাহ(সা) এর জন্ম ও ইন্তিকাল সম্পর্কে হাদীস ও ইতিহাসের আলোকে আলোচনা করব।মহান আল্লার কাছে তাওফিক চাই।
প্রথমত,রাসুল্লাহ(সা) এর জন্ম তারিখ
রাসুল্লাহ(সা) এর জন্ম বার,জন্মজ দিন,জন্ম মাস ও জন্ম তারিখ বিষয়ক হাদীসে ও ঐতিহাসিক তথ্যাদি বিস্তারিত আলোড়চনা করেছি ‘এহইযাউস সুনান গ্রন্থে।এখানে সংক্ষেপে কিছু বিষয়ক আলোচনা করছি।
সহীহ হাদীস থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে,রাসুল্লাহ(সা) সোমবার জন্মগ্রহন করেছেন । (সহীহ মুসলিম ২/৮১৯; মুসনাদে আহমদ ৪/১৭২-১৭৩, নং২৫০৬)। হাদীসে নববী থেকে তার জন্ম মাস ও জন্ম তারিখ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।সাহাবীগণের মাঝেও এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ঠ মত প্রচলিত ছিল না। এ কারনে পরবর্তী যুগের আলিম ঐতিহাসিকগণ তার জন্মতারিখ সম্পর্কে মতভেদ করেছেন। এ বিষয়ে ১২ টির ও বেশি মত রযেছে। ইবনে হিশাম,ইবনে সা’দ,ইবনে কাসীর,কাসতালানী ও অন্যান্য ঐতিহাসিক এ বিষয়ে নিম্নলিখিত মতামত উল্লেখ করেছেন:
(১).কারো মতে তাঁর জন্ম তারিখ অজ্ঞাত,তা জানা য়ায় নি এবং তা জানা সম্বব নয়। তিনি সোমবার জন্মগ্রহন করেছেন এতটুকুই জানা যায়,জন্ম মাস বা তারিখ জানা যায় না। এ বিষয়ে কোনো আলোচনা তারা অবান্তর মনে করেন।
(২)কারো কারো মতে তিনি মুহররাম মাসে জন্মগ্রহন করেছেন।
(৩)অন্য মতে তিনি সফর মাসে জন্মগ্রহন করেছেন।
(৪)কারো মতে তিনি রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ জন্মগ্রহন করেন। দ্বীতিয় হিজরি শতকের অন্যতম ঐতিহাসিক মুহাদ্দিস আবু মা’শার নাজীহ বিন আব্দুর রহমান আস- সিনদী (১৭০হি)এই মত গ্রহণ করেছেন।
(৫)অন্য মতে তাঁর জন্মতারিখ রবিউল আউয়াল মাসের ৮ তারিখ। আল্লামা কাসতালানী ও যারকানীর বর্ণনায় এই মতটি ই অধিকাংশ মুহাদ্দিস গ্রহন করেছেন। এই মতটি দুজন সাহাবী ইবনু আব্বাস ও জুবাইর বিন মুতয়িম(রা) তেকে বর্ণিত। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সিরাতের বিশেষজ্ঞ এই মতটি গ্রহন করেছেন বলে তারা উল্লেখ করেছেন। প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম মুহাম্মদ ইবনে মুসলিমইবনে শিহাব যুহরি (১২৫হি)তার উস্তাদ প্রথম শতাব্দির প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও নসববিদ ঐতিহাসিক তাবেয়ী মুহাম্মদ ইবনে মুতায়িম৯১০০হি) থেকে এই মতটি বর্ণনা করছেন।কাসতালানী বলেন:মুহাম্মদ ইবনে জুবাইর আরবদের বংশ পরিচয় ও আরবদের ইতিহাস সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন।রাসুল্লাহ(সা) এর জন্মতারিক সম্পর্কিত এই মতটি তিনি তাঁর পিতা সাহাবী হযরত জুবাইর বিন মুতয়িম(রা) তেকে গ্রহন করেথেন।স্পেনের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ আলী ইবনে আহমদ ইবনে হাযম(৪৫৬হি) ও মুহাম্মদ ইবনে ফাতুহ আল-হুমাইদী(৪৮৮হি) এই মতটি কে গ্রহনযোঘ্য বলে মনে করেচেন।স্পেনের মুহাদ্দিস আল্লামা ইউসূফ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল বার(৪৬৩হি) উল্লেখ করেছেন যে ঐতিহাসিকগণ এই মতটি কে সঠিক বলে মনে করেন।মিলাদের উপর প্রথম গ্রন্থ রচনা কারি আল্লামা আবুল খাত্তাব ইবনে দেহিয়া (৬৩৩ হি) ঈদে মিলাদুন্নবীর লিখিত সর্বপ্রথম গ্রন্থ “আত-তানবীর ফী মাওলিদিল বশির আন নাযীর”-এ এই মতটিকেই গ্রহন করেছেন।
৬.অন্য মতে তাঁর জন্মতারিক ১০ই রবিউল আউয়াল।এই মতটি ইমাম হুসাইনের পৌত্র মুহাম্মদ বিন আলী আল বাকের(১১৪হি) থেকে বর্ণিত।১ম-২য় শতাব্দির প্রখ্যাত মাহাদ্দিস আমির বিন শারাহিল আশ শাবী(১০৪হি)থেকেও এই মতটি বর্ণিত।ঐতিহাসিক মুহাম্মদ বিন উমর আল-ওয়াকিদী(২০৭হি) এই মত গ্রহন করেছেন।ইবনে সা’দ “আত তাবাকাতুল কুবরা”-য়শুধু দুইটা মত উল্লেখ করেছেন,২ তারিখ ও ১০ তারিখ।৬৮৪
(৭) কারো মতে রাসুলুল্লাহ(সা) এর জন্ম তারিখ ১২ই রবিউল আউয়াল।এই মতটি দ্বীতিয় হিজরী শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক(১৫১হি)গ্রহন করেছেন।তিনি বলেছেন:রাসুল্লাহ(সা) হাতির বছরে রবিউল আউয়াল মাসের ১১ তারিখে জন্মগ্রহন করেছেন।৬৮৫ এখানে লক্ষনিয় যে ইবনে ইসহাক সীরাতুন্নবীর সকল তথ্য সাধারনত সনদসহ বর্ননা করেছেন,কিন্তু এই তথ্যটির জন্য কোনো সনদ উল্লে করেননি।কোথা থেকে তিনি এই তথ্যটি গ্রহন করেছেন তাও জানাননি বা সনদ সহ প্রথম শতাব্দির কোনো সাহাবি বা তাবেয়ী থেকে বর্ণনা করেন নি।এ জন্য অনেক গবেষক এই মতটিকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন।৬৮৬ তা সত্তেও পরবর্তী যুগে এই মতটিই প্রসিদ্ধি লাষ করেছেন যে ২জন সাহাবি হযরত জাবির ও হযরত ইবনে আব্বাস থেকে এই মতটি বর্ণিত।
(৮).অন্য মতে রাসুল্লাহ(সা) এর জন্মতারিখ১৭ই রবিউ্রল আউযাল।
(৯).অন্য মতে তাঁর জন্ম তারিখ ২২-শে রবিউ্রল আউযাল।
(১০).অন্য মতে তিনি রবিউ্রস সানী মাসে জন্মগ্রহন করেছেন।
(১১)অন্য মতে তিনি রজব মাসে জন্মগ্রহন করেছেন।
(১২)(১১)অন্য মতে তিনি রমজান মাসে জন্মগ্রহন করেছেন।
তৃতীয় হিজরী শতকের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যুবাইর ইবনে বক্কার (২৫৬হি) থেকে এই মতটিবর্ণিত জুবাইর বিন মুতয়িম(রা) তেকে গ্রহন করেথেন।স্পেনের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ আলী ইবনে আহমদ ইবনে হাযম(৪৫৬হি) ও মুহাম্মদ ইবনে ফাতুহ আল-হুমাইদী(৪৮৮হি) এই মতটি কে গ্রহনযোঘ্য বলে মনে করেচেন।স্পেনের মুহাদ্দিস আল্লামা ইউসূফ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল বার(৪৬৩হি) উল্লেখ করেছেন যে ঐতিহাসিকগণ এই মতটি কে সঠিক বলে মনে করেন।মিলাদের উপর প্রথম গ্রন্থ রচনা কারি আল্লামা আবুল খাত্তাব ইবনে দেহিয়া (৬৩৩ হি) ঈদে মিলাদুন্নবীর লিখিত সর্বপ্রথম গ্রন্থ “আত-তানবীর ফী মাওলিদিল বশির আন নাযীর”-এ এই মতটিকেই গ্রহন করেছেন।
৬.অন্য মতে তাঁর জন্মতারিক ১০ই রবিউল আউয়াল।এই মতটি ইমাম হুসাইনের পৌত্র মুহাম্মদ বিন আলী আল বাকের(১১৪হি) থেকে বর্ণিত।১ম-২য় শতাব্দির প্রখ্যাত মাহাদ্দিস আমির বিন শারাহিল আশ শাবী(১০৪হি)থেকেও এই মতটি বর্ণিত।ঐতিহাসিক মুহাম্মদ বিন উমর আল-ওয়াকিদী(২০৭হি) এই মত গ্রহন করেছেন।ইবনে সা’দ “আত তাবাকাতুল কুবরা”-য়শুধু দুইটা মত উল্লেখ করেছেন,২ তারিখ ও ১০ তারিখ। (ইবনে সাদ,আত-ত্বাকাতুল কুবরা১/৮০-৮১)।
(৭) কারো মতে রাসুলুল্লাহ(সা) এর জন্ম তারিখ ১২ই রবিউল আউয়াল।এই মতটি দ্বীতিয় হিজরী শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক(১৫১হি)গ্রহন করেছেন।তিনি বলেছেন:রাসুল্লাহ(সা) হাতির বছরে রবিউল আউয়াল মাসের ১১ তারিখে জন্মগ্রহন করেছেন। (ইবনে হিসাম,.আস সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ,১/১৮৩)।
এখানে লক্ষনিয় যে ইবনে ইসহাক সীরাতুন্নবীর সকল তথ্য সাধারনত সনদসহ বর্ননা করেছেন,কিন্তু এই তথ্যটির জন্য কোনো সনদ উল্লে করেননি।কোথা থেকে তিনি এই তথ্যটি গ্রহন করেছেন তাও জানাননি বা সনদ সহ প্রথম শতাব্দির কোনো সাহাবি বা তাবেয়ী থেকে বর্ণনা করেন নি।এ জন্য অনেক গবেষক এই মতটিকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। (মাহদী রেজাকুল্লাহ আহমদ,আস সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ,১০৯পৃ.)। তা সত্তেও পরবর্তী যুগে এই মতটিই প্রসিদ্ধি লাষ করেছেন যে ২জন সাহাবি হযরত জাবির ও হযরত ইবনে আব্বাস থেকে এই মতটি বর্ণিত।
(৮).অন্য মতে রাসুল্লাহ(সা) এর জন্মতারিখ ১৭ই রবিউ্রল আউযাল।
(৯).অন্য মতে তাঁর জন্ম তারিখ ২২-শে রবিউ্রল আউযাল।
(১০).অন্য মতে তিনি রবিউ্রস সানী মাসে জন্মগ্রহন করেছেন।
(১১)অন্য মতে তিনি রজব মাসে জন্মগ্রহন করেছেন।
(১২) অন্য মতে তিনি রমজান মাসে জন্মগ্রহন করেছেন।
তৃতীয় হিজরী শতকের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যুবাইর ইবনে বক্কার (২৫৬হি) থেকে এই মতটিবর্ণিত।তার মতের পক্ষে যুক্তি হলো যে,রাসুল্লাহ(সা)সর্বসম্মতভাবে রমজান মাসে নবুয্যাত পেয়েছেন।তিনি ।তিনি ৪০ বৎসর পূর্তিতে নবুয়্যাত পেয়েছেন।তাহলে তার জন্ম অবশ্যই রমজান মাসে।এছাড়া কোনো কোনো হাদীসে বর্ণিত আছে যে,রাসুলল্লাহ(সা) হজ্বের পবিত্র দিনগুলোতে মাতৃগর্ভে আসেন।সেক্ষেত্রে ও তার জন্ম রমজানে ই হওয়া উচিত।এ মতের সমর্তনে হজরত আব্দুল্লাহ বিন উমর(রা)থেকে একটি বর্ণনা আছে বলে উল্লেখ করেন। (ইবনে সাদ,আত-ত্বাকাতুল কুবরা১/১০০-১০১,ইবনে কাসীর,আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/২১৫,.আল কাসতালানী,আহমদ বিন ,মুহাম্মদ,আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা ১/৭৪-৭৫,আল-যারকানী ,শারহূল মাওয়াহীব আল-লাদুন্নীয়া১/২৪৫/২৪৮,ইবনে রাজাব,লাতায়েফূল মায়ারেফ,প্রগুক্ত ১/১৫০)।
দ্বীতিয়ত,রাসুলুল্লাহ(সা) এর ওফাত দিবস
বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় যে , রাসুলল্লাহ(সা) সোমবার ইন্তিকালের করেন। (বুখারী আস সহীহ ১/২৬২,৪/১৬১৬;মুসলিম,আস-সহীহ১/৩১৫;আবূ নুআইম ইসপাহানি,আল মুসনাদ আল-মুসতাখরাজ আলা সহীহ মুসলিম ২/৪৩-৪৪)।
কিন্তু এই সোমবারটি কোন মাসের কোন তারিখ ছিল তা কোনো হাদীসে নাই। রামাদান মাসের ১১ তারিখে ইন্তিকাল করেন। (ইবনু হাজার,ফাতাহতুল বারী ৮/১২৯০)।
এই একক বর্ননাটি ছালা মুসলিম উম্মহর সকল। ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিস একমত যে রাসুলল্লাহ(সা) রবিউল আউয়াল মাসে ইন্তিকাল করেন। কিন্তু কোন তারিখে ইন্তিকাল করেছেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে ।
বুখারী ও মুসলিম সংকলিত হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে,রাসুলুল্লাহ(সা) এর বদদায় হজ্জের ৯ই যিলহাজ্জ আরাফায় অবস্থানের দিনটি ছিল শুক্রবার। (বুখারী১/২৫,৪/১৬০০,১৬৮৩,৬/২৬৫৩;মুসলিম,৪/২৩১২-২৩১৩)। এ থেকে আমরা জানতে পারি যে সে বছর ছিল যিলহাজ্জ মাসের ১ তারিখ ছিল বৃহস্পতিবার। আমরা জানি যে,বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে তিনি যিলহাজ্জ মাসের বাকি দিনগুলি এবং মুহর্রাম ও সফর মাস মদিনায় অবস্থান করেন এবং রবিউল আউয়াল মাসে ইন্তিকাল করেন । কোনো কোনো ঐতিহাসিক লিখেন যে তিনি বিদায় হজ্জের এই দিনের পরে ৮০ বা ৮১ দিন জীবিত ছিলেন। এরপর রবিউল আউয়াল মাসের শুরুতে তিনি ইন্তিকাল করেন। (ইবনু হাজার,ফাতাহতুল বারী ৮/১৩০)।
ইন্তিকালের তারিখ সম্পর্কে দ্বিতিয় হিজরীর তাবেয়ী ঐতিহাসিকগণ এবং পরবর্তী ঐতিহাসিকগণের ৪টি মত রয়েছে:১লা রবিউ্ল আউয়াল,২রা রবিউল আউয়াল,১২ইরবিউ্ল আউয়াল ও ১৩রবিউ্ল আউয়াল। (ইবনু হাজার,ফাতাহতুল বারী ৮/১২৯)।
সাধারন ভাবে পরবর্তীকালে ১২ তারিখের মতটিই প্রসিদ্ধ রাভ করে। কিন্তু এখন একটি কঠিন সমস্যা রয়েছে। আমরা জানি যে,আরবি মাস ৩০ বা ২৯ দিনে হয় এবং সাধারণত পরপর ৩টি মাস ২৯ বা ৩০ দিন হয না। উপরের হাদিস থেকে লক্ষ আমরা জেনেছি য়ে,যিলহজ্জ মাস শুরু হয়েছিল বৃহস্পতিবার। আর বৃহস্পতিবার ১লা যিলহজ্জ কোনো ভাবেই হতে পারে না। যিলহজ্জ,মহর্রম,সফর তিনটি মাসই ৩০ দিনে ধরলে ১ লা রবিউল আউয়াল হয় বুধবার।দুইটা ৩০ একটি ২৯ ধরলে ১লা রবিউল আউয়াল হয় মঙ্গলবার।দুইটা ২৯ একটি ৩০ ধরলে ১লা রবিউল আউয়াল হয় সোমবার আর তিন মাসই ২৯ দিনে ধরলে ১লা রবিউল আউয়াল হয় রবিবার। আর কোনো হিসাবেই ১২ তারিখ সোমবার হয় না।এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য কেউ কেউ ১৩ তারিখের কথা বলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন তিনটি মাস ই ৩০ দিনে ছিল এবং মদিনার একদিন পরে চাঁদ দেখা গিয়েছিল। দুটিই ব্যাখ্যাই দূরবর্তী।(ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৮/১২৯-১৩০)।
দ্বিতিয় হিজরীর শতকের প্রখ্যাত তাবেয়ী ঐতিহাসিক আল্লামা সুলাইমান ইবনে তারখান আত-তাইমী(৪৬-১৪৩হি) বলেন রাসুল্লাহ(সা) এর অসুস্ততা শুরু হয় ২২ সফর শনিবার।১০ দিন অসুস্ততা থাকার পর ২রা রবিউল আউয়াল সোমবার তিনি ইন্তিকাল করেন।(ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৮/১২৯)।
তাঁর এই মত অনুসারে সে বৎসরের যিলহাজ্জ,মুহর্রাম ও সফর তিনটি মাস ই ২৯ দিনে ছিল,যা সাধারনত খুব কম ঘটে।এ জন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক ও গবেষক ১ লা রবিউল আউয়ালের মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে আল্লামা সুহাইলী, ইবনু হাজার প্রমুখ গবেষক, মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক ২ তারিখের মতটিকেই গ্রহন করেছেন। তিনটি কারণে তাঁরা এই মতটি গ্রহণ করেছেন। প্রথমত, তাবেয়ীগণের যুগ হতে সহীহ সনদে কথাটি পাওয়া যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এই মতটি বিদায় হজ্জের পরে তাঁর ৮০ দিন বা ৮১ দিন জীবিত থাকার বর্ণনাটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তৃতীয়ত, যারা ১২ বলেছেন তাদের কথার একটি দুরবর্তী ব্যাখ্যা দেওয়া যায় যে, আরবীতে ‘মাসের দুইকে’ ‘দশের দুই’ পড়ার একটি সম্ভাবনা থাকে। কেউ হয়তো ২ কে ১৩ পড়েছিলেন ও লিখেছিলেন এবং অন্যরা তাকে অনুসরণ করেছে।(ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৮/১২৯-১৩০)।
তৃতীয়ত, হাদীসের আলোকে রবিউল আউয়াল মাসের ফযীলত
উপরের আলোচনা হতে আমরা জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ(সা) এর জন্ম বা ওফাতের মাস হিসেবে রবিউল আউয়াল মাসের কোনো উল্লেখ হাদীস শরীফে নেই। এই মাসের কোনো বিশেষ ফযীলত বা বিশেষ আমল কোনো কিছুই হাদীসে বর্ণিত হয় নি।
এ বিষয়ক মিথ্যা গল্প কাহিনীর মধ্যে রয়েছে, “এই মাসের ১২ তারিখ বুযুর্গ তাবেয়ীগণ হযরত মুহাম্মাদ(সা) এর রূহের মাগফিরাতের জন্য ২০ রাকা’য়াত নফল নামায পড়িতেন। এই নামায দুই রাকা’য়াতের নিয়মে আদায় করিতেন এবং প্রত্যেক রাকা’য়াতে সূরা ফাতিহার পরে ১১ বার করিয়া সূরা ইখলাস পড়িতেন। নামায শেষে আল্লাহর হাবীবের প্রতি সাওয়াব রেছানী করিতেন। তাহারা ইহার বরকতে খাবের মাধ্যমে হযরত রাসূলুল্লাহ(সা)কে দর্শন লাভ করিতেন এবং দোজাহানের খায়ের ও বরকত লাভ করিতেন। অন্য রেওয়ায়াতে বর্ণিত আছে যে, কোনো মু’মিন ব্যক্তি নিম্নের দুরূদ শরীফ এই মাসের যে কোনো তারিখে এশার নামাযের পরে ১১২৫ বার পাঠ করিলে আল্লাহর রহমতে সে ব্যক্তি হযরত নবী করীম(সা)কে স্বপ্নে দর্শন লাভ করিবে।…….”(মুফতী হাবিব ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, পৃ. ১৬-১৭)।
এইরূপ আরো অনেক ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা প্রচলিত বিভিন্ন পুস্তকে দেখা যায়।(অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃ. ৩০১, ৩০২)। এগুলি সবই বানোয়াট কথা। রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের পরবর্তী তিন যুগ, সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের মধ্যে এই মাসটির কোনো পরিচিতিই ছিল না। এ্ই মাসটি যে রাসূলুল্লাহ(সা) এর জন্ম মাস সেই কথাটিই তখনো প্রসিদ্ধি লাভ করে নি।
৪০০ হিজরীর দিকে সর্বপ্রথম মিশরের ফাতেমীয় শিয়া শাসকগণ এই মাসে ‘মিলাদ’ বা রাসূলুল্লাহ(সা) এর জন্ম দিবস পালন করে। ৬০০ হিজরীতে ইরাকের ইরবিল শহরে ৮ ও ১২ ই রবিউল আউয়াল মীলাদ বা মীলাদুন্নবী বা রাসূলুল্লাহ(সা) এর জন্ম উদযাপন শুরু হয়। অপরদিকে ভারত ও অন্যান্য দেশে ১২ই রবিউল আউয়ালে রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকাল উপলক্ষ্যে ‘ফাতেহা’ বা ‘ফাতেহায়ে দোয়াজদহম’ উদযাপন শুরু হয়। এ বিষয়ক সকল তথ্য বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে ‘এহইয়াউস সুনান’ গ্রন্থে।
২.১১.৪. রবিউস সানী মাস
রবিউস সানী বা রবিউল আউয়াল মাসের কোনোরূপ বৈশিষ্ট্য, ফযীলত বা এই মাসের কোনো বিশেষ সালাত, সিয়াম, দোয়া, যিকর বা বিশেষ কোনো আমল হাদীস শরীফে বর্ণিত হয় নি।
রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের প্রায় সাড়ে পাঁচশত বৎসর পরে, ৫৬১ হিজরীর রবিউস সানী মাসের ১০ তারিখে হযরত আব্দুল কাদের জীলানী(রাহ) ইন্তিকাল করেন। আমাদের দেশে অনেকে এই উপলক্ষ্যে ১১ই রবিউস সানী গেয়ারভী শরীফ বা ফাতেয়াহে ইয়াজদহম পালন করেন।
স্বভাবতই এর সাথে হাদীসের কোন সম্পর্কই নেই। এমনকি জন্ম বা মৃত্যু উদযাপন করা বা জন্ম তারিখ বা মৃত্যু তারিখ উপলক্ষ্যে দোয়া খায়ের বা সাওয়াব রেসানী করার কোন নির্দেশনা, প্রচলন বা উৎসাহ কোন হাদীসে নেই। রাসূলুল্লাহ(সা) এর জীবদ্দশায় তাঁর অনেক মেয়ে, ছেলে, চাচা, চাচাতো ভাই, দুধ ভাই ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম ওলী সাহাবীগণ ইন্তিকাল করেছেন। তিনি কখনো কারো মৃত্যুর পরের বৎসরে, বা পরবর্তী কোন সময়ে মৃত্যুর দিনে বা অন্য কোন সময়ে কোন ফাতেহা বা কোন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন নি।
রাসূলুল্লাহ(সা) এর ইন্তিকালের পরে তাঁর কন্যা ফাতিমা, জামাতা আলী, দৌহিত্র হাসান-হুসাইন, উম্মুল মোমিনীনগণ, খলিফায়ে রাশীদগণ, অন্যান্য সাহাবীগণ, তাবেয়ী-তাবি-তাবেয়ীগণ কেউ কখনো তাঁর ইন্তিকালের দিনে বা অন্য কোন সময়ে কোনরূপ ফাতিহা, দোয়া বা কোন অনুষ্ঠান করেন নি।
রবিউস সানী মাসের ফযীলত, আমল ইত্যাদি নামে যা কিছু প্রচলিত রয়েছে সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। যেমনঃ রবিউস সানী মাসের প্রথম তারিখে রাত্রিবেলা চার রাকা’য়াত নফল নামায আদায় করিতে হয়। উহার প্রতি রাকা’য়াতে সূরা ফাতিহার পরে সূরা ইখলাছ পড়িতে হয়। এই নামায আদায়কারীর আমলনামায় ৯০ হাজার বৎসরের সাওয়াব লিখা হইবে এবং ৯০ হাজার বৎসরের গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হইবে।(মুফতী হাবিব ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, পৃ. ১৭-১৮)। এইরূপ আরো অনেক আজগুবী মিথ্যা কথা প্রচলিত বিভিন্ন পুস্তকে দেখা যায়। (মুফতী হাবিব ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, পৃ. ১৭-১৮, অধ্যাপিকা দুলাল, নেক কানুন, পৃ. ৩০২)।
২.১১.৫. জমাদিউল আউয়াল মাস
জমাদিউল আউয়াল মাসের কোনোরূপ বৈশিষ্ট্য, ফযীলত বা এই মাসের কোনো বিশেষ সালাত, সিয়াম, দোয়া, যিকর বা বিশেষ কোনো আমল হাদীস শরীফে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। যেমনঃ “রাসূলে করীম(সা) এর সাহাবীগণ এই মাসের প্রথম তারিখে দুই রাকায়াতের নিয়্যতে মোট বিশ রাকায়াত নামায আদায় করিতেন এবং ইহার প্রত্যেক রাকায়াতে সূরা ফাতিহার পরে একবার করিয়া সূরা ইখলাস পাঠ করিতেন। নামাযের পরে নিম্নের দুরূদ শরীফ ১০০ বার পাঠ করিতেন। এই নামাযীর আমলনামায় অসংখ্য নেকী লিখা হইবে এবং তাহার সমস্ত নেক নিয়ত পূর্ণ করা হইবে।….কোনো ব্যক্তি এই মাসের প্রথম তারিখে দিনের বেলা দুই রাকায়াতের নিয়্যতে মোট ৮ রাকায়াত নামায আদায় করিলে এবং প্রতি রাকায়াতে সূরা ইখলাস ১১ বার পাঠ করিলে……।”(মুফতী হাবিব ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, পৃ. ১৮, অধ্যাপিকা দুলাল, নেক কানুন, পৃ. ৩০৩)। এই জাতীয় অনেক আজগুবি, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা আমাদের দেশে প্রচলিত ‘বার চাঁদের ফযীলত’ ও এই ধরনের পুস্তকাদিতে পাওয়া যায়।
২.১১.৬. জমাদিউস সানী মাস
জমাদিউস সানী বা জমাদিউল আখের (জুমাদা আল আখেরা)মাসের কোনোরূপ বৈশিষ্ট্য, ফযীলত বা এই মাসের কোনো বিশেষ সালাত, সিয়াম, দোয়া, যিকর বা বিশেষ কোনো আমল হাদীস শরীফে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। যেমনঃ জমাদিউস সানী মাসের পহেলা তারিখে হযরত আবূ বকর সিদ্দিক(রা) ও অন্যান্য সাহাবীগণ দুই রাকায়াতের নিয়্যতে মোট ১২ রাকায়াত নামায আদায় করিতেন। ইহার প্রত্যেক রাকায়াতে সূরা ফাতিহার পরে ১১ বার করিয়া সূরা ইখলাস পড়িতেন। আবার কেহ কেহ সূরা ইখলাসের পরে তিনবার করিয়া আয়াতুল কুরসী পাঠ করিতেন। এই নামাযে অসংখ্য নেকী লাভ হয়।………(মুফতী হাবিব ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, পৃ. ১৮-১৯, অধ্যাপিকা দুলাল, নেক কানুন, পৃ. ৩০৩)। এ সবই ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা।
২.১১.৭. রজব মাস
রজব মাসকে নিয়ে যত বেশি মিথ্যা হাদীস তৈরি করা হয়েছে, তত বেশি আর কোন মাসকে নিয়ে করা হয় নি। সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউল সানী, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানী এই ৫ মাসের ফযীলত বা খাস ইবাদত বিষয়ক যা কিছু বানোয়াট কথাবার্তা তা মূলত গত কয়েক শত বৎসর যাবত ভারতীয় উপমহাদেশেই প্রচলিত হয়েছে। ৫ম/৬ষ্ঠ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত মাউযূ হাদীস বা ফযীলতের বইগুলিতেও এ সকল মাসের উল্লেখ পাওয়া যায় না। এ সকল যুগে যে সকল নেককার সরলপ্রাণ বুযুর্গ ফযীলত ও আমলের বিষয়ে সত্য-মিথ্যা সকল কথাই জমা করে লিখতেন তাদের বই পুস্তকেও এই মাসগুলির কোনো প্রকারের উল্লেখ নেই। তাঁরা মূলত রজব মাস দিয়েই তাদের আলোচনা শুরু করতেন এবং মুহাররাম মাস দিয়ে শেষ করতেন।
আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, রজব মাস ইসলামী শরীয়তের ‘হারাম’ অর্থাৎ নিষিদ্ধ বা সম্মানিত মাসগুলির অন্যতম। জাহিলী যুগ থেকেই আরবরা ‘ইবরাহীম(আ) এর শরীয়ত’ অনুসারে এই মাসগুলির সম্মান করত। তবে ক্রমান্বয়ে তাদের মধ্যে অনেক কুসংস্কার ও রসম রেওয়াজ প্রবেশ করে। জাহিলী যুগে আরবরা এই মাসকে বিশেষভাবে সম্মান করত। এই মাসে তারা আতীরাহ নামক এক প্রকার কুরবানী করতো এবং উৎসব করতো। হাদীস শরীফে তা নিষেধ করা হয়েছে।(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২০৮৩; মুসলিম আস সহীহ, ৩/১৫৬৪)।
‘হারাম’ মাস হিসেবে সাধারণ মর্যাদা ছাড়া ‘রজব’ মাসের মর্যাদায় কোনো সহীহ হাদীসে কিছু উল্লেখ করা হয় নি। এই মাসের কোনোরূপ মর্যাদা, এই মাসের কোনো দিনে বা রাতে কোনো বিশেষ সালাত, সিয়াম, যিকর, দোয়া, তিলাওয়াত বা কোনো বিশেষ ইবাদতের কোনো বিশেষ ফযীলত আছে এই মর্মে রাসূলুল্লাহ(সা) থেকে কোনোরূপ কোনো হাদীস সহীহ বা গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি। পরবর্তী যুগের তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীগণ হতে কিছু কথা পাওয়া যায়। কিন্তু এ বিষযে অনেক জাল ও বানোয়াট কথা প্রচলিত রয়েছে। যেহেতু আমাদের দেশে সাধারণভাবে ২৭শে রজব ছাড়া অন্য কোনো দিবস বা রাত্রিকেন্দ্রিক জাল হাদীসগুলি তেমন প্রসিদ্ধ নয়, সেহেতু ২৭শে রজবের বিষয়ে কিছু বিস্তারিত আলোচনা এবং বাকি বিষয়গুলি সংক্ষেপে আলোচনার ইচ্ছা করছি। মহান আল্লাহর দরবারে তাওফীক প্রার্থনা করছি।
প্রথমত, সাধারণভাবে রজব মাসের মর্যাদা
সাধারণভাবে রজব মাসের মর্যাদা, এই মাসে কী কী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে এবং এই মাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যে কোনো সময়ে বা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকারের সালাত, সিয়াম, দান, দোয়া ইত্যাদি ইবাদত করলে কী অকল্পনীয় সাওয়াব বা পুরস্কার পাওয়া যাবে তার বর্ণনায় অনেক জাল হাদীস বানানো হয়েছে। আমাদের দেশের প্রচলিত ‘বার চাঁদের ফযীলত’ ও আমল-ওযীফা বিষয়ক বইগুলিতে এগুলির সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়।
যেমন, অন্য মাসের উপর রজবের মর্যাদা তেমনি, যেমন সাধারণ মানুষের কথার উপরে কুরআনের মর্যাদা……..। এই মাসে নূহ(আ) ও তাঁর সহযাত্রীগণ নৌকায় আরোহন করেন….। এই মাসেই নৌকা পানিতে ভেসেছিল….। এ মাসেই রক্ষা পেয়েছিল। এ মাসেই আদমের তাওবা কবুল হয়। এ মাসেই ইবরাহীম(আ) ও ঈসা(আ) এর জন্ম। এ মাসেই মূসার জন্য সমুদ্র দ্বিখন্ডিত হয়। ……এই মাসের প্রথম তারিখে রাসূলুল্লাহ(সা) এর জন্ম। এই মাসের ২৭ তারিখে তিনি নব্যুয়ত প্রাপ্ত হন। …এই মাসের ২৭ তারিখে তিনি মেরাজ গমন করেন। …..এই মাসে সালাত, সিয়াম, দান, সদকা, যিকর, দুরূদ, দোয়া ইত্যাদি নেক আমল করলে তার সাওয়াব বৃদ্ধি পায় বা বহুগুণ বেড়ে যায়….।ইত্যাদি সবই ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা ও জাল হাদীস। পূর্ববর্তী অনেক বুযুর্গের আমল ওযীফা ও ফাযাইল বিষয়ক গ্রন্থে এগুলির সমাবেশ ঘটেছে। তবে আমাদের সমাজের সাধারণ ধার্মিক মুসলমানদের মাঝে এগুলির প্রচলন কম। এ জন্য এগুলির বিস্তারিত আলোচনা বর্জন করছি।
দ্বিতীয়ত, রজব মাসের সালাত
রজব মাসে সাধারণভাবে এবং রজব মাসের ১ তারিখ, ১ম শুক্রবার, ৩, ৪, ৫ তারিখ, ১৫ তারিখ, ২৭ তারিখ, শেষ দিনে বা অন্যান্য বিশেষ দিনে বা রাতে বিশেষ সালাত আদায়ের বিশেষ পদ্ধতি ও সেগুলির অভাবনীয় পুরস্কারের ফিরিস্তি দিয়ে অনেক জাল হাদীস প্রচারিত হয়েছে।পূর্ববর্তী অনেক বুযুর্গের আমল ওযীফা ও ফাযাইল বিষয়ক পুস্তাকাদিতে এবং আমাদের দেশে বার চাঁদের ফযীলত, আমল-ওযীফা ও অন্যান্য পুস্তকে এগুলির কিছু কথা পাওয়া যায়। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এগুলির প্রচলন কম। এজন্য এগুলির বিস্তারিত আলোচনা করছি না। মুহাদ্দিসগণ এক্ষেত্রে যে মূলনীতি উল্লেখ করেছেন তা বলেই শেষ করছি।
আল্লামা ইবনু রাজাব, ইবনু হাজার আসকালানী, সুয়ূতী, মোল্লা আলী কারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস একবাক্যে বলেছেন, রজব মাসে বিশেষ কোন সালাত বা রজব মাসের কোন দিনে বা রাতে কোন সময়ে কোন সালাত আদায় করলে বিশেষ সাওয়াব পাওয়া যাবে এই মর্মে একটি হাদীসও কোন গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বাতিল ও বানোয়াট। (ইবনু রাজাব, লাতাইফ ১/১৯৪; ইবনু হাজার আসকালানী, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৯-৮০; আব্দুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ৫৮-৯০)।
তৃতীয়ত, রজব মাসের দান, যিকর ইত্যাদি
রজব মাসের যিকর, দান, দোয়া, দুরূদ ইত্যাদি নেক আমলের বিষয়েও একই কথা। রজব মাসে এ সকল নেক আমল করলে বিশেষ কোন সাওয়াব হবে বা সাধারণ সাওয়াব বৃদ্ধি পাবে এই মর্মে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সবই বাতিল ও ভিত্তিহীন। (ইবনু রাজাব, লাতাইফ ১/১৯৭; ইবনু হাজার আসকালানী, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৯-৮০; আব্দুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ৫৮-৯০)।
চতুর্থত, রজব মাসের সিয়াম
সবচেয়ে বেশি জাল হাদীস প্রচার হয়েছে রজব মাসের সিয়াম পালন বিষয়ে। বিভিন্নভাবে এই মাসে সিয়াম পালনের উৎসাহ দিয়ে জালিয়াতগণ হাদীস জাল করেছে। কোন কোন জাল হাদীসে সাধারণভাবে রজব মাসে সিয়াম পালন করলে কত অভাবনীয় সাওয়াব তা বলা হয়েছে। কোনটিতে রজব মাসের নির্ধারিত কিছু দিনের সিয়াম পালনের বিভিন্ন বানোয়াট সাওয়াব পালনের কথা বলা হয়েছে। কোনটিতে রজব মাসের ১ টি সিয়াম পালনের কি সাওয়াব, ২ টি সিয়ামের কি সাওয়াব, ৩টির কি সাওয়াব….৩০ টি সিয়ামের কত সাওয়াব তা বলা হয়েছে। মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন যে, রজব মাসের সিয়াম পালনের বিশেষ সাওয়াব বা রজব মাসের বিশেষ কোন দিনে সিয়াম পালনের উৎসাহ জ্ঞাপক সকল হাদীসই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে কোন কথাই নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি।
পঞ্জমত, লাইলাতুল রাগাইব
রজব মাস বিষয়ক জাল হাদীসের অন্যতম হলো লাইলাতুল রাগাইব ও সেই রাত্রির বিশেষ সালাত বিষয়ক জাল হাদীস। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই রাত্রির নামকরণ, ফযীলত, এই রাত্রির সালাতের ফযীলত, রাক’আত সংখ্যা, সূরা কিারয়াত , পদ্ধতি সবকিছুই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা। কিন্তু বিষয়টি অনেক মুসলিম দেশে ব্যাপক প্রচার লাভ করেছে।
প্রথমত কিছু জালিয়াত এ রাত্রির নামকরণ ও এ বিষয়ক কিছু আজগুবি গল্প বানায়। ক্রমান্বয়ে বিষয়টি আকর্ষণীয় ওয়াযে পরিণত হয়। জাল হাদীসের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা সাধারণ মানুষের চিত্তাকর্ষক হয় এবং কোন একটি জাল হাদীস একবার বাজার পেলে তখন অন্যান্য জালিয়াতও বিভিন্ন সনদে তা বানিয়ে বলতে থাকে। এভাবে অনেক জাল হাদীস সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। সালাতুল রাগাইব বিষয়ক হাদীসগুলিও সেইরূপ। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পরে এই জাল হাদীসগুলি প্রচার ও প্রসিদ্ধি লাভ করলে সাধারণ মুসল্লীগণ উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে অনেক দেশে ঘটা করে লাইলাতুল রাগাইব পালন করতে শুরু করেন। এ সকল সমাজে ‘লাইলাতুল রাগাইব’ আমাদের দেশের ‘লাইলাতুল বরাত’ এর মতই উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়।
এ বানোয়াট সালাতটি আমাদের দেশে অতটা প্রসিদ্ধি লাভ করে নি। এজন্য এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি না। এর সার সংক্ষেপ হলো, রজব মাসের প্রথম শুক্রবারের রাত্রি হলো ‘লাইলাতুল রাগাইব’ বা আশা আকাঙ্খা পূরণের রাত। রজবের প্রথম বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করে, বৃহস্পতিবারের দিবাগত শুক্রবারের রাত্রিতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে ১২ রাক’য়াত সালাত নির্ধারিত সূরা, আয়াত ও দোয়া দুরূদ দিয়ে আদায় করবে। …..তাহলে এই ব্যক্তি এত এত……পুরস্কার লাভ করবে।…….এর সাথে আরো অনেক কল্প কাহিনী যোগ করা হয়েছে এ সকল জাল হাদীসে।
এ সকল হাদীসের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে মুহাদ্দিসগণ সেগুলির সূত্র ও উৎস নিরীক্ষা করে এর জালিয়াতির বিষয় নিশ্চিত করেছেন। মুসলিম উম্মাহর সকল মুহাদ্দিস একমত যে, ‘লাইলাতুল রাগাইব’ ও ‘সালাতুল রাগাইব’ বিষয়ক সকল কথা মিথ্যা, জাল ও বানোয়াট।
ষষ্ঠত, রজব মাসের ২৭ তারিখ
বর্তমানে আমাদের সমাজে ২৭ শে রজব মিরাজের রাত বলেই প্রসিদ্ধ। সেই হিসেবেই আমাদের দেশের মুসলিমগণ এই রাতটি পালন করে থাকেন। কিন্তু এই প্রসিদ্ধির আগেও রজব মাসের ২৭ তারিখ বিষয়ক আরো অনেক কথা প্রচলিত হয়েছিল এবং এই তারিখের দিবসে ও রাতে ইবাদত বন্দেগীর বিষয়ে অনেক জাল কথা প্রচলিত হয়েছিল। প্রথমে আমরা ‘লাইলাতুল মিরাজ’ সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। এরপর এই দিন সম্পর্কে প্রচলিত জাল ও বানোয়াট হাদীসগুলি আলোচনা করব, ইনশাল্লাহ।
ক. লাইলাতুল মিরাজ
ইসরা ও মিরাজের ঘটনা বিভিন্নভাবে কুরআন কারীমে ও অনেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে প্রায় অর্ধশহ সাহাবী থেকে মিরাজের ঘটনার বিভিন্ন দিক ছোট বা বড় আকারে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোনো হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে মিরাজের তারিখ সম্পর্কে একটি কথাও বর্ণিত হয় নি। সাহাবীগণ তাঁকে কখনো তারিখ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন বলেও জানা যায় না। পরবর্তী যুগের তাবেয়ীদেরও একই অবস্থা; তাঁরা এ সকল হাদীস সাহাবাদের কাছে শিখেছেন, কিন্তু তাঁরা তারিখ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন না। কারণ, তাঁদের কাছে তারিখের বিষয়টির কোনো মূল্য ছিল না, এ সকল হাদীসের শিক্ষা গ্রহণই তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল। ফলে তারিখের বিষয়ে পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা যায়। মি‘রাজ একবার না একাধিকবার হয়েছে, কোন বৎসর হয়েছে, কোন মাসে হয়েছে, কোন তারিখে হয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে অনেক মতবিরোধ রয়েছে এবং প্রায় ২০টি মত রয়েছে।
মাসের ক্ষেত্রে অনেকেই বলেছেন রবিউল আউয়াল মাসের ২৭ তারিখ। কেউ বলছেন রবউস সানী মাসে, কেউ বলছেন রজব মাসে, কেউ বলছেন রমজান মাসে, কেউ বলছেন শাওয়াল মাসে, কেউ বলেছেন যিলকদ মাসে, কেউ বলেছেন যিলহাজ্জ্ব মাসে। তারিখের বিষয়ে আরো অনেক মতবিরোধ আছে।
দ্বিতীয় হিজরী শতক হতে তাবেয়ী ঐতিহাসিকগণ মিরাজের ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে আলোচনা করেছেন। কিন্তু তাঁরা কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন নি। পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ মি‘রাজের তারিখ বিষয়ক মতভেদ ও কারণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইবনু কাসীর(৭৭৪ হি), ইবনু হাজার আসকালানী(৮৫২ হি), আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল কাসতালানী(৯২৩ হি), মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ আশ শামী(৯৪২ হি), আব্দুল হাই লাখনাবী(১৩০৪ হি) ও অন্যান্যরা এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন।
এত মতবিরোধের কারণ হলো হাদীস শরীফে এ বিষয়ে কিছুই বলা হয় নি এবং সাহাবীগণও কিছু বলেন নি। তাবে-তাবেয়ীদের যুগে তারিখ নিয়ে কথা শুরু হয়, কিন্তু কেউই সঠিক সমাধান দিতে না পারায় তাঁদের যুগ ও পরবর্তী যুগে এত মতবিরোধ হয়। এই মতবিরোধ হতে আমরা বুঝতে পারি যে, কয়েক শতক আগেও শবে মেরাজ বলতে কোনো নির্দিষ্ট রাত ছিল না।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, রজব মাসের ২৭ তারিখে মি‘রাজ হয়েছিল, বা এই তারিখটি ‘লাইলাতুল মি‘রাজ’, এ্ই কথাটি তাবেয়ী ও পরবর্তী যুগের ঐতিহাসিকদের অনেক মতের একটি মত মাত্র। এই কথাটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। রাসূলুল্লাহ(সা) হতে এই তারিখে মি‘রাজ হওয়া সম্পর্কে কোনো কিছুই সহীহ বা যয়ীফ সনদে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই ঐতিহাসিকদের মতামত বা বানোয়াট কথাবার্তা।
আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করছি যে, কোনো কোনো জাল হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, রজব মাসের ২৭ তারিখে রাসূলুল্লাহ(সা) জন্মগ্রহণ করেন, নবুয়ত লাভ করেন……….ইত্যাদি। এগুলিও বাতিল ও মিথ্যা কথা।
খ. ২৭শে রজবের ইবাদত
মি‘রাজের রাত্রিতে ইবাদত বন্দেগী করলে বিশেষ কোনো সাওয়াব হবে এই বিষয়ে একটি সহীহ ও যয়ীফ হাদীসও নেই। মি‘রাজের রাত কোনটি তাই হাদীসে বলা হয় নি, সেখানে রাত পালনের কথা কিভাবে আসে। তবে ২৭ শে রজবের দিনে এবং রাতে ইবাদত বন্দেগীর ফযীলতের বিষযে কিছু জাল হাদীস প্রচলিত আছে। এ সকল জাল হাদীসে মি‘রাজের রাত হিসেবে নয় বরং রাসূলুল্লাহ(সা) এর নবুয়্যত প্রাপ্তির দিন হিসেবে বা একটি ফযীলতের দিন হিসেবে ‘২৭শে রজব’-কে বিশেষ মর্যাদাময় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইরূপ একটি জাল হাদীসে বলা হয়েছেঃ “রজব মাসের মধ্যে একটি দিন আছে, কেউ যদি এই দিনে সিয়াম পালন করে এবং সেই দিনের রাতে দাঁড়িয়ে (সালাতে ইবাদত রত) থাকে তাহলে সে ১০০ বৎসর সিয়াম পালন করার ও রাত জেগে সালাত আদায়ের সাওয়াব লাভ করবে। সেই দিনটি হলো রজব মাসের ২৭ তারিখ। এই দিনেই মুহাম্মাদ(সা) নুবয়ত লাভ করেন, এই দিনেই সর্বপ্রথম জিবরাঈল মুহাম্মাদ (সা) এর উপর অবতরণ করেন।”(জোযকোনী, আল আবাতিল, ২/৭১৪; সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ১১৭)।
অন্য একটি জাল হাদীসের ভাষা নিম্নরূপঃ যদি কেউ রজব মাসের ২৭ তারিখে ১২ রাকায়াত সালাত আদায় করে, প্রত্যেক রাকায়াতে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পাঠ করে, সালাত শেষ হলে সে বসা অবস্থাতেই ৭ বার সূরা ফাতিহা পাঠ করে এবং এরপর ৪ বার ‘সুবহানাল্লাহ, ওয়ালহামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লা হাওলা ওয়ালা কুওআতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যূল আজিম’ বলে, অতঃপর সকালে সিয়াম শুরু করে, তবে আল্লাহ তার ৬০ বৎসরের পাপরাশি মাফ করে দিবেন। এই রাতেই মুহাম্মাদ(সা)নবুয়ত পেয়েছিলেন।” (ইবনু হাজার, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৫২)।
“রজব মাসের ২৭ তারিখ আমি নবুয়ত পেয়েছি। কাজেই যে ব্যক্তি এই দিনে সিয়াম পালন করবে তার ৬০ মাসের গোনাহের কাফফারা হবে।”(ইবনু হাজার, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৬৪)।
আরেকটি জাল হাদীসে বলা হয়েছে, ইবনু আব্বাস ২৭ শে রজবের সকাল হতে ইতিকাফ শুরু করতেন। যোহর পর্যন্ত সালাতে রত থাকতেন। যোহরের পরে অমুক অমুক সূরা দিয়ে চার রাকায়াত সালাত আদায় করতেন…… এবং আসর পর্যন্ত দোয়ায় রত থাকতেন…..। তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ(সা) এরূপ করতেন।”(আব্দুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ৭৮)। এগুলি সবই জঘন্য মিথ্যা কথা।
২৭ শে রজবের ফযীলতে এবং এই দিনে ও রাতে সালাত, সিয়াম, দোয়া ইত্যাদি ইবাদতের ফযীলতে অনুরূপ আরো অনেক মিথ্যা কথা জালিয়াতগণ রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে প্রচার করেছে। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, ২৭ শে রজব সম্পর্কে হাদীস নামে যা কিছু প্রচলিত সবই ভিত্তিহীন, বাতিল ও জাল। আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি, মুহাদ্দিসগণ একমত যে, রজব মাস এবং এই মাসের কোনো দিন বা রাতের বিশেষ ফযীলতের বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদীসই ভিত্তিহীন। ২৭ শে রজব বিষয়ক হাদীসগুলিও এ সকল বাতিলের অন্তর্ভুক্ত। ইবনু হাজার আসকালানী, মোল্লা আলী কারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল আজলূনী, আব্দুল হাই লাখনবী, দরবেশ হুত প্রমুখ মুহাদ্দিস বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ২৭শে রজবের ফযীলত, এই তারিখের রাত্রে ইবাদত বা দিনের সিয়াম পালনের বিষয়ে বর্ণিত সকল কথাই জাল, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
২.১১.৮. শাবান মাস
প্রথমত, সহীহ হাদীসের আলোকে শাবান মাস
পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, সফর হতে রজব পর্যন্ত ৬ মাসের বিশেষ কোনো ফযীলত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। শাবান মাস তদ্রুপ নয়। সহীহ হাদীসে শাবান মাসের নিম্নলিখিত ফযীলতগুলি প্রমাণিতঃ
১. এই মাসে রাসূলুল্লাহ(সা) বেশি বেশি সিয়াম পালন করতে ভালবাসতেন। তিনি সাধারণত এই মাসের অধিকাংশ দিন একটানা সিয়াম পালন করতেন বলে বুখারী ও মুসলিম সংকলিত সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি বুখারী ও মুসলিমের কোনো কোনো হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি শাবান মাস পুরোটাই নফল সিয়ামে কাটাতেন। তিনি এই মাসে কিছু সিয়াম পালন করতে সাহাবীগণকে উৎসাহ প্রদান করতেন।(বুখারী, আস-সহীহ ২/৬৯৫, ৭০০; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮১০-৮১১,৮২০)।
২. আহমাদ, নাসাঈ প্রমুখ মুহাদ্দিস সংকলিত মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বা হাসান পর্যায়ের হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই শাবান মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়; এইজন্য এইমাসে বেশি বেশি নফল সিয়াম পালন করা উচিত।(নাসাঈ, আস সুনান ৪/২০১; আহমদ, আল-মুসনাদ ৫/২০১)।
৩. শাবান মাসের মধ্যরজনী বা ১৫ ই শাবানের রাতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করেন বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
এ সকল সহীহ ও হাসান হাদীসের পাশাপাশি এই মাসের ফযীলত ও ইবাদতের বিষয়ে অনেক জাল হাদীস প্রচলিত রয়েছে। এ জাল হাদীসগুলিকে আমার দু’ভাগে ভাগ করতে পারিঃ ১. সাধারণভাবে শাবান মাস বিষয়ক ও ২. শাবান মাসের মধ্য রজনী বা শবেবরাত বিষয়ক। আমাদের দেশে দ্বিতীয়টিই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এজন্য প্রথম বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করে আমরা দ্বিতীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাল্লাহ।
দ্বিতীয়ত, শাবান মাস বিষয়ক জাল ও ভিত্তিহীন কথাবার্তা
‘বার চাঁন্দের ফযীলত’ জাতীয় কোনো কোনো পুস্তকে শাবান মাসের প্রথম রজনীতে বিশেষ সূরা বা আয়াত দিয়ে কয়েক রাকায়াত সালাত আদায়ের কথা, হযরত ফাতিমার(রা) জন্য বখশিস করার কথা, শাবান মাসে নির্ধারিত পরিমাণ দুরূদ শরীফ পাঠের বিশেষ ফযীলতের কথা, শাবান মাসের যে কোনো জুমুআর দিবসে বিশেষ সূরা দ্বারা বিশেষ পদ্ধতিতে কয়েক রাকায়াত সালাত আদায়ের কথা এবং সেগুলির কাল্পনিক সাওয়াবের কথা লেখা হয়েছে। (মুফতী হাবিব ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, পৃ. ১৮-১৯)। এগুলি সবই ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা। শাবান মাসে নফল সিয়াম পালন ব্যতীত অন্য কোনো প্রকারের বিশেষ ইবাদতের কথা কোনো হাদীসে বলা হয় নি।
তৃতীয়ত, শবে বরাত বিষয়ক সহীহ, যয়ীফ ও জাল হাদীস
শাবান মাসের মধ্যম রজনী বা শবেবরাত মুসলিম সমাজে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এ বিষয়ক সকল সহীহ, যয়ীফ ও জাল হাদীস সনদসহ বিস্তারিত আলোচনা করেছি “কুরআন সুন্নাহর আলোকে শবে বরাতঃ ফযীলত ও আমল” নামক গ্রন্থে। এখানে আমি এ বিষয়ক জাল হাদীসগুলি আলোচনা করতে চাই। তবে প্রসঙ্গত এ বিষয়ক সহীহ ও যয়ীফ হাদীসগুলির বিষয়েও কিছু আলোকপাত করতে চাই।
১. মধ্য শাবানের রাত্রির বিশেষ মাগফেরাত
এ বিষয়টি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। হাদীস শরীফে বলা হয়েছেঃ আরবী(*****)
“আল্লাহ তায়ালা মধ্য শাবানের রাত্রিতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃকপাত করেন এবং অংশীবাদী(মুশরিক) ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।”
এই অর্থের হাদীস কাছাকাছি শব্দে ৮ জন সাহাবী: আবূ মুসা আশআরী, আউফ ইবনু মালিক, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর, মুয়ায ইবনু জাবাল, আবু সালাবা আল খুশানী, আবূ হুরাইরা, আয়েশা ও আবূ বাকর সিদ্দিক(রা) হতে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। (ইবনু মাজাহ, আস সুনান ১/৪৪৫; আহমদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ ২/১৭৬; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১২/৪৮১; বায়হাকী, শু’আবুল ঈমান, ৩/৩৮১)। এ সকল হাদীসের সনদ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা উপর্যুক্ত গ্রন্থে করেছি। এগুলির মধ্যে কিছু সনদ দুর্বল ও কিছু সনদ হাসান পর্যায়ের। সামগ্রিক বিচারে হাদীসটি সহীহ। শাইখ আলবানী বলেন, “হাদীসটি সহীহ। তা অনেক সাহাবী হতে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে, যা একটি অন্যটিকে শক্তিশালী হতে সহায়তা করে।………(আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীস আসসাহীহা ৩/১৩৫)।
এ হাদীস হতে প্রমাণিত হয় যে, এই রাতটি একটি বরকতময় রাত এবং এই রাতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু এই ক্ষমা অর্জনের জন্য শিরক ও বিদ্বেষ বর্জন ব্যতীত অন্য কোনো আমল করার প্রয়োজন আছে কিনা তা এই হাদীসে উল্লেখ নেই।
২. মধ্য শাবানের রাত্রিতে ভাগ্য লিখন
কিছু কিছু হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই রাত্রিতে ভাগ্য অনুলিপি করা হয় বা পরবর্তী বছরের জন্য হায়াত মওত ও রিযক ইত্যাদির অনুলিপি করা হয়। হাদীসগুলির সনদ বিস্তারিত আলোচনা করেছি উপর্যুক্ত পুস্তকটিতে। এখানে সংক্ষেপে বলা যায় যে, এই অর্থে বর্ণিত হাদীসগুলি অত্যন্ত দুর্বল অথবা বানোয়াট। এই অর্থে কোনো সহীহ বা গ্রহণযোগ্য হাদীস বর্ণিত হয় নি।
এখানে উল্লেখ্য যে, কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছেঃ
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ [٤٤:٣]
فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ [٤٤:٤]
আমিতো তা অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক রজনীতে এবং আমি তো সতর্ককারী। এই রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। (সূরা ৪৪ দুখানঃ আয়াত ৩-৪)।
এই বাণীর ব্যাখ্যায় তাবিয়ী ইকরিমাহ, বলেন, এখানে ‘মুবারক রজনী’ বলতে মধ্য শাবানের রাতকে বুঝানো হয়েছে। ইকরিমাহ বলেন, এই রাতে গোটা বছরের সকল বিষয় ফায়সালা করা হয়। (তাবারী, তাফসীর ২৫/১০৭-১০৯)।
মুফাসসিরগণ ইকরামার এই মত গ্রহণ করেন নি। ইমাম তাবারী বিভিন্ন সনদে ইকরামার এই ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করার পরে তার প্রতিবাদ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইকরামার এই মত ভিত্তিহীন। তিনি বলেন যে, সঠিক মত হলো, এখানে ‘মুবারক রজনী’ বলতে ‘লাইলাতুল ক্বাদর’ কে বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ যে রাত্রিতে কুরআন অবতীর্ণ করেছেন সেই রাত্রিকে এক স্থানে লাইলাতুল ক্বাদর বা মহিমান্বিত রজনী বলে অভিহিত করেছেন। (সূরা ৯৭, কাদর: আয়াত ১)। অন্যত্র এই রজনীকেই ‘লাইলাতুল মুবারাকা’ বা বরকতময় রজনী বলে উল্লেখ করেছেন। এবং এই রাত্রিটি নিঃসন্দেহে রামাদান মাসের মধ্যে; কারণ অন্যত্র আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি রামাদান মাসে কুরআন নাযিল করেছেন। (সূরা ২, বাকারা: আয়াত ১৮৫)। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুবারক রজনী রামাদান মাসে, শাবান মাসে নয়।(নাহহাস, মা’আনিল কুরআন ৬/৩৯৫; ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন ৪/১৬৯০; কুরতুবী, তাফসীর ১৬/১২৬; ইবনু কাছীর, তাফসীর ৪/১৪০; শাওকানী, ফাতহুল ক্বাদীর, ৪/৫৭০-৫৭২)।
৩. মধ্য শাবানের রাত্রিতে দোয়া মুনাজাত
মধ্য শাবানের রজনীর ফযীলত বিষয়ে বর্ণিত তৃতীয় প্রকারের হাদীসগুলিতে এই রাত্রিতে সাধারণভাবে দোয়া করার উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এ রাতে দোয়া করা, আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আকুতি জানানো এবং জীবিত ও মৃতদের পাপরাশি ক্ষমালাভের জন্য প্রার্থনার উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এই অর্থে কোনো সহীহ বা গ্রহণযোগ্য হাদীস নেই। এই অর্থে বর্ণিত হাদীসগুলির মধ্যে কিছু হাদীস দুর্বল এবং কিছু হাদীস জাল।
৪. অনির্ধারিত সালাত ও দোয়া
মধ্য শাবানের রাত্রি সম্পর্কে বর্ণিত কিছু হাদীসে এই রাত্রিতে সালাত আদায় ও দোয়া করার কথা বলা হয়েছে। এই সকল হাদীস এই রাত্রের সালাতের জন্য কোনো নির্ধারিত রাকা’য়াত, নির্ধারিত সূরা বা নির্ধারিত পদ্ধতি উল্লেখ করা হয় নি। শুধুমাত্র সাধারণভাবে এই রাত্রিতে তাহাজ্জুদ আদায় ও দোয়া করার বিষয়টি এ সকল হাদীস থেকে জানা যায়। এই অর্থে বর্ণিত হাদীসগুলি সবই বানোয়াট পর্যায়ের। দুই একটি হাদীস বানোয়াট না বলে যয়ীফ বা দুর্বল বলে গণ্য করা যায়।
৫. নির্ধারিত রাকায়াত, সূরা ও পদ্ধতিতে সালাত
শবে বরাত বিষয়ক অন্য কিছু হাদীসে এ রাত্রিতে বিশেষ পদ্ধতিতে বিশেষ সূরা পাঠের মাধ্যমে, নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকায়াত সালাত আদায়ের বিশেষ ফযীলতের উল্লেখ করা হয়েছে। মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী এই অর্থে বর্ণিত সকল হাদীস বানোয়াট। হিজরী চতুর্থ শতকের পরে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বানিয়ে এগুলি প্রচার করা হয়েছে। এখানে এই জাতীয় কয়েকটি জাল ও বানোয়াট হাদীস উল্লেখ করছি।
১. ৩০০ রাকায়াত, প্রতি রাকায়াতে ৩০ বার সূরা ইখলাস
“যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে প্রত্যেক রাকায়াতে ৩০ বার সূরা ইখলাস পাঠের মাধ্যমে ৩০০ রাকায়াত সালাত আদায় করবে জাহান্নামের আগুন অবধারিত এমন ১০ ব্যক্তির ব্যাপারে তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” হাদীসটি আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়্যিম বাতিল বা ভিত্তিহীন হাদীসের মধ্যে উল্লেখ করেছেন।(ইবনুল ক্বাইয়্যেম নাক্বদুল মানকুল ১/৮৫)।
২. ২০০ রাকায়াত, প্রতি রাকায়াতে ১০ বার সূরা ইখলাস
মধ্য শাবানের রাত্রিতে এই পদ্ধতিতে সালাত আদায়ের প্রচলন হিজরী চতুর্থ শতকের পরে মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করে। মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, ৪৪৮ হিজরী সনে বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রথম এই রাত্রিতে এই পদ্ধতিতে সালাত আদায়ের প্রচলন শুরু হয়।(মোল্লা আলী কারী, মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ৩/৩৮৮)। এ সময়ে বিভিন্ন মিথ্যাবাদী গল্পকার ওয়ায়েয এই অর্থে কিছু হাদীস বানিয়ে বলেন। এই অর্থে ৪ টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যার প্রত্যেকটিই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
এর প্রথমটি হযরত আলী ইবনু আবি তালিব(রা) এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে প্রচারিতঃ যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাত্রে ১০০ রাকায়াত সালাত আদায় করবে, প্রত্যেক রাকায়াতে সূরা ফাতিহা একবার ও সূরা ইখলাস ১০ বার পাঠ করবে, সে উক্ত রাতে যত প্রয়োজনের কথা বলবে আল্লাহ তায়ালা তার সকল প্রয়োজন পূরণ করবেন। লাওহে মাহফুজে তাকে দুর্ভাগা লিপিবদ্ধ করা হলেও তা পরিবর্তন করে সৌভাগ্যবান হিসেবে তার নিয়তি নির্ধারণ করা হবে, আল্লাহ তায়ালা তার কাছে ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রেরণ করবেন যারা তার পাপরাশি মুছে দিবে, বছরের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন রাখবে। এছাড়াও আল্লাহ তায়ালা ‘আদন’ জান্নাতে ৭০ হাজার বা ৭ লক্ষ ফেরেশতা প্রেরণ করবেন যারা বেহেশতের মধ্যে তার জন্য শহর ও প্রাসাদ নির্মাণ করবে এবং তার জন্য বৃক্ষরাজি রোপণ করবে…..। যে ব্যক্তি এ নামায আদায় করবে এবং পরকালের শান্তি কামনা করবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য তার অংশ দান করবেন।”
হাদীসটি সর্বসম্মতভাবে জাল ও বানোয়াট। এর বর্ণনাকারীগণ কেউ অজ্ঞাত পরিচয় এবং কেউ মিথ্যাবাদী জালিয়াত হিসেবে পরিচিত। (ইবনুল জাউযী, আল মাউদূ’আত, ২/৫০-৫১; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ৫/২৭১; সুয়ূতী, আল লাআলী, ২/৫৯)।
এ বিষয়ক দ্বিতীয় জাল হাদীসটিতে বানোয়াটকারী রাবীগণ ইবনু উমার(রা) এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বর্ণনা করেছেঃ “যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাত্রিতে একশত রাকায়াত ৎসালাতে এক হাজার বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহ তায়ালা তার কাছে ১০০ জন ফেরেশতা প্রেরণ করবেন, তন্মধ্যে ত্রিশজন তাকে বেহেশতের সুসংবাদ দিবে, ত্রিশজন তাকে দোযখের আগুন হতে নিরাপত্তার সুসংবাদ প্রদান করবে, ত্রিশজন তাকে ভুলের মধ্য হতে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা করবে এবং দশজন তার শত্রুদের ষড়যন্ত্রের জবাব দিবে।” এ হাদীসটিও বানোয়াট। সনদের অধিকাংশ রাবী অজ্ঞাত পরিচয়। বাকীরা মিথ্যাবাদী হিসেবে সুপরিচিত।(ইবনুল জাউযী, আল মাউ’দূআত, ২/৫০-৫১; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ৫/২৭১)।
এ বিষয়ক তৃতীয় জাল হাদীসটিতে জালিয়াতগণ বিশিষ্ট তাবেয়ী ইমাম আবু জাফর মুহাম্মাদ আল বাকের(১১৫ হি) হতে রাসূলুল্লাহ(সা)এর বরাতে বর্ণনা করেছেঃ “যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাত্রিতে একশত রাকায়াত সালাতে এক হাজার বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহ তায়ালা তার কাছে ১০০ জন ফেরেশতা প্রেরণ করবেন, তন্মধ্যে ত্রিশজন তাকে বেহেশতের সুসংবাদ দিবে, ত্রিশজন তাকে দোযখের আগুন হতে মুক্তি দিবে, ত্রিশজন তার ভুল সংশোধন করবে এবং ১০ জন তার শত্রুদের নাম লিপিবদ্ধ করবে।”
এ হাদীসটিও বানোয়াট। সনদের কিছু রাবী অজ্ঞাত পরিচয় এবং কিছু রাবী মিথ্যাবাদী হিসেবে সুপরিচিত।(ইবনুল জাউযী, আল মাউদূ’আত, ২/৫১; সুয়ূতী, আল লাআলী, ২/৫৯)।
১০০ রাকায়াত সংক্রান্ত এই বিশেষ পদ্ধতিটি বিভিন্ন গল্পকার ওয়ায়েযীনদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং যুগে যুগে তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক পর্যায়ে ভারতীয় ওয়ায়েযগণ এই সালাতের পদ্ধতির মধ্যে প্রত্যেক দুই রাকায়াতের পর “তাসবীহুত তারাবীহর” প্রচলন করেন এবং ১০০ রাকায়াত পূর্ণ হওয়ার পর কতিপয় সাজদা, সাজদার ভিতরে ও বাহিরে কতিপয় দোয়া সংযুক্ত করেছেন।
আল্লামা আব্দুল হাই লাখনাবী(১৩০৬ হি) বানোয়াট ও ভিত্তিহীন হাদীসের মধ্যে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। যার সারমর্ম হলো, মধ্য শাবানের রাতে পঞ্চাশ সালামে ১০০ রাকায়াত সালাত আদায় করতে হবে। প্রত্যেক রাকায়াতে সূরা ফাতিহার পরে ১০ বার সূরা ইখলাস পাঠ করতে হবে। প্রত্যেক দুই রাকায়াত পর তাসবীহুত তারাবীহ পাঠ করবে, এরপর সাজদা করবে। সাজদার মধ্যে কিছু নির্ধারিত বানোয়াট দোয়া পাঠ করবে। অতঃপর সাজদা হতে মাথা তুলবে এবং নবী(সা) এর উপর দুরূদ পাঠ করবে ও কিছু নির্ধারিত বানোয়াট দোয়া পাঠ করবে। অতঃপর দ্বিতীয় সাজদা করবে এবং তাতে কিছু নির্ধারিত বানোয়াট দোয়া পাঠ করবে।(আব্দুল হাই লাখনাবী, আল আসার আল মারফুআ, পৃ. ১১৩-১১৪)।
৩. ৫০ রাকায়াত
ইমাম যাহাবী এ হাদীসটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হাদীস হিসেবে হাদীসটির বর্ণনাকারী অজ্ঞাত রাবী মুহাম্মাদ বিন সাঈদ আলমীলী আত তাবারীর জীবনীতে উল্লেখ করেছেন। উক্ত মুহাম্মাদ বিন সাঈদ এ হাদীসটি তার মতই অজ্ঞাত রাবী মুহাম্মাদ বিন আমর আল বাজালী এর সনদে হযরত আনাস(রা) হতে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেনঃ যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে ৫০ রাকায়াত সালাত আদায় করবে, সে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার কাছে যত প্রকার প্রয়োজনের কথা বলবে তার সবটুকুই পূরণ করে দেয়া হবে। এমনকি লাওহে মাহফুজে তাকে দুর্ভাগ্যবান হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হলেও তা পরিবর্তন করে তাকে সৌভাগ্যবান করা হবে। এবং আল্লাহ তায়ালা তার কাছে ৭ লক্ষ ফেরেশতা প্রদান করবেন যারা তার নেকী লিপিবদ্ধ করবে, অপর ৭ লক্ষ ফেরেশতা প্রেরণ করবেন যারা তার জন্য বেহেশতে প্রাসাদ নির্মাণ করবে……এবং ৭০ হাজার একত্ববাদীর জন্য তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে………। ইমাম যাহাবী এই মিথ্যা হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন, যে ব্যক্তি এ হাদীসটি বানোয়াট করেছে আল্লাহ তায়ালা তাকে লাঞ্চিত করুন।(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল, ৬/১৬৮-১৬৯)।
৪. ১৪ রাকায়াত
ইমাম বায়হাকী তাঁর সনদে হযরত আলী(রা) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ(সা) কে মধ্য শাবানের রাতে ১৪ রাকায়াত সালাত আদায় করতে দেখেছি। সালাত শেষে বসে তিনি ১৪ বার সূরা ফাতিহা, ১৪ বার সূরা ইখলাস, ১৪ বার সূরা ফালাক, ১৪ বার সূরা নাস, ১ বার আয়াতুল কুরসী এবং সূরা তাওবার শেষ দুই আয়াত তিলাওয়াত করেছেন, এ সব কাজের সমাপ্তির পর আমি তাঁকে এগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তুমি আমাকে যেভাবে করতে দেখেছ এভাবে যে করবে তার আমলনামায় ২০টি কবুল হজ্জের সাওয়াব লিখা হবে এবং ১০ বছরের কবুল সিয়ামের সাওয়াব লিখা হবে। পরদিন যদি সে সিয়াম পালন করে তবে দুই বছরের সিয়ামের সাওয়াব তার আমলনামায় লিখা হবে।”
হাদীসটি উল্লেখ করার পর ইমাম বায়হাক্বী বলেনঃ ইমাম আহমদ বলেছেন যে, এই হাদীসটি আপত্তিকর, পরিত্যক্ত, জাল ও বানোয়াট বলে প্রতীয়মান হয়। হাদীসটির সনদে অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারীগণ রয়েছে। (বায়হাক্বী, শুআব আল-ঈমান, ৩/৩৮৬-৩৮৭, হাদীস নং-৩৮৪১)।
অন্যান্য মুহাদ্দিস হাদীসটিকে জাল বলে গণ্য করার বিষয়ে ইমাম বাইহাকীর সাথে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। আল্লামা ইবনুল জাওযী ও ইমাম সুয়ূতী বলেন, হাদীসটি বানোয়াট, এর সনদ অন্ধকারাচ্ছন্ন।…..সনদের মধ্যে মুহাম্মাদ বিন মুহাজির রয়েছেন। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল বলেনঃ মুহাম্মাদ বিন মুহাজির হাদীস বানোয়াটকারী।(ইবনুল জাওযী, আল মাউদূআত, ২/৫২; সুয়ূতী, আল লাআলী, ২/৫৯-৬০)।
৫. ১২ রাকায়াত, প্রত্যেক রাকায়াতে ৩০ বার সূরা ইখলাস
জালিয়াতগণ হযরত আবূ হুরায়রা(রা) পর্যন্ত একটি জাল সনদ তৈরি করে তাঁর সূত্রে রাসূলুল্লাহ(সা) থেকে বর্ণনা করেছেঃ “যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে ১২ রাকায়াত সালাত আদায় করবে, প্রত্যেক রাকায়াতে ৩০ বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে, সালাত শেষ হওয়ার পূর্বেই বেহেশতের মধ্যে তার অবস্থান সে অবলোকন করবে। এবং তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জাহান্নামের আগুন নির্ধারিত হয়েছে এমন দশ ব্যক্তির ব্যাপারে তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” এ হাদীসের সনদের অধিকাংশ বর্ণনাকারীই অজ্ঞাত। এছাড়াও সনদের মধ্যে কতিপয় দুর্বল ও পরিত্যাজ্য বর্ণনাকারী রয়েছে। (ইবনুল জাউযী, আল মাউদূআত, ২/৫২; সুয়ূতী, আল লাআলী ২/৫৯)।
উপরের আলোচনার মাধ্যমে আমাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে যে, মধ্য শাবানের রাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সূরার মাধ্যমে নির্দিষ্ট রাকায়াত সালাত আদায় করা সংক্রান্ত হাদীসসমূহ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। মুহাদ্দিসগণ এ ব্যাপারে সকলেই একমত। কিন্তু কতিপয় নেককার ও সরলপ্রাণ ফকীহ ও মুফাসসির তাঁদের রচনাবলিতে এগুলির জালিয়াতি ও অসারতা উল্লেখ ব্যতীতই এ সকল ভিত্তিহীন হাদীস স্থান দিয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ এগুলির উপর ভিত্তি করে ফতোয়া প্রদান করেছেন ও তদনুযায়ী আমল করেছেন, যা পরবর্তীতে এই রীতি প্রসারিত হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে।
মোল্লা আলী কারী(১০১৪ হি) মধ্য শাবানের রাতে সালাত আদায়ের ফযীলত সংক্রান্ত হাদীসগুলির অসারতা উল্লেখপূর্বক বলেন, সবচেয়ে আশ্চর্য্যের বিষয় হলো যে, যারা সুন্নাতের ইলমের সন্ধান পেয়েছেন তারা এগুলির দ্বারা প্রতারিত হন কি করে! এ সালাত চতুর্থ হিজরী শতকের পর ইসলামের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে যার উৎপত্তি হয়েছে বায়তুল মুকাদ্দাস থাকে। এ ব্যাপারে অসংখ্য জাল হাদীস তৈরি করা হয়েছে যার একটিও সঠিক বা নির্ভরযোগ্য নয়।(মোল্লা আলী কারী, আল আসরার, পৃ. ৩৩০-৩৩১; ইবনুল কাইয়্যেম, আল মানার আল মুনীফ পৃ. ৮৯-৯৯)। তিনি বলেন, হে পাঠক, এ সকল ভিত্তিহীন মিথ্যা হাদীস ‘কুতুল কুলুব’, ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন’ ও ইমাম সালাবীর তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ থাকার কারণে আপনারা প্রতারিত ও বিভ্রান্ত হবেন না। (মোল্লা আলী কারী, আল মাসনূ, পৃ.২০৮-২০৯)। ইসমাঈল বিন মুহাম্মাদ আজলুনীও (১১৬২ হি) অনুরূপ মন্তব্য করেছেন।(আজলুনী, কাশফুল খাফা, ২/৫৫৪-৫৫৫)।
আল্লামা শাওকানী(১২৫০ হি) শবে বরাতের রাত্রিতে আদায়কৃত এই সালাত সংক্রান্ত হাদীসের ভিত্তিহীনতা উল্লেখপূর্বক বলেন, এ সকল হাদীস দ্বারা একদল ফকীহ প্রতারিত হয়েছেন। যেমন ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থকার ইমাম গাযালী ও অন্যান্যরা। এমনিভাবে কতিপয় মুফাসসিরও প্রতারিত হয়েছেন। এ সালাতের বিষয়ে বিভিন্ন প্রকার জাল হাদীস রচিত হয়েছে। এ সকল হাদীস মাঊযূ বা বানোয়াট হওয়ার অর্থ হলো, এই রাত্রিতে নির্ধারিত পদ্ধতিতে নির্ধারিত রাকায়াত সালাত আদায়ের প্রচলন বাতিল ও ভিত্তিহীন। তবে কোনো নির্ধারিত রাকায়াত, সূরা বা পদ্ধতি ব্যতিরেকে সাধারণভাবে এই রাত্রিতে ইবাদত বা দোয়া করার বিষয়ে দুই একটি যয়ীফ হাদীস রয়েছে।(শাওকানী, আল ফাওয়ায়েদ ১/৭৬)।
তৃতীয়ত, আরো কিছু জাল বা অনির্ভরযোগ্য হাদীস
১. মধ্য শাবানের রাতে কিয়াম ও দিনে সিয়াম
ইমাম ইবনু মাজাহ তাঁর সুনান গ্রন্থে নিম্নলিখিত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। “আলী(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন, যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাতে(সালাতে দোয়ায়) দন্ডায়মান থাক এবং দিবসে সিয়াম পালন কর। কারণ, ঐদিন সূর্যাস্তের পর মহান আল্লাহ পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো রিযক অনুসন্ধানকারী আছে কি? আমি তাকে রিযক প্রদান করব। কোন দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি আছে কি? আমি তাকে মুক্ত করব। এভাবে সুবহে সাদিক উদয় হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে।”
এ হাদীসটি ইমাম ইবনু মাজাহ তাঁর উস্তাদ হাসান বিন আলী আল খাল্লাল থেকে, তিনি আব্দুর রাজ্জাক থেকে, তিনি ইবনু আবি সাবরাহ থেকে, তিনি ইবরাহীম বিন মুহাম্মাদ থেকে, তিনি মুয়াবিয়া বিন আব্দুল্লাহ বিন জাফর থেকে, তিনি তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ বিন জাফর থেকে, তিনি হযরত আলী ইবনু আবী তালিব(রা)থেকে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে বর্ণনা করেছেন। (ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৪৪৪)।
ইবনু মাজাহ কর্তৃক সংকলিত হওয়ার কারণে হাদীসটি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত, প্রচারিত ও আলোচিত। কিন্তু মুহাদ্দিসগণ হাদীসটিকে অত্যন্ত দুর্বল ও বানোয়াট পর্যায়ের বলে চিহ্নিত করেছেন।
এ হাদীসটি একমাত্র ইবনু আবি সাবরাহ বর্ণনা করেছেন। তিনি ব্যতীত অন্য কেউ এ হাদীস বর্ণনা করেন নি। এ হাদীস আলী ইবনু আবী তালিব থেকে তাঁর কোনো ছাত্র বর্ণনা করেন নি। আব্দুল্লাহ বিন জাফর বিন আবী তালিব থেকেও তাঁর কোনো ছাত্র হাদীসটি বর্ণনা করেন নি। এমনকি মুয়াবিয়া ও ইবরাহিম বিন মুহাম্মাদ থেকেও তাঁদের কোনো ছাত্র হাদীসটি বর্ণনা করেন নি। শুধুমাত্র ইবনু আবি সাবরাহ দাবি করেছেন যে, তিনি ইবরাহীম থেকে উক্ত সনদে হাদীসটি শ্রবণ করেছেন। তাঁর কাছ হতে আব্দুর রাজ্জাক ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন।
ইবনু আবী সাবরাহ(১৬২ হি) এর পূর্ণনাম আবু বকর বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আবী সাবরাহ। তিনি মদীনার একজন বড় আলিম ও ফকীহ ছিলেন। কিন্তু তুলনামূলক নিরীক্ষা ও বিচারের মাধ্যমে হাদীসের ইমামগণ নিশ্চিত হয়েছেন যে, তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নিতেন। অসংখ্য ইমাম তাঁকে মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। তন্মধ্যে ইমাম আহমদ, ইয়াহইয়া বিন মাঈন, আলী ইবনুল মাদীনী, বুখারী, ইবনু আদী, ইবনু হিব্বান ও হাকিম নাইসাপুরী অন্যতম।(ইবনু হাজার, তাক্বরীব, পৃ. ৬৩২; তাহযীব, ১২/২৫-২৬)।
এরই আলোকে আল্লামা শিহাব উদ্দীন আহমদ বিন আবি বকর আল বুসীরী(৮৪০ হি) এ হাদীসের টীকায় বলেছেন, ইবনু আবি সাবরাহর দুর্বলতার কারণে এ সনদটি দুর্বল। ইমাম আহমদ ও ইবনু মাঈন তাঁকে হাদীস বানোয়াটকারী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।(আল বুছীরী, যাওয়ায়েদ ইবনু মাজাহ, পৃ. ২০৩)। শাইখ নাসির উদ্দীন আলবানী বলেছেন, অত্যন্ত দুর্বল বা বানোয়াট। তিনি আরো বলেন, সনদটি বানোয়াট।(আলবানী, দাঈফু সুনানি ইবনি মাজাহ, পৃ. ১০৬; যাঈফাহ, ৫/১৫৪)।
২. দুই ঈদ ও মধ্য শাবানের রাত্রিভর ইবাদত
একটি জাল হাদীসে বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাত ও দুই ঈদের রাত ইবাদতে জাগ্রত থাকবে তার অন্তরের মৃত্যু হবে না যেদিন সকল অন্তর মরে যাবে।”(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল, ৫/৩৮১-৩৮২; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান, ৪/৩৯১)।
এই হাদীসের একমাত্র বর্ণনাকারী উপর্যুক্ত ঈসা ইবনু ইবরাহীম ইবনু তাহমান বাতিল হাদীস বর্ণনাকারী হিসাবে সুপরিচিত। ইমাম বুখারী, নাসাঈ, ইয়া্হইয়া ইবনু মাঈন ও আবু হাতিম রাযী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস একবাক্যে তাকে পরিত্যক্ত বা মিথ্যাবাদী রাবী বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ঈসা ইবনু ইবরাহীম নামক এই ব্যক্তি তার ওস্তাদ হিসেবে যার নাম উল্লেখ করেছেন সেই ‘সালামা বিন সুলাইমান’ দুর্বল রাবী বলে পরিচিত। আর তার উস্তাদ হিসেবে যার নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেই ‘মারওয়ান বিন সালিম’ মিথ্যা হাদীস বর্ণনার অভিযোগে অভিযুক্ত। (ইবনুল জাওযী, আল ইলাল আল মুতানাহিয়া ২/৫৬২; তালখীস আল হাবীর, ২/৬০৬)।
এভাবে আমরা দেখছি যে, এই হাদীসটির সনদের রাবীগণ অধিকাংশই মিথ্যাবাদী বা অত্যন্ত দুর্বল। এরা ছাড়া কেউ এই হাদীস বর্ণনা করেন নি। কাজেই হাদীসটি বানোয়াট পর্যায়ের।
এখানে উল্লেখ্য যে, আবূ উমামা(রা) ও অন্যান্য সাহাবী থেকে একাধিক দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাত ইবাদতে জাগ্রত থাকবে তার অন্তরের মৃত্যু হবে না যেদিন সকল অন্তর মরে যাবে।’ এ সকল বর্ণনায় দুই ঈদের রাতের সাথে মধ্য শাবানের রাতকে কেউ যুক্ত করেন নি।(ইবনু মাজাহ, আস সুনান ১/৫৬৭)।
৩. পাঁচ রাত্রি ইবাদতে জাগ্রত থাকা
মুয়ায ইবনু জাবাল(রা) এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, “যে ব্যক্তি পাঁচ রাত জাগ্রত থাকবে তার জন্য জান্নাত অপরিহার্য্য হবে: জিলহ্জ্জ্ব মাসের ৮ তারিখ রাত্রি, ৯ তারিখের(আরাফা) রাত্রি, ১০ তারিখের (ঈদুল আযহা) রাত্রি, ঈদুল ফিতরের রাত্রি ও মধ্য শাবানের রাত্রি।”
হাদীসটি ইস্পাহানী তাঁর ‘তারগীব’ গ্রন্থে সুওয়াইদ ইবনু সাঈদ এর সূত্রে উদ্ধৃত করেছেন। সুওয়াইদ, আব্দুর রাহীম ইবনু যাইদ আল‘আম্মী থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ওয়াহব ইবনু মুনাব্বিহ থেকে, তিনি মুয়ায ইবনু জাবাল থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ(সা) হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
হাদীসটির বর্ণনাকারী আব্দুর রাহীম ইবনু যাইদ আল আম্মী(১৮৪ হি) নামক ব্যক্তি মিথ্যা ও জাল হাদীস বর্ণনাকারী বলে প্রসিদ্ধ ছিলেন। ইমাম বুখারী, নাসাঈ, ইয়া্হইয়া ইবনু মাঈন, আহমদ ইবনু হাম্বাল, আবু হাতিম রাযী, আবু দাউদ ও অন্যান্য সকল মুহাদ্দিস এই ব্যক্তির বা মিথ্যাবাদীতার বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। এজন্য এ হাদীসটি মাউযূ বা জাল হাদীস বলে গণ্য। ইবনুল জাওযী, ইবনু হাজার আসকালানী, মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী প্রমুখ মুহাদ্দিস এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৪/৩৩৬; আলবানী, যায়ীফাহ ২/১২)।
৪. এই রাত্রিতে রহমতের দরজাগুলি খোলা হয়
আবুল হাসান আলী ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু ইরাক(৯৬৩ হি) তাঁর মাঊযূ বা জাল বা বানোয়াট হাদীস সংকলনের গ্রন্থে ইবনু আসাকির বরাত দিয়ে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন হাদীস হিসেবে নিম্নের হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। উবাই ইবনু কাব(রা) এর সূত্রে কথিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন, “মধ্য শাবানের রাতে জিবরাঈল(আ) আমার নিকট আগমন করে বলেন, আপনি দাঁড়িয়ে নামায পড়ুন এবং আপনার মাথা ও হস্তদ্বয় উপরে উঠান। আমি বললাম, হে জিবরাঈল, এটি কোন রাত? তিনি বলেন, হে মুহাম্মাদ, এই রাতে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং রহমতের ৩০০ দরজা খুলে দেওয়া হয়।……তখন রাসূলুল্লাহ(সা) বাকী গোরস্থানে গমন করেন। তিনি যখন সেখানে সাজদারত অবস্থায় দোয়া করেছিলেন, তখন জিবরাঈল সেখানে অবতরণ করে বলেন, হে মুহাম্মাদ, আপনি আকাশের দিকে মাথা তুলুন। তিনি তখন তাঁর মস্তক উত্তোলন করে দেখেন যে, রহমতের দরজাগুলি খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক দরজায় একজন ফিরিশতা ডেকে বলেছেন, এই রাত্রিতে যে সাজদা করে তার জন্য মহা সুসংবাদ…….. ।”
হাদীসটি উদ্ধৃত করে ইবনু ইরাক উল্লেখ করেছেন যে, এ হাদীস একটি মাত্র সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যে সূত্রের রাবীগণ সকলেই অজ্ঞাত পরিচয় এবং হাদীসটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন হিসেবে বিবেচিত।(ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১২৬)।
৫. পাঁচ রাতের দোয়া বিফল হয় না
আবূ উমামা বাহিলীর(রা) সূত্রে, রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে কথিত আছে, “পাঁচ রাতের দোয়া বিফল হয় না। রজব মাসের প্রথম রাত, মধ্য শাবানের রাত, জুমআর রাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাত।”
এ হাদীসটি হাফিয আব্দুল কাসিম ইবনু আসাকির(৫৭১ হি) তাঁর ‘তারীখ দিমাশক’ গ্রন্থে আবু সাঈদ বুনদার বিন মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ রূইহানীর সূত্রে, তিনি ইবরাহীম বিন আবি ইয়াহইয়া থেকে, তিনি আবু কা’নাব হতে, তিনি আবু উমামা বাহেলী(রা) হতে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম সুয়ূতী তাঁর “আল জামে আল সাগীর” গ্রন্থে হাদীসটি যয়ীফ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (সুয়ূতী, আল জামে আল সাগীর. ১/৬১০)। নাসিরুদ্দীন আলবানী হাদীসটি বানোয়াট হিসেবে উল্লেখ করেছেন।(আলবানী, দাঈফুল জামে, পৃ. ৪২০; যায়ীফাহ, ৩/৬৪৯-৬৫০)। কারণ এ হাদীসের মূল ভিত্তি হলো ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবী ইয়াহইয়া (১৮৪ হি) নামক একজন মুহাদ্দিস। ইমাম মালিক, আহমাদ, বুখারী, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন, ইয়াহইয়া আল কাত্তান, নাসাঈ, দারাকুতনী, যাহাবী, ইবনু হিব্বান ও অন্যান্য মুহাদ্দিস তাকে রাফেয়ী, শিয়া, মুতাযিলী ও ক্বাদেরীয়া আক্বীদায় বিশ্বাসী বলে অভিযুক্ত করেছেন এবং মিথ্যাবাদী ও অপবিত্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ইমাম শাফেয়ী প্রথম বয়সে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন বিধায় কোনো কোনো শাফেয়ী মুহাদ্দিস তার দুর্বলতা কিছুটা হাল্কা করার চেষ্টা্ করেন। তবে শাফেয়ী মাযহাবের অভিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ ও অন্যান্য সকল মুহাদ্দিস তাকে এক কথায় পরিত্যক্ত ও মিথ্যাবাদী বলে ঐক্যমত পোষণ করেছেন।
ইমাম শাফেয়ী নিজেও তাঁর শিক্ষকের দুর্বলতা ও অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি পরবর্তী জীবনে তার সূত্রে কোনো হাদীস বললে তার নাম উল্লেখ না করে বলতেন, আমাকে বলা হয়েছে, বা শুনেছি বা অনুরূপ কোনো বাক্য ব্যবহার করতেন।(ইবনু আদী, আল কামিল, ১/৩৫৩-৩৬৭; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল, ১/১৮২-১৮৫; ইবনু হাজার, তাহযীব ১/১৩৭-১৩৯)। এই হাদীসটির ক্ষেত্রেও ইমাম শাফেয়ী বলেন, আমাকে বলা হয়েছে যে, আগের যুগে বলা হতো, পাঁচ রাতে দোয়া করা মুস্তাহাব…..। ইমাম শাফেয়ী বলেন, এ সকল রাতে যে সব আমলের কথা বলা হয়েছে সেগুলিকে আমি মুসতাহাব মনে করি।
এছাড়া সনদের অন্য রাবী আবু সাঈদ বুনদার বিন উমরও মিথ্যাবাদী ও হাদীস জালকারী বলে পরিচিত।(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল, ২/৭০; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান, ২/৬৪)।
এখানে উল্লেখ্য যে, হাফিয আব্দুর রাজ্জাক সান’আনী এই হাদীসটি অন্য একটি সনদে হযরত ইবনু উমারের(রা) নিজস্ব বক্তব্য হিসেবে উদ্বৃত্ত করেছেন। (আব্দুর রাজ্জাক, আল মুসান্নাফ, ৪/৩১৭)।
আব্দুর রাজ্জাক সান’আনী বলেন, আমাকে এক ব্যক্তি বলেছেন, তিনি বায়লামানীকে বলতে শুনেছেন, তার পিতা বলেছেন, ইবনু উমার বলেছেন, পাঁচ রাতে দোয়া বিফল হয় না।…..”
এই সনদে আবদুর রাজ্জাককে যিনি হাদীসটি বলেছেন, তিনি অজ্ঞাত পরিচয়। পরবর্তী রাবী মুহাম্মাদ বিন আবদুর রাহমান বিন বায়লামানী হাদীস জালিয়াত হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন।(বুখারী, আততারীখুল কাবীর, ১/১৬৩; ইবনুল জাওযী, আদ-দুআফা ৩/৭৫)। উক্ত মুহাম্মাদের পিতা, সনদের পরবর্তী রাবী আব্দুর রাহমান বিন বায়লানামীও দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য রাবী।(ইবনু হাজার, তাহযীব, ৬/১৩৫; তাক্বরীব, পৃ. ৩৩৭)।
৬. শবে বরাতের গোসল
শবে বরাত বিষয়ক কতিপয় মিথ্যা কথাগুলির অন্যতম হলো এই রাতে গোসল করার ফযীলত। বিষয়টি যদিও সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও জঘন্য বানোয়াট কথা, তবুও আমাদের সমাজে তা অত্যন্ত প্রচলিত। আমাদের দেশের প্রচলিত প্রায় সকল পুস্তকেই এই জাল কথাটি লিখা হয় এবং ওয়াযে আলোচনায় বলা হয়। প্রচলিত একটি বই হতে উদ্ধৃত করছিঃ “একটি হাদীসে আছে যে, যে ব্যক্তি উক্ত রাত্রিতে এবাদতের উদ্দেশ্যে সন্ধ্যায় গোসল করিবে, সেই গোসলের প্রতিটি বিন্দু পানির পরিবর্তে তাহার আমল নামায় ৭০০(সাতশত) রাকায়াত নফল নামাযের ছওয়াব লিখা হইবে। গোসল করিয়া দুই রাকায়াত তাহিয়্যাতুল অজুর নামায পড়িবে।……..(মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মোমিনীন, পৃ. ২৪০; মুফতী হাবীব ছামদানি, বার চাঁদের ফযীলত, পৃ. ২৬; অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃ. ৩০৯)।
এই মিথ্যা কথাটি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কঠিন শীতের দিনেও অনেকে গোসল করেন। উপরন্তু ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ার আশায় শরীর ও মাথা ভাল করে মোছেন না। এর ফলে অনেকে বিশেষত, মহিলারা ঠান্ডা-সর্দিতে আক্রান্ত হন। আর এই সকল কষ্ট শরীয়তের দৃষ্টিতে বেকার পরিশ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, সুন্নাতের আলোকে এই রাতে গোসল করে ইবাদত করা আর ওযু করে ইবাদত করার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। অনুরূপভাবে এই রাতে গোসল করা এবং অন্য কোনো রাতে গোসল করার মাঝেও কোনো পার্থক্য নেই।
৭. এই রাত্রিতে নেক আমলের সুসংবাদ
এ বিষয়ে আমাদের দেশের প্রচলিত একটি কথাঃ “মহা সুসংবাদ তার জন্য যে শাবান মাসের মধ্যম রজনীতে নেক আমল করে……।” এই কথাটি উপরে উল্লেখিত উবাই ইবনু কার(রা) এর নামে প্রচারিত জাল হাদীসটি হতে গ্রহণ করা হয়।
৮. এই রাত্রিতে হালুয়া রুটি বা মিষ্টান্ন বিতরণ
এই রাত্রিতে হালুয়া রুটি তৈরি করা, খাওয়া, বিতরণ করা, মিষ্টান্ন বিতরণ করা ইত্যাদি সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কর্ম। এই রাত্রিতে এই সকল ইবাদত করলে কোনো বিশেষ সাওয়াব বা অতিরিক্ত সাওয়াব পাওয়া যাবে এই মর্মে কোনো হাদীস বর্ণিত হয় নি।
৯. ১৫ ই শাবানের দিনে সিয়াম পালন
আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ(সা) শাবান মাসে বেশি বেশি সিয়াম পালন করতেন, এমনকি প্রায় সারামাসই সিয়ামরত থাকতেন। আমরা আরো দেখেছি যে, শা’বান মাসের মধ্যম রজনীর ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এই রাত্রিতে সাধারণভাবে দোয়া ইসতিগফার বা সালাত আদায়ের উৎসাহজ্ঞাপক কিছু যয়ীফ বা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হাদীস রয়েছে। কিন্তু পরদিন সিয়াম পালনের বিষয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য হাদীস পাওয়া যায় না। ইবনু মাজাহ সংকলিত আলী(রা) এর নামে বর্ণিত হাদীসটিতে সিয়াম পালনের কথা বলা হয়েছে। তবে হাদীসটির সনদ নির্ভরযোগ্য নয়। এ রাতে ১৪ রাকায়াত সালাত আদায় বিষয়ক হাদীসেও পরদিন সিয়াম পালনের ফযীলত উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু হাদীসটি জাল। এ বিষয়ক আরেকটি জাল হাদীস আমাদের সমাজে প্রচলিতঃ “যে ব্যক্তি শাবান মাসের ১৫ তারিখে সিয়াম পালন করবে, জাহান্নামের আগুন কখনোই তাকে স্পর্শ করবে না।”(মোকছুদোল মোমেনীন, পৃ. ২৩৫; মুফতী ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, পৃ. ২৫)।
১০. প্রচলিত কিছু ভিত্তিহীন কথাবার্তার নমুনা
আমাদের দেশে প্রচলিত পুস্তকে অনেক সময় লেখকগণ বিশুদ্ধ ও অশুদ্ধকে একসাথে মিশ্রিত করেন। অনেক সময় সহীহ হাদীসেরও অনুবাদে এমন বিষয় প্রবেশ করান যা হাদীসের নামে মিথ্যায় পরিণত হয়। অনেক সময় নিজেদের খেয়াল খুশি মত বুখারী, মুসলিম ইত্যাদি গ্রন্থের নাম ব্যবহার করেন। এগুলির বিষয়ে আমাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। মহান আল্লাহ দয়া করে আামাদের লেখকগণের পরিশ্রম কবুল করুন, তাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন এবং আমাদের সকলকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলার তাওফীক প্রদান করুন। শবে বরাত বিষয়ক কিছু ভিত্তিহীন কথা আমাদের দেশে প্রচলিত একটি পুস্তক হতে উদ্ধৃত করছি। প্রায় সকল পুস্তকেই এই কথাগুলি কম বেশি লেখা হয়েছে।
“হাদীসে আছে, যাহারা এই রাত্রিতে এবাদত করিবে আল্লাহ তাআলা আপন খাছ রহমত ও স্বীয় অনুগ্রহের দ্বারা তাহাদের শরীরকে দোযখের অগ্নির উপর হারাম করিয়া দিবেন। অর্থাৎ তাহাদিগকে কখনও দোযখে নিক্ষেপ করিবেন না। হযরত(সা) আরো বলেন-আমি জিবরাঈল(আ) এর নিকট শুনিয়াছি, যাহারা শাবানের চাঁদের ১৫ই তারিখের রাত্রিতে জাগিয়া এবাদত বন্দেগী করিবে, তাহারা শবে ক্বদরের এবাদতের সমতুল্য ছওয়াব পাইবে।
আরও একটি হাদীসে আছে, হযরত(সা) বলিয়াছেন, শাবানের চাঁদের ১৫ই তারিখের রাত্রিতে এবাদতকারী আলেম, ফাজেল, অলী, গাউছ, কুতুব, ফকীর, দরবেশ ছিদ্দীক, শহীদ, পাপী ও নিষ্পাপ সমস্তকে আল্লাহ তা‘আলা মার্জনা করিবেন। কিন্তু যাদুকর, গণক, বখীল, শরাবখোর, যেনাকার, নেশাখোর, ও পিতা-মাতাকে কষ্টদাতা-এই কয়জনকে আল্লাহ তা‘আলা মাফ করিবেন না।
আরও একটি হাদীসে আছে, আল্লাহ তা‘আলা শাবানের চাঁদের ১৫ই তারিখের রাত্রিতে ৩০০ খাছ রহমতের দরজা খুলিয়া দেন ও তাঁহার বান্দাদের উপর বে-শুমার রহমত বর্ষণ করিতে থাকেন।
কালইউবী কিতাবে লিখিত আছে,-একদিন হযরত ঈসা(আ) জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন হে খোদাতাআলা! এ যামানায় আমার চেয়ে বুযুর্গ আর কেহ আছে কি? তদুত্তরে আল্লাহ তাআলা বলিলেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। সম্মুখে একটু গিয়াই দেখ। ইহা শুনিয়া হযরত ঈসা(আ) সম্মুখের দিকে চলিতে লাগিলেন………তখন বৃদ্ধ বলিলেন, আমি এতদ্দেশীয় একজন লোক ছিলাম। আমার মাতার দোওয়ায় আল্লাহ তাআলা আমাকে এ বুযুর্গী দিয়াছেন। সুতরাং আজ ৪০০ বৎসর ধরিয়া আমি এই পাথরের ভিতর বসিয়া খোদা তাআলার এবাদত করিতেছি এবং প্রত্যহ আমার আহারের জন্য খোদাতাআলা বেহেশত হতে একটি ফল পাঠাইয়া থাকেন। ইহা শুনিয়া হযরত ঈসা(আ) ছেজদায় পড়িয়া কাঁদিতে লাগিলেন। …….তখন আল্লাহ তা‘আলা বলিলেন, হে ঈসা(আ)! জানিয়া রাখ যে, শেষ যামানায় নবীর উম্মতদের মধ্যে যে ব্যক্তি শাবানের চাঁদের পনেরই তারিখের রাত্রে জাগিয়া এবাদত বন্দেগী করিবে ও সেদিন রোযা রাখিবে নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি আমার নিকট এই বৃদ্ধের চেয়েও বেশি বুযুর্গ ও প্রিয় হইতে পারিবে। তখন ঈসা(আ) কাঁদিয়া বলিলেন, হে খোদা তাআলা! তুমি আমাকে যদি নবী না করিয়া আখেরী যামানার নবীর উম্মত করিতে তাহা হইলে আমার কতই না সৌভাগ্য হইত! যেহেতু তাঁহার উম্মত হইয়া এক রাত্রিতে এত ছওয়াব কামাই করিতে পারিতাম। …….
হাদীসে আছে, শাবানের রাতে ১৪ই তারিখে সূর্য অস্ত যাইবার সময় নিম্নলিখিত দোওয়া ৪০ বার পাঠ করিলে ৪০ বৎসরের সগীরা গুনাহ মাফ হইয়া যাইবে।
-লা হাওলা ওয়ালা কুআতা ইল্লাবিল্লাহি।
…..দুই দুই রাকায়াত করিয়া চারি রাকাত নামায পড়িবে…..সূরা ফাতিহার পর প্রত্যেক রাকাতেই সূরা এখলাছ দশবার পড়িয়া পাঠ করিবে ও এই নিয়মেই নামায শেষ করিবে। হাদীস শরীফে আছে,-যাহারা এই নামায পড়িবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাহাদের চারিটি হাজত পুরা করিয়া দিবেন ও তাহাদের সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দিবেন।
তৎপর ঐ রাত্রিতে দুই দুই করিয়া আরো চারি রাকাত নামায পড়িবে।….প্রত্যেক রাকাতে সূরা ক্বদর একবার ও সূরা এখলাছ পঁচিশবার পাঠ করিবে এবং এই নিয়মে নামায শেষ করিবে।
হাদীস শরীফে আছে,-মাতৃগর্ভ হইতে লোক যেরূপ নিষ্পাপ হইয়া ভূমিষ্ঠ হয়, উল্লেখিত ৪ রাকাত নামায পড়িলেও সেইরূপ নিষ্পাপ হইয়া যাইবে। (মেশকাত)
হাদীস শরীফে আছে,-যাহারা এই নামায পাঠ করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাদের পঞ্চশ বৎসরের গুনাহ মার্জনা করিয়া দিবেন।
আরও হাদীসে আছে, -যাহারা উক্ত রাত্রে বা দিনে ১০০ হইতে ৩০০ মরতবা দুরূদ শরীফ হযরত(সা) এর উপর পাঠ করিবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাহাদের উপর দোজখ হারাম করিবেন। হযরত(দঃ)ও সুপারিশ করিয়া তাহাদিগকে বেহেশতে লইবেন।(সহীহ বুখারী)।
আর যাহারা উক্ত রাত্রিতে সূরা দোখান সাতবার ও সূরা ইয়াসীন তিনবার পাঠ করিবে, আল্লাহ তাহাদের তিনটি মকছুদ পুরা করিবেন। যথাঃ (১) হায়াত বৃদ্ধি করিবেন, (২) রুজি-রেজক বৃদ্ধি করিবেন, (৩) সমস্ত পাপ মার্জনা করিবেন। (মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মো‘মেনীন, পৃ. ২৩৬-২৪১)।
উপরের কথাগুলি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। সবচেয়ে দুঃখজনক কথা হলো. গ্রন্থকার এখানে মেশকাত, তিরমিযী ও বুখারীর উদ্ধৃতি দিয়েছেন ভিত্তিহীন কিছু কথার জন্য, যে কথাগুলি এই গ্রন্থগুলিতো দূরের কথা কোনো হাদীসের গ্রন্থেই নেই। এভাবে প্রতারিত হচ্ছেন সরলপ্রাণ বাঙালি পাঠক। বস্তুত এই পুস্তকটি এবং এই জাতীয় প্রচলিত পুস্তকগুলি জাল ও মিথ্যা কথায় ভরা। আমাদের সমাজে জাল হাদীসের প্রচলনের জন্য এরাই সবচেয়ে বেশি দামী।
২.১১.৯. রামাদান মাস
রামাদান মাসের ফযীলত, গুরুত্ব, ইবাদত, লাইলাতুল কাদর এর গুরুত্ব, ইবাদত ইত্যাদি কুরআন কারীম ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তবে এক্ষেত্রেও জালিয়াতগণ তাদের মেধা ও শ্রম ব্যয় করেছেন। অগণিত সহীহ হাদীসের পাশাপাশি অনেক জাল হাদীস তারা বানিয়েছেন। অনেক সময় তারা প্রসিদ্ধ সহীহ হাদীসের মধ্যে কিছু জাল কথা ঢুকিয়ে প্রচার করে। যেহেতু মূল ফযীলত প্রমাণিত, সেহেতু এ সকল জাল হাদীসের বিস্তারিত আলোচনা করছি না। প্রচলিত কয়েকটি জাল ও ভিত্তিহীন কথার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে শেষ করতে চাই। মহান আল্লাহর দরবারে তাওফীক প্রার্থনা করছি।
১. আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি ও আযাব-মুক্তি
রামাদান, সিয়াম, সেহরী খাওয়া, ইফতার করা ইত্যাদির গুরুত্ব, মর্যাদা, সাওয়াব ও বরকতের বিষয়ে অগণিত সহীহ হাদীস রয়েছে। তা সত্ত্বেও এগুলির বদলে অনেক আজগুবি বাতিল, ভিত্তিহীন ও জাল হাদীস আমাদের সমাজে প্রচলিত। একটি জাল হাদীসে বলা হয়েছে, “যখন রমজান মাসের প্রথম রাত্রি উপস্থিত হয়, তখন আল্লাহ তা‘আলা মাখলুকাতের (তাঁর সিয়াম পালনকারী সৃষ্টির) প্রতি রহমতের দৃষ্টিপাত করেন, আর আল্লাহ তা‘আলার রহমতের দৃষ্টি যাহার উপর পতিত হয়, সে কোন সময় শাস্তি ভোগ করিবে না।”(মুফতী হাবীব ছামদানি, বার চাঁন্দের ফযীলত, পৃ. ২৯-৩০)।
মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসটি জাল ও বানোয়াট। (ইবনুল জাওযী, আল মাউদূআত, ২/১০৪; সুয়ূতী, আল-লাআলী ২/১০০-১০১; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১৪৬)।
২. সাহরীর ফযীলত ও সাহরী ত্যাগের পরিণাম
সাহরী খাওয়ার উৎসাহ প্রদান করে একাধিক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। অন্তত এক চুমুক পানি পান করে হলেও সাহরী খেতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সাহরীকে বরকতময় আহার বলা হয়েছে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, ইহুদী ও খৃস্টানদের সাথে আমাদের সাহরীর পার্থক্য সাহরী খাওয়া।
কিন্তু এ সকল সহীহ ও হাসান হাদীসের পাশাপাশি কিছু অতিরঞ্জিত বানোয়াট হাদীসও প্রচলিত হয়েছে। যেমনঃ রাসূলুল্লাহ(সা) ফরমাইয়াছেন…..ছেহরীর আহারের প্রতি লোকমার পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা এক বৎসরের ইবাদতের সাওয়াব দান করিবেন।……..যে সেহরী খাইয়া রোজা রাখিবে সে ইহুদীদের সংখ্যানুপাতে সাওয়াব লাভ করিবে। ……তোমাদের মধ্য হইতে যে ব্যক্তি সেহরী খাওয়া হইতে বিরত থাকিবে, তাহার স্বভাব চরিত্র ইহুদীদের ন্যায় হইয়া যাইবে।……”(মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, পৃ. ৩৩-৩৪)। এ সকল কথাই সবই জাল ও বানোয়াট বলে প্রতীয়মান হয়।
৩. লাইলাতুল কাদর বনাম ২৭ শে রামাদান
কুরআন হাদীসে ‘লাইলাতুল কাদরের’ মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ(সা) লাইলাতুল কাদরকে নির্দিষ্ট করে দেন নি। রামাদান মা্সের শেষ দশ রাত এবং বিশেষ করে শেষ দশ রাতের মাঝে বিজোড় রাতগুলিতে লাইলাতুল কাদর সন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছেন। সাহাবী-তাবেয়ীগণের কেউ কেউ ২৭ শে রামাদান লাইলাতুল কাদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ(সা) হতে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছুই বর্ণিত হয় নি। কাজেই ‘২৭শে রামাদান’ এর ফযীলতে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট।
এই জাতীয় কিছু বাতিল কথা-“হাদীসে আছে-যে ব্যক্তি রামাদানের ২৭ তারিখের রাত্রিতে জাগিয়া ইবাদত বন্দেগী করিবে। আল্লাহ তায়ালা তার আমলনামায় এক হাজার বৎসরের এবাদতের ছওয়াব লিখিয়া দিবেন। আর বেহেশতে তাহার জন্য অসংখ্য ঘর নির্মাণ করাইবেন।…..আবূ বাকর ছিদ্দিকের প্রশ্নের উত্তরে রাছূল(সা) বলিয়াছিলেনঃ রমযানের ২৭ তারিখেই শবে কদর জানিও।…..রমযান মাসের ২৭ তারিখে সূর্যাস্ত যাওয়ার সময় নিম্নলিখিত দোওয়া ৪০ বার পাঠ করিলে ৪০ বৎসরের ছগীরা গুনাহ মার্জিত হইবে।(মাও. গোলাম রহমান, মোকছুদোল মো‘মেনীন, পৃ. ২৪৫-২৪৮)।
অনুরূপ বানোয়াট কথাঃ “হযরত রাসূলুল্লাহ(সা) এরশাদ করিয়াছেন, যেই ব্যক্তি রমজান মাসের ২৭ তারিখের রজনীকে জীবিত রাখিবে, তাহার আমলনামায় আল্লাহ ২৭ হাজার বৎসরের ইবাদতের তুল্য সাওয়াব প্রদান করিবেন এবং বেহেশতের মধ্যে অসংখ্য মনোরম বালাখানা নির্মাণ করিবেন যাহার সংখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউই অবগত নন। (মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, পৃ. ৩৯; অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, নেক কানুন, পৃ. ৩১৫)।
৪. লাইলাতুল কাদরের গোসল
শবে বরাতের ন্যায় কাদরের রাত্রিতেও গোসল করার বিষয়ে জাল হাদীস আমাদের সমাজে প্রচলিত। যেমনঃ “যাহারা শবে-ক্বদরের এবাদতের নিয়্যতে গোসল করিবে তাহাদের পা ধৌত করা শেষ না হইতেই পূর্বের পাপ মার্জিত হইয়া যাইবে।”(গোলাম রহমান, মোকছুদুল মো‘মেনীন, পৃ. ২৪৮; দুলাল, নেক কানুন, পৃ. ৩১৬)।
লাইলাতুল কাদরে গোসলের ফযীলতে কোনো হাদীস বর্ণিত হয় নি। তবে যয়ীফ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ(সা) রামাদান মাসের শেষ ১০ রাতের প্রত্যেক রাতে মাগরিব ও ইশার সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে গোসল করতেন। এইরূপ গোসলের ফযীলতে আর কিছু জানা যায় না। (ইবনু রাজাইব, লাতাইফ ২/৩০৯; ৩১৩-৩১৫)।
৫. লাইলাতুল ক্বাদরের সালাতের নিয়্যাত
আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, ‘নাওয়াইতু আন…..’ বলে যত প্রকারের নিয়্যত আছে সবই বানোয়াট। এখানে আরো লক্ষ্যণীয় যে, শবে বরাত, শবে কদর ইত্যাদি রাতে বা মর্যাদাময় দিনে নফল সালাত আদায়ের জন্য বিভিন্ন বানোয়াট নিয়্যাত প্রচলিত আছে। কোনো নফল সালাতের জন্যই কোনো পৃথক নিয়্যাত নেই। লাইলাতুল কাদর বা যে কোনো রাতের সালাতের নিয়্যাত হবে ‘সালাতুল লাইল’ বা ‘কিয়ামুল লাইল’ এর। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মুমিন দুই দুই রাকাত করে নফল সালাতের নিয়্যাত বা উদ্দেশ্য মনে নিয়ে যত রাকাত পারেন সালাত আদায় করবেন। যদি রাতটি সত্যই আল্লাহর নিকট ‘লাইলাতুল কদর’ বলে গণ্য হয় তাহলে বান্দা লাইলাতুল কাদরের সাওয়াব লাভ করবে। মুখে ‘আমি লাইলাতুল কাদরের নামায পড়ছি…..’ ইত্যাদি কথা বলা অর্থহীন ও ভিত্তিহীন।
৬. লাইলাতুল কাদরের সালাতের পরিমাণ ও পদ্ধতি
বিভিন্ন সহীহ হাদীসে ‘লাইলাতুল কাদর’ বা ‘কিয়ামুল্লাইল’ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কিয়ামুল্লাইল মানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নফল সালাত আদায় করা। এর জন্য কোনো বিশেষ রাকাত সংখ্যা, সূরা, আয়াত, দোয়া বা পদ্ধতি নেই। রাসূলুল্লাহ(সা) নিজে সুদীর্ঘ কিরআতে এবং সুদীর্ঘ রুকু ও সিজদার মাধ্যমে কিয়ামুল্লাইল করতেন। এজন্য সম্ভব হলে দীর্ঘ কিরআত বা দীর্ঘ রুকু সাজদা সহকারে সালাত আদায় করা উত্তম। না পারলে ছোট কিরআত সহকারে রাকাত সংখ্যা বাড়াবেন। মুমিন তার নিজের সাধ্য অনুসারে সূরা, তাসবীহ, দোয়া ইত্যাদি পাঠ করবেন। প্রত্যেকে তার কর্ম অনুসারে সাওয়াব পাবেন।
কাজেই লাইলাতুল ক্বাদরের সালাতের রাকাআত সংখ্যা, সূরার নাম, সালাতের পদ্ধতি, সালাতের মধ্যে বা পরে বিশেষ দোয়া ইত্যাদি সম্পর্কে যা কিছু বলা হয় সবই বাতিল ও মনগড়া কথা। (আব্দুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ১১৫)। অনেক প্রকারের মনগড়া কথা বাজারে প্রচলিত। একটি মনগড়া পদ্ধতি ও তৎসংশ্লিষ্ট কিছু জাল হাদীস একটি প্রসিদ্ধ পুস্তক হতে উদ্ধৃত করছি।
“শবে ক্বদরের নামায পড়িবার নিয়ম: এই রাত্রে পড়িবার জন্য নির্দিষ্ট ১২ রাকাত নফল নামায আছে। ঐ রাত্রিতে দুই রাকাত নফল নামায পড়িবে প্রথমে নিয়্যত করিবে, যথাঃ আমি আল্লাহরওয়াস্তে ক্বেবলারোখ দাঁড়াইয়া শবে-ক্বদরের দুই রাকাত নামায পড়িতেছি।” নিয়্যত ও তাকবীরে তাহরীমা অন্তে সুবহানাকা, আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ ও ‘ছূরা ফাতেহার’ পর প্রত্যেক রাকাতে ‘ছূরা ক্বদর’ একবার, ‘ছূরা এখলাছ’ তিনবার পাঠ করিবে এবং এইরূপে নামায শেষ করিবে।
হাদীছে আছে, যাহারা এই নামায পড়িবে, আল্লাহ তাআলা তাহাদিগকে সমস্ত শবে-ক্বদরের ছওয়াব বখশিশ করিবেন এবং হযরত ইদরীস, হযরত শোয়াইব, হযরত আইয়ুব, হযরত ইউছুফ, হযরত দাউদ ও হযরত নূহ আলাইহিচ্ছালাম এর সমস্ত পূণ্যের ছওয়াব তাহাদের আমলনামায় লিখিয়া দিবেন ও তাহাদের দোওয়া মকবুল হইবে এবং তাহাদিগকে বেহেশতের মধ্যে এই পৃথিবীর সমতুল্য একটি শহর দান করিবেন।
অতঃপর দুই দুই রাকাত করিয়া চারি রাকাত নফল নামায পড়িবে। প্রথমতঃ নিয়্যত করিবে। নিয়্যত ও তাকবীরে তাহরীমা পাঠান্তে প্রত্যেক রাকাতে ‘ছূরা ফাতেহার’ পর ‘ছূরা ক্বদর’ একবার ও ‘ছূরা এখলাছ’ ২৭ বার পড়িবে। ইহাও খেয়াল রাখিবে যে, প্রথমতঃ নিয়্যত করিয়া প্রথম রাকাতে ছূরা ফাতিহার পূর্বে ছূবহানাকা, আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ পড়িতে হয়। কিন্তু তৎপর যত রাকাতই হউকনা কেন প্রত্যেক রাকাতে ছূরা ফাতেহার পূর্বে কেবলমাত্র বিছমিল্লাহ পড়িতে হইবে এবং উল্লেখিত নিয়মেই পড়িয়া নামায শেষ করিবে।
হাদীসে আছে, যাহারা এই নামায পড়িবে, আল্লাহ তাআলা তাহাদিগকে এইরূপ নিষ্পাপ করিয়া দিবেন, যেমন অদ্যই মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়াছে। আর বেহেশতে তাহাদের জন্য হাজার বালাখানা তৈয়ার হইবে। –(মেশকাত)।
তৎপর দুই দুই রাকাত করিয়া চারি রাকাত নামায পড়িবে। অতঃপর দুই দুই রাকাত করিয়া চারি রাকাত নফল নামায পড়িবে। প্রথমতঃ নিয়্যত করিবে। নিয়্যত ও তাকবীরে তাহরীমা পাঠান্তে ছোবহানাকা, আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ ও ‘ছূরা ফাতেহার’ পর প্রত্যেক রাকাতে ‘ছূরা ক্বদর’ তিনবার ও ‘ছূরা এখলাছ’ ৫০ বার পাঠ করিবে এবং এইরূপে নামায শেষ করিয়া ছেজদায় গিয়া ঐ দোওয়া একবার পড়িবে-যাহা সূর্যাস্ত যাইবার কালে পড়িবার জন্য লিখা হইয়াছে।
হাদীছে আছে, যাহারা এই নামায পড়িবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাহাদের সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দিবেন ও তাহাদের দোওয়া খোদা তাআলার দরবারে মকবুল হইবে।”(মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মোমেনীন, পৃ. ২৪৮)।
এগুলি সবই ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা। ‘মেশকাত’ তো দূরের কথা কোনো হাদীসের গ্রন্থেই এ সকল কথা পাওয়া যায় না।
৭. লাইলাতুল কাদরের কারণে কদর বৃদ্ধি
আমাদের দেশে প্রচলিত একটি পুস্তকে নিম্নোক্ত হাদীসটি লিখা হয়েছে।
“যে ব্যক্তি লাইলাতুল কাদর পাবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার কদর বা মর্যাদা বাড়িয়ে দিবেন।”(মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মোমেনীন, পৃ. ২৪৩)।
এই হাদীসটি জাল ও ভিত্তিহীন বলেই প্রতীয়মান হয়।
৮. জুমু‘আতুল বিদা বিষয়ক জাল কথা
সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে, জুমু‘আর দিন ‘সাইয়েদুল আইয়াম’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। সূর্যের নিচে এর চেয়ে উত্তম দিবস আর নেই।(মুসলিম, আস সহীহ, ২/৫৮৯; ইবনু হিব্বান, ৩/১৯১)। অনুরূপভাবে রামাদান শ্রেষ্ঠ ও বরকতময় মাস।(বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৩/৩১৪-৩৫৫; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/১৪০)। কাজেই রামাদান মাসের জুমু‘আর দিনটির মর্যাদা সহজেই অনুমেয়। মুমিন স্বভাবতই প্রত্যেক জুমুআর দিনে নেক আমলগুলি বেশি বেশি করার চেষ্টা করেন। একইভাবে রামাদানের প্রত্যেক দিনই মুমিন সাধ্যমত নেক কর্মের চেষ্টা করেন। আর রামাদানে জুমু‘আর দিনে উভয় প্রকার চেষ্টা একত্রিত হয়। রামাদান মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফযীলত পূর্ণ দিন হলো শেষ দশ দিন। এ ছাড়া রামাদানের শেষে রামাদান চলে যাচ্ছে বলে মুমিনের কিছু অতিরিক্ত আগ্রহ বাড়া্ই স্বাভাবিক।
এ ছাড়া রামাদান মাসের শেষ জুমু’আ বা অন্য কোনো জুমু‘আর দিনের কোনো বিশেষ ফযীলত সম্পর্কে কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীস বর্ণিত হয় নি। তবে জালিয়াতগণ রামাদানের শেষ জুমু‘আর দিনের বা ‘বিদায়ী জুমু‘আর’ বিশেষ কিছু ফযীলত বানিয়ে সমাজে প্রচার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এই দিনে কাযা সালাত ও উমরী কাযা আদায়ের ফযীলত ও এই দিনের বিশেষ দোয়া বিষয়ক কিছু জাল ও বানোয়াট কথা। যেমনঃ “যদি কোনো ব্যক্তি রামাদান মাসের শেষ জুমু‘আর দিনে এক ওয়াক্ত(অন্য জাল বর্ণনায় ৫ ওয়াক্ত) কাযা সালাত আদায় করে তবে ৭০ বৎসর পর্যন্ত তার সকল কাযা সালাতের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে।”
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই কথাটি জাল ও মিথ্যা কথা।(মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ২৪২; দরবেশ হুত, আসানুল মাতালিব, পৃ. ২২৫)।
বাহ্যত এই জাল হাদীসটির প্রচলন ঘটছে বেশ দেরী করে। ফলে ৬ষ্ঠ-৭ম শতাব্দীতে যারা জাল হাদীস সংকলন করেছেন তারা তা উল্লেখ করেন নি। ১০ হিজরী শতক হতে মোল্লা আলী কারী(১০১৪ হি) ও অন্যান্য মুহাদ্দিস এর জালিয়াতির বিষয়ে আলোকপাত করেন। আল্লামা শাওকানী(১২৫০) বলেন, “এই কথাটি যে বাতিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি কোনো মাউদূ হাদীসের গ্রন্থেও এই হাদীসটি পাইনি। কিন্তু আমাদের যুগে আমাদের সানআ(ইয়ামানের রাজধানী) শহরে অনেক ফকীহ ও ফিকহ অধ্যয়নকারীদের মধ্যে তা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এদের অনেকেই এর উপর আমল করে। জানি না কে এই জাল কথাটি বানিয়েছে। আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের অপমান করুন।(শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ১/৭৯)।
কোনো কোনো আলিম জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে এই জাল ও ভিত্তিহীন কথাটি তাদের গ্রন্থে লিখেছেন। ৭ম-৮ম শতকের প্রসিদ্ধ ফকীহ আল্লামা হুসাইমুদ্দীন হুসাইন ইবনু আলী সাগনাকী(৭১০ হি) হেদায়া’র ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আন-নিহায়া’ নামক গ্রন্থে এই কথাটিকে ‘হাদীস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ‘আন-নিহায়া’ হিদায়ার অন্যতম ব্যাখ্যা গ্রন্থ। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারগণ এই গ্রন্থের উপর নির্ভর করেছেন। ফলে হেদায়ার পরবর্তী অনেক ব্যাখ্যাকার এই জাল কথাটি ‘হাদীস’ হিসেবে লিখেছেন। অনেক সময় বড় আলিমদের প্রতি মানুষের ভক্তি শ্রদ্ধা তাদের সকল কথা নির্বিচারে গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি করে। তাঁদের গ্রন্থে এই হাদীস উদ্ধৃত থাকাতে অনেক সাধারণ মানুষ এ্ই জাল কথাটিকে সঠিক বলে মনে করতে পারেন। এজন্য মোল্লা আলী কারী বলেনঃ “এই কথাটি নিঃসন্দেহে বাতিল। কারণ এই কথাটি এজমা বা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমতের বিরোধী। মুসলিম উম্মাহ একমত যে, কোনো একটি ইবাদত কখনোই অনেক বৎসরের পরিত্যক্ত ইবাদতের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না বা ক্ষতিপূরণ করতে পারে না। এরপর নেহায়া-র রচয়িতা এবং হেদায়ার অন্যান্য ব্যাখ্যাকার এর উদ্ধৃতির কোনো মূল্য নেই; কারণ তাঁরা মুহাদ্দিস ছিলেন না এবং তাঁরা কোনো হাদীস গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েও এই হাদীসটি উল্লেখ করেন নি।”(মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ২৪২; আব্দুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ৮৫)।
আল্লামা আলী কারীর এই কথার টীকায় বর্তমান যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও হানাফী ফকীহ আল্লামা আব্দুল গুদ্দাহ বলেনঃ “অত্যন্ত ভাল কথা বলেছেন! অত্যন্ত ভাল কথা বলেছেন!! রাসূলুল্লাহ(সা) এর হাদীসে পক্ষ হতে আল্লাহ আপনাকে উত্তম পুরস্কার প্রদান করুন।”(আব্দুল ফাত্তাহ আবূ গুদ্দাহ, মোল্লা আলী কারীর আল-মাসনূ গ্রন্থের টীকা, ১৫৭ পৃ.)।
৯. প্রচলিত কিছু ভিত্তিহীন কথাবার্তার নুমনা
ইতোপূর্বে উল্লেখ করছি যে, আমাদের দেশে প্রচলিত পুস্তাকাদিতে অনেক সময় লেখকগণ সহীহ হাদীস বাদ দিয়ে যয়ীফ ও জাল হাদীসের উপর নির্ভর করা ছাড়াও বিশুদ্ধ ও অশুদ্ধকে এমনভাবে সংমিশ্রণ করেন যে, পূরা কথাটি রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে মিথ্যায় পরিণত হয়। হাদীস গ্রন্থের উদ্ধৃতিও অনেক সময় মনগড়াভাবে দেওয়া হয়। একটি পুস্তকে বলা হয়েছেঃ “হযরত (সা) বলিয়াছেন, যাহারা শবে ক্বদরে বন্দেগী করিবে তাহারা শত বৎসরের নেকীর ছওয়াব পাইবে। হযরত(সা) আরো বলিয়াছেন, যাহারা শবে-ক্বদরে এবাদত করিয়াছে দোযখের আগুন তাহাদের উপর হারাম হইবে। আর একটি হাদীসে আছে, যদি তোমরা তোমাদের গোরকে আলোকময় পাইতে চাও, তবে শবে-ক্বদরে জাগরিত থাকিয়া এবাদত কর। আরও হাদীসে আছে-যাহারা শবে-ক্বদরে জাগিয়া এবাদত করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাদের ছগীরা, কবীরা সমস্ত পাপই মার্জনা করিবেন ও কিয়ামতের দিন তাহাদিগকে কিছুতেই নিরাশ করিবেন না। আর একটি হাদীসে আছে, -যে ব্যক্তি শবে-ক্বদর পাইবে নিশ্চয়ই আমি তাকে বেহেশতে লইবার জন্য জামিন হইব।…..”
“হাদীসে আছে, একদিন মূছা(আ) আল্লাহ তায়ালাকে প্রশ্ন করিলেন, হে আল্লাহ তায়ালা তুমি উম্মতে মোহাম্মদীকে উৎকৃষ্ট কোন জিনিস দান করিয়াছ? তদুত্তরে আল্লাহ তায়ালা বলিলেন, আমি হযরত মোহাম্মাদ(সা) এর উম্মাতকে উৎকৃষ্ট রমজান মাস দান করিয়াছি। মুছা(আ) বলিলেন, প্রভু সেই মাসের কি ফযীলত ও মরতবা তাহা আমাকে শুনাও। তখন আল্লাহ তায়ালা বলিলেন, হে মূছা! রমযান মাসের ফযীলত ও মরতবার কথা কতই শুনাইব তবে সামান্য এতটুকুতেই বুঝিতে পারিবে যে, উহার মর্যাদা কি পরিমাণ! তোমাদের সাধারণের মধ্যে আমার মর্যাদা ও সম্মান যেরূপ অতুলনীয়, অন্যান্য মাস হইতে রমযান মাসের মর্যাদাও তেমনি অতুলনীয় জানিবে। (তিরমিযী)”……..
হযরত(সা) বলেছেন, যাহারা নিজের পরিবার পরিজনসহ সন্তোষের সহিত রমজান মাসের ৩০টি রোজা রাখিয়াছে, হালাল জিনিস দ্বারা ইফতার করিয়াছে, আল্লাহ তায়ালা তাহাদিগকে ঐ প্রকার ছওয়াব দিবেন, যেমন তারা মক্কা শরীফে ও মদীনা শরীফে রোযা রাখিয়াছে। হাদীসে আছে, যাহারা উক্ত স্থানসমূহে রোযা রাখিবে, আল্লাহ তায়ালা তাহাদের ৭০ হাজার হজ্জ্বের, ৭০ হাজার ওমরার ও ৭০ হাজার রমযান মাসের ছওয়াব দিবেন ও পৃথিবীতে যত ঈমানদার বান্দা আছেন, সমস্তের নেকীর ছওয়াব দিবেন আর ঐ পরিমাণ পাপও তাহাদের আমলনামা হইতে কাটিয়া দিবেন। আর সপ্ত আকাশে যত ফেরেশতা আছে, তাহাদের সমস্ত পূণ্যের ছওয়াব তাহাদের আমলনামায় লিখিয়া দিবেন। (তিরমিজী)।(মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মো‘মেনীন, পৃ. ২৭৪-২৭৫)।
এ সকল কথা এভাবে সুনানে তিরমিযী তো দূরের কথা, অন্য কোনো হাদীস গ্রন্থে সহীহ বা যয়ীফ সনদে বর্ণিত হয়েছে বলে জানতে পারিনি। শুধুমাত্র মক্কা মোকাররমায় রামাদান পালনের বিষয়ে দুই একটি যয়ীফ ও বানোয়াট হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সম্ভবত গ্রন্থকার এখানে ইবনু মাজাহ সংকলিত নিম্নের হাদীসটির ‘ইচ্ছামত’ অনুবাদ করেছেনঃ
ইবনু মাজাহ বলেন, আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবনু আবী উমার বলেছেন, আমাদেরকে আব্দুর রাহীম ইবনু যাইদ আল আম্মী বলেছেন, তার পিতা থেকে, সাঈদ ইবনু জুবাইর থেকে, ইবনু আব্বাস থেকে, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেনঃ “যে ব্যক্তি মক্কায় রামাদান মাস পাবে, সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার জন্য অন্যত্র এক লক্ষ রামাদান মাসের সাওয়াব লিপিবদ্ধ করবেন। এবং আল্লাহ তার জন্য প্রতি দিবসের পরিবর্তে একটি দাসমুক্তি এবং প্রতি রাতের পরিবর্তে একটি দাসমুক্তি, এবং প্রতিদিনের জন্য আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য ঘোড়সাওয়ার পাঠানো এবং প্রতি দিনের জন্য একটি নেকি ও প্রতি রাতের জন্য একটি নেকি লিপিবদ্ধ করেন।”(ইবনু মাজাহ, আস সুনান ২/১০৪১)।
এই হাদীসটি একমাত্র আব্দুর রাহীম ইবনু যাইদ আল আম্মী(১৮৪ হি) নামক এই ব্যক্তি ছাড়া কেউই বর্ণনা করে নি। এই আব্দুর রহীম একজন মিথ্যাবাদী ও জালিয়াত রাবী বলে প্রসিদ্ধ। ইমাম বুখারী, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন ও অন্যান্য মুহাদ্দিস তাকে মিথ্যাবাদী, জালিয়াত ও পরিত্যক্ত বলে গণ্য করেছেন। এজন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীসটিকে জাল বলে গণ্য করেছেন।(ইবনু মাজাহ, আস সুনান ২/১০৪১; বাইহাকী, শুআবুল ঈমান, ৩/৩৪৭, ৩৮৭)।
২.১১.১০. শাওয়াল মাস
প্রথমত, সহীহ হাদীসের আলোকে শাওয়াল মাস
শাওয়াল মাস হজ্জের মাসগুলির প্রথম মাস। এই মাস হতে হজ্জ্বের কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়া সহীহ হাদীস দ্বারা এই মাসের একটি ফযীলত প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) এরশাদ করেছেনঃ “যে ব্যক্তি রামাদান মাসের সিয়াম পালন করবে। এরপর সে শাওয়াল মাসে ৬টি সিয়াম পালন করবে, তার সারা বৎসর সিয়াম পালনের মত হবে। (মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮২২)।
কোনো কোনো যয়ীফ হাদীসে পুরো শাওয়াল মাস সিয়াম পালনের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। একটি যয়ীফ হাদীসে বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি রামাদান এবং শাওয়াল মাস এবং (সপ্তাহে) বুধবার ও বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”(আহমদ, আল মুসনদা ৩/৪১৬; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/১৯০; ইবনু রাজাব, লাতাইফ ২/৩৬০-৩৬১)।
এছাড়া শাওয়াল মাসের আর কোনো ফযীলত প্রমাণিত নয়। মুমিন এ মাসে তার তাহাজ্জুদ, চাশত, যিকর ওযীফা ইত্যাদি সাধারণ ইবাদত নিয়মিত পালন করবেন। সাপ্তাহিক ও মাসিক নফল সিয়াম নিয়মিত পালন করবেন। অতিরিক্ত এই ছয়টি সিয়াম পালন করবেন। এছাড়া এই মাসের জন্য বিশেষ সালাত, সিয়াম, যিকর, দোয়া, দান বা অন্য কোনো নেক আমল, অথবা এই মাসে কোনো নেক আমল করলে বিশেষ সওয়াবের বিষয়ে যা কিছু প্রচলিত বা কথিত সবই ভিত্তিহীন বা বানোয়াট কথা। এগুলির অনেক কথা সাধারণভাবে শাওয়াল মাসের ফযীলত ও ছয় রোযার বিষয়ে বানানো হয়েছে। আর কিছু কথা শাওয়াল মাসের প্রথম দিন বা ঈদুল ফিতরের দিনের বিশেষ নামায বা আমলের বিষয়ে বানানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, শাওয়াল মাস বিষয়ক কিছু জাল হাদীস
১.৬. রোযা ও অন্যান্য ফযীলত
এ সকল বানোয়াট কথার মধ্যে রয়েছেঃ “হাদীস শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ(সা) ফরমাইয়াছেনঃ যেই ব্যক্তি শাওয়াল মাসে নিজেকে গুনাহের কর্ম হইতে বিরত রাখিতে সক্ষম হইবে আল্লাহ তায়ালা তাকে বেহেশতের মধ্যে মনোরম বালাখানা দান করিবেন। অন্য এক হাদীসে আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি শাওয়াল মাসের প্রথম রাত্রিতে বা দিনে দুই রাকয়াতের নিয়্যতে চার রাকয়াত নামায আদায় করিবে এবং উহার প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর ২১ বার করিয়া সূরা ইখলাছ পাঠ করিবে; করুণাময় আল্লাহ তায়ালা তাহার জন্য জাহান্নামের ৭টি দরজা বন্ধ করিয়া দিবেন এবং জান্নাতের ৮টি দরজা উন্মুক্ত করিয়া দিবেন। আর মৃত্যুর পূর্বে সে তাহার বেহেশতের নির্দিষ্ট স্থান দর্শন করিয়া লইবে।…….অন্য আর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রাসূলুল্লাহ(সা) ফরমাইয়াছেন, যে ব্যক্তি শাওয়াল মাসে মৃত্যুবরণ করিবে সে ব্যক্তি শহীদানের মর্যাদায় ভূষিত হইবে।….”(মুফতী ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, ৩৯; অধ্যাপিকা দুলাল, নেক কানুন, ৩১৯-৩২০)।
এগুলি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা হাদীসের নামে বলা হয়েছে। শাওয়াল মাসে ৬টি সিয়ামের ফযীলত সহীহ হাদীসের আলোকে আমরা জেনেছি। এ বিষয়ে অতিরঞ্জিত অনেক জাল কথাও প্রচলন করা হয়েছে। যেমনঃ হযরত রাসূলুল্লাহ(সা) ফরমাইয়াছেন, যে ব্যক্তি শাওয়াল মাসে ৬টি রোযা রাখিবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে শাস্তির শৃঙ্খল ও কঠোর জিজ্ঞিরের আবেষ্টনী হইতে নাজাত দিবেন…অন্য হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে, হযরত রাসূলুল্লাহ(সা) ফরমাইয়াছেন, যে ব্যক্তি শাওয়াল মাসের ৬টি রোযা রাখিবে, তাহার আমলনামায় প্রত্যেকটি রোযার পরিবর্তে সহস্র রোজার সওয়াব লেখা হইবে।”……“রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন,…যে ব্যক্তি শাওয়াল মাসে রোযা রাখেন আল্লাহ পাক তার জন্য দোযখের আগুন হারাম করে দেন। ……যে ব্যক্তি শাওয়াল মাসের ৬টি রোযা রাখিবে, তাহার আমলনামায় সমস্ত মোহাম্মদী নেককার লোকের সাওয়াব লিখেণ এবং সে হযরত সিদ্দিক আকবার(রা) এর সাথে বেহেশতে স্থান পাইবে। …..যে ব্যক্তি শাওয়াল মাসে রোযা রাখে আল্লাহ তায়ালা তাকে লাল ইয়াকুত পাথরের বাড়ী দান করবেন এবং প্রত্যেক বাড়ীর সম্মুখে দুধ ও মধুর নহর প্রবাহিত হতে থাকবে। ফেরেশতারা তাকে আসমান হতে ডেকে বলবেন, হে আল্লাহর খাস বান্দা, আল্লাহ তোমাকে মাফ করে দিয়েছেন। শাওয়াল মাসে লূতের(আ)কওম ধ্বংস হয়েছিল, নূহের(আ) কওম ডুবেছিল, হুদের(আ) কওম ধ্বংস হয়েছিল…….”(মুফতী ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, ৪২-৪৩; অধ্যাপিকা দুলাল, নেক কানুন, ৩২০)।
ইত্যাদি অসংখ্য মিথ্যা কথা দুঃসাহসের সাথে নিঃসঙ্কোচে রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বলা হয়েছে। আমাদের সম্মানিত লেখকগণ একটুখানিও চিন্তা ও যাচাই না করেই সেগুলি তাঁদের পুস্তকে লিখেন। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
২. ঈদুল ফিতরের দিনের বা রাতের বিশেষ সালাত
শাওয়ালের ১ম তারিখ ঈদুল ফিতর। একাধিক যয়ীফ হাদীসে ঈদুল ফিতরের রাত ইবাদতে জাগ্রত থাকতে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু ইবাদতের কোনো নির্ধারিত পদ্ধতি, রাক‘আত সংখ্যা, সূরা ইত্যাদি বলা হয় নি।
ঈদের দিনে সালাতুল ঈদ ছাড়া অন্য কোনো বিশেষ নফল সালাতের নির্দেশনা কোনো সহীহ হাদীসে নেই। তবে জালিয়াতগণ এ বিষয়ে কিছু হাদীস রচনা করেছে। শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখের দিনে বা রাতের ৪ রাকা’আত সালাত বিষয়ক একটি জাল হাদীস পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছি। এ বিষয়ক আরো একটি প্রচলিত জাল হাদীস উল্লেখ করছিঃ “যিনি আমাকে নবীরূপে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ, জিবরাঈল আমাকে ঈসরাফীলের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট থেকে বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের রাতে ১০০ রাকা‘আত সালাত আদায় করবে, প্রত্যেক রাক‘আতে একবার করে সূরা ফাতিহা এবং ১১ বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে, এরপর রূকুতে এবং সাজদায় ……..অমুক দোয়া ১০ বার পাঠ করবে, এরপর সালাত শেষে ১০০ বার এসতেগফার পাঠ করবে। এরপর সেজদায় গিয়ে বলবে……। যদি কেউ এরূপ করে তাহলে সেজদা হতে উঠার আগেই তার পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, রামাদানের সিয়াম কবুল করা হবে ……ইত্যাদি ইত্যাদি।(ইবনুল জাওযী, আল মাউদূ‘আত, ২/৫২; যাহাবী, তারতীবুল মাউদূ‘আত, পৃ. ১৬৩; সুয়ূতী, আল-লাআলী ২/৬০-৬১)।
৩. ঈদুল ফিতরের পরে ৪ রাক‘আত সালাত
ঈদুল ফিতরের দিনে কোনো বিশেষ সালাতের বিশেষ সাওয়াব বা বৈশিষ্ট্য নেই। কিন্তু জালিয়াতগণ সালাতুল ঈদ আদায়ের পরে ৪ রাক‘আত সালাতের বিশেষ ফযীলতের কাল্পনিক কাহিনী বানিয়েছে। একটি জাল হাদীস নিম্নরূপঃ
“যদি কেউ সালাতুল ঈদ আদায় করার পরে ৪ রাক‘আত সালাত আদায় করে, প্রত্যেক রাক‘আতে অমুক অমুক সূরা পাঠ করে, তবে সে যেন আল্লাহর নাযিল করা সকল কিতাব পাঠ করল, সকল এতিমকে পেটভরে খাওয়াল, তেল মাখালো, পরিষ্কার করলো। তার ৫০ বছরের পাপ ক্ষমা করা হবে। তাকে এত এত পুরস্কার দেওয়া হবে……।(ইবনুল জাওযী, আল মাউদূ‘আত, ২/৫৩-৫৪; যাহাবী, তারতীবুল মাউদূ‘আত, পৃ. ১৬৪; সুয়ূতী, আল-লাআলী ২/৬১)।
২.১১.১১. যিলকাদ মাস
যুলকা’দা বা যিলকাদ মাসের সাধারণ দুটি মর্যাদা রয়েছেঃ প্রথমত, তা ৪ টি হারাম মাসের একটি। দ্বিতীয়ত, তা হজ্জ্বের মাসগুলির দ্বিতীয় মাস। এ ছাড়া এই মাসের বিশেষ কোনো ফযীলত হাদীসে বর্ণিত হয় নি। তবে জালিয়াতগণ এ বিষয়ে কিছু মিথ্যা ও বানোয়াট কথা প্রচার করেছে। এগুলির মধ্যে রয়েছেঃ “রাসূলুল্লাহ(সা) ফরমান, তোমরা যিলক্বদ মাসকে সম্মান করিবে, যেহেতু ইহা মর্যাদাবান মাসসমূহের মধ্যে প্রথম মাস। ….যে ব্যক্তি যিলক্বদ মাসের ভিতরে একদিন রোযা রাখিবে, আল্লাহ তা‘আলা উহার প্রতি ঘন্টার পরিবর্তে একটি হজ্জের সাওয়াব তাহাকে দান করিবেন।….যে ব্যক্তি এই মাসের কোনো জুমুয়ার দিবসে দুই দুই রাকায়াতের নিয়তে চার রাকায়াত নামায আদায় করিবে, যাহার প্রতি রাকায়াতে সূরা ফাতিহার পরে ১০ বার করিয়া সূরা ইখলাছ পাঠ করিবে, আল্লাহ তা‘আলা তাহাকে একটি হজ্জ ও একটি ওমরার সওয়াব দান করিবেন। …..যে ব্যক্তি যিলক্বদ মাসের প্রত্যেক রজনীতে দুই রাক‘আত করিয়া নামায আদায় করিবে এবং ইহার প্রতি রাকয়াতে সূরা ফাতিহার পরে সূরা ইখলাছ তিনবার পাঠ করিবে আল্লাহ তা‘আলা সেই ব্যক্তির আমলনামায় একজন হাজী ও একজন শহীদের পূণ্যের তুল্য সাওয়াব দান করিবেন এবং রোজ কিয়ামতে সেই ব্যক্তি আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান লাভ করিবে।….” “এই মাসের রোজাদারের প্রত্যেক নিঃশ্বাসে একটি গোলাম আজাদ করার সাওয়াব প্রদান করেন। …এই মাসকে গনীমত মনে করবে। যেহেতু যে ব্যক্তি এ মাসে একদিন এবাদত করে উহা হাজার বছর হতেও উৎকৃষ্ট। …যিলক্বদ মাসের সোমবারের রোজা হাজার বৎসরের এবাদত হতেও উৎকৃষ্ট। …..এই চাঁদে যে একদিন রোজা রাখবে, আল্লাহ পাক তার জন্য প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসে এক একটি মকবুল হজ্জ্বের সাওয়াব দান করবেন।…….ইত্যাদি ইত্যাদি …।”(মুফতী ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত, ৪৪-৪৫; অধ্যাপিকা দুলাল, নেক কানুন, ৩২১-৩২২)।
এগুলি সবই দুঃসাহসী নির্লজ্জ জালিয়াতগণের কথা, যা তারা রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে বানিয়ে প্রচার করছে এবং জাহান্নামে নিজেদের আবাসস্থল বানিয়েছে। দুঃখজনক হলো, অনেক আলিম বা লেখক যাচাই বাছাই না করেই এই সমস্ত আজগুবি মিথ্যা কথাকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। অন্তত কোন্ গ্রন্থে হাদীসটি সংকলিত তা যাছাই করলেও জালিয়াতি ধরা পড়ত। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাযত করুন।
২.১১.১২. যিলহাজ্জ মাস
যুলহাজ্জ বা যিলহাজ্জ মাস ৪টি হারাম মাসের অন্যতম। এ মাসেই হজ্জ আদায় করা হয় এবং এই মাসেই ঈদুল আযহা উদযাপিত হয়। এই মাসের প্রথম দশ দিনে বেশি বেশি নেক কর্ম করতে সহীহ হাদীসে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ(সা) এরশাদ করেন, “যুলহাজ্জ মাসের প্রথম দশদিন নেক আমল করা আল্লাহর নিকট যত বেশি প্রিয় আর কোনো দিনের আমল তাঁর নিকট তত প্রিয় নয়।”(বুখারী, আস-সহীহ ১/৩২৯; তিরমিযী, আস সুনান, ৩/১৩০-১৩১)।
যয়ীফ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এই দশদিনের প্রতি দিনের সিয়াম এক বৎসরের সিয়ামের তুল্য এবং প্রত্যেক রাত লাইলাতুল ক্বদরের তুল্য। (তিরমিযী, আস-সুনান ৩/৩১৩)।
অন্য একটি দুর্বল হাদীসে বলা হয়েছে, “এই দশদিনের নেক আমলে ৭০০ গুণ সাওয়াব প্রদান করা হয়।”(বাইহাকী, শুআবুল ঈমান ৩/৩৫৬; মুনযিরী, আত তারগীব ২/১২৮)। অন্য একটি যয়ীফ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, আনাস ইবনু মালিক(রা) বলেছেন, কথিত আছে যে, যিলহাজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন এক হাজার দিনের সমান এবং বিশেষত আরাফার দিন ১০ হাজার দিনের সমান।”(বাইহাকী, শুআবুল ঈমান ৩/৩৫৮; মুনযিরী, আত তারগীব ২/১২৮)।
যুলহাজ্জ মাসের ৯ তারিখে হাজীগণ আরাফার মাঠে অবস্থানের মাধ্যমে হজ্জের মূল দায়িত্ব পালন করেন। যারা হজ্জ করছেন না তাদের জন্য এই দিনে সিয়াম পালনের বিশেষ উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, এই দিনের সিয়ামের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন, “তা বিগত বৎসর এবং পরবর্তী বৎসরের পাপ মার্জনা করে।”(মুসলিম, আস সহীহ ২/৮১৯)।
দ্বিতীয়ত, জিলহজ্জ মাস বিষয়ক কিছু বানোয়াট কথা
এ সকল সহীহ ও যয়ীফ হাদীসের পাশাপাশি এ মাসের ফযীলতে অনেক জাল হাদীস সমাজে প্রচলিত রয়েছে। এ সকল জাল হাদীসে এ মাসের জন্য বিশেষ বিশেষ সালাত ও সিয়ামের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া এ মাসের প্রথম ১০ দিনের ফযীলতের বিষয়েও অনেক জাল কথা তারা বানিয়েছে।
১. যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দিন
যিলহাজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের অংশ হিসেবে এই দিনটির ফযীলত রয়েছে। কিন্তু জালিয়াতগণ অন্য ফযীলত বর্ণনা করেছে। “যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দিন হযরত ইবরাহীম(আ) জন্মগ্রহণ করেন। কাজেই যে ব্যক্তি এই দিনে সিয়াম পালন করবে সে ৭০ বৎসর সিয়াম পালনের সাওয়াব পাবে….তার ৮০ বৎসরের পাপের মার্জনা হবে…..।”(সুয়ূতী, যাইল আল লাআলী, পৃ. ১১৯; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১৬৫; তাহের ফাতানী, তাযকিরা, পৃ. ১১৯)।
২. যিলহাজ্জ মাসের ৮ তারিখ, ইয়াওমুত তারবিয়া
যিলহাজ্জ মাসের ৮ তারিখকে ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’ বলা হয়। এই দিনে হজ্জের কার্য্যক্রম শুরু হয়। হাজীগণ এইদিনে হজ্জের জন্য মক্কা হতে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। হাজী ছাড়া অন্যদের জন্য এই দিনের বিশেষ কোনো আমল নেই। যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশদিনের অংশ হিসেবে এর মর্যাদা রয়েছে। কিন্তু জালিয়াতগণ এই তারিখের দিবসে ও রাতের জন্য বিশেষ সালাত ও সিয়ামের কাহিনী রচনা করেছে। ইতোপূর্বে শবে বরাত বিষয়ক জাল হাদীস আলোচনার সময় ‘তারবিয়ার’ রাত বা যিলহাজ্জ মাসের ৮ তারিখের রাত ইবাদতে জাগ্রত থাকার বিষয়ে কয়েকটি জাল বা অত্যন্ত দুর্বল হাদীস আমরা দেখতে পেয়েছি। আরেকটি জাল হাদীসে বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি তারবিয়ার দিনে সিয়াম পালন করবে আল্লাহ তাকে সেই পরিমাণ সাওয়াব প্রদান করবেন, যে পরিমাণ সাওয়াব আইয়ূব(আ) বালা মুসিবতের কারণে লাভ করেছিলেন।”(সুয়ূতী, যাইল আল লাআলী, পৃ. ১২১; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১৬৫; তাহের ফাতানী, তাযকিরা, পৃ. ১২১)।
৩. যিলহাজ্জ মাসের ৯ তারিখ, আরাফার দিন
আরাফার দিনে সিয়াম পালনের ফযীলত আমরা জানতে পেরেছি। হাজীগণ ব্যতীত অন্য মুসলিমের জন্য এই তারিখের দিনে বা রাতে আর কোনো বিশেষ সালাত, দোয়া, যিকির বা অন্য কোনো নেক আমলের র্নিধারিত বিধান বা পদ্ধতি কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। জালিয়াতগণ এ দিনের সালাত, যিকর, দোয়া ইত্যাদির বিষয়েও অনেক জাল হাদীস প্রচার করছে।
৪. যিলহাজ্জ মাসের বানোয়াট সালাত
আমরা দেখেছি যে, যিলহাজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন ও রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে নফল সালাত বা সিয়াম, যিকর, দোয়া, দান ইত্যাদি সকল প্রকার ইবাদত বন্দেগী যথাসাধ্য বেশি বেশি পালন করা দরকার। যে যতটুকু করতে পারবেন ততটুকুর সাওয়াব পাবেন। এ সকল দিনে বা জিলহাজ্জ মাসের কোনো দিন বা রাতের জন্য কোনোরূপ বিশেষ সালাত বা সালাতের বিশেষ পদ্ধতি কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট। যেমনঃ ১. যিলহাজ্জ মাসের প্রথম রাত্রির সালাতঃ দুই রাকা‘আত বা বেশি রাক‘আত…… সালাত, অমুক অমুক সূরা দ্বারা….ইত্যাদি। যেমনঃ
১. যিলহাজ্জ মাসের প্রথম রাত্রির সালাত। ২ রাক‘আত বা বেশি রাক‘আত……সালাত, অমুক অমুক সূরা দ্বারা….ইত্যাদি।
২. যিলহাজ্জ মাসের ৮ তারিখ ‘ইয়াওমুত তারবিয়ার’ রাতের সালাত: ২/৪….ইত্যাদি রাক‘আত সালাত, অমুক অমুক সূরা দিয়ে…।
৩. যিলহাজ্জ মাসের ৮ তারিখ ‘ইয়াওমুত তারবিয়ার’ দিবসের সালাত: ৬/৮….ইত্যাদি রাক‘আত সালাত, অমুক অমুক সূরা দিয়ে…।
৪. আরাফার দিনের সালাত: ২/৪….ইত্যাদি রাক‘আত সালাত, প্রত্যেক রাক‘আতে অমুক সূরা ……অতবার… ইত্যাদি।
৫. আরাফার রাতের সালাত: ১০০ রাক‘আত….ইত্যাদি রাক‘আত সালাত, প্রত্যেক রাক‘আতে অমুক সূরা ……অতবার… ইত্যাদি।
৬. ঈদুল আযহার বা ‘ইয়ামূন নাহার’ এর(কুরবানীর দিনের)রাতের সালাত: ১২/….ইত্যাদি রাক‘আত, প্রত্যেক রাক‘আতে অমুক সূরা ……অতবার… ইত্যাদি।
৭. কুরবানীর দিন বা ঈদুল আযহার দিনের সালাত, ঈদুল আযহার পরে ২ রাক‘আত সালাত, প্রত্যেক রাক‘আতে অমুক সূরা, অতবার……।
৮. জিলহাজ্জ মাসের শেষ দিনের সালাত, দুই রাক‘আত, প্রত্যেক রাক‘আতে অমুক সূরা, অমুক আয়াত অতবার…..।
এ সকল বানোয়াট সালাতের মধ্যে বা শেষে কিছু দোয়া বা যিকর এর উল্লেখও করছে জালিয়াতগণ।তারা এ সকল সালাতের জন্য আকর্ষণীয় ও আজগুবি অনেক সাওয়াব ও ফলাফলের কথা উল্লেখ করেছে।(আব্দুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ৮৭-৮৯, ১১৫-১১৭)।
৬. যিলহাজ্জের শেষ দিন ও মুহাররামের প্রথম দিনের সিয়াম
একটি জাল হাদীসে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি জিলহাজ্জ মাসের শেষ দিন এবং মুহাররাম মাসের প্রথম দিন সিয়াম পালন করল, সেই ব্যক্তি তার বিগত বছরকে সিয়াম দ্বারা সমাপ্ত করলো এবং আগত বছরকে সিয়াম দ্বারা স্বাগত জানালো। কাজেই আল্লাহ তার ৫০ বৎসরের কাফফারা বা পাপ মার্জনা করবেন। (ইবনুল জাওযী, আল মাঊদূ‘আত ২/১১২; সুয়ূতী, আল লাআলী ২/১৯৯, ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১৪৮; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ১/১২৯)।
এরূপ আরো আজগুবি সনদহীন বানোয়াট ও মিথ্যা কথা আমাদের সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন গ্রন্থে দেখতে পাওয়া যায়।(মুফতী ছামদানী, বার চাঁন্দের ফযীলত ৪৬-৫০)।
উপরের দীর্ঘ আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, জালিয়াতদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি দেখানোর একটি বড় ক্ষেত্র হলো সাপ্তাহিক, মাসিক ও বাৎসরিক বিভিন্ন নেক আমলের ফযীলতের বিষয়ে জাল হাদীস তৈরি করা। এর বড় কারণ হলো, এই ধরনের জাল কথা সহজেই সরলপ্রাণ মুসলমানদের মন আকৃষ্ট করে। এবং এগুলি দিয়ে সহজেই সরলপ্রাণ বুযুর্গ ও লেখকগণকে ধোঁকা দেওয়া যায়। তারা আমল ভালবাসেন এবং আমলের ফযীলত বিষয়ক হাদীসগুলি সরলমনে গ্রহণ করেন।
এই জাতীয় জাল কথা প্রচলন হওয়ার কারণও এই। অন্যান্য জাল কথার চেয়ে আমাদের ফযীলত বিষয়ক জাল কথার প্রসিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, অনেক বুযুর্গ ওয়ায়েয, দরবেশ বা লেখক এগুলির মধ্যে ফযীলতের আধিক্য দেখে সরল মনে এগুলিকে গ্রহণ করেছেন এবং সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য এগুলি মুখে বলেছেন বা বইয়ে লিখেছেন। আর, একবার সাধারণত একবার একজন লিখলে পরবর্তী লেখকগণ সেগুলি থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করে থাকেন। অনেকেই যাচাই বাছাই করার সময় পান না। অনেকে ভাবেন, যাই হোক এর দ্বারা কিছু মানুষতো আমল করছে। ভালই তো!!
আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, অনেক নেককার বুযুর্গ এগুলির উপর আমল করেছেন, অনেক ফল ও প্রভাব লাভ করেছেন। অনেকে এগুলি তাদের ওয়াযে বলেছেন বা বইয়ে লিখেছেন-তাঁরা কি সবাই গোনাহগার হবেন?
এখানে আমাদের বুঝতে হবে যে, এ সকল জাল হাদীসে সাধারণত, সালাত, সিয়াম, যিকর, দোয়া, দান ইত্যাদি শরীয়তসম্মত নেক আমলের উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। মুমিনের দায়িত্ব হলো নফল সালাত, সিয়াম, যিকর, দোয়া ইত্যাদি সকল প্রকার দৈনন্দিন, সাপ্তাহিক, বাৎসরিক ও নেক আমল নিয়মিত পালন করা। এই হলো রাসূলুল্লাহ(সা) ও তাঁর সুন্নাতের পরিপূর্ণ অনুসারী সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী ও বুযুর্গগণের রীতি ও তরিকা। এরপর সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত মর্যাদাময় রাত ও দিনগুলিতে অতিরিক্ত ইবাদতের চেষ্টা করা। এ সকল মিথ্যা ও জাল হাদীস সাধারণত মুমিনকে সহীহ সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত ইবাদত থেকে দূরে নিয়ে যায়, অকারণ পরিশ্রম ও কষ্টের মধ্যে নিপতিত করে এবং সুন্নাত বিরোধী বিভিন্ন রীতি পদ্ধতির মধ্যে নিমজ্জিত করে। এ ছাড়া যে কোনো কথা শুনে বা পড়েই তাকে হাদীস বলে মেনে নেওয়া, হাদীসের কোন্ গ্রন্থে সংকলিত আছে তা অন্তত যাছাই করার চেষ্টা না করা রাসূলুল্লাহর(সা) সুন্নাতের বিরোধী এবং দীনের বিষয়ে অবহেলার শামিল। এরপরও যারা অসাবধানতা, সরলতা বা অজ্ঞতাবশত এগুলিকে সঠিক মনে করে এগুলির উপর আমল করেছেন, তারা এ সকল জাল হাদীসে বর্ণিত জাল ও বানোয়াট সাওয়াব পাবেন না, তবে মূল নেক আমলের সাধারণ সাওয়াব পাবেন বলে আশা করা যায়।
কিন্তু কেউ যদি এগুলিকে জাল বলে জানার বা শোনার পরও এগুলি বলেন, লিখেন বা পালন করেন, এ বিষয়ে কোনো তাহকীক বা যাচাই করতে আগ্রহী না হন, তবে অবশ্যই তিনি রাসূলুল্লাহর(সা) নামে মিথ্যা বলার অপরাধে অপরাধী হবেন।
২.১২. মৃত্যু, জানাযা ইত্যাদি বিষয়ক
১. প্রতিদিন ২০ বার মৃত্যুর স্মরণে শাহাদাতে মর্যাদা
আমাদের দেশে ওয়াযে ও বিভিন্ন পুস্তকে বহুল প্রচলিত একটি কথাঃ “যে ব্যক্তি মৃত্যুকে দৈনিক বিশবার স্মরণ করবে সে শহীদগণের সঙ্গী হবে বা শহীদের মর্যাদা পাবে।”
মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন যে, কথাটি সনদবিহীন বানোয়াট কথা।(তাহের ফাতানী, তাযকিরা পৃ. ২১৩; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ১/৩৩৬)।
২. মৃত্যু কষ্টের বিস্তারিত বিবরণ
মৃত্যুর যন্ত্রণা বা কষ্ট বা সাতরাতুল মাওত বিষয়ক কিছু কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু মৃত্যু যন্ত্রণার বিস্তারিত বিবরণ, তুলনা, উদাহরণ, প্রত্যেক অঙ্গের সাথে আত্মার কথাবার্তা ইত্যাদি বিষয়ক প্রচলিত হাদীসগুলি কিছু বানোয়াট ও কিছু অত্যন্ত দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে। (তাহের ফাতানী, তাযকিরা, পৃ. ২১৩-২১৪)।
৩. ইবরাহীম (আ) এর মৃত্যুযন্ত্রণা
একটি জাল হাদীসে বলা হয়েছে, ইবরাহীম(আ) যখন তাঁর প্রভুর সাথে সাক্ষাত করেন তখন তিনি বলেন, হে ইবরাহীম, মৃত্যুকে কেমন বোধ করলে? তিনি বলেন, আমার অনুভব হলো যে, আমার চামড়া টেনে তুলে নেওয়া হচ্ছে। তখন আল্লাহ বলেন, তোমার জন্য মৃত্যু যন্ত্রণাকে সহজ করা হয়েছিল, তারপরেও এরূপ….।
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, কথাটি মিথ্যা ও জাল।(ইবনুল জাউযী, আল মাঊদূআত ২/৩৯৬; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/৩৬২)।
৪. চারিদিক থেকে জানাযা বহন বা মৃতের অনুগমন
আমাদের মধ্যে অতি প্রচলিত রেওয়াজ হলো, মৃতদেহ দাফনের জন্য বহন করার সময় একই ব্যক্তি ঘুরে ঘুরে চারিদিক থেকে বহন করেন। এ বিষয়ে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, “যদি কেউ চারিদিক হতে মৃতের অনুগমন করেন বা চারিদিক থেকে মৃতের খাটিয়া বহন করেন তাহলে আল্লাহ তার চল্লিশটি কবীরা গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন।”
ইবনুল জাওযী, আলবানী প্রমুখ মুহাদ্দিস এই অর্থের হাদীসকে মাউযূ বা মুনকার ও অত্যন্ত দুর্বল বলে গণ্য করেছেন। পক্ষান্তরে সুয়ূতী, ইবনু ইরাক প্রমুখ মুহাদ্দিস এই অর্থের হাদীসকে দুর্বল বলে গণ্য করেছেন। (ইবনুল জা্ওযী, আল মাঊদূআত ২/৩৮৩; সুয়ূতী, আল লাআলী ২/৪০৫)।
৫. নেককার মানুষদের পাশে কবর দেওয়া
একটি প্রচলিত জাল হাদীসে বলা হয়েছেঃ “তোমরা মৃতদেরকে নেককার মানুষদের মাঝে দাফন করবে; কারণ জীবিত মানুষ যেমন খারাপ প্রতিবেশি দ্বারা কষ্ট পায়, মৃত মানুষও তেমনি খারাপ প্রতিবেশি দ্বারা কষ্ট পায়।” হাদীসটির সনদে মিথ্যাবাদী রাবী রয়েছে। (ইবনুল জাওযী, আল মাঊদূআত ২/৪১১-৪১২; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/৩৭৩; আলবানী, যয়ীফাহ ২/৩৮-৩৯, ৭৯-৮২)।
৬. কবর যিয়ারতের ফযীলত
কবর যিয়ারত করা একটি সুন্নাত নির্দেশিত নফল ইবাদত। রাসূলুল্লাহ(সা) নিজে মাঝে মাঝে কবর যিয়ারত করতেন। এছাড়া তিনি আখেরাতের স্মরণ, মৃত্যুর স্মরণ ও মৃতব্যক্তির সালাম ও দোয়ার জন্য কবর যিয়ারত করতে উম্মাতকে অনুমতি ও উৎসাহ দিয়েছেন।(বুখারী, আস সহীহ ১/৪৩০; মুসলিম আস সহীহ ১/২১৮, ৩/১৫৬৩)।
এই সাধারণ সাওয়াব ছাড়া যিয়ারতের বিশেষ সাওয়াবের বিষয়ে কিছু জাল হাদীস প্রচলিত রয়েছে। যেমনঃ “যদি কোনো ব্যক্তি তার পিতা, মাতা, ফুফু, খালা বা কোনো আত্মীয়ের কবর জিয়ারত করে তবে তার জন্য একটি মাবরূর হজ্জের সাওয়াব লিখা হবে……।”(ইবনুল জাওযী, আল মাঊদূ‘আত ২/৪১৩-৪১৪; সুয়ূতী, আল লাআলী ২/৪৪০)।
৮. শুক্রবারে কবর যিয়ারতের বিশেষ ফযীলত
কবর যিয়ারত যে কোনো দিনে বা যে কোনো সময়ে করা যেতে পারে। কোনো বিশেষ দিনে বা বিশেষ সময়ে কবর জিয়ারতের জন্য বিশেষ ফযীলতের বিষয়ে কোনো সহীহ হাদীস নেই। এ বিষয়ে একটি প্রচলিত হাদীসঃ “যদি কোনো ব্যক্তি প্রত্যেক শুক্রবারে তার পিতামাতার বা একজনের কবর যিয়ারত করে তবে তার পাপ ক্ষমা করা হবে এবং তাকে পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব পালনকারী হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হবে।”
হাদীসটি ইমাম তাবারানী প্রমুখ মুহাদ্দিস লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁরা হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনু নু’মান ইবনু আবদুর রাহমান এর সূত্রে সংকলন করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনু নু’মান ইয়াহইয়া ইবনুল আলা আল বাজালী থেকে, তিনি আবদুল কারীম ইবনু আবীল মাখারিক থেকে, তিনি মুজাহিদ থেকে, তিনি আবূ হুরাইরা(রা) হতে হাদীসটি সংকলন করেছেন।
বর্ণনাকারী মুহাম্মদ ইবনু নু’মান অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি। তার উস্তাদ হিসেবে উল্লেখিত ইয়াহইয়া ইবনুল আলা আল বালাজী পরিত্যক্ত ও মিথ্যায় অভিযুক্ত রাবী। ইমাম আহমদ, ওকী প্রমুখ মুহাদ্দিস তাকে স্পষ্টভাবে মিথ্যাবাদী ও জালিয়াত বলে অভিহিত করেছেন। তার উস্তাদ হিসেবে উল্লেখিত ‘আব্দুল কারীম’ ও অত্যন্ত দুর্বল রাবী হিসেবে পরিচিত। এভাবে আমরা দেখেছি যে, হাদীসটির সনদ অত্যন্ত দুর্বল। বিশেষত ইয়াহইয়া নামক এই মিথ্যাবাদী রাবীর কারণে হাদীসটি জাল বলে গণ্য হয়। (তাবারানী, আল মাউসাত ৬/১৭৫; আস-সগীর ২/১৬০; সুয়ূতী আল লাআলী ২/৪৪০; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/৩৭৩; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ১/৩৪৫)।
৭. কবর যিয়ারতের সময় সূরা ইয়াসীন পাঠ
বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কবর যিয়ারতের সময় রাসূলুল্লাহ(সা) “আস-সালামু আলাইকুম দারা কাওমিন মুমিনীন…..” বা অনুরূপ বাক্য দ্বারা কবরবাসীকে সালাম প্রদান করতেন। এবং সালামের সাথেই সংক্ষিপ্ত কয়েকটি শব্দে দোয়া পাঠ করতেন। তিনি সাহাবীগণকে এভাবে সালাম দোয়া করতে শিক্ষা দিয়েছেন। একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, একরাতে তিনি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে হাত তুলে মৃতদের জন্য দোয়া করেন।(এহইয়াউস সুনান, পৃ. ৩৫৪-৩৫৫)।
এভাবে সালাম ও দোয়া ছাড়া কবর যিয়ারতের সময় কুরআন তিলাওয়াত ও কোনো সূরা পাঠের বিষয়ে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয় নি। কোনো কোনো ফকীহ যিয়ারতের পূর্বে আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস ইত্যাদি পাঠ করার কথা বলেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ক জাল হাদীসগুলির মধ্যে রয়েছেঃ
“যদি কেউ তার পিতামাতা বা উভয়ের একজনের কবর শুক্রবারে যিয়ারত করে এবং (তার কাছে)সূরা ইয়াসীন পাঠ করে, তবে তাকে ক্ষমা করা হবে।(পঠিত আয়াত বা অক্ষরের সংখ্যায় তাকে ক্ষমা করা হবে)।”
ইবুন আদী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস হাদীসটি সংকলন করেছেন। তাঁরা আমর ইবনু যিয়াদ নামক এক রাবীর সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এই ব্যক্তি বলেন, আমাদেরকে ইয়াহইয়া ইবনু সুলাইম বলেন, আমাদেরকে হিশাম ইবনু উরওয়া বলেন, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি আয়েশা(রা) থেকে, তিনি আবূ বাকর(রা) থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ(সা) থেকে…..।
এই হাদীসের একমাত্র বর্ণনাকারী ‘আমর ইবনু যিয়াদ’ নামক এই ব্যক্তিকে মুহাদ্দিসগণ মিথ্যাবাদী, জালিয়াত ও হাদীস চোর বলে স্পষ্টত উল্লেখ করেছেন। এজন্য ইবুন আদী, যাহাবী, ইবনুল জাওযী প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে জাল বলে গণ্য করেছেন। ইমাম সুয়ূতী এই হাদীসটিকে উপরে উল্লেখিত শুক্রবারে কবর যিয়ারত বিষয়ক হাদীসের সমার্থক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আব্দুর রাউফ মুনাবী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস তাঁর কথার প্রতিবাদ করে বলেন, প্রথমত, উভয় হাদীসের মধ্যে অর্থগত পার্থক্য রয়েছে। দ্বিতীয়ত, উভয় হাদীসের সনদেই জালিয়াত রাবী রয়েছে। জাল হাদীসের ক্ষেত্রে একাধিক হাদীসের সমন্বিত অর্থ গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে না।(ইবনু আদী, আল কামিল ৫/১৫১; ইবনুল জাউযী, আল মাঊদূ‘আত ২/৪১৩)।
৮. কবর যিয়ারতের সময় সূরা ইখলাস পাঠ
প্রচলিত বিভিন্ন পুস্তকে রয়েছেঃ “কবরস্থানে যেয়ে সূরা ইখলাস ১১ বার পাঠ করে মৃত ব্যক্তিগণের রূহের বখশিয়া দিলে সেই ব্যক্তি কবরস্থানের সমস্ত কবরবাসীর সমসংখ্যক নেকী লাভ করবে।” মূলত কথাটি একটি জাল হাদীসের প্রচলিত অনুবাদ। এই জাল হাদীসটিতে বলা হয়েছেঃ “যদি কেউ গোরস্থানের নিকট গমন করার সময় ২১ বার সূরা ইখলাস পাঠ করে তার সাওয়াব মৃতগণকে দান করে তবে মৃতগণের সংখ্যার সমপরিমাণ সওয়াব তাকে প্রদান করা হবে।” মুহাদ্দিসগণ একমত যে, হাদীসটি জাল ও বানোয়াট।(সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ১৪৪; আলবানী, যায়ীফাহ ৩/৪৫২-৪৫৪)।
৯. মৃত্যুর সময় শয়তান পিতামাতার রূপ ধরে বিভ্রান্তির চেষ্টা করে
সাধারণের মধ্যে প্রচলিত আছে যে, মৃত্যুপথযাত্রীর নিকট শয়তান তার পিতামাতার রূপ ধরে এবং তাকে বিভিন্ন ওয়াসওয়াসার মাধ্যমে বিপথগামী করার চেষ্টা করে। ইমাম সুয়ূতী, ইবনু হাজার মাক্কী প্রমুখ মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, এ বিষয়ে কোনো কথা কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি।(আলবানী, আহকামুল জানাইয, পৃ. ২৪৩)।
১০. গায়েবানা জানাযা আদায় করা
যে মৃতব্যক্তির মৃত্যুর স্থানে একবার জানাযার সালাত আদায় করা হয়েছে তার জন্য পুণরায় ‘গায়েবী জানাযা’ আদায় করার পক্ষে কোনরূপ হাদীস বর্ণিত হয় নি। বরং এই কর্মটি সুন্নাত বিরোধী একটি কর্ম। এহইয়াউস সুনান গ্রন্থে এ বিষয়ক বিস্তারিত উল্লেখ করছি।(এহইয়াউস সুনান, পৃ. ৩৩৫; আলবানী, আহকামুল জানাইয, পৃ. ২৫২)।
খাজা নিযামুদ্দীন আউলিয়া রচিত ‘রাহাতুল কুলুব’ নামক পুস্তকে তিনি লিখেছেন যে, তাঁর মুর্শিদ খাজা ফরীদউদ্দীন গঞ্জেশক্কর বলেনঃ “গায়েবানা জানাযা পড়ার বিধান রয়েছে। কেননা আমিরুল মোমেনীন হযরত হামযা ও অন্যান্যরা যখন শহীদ হলেন তখন হুজুর পাক(সা) তাঁদের জন্য গায়েবানার জানাযার নামাজ পাঠ করেছিলেন। এমনকি প্রত্যেকের জন্য পৃথক পৃথক ভাবে পড়েছিলেন। (খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া, রাহাতুল কুলুব, পৃ. ১২৬ (বিংশ মাজলিশ)।)।
এ সকল কথা কি সত্যই খাজা নিযামুদ্দীন(রাহ) লিখেছেন না তাঁর নামে জালিয়াতি করা হয়েছে তা আমরা জানি না। তবে সর্বাবস্থায় এগুলি একেবারে ভিত্তিহীন কথা। একজন সাধারণ মুসলিম জানেন যে, হামযা(রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন এবং রাসূলুল্লাহ(সা) স্বয়ং সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
১১. মৃত লাশকে সামনে রেখে উপস্থিতগণকে প্রশ্ন করা
আমাদের দেশে অনেক সময় সালাতুল জানাযা আদায়ের পূর্বে বা পরে মৃতদেহ সামনে রেখে উপস্থিত মুসল্লীগণকে প্রশ্ন করা হয়, লোকটি কেমন ছিল? সকলেই বলেনঃ ভাল ছিল……ইত্যাদি। এই কর্মটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। হাদীস শরীফে এরূপ কোনো কর্মের উল্লেখ নাই। হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে যদি মানুষেরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রশংসা করেন তবে তা সেই ব্যক্তির জন্য কল্যাণকর বলে গণ্য হবে।(বুখারী, আস-সহীহ ১/৪৬০; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৬৫৫)।
১২. মৃতকে কবরে রাখার সময় বা পরে আযান দেওয়া
প্রচলিত আরেকটি ভিত্তিহীন বানোয়াট কর্ম হলো মৃতকে কবরে রাখার সময় বা পরে আযান দেওয়া। কোনো সহীহ যয়ীফ বা মাঊযূ হাদীসেও এইরূপ কোনো কথা রাসূলুল্লাহ(সা) বা কোনো সাহাবী থেকে বর্ণিত হয় নি। এমনকি নামাযের ওয়াক্ত ছাড়া অন্য কোনো কারণে আযান দেওয়ার কোনো ফযীলতও কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি।
১৩. ভূত-প্রেতের ধারণা
আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও ইসলাম বিরোধী ধারণা হলো ভূত-প্রেতের ধারণা। মৃত মানুষের আত্মা ভূত বা প্রেত হয়ে বা অন্য কোনোভাবে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়, অবস্থান করে, ভাল বা মন্দ করতে পারে……ইত্যাদি সকল কথাই জঘন্য মিথ্যা ও ইসলামী বিশ্বাসের বিপরীত কথা। এই জাতীয় বাতিল কথা হলো, মৃতের আত্মা তার মৃত্যুর স্থানের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়……ইত্যাদি।
১৪. মৃত্যুর পরে লাশের নিকট কুরআন তিলাওয়াত করা
মৃত্যুপথযাত্রীর শেষ মুহুর্তগুলিতে সূরা ইয়াসীন পাঠ করে শুনানোর বিষয়ে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। (আবূ দাউদ, আস সুনান ৩/১৯১)। কিন্তু মৃত্যুর পরে লাশের নিকট কুরআন তিলাওয়াত করার বিষয়ে কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীস বর্ণিত হয় নি।
১৫. লাশ বহনের সময় সশব্দে কালিমা, দোয়া বা কুরআন পাঠ
এটি একটি বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও সুন্নাতের বিপরীত কর্ম। লাশ বহনের সময় পরিপূর্ণ নীরবতাই সুন্নাত। মনের গভীরে শোক ও মৃত্যুচিন্তা নিয়ে পথ চলতে হবে। পরস্পরে কথাবার্তা বলাও সুন্নাত বিরোধী। ইমাম নববী বলেন, লাশ বহনের সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকাই হলো সুন্নাত সম্মত সঠিক কর্ম যা সাহাবীগণ ও পরবর্তী যুগের মানুষদের রীতি ছিল। প্রসিদ্ধ হানাফী ফকীহ আল্লামা কাসানী বলেনঃ “লাশের অনুগমনকারী তার নীরবতাকে প্রলম্বিত করে। এ সময় সশব্দে যিকর করা মাকরূহ। কাইস ইবনু উবাদাহ বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(সা) এর সাহাবীগণ তিন সময়ে শব্দ করতে অপছন্দ করতেন: যুদ্ধ, জানাযা এবং যিকর। এছাড়া লাশ বহনের সময় সশব্দে যিকর করা ইহুদী নাসারাগণের অনুকরণ; এজন্য তা মাকরূহ।(কাসানী, বাদাউস সানাই ১/৩১০)।
১৬. কবরের নিকট দান সাদকা করা
হাদীস শরীফে সন্তানকে তার পিতামাতার জন্য দান সাদকা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই দান কবরের নিকট করলে কোনো অতিরিক্ত সাওয়াব বা সুবিধা আছে বলে কোনো হাদীসে কোনোভাবে বর্ণিত হয় নি। বিশ্বের যে কোনো স্থান হতে দান করলে একই অবস্থা।
১৭. সন্তান ছাড়া অন্যদের দান সাদকা
এখানে আরো লক্ষ্যণীয় যে, সন্তান-সন্ততি বা পরিবারবর্গ ছাড়া অন্য কেউ দান করলে মৃত ব্যক্তি সাওয়াব পাবেন বলে কোনো হাদীসে কোনোভাবে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় বা করা হয় সবই আলিমদের মতামতভিত্তিক, অথবা মনগড়া বা বানোয়াট।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে মুমিনগণের দায়িত্ব হলো মৃত মুমিনগণের জন্য দোয়া ও ইসতিগফার করা। আর সন্তানদের দায়িত্ব হলো মৃত পিতামাতার জন্য দোয়া ও ইসতিগফার ছাড়াও দান করা। সন্তান-সন্ততি ছাড়া অন্যান্য মানুষ দোয়া করলে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবেন বলে আমরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে নিশ্চিত জানতে পারি। কিন্তু সন্তান ছাড়া কেউ দান করলে মৃত ব্যক্তি সাওয়াব পাবেন বলে কোনো সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয় নি।
তবে অধিকাংশ আলিম মনে করেন যে, সন্তানের দানের সাওয়াব যেহেতু মৃত ব্যক্তি লাভ করবেন বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, সেহেতু আমরা আশা করতে পারি যে, অন্যান্য মানুষের দানের সাওয়াবও মৃত ব্যক্তি পেতে পারেন। কোনো কোনো আলিম বলেন যে, এক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীসের বাইরে আশা পোষণের কোনো ভিত্তি বা যুক্তি নেই। কুরআন ও হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, যে কোনো মুসলিম যে কোনো মৃত মুসলিমের জন্য দোয়া করবেন। আর সন্তান সন্ততি পিতামাতার জন্য দোয়া করা ছাড়াও দান করবে। আমাদের এর বাইরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। (এ বিষয়ক আয়াত, হাদীস ও আলিমদের মতামত বিস্তারিত দেখুনঃ ইবনুল কাইয়িম, আর রূহ, পৃ. ৩৫৩-৪০৯; সুয়ূতী, শরাহুস সুদূর, পৃ. ৩০১-৩১৪)।
অধিকাংশ আলিমের ‘আশা’ মেনে নিলেও এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। যেহেতু কুরআন ও হাদীসের আলোকে আমরা জানতে পারছি যে, দোয়া ও ইসতিগফার করলেই মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবেন এবং দোয়ার বিনিময়েই তাকে নেকী ও সাওয়াব দান করা হবে, সেহেতু কুরআন ও হাদীসের নির্দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কি? যেহেতু আমরা নিশ্চিতভাবে জানতে পারছি যে, ‘হে আল্লাহ, অমুক ব্যক্তিকে আপনি ক্ষমা করুন, তাঁকে মর্যাদা দান করুন….ইত্যাদ ‘ বলে দোয়া করলেই সে ব্যক্তি উপকৃত হবেন, তখন আমাদের প্রয়োজন কি যে আমরা বলব-“হে আল্লাহ, আমাদের এই দানের সাওয়াব অমুককে প্রদান করুন এবং এর বিনিময়ে তাকে ক্ষমা করুন, মর্যাদা, নেকি দান করুন”?
সম্ভবত আমরা মনে করি যে, দান-সাদকাসহ দোয়া করলে মৃতব্যক্তি বেশি সাওয়াব লাভ করবে। ‘গাইবী’ বিষয়ে নিজেরা ‘মনে’ করার চেয়ে ‘ওহী’-র উপর নির্ভর করা উত্তম। কুরআন ও হাদীসে দোয়া ও ইসতিগফারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, রাসূলুল্লাহ(সা) নিজে আজীবন অগণিত মুমিন-মুমিনার জন্য দোয়া ও ইসতিগফার করেছেন, কিন্তু কখনোই শেখান নি যে, কবর যিয়ারত বা অন্য সময় মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া-ইসতিগফারের পূর্বে, পরে বা অন্য সময়ে কিছু দান-সাদকা বা খানা বিতরণ করা ভাল। তিনি নিজেও তা কখনো করেন নি এবং কাউকে তা শিক্ষাও দেন নি। সাহাবীগণও মৃতদের জন্য দোয়া-ইসতিগফার করেছেন এবং কবর যিয়ারত করেছেন কিন্তু কখনোই কবরের পাশে বা অন্য কোথাও মৃতদের ‘সাওয়াব রেসানী’-র জন্য দান খয়রাত করেছেন বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয় নি। আমাদের উচিত সুন্নাতের শিক্ষার মধ্যে থাকা। সকল মুমিনই নিজের সাওয়াব অর্জন, বিপদ মুক্তি ও বরকতের জন্য সর্বদা বেশি বেশি দান সাদকা করতে চেষ্টা করবেন। পাশাপাশি সন্তান সন্ততি তাদের পূর্ব পুরুষদের জন্য দোয়া, ইসতিগফার ও দান করবে। আর অন্য সকল মুসলমান সকল মৃত মুমিন-মুমিনার জন্য দোয়া ও ইসতিগফার করবে।
১৮. মৃতের জন্য জীবিতদের হাদিয়া
প্রচলিত ওয়ায আলোচনায় একটি হাদীসে বলা হয় যে, মৃতব্যক্তি হলো ডুবন্ত মানুষের মত, জীবিতদের পক্ষ হতে কুরআন, কালিমা, দান-খয়রাত ইত্যাদির সাওয়াব হাদিয়া পাঠালে সে উপকৃত হয়। প্রকৃতপক্ষে হাদীসটিতে শুধু দোয়া-ইসতিগফারের কথা বলা হয়েছে, বাকি কথাগুলি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। মূল হাদীসটিও অত্যন্ত দুর্বল। ইমাম বাইহাকী তৃতীয় শতকের একজন অজ্ঞাত পরিচয় রাবী মুহাম্মাদ ইবনু জাবির ইবনু আবী আইয়াশ আল মাসীসীর সূত্রে হাদীসটি সংকলন করেছেন। এই ব্যক্তি বলেন, তাকে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, তাকে ইয়াকূব ইবনু কা’কা বলেছেন, মুজাহিদ থেকে, তিনি ইবনু আব্বাস থেকে, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেনঃ “ডুবন্ত ত্রাণপ্রার্থী ব্যক্তির যে অবস্থা, অবিকল সেই অবস্থা হলো কবরের মধ্যে মৃতব্যক্তির। সে দোয়ার অপেক্ষায় থাকে, যে দোয়া কোনো পিতা মাতা, ভাই বা বন্ধুর পক্ষ হতে তারা কাছে পৌঁছাবে। যখন এরূপ কোনো দোয়া তাঁর কাছে পৌছে তখন তা তার কাছে দুনিয়া ও তন্মধ্যস্থ সকল সম্পদের চেয়ে প্রিয়তর বলে গণ্য হয়। এবং মহিমাময় পরাক্রমশালী আল্লাহ পৃথিবীবাসীদের দোয়ার কারণে কবরবাসীদের পাহাড় পরিমাণ(সাওয়াব) দান করেন। আর মৃতদের জন্য জীবিতদের হাদিয়া হলো তাদের জন্য ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা।”
ইমাম বাইহাকী হাদীসটি উদ্ধৃত করে বলেন, একমাত্র মুহাম্মাদ ইবনু জাবির ইবনু আবী আইয়াশ নামক এই ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো সূত্রে কোনোভাবে এই হাদীসটি বর্ণিত হয় নি।(বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৬/২০৩, ৭/১৬)। ইমাম যাহাবী এই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বলেনঃ “এই ব্যক্তির কোনো পরিচয়ই আমি জানতে পারি নি। এই ব্যক্তি বর্ণিত হাদীসটি অত্যন্ত আপত্তিকর বা খুবই দুর্বল((منكر جد \ ।(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৬/৮৬; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ৫/৯৯; আলবানী, যায়ীফাহ ২/২১১)।
১৯. মৃতের জন্য খানাপিনা দান বা দোয়ার অনুষ্ঠান
মৃত ব্যক্তির জন্য মৃত্যুর পরে ৩য় দিন, ৫ম দিন, ৭ম দিন, ৪০ তম দিন বা অন্য যে কোনো দিনে, মৃত্যু দিনে বা জন্মদিনে খানাপিনা, দান-সাদকা, দোয়া খাইর ইত্যাদির অনুষ্ঠান করা আমাদের দেশের বহুল প্রচলিত রীতি। তবে রীতিটি একেবারেই বানোয়াট। এ সকল বিষয়ে মৃতের জন্য কোনো অনুষ্ঠান করার বিষয়ে কোনো প্রকার হাদীস বর্ণিত হয় নি। কোনো মানুষের মৃত্যুর পর কখনো কোনো প্রকার অনুষ্ঠান করার কোনো প্রকার নির্দেশনা কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। সদা সর্বদা বা সুযোগমত মৃতদের জন্য দোয়া করতে হবে। সন্তানগণ দান করবেন। এবং সবই অনানুষ্ঠানিক। এ বিষয়ে ‘এহইয়াউস সুনান’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।(পৃ. ৩৪৭-৩৫৯)।
২০. অসুস্থ ও মৃত ব্যক্তির জন্য বিভিন্ন প্রকারের খতম
খতমে তাহলীল, খতমে তাসমীয়া, খতমে জালালী, খতমে খাজেগান, খতমে ইউনূস ইত্যাদি সকল প্রকার খতম-ই পরবর্তীকালে বানানো। এ বিষয়ে হাদীস নামে প্রচলিত বানোয়াট কথার মধ্যে রয়েছেঃ “হাদীস শরীফে আছে. হযরত(সা) ফরমাইয়াছেন, যখন কেহ নিম্নোক্ত কলেমা(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) এক লক্ষ পঁচিশ হাজার বার পড়িয়া কোনো মৃত ব্যক্তির রূহের উপর বখশিশ করিয়া দিবে, তখন খোদাতাআলা নিশ্চয়ই উহার উছিলায় তাহাকে মার্জনা করিয়া দিবেন ও বেহেশতে স্থান দিবেন। (গোলাম রহমান, মোকছুদোল মো‘মেনীন পৃ. ৪০৭)। এগুলি সবই বানোয়াট কথা।
২১. মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন খতম
আমাদের দেশের অতি প্রচলিত কর্ম হলো কেউ ইন্তিকাল করলে তার জন্য কুরআন খতম করা। এই কর্মটি কোনো হাদীস ভিত্তিক কর্ম নয়। কোনো মৃত মানুষের জন্য রাসূলুল্লাহ(সা) ও সাহাবীগণ কখনোই কুরআন খতম করেন নি। এছাড়া কারো জন্য কুরআন খতম করলে তিনি সাওয়াব পাবেন এরূপ কোনো কথাও কোনো সহীহ বা গ্রহণযোগ্য হাদীসে বর্ণিত হয় নি।
আমরা আগেই উল্লেখ করছি যে, কুরআন ও হাদীসে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সন্তানগণকে মৃত পিতামাতার জন্য দান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে ঋণ পরিশোধ, সিয়াম পালন, হজ্জ ও উমরা পালনের কথাও হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে।
মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত, কুরআন খতম, তাসবীহ তাহলীল পাঠ ইত্যাদি ইবাদতের কোনো নির্দেশনা হাদীসে বর্ণিত হয় নি। তবে অধিকাংশ আলিম বলেছেন যে, যেহেতু দান, সিয়াম, হজ্জ, উমরা ও দোয়ার দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবেন বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে সেহেতু আশা করা যায় যে, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ তাহলীল ইত্যাদি ইবাদত দ্বারাও তারা উপকৃত হবেন। তবে এজন্য আনুষ্ঠানিকতা, খতম ইত্যাদি সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।
২২. দশ প্রকার লোকের দেহ পচবে না
প্রচলিত একটি পুস্তকে রয়েছেঃ “হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে যে, নিম্নলিখিত দশ প্রকারের দেহ পঁচবে নাঃ ১. পয়গম্বর, ২. শহীদ, ৩. আলিম, ৪. গাজী, ৫. কুরআনের হাফেজ, ৬. মোয়াযযিন, ৭. সুবিচারক বাদশাহ বা সরদার, ৮. সূতিকা রোগে মৃত রমনী, ৯. বিনা অপরাধে যে নিহত হয়, ১০. শুক্রবারে যার মৃত্যু হয়।(মৌলভী শামছুল হুদা, নেয়ামুল কোরআন ২৪৫)।
এদের অনেককেই হাদীসে শহীদ বলা হয়েছে। তবে একমাত্র নবীগণ বা পয়গম্বরগণের দেহ মাটিতে পচবে না বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। অন্য নয় প্রকারের মৃতগণের মৃতদেহ না পচার বিষয়ে কোনো হাদীস আছে বলে আমি সাধ্যমত চেষ্টা করেও জানতে পারি নি। মহান আল্লাহই ভাল জানেন।
২.১৩. যাকাত, সিয়াম ও হজ্জ বিষয়ক
২.১৩.১. যাকাত বিষয়ক
১. মুমিনের জমিতে খারাজ ও উশর একত্রিত হয় না
একজন মুসলমানকে তার ভূ-সম্পদের উৎপাদনের ৫% বা ১০% অংশ যাকাত প্রদান করতে হয়। ফল ও ফসলের যাকাতকে ‘উশর’ বলা হয়। অমুসলিমদেরকে ‘যাকাত’ দিতে হয় না। অমুসলিমদেরকে যাকাত দিতে হয় না। এজন্য মুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিককে তার ভূ-সম্পত্তির ‘খারাজ’ প্রদান করতে হয়। ‘খারাজ’ সাধারণত উশরের দ্বিগুণ হয়। কোনো অমুসলিমের জমি যদি কোনো মুসলিম ক্রয় করেন তবে তাকে উশর ও খারাজ উভয়ই প্রদান করতে হবে, নাকি শুধু খারাজ প্রদান করতে হবে সে বিষয়ে তাবেয়ীগণের যুগ থেকে ফকীহগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশ তাবেয়ী ও ইমাম বলেছেন, তাকে খারাজ ও উশর উভয়েই প্রদান করতে হবে। তাবিয়ী ইকরিমাহ, ইবরাহীম নাখায়ী ও ইমাম আবূ হানীফা(রা)বলেছেন, তাকে শুধুমাত্র খারাজ প্রদান করতে হবে। (পড়ুন লেখকের অন্য বইঃ বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাতঃ গুরুত্ব ও প্রয়োগ)।
এ বিষয়ে একটি হাদীস আলেমদের মধ্যে প্রচলিত। ৫ম হিজরী শতক ও তার পরের কিছু ফকীহ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। এই হাদীসটিকে ইবনু মাসঊদ(রা) এর সূত্রে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেনঃ “একজন মুসলিমের ভূমিতে উশর ও খারাজ একত্রিত হবে না।”(ইবনু আদী, আল কামিল ৯/১২৭, বাইহাকী, আস সুনানুল কুবরা ৪/২২২)।
কিন্তু ইমাম যাইলায়ী ও হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণ-সহ সকল মুহাদ্দিস বলেছেন যে, এই হাদীসটি বানোয়াট। রাসূলুল্লাহ(সা) বা ইবনু মাসঊদের বাণী বা কথা হিসেবে এই বাক্যটি বানোয়াট। প্রকৃতপক্ষে এই বাক্যটি হযরত ইবরাহীম নাখয়ীল(রাহ) কথা ও তাঁর মতামত। ইবরাহীম নাখয়ী ছাড়া আরো অন্যান্য তাবিয়ী হতেও এই মতটি বর্ণিত হয়েছে। (বিস্তারিতঃ বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাতঃ গুরুত্ব ও প্রয়োগ, পৃ. ৮৬-৮৭)।
ইমাম আবূ হানীফা(রাহ) এই কথাটি ইব্রাহীম নাখয়ী(রাহ) থেকে নাখয়ী’র নিজের মতামত হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং তা গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেনঃ আমাকে হাম্মাদ ইবনু আবী সুলাইমান বলেছেন, ইব্রাহীম নাখয়ী বলেছেনঃ “একজন মুসলিমের ভূমিতে উশর ও খারাজ একত্রিত হবে না।” এই পর্যন্ত কথাটি সহীহ। অর্থাৎ কথাটি ‘মাকতুয়’ হাদীস বা তাবেয়ীর কথা হিসেবে সহীহ।
কিন্তু পরবর্তী যুগের একজন রাবী ইয়াহইয়া ইবনু আনবাসাহ ইমাম আবূ হানীফার নামে বানোয়াটভাবে এই কথাটিকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা হিসেবে বর্ণনা করে। ইয়াহইয়া ইবুন আনবাসাহ বলেনঃ “আবূ হানীফা আমাদেরকে বলেছেনঃ হাম্মাদ ইবনু আবী সুলাইমান ইব্রাহীম নাখয়ী হতে, তিনি ‘আলকামাহ’ হতে, তিনি আবদুল্লাহ ইবুন মাসঊদ হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন যে, “একজন মুসলিমের ভূমিতে উশর ও খারাজ একত্রিত হবে না।”
এভাবে ইয়াহইয়া ইবুন আনবাসাহ একজন তাবেয়ীর বর্ণনাকে রাসূলুল্লাহ(সা) এর বাণী বলেবর্ণনা করেছেন। মুহাদ্দিসগণ খুব সহজেই তার এই জালিয়াতি বা ভুল ধরে ফেলেন।
তাঁরা লক্ষ্য করেন যে, ইমাম আবূ হানীফার(রাহ) অগণিত ছাত্রের কেউই এই হাদীসটি তাঁর নিকট হতে বর্ণনা করেন নি। তাঁর অন্যতম ছাত্র ইমাম আবু ইউসূফ ও মুহাম্মাদ(রাহ) তাঁদের বিভিন্ন গ্রন্থে এই মাসআলাটির উপরে অনেক আলোচনা করেছেন, কিন্তু কোথাও উল্লেখ করেন নি যে, ইমাম আবূ হানীফা তাঁদেরকে এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(সা) হতে বর্ণনা করেছেন অথবা তিনি এই বিষয়ে কোনো হাদীসে নববীর উপরে নির্ভর করেছেন।
এখানেই মুহাদ্দিসগণের সন্দেহের শুরু। যদি একজন হাদীস বর্ণনাকারী কোনো প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস বা ফকীহ হতে এমন একটি হাদীস বর্ণনা করেন যা তাঁর অন্য কোনো ছাত্র, বিশেষত যারা আজীবন তাঁর সাথে থেকেছেন তাঁরা কেউ বর্ণনা না করেন, তাহলে হাদীসটির বিশুদ্ধতার বিষয়ে সন্দিহান হন। দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে তাঁরা দেখেন, যে বর্ণনাকারী একাই এই হাদীসটি বলেছেন তাঁর বর্ণিত অন্যান্য হাদীসের ও তাঁর ব্যক্তিচরিত্রের অবস্থান কি? এখানে তাঁরা দেখতে পেলেন যে, ইয়াহইয়া ইবনু আনবাসাহ জীবনে যতগুলি হাদীস বর্ণনা করেছেন সবই ভুল বা বানোয়াট। তিনি বিভিন্ন প্রখ্যাত ও বিশ্বস্ত আলিম ও মুহাদ্দিসের নামে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন যা অন্য কেউ করেন নি। তিনি অনেক মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীস এভাবে বিভিন্ন বানোয়াট সনদে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত সকল হাদীসকে মুহাদ্দিসগণের বর্ণিত হাদীসের সাথে তুলনামূলক নিরীক্ষা করে এবং তাঁর ব্যক্তিজীবন পর্যালোচনা করে মুহাদ্দিসগণ নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই হাদীসটিও তিনি ইমাম আবূ হানীফার নামে বানিয়েছেন। এজন্যই ৩য় ও ৪র্থ হিজরী শতকের কোনো হানাফী ইমাম বা ফকীহ এই হাদীসটিকে দলীল হিসেবে পেশ করেন নি। (ইবনু আদী, কামিল ৯/১২৭; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ৪/২২২; ইবনুল জাওযী, আল-মাঊদূ‘আত ২/৬৯-৭০; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১১৮; সুয়ূতী আল লাআলী ২/৭০)।
২. অলঙ্কারের যাকাত নেই
ব্যবহৃত অলঙ্কারের যাকাত প্রদান করতে হবে কি না সে বিষয়ে সাহাবীগণের যুগ হতে ফকীহগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হযরত জাবির ও অন্য কয়েকজন সাহাবী বলতেন যে, অলঙ্কারের যাকাত প্রদান করতে হবে না। অপরদিকে অন্য অনেক সাহাবী বলতেন যে, অলঙ্কারের যাকাত প্রদান করতে হবে।
এক্ষেত্রে যারা অলঙ্কারের যাকাত ফরয নয় বলে মত প্রকাশ করেন তাদের পক্ষে একটি হাদীস বর্ণিত ও প্রচলিত। জাবির(রা) এর নামে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন, “অলঙ্কারের যাকাত নেই।”
হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা নয়। একে হাদীসে নববী হিসেবে বাতিল বলে ঘোষণা করেছেন বাইহাকী, ইবনু হাজার, আলবানী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস। এই বাক্যটি মূলত জাবির(রা) এর নিজের কথা। একজন অত্যন্ত দুর্বল বর্ণনাকারী ভুলবশত একে রাসূলুল্লাহ(সা) এর কথা বলে বর্ণনা করেছেন। (ইবনু হাজার, আদ দিরাইয়াতু ১/২৬০; আলবানী, ইরওয়াউল গালীল ৩/২৯৪-২৯৬)।
২.১৩.২. সিয়াম বিষয়ক
সিয়াম বিষয়ক অনেক জাল হাদীস ও মনগড়া কথা ইতোপূর্বে সালাত অধ্যায়ে ‘বার চাঁন্দের ফযীলত’ বিষয়ক আলোচনার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সিয়ামের বিষয়ে আরো দুই একটি বানোয়াট বা ভিত্তিহীন কথা এখানে উল্লেখ করছি।
১. সিয়ামের নিয়্যত
আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ‘নাওয়াইতু আন….’ বলে যত প্রকার নিয়্যত বলা হয় সবই বানোয়াট কথা। কোনো ইবাদতের এরূপ নিয়্যত পাঠ করার কথা কোনো হাদীসে বলা হয় নি।
২. ৩০ দিন সিয়াম ফরয হওয়ার কারণ
বিভিন্ন ইবাদতের কারণ নির্ণয় করা একটি বিশেষ বাতুল আগ্রহ। ফলে জালিয়াতগণ এ বিষয়ে অনেক কথা বানিয়েছে। রামাদানের ফরয সিয়াম বিষয়ে জালিয়াতগণ বানিয়েছেঃ “আমার উম্মাতের উপর ৩০ দিনের সিয়াম ফরয করা হয়েছে। কারণ আদম যখন ফল খেয়েছিলেন তখন তা তাঁর পেটের মধ্যে ৩০ দিন বিদ্যমান থাকে। যখন আল্লাহ আদমের তাওবা কবুল করলেন তখন ৩০ দিন ও ৩০ রাত একটানা সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন। আমার উম্মাতের উপর শুধু দিবসে সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন।…….(ইবনুল জাওযী, আল মাঊদূ‘আত ২/১০১; সুয়ূতী, আল লাআলী ২/৯৭; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১৪৫; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ১/১১৯)।
৩. ইফতার সাহরী ইত্যাদি খানা খাওয়ার হিসাব না হওয়া
সমাজে প্রচলিত আছে যে, ইফতার, সাহরী ইত্যাদি খানা খাওয়ার হিসাব নেই। এই অর্থের বানোয়াট হাদীসগুলির মধ্যে রয়েছেঃ “তিনব্যক্তির পানাহারের নেয়ামতের হিসাব গ্রহণ করা হবে না: ইফতারকারী, সাহরীর খাদ্য গ্রহণকারী ও মেহমান সহ খাদ্য গ্রহণকারী।”(সুয়ূতী, যািইলুল লাআলী পৃ. ১২১; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১৬৬; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ১/১২৪)।
এ সকল ভিত্তিহীন কথাবার্তার কারণে রামাদান মাসকে আমরা নিজে খাওয়ার মাসে পরিণত করেছি। অথচ রামাদান হলো অন্যকে খাওয়ানো ও সহমর্মিতার মাস। এছাড়া আমাদের ‘হিসাব হবে কিনা’ তা বিবেচনা না করে সাওয়াব বেশি হবে কিনা তা বিবেচনা করা উচিত।
৪. আইয়াম বীযের নামকরণ
চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখকে ‘আইয়ামুল বিদ’ বা ‘শুভ্র রাতের দিনগুলি’ বলা হয়। কারণ এই তারিখগুলিতে পূর্ণ চাঁদের কারণে প্রায় সারারাতই শুভ্রতা বা আলো বিরাজমান থাকে।(ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৪/২২৬; আব্দুর রাঊফ মুনাবী, ফাইদুল কাদীর ৪/২২৯)। কিন্তু জালিয়াতগণ ‘আইয়াম বিয’ এর নামকরণে অনেক জাল হাদীস প্রচলন করেছে। যেমনঃ “নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণের ফলে যখন আদম(আ) পৃথিবীতে আগমন করেন তখন তাঁর দেহ কাল হয়ে গিয়েছিল। ফলে ফেরেশতাগণ তাঁর জন্য কাঁদতে থাকেন। …তখন আল্লাহ আদমকে বলেন, তুমি আমার জন্য ১৩ তারিখ সিয়াম পালন কর। তিনি ১৩ তারিখ সিয়াম পালন করেন এবং এতে তাঁর এক তৃতীয়াংশ শুভ্র হয়ে যায়। অতঃপর মহান আল্লাহ তাঁকে বলেন, তুমি আজকের দিন ১৪ তারিখও সিয়াম পালন কর। তখন তিনি ১৪ তারিখও সিয়াম পালন করেন এবং তাঁর দুই তৃতীয়াংশ শুভ্র হয়ে যায়। অতঃপর মহান আল্লাহ তাঁকে বলেন, তুমি আজকের দিন ১৫ তারিখও সিয়াম পালন কর। তখন তিনি ১৫ তারিখ সিয়াম পালন করেন এবং তাঁর পুরো দেহ শুভ্র হয়ে যায়। এজন্য এই দিনগুলিকে ‘আইয়ামুল বীয’ বা ‘শুভ্রতার দিনগুলি’ নাম রাখা হয়।(ইবনুল জাওযী, আল-মাঊদূ‘আত ১/৩৭৫; সুয়ূতী, আল লাআলী ১/৪৮৩-৪৮৪; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/৫৪-৫৫)।
৫. আইয়াম বীযের সিয়াম পালনের ফযীলত
বিভিন্ন সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) মুমিনগণকে সকল নফল ইবাদত অল্প হলেও নিয়মিত পালন করার উৎসাহ দিয়েছেন। নফল সিয়ামের ক্ষেত্রে প্রতি চান্দ্র বা আরবী মাসে অন্তত তিনদিন সিয়াম পালনের উৎসাহ দিয়েছেন। কোনো কোনো হাদীসে বিশেষ করে প্রত্যেক চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ নফল সিয়াম পালনের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। (বুখারী, আস-সহীহ ১/৩৯৫, ২/৬৯৭-৬৯৯, ৩/১২৫৬, ১২৫৭; মুসলিম ১/৪৯৯, ২/৮১২-৮১৪)।
এই দিনগুলিতে সিয়াম পালনের বিশেষত্ব তিনটিঃ প্রথমত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিভিন্ন হাদীসে এই তিনদিন সিয়াম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।(বুখারী, আস-সহীহ ১/৩৯৫, ২/৬৯৭-৬৯৯, ৩/১২৫৬, ১২৫৭; মুসলিম ১/৪৯৯, ২/৮১২-৮১৪)।
দ্বিতীয়ত, তিনি নিজে সর্বদা এই তিন দিন সিয়াম পালন করতেন।(আলবানী, সহীহুল জামি ২/৮৭৬)। তৃতীয়ত, এই তিনদিন সিয়াম পালন করলে বা প্রতি মাসে অন্তত তিন দিন সিয়াম পালন করলে সারা বৎসর সিয়াম পালনের সাওয়াব হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।(বুখারী, আস-সহীহ ১/৩৯৫, ২/৬৯৭-৬৯৯, ৩/১২৫৬, ১২৫৭; মুসলিম ১/৪৯৯, ২/৮১২-৮১৪)।
মুমিনের জন্য এগুলিই যথেষ্ট। কিন্তু জালিয়াতগণ ‘আইয়ামে বিয’ এর ফযীলতের বিষয়ে অনেক জাল হাদীস প্রচার করেছে। যেমনঃ “যদি কেউ আইয়ামে বিযের সিয়াম পালন করে তবে ১ম দিনে(তের তারিখে) তাকে ১০ হাজার বৎসরের পুরস্কার প্রদান করা হবে, দ্বিতীয় দিনে(১৪ তারিখে) তাকে এক লক্ষ বৎসরের পুরস্কার প্রদান করা হবে এবং তৃতীয় দিনে(১৫ তারিখে) তাকে তিন লক্ষ্য বৎসরের সাওয়াব প্রদান করা হবে।” কোনো কোনো জালিয়াত একটু কমিয়ে বলেছেঃ “১ম দিনে তিন হাজার বৎসরের সাওয়াব, দ্বিতীয় দিনে ১০ হাজার বৎসরের এবং তৃতীয় দিনে ২০ হাজার বৎসরের সাওয়াব পাবে……।”(সুয়ূতী, আল লাআলী ২/১০৬-১০৭; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১৪৮; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ১/১২৮)।
এইরূপ আরো অনেক বানোয়াট কথা তারা প্রচার করেছে।
২.১১.৩. হজ্জ বিষয়ক
১. সাধ্য হলেও হজ্জ না করলে ইহুদী বা খৃস্টান হয়ে মরা
আমাদের সমাজে অতি পরিচিত একটি হাদীস, হজ্জ বিষয়ক যে কোনো ওয়ায, আলোচনা বা লেখালেখিতে যে হাদীসটি উল্লেখ করা হয়ঃ “যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহ পৌছার মত পাথেয় ও বাহনের মালিক হলো, অথচ হজ্জ করলো না, সে ইহুদী অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলে অথবা খৃস্টান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার কোনো অসুবিধা হবে না।”
হাদীসটির প্রসিদ্ধির অন্যতম কারণ হলো, প্রসিদ্ধ ৬টি হাদীস গ্রন্থের অন্যতম গ্রন্থ সুনানুত তিরমিযীতে এই হাদীসটি সংকলিত। ইমাম তিরমিযী বলেনঃ আমাকে মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া বলেন, আমাদেরকে মুসলিম ইবনু ইবরাহীম বলেছেন, আমাদেরকে হেলাল ইবনু আব্দুল্লাহ বলেছেন, আমাদেরকে আবূ ইসহাক হামদানী বলেছেন, হারিস থেকে, তিনি আলী থেকে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন………। হাদীসটি উদ্ধৃত করার পর ইমাম তিরমিযী বলেনঃ “এটি একটি গরীব হাদীস। হাদীসটি একমাত্র এই সনদ ছাড়া অন্য কোনো সূত্রে আমি পাই নি। এর সনদে আপত্তি রয়েছে। হেলাল ইবনু আব্দুল্লাহ একজন অজ্ঞাত পরিচয়। আর হারিস হাদীস বর্ণনায় দুর্বল।”(তিরমিযী, আস-সুনান ৩/১৭৬)।
এছাড়াও এ হাদীসটির সনদে আরো দুটি কঠিন দুর্বলতা রয়েছে।
প্রথমত, আবূ ইসহাক মুদাল্লিস ছিলেন। এখানে তিনি বলেন নি যে, হারিস তাকে হাদীসটি বলেছেন বা তিনি তার নিকট হতে হাদীস শুনেছেন। তার বর্ণনাভঙ্গি হতে বুঝা যায় তিনি সরাসরি হারিস হতে শুনেন নি।
দ্বিতীয়ত, হাদীসের পরবর্তী বর্ণনাকারী হিলাল ইবনু আব্দুল্লাহ অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি। হাদীসটি আদৌ আবূ ইসহাক বলেছেন, নাকি এই লোকটি বানিয়ে বলেছে, তা কিছুই জানার উপায় নেই।
এখানে উল্লেখ্য যে, এই অর্থে আরো কয়েকটি সনদে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সে সকল সনদের অবস্থা এর চেয়েও খারাপ। এ সকল কারণে কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীসটিকে জাল ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছেন। পক্ষান্তরে কেউ কেউ একে যয়ীফ বলে গণ্য করেছেন। আল্লামা ইবনু হাজার আসকালানী সকল সনদ পর্যালোচনা করে বলেন, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) থেকে এই কথাটি কোনো গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি। সবগুলি সনদই অত্যন্ত দুর্বল বা বাতিল। তবে সহীহ সনদে তা উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) হতে তাঁর নিজের বক্তব্য হিসাবে বর্ণিতে হয়েছে। (ইবনুল জাওযী, আল মাঊদূ‘আত ২/১২১-১২২; সুয়ূতী আল লাআলী ২/১১৮-১১৯)।
২. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কবর যিয়ারত বিষয়ক হাদীসসমূহ
যিয়ারত শব্দের অর্থ সাক্ষাত করা, দেখা করা, বেড়ান(visit, call)ইত্যাদি। জীবিত মানুষদের, বিশেষত আত্মীয় স্বজন ও নেককার মানুষদের যিয়ারত করা বা সাক্ষাত করা একটি হাদীস নির্দেশিত নেক কাজ। বিভিন্ন হাদীসে মুমিনদেরকে ‘তাযাউর ফিল্লাহ’( لًلهافروازالت) বা আল্লাহর ওয়াস্তে একে অপরের যিয়ারত বা দেখা সাক্ষাত করতে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। (মুনযিরী, আত-তারগীব ৩/২৪৭-২৪৯)।
অনুরূপভাবে মৃত মানুষদের কবর যিয়ারত করা, অর্থাৎ সাক্ষাত করা বা বেড়ানোও হাদীস সম্মত একটি মুস্তাহাব ইবাদত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রাওযা শরীফ যিয়ারত নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ যিয়ারত। এছাড়া তাঁকে ভালবাসা ঈমানের অংশ ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। আর সুন্নাত সম্মত যিয়ারতের মাধ্যমে এই মহব্বত বৃদ্ধি পায়। এছাড়া তাঁর পবিত্র কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দুরুদ-সালাম প্রদানের মর্যাদা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, রাওযা শরীফ যিয়ারত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
তবে এই ইবাদতের জন্য বিশেষ কোনো হাদীস আছে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ কউ এ বিষয়ক সকল হাদীস জাল ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ সেগুলিকে দুর্বল বা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে সে বিষয়ে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই।
এ বিষয়ক হাদীসগুলিকে অর্থের দিক দিয়ে মোটামুটি তিনভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর যিয়ারতকারী অথবা তাঁর বরকতময় কবর যিয়ারতের জন্য শাফায়াত বা রাহমাতের সুসংবাদ। দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর ইন্তিকালের পরে তাঁর পবিত্র কবর যিয়ারতকারীকে তার জীবদ্দশাতেই তার সাথে সাক্ষাতকারীর মর্যাদার সুসংবাদ দান। তৃতীয়ত, যিয়ারত পরিত্যাগকারীর প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ।
ক. যিয়ারতকারীর জন্য সুসংবাদ
১ম হাদীসঃ “যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করবে, আমার শাফা‘আত তার প্রাপ্য হবে।”
হাদীসটি ইবনু খুযাইমা, বাযযার, দারাকুতনী, বাইহাকী প্রমুখ মুহাদ্দিস সংকলন করেছেন। হাদীসটির ২টি সনদ রয়েছেঃ
১ম সনদঃ ইমাম বাযযার বলেনঃ আমাকে কুতাইবা বলেছেন, আমাকে আব্দুল্লাহ ইবনু ইবরাহীম বলেছেন, আমাকে আব্দুর রাহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম বলেছেন, তার পিতা থেকে, ইবনু উমার থেকে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন……।(হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২)।
আমরা অন্যত্র আব্দুর রামান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি যে, মুহাদ্দিসগণ তাকে অত্যন্ত দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ তাকে মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী বলে উল্লেখ করেছেন। এই সনদে তার ছাত্র আব্দুল্লাহ ইবনু ইবরাহীম নামক এই ব্যক্তিও অত্যন্ত দুর্বল। তিনি আব্দুর রাহমান ইবনু যাইদ ও অন্যান্য অনেক মুহাদ্দিসের নামে এমন অনেক হাদীস বর্ণনা করেছন, যেগুলি সে সকল মুহাদ্দিসের অন্য কোনো ছাত্র বর্ণনা করেন না বা অন্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায় না। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, তিনি অত্যন্ত দুর্বল ও পরিত্যক্ত রাবী। ইবুন হিব্বান তাকে হাদীস জালয়াতকারী বলে উল্লেখ করেছেন।(ইবনু আদী, আল কামিল ৪/১৯০-১৯১; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৪/৫৫-৫৬)।
আমরা দেখেছি যে, আব্দুর রাহমান বর্ণিত হাদীসই অত্যন্ত দুর্বল বা জাল বলে গণ্য। এই সনদে তার ছাত্রের অবস্থা এর চেয়ে আরও খারাপ।
দ্বিতীয় সনদঃ ইমাম দারাকুতনী বলেন, আমাদেরকে কাযী মুহামিলী বলেন, আমাদেরকে উবাইদুল্লাহ ইবুন মুহাম্মাদ আল-ওয়াররাক বলেছেন, আমাদেরকে মূসা ইবনু হিলাল বলেছেন, আমাদেরকে আব্দুল্লাহ(অথবা উবাইদুল্লাহ) ইবনু উমার আল উমারী বলেছেন, তিনি নাফী থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার থেকে, রাসূলু্ল্লাহ(ﷺ) বলেছেন…”(দারাকুতনী, আস সুনান ২/২৭৮)।
ইমাম বাইহাকীও একই সনদে মূসা ইবনু হিলাল থেকে, আবদুল্লাহ ইবনু উমার আল উমারি থেকে নাফি থেকে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার থেকে এই হাদীসটি সংকলিত করেছেন। হাদীসটি উদ্ধৃত করে বাইহাকী বলেনঃ হাদীসটি নাফী থেকে ইবনু উমার থেকে একটি মুনকার বা অত্যন্ত আপত্তিকর হাদীস। এই ব্যক্তি(মূসা ইবনু হিলাল) ছাড়া অন্য কেউই হাদীসটি বর্ণনা করেন নি।”(বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৩/৪৯০)।
ইমাম ইবনু খুযাইমাও একই সনদে হাদীসটি সংকলন করেছেন এবং বলেছেন, “হাদীসটি সনদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। …..হাদীসটি মুনকার, অর্থাৎ আপত্তিকর বা অত্যন্ত দুর্বল।(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৬/৫৬৬-৫৬৭; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৩২৮-৩২৯)।
এই সনদেও দুজন বর্ণনাকারী দুর্বল। মূসা ইবনু হিলাল নামক একজন অজ্ঞাত পরিচয় বা স্বল্প পরিচিত রাবী। আবূ হাতিম রাযী তাকে অজ্ঞাত পরিচয় বলেছেন। ইবনু আদী বলেছেন, আশা করি তার হাদীস মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। যাহাবী বলেন, এ ব্যক্তির হাদীস মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। …..তাঁর বর্ণিত হাদীসগুলির মধ্যে সবচেয়ে আপত্তিকর বা দুর্বল হলো এই হাদীসটি। (উকাইলী, আদ-দু‘আফা ৪/১৭০; ইবনু আদী, আল কামিল ৬/৩৫১)।
মূসা নামক এই রাবীর উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইবুন উমার ইবনু হাফস আল উমারী (১৭১ হি) দ্বিতীয় শতকের একজন তাবে-তাবেয়ী রাবী। তিনি হাদীস বর্ণনায় দুর্বল হলেও পরিত্যক্ত ছিলেন না। তাঁর ভাই ‘উবাইদুল্লাহ ইবনু উমার’ খুবই নির্ভরযোগ্য ছিলেন। আর তিনি দুর্বল ছিলেন। ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীন তাকে দুর্বল বা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলেছেন। আহমাদ ইবনু হাম্বল, ইবনু আদী, যাহাবী প্রমুখ মুহাদ্দিস তাকে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলেছেন। নাসাঈ ও অন্য কেউ কেউ তাকে দুর্বল বলেছেন। ইবনু হাজার আসকালানী সকল মতের সমন্বয় করে বলেন, “তিনি দুর্বল রাবী। ইমাম মুসলিম তাঁর বর্ণনাকে সহায়ক বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিরমিযী, নাসাঈ, আবু দায়ূদ ও ইবনু মাজাহ তার বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। (ইবনু আদী, আল কামিল ৪/১৪১; যাহাবী, আল মুগনী ১/৩৪৮-৩৪৯; মীযানুল ইতিদাল ৪/১৫১-১৫৩)।
কোনো কোনো বর্ণনায় মূসা ইবনু হিলাল তার উস্তাদ হিসেবে ‘উবাইদুল্লাহ ইবনু উমার’ এর নাম উল্লেখ করেছেন। তবে ইবনু খুযাইমা, বাইহাকী, যাহাবী প্রমুখ মুহাদ্দিস বলেছেন, এখানে উবাইদুল্লাহর উল্লেখ ভুল। হাদীসটি আব্দুল্লাহর বর্ণনা।(দারাকুতনী, আস-সুনান ২/২৭৮; বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৩/৪৯০)।
সর্বাবস্থায় এই সনদটি দুর্বল হলেও এতে কোনো মিথ্যাবাদী রাবী বা মিথ্যা বর্ণনার অভিযোগে অভিযুক্ত বা পরিত্যক্ত রাবী নেই।
২য় হাদীসঃ “ যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করবে, অথবা তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আমার যিয়ারত করবে, কেয়ামতের দিন আমি তার জন্য শাফায়াতকারী অথবা সাক্ষ্যদানকারী হব।” হাদীসটি আবূ দাউদ তায়ালিসী ও বাইহাকী সংকলন করেছেন। তাঁরা সিওয়ার ইবনু মাইমূন নামক এক ব্যক্তির সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এই সিওয়ার ইবনু মাইমূন বলেন, তাকে উমার ইবনুল খাত্তাব বংশের এক ব্যক্তি বলেছেন, উমার থেকে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন……।(বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৩/৪৮৮-৪৮৯; আস-সুনানুল কুবরা ৫/২৪৫)।
এই হাদীসের বর্ণনাকারী সিওয়ার ইবনু মাইমূন অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী। রিজাল শাস্ত্রের কোনো গ্রন্থে তার উল্লেখ পাওয়া যায় না। তার উস্তাদ ‘উমরের বংশের এক ব্যক্তি’ সম্পূর্ণ পরিচয়হীন। এজন্য ইমাম বাইহাকী হাদীসটি উদ্ধৃত করে বলেন, “এই সনদটি অজ্ঞাত”।(বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ৫/২৪৫)।
৩য় হাদীসঃ “ যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক আমার যিয়ারত করবে; কিয়ামতের দিন সে আমার প্রতিবেশী হয়ে বা আমার আশ্রয়ে থাকবে।”(বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৪/৪৮৮; যাহাবী, মীযানুল ই‘তিদাল ৭/৬৩; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ৬/১৮০)।
হাদীসটি বাইহাকী, যাহাবী, ইবনু হাজার প্রমুখ মুহাদ্দিস উদ্ধৃত করেছেন। তারা হাদীসটি ৩য় শতকের মুহাদ্দিস আব্দল মালিক ইবনু ইবরাহীম আল জুদ্দী(২০৫ হি) সূত্রে বর্ণনা করেন। আব্দুল মালিক বলেন, আমাদেরকে শু‘বা ইবনুল হাজ্জাজ(১৬২ হি) বলেছেন, সিওয়ার ইবনু মাইমুন থেকে, তিনি বলেন, আমাদেরকে হারূন ইবনু কুযা‘আহ বলেছেন, খাত্তাবের বংশের জনৈক ব্যক্তি থেকে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) থেকে, তিনি বলেছেন……।
এই হাদীসটির সনদ পূর্বের সনদের চেয়েও দুর্বল। উপরের সনদের দুটি দুর্বলতা ছাড়াও এই সনদে আরো দুটি দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, এই সনদে সিওয়ার এর উস্তাদ হারূন আবূ কুযা‘আহ এর সঠিক পরিচয় জানা যায় না। একে হারূন আবূ কুযা‘আহ বা হারূন ইবনু কুযা‘আহ বলা হয়। তার সম্পর্কে ইমাম বুখারী বলেন, এই ব্যক্তির হাদীস ভিত্তিহীন, অন্য কেউ তা বলে না। আযদী বলেন, এই ব্যক্তি পরিত্যক্ত।(ইবনু আদী, আল কামিল ৭/১২৮, যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৭/৬৩,৬৭; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ৬/১৮০, ১৮৩)। দ্বিতীয়ত, এই সনদে সাহাবীর নাম উল্লেখ করা হয় নি, ফলে সনদটি মুরসাল বা বিচ্ছিন্ন।
৪র্থ হাদীসঃ “যে ব্যক্তি আমার কাছে যিয়ারতকারী হিসেবে আগমন করবে, আমার যিয়ারত ছাড়া অন্য কোনো প্রয়োজন তাকে ধাবিত করবে না, তার জন্য আমার দায়িত্ব হবে যে, আমি কিয়ামতের দিন তার জন্য শাফা‘আত করব।”
হাদীসটি দারাকুতনী, তাবারানী, যাহাবী প্রমুখ মুহাদ্দিস সংকলন করেছেন। তাঁরা তাঁদের সনদে আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ আল আব্বাদীর সূত্রে বলেন, তিনি বলেছেন, আমাদেরকে মুসলিম(মাসলামা) ইবনু সালিম আল জুহানী বলেছেন, আমাকে আবদুল্লাহ (অথবা উবাইদুল্লাহ) ইবনু উমার বলেছেন, তিনি নাফি থেকে, তিনি সালিম থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার থেকে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন……(তাবারানী, আল মু’জামুল কবীর ১২/২৯১)। এই হাদীসের বর্ণনাকারী মুসলিম ইবনু সালিম আল জুহানী দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য রাবী ছিলেন। কেউ কেউ তার নাম ‘মাসলামা’ বলে উল্লেখ করেছেন। আবূ দাউদ সিজিসতানী বলেন, এই লোকটি সিকাহ বা বিশ্বস্ত নয়। ইমাম হাইসামী বলেন, এই ব্যক্তি দুর্বল।(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৬/৪১৫; ইবুন হাজার, লীসানুল মীযান ৬/২৯)।
৫ম হাদীসঃ “যে ব্যক্তি একান্ত নেক নিয়্যতে বা সাওয়াবের উদ্দেশ্যে মদীনায় আমার সাথে সাক্ষাত করবে, কেয়ামতের দিন আমি তার সাক্ষী ও শাফায়াতকারী হব।”
হাদীসটি ইবনু আবী দুনিয়া, বাইহাকী প্রমুখ মুহাদ্দিস সংকলন করেছেন। তারা একাধিক সনদে মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল ইবনু আবী ফুদাইক এর সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদেরকে আবুল মুসাইন্না সুলাইমান ইবনু ইয়াযিদ আল কাবী বলেছেন, আনাস ইবনু মালিক(রা) থেকে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন…..(বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৩/৪৮৯-৪৯০; ইবনু হাজার, তালখীসুল হাবীর ২/২৬৭)।
এই সনদে আবুল মুসাইন্না সুলাইমান ইবনু ইয়াযিদ নামক এই রাবীকে মুহাদ্দিসগণ দুর্বল বলেছেন। আবূ হাতিম রাযী বলেন, লোকটি শক্তিশালী রাবী ছিল না, আপত্তিকর হাদীস বর্ণনা করতেন। দারাকুতনীও তাকে দুর্বল বলেছেন। তবে ইবনু হিব্বান তাকে ‘সিকাহ’ বা বিশ্বস্ত রাবীদের তালিকাভুক্ত করছেন। ইমাম তিরমিযীও তাকে গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। মুহাদ্দিসগণের মতামত সমন্বয় করে ইবনু হাজার তাকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, আবুল মুসান্না তাবেয়ী ছিলেন না, তাবে-তাবেয়ী ছিলেন। ইবনু হিব্বান, ইবনু হাজার প্রমুখ মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, তিনি কোনো সাহাবী হতে হাদীস শিক্ষা করেন নি। বরং তাবেয়ীগণ হতে হাদীস শুনেছেন। এজন্য হাদীসটি সনদ বিচ্ছিন্ন বা মুনকাতী।(ইবনু হিব্বান, আস সিকাত ৬/৩৯৫; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৩/৩২১; ইবনু হাজার লিসানুল মীযান ৭/৪৮১; আলবানী, যায়ীফুল জামি, পৃ. ৮০৮)।
৬ষ্ঠ হাদীসঃ “আল্লাহ রহমত করুন সেই ব্যক্তিকে, যে তার উটের রশি তার হাতে নিয়ে আমার যিয়ারত করেছে।”
এই বাক্যটির বিষয়ে ইবুন হাজার আসকালানী, সাখাবী, সুয়ূতী, ইবুন ইরাক, মোল্লা আলী কারী, শাওকানী, দরবেশ হুত প্রমুখ মুহাদ্দিস বলেছেন যে, বাক্যটি ভিত্তিহীন বানোয়াট। (ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১৭৬; সাখাবি, আল মাকাদিস পৃ. ২৩৫; মোল্লা আলী কারী, আল আসরার পৃ. ১২৮; দরবেশে হুত, আসানুল মাতালিব, পৃ. ১১৪)।
উপরের ৬টি হাদীসের মধ্যে ৬ষ্ঠ হাদীসটি সর্বসম্মতভাবে ভিত্তিহীন বানোয়াট বাক্য। বাকী পাঁচটি হাদীস হতে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর যিয়ারত করা বা তাঁর সাথে সাক্ষাত করার ফযীলত অবগত হওয়া যায়। প্রথম হাদীসে কবর যিয়ারতের কথা স্পষ্ট বলা হয়েছে। তৃতীয়, চতূর্থ ও পঞ্চম হাদীসে রাসূলুল্লাহ(ﷺ)কে যিয়ারতের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় হাদীসে উভয়ের যে কোনো একটির কথা বলা হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর ইন্তিকালের পরে তাঁর পবিত্র কবর যিয়ারতও তাঁরই যিয়ারত বলে গণ্য হতে পারে।
আমরা দেখছি যে, এই অর্থের হাদীসগুলির সবগুলোর সনদই বেশ দুর্বল। ইবনু তাইমিয়া, ইবুন আব্দুল হাদী প্রমুখ মুহাদ্দিস এ অর্থের হাদীসগুলিকে একেবারেই ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। আলবানী একে যয়ীফ বা দুর্বল বলে গণ্য করেছেন। (ইবুন আব্দুল হাদী, আস-সারিম আল-মানকী পৃ. ২৯-২৪৬; আলবানী, ইরওয়াউল গালীল ৪/৩৩৩-৩৩৫)। তবে আমরা দেখতে পাই যে, প্রথম হাদীসটির দ্বিতীয় সনদ, ৪র্থ হাদীস ও পঞ্চম হাদীসের সনদে কোনো মিথ্যাবাদী বা একেবারে ‘মাজহূল’ বা অজ্ঞাতনামা কউ নেই। কাজেই এই সনদগুলি পরস্পরের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং একাধিক সনদের কারণে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।
খ. ওফাত পরবর্তী যিয়ারতকে জীবদ্দশায় যিয়ারতের মর্যাদা দান
৭ম হাদীসঃ “যে ব্যক্তি হজ্জ করে আমার মৃত্যুর পর আমার কবর যিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশাতেই আমার যিয়ারত করল।”
হাদীসটি দারাকুতনী, তাবারানী, বাইহাকী প্রমুখ মুহাদ্দিস সংকলন করেছেন। তাঁরা সকলেই হাদীসটি হাফস ইবুন সুলাইমান নামক রাবীর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। হাফস বলেন, তাকে লাইস ইবনু আবী সুলাইম বলেছেন, তাকে মুজাহিদ বলেছেন, আব্দুল্লাহ ইবুন উমার থেকে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন…….(দারাকুতনী, আস-সুনান ২/২৭৮; শু‘আবুল ঈমান ৩/৪৮৯, তাবারানী, আল-মুজামুল আউসাত ১/৯৪)। বাইহাকী হাদীসটি উদ্ধৃত করে বলেন, “একমাত্র হাফসই এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তিনি দুর্বল।(বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ৫/২৪৬; শু‘আবুল ঈমান ৩/৪৮৯)।
এই হাদীসের একমাত্র বর্ণনাকারী হাফস ইবুন সুলাইমান(১৮০ হি) প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য কারী ছিলেন। তবে তিনি হাদীস বর্ণনায় অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। কুরআনের কিরআত ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে তিনি এত ব্যস্ত থাকতেন যে, হাদীস মুখস্ত, পুনরালোচনা ও বিশুদ্ধ বর্ণনায় তিনি মোটেও সময় দিতেন না। ফলে তাঁর বর্ণিত হাদীসে এত বেশি ভুল পাওয়া যায় যে, ইমাম আহমদ ছাড়া অন্য সকল মুহাদ্দিস তাকে অত্যন্ত দুর্বল ও পরিত্যক্ত বলে গণ্য করেছেন। ইমাম আহমদ তাকে মোটামুটি চলনসই বলে মনে করতেন। যাহাবী, ইবনু হাজার ও অন্যান্য মুহাদ্দিস বলেছেন যে, তিনি নিজে সত্যবাদী ছিলেন, তবে হাদীস বলতে অত্যন্ত বেশি ভুল করতেন, সনদ উল্টে ফেলতেন, রাবীর নাম বদলে দিতেন, মতন পাল্টে দিতেন, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে পারতেন না। এজন্য তিনি পরিত্যক্ত রাবী হিসেবে গণ্য। ইমাম বুখারী তাকে পরিত্যক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। আর তিনি মিথ্যায় অভিযুক্তদেরই পরিত্যক্ত বলতেন। আবূ হাতিম রাযী, ইবনু আদী, ইবনু হিব্বান ও অন্যান্য মুহাদ্দিসও তাকে অত্যন্ত দুর্বল বলেছেন। ইবনু খিরাশ তাকে মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী বলে উল্লেখ করেছন। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ২/৩১৯-৩২১; ইবনু হাজার, তাকরীব, পৃ. ১৭২)।
এই সনদের হাফসের উস্তাদ লাইস ইবুন আবী সুলাইমও কিছুটা দুর্বল রাবী ছিলেন। তিনি একজন বড় আলিম, আবিদ ও সত্যপরায়ণ রাবী ছিলেন। তবে শেষ জীবনে তার স্মৃতি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ইমাম মুসলিম তার বর্ণনা সহায়ক বর্ণনা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সুনান চতুষ্টয়ের সংকলকগণ: তিরমিযী, নাসাঈ, আবূ দায়ূদ ও ইবনু মাজাহ তার বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৫/৫০৯; ইবনু হাজার, তাকরীব, পৃ. ৪৬৪)।
৮ম হাদীসঃ “আমার মৃত্যুর পর আমার কবর যে ব্যক্তি যিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমার যিয়ারত করল।”(তাবারানী, আল-মুজা‘মুল কাবীর ১২/৪০৬; আল-মুজামুল আউসাত ১/৯৪)।
ইমাম তাবারানী হাদীসটি উদ্ধৃত করে বলেন, আমাকে আহমাদ ইবনু রিশদীন বলেছেন, আমাদেরকে আলী ইবনুল হাসান ইবনু হারূন আনসারী বলেছেন, আমাকে লাইস ইবনু আবী সুলাইমের মেয়ের পুত্র লাইস বলেছেন, আমাকে লাইস ইবনু আবী সুলাইমের স্ত্রী আয়েশা বিনতু ইউনুস বলেছেন, তাকে মুজাহিদ বলেছেন, ইবুন উমার থেকে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন…..। এই সনদের প্রায় সকল রাবীই অজ্ঞাত পরিচয় বা দুর্বল। তাবারানীর উস্তাদ আহমদ ইবনু রিশদীন(২৯২ হি) দুর্বল ছিলেন। কোনো কোনো মুহাদ্দিস তাকে মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেছেন। (ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ১/২৫৭)। তাঁর উস্তাদ আলী ইবনুল হাসান নামক এই ব্যক্তির কোনোরূপ পরিচয় জানা যায় না। অনুরূপভাবে তাঁর উস্তাদ লাইস নামক এই ব্যক্তি, তার উস্তাদ আয়েশা নামক এই মহিলা এরাও একেবারেই অপরিচিত। এজন্য সনদটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। (হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২; আলবানী, যায়ীফাহ ১/১২৩-১২৪)।
৯ম হাদীসঃ “ যে ব্যক্তি আমার মৃত্যুর পর আমার যিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশাতেই আমার যিয়ারত করল।”
হাদীসটি ইমাম দারাকুতনী, বাইহাকী প্রমুখ মুহাদ্দিস সংকলন করেছেন। এই হাদীসের সনদ বর্ণনায় মুহাদ্দিসগণ বৈপরীত্য ও বিক্ষিপ্ততা দেখতে পেয়েছেন। দুইভাবে এই হাদীসটির সনদ ও মতন বলা হয়েছে।
প্রথম সনদঃ ২য় হিজরী শতকের মুহাদ্দিস ওকী ইবনুল জাররাহ(১৯৭ হি) বলেছেন, আমাদেরকে বলেছেন, খালীদ ইবুন আবূ খালীদ ও আবূ আউন উভয়ে শাবী ও আসওয়াদ ইবনু মাইমুন থেকে, তিনি হারূন আবূ কুযা‘আহ থেকে, তিনি হাতিব এর বংশের জনৈক ব্যক্তি হতে, তিনি হাতিব(রা) হতে, হাতিব(রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন……(দারাকুতনী, আস-সুনান ২/২৭৮; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ৫/২৪৫; শু‘আবুল ঈমান ৪/৪৮৮)।
ইতোপূর্বে ৩ নং হাদীসের সনদ আলোচনার সময় আমরা দেখতে পেয়েছি যে, হারূন আবূ কুযা‘আহ অপরিচিত, অগ্রহণযোগ্য ও পরিত্যক্ত রাবী। এই সনদে হারূন এর উস্তাদ ‘হাতিব এর বংশের জনৈক ব্যক্তি’ শুধু অজ্ঞাত পরিচয়ই নয়, তিনি অজ্ঞাতনামাও বটে। ২য১
দ্বিতীয় সনদঃ ৩য় শতকের মুহাদ্দিস ইউসূফ ইবনু মূসা বলেন, আমাদেরকে ওকী ইবনুল জাররাহ বলেছেন, আমাদেরকে মাইমূন ইবনু সিওয়ার (সিওয়ার ইবনু মাইমূন)বলেছেন, আমাকে হারূন আবূ কুযা‘আহ..(বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৪/৪৮৮; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ৬/১৮০)।
এই সনদটি প্রথম সনদের চেয়েও দুর্বল। কারণ উপরে ৩ নং হাদীসের আলোচনা হতে আমরা দেখেছি যে, সিওয়ার ইবনু মাইমূন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি।
উপরের তিনটি হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর ওফাতের পরেও যে মুমিন তাঁর কবর যিয়ারত করবে, সে জীবদ্দশায় তাঁর সাথে সাক্ষাতের মর্যাদা লাভ করবে। আমরা দেখেছি যে, তিনটি সনদই অত্যন্ত দুর্বল। প্রথম ও দ্বিতীয় সনদে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত রাবী রয়েছেন। তৃতীয় সনদের পরিত্যক্ত রাবী রয়েছেন। এছাড়া সনদগুলিতে সম্পূর্ণ অজ্ঞাতনামা ও অজ্ঞাতপরিচয় রাবী রয়েছে। এ কারণে ইবনু তাইমিয়া, ইবুন আব্দুল হাদী, আলবানী প্রমুখ মুহাদ্দিস এই হাদীসগুলিকে ‘মাঊদূ’ বা জাল বলে গণ্য করেছেন।
সনদগত অগ্রহণযোগ্যতা ছাড়াও অর্থগতভাবেও হাদীসগুলি ইসলামের মূল চেতনার বিরোধী বলে তাঁরা দাবি করেছেন। ইবুন তাইমিয়া বলেন, এ কথা যে মিথ্যা তা স্পষ্ট। এ কথা মুসলিমদের ধর্ম বিরোধী। কারণ যে মুমিন ব্যক্তি জীবদ্দশায় রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর যিয়ারত বা সাক্ষাত করবেন তিনি তাঁর সাহাবী বলে গণ্য হবেন। …..পরবর্তী যুগের একজন মুমিন বড় বড় ফরয ওয়াজিবগুলি বেশি বেশি পালন করেও কখনোই একজন সাহাবীর সম মর্যাদাসম্পন্ন হতে পারবেন না। তাহলে একটি মুস্তাহাব ইবাদত পালনের মাধ্যমে কিভাবে তিনি একজন সাহাবীর সমমর্যাদা লাভ করবেন?!(আলবানী, যায়ীফাহ ১/১২০-১২৪; ইরওয়াউল গালীল ৪/৩৩৫-৩৪১)।
গ. যিয়ারত পরিত্যাগকারীর প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ
১০ম হাদীসঃ “যে ব্যক্তি আমার হজ্জ করল, কিন্তু আমার যিয়ারত করল না, সে আমার সাথে অসদাচরণ করল বা বেয়াদবী করল।” অন্য ভাষায় “যে ব্যক্তি আমার যিয়ারত বা সাক্ষাত করল না সে আমার সাথে অসদাচরণ বা বেয়াদবী করল।”
হাদীসটি কোনো হাদীস সংকলক কোনো হাদীস গ্রন্থে সংকলন করেন নি। দুর্বল ও মিথ্যাবাদী রাবীদের জীবনীগ্রন্থসমূহে কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীসটি সংকলন করেছেন। তারা হাদীসটি একটিমাত্র সনদে সংকলিত করেছেন। তাঁরা উল্লেখ করেছেন যে, মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আন-নু‘মান নামক এক ব্যক্তি বলেন, আমাকে আমার দাদা আন-নুমান ইবনু শিবল বলেছেন, মালিক ইবনু আনাস আমাকে বলেছেন, তিনি নাফি থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার(রা) থেকে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন……..।”
এই সনদের দুইজন রাবী অত্যন্ত দুর্বল ও মিথ্যা হাদীস বর্ণনায় অভিযুক্ত। প্রথমত ইমাম মালিক থেকে বর্ণনাকারী আন-নু‘মান ইবনু শিবল নামক এই ব্যক্তি অত্যন্ত দুর্বল রাবী ছিলেন। কোনো কোনো মুহাদ্দিস তাকে মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয়ত তার পৌত্র মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদও মিথ্যাবাদী ও জালিয়াত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ইমাম দারাকুতনী, ইবনু হিব্বান, ইবনুল জাওযী, সাগানী, যাহাবী, ইবনু হাজার, দরবেশ হুত, শাওকানী, আলবানী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস হাদীসটিকে জাল বলে উল্লেখ করেছেন। দারাকুতনী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, এর জালিয়াতির জন্য দায়ী মুহাম্মাদ ইবুন মুহাম্মাদ ইবুন আন নু‘মান, তার দাদা নুমান ইবনু শিবল নন।(ইবনু হিব্বান, আল মাজরূহীন ৪/৭৪; ইবনু আদী, আল কামিল ৭/১৪, দরবেশ হুত, আসানুল মাতালিব, পৃ. ২২৯; আলবানী, যায়ীফাহ ১/১১৯)।
১১ শ হাদীসঃ “আমার উম্মাতের কোনো ব্যক্তির যদি স্বচ্ছলতা বা সুযোগ থাকে, তা সত্ত্বেও সে আমার সাথে সাক্ষাত বা যিয়ারত না করে তাহলে তার কোনো ওযর থাকে না।”
হাদীসটি ইবনু নাজ্জার তার ‘তারীখুল মদীনা’ নামক গ্রন্থে সংকলিত করেছেন। (ইরাকী, আল মুগনী, এহইয়াউ উলূমিদ্দীন সহ ১/৩০৬; সাখাবী, আল মাকাদিস পৃ. ৪২৪)। তাঁর সনদটি নিম্নরূপ। “মুহাম্মাদ ইবুন মুকাতিল থেকে, তিনি জাফর ইবনু হারূন থেকে, তিনি সাম‘আন ইবনু মাহদী থেকে, তিনি আনাস(রা) থেকে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন……।”(ইবনু আব্দুল হাদী, আস সারিম, পৃ. ২৩৪; আলবানী, ইরওয়াউল গালীল ৪/৩৪০)।
এই সনদটি মাঊদূ সনদ হিসেবে প্রসিদ্ধ। মুহাম্মাদ ইবনু মুকাতিল রাযী(২৪৮ হি) কিছুটা দুর্বল হলেও পরিত্যক্ত ছিলেন না। এই সনদে তিনি যার নিকট হতে হাদীসটি শুনেছেন, জাফর ইবনু হারূন নামক এ ব্যক্তি মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী ও জাল হাদীস প্রচারকারী হিসেবে পরিচিত। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ২/১৫১; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ২/১৩১)। তাততারতজাকাকতার উস্তাদ হিসেবে পরিচিত ‘সামআন ইবনু মাহদী’ সম্পর্কে ইবনু হাজার আসকালানী ও যাহাবী বলেছেনঃ এই লোকটি সম্পর্কে কিছু জানা যায় না বললে চলে। তার নামে আনাস ইবনু মালিক(রা) থেকে একটি বানোয়াট পান্ডুলিপি প্রচারিত। এতে প্রায় ৩০০ হাদীস আছে। মুহাম্মাদ ইবনু মুকাতিল রাযী, জাফর ইবনু হারূন আল আল-ওয়াসিতীর মাধ্যমে এই সাম‘আন থেকে সেই হাদীসগুলি বর্ণনা করেছেন। এই হাদীসগুলির জালিয়াতকে আল্লা্হ লাঞ্চিত করুন।(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৩/৩২৮; ইবুন হাজার, লীসানুল মীযান ৩/১১৪)।
বাহ্যত এই হাদীসটিও উপর্যুক্ত জাল পান্ডুলিপির অংশ। সর্বাবস্থায় হাদীসটির সনদে একাধিক মিথ্যাবাদী রাবী রয়েছে।
১২শ হাদীসঃ “যে ব্যক্তি প্রশস্ততা বা স্বচ্ছলতা পেল, কিন্তু আমার নিকট আগমন করল না, সে আমার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ বা বেয়াদবী করল।”
হাদীসটি ইমাম গাযালী তাঁর ‘এহইয়া্উ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থে সনদবিহীনভাবে উল্লেখ করেছেন। কোথাও কোনো গ্রন্থেই তা সনদসহ পাওয়া যায় না। আল্লামা সুবকী, ইরাকী, সাখাবী, আজলূনী, শাওকানী প্রমুখ মুহাদ্দিস নিশ্চিত করেছেন যে, এই বাক্যটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। (আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৩৬৬; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ১/১৫৩)।
উপরের তিনটি হাদীস থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে-তাঁর জীবদ্দশায় বা ইন্তিকালের পরে-যিয়ারত বা সাক্ষাত না করার অপরাধ বুঝা যায়। তবে আমরা দেখছি যে, তৃতীয় হাদীসটি একেবারেই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা এবং প্রথম ও দ্বিতীয় হাদীসের সনদের একাধিক মিথ্যাবাদী রয়েছে।
উপরের আলোচনা হতে আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বরকতময় কবর যিয়ারত এর ফযীলত বিষয়ক সকল হাদীসই দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে। সম্ভবত এ কারণেই প্রসিদ্ধ ছয়টি গ্রন্থের লেখকগণ, অন্যান্য সহীহ গ্রন্থের সংকলকগণ, ইমাম মালিক, ইমাম আহমদ প্রমুখ মুহাদ্দিস এ সকল হাদীস তাঁদের গ্রন্থসমূহে সংকলন করেন নি। এ সকল হাদীসের সনদগত দুর্বলতার কারণে কোনো কোনো মুহাদ্দিস ঢালাওভাবে এ সকল হাদীসকে জাল বা অত্যন্ত দুর্বল বা একেবারে অগ্রহণযোগ্য বলে মত প্রকাশ করেছেন। অপরদিকে কোনো কোনো মুহাদ্দিস এগুলির সবগুলিকে একত্রিত ভাবে সহীহ বা হাসান বলে গ্রহণ করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। ইবনু তাইমিয়্যা, ইবুনল জাওযী, ইবুন আব্দুল হাদী প্রমুখ মুহাদ্দিস রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পবিত্র কবর যিয়ারত বিষয়ক সকল হাদীসকেই জাল অথবা একেবারেই দুর্বল ও অগ্রহণযো্গ্য বলে উল্লেখ করেছেন। পক্ষান্তরে আল্লামা আবূ আলী ইবনুস সাকান, আব্দুল হক ইশবিলী, সুবকী, সাখাবী, ইবনু হাজার মাক্কী প্রমুখ মুহাদ্দিস এই অর্থের হাদীসগুলিকে গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন।(ইবনু তাইমিয়া, মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ২৭/২৯-৩৬, ১১৪-২৮৮; সাখাবী, আল মাকাদিস পৃ. ৪১০, ৪২৪)।
তবে উপরের আলোচনার মত অর্থগত মতপার্থক্য করে কেউ সনদগুলি আলোচনা করেছেন বলে জানতে পারি নি। একজন নগণ্য তালিব ইলম হিসেবে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, তৃতীয় অর্থে অর্থাৎ যিয়ারত পরিত্যাগকারীর প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশের অর্থে বর্ণিত সকল হাদীসই জাল ও ভিত্তিহীন। দ্বিতীয় অর্থে, অর্থাৎ ওফাতের পরে কবর যিয়ারতকারীকে জীবদ্দশায় যিয়ারতকারীর মর্যাদা প্রদান বিষয়ক হাদীসগুলি অত্যন্ত দুর্বল বা জাল।
প্রথম অর্থে, অর্থাৎ যিয়ারতকারীর জন্য শাফায়াতের সুসংবাদ প্রদানমূলক হাদীসগুলি হাসান পর্যায়ের বলে গণ্য করা উচিত। কারণ একই অর্থে ৫টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে তিনটি সনদের দুর্বলতা সম্পূরকযোগ্য। ১ম হাদীসের ২য় সনদ, ৪র্থ হাদীস এবং ৫ম হাদীসের সনদে কোনো মিথ্যায় অভিযুক্ত বা পরিত্যক্ত রাবী নেই। কাজেই একাধিক সনদের কারণে তা ‘হাসান লি গাইরিহী’ বলে গণ্য হবে। মহান আল্লাহই ভাল জানেন।
৩. বিবাহের আগে হজ্জ আদায়ের প্রয়োজনীয়তা
আমাদের দেশে ‘হজ্জ রাখতে পারবে কিনা’, ‘হজ্জের আগে ছেলেমেয়ে বিয়ে দিতে হবে’, ‘হজ্জের আগে পিতামাতার হজ্জ করাতে হবে’, বা পিতামাতার অনুমতি লাগবে….. ইত্যাদি কিছু ভিত্তিহীন ধারণা ও কুসংস্কারের কারণে সাধারণত মুসলমানরা বার্ধক্যের আগে হজ্জ করেন না, যদিও হজ্জ ফরয হওয়ার পর দেরি করা মোটেও উচিত নয়। ইন্দোনেশিয়ায় বিষয়টি উল্টো। যৌবনের শুরুতে, বিবাহের আগে হ্জ্জ না করলে মনে হয় হজ্জ হলো না। একটি জাল হাদীস এর কারণ। এই জাল হাদীসটিতে বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি হজ্জ পালনের আগে বিবাহ করল, সে পাপ দিয়ে শুরু করল।” মুহাদ্দিসগণ একমত যে, হাদীসটি জাল। (ইবনু আদী, আল কামিল ১/৩৬৪; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ১/৪৫৮; সুয়ূতী, আল-লাআলী ২/১২০; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/১৬৭; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ১/১৩৮)।
৪. হজ্জের কারণে বান্দার হক্কও ক্ষমা হওয়া
হজ্জ বিষয়ক প্রচলিত কিছু হাদীসে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিদায় হজ্জের সময় হাজীদের সকল পাপের মার্জনার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন। মহান আল্লাহ প্রথমে জানান যে বান্দার হক ছাড়া হাজীর সকল পাপ ক্ষমা করা হবে। বারংবার দোয়ার পর আল্লাহ জানান যে, হাজীর সকল পাপ এমনকি বান্দার হক্ক বিষয়ক পাপও ক্ষমা করা হবে…..।
এই মর্মে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেকটি হাদীসের সনদই অত্যন্ত দুর্বল। প্রত্যেক সনদেই মিথ্যাবাদী অথবা অত্যন্ত দুর্বল রাবী অথবা অজ্ঞাতনামা ও অজ্ঞাতপরিচয় রাবী রয়েছে। কোনো কোনো মুহাদ্দিস একাধিক সনদের কারণে সেগুলিকে ‘দুর্বল’ হলেও সরাসরি জাল নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন। পক্ষান্তরে কোনো কোনো মুহাদ্দিস এই অর্থের সকল হাদীসই জাল ও ভিত্তিহীন বলে মত প্রকাশ করেছেন। কারণ প্রত্যেক হাদীসেই মিথ্যাবাদী ও পরিত্যক্ত রাবী রয়েছেন। এছাড়া তা বিভিন্ন সহীহ হাদীস দ্বার প্রমাণিত অর্থের বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে। বিভিন্ন সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, হক্কুল ইবাদ বা বান্দার অধিকার বা প্রাপ্য সংশ্লিষ্ট বান্দা ক্ষমা না করলে ক্ষমা করেন না। এমনকি জিহাদ ও শাহাদাতের দ্বারাও তা ক্ষমা হয় না। (ইবনুল জাওযী, আল মাঊদূ‘আত ২/১২৪-১২৭; যাহাবী, তারতীবুল মাঊদূ‘আত পৃ. ১৮৫; সুয়ূতী, আল লাআলী ২/১২০-১২৪; আল মুনযিরী, আত তারগীব ২/১২৯-১৩১)।
২.১৪. যিকর, দোয়া, দুরূদ, সালাম ইত্যাদি
২.১৪.১. কুরআন তিলাওয়াত বিষয়ক
কুরআন কারীমের বিভিন্ন সূরা বা আয়াতের ফযীলত বিষয়ে অনেক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যেগুলির বিষয়ে ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার এ সকল বিষয়ে অনেক মিথ্যা কথাও হাদীস নামে চালানো হয়েছে। আমাদের দেশে প্রচলিত বিভিন্ন গ্রন্থে এ জাতীয় অনেক অনির্ভরযোগ্য ও বানোয়াট কথা রয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশে কুরআন কারীমের বিভিন্ন সূরা বা আয়াত বিষয়ক দুই প্রকারের কথা প্রচলিত। এক প্রকারের কথা ফযীলত বা আখিরাতের মর্যাদা, সাওয়াব, আল্লাহর দয়া ইত্যাদি বিষয়ক। দ্বিতীয় প্রকারের কথা তদবীর বা দুনিয়ায় বিভিন্ন ফলাফল বিষয়ক।
উমার আল মাউসিলীর আলোচনা হতে দেখেছি যে, বিভিন্ন সূরা ও আয়াতের ফযীলতে কিছু সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া প্রচলিত বাকি হাদীসগুলি অধিকাংশই যয়ীফ বা বানোয়াট। বিশেষত, তাফসীরে কাশশাফ ও তাফসীরে বায়যাবীর প্রতিটি সূরার শেষে সেই সূরার ফযীলত বিষয়ক যে সকল কথা বলা হয়েছে তা মূলত এ বিষয়ক দীর্ঘ জাল হাদীসটি হতে নেওয়া হয়েছে। আমাদের সমাজে পাঞ্জ সূরার ফযীলত বিষয়ক অধিকাংশ কথাই জাল অথবা যয়ীফ। এই বিষয়ক যয়ীফ ও মাউযূ হাদীসের সংখ্যা অনেক বেশি এবং এগুলির বিস্তারিত আলোচনার জন্য পৃথক পুস্তকের প্রয়োজন। এই বইয়ের কলেবর ইতোমধ্যেই অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। এজন্য আমরা এই বইয়ে ফযীলত বিষয়ক যয়ীফ ও জাল হাদীসগুলি আর আলোচনা করছি না। বরং এখানে আমল-তদবীর বিষয়ক কিছু কথা উল্লেখ করছি।
২.১৪.২. আমল তদবীর ও খতম বিষয়ক
কুরআনের আয়াত দ্বারা ঝাড় ফুঁক দেওয়া ও এগুলি পাঠ করে বিভিন্ন রোগব্যাধি বা বিপদাপদ থেকে মুক্তির জন্য আমল করা বৈধ। হাদীস শরীফে কুরআন দ্বারা রুকইয়া বা ঝাড় ফুঁক করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাদীসের দোয়া বা যে কোনো ভাল অর্থের বাক্য দ্বার ঝাড় ফুঁক করা বৈধ।
ঝাড়ফুঁক বা তদবীর দুই প্রকারের। কিছু ঝাড়ফুঁক বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এই প্রকারের ঝাড়ফুঁক ও আমল সীমিত। আমাদের সমাজে অধিকাংশ ঝাড়ফুঁক আমল ইত্যাদি পরবর্তী যুগের বুযুর্গদের অভিজ্ঞতার আলোকে বানানো। যেমন, অমুক সূরা বা অমুক আয়াতটি এতবার বা এতদিন বা অমুক সময় পাঠ করলে অমুক ফল লাভ হয় বা অমুক রোগ হতে মুক্ত হওয়া যায়। এইরূপ বিভিন্ন আমল বা তদবীরই বিভিন্ন বুযুর্গের অভিজ্ঞতা প্রসূত।
কেউ ব্যক্তিগত আমল বা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ‘তদবীর’ বা ‘রুকইয়্যা শরইয়্যা’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তবে এগুলির কোনো খাস ফযীলত আছে বা এগুলি হাদীস সম্মত এরূপ ধারণা করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নামে মিথ্যা বলা হবে। এছাড়া তদবীর বা আমল হিসেবেও আমাদের উচিত সহীহ হাদীসে উল্লেখিত তদবীর, দোয়া ও আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা।
হাদীসের নামে যে সকল বানোয়াট ‘আমল’ বা ‘তদবীর’ আমাদের দেশে প্রচলিত কোনো কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় সেগুলির মধ্যে রয়েছেঃ
১. লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা……দারিদ্র্য বিমোচনের আমল
(লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ) এই যিকরটির ফযীলতে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। বিভিন্ন হাদীসে এই বাক্যটিকে বেশি বেশি করে বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বাক্যটি জান্নাতের অন্যতম ধনভান্ডার, গোনাহ মাফের ও অফুরন্ত সাওয়াব লাভের অসীলা বলে বিভিন্ন হাদীসে বলা হয়েছে। এ বিষয়ক কিছু সহীহ হাদীস আমি ‘রাহে বেলায়াত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছি। কিন্তু আমাদের দেশে প্রচলিত বিভিন্ন গ্রন্থে হাদীস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যহ এই বাক্যটি ১০০ বার পাঠ করবে সে কখনো দরিদ্র থাকবে না।’ কথাটি বানোয়াট বলেই প্রতীয়মান হয়।
২. ঋণমুক্তির আমল
আলী(রা) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, নিম্নের বাক্যটি বললে পাহাড় পরিমাণ ঋণ থাকলেও আল্লাহ তা পরিশোধ করাবেনঃ “হে আল্লাহ, আপনি আপনার হালাল প্রদান করে আমাকে হারাম হতে রক্ষা করুন এবং আপনার দয়া ও বরকত প্রদান করে আমাকে আপনি ছাড়া অন্য সকলের অনুগ্রহ হতে বিমুক্ত করে দিন।” হাদীসটি সহীহ।(সুনানুত তিরমিযী ৫/৫৬০; মুসতাদরাক হাকিম ১/৭২১)।
কিন্তু কোনো বিশেষ দিনে বা বিশেষ সংখ্যায় দোয়াটি পাঠ করার বিষয়ে কোনো নির্দেশ কোনো হাদীসে দেওয়া হয় নি। প্রচলিত কোনো কোনো গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি শুক্রবার দিনে ৭০ বার এই দোয়া পড়বে, অল্প দিনের মধ্যে আল্লাহ তাকে ধনী ও সৌভাগ্যশালী করে দিবেন। হযরত আলী(রা) বলেছেন, শুক্রবার দিন জুময়ার নামাযের পূর্বে ও পরে ১০০ বার করে দুরূদ পড়ে এই দোয়া ৫৭০ বার পাঠ করলে পাহাড় পরিমাণ ঋণ থাকলেও তাহা অল্প দিনের মধ্যে পরিশোধ হয়ে যাবে…..।” এই বর্ণনাগুলি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে প্রতীয়মান হয়।
৩. সূরা ফাতিহার আমল
সূরা ফাতিহার ফযীলতে বলা হয়ঃ “ফাতিহা যে নিয়্যতে পাঠ করা হবে তা পূরণ হবে।” এই কথাটি ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা। আরেকটি কথা বলা হয়। “সূরা ফাতিহা সকল রোগের আরোগ্য বা শেফা।” এই কথাটি একটি যয়ীফ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।(সাখাবী, আল মাকাদিস পৃ. ৩০৫, নং ৭৩৪; মুল্লা আলী কারী, আল আসরার পৃ. ১৬৫)।
৪. বিভিন্ন প্রকারের খতম
বিভিন্ন প্রকারের খতম প্রচলিত আছে। সাধারণত, দুটি কারণে ‘খতম’ পাঠ করা হয়। (১) বিভিন্ন বিপদাপদ কাটানো বা জাগতিক ফল লাভ ও (২) মৃতের জন্য সাওয়াব পাঠানো। উভয় প্রকার খতমই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এ সকল খতমের জন্য পঠিত বাক্যগুলি অধিকাংশই খুবই ভাল বাক্য। এগুলি কুরআন কারীমের আয়াত বা সুন্নাত সম্মত দোয়া ও যিকর। কিন্তু এগুলি এক লক্ষ বা সোয়া লক্ষ বার পাঠের কোনো নির্ধারিত ফযীলত, গুরুত্ব বা নির্দেশনা কিছুই কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীসে বর্ণিত হয় নি। এ সকল ‘খতম’ সবই বানোয়াট। উপরন্তু এগুলিকে কেন্দ্র করে কিছু হাদীসও বানানো হয়েছে।
‘বিসমিল্লাহ’ খতম, দোয়া ইউনুস খতম, কালেমা খতম ইত্যাদি সবই এই পর্যায়ের। বলা হয় ‘সোয়া লাখ বার বিসমিল্লাহ পড়লে অমুক ফল লাভ করা যায়’ বা ‘সোয়া লাখ বার দোয়া ইউনুস পাঠ করলে অমুক ফল পাওয়া যায়’ ইত্যাদি। এগুলি সবই বুযুর্গদের অভিজ্ঞতার আলোকে বানানো এবং কোনোটিই হাদীস নয়। তাসমিয়া বা (বিসমিল্লাহ), তাহলীল বা (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) ও দোয়া ইউনুস এর ফযীলত ও সাওয়াবের বিষয়ে সহীহ হাদীস রয়েছে। (দেখুন, লেখকের অন্য বই: রাহে বেলায়াত, পৃ. ৮৯)। তবে এগুলি এক লক্ষ, সোয়া লক্ষ ইত্যাদি নির্ধারিত সংখ্যায় পাঠ করার বিষয়ে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয় নি। খতমে খাজেগানের মধ্যে পঠিত কিছু দোয়া সুন্নাত সম্মত ও কিছু দোয়া বানোয়াট। তবে পদ্ধতিটি পুরোটাই বানানো।
২.১৪.৩. যিকর, ওযীফা, দোয়া ইত্যাদি
১. মহান আল্লাহর বিভিন্ন পাক নামের ফযীলত বা আমল
মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে উল্লেখ করেছেনঃ
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا ۖ وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ ۚ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ [٧:١٨٠]
-“ এবং আল্লাহর আছে সুন্দরতম নামসমূহ; কাজেই তোমরা তাঁকে সে সকল নামে ডাকবে। যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন করবে। তাঁদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই তাদেরকে দেওয়া হবে।”(সূরা আরাফঃ আয়াত ১৮০)।
সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থে সংকলিত হাদীসে হযরত আবূ হুরাইরা(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহর ৯৯টি নাম আছে, ১০০’র একটি কম, যে ব্যক্তি এই নামগুলি সংরক্ষিত রাখবে বা হিসাব রাখবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”(সহীহ বুখারী ২/৯৮১; নং ২৫৮৫; সহীহ মুসলিম ৪/২০৬৩, নং ২৬৭৭)।
এই হাদীসে নামগুলির বিবরণ দেওয়া হয় নি। ৯৯ টি নাম সম্বলিত একটি হাদীস ইমাম তিরমিযী, ইবনু মাজাহ ও অন্য কয়েকজন মুহাদ্দিস সংকলন করেছন।(সুনানুত তিরমিযী ৫/৫৩০; নং ৩৫০৭; মুসতাদরাক হাকিম ১/৬২-৬৩)। কিন্তু অধিকাংশ মুহাদ্দিস উক্ত বিবরণকে যয়ীফ বলেছেন। ইমাম তিরমিযী নিজেই হাদীসটি সংকলন করে তার দুর্বলতার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। কোনো মুহাদ্দিস বলেন, ৯৯টি নামের তালিকা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বা আবূ হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত নয়। পরবর্তী রাবী এগুলি কুরআনের আলোকে বিভিন্ন আলিমের মুখ হতে সংকলিত করে হাদীসের মধ্যে উল্লেখ করেছেন। কুরআন কারীমে উল্লেখিত অনেক নামই এই তালিকায় নেই। কুরআন কারীমে মহান আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি নামে ডাকা হয়েছে ‘রাব্ব’ বা প্রভু নামে। এই নামটিও এ তালিকায় নেই। (ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১১/২১৭)।
এক্ষেত্রে আগ্রহী মুসলিম চিন্তা করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ৯৯টি নাম দিলেন, কিন্তু তার তালিকা দিলেন না কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে উলামায়ে কেরাম বলেন যে, কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আংশিক গোপন রাখা হয়, মুমিনের কর্মোদ্দীপনা বৃদ্ধির জন্য। যেমন, লাইলাতুল কাদর, জুমু’আর দিনের দোয়া কবুলের সময় ইত্যাদি। অনুরূপভাবে নামের নির্ধারিত তালিকা না বলে আল্লাহর নাম সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন বান্দা আগ্রহের সাথে কুরআন কারীমে আল্লাহর যত নাম আছে সবই পাঠ করে, সংরক্ষণ করে এবং সে সকল নামে আল্লাহকে ডাকতে থাকে এবং সেগুলির অসীলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করে। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ১১/২১৭-২১৮, ১১/২২১; নাবাবী, শারহু সহীহ মুসলিম ১৭/৫)।
কোনো কোনো মুহাদ্দিস ইমাম তিরমিযী সংকলিত তালিকাটিকে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছেন।(নাবাবী, আল আযকার পৃ. ১৫১; জামউল উসূল ৪/১৭৩-১৭৫)। সর্বাবস্থায় আগ্রহী যাকির এই নামগুলি মুখস্ত করতে পারেন। এছাড়া কুরআন কারীমে উল্লেখিত আল্লাহর মোবারক নাম নিয়মিত কুরআন পাঠের মাধ্যমে সংরক্ষিত রাখতে হবে।
আল্লাহ তায়ালার বরকতময় নামের অসীলা দিয়ে কিভাবে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে হবে, মহিমাময় আল্লাহর ‘ইসমু আযম’ কি এবং এর মাধ্যমে কিভাবে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে হবে সে বিষয়ক সহীহ হাদীসগুলি আমি রাহে বেলায়াত গ্রন্থে সনদসহ বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
আমাদের দেশের প্রচলিত অনেক বইয়ে এ সকল নামের আরো অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন প্রত্যহ এগুলি পাঠ করলে অন্নকষ্ট হবে না, রোগব্যাধি দূর হবে, স্বপ্নযোগে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর যিয়ারত হবে, মনের আশা পূর্ণ হবে, দৈনিক এতবার অমুক নামটি এত দিন পর্যন্ত পড়লে, বা লিখলে অমুক ফল লাভ করা যাবে অথবা অমুক নাম প্রতিদিন এতবার এই পদ্ধতিতে করলে অমুক ফল পাওয়া যাবে, অথবা অমুক নাম এতবার পাঠ করতে হবে, ইত্যাদি। এই ধরনের কোনো কথাই কুরআন বা হাদীসের কথা নয়। কোনো কোনো বুযুর্গ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে কোনো কোনো আমল বা তদবীর করেছেন বা শিখিয়েছেন। তবে এগুলিকে আল্লাহর কথা বা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কথা বলে মনে করলে বা হাদীস হিসেবে বর্ণনা করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নামে মিথ্যা বলা হবে।
এ বিষয়ক প্রচলিত জাল হাদীসগুলির মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপঃ
২. “আল্লাহর যিকর সর্বোত্তম যিকর।”
বিভিন্ন পুস্তকে হাদীস হিসেবে নিম্নের বাক্যটি উল্লেখ দেখা যায়ঃ “আল্লাহর যিকর সর্বোত্তম যিকর।” অর্থের দিক থেকে কথাটি ঠিক। আল্লাহর যিকর তো সর্বোত্তম যিকর হবেই। আল্লাহর যিকর ছাড়া আর কার যিকর সর্বোত্তম হবে? তবে কথাটি হাদীস নয়। কোনো সহীহ বা যয়ীফ সনদে তা বর্ণিত হয়েছে বলে জানা যায় না।
৩. “যে ব্যক্তি রাত্রিতে আল্লাহর নাম যিকর করে তাহার অন্তরে এবং মৃত্যু হইলে তাহার কবরে নূর চমকাইতে থাকিবে” (মৌলভী শামছূল হুদা, নেয়ামুল কুরআন পৃ. ১৭)।
৪. যে ব্যক্তি ফযরের সময় আল্লাহ নামটি ১০০ বার যিকর করে নিম্নোক্ত ৬টি নাম(জাল্লা জালালুহু, ওয়া আম্মা নাওয়ালুহু, ওয়া জাল্লা সানাউহু, ওয়া তাকাদ্দাসাত আসমাউহূ, ওয়া আ‘যামা শানুহু, ওয়া লা ইলাহা গাইরুহু) একবার করে পড়বে, সে ব্যক্তি গোনাহ হতে এমনভাবে মুক্ত হবে যেন সে এইমাত্র মাতৃগর্ভ হতে জন্মলাভ করল। তার আমলনামা পরিষ্কার থাকবে এবং সেই ব্যক্তি নিশ্চয়িই বেহেশতে প্রবেশ করবে।(মৌলভী শামছূল হুদা, নেয়ামুল কুরআন পৃ. ৩৬)।
এগুলি সবই ভিত্তিহীন কথা যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নামে বলা হয়েছে।
৫. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালেমার খাস যিকর
আল্লাহর যিকর এর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ বাক্য হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেনঃ “সর্বোত্তম যিকর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”(তিরমিযী, আস সুনান ৫/৪৬২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/১২৪৯; হাকিম, আল মুসতাদরাক ১/৬৭৬,৬৮১)। আরো বলেন, “তোমরা বেশি বেশি করে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে।(হাকিম, আল মুসতাদরাক ৪/২৮৫; হাইসামী, মাজমাওয যাওয়াইদ ১/৫২, ২/২১১, ১০/৮২)। অন্যত্র তিনি বলেনঃ “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বাক্য চারটিঃ ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং ‘আল্লাহু আকবার’। তুমি ইচ্ছেমত এই বাক্য চারটির যে কোনো বাক্য আগে পিছে বলতে পার।”(সহীহ মুসলিম ৩/১৬৮৫, নং ২১৩৭)।
এ সকল যিকর এর গুরুত্ব, ফযীলত, সংখ্যা ও সময় বিষয়ক অনেক সহীহ ও হাসান হাদীস আমি ‘রাহে বেলায়াত’ পুস্তকে আলোচনা করেছি। আমরা সেখানে দেখেছি যে, এ সকল যিকর যপ করার বা উচ্চারণ করার কোনো বিশেষ পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শেখান নি। কোথাও কোনো একটি সহীহ বা যয়ীফ হাদীসেও বর্ণিত হয় নি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কাউকে টেনে টেনে বা জোরে জোরে বা ধাক্কা দিয়ে বা কোনো লতীফার দিকে লক্ষ্য করে, বা অন্য কোনো বিশেষ পদ্ধতিতে যিকর করতে শিক্ষা দিয়েছেন। মূল কথা হলো, মনোযোগের সাথে বিশুদ্ধ উচ্চারণে যিকর করতে হবে এবং প্রত্যেকে তার মনোযোগ ও আবেগ অনুসারে সাওয়াব পাবেন।
পরবর্তী যুগের বিভিন্ন আলেম, পীর ও মুরশিদ মুরীদগণের মনোযোগ ও আবেগ তৈরির জন্য কিছু বিশেষ পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। এগুলি তাঁদের উদ্ভাবন এবং মুরিদের মনোযোগের জন্য সাময়িক রিয়াযত বা অনুশীলন।
তবে জালিয়াতরা এ বিষয়েও কিছু কথা বানিয়েছে। এই জাতীয় একটি ভিত্তিহীন কথা ও জাল হাদীস নিম্নরূপঃ “একদা হযরত আলী(রা) হুযুর (ﷺ) কে বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের জন্য আমাকে সহজ সরল পন্থা বলিয়া দিন। হুযুর (ﷺ) বলিলেন-একটি যিকর করিতে থাক। হযরত আলী বলিলেন-কিভাবে করিব? এরশাদ করিলেন-চক্ষু বন্ধ কর এবং আমার সাথে তিনবার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বল। হযরত আলী(রা) ইহা হযরত হাসান বসরীকে এবং হযরত হাসান বসরী হইতে মুরশিদ পরম্পরায় আমাদের নিকট পর্যন্ত পৌছিয়াছে।”
এই গল্পটির আরেকটি ভার্সন নিম্নরূপঃ “আলী(রা) বলেন, খোদা-প্রাপ্তির অতি সহজ ও সরল পথ অবগত হওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওহীর অপেক্ষায় থাকেন। অতঃপর জিবরাঈল(আ) আগমন করে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালেমা শরীফ তিনবার শিক্ষা দিলেন। জিবরাঈল(আ) যেভাবে উচ্চারণ করলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সেভাবে আবৃত্তি করলেন। অতঃপর তিনি আলী(রা)কে তা শিখিয়ে দিলেন। আলী(রা) অন্যান্য সাহাবীকে তা শিখিয়ে দিলেন।”
এই হাদীসটি লোকমুখে প্রচারিত ভিত্তিহীন কথা মাত্র। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা মাঊদূ সনদেও হাদীসটি কোনো গ্রন্থে সংকলিত হয় নি। এজন্য শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী উল্লেখ করেছেন যে, তরীকার বুযুর্গগণের মুখেই শুধু এই কথাটি শোনা যায়। এছাড়া এর কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। (শাহ ওয়ালীউল্লাহ, আল-কাউলূল জামিল, পৃ. ৩৮-৩৯)।
৬. পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরে ওযীফা
অগণিত সহীহ হাদীসে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরে বিভিন্ন প্রকারের যিকর, দোয়া বা ওযীফার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে পালন করতেন বা সাহাবীগণকে ও উম্মাতকে পালন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এগুলি ছাড়াও কিছু ওযীফা আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত, যা পরবর্তী যুগের মানুষদের বানানো, কোনো হাদীসে তা পাওয়া যায় না। নিম্নের ওযীফাটি খুবই প্রসিদ্ধঃ
ফজর নামাযের পরে ১০০ বার ‘হুয়াল হাইয়্যূল কাইয়্যূম’, যোহরের নামাযের পর ১০০ বার ‘হুয়্যাল আলীয়্যূল আজীম’, আসরের নামাযের পরে ১০০ বার ‘হুয়ার রাহমানির রাহিম’, মাগরিবের নামাযের পর ১০০ বার ‘হুয়াল গাফূরুর রাহিম’ এবং ঈশার নামাযের পরে ১০০ বার ‘হুয়াল লাতীফুল খাবীর’ পাঠ করা।
এই বাক্যগুলি সবই সুন্দর এবং এগুলির পাঠে কোনো দোষ নেই। কিন্তু এগুলির কোনোরূপ ফযীলত হাদীসে বর্ণিত হয় নি। এগুলিকে এত সংখ্যায় পড়তে হবে বা অমুক সময়ে পড়তে হবে এমন কোনো প্রকারের নির্দেশনা কুরআন বা হাদীসে নেই। আমাদের উচিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর শেখানো ওযীফাগুলি পালন করা।
৭. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত শেষে ‘আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম…..’
বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ফরয নামাযের সালাম ফিরিয়ে বলতেনঃ “হে আল্লাহ, আপনিই সালাম(শান্তি), আপনার থেকেই শান্তি, হে মহাসম্মানের অধিকারী ও মর্যাদা প্রদানের অধিকারী, আপনি বরকতময়।”(সহীহ মুসলিম ১/৪১৪, নং ৫৯১)।
৮. দোয়ায়ে গঞ্জল আরশ
প্রচলিত মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন দোয়াগুলির অন্যতম এই দোয়াটি। এর মধ্যে যে বাক্যগুলি বলা হয় তার অর্থ ভাল। তবে এভাবে এই বাক্যগুলি কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। এই বাক্যগুলির সম্মিলিতরূপ এভাবে কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। এই বাক্যগুলির ফযীলত ও সাওয়াবে যা কিছু বলা হয় সবই মিথ্যা কথা।
৯. দোয়ায়ে আহাদ নামা
অনুরূপ একটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন দোয়া ‘দোয়ায়ে আহাদ নামা’। প্রচলিত বিভিন্ন পুস্তকে এই দোয়াটি বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দোয়ার মূল বাক্যগুলি একাধিক যয়ীফ সনদে বর্ণিত হাদীসে পাওয়া যায়। এ সকল হাদীসে এই দোয়াটি সকালে ও সন্ধ্যায় পাঠ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ফযীলত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি কেউ এই দোয়াটি সকাল সন্ধ্যায় পাঠ করেন তবে কিয়ামতের দিন সে মুক্তি লাভ করবে…..।(আহমদ, আল মুসনাদ ১/৪১২; হাকিম, আল মুসতাদরাক ২/৪০৯; তাবারী, আত-তাফসীর ১১/১৫৪)।
এছাড়া এই দোয়ার আমল ও ফযীলত সম্পর্কে প্রচলিত কথাগুলি সবই বানোয়াট। এ সকল বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথাবার্তার একটি নমুনা দেখুনঃ “তিরমিযী, শামী ও নাফাউল খালায়েক কিতাবে ‘দোয়ায়ে আহাদনামা’ সম্পর্কে বহু ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরশাদ করেন-যে ব্যক্তি ইসলামী যিন্দেগী যাপন করে জীবনে আহাদনামা ১০০ বার পাঠ করবে সে ঈমানের সাথে দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে এবং আমি তার জান্নাতের জামিন হব। ….হযরত জাবির(রা) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শুনেছি, মানবদেহে আল্লাহ তায়ালা তিন হাজার রোগব্যাধি দিয়েছেন। এক হাজার হাকিম ডাক্তারগণ জানেন এবং চিকিৎসা করেন। দু‘হাজার রোগের ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া কেহ জানেন না। যদি কেউ আহাদনামা লিখে সাথে রাখে অথবা দু‘বার পাঠ করে আল্লাহ তায়ালা তাকে দু‘হাজার ব্যাধি থেকে হিফাজত করবেন।……(মাও. মুহাম্মাদ আমজাদ হুসাইন; অজীফায়ে ছালেহীন পৃ. ১৪৪)।
এগুলি সবই ভিত্তিহীন কথা ও হাদীসের নামে জালিয়াতি। সুনানুত তিরমিযী তো দূরের কথা কোনো হাদীস গ্রন্থেই এ সকল কথা কোনো সহীহ বা যয়ীফ সনদে বর্ণিত হয় নি।
১০. দোয়ায়ে কাদাহ
প্রচলিত আরেকটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন দোয়া ‘দোয়ায়ে কাদাহ’। এই দোয়াটির ফযীলতে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট কথা।
১১. দোয়ায়ে জামিলা
দোয়ায়ে জামিলা ও এর ফযীলত বিষয়ক যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট কথা।
১২. হাফতে হাইকাল
হাফতে হাইকাল নামক এই দোয়াটির মধ্যে মূলত কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতগুলির এরূপ বিভক্তি, বন্টন ও ব্যবহার কোনো কোনো বুযুর্গের বানানো ও অভিজ্ঞতালব্ধ। এগুলির ব্যবহার ও ফযীলতে যা কিছু বলা হয় সবই বিভিন্ন মানুষের কথা, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কথা বা হাদীস নয়।
১৩. দোয়ায়ে আমান
প্রচলিত আরেকটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন দোয়া ‘দোয়ায়ে আমান’। এই দোয়ার বাক্যগুলির অর্থ ভাল। তবে এভাবে কোনো হাদীস বর্ণিত হয় নি এবং এর ফযীলতে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট।
১৪. দোয়ায়ে হিযবুল বাহার
প্রচলিত একটি দোয়া ও আমল হলো ‘দোয়ায়ে হিযবুল বাহার’। এই দোয়াটির মধ্যে ব্যবহৃত অনেক বাক্য কুরআন ও হাদীস হতে নিয়ে জমা করা হয়েছে। কিন্তু এভাবে এই দোয়াটি কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। এর কোনোরূপ গুরুত্ব, ফযীলত বা ফায়দাও হাদীসে বর্ণিত হয় নি।
অনেক বুযুর্গ এগুলির উপর আমল করেছেন। অনেকে ফল পেয়েছেন। অনেকে হয়তো মনে করতে পারেন যে, এ সকল দোয়াকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কথা বা হাদীস বলে মনে করলে অন্যায় হবে। কিন্তু বুযুর্গদের বানানো দোয়া হিসেবে আমল করতে দোষ কি?
এ কথা ঠিক যে, মুমিন যে কোনো ভাল বাক্য দিয়ে দোয়া করতে পারেন। তবে এ সকল দোয়ার মনগড়া কোনো সাওয়াব বা ফলাফল ঘোষণা করতে পারেন না। এছাড়া সহীহ হাদীসে অনেক সংক্ষিপ্ত ও সুন্দর দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে। যেগুলি পালন করলে এরূপ বা এর চেয়েও ভাল ফল পাওয়া যাবে বলে স্বয়ং রাসূলু্ল্লাহ (ﷺ) বলেছেন। এ সকল বানোয়াট সুন্দর সুন্দর দোয়ার প্রচলনের ফলে সে সকল ‘নববী’ দোয়া পরিত্যক্ত ও অচল হয়ে গিয়েছে। এ সকল দোয়ার বুযুর্গীর ছোঁয়া থাকলেও নবুওতের নূর নেই। আমাদের জন্য উত্তম হচ্ছে নবুওতের নূর হতে উৎসারিত দোয়াগুলি পালন করা। এতে দোয়া করা ও ফল লাভ ছাড়াও আমরা সুন্নাতকে জীবিত করার এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ভাষায় দোয়া করার অতিরিক্ত সাওয়াব ও বরকত লাভ করব। আমি আমার ‘রাহে বেলায়াত’ পুস্তকে সহীহ হাদীস থেকে অনেক দোয়া, মুনাজাত, যিকর ও ওযীফা উল্লেখ করেছি। আগ্রহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন।
২.১৪.৪. দরুদ-সালাম বিষয়ক
মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে মুমিনগণকে নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর মহান নবীর (ﷺ) উপর সালাত(দুরুদ) ও সালাম পাঠ করতে। হাদীসের আলোকে আমরা জানতে পারি যে, রাসূলে আকরাম (ﷺ) এর উপর দুরুদ ও সালাম পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও অত্যন্ত বড় নেক কর্ম। সহীহ হাদীসের আলোকে দরুদ ও সালামের ফযীলতের বিষয়গুলি ‘রাহে বেলায়াত’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এ সকল ফযীলতের মধ্যে রয়েছেঃ (১) সালাত ও সালাম পাঠকারীর উপর আল্লাহ নিজে সালাত(রহমত) ও সালাম প্রেরণ করেন। একবার সালাত(দরুদ) পাঠ করলে আল্লাহ সালাত পাঠকারীকে ১০ বার সালাত(রহমত) প্রদান করবেন, তার ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, ১০টি সাওয়াব লিখবেন এবং ১০টি গোনাহ ক্ষমা করবেন। একবার সালাম পাঠ করলে আল্লাহ তাকে ১০বার সালাম জানাবেন।
(২) সালাত বা দরুদ পাঠকারী যতক্ষণ দরুদ পাঠে রত থাকবেন ততক্ষণ ফিরিশতাগণ তার জন্য দোয়া করতে থাকবেন। একবার সালাত(দরুদ) পাঠ করলে আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ তাঁর উপর সত্তর বার সালাম(রহমত ও দোয়া) করবেন।
(৩) সালাত ও সালাম পাঠকারীর সালাত ও সালাম তার পরিচয়সহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে পৌছানো হবে।
(৪) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে সালাত পাঠকারীর জন্য দোয়া করবেন।
(৫) দরুদ পাঠ কিয়ামতে নবীজী (ﷺ) এর শাফায়াত লাভের অসীলা।
(৬) মহান আল্লাহ দরুদ পাঠকারীর দোয়া কবুল করবেন এবং সকল দুনিয়াবী ও পারলৌকিক সমস্যা মিটিয়ে দিবেন।
দরুদের এত সহীহ ফযীলত থাকা সত্ত্বেও কতিপয় আবেগী মানুষ দরুদের ফযীলতে আরো অনেক বানোয়াট কথা হাদীস নামে প্রচার করেছেন।
‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ’ এইটুকু কথা হলো দরুদের ন্যূনতম পর্যায়। এর সাথে ‘সালাম’ যোগ করলে সালামের ন্যূনতম পর্যায় পালিত হবে। যেমন, ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও সাল্লিম’। অথবা ‘সাল্লাল্লাহু আলা মুহাম্মাদিও ওয়া সাল্লামা।’ সহীহ হাদীসে দরুদ পাঠের জন্য দরুদে ইবরাহিমী ও ছোট বাক্যের দুই একটি দরুদ পাওয়া যায়। হাদীসে বর্ণিত দরুদের বাক্যগুলি ‘রাহে বেলায়াত’ ও ‘এহইয়াউস সুনান’ গ্রন্থদ্বয়ে উল্লেখ করেছি। আমাদের সমাজে প্রচলিত দরুদে বিভিন্ন নির্ধারিত বাক্য সবই বানোয়াট।
দরুদ সালাম বিষয়ক কিছু প্রচলিত বানোয়াট বা অনির্ভরযোগ্য কথা
১. জুমু‘য়ার দিনে নির্দিষ্ট সংখ্যায় দরুদ পাঠের ফযীলত
জুমুআর দিনে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে সহীহ হাদীসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এই দিনে নির্ধারিত সংখ্যক দরুদ পাঠের বিষয়ে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয় নি। এই দিনে বা রাতে ৪০ বার, ৫০ বার, ১০০ বার, ১০০০ বার বা অনুরূপ কোনো সংখ্যায় দরুদ পাঠ করলে ৪০, ৫০, ১০০ বছরের গোনাহ মাফ হবে, বা বিশেষ পুরস্কার বা ফযীলত অর্জন হবে অর্থে কোনো সহীহ হাদীস নেই। মুমিন যথাসাধ্য বেশি বেশি দরুদ ও সালাম এই দিনে পাঠ করবেন। নিজের সুবিধা ও সাধ্যমত ওযীফা তৈরি করতে পারেন। যেমন আমি শুক্রবারে অথবা প্রতিদিন ১০০, ৩০০ বা ৫০০ বার ওযীফা পাঠ করব।
২. দরুদে মাহি বা মাছের দরুদ
দরুদে মাহি ‘মাছের দরুদ’ এ বর্ণিত ঘটনাবলি সবই মিথ্যা ও বানোয়াট। অনুরূপভাবে এই দরুদের ফযীলতে বর্ণিত সকল কথাই মিথ্যা ও বানোয়াট। এই বানোয়াট কাহিনীতে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহর (ﷺ) যুগে এক ব্যক্তি নদীর তীরে বসে দরুদ পাঠ করতেন। ঐ নদীর একটি রুগ্ন মাছ শুনে শুনে দরুদটি শিখে ফেলে এবং পড়তে থাকে। ফলে মাছটি সুস্থ হয়ে যায়। পরে এক ইয়াহুদীরে জালে মাছটি আটকা পড়ে। ইহুদীর স্ত্রী মাছটিকে কাটতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। অবশেষে মাছটিকে ফুটন্ত তেলের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। মাছটি ফুটন্ত তেলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে দরুদটি পাঠ করতে থাকে। এতে ঐ ইহুদী আশ্চার্যান্বিত হয়ে মাছটিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহর (ﷺ) দরবারে উপস্থিত হয়। তাঁর দোয়ায় মাছটি বাকশক্তি লাভ করে এবং সকল বিষয় বর্ণনা করে।…… পুরো ঘটনাটিই ভিত্তিহীন মিথ্যা।
৩. দরুদের তাজ, তুনাজ্জিনা, ফুতুহাত, শিফা ইত্যাদি
দরুদে তাজ, দরুদে তুনাজ্জিনা, দরুদে ফুতুহাত, দরুদে শিফা, দরুদে খাইর, দরুদে আকবার, দরুদে লাখী, দরুদে হাজারী, দরুদে রূহী, দরুদে বীর, দরুদে নারীয়া, দরুদে শাফেয়ী, দরুদে গাওসিয়া, দরুদে মোহম্মাদী…….।
এ সকল দরুদ সবই পরবর্তী যুগের মানুষদের বানানো। এগুলির ফযীলতে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট ও মিথ্যা।
এ সকল দরুদের বাক্যগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাল কথার সমন্বয়। তবে এভাবে রাসূলু্ল্লাহ (ﷺ) থেকে পড়ার জন্য বিশেষ কোনো নির্দেশনা নেই। এ সকল দরুদের বাক্যগুলি বিন্যাস পরবর্তী মানুষদের তৈরি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলি পাঠ করলে দরুদ পাঠের সাধারণ ফযীলত লাভ হতে পারে। তবে এগুলির বিশেষ ফযীলতে বর্ণিত কথাগুলি বানোয়াট।
যেমন, (আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি) হাদীস সম্মত একটি দরুদ। আবার(আল্লাহুম্মা সাল্লিা ‘আলা মুহাম্মাদিন বি ‘আদাদি কুল্লি দায়িওঁ ওয়া বি ‘আদাদি কুল্লি ইল্লাতিওঁ ওয়া শিফা)কথাটির মধ্যে কোনো দোষ নেই। এই বাক্যের মাধ্যমে দরুদ পাঠ করলে দরুদ পাঠের সাধারণ সাওয়াব লাভের আশা করা যায়। তবে এগুলির জন্য কোনো বিশেষ ফযীলতের কথা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে প্রমাণিত নয়। সকল বানানো দরুদেরই একই অবস্থা। কোনো কোনো বানানো দরুদের মধ্যে আপত্তিকর কথা রয়েছে।
২.১৫. শুভ, অশুভ, উন্নতি, অবনতি বিষয়ক
বিভিন্ন প্রচলিত ইসলামী গ্রন্থে এবং আমাদের সমাজে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস আছে যে, অমুক দিন, বার, তিথি, সময় বা মাস অশুভ বা অযাত্রা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে মনে করা হয় বিভিন্ন কাজের অশুভ ফল রয়েছে এবং এ সকল কাজের কারণে মানুষ দরিদ্র হয় বা মানুষের ক্ষতি হয়। এই বিশ্বাস বা ধারণা শুধু ইসলাম বিরোধী কুসংস্কারই নয়; উপরন্তু এইরূপ বিশ্বাসের ফলে ঈমান নষ্ট হয় বলে হাদীস শরীফে বলা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অশুভ, অযাত্রা, অমঙ্গল ইত্যাদি বিশ্বাস করতে এবং যে কোনো বিষয়ে আগাম হতাশা, নৈরাজ্যবাদ(PESSIMISM) অত্যন্ত অপছ্ন্দ করতেন। পক্ষান্তরে তিনি সকল কাজে সকল অবস্থাতে শুভ চিন্তা, মঙ্গল ধারণা ও ভাল আশা পছ্ন্দ করতেন।(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২১৭১; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৪৫)। শুভ চিন্তা ও ভাল আশার অর্থ হলো আল্লাহর রহমতের আশা অব্যাহত রাখা। আর অশুভ ও অমঙ্গল চিন্তার অর্থ হলো আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন “অশুভ বা অযাত্রা বিশ্বাস করা বা নির্ণয়ের চেষ্টা করা শিরক, অশুভ বা অযাত্রা বিশ্বাস করা বা নির্ণয়ের চেষ্টা করা শিরক, অশুভ বা অযাত্রা বিশ্বাস করা বা নির্ণয়ের চেষ্টা করা শিরক”(তিরমিযী, আস-সুনান ৪/১৬০; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১৩/৪৯১; হাকিম, আল মুসতাদরাক ১/৬৪; আবূ দাউদ, আস-সুনান ৪/১৭; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/১১৭০। তিরমিযী, ইবনু হিব্বান, হাকিম প্রমুখ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)।
এ বিষয়ে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তাই অমঙ্গলের কারণ। বান্দার জন্য অমঙ্গল ও ক্ষতির কারণ বলেই তো আল্লাহ তা বান্দার জন্য নিষিদ্ধ করেছেন। এ সকল কর্মে লিপ্ত হলে মানুষ আল্লাহর রহমত ও বরকত হতে বঞ্চিত হয়। আল্লাহর নিষিদ্ধ হারাম দুই প্রকারেরঃ (১) হক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক্ক সম্পর্কিত হারাম ও (২) হক্কুল ইবাদ বা সৃষ্টির অধিকার সম্পর্কিত হারাম। দ্বিতীয় প্রকারের হারামের জন্য মানুষকে আখিরাতের শাস্তি ছাড়াও দুনিয়াতে পার্থিব ক্ষতির মাধ্যমে শাস্তি পেতে হবে বলে বিভিন্ন হাদীসের আলোকে জানা যায়। জুলুম করা, কারো সম্পদ তার ইচ্চার বাইরে চাঁদাবাজি, যৌতুক বা অন্য কোনো অনৈতিক উপায়ে গ্রহণ করা, ওজন, পরিমাপ বা মাপে কম দেওয়া, পিতামাতা, স্ত্রী, প্রতিবেশী, দরিদ্র, অনাথ, আত্মীয়-স্বজন বা অন্য কোনো মানুষের অধিকার নষ্ট করা, কাউকে তার প্রাপ্য হতে বঞ্চিত করা, আল্লাহর কোনো সৃষ্টির বা মানুষের ক্ষতি করা বা সাধারণভাবে হক্কুল ইবাদ নষ্ট করা পার্থিব অবনতির কারণ।
কিন্তু আল্লাহর কোনো সৃষ্টির মধ্যে কোনো বার, তারিখ, তিথি, দিক ইত্যাদির মধ্যে অথবা কোনো মোবাহ কর্মের মধ্যে কোনো অশুভ প্রভাব আছে বলে বিশ্বাস করা কঠিন অন্যায় ও ঈমান বিরোধী। আমাদের সমাজে এ জাতীয় অনেক কথা প্রচলিত আছে। এগুলিকে সবসময় হাদীস বলা হয় না। কিন্তু পাঠক সাধারণভাবে মনে করেন যে, এগুলি নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) কথা। তা না হলে কিভাবে আমরা জানলাম যে, এতে অমঙ্গল হয়, এতে অমঙ্গল হয়? এগুলি বিশ্বাস করা ঈমান বিরোধী। আর এগুলিকে আল্লাহ বা তাঁরা রাসূলের (ﷺ) বাণী মনে করা অতিরিক্ত আরেকটি কঠিন অন্যায়।
২.১৫.১. সময়, স্থান বিষয়ক
১. শনি, মঙ্গল, অমাবস্যা, পূর্ণিমা ইত্যাদি
শনিবার, মঙ্গলবার, অমাবস্যা, পূর্ণিমা, কোনো তিথি, স্থান বা সময়কে অমঙ্গল অযাত্রা বা অশুভ বলে বিশ্বাস করা জঘন্য মিথ্যা বা ঘোরতর ইসলাম বিরোধী বিশ্বাস। অমুক দিনে বাঁশ কাঁটা যাবে না, চুল কাটা যাবে না, অমুক দিনে অমুক কাজ করতে নেই…..ইত্যাদি সবই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা কুসংস্কার। এগুলি বিশ্বাস করলে শিরকের গোনাহ হবে।
২. চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, রংধনু, ধুমকেতু ইত্যাদি
চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, রংধনু, ধুমকেতু ইত্যাদি প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলী বিশেষ কোনো ভাল বা খারাপ প্রভাব রেখে যায় বলে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট ও মিথ্যা কথা। অমুক চাঁদে গ্রহণ অমুক হয়, বা অমুক সময়ে রঙধনু দেখা দিলে অমুক ফল হয়, এই ধরনের কথাগুলি বানোয়াট। (ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/১৭৮,১৭৯, ১৯১; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ২/৫৬৮)।
৩. বুধবার বা মাসের শেষ বুধবার
বুধবারকে বা মাসের শেষ বুধবারকে অমঙ্গল, অশুভ, অযাত্রা বা খারাপ বলে বা বুধবারের নিন্দায় কয়েকটি বানোয়াট হাদীস প্রচলিত আছে। এগুলি সবই মিথ্যা। আল্লাহর সৃষ্টি দিন, মাস, তিথি সবই ভাল। এর মধ্যে কোনো কোনো দিন বা সময় বেশি ভাল। যেমন শুক্রবার, সোমবার ও বৃহস্পতিবার বেশি বরকতময়। তবে অমঙ্গল, অশুভ বা অযাত্রা বলে কিছু নেই।(ইবুনল জাওযী, আল মাঊদূ‘আত ১/৩৭৪-৩৭৬; সুয়ূতী, আল লাআলী ১/৪৮১-৪৮৬; সাখাবী, আল মাকাদিস পৃ. ৩৬৪; মুল্লা আলী কারী, আল আসরার, পৃ. ১৯৯-২০০)।
২.১৫.২. অশুভ কর্ম বা অবনতির কারণ বিষয়ক
বিভিন্ন প্রচলিত পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিম্নের কাজগুলি অশুভ, খারাপ ফলদায়ক বা দারিদ্র্য আনয়নকারী।
১. হাঁটতে হাঁটতে ও অযু ব্যতীত দরুদ শরীফ পাঠ করা।
২. বিনা অযুতে কুরআন কারীম বা কুরআনের কোনো আয়াত পাঠ করা।
এই কথা দুটি একদিকে যেমন ইসলাম বিরোধী বানোয়াট কথা, অপরদিকে এ কথার মাধ্যমে মুমিনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত হতে বিরত রাখা হয়। গোসল ফরয থাকলে কুরআন পাঠ করা যায় না। কিন্তু ওযু ছাড়া কুরআন তিলাওয়াত জায়েয। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণ ও ওযু ছাড়া মুখস্ত কুরআন তিলাওয়াত করতেন। ওযু অবস্থায় যিকর, দোয়া, দরুদ, সালাম ইত্যাদি পাঠ করা ভাল, তবে ওযু ও গোসল আবশ্যিক নয়। বরং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের সুন্নাত হলো, হাঁটতে, চলতে, বসতে, শুয়ে ওযুসহ ও ওযুছাড়া সর্বাবস্থায় নিজের মুখ ও মনকে আল্লাহর যিকর, দরুদ ও দোয়া পাঠে রত রাখা।
৩. বসে মাথায় পাগড়ি পরিধান করা।
৪. দাঁড়িয়ে পায়জামা পরিধান করা।
৫. কাপড়ের আস্তিন ও আঁচল দ্বারা মুখ পরিষ্কার করা।
৬. ভাঙ্গা বাসনে বা গ্লাসে পানাহার করা।
৭. রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খাওয়া।
৮. খালি মাথায় পায়খানায় যাওয়া।
৯. খালি মাথায় আহার করা।
১০. পরিধানে কাপড় রেখে সেলাই করা।
১১. ফুঁক দিয়ে প্রদীপ নেভানো।
১২. ভাঙ্গা চিরুনী ব্যবহার করা।
১৩. ভাঙ্গা কলম ব্যবহার করা।
১৪. দাঁত দ্বারা নখ কাঁটা।
১৫. রাত্রিকালে ঘর ঝাঁড়ু দেওয়া।
১৬. কাপড় দ্বারা ঘর ঝাঁড়ু দেওয়া।
১৭. রাত্রে আয়নায় মুখ দেখা।
১৮. হাঁটতে হাঁটতে দাঁত খেলাল করা।
১৯. কাপড় দ্বারা দাঁত পরিষ্কার করা।
এইরূপ আরো অনেক কথা প্রচলিত আছে। সবই বানোয়াট কথা। কোনো জায়েয কাজের জন্য কোনোরূপ ক্ষতি বা কুপ্রভাব হতে পারে বলে বিশ্বাস করা কঠিন অন্যায়। আর এগুলিকে হাদীস বলে মনে করা কঠিনতম অন্যায়।
২.১৫.৩. শুভ কর্ম বা উন্নতির কারণ বিষয়ক
মহান আল্লাহ বান্দাকে যে সকল কর্মের নির্দেশ দিয়েছেন সবই তার জন্য পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ, মঙ্গল ও উন্নতি বয়ে আনে। সকল প্রকার ফরয, ওয়াযিব, সুন্নাত, নফল-মুস্তাহাব কর্ম মানুষের জন্য আখিরাতের সাওয়াবের পাশাপাশি জাগতিক বরকত বয়ে আনে। আল্লাহ এরশাদ করেছেনঃ
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
-“যদি জনপদবাসীগণ ঈমান ও তাকওয়া অর্জন করতো(আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করতো ও নির্দেশিত কাজ পালন করতো) তবে তাদের জন্য আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর বরকত-কল্যাণসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।”(সূরা ৭, আরাফঃ আয়াত ৯৬)।
এভাবে আমরা দেখছি যে, সকল ঈমান ও তাকওয়ার কর্মই বরকত আনয়ন করে। তবে সৃষ্টির সেবা ও মানবকল্যাণমূলক কর্মে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি খুশি হন এবং এই ধরনের কাজের জন্য মানুষকে আখিরাতের সাওয়াব ছাড়াও পৃথিবীতে বিশেষ বরকত প্রদান করেন বলে বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অনেক বানোয়াট কথাও বলা হয়। যেমন বলা হয় যে, নিম্নের কাজগুলি করলে মানুষ ধনী ও সৌভাগ্যশালী হতে পারে।
১. আকীক পাথরের আংটি পরিধান করা।
২. বৃহস্পতিবারে নখ কাটা।
৩. সর্বদা জুতা বা খড়ম ব্যবহার করা।
৪. ঘরে সিরকা রাখা।
৫. হলুদ রঙের জুতা পরা।
৬. যে ব্যক্তি জমরূদ বা আকীক পাথরের আংটি পরিধান করবে সে কখনো দরিদ্র হবে না এবং সর্বদা প্রফুল্ল থাকবে।
অনুরূপভাবে অমুক কাজে মানুষ স্বাস্থ্যবান ও সবল হয়, স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পায়, অমুক কাজে স্বাস্থ্য নষ্ট হয় বা স্মরণশক্তি নষ্ট হয়, অমুক কাজে দৃষ্টিশক্তি বাড়ে, অমুক কাজে দৃষ্টিশক্তি কমে, অমুক কাজে বার্ধক্য আনে, অমুক কাজে শরীর মোটা হয়, অমুক কাজে শরীর দুর্বল হয় ইত্যাদি সকল কথাই বানোয়াট।
২.১৬. পোশাক ও সাজগোজ বিষয়ক
‘রাসূলুল্লাহর (ﷺ) পোশাক ও ইসলামে পোশাকের বিধান’ পুস্তকে আমি পোশাক বিষয়ক সহীহ, যয়ীফ ও মাউদূ হাদীসগুলি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে এ বিষয়ক কিছু মাউযূ বা জাল হাদীস উল্লেখ করেছি।
২.১৬.১. জামা-পাজামা বিষয়ক
১. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর একটিমাত্র জামা ছিলঃ
আবু দারদা(রা) হতে বর্ণিত হয়েছেঃ “রাসূলু্ল্লাহর (ﷺ) একটি কামিসই ছিল। একাধিক কামিস তাঁর ছিল না।”(তাবারানী, আল মু’জামুল আউসাত ৬/৩১; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৫/১২১)। হাদীসটির একমাত্র বর্ণনাকারী সাঈদ ইবনু মাইসারাহ মিথ্যা হাদীস বানিয়ে বলতেন বলে ইমাম বুখারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন।(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৩/২৩৩)।
বিভিন্ন হাদীসের আলোকে মনে হয়, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিভিন্ন প্রকারের জামা পরিধান করতেন। কোনোটির ঝুল ছিল টাখনু পর্যন্ত। কোনোটি কিছুটা খাট হাটুর নিম্ন পর্যন্ত। কোনোটির হাতা ছিল হাতের আঙ্গুলগুলির মাথা পর্যন্ত। কোনোটির হাতা কিছুটা ছোট এবং কব্জি পর্যন্ত ছিল।
২. জামার বোতাম ছিল না বা ঘুন্টি ছিল
বিভিন্ন হাদীসের আলোকে আমরা জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহর (ﷺ) জামার বোতাম ছিল, তবে তিনি সাধারণত বোতাম লাগাতেন না। বিভিন্ন হাদীসে বলা হয়েছ যে, ‘তাঁর জামার বোতামগুলি’ খোলা ছিল। এ থেকে মনে হয় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জামার তিন বা ততোধিক বোতাম ছিল। তিনি সাধারণত, এ সকল বোতামের কোনো বোতামই লাগাতেন না।
কেউ কেউ বলেছেন যে, তাঁর জামার বোতাম ছিল না বা বোতামের স্থলে কাপড়ের তৈরি ঘুন্টি ছিল। এ বিষয়ক কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। ইমাম গাযালী(৫০৫ হি) লিখেছেনঃ “তাঁর কামিস ও জামার বোতামগুলি লাগানো থাকত। কখনো কখনো তিনি সালাত ও সালাতের বাইরে বোতামগুলি খুলে রাখতেন।”(গাযালী, এহইয়াউ উলূমিদ্দীন ২/৪০৫)।
৩. দাঁড়িয়ে বা বসে পাজামা পরিধান
কোনো কোনো গ্রন্থে বসে পাজামা পরিধান করা সুন্নাত বা আদাব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীস আমার নজরে পড়ে নি। বিষয়টি পরবর্তী যুগের আলিমদের মতামত বলেই মনে হয়।
২.১৬.২. টুপি বিষয়ক
৪. টুপির উপর পাগড়ী মুসলিমের চিহ্ন
ইমাম আবু দাউদ ও তিরমিযী উভয়ে তাঁদের উস্তাদ কুতাইবা ইবনু সাঈদের সুত্রে একটি হাদীস সংকলিত করেছেন। তাঁরা উভয়ই বলেনঃ কুতাইবা আমাদেরকে বলেছেন, তাকে মুহাম্মাদ ইবনু রাবীয়াহ হাদীসটি আবুল হাসান আসকালানী নামক এক ব্যক্তি থেকে, তিনি জাফর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু রুকানাহ নামক এক ব্যক্তি থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে বলেছেন, রুকানার সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুস্তি লড়েন এবং তিনি রুকানাকে পরাস্ত করেন। রুকানা আরো বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি-“আমাদের ও মুশরিকেদের মধ্যে পার্থক্য হলো টুপির উপরে পাগড়ী।”(তিরমিযী, আস-সুনান ৪/২৪৭; আবু দাউদ, আস-সুনান ৪/৫৫)।
ইমাম তিরমিযী হাদীসটি উল্লেখ করে এর সনদটি যে মোটেও নির্ভরযোগ্য নয় তা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন যে, হাদীসটির একমাত্র বর্ণনাকারী আবুল হাসান আসকালানী। এই ব্যক্তিটির পরিচয় কেউ জানেন না। শুধু তাই নয়, তিনি দাবি করেছেন যে, তিনি রুকানার পুত্র হতে হাদীসটি শুনেছেন। রুকানার কোনো পুত্র ছিল কিনা, থাকলে তিনি কে, কিরূপ মানুষ ছিলেন তা কিছুই জানা যায় না। এজন্য হাদীসটির সনদ মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
ইমাম তিরমিযীর উস্তাদ, ইমামুল মুহাদ্দিসীন ইমাম বুখারীও তার ‘‘আত-তারীখুল কাবীর” গ্রন্থে এই হাদীসটির দুর্বলতা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হাদীসটির সনদ অজ্ঞাত অপরিচিত মানুষদের সমন্বয়। এছাড়া এদের কেউ কারো কাছ হতে হাদীস শুনেছেন বলেও জানা যায় না।(বুখারী, আত-তারীখুল কাবীর ১/৮২)। ইমাম যাহাবী, আজলূনী প্রমুখ একে মাউযূ বা বানোয়াট বলে গণ্য করেছেন।(হাকিম, আল মুসতাদরাক ৩/৫১১; বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৫/১৭৫; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৬/১৪৫; আজলূনী, কাশাফুল খাফা ২/৯৫)।
এছাড়া আব্দুর রাঊফ মুনাবী, মুল্লা আলী কারী, আব্দুর রাহমান মুবারকপুরী, শামছুল হক আযীমাবাদী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস আলোচনা করেছেন যে, এই হাদীসের অর্থ বাস্তবতার বিপরীত। হাদীসটির দুটি অর্থ হতে পারেঃ ১. মুশরিকগণ শুধু টুপি পরিধান করে আর আমরা পাগড়ীসহ টুপি পরিধান করি। ২. মুশরিকগণ শুধু পাগড়ী পরিধান করে আর আমরা টুপির উপর পাগড়ী পরিধান করি। উভয় অর্থই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীগণের কর্মের বিপরীত। কারণ বিভিন্ন হাদীসে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, তাঁরা কখনো শুধু টুপি পরিধান করতেন এবং কখনো শুধু পাগড়ী পরতেন।
ইমাম গাযালী (৫০৫ হি) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনো পাগড়ীর নিচে টুপি পরিধান করতেন। কখনো পাগড়ী ছাড়া শুধু টুপি পরতেন। তিনি পাগড়ী ছাড়া শুধু টুপিও পরতেন। আবার টুপি ছাড়া শুধু পাগড়ীও পরতেন।”(ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মা’আদ ১/১৩০)।
৫. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পাঁচকল্লী টুপি
হযরত আবু হুরাইরা(রা) হতে বর্ণিতঃ “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথায় একটি লম্বা (উঁচু) পাঁচভাগে বিভক্ত টুপি দেখেছি।”
হাদীসটি আল্লামা আবু নুআইম ইসপাহানী তাঁর সংকলন ‘মুসনাদুল ইমাম আবী হানীফা’ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। তিনি বলেছেনঃ আমাকে আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনু জাফর ও আবু আহমদ জুরজানী বলেছেন, আমাদেরকে আহমদ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসুফ বলেছেন, আমাদেরকে আবু উসামাহ বলেছেন, আমাদেরকে দাহহাক ইবনু হাজার বলেছেন, আমাদেরকে আবু কাতাদাহ হাররানী বলেছেন যে, অমাদেরকে আবু হানীফা বলেছেন, তাঁকে আতা’ আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি এই হাদীস বলেছেন।(আবু নু‘আইম ইসপাহানী, মুসনাদুল ইমাম আবী হানীফা, পৃ. ১৩৭)।
এই হাদীসটি জাল। ইমাম আবু হানীফা থেকে শুধুমাত্র কাতাদাহ হাররানী(মৃ. ২০৭ হি) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এই হাররানী ছাড়া অন্য কেহ এই শব্দ বলেন নি। ইমাম আবু হানীফার(রা) অগণিত ছাত্রে কেউ এই হাদীসটি এই শব্দে বলেন নি। বরং তাঁরা এর বিপরীত শব্দ বলেছেন। অন্যান্য ছাত্রদের বর্ণনা অনুসারে ইমাম আবু হানীফা বলেছেন, তাঁকে আতা’ আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাদা শামি টুপি ছিল।(মুল্লা আলী কারী, শারহু মুসনাদি আবী হানীফাহ, পৃ. ১৪২)।
তাহলে আমরা দেখেছি যে, অন্যান্যদের বর্ণনা মতে হাদীসটি ‘শামী টুপি’ এবং আবু কাতাদাহ হাররানীর বর্ণনায় বা ‘খুমাসী টুপি’। এথেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আবু হানীফা বলেছিলেন শামী টুপি, যা তাঁর সকল ছাত্র বলেছেন, আবু কাতাদাহ ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় ভুল বলেছে। অথবা সে শব্দটিকে বিকৃতভাবে রূপে পড়েছে।
সর্বোপরি এই আবূ কাতাদা পরিত্যক্ত রাবী। ইমাম বুখারী বলেছেন, আবূ কাতাদাহ হাররানী ‘মুনকারুল হাদীস’। ইমাম বুখারী কাউকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বা ‘আপত্তিকর বর্ণনাকারী’ বলার অর্থ হলো যে, সেই লোকটি মিথ্যা হাদীস বলে বলে তিনি জেনেছেন। তবে তিনি সরাসরি কাউকে মিথ্যাবাদী না বলে ‘মুনকারুল হাদীস’ বা অনুরূপ শব্দাবলী ব্যবহার করতেন।
এছাড়া হাদীসটি আবু কাতাদাহ হাররানীর থেকে শুধুমাত্র দাহহাক ইবনু হুজুর বর্ণনা করেছেন। এই দাহহাক ইবনু হুজুর এর কুনিয়াত হলো আবু আব্দুল্লাহ মানিবিজী। তিনিও অত্যন্ত দুর্বল বর্ণনাকারী ছিলেন। তিনি মিথ্যা হাদীস বানাতেন বলে ইমাম দারাকুতনী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন।(ইমাম বুখারী, আত তারীখুল কাবীর ৫/২১৯; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৪/৩১৯; ইবুন হাজার আসকালানী, লীসানুল মীযান ৭/৭২)।
এজন্য আল্লামা আবু নু’আইম ইসপাহানী হাদীসটি উল্লেখ করে বলেনঃ “এই হাদীসটি শুধুমাত্র দাহহাক আবু কাতাদা হতে বর্ণনা করেছেন। আর কেউই আবু হানীফা থেকে বা আবু কাতাদাহ হতে তা বর্ণনা করেন নি।”(আবু নু’আইম, মুসনাদুল ইমাম আবু হানীফা, পৃ. ১৩৭)।
২.১৬.৩. পাগড়ী বিষয়ক
৬. পাগড়ীর দৈর্ঘ্য
পাগড়ী কত হাত লম্বা হবে বা পাগড়ীর দৈর্ঘ্যের বিষয়ে সুন্নাত কী? এ বিষয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে। সবই ভিত্তিহীন বা আন্দায কথা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পাগড়ীর দৈর্ঘ্য কত ছিল তা কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি।(আযীমাবাদী, আউনুল মা’বুদ ১১/৮৯)।
৭. দাঁড়িয়ে পাগড়ী পরিধান করা
কোনো কোনো গ্রন্থে ‘দাঁড়িয়ে পাগড়ী পরিধান করা’ সুন্নাত বা আদব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীস আমার নজরে পড়ে নি। এ বিষয়টিও পরবর্তী যুগের আলিমদের মতামত বলেই মনে হয়। (মুনাবী, ফাইযুল কাদীর ৪/৩৬২)।
৮. পাগড়ীর রঙ: সাদা ও সবুজ পাগড়ী
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অধিকাংশ সময় কাল রঙের পাগড়ী পরেছেন। হাদীস হতে আমরা দেখতে পাই যে, তিনি মদীনায়, সফরে, যুদ্ধে সর্বত্র কাল পাগড়ী ব্যবহার করতেন।
৮/৯ম হিজরী শতকের কোনো কোনো আলিম উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনায় থাকা অবস্থায় কাল পাগড়ী ব্যবহার করতেন। এই দাবীর পক্ষে কোনো প্রমাণ বা হাদীস তারা পেশ করেন নি। এজন্য হিজরী ৯ম শতকের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম সাখাবী(৯০২ হি) এই কথাকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।(মুহাম্মাদ ইবুন ইউসুফ শামী, সীরাহ শামিয়াহ ৭/২৭৬)।
আমরা জানি, পাগড়ী পোশাক বা জাগতিক বিষয়। এজন্য হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশনা ব্যতিরেকে কোনো রঙকে আমরা নাজায়েয বলতে পারব না। তবে কোনো রঙ সুন্নাত কিনা তা বলতে প্রমাণ প্রয়োজন। বিভিন্ন হাদীসে সাধারণ ভাবে সবুজ পোশাক পরিধানে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনো পাগড়ীর ক্ষেত্রে সবুজ রঙ ব্যবহার করেছেন বলে জানতে পারি নি। ফিরিশতাগণের পাগড়ী বিষয়েও তাঁরা কখনো সবুজ পাগড়ী পরিধান করেছেন বলে কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীস আমরা দেখতে পাই নি। অনুরূপভাবে তিনি কখনো সাদা রঙের পাগড়ী পরিধান করেছেন বলে জানতে পারি নি। কোনো কোনো সনদহীন ইসরায়েলীয় বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, তাবেয়ী কা’ব আহবার বলেছেনঃ হযরত ঈসা(আ) যখন পৃথিবীতে নেমে আসবেন তখন তাঁর মাথায় সবুজ পাগড়ী থাকবে।(মুনাবী, ফযযুল কাদীর ২/৫৩৮)।
৯. পাগড়ীর ফযীলত
বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণ পাগড়ী ব্যবহার করতেন। কিন্তু পাগড়ী ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান মূলক কোনো সহীহ হাদীস নেই। এ বিষয়ে যা কিছু বর্ণিত ও প্রচারিত সবই ভিত্তিহীন, বানোয়াট বা অত্যন্ত দুর্বল। এ বিষয়ক হাদীসগুলি দুই ভাগে ভাগ করা যায়ঃ প্রথমত, সাধারণ পোশাক হিসেবে পাগড়ী পরিধানের উৎসাহ প্রদান বিষয়ক হাদীস। দ্বিতীয়ত, পাগড়ী পরিধান করে নামায আদায়ের উৎসাহ প্রদান বিষয়ক হাদীস। উভয় অর্থে বর্ণিত সকল হাদীসই অত্যন্ত দুর্বল ও বানোয়াট পর্যায়ের।
বিশেষত দ্বিতীয় অর্থে বর্ণিত সকল হাদীস সন্দেহাতীতভাবে জাল ও বানোয়াট।
এখানে উল্লেখ্য যে, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পোশাক’ গ্রন্থে এ সকল হাদীসের সনদের বিস্তারিত আলোচনা করেছি। প্রত্যেক সনদের মিথ্যাবাদী জালিয়াতের পরিচয়ও তুলে ধরেছি। এখানে সংক্ষেপে হাদীসগুলি উল্লেখ করেছি। আগ্রহী পাঠক পোশাকের বইটি থেকে বাকি আলোচনা জানতে পারবেন।
প্রথমত, সৌন্দর্য্য ও মর্যাদার জন্য পাগড়ী
সৌন্দর্য্য ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে পাগড়ী পরিধানের উৎসাহ দিয়ে বর্ণিত জাল বা অত্যন্ত দুর্বল হাদীসগুলির মধ্যে রয়েছেঃ
৯.১. পাগড়ীতে ধৈর্য্যশীলতা বৃদ্ধি ও পাগড়ী আরবদের তাজ
একটি বানোয়াট হাদীসে বলা হয়েছেঃ “তোমরা পাগড়ী পরিধান করবে, এতে তোমাদের ধৈয্যশীলত বৃদ্ধি পাবে। আর পাগড়ী হলো আরবদের তাজ বা রাজকীয় মুকুট।” (হাকিম, আল মুসতাদরাক ৪/২১৪; বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৫/১৭৫; সাখাবী, আল মাকাদিস ২৯৭)।
৯.২. পাগড়ী আরবদের তাজ, পাগড়ী খুললেই পরাজয়
অন্য একটি বানোয়াট হাদীসে বলা হয়েছেঃ “পাগড়ী আরব জাতির মুকুট। তারা যখন পাগড়ী ফেলে দিবে তখন তাদের মর্যাদাও চলে যাবে বা আল্লাহ তাদের মর্যাদা নষ্ট করে দিবেন।”(প্রাগুক্ত)।
৯.৩. পাগড়ী মুসলিমের মুকুট, মসজিদে যাও পাগড়ী পড়ে ও খালি মাথায়
আরেকটি বানোয়াট হাদীসে বলা হয়েছেঃ “তোমরা মসজিদে একেবারে খালি মাথায় আসবে এবং পাগড়ী, পট্টি বা রুমাল মাথায় আসবে(অর্থাৎ সুযোগ ও সুবিধা থাকলে খালি মাথায় না এসে পাগড়ী মাথায় মসজিদে আসবে); কারণ পাগড়ী মুসলিমের মুকুট।”(ইবুন আদী, আল কামিল ৬/৪১৭-৪১৯; আলবানী, যয়ীফুল জামিয়, পৃ. ৬; যায়ীফাহ ৩/৪৫৯)।
৯.৪. পাগড়ী মুমিনের গাম্ভীর্য ও আরবের মর্যাদা
অন্য একটি অত্যন্ত দুর্বল ও জাল হাদীসে বলা হয়েছেঃ “পাগড়ী মুমিনের গাম্ভীর্য ও আরবের মর্যাদা। যখন আরবগণ পাগড়ী ছেড়ে দিবে তখন তাদের মর্যাদা নষ্ট হবে।”(আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৯৪; আলবানী, মাকালাত পৃ. ১৩৪)।
৯.৫. পাগড়ী আরবদের তাজ ও জাড়িয়ে বসা তাদের প্রাচীর
অন্য একটি বানোয়াট হাদীসঃ “পাগড়ী আরবদের মুকুট, দুই পা ও পিঠ একটি কাপড় দ্বারা পেচিয়ে বসা তাদের প্রাচীর।”(বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৫/১৭৬; সাখাবী, আল মাকাদিস , পৃ. ২৯৭)।
৯.৬. পাগড়ীর প্রতি প্যাচে কেয়ামতে নূর
আরেকটি বানোয়াট হাদীসঃ “মুশরিকগণ ও আমাদের মধ্যে পার্থক্য হলো টুপির উপরে পাগড়ী। কেয়ামতের দিন মাথার উপর পাগড়ীর প্রতিটি আবর্তনের বা প্যাচের জন্য নূর প্রদান করা হবে।” (মুনাবী, ফাইযুল কাদির ৪/৩৯২; আলবানী, মাকালাত পৃ. ১৩১)।
৯.৭. পাগড়ী পরে পূর্ববর্তী উম্মাতের বিরোধিতা কর
আরেকটি যয়ীফ বা বানোয়াট হাদীসঃ “তোমরা পাগড়ী পরিধান করবে, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিদের বিরোধিতা করবে।”(বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৫/১৭৬)।
৯.৮. পাগড়ী আর পতাকায় সম্মান
আরেকটি যয়ীফ বা বানোয়াট হাদীসঃ “আল্লাহ তায়ালা এই উম্মাতকে পাগড়ী ও পতাকা বা ঝান্ডা দিয়ে সম্মানিত করেছেন।”(সাঈদ ইবনু মানসুর, আস-সুনান ২/২৪৬)।
৯.৯. পাগড়ী ফিরিশতাদের বেশ
আরেকটি বানোয়াট হাদীসঃ “তোমরা পাগড়ী পরবে; কারণ পাগড়ী ফিরিশতাদের চিহ্ন বা বেশ। আর তোমরা পিছন থেকে পাগড়ীর প্রান্ত নামিয়ে দিবে।”(বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান ৫/১৭৬; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ১/৩১৫, ৬/২৯৪, ৭/২০৪; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৯৪)।
৯.১০. পাগড়ী কুফর ও ঈমানের মাঝে বাঁধা
আলীর(রা) নামে প্রচারিত একটি বানোয়াট হাদীসঃ “গাদীর খুমের দিনে রাসূলু্ল্লাহ (ﷺ) আমাকে পাগড়ী পরিয়ে দেন এবং পাগড়ীর প্রান্ত পিছন দিকে ঝুলিয়ে দেন। এরপর বলেনঃ বদর ও হুনাইনের দিনে আল্লাহ আমাকে এভাবে পাগড়ী পরা ফিরিশতাদের দিয়ে সাহায্য করেছেন। আরো বলেনঃ পাগড়ী কুফর ও ঈমানের মাঝে বেড়া বা বাঁধা।”(বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ১০/১৪; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ১/৪২৬, ৪/৬৭; আল মুগনী ১/৯১, ১/৩৩৩, ২/৭৮৪)।
এ সকল হাদীসে অধিকাংশ হাদীসের বিষয়ে মুহাদ্দিসগণ একমত যে, তা মিথ্যাবাদীদের বানোয়াট কথা। দুই একটি হাদীসের বিষয়ে সামান্য মতভেদ আছে। কেউ সেগুলিকে মিথ্যা হাদীস বলে বর্ণনা করেছেন। কেউ সরাসরি মিথ্যা না বলে সেগুলিকে অত্যন্ত দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন।(সাখাবী, আল মাকাদিস পৃ. ২৯৭-২৯৮; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৯৪)।
দ্বিতীয়ত, পাগড়ী সহ সালাতের ফযীলত
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বা তাঁর সাহাবীগণ কখনো শুধু নামাযের জন্য পাগড়ী পরিধান করেছেন এরূপ কোনো কথা কোথাও দেখা যায় না। এখন প্রশ্ন হলো পাগড়ী পরে নামায আদায় করার অতিরিক্ত কোনো সাওয়াব আছে কি না?
এ বিষয়ে কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং মুহাদ্দিসগণ একমত যে, সেগুলি সবই বানোয়াট। সুপরিচিত মিথ্যাবাদী রাবীগণ এগুলি বানিয়েছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখানে সংক্ষেপে আমি হাদীসগুলি উল্লেখ করছি। বিস্তারিত আলোচনার জন্য পোশাক বিষয়ক পুস্তকটি দ্রষ্টব্য।
৯.১১. জুমু‘আর দিনে সাদা পাগড়ী পরার ফযীলত
হযরত আনাস ইবনু মালিকের(রা)সূত্রে প্রচারিত একটি মিথ্যা কথাঃ “আল্লাহর কিছু ফিরিশতা আছেন, শুক্রবারের দিন জামে মসজিদের দরজায় তাঁদের নিয়োগ করা হয়, তারা সাদা পাগড়ী পরিধান কারীগণের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। (খাতীব বাগদাদী, তারীখ বাগদাদ ১৪/২০৬; ইবনু হাজার আসকালানী, লিসানুল মীযান ৬/২৬১)।
৯.১২. জুমু‘আর দিনে পাগড়ী পরার ফযীলত
হযরত আবু দারদার(রা) নামে বর্ণিত মিথ্যা কথা। “আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ শুক্রবারে পাগড়ী পরিহিতদের উপর সালাত(দয়া ও দরুদ) প্রেরণ করেন।”(যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ১/৪৬৩; ইবুন হাজার, লীসানুল মীযান ১/৪৮৮; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৯৫)।
৯.১৩. পাগড়ীর ২ রাকা‘আত বনাম পাগড়ী ছাড়া ৭০ রাকা‘আত
হযরত জাবিরের(রা) নামে বর্ণিত জাল হাদীসঃ “পাগড়ীসহ দুই রাকা‘আত নামায পাগড়ী ছাড়া বা খালি মাথায় ৭০ রাক‘আত নামাযের চেয়ে উত্তম।”(সাখাবী, আল মাকাদিস পৃ. ২৯৮; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৩৩, ৯৫)।
৯.১৪. পাগড়ীর নামায ২৫ গুণ ও পাগড়ীর জুমু‘আ ৭০ গুণ
ইবনু উমরের(রা)সূত্রে প্রচারিত একটি জাল কথাঃ “পাগড়ীসহ একটি নামায পঁচিশ নামাযের সমান এবং পাগড়ীসহ একটি জুমু‘আ ৭০টি জুমু‘আর সমতুল্য”।(সাখাবী, আল মাকাসিদ পৃ. ২৯৮; মুল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ১৪৭; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৩৩, ৯৫)।
৯.১৫. পাগড়ীর নামাযে ১০,০০০ নেকী
আনাস ইবনু মালিকের সূত্রে প্রচার করেছ মিথ্যাবাদীরা।“পাগড়ীসহ নামাযে ১০,০০০ নেকী রয়েছে।”(সাখাবী, আল মাকাসিদ পৃ. ২৯৮; মুল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ১৪৭; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৩৩, ৯৫)।
এভাবে মুহাদ্দিসগণ একমত যে, ‘পাগড়ী পরে নামায আদায়ের ফযীলতে’ যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সবই জাল ও বানোয়াট কথা।
২.১৬.৪. সাজগোজ ও পরিচ্ছন্নতা
১০. নুতন পোশাক পরিধানের সময়
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নতুন পোশাক পরিধানের জন্য কোনো সময়কে পছন্দ করতেন বলে কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে নিম্নের হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে যাকে মুহাদ্দিসগণ জাল বলে গণ্য করেছেনঃ “রাসূলুল্লাহ(ﷺ) যখন নতুন পোশাক পরিধান করতেন তখন শুক্রবারে তা পরিধান করতেন।”(খাতীব বাগদাদী, তারিখ বাগদাদ ৪/১৩৬; ইবনু হাজার, তাহজীব ৯/২২৮; আলবানী, যায়ীফুল জামিয়, পৃ. ৬২৯)।
১১. দাড়ি ছাঁটা
ইমাম তিরমিযী তাঁর সুনান গ্রন্থে বলেনঃ আমাদেরকে হান্নাদ বলেছেন, আমাদেরকে উমার ইবনু হারূন বলেছেন, তিনি উসামা ইবনু যাইদ থেকে, তিনি আমর ইবনু শু‘আইব থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে, “রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর দাড়ির দৈর্ঘ্যও প্রস্থ হতে গ্রহণ করতেন(কাটতেন)।”
ইমাম তিরমিযী হাদীসটি উদ্ধৃত করে বলেনঃ “এই হাদীসটি গরীব(দুর্বল)। আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলকে (ইমাম বুখারী) বলতে শুনেছি, উমার ইবনু হারূন কোনোরকম চলনসই রাবী। তার বর্ণিত যত হাদীস আমি শুনেছি সবগুলিরই কোনো না কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়। কিন্তু এই হাদীসটিরই কোনোরূপ ভিত্তি পাওয়া যায় না। আর এই হাদীসটি উমার ইবনু হারূন ছাড়া আর কারো সূত্রে জানা যায় না।(তিরমিযী, আস-সুনান ৫/৯৪)।
ইমাম তিরমিযীর আলোচনা থেকে আমরা তিনটি বিষয় জানতে পারি।
(১) এ্ই হাদীসটি একমাত্র উমার ইবনু হারূন ছাড়া অন্য কোনো সূত্রে বর্ণিত হয় নি। একামাত্র তিনিই দাবি করছেন যে, উসামা ইবুন যাইদ আল-লাইসী তাকে এই হাদীসটি বলেছেন।
(২) ইমাম বুখারীর মতে উমার ইবনু হারূন একেবারে পরিত্যক্ত রাবী নন।
(৩) উমার ইবনু হারূন এর অন্যান্য হাদীসের ভিত্তি পাওয়া গেলেও এ হাদীসটি একেবারেই ভিত্তিহীন।
অন্যান্য অনেক মুহাদ্দিস দ্বিতীয় বিষয়ে ইমাম বুখারীর সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। বিষয়টির সংক্ষিপ্ত আলোচনা আমাদেরকে মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষা পদ্ধতি এবং এ বিষয়ক মতভেদ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণালাভ করতে সাহায্য করবে।
উমার ইবুন হারূন ইবনু ইয়াযিদ বালখী(১৯৪ হি) দ্বিতীয় হিজরী শতকের একজন বেশ নামকরা মুহাদ্দিস ছিলেন। তাঁর আরো একটি বিশেষ পরিচয় ছিল যে, তিনি মুহাদ্দিসগণের ও আহলূস সুন্নাতের আকীদার পক্ষে মুরজিয়াগণের বিপক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতেন। ফলে অনেক মুহাদ্দিসই তাঁকে পছন্দ করতেন। কিন্তু তাঁরা লক্ষ্য করেন যে, তিনি তাঁর কোনো কোনো উস্তাদের নামে এমন অনেক হাদীস বলেন, যেগুলি সে সকল উস্তাদের অন্য কোনো ছাত্র বলেন না। মুহাদ্দিসগণের তুলনামূলক নিরীক্ষায় এগুলি ধরা পড়ে।
এর কারণ নির্ণয়ে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। তাঁর প্রসিদ্ধি ও বিদ‘আত বিরোধী ভূমিকার ফলে অনেক মুহাদ্দিস তাঁর বিষয়ে ভাল ধারণা রাখতেন। তাঁরা তাঁর এই একক বর্ণনাগুলির ব্যাখ্যায় বলেন যে, সম্ভবত তিনি অনেক হাদীস মুখস্ত করার ফলে কিছু হাদীসে অনিচ্ছাকৃত ভুল করতেন। এদের মতে তিনি ইচ্ছাপূর্বক মিথ্যা বলতেন না। এদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম বুখারী ও অন্য কতিপয় মুহাদ্দিস।
অপরদিকে অন্যান্য অনেক মুহাদ্দিস তাকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাবাদী বলে গণ্য করেছেন। তাঁদের নিরীক্ষায় তাঁর মিথ্যা ধরা পড়েছে। এদের অন্যতম হলেন সমসাময়িক প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক(১৮১ হি)। তিনি বলেন, আমি ইমাম জাফর সাদিকের(১৪৮ হি) নিকট হতে হাদীস শিক্ষা করার জন্য মক্কায় গমন করি। কিন্তু আমার পৌছানোর আগেই তিনি ইন্তিকাল করেন। ফলে আমি তাঁর নিকট হতে কিছু শিখতে পারি নি। আর উমার ইবুন হারূন আমার পরে মক্কায় আগমন করেন। এরপরও সে দাবি করে যে, সে ইমাম জাফর সাদিক হতে অনেক হাদীস শিখেছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, সে মিথ্যাবাদী।
আবদুর রাহমান্ ইবনু মাহদী(১৯৪ হি) বলেন, উমার ইবনু হারূন আমাদের নিকট এসে জাফর ইবনু মুহাম্মাদ(ইমাম জাফর সাদিক) এর সূত্রে অনেক হাদীস বলেন। তখন আমরা উমার ইবনু হারূনের জন্ম এবং তার হাদীস শিক্ষার জন্য মক্কার তারিখ হিসাব করলাম। এতে আমরা দেখলাম যে, উমারের মক্কায় গমনের আগেই জা’ফর ইন্তিকাল করেন।(উমার ১২৫/১৩০ হিজরীর দিকে জন্মগ্রহণ করেন। জাফর সাদিক ১৪৮ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। এ সময়ে উমার হাদীস শিক্ষার জন্য বের হন নি।)
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল বলেন, উমার ইবুন হারূন একবার কিছু হাদীস বলেন। পরবর্তী সময়ে সে হাদীসগুলিই তিনি অন্য উস্তাদের নামে এবং অন্য সনদে বলেন। ফলে আমরা তার হাদীস পরিত্যাগ করি।
এ ধরনের বিভিন্ন নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের নিকট প্রতীয়মান হয়েছে যে, উমার ইবনু হারূন হাদীস বর্ণনায় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলেন। অন্যান্য যে সকল মুহাদ্দিস উমার ইবুন হারূনকে মিথ্যাবাদী বা পরিত্যক্ত বলেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল কাত্তান, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন, নাসাঈ, সালিহ জাযরাহ, আবূ নু‘আইম, ইবুন হিব্বান ও ইবনু হাজার।(ইবুন হাজার, তাহযীব ৭/৪৪১-৪৪৩; তাকরীব, পৃ. ৪১৭)। এজন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীসটিকে জাল বলে গণ্য করেছেন।(আলবানী, যায়ীফুল জামি, পৃ. ৬৫৩; যায়ীফাহ ১/৪৫৬-৪৫৭)।
এখানে উল্লেখ্য যে, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার(রা), আবু হুরাইরা(রা) প্রমুখ সাহাবী হতে গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিতে হয়েছে যে, তাঁরা হজ্জ বা উমরার পর যখন মাথা টাক করতেন, তখন দাড়িকে মুষ্টি করে ধরে মুষ্টির বাইরের দাড়ি কেটে ফেলতেন।(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২২০৯; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ৫/১০৪; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ১০/৩৫০)।
এজন্য কোনো কোনো ফকীহ বলেছেন যে, এক মুষ্টি পরিমাণের বেশি দাড়ি কেটে ফেলা যাবে। অন্যান্য ফকীহ বলেছেন যে, দাড়ি যত বড়ই হোক ছাঁটা যাবে না, শুধুমাত্র অগোছালো দাড়িগুলো ছাঁটা যাবে।
১২. আংটি ও পাথরের গুণাগুণ
সমাজে প্রচলিত অসংখ্য মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীসের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন পাথরের গুণাগুণ বর্ণনার হাদীস্। মুসলমানের ঈমান নষ্টকারী বিভিন্ন শয়তানী ওসীলার মধ্যে অন্যতম হল জ্যোতিষ শাস্ত্র ও সমাজের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়া ভন্ড জ্যোতিষীর দল। বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, কোনো জ্যোতিষী বা ভাগ্য গণনাকারীর কাছে গেলে বা তার কথা বিশ্বাস করলে মুসলমান কাফির হয়ে যায় এবং তার ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। এ বিষয়ে এখানে আলোচনা সম্ভব নয়। জ্যোতিষীদের অনেক ভন্ডামির মধ্যে রয়েছে পাথর নির্ধারণ। তারা বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন ধরণের পাথরের আংটি পরতে পরামর্শ দেন। কেউ কেউ আবার এ বিষয়ে হাদীসও উল্লেখ করেন। পাথরের মধ্যে কল্যাণ অকল্যাণের শক্তি থাকার বিশ্বাস ঈমান বিরোধী বিশ্বাস। বিভিন্ন অমুসলিম সমাজ থেকে এই বিশ্বাস মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, পাথরের গুণাগুণ সম্পর্কিত সকল হাদীসই বানোয়াট। বিভিন্ন ধরনের পাথর, যেমন: যবরজদ পাথর, ইয়াকুত পাথর, যমররদ পাথর, আকীক পাথর ইত্যাদি সম্পর্কে বর্ণিত কোনো হাদীসই নির্ভরযোগ্য নয়। (মোল্লা কারী, আল আসরার ৯৩-৯৪ পৃ.; আল মাসনূ, ৫১ পৃ.)।
১৩. আঙটি পরে নামাযে ৭০ গুণ বেশি সাওয়াব
আঙটির ফযীলতে বানোয়াট একটি হাদীস। “আঙটি পরে নামায আদায় করলে আঙটি ছাড়া নামায আদায়ের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি সাওয়াব হয়।”
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, হাদীসটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আঙটি ব্যবহার করেছেন বলে সহীহ হাদীসে প্রমাণিত। তবে আঙটি পরতে উৎসাহ দিয়েছেন বলে কোনো সহীহ হাদীস নেই।(সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ২৭১; মুল্লা কারী, আল আসরার পৃ. ১৪৬; মাসনূ’য়, পৃ. ৮৭; যারকানী, মুখতারাসুল মাকাসিদ, পৃ. ১২৫)।
১৪. নখ কাটার নিয়মকানুন
নিয়মিত নখ কাটা ইসলামের বিধান ও সুন্নাত। নখ কাটার জন্য কোনো নির্ধারিত দিবস রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শিক্ষা দেন নি। বিভিন্ন গ্রন্থে নখ কাটার বিভিন্ন নিয়ম, উল্টোভাবে নখ কাটা, অমুক নখ থেকে শুরু করা ও অমুক নখে শেষ করা, অমুক দিনে নখ কাটা বা না কাটা ইত্যাদির ফযীলত বা ফলাফল বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলি সবই পরবর্তী যুগের প্রবর্তিত নিয়ম। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এ বিষয়ে যা কিছু প্রচলিত সবই বাতিল, বানোয়াট ও মিথ্যা।
নখ কাটার জন্য এসকল নিয়ম পালন করাও সুন্নাত বিরোধী কাজ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নখ কাটতে নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো বিশেষ নিয়ম বা দিন শিক্ষা দেন নি। কাজেই যে কোনো দিন যে কোনোভাবে নখ কাটলেই এই নির্দেশ পালিত হবে। কোনো বিশেষ দিনে বা কোনো বিশেষ পদ্ধতিতে নখ কাটার কোনো বিশেষ ফযীলত কল্পনা করার অর্থ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর শিক্ষাকে অপূর্ণ মনে করা এবং তার শিক্ষাকে পূর্ণতা দানের দুঃসাহস দেখানো। আল্লাহ আমাদেরকে সহীহ সুন্নাতের মাধ্যমে জীবন যাপনের তাওফীক প্রদান করুন।(সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ৩১৩, ৪২১; মুল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ. ১৭০, ২৪১)।
২.১৭. পানাহার বিষয়ক
১. খাদ্য গ্রহণের সময় কথা না বলা
খাদ্য গ্রহণের সময় কথা বলা নিষেধ বা কথা না বলা উচিত অর্থে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট। শুধু বানোয়াটই নয়, সহীহ হাদীসের বিপরীত। বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্ণিতে হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণ খাদ্য গ্রহণের সময় বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলতেন ও গল্প করতেন।(সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ৪৬০; মুল্লা আলী কারী, আল আসরার পৃ. ২৬৫; আল-আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৪৮৮; যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃ. ২০৩)।
২. খাওয়ার সময়ে সালাম না দেওয়া
প্রচলিত ধারণা হলো খাওয়ার সময় সালাম দেওয়া ঠিক না। বলা হয়ঃ “খাদ্য গ্রহণকারীকে সালাম দেওয়া হবে না।”
সাখাবী, মুল্লা কারী ও আজলূনী বলেন, হাদীসের মধ্যে এই কথার কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে যদি কারো মুখের মধ্যে খাবার থাকে, তাহলে তাকে সালাম না দেওয়া ভাল। এই অবস্থায় কেউ তাকে সালাম দিলে তার জন্য উত্তর প্রদান ওয়াজিব হবে না।(সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ৪৬০; মুল্লা আলী কারী, আল আসরার পৃ. ২৬৫)।
৩. মুমিনের ঝুটায় রোগমুক্তি
আরেকটি প্রচলিত বানোয়াট কথা হলোঃ “মুমিনের ঝুটায় রোগমুক্তি বা মুমিনের মুখের লালাতে রোগমুক্তি।” কথাটি কখনো হাদীস নয় বা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কথা নয়। (সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ২৪১; মুল্লা আলী কারী, আল আসরার পৃ. ১২৯)।
মুমিনের ঝুটা খাওয়া রোগমুক্তি নয় তবে ইসলামী আদবের অংশ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) , তাঁর সাহাবীগণ ও পরবর্তী যুগের মুসলিমগণ একত্রে একই পাত্রে বসে খাওযা দাওয়া করেছেন এবং একই পাত্রে পানি পান করেছেন। এখনো এই অভ্যাস আরবে ও ইউরোপে প্রচলিত আছে। আমাদের দেশে ভারতীয় বর্ণপ্রথা ও অচ্ছূত প্রথার কারণে একে অপরের ঝুটা খাওয়াকে ঘৃণা করা হয়। এগুলি ইসলাম বিরোধী মানসিকতা।
৪. খাওয়ার আগে পরে লবণ খাওয়ায় রোগমুক্তি
আমাদের সমাজে প্রচলিত আরেকটি জাল হাদীস। “তুমি যখন খাদ্য গ্রহণ করবে, তখন লবণ দিয়ে শুরু করবে এবং লবণ দিয়ে শেষ করবে; কারণ লবণ ৭০ প্রকার রোগের প্রতিষেধক….।” মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই কথাটি মিথ্যা ও বানোয়াট।(হাইসামী, যাওয়াইদ মুসনাদুল হারিস ১/৫২৬; দাইলামী, আল-ফিরদাউস ৩/৩৩; ইবনুল জাওযী, আল মাউদূ‘আত ২/১৯২)।
৫. লাল দস্তরখানের ফযীলত
আমাদের দেশের ধার্মিক মানুষদের মধ্যে প্রসিদ্ধ একটি ‘সুন্নাত’ হলো লাল দস্তারখানে খানা খাওয়া। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনো লাল দস্তরখান ব্যবহার করেছেন, অথবা এইরূপ দস্তরখান ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়েছেন বলে কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীস দেখা যায় না। এ বিষয়ে অনেক বানোয়াট কথা প্রচলিত। এইরূপ একটি বানোয়াট কথা নিম্নরূপঃ “হযরত রাসূলে মকবুল (ﷺ) ….লাল দস্তরখান ব্যবহার করা হতো। …..যে ব্যক্তি লাল দস্তরখানে আহার করে তার প্রতি লোকমার প্রতিদানে একশ করে ছাওয়াব পাবে এবং বেহেস্তের ১০০টি দরজা তার জন্য নির্ধারিত হবে। সে ব্যক্তি বেহেশতের মধ্যে সব সময়ই ঈসা(আ) ও অন্য নবীদের হাজার হাজার সালাম ও আশীর্বাদ লাভ করবে….। এরপর হযরত কসম খেয়ে বর্ণনা করলেন, কসম সেই খোদার যার হাতে নিহিত রয়েছে আমার প্রাণ; যে ব্যক্তি লাল দস্তরখানে রুটি খাবে সে এক ওমরা হজ্জের সাওয়াব পাবে এবং এক হাজার ক্ষুধার্তকে পেট ভরে আহার করানোর সাওয়াব পাবে। সে ব্যক্তি এত বেশি সাওয়াব লাভ করবে যেন আমার উম্মাতের মধ্যে হাজার বন্দীকে মুক্ত করালেন…….।” এভাবে আরো অনেক আজগুবি, উদ্ভট ও বানোয়াট কাহিনী ও সাওয়াবের ফর্দ দেওয়া হয়েছে। (শায়খ মাঈন উদ্দীন চিশতী, আনিসুল আরওয়াহ পৃ. ৩০-৩১)।
এখানে উল্লেখ্য যে, দস্তরখান সম্পর্কে আরো অনেক ভুল বা ভিত্তিহীন ধারণা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দস্তরখান ব্যবহার করতেন। তবে তা ব্যবহার করার নির্দেশ বা উৎসাহ তাঁর থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয় নি। দস্তরখান ছাড়া খাদ্যগ্রহণের বিষয়ে তিনি কোনো আপত্তিও করেন নি। কিন্তু আমরা সাধারণত দস্তরখানের বিষয়ে যতটুকু গুরুত্ব প্রদান করি, কুরআন ও হাদীসে নির্দেশিত অনেক ফরয, বা নিষিদ্ধ অনেক হারামের বিষয়ে সেইরূপ গুরুত্ব প্রদান করি না। এছাড়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দস্তরখান ব্যবহার করতেন বলে আমরা বুঝি যে, তিনি আমাদের মত দস্তরখানের উপর থালা, বাটি ইত্যাদি রেখে খাবার খেতেন। ধারণাটি সঠিক নয়। তাঁর সময়ে চামড়ার দস্তরখান বা ‘সুফরা’ ব্যবহার করা হতো এবং তার উপরেই সরাসরি-কোনোরূপ থালা, বাটি, গামলা ইত্যাদি ছাড়াই-খেজুর, পনির, ঘি ইত্যাদি খাদ্য রাখা হতো। দস্তরখানের উপরেই প্রয়োজনে এগুলি মিশ্রিত করা হতো এবং সেখান হতে খাদ্য গ্রহণ করা হতো।(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২০৫৯)।
২.১৮. বিবাহ, পরিবার, সমাজ ইত্যাদি বিষয়ক
২.১৮.১. বিবাহ, পরিবার ও দাম্পত্য জীবন
ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবার। পরিবার গঠন, পরিবারের সদস্যগণের পারস্পরিক দায়িত্ব, কর্তব্য, সহমর্মিতা, স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব, দাম্পত্য জীবনের আনন্দ ও তৃপ্তির ফযীলত ইত্যাদি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর অনেক নির্দেশনা বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। সেগুলির পাশাপাশি অগণিত বানোয়াট, ভিত্তিহীন, জাল বা যয়ীফ কথা হাদীস নামে সমাজে প্রচলিত। সবচেয়ে বেশি অবাক হতে হয় যে, প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থগুলির সহীহ হাদীস বাদ দিয়ে অগণিত সূত্র বিহীন বানোয়াট কথা আমরা বিভিন্ন গ্রন্থে লিখছি বা মুখে বলছি।
বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বিভিন্ন বিষয়ে সহীহ হাদীসের উল্লেখ করা সম্ভব হচ্ছে না। শুধু সংক্ষেপে কিছু বানোয়াট কথা উল্লেখ করছি।
১. বিবাহিতের দুই রাক‘আত অবিবাহিতের ৭০ রাক‘আত
প্রচলিত একটি জাল হাদীসঃ “অবিবাহিতের ৭০ রাক‘আত অপেক্ষা বিবাহিতের দুই রাক‘আত উত্তম।”
২. বিবাহিতের দুই রাক‘আত অবিবাহিতের ৮২ রাক‘আত
আরেকটি প্রচলিত জাল হাদীসঃ “অবিবাহিতের ৭০ রাক‘আত অপেক্ষা বিবাহিতের দুই রাক‘আত উত্তম।”
কুরআন ও হাদীসে বিবাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিবাহের ফযীলতও বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এই হাদীস দুটি জাল ও বানোয়াট।(ইবনুল জাওযী, আল মাঊদূ‘আত ২/১৬৪; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৬/২১; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ৫/১৫)।
৩. বিবাহ অনুষ্ঠানে খেজুর ছিটানো, কুড়ানো বা কাড়াকাড়ি করা
এ বিষয়ে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সেগুলির মধ্যে কোনো সহীহ হাদীস নেই। হাদীসগুলির সনদ অত্যন্ত যয়ীফ এবং সনদে মিথ্যাবাদী রাবী রয়েছে। এজন্য মুহাদ্দিসগণ সেগুলিকে জাল বলে গণ্য করেছন।(তাবারানী, আল-আউসাত ১/৪৪; ইবনুল জাওযী, আল মাউদূ‘আত ২/১৭০-১৭২; যাহাবী, মীযানুল ইতদাল ২/২৩; ইবনু হাজার, লীসানুল মীযান ২/১৯)।
৪. দাম্পত্য মিলনের বিধিনিষেধ
ইসলাম যেমন বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক কঠোরভাবে নিষেধ করে, তেমনি বিবাহিত দম্পতিকে তাদের জীবন ও যৌবনের আনন্দ, উল্লাস, ফূর্তি, আবেগ সবকিছু উপভোগ করতে উৎসাহ দেয়। দম্পতির স্বাভাবিক আনন্দলাভের কোনো দিন, তারিখ, বার, তিথি, সময়, উপকরণ বা পদ্ধতি ইসলাম নিষিদ্ধ বা হারাম করে নি। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কোনোরূপ পর্দা নেই বা কোনো কিছু দর্শন বা স্পর্শ করার নিষেধাজ্ঞা নেই।
প্রচলিত অনেক জাল, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হাদীসে দাম্পত্য মিলন বিষয়ক বিভিন্ন মিথ্যা কথা বলা হয়েছে। অমুক সময়ে, অমুক দিনে, অমুক বারে, অমুক রাতে, অমুক তিথিতে দাম্পত্য সম্পর্ক করবে না, তাতে অমুক প্রকারের ক্ষতি হবে, অথবা সন্তানের অমুক রোগ হবে….ইত্যাদি। অথবা অমুক পদ্ধতিতে বা অমুক আসনে দাম্পত্য মিলন করবে না, তাহলে অমুক ক্ষতি হবে বা সন্তানের অমুক খুত হবে…. ইত্যাদি। অথবা দাম্পত্য মিলনের সময় কথা বলবে না, দৃষ্টিপাত করবে না……স্পর্শ করবে না……তাহলে অমুক রোগ হবে, বা অমুক ক্ষতি হবে…ইত্যাদি। অথবা অমুক সময়ে, বারে, তিথিতে দাম্পত্য মিলনে সন্তান সৌভাগ্যবান বা দুর্ভাগ্যবান হয়…..। এগুলি সবই মিথ্যা, বানোয়াট ও জাল কথা।
সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, মদীনার ইহুদীগণের মধ্যে এরূপ কিছু কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। তখন মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে সূরা বাকারা ২২৩ নং আয়াত নাযিল করে সেসকল কুসংস্কার খন্ডন করেন।(মুসলিম, আস-সহীহ ২/১০৫৯; ইবনু কাসীর, তাফসীর ১/২৬২; ইবনুল জাওযী, আল-মাঊদূ‘আত ২/১৭৫-১৭৬; আলবানী, যায়ীফাহ ১/৩৫১-৩৫৬)।
৫. স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত
বহুল প্রচলিত একটি পুস্তকে রয়েছেঃ “হযরত (ﷺ) বলিয়াছেন, স্ত্রীগণের বেহেশত স্বামীর পায়ের নীচে।”(মাও. গোলাম রহমান, মোকছুদুল মোমেনীন, পৃ. ৩২৮)।
এই কথাটি একটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা মাঊযূ সনদেও এই কথাটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে বর্ণিত হয়েছে বলে জানা যায় না। কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা হতে বুঝা যায় যে, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জান্নাত উভয়ের হাতে। উভয়ের প্রতি উভয়ের দায়িত্ব পালন ও অধিকার আদায়ের মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ সম্ভব।
৬. গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের পুরস্কার
কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে মাতৃগর্ভের মর্যাদার বিষয়ে বিশেষভাবে সন্তানধারণ, দুগ্ধপান ইত্যাদি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। হাদীস শরীফে সাধারণভাবে সংসার পালন, সন্তান প্রতিপালন ইত্যাদির সাধারণ সাওয়াবের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু জালিয়াতগণ তাদের অভ্যাস মত প্রত্যেক কর্ম বা অবস্থার জন্য পৃথক পৃথক আজগুবি ফযীলত ও সাওয়াবের বর্ণনা দিয়ে অনেক হাদীস বানিয়েছে। আমাদের সমাজে এগুলি প্রচলিত। এমনকি এ সকল ভিত্তিহীন কথা দিয়ে বিভিন্ন ছাপানো পোস্টার, ক্যালেন্ডার ইত্যাদি ছাপা হয়।
প্রচলিত একটি পুস্তকে রয়েছেঃ “হুযুর(ﷺ) একদিন স্ত্রীলোকদের লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, যখন কোনো স্ত্রীলোক তাহার স্বামী কর্তৃক হামেলা(গর্ভবতী) হইয়া থাকে, তখন হইতে প্রসব বেদনা উপস্থিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সর্বদা সে স্ত্রীলোকটি দিনে রোযা রাখার ও রাত্রি বেলা নফল নামায পড়ার ছওয়াব পাইবে। আর যখন প্রসব বেদনা উপস্থিত হয় তখন খোদা তায়ালা তাহার জন্য বেহেশতের মধ্যে এমন বস্তুসমূহ গচ্ছিত রাখিয়া দেন যে, তাহার সন্ধান পৃথিবী আকাশ বেহেশত, দোজখবাসী কেহই অবগত নহেন। আর যখন সন্তান প্রসব করেন তখন হইতে দুগ্ধ ছাড়ান পর্যন্ত প্রতি ঢোক দুগ্ধের পরিবর্তে আল্লাহ তাআলা তাহাকে একটি করিয়া নেকী দান করেন। এবং সেই সময়ের মধ্যে তাহার মৃত্যু হইলে শহীদের দরওয়াজা প্রাপ্ত হইবে। আর যদি তাহাকে তাহার সন্তানের জন্য কোনো রাত্রি জাগিয়া থাকিতে হয় তবে আল্লাহ তায়ালা তাহাকে ঐ রাত্রি জাগরণের পরিবর্তে ৭০টি গোলাম আজাদ করার ছওয়াব দিয়া থাকেন। তৎপর তিনি ইহাও বলিয়া ছিলেন যে, এই ছওয়াব সমূহ কেবল মাত্র ঐ সমস্ত স্ত্রী লোকদেরকে দেওয়া হইবে যাহারা সর্বদাই খোদার হুকুম ও আপন স্বামীর হুকুম পালন করিয়া আওরাতে হাছীনার অন্তর্ভূক্ত হইতে পারিয়াছে। আল্লাহ ও স্বামীর নাফরমান স্ত্রীলোকদিগকে কখনও ঐ সমস্ত ছওয়াব দেওয়া হইবে না।”(মাও. গোলাম রহমান, মকছুদুল মোমেনীন পৃ. ৩৩১-৩৩২)।
এই কথাটি একটি জাল হাদীসের ইচ্ছামাফিক অনুবাদ।(ইবনুল জাওযী, আল মাউদূ‘আত ২/১৭৮; সুয়ূতী, আল লাআলী ২/১৭৪-১৭৫; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/২০৩-২০৪, ২১১)।
এছাড়া আরো অনেক আজগুবি, মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা হাদীসের নামে লিখে এ সকল পুস্তকের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা মসীলিপ্ত করা হয়েছে। এ সকল পুস্তকে হাদীস নামে লেখা অধিকাংশ কথাই বানোয়াট ও জাল।
২.১৮.২. বয়সের ফযীলত ও বয়স্কের সম্মান
কুরআন ও হাদীসে বিভিন্ন সামাজিক শিষ্ঠাচারের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম হলো, বয়স্কদের সম্মান করা। বিভিন্ন হাদীসে যার বয়স বেশি তাকে আগে কথা বলার সুযোগ দেওয়া, কোনো দ্রব্য তার হাতে আগে দেওয়া বা অনুরূপ সামাজিক কর্মে ও সম্মানে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাধারণভাবে বয়স্ক ও বৃদ্ধদেরকে সম্মান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সহীহ হাদীসের মধ্যে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি আমাদের মধ্যকার ছোটদের মমতা না করবে এবং বড়দের অধিকার না জানবে(বড়দের সম্মান না করবে) সে আমাদের দলভুক্ত নয়।(হাকিম, আল মুসতাদরাক ১/১৩১; তিরমিযী, আস-সুনান ৪/৩২১-৩২২)।
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেনঃ “আল্লাহকে মর্যাদা প্রদর্শনের অংশ হলো শুভ্রতাময় (সাদা চুল দাড়িওয়ালা) বৃদ্ধ মুসলিমকে সম্মান করা…..।”(আবু দাউদ, আস সুনান ৪/২৬১; আলবানী, সহীহুল জামি ১/৪৩৮)।
১. বৃদ্ধের সম্মান আল্লাহর সম্মান
কিন্তু অন্যান্য বিষয়ের মত এ বিষয়েও জালিয়াতগণ জাল হাদীস তৈরি করেছে। এ বিষয়ক জাল ও অত্যন্ত দুর্বল হাদীসগুলির মধ্যে রয়েছেঃ “তোমরা শাইখ বা বৃদ্ধ মানুষদেরকে সম্মান করবে; কারণ বৃদ্ধদের সম্মান করা আল্লাহর সম্মানের অংশ।”
এই হাদীসটির অর্থ উপরের নির্ভরযোগ্য হাদীসগুলির কাছাকাছি। তবে এই শব্দে কোনো হাদীস রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে বর্ণিত হয় নি। এজন্য মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই শব্দে হাদীসটি জাল।(ইবনু ইরাক, তানযীহুশ শারীয়াহ ২০৭)।
২. বংশের মধ্যে বৃদ্ধ উম্মতের মধ্যে নবীর মত
এ বিষয়ে অন্য একটি জাল হাদীসঃ “কোনো কওম বা গোত্রের মধ্যে শাইখ বা বয়স্ক মুরুব্বী ব্যক্তি উম্মাতের মধ্যে নবীর মতই।” (ইবনু ইরাক, তানযীহুশ শারীয়াহ ২০৭-২০৮)।
শাইখ বলতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর যুগে বা পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত দুটি অর্থ বুঝানো হতো। প্রথম অর্থ হলো ‘বৃদ্ধ বক্তি’। এ হলো এই শব্দে মূল শাব্দিক বা ব্যবহারিক অর্থ। দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ গোত্রপতি। পরবর্তী যুগে সুফী বুযুর্গগণকেও শাইখ বলা হতো। ফার্সী ‘পীর’ শব্দটিও এই অর্থের।
‘শাইখ’ শব্দটি তৃতীয় অর্থে ব্যবহার করা শুরু হওয়ার পরে এই হাদীসটির জালিয়াতি সম্পর্কে অসচেতন কেউ কেউ এই জাল হাদীসটিকে তরীকতের শাইখ বা পীর মাশাইখদের মর্যাদার দলীল হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। আমরা জানি যে, পীর মাশাইখদের মর্যাদা রয়েছে নেককার বান্দা হিসেবে এবং আল্লাহর পথের উস্তাদ বা মুরশিদ হিসেবে। তবে এই জাল হাদীসটির সাথে তাদের মর্যাদার কোনো সম্পর্ক নেই।
৩. পাকাচুল বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার শাস্তি মাফ
এই জাতীয় অন্য একটি বানোয়াট কথা। আল্লাহ বলেনঃ “আমি লজ্জা পাই যে, ইসলামের মধ্যে আমার বান্দার চুল দাড়ি পেকে যাওয়ার পরও আমি তাদেরকে জাহান্নামে শাস্তি দেব।”(ইবনু ইরাক, তানযীহুশ শারীয়াহ ২০৪-২০৫)।
এই ধরনের অন্য একটি বানোয়াট কথাঃ “ইসলামের মধ্যে যার বয়স ৬০ বৎসর হলো, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামকে হারাম করে দিলেন।”(ইবনু ইরাক, তানযীহুশ শারীয়াহ ২২৭)।
৪. ৪০ বৎসর বয়সেও ভাল না হলে জাহান্নামের প্রস্তুতি
আরেকটি বানোয়াট কথাঃ “যার বয়স চল্লিশ হলো, অথচ তার মধ্যে খারাপের চেয়ে ভাল বেশি হলো না; সে জাহান্নামের জন্য প্রস্তুত হোক।”(ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/২০৫-২০৬)।
২.১৯. ভাষা, পেশা ইত্যাদি বিষয়ক
ইসলাম সকল যুগের, সকল ভাষার, সকল সমাজের মানুষদের জন্য আল্লাহর মনোনীত ধর্ম, দীন বা জীবন ব্যবস্থা। এখানে ভাষা, বর্ণ, দেশ, গোত্র, বংশ, যুগ ইত্যাদির কারণে কোনো মর্যাদার আধিক্য বা কমতি নেই। কুরআন ও হাদীসে একথা বারংবার বলা হয়েছে। দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকে জাতিগত, ভাষাগত, পেশাগত ইত্যাদি বিভেদের সুযোগ নিয়ে অনেক জালিয়াত কারো পক্ষে ও কারো বিপক্ষে বিভিন্ন হাদীস বানিয়েছে। আরবী ভাষার পক্ষে ও ফার্সী ভাষার বিপক্ষে কেউ কথা বানিয়েছে। কউ উল্টো করেছেন। অনুরূপভাবে আরব, ফার্সীয়ান, তুর্কী, নিগ্রো, রোমান, গ্রীক, আফ্রিকান……বিভিন্ন জাতি ও বর্ণের পক্ষে ও বিপক্ষে হাদীস বানানো হয়েছে। স্বর্ণকার, তাতী, জেলে, নাপিত…..ইত্যাদি বিভিন্ন পেশার পক্ষে ও বিপক্ষে হাদীস বানানো হয়েছে।
সনদ বিচার ও নিরীক্ষায় এগুলির জালিয়াতি ধরা পড়েছে। এছাড়া এগুলি ইসলামি মূল্যবোধের বিরোধী। মানুষের মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি ‘তাকওয়া’ বা সততা। পেশা, ভাষা, বর্ণ, গোত্র, বংশ ইত্যাদির ভিত্তিতে কাউকে নিন্দা করা বা কাউকে কারো থেকে ছোট বলা কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশনার বিরোধী। এ জাতীয় জাল হাদীসগুলির মধ্যে রয়েছেঃ
১. আরবদেরকে তিনটি কারণে ভালবাসবে
আরবী কুরআনের ভাষা এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ভাষা। এজন্য স্বভাবতই সকল মুমিন আরবী ভাষাকে ভালবাসেন। ভাষার প্রতি এই স্বাভাবিক ভালবাসাকে কেন্দ্র করে জালিয়াতগণ আরবগণকে ভালবাসার ফযীলতে অনেক হাদীস বানিয়েছে। একটি প্রচলিত হাদীসঃ “তিনটি কারণে আরবদেরকে ভালবাসবেঃ আমি আরবী, কুরআনের ভাষা আরবী এবং জান্নাতের ভাষা আরবী।” এই কথাকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস বানোয়াট ও মিথ্যা হাদীস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কউ কেউ যয়ীফ বা দুর্বল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সনদ বিচারে এ কথাটি বানোয়াট বলেই বুঝা যায়।(হাকিম, আল মুসতাদরাক ৪/৯৭-৯৮; সুয়ূতী, আল লাআলী ১/৪৪২; সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ৪৫-৪৬; আলবানী, যায়ীফাহ ১/২৯৩)।
২. ফার্সী ভাষায় কথা বলার কঠিন অপরাধ
হাকিম নাইসাপুরী তার আল মুসতাদরাক গ্রন্থে আনাস(রা)এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে নিম্নের হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেনঃ “যদি কেউ ফার্সী ভাষায় কথা বলে, তবে তা তার নোংরামি পাপ বৃদ্ধি করবে এবং তার মনুষ্যত্ব ও ব্যক্তিত্ব কমিয়ে দিবে।”
এই হাদীসের একমাত্র বর্ণনাকারী তালহা ইবনু যাইদ রুক্কী। তিনি দাবি করেন যে, ইমাম আউযায়ী তাকে হাদীসটি ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসির থেকে আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন। এই ব্যক্তিকে মুহাদ্দিসগণ পরিত্যক্ত ও অত্যন্ত আপত্তিকর বলে উল্লেখ করেছেন। এজন্য ইবনুল জাওযী, যাহাবী প্রমুখ ইমাম হাদীসটিকে বানোয়াট ও মিথ্যা বলে গণ্য করেছেন। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, সনদগত দুর্বলতার পাশাপাশি অর্থ ইসলামী মূল্যবোধের বিরোধী হওয়ায় হাদীসটি বাতিল বলেই গণ্য।(ইবনু আদী, আল কামিল ৪/১০৮-১১০; হাকিম, আল মুসতাদরাক ৪/৯৮; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৩/৪৬৩-৪৬৪; ইবনু ইরাক, তানযীহ ২/২৯১)।
৩. বিভিন্ন পেশার নিন্দা
যে সকল জাল হাদীস আমাদের সমাজে দীর্ঘস্থায়ী ঘৃণ্য প্রভাব রেখেছে সেগুলির অন্যতম হলো তাঁতী, দর্জি, কর্মকার, নাপিত ইত্যাদি পেশার মানুষদের বিরুদ্ধে বানানো বিভিন্ন জাল হাদীস। ইসলামে শ্রম, কর্ম ও পেশাকে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। সকল প্রকার পেশা ও কর্মকে প্রশংসা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে এ সকল জালিয়াত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নামে বিভিন্ন পেশার নিন্দায় হাদীস বানিয়েছে। যেমন, তাঁতীগণ বা নাপিতগণ অন্য মুসলমানদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের সমমর্যাদা সম্পন্ন নয়। কর্মকার বা স্বর্ণকারগণ সবচেয়ে বেশি মিথ্যাবাদী। তাঁতিরাই দাজ্জালের অনুসারী হবে। পশু-ব্যবসায়ী, কসাই বা শিকারীর নিন্দা।(দাইলামী, আল ফিরদাউস ৩/৮৯; ইবনুল জাওযী, আল মাউদূ‘আত ১/১৬২-১৬৩; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ৫/১৭৪-১৭৬; ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/২৫৪-২৫৫; আলবানী, যায়ীফুল জামি, পৃ. ৫৬২-৫৬৩)।
এ সকল জাল হাদীসের প্রচলন মুসলিম সমাজে বিভিন্ন পেশার প্রতি ঘৃণা, কর্মের প্রতি ঘৃণা ইত্যাদি ইসলাম বিরোধী মানসিকতা সৃষ্টি করেছে।
২.১৮. অন্যান্য কিছু বানোয়াট হাদীস
আমরা জানি যে, আখেরাতের জন্য দুনিয়াতেই কর্ম করতে হবে। তবে এই অর্থে একটি হাদীস প্রচলিত, যা ভিত্তিহীন। হাদীসটিতে বলা হয়েছেঃ “দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র।” কথাটির অর্থ সঠিক হলেও তা হাদীস নয়। কোনো সহীহ,যয়ীফ বা মাঊদূ সনদেও কথাটি কোথাও বর্ণিত হয় নি। শুধু জনশ্রুতির ভিত্তিতে অনেকে তা হাদীস বলে লিখেছেন, বলেছেন ও বলছেন।(সাগানী, আল মাঊদূ‘আত, পৃ. ৬৪; সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ২২৭; মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ১২৩; দরবেশ হুত, আসানুল মাতালিব, পৃ. ১১০)।
২. নেককারদের পূণ্য নিকটবর্তীদের পাপ
প্রচলিতি একটি বাক্য যা সাধারণত হাদীস হিসেবে উল্লেখ করা হয়ঃ “নেককার মানুষদের নেক-আমলসমূহ নিকটবর্তীগণের(আল্লাহর ওলীদের) জন্য পাপ বলে গণ্য।” মুহাদ্দিসগণ একমত যে, বাক্যটি হাদীস নয়, বরং তৃতীয় শতকের একজন বুযুর্গ আবূ সাঈদ আল খাররার(২৮৬ হি) এর কথা।(ইবনু তাইমিয়া, আহাদীসুল কুসসাস, পৃ. ৮৪; সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ১৯৯; মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ১১৩; আল-মাসনূ, পৃ. ৬৪)।
৩. মনোযোগ ছাড়া সালাত হবে না
‘হাদীস’ বলে প্রচলিত আরেকটি ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা। “অন্তরের উপস্থিতি ছাড়া সালাত হবে না।” সালাতের মধ্যে মনোযোগের গুরুত্ব কুরআন ও বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে বুঝা যায়। তবে এই কথাটি হাদীস নয়; বরং সনদবিহীন বানোয়াট কথা।
৪. মৃত্যুর আগে মৃত্যুবরণ কর
হাদীস নামে প্রচলিত একটি বানোয়াট বাক্যঃ “তোমরা মৃত্যুর আগেই মৃত্যুবরণ কর।” ইবুন হাজার আসকালানী, সাখাবী, মোল্লা আলী কারী প্রমুখ মুহাদ্দিস একমত যে, এই কথাটি ভিত্তিহীন একটি বানোয়াট কথা।(সাখাবী, আল মাকাসিদ, পৃ. ৪৩২; মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ২৪৬; দরবেশ হুত, আসানুল মাতালিব, পৃ. ২৩৫, আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৩৮৪)।
৫. ধুমপানের মহাপাপ
প্রচলিত একটি পত্রিকা(আঞ্জুমানে আহমাদিয়া রাহমানিয়া সুন্নিয়া, চট্টগ্রাম, মাসিক তরজুমান ২৫ বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, মে-জুন ২০০৫, পৃ. ৫৭) থেকে জানা যায় যে, আমাদের দেশের কোনো কোনো এলাকায় ধুমপানের বিরুদ্ধে দুটি বানোয়াট হাদীস প্রচার করা হয়। “যে ব্যক্তি ধুমপান করল সে যেন নবীগণের রক্ত পান করল।” “যে ব্যক্তি ধুমপান করল, সে যেন কাবাঘরের মধ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করল।” এই প্রকারের জঘন্য নোংরা ও ফালতু কথা কেউ হাদীস হিসেবে বলতে পারে বলে বিশ্বাস করা কষ্ট। সর্বাবস্থায় এগুলি জঘন্য মিথ্যা ও বানোয়াট কথা।
৬. মাদ্রাসা নবীর ঘর
আমাদের দেশের অতি প্রচলিত ও ওয়ায়িযদের প্রিয় হাদীসঃ “মাসজিদ আল্লাহর বাড়ি এবং মাদ্রাসা আমার বাড়ি বা ঘর।”
এই কথাটি হাদীসের নামে বলা একটি জঘন্য মিথ্যা ও বানোয়াট কথা, যা কোনো সহীহ, যয়ীফ সনদ তো দূরের কথা, কোনো জাল বা মাউযূ সনদেও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত হয় নি। ‘মাদ্রাসা’ শব্দটিরই কোনো ব্যবহার ইসলামের প্রথম দুই শতাব্দীতে ছিল না।
শেষ কথা
হাদীসের নামে জালিয়াতির এই আলোচনা এখানেই শেষ করছি। আমাদের চারিপাশে অগণিত জাল হাদীসের ছড়াছড়ি। ওয়াযে, আলোচনায়, লেখনীতে, গবেষণায় সর্বত্রই এসকল মিথ্যা ও বানোয়াট কথার ব্যাপকতা লক্ষ্য করা যায়। হাদীসের নামে বা রাসূলুল্লাহর (ﷺ) নামে প্রচলিত ও প্রচারিত এ সকল অগণিত জাল কথার মধ্য থেকে কিছু বিষয় এ পুস্তকে আলোচনার চেষ্টা করেছি। মহিমাময় আল্লাহর দয়া ও তাওফীক হলে পরবর্তী খন্ডগুলিতে প্রচলিত অন্যান্য বানোয়াট, মিথ্যা ও অনির্ভরযোগ্য কথা আলোচনা করব।
সাইয়্যেদুল মুরসালীন, রাহমাতুল্লীল আলামীন মুহাম্মাদুর রাসূলু্ল্লাহ (ﷺ) এর সহীহ সুন্নাতকে জীবিত করা এবং মিথ্যা, জাল , ভিত্তিহীন বা অনির্ভরযোগ্য কথা আলোচনা, বর্ণনা, পালন বা বিশ্বাসের কঠিন পাপ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার আবেগে অযোগ্যতা ও দুর্বলতা সত্ত্বেও এ বিষয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করলাম। স্বভাবতই এর মাঝে অনেক ভুলভ্রান্তি রয়েছে। আমি সকল ভুলভ্রান্তির জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করছি ও তাওবা করছি।
এই নগন্য প্রচেষ্টার মধ্যে যা কিছু কল্যাণকর রয়েছে সবই মহান আল্লাহর দয়া ও তাওফীক। তাঁর পবিত্র দরবারে দোয়া করি, তিনি যেন দয়া করে তাঁর প্রিয়তম রাসূলের (ﷺ) সুন্নাতের খেদমতে এই নগন্য প্রচেষ্টাটুকু কবুল করে নেন এবং একে আমার, আমার পিতামাতা ও সকল পাঠকের নাজাতের ওসীলা বানিয়ে দেন। আমীন!
وصلى آللًه على محمد آلنبى آلأمى وآله وأصحبه أجمعين وآلحمد للًه رب آلع مين